📄 চিন্তার বিপ্লব
তিনি প্রথমেই জনগণের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে এমন বিপ্লব সৃষ্টি করে দেন। তাঁর জাতির লোকেরা চিন্তার যে অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো, তিন সেজের সে অন্ধার পর্যন্ত আঘাত করেন। তাদের অবচেতন অনুভূতিকে সচেতন করে দেন। তাদের বিবেককে নাড়া দেন। তাদের চোখের পর্দা সরিয়ে দেন। কানের তালা খুলে দেন। দিলের কালিমা দূর করে দেন।
তারা আল্লাহকে অদেখা বলে জানতো। কিন্তু তারা তাঁকে কেবল ভালোকন্দের দেবতা বলেই মনে করতো। তারা মনে করতো, তাঁকে খুশি করলে তাদের পার্থিব জীবনে কল্যাণ হবে, আর অখুশি করলে তাদের অকল্যাণ। কিন্তু কিনে তিনি হন না আর কিসে অখুশি হন, তা তারা জানতো না। এ ব্যাপারে তারা নিজেদের মনগড়া চিন্তার দ্বারা বাহিত ছিলো। তাছাড়া তারা মনে করতো সরাসরি মানুষ তাঁকে খুশি করতে পারে না। মানুষের আরাধনা সরাসরি তাঁর কাছে বলে বলে তারা নিজেদের মনগড়া মাধ্যমে সাযস্ত করে নিয়েছিলো।
এভাবে তারা আল্লাহ্র সাথে অসংখ্য মনগড়া অংশীদার বানিয়ে নিয়েছিল। পরকালের জীবন সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিলো না। পার্থিব জীবনের পাপ, অন্যায়, যুলম, অত্যাচার, অধিকার হরণ ইত্যাদি জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে বলে তাদের কোনো ধারণা ছিলো না। এভাবে আল্লাহ্র বিধান এবং তাঁর দেওয়া গুরুত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে তারা ছিলো সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
রাসূলুল্লাহ সা. ওহীর সাহায্যে তাদের মধ্যে জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেন। একটি যুক্তি গ্রাহ্য সাহায্যে তাদের ধারণা দূর করে দেন। তাদের চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করে দেন। তাদের মধ্যে মানসিক বিপ্লব সংঘটিত করে দেন। সুন্দরযার যুক্তি পেশ করেন, তাদের জীবন ও জগত থেকে অকাট্য প্রমাণসহ উপস্থাপনা করেন, ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তসমূহ তাদের চোখের সামনে তুলে ধরেন। সেই সাথে মর্মস্পর্শী উপদেশের মাধ্যমে তাদের মধ্যে বজ্র দাগা উন্মুক্ত করে দেন। এভাবে তাদের মনে ও মগজে এ ধারণা বদ্ধমূল করে দেন যে :
আল্লাহ্ এক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। কোনো প্রতিপক্ষ নেই। কোনো আত্মীয় নেই। তিনি সরাসরি মানুষের কথা শুনেন। আরাধনা শুনেন। তিনি যাদের মোটা রশিতে বেঁধেও মানুষের নিকটতর। তাঁর দাসত্ব ও আনুগত্য করার জন্যই তিন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের তার খলিফা-প্রতিনিধি। তার ক্ষমতা সর্বব্যাপী। দুর্ভেদ্য প্রতিপশলী তিনি। গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু তিনি জানেন ও দেখেন।
মৃত্যুর পর তিনি সব মানুষকে জীবিত করবেন। পৃথিবীর জীবনে তারা তাঁর অনুগত হয়ে চলেছিল কিনা; পৃথিবীতে তাঁর দাসের জীবন যাপন করেছিল কিনা; কিয়ামতের দিন তিনি এসব কিছুর হিসাব নেবেন।
পৃথিবীর জীবনে প্রতিটি মানুষের যাবতীয় কর্মকাণ্ড তিনি রেকর্ড করার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এসব রেকর্ড এবং সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সেদিন তিনি বিচার করবেন। বিচারে যারা কৃতকার্য হবে, তাদের চিরদিনের জন্য পুরস্কার জান্নাতে থাকতে দেবেন। আর অকৃতকার্য হলে কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্থান জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
মুহাম্মদ সা. কে তিনি নিজের রাসূল মনোনীত করেছেন। তাঁর মাধ্যমে মানুষের জন্য জীবনের যাপনের বিধান প্রদান করেছেন। কিভাবে জীবন যাপন করলে তিনি খুশি হবেন আর কী কী কাজে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন, তার মাধ্যমে এসব কিছু তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।
সুতরাং যারা মুহাম্মদ সা.-এর মাধ্যমে প্রেরিত বিধানের পূর্ণ অনুসরণ করবে এবং তিনি যেভাবে চলতে বলেন, সেভাবে জীবন যাপন করবে, পরকালে কেবল তারাই মুক্তি পাবে এবং জান্নাতের অধিকারী হবে। আর যারা তাঁর মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহ্র বিধানের অনুসরণ করবে না এবং তাঁর দেখানো পথে চলবে না, পরকালে তারাই অকৃতকার্য হবে এবং প্রবেশ করবে জাহান্নামে।
📄 চারিত্রিক বিপ্লব
চিন্তার ক্ষেত্রে যাদের মধ্যে এই পরিবর্তন, এই বিপ্লব সাধিত হচ্ছিল, সাথে সাথে তাদের চরিত্রের মধ্যেও পরিবর্তন সাধিত হচ্ছিল। সংঘটিত হচ্ছিল চারিত্রিক বিপ্লব। এতদিন তারা অসংখ্য খোদার পূজা অর্চনা করতো, এখন এক আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন হয়ে অসংখ্য খোদার আনুগত্য করতো, এখন খোদার প্রতিপশালী সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করে না।
📄 সমাজ বিপ্লব
এভাবে মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. সমাজে দুটি ধারা সৃষ্টি করে দিলেন। একটি হলো প্রচলিত ধারা, যার শিরক ও কুফরর উপর অটল থেকে নিজেদের পার্থিব স্বার্থের জন্য সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করে রেখেছে। অপরটি হলো, তার সৃষ্ট বিপ্লবী ধারা, যাদের মানসিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, নৈতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এবং চারিত্রিক গুণেও আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
সহসাই দুটি ধারার মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও সংঘর্ষ বাঁধে। কায়েমী স্বার্থবাদী ধারা বিপ্লবী ধারাকে কিছুতেই বরদাশত করে না। বিপ্লবী ধারা দিন দিনই জোরদার হচ্ছে দেখে তারা বিরোধিতায় মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়। ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। চরম অত্যাচার নির্যাতনের স্টীম রোলার উপর চাপিয়ে দিয়ে বিপ্লবী ধারা তাদের জীবনের পরম লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য এসব কিছুই বরদাশত করে।
কিন্তু রাসূল পাকের সৃষ্ট এই বিপ্লবী ধারা ছিলো যেহেতু সত্যের ধারক, যুক্তির আহবায়ক, তাই দিন দিন তাদের জনবল এবং মনোবল বৃদ্ধি পেতে থাকে।