📄 নেতা হিসেবে রসূলুল্লাহ সা.-এর আত্মগঠন পদ্ধতি
নেতা হিসেবে রসূলুল্লাহ সা.-এর আত্মগঠন পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত। তিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশাবলী অনুসরণ করতেন এবং নিজেকে একজন আদর্শ নেতা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করতেন। তাঁর আত্মগঠন পদ্ধতির প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:
১. আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য:
রসূলুল্লাহ সা. তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করতেন। তিনি জানতেন যে, তাঁর সকল সফলতা আল্লাহ্ তা’আলার সাহায্য ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। তিনি সর্বদা আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশাবলী অনুসরণ করতেন এবং তাঁর উপরই নির্ভর করতেন।
২. কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ:
তিনি কুরআন ও সুন্নাহকে তাঁর জীবনের প্রধান পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কুরআনের আয়াতসমূহ গভীরভাবে অনুধাবন করতেন এবং সুন্নাহর প্রতিটি দিক অনুসরণ করতেন। তিনি জানতেন যে, কুরআন ও সুন্নাহই মানবজাতির জন্য একমাত্র সঠিক পথ।
৩. ইবাদত ও যিকির:
তিনি নিয়মিতভাবে নামায, রোযা, যাকাত এবং অন্যান্য ইবাদত পালন করতেন। তিনি আল্লাহ্ তা’আলার যিকির ও তাসবীহ্ করতেন এবং তাঁর কাছে সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। ইবাদত ও যিকির তাঁর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করত এবং তাঁকে মানসিক শান্তি ও শক্তি প্রদান করত।
৪. জ্ঞান অর্জন:
তিনি জ্ঞান অর্জনের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং সর্বদা নতুন জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতেন। তিনি সাহাবীদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করতেন এবং তাঁদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতেন।
৫. চারিত্রিক গুণাবলী:
তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ, ক্ষমাশীল, উদার, বিনয়ী, সাহসী, দৃঢ়চেতা, দয়ালু এবং সহানুভূতিশীল। তিনি তাঁর সকল চারিত্রিক গুণাবলীকে উন্নত করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করতেন।
৬. আত্মপর্যালোচনা:
তিনি নিয়মিতভাবে আত্মপর্যালোচনা করতেন এবং নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করতেন। তিনি জানতেন যে, আত্মপর্যালোচনা একজন নেতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. পরামর্শ:
তিনি তাঁর সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি জানতেন যে, পরামর্শ একজন নেতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৮. আত্মত্যাগ:
তিনি তাঁর সকল ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে দ্বীনের জন্য কাজ করতেন। তিনি তাঁর জীবন, সম্পদ এবং সময় সবকিছুই আল্লাহ্ তা’আলার পথে উৎসর্গ করেছিলেন।
৯. ধৈর্য ও সহনশীলতা:
তিনি তাঁর দাওয়াতী কাজ ও নেতৃত্বের পথে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো ধৈর্য হারাননি, বরং অত্যন্ত সহনশীলতার সাথে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছিলেন।
১০. দৃঢ় সংকল্প:
তিনি তাঁর লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। তিনি কখনো তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি এবং সর্বদা তাঁর লক্ষ্য অর্জনের জন্য চেষ্টা করতেন।
এই সকল আত্মগঠন পদ্ধতির কারণে রসূলুল্লাহ সা. একজন আদর্শ নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্ব সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
📄 রসূলুল্লাহ সা. পরিচালিত আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য
রসূলুল্লাহ সা. পরিচালিত আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল অনন্য এবং মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনকারী। তাঁর আন্দোলন শুধু একটি ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, যা মানবজাতির সকল দিক ও বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তাঁর আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
১. তাওহীদভিত্তিক আন্দোলন:
রসূলুল্লাহ সা. এর আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল তাওহীদ, অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলার একত্ববাদ। তিনি মানুষকে শিরক ও কুফরীর অন্ধকার থেকে বের করে একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর আন্দোলন ছিল সকল প্রকার মূর্তি পূজা, কুসংস্কার এবং মিথ্যা উপাসনার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
২. পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা:
তাঁর আন্দোলন শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামরিক এবং অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশাবলী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর আন্দোলন মানবজাতির সকল সমস্যার সমাধান দিয়েছিল।
৩. ন্যায় ও ইনসাফ:
রসূলুল্লাহ সা. এর আন্দোলন ছিল ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তিনি সকল মানুষের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন, এমনকি তাঁর শত্রুদের প্রতিও। তিনি কখনো কারো প্রতি অবিচার করেননি এবং সর্বদা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে সকল মানুষ সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করত।
৪. সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব:
