📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ইয়েমেনের বাদশাহী

📄 ইয়েমেনের বাদশাহী


'আরবে আরেবার' মধ্যে প্রাচীন ইয়েমেনী গোত্রের নাম ছিলো কওমে সাবা। ইরাকে আবিষ্কৃত প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায়, খৃষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে সাবা জাতির এখানে বসতি ছিলো। তবে এ জাতির উন্নতি অগ্রগতির সূচনা হয়েছিলো খৃষ্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীতে। উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক সময়কাল নিম্নরূপ,
এক) খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ সালের পূর্বেকার সময়। সেই সময়ে সাবার বাদশাহদের উপাধি ছিলো মাকরাবে সাবা। এদের রাজধানী ছিলো সরওয়াহ নামক জায়গায়। এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ মা-আবের থেকে পশ্চিমে একদিনের পথের দূরত্বে পাওয়া যায়। সেই জায়গার বর্তমান নাম খারিবা। সেই যুগে মা-আরেবের বিখ্যাত বাঁধের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিলো। ইয়েমেনের ইতিহাসে এটা এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই সময়ে সাবার বাদশাহদের শাসনামলে বহুলোক আরবের ভেতর এবং বাইরে বিভিন্ন স্থানে নতুন বসতি স্থাপন করেছিলো।
দুই) খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ থেকে খৃষ্টপূর্ব ১১৫ সাল। এ সময়ে সাবার বাদশাহরা মাকরাব উপাধি পরিত্যাগ করে বাদশাহ উপাধি ধারণ করে এবং সরওয়াহ এর পরিবর্তে মায়ারেবকে রাজধানী মনোনীত করে। এই শহরের ধ্বংসাবশেষ সান-য়া' থেকে ৬০ মাইল পূর্বে পাওয়া যায়।
তিন) খৃষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ১১৫ সাল। এ সময়ে সাবার বাদশাহদের ওপর হেমইয়ার গোত্র আধিপত্য বিস্তার করে এবং তারা মায়া'রবের পরিবর্তে রাইদানকে নিজেদের রাজধানী মনোনীত করে। পরবর্তী সময়ে রাইদানের নাম পরিবর্তন করে জেফার রাখা হয়। এর ধ্বংসাবশেষ ইয়েমেনের কাছাকাছি একটি পাহাড়ে পাওয়া যায়।
এই যুগে সাবা জাতির পতন শুরু হয়। প্রথমে নাবেতিরা হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে এবং সাবার নতুন জনবসতি উৎখাত করতে শুরু করে। এরপর রোমকরা মিসর, সিরিয়া এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে এতে তাদের স্থলপথে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে কাহতানি গোত্রসমূহ নিজেরাও ছিলো আর্থিক দিক থেকে দুর্দশাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে কাহতানি গোত্রসমূহ নিজেদের দেশ ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
চার) খৃষ্টপূর্ব ১১৫ থেকে ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত। এ সময়ে ইয়েমেনে ক্রমাগত বিভেদ বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ এবং বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ চলতে থাকে। এমনি করে এক পর্যায়ে ইয়েমেনের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়া হয়। এই সময়ে রোমকরা আদনের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ করে এবং তাদের সাহায্যে হাবশী অর্থাৎ আবিসিনীয়রা হেমইয়ার ও হামদান গোত্রের পারস্পরিক সংঘাত থেকে লাভবান হয়ে ৩৪০ সালে প্রথমবার ইয়েমেন দখল করে নেয়। এই দখল ৩৭৮ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। এরপর ইয়েমেন স্বাধীনতা লাভ করে বটে, কিন্তু মা-য়া'রেবের বিখ্যাত বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দেয়। ৪৫০ বা ৪৫১ সালে এই বাঁধ ভেঙ্গে যায়। পবিত্র কোরআনে এই ভাঙ্গনকে বাঁধভাঙ্গা বন্যা বলে অভিহিত করা হয়েছিলো। সূরা সাবায় এর উল্লেখ রয়েছে। এটা ছিলো বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা। এ বন্যায় বহু জনপদ বিরান ও জনশূন্য হয়ে পড়েছিলো এবং বহু গোত্র বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
