📄 পাদ্রী বুহাইরা ও ফুজ্জারের যুদ্ধ
নবী মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন বারো বছর, মতান্তরে বারো বছর দুই মাস দশদিন হলো তখন আবু তালেব তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন। বসরায় পৌঁছার পর এক জায়গায় তাঁবু স্থাপন করলেন। সে সময় আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত রাজ্যের রাজধানী সেরা ছিলো। সেই শহরে জারজিস নামে একজন পাদ্রী ছিলেন। তিনি বুহাইরা নামে পরিচিত ছিলেন। কাফেলা তাঁবু স্থাপনের পর বুহাইরা গীর্জা থেকে বের হয়ে কাফেলার লোকদের কাছে এলেন এবং তাদের মেহমানদারী করলেন। অথচ পাদ্রী বুহাইরা কখনো তার গীর্জা থেকে বের হতেন না। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিনে ফেললেন এবং তাঁর হাত ধরে বললেন, তিনি সাইয়েদুল আলামিন। আল্লাহ তায়ালা এঁকে রহমাতুললিল আলামিন হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আবু তালেব বুহাইরাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এটা কিভাবে বুঝলেন? তিনি বললেন, আপনারা এই এলাকায় আসার পর এই বালকের সম্মানে এখানকার সব গাছপালা এবং পাথর সেজদায় নত হয়েছে। এরা নবী ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করে না। তাছাড়া মোহরে নবুয়তের দ্বারা আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। তাঁর কাঁধের নীচে নরম হাড়ের পাশে এটি 'সেব' ফলের মতো মজুদ রয়েছে। আমরা তাঁর উল্লেখ আমরা আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে দেখেছি।
এরপর পাদ্রী বুহাইরা আবু তালেবকে বললেন, ওকে মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দিন। সিরিয়ায় নেবেন না। ইহুদীরা ওর ক্ষতি করতে পারে। এ পরামর্শ অনুযায়ী আবু তালেব কয়েকজন ভৃত্যের সঙ্গে প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন।
ফুজ্জারের যুদ্ধ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন পনের বছর, তখন ফুজ্জারের যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে একদিকে কোরায়শ এবং তাদের সাথে ছিলো বনু কেনানা অন্যদিকে ছিলো কয়সে আয়নাল। কোরায়শ এবং কেনানার প্রধান ছিলো হারব ইবনে উমাইয়া। বয়স এবং বংশ মর্যাদার কারণে কোরায়শের কাছে সে সম্মানের পাত্র ছিলো। বনু কেনানাও তাকে সম্মান করতো। যুদ্ধের প্রথম প্রহরে কেনানার ওপর কয়েসের পাল্লা ভারি ছিলো। কিন্তু দুপুর হতে না হতেই কয়েসের ওপর কেনানার পাল্লা ভারি হয়ে গেলো। এই যুদ্ধকে ফুজ্জারের যুদ্ধ বলা হয়। কারণ যেহেতু এতে হরম এবং হারাম মাস উভয়ের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছিলো। এই যুদ্ধে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর চাচাদের হাতে তীর তুলে দিতেন।
হেলফুল ফুযুল ফুজ্জারের যুদ্ধের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত যিলকদ মাসে হেলফুল ফুযুল সংঘটিত হয়। কয়েকটি গোত্র যেমন কোরায়শ অর্থাৎ বনি হাশেম, বনি মোত্তালেব, বনি আসাদ ইবনে আবদুল ওযযা, বনি যোহরা ইবনে কেলাব এবং বনু তাইম ইবনে মোররা এর ব্যবস্থা করেন। এরা সবাই আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন তাইমির ঘরে একত্রিত হন। এরা বয়স এবং আভিজাত্যে ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। এরা পরস্পর এ মর্মে অংগীকার করলেন যে, মক্কায় সংঘটিত যে কোন প্রকার যুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করবেন।
