📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আরব জাতিসমূহ

📄 আরব জাতিসমূহ


ঐতিহাসিকরা আরব জাতিসমূহকে তিনভাগে ভাগ করেছেন।

এক. আরব বারেবা
আরব বারেবা বলতে আরবের সেইসব প্রাচীন গোত্র এবং সম্প্রদায়ের কথা বোঝানো হয়েছে যারা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এসব গোত্র ও সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিস্তারিত তথ্য এখন আর জানা যায় না। যেমন আদ, সামুদ, তাছাম, জাদিছ আমালেকা প্রভৃতি জাতি।

দুই. আরব আবেরা এ দ্বারা সেসব গোত্রের কথা বলা হয়েছে, যারা ছিলো ইয়ারুব ইবনে ইয়াশজুব ইবনে কাহতানের বংশধর। এদেরকে কাহতানি আরবও বলা হয়।

তিন. আরবে মোস্তারেবা এরা সেসব গোত্র, যারা হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর। এদেরকে আদনানী আরবও বলা হয়।

আরবে আরেবা অর্থাৎ কাহতানি আরবদের প্রকৃত বাসস্থান ছিলো ইয়েমেনে। এখানেই এদের পরিবার ও গোত্রের বিভিন্ন শাখা প্রসার লাভ করে। এদের মধ্যে দু'টি গোত্র বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। যথা:
(ক) হেমইয়ার: এদের বিখ্যাত শাখার নাম হচ্ছে যাইদুল যমহুর কোজাআহ এবং যাকাসেক।
(খ) কাহতান: এদের বিখ্যাত বিখ্যাত শাখার নাম হচ্ছে হামদান, আনমার, তাঈ, মাযহিজ, কেন্দাহ, লাখম, জুযাম আযদ, আওস, খাজরায এবং জাফনার বংশধর। নিজস্ব এলাকা ছেড়ে এরা সিরিয়ার আশে পাশে বাদশাহী কায়েম করেছিলো। পরে এরা গাস্সান নামে পরিচিতি লাভ করে। সাধারণ কাহতানি গোত্রসমূহ পরবর্তীকালে ইয়েমেন ছেড়ে দেয় এবং আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এরা সেই সময় দেশত্যাগ করেছিলো, যখন রোমকরা মিসর ও সিরিয়া অধিকার করার পর ইয়েমেনবাসীদের জলপথের বাণিজ্যের ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো এবং স্থলপথের বাণিজ্যও নিজেদের অধিকারে এনেছিলো। এর ফলে কাহতানিদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।

এমনও হতে পারে, কাহতানি এবং হেমইয়ারি গোত্রসমূহের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ দেখা দেয়ায় কাহতানিরা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলো। এরূপ মনে করার এটাই কারণ যে, কাহতানি গোত্রসমূহ দেশত্যাগ করেছিলো, কিন্তু হিমইয়ারী গোত্রসমূহ তাদের জায়গায় অটল ছিলো।

যেসব কাহতানি গোত্র দেশ ত্যাগ করেছিলো, তাদের চারভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
এক) আযাদ : এরা তাদের সর্দার এমরান ইবনে আমর মুযাইকিয়ার পরামর্শে দেশত্যাগ করে। প্রথমে এরা ইয়েমেনে এক জায়গা থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয় এবং অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়ার জন্যে বিভিন্ন দল পাঠাতে থাকে। এরপর উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে বসতি স্থাপন করে। এদের বিস্তারিত বিরবণ নিম্নরূপ:
ছা'লাবা ইবনে আমর : এই ব্যক্তি প্রথমে হেজায অভিমুখে রওয়ানা হয়ে ছা'লাবা এবং জিকার এর মাঝখানে অবস্থান গ্রহণ করেন। তার সন্তানরা বড় হলে এবং খান্দান শক্তিশালী হলে তখন মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং মদীনাতেই বসবাস করেন। এই ছা'লাবার বংশ থেকেই আওস এবং খাযরাজের জন্ম। আওস এবং খাযরাজ ছিলো ছা'লাবার পুত্র হারেছার সন্তান।
হারেছ ইবনে আমর : তিনি ছিলেন খোজাআর সন্তান। এই বংশধারার লোকেরা হেজায ভূমির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরার পর মাররায যাহরানে অবস্থান নিয়ে পরে মদীনায় হামলা করে। মক্কা থেকে বনি জুরহুম গোত্রের লোকদের বের করে দিয়ে নিজেরা মক্কায় বসতি গড়ে।

