📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্র একগুচ্ছ বাণী

📄 নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্র একগুচ্ছ বাণী


কুরআন মজীদে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে বেশ কিছু নির্দেশিকাই আছে। রাসূলুল্লাহ সা.-এর এবং নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভকারীদের কী ধরনের নীতি ও আচরণ গ্রহণ করা উচিত, সেই হিদায়াতও দেয়া হয়েছে। সেই হিদায়াতের আলোকে রাসূলুল্লাহ সা. কী ধরনের নীতি ও আচরণ গ্রহণ করেছিলেন তা আমরা এ পুস্তকের শুরু থেকে আলোচনা করে এসেছি।

এবার আমরা তুলে ধরবো, ইসলামি নেতৃত্বের আদর্শ মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. এর কিছু বাণী। নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও আনুগত্য বিচার সম্পর্কে তিনি কী ধারণা ও নির্দেশিকা দিয়ে গেছেন, সেসব বাণী। সরাসরি হাদিস পেশ করবো। একগুচ্ছ হাদিস নিয়ে এসেছি। হাদিসের বাগান থেকে চয়ন করে আনা সুরক্ষিত ফল এগুলো। যে কেউ এগুলো দিয়ে মালা গেঁথে নিতে পারে নিজের জন্যে, কিংবা তৈরি করে নিতে পারেন মালঞ্চ। নিচে পেশ করা হলো একগুচ্ছ হাদিস- রাসূলুল্লাহ সা. এর অমর বাণী :

১. যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো, সে আল্লাহ্র আনুগত্য করলো। আর যে আমার অবাধ্য হলো, সে আল্লাহ্র অবাধ্য হলো। যে ব্যক্তি আমীরের (ইসলামি নেতা ও শাসকের) আনুগত্য করলো, সে আমার আনুগত্য করলো। আর যে আমীরের অবাধ্য হলো, সে আমার অবাধ্য হলো। মূলত নেতা হলো ঢালস্বরূপ। কারণ তার নেতৃত্বে লড়াই করা হয় এবং নিরাপদে থাকা হয়। তাই নেতা যদি আল্লাহভীতি নিয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে এবং শান্ত, পরিচালিত ও অধীনস্থদের প্রতি সুবিচার করে তবে এর প্রতিদান ও প্রতিফল সে লাভ করবে। আর আল্লাহভীতি ও সুবিচার ত্যাগ করে এর সাজা তাকে ভোগ করতে হবে। -বুখারি ও মুসলিম : আবু হুরাইরা রা.।

২. যদি কোনো বিকলাংগ কুৎসিত ক্রীতদাসকেও আমীর নিযুক্ত করা হয়, তবে তোমরা তার কথা শুনো ও মানো, যতোক্ষণ সে আল্লাহ্র কিতাব মাফিক তোমাদের পরিচালিত করে। -সহীহ মুসলিম : উম্মুল হুসাইন রা.।

৩. নিজের পছন্দ হোক কিংবা অপছন্দ, উভয় অবস্থাতেই নেতার নির্দেশ পালন করা মুসলিম ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য, যতোক্ষণ না আল্লাহ্র অবাধ্য হবার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে, যখনই আল্লাহ্র অবাধ্য হবার মতো কোনো কাজের নির্দেশ দেয়া হবে, তখন তার কথা শুনাও যাবে না, মানাও যাবে না। (বুখারি ও মুসলিম : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা.)।

৪. (আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের) অবাধ্য হবার মতো নির্দেশের ক্ষেত্রে নেতা আনুগত্য লাভ করবে না। আনুগত্য প্রযোজ্য হবে কেবল মা’রূফ কাজে। (বুখারি ও মুসলিম : আলী রা.)।

৫. কেউ যদি আমীরের (ইসলামি নেতা ও শাসকের) আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যায় এবং আল জামা'আতও ত্যাগ করে, এ অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হলে তার সে মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (সহীহ মুসলিম : আবু হুরাইয়া রা.)।

৬. কেউ যদি আমীরের মধ্যে অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তবে দলত্যাগ না করে সে যেনো সবর করে। কারণ, যে আল জামা'আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তার সে মৃত্যু হয় জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (বুখারি ও মুসলিম : আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস রা.)।

৭. তোমাদের নেতারাও তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম নেতা, যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারাও তোমাদের ভালোবাসে; যাদের জন্যে তোমরা দু’আ করো আর তারাও তোমাদের জন্যেও দু'আ করে। তোমাদের নেতাদের মধ্যে ও নিকৃষ্ট নেতা তারা, যাদের তোমরা ঘৃণা করো আর তারাও তোমাদের ঘৃণা করে; যাদের তোমরা অভিশাপ দাও, আর তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়। (সহীহ মুসলিম : আউফ ইবনে মালেক আশজায়ী রা.)।

৮. আবদুর রহমান ইবনে সামুরা রা. বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, হে আবদুর রহমান! নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না, কারণ চাওয়ার কারণে যদি তোমাকে নেতৃত্ব দেয়া হয়, তবে নেতৃত্বের সব দায় দায়িত্ব তোমার উপর বর্তাবে। আর চawaa ছাড়াই যদি তোমাকে নেতৃত্ব দেয়া হয়, তবে দায়িত্ব পালনে তোমাকে সাহায্য করা হবে। (বুখারি ও মুসলিম)।

৯. তোমরা অচিরেই নেতৃত্বের জন্যে লালায়িত হয়ে পড়বে, আর এ কারণে কিয়ামতের দিন তোমরা লজ্জিত হবে। (সহীহ বুখারি : আবু হুরাইয়া রা.)।