৫২৩ ঈসায়ী সালে আরেকটি বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটে। বাদশাহ জুনুয়াস ইয়েমেনের ঈসায়ীদের ওপর হামলা করে তাদের খৃষ্টধর্ম ত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা রাযি না হওয়ায় তাদেরকে পরিখা খনন করে প্রজ্জলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা বুরুজে 'ধ্বংস হয়েছিলো কুন্ডের অধিপতিরা' বলে এই লোমহর্ষক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রোমক বাদশাহদের নেতৃত্বে ঈসায়ী ধর্মের উজ্জীবনকারীরা তৎপর এবং প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে। আবিসিনীয়রা রোমকদের সমর্থন পেয়ে ৫১৫ সালে আরিয়াতের নেতত্বে ৭০ হাজার সৈন্যসহ পুনরায় ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে ইয়েমেন অধিকার করে নেয়। অধিকারের পর আবিসিনিয়ার সম্রাটের গভর্নর হিসাবে আরিয়াত ইয়েমেন শাসন করতে থাকেন। কিছুকাল পর আরিয়াতের সেনাবাহিনীর এক অধিনায়ক আরিয়াতকে হত্যা করে ক্ষমতা গ্রহণ করে। এ অধিনায়কের নাম ছিলো আবরাহা। ক্ষমতা গ্রহণের পর আবরাহা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আবিসিনিয়ার সম্রাটকেও তার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করায়।
এই আবরাহাই পরবর্তীকালে কাবাঘর ধ্বংস করতে ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলো। দুর্ধর্ষ একদল সৈন্য এবং কয়েকটি হাতী নিয়ে আবরাহা মক্কা অভিযান পরিচালনা করেছিলো। এই অভিযানকে 'আসহাবে ফীল' নামে সূরা ফীলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসহাবে ফীলের ঘটনায় আবিসিনীয়দের যে ক্ষতি হয়েছিলো, তার প্রেক্ষিতে ইয়েমেনের অধিবাসীরা পারস্য সরকারের কাছে সাহায্য চায়। তারা আবিসিনীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং সাইফে যী ইয়াযান ইময়ারীর পুত্র মাদি কারাবের নেতৃত্বে আবিসিনীয়দের দেশ থেকে বের করে দেয়। এরপর তারা একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসাবে মাদিকারাবকে ইয়েমেনের বাদশাহ বলে ঘোষণা করে। এটা ছিলো ৫০৫ সালের ঘটনা।
স্বাধীনতার পর মাদিকারাব তার সেবা এবং রাজকীয় বাহিনীর সৌন্দর্যের জন্যে কিছু সংখ্যক হাবশী অর্থাৎ আবিসিনীয়কে রেখে দেয়। তার এ শখ পরবর্তীতে বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়। কর্মরত হাবশীরা একদিন ধোঁকা দিয়ে বাদশাহ মাদিকারাবকে হত্যা করে। এর ফলে যী ইয়াযান পরিবারের রাজত্ব চিরতরে শেষ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতি থেকে সুবিধা আদায়ের জন্যে এগিয়ে আসেন পারস্য সম্রাট কিসরা। তিনি সন্‌ন্যা'য় পারস্য বংশোদ্ভূত একজন গভর্ণর নিয়োগ করে ইয়েমেনকে পারস্যের একটি প্রদেশে পরিণত করেন। পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনে একের পর এক ফরাসী গভর্ণর নিযুক্ত হতে থাকেন। সর্বশেষ গভর্ণর বাযান ৬২৮ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর ফলে ইয়েমেনে পারস্য আধিপত্য লোপ পায় এবং ইয়েমেন ইসলামী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

