📄 আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরশীলতা এবং তাঁরই নিকট দু‘আ প্রার্থনার তাকীদ
কুরআন মাজীদের সূরা আলু ইমরানে আল্লাহ মর্দে মুমিনদের চরিত্র বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন এভাবে:
(ا الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ فَالقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَصْلِ لَمْ يَمْسَهُمْ سُوءُ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمي) (ال عمران : ١٧٣-١٧٤)
তারা সেই লোক যাদেরকে লোকেরা এসে খবর দিল যে, (তোমাদের দুশমন) লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে। এ কথা শ্রবণ করার পর (মর্দে মুমিনগণ ভয়ে সন্ত্রস্ত হওয়ার পরিবর্তে বরং) তাদের ঈমান আরও বর্ধিত হলো, বল দৃঢ়তর হয়ে উঠল আর তারা বলে উঠল : আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি হচ্ছেন কারসাজরূপে উত্তম; তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর নিয়ামাত এবং অনুগ্রহ রাশি দ্বারা পৃষ্ট হয়ে তারা বিজয়ী বেশে ফিরে এল, কোন রূপ অনিষ্ট তাদেরকে স্পর্শ করতে পারল না, কেননা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পন্থাই তারা অনুসরণ করেছিল। আর জেনে রাখো, আল্লাহ হচ্ছেন অতীব অনুগ্রহপরায়ণ। (সূরা আলু ইমরান ১৭৩ ও ৭৪)
এখন হাদীস থেকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতার কতিপয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করা যাচ্ছেঃ
(حسبنا الله ونعم الوكيل)
আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং কারসাজরূপে কতই না উত্তম- এই কালেমা ইব্রাহীম ('আ.) সেই মহা বিপদের সময় উচ্চারণ করেছিলেন যখন কাফিরের দল তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল, আর রসূলুল্লাহ ﷺ সেই সময় তা পাঠ করেছিলেন, যখন লোকেরা এসে তাঁকে খবর দিল যে,
(إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ)
"আপনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আপনাদের বিরুদ্ধবাদী (মাক্কাহর) লোকেরা সংঘবদ্ধ হয়েছে।"
২। বুখারীতে এই হাদীস সংকলিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ বিপদাপদে-উদ্বেগ আকুলতার সময় এই কালেমা পাঠ করতেন :
(لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ العَظِيمُ العَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الكَرِيمُ ..)
"নেই কোন আরাধনার যোগ্য-উপাস্য প্রভু একমাত্র আল্লাহ ছাড়া যিনি মহান, যিনি সহিষ্ণু, নেই কোন আরাধনার যোগ্য-উপাস্য প্রভু একমাত্র আল্লাহ ছাড়া যিনি মহিমান্বিত আরশের অধিপতি, নেই কোন আরাধানার যোগ্য-উপাস্য প্রভু একমাত্র আল্লাহ ছাড়া যিনি আসমান সমূহ ও যমীনের প্রভু প্রতিপালক এবং মহান আরশের প্রভু পরোয়ারদিগার।"
হাদীসে আছে যে, নাবী ﷺ এ ধরনের বহু দু'আ তাঁর পরিবার-পরিজনকে শিখিয়েছিলেন।
সুনান হাদীস গ্রন্থ সমূহে আছে, রসূলুল্লাহ ﷺ তাকলীফ অর্থাৎ দুঃখ-কষ্ট যাতনার সময় এই দু'আ পড়তেন:
(يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ اسْتَغِيْتُ)
হে চিরঞ্জীব, হে চিরবিদ্যমান! আপনার রহমাতের আমি ভিখারী।
হাদীসে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী ﷺ তাঁর প্রিয়তমা কন্যা ফাতিমাহ (রাযি.)-কে এই দু'আ শিখিয়েছিলেন-
(يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ يَا بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ بِرَحْمَتِكَ اسْتَغِيتُ أصلح لي شأني كله ولا تكلني إلى نفسي طرفة عَيْنِ وَلا إِلَى أَحَدٍ مِّنْ خلقك)
হে চিরস্থায়ী! হে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর উদ্ভাবক! নেই কোন উপাস্য প্রভু-পরোয়ার্দিগার তুমি ভিন্ন, আমি তোমার রহমাতের ভিখারী। আমার সমস্ত কাজকর্ম বিশুদ্ধ করে দাও! আর চোখের একটি পলকের জন্যও আমার নিজের উপর আমাকে ছেড়ে দিওনা- তোমার সৃষ্টির মধ্যে আর কারোর উপরেও নয় (সর্বক্ষণ আমাকে একমাত্র তোমারই হিফাযাতে রেখো)।
৫। মুসনাদে ইমাম আহমাদ এবং সহীহ আবি হাতিমে রিওয়ায়াত এসেছে যে, ইবনে মাসউদ (রাযি.) রসূল ﷺ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেনঃ
যে ব্যক্তি বিপদ আপদে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সময়ে নিম্নের এই দু'আ খালেস অন্তরে পাঠ করে, আল্লাহ আ'আলা তার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, তার মনের অস্থিরতা এবং বিচলিত অবস্থা দূর করে দেন এবং তৎপরিবর্তে মনে আনন্দ ও প্রশান্তি এনে দেনঃ
(اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ، ابْنُ عَبْدِكَ، ابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضٍ فِي حكمك، عدل في قَضَاؤُكَ، أسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمِ هُوَ لَكَ، سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ أَنزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أو استأثرت به في علم الغيب عندكَ، أَنْ تَجْعَلَ القُرْآنَ الْعَظِيمَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وجلاء حُزْنِي وَذَهَابَ هَمِّى وَغَمَى،)
"প্রভু হে! আমি তোমারই দাস, আর তোমার দাসের পুত্র এবং তোমার দাসীর পুত্র (অর্থাৎ আমি নিজেও তোমার দাস এবং আমার পিতা-মাতাও তোমার দাস-দাসী) আমার কপাল অর্থাৎ আমার সত্তা তোমারই হস্তে, তোমার প্রতিটি হুকুম আমার উপর প্রযোজ্য (এবং অবশ্য প্রতিপাল্য) আমার সম্বন্ধে তোমার প্রতিটি ফয়সালা ইনসাফ তথা ন্যায় ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমি তোমার প্রত্যেক সেই নামে (যে নামে তুমি সুপরিচিত) যে নাম তুমি তোমার নিজের জন্য নির্বাচন করেছ অথবা যা তুমি তোমার গ্রন্থে নাযিল করেছ অথবা যা তোমার কোন সৃষ্টজীবকে তুমি শিক্ষা দিয়েছ অথবা যা তুমি ইলমে গায়িবের খাজানায় নিজের কাছেই সুরক্ষিত রেখেছ- তোমার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তুমি কুরআনে আযীমকে আমার হৃদয়ের বসন্ত ও আমার চোখের জ্যোতি বানিয়ে দাও, ঐ কুরআনকে আমার উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অপসারণ এবং আমার চিন্তা ভাবনা দূরীকরণের মাধ্যম করে দাও।"
সহাবীগণ রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি এই দু'আ শিখে মুখস্থ করে নিব? তিনি এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এই দু'আ শুনবে, সে যেন তা শিখে মুখস্থ করে নেয়।
৬। রসূলুল্লাহ ﷺ স্বীয় উম্মতের শিক্ষা এবং হুশিয়ারীর জন্য আরও বলেনঃ
(ان الشمس والقمر ايا تان من آيات الله لا ينكسفان لموت أحد ولا الحياته ولكن الله بخوف بهما عباده فاذا رايتم ذلك فانزعوا الى الصلوة وذكر الله والاستغفار-)
"সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহর অসীম কুদরতের বহু নিদর্শনের মধ্যে দু'টি নিদর্শন মাত্র। কারো জন্ম অথবা মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনই সম্পর্ক নেই। মহীয়ান ও গরীয়ান আল্লাহ রব্বুল আলামীন স্বীয় কুদরতের মাধ্যমে তাঁর শক্তিমত্তা এবং মহিমার কিছু নিদর্শন দেখিয়ে থাকেন মাত্র। যখন তোমরা তোমাদের তখন ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহ্র কাছে তোমরা পানাহ চাবে- সলাত, আল্লাহর যিক্র আযকার ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে।" তিনি সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের সময় সলাত পড়ার, দু'আ করার, দান খয়রাত করার এবং গোলাম আজাদ করার আদেশ প্রচার করেন। তিনি তাদেরকে এ কথা বলেননি যে, চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণের সময় কোন সৃষ্ট জীব বা বস্তু, কোন ফেরেশতা, কোন নাবী, কোন ওলী আউলিয়াকে সাহায্যের জন্য ডাকবে!
📄 শির্ক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজের প্রতি আকর্ষণ
যদি কেউ এই কথা বলে যে, এভাবে মৃত বুযুর্গ ব্যক্তিকে ডাকার ফলে তার অভাব দূর হয়েছে, তার প্রয়োজন মিটে গেছে এবং বুযুর্গ ব্যক্তির চেহারা তার সম্মুখে ভেসে উঠেছে, তাহলে তার জানা প্রয়োজন যে, নক্ষত্র-পূজক, মূর্তি পূজক প্রভৃতি মুশরিকদের বেলাতেও এরূপ ঘটনা অনেক ঘটে থাকে। বস্তুতঃ অতীত কালে এবং বর্তমান মুশরিকদের এ ধরনের বহু ঘটনার বিবরণ বহু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এরূপ বিস্ময়কর ঘটনা যদি প্রকাশিত না হতো তা হলে মূর্তি প্রভৃতির পূজায় কেউ কোন দিনই আত্মনিয়োগ করত না।
কুরআন মাজীদেই আমরা এর প্রমাণ দেখতে পাই। ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ ('আ.) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন প্রসঙ্গে বলেন:
"আর আমাকে এবং আমার সন্তানসন্ততিকে তুমি মূর্তি ও প্রতীক পূজা থেকে দূরে রেখো, প্রভু হে। নিশ্চয় ওগুলো (ঐ মূর্তি ও প্রতীকগুলো) বহু মানুষকে গুমরাহ ও পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে।" (সূরা ইব্রাহীম ৩৫ ও ৩৬)*
কথিত আছে যে, ইব্রাহীম (আ.)-এর পর মাক্কাহয় প্রথম শির্কের আমদানী করে আমর ইবনে লাহয়ীল খাযায়ী যাকে রসূল ﷺ দোযখে এই অবস্থায় দেখেছিলেন যে, তার নাড়িভুঁড়ি পড়ে আছে আর সে তা টেনে বেড়াচ্ছে!