হোক মক্কার অধিবাসী বা বাইরের কেউ— অত্যাচারিত হলে প্রতিকার করে তার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। এ সমাবেশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও উপস্থিত ছিলেন। নবুয়ত পাওয়ার পর এ ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলতেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন চুক্তিতে শরিক ছিলাম, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার পছন্দ নয়। ইসলামী যুগে সেই চুক্তির জন্যে যদি আমাকে ডাকা হতো, তবে আমি অবশ্যই হাযির হতাম।
এ চুক্তির মূল ছিলো জাহেলী যুগের যাবতীয় বে-ইনসাফী দূরীকরণ। এ চুক্তির কারণ এটাই বলা হয়েছে যে, যোবায়েরের একজন লোক কিছু জিনিস নিয়ে মক্কায় এসেছিলো। আস ইবনে ওয়ায়েল তার কাছ থেকে সেই জিনিস ক্রয় করে, কিন্তু তার মূল্য পরিশোধ করেনি। আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছে জিনিস বিক্রেতা আবদুদ দার, মাখজুম, জামিহ, ছাহাম এবং আদীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়। কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি। এরপর সেই লোকটি আবু কুরাইস পাহাড়ে উঠে উচ্চস্বরে কয়েকটি কবিতা আবৃত্ত করলো। সে কবিতায় তার প্রতি অত্যাচারের কথা বর্ণনা করা হয়েছিলো।
এতে যোবায়ের ইবনে আবদুল মোত্তালেব ছুটোছুটি শুরু করে বলেন, এই লোকটির কোন সাহায্যকারী নেই কেন? তার চেষ্টায় উল্লেখিত কয়েকটি গোত্র একত্রিত হলো। প্রথমে তারা চুক্তি করলো পরে আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছ থেকে বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায় করে দিল।
সংগ্রামী জীবন যাপন তরুণ বয়সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দিষ্ট কোন কাজ ছিলো না। তবে বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি বকরি চরাতেন। সেগুলো ছিলো বনি সা'দ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কায় বিভিন্ন লোকের বকরিও তিনি চরাতেন। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি হযরত খাদিজা (রা.) বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় সফর করেন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ একজন অভিজাত ও ধনবতী মহিলা ছিলেন। তিনি বিভিন্ন লোককে দিয়ে পণ্য কিনতেন এবং সেসব পণ্য বিক্রি করাতেন। লাভের একটা অংশ তিনি গ্রহণ করতেন। সমগ্র কোরায়শ গোত্রই ব্যবসা করতো। বিবি খাদিজা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সততা, সচ্চরিত্রতা এবং নম্রতার কথা শুনে তাঁকে ব্যবসায় নিয়োগের জন্যে প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি তাঁর ক্রীতদাস মায়ছারাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রস্তাব দিলেন। বিবি খাদিজা একথাও বললেন যে অন্য লোকদের তিনি যে পারিশ্রমিক দিয়ে থাকেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক দেবেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং বিবি খাদিজার ব্যবসায়িক পণ্য (তথা মসলাদী) তাঁর ক্রীতদাস মায়ছারাকে সাথে করে নিয়ে সিরিয়া গেলেন।
টিকাঃ
১৬. তালকিহুল ফুহুম, ইবনে জওযি, পৃ. ৭
১৭. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১৬, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৮০, ১৮৩, তিরমিযি সহ অনন্য গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি হযরত বেলালের সাথে মক্কায় ফিরে যান, কিন্তু এটা ভুল। বেলালের- তখনো জন্মই হয়নি। আর জন্ম হয়ে থাকলেও তিনি আবু তালেব বা আবু বকরের সাথে পরিচিত ছিলেন না। যাদুল মা'য়াদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১৭
১৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৮৪-১৮৬ কলবে জাযিরাতুল আরব, পৃ. ৩৬০, তারীখে খাযরামি, ১ম খন্ড, পৃ. ৬৩
১৯. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৩৩, ১৩৫, মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ৩০, ৩১।