টিকাঃ
১. মওলানা সাইয়েদ সোলায়মান নদভী তারীখে আরদুল কোরআন গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ১৩৬ পৃষ্ঠা থেকে গ্রন্থের শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের আলোকে সাবা জাতি সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। মওলানা সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদী তাফহীমুল কোরআনের চতুর্থ খন্ডের ১৫৮-১৯৮ পৃষ্ঠাতেও এপর্যায়ে কিছু কিছু তথ্য সন্নিবেশিত করেছেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হীরার বাদশাহী

📄 হীরার বাদশাহী


ইরাক এবং তার আশেপাশের এলাকায় কোরোশ কাবির অথবা সায়রাম যুল কারনাইনের (খৃষ্টপূর্ব ৫৭৫ থেকে ৫২৯ সাল পর্যন্ত) সময় থেকেই পারস্যদের রাজত্ব চলে আসছিলো। ফরাসীদের মোকাবেলা করার মতো শক্তি কারো ছিলো না। খৃষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে সিকান্দার মাকদুনি প্রথম পরাজিত করে পারস্য শক্তি নস্যাৎ করেন। এর ফলে পারস্য সাম্রাজ্য খন্ড খন্ড হয়ে যায়। এ বিশৃঙ্খল অবস্থা ২৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এ সময়ে কাহতানী গোত্রসমূহ দেশত্যাগ করে। ইরাকের এক বিস্তীর্ণ সীমান্ত থেকে যেসব আদনানী দেশত্যাগ করে গিয়েছিলো, তারা এ সময় কারিলায় ফিরে এসে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করে ফোরাত নদীর উপকূল ভাগের একাংশে বসতি স্থাপন করে।
এদিকে ২২৬ সালে আর্দেশির সাসানি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর ধীরে ধীরে পারস্য শক্তি পুনরায় সংহত হতে শুরু করে। আর্দেশির পারস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার দেশের সীমান্তে বসবাসকারী আরবদের প্রতিহত করেন। এর ফলে কোযায়া গোত্র সিরিয়ার পথে রওয়ানা হয়। পক্ষান্তরে হীরা এবং আনবারের আরব অধিবাসীরা বশ্যতা স্বীকারে সম্মতি জ্ঞাপন করে।
আর্দেশিরের শাসনামলে হীরা, বাদিয়াতুল ইরাক এবং উপদ্বীপবাসীর ওপর রবিয়ী গোত্রের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। মোদারী গোত্রসমূহের ওপর জাযিমাতুল ওয়াযযাহদের শাসন ছিলো। মনে হয়, আর্দেশিয়রা বুঝতে পেরেছিলো যে, আরব অধিবাসীদের ওপর সরাসরি শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং সীমান্তে তাদেরকে লুটতরাজ থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়। বরং ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে এমন কোন আরব নেতাকে শাসক হিসাবে নিযুক্ত করাই হবে বুদ্ধিমত্তার কাজ। এর ফলে একটা লাভ এই হবে যে, প্রয়োজনের সময় রোমকদের বিরুদ্ধে এসব আরবের সাহায্য নেয়া যাবে এবং সিরিয়ার রোমকপন্থী আরব শাসকদের মোকাবেলায় ইরাকের এসব আরব শাসনকর্তাকে দাঁড় করানো যাবে। হীরার বাদশাহদের অধীনে পারস্য সৈন্যদের একটি ইউনিট আবিসিনিয়ায় থাকতো। এদের দ্বারা বিভিন্ন স্থানে আরব বিদ্রোহীদের দমন করা হতো।
২৬৮ সালে জাযিমা মৃত্যু বরণ করেন এবং আমর ইবনে আদী ইবনে নসর লাখামী হাদরামি তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ছিলেন লাখাম গোত্রের প্রথম শাসনকর্তা। শাপুল কোবাজ ইবনে ফিরোজের যুগ পর্যন্ত একাধারে হীরার ওপর লাখমিদের শাসন চলতে থাকে। কোবাজের সমসাময়িককালে মোজদকের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ছিলেন সংস্কারবাদের প্রবক্তা। কোবাজ এবং তার বহুসংখ্যক অনুসারী বাদশাহ মোনযার ইবনে মাউসসামাকে বার্তা পাঠালেন যে, তুমিও এ ধর্ম গ্রহণ করো। মোনযার ছিলো বড়ই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ, তিনি অস্বীকার করে বসলেন। ফলে কোবাজ তাকে বরখাস্ত করে তার স্থলে মোজদাকি মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা হারেস ইবনে আমর ইবনে হাযার ফিন্দীর হাতে হীরার শাসনভার ন্যস্ত করলেন।
কোবাজের পরে পারস্যের শাসনক্ষমতা কেস্সা নওশেরওয়া'র হাতে আসে। তিনি এ ধর্মকে প্রচন্ড ঘৃণা করতেন। তিনি মোজদাক এবং তার বহু সংখ্যক সমর্থককে হত্যা করেন। মোনযারকে পুনরায় হীরার শাসনভার ন্যস্ত করেন এবং হারেস ইবনে আমরকে ডেকে পাঠান। কিন্তু হারেস বনু কেনায়েব এলাকায় পালিয়ে গেলে তিনি সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন।
মোনযার ইবনে মাউসসামার পরে নো'মান ইবনে মোনযারের কাল পর্যন্ত হীরার শাসনক্ষমতা তার বংশধরদের মধ্যে আবর্তিত হয়। এরপর যায়েদ ইবনে আদী এবাদী কিস্সার কাছে নো'মান ইবনে মোনযারের নামে মিথ্যা অভিযোগ করে। কেসরা নওশেরওয়াঁ এতে ক্ষেপে যান এবং নো'মানকে ডেকে পাঠান। নো'মান প্রথমেই হাযির না হয়ে চুপিসারে বনু শায়বানের সর্দার হানি ইবনে মাসুদের কাছে যান এবং পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ সবকিছু তার কাছে রেখে কেসরার দরবারে হাযির হন। কিসরা তাকে বন্দী করেন এবং ঐ অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে কেসরা নো'মানকে বন্দী করার পর তার স্থলে ইয়াস ইবনে কোবায়সা তাঈকে হীরার শাসনকর্তা নিয়োগ করেন এবং হানি ইবনে মাসুদের কাছে নো'মানের জামানত চাওয়ার জন্যে ইয়াসকে নির্দেশ দেন। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হানি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ইয়াস কেসরার সৈন্যদের নিয়ে এবং মুরযবানদের দল নিয়ে রওয়ানা হন। জিকার ময়দানে তুমুল যুদ্ধে বনু শায়বান জয়লাভ করে এবং ফরাসীরা লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়। এই প্রথম আরবরা অনারবদের ওপর জয়লাভ করেন। এ ঘটনা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের কিছুকাল পরে ঘটেছিলো। হীরায় ইয়াস-এর শাসন পরিচালনার অষ্টম মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন।
ইয়াস-এর পরে কেসরা হীরায় একজন ফরাসী গবর্ণর নিয়োগ করেন। কিন্তু ৬৩২ সালে লাখমিদের ক্ষমতা পুনর্বহাল হয় এবং মোনযের ইবনে মারুর নামে এক ব্যক্তি শাসন ক্ষমতা দখল করেন। শাসনকার্য পরিচালনার আট মাস পরেই হযরত খালেদ (রা.) ইসলামী শক্তির পতাকা নিয়ে হীরায় প্রবেশ করেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 সিরিয়ার বাদশাহী

