📄 মদিনা সনদের অন্তরভুক্ত জনগোষ্ঠী
হিজরতের পর রাসূল সা. ধারাবাহিক দু’বার মসজিদ নির্মাণ, মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা, মদিনা সনদ সম্পাদন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন কার্য সম্পন্ন করেন। এই কাজগুলো হিজরতের পর একেবারে প্রথম দিকেই এবং প্রথম বছরে সম্পাদিত হয়।
ঐতিহাসিক হিসাব মতে রাসূল সা. মক্কা থেকে হিজরত করে ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে মদিনায় পদার্পণ করেন। এটি ছিলো ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর। অবশ্য মতান্তরে ২২ অথবা ২৪ ফেব্রুয়ারি ৬২৩ খ্রিস্টাব্দ।
এই মদিনা সনদ প্রণীত হওয়ার প্রথম দিকে অথবা হিজরতের ৬২২ খ্রিস্টাব্দে অথবা ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে।
রাসূলুল্লাহ সা. যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসেন, তখন মদিনায় মোটামোটিভাবে দু'প্রকার জনগোষ্ঠী বর্তমান ছিল:
১. মদিনার অধিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী।
২. হিজরত করে আসা কুরাইশ, আনসার এবং অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠী।
৩. ইহুদি জনগোষ্ঠী। এরা কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত ছিল।
৪. মদিনার আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী। (তবে হিজরতের আগে থেকে আবূ আবদুল্লাহ্ ইবন আবূ হাসামার বর্ণনামতে উমরের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হিজরতের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল এবং হিজরতের পরে মদিনায় আসে।)
রাসূলুল্লাহ সা. এই সকল জনগোষ্ঠী নিয়ে মদিনাকে মদিনা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেন।
এই চুক্তিতে মদিনার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখিত চুক্তিতে মদিনায় আসার কারণে এটি মূলত একটি চুক্তি। মদিনায় আসতে ইচ্ছুক মুসলিমদেরকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে : এ চুক্তিতে মদিনায় আসতে ইচ্ছুক মুসলিমদেরকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
১. কুরাইশ এবং ইয়াসরিফার (মদিনার) মুসলিম-মুসলিম জনগোষ্ঠী।
২. যারা তাদের অনুসারী (অর্থাৎ মুসলিম) হয়ে মদিনায় আসবে-তারা।
৩. যারা তাদের সাথে যোগ দেবে (যেমন: মুসলিমরা)।
৪. এবং মুসলিমদের সাথে যুক্ত হবে (যেমন: মুসলিমরা)।
এই সনদ ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপক। উপরোক্ত জনগোষ্ঠী এই দলিলের স্বীকৃতি প্রদান করে।
📄 সনদের কর্তৃত্ব ও অভিভাবকত্ব
মদিনা সনদ মূলত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. -এর দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব প্রমাণ ও জারি করা হয়েছিল। এই চুক্তিতে এটিকে কিতাবুন নবী বা নবী সা.-এর কিতাব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সনদে আল্লাহ্ সর্বোত্তম এবং একক মালিক বলে স্বীকার করা হয়েছে।
এই সনদে মুহাম্মদ সা. আল্লাহ্ নবী ও রাসূল এবং আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শাসক, সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ও কর্তৃত্বের অধিকারী বলে স্বীকার করা হয়েছে।
মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. এই সনদের অন্তর্ভুক্ত জনগোষ্ঠী এবং এই সনদের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং তাকে একক নেতা হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে।
📄 নাগরিক অধিকার
এই সনদে মূলত কুরাইশ ও মদিনার মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের সকলকেই নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার, নিজস্ব বিশ্বাস ও জীবন ধারণের স্বাধীনতা, শান্তি ও সহযোগিতা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অধিকার, সম্পত্তি অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা ইত্যাদি সবই নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ধরনের সকল নাগরিককে মদিনার নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে।
এই সনদে মদিনার অধিবাসীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে এবং তাদের মধ্যে কোনো প্রকারের বিভেদ সৃষ্টি হবে না। তারা আল্লাহর কাছে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে।
এই সনদে মুসলিমরা, ইহুদিরা এবং অন্যান্য সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
১. ইবন ইসহাকের সীরাতে ইবন হিশাম উল্লেখ করেছেন : নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন উসায়দ আন নাহহামসহ সকল মুসলমানকে এই সনদ প্রদান করা হয়।
📄 মদিনা সনদ (Charter of Madina)
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
০১. এটি একটি কিতাব (ফরমান/দলিল/সনদ/সংবিধান/চুক্তি)।
০২. এটি জারি করছেন নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
০৩. এটি জারি করা হলো কুরাইশ ও ইয়াসরিফের মুসলিম ও মুসলিমদের যারা ঈমান এনেছে তাদের মধ্যে (পরস্পর সম্পর্ক এবং অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের নির্দেশ)।
০৪. এটি তাদের অন্যায়কে প্রযোজ্য নয়, যারা ঈমান এনেছে তাদের অনুসারী হবে এবং তাদের সাথে মিলবে না।
০৫. এটি তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা তাদের সাথে (পক্ষে) অংশ নেবে।
০৬. আল্লাহ্ সকল মানুষের আশ্রয় হবে এবং আল্লাহ্ তাদের উপর দয়া করবেন।
০৭. কুরাইশ মুহাজিররা ইসলাম গ্রহণের সময় বিবাহ ও ফিদিয়া বিষয়ে তারা তাদের পুরনো নিয়ম অনুযায়ী চলবে। ইসলাম অনুযায়ী তারা তাদের বিবাহ ও ফিদিয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
০৮. বনূ আউফের সকল শাখা তাদের মধ্যে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।
০৯. বনূ সায়েদার সকল শাখা তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।
১০. বনূ হারিস তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।
১১. বনূ জুশাম তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।
১২. বনূ নাজ্জার তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।
১৩. বনূ আমর ইবন আউফ তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।
১৪. বনূ নাবীত তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদান করবে। তাদের প্রত্যেক উপগোত্র মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত নিয়ম ও সুবিচারের ভিত্তিতে ফিদিয়া এবং রক্তমূল্য প্রদান করবে।