প্রথম প্রথম সে (মাক্কাহয়) ষাড় ছেড়ে দিয়েছিল এবং সে-ই সর্বপ্রথম (মাক্কাহয়) দ্বীনে ইব্রাহীম অর্থাৎ খালেস তাওহীদের ধর্মকে মিটিয়ে দিয়েছিল। কথিত আছে যে, সে সিরিয়ায় গিয়ে বাল্কা নামক স্থানে মূর্তি পূজার প্রচলন দেখতে পায়। সেখানে লোকদের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, প্রতিমাগুলো তাদের কল্যাণ বিধান এবং অকল্যাণ ও ক্ষয়ক্ষতি দূরীকরণে সহায়তা করে থাকে। ফলে সে ঐ মূর্তিগুলোকে মাক্কাহয় স্থানান্তরিত করলো। এভাবে সে মাক্কাহয় মূর্তিপূজার মাধ্যমে শির্কের রেওয়াজ প্রবর্তন করল। সে সেখানে সেই সব নিষিদ্ধ কাজের প্রথা জারি করে দিল যা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলগণ হারাম করে দিয়েছেন। সেই নিষিদ্ধ কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: শির্ক, যাদু, না হক খুনখারাবী, ব্যাভিচার, মিথ্যা সাক্ষ্যদান প্রভৃতি। এই সব পাপক্রিয়ায় মানুষ আকৃষ্ট হয় কখনও নফসে আম্মারার তাকীদে অর্থাৎ অসৎ প্রবৃত্তির তাড়নায় আর কখনও অজ্ঞানতার কারণে।
মনের অসৎ প্রবণতা মানুষকে নিষিদ্ধ কাজের মধ্যে তার জন্য কল্যাণ নিহিত এবং ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্তির পথ আছে বলে মিথ্যা ধারণা জন্মায়। এই মিথ্যা ধারণার সৃষ্টি না হলে সে কিছুতেই এমন কাজে প্রবৃত্ত হতো না যার ভিতর দৃশতঃ কোন কল্যাণ নেই।
অজ্ঞানতার বশবর্তী হয়ে এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় শির্ক এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজের ফাঁদে কেন মানুষ পা দেয় তার খোলাসা বিবরণ অতঃপর পেশ করা হচ্ছে।
টিকাঃ
* নোটঃ ইব্রাহীম (আ.)-এর এই দু'আ কবুল হয়েছিল। তাঁর দুই পুত্র ইসমাঈল ('আ.) ও ইসহাক ('আ.) পৌত্তলিকতার সংস্রব থেকে শুধু নিজেরাই দূরে অবস্থান করেন নাই, তারা অন্যকেও মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। ইসহাক ('আ.)-এর পুত্র ইয়াকুব (আ.) জীবনভর এই সাধানায় রত থেকে মৃত্যুর প্রাক্কালে তার পুত্রদের ডেকে যখন জিজ্ঞাস করেন, আমার পরে তোমরা কার ইবাদাত করবে? তখন তারা এক বাক্যে উত্তর দিয়ে ছিলেন, আমরা আপনার প্রভু পরোয়ারদিগারের এবং আপনার পিতৃ পুরুষ-ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের সেই এক ও একক আল্লাহরই ইবাদাত করব এবং তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পিত মুসলিম আমরা। (সূরা আল-বাকারা ১৩৩)
ইয়াকুব (আ.)-এর নাবী-পুত্র ইউসুফ ('আ.) কারাগারে বসেও তাওহীদের শিক্ষা প্রচার করে গিয়েছেন। তিনি কারাগারেই ঘোষণা করেছেন: আমি অনুসরণ করে চলেছি আমার পিতৃ পুরুষ ইব্রাহীমের, ইসহাকের ও ইয়াকুবের মিল্লাতের। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কিছুকেই শরীক করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।...
তারপর তিনি কারাগারে তাঁর দুই সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "হে আমার কারাগারের সঙ্গীদ্বয়! (বল দেখিঃ) বহু বিচ্ছিন্ন ঈশ্বরই শ্রেয়, না এক অদ্বিতীয় পরম-পরাক্রান্ত আল্লাহ।"
"তিনি ব্যতীত আর যা কিছুর পূজা অর্চনা তোমরা করে আসছ সেগুলো তো (অবাস্তব) নামমাত্র-যেগুলোর নামকরণ করেছ তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা, যার সম্বন্ধে আল্লাহ কোনই সনদ নাযিল করেন নাই। জেনে রাখো, হুকুমের একমাত্র মালিক তো হচ্ছে আল্লাহ। তিনি আদেশ করেছেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই বন্দেগী করবে না। এটাই হচ্ছে সত্য ও সুদৃঢ় ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।" (সূরা ইউসুফ ৩৮-৪০)
📄 শির্ক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজে জড়িত হওয়ার দুটি প্রধান কারণ
অজ্ঞতা এবং প্রয়োজনের তাকীদ মানুষকে নিষিদ্ধ কাজের দিকে প্রভাবিত করে। যে ব্যক্তি সত্য সত্যই জ্ঞান রাখে যে, অমুক কাজটি খারাপ ও ক্ষতিকর এবং শরী'আত নিষিদ্ধ, সে কী করে জেনে শুনে ক্ষতিকর কাজ করতে পারে?
