📄 শির্ক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হওয়ার দুটি প্রধান কারণ
অজ্ঞতা এবং প্রয়োজনের তাকীদ মানুষকে নিষিদ্ধ কাজের দিকে প্রভাবিত করে। যে ব্যক্তি সত্য সত্যই জ্ঞান রাখে যে, অমুক কাজটি খারাপ ও ক্ষতিকর এবং শরী'আত নিষিদ্ধ, সে কী করে জেনে শুনে ক্ষতিকর কাজ করতে পারে?
📄 অজ্ঞতা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ
সে সব লোক নিষিদ্ধ কাজ করে চলে তাদের মধ্যে রয়েছে কতক জাহেল এবং নাদান-অজ্ঞ এবং ভালমন্দের বোধ-রহিত। তারা উক্ত কাজের ক্ষতি এবং অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে অনুভূতি শূন্য। বাকী লোকের মনে এ বোধ রয়েছে যে, কাজটি অন্যায় কিন্তু তারা উক্ত কাজের প্রতি প্রলুব্ধ এবং এক অন্ধ আবেগে আকর্ষিত। উৎকট কাম ভাব এবং ভোগ প্রবৃত্তি তাদের হৃদয়কে অস্থির এবং চঞ্চল করে তোলে। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোন নিষিদ্ধ কাজে যে ক্ষতি ও অশুভ পরিণতি নিহিত রয়েছে- উক্ত কাজের সাময়িক আনন্দে ও সম্ভোগের মোহে তা আরও বর্ধিত হয়। কী ভয়ঙ্কর পরিণতি তার জন্য অপেক্ষা করছে সে তা মোটেই অনুধাবন করে না। অজ্ঞতার কারণে সে উক্ত ক্ষতি সম্পর্কে অনবহিত থেকে যায়। কিংবা ভোগ লিলা তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে একেবারে অন্ধ করে ফেলে। সে তার প্রবৃত্তির কেনা গোলামে পরিণত হয়। সে যা হক এবং প্রকৃত সত্য তা মোটেই অনুধাবন করতে পারে না। কেননা (হাদীসে এসেছে)
"কোন বস্তুর প্রেম অথবা কোন বস্তুর প্রতি অনুরাগ তোমাকে অন্ধ এবং বধির করে ফেলে। এজন্যই বলা হয়েছে, সাহেবে ইলম তথা বিদ্বান ও জ্ঞানী ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে থাকে।"
আবু আলীয়া বলেন, আমি রসূলুল্লাহ ﷺ এর সহাবীগণকে এই আয়াতের অর্থ এবং তাৎপর্য জিজ্ঞেস করি:
"বস্তুতঃ আল্লাহ সেই সব লোকের প্রতি প্রত্যাবর্তিত হন, তাদের তাওবাহ কবুল করেন যারা অপকর্ম করে থাকে অজ্ঞতা বশতঃ তারপর (সে সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর) শীঘ্রই (আল্লাহর দিকে ফিরে গিয়ে) তাওবাহ করে থাকে। [আল্লাহ কবুল করে থাকেন এই শ্রেণীর লোকদের তাওবাহ, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আন-নিসা ১৭)
আবু আলীয়া সহাবীগণের নিকট থেকে এই আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে যে উত্তর পেয়েছিলেন তা এখানে উল্লেখিত হয়নি। (তবে অন্যত্র দেখা যায় যে, সহাবীরা বলতেন যে, মানুষের দ্বারা যে গুনাহের কাজই সংঘটিত হয়ে থাকে তা ঘটে থাকে জাহেলী তথা অজ্ঞতা এবং জ্ঞানবিভ্রমের জন্যই।)
শরী'আতে যে সব কাজ নিষেধ হয়েছে তাতে (অপপ্রভাব-বিস্তারী) কী কী ক্ষতি নিহিত রয়েছে এবং শরী'আতে যে সব কাজের আদেশ প্রদান করা হয়েছে তাতেই বা কী কী (শুভ প্রভাব বিস্তারী) কল্যাণ রয়েছে সে সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনার স্থান এটা নয়। তবে মুমিন ব্যক্তির জন্য এটুকু জেনে রাখাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা যে সব কাজের হুকুম দিয়েছেন সেগুলো হয় পুরাপুরি কল্যাণের প্রতীক নতুবা তার ভিতরে রয়েছে কল্যাণের আধিক্য। আর যে সব কাজ তিনি করতে নিষেধ করেছেন তা হয় পুরাপুরি অকল্যাণের প্রতীক নতুবা তাতে অকল্যাণের আধিক্য রয়েছে। এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তা'আলা যে সব কাজের জন্য মনুষ্য জাতিকে নির্দেশ প্রদান করেছেন তাতে এরূপ মনে করার কারণ নেই যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার নিজের কোন প্রয়োজন রয়েছে বরং তাতে মানুষের নিজেরই কল্যাণ ও উপকার রয়েছে। আর যে কাজ করতে তিনি নিষেধ করেছেন, তার একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, তা করলে মানুষ নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্যই রসূলুল্লাহ ﷺ এর পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ ফরমিয়েছেন:
"রসূল ﷺ তাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ দেন ও অসৎ কর্ম থেকে বারণ করেন আর পবিত্র জিনিসকে হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুকে হারাম করে দেন।" (সূরা আরাফ ১৫৭)
এখন কবরের আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করা যাক। মুসলিমদের সর্বসম্মত অভিমত অনুসারে কবর মাজারে তা যে কোন ওলী-আউলিয়া, পীর পয়গাম্বরের হোক না কেন হাত রাখা, চুম্বন করা, তাতে মুখ-গাল স্পর্শ করানো নিষিদ্ধ। প্রাথমিক যুগের কোন উম্মত এবং সে যুগের কোন ইমাম এরূপ কখনও করেননি। এ হচ্ছে এক প্রকারের শির্ক। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ ফরমিয়েছেন:
নূহের কউমের লোকেরা তাদের স্বজাতিকে বলত, "নিজেদের আরাধ্য ঈশ্বরকে কোন মতেই বর্জন করবে না, বিশেষতঃ ওয়াদ্দাকে, সুওয়াকে এবং ইয়াগুসকে, ইয়াউককে এবং নাস্ত্রকে। তাদের প্রধানগণ (এভাবে) বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে।" (সূরা নূহ ২৩ ও ২৪)
এ সম্পর্কে প্রথমেই আলোচনা করা হয়েছে যে, উপরে উদ্ধৃত ওয়াদ্দা, সুওয়া প্রভৃতি নূহ ('আ.)-এর কউমের পূর্ব পুরুষদের কতিপয় সাধু ব্যক্তির নাম ছিল। কালক্রমে তাদের মাজার মানুষের যিয়ারত এবং ই'তিকাফের স্থানে পরিণত হয় এবং গোরপূজায় এর শেষ পরিণত ঘটে। সর্বশেষে মানুষ তাদের মূর্তি বানিয়ে মূর্তি পূজা শুরু করে দেয়।
বুযুর্গ ব্যক্তিদের প্রতি অন্ধ ভক্তির এই অশুভ পরিণতির কারণেই মাজার সমূহের স্পর্শ, চুম্বন, তার উপর মুখমণ্ডল মিলানো প্রভৃতি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে যখন এই সব কাজের সঙ্গে কবরে-মাজারে শায়িত মৃত ব্যক্তিকে ডাকা, তার নিকট ফরিয়াদ পেশ এবং প্রার্থনা জ্ঞাপন সংযুক্ত হয়।
আমি ইতোপূর্বেই এই সমস্ত বিষয় পর্যালোচনা করেছি এবং সেখানেই কবর সমূহের যিয়ারত উপলক্ষে যে সব শিকী কার্য সংঘটিত হয়ে থাকে তার উপর আলোকপাত করেছি। তাতে শরয়ী যিয়ারত এবং বিদআতী যিয়ারতের পার্থক্য নির্দেশ করে শেষোক্ত যিয়ারতে নাসারাদের সঙ্গে গোরপোরস্ত ব্যক্তিদের মিল দেখিয়েছি এবং এটা যে তাদের অন্ধ অনুকরণের ফলশ্রুতি তাও দেখিয়ে দিয়েছি।
পীর এবং বুযুর্গদের সম্মুখে মাথা অবনমিত করা, মাটি চুমা খাওয়া এবং এই ধরনের অন্যান্য কাজ নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে ইমামগণের মধ্যে কোনই মতভেদ নেই। বরং আল্লাহ ছাড়া অপর কারোর সামনে শুধু মাথা ঝুকানোও সিদ্ধ নয়। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে মু'আয ইবনে জাবাল (রাযি.)-এর যে ঘটনা বিবৃত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, তিনি সিরিয়া থেকে মাদীনাহয় ফিরে এসে রসূলুল্লাহ ﷺ এর সম্মুখে সিজদা ক'রে ফেললেন। রসূল ﷺ বললেন, মু'আয! তুমি এ কী কাণ্ড করলে? তখন মু'আয (রাযি.) আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি সিরিয়ার অধিবাসীদেরকে দেখে এলাম যে, তারা তাদের পাদ্রী এবং অন্যান্য মান্য ব্যক্তিদের সিজদা করে থাকে। তারা এই কাজের সমর্থনে বলে যে, এরূপ সিজদা পূর্ববর্তী নাবীদের যুগ থেকে চলে আসছে। রসূলুল্লাহ এরশাদ করলেন- জেনে রাখো, হে মুআয! এটা সত্যের অপলাপ, তাদের এক মিথ্যা ভাষণ। আমি যদি মানুষকে সিজদা করার হুকুম দিতাম, তা হলে স্ত্রীদেরকে তাদের স্বামীদের সিজদা করতে বলতাম, কেননা স্ত্রীদের উপর স্বামীদের বড় রকম হক রয়েছে। (কিন্তু যেহেতু আল্লাহ ছাড়া কোন মানুষই অপর কোন মানুষের সিজদা পেতে পারে না। তাই এ ধরনের হুকুম আমি দিতে পারি না।)
তারপর তিনি বললেন, হে মুআয! আমার মৃত্যুর পর যখন আমার কবরের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করবে, তখন কি (কবরের উদ্দেশে) সিজদা করবে? মু'আয (রাযি.) বললেন, 'না'। তখন রসূল বললেন, হ্যাঁ, কখনো তা করবে না।
বরং এর চাইতেও বড় হুঁশিয়ারী রয়েছে নিম্নোক্ত ঘটনায়।
সহীহ বুখারীতে জাবির (রাযি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে দেখা যায় যে, রসূলুল্লাহ তাঁর রুগ্ন অবস্থায় বসে বসে যখন নামায পড়ছিলেন, তখন তাঁর পশ্চাতে সহাবীগণ কাতার বেঁধে দণ্ডায়মান অবস্থায় নামায পড়তে যাচ্ছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ তাদেরকেও বসে নামায পড়ার হুকুম দিলেন। তারপর ইরশাদ ফরমালেন, অনারবরা যেভাবে একে অপরের তা'যীম করে থাকে, তোমরা আমাকে সেরূপ তাযীম করো না। তারপর বললেন, যে ব্যক্তি তার সম্মুখে লোকেদের দণ্ডবৎ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুশী হয়, সে যেন দোযখে তাঁর বাসস্থান ঠিক করে নেয়।
এখন চিন্তা করে দেখুন, যখন রসূল অনারবদের মধ্যে প্রচলিত বড়দের প্রতি সম্মানার্থে দাঁড়ানোর প্রথাকে এতদূর অপছন্দ করেছেন এবং তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপিত হয় এমন কাজ থেকে এত অধিক পরহেয করেছেন যে, তিনি বসে নামায পড়ানো অবস্থায় তাঁর পশ্চাতে সহাবাগণের দাঁড়িয়ে নামায পড়া বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়তে বললেন। এটা এজন্য করলেন যে, যারা তাদের বুযুর্গ ও মান্য ব্যক্তিদের সম্মানার্থে দণ্ডায়মান হয় তাদের অনুকরণ যেন মুসলমানরা না করে। এছাড়া তিনি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি তার সম্মানার্থে লোকদের দাঁড়ান দেখে খুশী হয়, দোযখে প্রবেশ ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। এই যদি হয় নিষেধাজ্ঞার পরিসর, তাহলে পীর বুযুর্গদের সিজদা করা, তাদের সামনে মাথা নোয়ানো এবং হাত চুম্বন করা কী করে জায়িয হবে?
'উমার ইবনে আব্দুল আযীয- যিনি পৃথিবীর বুকে আল্লাহ্র খলীফা ছিলেন, তিনি এমন সব কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন যাদের কাজই ছিল দরবারে প্রবেশকারীদের মাটি চুম্বন দেয়ার প্রথা পালনে বাধা দেয়া। সে সত্ত্বেও যারা সেরূপ করতো তাদের তারা শায়েস্তা করতেন।
মোট কথা, কিয়াম (দাঁড়ান) ক'উদ (বসা), রুকু এবং সিজদা সম্পূর্ণরূপে একমাত্র আসমান ও যমীনের স্রষ্টা একক আল্লাহরই প্রাপ্য- তাঁরই খাস অধিকার। আর যে বস্তুতে একমাত্র আল্লাহরই হক- সেখানে অন্য কারোর বিন্দুমাত্রও অংশ নেই।
এমনকি শপথ করার মত একটি চিরাভ্যস্ত কাজ যা মানুষ অহরহ করে থাকে-একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অপর কারোর নামেই করা চলবে না। অন্য কারোও নামে কসম খাওয়া কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
বুখারী এবং মুসলিমের রিওয়ায়াতে আছে- রসূলুল্লাহ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি শপথ করবে- সে যেন শপথ করে আল্লাহর নামে নতুবা সে নীরব থাকবে, অন্য কোন শপথই উচ্চারণ করবে না।"
অন্য হাদীসে আছেঃ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন নামে কসম খায়, সে শির্ক করে থাকে।"
বস্তুতঃ সব রকম ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, একমাত্র লা শরীক আল্লাহরই তা প্রাপ্য, অন্য কারোর কোনই হক নেই তাতে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন:
"বস্তুতঃ তাদেরকে তো এই আদেশই দেয়া হয়েছিল যে, দ্বীনকে তারা খালাস করে নিবে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য-একনিষ্ঠভাবে এবং কায়িম করবে নামাযকে এবং প্রদান করতে থাকবে যাকাত আর প্রকৃত প্রস্তাবে এটাই হচ্ছে সুদৃঢ় ধর্মমত।" (সূরা বাইয়িনাহ ৫)
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য তিনটি বস্তু পছন্দ করেন, সেগুলো এই:
১। "তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো আর ইবাদাতে কাউকে তাঁর সঙ্গে শরীক করো না।"
২। "সকলে সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রশিকে (কুরআন এবং তার ব্যাখ্যারূপী সুন্নাহকে) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে আর তোমরা ফির্কায় ফির্কায় বিভক্ত হয়ে যেয়ো না।"
৩। "আর আল্লাহ যাকে তোমাদের উপর শাসন কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন, তোমরা তার কল্যাণ কামনা করবে (তার অমঙ্গল কামনা করবে না, বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কাজে যাবে না)।"
এ কথা সুবিদিত যে, দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করে দেয়াই ইবাদাতের তথা আনুগত্যের মূল কথা। এ জন্য রসূল ﷺ প্রকাশ্য, গোপন, ছোট, বড় সব রকম শির্ক ও শির্কী কাজে জড়িত হতে কঠোরভাবে নিষেধ করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। এমনকি বহু সূত্রে বর্ণিত (মুতাওয়াতির) হাদীসে বিভিন্ন শব্দে সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়ার সময়ে নামায পড়তে (সিজদা করতে) তিনি নিষেধ করেছেন।
কখনও তিনি বলেছেন:
"সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের নির্দিষ্ট সময়ে তোমরা ইচ্ছা করে নামায পড়ো না। আবার কখনও বা তিনি ফজরের উদয় (ফজরের নামায পড়া) এর পর থেকে সূর্য পুরাপুরি না উঠা পর্যন্ত এবং আসরের নামাযের পর থেকে সূর্য পূরাপুরি অন্ত না যাওয়া পর্যন্ত নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।"
আবার কখনও বা একথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে,
"নিশ্চয় সূর্য যখন উদিত হয়-তখন শয়তানের দুই শিং এর মধ্যস্থল দিয়ে উদিত হয়। আর সেই সময় কাফিরেরা সূর্যকে সিজদা করে থাকে।"
এই সময় নামায আদায় করতে এজন্যই নিষেধ করা হয়েছে যে, তাতে করে মুশরিকদের সঙ্গে সময়ের দিক দিয়ে সামঞ্জস্য দেখা দেয়। কেননা তারা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে সিজদা করে থাকে আর সে সময় শয়তান সূর্যের নিকটে অবস্থান করে- যাতে করে মানুষের সিজদা তার জন্য হয়ে যায়।
মুশরিকদের সঙ্গে এতটুকু সামঞ্জস্যের ব্যাপারকেও যখন কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে তখন মুশরিকদের সঙ্গে অন্যান্য ব্যাপারে সামঞ্জস্য রেখে অথবা তাদের দেখাদেখি শির্ক ও শির্কীয়ানা কাজে জড়িত হয়ে পড়া কত বড় অপরাধ তা চিন্তা করে দেখা প্রয়োজন।
রসূলুল্লাহ ﷺ কে আহলে কিতাবদের উদ্দেশে যে কথা ঘোষণা করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, এই প্রসঙ্গে তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ।
"বলুন (হে রসূল!) হে আহলে কিতাব (ইয়াহুদী, নাসারাগণ) তোমরা আসো এমন এক কথায় যা তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে একই (অর্থাৎ যা একটা কমন প্ল্যাটফর্ম রূপে ব্যবহৃত হতে পারে) আর সেটা হচ্ছে এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই ইবাদাত করব না-কারোরই আনুগত্য বরণ করব না, তার সঙ্গে অপর কাউকে শরীক করবে না এবং আমাদের কেউই আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকেই রবরূপে গ্রহণ করব না। তারা যদি এই ব্যাপারে বিমুখ হয় (রাজী না হয় এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়) তাহলে বলুন: তোমরা এই বিষয়ে সাক্ষী থাক যে, আমরা হচ্ছি মুসলমান-একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।" (সূরা আলু ইমরান ৬৪)
এই সম্বোধন এজন্য করা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে প্রভুরূপে মেনে নেয়ার ব্যাপারে উভয়ের (ইয়াহুদী ও নাসারাগণের) মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে। আর আমরা মুসলমানগণ এ ধরনের কাজে লিপ্ত হতে কঠোর নিষেধ বাণী পেয়েছি, কাজেই যারা রসূলুল্লাহ ﷺ এর হিদায়াত বা সহাবাগণের অনুসৃত পথ এবং তাবিয়ীদের অবলম্বিত পন্থা (রিওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমায়ীন) ছেড়ে নাসারা এবং ইয়াহুদীদের তরীকাকে অবলম্বন এবং তাদের পথের অনুসরণকে প্রেয় ও শ্রেয় মনে করে বেছে নেয়, তারা নিশ্চিততাবে আল্লাহর এবং তাঁর রসূল ﷺ এর হুকুম আহকাম হেলায় প্রত্যাখ্যান করে থাকে। এটা নিশ্চিতভাবে আল্লাহ এবং তার রসূল ﷺ এর জঘন্য নাফরমানি।
কতক লোক এমন রয়েছে যারা বলে, "আল্লাহর বারকাতে এবং আপনার কল্যাণে আমার কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে"। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এ ধরনের কথা শরী'আতের সম্পূর্ণ খেলাফ। কেননা কার্যে সিদ্ধিদানের ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে কেউ শরীক হতে পারে না।
এ ব্যাপারেও রসূলুল্লাহ এর পথ নির্দেশ সুস্পষ্ট। যখন কোন এক ব্যক্তি কোন এক প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ কে লক্ষ্য করে বললেনঃ "আল্লাহ এবং আপনি যা ইচ্ছা করেন।" তখন এ কথা শুনে রসূল বললেন, "কী! তুমি আমাকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে দিলে? এরূপ না বলে তুমি বরং বল, একমাত্র আল্লাহ এককভাবে যা ইচ্ছা করেন।"
অন্যত্র তিনি তাঁর সহচরবৃন্দকে লক্ষ্য করে বলেন,
"এ কথা বলো না যে, আল্লাহ এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন, বরং বলোঃ আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তৎপর (আল্লাহর ইচ্ছা মুতাবেক) মুহাম্মাদ যা যা ইচ্ছা করেন।"
এক হাদীসে বলা হয়েছে, কোন এক ব্যক্তি মুসলমানদের একটি দলকে লক্ষ্য করে বললো, তোমরা যদি আল্লাহর সঙ্গে শরীক না বানাতে তবে তোমরা কত সুন্দর জাতিই না হতে। কিন্তু তোমরা বলে থাকো:
"যা আল্লাহ ইচ্ছা করেন এবং যা মুহাম্মাদ ইচ্ছা করেন।"
অতঃপর রসূলুল্লাহ ﷺ এরূপ বলতে নিষেধ করে দিলেন।
সহীহ বুখারীতে যায়িদ ইবনে খালিদ (রাযি.) থেকে রিওয়ায়াত এসেছে:
নাবী ﷺ হুদায়বিয়ায় আমাদের নিয়ে ফজরের নামায পড়লেন, ঐ রাত্রে বৃষ্টি হয়ে গেছে। নামাযের পর রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা কি জান যে, গত রাত্রে তোমাদের প্রভু কী বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই উত্তম জানেন। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন যে, আল্লাহ বলেছেন: "আজকের রাত্রে আমার বান্দাদের মধ্যে কতক আমার প্রতি ঈমান রাখে আর নক্ষত্র (পরস্তী)-কে অস্বীকার করে, আবার কতক এমন রয়েছে যারা নক্ষত্রের প্রতিই ঈমান রাখে এবং আমাকে ইনকার করে- অর্থাৎ আমার কুদরতী শক্তিকে অস্বীকার করে। (তারপর আল্লাহ বলেন) যারা (মনে দৃঢ় আস্থা রেখে) বলে যে, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দয়াতেই বৃষ্টি হয়েছে, তারা আমার প্রতি (প্রকৃত প্রস্তাবে) ঈমান রাখে এবং নক্ষত্র পূজা থেকে নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখে। আর যারা এই ধারণা পোষণ করে যে, অমুক অমুক নক্ষত্র রাশির যোগাযোগের ফলে বৃষ্টি হয়েছে, তারা আমার উপর অনাস্থা প্রকাশ করে এবং নক্ষত্রের উপরই ঈমান রাখে।"
অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, প্রকৃতির রাজ্যে আল্লাহ তা'আলা যে সব কার্য-কারণ ও ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চালু রেখেছেন সে গুলো সবই তাঁর হুকুমবরদার, তাঁর ইচ্ছা এবং ইঙ্গিতেই সব কিছু ঘটে থাকে, ওগুলোর কোনটিকেই তাঁর শরীক ও সাহায্যকারীরূপে মনে করা যাবে না। যারা বলে থাকে, "অমুক কাজটি অমুক বুযুর্গের বারকাতে সম্পন্ন হয়েছে"-তাদের এই কথার তাৎপর্য কয়েক রকম হতে পারে। প্রথম, এর অর্থ দু'আ হতে পারে, এই তাৎপর্য গ্রহণ মোটেই আপত্তিকর নয়। বুযুর্গ ব্যক্তিদের দু'আ আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে থাকে, বিশেষ করে এক অনুপস্থিত ব্যক্তির দু'আ অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য খুব দ্রুত ফলপ্রসূ হয়ে থাকে!
