📄 মা'রূফের প্রতি আহ্বান
কুরআনে নবী করিম সা.-কে বলা হয়েছে : ‘ওয়া’মুর বিল উরফি-মা'রূফের আদেশ করো।’
এর ব্যাখ্যায় তাফসীর তাফহীমুল কুরআনে বলা হয়েছে : “দাওয়াতদানকারীর বড় বড় দর্শন ও সূক্ষ্ম তত্ত্বের পরিবর্তে লোকদের সরাসরি ‘মা'রূফ’ মনে-য্যোগ ও সুস্পষ্ট কল্যাণের শিক্ষা দেবে, যেসব কথাকে সাধারণ মানুষ ভালো কথা বলে জানে কিংবা যা ভালো কথা বলে মনে করার জন্য তাদের সাধারণ বুদ্ধিই (Common sense) যথেষ্ট হতে পারে।
এ পন্থা গ্রহণের ফলে সত্য পথের দাওয়াতদানকারীর আবেদন সাধারণ ও সুধী সবাইকেই প্রভাবিত করে। শ্রোতার ওপর এর প্রভাব ভেদ করে দাওয়াত আপনিতেই তার মর্মে গিয়ে পৌঁছায়। এমন ‘মারূফ’ দাওয়াতের বিরুদ্ধে যারা চিৎকার ও হাঙ্গামা করে, তারা নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতা ও দাওয়াতের কামিয়াবির ক্ষেত্র তৈরি করে করে।” (তাফহীমুল কুরআন, সূরা ৭ আ'রাফ, টীকা : ১৫০)।
📄 সাহসিকতা
কোনো ভীরু কাপুরুষ ব্যক্তি আল্লাহ্র দীনের দাওয়াতদানকারী হতে পারেনা। এ কাজের জন্যে প্রয়োজন বিরাট সৎ সাহসের। চরম বিরোধিতার পরিবেশেও দাওয়াতদানকারী নিজের হকপন্থী হবার কথা ঘোষণা করতে পারলে তার দাওয়াত খুবই প্রভাবশালী ও কার্যকর হবে। সূরা হামীমুস সাজদার ৩২ নং আয়াতে সর্বোত্তম দাওয়াতদানকারীর একটি পরিচয় বলা হয়েছে যে, সে নিজেকে মুসলিম বলে ঘোষণা করে দেয় ‘ওয়া কালাল ইন্নানি মিনাল মুসলিমীন’
এর ব্যাখ্যায় আবুল আ'লা মওদুদী রহ. বলেছেন : “এ কথার তাৎপর্য বুঝার জন্যে মনে যায়যামায় সেই পরিবেশকে সম্মুখে রাখতে হবে যা আমি প্রথমে উল্লেখ করেছি। নবুয়তের সে পর্যায়ে কাফের ও মুশরিকদের মোকাবেলায় ‘আমি একজন মুসলমান’ সহজ ও মামুলি ব্যাপার ছিলো না। বরং এটা ছিলো হিংস্র পশুদেরকে নিজের উপর হামলা করার আহ্বান জানানোর নামান্তর। বাস্ তখন সত্য দীনের দাওয়াতদানকারীর এ বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার হলো যে, তিনি কেবলমাত্র পবিত্র আমলে তাদের আদর্শেরই নন, বরং তিনি নিরন্তর শত্রুদের সম্মুখে এবং চরম বিরুদ্ধবাদী পরিবেশে নিজের মুসলমান হবার কথা অস্বীকার করেন না, লুকিয়ে রাখেন না।
নিজের মুসলমান হবার কথা স্বীকার করতে এবং তার ঘোষণা দিতে কোনো লজ্জা, সংকোচ ও ভয়-ভীতির পরোয়া করেন না। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে দেন, হ্যাঁ, আমি মুসলমান, যার যা ইচ্ছা করুক।’
অন্য কথায় দিনে হকের দাওয়াতদানকারীর একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ এটাই হবে যে, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও বাহাদুর ব্যক্তি হবেন।
আল্লাহ্র পথে ডাকা কোনো ভীরু কাপুরুষের কাজ নয়। সামান্য চোটেই যে ভেঙ্গে পড়ে, এমন ব্যক্তি কখনো মানুষকে আল্লাহ্র পথে ডাকতে পারে না। ঐ ব্যক্তিই আল্লাহ্র পথে মানুষকে ডাকার যোগ্যতা রাখে, যে কঠিনতম শত্রুতার পরিবেশে, বিরুদ্ধতার পরিবেশে এবং মারাত্মক বিপজ্জনক পরিবেশে ইসলামের বাণী নিয়ে দণ্ডায়মান হবার সৎসাহস রাখে এবং পরিণামের কোনো পরোয়াই করে না।
📄 আমলে সালেহ
মহান আল্লাহ বলেন :
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا
“যে ব্যক্তির চাইতে ভালো কথা কে বলে, যে মানুষকে আল্লাহ্র দিকে ডাকে এবং নিজের আমলে সালেহ দ্বারা সুশোভিত করে।” (সূরা ৪১ হামীমুস সাজদা : আয়াত ৩৩)
অর্থাৎ হক পথের দাওয়াতদানকারীকে আমলে সালেহর সৌন্দর্য সুশোভিত হতে হবে। তাকে নেক আমল করতে হবে। একটু চিন্তা করলে এ ফরমানটির তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে যাবে। ব্যাপারটা হচ্ছে দাওয়াতদানকারীর নিজের আমলই যদি দুরস্ত না হয়, তবে তার দাওয়াতের আর কোনো প্রভাবই থাকে না। তা সম্পূর্ণ বেকার হয়ে যায়।
একজন ব্যক্তি যে জিনিসের প্রতি লোকদের দাওয়াত দেবেন তার নিজেকেই প্রথমে সে জিনিসের প্রতিমূর্তি হতে হবে। তার নিজের জীবনে আল্লাহ্র নাফরমানীর এতোটুকু চিহ্নও যেনো পাওয়া না যায়।
তার নৈতিক চরিত্র এমন হতে হবে যেনো কোনো ব্যক্তি তার মধ্যে একটি দাগও খুঁজে না পায়। তার আশ-পাশের পরিবেশ, তার সমাজ, তার বন্ধু-বান্ধব, তার আপনজন ও আত্মীয়-স্বজন যেনো এ কথা মনে করে যে, আমাদের মধ্যে একজন উত্তম ও পবিত্র চরিত্রের ব্যক্তি রয়েছে।
📄 নিঃস্বার্থপরতা (ইখলাস)
দাওয়াতদানকারী শুধুমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ এবং মানুষকে কল্যাণের পথে আনার নিমিত্তে দাওয়াতি কাজ করবেন। এর পেছনে যদি কোনো প্রকার পার্থিব চিন্তা বা স্বার্থ লুক্কায়িত থাকে তবে তার সমস্ত তৎপরতাই পশু হয়ে যাবে।
দাওয়াতদানকারী যে মহাসত্যের দিকে মানুষকে দাওয়াত দেবেন তার সত্যতা মানুষ তখনই উপলব্ধি করবে, যখন তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে দাওয়াতি কাজ করবেন।
তার মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো পার্থিব স্বার্থ রয়েছে বলে যদি মানুষ উপলব্ধি করে, তবে কিছুতেই মানুষের উপর তার দাওয়াতের প্রভাব পড়বে না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সা. দাওয়াতকালে মানুষকে সুস্পষ্টভাবে নিজের নিঃস্বার্থপরতার কথা জানিয়ে দিয়েছেন :
قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا ۖ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَىٰ لِلْعَالَمِينَ
“হে নবী তুমি বলে দাও : এ দাওয়াতের কাজের জন্যে তোমাদের কাছে তো আমি কোনো পারিশ্রমিক দাবি করছি না। এতো হলো বিশ্ববাসীর জন্য সাধারণ উপদেশ।” (সূরা ৬ আল আনআম, আয়াত : ৯০)।