এমরান ইবনে আমর : এই ব্যক্তি এবং তার সন্তানরা আম্মানে বসবাস করতে থাকেন। এ কারণে এদেরকে আযদে আম্মান বলা হয়ে থাকে।
নাসর ইবনে আযদ: এই ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত গোত্রসমূহ তোহামায় অবস্থান করে। এদের আযদে শানুয়াত বলা হয়ে থাকে।
জাফনা ইবনে আমর: এই ব্যক্তি সিরিয়ায় চলে যান এবং সেখানে সপরিবারে বসবাস করেন। তিনি ছিলেন গাস্সানী বাদশাহদের প্রপিতামহ। সিরিয়ায় যাওয়ার আগে এরা হেজাযে গাস্সান নামক একটি জলাশয়ের কাছে কিছুদিন অবস্থান করেন।

দুই) লাখম জুযাম গোত্র, লাখমের বংশধরদের মধ্যে নসর ইবনে রবিয়া ছিলেন অন্যতম। তিনি হীরার শাসনকর্তাদের (যাদের বলা হতো আলে মোনযের) পূর্বপুরুষ ছিলেন।

তিন) বনু তাঈ গোত্র, এই গোত্র বনু আযদের দেশত্যাগের পর উত্তর দিকে রওয়ানা হয় এবং আজা ও সালমা নামে দু'টি পাহাড়ের মাঝখানে বসবাস করতে শুরু করে। তাঈ গোত্রের কারণে এই দু'টি পাহাড় বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

চার) কিন্দা গোত্র, এ গোত্রের লোকেরা প্রথমে বাহরাইনের বর্তমান আল আহমা নামক স্থানে বসতি স্থাপন করে। কিছুকাল পর তারা হাদরামাউতে যায়। কিন্তু সেখানেও তারা টিকতে পারেনি। অবশেষে নাজদে গিয়ে বসতি স্থাপন করে এবংএকটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু সে সরকারও স্থায়ী হয়নি। কিছুকালের মধ্যেই তাদের নাম নিশানাও মুছে যায়।

কাহতান ছাড়া হেমইয়ারের আর একটি গোত্র ছিলো, তার নাম ছিলো কাজাআ। এ গোত্রের নাম হেমিরি হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এরা ইয়েমেন থেকে চলে গিয়ে ইরাকের বাদিয়াতুস সামাওয়াতে বসবাস করতে থাকে।¹

আরবে মোস্তারেবা এদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন সাইয়েদেনা হযরত ইবরাহীম (আ.)। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে ইরাকের উয শহরের অধিবাসী। এ শহর ফোরাত নদীর পশ্চিম উপকূল কুফার কাছে অবস্থিত ছিলো। ফোরাত নদী খননের সময়ে পাওয়া নিদর্শনসমূহ থেকে এ শহর সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা গেছে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পরিবার এবং উয শহরের অধিবাসী ও তাদের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কেও অনেক তথ্য এতে উদঘাটিত হয়েছে।

হযরত ইবরাহীম (আ.) দ্বীনের তাবলীগের জন্যে দেশের ভেতর ও বাইরে ছুটোছুটি করেন। একবার তিনি মিসরে যান। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর স্ত্রী সারার কথা শোনার পর ফেরাউনের মনে মন্দ ইচ্ছা জাগে। অসৎ উদ্দেশ্যে সে হযরত সারাকে নিজের দরবারে ডেকে নেয়। তারপর তা চরিতার্থ করতে চায়। হযরত সারা আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। তার দোয়ার বরকতে আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনকে এমনভাবে পাকড়াও করেন যে, সে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে শুরু করে। এতে সে বুঝতে পারে যে, হযরত সারা আল্লাহর খুবই প্রিয়পাত্রী এবং পুণ্যশীলা রমনী। হযরত সারার এ বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে ফেরাউন তার কন্যা হাজেরাকে² হযরত সারার হাতে তুলে দেন। হযরত সারা হযরত হাজেরাকে তাঁর স্বামী হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে বিবাহ দেন।³