দ্বিতীয়, এর অর্থ হয় : বুযুর্গ ব্যক্তির সাহচর্যে ইলমী ও 'আমলী কল্যাণ লাভ হয়ে থাকে। এই অর্থও বাস্তব ও সত্য। জ্ঞানী ও নিষ্ঠাবান সৎ কর্মশীল বুযুর্গ ও ব্যক্তির সাহচর্যে যারা আসেন সেই জ্ঞানবুদ্ধ, উন্নত-চরিত্র ও অমলিন ব্যক্তিত্বের প্রভাবে প্রভূত কল্যাণ লাভ করে থাকেন। এগুলো এবং এই ধরনের অন্য কোন অর্থ হলে তাও হবে বিশুদ্ধ - দোষ বিবর্জিত। এতে আপত্তির কোন কারণ নেই।
তৃতীয়, যখন বারকাত হাসেল থেকে অর্থ গ্রহণ করা হয় যে, মৃত বা অনুপস্থিত বুযুর্গের নিকট আবেদন নিবেদন পেশ করে কল্যাণ লাভ করা যায়, তখন সে অর্থ হবে বাতিল, অন্যায় ও অমূলক। কারণ সে অবস্থায় মৃত সেই অক্ষম। কারণ তখন তার দ্বারা কোন কল্যাণ লাভ করা সম্ভব নয়, কোন রূপ প্রভাব বিস্তারে তার কোনই ক্ষমতা নেই। অথবা যখন উদ্দেশ্য হয় নাজারিয বিদ'আতী কোন কাজ, তখন বুযুর্গ ব্যক্তি ঐ আহবানকারীর আহবানে সাড়া দেন না দিতে পারেন না। এ ধরনের অন্য তাৎপর্যও বাতিল। তবে এ বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য বরণের জন্য সুন্নত -সম্মত কোন বাস্তব আমল এবং মুমিনদের একের জন্য অপরের দু'আ করা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় লোকের জন্য কল্যাণপ্রদ এবং এই কল্যাণ লাভ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার উপর নির্ভরশীল।
📄 কুতুব, গাউস প্রভৃতি সম্পর্কে জনসাধারণের ভ্রান্ত ধারণা এবং তাঁর নিরসন
ফতোয়া জিজ্ঞাসাকারী তার প্রশ্নে কুতুব, গাউস প্রভৃতি সম্পর্কে যে কথা জানতে চেয়েছেন তার জওয়াব হচ্ছে এইঃ
এই ব্যাপারে লোকদের মধ্যে অনেক দলই - গাউস, কুতুব এর অস্তিত্বের সমর্থক, তারা তাদের বিশ্বাসের যে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে তা সম্পূর্ণ বাতিল, দ্বীন ইসলাম তথা ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদীসে-সহীহায় তার কোনই সমর্থন মিলে না।
দৃষ্টান্ত পেশ করছি। কতক লোকে এই ধারণা পোষণ করে থাকেন যে, গাউস এমন এক সত্তা যার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট জীবসমূহের রিযক অর্থাৎ জীবিকা অর্জিত হয়ে থাকে আর তাদের সাহায্যেই দুশমনের বিরুদ্ধে সহায়তা অর্জিত হয়ে থাকে! এমন কি ঊর্ধ্ব লোকের ফেরেশতা এবং পানির গর্ভে সঞ্চারমান মৎস্যসমূহও তার ওয়াসীলাতেই সাহায্য লাভ করে থাকে। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এটা এমন এক কথা যা নাসারাগণ ঈসা ('আ.) সম্বন্ধে বিশ্বাস পোষণ করে থাকে আর রাফিযীরা (গালিয়াগণ) আলী (রাযি.) সম্বন্ধে এ ধরনের ই'তিকাদ পোষণ করে। আর এ হচ্ছে সুস্পষ্ট কুফর। যারা এ রকম গুমরাহীর কথা কলবে তাদেরকে বলতে হবে, তাওবাহ কর। যদি তাওবাহ করে, ভাল।
কিন্তু জীব সমূহের মধ্যে এমন কেউ নেই- না ফেরেশেতাদের মধ্যে, না কোন মানুষের মধ্যে- যার ওয়াসীলায় আল্লাহর কোন সৃষ্ট জীবের সাহায্য লাভ হয়ে থাকে। এ ধরনের কথা মুসলমানদের সর্বসম্মত রায় অনুসারে কুফরের পর্যায়ভুক্ত।
কতক লোক বলে থাকে যে, পৃথিবীতে ৩১০ জনের কিছু বেশী এমন সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে যাদেরকে বলা হয় নুজাবা (নজীব)।
এদের মধ্যে বেছে ৭০ জনকে নির্বাচিত করা হয় যাদেরকে বল হয় নূকাবা (নকীব)। এই ৭০ জনের মধ্যে রয়েছেন ৪০ জন এমন পুরুষ যাদের বলা হয় আবদাল, আবার তাদের মধ্যে রয়েছেন ৭ জন আকতাব (কুতুব) এই ৭ জনের মধ্যে আছেন ৪ জন যাদের বলা হয় আওতাদ, অতঃপর ঐ চার জনের মধ্যে আছেন এক ব্যক্তি সত্তা যার নাম গাউস- তিনি অবস্থান করেন মাক্কাহ মুয়ায্যমায়। দুনিয়ার বাসিন্দাদের উপর যখন খাদ্য অথবা অন্য কোন ব্যাপারে কোন বালা-মুসীবত নাযিল হয়ে যায়, তখন তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিপদ নিরসনের জন্য প্রথমোল্লেখিত নূজাবাদের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় যাদের সংখ্যা ১৩০ জন এর কিছু উপরে। অতঃপর নূজাবাগণ ৭০ জন নুকাবার দিকে, সেই ৭০ জন নূকাবা ৪০ জন আবদালের দিকে, তারা আবার ৭ জন আকতাবের নিকট তারা পুনঃ ৪ জন আওতাদের নিকট এবং সর্বশেষে তারা তাদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি-সত্তা গাউসের দিকে ধাবিত হয়।
কতক লোক উল্লেখিত সংখ্যা, নাম এবং পদমর্যাদার মধ্যে কিছু কমবেশী ও পার্থক্য করে থাকে। কেননা তাদের সম্বন্ধে বহু রকম উক্তি শুনতে পাওয়া যায়। বহু অদ্ভূত এবং উদ্ভট কথাও তাদের সম্বন্ধে প্রচারিত হয়ে থাকে। কেউ বলে, গাউস এবং যুগের খিযর ('আ.)-এর নামে আসমান থেকে মাক্কাহ মুয়ায্যমায় একটা সবুজ পত্র অবতীর্ণ হয়ে থাকে। এ ধারণা ঐ সব লোক পোষণ করে থাকে যাদের বিশ্বাস হচ্ছে এই যে, খিযর বেলায়েতের একটি পর্যায়। তাদের মতে প্রত্যেক যুগে একজন করে খিযর থাকেন। খিযর সম্বন্ধে তাদের দু' রকম কথা শুনতে পাওয়া যায় আর এগুলো সমস্তই বাতিল, প্রত্যাখ্যাত এবং অযোগ্য। কেননা, আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদে এবং রসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাতে এর কোন ভিত্তি নেই। সালফে- সালিহীনের মধ্যে কেউ এ ধরনের কথা বলে যাননি। এ ধরনের কোন কথা না বলেছেন শরী'আতের কোন ইমাম, না পূর্ব যুগের মা'রেফতের কোন বড় মাশায়েখ।
আর এ কথা কে না জানে যে, সৃষ্ট জীব তথা মনুষ্যকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ যে সত্তা সেই মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ এবং তার শ্রেষ্ঠ চার শিষ্য সিদ্দীকে আকবর, ফারুকে আযম, উসমান যুন নূরাইন এবং আমীরুল মুমিনীন আলী (রাযি.) ছিলেন নাবীদের পর মর্যাদার শ্রেষ্ঠ, কিন্তু এঁরা সবাই মাক্কাহ ছেড়ে মাদীনাহয় অবস্থান করে গেছেন। এঁদের মধ্যে কেউই (হিজরতের পর থেকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত) মাক্কাহয় বসবাস করেননি।
কেউ কেউ মুগীরা ইবনে শু'বার গোলাম হেলাল সম্বন্ধে বলে থাকে যে, তিনি সাতজন কুতুবের এক ছিলেন তারা এর সমর্থনে একটা 'হাদীসও' পেশ করে থাকে। কিন্তু সেই 'হাদীসটি' হাদীস-শাস্ত্র বিশারদদের সর্বসম্মত মতে বাতিল।
এ ধরনের কতিপয় হাদীস যদিও আবূ নায়ীম (রহ.) হিলিয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থে এবং শাইখ আবু আবদুর রহমান আসসালমা তার কোন কোন গ্রন্থে রিওয়ায়াত করেছেন, তার দ্বারা ধোঁকায় পড়া এবং নিজেদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলা উচিত নয়। কেননা, তাদের এসব সঙ্কলিত গ্রন্থে একদিকে যেমন সহীহ এবং হাসান হাদীস সঙ্কলিত হয়েছে- তেমনি তাতে যঈফ, মাউযু এবং মিথ্যা হাদীসও স্থান পেয়েছে যেগুলোর প্রক্ষিপ্ত হওয়া সম্বন্ধে হাদীসাভিজ্ঞ আলিমদের মধ্যে কোনই মতভেদ নেই।
হাদীস সংকলকগণের মধ্যে কেউ কেউ যেরূপ রিওয়ায়াত শ্রবণ করেছেন, ঠিক সেরূপই লিপিবদ্ধ করেছেন- তারা কোন্ রিওয়ায়াত সহীহ, কোন্টি বাতিল সে সব বিচার বিবেচনা করার ও পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। অপরপক্ষে সত্যনিষ্ঠ আহলে হাদীসগণ তথা মুহাক্কিক মুহাদ্দিসগণ কখনই এরূপ করতেন না। তারা হাদীস পরীক্ষা করে দেখতেন এবং তাদের বিচারে যেগুলো মওযূ-জাল এবং বাতিল বলে সাব্যস্ত হত তারা রিওয়ায়াত করতেন না। কারণ তারা সহীহ বুখারীতে রসূল ﷺ এর এই হাদীস সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন যাতে বলা হয়েছেঃ
"যে ব্যক্তি এমন এক হাদীস রিওয়ায়াত করে যে হাদীস সম্পর্কে তার ধারণা এই যে, তা মিথ্যা, সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদীদের অন্যতম।"
মোট কথা, প্রত্যেক মুসলমানই জানে যে, বাঞ্ছিত কোন বস্তুর জন্য একমাত্র আল্লাহর কাছেই আবেদন জানাতে হয় অথবা আসমানী কোন বালা মুসীবত যখন নাযিল হয়, তখনই সেই ভয় ও বিপদ থেকে উদ্ধার লাভের জন্য আল্লাহর নিকটে নিবেদন পেশ করতে হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, বৃষ্টির যখন একান্ত প্রয়োজন তখন বৃষ্টি না হলে তারা ইসতিস্কার নামায পড়ে (সময়মত শস্য উৎপাদনের জন্য) পানি বর্ষণের প্রার্থনা জানায়। আর চন্দ্র গ্রহণ, সূর্য গ্রহণ, সাইক্লোন, ভূমিকম্প কুজঝটিকায় (অথবা ট্রেন, বাস, জাহাজ, নৌকা প্রভৃতির দুর্ঘটনায়) বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য মুসলমান একমাত্র একক লা-শারীক আল্লাহর শরণাপন্ন হয়ে থাকে। তাঁকেই তারা একমাত্র বিপত্তারণ বলে বিশ্বাস করে। জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য একমাত্র তাঁরই উপর ভরসা রেখে তাঁকেই আকুল হৃদয়ে কাতর স্বরে ডাকতে থাকে। তখন তারা অপর কাউকেই আল্লাহর শরীক ভাবে না। বিপদ মুক্তির জন্য তাঁর সঙ্গে অপর কাউকেই তারা ডাকে না।
আর প্রকৃত কথা এই যে, কোন মুসলিমের জন্য এটা সিদ্ধ নয় যে, নিজের কোন অভাব মিটান ও প্রয়োজন সিদ্ধির জন্য আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকে মাধ্যম রূপে পাওয়ার নিমিত্ত এদিক সেদিক ধন্না দেয়। তার পক্ষে এটাও মোটেই কাম্য নয় যে, ইসলাম গ্রহণ ও তাওহীদ বরণের পর এ ধারণা পোষণ করে যে, কোন নির্দিষ্ট মাধ্যম ছাড়া (কুরআন ও হাদীসে যার কোনই দলীল নেই) তাদের দু'আ কবুল হতে পারে না।
এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্যযোগ্য। আল্লাহ বলেন,
"যখন মানুষের উপর কোন ক্ষতিকর কিছু আপতিত হয়, তখন সে শায়িত, উপবিষ্ট অথবা দণ্ডায়মান অবস্থায় আমার নিকট আহবান জানায়, (কিন্তু) যখন আমি তার উপর আপতিত ক্ষতিকর বস্তুটি অপসারিত করে দেই, তখন সে এমনভাবে চলাফেরা করে যেন তার উপর আপতিত ক্ষতিকর বস্তুর আপসারণের জন্য আমার নিকট কোন আহ্বানই সে জানায়নি।" (সূরা ইউনুস ১২)
"যখন সমুদ্রে তোমাদেরকে কোন বিপদাপদ স্পর্শ করে, তখন তোমরা আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে ডেকে থাকো তারা সবাই তখন হারিয়ে যায়।" (সূরা বানী ইসরাঈল ৬৭)
"(হে রসূল) আপনি বলুন: তোমরা ভেবে দেখ- দেখি তোমাদের উপর আল্লাহর কোন শাস্তি যদি আপতিত হয় অথবা তোমাদের নিকট যদি 'কিয়ামাত' উপস্থিত হয়ে যায়, তখন কি তোমরা সাহায্যের জন্য আহবান করবে আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে? (উত্তর দাও) যদি তোমরা সত্যবাদী হও। না, বরং তোমরা আহবান করবে তাঁকেই, তিনি ইচ্ছা করলেই তোমাদের সে আপদ যা মোচনের জন্য তোমরা তাঁকে আহবান জানিয়েছিলে দূর করে দেবেন আর যাদেরকে তোমরা তাঁর শরীক করতে, তাদের তোমরা ভুলে যাবে।" (সূরা আল-আন'আম ৪০-৪১)
"নিশ্চয় আপনার পূর্বেও বহু জাতির নিকট আমি রসূল প্রেরণ করেছি, অতঃপর (তাদের কর্মফলের জন্য) আমি তাদেরকে অর্থ সঙ্কট ও আপদ দ্বারা বিপন্ন করেছি- যাতে তারা আল্লাহর নিকট বিনয়নম্র হয়। কিন্তু আমার পরীক্ষা যখন এসে গেল তাদের নিকটে তারা কেন বিনীত হল না? বরং তাদের অন্তরগুলো আরও কঠোর হল এবং তারা যা করছিল শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিয়েছিল।" (সূরা আল-আন'আম ৪২-৪৩)