📄 অজ্ঞতা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ
সে সব লোক নিষিদ্ধ কাজ করে চলে তাদের মধ্যে রয়েছে কতক জাহেল এবং নাদান-অজ্ঞ এবং ভালমন্দের বোধ-রহিত। তারা উক্ত কাজের ক্ষতি এবং অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে অনুভূতি শূন্য। বাকী লোকের মনে এ বোধ রয়েছে যে, কাজটি অন্যায় কিন্তু তারা উক্ত কাজের প্রতি প্রলুব্ধ এবং এক অন্ধ আবেগে আকর্ষিত। উৎকট কাম ভাব এবং ভোগ প্রবৃত্তি তাদের হৃদয়কে অস্থির এবং চঞ্চল করে তোলে। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোন নিষিদ্ধ কাজে যে ক্ষতি ও অশুভ পরিণতি নিহিত রয়েছে- উক্ত কাজের সাময়িক আনন্দে ও সম্ভোগের মোহে তা আরও বর্ধিত হয়। কী ভয়ঙ্কর পরিণতি তার জন্য অপেক্ষা করছে সে তা মোটেই অনুধাবন করে না। অজ্ঞতার কারণে সে উক্ত ক্ষতি সম্পর্কে অনবহিত থেকে যায়। কিংবা ভোগ লিলা তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে একেবারে অন্ধ করে ফেলে। সে তার প্রবৃত্তির কেনা গোলামে পরিণত হয়। সে যা হক এবং প্রকৃত সত্য তা মোটেই অনুধাবন করতে পারে না। কেননা (হাদীসে এসেছে)
"কোন বস্তুর প্রেম অথবা কোন বস্তুর প্রতি অনুরাগ তোমাকে অন্ধ এবং বধির করে ফেলে। এজন্যই বলা হয়েছে, সাহেবে ইলম তথা বিদ্বান ও জ্ঞানী ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে থাকে।"
আবু আলীয়া বলেন, আমি রসূলুল্লাহ ﷺ এর সহাবীগণকে এই আয়াতের অর্থ এবং তাৎপর্য জিজ্ঞেস করি:
"বস্তুতঃ আল্লাহ সেই সব লোকের প্রতি প্রত্যাবর্তিত হন, তাদের তাওবাহ কবুল করেন যারা অপকর্ম করে থাকে অজ্ঞতা বশতঃ তারপর (সে সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর) শীঘ্রই (আল্লাহর দিকে ফিরে গিয়ে) তাওবাহ করে থাকে। [আল্লাহ কবুল করে থাকেন এই শ্রেণীর লোকদের তাওবাহ, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আন-নিসা ১৭)
আবু আলীয়া সহাবীগণের নিকট থেকে এই আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে যে উত্তর পেয়েছিলেন তা এখানে উল্লেখিত হয়নি। (তবে অন্যত্র দেখা যায় যে, সহাবীরা বলতেন যে, মানুষের দ্বারা যে গুনাহের কাজই সংঘটিত হয়ে থাকে তা ঘটে থাকে জাহেলী তথা অজ্ঞতা এবং জ্ঞানবিভ্রমের জন্যই।)
শরী'আতে যে সব কাজ নিষেধ হয়েছে তাতে (অপপ্রভাব-বিস্তারী) কী কী ক্ষতি নিহিত রয়েছে এবং শরী'আতে যে সব কাজের আদেশ প্রদান করা হয়েছে তাতেই বা কী কী (শুভ প্রভাব বিস্তারী) কল্যাণ রয়েছে সে সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনার স্থান এটা নয়। তবে মুমিন ব্যক্তির জন্য এটুকু জেনে রাখাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা যে সব কাজের হুকুম দিয়েছেন সেগুলো হয় পুরাপুরি কল্যাণের প্রতীক নতুবা তার ভিতরে রয়েছে কল্যাণের আধিক্য। আর যে সব কাজ তিনি করতে নিষেধ করেছেন তা হয় পুরাপুরি অকল্যাণের প্রতীক নতুবা তাতে অকল্যাণের আধিক্য রয়েছে। এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তা'আলা যে সব কাজের জন্য মনুষ্য জাতিকে নির্দেশ প্রদান করেছেন তাতে এরূপ মনে করার কারণ নেই যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার নিজের কোন প্রয়োজন রয়েছে বরং তাতে মানুষের নিজেরই কল্যাণ ও উপকার রয়েছে। আর যে কাজ করতে তিনি নিষেধ করেছেন, তার একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে, তা করলে মানুষ নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্যই রসূলুল্লাহ ﷺ এর পরিচয় প্রদান করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ ফরমিয়েছেন:
"রসূল ﷺ তাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ দেন ও অসৎ কর্ম থেকে বারণ করেন আর পবিত্র জিনিসকে হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুকে হারাম করে দেন।" (সূরা আরাফ ১৫৭)
এখন কবরের আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করা যাক। মুসলিমদের সর্বসম্মত অভিমত অনুসারে কবর মাজারে তা যে কোন ওলী-আউলিয়া, পীর পয়গাম্বরের হোক না কেন হাত রাখা, চুম্বন করা, তাতে মুখ-গাল স্পর্শ করানো নিষিদ্ধ। প্রাথমিক যুগের কোন উম্মত এবং সে যুগের কোন ইমাম এরূপ কখনও করেননি। এ হচ্ছে এক প্রকারের শির্ক। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ ফরমিয়েছেন:
নূহের কউমের লোকেরা তাদের স্বজাতিকে বলত, "নিজেদের আরাধ্য ঈশ্বরকে কোন মতেই বর্জন করবে না, বিশেষতঃ ওয়াদ্দাকে, সুওয়াকে এবং ইয়াগুসকে, ইয়াউককে এবং নাস্ত্রকে। তাদের প্রধানগণ (এভাবে) বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে।" (সূরা নূহ ২৩ ও ২৪)
এ সম্পর্কে প্রথমেই আলোচনা করা হয়েছে যে, উপরে উদ্ধৃত ওয়াদ্দা, সুওয়া প্রভৃতি নূহ ('আ.)-এর কউমের পূর্ব পুরুষদের কতিপয় সাধু ব্যক্তির নাম ছিল। কালক্রমে তাদের মাজার মানুষের যিয়ারত এবং ই'তিকাফের স্থানে পরিণত হয় এবং গোরপূজায় এর শেষ পরিণত ঘটে। সর্বশেষে মানুষ তাদের মূর্তি বানিয়ে মূর্তি পূজা শুরু করে দেয়।
বুযুর্গ ব্যক্তিদের প্রতি অন্ধ ভক্তির এই অশুভ পরিণতির কারণেই মাজার সমূহের স্পর্শ, চুম্বন, তার উপর মুখমণ্ডল মিলানো প্রভৃতি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে যখন এই সব কাজের সঙ্গে কবরে-মাজারে শায়িত মৃত ব্যক্তিকে ডাকা, তার নিকট ফরিয়াদ পেশ এবং প্রার্থনা জ্ঞাপন সংযুক্ত হয়।
আমি ইতোপূর্বেই এই সমস্ত বিষয় পর্যালোচনা করেছি এবং সেখানেই কবর সমূহের যিয়ারত উপলক্ষে যে সব শিকী কার্য সংঘটিত হয়ে থাকে তার উপর আলোকপাত করেছি। তাতে শরয়ী যিয়ারত এবং বিদআতী যিয়ারতের পার্থক্য নির্দেশ করে শেষোক্ত যিয়ারতে নাসারাদের সঙ্গে গোরপোরস্ত ব্যক্তিদের মিল দেখিয়েছি এবং এটা যে তাদের অন্ধ অনুকরণের ফলশ্রুতি তাও দেখিয়ে দিয়েছি।
পীর এবং বুযুর্গদের সম্মুখে মাথা অবনমিত করা, মাটি চুমা খাওয়া এবং এই ধরনের অন্যান্য কাজ নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে ইমামগণের মধ্যে কোনই মতভেদ নেই। বরং আল্লাহ ছাড়া অপর কারোর সামনে শুধু মাথা ঝুকানোও সিদ্ধ নয়। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে মু'আয ইবনে জাবাল (রাযি.)-এর যে ঘটনা বিবৃত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে, তিনি সিরিয়া থেকে মাদীনাহয় ফিরে এসে রসূলুল্লাহ ﷺ এর সম্মুখে সিজদা ক'রে ফেললেন। রসূল ﷺ বললেন, মু'আয! তুমি এ কী কাণ্ড করলে? তখন মু'আয (রাযি.) আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি সিরিয়ার অধিবাসীদেরকে দেখে এলাম যে, তারা তাদের পাদ্রী এবং অন্যান্য মান্য ব্যক্তিদের সিজদা করে থাকে। তারা এই কাজের সমর্থনে বলে যে, এরূপ সিজদা পূর্ববর্তী নাবীদের যুগ থেকে চলে আসছে। রসূলুল্লাহ এরশাদ করলেন- জেনে রাখো, হে মুআয! এটা সত্যের অপলাপ, তাদের এক মিথ্যা ভাষণ। আমি যদি মানুষকে সিজদা করার হুকুম দিতাম, তা হলে স্ত্রীদেরকে তাদের স্বামীদের সিজদা করতে বলতাম, কেননা স্ত্রীদের উপর স্বামীদের বড় রকম হক রয়েছে। (কিন্তু যেহেতু আল্লাহ ছাড়া কোন মানুষই অপর কোন মানুষের সিজদা পেতে পারে না। তাই এ ধরনের হুকুম আমি দিতে পারি না।)
তারপর তিনি বললেন, হে মুআয! আমার মৃত্যুর পর যখন আমার কবরের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করবে, তখন কি (কবরের উদ্দেশে) সিজদা করবে? মু'আয (রাযি.) বললেন, 'না'। তখন রসূল বললেন, হ্যাঁ, কখনো তা করবে না।
বরং এর চাইতেও বড় হুঁশিয়ারী রয়েছে নিম্নোক্ত ঘটনায়।
সহীহ বুখারীতে জাবির (রাযি.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে দেখা যায় যে, রসূলুল্লাহ তাঁর রুগ্ন অবস্থায় বসে বসে যখন নামায পড়ছিলেন, তখন তাঁর পশ্চাতে সহাবীগণ কাতার বেঁধে দণ্ডায়মান অবস্থায় নামায পড়তে যাচ্ছিলেন। তখন রসূলুল্লাহ তাদেরকেও বসে নামায পড়ার হুকুম দিলেন। তারপর ইরশাদ ফরমালেন, অনারবরা যেভাবে একে অপরের তা'যীম করে থাকে, তোমরা আমাকে সেরূপ তাযীম করো না। তারপর বললেন, যে ব্যক্তি তার সম্মুখে লোকেদের দণ্ডবৎ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুশী হয়, সে যেন দোযখে তাঁর বাসস্থান ঠিক করে নেয়।