টিকাঃ
১. এ সকল গোত্র এবং তাদের দেশত্যাগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন, তারিখুল ইমামিল ইসলামিয়া ১ম খন্ড, পৃঃ ১১-১৩ আল জাযিরাতুল আরব পৃঃ ২৩১-২৩৫। দেশ ত্যাগের ঘটনাবলীর ব্যাপারে সময় নির্ণয়ের মতভেদ রয়েছে। আমরা নানা দিক বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য তথ্য উল্লেখ করেছি।
২. হযরত হাজেরা দাসী ছিলেন বলে ভিন্ন গ্রন্থে বলা হয়, আসলে তিনি ছিলেন ফেরাউনের কন্যা। রহমাতুল্লিল আলামিন, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৬-৩৭ দেখুন।
৩. ঐ ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৪, ঘটনার বিস্তারিত বিবরণের জন্য সহীহ বোখারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪৮৪ দেখুন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 আরবের প্রশাসনিক অবস্থা

📄 আরবের প্রশাসনিক অবস্থা


ইসলাম পূর্বকালের আরবের অবস্থা আলোচনা প্রসঙ্গে আরবের প্রশাসনিক অবস্থা, সর্দারী এবং ধর্মীয় আদর্শ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। এতে ইসলামের আবির্ভাবকালে আরবের অবস্থা সহজে বোঝা যাবে।

জাযিরাতুল আরবে যে সময় ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছিলো, সে সময় আরবে দু'ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত ছিলো। প্রথমত মুকুটধারী বাদশাহ, এরাও আবার পরিপূর্ণ স্বাধীন ছিলো না। দ্বিতীয়ত ছিলো গোত্রীয় সর্দার ব্যবস্থা। এরা মুকুটধারী বাদশাহদের মতোই ক্ষমতা প্রয়োগ করতো এবংএরা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিলো। প্রকৃত বাদশাহ ছিলো ইয়েমেনের বাদশাহ, সিরিয়ার গাস্সান বংশের বাদশাহরা ও ইরাকের হীরার বাদশাহরা। এছাড়া আরবে অন্য কোন মুকুটধারী বাদশাহ ছিলো না।

ইয়েমেনের বাদশাহী
'আরবে আরেবার' মধ্যে প্রাচীন ইয়েমেনী গোত্রের নাম ছিলো কওমে সাবা। ইরাকে আবিষ্কৃত প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায়, খৃষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে সাবা জাতির এখানে বসতি ছিলো। তবে এ জাতির উন্নতি অগ্রগতির সূচনা হয়েছিলো খৃষ্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীতে। উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক সময়কাল নিম্নরূপ,
এক) খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ সালের পূর্বেকার সময়। সেই সময়ে সাবার বাদশাহদের উপাধি ছিলো মাকরাবে সাবা। এদের রাজধানী ছিলো সরওয়াহ নামক জায়গায়। এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ মা-আবের থেকে পশ্চিমে একদিনের পথের দূরত্বে পাওয়া যায়। সেই জায়গার বর্তমান নাম খারিবা। সেই যুগে মা-আরেবের বিখ্যাত বাঁধের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিলো। ইয়েমেনের ইতিহাসে এটা এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই সময়ে সাবার বাদশাহদের শাসনামলে বহুলোক আরবের ভেতর এবং বাইরে বিভিন্ন স্থানে নতুন বসতি স্থাপন করেছিলো।

দুই) খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ থেকে খৃষ্টপূর্ব ১১৫ সাল। এ সময়ে সাবার বাদশাহরা মাকরাব উপাধি পরিত্যাগ করে বাদশাহ উপাধি ধারণ করে এবং সরওয়াহ এর পরিবর্তে মায়ারেবকে রাজধানী মনোনীত করে। এই শহরের ধ্বংসাবশেষ সান-য়া' থেকে ৬০ মাইল পূর্বে পাওয়া যায়।

তিন) খৃষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ১১৫ সাল। এ সময়ে সাবার বাদশাহদের ওপর হেমইয়ার গোত্র আধিপত্য বিস্তার করে এবং তারা মায়া'রবের পরিবর্তে রাইদানকে নিজেদের রাজধানী মনোনীত করে। পরবর্তী সময়ে রাইদানের নাম পরিবর্তন করে জেফার রাখা হয়। এর ধ্বংসাবশেষ ইয়েমেনের কাছাকাছি একটি পাহাড়ে পাওয়া যায়।