২০. মুখতাছারুছ সীরাত, পৃ. ৩০-৩১
২১. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ৬২, ১৬৬
২২. সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৩০১
📄 হেলফুল ফুযুল ও সংগ্রামী জীবন যাপন
ফুজ্জারের যুদ্ধের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত যিলকদ মাসে হেলফুল ফুযুল সংঘটিত হয়। কয়েকটি গোত্র যেমন কোরায়শ অর্থাৎ বনি হাশেম, বনি মোত্তালেব, বনি আসাদ ইবনে আবদুল ওযযা, বনি যোহরা ইবনে কেলাব এবং বনু তাইম ইবনে মোররা এর ব্যবস্থা করেন। এরা সবাই আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন তাইমির ঘরে একত্রিত হন। এরা বয়স এবং আভিজাত্যে ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। এরা পরস্পর এ মর্মে অংগীকার করলেন যে, মক্কায় সংঘটিত যে কোন প্রকার যুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করবেন।
হোক মক্কার অধিবাসী বা বাইরের কেউ— অত্যাচারিত হলে প্রতিকার করে তার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। এ সমাবেশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও উপস্থিত ছিলেন। নবুয়ত পাওয়ার পর এ ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলতেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন চুক্তিতে শরিক ছিলাম, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার পছন্দ নয়। ইসলামী যুগে সেই চুক্তির জন্যে যদি আমাকে ডাকা হতো, তবে আমি অবশ্যই হাযির হতাম।
এ চুক্তির মূল ছিলো জাহেলী যুগের যাবতীয় বে-ইনসাফী দূরীকরণ। এ চুক্তির কারণ এটাই বলা হয়েছে যে, যোবায়েরের একজন লোক কিছু জিনিস নিয়ে মক্কায় এসেছিলো। আস ইবনে ওয়ায়েল তার কাছ থেকে সেই জিনিস ক্রয় করে, কিন্তু তার মূল্য পরিশোধ করেনি। আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছে জিনিস বিক্রেতা আবদুদ দার, মাখজুম, জামিহ, ছাহাম এবং আদীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়। কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি। এরপর সেই লোকটি আবু কুরাইস পাহাড়ে উঠে উচ্চস্বরে কয়েকটি কবিতা আবৃত্ত করলো। সে কবিতায় তার প্রতি অত্যাচারের কথা বর্ণনা করা হয়েছিলো।
এতে যোবায়ের ইবনে আবদুল মোত্তালেব ছুটোছুটি শুরু করে বলেন, এই লোকটির কোন সাহায্যকারী নেই কেন? তার চেষ্টায় উল্লেখিত কয়েকটি গোত্র একত্রিত হলো। প্রথমে তারা চুক্তি করলো পরে আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছ থেকে বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায় করে দিল।
টিকাঃ
১৯. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৩৩, ১৩৫, মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ৩০, ৩১।
২০. মুখতাছারুছ সীরাত, পৃ. ৩০-৩১
📄 বিবি খাদিজার সাথে বিয়ে
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাণিজ্যিক সফর থেকে ফিরে আসার পর বিবি খাদিজা লক্ষ্য করলেন, অতীতের চেয়ে এবার তাঁর অনেক বেশি লাভ হয়েছে। এছাড়া তিনি ভৃত্য মায়ছারার কাছে আল্লাহর রসূলের উন্নত চরিত্র, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদির ভূয়সী প্রশংসা শুনলেন। এসব শুনে মনে মনে তিনি আল্লাহর রসূলকে ভালোবেসে ফেললেন। এর আগে বড় বড় সর্দার এবং নেতৃস্থানীয় লোক বিবি খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন প্রস্তাবই তিনি গ্রহণ করেননি। মনের গোপন ইচ্ছার কথা বিবি খাদিজা তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহর কাছে ব্যক্ত করলেন। নাফিসা গিয়ে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বললেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাযি হলেন এবং তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করলেন। তাঁর চাচারা খাদিজার চাচার সাথে আলোচনা করলেন এবং বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। এরপর বিয়ে হয়ে গেলো। এ বিয়েতে বনি হাশেম এবং মুযার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষ করে ফিরে আসার দুই মাস পর এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ের মোহরানা হিসাবে বিশটি উট দিয়েছিলেন। বিবি খাদিজার বয়স সে সময় ছিলো চল্লিশ বছর। তিনি বিবেক বুদ্ধি, সৌন্দর্য, অর্থ সম্পদ, বংশমর্যাদায় ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ নারী। বিবি খাদিজার সাথে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এটা ছিলো প্রথম বিবাহ। তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি। ইবরাহীম ব্যতীত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল সন্তান ছিলেন বিবি খাদিজার গর্ভজাত। সর্বপ্রথম কাসেম জন্মগ্রহণ করেন। এ কারণে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হতো আবুল কাসেম বা কাসেমের পিতা। কাসেমের পর যয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা এবং আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। আবদুল্লাহর উপাধি ছিলো তাইয়েব এবং তাহের। পুত্র সন্তান সকলেই শৈশবে ইন্তেকাল করেন। কন্যারা ইসলামের যুগ পেয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরতের গৌরব অর্জন করেন। হযরত ফাতেমা (রা.) ছাড়া অন্য সকলেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়ই ইন্তেকাল করেন। হযরত ফাতেমা (রা.) তাঁর আব্বা রসূলুল্লাহ (স)-এর ইন্তেকালের মাত্র ছয় মাস পর ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
২৩. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ১৮৭,১৮৮
২৪. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৮৯, ১৯০, ফেকহুছ সীরাত পৃ. ৫৯, তালকিছুল ফুহুম, পৃ. ৭
২৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ; ১৯০, ১৯১, ফেকহুছ সীরাত পৃ. ৬০, ফতহুল বারী, সপ্তম খন্ড, পৃ. ১০৫, ঐতিহাসিক তথ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। যে তথ্য নির্ভুল মনে হয়েছে সে তথ্যই উল্লেখ করেছি।
📄 কাবার নির্মাণ এবং হাজরে আসওয়াদের বিরোধ মীমাংসা
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর, সে সময় কোরায়শরা নতুন করে কাবাঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এ উদ্যোগের কারণ ছিলো এই যে, কাবাঘর মানুষের উচ্চতার চেয়ে সামান্য বেশি উচ্চতা বিশিষ্ট চার দেয়ালে ঘেরা ছিলো। হযরত ইসমাইল (আ.)-এর যমানায়ই এসব দেয়ালের উচ্চতা ছিলো নয় হাত এবং উপরে কোন ছাদ ছিলো না। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত চোর ভেতরের সম্পদ চুরি করে। তাছাড়া নির্মাণের পর দীর্ঘকাল কেটে গেছে। ইমারত পুরনো হওয়ায় দেয়ালে ফাটল ধরেছিলো। এদিকে সে বছর প্রবল প্লাবনও হয়েছিলো, সেই প্লাবনের তোড় ছিলো কাবাঘরের দিকে। এ সব কারণে কাবাঘর যে কোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিলো। তাই কোরায়শরা কাবাঘর নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো।
এ পর্যায়ে কোরায়শরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, কাবাঘরের নির্মাণ কাজে শুধু বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থই ব্যবহার করা হবে। এসবের মধ্যে পতিতার উপার্জন, সুদের অর্থ এবং অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা কোনো অর্থ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না।
