📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 তাঁর জন্ম মোবারক ও বনি সা'দ গোত্রে অবস্থান

📄 তাঁর জন্ম মোবারক ও বনি সা'দ গোত্রে অবস্থান


রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় বনি হাশেম বংশে ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। সেই বছরেই হাতী যুদ্ধের ঘটনাটি ঘটেছিলো। সে সময় সম্রাট নওশেরওয়ার সিংহাসনে আরোহণের চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়েছিলো। জন্ম তারিখ ছিলো ২০ বা ২২ শে এপ্রিল। ৫৭১ ঈসায়ী সাল। সাইয়েদ সোলায়মান নদভী, সালমান মনসুরপুী এবং মোহাম্মদ পাশা ফালাকি গবেষণা করে এ তথ্য উদঘাটন করেছেন।¹

ইবনে সা'দ-এর বর্ণনায় রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতা বলেছেন, যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন তখন দেহ থেকে একটি নূর বের হলো, সেই নূর দ্বারা শামদেশের মহল উজ্জ্বল হয়ে গেলো। ইমাম আহমদ হযরত এরবাজ ইবনে ছারিয়া থেকে প্রায় একই ধরনের একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।²

কোন কোন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, নবুয়তের পটভূমি হিসেবে আল্লাহর রসূলের জন্মের সময় কিছু কিছু ঘটনা প্রকাশ পেয়েছিলো। কেসরার রাজ প্রাসাদের চৌদ্দটি পিলার ধসে পড়েছিলো। অগ্নি উপাসকদের অগ্নিকুন্ড নিভে গিয়েছিলো। বহিরার গীর্জা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। এটি ছিলো বায়হাকির বর্ণনা। কিন্তু মোহাম্মদ গাযযালী এ বর্ণনা সমর্থন করেননি।³

জন্মের পর তাঁর মা তাঁর দাদা আবদুল মোত্তালেবের কাছে পৌত্রের জন্মের সুসংবাদ দিলেন। তিনি খুব খুশি হলেন এবং সানন্দভাবে তাঁকে কাবাঘরে নিয়ে গিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া এবং শোকরেয়া আদায় করলেন। এ সময় তিনি তাঁর নাম রাখলেন মোহাম্মদ। এ নাম আরবে পরিচিত ছিলো না। এরপর আরবের নিয়ম অনুযায়ী সপ্তম দিনে খৎনা করালেন।⁵

মায়ের পর তাঁকে আবু লাহাবের দাসী ছাওবিয়া দুধ পান করান। সে সময় ছাওবিয়ার কোলের শিশুর নাম ছিলো মাছরুহ। ছাওবিয়া তাঁর আগে হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেব এবং তাঁর পরে আবু সালমা সামা ইবনে আবদুল আছাদ মাখজুমিকেও দুধ পান করিয়েছিলেন।⁶

বনি সা'দ গোত্রে অবস্থান
আরবের শহুরে নাগরিকদের রীতি ছিলো যে, তারা নিজেদের শিশুদের শহরের অসুখ বিসুখ থেকে ভালো রাখার জন্যে দুধ পান করানোয় কাজে নিয়োজিত বেদুইন নারীদের কাছে পাঠাতেন। এতে শিশুদের দেহ মজবুত এবং শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠতো। এছাড়া এর আরেক উদ্দেশ্য হলো, সেই দুধ পানের সময়েই যেন তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিখতে পারে। এই রীতি অনুযায়ী আবদুল মোত্তালেব ধাত্রীর খোঁজ করে তাঁর দৌহিত্রকে হালিমা বিনতে আবু জুয়াইবের হাতে দিলেন। এই মহিলা ছিলেন বনি সা'দ ইবনে বকরের অন্তর্ভুক্ত। তার স্বামী ছিলো হারেস ইবনে আবদুল ওযযা, ডাক নাম আবু কাবশা। তিনিও ছিলেন বনি সা'দ গোত্রেরই মানুষ।

হারেসের সন্তানরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পর্কের কারণে তাঁর দুধ ভাই ও বোন ছিলো। তাদের নাম হলো। আবদুল্লাহ, আনিসা, হোযাফা বা জোযামা। হালিমার উপাধি ছিলো শায়মা এবং এই নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুকের দুধ খাওয়াতেন। এবং তিনি ছাড়া আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মোত্তালেব, যিনি রসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই ছিলেন, তিনিও হালিমার মাধ্যমে তাঁর দুধ ভাই ছিলেন। তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালেবও দুধ পানের জন্যে বনু সা'দ গোত্রের একজন মহিলার কাছে ন্যস্ত হয়েছিলেন। বিবি হালিমার কাছে থাকার সময়ে এই মহিলাও একদিন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুধ পান করিয়েছিলেন। এই হিসাবে তিনি এবং হামযা উভয়ে দুই সূত্রে রেযায়ী ভাই বা দুধ ভাই ছিলেন। (একদিকে ছাওরিয়ার সূত্রে, অন্যদিকে বনু সা'দ গোত্রের এই মহিলার সূত্রে)।⁷

দুধ পান করানোর সময় হযরত হালিমা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতের এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বিস্তারিত বিবরণ তাঁর মুখেই শোনা যাক। ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে হযরত হালিমা বলেন, আমি আমার স্বামীর সাথে আমাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ বনি সা'দ গোত্রের কয়েকজন মহিলার সঙ্গে নিজেদের শহর ছেড়ে বের হলাম। সেটা ছিলো দুর্ভিক্ষের বছর; চারিদিকে অভাব অনটন। আমি একটি মাদী গাধার পিঠে সওয়ার ছিলাম। আমাদের কাছে একটি উটনিও ছিলো। কিন্তু সেই উটনি এক ফোটাও দুধ দিত না। ক্ষুধার জ্বালায় দুধের শিশু ছটফট করতো। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আমার বুকেও দুধ ছিলো না, উটনিও দুধ দিত না। বৃষ্টি এবং স্বাচ্ছন্দের অপেক্ষায় আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। মাদী গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় গাধা এতো ধীরে চলতে লাগলো যে, কাফেলার সবাই বিরক্ত হয়ে গেলো। দুধ পান করানোর জন্যে শিশুর সন্ধানে মক্কায় গেলাম। আমাদের কাফেলার যতো মহিলা ছিলো, সকলের কাছেই আল্লাহর রসূলকে গ্রহণ করতে পেশ করা হলো। কিন্তু পিতৃহীন অর্থাৎ এতিম হওয়ায় সবাই তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। কেননা সবাই সন্তানের পরিবার থেকে ভালো পারিশ্রমিকের আশা করছিলো। একজন বিধবা মা কি আর দিতে পারবে? এ কারণেই আমরা কেউ তাঁকে নিতে রাযি হইনি।

এদিকে আমাদের কাফেলার প্রত্যেক মহিলাই কোন না কোন শিশু পেয়ে গেলো। আমি কোন শিশুই পেলাম না। ফেরার সময় স্বামীকে বললাম, খালি হাতে ফিরে যেতে ভালো লাগছে না। আমি বরং সেই এতিম শিশুকেই নিয়ে যাই। স্বামী রাযি হলেন। বললেন, হয়তো ওর ওছিলায় আল্লাহ তায়ালা আমাদের বরকত দেবেন। এরপর আমি গিয়ে তাঁকে গ্রহণ করলাম।

হযরত হালিমা (রা.) বলেন, শিশুকে নিয়ে আমি যখন ডেরায় ফিরে এলাম তখন আমার উভয় স্তন ছিলো দুধে পূর্ণ, শিশুটি পেট ভরে দুধ পান করলো। তার সঙ্গে তার দুধ ভাইও পেট ভরে দুধ পান করলো। এরপর উভয়ে স্বস্তির সাথে ঘুমিয়ে পড়লো। অথচ এর আগে আমার সন্তান ক্ষুধার জ্বালায় ঘুমাতে পারত না। এদিকে আমার স্বামী উটনি দোহন করতে গিয়ে লক্ষ্য করলো তার স্তন দুধে পরিপূর্ণ। তিনি এতো দুধ দোহন করলেন যে, আমরা তৃপ্তির সাথে পান করলাম। বড় আরামে আমরা রাত কাটালাম। সকালে আমার স্বামী বললেন, খোদার কসম, হালিমা, তুমি একটি বরকতসম্পন্ন শিশু গ্রহণ করেছো। আমি বললাম, আমারও তাই মনে হয়।