এই যুগে সাবা জাতির পতন শুরু হয়। প্রথমে নাবেতিরা হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে এবং সাবার নতুন জনবসতি উৎখাত করতে শুরু করে। এরপর রোমকরা মিসর, সিরিয়া এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে এতে তাদের স্থলপথে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে কাহতানি গোত্রসমূহ নিজেরাও ছিলো আর্থিক দিক থেকে দুর্দশাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে কাহতানি গোত্রসমূহ নিজেদের দেশ ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

চার) খৃষ্টপূর্ব ১১৫ থেকে ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত। এ সময়ে ইয়েমেনে ক্রমাগত বিভেদ বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ এবং বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ চলতে থাকে। এমনি করে এক পর্যায়ে ইয়েমেনের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়া হয়। এই সময়ে রোমকরা আদনের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ করে এবং তাদের সাহায্যে হাবশী অর্থাৎ আবিসিনীয়রা হেমইয়ার ও হামদান গোত্রের পারস্পরিক সংঘাত থেকে লাভবান হয়ে ৩৪০ সালে প্রথমবার ইয়েমেন দখল করে নেয়। এই দখল ৩৭৮ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। এরপর ইয়েমেন স্বাধীনতা লাভ করে বটে, কিন্তু মা-য়া'রেবের বিখ্যাত বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দেয়। ৪৫০ বা ৪৫১ সালে এই বাঁধ ভেঙ্গে যায়। পবিত্র কোরআনে এই ভাঙ্গনকে বাঁধভাঙ্গা বন্যা বলে অভিহিত করা হয়েছিলো। সূরা সাবায় এর উল্লেখ রয়েছে। এটা ছিলো বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা। এ বন্যায় বহু জনপদ বিরান ও জনশূন্য হয়ে পড়েছিলো এবং বহু গোত্র বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিলো।

৫২৩ ঈসায়ী সালে আরেকটি বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটে। বাদশাহ জুনুয়াস ইয়েমেনের ঈসায়ীদের ওপর হামলা করে তাদের খৃষ্টধর্ম ত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা রাযি না হওয়ায় তাদেরকে পরিখা খনন করে প্রজ্জলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা বুরুজে 'ধ্বংস হয়েছিলো কুন্ডের অধিপতিরা' বলে এই লোমহর্ষক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রোমক বাদশাহদের নেতৃত্বে ঈসায়ী ধর্মের উজ্জীবনকারীরা তৎপর এবং প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে। আবিসিনীয়রা রোমকদের সমর্থন পেয়ে ৫১৫ সালে আরিয়াতের নেতত্বে ৭০ হাজার সৈন্যসহ পুনরায় ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে ইয়েমেন অধিকার করে নেয়। অধিকারের পর আবিসিনিয়ার সম্রাটের গভর্নর হিসাবে আরিয়াত ইয়েমেন শাসন করতে থাকেন। কিছুকাল পর আরিয়াতের সেনাবাহিনীর এক অধিনায়ক আরিয়াতকে হত্যা করে ক্ষমতা গ্রহণ করে। এ অধিনায়কের নাম ছিলো আবরাহা। ক্ষমতা গ্রহণের পর আবরাহা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আবিসিনিয়ার সম্রাটকেও তার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করায়।

এই আবরাহাই পরবর্তীকালে কাবাঘর ধ্বংস করতে ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলো। দুর্ধর্ষ একদল সৈন্য এবং কয়েকটি হাতী নিয়ে আবরাহা মক্কা অভিযান পরিচালনা করেছিলো। এই অভিযানকে 'আসহাবে ফীল' নামে সূরা ফীলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আসহাবে ফীলের ঘটনায় আবিসিনীয়দের যে ক্ষতি হয়েছিলো, তার প্রেক্ষিতে ইয়েমেনের অধিবাসীরা পারস্য সরকারের কাছে সাহায্য চায়। তারা আবিসিনীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং সাইফে যী ইয়াযান ইময়ারীর পুত্র মাদি কারাবের নেতৃত্বে আবিসিনীয়দের দেশ থেকে বের করে দেয়। এরপর তারা একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসাবে মাদিকারাবকে ইয়েমেনের বাদশাহ বলে ঘোষণা করে। এটা ছিলো ৫০৫ সালের ঘটনা।