কাবাঘর নতুন করে নির্মাণের জন্যে পুরনো ইমারত ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু কেউ ঘর ভাঙ্গার সাহস পাচ্ছিলো না। অবশেষে ওলীদ ইবনে মুগিরা মাখযমি প্রথমে ভাঙ্গতে শুরু করলো। সবাই যখন লক্ষ্য করলো যে, ওলীদের ওপর কোন বিপদ আপতিত হয়নি, তখন সবাই ভাঙ্গার কাজে অংশগ্রহণ করলো। হযরত ইব্রাহীম (আ.) নির্মিত অংশও ভাঙ্গার পর নতুন করে নির্মাণ শুরু করা হলো। নির্মাণ কাজে প্রত্যেক গোত্রের অংশ নির্ধারিত ছিলো এবং প্রত্যেক গোত্র কাজ শুরু করলো। বাকুম নামে এক রোমক স্থপতি নির্মাণ কাজ তদারক করছিলো। ইমারত যখন হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত উঁচু হলো তখন বিপদ দেখা দিলো যে, এ পবিত্র পাথর কে স্থাপন করবে? এটা ছিলো একটা পবিত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত কাজ। চার পাঁচ দিন যাবত এ ঝগড়া চলতে থাকলো। এ ঝগড়া এমন মারাত্মক রূপ ধারণ করলো যে, খুন খারাবি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। আবু উমাইয়া মাখজুমি এ বিবাদ ফয়সালার একটা উপায় এভাবে নির্ধারণ করলেন যে, আগামীকাল প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরোজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন, তার ফয়সালা সবাই মেনে নেবে। এ প্রস্তাব সবাই গ্রহণ করলো। পরদিন প্রত্যুষে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম কাবাঘরে প্রবেশ করলেন। এরপর তাঁকে বিচারক মনোনীত করা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একখানি চাদর মাটিতে বিছিয়ে নিজ হাতে সে চাদরের ওপর পাথর রাখলেন, তারপর বিবাদমান গোত্রসমূহের নেতাদের সে চাদরের অংশ ধরে পাথর যথাস্থানে নিয়ে যেতে বললেন। তারা তাই করলো। নির্ধারিত জায়গায় চাদর নিয়ে যাওয়ার পর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে পাথর যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এ ফয়সালা ছিলো অত্যন্ত বিবেকসম্মত এবং বুদ্ধিদীপ্ত। বিবাদমান গোত্রের সকলেই এতে সন্তুষ্ট হলো, কারো কোনো অভিযোগ রইলো না।
এদিকে কোরায়শদের কাছে বৈধ অর্থের অভাব দেখা দিলো। এ কারণে তারা উত্তর দিকে কাবার দৈর্ঘ প্রায় ছয় হাত কমিয়ে দিল। এই অংশকে হেজর এবং হাতীম বলা হয়। এ পর্যায়ে কোরায়শরা কাবার দরোজা বেশ উঁচু করে দিলো, যাতে একমাত্র তাদের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিই কাবাঘরে প্রবেশ করতে পারে। দেয়ালসমূহ পনের হাত উঁচু হওয়ার পর ভেতরে ছয়টি খুঁটি দাঁড় করিয়ে ওপর থেকে ছাদ ঢালাই করা হলো। নির্মাণ শেষে কাবাঘর চতুষ্কোণ আকৃতি লাভ করলো। বর্তমানে কাবাঘরের উচ্চতা পনের মিটার। যে অংশে হাজরে আসওয়াদ রয়েছে, সে অংশের দেয়াল এবং তার সামনের অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণ অংশের দেয়াল দশ দশ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন। হাজরে আসওয়াদ মাটি থেকে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। যে দিকে দরোজা রয়েছে, সেদিকের দেয়াল এবং সামনের দিকের অংশ পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দেয়াল থেকে বারো মিটার উচ্চ। দরোজা মাটি থেকে দুই মিটার উঁচু। দেয়ালের ঘেরাও এর নীচে চারিদিক থেকে চেয়ারের আকৃতিবিশিষ্ট ঘেরাও রয়েছে। এর উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ত্রিশ সেন্টিমিটার। এটাকে শাজরাওয়ান বলা হয়। এটাও প্রকৃতপক্ষে কাবাঘরের অংশ, কিন্তু কোরায়শরা এ অংশের নির্মাণ কাজও স্থগিত রাখে।
টিকাঃ
২৬. বিস্তারিত বিবরণের জন্য ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ১৯২, ১৯৭ ফেকহুস সীরাত ৬২, সহীহ বোখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ১, ২, ১৫ তারীখে খাজরামি ১ম খন্ড, পৃ. ৬৪, ৬৫ দেখুন,