তাঁর আন্দোলন ছিল সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। তিনি বর্ণ, গোত্র, ভাষা এবং সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে সকল প্রকার ভেদাভেদ দূর করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, সকল মানুষ সমান এবং তাদের মধ্যে একমাত্র শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া (আল্লাহ্ ভীতি)। তিনি মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেছিলেন এবং তাদেরকে এক উম্মাহ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
৫. নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়ন:
রসূলুল্লাহ সা. এর আন্দোলন নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দিয়েছিল। তিনি মানুষকে সৎ, সত্যবাদী, আমানতদার, ক্ষমাশীল, উদার, বিনয়ী, সাহসী, দৃঢ়চেতা, দয়ালু এবং সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর নিজের জীবনে এই সকল চারিত্রিক গুণাবলী প্রদর্শন করেছিলেন এবং সাহাবীদেরকেও এই সকল গুণাবলী অর্জনের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
৬. জ্ঞান ও শিক্ষা:
তাঁর আন্দোলন জ্ঞান ও শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়েছিল। তিনি মানুষকে জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করতেন এবং মদীনায় একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, জ্ঞান ও শিক্ষা মানবজাতির উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
৭. দাওয়াত ও তাবলীগ:
রসূলুল্লাহ সা. এর আন্দোলন ছিল দাওয়াত ও তাবলীগের আন্দোলন। তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার পথে আসার জন্য উৎসাহিত করতেন। তিনি তাঁর দাওয়াতী কাজ অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার সাথে পরিচালনা করতেন।
৮. জিহাদ ও আত্মরক্ষা:
তাঁর আন্দোলন জিহাদ ও আত্মরক্ষার আন্দোলনও ছিল। তিনি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন এবং মুসলিমদের আত্মরক্ষার জন্য সামরিক শক্তি গঠন করেছিলেন। তবে তাঁর জিহাদ ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।
৯. বিশ্বজনীনতা:
রসূলুল্লাহ সা. এর আন্দোলন ছিল বিশ্বজনীন। তিনি শুধু আরবদের জন্য প্রেরিত হননি, বরং তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর আন্দোলন সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য একটি আদর্শ জীবনব্যবস্থা উপস্থাপন করেছিল।
১০. বাস্তববাদী ও প্রয়োগিক:
তাঁর আন্দোলন ছিল বাস্তববাদী ও প্রয়োগিক। তিনি এমন কোনো আদর্শ বা নীতি উপস্থাপন করেননি, যা মানবজীবনে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তাঁর সকল শিক্ষা ও নির্দেশাবলী মানবজীবনে প্রয়োগযোগ্য ছিল।
এই সকল বৈশিষ্ট্য রসূলুল্লাহ সা. এর আন্দোলনকে মানব ইতিহাসের এক সফলতম আন্দোলনে পরিণত করেছে এবং তাঁর আন্দোলন আজও সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আছে।
📄 রসূলুল্লাহর নেতৃত্বসূলভ অসাধারণ গুণাবলী
রসূলুল্লাহ সা. এর নেতৃত্বসুলভ অসাধারণ গুণাবলী ছিল এমন যা তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর গুণাবলী শুধু তাঁর অনুসারীদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য নেতৃত্বসুলভ গুণাবলী নিম্নরূপ:
১. আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতা:
তিনি তাঁর সকল কাজে আল্লাহ্ তা’আলার উপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন এবং তাঁর উপরই নির্ভর করতেন। তিনি জানতেন যে, তাঁর সকল সফলতা আল্লাহ্ তা’আলার সাহায্য ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। এই আস্থা তাঁকে যেকোনো পরিস্থিতিতে অবিচল থাকতে সাহায্য করত।
২. দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা:
রসূলুল্লাহ সা. ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান। তিনি ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করতে পারতেন এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন। তাঁর সকল সিদ্ধান্ত ছিল বিচক্ষণতাপূর্ণ, যা তাঁর আন্দোলনের সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
৩. ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফ:
তিনি সকল মানুষের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন, এমনকি তাঁর শত্রুদের প্রতিও। তিনি কখনো কারো প্রতি অবিচার করেননি এবং সর্বদা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতেন। তাঁর এই গুণাবলী তাঁকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
৪. ধৈর্য ও সহনশীলতা:
তিনি তাঁর দাওয়াতী কাজ ও নেতৃত্বের পথে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো ধৈর্য হারাননি, বরং অত্যন্ত সহনশীলতার সাথে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছিলেন। তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতা অনুসারীদের জন্য অনুপ্রেরণা ছিল।
৫. ক্ষমা ও উদারতা:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও উদার। তিনি তাঁর শত্রুদেরকেও ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি মক্কাবাসীদের প্রতি যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন, তা তাঁর উদারতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৬. বিনয় ও নম্রতা:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি কখনো অহংকার করেননি এবং সর্বদা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যেতেন। তিনি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে করতেন না এবং সকলের সাথে সমানভাবে আচরণ করতেন।
৭. সাহস ও দৃঢ়তা:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও দৃঢ়চেতা। তিনি কখনো কোনো বিপদ বা চ্যালেঞ্জের মুখে ভয় পাননি, বরং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছিলেন। বদর, উহুদ, খন্দক এবং অন্যান্য যুদ্ধে তাঁর সাহস ও দৃঢ়তা প্রমাণিত হয়েছিল।
