📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 মহোত্তম চরিত্রের অনুপম ছবি

📄 মহোত্তম চরিত্রের অনুপম ছবি


রাসূলুল্লাহ সা. এর চরিত্র সম্পর্কে এখানে আমরা কয়েকজন সাহাবির কয়েকটি অনুপম বর্ণনা উল্লেখ করছি। এ বর্ণনাগুলোতে তাঁর জীবন পদ্ধতি ও চরিত্রের বৈশিষ্ট্য সমস্ত দিকের উপর অতি সংক্ষেপে আঁকা হয়েছে এক অনুপম ছবি। দেখুন সে ছবি :
উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রা.-এর আগের ঘরের ছেলে হিন্দ ইবনে আবি হালা বলেন : রাসূলুল্লাহ সা. সব সময় আখিরাতের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অধিকাংশ সময় তিনি চুপ থাকতেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। কথা বলার সময় প্রতিটি কথা পৃথক পৃথক উচ্চারণ করে স্পষ্ট ভাষায় বলতেন। তাঁর কথাবার্তা ছিলো পরিচ্ছন্ন, মৌলিক ও অকাট্য। তিনি কঠোর ভাষী ছিলেন না। আবার ব্যক্তিস্বার্থেও ছিলেন না।
তিনি কাউকে লজ্জা দিতেন না। অপমানিত করতেন না কাউকেও। তিনি আল্লাহ্র প্রতিটি নিয়ামতের কদর করতেন। খাবার সামনে এলে কখনো দোষ ধরতেন না। কোনো জাগতিক বিষয়ে তিনি কখনো রাগ করতেন না। কিন্তু আল্লাহ্র অধিকার নষ্ট হতে দেখলে অত্যন্ত রাগ করতেন। নিজের জন্য কখনো রাগ করেননি।
প্রতিশোধ নেননি কখনো। অধিকাংশ সময় মুচকি হাসতেন। তখন তার শিশির শুভ্র মুক্তার মতো দাঁতগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতো। -শামায়েলে তিরমিযি।
আনাস রা. বলেন : তিনি ছিলেন সবচে’ ভদ্র, কোমল ও অমায়িক মানুষ। তিনি সবার সাথে মিলেমিশে থাকতেন। সবার সাংসারিক খোঁজ-খবর নিতেন। শিশু-কিশোরদের সাথে হাস্যরস করতেন। শিশুদের আদর করে কোলে তুলে বসাতেন। ছোট বড়ো সকলের দাওয়াত তিনি কবুল করতেন। দূরে হলেও গিয়ে ব্যক্তির খোঁজ খবর নিতেন। তিনি মানুষের ওযর কবুল করতেন। (মিশকাত)।
রসূলে করিম সা.-এর মহোত্তম জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় সাথি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
তিনি কখনো অশ্লীল কথা বলতেননা। কখনো মন্দ তাঁর মুখ থেকে বেরোয়নি। তিনি ভর্ৎসনা করেননি কখনো। হাটে বাজারে চিৎকার করে কথা বলতেননা। অন্যায়ের বদলে অন্যায় করেননি। মন্দের মোকাবিলা করতেন ন্যায় ও ক্ষমাশীলতা দিয়ে। জিহাদের ময়দান ছাড়া কারে উপর তিনি হাত তোলেননি। সেবককে কখনো মারেননি। নিজের জন্য কখনো কারো কাছে প্রতিশোধ নেননি। দুটি জিনিসের একটা গ্রহণ করার সুযোগ থাকলে সহজে যেটি বেছে নিতেন। নিজের কাপড় চোপড় নিজেই ধুতেন। বকরীর দুধ নিজ হাতে দুহন করতেন। নিজের কাজ নিজেই করতেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। মানুষের মন রক্ষা করতেন। কারো মনে কষ্ট দিতেন না। সব সাথিদের খোঁজ খবর নিতেন। তাঁর অবস্থা ছিলো ভারসাম্যপূর্ণ। কারো প্রশংসা করার ভঙ্গী করতেন না। উপস্থিত কথাকে মনোযোগ আকর্ষণ রাখতেন। প্রত্যেকেই মনে করতো, তাঁর কাছে সে-ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দিতেন না। কেউ কথা বলতে চাইলে তার প্রয়োজন মতো সময় দিতেন। তিনি সকলের সাথে উত্তম আচরণ করতেন। তিনি কারো দোষ ধরতেন না। এছাড়া বিবস্ত্রা করতেন না। অহংকার করতেন না। অর্থাৎ কথকাজ থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তাঁর সাথিরা পিনপতন নিরবতা অবলম্বন করতো। তাঁর কথা শেষ হলেই তারা কথা বলতো। কারো কথার মাঝে তিনি কথা বলতেন না। তিনি অমায়িক ও বিশাল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যবাদী। ছিলেন বিশ্বস্ত, কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তাঁর সাথিরা ছিলেন তাঁর জন্য পাগলপারা। (শামায়েলে তিরমিযি)।
