📄 বান্দার উপর আল্লাহর হক এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক সংক্রান্ত হাদীস
সহীহ বুখারীতে মু'আয ইবনে জাবাল কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে: রসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করেছেনঃ
(يا معاذ، اندرى ما حق الله على البعاد، قال الله ورسوله أعلم، قال حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئا - اندرى ما حق العباد على الله اذا فعلوا ذالك فان حقهم عليه أن لا يعذبهم)
"হে মু'আয। তুমি কি জান যে, বান্দার উপর আল্লাহর হক কী? মু'আয বলেন, এ সম্পর্কে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই এ অধিকতর জ্ঞান রাখেন।"
তখন রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, বান্দার প্রতি আল্লাহর হক এই যে, (যেহেতু তিনিই খালেক ও মালেক কাজেই) তারা একমাত্র তাঁরই দাসত্ব বরণ করবে, একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে অপর কাউকেই শরীক করবে না। তিনি পুনঃ জিজ্ঞেস করলেন, "মু'আয! তুমি কি জান, যখন তারা আল্লাহর উক্ত হক আদায় করবে তখন আল্লাহর নিকট বান্দার হক কী? তিনি নিজেই উত্তরে বললেন, বান্দা যখন আল্লাহর হক আদায় করবে তখন আল্লাহর নিকট বান্দার পাপ্য হক অধিকার হবে এই যে, তিনি তাদেরকে (তাদের ভুল ভ্রান্তির জন্য) শাস্তি প্রদান করবেন না।"
কোন কোন হাদীসে এই হক সম্পর্কে আরও বিস্তৃত বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন রসূল ﷺ বলেছেন,
"মদ্যপায়ীর চল্লিশ দিবসের নামায কবুল হয় না। সে যদি তাওবাহ করে তবে আল্লাহ তার গুনাহ্ মাফ করে দেন। তারপর এই তাওবাহর পর আবার যদি সে মদ খাওয়া শুরু করে দেয় তবে (দ্বিতীয়বারও তাকে অনুরূপ তাওবাহয় আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন কিন্তু) তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় আল্লাহর এ অধিকার বর্তে যায় যে, তিনি তাকে 'তীনাতুল খাবাল' পান করাবেন। রসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হল 'তীনাতুল খাবাল' কী? তিনি বললেন, তা জাহান্নামের অধিবাসীদের জন্য পানের অযোগ্য পানীয়ের তলানি।
📄 রসূল ﷺ এর ইন্তিকালের পর তাঁর ওয়াসীলার অসিদ্ধতা
আলিমদের অপর একদল বলেন, এ সব দলীল দ্বারা রসূল ﷺ এর ইস্তিকালের পর এবং অনুপস্থিতিকালে তাঁর ওয়াসীলা ধরার সিদ্ধতা মোটেই প্রমাণিত হয় না এবং কেবলমাত্র তাঁর জীবিতকালে এবং তার উপস্থিতিতেই 'ওয়াসীলাহর সিদ্ধতা প্রমাণিত হয়। যেমন সহীহ বুখারীতে রিওয়ায়াত এসেছে যে, 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) রসূলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তিকালের পর তাঁর চাচা আব্বাসের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বৃষ্টি বর্ষণের প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন,
"হে আল্লাহ! যতদিন রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলেন, ততদিন আমরা আমাদের নাবীর মাধ্যমে তোমার নিকট বৃষ্টির প্রার্থনা জানিয়েছি। ফলে তুমি বৃষ্টি প্রদান করেছ। এখন (তাঁর অনুপস্থিতিতে) আমাদের নাবীর চাচার মাধ্যমে আমাদের প্রার্থনা জ্ঞাপন করছি, অতএব তুমি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ কর।"
সে প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েছে এবং বৃষ্টিও বর্ষিত হয়েছে। ফারুকে আযম এই ঘটনার মাধ্যমে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ -এর কেবল জীবিতকালেই এ ধরনের ব্যাপারে তারা তাঁর ওয়াসীলা ধরেছেন এবং বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। এই ওয়াসীলার তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, লোকেরা তাঁর নিকট এসে আল্লাহর নিকট দু'আর আবেদন জানাতেন। রসূলুল্লাহ ﷺ দু'আ করতেন আর সহাবাগণ তার সঙ্গে দু'আয় সামিল হতেন। তারা এভাবে রসূল ﷺ এর সুপারিশ এবং দু'আর ওয়াসীলা ধরতেন অর্থাৎ রসূল ﷺ এর সুপারিশ এবং দু'আই হচ্ছে তাঁর ওয়াসীলা। এ বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে নিম্ন বর্ণিত হাদীস থেকে।
সহীহ বুখারীতে আনাস ইবনে মালিক (রাযি.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি জুমু'আহ্র দিবস মাসজিদে নববীতে আগমন করল। রসূলুল্লাহ ﷺ তখন খুৎবাহ দিচ্ছেলেন। ঐ ব্যক্তি রসূল ﷺ এর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! (অতিরিক্ত বর্ষণের ফলে) সম্পদ ফল ফসলাদি ধ্বংস হয়ে গেল, রাস্তাঘাট (এ চলাচল) বন্ধ হয়ে গেল, আপনি আল্লাহর নিকট বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার প্রার্থনা জানিয়ে দু'আ করুন। রসূলুল্লাহ ﷺ দু'আর জন্য দু'হাত তুললেন এবং বললেন, "প্রভু হে! বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দিন- আমাদের উপর থেকে, বৃষ্টি দিতে থাকুন টালায়, পাহাড়ে উপত্যকায়, মুক্ত প্রান্তর, বনে জঙ্গলে।
রাবী বলেন, এই দু'আর সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল। ফলে যখন আমরা মসজিদ থেকে বের হলাম তখন আকাশ মেঘমুক্ত, সূর্যের প্রখর রৌদ্রে আমরা পথ চলতে লাগলাম।
এই হাদীসে দেখা যাচ্ছে যে, উক্ত ব্যক্তি রসূলুল্লাহ ﷺ এর খেদমতে আবেদন জানালোঃ
(ادع الله لنا أن يمسكها عنا)
ওগো আল্লাহর রসূল! আমাদের জন্য আল্লাহর দরগাহে দু'আ করুন তিনি যেন আমাদের উপর থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেন।
এতে এ কথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে দু'আর আবেদন জানান হত আর এটাই হচ্ছে তাঁর ওয়াসীলা ধরা।
বুখারী 'আবদুল্লাহ ইবনে 'উমার (রাযি) থেকে রিওয়ায়াত করেছেন, তিনি বলেন, 'আলী (রাযি.)-এর পিতা আবু তালিব রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রশংসায় যে কথা বলতেন তা আমার বেশ মনে পড়ে।
তিনি বলতেন: (وابيض ايستسقى الغمام بوجهه ثمال لليتامى عصمة للارامل)
অর্থাৎ সেই শুভ্র-বদন যাঁর চেহারার ঔজ্জ্বল্যের তুফাইলে বৃষ্টির জন্য দু'আ প্রার্থনা করা হয়; তিনি হচ্ছে ইয়াতিমদের আশ্রয়স্থল আর বিধবাদের শরণ-কেন্দ্র।
ফলকথা এই যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবদ্দশায় পানি বর্ষণের জন্য তাঁর ওয়াসীলার আশ্রয় নেয়া হত। অর্থাৎ তাঁর নিকট দু'আর বাসনা জানানো হত। আর তাঁর মহা প্রয়াণের পর তাঁর চাচা আব্বাস (রাযি.)-এর মাধ্যমে পানি বর্ষণের জন্য দু'আ করা হ'ত।
কিন্তু রসূলুল্লাহ ﷺ এর ইস্তিকালের পর অথবা তাঁর অনুপস্থিতি কালে কিংবা তাঁর কবরের কাছে গিয়ে তাঁর ওয়াসীলা করা হ'ত না, তিনি ছাড়া অন্য কারও কবরের কাছে গিয়েও পানি চাওয়া হ'ত না।
এভাবে আমীরুল মু'মিনীন মু'আবিয়া ইবনে আবু সুফ্যান ইয়াযিদ ইবনে আসওয়াদ জারশীকে ইমাম বানিয়ে পানির জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেনঃ
অর্থাৎ "হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তিদেরকে তোমার সম্মুখে সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত করেছি- হে ইয়াযীদ! আল্লাহর দরবারে দু'আর জন্য হাত উঠাও।"
তিনি হাত উঠিয়ে দু'আ করলেন আর উপস্থিত সবাই তাঁর সঙ্গে সঙ্গে দু'আ করলেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা রহমতের পানি বর্ষণ করলেন।
এ জন্যই উলামায়ে কিরামের মতে মুত্তাকী এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের দ্বারা দু'আ করানো মুস্তাহাব। সুপারিশকারী ব্যক্তি যদি রসূলুল্লাহ ﷺ এর আহলে বায়তের মধ্য থেকে হন তবে সর্বোত্তম, কিন্তু কোন আলিমই কোন নাবী অথবা কোন সালেহ বান্দার মৃত্যুর পর কিংবা তাঁর অনুপস্থিতিতে পানি বর্ষণের জন্য তাঁর ওয়াসীলায় দু'আ করা শরীঅত সম্মত কাজ বলে অভিমত প্রকাশ করেন নাই। অনুরূপভাবে কোন দুশমনের উপর বিজয় লাভের জন্য কিংবা অন্য কোনরূপ প্রার্থনায় তাঁদের ওয়াসীলারূপে পেশ করা জায়িয বলেননি। এরূপ কাজকে কোন আলিম মুস্তাহাবও বলেননি।
দু'আ তো সকল ইবাদাতের মস্তিষ্ক স্বরূপ আর ইবাদাতের ভিত্তি, নাবী ﷺ এর সুন্নাত এবং তাঁর ইত্তিবা (অনুসরণ)-এর উপর প্রতিষ্ঠিত।
হৃদয়ের বাসনা কামনা এবং স্বকপোলকল্পিত ও নব উদ্ভাবিত পদ্ধতির উপরেও ইবাদাতের বুনিয়াদ কায়িম নয়। সেই ইবাদাতই আল্লাহর ইবাদাতরূপে গণ্য হবে যা শরীয়ত সম্মত। যে ইবাদাত প্রবৃত্তির চাহিদা অনুসারে এবং নবাবিষ্কৃত পদ্ধতিতে করা হবে, তা কস্মিনকালে আল্লাহর ইবাদত রূপে গণ্য হবে না। তাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ ফরমিয়েছেন:
(ام لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنَ بِهِ اللَّهُ) (شوری : ۲۱)
অর্থাৎ তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কতক শরীক (বিধানদাতা) কল্পনা করে নিয়েছে যারা তাদের জন্য এমন বিধান প্রদান করে যার অনুমতি আল্লাহ দেন নাই? (সূরা শূরা ২১)
বরং আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন:
(ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَحُفَيَةٍ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ) (اعراف : ٥٥)
অর্থাৎ তোমরা তোমাদের প্রভু পরোয়ারদিগারকে আহ্বান করো বিনয় নম্র অন্তরে এবেং মনে মনে-সংগোপনে, নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা আল আ'রাফ ৫৫)
আর রসূলুল্লাহ ﷺ হুঁশিয়ার বাণী উচ্চারণ করেছেন:
(سيكون في هذه الامة قوم يعتدن في الدعاء والطهور)
অর্থাৎ এই উম্মতের মধ্যে এমন লোকের আবির্ভাব অবশ্যই ঘটবে যারা দু'আ এবং পাক-পবিত্রতার ব্যাপারে ন্যায়ের সীমারেখা অতিক্রম করে চলবে।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে কোন ব্যক্তি বিপদে নিপতিত হয়ে অথবা ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে যদি তার পীর মুর্শিদের নিকট এই বলে সাহায্য প্রার্থনা করে যে, তার পীর যেন তার সন্ত্রস্ত হৃদয়ের অস্থিরতা দূর করে তাতে প্রশান্তি ও দৃঢ়তা আনয়ন করেন, তা হলে সে কাজ হবে সুস্পষ্ট শির্ক আর সে শির্ক হবে খৃষ্ট ধর্মে প্রচলিত শির্কের একটি প্রকরণ।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহই হচ্ছেন একমাত্র সত্তা যিনি রহমত এনায়েত করে হৃদয়ে প্রশান্তি বিধান করেন আর তিনিই সেই একমাত্র সত্তা যিনি বিপদ আপদ, দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা উদ্বেগের অনিষ্ট অপসারিত করে থাকেন।
আল্লাহ কুরআন মাজীদে ইরশাদ ফরমিয়েছেন:
(الوَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ) (یونس : ۱۰۷)
আল্লাহ যদি তোমাকে কোন যাতনা-ক্লেশ (অথবা বিপদ আপদ) পৌঁছিয়ে দেন, তা হলে কেউ নেই তার মোচনকারী, নেই এমন কেউ যে হটিয়ে দিতে সক্ষম আর আল্লাহ যদি তোমার কোন মঙ্গল চান, তবে তা রদ করবারও কেউ নেই। (সূরা ইউনুস ১০৭)
তিনি আবার বলেন:
