📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও নয়

📄 ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও নয়


ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক এবং ইবনে হিশামসহ বহুসংখ্যক ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ না করলেও তাঁকে কাজীর সহযোগিতা করে আসছিলেন। কুরাইশদের আক্রমণ থেকে তিনি তাঁকে রক্ষা করতেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়াতেন। কুরাইশরা এসে আবু তালিবের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতো এবং তাঁর কঠোর সমালোচনা করে তাঁর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার অনুরোধ করতো।

কিন্তু আবু তালিব তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে বিদায় দিতেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর দাওয়াত ও প্রচার কাজ যথারীতি চালিয়ে যেতেন। ফলে কুরাইশদের বিদ্বেষ ও আক্রোশ দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে। অবশেষে তারা রাসূল সা. কে হত্যা করতেও উদ্যত হয়।

কুরাইশরা আবারো আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হয়। তারা তাঁকে বলে : হে আবু তালিব! আপনি আমাদের প্রধান ও মুরব্বী। আমরা আপনাকে নেতা ও আমাদের অন্যায়ের প্রধান স্তম্ভ মনে করি। আপনি আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু এখন আপনিই আমাদের বিরুদ্ধে আপনার ভাতিজাকে পক্ষ থেকে বিরত রাখুন। নতুবা আমরা আপনার ও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের অবতীর্ণ হবো। এ যুদ্ধ আমাদের যতোক্ষণ না এক পক্ষ ধ্বংস হয়ে যায়।

আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সা.-কে ডেকে পাঠান। তিনি এসে আবু তালিব বললেন : ভাতিজা! তোমার কওমের লোকেরা আমার কাছে এই এই কথা বলেছে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যা যা বলেছিল, তিনি সবই তাঁকে খুলে বলার পর বললেন : অবস্থা যখন এতোটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তুমি নিজেকে এবং আমাকে সামাল দিয়ে চলো। আমার সাধ্যাতীত কোনো কিছু আমার উপর চাপিয়ে দিও না।

চাচার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. ভাবলেন, কুরাইশ নেতারা হয়তো চাচার মতও পাল্টে দিতে চলেছে। তিনি এখন হয়তো কুরাইশদের মোকাবিলায় তাঁকে একা ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন এবং তাঁর সহযোগিতা করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তাই বিশ্বস্ত চাচাকে লক্ষ্য করে বলে দিলেন :
“চাচা, আল্লাহ্র কসম! এরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় এবং তার বিনিময়ে আমাকে একাজ থেকে বিরত থাকতে বলে, তবু আমি একাজ ত্যাগ করবো না, যতোদিন না আল্লাহ্ তাঁর দীনকে বিজয়ী করেন, কিংবা এ কাজ করতে করতে আমার মৃত্যু হয়।”

এই কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর দু'চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তাঁর দু'গাল বেয়ে। অতঃপর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং নীরবে ফিরে চলেন।

কয়েক কদম যেতে না যেতেই আবু তালিব তাঁকে ডেকে কাছে আনলেন। বললেন : ভাতিজা! ঠিক আছে তুমি যা কাজ করছো, করে যাও। আমি কিছুতেই তোমাকে ওদের হাতে সমর্পণ করবো না।

📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 কোনো কিছুর বিনিময়েই আদর্শ ত্যাগ করা যায় না