রাসূলুল্লাহ সা. এর নাতি হাসান ইবনে আলী রা. বলেন, আমি আমার পিতাকে তাঁর ঘরোয়া বা ব্যক্তিগত কাজকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন : ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্য এ অনুমতি ছিলো, তিনি যখনই ইচ্ছা করতেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর গৃহে প্রবেশ করতে পারতেন। তিনি বলেন রাসূল সা.-এর অভ্যাস ছিলো, যখনই ঘরে যেতেন, তাঁর সময়কে তিন ভাগ করে নিতেন। এক ভাগ আল্লাহ্র ইবাদাতের জন্য, দ্বিতীয় ভাগ নিজ পরিবার পরিজনের জন্য এবং তৃতীয় ভাগ নিজ নিজের জন্য। আবার নিজ আরামের সময়টুকুও লোকদেরকে দিয়ে দিতেন। এর বিশেষ লোকদের মাধ্যমে তার উপকারীতাও সাধারণ লোকদের মধ্যে বিস্তার করতেন অর্থাৎ সময় বিশেষ সাক্ষাৎ করতেন আর তার কাছে বিশেষ লোকেরা আসতো।
মায়ায়েল ও দীনের মর্মকথা প্রচার করে সাধারণ লোকদের মধ্যে পৌঁছে দিতেন। তাঁদের নিকট কোনো কথা গোপন রাখতেন না। দীন ও দুনিয়ার লাভজনক সব কথাই বলতেন। তাঁর অভ্যাস ছিলো, উম্মতের জন্য নির্ধারিত সময়ে প্রিয় ইচ্ছা অনুযায়ী সাথিদেরকে প্রাধান্য দিতেন এবং এই সময়ের বণ্টনে দাবি মর্যাদা হিসাবে তারতম্য ঘটতো। তাদের মধ্যে কারো দরকার একটা কাজ, কারো দুটি কাজ এবং কারো কয়েকটি কাজ। তিনি তাদের কাজ করে লেগে যেতেন এবং তাদের সংশোধনে এতো কাজে মশগুল রাখতেন। তাতে তাদের এবং উম্মতের সংশোধন হতো। তিনি তাদের সময়গুলো জানতে চাইতেন এবং তাদের অবস্থা অনুযায়ী তাদের পরামর্শ দিতেন। বলতেন, যারা এখন উপস্থিত আছে, তারা যেনো অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেয়। (তিনি বলতেন) আমাকে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন অবগত করো, যে তার প্রয়োজনের কথা আমার কাছে পৌঁছাতে পারে না।
সাহাবিগণ তাঁর নিকট ইলম ও দীনের অন্বেষী হয়ে যেতেন। পূর্ণ তৃপ্তি ছাড়া সেখান থেকে ফিরতেন না। আর যখন তারা সেখান থেকে বের হতেন, তখন পথ-প্রদর্শক হয়ে বের হতেন।
রাসূলুল্লাহ সা. এর নাতি হুসাইন রা. বলেন, আমি (আমার পিতাকে) জিজ্ঞাসা করলাম, নবী সা.-এর ঘরের বাইরের কাজকর্ম সম্পর্কে কিছুটা বলুন, অর্থাৎ গৃহের বাইরে তিনি কি কাজকর্ম করতেন? তিনি বললেন : রাসূলুল্লাহ সা. অনর্থক কথাবার্তা থেকে স্বীয় যবান মুবারককে রক্ষা করতেন। মানুষের মনোযোগ নিজের প্রতি আকৃষ্ট রাখতেন। অমনোযোগী হতে দিতেন না। প্রত্যেক গোত্রের সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতেন এবং তাকেই তাদের নেতা ও অভিভাবক বানাতেন। তিনি মানুষের সাথে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক ও সাবধানতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু কারো সাথে স্বীয় আন্তরিকতা ও ভদ্রস্থতার ক্ষেত্রে তারতম্য করতেন না। নিজ সাথিদের খোঁজ-খবর নিতেন। মানুষকে তাদের অবস্থা অনুযায়ী জিজ্ঞাসা করতেন। কারো কথাকে ভালো বলতেন এবং তার প্রশংসা করতেন। আর মন্দ কথাকে মন্দ বলতেন এবং নিন্দা করতেন। তাঁর প্রতিটি কাজে