📄 শয়তানের নোংরা অট্টহাসি
সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. একদিন কা'বার হেরেমে নামায পড়ছিলেন। সেখানে অনতিদূরেই কুরাইশ নেতারা বসে গল্প করছিলো। আবু জাহেল বললো : মুহাম্মদ সাজদায় গেলে যদি উটের নাড়ীভুঁড়ি এনে তার উপরে ফেলে চাপ দিয়ে রাখতো, তবে কী মজাই না হতো।’-একথা শুনে উকবা ইবনে আবু মুয়ীত বললো : এ কাজ আমি করতে পারবো।
অতঃপর উকবা দৌঁড়ে গিয়ে উটের নাড়ীভুঁড়ি এনে সাজদারত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সা.-এর ঘাড়ের উপর ফেলে রাখলো। তিনি মাথা উঠাতে পারছিলেন না। পার্শ্বে ছিলো কিন্তু ভয়ে উম্মে মাখযুম দৌড়ে পারছিলেন না।
খবর শুনে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কন্যা ফাতিমা দৌঁড়ে এলেন। বহু কষ্টে পিতার ঘাড়ের উপর থেকে নাড়ীভুঁড়ি সরিয়ে দিলেন। এ সময় শিশু ফাতিমা উকবাকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন।
📄 গলায় চাদর পেঁচিয়ে মারার চেষ্টা
ইমাম বুখারি, ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, একদিন কুরাইশ সর্দাররা কা'বার চত্বরে বসে ছিলো। এমনি সময় রাসূল আকরাম সা. হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হন। তারা তাঁকে দেখেই তাঁর উপর হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তখনকার কিশোর আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আ'স রা. বলেন, আমি দেখলাম, তাদের একজন (অর্থাৎ- উকবা ইবনে আবু মুয়ীত) রাসূলুল্লাহ সা. কে তাঁর গলার উপরে ঝুলে থাকা চাদর দু'পাশ ধরে টেনে ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করছিলো। ঠিক সে মুহূর্তে আবু বকর সেখানে দৌড়ে এলেন। তিনি উকবাকে প্রতিহত করলেন এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর গলায় ফাঁস খুলতে খুলতে বললেন : “আল্লাহ্ আমার প্রভু -একথাটি বলার কারণে কি তোমরা একজন লোককে হত্যা করবে?”
আবদুল্লাহ্ বলেন, তখন পাপিষ্ঠরা সেখানে থেকে চলে গেলো। তিনি আরো বলেন, সেদিন আমি রাসূলুল্লাহ সা.-এর উপর কুরাইশদের যে রকম মারাত্মক আক্রমণ দেখেছি, সেরকম আর কখনো দেখিনি।
📄 ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও নয়
ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক এবং ইবনে হিশামসহ বহুসংখ্যক ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ না করলেও তাঁকে কাজীর সহযোগিতা করে আসছিলেন। কুরাইশদের আক্রমণ থেকে তিনি তাঁকে রক্ষা করতেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়াতেন। কুরাইশরা এসে আবু তালিবের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতো এবং তাঁর কঠোর সমালোচনা করে তাঁর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার অনুরোধ করতো।
কিন্তু আবু তালিব তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে বিদায় দিতেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর দাওয়াত ও প্রচার কাজ যথারীতি চালিয়ে যেতেন। ফলে কুরাইশদের বিদ্বেষ ও আক্রোশ দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে। অবশেষে তারা রাসূল সা. কে হত্যা করতেও উদ্যত হয়।
কুরাইশরা আবারো আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হয়। তারা তাঁকে বলে : হে আবু তালিব! আপনি আমাদের প্রধান ও মুরব্বী। আমরা আপনাকে নেতা ও আমাদের অন্যায়ের প্রধান স্তম্ভ মনে করি। আপনি আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু এখন আপনিই আমাদের বিরুদ্ধে আপনার ভাতিজাকে পক্ষ থেকে বিরত রাখুন। নতুবা আমরা আপনার ও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের অবতীর্ণ হবো। এ যুদ্ধ আমাদের যতোক্ষণ না এক পক্ষ ধ্বংস হয়ে যায়।
আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সা.-কে ডেকে পাঠান। তিনি এসে আবু তালিব বললেন : ভাতিজা! তোমার কওমের লোকেরা আমার কাছে এই এই কথা বলেছে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যা যা বলেছিল, তিনি সবই তাঁকে খুলে বলার পর বললেন : অবস্থা যখন এতোটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তুমি নিজেকে এবং আমাকে সামাল দিয়ে চলো। আমার সাধ্যাতীত কোনো কিছু আমার উপর চাপিয়ে দিও না।
চাচার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. ভাবলেন, কুরাইশ নেতারা হয়তো চাচার মতও পাল্টে দিতে চলেছে। তিনি এখন হয়তো কুরাইশদের মোকাবিলায় তাঁকে একা ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন এবং তাঁর সহযোগিতা করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। তাই বিশ্বস্ত চাচাকে লক্ষ্য করে বলে দিলেন :
“চাচা, আল্লাহ্র কসম! এরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় এবং তার বিনিময়ে আমাকে একাজ থেকে বিরত থাকতে বলে, তবু আমি একাজ ত্যাগ করবো না, যতোদিন না আল্লাহ্ তাঁর দীনকে বিজয়ী করেন, কিংবা এ কাজ করতে করতে আমার মৃত্যু হয়।”
এই কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহ সা.-এর দু'চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তাঁর দু'গাল বেয়ে। অতঃপর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং নীরবে ফিরে চলেন।
কয়েক কদম যেতে না যেতেই আবু তালিব তাঁকে ডেকে কাছে আনলেন। বললেন : ভাতিজা! ঠিক আছে তুমি যা কাজ করছো, করে যাও। আমি কিছুতেই তোমাকে ওদের হাতে সমর্পণ করবো না।
📄 কোনো কিছুর বিনিময়েই আদর্শ ত্যাগ করা যায় না
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন, একবার কুরাইশদের প্রধান নেতা উতবা ইবনে রবীয়া রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে তাঁর পাশে বসলো। সে পাশে বসে অত্যন্ত সুকৌশলে মন ভোলানো ভাষায় রাসূল সা.কে বললো : তুমি আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় অশান্তি ও মর্যাদাহানিকর, তাতে তুমিই জানো।
তুমি একটা মারাত্মক জিনিস নিয়ে আমাদের জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছো। তুমি আমাদের সবাইকে বোকা প্রতিপন্ন করেছো। আমাদের পূর্ব পুরুষদের হেয় করেছো। তবে এখন আমার কথা শুনো। আমি তোমার কাছে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। ভেবে দেখো, এখন থেকে কোনো না কোনো প্রস্তাব মেনে নিতে পারো কিনা?