স্বাধীনতার পর মাদিকারাব তার সেবা এবং রাজকীয় বাহিনীর সৌন্দর্যের জন্যে কিছু সংখ্যক হাবশী অর্থাৎ আবিসিনীয়কে রেখে দেয়। তার এ শখ পরবর্তীতে বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়। কর্মরত হাবশীরা একদিন ধোঁকা দিয়ে বাদশাহ মাদিকারাবকে হত্যা করে। এর ফলে যী ইয়াযান পরিবারের রাজত্ব চিরতরে শেষ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতি থেকে সুবিধা আদায়ের জন্যে এগিয়ে আসেন পারস্য সম্রাট কিসরা। তিনি সন্‌ন্যা'য় পারস্য বংশোদ্ভূত একজন গভর্ণর নিয়োগ করে ইয়েমেনকে পারস্যের একটি প্রদেশে পরিণত করেন। পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনে একের পর এক ফরাসী গভর্ণর নিযুক্ত হতে থাকেন। সর্বশেষ গভর্ণর বাযান ৬২৮ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর ফলে ইয়েমেনে পারস্য আধিপত্য লোপ পায় এবং ইয়েমেন ইসলামী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।¹

টিকাঃ
১. মওলানা সাইয়েদ সোলায়মান নদভী তারীখে আরদুল কোরআন গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ১৩৬ পৃষ্ঠা থেকে গ্রন্থের শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের আলোকে সাবা জাতি সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। মওলানা সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদী তাফহীমুল কোরআনের চতুর্থ খন্ডের ১৫৮-১৯৮ পৃষ্ঠাতেও এপর্যায়ে কিছু কিছু তথ্য সন্নিবেশ করেছেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 ইয়েমেনের বাদশাহী