এখন চিন্তা করে দেখুন, যখন রসূল অনারবদের মধ্যে প্রচলিত বড়দের প্রতি সম্মানার্থে দাঁড়ানোর প্রথাকে এতদূর অপছন্দ করেছেন এবং তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপিত হয় এমন কাজ থেকে এত অধিক পরহেয করেছেন যে, তিনি বসে নামায পড়ানো অবস্থায় তাঁর পশ্চাতে সহাবাগণের দাঁড়িয়ে নামায পড়া বন্ধ করে দিয়ে বসে পড়তে বললেন। এটা এজন্য করলেন যে, যারা তাদের বুযুর্গ ও মান্য ব্যক্তিদের সম্মানার্থে দণ্ডায়মান হয় তাদের অনুকরণ যেন মুসলমানরা না করে। এছাড়া তিনি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি তার সম্মানার্থে লোকদের দাঁড়ান দেখে খুশী হয়, দোযখে প্রবেশ ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। এই যদি হয় নিষেধাজ্ঞার পরিসর, তাহলে পীর বুযুর্গদের সিজদা করা, তাদের সামনে মাথা নোয়ানো এবং হাত চুম্বন করা কী করে জায়িয হবে?
'উমার ইবনে আব্দুল আযীয- যিনি পৃথিবীর বুকে আল্লাহ্র খলীফা ছিলেন, তিনি এমন সব কর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন যাদের কাজই ছিল দরবারে প্রবেশকারীদের মাটি চুম্বন দেয়ার প্রথা পালনে বাধা দেয়া। সে সত্ত্বেও যারা সেরূপ করতো তাদের তারা শায়েস্তা করতেন।
মোট কথা, কিয়াম (দাঁড়ান) ক'উদ (বসা), রুকু এবং সিজদা সম্পূর্ণরূপে একমাত্র আসমান ও যমীনের স্রষ্টা একক আল্লাহরই প্রাপ্য- তাঁরই খাস অধিকার। আর যে বস্তুতে একমাত্র আল্লাহরই হক- সেখানে অন্য কারোর বিন্দুমাত্রও অংশ নেই।
এমনকি শপথ করার মত একটি চিরাভ্যস্ত কাজ যা মানুষ অহরহ করে থাকে-একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অপর কারোর নামেই করা চলবে না। অন্য কারোও নামে কসম খাওয়া কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
বুখারী এবং মুসলিমের রিওয়ায়াতে আছে- রসূলুল্লাহ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি শপথ করবে- সে যেন শপথ করে আল্লাহর নামে নতুবা সে নীরব থাকবে, অন্য কোন শপথই উচ্চারণ করবে না।"
অন্য হাদীসে আছেঃ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন নামে কসম খায়, সে শির্ক করে থাকে।"
বস্তুতঃ সব রকম ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, একমাত্র লা শরীক আল্লাহরই তা প্রাপ্য, অন্য কারোর কোনই হক নেই তাতে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন:
"বস্তুতঃ তাদেরকে তো এই আদেশই দেয়া হয়েছিল যে, দ্বীনকে তারা খালাস করে নিবে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য-একনিষ্ঠভাবে এবং কায়িম করবে নামাযকে এবং প্রদান করতে থাকবে যাকাত আর প্রকৃত প্রস্তাবে এটাই হচ্ছে সুদৃঢ় ধর্মমত।" (সূরা বাইয়িনাহ ৫)
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য তিনটি বস্তু পছন্দ করেন, সেগুলো এই:
১। "তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো আর ইবাদাতে কাউকে তাঁর সঙ্গে শরীক করো না।"
২। "সকলে সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রশিকে (কুরআন এবং তার ব্যাখ্যারূপী সুন্নাহকে) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে আর তোমরা ফির্কায় ফির্কায় বিভক্ত হয়ে যেয়ো না।"
৩। "আর আল্লাহ যাকে তোমাদের উপর শাসন কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন, তোমরা তার কল্যাণ কামনা করবে (তার অমঙ্গল কামনা করবে না, বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কাজে যাবে না)।"
এ কথা সুবিদিত যে, দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করে দেয়াই ইবাদাতের তথা আনুগত্যের মূল কথা। এ জন্য রসূল ﷺ প্রকাশ্য, গোপন, ছোট, বড় সব রকম শির্ক ও শির্কী কাজে জড়িত হতে কঠোরভাবে নিষেধ করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। এমনকি বহু সূত্রে বর্ণিত (মুতাওয়াতির) হাদীসে বিভিন্ন শব্দে সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়ার সময়ে নামায পড়তে (সিজদা করতে) তিনি নিষেধ করেছেন।
