📄 ভূমিকা
হিজরতের পর মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. আল্লাহ্র দেয়া জীবন-ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রবর্তনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ইসলাম প্রচারের প্রধান পদক্ষেপ সমূহের মধ্যে তাঁর প্রণীত মদিনা মানব ইতিহাসের এক অম্লান সোনালি স্মারক। মদিনা আগমনের পর পরই সম্পাদিত তাঁর প্রধান কার্যকরী কার্যক্রমের মধ্যে মদিনা সনদ প্রণয়ন অন্যতম।
মদিনা সনদ মূলত একটি চুক্তি। এর দ্বারা মুহাজির ও আনসারদের অলৌকিক অধিকার সংরক্ষণ এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিবরণ সম্পর্কিত এক অনন্য দলিল।
ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ কেউ সংক্ষিপ্ত আবার কেউ বিস্তারিত আকারে এ দলিলের বিবরণ উল্লেখ করেছেন।
ঐতিহাসিক এবং সমাজ বিজ্ঞানীরা এই দলিলের উপর ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা করেছেন। তাঁরা এ দলিলকে 'মদিনা সনদ' (Charter of Madina) বলে উল্লেখ করেছেন। মোটামোটিভাবে ইয়াত তাঁর 'মুহাম্মদ অ্যাট মদিনা' গ্রন্থে এই দলিলকে 'The Constitution of Madina' অর্থাৎ 'মদিনার সংবিধান' বলে উল্লেখ করেছেন। আসলে এটি ছিল মদিনা রাষ্ট্রের সংবিধান। এটি মাধ্যমে মদিনা রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
মূল দলিলে এটিকে ‘কিতাবুন নবী’ উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ- নবী মুহাম্মদ সা. কর্তৃক লিখিত সনদ বা দলিল।
টিকাঃ
১. অধ্যাপক এনায়েতুল্লাহ মাশরিকীর গবেষণা মতে, এই সনদ হিজরতের পূর্বে মদিনায় প্রণীত হয়।
📄 মদিনা সনদ কোন্ সালে প্রণীত হয়?
এই দলিল কবে সম্পাদিত হয়? কেউ কেউ বলেছেন বদর যুদ্ধের পরে এটি সম্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু এ বক্তব্য ঠিক নয়। ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশাম রচিত সীরাত গ্রন্থানুসারে হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ সা. যেসকল কাজ সম্পন্ন করেন এই দলিল প্রণয়নকে তার অন্যতম বলে গণ্য করা হয়েছে।
টিকাঃ
১. ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে এই সনদ হিজরতের পরে সম্পাদিত হয়।
📄 মদিনা সনদের অন্তরভুক্ত জনগোষ্ঠী
হিজরতের পর রাসূল সা. ধারাবাহিক দু’বার মসজিদ নির্মাণ, মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা, মদিনা সনদ সম্পাদন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন কার্য সম্পন্ন করেন। এই কাজগুলো হিজরতের পর একেবারে প্রথম দিকেই এবং প্রথম বছরে সম্পাদিত হয়।
ঐতিহাসিক হিসাব মতে রাসূল সা. মক্কা থেকে হিজরত করে ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে মদিনায় পদার্পণ করেন। এটি ছিলো ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর। অবশ্য মতান্তরে ২২ অথবা ২৪ ফেব্রুয়ারি ৬২৩ খ্রিস্টাব্দ।
এই মদিনা সনদ প্রণীত হওয়ার প্রথম দিকে অথবা হিজরতের ৬২২ খ্রিস্টাব্দে অথবা ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে।
রাসূলুল্লাহ সা. যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসেন, তখন মদিনায় মোটামোটিভাবে দু'প্রকার জনগোষ্ঠী বর্তমান ছিল:
১. মদিনার অধিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী।
২. হিজরত করে আসা কুরাইশ, আনসার এবং অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠী।
৩. ইহুদি জনগোষ্ঠী। এরা কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত ছিল।
৪. মদিনার আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী। (তবে হিজরতের আগে থেকে আবূ আবদুল্লাহ্ ইবন আবূ হাসামার বর্ণনামতে উমরের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হিজরতের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল এবং হিজরতের পরে মদিনায় আসে।)
রাসূলুল্লাহ সা. এই সকল জনগোষ্ঠী নিয়ে মদিনাকে মদিনা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেন।
এই চুক্তিতে মদিনার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখিত চুক্তিতে মদিনায় আসার কারণে এটি মূলত একটি চুক্তি। মদিনায় আসতে ইচ্ছুক মুসলিমদেরকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে : এ চুক্তিতে মদিনায় আসতে ইচ্ছুক মুসলিমদেরকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
১. কুরাইশ এবং ইয়াসরিফার (মদিনার) মুসলিম-মুসলিম জনগোষ্ঠী।
২. যারা তাদের অনুসারী (অর্থাৎ মুসলিম) হয়ে মদিনায় আসবে-তারা।
৩. যারা তাদের সাথে যোগ দেবে (যেমন: মুসলিমরা)।
৪. এবং মুসলিমদের সাথে যুক্ত হবে (যেমন: মুসলিমরা)।
এই সনদ ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপক। উপরোক্ত জনগোষ্ঠী এই দলিলের স্বীকৃতি প্রদান করে।
📄 সনদের কর্তৃত্ব ও অভিভাবকত্ব
মদিনা সনদ মূলত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. -এর দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব প্রমাণ ও জারি করা হয়েছিল। এই চুক্তিতে এটিকে কিতাবুন নবী বা নবী সা.-এর কিতাব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সনদে আল্লাহ্ সর্বোত্তম এবং একক মালিক বলে স্বীকার করা হয়েছে।
এই সনদে মুহাম্মদ সা. আল্লাহ্ নবী ও রাসূল এবং আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শাসক, সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ও কর্তৃত্বের অধিকারী বলে স্বীকার করা হয়েছে।
মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. এই সনদের অন্তর্ভুক্ত জনগোষ্ঠী এবং এই সনদের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং তাকে একক নেতা হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে।