📄 হেজাযের নেতৃত্ব
হযরত ইসমাইল (আ.) থেকেই মক্কায় মানব বসতি গড়ে ওঠে। তিনি ১৩৭ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র নাবেত এবং কাইদার মক্কায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এই দুজনের মধ্যে কে আগে এবং কে পরে ক্ষমতাসীন ছিলেন- এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এদের পরে এদের নানা মাজাজ ইবনে জোরহামি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এমনি করে মক্কায় শাসন ক্ষমতা জোরহামিদের হাতে চলে যায়। দীর্ঘদিন এ ক্ষমতা তাদের কাছে থাকে। হযরত ইসমাইল (আ.) তাঁর পিতার সাথে কাবাঘর নির্মাণ করায় যদিও তাঁর বংশধরদের একটি সম্মানজনক অবস্থান ছিলো, কিন্তু ক্ষমতা ও নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে তাদের কোনো অংশ ছিলো না।
বছরের পর বছর কেটে যায়। কিন্তু হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধররা অজ্ঞাত পরিচয় অবস্থা থেকে বাইরে আসতে পারেননি। বখতে নসরের আবির্ভাবের কিছুকাল আগে বনু জোরহামের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মক্কার রাজনৈতিক গগনে আদনানীদের রাজনৈতিক নক্ষত্র চমকাতে শুরু করে। এর প্রমাণ এই যে, ইরক নামক জায়গায় বখতে নসর আরবদের সাথে যে যুদ্ধ করেন, সেই যুদ্ধে আরব সেনাদলের অধিনায়কদের মধ্যে জোরহাম গোত্রের কেউ ছিলেন না।
খৃষ্টপূর্ব ৫৮৭ সালে বখতে নসরের দ্বিতীয় অভিযানের সময়ে বনু আদনান ইয়েমেনে পালিয়ে যায়। সে সময়ে বনি ইসরাইলের নবী ছিলেন হযরত ইয়ারমিয়াহ (আ.)। তিনি আদনানের পুত্র মায়া'দকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ায় যান। বখতে নসরের দাপট হ্রাস পাওয়ার পর মায়া'দ মক্কায় ফিরে আসেন। এ সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, মক্কায় জোরহাম গোত্রের জোরশাম নামে শুধু একজন লোক রয়েছেন। জোরশাম ছিলেন জুলহামার পুত্র। মায়া'দ তখন জোরশামের কন্যা মায়া'নার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার গর্ভ থেকে নাযার জন্মগ্রহণ করেন।
সে সময় মক্কায় জোরহামের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। দারিদ্রের নিষ্পেষণে তারা ছিলো জর্জরিত। এর ফলে তারা কাবাঘর তওয়াফ করতে আসা লোকদের ওপর বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয় এমনকি কাবাঘরের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। বনু আদনান বনু জোরহামের এসব কাজে ভেতরে ভেতরে ছিলো দারুন অসন্তুষ্ট। ফলে বনু খোজায়া মাররাজ জাহরানে অভিযানের সময় আদনান বংশের লোকদের লোভকে কাজে লাগায়। বনু খোজায়া আদনান গোত্রের বনু বকর ইবনে আবদে মান্নাফ ইবনে কেনানাকে সঙ্গে নিয়ে বনু জোরহামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধে বনু জোরহাম পরাজিত হয়ে মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়। এ ঘটনা ঘটেছিলো খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।
মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় বনু জোরহাম যমযম কূপ ভরাট করে দেয়। এ সময় তারা যমযমে কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নিক্ষেপ করে তা প্রায় ভরাট করে ফেলে। মোহাম্মদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, আমর ইবনে হারেস মায়ায জোরহামি কাবাঘরের দুটি সোনার হরিণ ও কাবার কোণে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদকে বের করে যমযম কুপে প্রোথিত করে। এরপর তারা জোরহাম গোত্রের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ইয়েমেনে চলে যায়। বনু জোরহাম মক্কা থেকে বহিষ্কৃত হওয়া এবং ক্ষমতা হারানোর ব্যথা ভুলতে পারছিলো না। জোরহাম গ্রোত্রের আমর নামক এক ব্যক্তি এ সম্পর্কে রচিত কবিতায় বলেছেন, 'আজুন থেকে সাফা পর্যন্ত মিত্র কেউ নেই, রাতের মহফিলে নেই গল্প বলার কেউ। নেই কেন? আমরা তো এখানের অধিবাসী, সময়ের আবর্তনে ভাঙ্গা কপাল, হায়রে, হায় আজ আমাদের করে দিয়েছে সর্বহারা!'
টিকাঃ
৩. বাইবেল, জন্ম শীর্ষক অধ্যায় পৃঃ ১৭-২৫
৪. কল্বে জাযিরাতুল আরব, পৃঃ ২৩০-২৩৭
৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃঃ ১১১-১১৩, ইবনে হিশাম, হযরত ইসমাইলের বংশধরদের মধ্যে শুধুমাত্র নাবেতের ক্ষমতাসীন থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
৬. কলবে জাযিরাতুল আরব, পৃঃ ২৩০
৭. রহমতুন লিল আলামিন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৮
৮. কল্পে জাযিরাতুল আরব পৃঃ ২৩১
৯. হযরত ইসমাঈলের ঘটনায় উল্লেখিত মাযায জোরহামি এবং এই লোক এক ব্যক্তি নন।
১০. মাসুদ লিখেছেন, পারস্যবাসী কাবাঘরের জন্য মূল্যবান সম্পদ এবং উপঢৌকন পাঠাতেন। যাযান ইবনে বাক সোনার তৈরী দুটি হরিণ, মনিমুক্তা, তলোয়ার এবং বহু সোনা প্রেরণ করেছিলেন। আমর এসব কিছু যমযম কূপে নিক্ষেপ করেন। মুরাও অযজাহাব ১ম খন্ড, পৃঃ ২৩৫
১১. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃঃ ১১৪-১১৫
📄 আরবের অন্যান্য অংশের প্রশাসনিক অবস্থা
ইতিপূর্বে কাহতানি এবং আদনানী আরবদের দেশ ত্যাগের কথা আলোচনা করা হয়েছে এবং উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমগ্র দেশ আরবের এসব গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে।
এরপর তাদের নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বের অবস্থা এরূপ ছিলো যে, কাবার আশেপাশে যেসব গোত্র বসবাস করতো, তাদেরকে হীরার অধীনস্থ মনে করা হতো। যেসব গোত্র সিরীয় এলাকায় বসবাস করতো, তাদেরকে আসমানী শাসকদের অধীনস্থ মনে করা হতো। কিন্তু এটা ছিলো নামকাওয়াস্তে, বাস্তবে না। উল্লিখিত দু'টি জায়গা বাদে অন্যান্য এলাকার আরবরা ছিলো সম্পূর্ণ স্বাধীন।
এ সকল গোত্রের মধ্যে সর্দার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। গোত্রের লোকেরাই নিজেদের সর্দার নিযুক্ত করতো। এ সকল সর্দারদের জন্যে গোত্র হতো একটি ছোট খাট সরকার। রাজনৈতিক অস্তিত্বের নিরাপত্তার ভিত্তি, গোত্রীয় বিবাদ বিশৃঙ্খলা নিরসন এবং নিজেদের ভূখন্ডের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষার সম্মিলিত স্বার্থ এর দ্বারা রক্ষা করা হতো।
সর্দারদের মর্যাদা ছিলো তাদের সমাজে বাদশার মতো। যুদ্ধ সন্ধির ব্যাপারে সর্দারদের ফয়সালাই হতো চূড়ান্ত। এ অবস্থায় কোন পরিবর্তন কোন অবস্থায়ই হতো না। একজন একনায়কের যেরূপ ক্ষমতা থাকা দরকার, সর্দারের ক্ষমতা তার চেয়ে কোন অংশেই কম ছিলো না, কোন কোন সর্দারের অবস্থা এমন ছিলো যে, তারা সব দিক থেকে স্বাতন্ত্রের অধিকারী হতেন। একজন কবি একথা এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, 'আমাদের মধ্যে তোমার জন্যে গণিমতের মালের এক চতুর্থাংশ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে নির্বাচিত ধন-সম্পদ। তুমি ফয়সালা করে দেবে, সে সম্পদেও রয়েছে তোমার মালিকানা। পথে যা কুড়িয়ে পাওয়া যাবে এবং যা বন্টন না হয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে, সে সম্পদের মালিকও তুমি।'
📄 রাজনৈতিক পরিস্থিতি
জাযিরাতুল আরবের সরকার পদ্ধতি এবং শাসনকর্তাদের সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। কাজেই রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করাই সমীচীন হবে।
জাযিরাতুল আরবের তিনটি সীমান্ত এলাকার জনগণ ছিলো ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রতিবেশী। এ তিনটি দেশে অশান্তি বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যমান ছিলো। মানুষরা দাস এবং প্রভু এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিলো। সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা, নেতা, বিশেষত বিদেশী শাসকদের করতলগত ছিলো। সকল বোঝা ছিলো দাসদের মাথায়। সুস্পষ্ট ভাষায় বললে বলা যায় যে, প্রশাসন ছিলো খেত-খামারের মতো। তারা সরকারের আয়ের উৎস হিসাবে পরিগণিত হতো। শাসকবর্গ সেই অর্থ সম্পদ নিজের সুখ-সাচ্ছন্দ, আরাম-আয়েশ ঐশ্বর্য এবং বিলাসিতায় ব্যয় করতো। আর জনগণ অন্ধকারে হাত পা ছুঁড়তো। শাসকরা জনগণের ওপর সকল প্রকার যুলুম-অত্যাচার চালিয়ে যেতো, জনগণ সেসব মুখ বুজে নির্বিচারে সহ্য করতো। কোন প্রকার অভিযোগ করার তাদের উপায় ছিলো না। অসম্মান অবমাননা অত্যাচার তাদের সহ্য করতে হতো। শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা ডিক্টেটরের মতো আচরণ করতো। মানুষের অধিকার বলতে কোন কিছুই তখন ছিলো না।
এ সকল এলাকার পাশে বসতি স্থাপনকারী প্রতিবেশীরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতো। এসব গোত্রের লোকেরা পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতো। তারা কখনো ইরাকী, আবার কখনো সিরীয়দের সুরে সুর মেলাতো।
আরবের ভেতরে বসবাসকারী গোত্রসমূহও ছিলো শতধাবিচ্ছিন্ন। চারিদিকে ঝগড়া বিবাদ, কলহ কোন্দল এবং বংশগত ও ধর্মীয় বিভেদ বিশৃঙ্খলা চলছিলো।
এসব অশান্তির মধ্যেও বিচ্ছিন্ন লোকেরা প্রয়োজনে নিজের গোত্রের প্রতিই সমর্থন দিতো। এক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায়র ধার ধারতো না। একটি গোত্রের মুখপাত্র একজন কবি বলেন, 'আমি তো গাযিয়া গোত্রের একজন মানুষ। ওরা যদি ভুল পথে চলে, তবে আমিও ভুল পথে চলবো, ওরা যদি সঠিক পথে চলে, তবে আমিও সঠিক পথে চলবো।'
আরবের ভেতর এমন কোন বাদশাহ ছিলো না, যে জনগণের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতো। প্রজাদের কারো কোন আশ্রয়স্থল ছিলো না। দুঃখ কষ্ট, সমস্যা সংকট এবং আপদ বিপদে বিশ্বাস এবং নির্ভর করার মতো কেউই ছিলো না।
হেজাযের শাসককে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হতো এবং কেন্দ্রীয় শাষক হিসাবে তাকে সম্মান করা হতো। হেজাযের শাসক ছিলো প্রকৃতপক্ষে দুনিয়াবী এবং দ্বীনী নেতা। ধর্মীয় নেতা হিসাবে আরবদের ওপর তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কাবাঘর এবং আশেপাশের এলাকায় তার শাসন রিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়া হতো। কাবাঘর যেয়ারতের জন্যে যারা আসতো, তাদের দেখাশোনা, প্রয়োজন পূরণ, শরীয়তের বাস্তবায়ন, সংসদীয় পদ্ধতির লালন, বিকাশ ইত্যাদি কাজ সেই শাসনকর্তার ওপর ন্যস্ত থাকতো। কিন্তু সে এমন দুর্বল হতো যে, আরবের অভ্যন্তরীণ সমস্যার বোঝা মাথায় নেয়া অর্থাৎ যাবতীয় সমস্যার সমাধান করার শক্তি তার থাকতো না। আবিসিনীয়দের হামলার সময় এই দুর্বলতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো।