📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 কুতুব, গাউস প্রভৃতি সম্পর্কে জনসাধারণের ভ্রান্ত ধারণা এবং তাঁর নিরসন

📄 কুতুব, গাউস প্রভৃতি সম্পর্কে জনসাধারণের ভ্রান্ত ধারণা এবং তাঁর নিরসন


ফতোয়া জিজ্ঞাসাকারী তার প্রশ্নে কুতুব, গাউস প্রভৃতি সম্পর্কে যে কথা জানতে চেয়েছেন তার জওয়াব হচ্ছে এইঃ
এই ব্যাপারে লোকদের মধ্যে অনেক দলই - গাউস, কুতুব এর অস্তিত্বের সমর্থক, তারা তাদের বিশ্বাসের যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে তা সম্পূর্ণ বাতিল, দ্বীন ইসলাম তথা ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদীসে-সহীহায় তার কোনই সমর্থন মিলে না।
দৃষ্টান্ত পেশ করছি। কতক লোকে এই ধারণা পোষণ করে থাকেন যে, গাউস এমন এক সত্তা যার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট জীবসমূহের রিযক অর্থাৎ জীবিকা অর্জিত হয়ে থাকে আর তাদের সাহায্যেই দুশমনের বিরুদ্ধে সহায়তা অর্জিত হয়ে থাকে! এমন কি ঊর্ধ্ব লোকের ফেরেশতা এবং পানির গর্ভে সঞ্চারমান মৎস্যসমূহও তার ওয়াসীলাতেই সাহায্য লাভ করে থাকে। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এটা এমন এক কথা যা নাসারাগণ ঈসা ('আ.) সম্বন্ধে বিশ্বাস পোষণ করে থাকে আর রাফিযীরা (গালিয়াগণ) আলী (রাযি.) সম্বন্ধে এ ধরনের ই'তিকাদ পোষণ করে। আর এ হচ্ছে সুস্পষ্ট কুফর। যারা এ রকম গুমরাহীর কথা কলবে তাদেরকে বলতে হবে, তাওবাহ কর। যদি তাওবাহ করে, ভাল।
কিন্তু জীব সমূহের মধ্যে এমন কেউ নেই- না ফেরেশেতাদের মধ্যে, না কোন মানুষের মধ্যে- যার ওয়াসীলায় আল্লাহর কোন সৃষ্ট জীবের সাহায্য লাভ হয়ে থাকে। এ ধরনের কথা মুসলমানদের সর্বসম্মত রায় অনুসারে কুফরের পর্যায়ভুক্ত।

কতক লোক বলে থাকে যে, পৃথিবীতে ৩১০ জনের কিছু বেশী এমন সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে যাদেরকে বলা হয় নুজাবা (নজীব)।
এদের মধ্যে বেছে ৭০ জনকে নির্বাচিত করা হয় যাদেরকে বল হয় নূকাবা (নকীব)। এই ৭০ জনের মধ্যে রয়েছেন ৪০ জন এমন পুরুষ যাদের বলা হয় আবদাল, আবার তাদের মধ্যে রয়েছেন ৭ জন আকতাব (কুতুব) এই ৭ জনের মধ্যে আছেন ৪ জন যাদের বলা হয় আওতাদ, অতঃপর ঐ চার জনের মধ্যে আছেন এক ব্যক্তি সত্তা যার নাম গাউস- তিনি অবস্থান করেন মাক্কাহ মুয়ায্যমায়। দুনিয়ার বাসিন্দাদের উপর যখন খাদ্য অথবা অন্য কোন ব্যাপারে কোন বালা-মুসীবত নাযিল হয়ে যায়, তখন তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিপদ নিরসনের জন্য প্রথমোল্লেখিত নূজাবাদের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় যাদের সংখ্যা ১৩০ জন এর কিছু উপরে। অতঃপর নূজাবাগণ ৭০ জন নুকাবার দিকে, সেই ৭০ জন নূকাবা ৪০ জন আবদালের দিকে, তারা আবার ৭ জন আকতাবের নিকট তারা পুনঃ ৪ জন আওতাদের নিকট এবং সর্বশেষে তারা তাদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি-সত্তা গাউসের দিকে ধাবিত হয়।
কতক লোক উল্লেখিত সংখ্যা, নাম এবং পদমর্যাদার মধ্যে কিছু কমবেশী ও পার্থক্য করে থাকে। কেননা তাদের সম্বন্ধে বহু রকম উক্তি শুনতে পাওয়া যায়। বহু অদ্ভূত এবং উদ্ভট কথাও তাদের সম্বন্ধে প্রচারিত হয়ে থাকে। কেউ বলে, গাউস এবং যুগের খিযর ('আ.)-এর নামে আসমান থেকে মাক্কাহ মুয়ায্যমায় একটা সবুজ পত্র অবতীর্ণ হয়ে থাকে। এ ধারণা ঐ সব লোক পোষণ করে থাকে যাদের বিশ্বাস হচ্ছে এই যে, খিযর বেলায়েতের একটি পর্যায়। তাদের মতে প্রত্যেক যুগে একজন করে খিযর থাকেন। খিযর সম্বন্ধে তাদের দু' রকম কথা শুনতে পাওয়া যায় আর এগুলো সমস্তই বাতিল, প্রত্যাখ্যাত এবং অযোগ্য। কেননা, আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদে এবং রসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাতে এর কোন ভিত্তি নেই। সালফে- সালিহীনের মধ্যে কেউ এ ধরনের কথা বলে যাননি। এ ধরনের কোন কথা না বলেছেন শরী'আতের কোন ইমাম, না পূর্ব যুগের মা'রেফতের কোন বড় মাশায়েখ।

আর এ কথা কে না জানে যে, সৃষ্ট জীব তথা মনুষ্যকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ যে সত্তা সেই মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ এবং তার শ্রেষ্ঠ চার শিষ্য সিদ্দীকে আকবর, ফারুকে আযম, উসমান যুন নূরাইন এবং আমীরুল মুমিনীন আলী (রাযি.) ছিলেন নাবীদের পর মর্যাদার শ্রেষ্ঠ, কিন্তু এঁরা সবাই মাক্কাহ ছেড়ে মাদীনাহয় অবস্থান করে গেছেন। এঁদের মধ্যে কেউই (হিজরতের পর থেকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত) মাক্কাহয় বসবাস করেননি।
কেউ কেউ মুগীরা ইবনে শু'বার গোলাম হেলাল সম্বন্ধে বলে থাকে যে, তিনি সাতজন কুতুবের এক ছিলেন তারা এর সমর্থনে একটা 'হাদীসও' পেশ করে থাকে। কিন্তু সেই 'হাদীসটি' হাদীস-শাস্ত্র বিশারদদের সর্বসম্মত মতে বাতিল।
এ ধরনের কতিপয় হাদীস যদিও আবূ নায়ীম (রহ.) হিলিয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থে এবং শাইখ আবু আবদুর রহমান আসসালমা তার কোন কোন গ্রন্থে রিওয়ায়াত করেছেন, তার দ্বারা ধোঁকায় পড়া এবং নিজেদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলা উচিত নয়। কেননা, তাদের এসব সঙ্কলিত গ্রন্থে একদিকে যেমন সহীহ এবং হাসান হাদীস সঙ্কলিত হয়েছে- তেমনি তাতে যঈফ, মাউযু এবং মিথ্যা হাদীসও স্থান পেয়েছে যেগুলোর প্রক্ষিপ্ত হওয়া সম্বন্ধে হাদীসাভিজ্ঞ আলিমদের মধ্যে কোনই মতভেদ নেই।
হাদীস সংকলকগণের মধ্যে কেউ কেউ যেরূপ রিওয়ায়াত শ্রবণ করেছেন, ঠিক সেরূপই লিপিবদ্ধ করেছেন- তারা কোন্ রিওয়ায়াত সহীহ, কোন্টি বাতিল সে সব বিচার বিবেচনা করার ও পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। অপরপক্ষে সত্যনিষ্ঠ আহলে হাদীসগণ তথা মুহাক্কিক মুহাদ্দিসগণ কখনই এরূপ করতেন না। তারা হাদীস পরীক্ষা করে দেখতেন এবং তাদের বিচারে যেগুলো মওযূ-জাল এবং বাতিল বলে সাব্যস্ত হত তারা রিওয়ায়াত করতেন না। কারণ তারা সহীহ বুখারীতে রসূল ﷺ এর এই হাদীস সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন যাতে বলা হয়েছেঃ
"যে ব্যক্তি এমন এক হাদীস রিওয়ায়াত করে যে হাদীস সম্পর্কে তার ধারণা এই যে, তা মিথ্যা, সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদীদের অন্যতম।"

মোট কথা, প্রত্যেক মুসলমানই জানে যে, বাঞ্ছিত কোন বস্তুর জন্য একমাত্র আল্লাহর কাছেই আবেদন জানাতে হয় অথবা আসমানী কোন বালা মুসীবত যখন নাযিল হয়, তখনই সেই ভয় ও বিপদ থেকে উদ্ধার লাভের জন্য আল্লাহর নিকটে নিবেদন পেশ করতে হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, বৃষ্টির যখন একান্ত প্রয়োজন তখন বৃষ্টি না হলে তারা ইসতিস্কার নামায পড়ে (সময়মত শস্য উৎপাদনের জন্য) পানি বর্ষণের প্রার্থনা জানায়। আর চন্দ্র গ্রহণ, সূর্য গ্রহণ, সাইক্লোন, ভূমিকম্প কুজঝটিকায় (অথবা ট্রেন, বাস, জাহাজ, নৌকা প্রভৃতির দুর্ঘটনায়) বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য মুসলমান একমাত্র একক লা-শারীক আল্লাহর শরণাপন্ন হয়ে থাকে। তাঁকেই তারা একমাত্র বিপত্তারণ বলে বিশ্বাস করে। জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য একমাত্র তাঁরই উপর ভরসা রেখে তাঁকেই আকুল হৃদয়ে কাতর স্বরে ডাকতে থাকে। তখন তারা অপর কাউকেই আল্লাহর শরীক ভাবে না। বিপদ মুক্তির জন্য তাঁর সঙ্গে অপর কাউকেই তারা ডাকে না।
আর প্রকৃত কথা এই যে, কোন মুসলিমের জন্য এটা সিদ্ধ নয় যে, নিজের কোন অভাব মিটান ও প্রয়োজন সিদ্ধির জন্য আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকে মাধ্যম রূপে পাওয়ার নিমিত্ত এদিক সেদিক ধন্না দেয়। তার পক্ষে এটাও মোটেই কাম্য নয় যে, ইসলাম গ্রহণ ও তাওহীদ বরণের পর এ ধারণা পোষণ করে যে, কোন নির্দিষ্ট মাধ্যম ছাড়া (কুরআন ও হাদীসে যার কোনই দলীল নেই) তাদের দু'আ কবুল হতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্যযোগ্য। আল্লাহ বলেন,
"যখন মানুষের উপর কোন ক্ষতিকর কিছু আপতিত হয়, তখন সে শায়িত, উপবিষ্ট অথবা দণ্ডায়মান অবস্থায় আমার নিকট আহবান জানায়, (কিন্তু) যখন আমি তার উপর আপতিত ক্ষতিকর বস্তুটি অপসারিত করে দেই, তখন সে এমনভাবে চলাফেরা করে যেন তার উপর আপতিত ক্ষতিকর বস্তুর আপসারণের জন্য আমার নিকট কোন আহ্বানই সে জানায়নি।" (সূরা ইউনুস ১২)

"যখন সমুদ্রে তোমাদেরকে কোন বিপদাপদ স্পর্শ করে, তখন তোমরা আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে ডেকে থাকো তারা সবাই তখন হারিয়ে যায়।" (সূরা বানী ইসরাঈল ৬৭)

"(হে রসূল) আপনি বলুন: তোমরা ভেবে দেখ- দেখি তোমাদের উপর আল্লাহর কোন শাস্তি যদি আপতিত হয় অথবা তোমাদের নিকট যদি 'কিয়ামাত' উপস্থিত হয়ে যায়, তখন কি তোমরা সাহায্যের জন্য আহবান করবে আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে? (উত্তর দাও) যদি তোমরা সত্যবাদী হও। না, বরং তোমরা আহবান করবে তাঁকেই, তিনি ইচ্ছা করলেই তোমাদের সে আপদ যা মোচনের জন্য তোমরা তাঁকে আহবান জানিয়েছিলে দূর করে দেবেন আর যাদেরকে তোমরা তাঁর শরীক করতে, তাদের তোমরা ভুলে যাবে।" (সূরা আল-আন'আম ৪০-৪১)

"নিশ্চয় আপনার পূর্বেও বহু জাতির নিকট আমি রসূল প্রেরণ করেছি, অতঃপর (তাদের কর্মফলের জন্য) আমি তাদেরকে অর্থ সঙ্কট ও আপদ দ্বারা বিপন্ন করেছি- যাতে তারা আল্লাহর নিকট বিনয়নম্র হয়। কিন্তু আমার পরীক্ষা যখন এসে গেল তাদের নিকটে তারা কেন বিনীত হল না? বরং তাদের অন্তরগুলো আরও কঠোর হল এবং তারা যা করছিল শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিয়েছিল।" (সূরা আল-আন'আম ৪২-৪৩)

রসূল সাহাবাদের কল্যাণার্থে ইসতিস্স্কার (পানি বর্ষণের প্রার্থনা জানিয়ে) দু'আ করতেন। এই দু'আ তিনি করতেন কখনও নামায পড়ে আর কখনও নামায না পড়েও। ইসতিস্কার নামাযে আর সলাতে কুসুফে (সূর্য গ্রহণের সময় পঠিত নামায) তিনি নিজে ইমামাত করেছেন। এছাড়া মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য তিনি নামাযে দু'আয়ে কুনূত পড়তেন। এভাবে তার ইন্তিকালের পর খুলাফায়ে রাশেদীন, মুজতাহিদীন, মাশায়েখে কুবরা অর্থাৎ বড় বড় সাধকদের মধ্যে এই প্রথাই প্রচলিত ছিল এবং তারা সব সময় এভাবেই আমল করে গিয়েছেন।
এ জন্যই বলা হয়েছেন যে, তিনটি (বদ্ধমূল) ধারণায় কোনই ভিত্তি নেই- ১। বাবে নাসিরিয়া ২। মুনতাযরে রাওয়াফেয এবং ৩। গাউসে জাঁহা।
নাসিরিয়া ফির্কা এই দাবী জানিয়ে আসছে যে, বাব আছে এবং তারই উপর বিশ্বজগৎ কায়িম রয়েছে।
এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, এই সত্তা তো মওজুদ রয়েছে কিন্তু এ সম্পর্কে নাসিরিয়াদের উক্ত সত্তা সম্পর্কিত দাবী সম্পূর্ণ বাতিল।
আর মুহাম্মাদ ইবনে হাসান (রহ.) হচ্ছেন আল মুনতাযর। আর মাক্কাহয় অবস্থানরত অদৃশ্য গাউস প্রভৃতি এমন ধরনের মিথ্যা যার মূলে সত্যের লেশমাত্রও নেই। এমনিভাবে যারা দাবী করে থাকে যে, কুতুব, গাউস এমন সুবিজ্ঞ সত্তা যারা বিশ্বের সর্বত্র অবস্থিত আউলিয়াদের চিনেন এবং তাদের সাহায্যও করে থাকেন, তাদের এ দাবীও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা স্বয়ং আবু বাক্ সিদ্দীক এবং 'উমার ফারুক (রাযি.)-এর ন্যায় বুযুর্গ সাধকও তামাম আউলিয়াকে জানতেন না, চিনতেন না, তাদের সাহায্যও করতেন না।
যিনি ছিলেন সমগ্র মানবমণ্ডলীর সরদার, সেই মহা মানব ও মহা নাবী তার উম্মতদের মধ্যে যাদেরকে এই দুনিয়ায় দেখেননি-দেখার সুযোগ পাননি, তাদেরকে তিনি কিয়ামাত দিবসে এমনিতেই চিনতে পারবেন না, চিনতে পারবেন কেবল তাদের ওযুর চিহ্ন দেখে। এই-ই যখন সাইয়িদুল মুরসালীন-সর্বশ্রেষ্ঠ নাবীর অবস্থা, তখন অন্যদের ব্যাপারে ঐ সব সত্য বিকৃতিকারী, মিথ্যাবাদী ও পথভ্রষ্টদের ধারণা কী করে সঠিক ও দুরস্ত হতে পারে?
তার চাইতেও যুক্তি নির্ভর কথা এই যে, রসূল ﷺ আর আল্লাহর ওলী আউলিয়াদের সংখ্যা এত অগণিত যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অপর কেউ সে সংখ্যা সম্পর্কে অবহিত নয়। ওলী আউলিয়া তো পরের কথা, খোদ নাবী ও রসূলদের সকলকে তো নয়ই, অধিকাংশকেও স্বয়ং রসূল জানতেন না, অথচ তিনি হচ্ছেন তাদের সকলের নেতা এবং তাদের মুখপাত্র।
আল্লাহ স্বয়ং কুরআন মাজীদে বলেছেনঃ
"(হে রসূল!) আমি নিশ্চয় আপনার পূর্বে রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি, যাদের মধ্যে কতকের কথা আমি আপনার নিকট বর্ণনা করেছি, কতকের (অধিকাংশের) কথা আপনার নিকট উল্লেখ করিনি।" (সূরা মুমিন ৭৮)

এরপর আরও দেখা যায় মূসা ('আ.) এর মত জবরদস্ত রসূল খিযর ('আ.) এর ন্যায় অনন্য ওলীউল্লাহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত ছিলেন আর মূসা ('আ.) খিযর ('আ.)-কে চিনতেন না। নিগূঢ় জ্ঞানের অধিকারী খিযর ('আ.) সম্বন্ধে আল্লাহর তরফ থেকে অবহিত হয়ে মূসা ('আ.) যখন তার সন্ধানে বের হলেন এবং সাক্ষাৎ লাভের পর তাকে সালাম জানালেন, তখন সেই সালামের শব্দ শুনে বিস্ময়াবিষ্ট খিযর ('আ.) বিস্ময়ের সঙ্গেই জিজ্ঞেস করলেন; এখানে সালাম শব্দ উচ্চারিত হলো কেমন করে, কার মুখ দিয়ে? তখন মূসা ('আ.) বললেন, আমারই মুখ দিয়ে আর আমি হচ্ছি মুসা! তখন খিযর ('আ.) বললেন, কোন্ মুসা, বানী ইসরাঈলের মুসাঃ
জওয়াবে মূসা ('আ.) বললেন, হাঁ আমি সেই মূসাই বটে? ইতোপূর্বে তার নাম তাকে জানান হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি তাকে দেখার (অথবা তার সম্বন্ধে বেশী কিছু জানার) সুযোগ পাননি।

📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 খিযর (আ.) জীবিত নেই : ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই মারা গিয়েছেন

📄 খিযর (আ.) জীবিত নেই : ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই মারা গিয়েছেন


যে সব লোক মনে করে যে, খিযর ('আ.) হচ্ছেন সকল ওলী আউলিয়ার নকীব এবং তাদের সকলের অবস্থা সম্বন্ধে তিনি ওয়াকেফহাল, তাদের ধারণা সবই মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। প্রকৃত সত্য তা-ই যা তত্ত্ববিদ-মুহাক্কিকগণ তার সম্বন্ধে বলে গেছেন। তাঁরা বলেছেন, "ইসলামের পূর্ব যুগেই অর্থাৎ রসূলুল্লাহ ﷺ এর আবির্ভাবের পূর্বেই খিযর ('আ.) ইন্তিকাল করেছেন।"
তিনি যদি রসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে জীবিত থাকতেন, তাহলে তিনি অবশ্যই রসূলুল্লাহ ﷺ এর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনতেন, তাঁকে মেনে চলতেন এবং তাঁর সঙ্গে জিহাদে শরীক হতেন। কেননা রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমসাময়িক এবং পরবর্তী সকল জগৎবাসীর জন্য তাঁর আনুগত্য বরণ আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন।
এছাড়া ঐ সময়ে কাফিরদের মধ্যে অবস্থান করে পানিতে বিপন্ন নৌকা প্রভৃতি রক্ষার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার চাইতে তার পক্ষে রসূল ﷺ এর সাহচর্যে মক্কায় ও মাদীনাহয় অবস্থিতি, সহাবীদের সঙ্গে মিলে জিহাদে অংশ গ্রহণ এবং দ্বীনের কাজে তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান অধিকতর বাঞ্ছনীয় হ'ত।
এরপরও প্রশ্ন করা যেতে পারে, (সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নাবীর মাধ্যমে দীন মুকাম্মল হওয়ার পর) মুসলমানদের ধর্মীয় কাজে এবং পার্থিব বিষয়ে তার প্রয়োজনটাই বা কী? দ্বীনের সব কিছুই তো আখিরী নাবী ﷺ এর মাধ্যমে সকলের নিকট পৌছিয়ে দেয়ার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে।
নাবী কিতাব এবং হিকমাত তথা কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে দ্বীন দুনিয়ার সব বিষয়ে পুরোপুরি পরিষ্কার করে দিয়ে গেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন-তাঁকে ছাড়া আর কারোরই অনুসরণ করা চলবে না, এমনকি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপকারী (কালীমুল্লাহ) ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন রসূল মূসা ('আ.)-এরও নয়। রসূলুল্লাহ ﷺ এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন:
"মূসা ('আ.) যদি এই সময় জীবিত থাকতেন আর তোমরা আমাকে ছেড়ে তার অনুসরণ করতে, তাহলে তোমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে।"
অর্থাৎ রসূলুল্লাহ ﷺ এর আবির্ভাবের পর নবুওত ও রিসালাতের সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই। অন্য কারও আবির্ভাব ঘটলে তাঁর দ্বীনের অনুসরণ ব্যতীত গত্যন্তর নেই। এজন্যই যখন ঈসা ('আ.)-এর আসমান থেকে অবতরণ ঘটবে, তখন তিনি মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি অবতীর্ণ কুরআন মাজীদ এবং তাঁর সুন্নাত মুতাবিক হুকুম আহকাম জারী এবং বিচারাদি নিষ্পন্ন করবেন। অতএব সেই রহমাতে আলম বিশ্ব কল্যাণের মূর্ত প্রতীকের নবুওত জারী থাকতে খিযর ('আ.) বা অন্য কারোর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?
এছাড়াও রসূল তাঁর উম্মতকে ঈসা ('আ.)-এর আসমান থেকে অবতরণের সংবাদ প্রদান প্রসঙ্গে বলেছেন:
"সেই উম্মত কী করে ধ্বংস হতে পারে যার সূচনায় রয়েছি আমি আর শেষে থাকবেন ঈসা ('আ.)।"
সুতরাং এই দুই বুযুর্গ নাবী যারা ইব্রাহীম ('আ.), মূসা ('আ.) এবং নূহ (আ.) এর ন্যায় দৃঢ়-সঙ্কল্প ও মহত্তম রসূল রূপে পরিচিত তারা এবং বিশেষ করে আদম সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম পুরুষ মুহাম্মাদ রসূল নিজেকে যখন উম্মাতের সাধারণ জনবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোন সময়েই গোপনীয়তা এখতিয়ার করেননি, তখন যিনি কোন ক্রমেই তাদের সমপর্যায়ভুক্ত হতে পারেন না সেই খিযর ('আ.) কী করে অদৃশ্য রহস্যে আবৃত থাকতে পারেন?
খিযর ('আ.) যদি সত্য সত্যই (কিয়ামাত অবধি) চিরঞ্জীব হয়ে থাকেন, তাহলে রসূলুল্লাহ ﷺ কেন তা কস্মিনকালে ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করলেন না? কেন তিনি প্রকাশ্যে উম্মতকে তা বলে গেলেন না? খুলাফায়ে রাশিদীনের মত বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকেও সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র অবহিত করলেন না?
তারপর যারা বলে থাকে, খিযর ('আ.) হচ্ছেন ওলী আউলিয়াদের নকীব তাদের জিজ্ঞেস করা উচিত, তাকে নকীব নির্বাচন করল কে? সত্য কথা এই যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এর সহাবীগণই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম আউলিয়া আর খিযর ('আ.) তাদের অন্তভুক্ত নন।
জেনে রাখা প্রয়োজন যে, খিযর ('আ.) সম্পর্কে যত রকম বৃত্তান্ত এবং কাহিনী পেশ করা হয়েছে তার কতক মিথ্যা ও কপোলকল্পিত। হয়ত কোন সময় কোন এক ব্যক্তি আচানক কাউকে দূর থেকে দেখল, তখন সে ধারণা করে নিল যে, তার দেখা লোকটি খিযর ('আ.) না হয়ে যায় না।
অতঃপর সে লোকেদের মধ্যে প্রচার করে দিল যে, খিযর ('আ.)-কে সে স্বচক্ষে দেখেছে। এমনিভাবে কখনও কেউ কাউকে দেখে ধরে নিল যে, সে নিষ্পাপ মুনতাযর ইমামকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছে। যার আবির্ভাবের আশায় রাফিজীরা দিনের পর দিন প্রতীক্ষারত-তিনি আবির্ভূত হয়ে গেছেন! তারপর সে এই কথা প্রচারে লেগে গেল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, যখন কোন ব্যক্তি তাকে খিযর ('আ.) সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতো, তখন তিনি তার জওয়াবে বলতেন, যে ব্যক্তি তোমাকে এরূপ গায়িবী খবর শুনিয়েছে সে তোমার প্রতি সুবিচার করেনি। এ সবই হচ্ছে শয়তানী ওয়াসওয়াসা। মানুষের মুখে খিযর সম্পর্কে এসব আজগুবী কাহিনী যে জারী করে দিয়েছে সে শয়তান ভিন্ন আর কিছুই নয়। এ সম্পর্কে আমি (ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ) অন্যত্র বিস্তৃত আলোচনা করেছি।

কেউ কেউ বলেন, 'কুতুব' আর 'গাউস' হচ্ছেন 'ফর্দে জামে'। এই 'ফর্দে জামে' এর অর্থ যদি এই হয় যে, উম্মাতের মধ্যে (প্রতি যুগে) এমন এক ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব থাকে যিনি যুগের সমস্ত ব্যক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তাহলে সেটা সম্ভব। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো সম্ভব যে, ঐ এরূপ বিশিষ্ট ব্যক্তি এক না হয়ে দু'জনও হতে পারেন, তিনজনও হতে পারেন এবং চারজনও হতে পারেন যারা জ্ঞানে গুণে ও চরিত্র বৈশিষ্ট্যে একে অপরের সমান। অথবা এও হতে পারে যে, এক যুগে সমসাময়িক কালে বহু বিশিষ্ট লোকের এমন সমাবেশ ঘটে গেছে যাদের একেক জন একেক গুণ বৈশিষ্ট্যে অপর জন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করতে পারেন আর সেই বৈশিষ্ট্যগুলো মানের দিক দিয়ে হয়ত প্রায় সমান সমান কিংবা কাছাকাছি।
অতঃপর বক্তব্য এই যে, কোন যুগে কোন অবস্থায় যদি এক ব্যক্তি সেই যুগের সকল লোকের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হয়, তাহলে তাকে 'কুতুব' ও 'গাউসে জামে' রূপে আখ্যায়িত করতে হবে-এমন কোন কথা নেই। এরূপ আখ্যায়ন সরাসরি বিদ'আত-এক নবাবিষ্কৃত কাজ। আল্লাহর কিতাবে এর কোনই প্রমাণ নেই। সলফে সালিহীনের মধ্যে কেউ কিংবা ইমামগণের মধ্যে কোন একজন তাদের মুখ দিয়ে এ ধরনের কোন কথা উচ্চারণ করেননি। তবে প্রাথমিক যুগে কোন কোন লোক সম্বন্ধে এ ধারণা পোষণ করা হতো যে, তিনি যুগশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম। (এরূপ ধারণা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং প্রতিটি দেশে প্রতি যুগে এরূপ ধারণা ও মূল্যায়নের নিয়ম চলে আসছে-অনুবাদক) কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত ধারণার পর্যায়েই সীমিত থাকত। সমষ্টিগতভাবে কাউকে শ্রেষ্ঠত্বের লেবেল লাগিয়ে সুনির্দিষ্ট করা হত না অর্থাৎ ব্যক্তিগত দলগত বিশ্বাসের পর্যায়ে রূপান্তরিত করা হত না।
এ কথা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য যে, যারা কোন একজনকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করে তার উপর ঈমান রাখতো, তাদের মধ্যে কতক জন দাবী করতো যে, কুতুব আকতাবের সিলসিলা ইমাম হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব (রাযি.) থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী যুগের মাশায়েখ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে এসেছে। এই যে ধারণা- এটা আহলে সুন্নাত মাযহাব অনুসারে তো সহীহ নয়-ই এমনকি রাফিযী (শিয়া) মতেও নয়। এই মত অনুসারে শ্রেষ্ঠতম সাধক বা কুতুবের আসনে সমাসীন হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হননি সাধক চূড়ামণি আবু বাক্স, তাপস শ্রেষ্ঠ 'উমার ফারুক, উসমান যুন নূরাইন আর আসাদুল্লাহিল গালিব আলী ইবনে আবি তালিব। আনসার ও মুহাজিরীনের মধ্যে কুরআনে প্রশংসিত সাবেকুনাল আওওয়ালুন-যুগের অগ্রবর্তী দলের তো কোন কথাই নেই। অথচ সেই মহান বুযুর্গ ব্যক্তিত্বগুলোকে বাদ রেখে প্রথম কুতুবরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে হাসান (রাযি.)-কে যিনি রসূল ﷺ এর মহাপ্রয়াণের সময় ভালমন্দ বিচার ক্ষমতা অর্জনের এবং বালেগ পদবাচ্য হওয়ার মত বয়সে কোন রকমে কেবল পৌছেছিলেন।
উপরিউক্ত মতের পরিপোষক বড় বড় কতিপয় মাশায়েখের উক্তি আমার নিকট পৌছানো হয়েছে, যাতে তারা বলেছেন, কুতুব ফর্দে জামে'র মর্যাদায় যিনি অভিষিক্ত, তার জ্ঞান মার্গ এতটা উর্ধ্বে পৌছে যায় যে, তা আল্লাহর কুদরতের সমর্পযায়ে উপনীত হয়। ফলে আল্লাহ যা জানেন তিনিও তা জানতে পারেন, আল্লাহ যে ক্ষমতা রাখেন তিনিও সেই ক্ষমতার অধিকারী হন। (নাউযুবিল্লাহ) তাদের মতে নাবী এই জ্ঞান ও শক্তির অধিকারী ছিলেন, তাঁর নিকট থেকে হস্তান্তরিত হয়ে উক্ত গুণ হাসান (রাযি.)-এর নিকট পৌঁছে যায়, আবার হাসান থেকে হস্তান্তরিত হয়ে পরবর্তী কুতুবের নিকট পৌঁছে। এভাবে উক্ত গুণ হস্তান্তরিত হতে হতে সমসাময়িক কুতুবের অধিকারে এসেছে। আমি এর জওয়াবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছি যে, এই আকীদা স্পষ্ট কুফ্র এবং জঘন্য মূর্খতা ভিন্ন আর কিছুই নয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ ফরমান: নূহ ('আ.) তার কওমকে বলেনঃ
"আমি তোমাদেরকে এমন কথা বলি না যে, আমার কাছে রয়েছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ আর (এ কথাও বলি না যে,) আমার কাছে গায়িবের সংবাদ আছে এবং আমি এটাও বলি না যে, আমি (অতি মানুষ) ফেরেশতা বিশেষ।" (সূরা হুদ ৩১)
রসূলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহ ঘোষণা করতে বলছেন,
"বলে দাও (হে রসূল!) আমি নিজেও তো নিজের জন্য মঙ্গল ও অমঙ্গলের মালিক নই। কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই ঘটবে। আর দেখ! আমি যদি গায়িবের খবর জানতে পারতাম, তাহলে তো প্রভৃত কল্যাণ হাসিল করে নিতাম, পক্ষান্তরে কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারত না।" (সূরা আল আরাফ ১৮৮)

"তারা বলে থাকে, আমাদের যদি এ ব্যাপারে কিছু এখতিয়ার থাকতো তা হলে আমাদেরকে (এখানে) এসে নিহত হতে হত না।" (সূরা আলু ইমরান ১৫৪)

"তারা বলে, এ ব্যাপারে আমাদেরও কি কিছু এখতিয়ার আছে? (হে রসূল!) আপনি বলে দিন, এখতিয়ারের সবটারই মালিক-মুখতার হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ।" (সূরা আলু ইমরান ১৫৪)

"হে মুমিনগণ! আল্লাহ এজন্য তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন-যাতে করে তিনি বিধ্বস্ত করে দিবেন কাফিরদের একটা অংশকে অথবা এমনভাবে হতমান করে দেবেন যে, তার ফলে তাদেরকে ফিরে যেতে হবে সর্বনাশগ্রস্ত অবস্থায়।"
"(হে রসূল!) এ ব্যাপারে কোনও ইখতিয়ার আপনার নাই, হয়ত তিনি তাদের ক্ষমা করে দিবেন, হয়ত বা তিনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন, কারণ তারা হচ্ছে জালিম।" (সূরা আলু ইমরান ১২৭-১২৮)

"(হে রসূল!) আপনি তাকে সৎ পথে আনতে পারেন না যাকে আপনি আনতে চান, বস্তুতঃ আল্লাহই সৎ পথে নিয়ে আসেন যাকে তিনি চান। আর তিনিই ভাল জানেন কারা হিদায়াতের পথে আসবে।" (সূরা আল কাসাস ৫৬)

উপরোধৃত কুরআনী আয়াত থেকে জানা যাচ্ছে যে, জ্ঞান এবং কুদরতের মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহ। এটা সম্পূর্ণরূপে তাঁরই অধিকারভুক্ত। এই অধিকারত্বে স্বয়ং রসূলুল্লাহ এটি কেউ বসান কোন ক্রমেই জায়িয নয়। স্বয়ং রসূলুল্লাহ এটি কেউ বসান কোন ক্রমেই জায়িয নয়। হাসান (রাযি.) তো অনেক দূরের কথা।

📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা

📄 রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা


রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসা সম্বন্ধে আমাদেরকে যা হুকুম করা হয়েছে তা হচ্ছে তার এতা'আৎ। অর্থাৎ তাঁর আজ্ঞা মেনে চলতে হবে। তাঁকে মেনে চললে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই মানা হবে। এ কথা আল্লাহ জাল্লাজালাল স্বয়ং বলে দিয়েছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়:
"যে ব্যক্তি রসূল ﷺ এর আজ্ঞা মেনে চলল, সে প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহর আজ্ঞা মেনে চলল।" (সূরা আন-নিসা ৮০)

"তোমরা যদি আল্লাহকে মহব্বত করে থাক, তাহলে আমার অনুসরণ করে চল ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে মহব্বত করবেন।" (সূরা আলু ইমরান ৩০)

আমাদেরকে কুরআন মাজীদে এই হুকুমও দেয়া হয়েছে যে, আমরা যেন রসূলুল্লাহ ﷺ কে তাঁর ব্রত পালনে সর্বতোভাবে সহায়তা করি, তাঁর শক্তি বর্ধিত করি এবং তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করি। এ ছাড়াও তাঁর প্রতি রয়েছে আমাদের আরও বহু কর্তব্য যার বিস্তৃত বিবরণ কুরআন মাজীদ এবং সুন্নাতে নাববীতে বিধৃত রয়েছে। সর্বোপরি তাঁকে ভালবাসা আমাদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে। সে ভালবাসা হবে সব ভালাবাসার উর্ধ্বে। ভাই-বোন, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, এমনকি নিজের জীবনের চাইতেও তাঁকে বেশী ভালবাসতে হবে। তিনিই যে আমাদের প্রকৃত হিতকারী। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছেঃ
"তাদের নিজেদের চাইতেও নাবী মুমিনদের প্রতি অধিকতর আগ্রহশীল।" (সূরা আহযাব ৬)

(হে রসূল!) আপনি বলে দিন: তোমাদের পিতাগণ, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভ্রাতৃবর্গ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের গোত্রগোষ্ঠী এবং তোমাদের সেই ধন-সম্পদ যা তোমরা সঞ্চয় করে রেখেছ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তোমরা যার মন্দাপড়ার আশঙ্কা করে থাক এবং তোমাদের বাসগৃহ সমূহ যাতে (বাস করে) তোমরা সন্তোষপ্রাপ্ত, (এ সব) যদি তোমাদের নিকট আল্লাহর চাইতে, আর রসূলের চাইতে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদের চাইতে অধিকতর প্রিয় হয় তাহলে আল্লাহর ফরমান আসার সময় পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করতে থাক। (সূরা তওবাহ ২৪)

আর হাদীসে এসেছে: রসূল ﷺ বলেছেন,
"সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন ন্যস্ত, তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না আমি (রসূলুল্লাহ) তার নিকট তার পিতামাতা, তার সন্তান সন্ততি এবং অন্য (সব) লোক থেকে প্রিয়তর হই।"

'উমার (রাযি.) এ কথা শুনে আরয করলেন,
"হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমার নিকট (দুনিয়ার) সব বস্তু হতে অধিকতর প্রিয় কিন্তু আমার নিজের জীবন ছাড়া। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে 'উমার! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার নিজের জীবন অপেক্ষাও আমি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় না হব ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি (কামিল) মুমিন হতে পারবে না। এ কথা শুনে 'উমার বললেন, তা হলে এখান নিশ্চয় আপনি আমার নিকট আমার নিজের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়।"
রসূলুল্লাহ ﷺ 'উমারের এই কথা শুনে বললেন, এখন তুমি হে 'উমার! (পূর্ণ পরিণত) মুমিন।

অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে:
যে ব্যক্তির মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করে:
১। সেই ব্যক্তি- যার নিকট আল্লাহ এবং তাঁর রসূল এই দু'জন ছাড়া অন্য সব কিছু হতে অধিকতর প্রিয় হয়।
২। সেই ব্যক্তি- যে কোন লোককে যখন ভালবাসে, তখন একমাত্র আল্লাহর ওয়ান্তেই তাকে ভালবাসে।
৩। সেই ব্যক্তি- যাকে আল্লাহ কুফরের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে ঈমানের আশীর্বাদ দ্বারা ধন্য করেন, সে পুনরায় কুফরীর দিকে ফিরে যেতে ঠিক তেমনই খারাপ জানে যেরূপ আগুনে ঝাপ দেয়ার কাজকে খারাপ জানে।"

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলা নিজের সেই প্রাপ্য হকসমূহও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলেন- যে হক আর কারোরই প্রাপ্য নয়। তিনি অনুরূপভাবে রসূলুল্লাহ ﷺ এর 'হক' সমূহও বিশদভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। আমি অন্যত্র অত্যন্ত বিশদভাবে এইসব 'হক' এর কথা আলোচনা করেছি। এখানে অতি সংক্ষেপে নমুনা স্বরূপ দু' একটি কথা বলছি:
আল্লাহ বলছেন:
"যে সব ব্যক্তি আজ্ঞাবহ হয় আল্লাহর এবং তাঁর রসূল -এর এবং (সঙ্গে সঙ্গে একমাত্র আল্লাহকে) ভয় করে এবং তাঁকে সমীহ করে অন্যায় কার্য হতে আত্মরক্ষা করে চলে, সাফল্য অর্জন করে থাকে তারাই।" (সূরা আন-নূর ৫২)
এই আয়াত থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে- হুকুম মেনে চলতে হবে আল্লাহর এবং তাঁর রসূলের- কিন্তু ভয় ও সমীহ করার পাত্র হচ্ছেন একমাত্র একজন এবং তিনি হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ। বান্দার ভয় ও সমীহ করার পাত্র হচ্ছেন একমাত্র তিনিই।
শরীয়তের বিধান দাতা হচ্ছেন আল্লাহ এবং রসূল উভয়েই কিন্তু বান্দার আশা আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণ-কর্তা একমাত্র আল্লাহ আর তিনি একমাত্র তিনিই এই ব্যাপারে যথেষ্ট। কুরআন মাজীদে বলা হচ্ছেঃ
"বস্তুতঃ (কতই না সুন্দর ও শুভ হতো তাদের পক্ষে) যদি তারা সন্তুষ্ট থাকত সেই বস্তু পেয়ে যা তাদেরকে দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং যদি তারা বলতো আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। অদূর ভবিষ্যতে আল্লাহ তাঁর রহমাতের ভাণ্ডার থেকে আরও দিবেন এবং তাঁর রসূলও-আর আমরা প্রত্যাশা করে থাকব একমাত্র আল্লাহরই দিকে-যাঙ্ক্ষা করে চলব একমাত্র তাঁরই নিকট।” (সূরা আত-তাওবাহ ৫৯)
কাজেই দেখা যাচ্ছে ইতা'আত অর্থাৎ হুকুম পালন করতে হবে, আজ্ঞাবহ হতে হবে আল্লাহর এবং রসূল উভয়ের, কিন্তু ভয় ও সমীহ করতে হবে একমাত্র আল্লাহকে, তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে।
অতএব বুঝা যাচ্ছে দান-প্রদান (আদেশ-নিষেধ প্রভৃতি) আল্লাহ এবং রসূল উভয়েরই শান। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা পেশ ও প্রার্থনা জাপন একমাত্র আল্লাহর নিকটেই সিদ্ধ এবং তাঁরই জন্য সুনির্দিষ্ট।
যেমন আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন,
আর রসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা গ্রহণ কর, দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর (যা করতে আদেশ করেন তা পালন কর) এবং যে কাজ করতে নিষেধ করেন তার থেকে বিরত থাক। (সূরা হাশর ৭)
কেননা হালাল (সিদ্ধ কাজ) হচ্ছে তা-ই যা আল্লাহ এবং তাঁর রসূল হালাল করেছেন আর হারাম হচ্ছে তা-ই যা আল্লাহ এবং তার রসূল হারাম করেছেন। (সুতরাং শরী'আতের বিধান প্রদানে আল্লাহর পরই রসূলুল্লাহ ﷺ এর ভূমিকা) কিন্তু নির্ভরশীলতা প্রশ্নে আল্লাহর সঙ্গে অপর কাউকেই সংযুক্ত করা চলবে না- তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসূল ﷺ কেও নয়।
তাই নাবী-রসূল ও মুমিন-মুসলিমের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে:
"তারা বলেন, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"
এ কথা বলা হয়নি:
"আমাদের জন্য আল্লাহ এবং (তাঁর সঙ্গে) তাঁর রসূল যথেষ্ট।" কুরআন মাজীদের অন্যত্র বলা হয়েছে:
"হে নাবী! আপনার জন্য এবং মুমিনদের মধ্যে যারা আপনার তাবেদারী করে চলে তাদের সকলের জন্য (সর্ব ব্যাপারে) আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আনফাল ৬৪)
এই আয়াতের এই অর্থই নিশ্চিতভাবে বিশুদ্ধ এবং অখণ্ডনীয়, অন্য অর্থ ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
এই কারনেই তাওহীদের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ ('আ.) এবং তাওহীদের রূপকার মুহাম্মাদ ﷺ এর পবিত্র যবানে সদা উচ্চারিত কালেমা ছিল-
"আমাদের জন্য (সর্ব বিষয়ে) আল্লাহই যথেষ্ট, সর্বোত্তম ও সুন্দরতম নির্ভরস্থল হচ্ছেন তিনি।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00