📄 সিরিয়ার বাদশাহী


আরব গোত্রসমূহের হিজরত যে সময় চলছিলো, সে সময় কোজায়া গোত্রের কয়েকটি শাখা সিরিয়া সীমান্তে এসে বসবাস শুরু করে। বনু সোলাইম ইবনে হুলওয়ানের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিলো। এদের একটি শাখা ছিলো বনু জাজআন ইবনে সোলাইম। এরা জাজায়েমা নামে খ্যাত ছিলো। কোজায়ার এই শাখাকে রোমানরা আরবের মরু বেদুইনদের লুটতরাজ থেকে রক্ষা পাওয়া এবং পারস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে কাছে টেনে নিয়েছিলো। এই গোত্রের একজনের ওপর শাসনভার ন্যস্ত করা হয়েছিলো। এরপর দীর্ঘদিন যাবত তাদের শাসন চলতে থাকে। এদের বিখ্যাত বাদশাহ ছিলেন যিয়াদ ইবনে হিউলা। ধারণা করা হয়ে যে, জাযায়েমার শাসনকাল দ্বিতীয় খৃষ্টীয় শতকের পুরো সময় ব্যাপ্ত ছিলো। পরে গাসসান বংশের আবির্ভাব ঘটে এবং জাযায়েমাদের শাসনামলের অবসান ঘটে। গাসসান বংশের লোকেরা বনু জাযয়া'মাদের পরাজিত করে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে। এ অবস্থা দেখে রোমকরা গাস্সানী বংশের শাসককে সিরিয়ার আরব অধিবাসীদের শাসনকর্তা হিসেবে মেনে নেয়। গাস্সান বংশের রাজধানী ছিলো দওমাতুল জন্দল। রোমক শক্তির ক্রীড়ানক হিসেবে সিরিয়ায় দীর্ঘকাল তাদের শাসন ক্ষমতা অটুট থাকে। ফারুকী খেলাফতের সময় ত্রয়োদশ হিজরীতে ইয়ারমুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সময় গাসসান বংশের সর্বশেষ শাসনকর্তা জাবলা ইবনে আইহাম ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অহংকারের কারণে এই লোকটি বেশীদিন ইসলামের ওপর টিকে থাকতে পারেনি। পরে সে ধর্মান্তরিত বা মোরতাদ হয়ে যায়।

টিকাঃ
২. মোহাজেরাতে খাযরামি ১ম খন্ড, পৃঃ ৬৪, তারীখে আরদুল কোরআন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৮০-৮২

আরব গোত্রসমূহের হিজরত যে সময় চলছিলো, সে সময় কোজায়া গোত্রের কয়েকটি শাখা সিরিয়া সীমান্তে এসে বসবাস শুরু করে। বনু সোলাইম ইবনে হুলওয়ানের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিলো। এদের একটি শাখা ছিলো বনু জাজআন ইবনে সোলাইম। এরা জাজায়েমা নামে খ্যাত ছিলো। কোজায়ার এই শাখাকে রোমানরা আরবের মরু বেদুইনদের লুটতরাজ থেকে রক্ষা পাওয়া এবং পারস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে কাছে টেনে নিয়েছিলো। এই গোত্রের একজনের ওপর শাসনভার ন্যস্ত করা হয়েছিলো। এরপর দীর্ঘদিন যাবত তাদের শাসন চলতে থাকে। এদের বিখ্যাত বাদশাহ ছিলেন যিয়াদ ইবনে হিউলা। ধারণা করা হয়ে যে, জাযায়েমার শাসনকাল দ্বিতীয় খৃষ্টীয় শতকের পুরো সময় ব্যাপ্ত ছিলো। পরে গাসসান বংশের আবির্ভাব ঘটে এবং জাযায়েমাদের শাসনামলের অবসান ঘটে। গাসসান বংশের লোকেরা বনু জাযয়া'মাদের পরাজিত করে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে। এ অবস্থা দেখে রোমকরা গাস্সানী বংশের শাসককে সিরিয়ার আরব অধিবাসীদের শাসনকর্তা হিসেবে মেনে নেয়। গাস্সান বংশের রাজধানী ছিলো দওমাতুল জন্দল। রোমক শক্তির ক্রীড়ানক হিসেবে সিরিয়ায় দীর্ঘকাল তাদের শাসন ক্ষমতা অটুট থাকে। ফারুকী খেলাফতের সময় ত্রয়োদশ হিজরীতে ইয়ারমুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সময় গাসসান বংশের সর্বশেষ শাসনকর্তা জাবলা ইবনে আইহাম ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অহংকারের কারণে এই লোকটি বেশীদিন ইসলামের ওপর টিকে থাকতে পারেনি। পরে সে ধর্মান্তরিত বা মোরতাদ হয়ে যায়।

টিকাঃ
২. মোহাজেরাতে খাযরামি ১ম খন্ড, পৃঃ ৬৪, তারীখে আরদুল কোরআন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৮০-৮২

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হেজাযের নেতৃত্ব

📄 হেজাযের নেতৃত্ব


হযরত ইসমাইল (আ.) থেকেই মক্কায় মানব বসতি গড়ে ওঠে। তিনি ১৩৭ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র নাবেত এবং কাইদার মক্কায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। এই দুজনের মধ্যে কে আগে এবং কে পরে ক্ষমতাসীন ছিলেন- এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এদের পরে এদের নানা মাজাজ ইবনে জোরহামি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এমনি করে মক্কায় শাসন ক্ষমতা জোরহামিদের হাতে চলে যায়। দীর্ঘদিন এ ক্ষমতা তাদের কাছে থাকে। হযরত ইসমাইল (আ.) তাঁর পিতার সাথে কাবাঘর নির্মাণ করায় যদিও তাঁর বংশধরদের একটি সম্মানজনক অবস্থান ছিলো, কিন্তু ক্ষমতা ও নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে তাদের কোনো অংশ ছিলো না।
বছরের পর বছর কেটে যায়। কিন্তু হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধররা অজ্ঞাত পরিচয় অবস্থা থেকে বাইরে আসতে পারেননি। বখতে নসরের আবির্ভাবের কিছুকাল আগে বনু জোরহামের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মক্কার রাজনৈতিক গগনে আদনানীদের রাজনৈতিক নক্ষত্র চমকাতে শুরু করে। এর প্রমাণ এই যে, ইরক নামক জায়গায় বখতে নসর আরবদের সাথে যে যুদ্ধ করেন, সেই যুদ্ধে আরব সেনাদলের অধিনায়কদের মধ্যে জোরহাম গোত্রের কেউ ছিলেন না।
খৃষ্টপূর্ব ৫৮৭ সালে বখতে নসরের দ্বিতীয় অভিযানের সময়ে বনু আদনান ইয়েমেনে পালিয়ে যায়। সে সময়ে বনি ইসরাইলের নবী ছিলেন হযরত ইয়ারমিয়াহ (আ.)। তিনি আদনানের পুত্র মায়া'দকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ায় যান। বখতে নসরের দাপট হ্রাস পাওয়ার পর মায়া'দ মক্কায় ফিরে আসেন। এ সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, মক্কায় জোরহাম গোত্রের জোরশাম নামে শুধু একজন লোক রয়েছেন। জোরশাম ছিলেন জুলহামার পুত্র। মায়া'দ তখন জোরশামের কন্যা মায়া'নার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার গর্ভ থেকে নাযার জন্মগ্রহণ করেন।
সে সময় মক্কায় জোরহামের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। দারিদ্রের নিষ্পেষণে তারা ছিলো জর্জরিত। এর ফলে তারা কাবাঘর তওয়াফ করতে আসা লোকদের ওপর বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয় এমনকি কাবাঘরের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। বনু আদনান বনু জোরহামের এসব কাজে ভেতরে ভেতরে ছিলো দারুন অসন্তুষ্ট। ফলে বনু খোজায়া মাররাজ জাহরানে অভিযানের সময় আদনান বংশের লোকদের লোভকে কাজে লাগায়। বনু খোজায়া আদনান গোত্রের বনু বকর ইবনে আবদে মান্নাফ ইবনে কেনানাকে সঙ্গে নিয়ে বনু জোরহামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধে বনু জোরহাম পরাজিত হয়ে মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়। এ ঘটনা ঘটেছিলো খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।
মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় বনু জোরহাম যমযম কূপ ভরাট করে দেয়। এ সময় তারা যমযমে কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নিক্ষেপ করে তা প্রায় ভরাট করে ফেলে। মোহাম্মদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, আমর ইবনে হারেস মায়ায জোরহামি কাবাঘরের দুটি সোনার হরিণ ও কাবার কোণে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদকে বের করে যমযম কুপে প্রোথিত করে। এরপর তারা জোরহাম গোত্রের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ইয়েমেনে চলে যায়। বনু জোরহাম মক্কা থেকে বহিষ্কৃত হওয়া এবং ক্ষমতা হারানোর ব্যথা ভুলতে পারছিলো না। জোরহাম গ্রোত্রের আমর নামক এক ব্যক্তি এ সম্পর্কে রচিত কবিতায় বলেছেন, 'আজুন থেকে সাফা পর্যন্ত মিত্র কেউ নেই, রাতের মহফিলে নেই গল্প বলার কেউ। নেই কেন? আমরা তো এখানের অধিবাসী, সময়ের আবর্তনে ভাঙ্গা কপাল, হায়রে, হায় আজ আমাদের করে দিয়েছে সর্বহারা!'

টিকাঃ
৩. বাইবেল, জন্ম শীর্ষক অধ্যায় পৃঃ ১৭-২৫
৪. কল্বে জাযিরাতুল আরব, পৃঃ ২৩০-২৩৭
৫. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃঃ ১১১-১১৩, ইবনে হিশাম, হযরত ইসমাইলের বংশধরদের মধ্যে শুধুমাত্র নাবেতের ক্ষমতাসীন থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
৬. কলবে জাযিরাতুল আরব, পৃঃ ২৩০
৭. রহমতুন লিল আলামিন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৮
৮. কল্পে জাযিরাতুল আরব পৃঃ ২৩১
৯. হযরত ইসমাঈলের ঘটনায় উল্লেখিত মাযায জোরহামি এবং এই লোক এক ব্যক্তি নন।
১০. মাসুদ লিখেছেন, পারস্যবাসী কাবাঘরের জন্য মূল্যবান সম্পদ এবং উপঢৌকন পাঠাতেন। যাযান ইবনে বাক সোনার তৈরী দুটি হরিণ, মনিমুক্তা, তলোয়ার এবং বহু সোনা প্রেরণ করেছিলেন। আমর এসব কিছু যমযম কূপে নিক্ষেপ করেন। মুরাও অযজাহাব ১ম খন্ড, পৃঃ ২৩৫
১১. ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃঃ ১১৪-১১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00