📄 ইয়েমেনের বাদশাহী


'আরবে আরেবার' মধ্যে প্রাচীন ইয়েমেনী গোত্রের নাম ছিলো কওমে সাবা। ইরাকে আবিষ্কৃত প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায়, খৃষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে সাবা জাতির এখানে বসতি ছিলো। তবে এ জাতির উন্নতি অগ্রগতির সূচনা হয়েছিলো খৃষ্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীতে। উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক সময়কাল নিম্নরূপ,
এক) খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ সালের পূর্বেকার সময়। সেই সময়ে সাবার বাদশাহদের উপাধি ছিলো মাকরাবে সাবা। এদের রাজধানী ছিলো সরওয়াহ নামক জায়গায়। এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ মা-আবের থেকে পশ্চিমে একদিনের পথের দূরত্বে পাওয়া যায়। সেই জায়গার বর্তমান নাম খারিবা। সেই যুগে মা-আরেবের বিখ্যাত বাঁধের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিলো। ইয়েমেনের ইতিহাসে এটা এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই সময়ে সাবার বাদশাহদের শাসনামলে বহুলোক আরবের ভেতর এবং বাইরে বিভিন্ন স্থানে নতুন বসতি স্থাপন করেছিলো।
দুই) খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ থেকে খৃষ্টপূর্ব ১১৫ সাল। এ সময়ে সাবার বাদশাহরা মাকরাব উপাধি পরিত্যাগ করে বাদশাহ উপাধি ধারণ করে এবং সরওয়াহ এর পরিবর্তে মায়ারেবকে রাজধানী মনোনীত করে। এই শহরের ধ্বংসাবশেষ সান-য়া' থেকে ৬০ মাইল পূর্বে পাওয়া যায়।
তিন) খৃষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ১১৫ সাল। এ সময়ে সাবার বাদশাহদের ওপর হেমইয়ার গোত্র আধিপত্য বিস্তার করে এবং তারা মায়া'রবের পরিবর্তে রাইদানকে নিজেদের রাজধানী মনোনীত করে। পরবর্তী সময়ে রাইদানের নাম পরিবর্তন করে জেফার রাখা হয়। এর ধ্বংসাবশেষ ইয়েমেনের কাছাকাছি একটি পাহাড়ে পাওয়া যায়।
এই যুগে সাবা জাতির পতন শুরু হয়। প্রথমে নাবেতিরা হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে এবং সাবার নতুন জনবসতি উৎখাত করতে শুরু করে। এরপর রোমকরা মিসর, সিরিয়া এবং হেজাযের উত্তরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে এতে তাদের স্থলপথে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে কাহতানি গোত্রসমূহ নিজেরাও ছিলো আর্থিক দিক থেকে দুর্দশাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে কাহতানি গোত্রসমূহ নিজেদের দেশ ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
চার) খৃষ্টপূর্ব ১১৫ থেকে ইসলামের সূচনাকাল পর্যন্ত। এ সময়ে ইয়েমেনে ক্রমাগত বিভেদ বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ এবং বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ চলতে থাকে। এমনি করে এক পর্যায়ে ইয়েমেনের স্বাধীনতাও কেড়ে নেয়া হয়। এই সময়ে রোমকরা আদনের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ করে এবং তাদের সাহায্যে হাবশী অর্থাৎ আবিসিনীয়রা হেমইয়ার ও হামদান গোত্রের পারস্পরিক সংঘাত থেকে লাভবান হয়ে ৩৪০ সালে প্রথমবার ইয়েমেন দখল করে নেয়। এই দখল ৩৭৮ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। এরপর ইয়েমেন স্বাধীনতা লাভ করে বটে, কিন্তু মা-য়া'রেবের বিখ্যাত বাঁধে ভাঙ্গন দেখা দেয়। ৪৫০ বা ৪৫১ সালে এই বাঁধ ভেঙ্গে যায়। পবিত্র কোরআনে এই ভাঙ্গনকে বাঁধভাঙ্গা বন্যা বলে অভিহিত করা হয়েছিলো। সূরা সাবায় এর উল্লেখ রয়েছে। এটা ছিলো বড় ধরনের একটা দুর্ঘটনা। এ বন্যায় বহু জনপদ বিরান ও জনশূন্য হয়ে পড়েছিলো এবং বহু গোত্র বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