১০. তোমরা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জন্যে উদ্যম ও উপযুক্ত লোক পাবে তাদের মাঝে, যারা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের পদকে চরম ঘৃণা করে, যতোক্ষণ না তারা তা লাভের জন্যে সক্রিয় হয়। (বুখারি ও মুসলিম : আবু হুরাইয়া রা.)।

১১. সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর কিয়ামতের দিন প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জনগণের উপর নিযুক্ত এবং একজন দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি ও মুসলিম : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা.)।

১২. কোনো ব্যক্তি মুসলমানদের নেতা বা শাসক থাকাবস্থায় তার যদি দায়িত্ব পালনে বিশ্বাস ঘাতকতা ও প্রতারণা করা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম : মা'কাল ইবনে ইয়াসার রা.)।

১৩. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে এই দু'আ করতে শুনেছি : হে আল্লাহ! যে ব্যক্তিকে আমার উম্মতের কোনো বিষয়ে নেতা, শাসক বা পরিচালক করা হয়, সে যদি তাদের উপর এমন কিছু চাপিয়ে দেয়, যা তাদের জন্যে কষ্টদায়ক, তবে তুমি তার উপরও সেরকম কষ্ট ও বিপদ চাপিয়ে দাও। আর সে যদি তাদের সাথে সদ্ভাব করে, তবে তুমিও তার প্রতি অনুগ্রহ করো। (সহীহ মুসলিম)।

১৪. আমি তোমাদের নিকট কাজের নির্দেশ দিচ্ছি : ক. তোমরা জামায়াতবদ্ধ থাকবে। খ. নেতার আদেশ শুনবে, গ. নেতার আনুগত্য করবে, ঘ. হিজরত করবে, ঙ. আল্লাহ্র পথে জিহাদ করবে। জেনে রেখো, যে ব্যক্তি জ়ামায়াত দল থেকে এক বিঘত পরিমাণও বেরিয়ে যাবে, যে অবশ্যই নিজের গলদেশ থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলবে। পুনরায় ফিরে এসে দলভুক্ত না হলে সে ইসলামের বাইরেই থাকবে। (তিরমিযি : হারিস আল আশআরী রা.)।

১৫. যে ব্যক্তি দুজন লোকেরও আমীর হবে, কিয়ামতের দিন তাকে বেঁধে উঠানো হবে। অতঃপর তার ন্যায়পরায়ণতা তাকে মুক্ত করবে, অথবা তার যুলুম ও সীমালংঘন তাকে ধ্বংস করবে। (দারিমি : আবু হুরাইয়া রা.)।

১৬. কা'ব ইবনে উজরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে বলেছেন, হে কা'ব! আমি তোমাকে অজ্ঞ, দাম্ভিক নেতা ও शासকদের नेतृत्व ও शासनের কবল থেকে আল্লাহ্র আশ্রয় দিলাম। আমি বললাম, সেটা কেমন হে আল্লাহ্র রাসূল! তিনি বললেন : অচিরেই এ ধরনের নেতাদের আবির্ভাব ঘটবে। যেসব লোক তাদের কাছে যাবে, তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে, তাদের অন্যায় কাজে সাহায্য সহযোগিতা করবে, তাদের সাথে আমার সম্পর্ক নেই। তারা হাউজে কাউসারে আমার কাছে আসতে পারবে না। আর যারা তাদের কাছে ঘেঁষবে না, তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে না এবং তাদের অন্যায় কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে না, তারাই আমার লোক, আমিও তাদের লোক। তারাই হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হবার আশা পোষণ করতে পারে। (তিরমিযি)।

১৭. কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র আরশের ছায়াতলে থাকবে ন্যায়পরায়ণ নেতা বা শাসক। আর কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে এবং আল্লাহ্র থেকে সর্বাগ্রে দূরে থাকবে যুলুমবাজ নেতা ও শাসক। (তিরমিযি : আবু সাঈদ রা.)।

১৮. অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ। (তিরমিযি, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ : আবু সাঈদ রা.)।

১৯. আমীর যখন জনগণের দুষ্কৃতী খুঁজে বের করার কাজে আত্মনিয়োগ করে, তখন সে তাদেরকে অনিষ্টের দিকে নিয়ে যায়। -আবু দাউদ : আবু উমামা রা.।

২০. মু’আবিয়া রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.- কে বলতে শুনেছি : তুমি যখন জনগণের গোপন বিষয় খুঁজতে শুরু করবে, তখন তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। (বায়হাকি)।

২১. তোমরা কি জানো কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আল্লাহ্র আরশের ছায়ায় আশ্রয় কারা পাবে? সাহাবীরা বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন।’ তিনি বললেন : সেইসব নেতা ও শাসক, হক কথা বলা হলে সাথে সাথে তা গ্রহণ করে, অধিকার দাবি করা হলে সাথে সাথে দিয়ে দেয় এবং মানুষের উপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব চালায় ঠিক সেভাবে যেমন চালায় নিজের উপর। (মিশকাত : আয়েশা রা.)।

২২. তোমরা যেমন হবে, তোমাদের নেতা ও শাসকরাও হবে ঠিক সেরকম।

২৩. যে ব্যক্তিকে মানুষের মাঝে বিচারক নিযুক্ত করা হলো, তাকে যেনো ছুরি ছাড়াই জবাই করে দেয়া হলো। (তিরমিযি : আবু হুরাইয়া)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00