📄 কোনো কিছুর বিনিময়েই আদর্শ ত্যাগ করা যায় না


ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, একবার কুরাইশদের প্রধান নেতা উতবা ইবনে রবীয়া রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে তাঁর পাশে বসলো। সে পাশে বসে অত্যন্ত সুকৌশলে মন ভোলানো ভাষায় রাসূল সা.কে বললো : তুমি আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় অশান্তি ও মর্যাদাহানিকর, তাতে তুমিই জানো।
তুমি একটা মারাত্মক জিনিস নিয়ে আমাদের জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছো। তুমি আমাদের সবাইকে বোকা প্রতিপন্ন করেছো। আমাদের পূর্ব পুরুষদের হেয় করেছো। তবে এখন আমার কথা শুনো। আমি তোমার কাছে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। ভেবে দেখো, এখন থেকে কোনো না কোনো প্রস্তাব মেনে নিতে পারো কিনা?
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : বেশ বলুন, আমি শুনছি। উতবা বললো : ভাতিজা! তুমি যে নতুন জিনিসের দিকে আমাদেরকে ডাকছো, তার উদ্দেশ্য যদি হয় বিপুল অর্থসম্পদ লাভ করা, তবে আমরা অর্থ সংগ্রহ করে তোমাকে আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় সম্পদশালী বানিয়ে দেবো এবং এর বিনিময়ে তুমি তোমার এ কাজ ত্যাগ করো।
কিংবা তোমার এ কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় নেতা হওয়া, তবে একাজ ত্যাগ করো, আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের নেতা হিসেবে স্বীকার করে নেবো এবং তোমাকে বাদ দিয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবো না।
আর যদি ব্যাপারটা এমন হয়ে থাকে যে, জিন পেয়ে বসেছে এবং তুমি সে জিন তাড়াতে পারছো না, তবে আমরা তোমার চিকিৎসা করাবো। যতো অর্থকড়িই খরচ হোক, আমরা তা করবো এবং তোমাকে সুস্থ করে তুলবো। কেননা অনেক জিন এমন হয়ে থাকে, যা মানুষকে প্রবলভাবে পেয়ে বসে। সে জিন তাড়াবার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
-এ পর্যন্ত বলার পর উতবা থামলো।
রাসূলুল্লাহ সা. মনোযোগ দিয়ে নিরবে তার কথা শুনছিলেন। সে থামলে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে আবুল ওলীদ! আপনার কথা কি শেষ হয়েছে? সে বললো, হ্যাঁ।
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তবে এবার আমার কিছু কথা শুনুন। উতবা বললো, হ্যাঁ, তোমার কথা বলো।
রাসূলুল্লাহ সা. ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলে সূরা হামীম আস্ সাজদা থেকে তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন : “হামীম। এটি রহমানুর রহীমের নিকট থেকে অবতীর্ণ কিতাব। এ কিতাবের আয়াতসমূহ একেবারেই স্পষ্ট-পরিষ্কার। (তোমাদেরই মাতৃভাষা) আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে এ কুরআন। যারা জ্ঞান বুদ্ধি রাখে, তাদের জন্য এ কিতাব সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই তারা শুনতে পায় না।…।
তিলাওয়াত করতে করতে সাজদার আয়াতে এসে তিনি সাজদা করলেন। উতবা দুই হাত পিছনের দিকে মাটিতে ঠেস দিয়ে মনোযোগ সহকারে শুনছিল। রাসূলুল্লাহ সা. সাজদা থেকে মাথা উঠিয়ে তাকে বললেন : হে আবুল ওলীদ পিতা! আমার জবাব নিশ্চয়ই আপনি পেয়ে গেছেন। এখন যা ইচ্ছে করতে পারেন।
উতবা উঠে কুরাইশদের আড্ডার দিকে অগ্রসর হলো। তারা দূর থেকেই উতবাকে দেখে বললো, আল্লাহ্র কসম উতবার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সে যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিল এটা সেই চেহারা নয়। অতঃপর সে এসে বসলে তারা জিজ্ঞেস করলো, কী শুনে এলে?
উতবা বললো, আল্লাহ্র কসম, আমি এমন কথা শুনেছি যা এর আগে কখনো শুনিনি। আল্লাহ্র কসম এটা কবিতা নয়, যাদুও নয়, জ্যোতিষীর কথাও নয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এ বাণী সফল হবেই। তোমরা ওর ব্যাপারটা ওপর ছেড়ে দাও। সে যা করতে চায় করতে দাও।
আরবরা যদি তার বিজয়ী হয়, তবে তোমরা নিজেদের ভাইয়ের উপর হাত উঠানো থেকে বেঁচে গেলে। আর যদি সে বিজয়ী হয় তবে তার রাজত্ব তো তোমাদেরই রাজত্ব এবং তার সম্মান-মর্যাদাতে তোমদেরই সম্মান মর্যাদা।

📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 আদর্শ প্রতিষ্ঠার দুর্জয় অংগীকার