৫২৩ ঈসায়ী সালে আরেকটি বড় রকমের দুর্ঘটনা ঘটে। বাদশাহ জুনুয়াস ইয়েমেনের ঈসায়ীদের ওপর হামলা করে তাদের খৃষ্টধর্ম ত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা রাযি না হওয়ায় তাদেরকে পরিখা খনন করে প্রজ্জলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা বুরুজে 'ধ্বংস হয়েছিলো কুন্ডের অধিপতিরা' বলে এই লোমহর্ষক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে রোমক বাদশাহদের নেতৃত্বে ঈসায়ী ধর্মের উজ্জীবনকারীরা তৎপর এবং প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে। আবিসিনীয়রা রোমকদের সমর্থন পেয়ে ৫১৫ সালে আরিয়াতের নেতত্বে ৭০ হাজার সৈন্যসহ পুনরায় ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে ইয়েমেন অধিকার করে নেয়। অধিকারের পর আবিসিনিয়ার সম্রাটের গভর্নর হিসাবে আরিয়াত ইয়েমেন শাসন করতে থাকেন। কিছুকাল পর আরিয়াতের সেনাবাহিনীর এক অধিনায়ক আরিয়াতকে হত্যা করে ক্ষমতা গ্রহণ করে। এ অধিনায়কের নাম ছিলো আবরাহা। ক্ষমতা গ্রহণের পর আবরাহা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আবিসিনিয়ার সম্রাটকেও তার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করায়।
এই আবরাহাই পরবর্তীকালে কাবাঘর ধ্বংস করতে ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলো। দুর্ধর্ষ একদল সৈন্য এবং কয়েকটি হাতী নিয়ে আবরাহা মক্কা অভিযান পরিচালনা করেছিলো। এই অভিযানকে 'আসহাবে ফীল' নামে সূরা ফীলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসহাবে ফীলের ঘটনায় আবিসিনীয়দের যে ক্ষতি হয়েছিলো, তার প্রেক্ষিতে ইয়েমেনের অধিবাসীরা পারস্য সরকারের কাছে সাহায্য চায়। তারা আবিসিনীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং সাইফে যী ইয়াযান ইময়ারীর পুত্র মাদি কারাবের নেতৃত্বে আবিসিনীয়দের দেশ থেকে বের করে দেয়। এরপর তারা একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসাবে মাদিকারাবকে ইয়েমেনের বাদশাহ বলে ঘোষণা করে। এটা ছিলো ৫০৫ সালের ঘটনা।
স্বাধীনতার পর মাদিকারাব তার সেবা এবং রাজকীয় বাহিনীর সৌন্দর্যের জন্যে কিছু সংখ্যক হাবশী অর্থাৎ আবিসিনীয়কে রেখে দেয়। তার এ শখ পরবর্তীতে বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়। কর্মরত হাবশীরা একদিন ধোঁকা দিয়ে বাদশাহ মাদিকারাবকে হত্যা করে। এর ফলে যী ইয়াযান পরিবারের রাজত্ব চিরতরে শেষ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতি থেকে সুবিধা আদায়ের জন্যে এগিয়ে আসেন পারস্য সম্রাট কিসরা। তিনি সন্‌ন্যা'য় পারস্য বংশোদ্ভূত একজন গভর্ণর নিয়োগ করে ইয়েমেনকে পারস্যের একটি প্রদেশে পরিণত করেন। পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনে একের পর এক ফরাসী গভর্ণর নিযুক্ত হতে থাকেন। সর্বশেষ গভর্ণর বাযান ৬২৮ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর ফলে ইয়েমেনে পারস্য আধিপত্য লোপ পায় এবং ইয়েমেন ইসলামী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

টিকাঃ
১. মওলানা সাইয়েদ সোলায়মান নদভী তারীখে আরদুল কোরআন গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ১৩৬ পৃষ্ঠা থেকে গ্রন্থের শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের আলোকে সাবা জাতি সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। মওলানা সাঈয়েদ আবুল আলা মওদূদী তাফহীমুল কোরআনের চতুর্থ খন্ডের ১৫৮-১৯৮ পৃষ্ঠাতেও এপর্যায়ে কিছু কিছু তথ্য সন্নিবেশিত করেছেন।

📘 আর রাহিকুল মাখতুম > 📄 হীরার বাদশাহী

📄 হীরার বাদশাহী


ইরাক এবং তার আশেপাশের এলাকায় কোরোশ কাবির অথবা সায়রাম যুল কারনাইনের (খৃষ্টপূর্ব ৫৭৫ থেকে ৫২৯ সাল পর্যন্ত) সময় থেকেই পারস্যদের রাজত্ব চলে আসছিলো। ফরাসীদের মোকাবেলা করার মতো শক্তি কারো ছিলো না। খৃষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে সিকান্দার মাকদুনি প্রথম পরাজিত করে পারস্য শক্তি নস্যাৎ করেন। এর ফলে পারস্য সাম্রাজ্য খন্ড খন্ড হয়ে যায়। এ বিশৃঙ্খল অবস্থা ২৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এ সময়ে কাহতানী গোত্রসমূহ দেশত্যাগ করে। ইরাকের এক বিস্তীর্ণ সীমান্ত থেকে যেসব আদনানী দেশত্যাগ করে গিয়েছিলো, তারা এ সময় কারিলায় ফিরে এসে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করে ফোরাত নদীর উপকূল ভাগের একাংশে বসতি স্থাপন করে।
এদিকে ২২৬ সালে আর্দেশির সাসানি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর ধীরে ধীরে পারস্য শক্তি পুনরায় সংহত হতে শুরু করে। আর্দেশির পারস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার দেশের সীমান্তে বসবাসকারী আরবদের প্রতিহত করেন। এর ফলে কোযায়া গোত্র সিরিয়ার পথে রওয়ানা হয়। পক্ষান্তরে হীরা এবং আনবারের আরব অধিবাসীরা বশ্যতা স্বীকারে সম্মতি জ্ঞাপন করে।
আর্দেশিরের শাসনামলে হীরা, বাদিয়াতুল ইরাক এবং উপদ্বীপবাসীর ওপর রবিয়ী গোত্রের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। মোদারী গোত্রসমূহের ওপর জাযিমাতুল ওয়াযযাহদের শাসন ছিলো। মনে হয়, আর্দেশিয়রা বুঝতে পেরেছিলো যে, আরব অধিবাসীদের ওপর সরাসরি শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং সীমান্তে তাদেরকে লুটতরাজ থেকে বিরত রাখা সম্ভব নয়। বরং ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে এমন কোন আরব নেতাকে শাসক হিসাবে নিযুক্ত করাই হবে বুদ্ধিমত্তার কাজ। এর ফলে একটা লাভ এই হবে যে, প্রয়োজনের সময় রোমকদের বিরুদ্ধে এসব আরবের সাহায্য নেয়া যাবে এবং সিরিয়ার রোমকপন্থী আরব শাসকদের মোকাবেলায় ইরাকের এসব আরব শাসনকর্তাকে দাঁড় করানো যাবে। হীরার বাদশাহদের অধীনে পারস্য সৈন্যদের একটি ইউনিট আবিসিনিয়ায় থাকতো। এদের দ্বারা বিভিন্ন স্থানে আরব বিদ্রোহীদের দমন করা হতো।
২৬৮ সালে জাযিমা মৃত্যু বরণ করেন এবং আমর ইবনে আদী ইবনে নসর লাখামী হাদরামি তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ছিলেন লাখাম গোত্রের প্রথম শাসনকর্তা। শাপুল কোবাজ ইবনে ফিরোজের যুগ পর্যন্ত একাধারে হীরার ওপর লাখমিদের শাসন চলতে থাকে। কোবাজের সমসাময়িককালে মোজদকের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ছিলেন সংস্কারবাদের প্রবক্তা। কোবাজ এবং তার বহুসংখ্যক অনুসারী বাদশাহ মোনযার ইবনে মাউসসামাকে বার্তা পাঠালেন যে, তুমিও এ ধর্ম গ্রহণ করো। মোনযার ছিলো বড়ই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ, তিনি অস্বীকার করে বসলেন। ফলে কোবাজ তাকে বরখাস্ত করে তার স্থলে মোজদাকি মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা হারেস ইবনে আমর ইবনে হাযার ফিন্দীর হাতে হীরার শাসনভার ন্যস্ত করলেন।
কোবাজের পরে পারস্যের শাসনক্ষমতা কেস্সা নওশেরওয়া'র হাতে আসে। তিনি এ ধর্মকে প্রচন্ড ঘৃণা করতেন। তিনি মোজদাক এবং তার বহু সংখ্যক সমর্থককে হত্যা করেন। মোনযারকে পুনরায় হীরার শাসনভার ন্যস্ত করেন এবং হারেস ইবনে আমরকে ডেকে পাঠান। কিন্তু হারেস বনু কেনায়েব এলাকায় পালিয়ে গেলে তিনি সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন।
মোনযার ইবনে মাউসসামার পরে নো'মান ইবনে মোনযারের কাল পর্যন্ত হীরার শাসনক্ষমতা তার বংশধরদের মধ্যে আবর্তিত হয়। এরপর যায়েদ ইবনে আদী এবাদী কিস্সার কাছে নো'মান ইবনে মোনযারের নামে মিথ্যা অভিযোগ করে। কেসরা নওশেরওয়াঁ এতে ক্ষেপে যান এবং নো'মানকে ডেকে পাঠান। নো'মান প্রথমেই হাযির না হয়ে চুপিসারে বনু শায়বানের সর্দার হানি ইবনে মাসুদের কাছে যান এবং পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ সবকিছু তার কাছে রেখে কেসরার দরবারে হাযির হন। কিসরা তাকে বন্দী করেন এবং ঐ অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে কেসরা নো'মানকে বন্দী করার পর তার স্থলে ইয়াস ইবনে কোবায়সা তাঈকে হীরার শাসনকর্তা নিয়োগ করেন এবং হানি ইবনে মাসুদের কাছে নো'মানের জামানত চাওয়ার জন্যে ইয়াসকে নির্দেশ দেন। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হানি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ইয়াস কেসরার সৈন্যদের নিয়ে এবং মুরযবানদের দল নিয়ে রওয়ানা হন। জিকার ময়দানে তুমুল যুদ্ধে বনু শায়বান জয়লাভ করে এবং ফরাসীরা লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়। এই প্রথম আরবরা অনারবদের ওপর জয়লাভ করেন। এ ঘটনা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের কিছুকাল পরে ঘটেছিলো। হীরায় ইয়াস-এর শাসন পরিচালনার অষ্টম মাসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন।
ইয়াস-এর পরে কেসরা হীরায় একজন ফরাসী গবর্ণর নিয়োগ করেন। কিন্তু ৬৩২ সালে লাখমিদের ক্ষমতা পুনর্বহাল হয় এবং মোনযের ইবনে মারুর নামে এক ব্যক্তি শাসন ক্ষমতা দখল করেন। শাসনকার্য পরিচালনার আট মাস পরেই হযরত খালেদ (রা.) ইসলামী শক্তির পতাকা নিয়ে হীরায় প্রবেশ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00