📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 আদর্শ প্রতিষ্ঠার দুর্জয় অংগীকার

📄 আদর্শ প্রতিষ্ঠার দুর্জয় অংগীকার


ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন। হাজারো অত্যাচার নির্যাতনের পরও যখন পুরুষ ও নারীদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটতে লাগলো, তখন ইসলামের প্রতিপক্ষ দিশেহারা হয়ে উঠলো। এমনি পরিস্থিতিতে এক সন্ধ্যায় কুরাইশদের সব শাখার সর্দাররা কা'বার চত্বরে এসে সমবেত হয়।
সেখানে উপস্থিত কুরাইশ সর্দাররা ছিলো : উতবা, শাইবা, আবু সুফিয়ান, নাদার, আবুল বুখতরী, আসওয়াদ, আ'স বিন ওয়াইল, যুবাইর, মুনাব্বিহ এবং উমাইয়া বিন খালফ। এই সর্দাররা পরামর্শ করে ঠিক করলো, মুহাম্মাদকে এখানে ডেকে এনে তাঁর সাথে কথা বলা হবে এবং তাঁকে তার কাছে অসম্ভব দাবি দাওয়া পেশ করা হবে। তারা বললো, এমনটি করা হলে জনগণ মুহাম্মাদকে দোষ দেবে এবং আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে।
ফয়সালা অনুযায়ী করীম সা.-কে ডেকে আনার জন্য একজনকে পাঠানো হলো। সেই দূত গিয়ে তাঁকে বললো : কুরাইশ সর্দারগণ কা'বার চত্বরে সমবেত হয়েছেন। তারা আপনার সাথে কথা বলতে চান। আমার সাথে তাদের কাছে চলুন।
একথা শুনা মাত্র রাসূলুল্লাহ সা. তাদের দিকে ছুটে চললেন। তিনি ভাবলেন, তিনি তাদেরকে যে মহান আদর্শের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তারা হয়তো সে ব্যাপারে পদ্ধতির চিন্তা ভাবনা করছে। তাদের গোঁড়ামি এবং অত্যাচার নির্যাতনের যদিও তিনি খুবই ব্যথিত ছিলেন, কিন্তু তিনি সব সময়ই আন্তরিকভাবে কামনা করতেন, তারা সঠিক পথে আসুক। এখন সেই আশা নিয়েই তাদের আহ্বানে ছুটে চললেন। তিনি জানেন না তারা কি ষড়যন্ত্র এঁটে তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছে।
অবশেষে তিনি তাদের কাছে পৌঁছুলেন, তাদের পাশে গিয়ে বসলেন। তারা বললো : হে মুহাম্মদ! কিছু জরুরি কথা বলার জন্য আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। শোন! আল্লাহ্র কসম! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছো। তুমি এমন কাজ করছো, যা আর কোনো আরব করেনি। তুমি আমাদের বাপ-দাদার ধর্মের সমালোচনা করছো, আমাদের উপাসকদের নিন্দা করছো, আমাদের জ্ঞানীদের বোকা বানাচ্ছো এবং আমাদের জাতির ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছো। এখন কথা হলো, আমাদের কাছে বলো, এসব কথাবার্তা ও কাজকর্মের পিছনে তোমার আসল উদ্দেশ্যটা কী?
এর দ্বারা যদি তুমি অর্থসম্পদ অর্জন করতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে এতো অর্থসম্পত্তি সংগ্রহ করে দেবো যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিত্তশালী হবে। আর একাজের মাধ্যমে যদি তুমি সর্দার হতে চাও, তবে আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের সর্দার বানিয়ে দেবো। কিংবা তুমি যদি রাজত্ব চাও, তাহলেও আমরা রাজি। আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে নেবো। আর যদি ব্যাপার এমন হয়ে থাকে যে, তোমার কাছে যে দূত আসে, সে প্রভাবশালী জিন-ভূত, তাও বলো, যতো অর্থ লোক লাগে আমরা তোমাকে চিকিৎসা করাবো এবং সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলবো, যেনো তোমার ব্যাপারে জনগণের কাছে আমাদের কোনো জবাবদিহি করতে না হয়।
তাদের বক্তব্য শুনার পর বিশ্ব মানবতার নেতা অত্যন্ত শান্ত স্বরে জবাব দিলেন :
“তোমরা যা কিছু আমাকে অফার দিলে এর কোনো কিছুই আমি চাই না। আমি যে মহান আদর্শের দিকে তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি, তার উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে অর্থ সম্পদ, কিংবা নেতৃত্ব চাই, অথবা রাজা-বাদশা হতে চাই। এগুলো কিছুই আমার উদ্দেশ্য নয়। আমাকে মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি আমার প্রতি তাঁর বাণী (আল কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। এতে তিনি আমাকে মানুষের জন্যে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হবার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী আমি তোমাদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দিয়েছি, তোমাদের সদুপদেশ দিয়েছি। এখন তোমরা যদি আমার এই দাওয়াত গ্রহণ করে নাও, তবে সেটা তোমাদেরই ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনবে। আর যদি তোমরা এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করো, তবে তোমাদের ও আল্লাহ্র চূড়ান্ত ফয়সালা আসা পর্যন্ত আমি দৃঢ়তার সাথে আমার কাজে অটল থাকবো এবং তোমাদের সব আচরণ সয়ে যাবো।”
এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে থেকে একে একে কতোটা অলৌকিক ও অবাস্তব দাবি-দাওয়া পেশ করে।
এর জবাবে তিনি তাদের বলেন : আমি এসব ব্যাপার নিয়ে তোমাদের কাছে আসিনি। এগুলো সম্পূর্ণ আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। আল্লাহ্ আমাকে যে বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। এ আহ্বান গ্রহণ করলেই তোমাদের সমস্ত সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে যাবে।
ইবনে ইসহাক বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সা.-কে কোনো প্রকারে তাঁর মহান মিশন থেকে নিবৃত্ত করতে না পেরে কুরাইশরা তাঁকে এবং তার গোত্রকে বয়কট করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00