ভারসাম্যতা বজায় থাকতো। এদিক-ওদিক কিছু পড়তেন না। তিনি মানুষের প্রতি খেয়াল রাখতেন যাতে তারা কর্তব্য বিমুখ কিংবা অলস না হয়ে পড়ে। প্রত্যেক অবস্থার জন্যই তাঁর নিকট উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতো। সত্য গ্রহণ করতে সংকীর্ণতা করতেন না এবং সত্য ত্যাগ করে অন্যাদিকে চলে যেতেন না। সঙ্গী-সাথিরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁর কাছে সবার সেরা ব্যক্তি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সবার মঙ্গল কামনা করতেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে মর্যাদาศীল ছিলেন সে ব্যক্তি, যিনি ছিলেন মানুষের সমব্যথী এবং তাদের ব্যাপারে সবচেয়ে উত্তম।
হুসাইন রা. বলেন, অতঃপর আমি (আমার পিতাকে) রাসূলুল্লাহ সা.-এর মজলিস ও উঠাবসার অবস্থা জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন : রাসূলুল্লাহ সা. উঠতে বসতে আল্লাহ্র যিকর করতেন। কোনো স্থানে নিজেকে নিজের জন্য নির্দিষ্ট করতেন না। তিনি যখন মানুষের সাথে বসতেন, তখন যেখানেই বসার স্থান পেতেন বসে পড়তেন এবং মানুষকে এরূপ করতে নির্দেশ দিতেন। তিনি তাঁর মজলিসের প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে যথাযথ মর্যাদা দান করতেন।
কেউ একথা অনুভব করতো না যে, সে ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি তাঁর বেশি প্রিয়। যে ব্যক্তি (কোনো প্রয়োজনে) তাঁর কাছে এসে বসতো কিংবা যেতো, তিনি তার সাথে নিজেকে ততক্ষণ পর্যন্ত আটকে রাখতেন, যে পর্যন্ত না সে নিজেই চলে যেতো। কেউ যদি তাঁর কাছে কোনো কিছু চাইতো আসতো, সে তার বাসনা পূরণ করে ফিরতো, কিংবা কোমল ব্যবহার ও সান্ত্বনা নিয়ে ফিরে যেতো। তাঁর ব্যবহার সমস্ত লোকের জন্য সমান ছিলো।
স্নেহ-মমতার ক্ষেত্রে, তিনি ছিলেন তাদের পিতা। আর লোকেরা সব (অধিকারের ক্ষেত্রে) তাঁর নিকট ছিলো সমান। তাঁর মজলিস ছিলো ধৈর্যশীলতা, লজ্জাশীলতা, সত্যতা ও আমানতের মজলিস। সেখানে উচ্চস্বরে কথাবার্তা হতো না। কারো ইয়ত-গুণের উপর আরোপ করা হতো না। কারো দোষত্রুটি সমালোচিত হতো না। সবার সদস্যদের মধ্যে ছিলো হৃদ্যতা। তাকওয়া দ্বারা থাকতো। এক অপরের সাথে ভদ্র ও নম্র আচরণ করতো। বড়দের শ্রদ্ধা করতো, ছোটদের স্নেহ করতো। অভাবগ্রস্তদের প্রাধান্য দিতো। অপরিচিত আগন্তকদের প্রতি খেয়াল রাখতো।
হুসাইন রা. বলেন, অতঃপর আমি (আমার পিতাকে) জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সদস্যদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করতেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সা. তাঁদের সাথে আনন্দচিত্তে মিলিত হতেন। তিনি নম্র ও বিনয়ী ছিলেন। কঠোর ছিলেন না। তিনি হাট-বাজারে হৈহুল্লোড় করতেন না। অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করতেন না। কাউকে দোষারোপ করতেন না। অহেতুক কারো প্রশংসা করতেন না। অপছন্দনীয় জিনিস থেকে দূরে থাকতেন এবং এ ব্যাপারে মানুষ তাঁর সম্পর্কে নিরাশ হতো। তিনি সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্যও করতেন না। তিনটি বিষয় থেকে তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। এক. ঝগড়া-বিবাদ থেকে। দুই. বেশি কথা বলা থেকে। তিন. অনর্থক কাজ থেকে। তিনটি বিষয় থেকে তিনি অন্য মানুষকে রক্ষা