📄 কাবার নির্মাণ এবং হাজরে আসওয়াদের বিরোধ মীমাংসা
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর, সে সময় কোরায়শরা নতুন করে কাবাঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এ উদ্যোগের কারণ ছিলো এই যে, কাবাঘর মানুষের উচ্চতার চেয়ে সামান্য বেশি উচ্চতা বিশিষ্ট চার দেয়ালে ঘেরা ছিলো। হযরত ইসমাইল (আ.)-এর যমানায়ই এসব দেয়ালের উচ্চতা ছিলো নয় হাত এবং উপরে কোন ছাদ ছিলো না। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত চোর ভেতরের সম্পদ চুরি করে। তাছাড়া নির্মাণের পর দীর্ঘকাল কেটে গেছে। ইমারত পুরনো হওয়ায় দেয়ালে ফাটল ধরেছিলো। এদিকে সে বছর প্রবল প্লাবনও হয়েছিলো, সেই প্লাবনের তোড় ছিলো কাবাঘরের দিকে। এ সব কারণে কাবাঘর যে কোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিলো। তাই কোরায়শরা কাবাঘর নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো।
এ পর্যায়ে কোরায়শরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, কাবাঘরের নির্মাণ কাজে শুধু বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থই ব্যবহার করা হবে। এসবের মধ্যে পতিতার উপার্জন, সুদের অর্থ এবং অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা কোনো অর্থ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না।
কাবাঘর নতুন করে নির্মাণের জন্যে পুরনো ইমারত ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু কেউ ঘর ভাঙ্গার সাহস পাচ্ছিলো না। অবশেষে ওলীদ ইবনে মুগিরা মাখযমি প্রথমে ভাঙ্গতে শুরু করলো। সবাই যখন লক্ষ্য করলো যে, ওলীদের ওপর কোন বিপদ আপতিত হয়নি, তখন সবাই ভাঙ্গার কাজে অংশগ্রহণ করলো। হযরত ইব্রাহীম (আ.) নির্মিত অংশও ভাঙ্গার পর নতুন করে নির্মাণ শুরু করা হলো। নির্মাণ কাজে প্রত্যেক গোত্রের অংশ নির্ধারিত ছিলো এবং প্রত্যেক গোত্র কাজ শুরু করলো। বাকুম নামে এক রোমক স্থপতি নির্মাণ কাজ তদারক করছিলো। ইমারত যখন হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত উঁচু হলো তখন বিপদ দেখা দিলো যে, এ পবিত্র পাথর কে স্থাপন করবে? এটা ছিলো একটা পবিত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত কাজ। চার পাঁচ দিন যাবত এ ঝগড়া চলতে থাকলো। এ ঝগড়া এমন মারাত্মক রূপ ধারণ করলো যে, খুন খারাবি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। আবু উমাইয়া মাখজুমি এ বিবাদ ফয়সালার একটা উপায় এভাবে নির্ধারণ করলেন যে, আগামীকাল প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরোজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন, তার ফয়সালা সবাই মেনে নেবে। এ প্রস্তাব সবাই গ্রহণ করলো। পরদিন প্রত্যুষে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম কাবাঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর তাঁকে বিচারক মনোনীত করা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একখানি চাদর মাটিতে বিছিয়ে নিজ হাতে সে চাদরের ওপর পাথর রাখলেন, তারপর বিবাদমান গোত্রসমূহের নেতাদের সে চাদরের অংশ ধরে পাথর যথাস্থানে নিয়ে যেতে বললেন। তারা তাই করলো। নির্ধারিত জায়গায় চাদর নিয়ে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে পাথর যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এ ফয়সালা ছিলো অত্যন্ত বিবেকসম্মত এবং বুদ্ধিদীপ্ত। বিবাদমান গোত্রের সকলেই এতে সন্তুষ্ট হলো, কারো কোনো অভিযোগ রইলো না।
এদিকে কোরায়শদের কাছে বৈধ অর্থের অভাব দেখা দিলো। এ কারণে তারা উত্তর দিকে কাবার দৈর্ঘ প্রায় ছয় হাত কমিয়ে দিল। এই অংশকে হেজর এবং হাতীম বলা হয়। এ পর্যায়ে কোরায়শরা কাবার দরোজা বেশ উঁচু করে দিলো, যাতে একমাত্র তাদের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিই কাবাঘরে প্রবেশ করতে পারে। দেয়ালসমূহ পনের হাত উঁচু হওয়ার পর ভেতরে ছয়টি খুঁটি দাঁড় করিয়ে ওপর থেকে ছাদ ঢালাই করা হলো। নির্মাণ শেষে কাবাঘর চতুষ্কোণ আকৃতি লাভ করলো। বর্তমানে কাবাঘরের উচ্চতা পনের মিটার। যে অংশে হাজরে আসওয়াদ রয়েছে, সে অংশের দেয়াল এবং তার সামনের অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণ অংশের দেয়াল দশ দশ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন। হাজরে আসওয়াদ মাটি থেকে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। যে দিকে দরোজা রয়েছে, সেদিকের দেয়াল এবং সামনের দিকের অংশ পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দেয়াল থেকে বারো মিটার উচ্চ। দরোজা মাটি থেকে দুই মিটার উঁচু। দেয়ালের ঘেরাও এর নীচে চারিদিক থেকে চেয়ারের আকৃতিবিশিষ্ট ঘেরাও রয়েছে। এর উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ত্রিশ সেন্টিমিটার। এটাকে শাজরাওয়ান বলা হয়। এটাও প্রকৃতপক্ষে কাবাঘরের অংশ, কিন্তু কোরায়শরা এ অংশের নির্মাণ কাজও স্থগিত রাখে।
টিকাঃ
২৬. বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ১৯২, ১৯৭ ফেকহুস সীরাত ৬২, সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ১, ২, ১৫ তারীখে খাজরামি ১ম খন্ড, পৃ. ৬৪, ৬৫ দেখুন,
📄 নবুয়তের আগের জীবন
বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যেসব গুণবৈশিষ্ট বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে এককভাবেই বিদ্যমান ছিলো। তিনি ছিলেন সেগুলো দূরদর্শিতা, সত্যপ্রিয়তা এবং চিন্তাশীলতার এক সুউচ্চ মিনার। চিন্তার পরিচ্ছন্নতা, পরিপক্কতা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পবিত্রতা তাঁর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো। দীর্ঘ সময়ের নীরবতায় তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আল্লাহর সাহায্য পেতেন। পরিচ্ছন্ন, মার্জিত, সুন্দর বিবেক বুদ্ধি, উন্নত স্বভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি মানুষের জীবন, বিশেষত জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে গভীরভাবে ধ্যান করেছিলেন। এ ধ্যানের মাধ্যমে মানুষকে যে সকল পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত দেখলেন, এতে তাঁর মন ঘৃণায় ভরে উঠলো। তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হলেন। পঙ্কিলতার আবর্তে নিমজ্জিত মানুষ থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখলেন। মানুষের জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেয়ার পর মানবকল্যাণে যতোটা সম্ভব অংশগ্রহণ করতেন। বাকি সময় নিজের প্রিয় নির্জনতার ভুবনে ফিরে যেতেন। তিনি কখনো মদ স্পর্শ করেন নি, আস্তানায় যবাই করা পশুর গোশত খাননি, মূর্তির জন্যে আয়োজিত উৎসব, মেলা ইত্যাদিতেও কখনোই অংশগ্রহণ করেননি।
শুরু থেকে মূর্তি নামের বাতিল উপাস্যদের অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। এতো বেশি ঘৃণা অন্য কিছুর প্রতি ছিলো না। এছাড়া লাত এবং ওযযার নামে শপথও সহ্য করতে পারতেন না। তকদীর তাঁর ওপর হেফাযতের ছায়া ফেলে রেখেছিলো এতে কোন সন্দেহ নেই। পার্থিব কোন কিছু পাওয়ার জন্যে যখন মন ব্যাকুল হয়েছে, অথবা অপছন্দনীয় রুসস্ম-রেওয়াজের অনুসরণের জন্যে মনে ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সেসব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।
ইবনে আছিরের এক বর্ণনায় রয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জাহেলি যুগের লোকেরা যেসব কাজ করতো, দু'বারের বেশি কখনোই সেসব কাজ করার ইচ্ছে আমার হয়নি। সেই দু'টি কাজেও আল্লাহর পক্ষ থেকে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে।
এরপর সে ধরনের কাজের ইচ্ছা কখনোই আমার মনে জাগেনি। ইতিমধ্যে আল্লাহ তায়ালা আমাকে নবুয়তের গৌরবে গৌরবান্বিত করেছেন। মক্কার উপকণ্ঠে যে বালক আমার সাথে বকরি চরাতো, একদিন তাকে বললাম, তুমি আমার বকরিগুলোর দিকে যদি লক্ষ্য রাখতে, তবে আমি মক্কায় গিয়ে অন্য যুবকদের মতো রাত্রিকালের গল্প-গুজবের আসরে অংশ নিতাম। রাখাল রাজি হলো। আমি মক্কার দিকে রওয়ানা দিলাম। প্রথম ঘরের কাছে গিয়ে বাজনার আওয়ায শুনলাম। জিজ্ঞাসা করায় একজন বললো, অমুকের সাথে অমুকের বিবাহ হচ্ছে। আমি শোনার জন্যে বসে পড়লাম। আল্লাহ তায়ালা আমার কান বন্ধ করে দিলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। রোদের আঁচ গায়ে লাগার পর আমার ঘুম ভাঙ্গলো। আমি তখন মক্কার উপকণ্ঠে সেই রাখালের কাছে ফিরে গেলাম। সে জিজ্ঞাসা করার পর সব কথা খুলে বললাম। আরো একদিন একই রকমের কথা বলে রাখালের কাছ থেকে মক্কায় পৌছুলাম এবং প্রথমোক্ত রাতের মতই ঘটনাও সেদিন ঘটলো। এরপর কখনো ওই ধরনের ভুল ইচ্ছা আমার মনে জাগ্রত হয়নি।
সহীহ বোখারী শরীফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, কাবাঘর যখন নির্মাণ করা হয়েছিলো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আব্বাস পাথর ভাঙ্গছিলেন। হযরত আব্বাস (রা.) রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, তহবন্দ খুলে কাঁধে রাখো, পাথরের ধুলোবালি থেকে রক্ষা পাবে। তহবন্দ খোলার সাথে সাথে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর আকাশের প্রতি তাকালেন এবং বেহুঁশ হয়ে গেলেন। খানিক পরেই হুঁশ ফিরে এলে বললেন, আমার তহবন্দ, আমার তহবন্দ। এরপর তাঁর তহবন্দ তাঁকে পরিয়ে দেয়া হয়। এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এ ঘটনার পর আর কখনো তাঁর লজ্জাস্থান দেখা যায়নি।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রশংসনীয় কাজ, উন্নত সুন্দর চরিত্র এবং মাধূর্য মন্ডিত স্বভাবের কারণে স্বতন্ত্র এবং বিশিষ্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে অধিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, উন্নত চরিত্রের অধিকারী, সম্মানিত প্রতিবেশী, সর্বাধিক দূরদর্শিতাসম্পন্ন, সকলের চেয়ে অধিক সত্যবাদী, সকলের চেয়ে কোমলপ্রাণ ও সর্বাধিক পবিত্র পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী। ভালো কাজে ভালো কথায় তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রসর এবং প্রশংসিত। অংগীকার পালনে ছিলেন সকলের চেয়ে অগ্রণী, আমানতদারির ক্ষেত্রে ছিলেন অতুলনীয়। স্বজাতির লোকেরা তার নাম রেখেছিলো আল-আমিন। তার মধ্যে ছিলো প্রশংসনীয় গুণ বৈশিষ্টের সমন্বয়। হযরত খাদিজা (রা.) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি বিপদগ্রস্তদের বোঝা বহন করতেন, দুঃখী দরিদ্র লোকদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াতেন, মেহমানদারি করতেন এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজে সাহায্য করতেন।
টিকাঃ
২৭. বুহাইরার ঘটনায় এর প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে (ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১২৮),
২৮. হাকেম যাহাবি এ হাদীসকে সহীহ বলেছেন। আর ইবনে কাছির তাঁর 'আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া' গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডের ২৮৭ পৃষ্ঠায় এই হাদীসকে যঈফ (দুর্বল) বলে উল্লেখ করেছেন।
২৯. সহীহ বোখারী, বাবে বুনিয়ানুল কাবা, ১ম খন্ড, পৃ. ৫৪০
৩০. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৩