৮. দয়া ও সহানুভূতি:
তিনি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তিনি সকল মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন, বিশেষ করে দুর্বল, অসহায়, এতিম এবং বিধবাদের প্রতি। তাঁর দয়া ও সহানুভূতি তাঁকে সকলের প্রিয় করে তুলেছিল।
৯. পরামর্শ:
তিনি তাঁর সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি জানতেন যে, পরামর্শ একজন নেতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০. আত্মত্যাগ:
তিনি তাঁর সকল ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে দ্বীনের জন্য কাজ করতেন। তিনি তাঁর জীবন, সম্পদ এবং সময় সবকিছুই আল্লাহ্ তা’আলার পথে উৎসর্গ করেছিলেন।
১১. প্রতিশ্রুতি পালন:
তিনি তাঁর সকল প্রতিশ্রুতি কঠোরভাবে পালন করতেন। তিনি কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেননি এবং সর্বদা তাঁর কথার উপর অটল থাকতেন।
১২. নেতৃত্ব ও উদাহরণ:
তিনি শুধু নির্দেশ দিয়েই নেতৃত্ব দেননি, বরং তিনি তাঁর নিজের জীবনে সকল আদর্শ ও গুণাবলী প্রদর্শন করে অনুসারীদের জন্য উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। তিনি যা বলতেন, তা নিজেই করে দেখাতেন।
এই সকল অসাধারণ গুণাবলীর কারণে রসূলুল্লাহ সা. একজন আদর্শ নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্ব সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আছে।
📄 রসূলুল্লাহর সংগঠনের কয়েকটি মৌলনীতি
রসূলুল্লাহ সা. তাঁর পরিচালিত আন্দোলনকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিয়েছিলেন, যা তাঁর সফলতার অন্যতম কারণ ছিল। তাঁর সংগঠনের কয়েকটি মৌলনীতি ছিল নিম্নরূপ:
১. আল্লাহ্ তা’আলার সার্বভৌমত্ব:
রসূলুল্লাহ সা. এর সংগঠনের মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহ্ তা’আলার সার্বভৌমত্ব। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই সকল ক্ষমতার উৎস এবং তাঁর নির্দেশাবলীই চূড়ান্ত। এই নীতি মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
২. নেতৃত্ব ও আনুগত্য:
সংগঠনের প্রতিটি সদস্যকে নেতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করতে হতো। রসূলুল্লাহ সা. ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান নেতা এবং তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চলা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। এই আনুগত্য ছিল আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি আনুগত্যের অংশ।
৩. পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ:
রসূলুল্লাহ সা. তাঁর সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করতেন। তিনি শুরা (পরামর্শ) ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং সকলের মতামতকে সম্মান করতেন। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেতার হাতে থাকত, তবে পরামর্শের মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হতো।
৪. পারস্পরিক কল্যাণ ও সহযোগিতা:
সংগঠনের সদস্যরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ ছিল। তারা একে অপরের সুখে-দুঃখে পাশে থাকত এবং পারস্পরিক কল্যাণের জন্য কাজ করত। এই নীতি মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি বৃদ্ধি করেছিল।
৫. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
সংগঠনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, যা ছিল আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জন এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকল সদস্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করত।
৬. শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা:
সংগঠনের প্রতিটি সদস্যকে কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতে হতো। তারা নিয়মিতভাবে নামায আদায় করত, যাকাত দিত এবং অন্যান্য ইসলামী বিধান পালন করত। এই শৃঙ্খলা সংগঠনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করেছিল।
৭. আত্মত্যাগ ও উৎসর্গ:
সংগঠনের সদস্যরা আল্লাহ্ তা’আলার পথে আত্মত্যাগ ও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল। তারা তাঁদের জীবন, সম্পদ এবং সময় সবকিছুই আল্লাহ্ তা’আলার পথে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করত না। এই আত্মত্যাগ সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধি করেছিল।
৮. প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা:
রসূলুল্লাহ সা. তাঁর অনুসারীদেরকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দিতেন। তিনি তাঁদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান শিক্ষা দিতেন এবং তাঁদেরকে নৈতিক ও চারিত্রিকভাবে উন্নত করার চেষ্টা করতেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁদেরকে একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
৯. প্রচার ও প্রসার:
সংগঠন ইসলামের দাওয়াত প্রচার ও প্রসারের উপর গুরুত্ব দিত। তারা বিভিন্ন উপায়ে মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিত এবং তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার পথে আসার জন্য উৎসাহিত করত।
১০. ন্যায়বিচার ও সমতা:
সংগঠনের সকল সদস্যের জন্য ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করা হতো। কোনো প্রকার বৈষম্য বা অবিচার বরদাশত করা হতো না। এই নীতি সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি করেছিল।
এই সকল মৌলনীতি রসূলুল্লাহ সা. এর সংগঠনকে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংগঠনে পরিণত করেছিল, যা মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল।