📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা

📄 রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা


রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসা সম্বন্ধে আমাদেরকে যা হুকুম করা হয়েছে তা হচ্ছে তার এতা'আৎ। অর্থাৎ তাঁর আজ্ঞা মেনে চলতে হবে। তাঁকে মেনে চললে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই মানা হবে। এ কথা আল্লাহ জাল্লাজালাল স্বয়ং বলে দিয়েছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়:
"যে ব্যক্তি রসূল ﷺ এর আজ্ঞা মেনে চলল, সে প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহর আজ্ঞা মেনে চলল।" (সূরা আন-নিসা ৮০)

"তোমরা যদি আল্লাহকে মহব্বত করে থাক, তাহলে আমার অনুসরণ করে চল ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে মহব্বত করবেন।" (সূরা আলু ইমরান ৩০)

আমাদেরকে কুরআন মাজীদে এই হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমরা যেন রসূলুল্লাহ ﷺ কে তাঁর ব্রত পালনে সর্বতোভাবে সহায়তা করি, তাঁর শক্তি বর্ধিত করি এবং তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করি। এ ছাড়াও তাঁর প্রতি রয়েছে আমাদের আরও বহু কর্তব্য যার বিস্তৃত বিবরণ কুরআন মাজীদ এবং সুন্নাতে নাববীতে বিধৃত রয়েছে। সর্বোপরি তাঁকে ভালবাসা আমাদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে। সে ভালবাসা হবে সব ভালাবাসার উর্ধ্বে। ভাই-বোন, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, এমনকি নিজের জীবনের চাইতেও তাঁকে বেশী ভালবাসতে হবে। তিনিই যে আমাদের প্রকৃত হিতকারী। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছেঃ
"তাদের নিজেদের চাইতেও নাবী মুমিনদের প্রতি অধিকতর আগ্রহশীল।" (সূরা আহযাব ৬)

(হে রসূল!) আপনি বলে দিন: তোমাদের পিতাগণ, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভ্রাতৃবর্গ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের গোত্রগোষ্ঠী এবং তোমাদের সেই ধন-সম্পদ যা তোমরা সঞ্চয় করে রেখেছ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার মন্দাপড়ার আশঙ্কা করে থাক এবং তোমাদের বাসগৃহ সমূহ যাতে (বাস করে) তোমরা সন্তোষপ্রাপ্ত, (এ সব) যদি তোমাদের নিকট আল্লাহর চাইতে, আর রসূলের চাইতে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদের চাইতে অধিকতর প্রিয় হয় তাহলে আল্লাহর ফরমান আসার সময় পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করতে থাক। (সূরা তওবাহ ২৪)

আর হাদীসে এসেছে: রসূল ﷺ বলেছেন,
"সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন ন্যস্ত, তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না আমি (রসূলুল্লাহ) তার নিকট তার পিতামাতা, তার সন্তান সন্ততি এবং অন্য (সব) লোক থেকে প্রিয়তর হই।"

'উমার (রাযি.) এ কথা শুনে আরয করলেন,
"হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার নিকট (দুনিয়ার) সব বস্তু হতে অধিকতর প্রিয় কিন্তু আমার নিজের জীবন ছাড়া। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে 'উমার! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার নিজের জীবন অপেক্ষাও আমি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় না হব ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি (কামিল) মুমিন হতে পারবে না। এ কথা শুনে 'উমার বললেন, তা হলে এখান নিশ্চয় আপনি আমার নিকট আমার নিজের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়।"
রসূলুল্লাহ ﷺ 'উমারের এই কথা শুনে বললেন, এখন তুমি হে 'উমার! (পূর্ণ পরিণত) মুমিন।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে:
যে ব্যক্তির মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করে:
১। সেই ব্যক্তি- যার নিকট আল্লাহ এবং তাঁর রসূল এই দু'জন ছাড়া অন্য সব কিছু হতে অধিকতর প্রিয় হয়।
২। সেই ব্যক্তি- যে কোন লোককে যখন ভালবাসে, তখন একমাত্র আল্লাহর ওয়ান্তেই তাকে ভালবাসে।
৩। সেই ব্যক্তি- যাকে আল্লাহ কুফরের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে ঈমানের আশীর্বাদ দ্বারা ধন্য করেন, সে পুনরায় কুফরীর দিকে ফিরে যেতে ঠিক তেমনই খারাপ জানে যেরূপ আগুনে ঝাপ দেয়ার কাজকে খারাপ জানে।"

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা নিজের সেই প্রাপ্য হকসমূহও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলেন- যে হক আর কারোরই প্রাপ্য নয়। তিনি অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ ﷺ এর 'হক' সমূহও বিশদভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। আমি অন্যত্র অত্যন্ত বিশদভাবে এইসব 'হক' এর কথা আলোচনা করেছি। এখানে অতি সংক্ষেপে নমুনা স্বরূপ দু' একটি কথা বলছি:
আল্লাহ বলছেন:
"যে সব ব্যক্তি আজ্ঞাবহ হয় আল্লাহর এবং তাঁর রসূল -এর এবং (সঙ্গে সঙ্গে একমাত্র আল্লাহকে) ভয় করে এবং তাঁকে সমীহ করে অন্যায় কার্য হতে আত্মরক্ষা করে চলে, সাফল্য অর্জন করে থাকে তারাই।" (সূরা আন-নূর ৫২)
এই আয়াত থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে- হুকুম মেনে চলতে হবে আল্লাহর এবং তাঁর রসূলের- কিন্তু ভয় ও সমীহ করার পাত্র হচ্ছেন একমাত্র একজন এবং তিনি হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ। বান্দার ভয় ও সমীহ করার পাত্র হচ্ছেন একমাত্র তিনিই।
শরীয়তের বিধান দাতা হচ্ছেন আল্লাহ এবং রসূল উভয়েই কিন্তু বান্দার আশা আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণ-কর্তা একমাত্র আল্লাহ আর তিনি একমাত্র তিনিই এই ব্যাপারে যথেষ্ট। কুরআন মাজীদে বলা হচ্ছেঃ
"বস্তুতঃ (কতই না সুন্দর ও শুভ হতো তাদের পক্ষে) যদি তারা সন্তুষ্ট থাকত সেই বস্তু পেয়ে যা তাদেরকে দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং যদি তারা বলতো আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। অদূর ভবিষ্যতে আল্লাহ তাঁর রহমাতের ভাণ্ডার থেকে আরও দিবেন এবং তাঁর রসূলও-আর আমরা প্রত্যাশা করে থাকব একমাত্র আল্লাহরই দিকে-যাঙ্ক্ষা করে চলব একমাত্র তাঁরই নিকট।” (সূরা আত-তাওবাহ ৫৯)
কাজেই দেখা যাচ্ছে ইতা'আত অর্থাৎ হুকুম পালন করতে হবে, আজ্ঞাবহ হতে হবে আল্লাহর এবং রসূল উভয়ের, কিন্তু ভয় ও সমীহ করতে হবে একমাত্র আল্লাহকে, তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে।
অতএব বুঝা যাচ্ছে দান-প্রদান (আদেশ-নিষেধ প্রভৃতি) আল্লাহ এবং রসূল উভয়েরই শান। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা পেশ ও প্রার্থনা জাপন একমাত্র আল্লাহর নিকটেই সিদ্ধ এবং তাঁরই জন্য সুনির্দিষ্ট।
যেমন আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন,
আর রসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা গ্রহণ কর, দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর (যা করতে আদেশ করেন তা পালন কর) এবং যে কাজ করতে নিষেধ করেন তার থেকে বিরত থাক। (সূরা হাশর ৭)
কেননা হালাল (সিদ্ধ কাজ) হচ্ছে তা-ই যা আল্লাহ এবং তাঁর রসূল হালাল করেছেন আর হারাম হচ্ছে তা-ই যা আল্লাহ এবং তার রসূল হারাম করেছেন। (সুতরাং শরী'আতের বিধান প্রদানে আল্লাহর পরই রসূলুল্লাহ ﷺ এর ভূমিকা) কিন্তু নির্ভরশীলতা প্রশ্নে আল্লাহর সঙ্গে অপর কাউকেই সংযুক্ত করা চলবে না- তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল ﷺ কেও নয়।
তাই নাবী-রসূল ও মুমিন-মুসলিমের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে:
"তারা বলেন, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"
এ কথা বলা হয়নি:
"আমাদের জন্য আল্লাহ এবং (তাঁর সঙ্গে) তাঁর রসূল যথেষ্ট।" কুরআন মাজীদের অন্যত্র বলা হয়েছে:
"হে নাবী! আপনার জন্য এবং মুমিনদের মধ্যে যারা আপনার তাবেদারী করে চলে তাদের সকলের জন্য (সর্ব ব্যাপারে) আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আনফাল ৬৪)
এই আয়াতের এই অর্থই নিশ্চিতভাবে বিশুদ্ধ এবং অখণ্ডনীয়, অন্য অর্থ ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
এই কারনেই তাওহীদের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ ('আ.) এবং তাওহীদের রূপকার মুহাম্মাদ ﷺ এর পবিত্র যবানে সদা উচ্চারিত কালেমা ছিল-
"আমাদের জন্য (সর্ব বিষয়ে) আল্লাহই যথেষ্ট, সর্বোত্তম ও সুন্দরতম নির্ভরস্থল হচ্ছেন তিনি।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00