(مَا يَفْتَحُ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَمَا يُمْسِكَ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ) (فاطر : ۲)
আল্লাহ মানুষের জন্য স্বয়ং তাঁর রহমতের যে দুয়ার খুলে দেন, তা বন্ধ করে দেবার মত কেউ নেই, আর তিনিই যে প্রবল পরাক্রান্ত প্রজ্ঞামণ্ডিত। (সূরা আল্-ফাতির ২)
অন্যত্র আল্লাহ ইরশাদ ফরমিয়েছেন:
(قُلْ أَرَأَيْتَكُمْ إِنْ أَتَكُمْ عَذَابُ اللَّهِ أَوْ أَتَتْكُمُ السَّاعَةُ أَغَيْرَ اللَّهِ تَدْعُونَ إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ بَلْ إِيَّاهُ تَدْعُونَ فَيَكْشِفُ مَا تَدْعُونَ إِلَيْهِ إِنْ شَاءَ وَتَنْسَوْنَ مَا تُشْرِكُونَ)
(হে রসূল) আপনি বলে দিন, "আচ্ছা দেখ তো, যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর আযাব এসে যায় অথবা তোমাদের উপর যদি কিয়ামাত আপতিত হয় তখন কি তোমরা (সাহায্য ও আশ্রয়ের জন্য) ডাকবে আল্লাহ ছাড়া অপর কাউকে (যাদেরকে তোমাদের দেবতারূপে গ্রহণ করেছ)? যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক- (তবে এর জবাব দাও) না, বরং তাঁকেই (একক প্রভু-পরোয়ারদিগারকেই) তোমরা ডাকবে। তখন যে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য তাঁকে তোমরা ডাকবে, যদি তিনি ইচ্ছা করেন সেই বিপদ তিনি দূর করে দেবেন, আর যাদেরকে তোমরা আল্লাহর শরীক ধরে নিয়েছিলে (সেই বিপদের দিনে) তাদেরকে তোমরা ভুলে যাবে। (সূরা আন'আম ৪০-৪১)
সূরা বানী ইসরাঈলে আল্লাহ বলেন,
(হে পয়গম্বর!) আপনি (তাদের) বলে দিন: তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য যাদেরকে বিপদ উদ্ধারকারী মনে করে নিয়েছ তাদেরকে ডেকে দেখ। (ডেকে ডেকে ব্যর্থ হবে, তখন বুঝতে পারবে) তোমাদের দুঃখ-ক্লেশ দূর করার কোন ক্ষমতাই তাদের নেই, তার কোন পরিবর্তন সাধনের ক্ষমতাও তারা রাখে না।
যাদেরকে এরা আহ্বান করে তারাই তো স্বীয় প্রভুর নৈকট্য লাভের জন্য 'ওয়াসীলা'র সন্ধান করে বেড়ায় এজন্য যে, কে (তাদের মধ্যে) অধিকতর নিকটবর্তী, আর তারা আল্লাহর দয়া প্রত্যাশা করে এবং (সঙ্গে সঙ্গে) তাঁর শান্তিকে ভয় ক'রে চলে, নিশ্চয় আপনার প্রভু-প্রতিপালকের শান্তি ভয়েরই যোগ্য-ভয়াবহ। (সূরা বানী ইসরাঈল ৫৬ ও ৫৭)
উপরে সংকলিত আয়াতগুলোতে আল্লাহ এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং খোলাসা করে দিয়েছেন যে, যে সব লোক বিপদত্রাণের জন্য ফেরেশতা, নাবী-রসূল, ওলী-আউলিয়া, পীর মুরশিদ প্রমুখকে ডেকে থাকে, "তারা লা ইয়ামলেকুনা কাশফায় যুবরে ওলা তাহবীলা" দুঃখ-ক্লেশ বিপদ আপদ দূর করার অথবা তার পরিবর্তন সাধনের কোন ক্ষমতাই রাখে না। তারা বর্তমানের বিপদও দূর করতে পারে না, ভবিষ্যতের দুঃখ কষ্ট প্রতিরোধের ক্ষমতাও তাদের নেই।
যদি কোন ব্যক্তি বলে যে, আমি আমার শায়খ তথা পীর মুরশিদের এ জন্যই ডাকি যে, তিনি হবেন আমার সুপারিশকারী, তবে সে খৃষ্টান এবং তাদের পোপ, বিশপ ও সন্ন্যাসীদের মত ও পথকেই অবলম্বন করবে, মুমিন মুসলিমদের পথ এটা নয়। মুমিন একমাত্র তার প্রভু পরোয়ারদিগারের অনুগ্রহেরই প্রত্যাশী এবং তাঁরই শাস্তির ভয়ে ভীত, সদা সন্ত্রস্ত। একনিষ্ঠভাবে অকপট মনে সে তার প্রভুকেই ডেকে থাকে। পীর মুরশিদের কাজ হচ্ছে তার মুরীদের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করা এবং তার প্রতি সহৃদয় ব্যবহার করা।