রসূল সাহাবাদের কল্যাণার্থে ইসতিস্স্কার (পানি বর্ষণের প্রার্থনা জানিয়ে) দু'আ করতেন। এই দু'আ তিনি করতেন কখনও নামায পড়ে আর কখনও নামায না পড়েও। ইসতিস্কার নামাযে আর সলাতে কুসুফে (সূর্য গ্রহণের সময় পঠিত নামায) তিনি নিজে ইমামাত করেছেন। এছাড়া মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য তিনি নামাযে দু'আয়ে কুনূত পড়তেন। এভাবে তার ইন্তিকালের পর খুলাফায়ে রাশেদীন, মুজতাহিদীন, মাশায়েখে কুবরা অর্থাৎ বড় বড় সাধকদের মধ্যে এই প্রথাই প্রচলিত ছিল এবং তারা সব সময় এভাবেই আমল করে গিয়েছেন।
এ জন্যই বলা হয়েছেন যে, তিনটি (বদ্ধমূল) ধারণায় কোনই ভিত্তি নেই- ১। বাবে নাসিরিয়া ২। মুনতাযরে রাওয়াফেয এবং ৩। গাউসে জাঁহা।
নাসিরিয়া ফির্কা এই দাবী জানিয়ে আসছে যে, বাব আছে এবং তারই উপর বিশ্বজগৎ কায়িম রয়েছে।
এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, এই সত্তা তো মওজুদ রয়েছে কিন্তু এ সম্পর্কে নাসিরিয়াদের উক্ত সত্তা সম্পর্কিত দাবী সম্পূর্ণ বাতিল।
আর মুহাম্মাদ ইবনে হাসান (রহ.) হচ্ছেন আল মুনতাযর। আর মাক্কাহয় অবস্থানরত অদৃশ্য গাউস প্রভৃতি এমন ধরনের মিথ্যা যার মূলে সত্যের লেশমাত্রও নেই। এমনিভাবে যারা দাবী করে থাকে যে, কুতুব, গাউস এমন সুবিজ্ঞ সত্তা যারা বিশ্বের সর্বত্র অবস্থিত আউলিয়াদের চিনেন এবং তাদের সাহায্যও করে থাকেন, তাদের এ দাবীও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কেননা স্বয়ং আবু বাক্ সিদ্দীক এবং 'উমার ফারুক (রাযি.)-এর ন্যায় বুযুর্গ সাধকও তামাম আউলিয়াকে জানতেন না, চিনতেন না, তাদের সাহায্যও করতেন না।
যিনি ছিলেন সমগ্র মানবমণ্ডলীর সরদার, সেই মহা মানব ও মহা নাবী তার উম্মতদের মধ্যে যাদেরকে এই দুনিয়ায় দেখেননি-দেখার সুযোগ পাননি, তাদেরকে তিনি কিয়ামাত দিবসে এমনিতেই চিনতে পারবেন না, চিনতে পারবেন কেবল তাদের ওযুর চিহ্ন দেখে। এই-ই যখন সাইয়িদুল মুরসালীন-সর্বশ্রেষ্ঠ নাবীর অবস্থা, তখন অন্যদের ব্যাপারে ঐ সব সত্য বিকৃতিকারী, মিথ্যাবাদী ও পথভ্রষ্টদের ধারণা কী করে সঠিক ও দুরস্ত হতে পারে?
তার চাইতেও যুক্তি নির্ভর কথা এই যে, রসূল ﷺ আর আল্লাহর ওলী আউলিয়াদের সংখ্যা এত অগণিত যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অপর কেউ সে সংখ্যা সম্পর্কে অবহিত নয়। ওলী আউলিয়া তো পরের কথা, খোদ নাবী ও রসূলদের সকলকে তো নয়ই, অধিকাংশকেও স্বয়ং রসূল জানতেন না, অথচ তিনি হচ্ছেন তাদের সকলের নেতা এবং তাদের মুখপাত্র।
আল্লাহ স্বয়ং কুরআন মাজীদে বলেছেনঃ
"(হে রসূল!) আমি নিশ্চয় আপনার পূর্বে রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি, যাদের মধ্যে কতকের কথা আমি আপনার নিকট বর্ণনা করেছি, কতকের (অধিকাংশের) কথা আপনার নিকট উল্লেখ করিনি।" (সূরা মুমিন ৭৮)
এরপর আরও দেখা যায় মূসা ('আ.) এর মত জবরদস্ত রসূল খিযর ('আ.) এর ন্যায় অনন্য ওলীউল্লাহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত ছিলেন আর মূসা ('আ.) খিযর ('আ.)-কে চিনতেন না। নিগূঢ় জ্ঞানের অধিকারী খিযর ('আ.) সম্বন্ধে আল্লাহর তরফ থেকে অবহিত হয়ে মূসা ('আ.) যখন তার সন্ধানে বের হলেন এবং সাক্ষাৎ লাভের পর তাকে সালাম জানালেন, তখন সেই সালামের শব্দ শুনে বিস্ময়াবিষ্ট খিযর ('আ.) বিস্ময়ের সঙ্গেই জিজ্ঞেস করলেন; এখানে সালাম শব্দ উচ্চারিত হলো কেমন করে, কার মুখ দিয়ে? তখন মূসা ('আ.) বললেন, আমারই মুখ দিয়ে আর আমি হচ্ছি মুসা! তখন খিযর ('আ.) বললেন, কোন্ মুসা, বানী ইসরাঈলের মুসাঃ
জওয়াবে মূসা ('আ.) বললেন, হাঁ আমি সেই মূসাই বটে? ইতোপূর্বে তার নাম তাকে জানান হয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি তাকে দেখার (অথবা তার সম্বন্ধে বেশী কিছু জানার) সুযোগ পাননি।
📄 খিযর (আ.) জীবিত নেই : ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই মারা গিয়েছেন
যে সব লোক মনে করে যে, খিযর ('আ.) হচ্ছেন সকল ওলী আউলিয়ার নকীব এবং তাদের সকলের অবস্থা সম্বন্ধে তিনি ওয়াকেফহাল, তাদের ধারণা সবই মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। প্রকৃত সত্য তা-ই যা তত্ত্ববিদ-মুহাক্কিকগণ তার সম্বন্ধে বলে গেছেন। তাঁরা বলেছেন, "ইসলামের পূর্ব যুগেই অর্থাৎ রসূলুল্লাহ ﷺ এর আবির্ভাবের পূর্বেই খিযর ('আ.) ইন্তিকাল করেছেন।"
তিনি যদি রসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে জীবিত থাকতেন, তাহলে তিনি অবশ্যই রসূলুল্লাহ ﷺ এর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনতেন, তাঁকে মেনে চলতেন এবং তাঁর সঙ্গে জিহাদে শরীক হতেন। কেননা রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমসাময়িক এবং পরবর্তী সকল জগৎবাসীর জন্য তাঁর আনুগত্য বরণ আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন।
এছাড়া ঐ সময়ে কাফিরদের মধ্যে অবস্থান করে পানিতে বিপন্ন নৌকা প্রভৃতি রক্ষার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার চাইতে তার পক্ষে রসূল ﷺ এর সাহচর্যে মক্কায় ও মাদীনাহয় অবস্থিতি, সহাবীদের সঙ্গে মিলে জিহাদে অংশ গ্রহণ এবং দ্বীনের কাজে তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান অধিকতর বাঞ্ছনীয় হ'ত।
এরপরও প্রশ্ন করা যেতে পারে, (সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নাবীর মাধ্যমে দীন মুকাম্মল হওয়ার পর) মুসলমানদের ধর্মীয় কাজে এবং পার্থিব বিষয়ে তার প্রয়োজনটাই বা কী? দ্বীনের সব কিছুই তো আখিরী নাবী ﷺ এর মাধ্যমে সকলের নিকট পৌছিয়ে দেয়ার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে।
নাবী কিতাব এবং হিকমাত তথা কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে দ্বীন দুনিয়ার সব বিষয়ে পুরোপুরি পরিষ্কার করে দিয়ে গেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন-তাঁকে ছাড়া আর কারোরই অনুসরণ করা চলবে না, এমনকি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপকারী (কালীমুল্লাহ) ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন রসূল মূসা ('আ.)-এরও নয়। রসূলুল্লাহ ﷺ এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন:
"মূসা ('আ.) যদি এই সময় জীবিত থাকতেন আর তোমরা আমাকে ছেড়ে তার অনুসরণ করতে, তাহলে তোমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে।"
অর্থাৎ রসূলুল্লাহ ﷺ এর আবির্ভাবের পর নবুওত ও রিসালাতের সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই। অন্য কারও আবির্ভাব ঘটলে তাঁর দ্বীনের অনুসরণ ব্যতীত গত্যন্তর নেই। এজন্যই যখন ঈসা ('আ.)-এর আসমান থেকে অবতরণ ঘটবে, তখন তিনি মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি অবতীর্ণ কুরআন মাজীদ এবং তাঁর সুন্নাত মুতাবিক হুকুম আহকাম জারী এবং বিচারাদি নিষ্পন্ন করবেন। অতএব সেই রহমাতে আলম বিশ্ব কল্যাণের মূর্ত প্রতীকের নবুওত জারী থাকতে খিযর ('আ.) বা অন্য কারোর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?
এছাড়াও রসূল তাঁর উম্মতকে ঈসা ('আ.)-এর আসমান থেকে অবতরণের সংবাদ প্রদান প্রসঙ্গে বলেছেন:
"সেই উম্মত কী করে ধ্বংস হতে পারে যার সূচনায় রয়েছি আমি আর শেষে থাকবেন ঈসা ('আ.)।"
সুতরাং এই দুই বুযুর্গ নাবী যারা ইব্রাহীম ('আ.), মূসা ('আ.) এবং নূহ (আ.) এর ন্যায় দৃঢ়-সঙ্কল্প ও মহত্তম রসূল রূপে পরিচিত তারা এবং বিশেষ করে আদম সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম পুরুষ মুহাম্মাদ রসূল নিজেকে যখন উম্মাতের সাধারণ জনবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোন সময়েই গোপনীয়তা এখতিয়ার করেননি, তখন যিনি কোন ক্রমেই তাদের সমপর্যায়ভুক্ত হতে পারেন না সেই খিযর ('আ.) কী করে অদৃশ্য রহস্যে আবৃত থাকতে পারেন?
খিযর ('আ.) যদি সত্য সত্যই (কিয়ামাত অবধি) চিরঞ্জীব হয়ে থাকেন, তাহলে রসূলুল্লাহ ﷺ কেন তা কস্মিনকালে ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করলেন না? কেন তিনি প্রকাশ্যে উম্মতকে তা বলে গেলেন না? খুলাফায়ে রাশিদীনের মত বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকেও সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র অবহিত করলেন না?
তারপর যারা বলে থাকে, খিযর ('আ.) হচ্ছেন ওলী আউলিয়াদের নকীব তাদের জিজ্ঞেস করা উচিত, তাকে নকীব নির্বাচন করল কে? সত্য কথা এই যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এর সহাবীগণই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম আউলিয়া আর খিযর ('আ.) তাদের অন্তভুক্ত নন।
জেনে রাখা প্রয়োজন যে, খিযর ('আ.) সম্পর্কে যত রকম বৃত্তান্ত এবং কাহিনী পেশ করা হয়েছে তার কতক মিথ্যা ও কপোলকল্পিত। হয়ত কোন সময় কোন এক ব্যক্তি আচানক কাউকে দূর থেকে দেখল, তখন সে ধারণা করে নিল যে, তার দেখা লোকটি খিযর ('আ.) না হয়ে যায় না।
অতঃপর সে লোকেদের মধ্যে প্রচার করে দিল যে, খিযর ('আ.)-কে সে স্বচক্ষে দেখেছে। এমনিভাবে কখনও কেউ কাউকে দেখে ধরে নিল যে, সে নিষ্পাপ মুনতাযর ইমামকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছে। যার আবির্ভাবের আশায় রাফিজীরা দিনের পর দিন প্রতীক্ষারত-তিনি আবির্ভূত হয়ে গেছেন! তারপর সে এই কথা প্রচারে লেগে গেল।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, যখন কোন ব্যক্তি তাকে খিযর ('আ.) সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতো, তখন তিনি তার জওয়াবে বলতেন, যে ব্যক্তি তোমাকে এরূপ গায়িবী খবর শুনিয়েছে সে তোমার প্রতি সুবিচার করেনি। এ সবই হচ্ছে শয়তানী ওয়াসওয়াসা। মানুষের মুখে খিযর সম্পর্কে এসব আজগুবী কাহিনী যে জারী করে দিয়েছে সে শয়তান ভিন্ন আর কিছুই নয়। এ সম্পর্কে আমি (ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ) অন্যত্র বিস্তৃত আলোচনা করেছি।
কেউ কেউ বলেন, 'কুতুব' আর 'গাউস' হচ্ছেন 'ফর্দে জামে'। এই 'ফর্দে জামে' এর অর্থ যদি এই হয় যে, উম্মাতের মধ্যে (প্রতি যুগে) এমন এক ব্যক্তিত্বের অস্তিত্ব থাকে যিনি যুগের সমস্ত ব্যক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তাহলে সেটা সম্ভব। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো সম্ভব যে, ঐ এরূপ বিশিষ্ট ব্যক্তি এক না হয়ে দু'জনও হতে পারেন, তিনজনও হতে পারেন এবং চারজনও হতে পারেন যারা জ্ঞানে গুণে ও চরিত্র বৈশিষ্ট্যে একে অপরের সমান। অথবা এও হতে পারে যে, এক যুগে সমসাময়িক কালে বহু বিশিষ্ট লোকের এমন সমাবেশ ঘটে গেছে যাদের একেক জন একেক গুণ বৈশিষ্ট্যে অপর জন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করতে পারেন আর সেই বৈশিষ্ট্যগুলো মানের দিক দিয়ে হয়ত প্রায় সমান সমান কিংবা কাছাকাছি।