📄 আদর্শ প্রতিষ্ঠার দুর্জয় অংগীকার


ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন। হাজারো অত্যাচার নির্যাতনের পরও যখন পুরুষ ও নারীদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটতে লাগলো, তখন ইসলামের প্রতিপক্ষ দিশেহারা হয়ে উঠলো। এমনি পরিস্থিতিতে এক সন্ধ্যায় কুরাইশদের সব শাখার সর্দাররা কা'বার চত্বরে এসে সমবেত হয়।
সেখানে উপস্থিত কুরাইশ সর্দাররা ছিলো : উতবা, শাইবা, আবু সুফিয়ান, নাদার, আবুল বুখতরী, আসওয়াদ, আ'স বিন ওয়াইল, যুবাইর, মুনাব্বিহ এবং উমাইয়া বিন খালফ। এই সর্দাররা পরামর্শ করে ঠিক করলো, মুহাম্মাদকে এখানে ডেকে এনে তাঁর সাথে কথা বলা হবে এবং তাঁকে তার কাছে অসম্ভব দাবি দাওয়া পেশ করা হবে। তারা বললো, এমনটি করা হলে জনগণ মুহাম্মাদকে দোষ দেবে এবং আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে।
ফয়সালা অনুযায়ী করীম সা.-কে ডেকে আনার জন্য একজনকে পাঠানো হলো। সেই দূত গিয়ে তাঁকে বললো : কুরাইশ সর্দারগণ কা'বার চত্বরে সমবেত হয়েছেন। তারা আপনার সাথে কথা বলতে চান। আমার সাথে তাদের কাছে চলুন।
একথা শুনা মাত্র রাসূলুল্লাহ সা. তাদের দিকে ছুটে চললেন। তিনি ভাবলেন, তিনি তাদেরকে যে মহান আদর্শের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তারা হয়তো সে ব্যাপারে পদ্ধতির চিন্তা ভাবনা করছে। তাদের গোঁড়ামি এবং অত্যাচার নির্যাতনের যদিও তিনি খুবই ব্যথিত ছিলেন, কিন্তু তিনি সব সময়ই আন্তরিকভাবে কামনা করতেন, তারা সঠিক পথে আসুক। এখন সেই আশা নিয়েই তাদের আহ্বানে ছুটে চললেন। তিনি জানেন না তারা কি ষড়যন্ত্র এঁটে তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছে।
অবশেষে তিনি তাদের কাছে পৌঁছুলেন, তাদের পাশে গিয়ে বসলেন। তারা বললো : হে মুহাম্মদ! কিছু জরুরি কথা বলার জন্য আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। শোন! আল্লাহ্র কসম! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছো। তুমি এমন কাজ করছো, যা আর কোনো আরব করেনি। তুমি আমাদের বাপ-দাদার ধর্মের সমালোচনা করছো, আমাদের উপাসকদের নিন্দা করছো, আমাদের জ্ঞানীদের বোকা বানাচ্ছো এবং আমাদের জাতির ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছো। এখন কথা হলো, আমাদের কাছে বলো, এসব কথাবার্তা ও কাজকর্মের পিছনে তোমার আসল উদ্দেশ্যটা কী?
এর দ্বারা যদি তুমি অর্থসম্পদ অর্জন করতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে এতো অর্থসম্পত্তি সংগ্রহ করে দেবো যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিত্তশালী হবে। আর একাজের মাধ্যমে যদি তুমি সর্দার হতে চাও, তবে আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের সর্দার বানিয়ে দেবো। কিংবা তুমি যদি রাজত্ব চাও, তাহলেও আমরা রাজি। আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে নেবো। আর যদি ব্যাপার এমন হয়ে থাকে যে, তোমার কাছে যে দূত আসে, সে প্রভাবশালী জিন-ভূত, তাও বলো, যতো অর্থ লোক লাগে আমরা তোমাকে চিকিৎসা করাবো এবং সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলবো, যেনো তোমার ব্যাপারে জনগণের কাছে আমাদের কোনো জবাবদিহি করতে না হয়।
তাদের বক্তব্য শুনার পর বিশ্ব মানবতার নেতা অত্যন্ত শান্ত স্বরে জবাব দিলেন :
“তোমরা যা কিছু আমাকে অফার দিলে এর কোনো কিছুই আমি চাই না। আমি যে মহান আদর্শের দিকে তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি, তার উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে অর্থ সম্পদ, কিংবা নেতৃত্ব চাই, অথবা রাজা-বাদশা হতে চাই। এগুলো কিছুই আমার উদ্দেশ্য নয়। আমাকে মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি আমার প্রতি তাঁর বাণী (আল কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। এতে তিনি আমাকে মানুষের জন্যে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হবার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী আমি তোমাদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দিয়েছি, তোমাদের সদুপদেশ দিয়েছি। এখন তোমরা যদি আমার এই দাওয়াত গ্রহণ করে নাও, তবে সেটা তোমাদেরই ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনবে। আর যদি তোমরা এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করো, তবে তোমাদের ও আল্লাহ্র চূড়ান্ত ফয়সালা আসা পর্যন্ত আমি দৃঢ়তার সাথে আমার কাজে অটল থাকবো এবং তোমাদের সব আচরণ সয়ে যাবো।”
এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে থেকে একে একে কতোটা অলৌকিক ও অবাস্তব দাবি-দাওয়া পেশ করে।
এর জবাবে তিনি তাদের বলেন : আমি এসব ব্যাপার নিয়ে তোমাদের কাছে আসিনি। এগুলো সম্পূর্ণ আল্লাহ্র ইচ্ছাধীন। আল্লাহ্ আমাকে যে বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। এ আহ্বান গ্রহণ করলেই তোমাদের সমস্ত সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে যাবে।
ইবনে ইসহাক বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সা.-কে কোনো প্রকারে তাঁর মহান মিশন থেকে নিবৃত্ত করতে না পেরে কুরাইশরা তাঁকে এবং তার গোত্রকে বয়কট করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00