📄 রসূলুল্লাহ সা. -এর আদর্শ ও বাংলাদেশ
১,৪৮,০০০ বর্গ কিলোমিটারের একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। ১৬ কোটি মানুষ অধ্যুষিত এই দেশের শতকরা প্রায় ৯০ জনই মুসলিম। এদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহ্যমণ্ডিত। খলিফায়ে রাশেদীনের যুগ থেকেই ইসলাম প্রচারকগণ এ অঞ্চলে আসতে শুরু করেছিলেন। প্রাচ্যের হাতে নিপীড়িত এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যখন ইসলামের সুবিচারমূলক শান্তির আহ্বান পেলেন তখন তারা দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসে সমবেত হলেন। দ্বাদশ শতাব্দি থেকে এদেশে মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও রাসূলুল্লাহর আদর্শের ভিত্তিতে এখানে কখনো সত্যিকার ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মাঝখানে দেড়'শ বছর বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনে থাকলেও ১৯৪৭ থেকে এদেশের শাসন আবার মুসলমানদের হাতেই আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুসলমানদের স্বাধীন স্বতন্ত্র্য মারচিত্রের অধিকারী হয়। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়েও এখানে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ঘরের পাশেই পৌত্তলিক কলোচারা অবস্থান। তাই প্রথম থেকেই পৌত্তলিক সভ্যতা সংস্কৃতির সাথে এদেশের ইসলামের একটি সংঘাত চলেই আসছিল। এ অঞ্চলের মানুষ ইসলামের দাওয়াত পেয়ে তা গ্রহণ করলেও অধিকাংশ মুসলমানই কুরআন সুন্নাহর প্রকৃত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত রয়ে যায়। ফলে সত্যিকারের ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা আর পৌত্তলিক সংস্কৃতির প্রভাব এ দুই মিলে এখানকার مسلمانদের மதীয় পরিবেশের উপর থেকে দূরে থেকে যায়।
তাইতো দেখা যায়, মুসলিম হয়েও কেউ পীরকে সিজদা করতে নিমজ্জিত, কেউ নাস্তিকতায় নিমজ্জিত, কেউ কুসংস্কারে অনুকরণ পছন্দ করে, কেউ ভালোবাসা ব্রাহ্মণ্যবাদী কালচার। ফলে এদেশের শতকরা ৯০ জন মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তাদের ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাসূলুল্লাহর সত্যিকার অর্থে এবং পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত নেই। অথচ মুমিন জীবনের সবচে' বড় অংগীকার তো হওয়া উচিত ছিলো রাসূলুল্লাহর আদর্শ প্রতিষ্ঠা।
📄 রসূলুল্লাহর আদর্শ বলতে কি বুঝায়?
বিশ্বজগতের মালিক মহান আল্লাহ এ পৃথিবীতে মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে কেবল তাঁরই দাসত্ব, আনুগত্য ও হুকুম পালন করে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিভাবে মানুষ তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী জানবে, কিভাবে মানুষ তাঁর হুকুম ও বিধান, সে ব্যবস্থাও তিনি করেছেন। সে ব্যবস্থার নাম হচ্ছে নবুয়ত ও রিসালাত। মানুষের মধ্য থেকেই কিছু লোককে তিনি বেছে নিয়ে রেখে দেশে নবী রাসূল মারফত তাদের কাছে মানুষের জন্য পথনির্দেশ পাঠান।
নবুয়তের এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ নবী হলেন মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা.। কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের জন্য তিনি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ প্রদত্ত শাশ্বত জীবন বিধান ইসলামই তাঁর আদর্শ। ইসলাম মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা।
মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে ইসলাম একটি বিধান ও দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর পুরো জীবনে ইসলামের সমগ্র বিধানের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করে বিশ্ব মানুষের সামনে ইসলামের আদর্শ পেশ করে গেছেন।
এখানে রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শ বলতে ইসলামকেই বুঝানো হয়েছে। ইসলাম দুটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত : ১. আল্লাহ্র কিতাব আল কুরআন। ২. রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবন ছিলো আল্লাহ্র কিতাবের বাস্তব রূপায়ণ। তাঁকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবের শিক্ষক নিয়োগ করেন। শিক্ষক হিসেবে এ কিতাবের ব্যাখ্যা দানের দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পণ করেন। রাসূলুল্লাহ সা. একদিকে কিতাবের মৌখিক শিক্ষা প্রদান করেন, অপর দিকে প্রদান করেন বাস্তব শিক্ষা। অর্থাৎ তিনি নিজের জীবনকে কিতাবের শিক্ষা অনুযায়ী গড়ে তোলেন এবং নিজেকে মানুষের সামনে কিভাবে বাস্তব সাক্ষ্য ও নমুনা হিসেবে পেশ করেন।
সুতরাং কুরআন ছাড়াত কিতাবের বাহক ও শিক্ষক হিসেবে তিনি যেসব শিক্ষা প্রদান করেছেন, যেভাবে ইসলামের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করেছেন, জীবনের প্রতিটি দিক যেভাবে পরিচালনা করেছেন এবং রাসূল হিসেবে প্রচলিত সমাজকে যেসব নিয়ম নীতির অধীনে ইসলামের জন্য সমর্থন করেছেন এসবই তাঁর সুন্নাহ। এগুলো ছিলো কুরআনেরই বাস্তব রূপ। আয়েশা রা. বলেছেন, কুরআনই ছিলো তাঁর জীবন চরিত।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ সা. এর আদর্শ বলতে কুরআন সুন্নাহ বর্ণিত সমস্ত বিধি বিধান ও জীবন যাপনের পথনির্দেশ। এগুলোর সমন্বিত রূপই রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শ।
📄 রসূলুল্লাহর আদর্শ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা
মানুষ নিজেই নিজের জীবন-বিধান ও জীবন যাপনের সঠিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। কারণ মানুষ তাঁর সীমিত, দুটি অগ্রপশ্চাৎ এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে সে অজ্ঞ। ফলে মানুষ কিছুতেই তার জীবন বিধান ও জীবন যাপনের স্থায়ী ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারে না।
মানুষের জীবন যাপনের সঠিক ব্যবস্থা তো তিনিই দিতে পারেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি জানেন, কিসে মানুষের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ। যিনি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে সমান রাখেন, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য -মিথ্যা ও লাভ-ক্ষতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখেন।
এমন সত্তা তো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। হ্যাঁ কেবল মহান আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি মানুষকে তার সঠিক চলার পথ বলে দিতে পারেন, যিনি মানুষকে অকল্যাণ থেকে বাঁচার পথ এবং সত্যিকারের কল্যাণের পথ দেখাতে পারেন।
মহান আল্লাহই তো সেই সত্তা যিনি সমগ্র প্রকার সৃষ্টি, সকল মানুষ যার জন্মান্তর দাস, সকল মানুষ যিনি সমগ্র কালে কল্যাণ দান, অসীম সৃষ্টি হিসেবে সকল মানুষকে সমানভাবে ভালোবাসেন। তাই জীবন বিধান ও জীবন ব্যবস্থা দেবার জন্য তিনিই সবাই উপযোগী। তিনি পরম দয়ালু। তিনি তাঁর সৃষ্টি মানুষকে এতোটাই ভালোবাসেন। তাইতো মানুষের জীবন যাপনের পথ বাতলে দিয়েছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন সিরাতুল মুস্তাকীম। এজন্যই তিনি রাসূল নিয়োগ করেছেন। কিতাব নাযিল করেছেন। মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা.-এর মাধ্যমে পরিপূর্ণ হিদায়াত নাযিল করে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের মুক্তির ব্যবস্থা তিনি করেছেন।
মুহাম্মদ সা. আল্লাহ্র হিদায়াত অনুযায়ী নিজেকে গড়েছেন, সমাজ নির্মাণ করেছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, পরিচালনা করেছেন। তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবন ছিলো আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াত ও জীবন ব্যবস্থার মূর্ত প্রতীক। মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় অকল্যাণ থেকে মুক্তি পেতে হলে, আল্লাহ্র বিরাগভাজন হওয়া থেকে বাঁচতে হলে এবং তাঁর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে অবশ্যই মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা.-এর আনুগত্য ও অনুসরণ করতে হবে। কারণ তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে হিদায়াতের মডেল :
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।” (সূরা ৩৩ : ২১)
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
“হে নবী ওদের বলে দাও! তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, তবে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।” (সূরা ৩ : ৩১)
সুতরাং আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তথা জীবনের সকল দিক ও বিভাগে রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এটা শুধু তাঁর প্রতি আমাদের ভক্তি শ্রদ্ধার কারণেই নয়, বরং আমাদের ইহ জাগতিক এবং পারলৌকিক মুক্তির এটাই একমাত্র পথ।
📄 রসূলুল্লাহর আদর্শ বাস্তবায়ন বলতে কি বুঝায়?
রাসূলুল্লাহর আদর্শ বাস্তবায়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হবার পর এখন আমাদের দেখতে হবে, রাসূলুল্লাহর আদর্শ বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠা বলতে আসলে কি বুঝায়?
রাসূলুল্লাহর আদর্শ বাস্তবায়ন বলতে মূলত রাসূলুল্লাহ সা. ইসলামকে যেভাবে পেশ করেছেন, ইসলামের ভিত্তিতে যেভাবে জীবন যাপন করতে শিখিয়েছেন, ইসলামের ভিত্তিতে যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে ও পরিচালনা করেছেন সেভাবে পরিচালনা করা, যেভাবে জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে ইসলামের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে শিখিয়েছেন, আমাদের পূর্ণাঙ্গ জীবন এবং জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে সেভাবে গড়ে তোলা ও পরিচালনা করাটাই হলো রাসূলুল্লাহর আদর্শ বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠা। আর এসব ক্ষেত্রে ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ, বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠা বলতে বুঝায় :
১. আল্লাহ্র কিতাব আল-কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও বাস্তবায়ন।
২. রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শের পরিপূর্ণ অনুসরণ ও বাস্তবায়ন।
৩. খলিফায়ে রাশেদীনের আদর্শের অনুসরণ।
৪. সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তর থেকে সর্বপ্রকার জাহেলিয়াত তথা শিরক, বিদয়াত, ফিসক, ফুযূর ও ফাহেশাত ইত্যাদি উচ্ছেদ।
৫. সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এক্ষেত্রে আল্লাহ্র আইন ও কর্তৃত্ব তথা আল্লাহ্র দীনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা।
৬. কুরআন সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা চালু করা।
৭. রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সকল প্রকার মাধ্যমকে প্রধানত ইসলামের প্রচার ও জনগণের প্রশিক্ষণে এবং কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত রাখা।