কখনও তিনি বলেছেন:
"সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের নির্দিষ্ট সময়ে তোমরা ইচ্ছা করে নামায পড়ো না। আবার কখনও বা তিনি ফজরের উদয় (ফজরের নামায পড়া) এর পর থেকে সূর্য পুরাপুরি না উঠা পর্যন্ত এবং আসরের নামাযের পর থেকে সূর্য পূরাপুরি অন্ত না যাওয়া পর্যন্ত নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।"
আবার কখনও বা একথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে,
"নিশ্চয় সূর্য যখন উদিত হয়-তখন শয়তানের দুই শিং এর মধ্যস্থল দিয়ে উদিত হয়। আর সেই সময় কাফিরেরা সূর্যকে সিজদা করে থাকে।"
এই সময় নামায আদায় করতে এজন্যই নিষেধ করা হয়েছে যে, তাতে করে মুশরিকদের সঙ্গে সময়ের দিক দিয়ে সামঞ্জস্য দেখা দেয়। কেননা তারা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে সিজদা করে থাকে আর সে সময় শয়তান সূর্যের নিকটে অবস্থান করে- যাতে করে মানুষের সিজদা তার জন্য হয়ে যায়।
মুশরিকদের সঙ্গে এতটুকু সামঞ্জস্যের ব্যাপারকেও যখন কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে তখন মুশরিকদের সঙ্গে অন্যান্য ব্যাপারে সামঞ্জস্য রেখে অথবা তাদের দেখাদেখি শির্ক ও শির্কীয়ানা কাজে জড়িত হয়ে পড়া কত বড় অপরাধ তা চিন্তা করে দেখা প্রয়োজন।
রসূলুল্লাহ ﷺ কে আহলে কিতাবদের উদ্দেশে যে কথা ঘোষণা করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, এই প্রসঙ্গে তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ।
"বলুন (হে রসূল!) হে আহলে কিতাব (ইয়াহুদী, নাসারাগণ) তোমরা আসো এমন এক কথায় যা তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে একই (অর্থাৎ যা একটা কমন প্ল্যাটফর্ম রূপে ব্যবহৃত হতে পারে) আর সেটা হচ্ছে এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই ইবাদাত করব না-কারোরই আনুগত্য বরণ করব না, তার সঙ্গে অপর কাউকে শরীক করবে না এবং আমাদের কেউই আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকেই রবরূপে গ্রহণ করব না। তারা যদি এই ব্যাপারে বিমুখ হয় (রাজী না হয় এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়) তাহলে বলুন: তোমরা এই বিষয়ে সাক্ষী থাক যে, আমরা হচ্ছি মুসলমান-একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।" (সূরা আলু ইমরান ৬৪)
এই সম্বোধন এজন্য করা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে প্রভুরূপে মেনে নেয়ার ব্যাপারে উভয়ের (ইয়াহুদী ও নাসারাগণের) মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে। আর আমরা মুসলমানগণ এ ধরনের কাজে লিপ্ত হতে কঠোর নিষেধ বাণী পেয়েছি, কাজেই যারা রসূলুল্লাহ ﷺ এর হিদায়াত বা সহাবাগণের অনুসৃত পথ এবং তাবিয়ীদের অবলম্বিত পন্থা (রিওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমায়ীন) ছেড়ে নাসারা এবং ইয়াহুদীদের তরীকাকে অবলম্বন এবং তাদের পথের অনুসরণকে প্রেয় ও শ্রেয় মনে করে বেছে নেয়, তারা নিশ্চিততাবে আল্লাহর এবং তাঁর রসূল ﷺ এর হুকুম আহকাম হেলায় প্রত্যাখ্যান করে থাকে। এটা নিশ্চিতভাবে আল্লাহ এবং তার রসূল ﷺ এর জঘন্য নাফরমানি।
কতক লোক এমন রয়েছে যারা বলে, "আল্লাহর বারকাতে এবং আপনার কল্যাণে আমার কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে"। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এ ধরনের কথা শরী'আতের সম্পূর্ণ খেলাফ। কেননা কার্যে সিদ্ধিদানের ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে কেউ শরীক হতে পারে না।
এ ব্যাপারেও রসূলুল্লাহ এর পথ নির্দেশ সুস্পষ্ট। যখন কোন এক ব্যক্তি কোন এক প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ কে লক্ষ্য করে বললেনঃ "আল্লাহ এবং আপনি যা ইচ্ছা করেন।" তখন এ কথা শুনে রসূল বললেন, "কী! তুমি আমাকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে দিলে? এরূপ না বলে তুমি বরং বল, একমাত্র আল্লাহ এককভাবে যা ইচ্ছা করেন।"
অন্যত্র তিনি তাঁর সহচরবৃন্দকে লক্ষ্য করে বলেন,
"এ কথা বলো না যে, আল্লাহ এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন, বরং বলোঃ আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তৎপর (আল্লাহর ইচ্ছা মুতাবেক) মুহাম্মাদ যা যা ইচ্ছা করেন।"
এক হাদীসে বলা হয়েছে, কোন এক ব্যক্তি মুসলমানদের একটি দলকে লক্ষ্য করে বললো, তোমরা যদি আল্লাহর সঙ্গে শরীক না বানাতে তবে তোমরা কত সুন্দর জাতিই না হতে। কিন্তু তোমরা বলে থাকো:
"যা আল্লাহ ইচ্ছা করেন এবং যা মুহাম্মাদ ইচ্ছা করেন।"
অতঃপর রসূলুল্লাহ ﷺ এরূপ বলতে নিষেধ করে দিলেন।
সহীহ বুখারীতে যায়িদ ইবনে খালিদ (রাযি.) থেকে রিওয়ায়াত এসেছে:
নাবী ﷺ হুদায়বিয়ায় আমাদের নিয়ে ফজরের নামায পড়লেন, ঐ রাত্রে বৃষ্টি হয়ে গেছে। নামাযের পর রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা কি জান যে, গত রাত্রে তোমাদের প্রভু কী বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই উত্তম জানেন। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন যে, আল্লাহ বলেছেন: "আজকের রাত্রে আমার বান্দাদের মধ্যে কতক আমার প্রতি ঈমান রাখে আর নক্ষত্র (পরস্তী)-কে অস্বীকার করে, আবার কতক এমন রয়েছে যারা নক্ষত্রের প্রতিই ঈমান রাখে এবং আমাকে ইনকার করে- অর্থাৎ আমার কুদরতী শক্তিকে অস্বীকার করে। (তারপর আল্লাহ বলেন) যারা (মনে দৃঢ় আস্থা রেখে) বলে যে, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দয়াতেই বৃষ্টি হয়েছে, তারা আমার প্রতি (প্রকৃত প্রস্তাবে) ঈমান রাখে এবং নক্ষত্র পূজা থেকে নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখে। আর যারা এই ধারণা পোষণ করে যে, অমুক অমুক নক্ষত্র রাশির যোগাযোগের ফলে বৃষ্টি হয়েছে, তারা আমার উপর অনাস্থা প্রকাশ করে এবং নক্ষত্রের উপরই ঈমান রাখে।"
অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, প্রকৃতির রাজ্যে আল্লাহ তা'আলা যে সব কার্য-কারণ ও ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চালু রেখেছেন সে গুলো সবই তাঁর হুকুমবরদার, তাঁর ইচ্ছা এবং ইঙ্গিতেই সব কিছু ঘটে থাকে, ওগুলোর কোনটিকেই তাঁর শরীক ও সাহায্যকারীরূপে মনে করা যাবে না। যারা বলে থাকে, "অমুক কাজটি অমুক বুযুর্গের বারকাতে সম্পন্ন হয়েছে"-তাদের এই কথার তাৎপর্য কয়েক রকম হতে পারে। প্রথম, এর অর্থ দু'আ হতে পারে, এই তাৎপর্য গ্রহণ মোটেই আপত্তিকর নয়। বুযুর্গ ব্যক্তিদের দু'আ আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে থাকে, বিশেষ করে এক অনুপস্থিত ব্যক্তির দু'আ অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য খুব দ্রুত ফলপ্রসূ হয়ে থাকে!
দ্বিতীয়, এর অর্থ হয় : বুযুর্গ ব্যক্তির সাহচর্যে ইলমী ও 'আমলী কল্যাণ লাভ হয়ে থাকে। এই অর্থও বাস্তব ও সত্য। জ্ঞানী ও নিষ্ঠাবান সৎ কর্মশীল বুযুর্গ ও ব্যক্তির সাহচর্যে যারা আসেন সেই জ্ঞানবুদ্ধ, উন্নত-চরিত্র ও অমলিন ব্যক্তিত্বের প্রভাবে প্রভূত কল্যাণ লাভ করে থাকেন। এগুলো এবং এই ধরনের অন্য কোন অর্থ হলে তাও হবে বিশুদ্ধ - দোষ বিবর্জিত। এতে আপত্তির কোন কারণ নেই।
তৃতীয়, যখন বারকাত হাসেল থেকে অর্থ গ্রহণ করা হয় যে, মৃত বা অনুপস্থিত বুযুর্গের নিকট আবেদন নিবেদন পেশ করে কল্যাণ লাভ করা যায়, তখন সে অর্থ হবে বাতিল, অন্যায় ও অমূলক। কারণ সে অবস্থায় মৃত সেই অক্ষম। কারণ তখন তার দ্বারা কোন কল্যাণ লাভ করা সম্ভব নয়, কোন রূপ প্রভাব বিস্তারে তার কোনই ক্ষমতা নেই। অথবা যখন উদ্দেশ্য হয় নাজারিয বিদ'আতী কোন কাজ, তখন বুযুর্গ ব্যক্তি ঐ আহবানকারীর আহবানে সাড়া দেন না দিতে পারেন না। এ ধরনের অন্য তাৎপর্যও বাতিল। তবে এ বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য বরণের জন্য সুন্নত -সম্মত কোন বাস্তব আমল এবং মুমিনদের একের জন্য অপরের দু'আ করা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় লোকের জন্য কল্যাণপ্রদ এবং এই কল্যাণ লাভ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার উপর নির্ভরশীল।