অতঃপর বক্তব্য এই যে, কোন যুগে কোন অবস্থায় যদি এক ব্যক্তি সেই যুগের সকল লোকের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হয়, তাহলে তাকে 'কুতুব' ও 'গাউসে জামে' রূপে আখ্যায়িত করতে হবে-এমন কোন কথা নেই। এরূপ আখ্যায়ন সরাসরি বিদ'আত-এক নবাবিষ্কৃত কাজ। আল্লাহর কিতাবে এর কোনই প্রমাণ নেই। সলফে সালিহীনের মধ্যে কেউ কিংবা ইমামগণের মধ্যে কোন একজন তাদের মুখ দিয়ে এ ধরনের কোন কথা উচ্চারণ করেননি। তবে প্রাথমিক যুগে কোন কোন লোক সম্বন্ধে এ ধারণা পোষণ করা হতো যে, তিনি যুগশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম। (এরূপ ধারণা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং প্রতিটি দেশে প্রতি যুগে এরূপ ধারণা ও মূল্যায়নের নিয়ম চলে আসছে-অনুবাদক) কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত ধারণার পর্যায়েই সীমিত থাকত। সমষ্টিগতভাবে কাউকে শ্রেষ্ঠত্বের লেবেল লাগিয়ে সুনির্দিষ্ট করা হত না অর্থাৎ ব্যক্তিগত দলগত বিশ্বাসের পর্যায়ে রূপান্তরিত করা হত না।
এ কথা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য যে, যারা কোন একজনকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করে তার উপর ঈমান রাখতো, তাদের মধ্যে কতক জন দাবী করতো যে, কুতুব আকতাবের সিলসিলা ইমাম হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালিব (রাযি.) থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী যুগের মাশায়েখ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে এসেছে। এই যে ধারণা- এটা আহলে সুন্নাত মাযহাব অনুসারে তো সহীহ নয়-ই এমনকি রাফিযী (শিয়া) মতেও নয়। এই মত অনুসারে শ্রেষ্ঠতম সাধক বা কুতুবের আসনে সমাসীন হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হননি সাধক চূড়ামণি আবু বাক্স, তাপস শ্রেষ্ঠ 'উমার ফারুক, উসমান যুন নূরাইন আর আসাদুল্লাহিল গালিব আলী ইবনে আবি তালিব। আনসার ও মুহাজিরীনের মধ্যে কুরআনে প্রশংসিত সাবেকুনাল আওওয়ালুন-যুগের অগ্রবর্তী দলের তো কোন কথাই নেই। অথচ সেই মহান বুযুর্গ ব্যক্তিত্বগুলোকে বাদ রেখে প্রথম কুতুবরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে হাসান (রাযি.)-কে যিনি রসূল ﷺ এর মহাপ্রয়াণের সময় ভালমন্দ বিচার ক্ষমতা অর্জনের এবং বালেগ পদবাচ্য হওয়ার মত বয়সে কোন রকমে কেবল পৌছেছিলেন।
উপরিউক্ত মতের পরিপোষক বড় বড় কতিপয় মাশায়েখের উক্তি আমার নিকট পৌছানো হয়েছে, যাতে তারা বলেছেন, কুতুব ফর্দে জামে'র মর্যাদায় যিনি অভিষিক্ত, তার জ্ঞান মার্গ এতটা উর্ধ্বে পৌছে যায় যে, তা আল্লাহর কুদরতের সমর্পযায়ে উপনীত হয়। ফলে আল্লাহ যা জানেন তিনিও তা জানতে পারেন, আল্লাহ যে ক্ষমতা রাখেন তিনিও সেই ক্ষমতার অধিকারী হন। (নাউযুবিল্লাহ) তাদের মতে নাবী এই জ্ঞান ও শক্তির অধিকারী ছিলেন, তাঁর নিকট থেকে হস্তান্তরিত হয়ে উক্ত গুণ হাসান (রাযি.)-এর নিকট পৌঁছে যায়, আবার হাসান থেকে হস্তান্তরিত হয়ে পরবর্তী কুতুবের নিকট পৌঁছে। এভাবে উক্ত গুণ হস্তান্তরিত হতে হতে সমসাময়িক কুতুবের অধিকারে এসেছে। আমি এর জওয়াবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছি যে, এই আকীদা স্পষ্ট কুফ্র এবং জঘন্য মূর্খতা ভিন্ন আর কিছুই নয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ ফরমান: নূহ ('আ.) তার কওমকে বলেনঃ
"আমি তোমাদেরকে এমন কথা বলি না যে, আমার কাছে রয়েছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ আর (এ কথাও বলি না যে,) আমার কাছে গায়িবের সংবাদ আছে এবং আমি এটাও বলি না যে, আমি (অতি মানুষ) ফেরেশতা বিশেষ।" (সূরা হুদ ৩১)
রসূলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহ ঘোষণা করতে বলছেন,
"বলে দাও (হে রসূল!) আমি নিজেও তো নিজের জন্য মঙ্গল ও অমঙ্গলের মালিক নই। কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই ঘটবে। আর দেখ! আমি যদি গায়িবের খবর জানতে পারতাম, তাহলে তো প্রভৃত কল্যাণ হাসিল করে নিতাম, পক্ষান্তরে কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারত না।" (সূরা আল আরাফ ১৮৮)
"তারা বলে থাকে, আমাদের যদি এ ব্যাপারে কিছু এখতিয়ার থাকতো তা হলে আমাদেরকে (এখানে) এসে নিহত হতে হত না।" (সূরা আলু ইমরান ১৫৪)
"তারা বলে, এ ব্যাপারে আমাদেরও কি কিছু এখতিয়ার আছে? (হে রসূল!) আপনি বলে দিন, এখতিয়ারের সবটারই মালিক-মুখতার হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ।" (সূরা আলু ইমরান ১৫৪)
"হে মুমিনগণ! আল্লাহ এজন্য তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন-যাতে করে তিনি বিধ্বস্ত করে দিবেন কাফিরদের একটা অংশকে অথবা এমনভাবে হতমান করে দেবেন যে, তার ফলে তাদেরকে ফিরে যেতে হবে সর্বনাশগ্রস্ত অবস্থায়।"
"(হে রসূল!) এ ব্যাপারে কোনও ইখতিয়ার আপনার নাই, হয়ত তিনি তাদের ক্ষমা করে দিবেন, হয়ত বা তিনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন, কারণ তারা হচ্ছে জালিম।" (সূরা আলু ইমরান ১২৭-১২৮)
"(হে রসূল!) আপনি তাকে সৎ পথে আনতে পারেন না যাকে আপনি আনতে চান, বস্তুতঃ আল্লাহই সৎ পথে নিয়ে আসেন যাকে তিনি চান। আর তিনিই ভাল জানেন কারা হিদায়াতের পথে আসবে।" (সূরা আল কাসাস ৫৬)
উপরোধৃত কুরআনী আয়াত থেকে জানা যাচ্ছে যে, জ্ঞান এবং কুদরতের মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহ। এটা সম্পূর্ণরূপে তাঁরই অধিকারভুক্ত। এই অধিকারত্বে স্বয়ং রসূলুল্লাহ এটি কেউ বসান কোন ক্রমেই জায়িয নয়। স্বয়ং রসূলুল্লাহ এটি কেউ বসান কোন ক্রমেই জায়িয নয়। হাসান (রাযি.) তো অনেক দূরের কথা।