হালিমা বলেন, এরপর আমাদের কাফেলা রওয়ানা হলো। আমি দুর্বল গাধার পিঠে সওয়ার হলাম। শিশুটি ছিলো আমার কোলে। গাধা এতো দ্রুত পথ চললো যে, সব গাধাকে সে ছাড়িয়ে গেলো। সঙ্গিনী মহিলারা অবাক হয়ে বললো, ও আবু যোবায়েবের কন্যা, এটা কি আশ্চর্য ব্যাপার, আমাদের দিকে একটু তাকাও। যে গাধায় সওয়ার হয়ে তুমি এসেছিলে, এটা কি সেই গাধা? আমি বললাম, হাঁ, সেটিই। তারা বললো, এর মধ্যে নিশ্চয়ই বিশেষ কোন ব্যাপার রয়েছে।

এরপর আমরা বনু সা'দ গোত্রে নিজেদের ঘরে চলে এলাম। আমাদের এলাকার চেয়ে বেশি অভাবগ্রস্ত দুর্ভিক্ষ কবলিত অন্য কোন এলাকা ছিলো কিনা আমি জানতাম না। আমাদের ফিরে আসার পর বকরিগুলো চারণভূমিতে গেলে ভরা পেট ও ভরা স্তনে ফিরে আসতো। আমরা দুধ দোহন করে পান করতাম। অথচ সে সময় অন্য কেউ দুধই পেতো না। তাদের পশুদের স্তনে কোন দুধই থাকত না। আমাদের কওমের লোকেরা রাখালদের বলতো, হতভাগ্যের দল তোমরা তোমাদের বকরি সেই এলাকায় চরাও যেখানে আবু যোবায়েরের কন্যা বকরি চরায়। কিন্তু তবুও তাদের বকরি খালি পেটেই ফিরে আসতো। একফোটা দুধও তাদের স্তনে পাওয়া যেতো না। অথচ আমার বকরিগুলো ভরাপেট এবং ভরা স্তনে ফিরে আসতো। এমনি করে আমরা আল্লাহর রহমত ও বরকত প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। শিশুর বয়স দুই বছর হওয়ার পর আমরা তাকে দুধ ছাড়ালাম। অন্যান্য শিশুদের চেয়ে এই শিশু ছিলো অধিক হৃষ্টপুষ্ট এবং মোটাসোটা। এরপর আমরা শিশুটিকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। আমরা তার কারণে বরকত প্রত্যক্ষ করেছিলাম। তাই চাচ্ছিলাম যে, শিশুটি আমাদের কাছেই আরও কিছুদিন থাকুক। শিশুর মাকে আমি এ ইচ্ছার কথা জানালাম। বার বার আবেদন নিবেদন জানাতে বিবি আমেনা পুনরায় শিশুকে আমার কাছেই ফিরিয়ে দিলেন।⁸

টিকাঃ
১. তারিখে খাযরাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৬২, রহমাতুল লিল আলামিন ১ম খন্ড, পৃ. ৩য়, পৃ. ৩৯
২. মুখতাছারুছ সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১২, ইবনে, সা'দ ১ম খন্ড, পৃ ৬৩
৩. মুখতাছারুছ সীরাত, পৃ. ১২
৫. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৫৯, ১৬০, তারীখে খাযরামি ১ম খন্ড, পৃ. ৬২, একটি বর্ণনায় এ কথাও উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি খৎনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। (তালকিহুল ফুহুম, পৃ. ৪) ইবনে কাইয়েম বলেছেন, এ সম্পর্কে কোন প্রমাণিত হাদীস দেখা যায়নি। যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১৮
৬. তালকিহুল ফুহুম, পৃ. ৪, মুখতাছারুছ সীরাত শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১৩
৭. যাদুল মা'য়াদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১৯
৮. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬২, ১৬৩, ১৬৪

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সিনা চাকের ঘটনা

📄 সিনা চাকের ঘটনা


দুধ ছাড়ানোর পরও শিশু মোহাম্মদ বনু সা'দ গোত্রেই ছিলেন। তাঁর বয়স যখন চার অথবা পাঁচ বছর তখন 'সিনা চাক'-এর ঘটনাটি ঘটে।⁹

এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হযরত জিবরাইল (আ.) আগমন করলেন। এ সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য শিশুদের সাথে খেলা করছিলেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে শুইয়ে বুক চিরে দিল বের করলেন। তারপর দিল থেকে একটি অংশ বের করে বললেন, এটা তোমার মধ্যে শয়তানের অংশ। এরপর দিল একটি তশতরিতে রেখে যমযম কূপের পানি দিয়ে ধুয়ে নিলেন। তারপর যথাযথ স্থানে তা স্থাপন করলেন। অন্য শিশুরা ছুটে গিয়ে বিবি হালিমার কাছে বললো, মোহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরিবারের লোকেরা ছুটে এলো। এসে দেখলো তিনি বিবর্ণমুখে বসে আছেন।¹⁰

টিকাঃ
৯. অধিকাংশ সীরাত রচয়িতা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিন বছর বয়সে এ ঘটনা ঘটেছিল। (ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৪, ১৬৫)
১০. সহীহ মুসলিম, আল আসরা অধ্যায়, ১ম খন্ড, পৃ. ৯২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 মায়ের স্নেহ ও দাদার আদরে এবং চাচার স্নেহবাৎসল্য

📄 মায়ের স্নেহ ও দাদার আদরে এবং চাচার স্নেহবাৎসল্য


এ ঘটনার পর বিবি হালিমা ভীত হয়ে পড়লেন। তিনি শিশুকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এলেন। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি মায়ের স্নেহছায়ায় কাটালেন।
এদিকে হযরত আমেনার ইচ্ছে হলো যে, তিনি পরলোকগত স্বামীর কবর যেয়ারত করবেন। পুত্র মোহাম্মদ, দাসী উম্মে আয়মন এবং শ্বশুর আবদুল মোত্তালেবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচ শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পৌঁছুলেন। একমাস সেখানে অবস্থানের পর মক্কায় পথে রওয়ানা হলেন। মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি আবওয়া নামক জায়গায় এসে বিবি আমেনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ক্রমে এই অসুখ বেড়ে চললো। অবশেষে তিনি আবওয়ায় ইন্তেকাল করেন।
বৃদ্ধ আবদুল মোত্তালেব পৌত্রকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় পৌঁছুলেন। পিতৃমাতৃহীন পৌত্রের জন্যে তাঁর মনে ছিলো ভালোবাসার উত্তাপ। অতীতের স্মৃতিতে তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। পিতৃমাতৃহীন পৌত্রকে তিনি যতোটা ভালোবাসতেন, এতো ভালোবাসা তাঁর নিজ পুত্র কন্যা কারো জন্যেই ছিলো না। ভাগ্যের লিখন, বালক মোহাম্মদ সে অবস্থায় ছিলেন একান্ত নিঃসঙ্গ; কিন্তু আবদুল মোত্তালেব তাঁকে নিঃসঙ্গ থাকতে দিতেন না, তিনি পৌত্রকে অন্য সকলের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং স্নেহ করতেন। ইবনে হিশাম লিখেছেন, আবদুল মোত্তালেবের জন্যে কাবাঘরের ছায়ায় বিছানা পেতে দেয়া হতো। তাঁর সব সন্তান সেই বিছানার চারিদিকে বসতো। কিন্তু মোহাম্মদ গেলে বিছানায়ই বসতেন। তিনি ছিলেন অল্প বয়স্ক শিশু। তাঁর চাচারা তাঁকে বিছানা থেকে সরিয়ে দিতেন। কিন্তু আবদুল মোত্তালেব বলতেন, ওকে সরিয়ে দিয়ো না। ওর মর্যাদা অসাধারণ। বরং তাকে নিজের পাশে বসাতেন। শুধু বসানোই নয়, তিনি প্রিয় দৌহিত্রকে সব সময় নিজের সাথে রাখতেন। বালক মোহাম্মদের কাজকর্ম তাঁকে আনন্দ দিতো।
বয়স আট বছর দুই মাস দশদিন হওয়ার পর তাঁর দাদার স্নেহের ছায়াও উঠে গেলো। তিনি ইন্তেকাল করলেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালেবকে ওসিয়ত করে গেলেন, তিনি যেন ভ্রাতুষ্পুত্রের বিশেষভাবে যত্ন নেন। উল্লেখ্য আবু তালেব এবং আবদুল্লাহ ছিলেন একই মায়ের সন্তান।
চাচার স্নেহবাৎসল্যে আবু তালেব ভ্রাতুষ্পুত্রকে গভীর স্নেহ-মমতার সাথে প্রতিপালন করেন। তাঁকে নিজ সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। বরং নিজ সন্তানদের চেয়ে বেশিই স্নেহ করতেন, চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে সহায়তা দেন। আবু তালেব ভ্রাতুষ্পুত্রের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখেই মানুষের সাথে শত্রুতা মিত্রতার বন্ধনও স্থাপন করতেন।
আল্লাহর রহমতের সন্ধানে ইবনে আসাকের জলাহামা ইবনে আরফাতার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, আমি মক্কায় এলাম। চারিদিকে দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টির ফলেই এর সৃষ্টি হয়েছে। কোরায়শ বংশের লোকেরা বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে আবু তালেবের কাছে আবেদন জানালো। আবু তালেব একটি বালককে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। বালকটিকে দেখে মেঘে ঢাকা সূর্য মনে হচ্ছিলো। আশে পাশে অন্যান্য বালকও ছিলো। আবু তালেব সেই বালককে সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরের সামনে গেলেন। বালকের পিঠ কাবার দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দিলেন। বালক তাঁর হাতে আঙ্গুল রাখলো। আকাশে এক টুকরো মেঘও ছিলো না। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই সমগ্র আকাশ মেঘে ছেয়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। শহর প্রান্তর সজীব উর্বর হয়ে গেলো। পরবর্তীকালে আবু তালেব এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, 'তিনি সুদর্শন, তাঁর চেহারা থেকে বৃষ্টির করুণা প্রত্যাশা করা হয়। তিনি এতিমদের আশ্রয় এবং বিধবাদের রক্ষাকারী। '

টিকাঃ
১১. তালকিহুল ফুহুম, পৃ. ৭, ইবনে হিশাম ১ম খন্ড পৃ. ১৬৮
১২. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৮, তালকিছুল তুহুম পৃ. ৭ তারীখে খাজরামি, ১ম খন্ড, পৃ. ৬৩ ফেকহুছ সীরাত, গাজ্জাযযলী, পৃ. ৫০
১৩. ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ; ১৬৮
১৪. তালকিহুল ফুহুম, পৃ. ৭, ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃ ১৪৯
১৫. মুখতাছারু সীরাত, শেখ আবদুল্লাহ, পৃ. ১৫, ১৬

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আল্লাহর রহমতের সন্ধানে

📄 আল্লাহর রহমতের সন্ধানে


ইবনে আসাকের জলাহামা ইবনে আরফাতার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, আমি মক্কায় এলাম। চারিদিকে দুর্ভিক্ষ, অনাবৃষ্টির ফলেই এর সৃষ্টি হয়েছে। কোরায়শ বংশের লোকেরা বৃষ্টির জন্যে দোয়া করতে আবু তালেবের কাছে আবেদন জানালো। আবু তালেব একটি বালককে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। বালকটিকে দেখে মেঘে ঢাকা সূর্য মনে হচ্ছিলো। আশে পাশে অন্যান্য বালকও ছিলো। আবু তালেব সেই বালককে সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরের সামনে গেলেন। বালকের পিঠ কাবার দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দিলেন। বালক তাঁর হাতে আঙ্গুল রাখলো। আকাশে এক টুকরো মেঘও ছিলো না। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই সমগ্র আকাশ মেঘে ছেয়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। শহর প্রান্তর সজীব উর্বর হয়ে গেলো। পরবর্তীকালে আবু তালেব এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, 'তিনি সুদর্শন, তাঁর চেহারা থেকে বৃষ্টির করুণা প্রত্যাশা করা হয়। তিনি এতিমদের আশ্রয় এবং বিধবাদের রক্ষাকারী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00