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : বেশ বলুন, আমি শুনছি। উতবা বললো : ভাতিজা! তুমি যে নতুন জিনিসের দিকে আমাদেরকে ডাকছো, তার উদ্দেশ্য যদি হয় বিপুল অর্থসম্পদ লাভ করা, তবে আমরা অর্থ সংগ্রহ করে তোমাকে আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় সম্পদশালী বানিয়ে দেবো এবং এর বিনিময়ে তুমি তোমার এ কাজ ত্যাগ করো।
কিংবা তোমার এ কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় নেতা হওয়া, তবে একাজ ত্যাগ করো, আমরা সবাই মিলে তোমাকে আমাদের নেতা হিসেবে স্বীকার করে নেবো এবং তোমাকে বাদ দিয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্তই গ্রহণ করবো না।
আর যদি ব্যাপারটা এমন হয়ে থাকে যে, জিন পেয়ে বসেছে এবং তুমি সে জিন তাড়াতে পারছো না, তবে আমরা তোমার চিকিৎসা করাবো। যতো অর্থকড়িই খরচ হোক, আমরা তা করবো এবং তোমাকে সুস্থ করে তুলবো। কেননা অনেক জিন এমন হয়ে থাকে, যা মানুষকে প্রবলভাবে পেয়ে বসে। সে জিন তাড়াবার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
-এ পর্যন্ত বলার পর উতবা থামলো।
রাসূলুল্লাহ সা. মনোযোগ দিয়ে নিরবে তার কথা শুনছিলেন। সে থামলে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হে আবুল ওলীদ! আপনার কথা কি শেষ হয়েছে? সে বললো, হ্যাঁ।
রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তবে এবার আমার কিছু কথা শুনুন। উতবা বললো, হ্যাঁ, তোমার কথা বলো।
রাসূলুল্লাহ সা. ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলে সূরা হামীম আস্ সাজদা থেকে তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন : “হামীম। এটি রহমানুর রহীমের নিকট থেকে অবতীর্ণ কিতাব। এ কিতাবের আয়াতসমূহ একেবারেই স্পষ্ট-পরিষ্কার। (তোমাদেরই মাতৃভাষা) আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে এ কুরআন। যারা জ্ঞান বুদ্ধি রাখে, তাদের জন্য এ কিতাব সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই তারা শুনতে পায় না।…।
তিলাওয়াত করতে করতে সাজদার আয়াতে এসে তিনি সাজদা করলেন। উতবা দুই হাত পিছনের দিকে মাটিতে ঠেস দিয়ে মনোযোগ সহকারে শুনছিল। রাসূলুল্লাহ সা. সাজদা থেকে মাথা উঠিয়ে তাকে বললেন : হে আবুল ওলীদ পিতা! আমার জবাব নিশ্চয়ই আপনি পেয়ে গেছেন। এখন যা ইচ্ছে করতে পারেন।
উতবা উঠে কুরাইশদের আড্ডার দিকে অগ্রসর হলো। তারা দূর থেকেই উতবাকে দেখে বললো, আল্লাহ্র কসম উতবার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সে যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিল এটা সেই চেহারা নয়। অতঃপর সে এসে বসলে তারা জিজ্ঞেস করলো, কী শুনে এলে?
উতবা বললো, আল্লাহ্র কসম, আমি এমন কথা শুনেছি যা এর আগে কখনো শুনিনি। আল্লাহ্র কসম এটা কবিতা নয়, যাদুও নয়, জ্যোতিষীর কথাও নয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এ বাণী সফল হবেই। তোমরা ওর ব্যাপারটা ওপর ছেড়ে দাও। সে যা করতে চায় করতে দাও।
আরবরা যদি তার বিজয়ী হয়, তবে তোমরা নিজেদের ভাইয়ের উপর হাত উঠানো থেকে বেঁচে গেলে। আর যদি সে বিজয়ী হয় তবে তার রাজত্ব তো তোমাদেরই রাজত্ব এবং তার সম্মান-মর্যাদাতে তোমদেরই সম্মান মর্যাদা।