করেছিলেন। এক. তিনি কারো নিন্দা করতেন না। দুই. কাউকে লজ্জা দিতেন না। তিনি দোষ অন্বেষণ করতেন না। যে কথা বললে সওয়াবের আশা করা যেতো, তিনি তাই বলতেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন সভাসদগণ তাদের মাথা এমনভাবে ঝুঁকিয়ে রাখতেন যেনো তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। তিনি যখন কথা বন্ধ করতেন তখন অন্যরা কথা বলতেন না। যখন কেউ কোনো কথা শুরু করতেন, তখন অন্যরা তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহ্য নীরব থাকতেন।
তাদের মধ্যে প্রত্যেকের কথাই তার নিকট ততটুকু গুরুত্বের অধিকারী হতো, যতটুকু গুরুত্ব পেতো প্রথম ব্যক্তির কথা। সবাই যে কথা শুনতো, তিনিও তাই শুনতেন। সবাই যাতে হাসতো, তিনিও তাতে আশ্চর্য হতেন। আগন্তকের অসংলগ্ন কথাবার্তা ও প্রশ্ন তিনি ধৈর্য সহকারে শুনতেন। তাঁর সাথীগণ এরূপ লোকদের তাঁর নিকট নিয়ে আসতেন (যাতে তাদের প্রশ্ন থেকে নতুন বিষয় জানা যায়)।
তিনি বলতেন, তোমরা যখন কোনো অভাবগ্রস্তকে তার অভাব দূর করার প্রার্থনা করতে দেখো, তখন তাকে সাহায্য করো। কেউ তার প্রশংসা করলে তিনি তা পছন্দ করতেন না। তবে কৃতজ্ঞতা বসত কিছু বললে তা ছিলো ভিন্ন। তিনি কারো কথার প্রতিবাদ করতেন না। অবশ্য সে যদি সীমা অতিক্রম করে যেতো, তবে তার কথার প্রতিবাদ করতেন। হয়তো তাকে নিষেধ করতেন, কিংবা সেখান থেকে নিজে উঠে দাঁড়াতেন।
হুসাইন রা. বলেন, অতঃপর আমি আমার পিতা রাসূলুল্লাহ সা. এর চুপ থাকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমার পিতা বললেন : রাসূলুল্লাহ সা. চুপ থাকতেন চারটি কারণে। এক. সহনশীলতার কারণে, দুই. সাবধানতার কারণে, তিন. আন্দাজ করার উদ্দেশ্যে, চার. চিন্তা-ভাবনা করার জন্য। তাঁর আন্দাজ করা ছিলো অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং তাঁর চিন্তা-ভাবনা করা এবং মানুষের আলাপ-আলোচনা শ্রবণ করা। অর্থাৎ তিনি চিন্তা-ভাবনা করতেন সে সব বিষয়ে, যা অক্ষুণ্ণ এবং বিলীন হয় না। আর সহনশীলতা তাঁর ধৈর্যের মধ্যেই একত্রিত করা হয়েছিলো। অর্থাৎ কোনো বিষয় তাঁকে উত্তেজিত করতে পারতো না এবং অস্থিরতা তাঁর জন্য চারটি জিনিসের মধ্যে একত্রিত করা হয়েছে। (আর তা হচ্ছে) তিনি উত্তম কাজটি গ্রহণ করতেন, যাতে মানুষ তা গ্রহণ করে।
তিনি মন্দকাজ পরিত্যাগ করতেন, যাতে মানুষ তা থেকে বিরত থাকে। যে জিনিসে তাঁর উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণ একত্রিত ও সমন্বিত করেন। -আবদুল্লাহ্ নবী : আবু সায়্যিদ ইসফাহানি।
আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, দশ বছর আমি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহচর্যে ছিলাম এবং সব রকমের আচরণ আমি নিয়েছি। কিন্তু তার মুখের থেকে উত্তম কোনো ঘ্রাণ আমার নাকে স্পর্শ করেনি। সাধারণের মধ্যে কারো সাথে যখন তিনি সাক্ষাৎ হতো, তখন তিনি তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন না, এতো যে পর্যন্ত সে তাঁর থেকে পৃথক না হতো, তিনি নিজে তাঁর হাত মুবারক গুটিয়ে নিতেন না।
কোনো সাহাবি যখন তাঁর সাথে মিলিত হয় তাঁর কানে কানে কোনো কথা বলতে চাইতেন, তখন তিনি নিজ কান তার দিকে পেতে দিতেন। এবং কথোপকথন পর্যন্ত তাঁর কান সরিয়ে নিতেন না, যতক্ষণে না ঐ ব্যক্তি নিজেকে না সরিয়ে নিতো। -শামায়েলে তিরমিযি।

📘 আদর্শ নেতা মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ > 📄 নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্র একগুচ্ছ বাণী

📄 নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে রসূলুল্লাহ্র একগুচ্ছ বাণী


কুরআন মজীদে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে বেশ কিছু নির্দেশিকাই আছে। রাসূলুল্লাহ সা.-এর এবং নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভকারীদের কী ধরনের নীতি ও আচরণ গ্রহণ করা উচিত, সেই হিদায়াতও দেয়া হয়েছে। সেই হিদায়াতের আলোকে রাসূলুল্লাহ সা. কী ধরনের নীতি ও আচরণ গ্রহণ করেছিলেন তা আমরা এ পুস্তকের শুরু থেকে আলোচনা করে এসেছি।

এবার আমরা তুলে ধরবো, ইসলামি নেতৃত্বের আদর্শ মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সা. এর কিছু বাণী। নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও আনুগত্য বিচার সম্পর্কে তিনি কী ধারণা ও নির্দেশিকা দিয়ে গেছেন, সেসব বাণী। সরাসরি হাদিস পেশ করবো। একগুচ্ছ হাদিস নিয়ে এসেছি। হাদিসের বাগান থেকে চয়ন করে আনা সুরক্ষিত ফল এগুলো। যে কেউ এগুলো দিয়ে মালা গেঁথে নিতে পারে নিজের জন্যে, কিংবা তৈরি করে নিতে পারেন মালঞ্চ। নিচে পেশ করা হলো একগুচ্ছ হাদিস- রাসূলুল্লাহ সা. এর অমর বাণী :

১. যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো, সে আল্লাহ্র আনুগত্য করলো। আর যে আমার অবাধ্য হলো, সে আল্লাহ্র অবাধ্য হলো। যে ব্যক্তি আমীরের (ইসলামি নেতা ও শাসকের) আনুগত্য করলো, সে আমার আনুগত্য করলো। আর যে আমীরের অবাধ্য হলো, সে আমার অবাধ্য হলো। মূলত নেতা হলো ঢালস্বরূপ। কারণ তার নেতৃত্বে লড়াই করা হয় এবং নিরাপদে থাকা হয়। তাই নেতা যদি আল্লাহভীতি নিয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে এবং শান্ত, পরিচালিত ও অধীনস্থদের প্রতি সুবিচার করে তবে এর প্রতিদান ও প্রতিফল সে লাভ করবে। আর আল্লাহভীতি ও সুবিচার ত্যাগ করে এর সাজা তাকে ভোগ করতে হবে। -বুখারি ও মুসলিম : আবু হুরাইরা রা.।

২. যদি কোনো বিকলাংগ কুৎসিত ক্রীতদাসকেও আমীর নিযুক্ত করা হয়, তবে তোমরা তার কথা শুনো ও মানো, যতোক্ষণ সে আল্লাহ্র কিতাব মাফিক তোমাদের পরিচালিত করে। -সহীহ মুসলিম : উম্মুল হুসাইন রা.।

