📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 অর্থনৈতিক অবস্থা

📄 অর্থনৈতিক অবস্থা


অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো সামগ্রিক সামাজিক অবস্থার অধীন। আরবদের জীবিকার উৎসের কথা চিন্তা করলে দেখা যায় যে, ব্যবসা-বাণিজ্যই ছিলো তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম। বাণিজ্যিক আদান-প্রদান সম্ভব ছিলো না। জাযিরাতুল আরবের অবস্থা এমন ছিলো যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহ ছাড়া শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ অন্য কোন সময় বিদ্যমান ছিলো না। একারণেই জানা যায় যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহেই আরবের বিখ্যাত বাজার ওকায, যিল মায়ায, মাযনা প্রভৃতি মেলাগুলো বসতো।
শিল্পক্ষেত্রে আরবরা ছিলো বিশ্বের অন্য সকল দেশের পেছনে। কাপড় বুনন, চামড়া পাকা করা ইত্যাদি যেসব শিল্পের খবর জানা যায়, তার অধিকাংশই হতো প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেনে। সিরিয়া ও হীরা বা ইরাকে। আরবের ভেতরে খেত-খামার এবং ফসল উৎপাদনের কাজ চলতো। সমগ্র আরবে মহিলারা সূতা কাটার কাজ করতো। কিন্তু মুশকিল ছিলো এই যে, সূতা কাটার উপকরণ থাকতো যুদ্ধের বিভীষিকায় দুর্লভ। দারিদ্র্যতা ছিলো একটি সাধারণ সমস্যা। প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য এবং পোশাক থেকে মানুষ প্রায়ই বঞ্চিত থাকতো।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 চারিত্রিক অবস্থা

📄 চারিত্রিক অবস্থা


এটা স্বীকৃত সত্য যে, আরবের লোকদের মধ্যে ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় অভ্যাসসমূহ পাওয়া যেতো এবং এমন সব কাজ তারা করতো, যা বিবেক বুদ্ধি মোটেই অনুমোদন করত না। তবে তাদের মধ্যে এমন কিছু চারিত্রিক গুণও ছিলো, যা রীতিমত বিস্ময়কর। নীচে সেসব গুণাবলীর কিছু বিবরণ উল্লেখ করা যাচ্ছে।
এক) দয়া ও দানশীলতা। এটা ছিলো তাদের একটা বিশেষ গুণ। এক্ষেত্রে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব লক্ষ্য করা যেতো। এ গুণের ওপর তারা এতো গর্ব করতো যে, আরবের অর্ধেক মানুষই কবি হয়ে গিয়েছিলো। এ ব্যাপারে কেউ নিজের এবং কেউ অন্য কারো প্রশংসা করতো। কখনো এমন হতো যে, প্রচন্ড শীত এবং অভাবের সময়েও হয়তো কারো বাড়িতে মেহমান এলো। সেই সময় গৃহস্বামীর কাছে একটা মাত্র উটই ছিলো সম্বল। গৃহস্বামী আতিথেয়তা করতে সেই উটই যবাই করে দিতো। দয়া এবং উদারতার কারণেই তারা মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে নিতো এবং সে ক্ষতি যথারীতি আদায় করতো। এমনিভাবে মানুষকে ধ্বংস এবং রক্তপাত থেকে রক্ষা করে অন্যান্য ধনী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তির ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে গর্ব করতো।
এ ধরনের দানশীলতার কারণেই দেখা যেতো যে, তারা মদ পান করায় গর্ব অনুভব করতো। মদ পান প্রকৃতপক্ষে কোন ভাল কাজ ছিলো না; কিন্তু এতে তারা উদার হতে পারতো এবং দান- খয়রাত করা তাদের জন্যে সহজ হতো। কেননা নেশার ঘোরে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করা মানুষের জন্যে কষ্টকর হয় না। এ কারণে আরবের লোকেরা মদ তৈরীর উপকরণ আঙ্গুরের গাছকে 'করম' এবং মদকে 'বিনতুল করম' বলে অভিহিত করতো। জাহেলি যুগের কবিদের কবিতার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা গর্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী ছিলো। আনতারা ইবনে শাদ্দাদ আবসী তার রচিত মোয়াল্লাকায় লিখেছেন, 'দুপুরের প্রখর রোদ কমে যাওয়ার পর আমি একটি কারুকার্য খচিত পীত রঙের পাত্র থেকে মদ পান করলাম। যখন আমি মদ পান করি, তখন আমার অর্থ-সম্পদ দান করে ফেলি। কিন্তু এ সময়ও আমি নিজের ইযযত আক্র সম্পর্কে সচেতন থাকি। ওতে কোন দাগ রাখতে দেই না। জ্ঞান ফিরে আসার পরও আমি দানশীলতার ক্ষেত্রে কোন কার্পণ্য করি না। আমার চারিত্রিক সৌন্দর্য এবং দয়া সম্পর্কে তোমাদের কি আর বলবো, সেটাতো তোমাদের অজানা নয়।'
দয়াশীলতার কারণেই আরবের লোকেরা ঢালাওভাবে জুয়া খেলতো। তারা মনে করতো যে, এটা দানশীলতার একটা পথ। কেননা জুয়া খেলার পর জুয়াড়িয়া যা লাভ করতো অথবা লাভ থেকে খরচের পর যা বেঁচে যেতো, সেসব তারা গরীব দুঃখীদের মধ্যে দান করে দিতো। এ কারণেই পবিত্র কোরআনে মদ এবং জুয়ার উপকারের কথা অস্বীকার করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে যে, এ দু'টোর উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বল, উভয়ের মধ্যে মহাপাপ এবং মানুষের জন্যে উপকারও আছে। কিন্তু এদের পাপ উপকারের চাইতে বেশী। (২১৯, ৬)
দুই) অংগীকার পালন। আরবের লোকেরা অংগীকার পালনকে ধর্মের অংশ বলে মনে করতো। অংগীকার পালন বা কথা রাখতে গিয়ে তারা জানমালের ক্ষতিকেও তুচ্ছ মনে করতো। এটা বোঝার জন্যে হানি ইবনে মাসুদ শায়বানি, সামোয়াল ইবনে আদীয়া এবং হাজের ইবনে জারারার ঘটনাগুলোই যথেষ্ট।
তিন) আত্মমর্যাদা সচেতনতা। যুলুম অত্যাচার সহ্য করেও নিজের মর্যাদা বজায় রাখা ছিলো জাহেলি যুগের পরিচিত একটি চারিত্রিক গুণ। এর ফলে তারা বীরত্ব বাহাদুরি প্রকাশ করতো। তাদের ক্রোধ ছিলো অসামান্য, হঠাৎ করেই তারা ক্ষেপে যেতো। অবমাননার সামান্য লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া গেলেই তারা অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এবং রক্তপাত ঘটাতো। এ ব্যাপারে তারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করতো।
চার) প্রতিজ্ঞা পালনে জাহেলী যুগের লোকদের একটা বৈশিষ্ট ছিলো এই যে, কোন কাজ করতে প্রতিজ্ঞা করলে সে কাজ থেকে তারা কিছুতেই দূরে থাকতো না। কোন বাধাই তারা মানত না। জীবন বিপন্ন হলেও সে কাজ তারা সম্পাদন করতো।
পাঁশ) সহিষ্ণুতা এবং দূরদর্শীতামূলক প্রজ্ঞা। এটাও ছিলো আরবদের একটা মহৎ গুণ। কিন্তু বীরত এবং যুদ্ধের জন্যে সব সময় তৈরী থাকার কারণে এ গুণ তাদের মধ্যে ছিলো দুর্লভ।
ছয়) বেদুইন সুলভ সরলতা। তারা সভ্যতার উপকরণ থেকে দূরে অবস্থান করতো এবং এক্ষেত্রে তাদের অনীহা ছিলো। এই ধরনের সহজ সরল জীবন যাপনের কারণে তাদের মধ্যে সত্যবাদিতা এবং আমানতদারী পাওয়া যেতো। প্রতারণা, অংগীকার ভঙ্গ এসবকে তারা ঘৃণা করতো।
আমরা মনে করি যে, জাযিরাতুল আরবের সাথে সমগ্র বিশ্বের যে ধরনের ভৌগোলিক অবস্থান ছিলো, সেটা ছাড়া উল্লিখিত চারিত্রিক গুণাবলীর কারণেই তাদেরকে মানব জাতির নেতৃত্ব এবং নবুয়তের জন্যে মনোনীত করা হয়েছিলো। এসব গুণাবলীর কারণে হঠাৎ করে যদিও তারা ভয়ংকর হয়ে উঠতো এবং অঘটন ঘটাতো, তবু এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, এসব গুণাবলী ছিলো অত্যন্ত প্রশংসনীয় প্রকৃত মানবিক গুণ। সামান্য সংশোধনের পর এসব গুণ মানুষের জন্যে মহাকল্যাণকর প্রমাণিত হতে পারে। ইসলাম সেই কাজ সম্পাদন করেছে।
সম্ভবত উল্লিখিত চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে অংগীকার পালনের পর আত্মমর্যাদাবোধ এবং প্রতিজ্ঞা পালন ছিলো সবচেয়ে মূল্যবান এবং প্রশংসনীয়। এইসব গুণাবলী এবং চারিত্রিক শক্তি ছাড়া বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও অকল্যাণ দূর করে ন্যায়নীতি ও সুবিচারমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন অসম্ভব।
জাহেলী যুগে আরবের লোকদের মধ্যে আরো কিছু উল্লেখযোগ্য চারিত্রিক গুণ ছিলো কিন্ত এখানে সবগুলো আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।

টিকাঃ
১. সহীহ বোখারী, কেতাবুন নেকাহ, ২য় খন্ড, পৃ. ৭৬৯ আবু দাউদ 'বাবে ওজুহুন নেকাহ (বিস্তারিত বিবরণের জন্যে তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন ১৪ নং খন্ড দেখুন)
২. আবু দাউদ, তাফসীর গ্রন্থাবলী, 'আত তালাক, মাররাতান' দ্রষ্টব্য
৩. সহীহ বোখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৯৯, ১০৬৫, আবু দাউদ।
৪. সূরা আনআম, আয়াত ১০১, সূরা নাহল আয়াত ৫৮-৫৯, সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩১, ৮১, সূরা আনফাল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00