৩. নিজের পছন্দ হোক কিংবা অপছন্দ, উভয় অবস্থাতেই নেতার নির্দেশ পালন করা মুসলিম ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য, যতোক্ষণ না আল্লাহ্র অবাধ্য হবার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে, যখনই আল্লাহ্র অবাধ্য হবার মতো কোনো কাজের নির্দেশ দেয়া হবে, তখন তার কথা শুনাও যাবে না, মানাও যাবে না। (বুখারি ও মুসলিম : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা.)।

৪. (আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের) অবাধ্য হবার মতো নির্দেশের ক্ষেত্রে নেতা আনুগত্য লাভ করবে না। আনুগত্য প্রযোজ্য হবে কেবল মা’রূফ কাজে। (বুখারি ও মুসলিম : আলী রা.)।

৫. কেউ যদি আমীরের (ইসলামি নেতা ও শাসকের) আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যায় এবং আল জামা'আতও ত্যাগ করে, এ অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হলে তার সে মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (সহীহ মুসলিম : আবু হুরাইয়া রা.)।

৬. কেউ যদি আমীরের মধ্যে অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তবে দলত্যাগ না করে সে যেনো সবর করে। কারণ, যে আল জামা'আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তার সে মৃত্যু হয় জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (বুখারি ও মুসলিম : আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস রা.)।

৭. তোমাদের নেতারাও তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম নেতা, যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারাও তোমাদের ভালোবাসে; যাদের জন্যে তোমরা দু’আ করো আর তারাও তোমাদের জন্যেও দু'আ করে। তোমাদের নেতাদের মধ্যে ও নিকৃষ্ট নেতা তারা, যাদের তোমরা ঘৃণা করো আর তারাও তোমাদের ঘৃণা করে; যাদের তোমরা অভিশাপ দাও, আর তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়। (সহীহ মুসলিম : আউফ ইবনে মালেক আশজায়ী রা.)।

৮. আবদুর রহমান ইবনে সামুরা রা. বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, হে আবদুর রহমান! নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না, কারণ চাওয়ার কারণে যদি তোমাকে নেতৃত্ব দেয়া হয়, তবে নেতৃত্বের সব দায় দায়িত্ব তোমার উপর বর্তাবে। আর চawaa ছাড়াই যদি তোমাকে নেতৃত্ব দেয়া হয়, তবে দায়িত্ব পালনে তোমাকে সাহায্য করা হবে। (বুখারি ও মুসলিম)।

৯. তোমরা অচিরেই নেতৃত্বের জন্যে লালায়িত হয়ে পড়বে, আর এ কারণে কিয়ামতের দিন তোমরা লজ্জিত হবে। (সহীহ বুখারি : আবু হুরাইয়া রা.)।

১০. তোমরা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জন্যে উদ্যম ও উপযুক্ত লোক পাবে তাদের মাঝে, যারা নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের পদকে চরম ঘৃণা করে, যতোক্ষণ না তারা তা লাভের জন্যে সক্রিয় হয়। (বুখারি ও মুসলিম : আবু হুরাইয়া রা.)।

১১. সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর কিয়ামতের দিন প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জনগণের উপর নিযুক্ত এবং একজন দায়িত্বশীল। সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারি ও মুসলিম : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রা.)।

১২. কোনো ব্যক্তি মুসলমানদের নেতা বা শাসক থাকাবস্থায় তার যদি দায়িত্ব পালনে বিশ্বাস ঘাতকতা ও প্রতারণা করা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেবেন। (বুখারি ও মুসলিম : মা'কাল ইবনে ইয়াসার রা.)।

১৩. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে এই দু'আ করতে শুনেছি : হে আল্লাহ! যে ব্যক্তিকে আমার উম্মতের কোনো বিষয়ে নেতা, শাসক বা পরিচালক করা হয়, সে যদি তাদের উপর এমন কিছু চাপিয়ে দেয়, যা তাদের জন্যে কষ্টদায়ক, তবে তুমি তার উপরও সেরকম কষ্ট ও বিপদ চাপিয়ে দাও। আর সে যদি তাদের সাথে সদ্ভাব করে, তবে তুমিও তার প্রতি অনুগ্রহ করো। (সহীহ মুসলিম)।

১৪. আমি তোমাদের নিকট কাজের নির্দেশ দিচ্ছি : ক. তোমরা জামায়াতবদ্ধ থাকবে। খ. নেতার আদেশ শুনবে, গ. নেতার আনুগত্য করবে, ঘ. হিজরত করবে, ঙ. আল্লাহ্র পথে জিহাদ করবে। জেনে রেখো, যে ব্যক্তি জ়ামায়াত দল থেকে এক বিঘত পরিমাণও বেরিয়ে যাবে, যে অবশ্যই নিজের গলদেশ থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলবে। পুনরায় ফিরে এসে দলভুক্ত না হলে সে ইসলামের বাইরেই থাকবে। (তিরমিযি : হারিস আল আশআরী রা.)।

১৫. যে ব্যক্তি দুজন লোকেরও আমীর হবে, কিয়ামতের দিন তাকে বেঁধে উঠানো হবে। অতঃপর তার ন্যায়পরায়ণতা তাকে মুক্ত করবে, অথবা তার যুলুম ও সীমালংঘন তাকে ধ্বংস করবে। (দারিমি : আবু হুরাইয়া রা.)।

১৬. কা'ব ইবনে উজরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে বলেছেন, হে কা'ব! আমি তোমাকে অজ্ঞ, দাম্ভিক নেতা ও शासকদের नेतृत्व ও शासनের কবল থেকে আল্লাহ্র আশ্রয় দিলাম। আমি বললাম, সেটা কেমন হে আল্লাহ্র রাসূল! তিনি বললেন : অচিরেই এ ধরনের নেতাদের আবির্ভাব ঘটবে। যেসব লোক তাদের কাছে যাবে, তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে, তাদের অন্যায় কাজে সাহায্য সহযোগিতা করবে, তাদের সাথে আমার সম্পর্ক নেই। তারা হাউজে কাউসারে আমার কাছে আসতে পারবে না। আর যারা তাদের কাছে ঘেঁষবে না, তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে না এবং তাদের অন্যায় কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে না, তারাই আমার লোক, আমিও তাদের লোক। তারাই হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হবার আশা পোষণ করতে পারে। (তিরমিযি)।

১৭. কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র আরশের ছায়াতলে থাকবে ন্যায়পরায়ণ নেতা বা শাসক। আর কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে এবং আল্লাহ্র থেকে সর্বাগ্রে দূরে থাকবে যুলুমবাজ নেতা ও শাসক। (তিরমিযি : আবু সাঈদ রা.)।

১৮. অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ। (তিরমিযি, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ : আবু সাঈদ রা.)।

১৯. আমীর যখন জনগণের দুষ্কৃতী খুঁজে বের করার কাজে আত্মনিয়োগ করে, তখন সে তাদেরকে অনিষ্টের দিকে নিয়ে যায়। -আবু দাউদ : আবু উমামা রা.।

২০. মু’আবিয়া রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.- কে বলতে শুনেছি : তুমি যখন জনগণের গোপন বিষয় খুঁজতে শুরু করবে, তখন তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। (বায়হাকি)।

২১. তোমরা কি জানো কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আল্লাহ্র আরশের ছায়ায় আশ্রয় কারা পাবে? সাহাবীরা বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন।’ তিনি বললেন : সেইসব নেতা ও শাসক, হক কথা বলা হলে সাথে সাথে তা গ্রহণ করে, অধিকার দাবি করা হলে সাথে সাথে দিয়ে দেয় এবং মানুষের উপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব চালায় ঠিক সেভাবে যেমন চালায় নিজের উপর। (মিশকাত : আয়েশা রা.)।

২২. তোমরা যেমন হবে, তোমাদের নেতা ও শাসকরাও হবে ঠিক সেরকম।

২৩. যে ব্যক্তিকে মানুষের মাঝে বিচারক নিযুক্ত করা হলো, তাকে যেনো ছুরি ছাড়াই জবাই করে দেয়া হলো। (তিরমিযি : আবু হুরাইয়া)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00