এ কথা কস্মিনকালে বিস্তৃত হওয়া উচিত নয় যে, সম্মান ও মর্যাদায় সৃষ্টিকুলের সেরা হচ্ছে আমাদের রসূল ﷺ! আর এর সঙ্গে এ কথাও হৃদয়ে গেঁথে রাখা প্রয়োজন যে, সহাবাগণ যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁর অমিয় বাণী শুনেছেন, তার সমুদয় কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছেন, তারাই হচ্ছেন রসূলুল্লাহ ﷺ এর আদেশ নিষেধ এবং শরীয়াতের হুকুম আহকাম সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানবান। তাঁর সম্মান ও মান মর্যাদা সম্পর্কে তারাই অধিকতর ওয়াকেফহাল। আর তারাই ছিলেন তাঁর সর্বাধিক অনুগত-হুকুমবরদার।
সেই পাক-পূত মানব মুকুট, রসূল-শ্রেষ্ঠ ও নাবী-সম্রাট তাঁর সহচরদের কাউকেই কখনও এ হুকুম দেননি যে, ভয়-ভীতি এবং বিপদ আপদ ও দুঃঃখ ক্লেশের সময় 'ইয়া সাইয়েদী', হে আল্লাহর রসূল! হে আমাদের নেতা, হে আল্লাহর রসূল- বলে ডেকো। আর সহাবাগণের মধ্যে কেউ-না নাবী ﷺ এর জীবিতকালে, না তাঁর ওফাতের পরে এরূপভাবে তাঁকে ডেকেছেন।
বরং তিনি ডাকতে বলেছেন, একমাত্র আল্লাহকেই এবং নির্ভর করতে বলেছেন একমাত্র তাঁরই উপরে।
📄 আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরশীলতা এবং তাঁরই নিকট দু‘আ প্রার্থনার তাকীদ
কুরআন মাজীদের সূরা আলু ইমরানে আল্লাহ মর্দে মুমিনদের চরিত্র বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন এভাবে:
(ا الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ فَالقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَصْلِ لَمْ يَمْسَهُمْ سُوءُ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمي) (ال عمران : ١٧٣-١٧٤)
তারা সেই লোক যাদেরকে লোকেরা এসে খবর দিল যে, (তোমাদের দুশমন) লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে। এ কথা শ্রবণ করার পর (মর্দে মুমিনগণ ভয়ে সন্ত্রস্ত হওয়ার পরিবর্তে বরং) তাদের ঈমান আরও বর্ধিত হলো, বল দৃঢ়তর হয়ে উঠল আর তারা বলে উঠল : আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি হচ্ছেন কারসাজরূপে উত্তম; তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে আল্লাহর নিয়ামাত এবং অনুগ্রহ রাশি দ্বারা পৃষ্ট হয়ে তারা বিজয়ী বেশে ফিরে এল, কোন রূপ অনিষ্ট তাদেরকে স্পর্শ করতে পারল না, কেননা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পন্থাই তারা অনুসরণ করেছিল। আর জেনে রাখো, আল্লাহ হচ্ছেন অতীব অনুগ্রহপরায়ণ। (সূরা আলু ইমরান ১৭৩ ও ৭৪)
এখন হাদীস থেকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতার কতিপয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করা যাচ্ছেঃ
(حسبنا الله ونعم الوكيل)
আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং কারসাজরূপে কতই না উত্তম- এই কালেমা ইব্রাহীম ('আ.) সেই মহা বিপদের সময় উচ্চারণ করেছিলেন যখন কাফিরের দল তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল, আর রসূলুল্লাহ ﷺ সেই সময় তা পাঠ করেছিলেন, যখন লোকেরা এসে তাঁকে খবর দিল যে,
(إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ)
"আপনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আপনাদের বিরুদ্ধবাদী (মাক্কাহর) লোকেরা সংঘবদ্ধ হয়েছে।"
২। বুখারীতে এই হাদীস সংকলিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ বিপদাপদে-উদ্বেগ আকুলতার সময় এই কালেমা পাঠ করতেন :
(لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ العَظِيمُ العَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الكَرِيمُ ..)
"নেই কোন আরাধনার যোগ্য-উপাস্য প্রভু একমাত্র আল্লাহ ছাড়া যিনি মহান, যিনি সহিষ্ণু, নেই কোন আরাধনার যোগ্য-উপাস্য প্রভু একমাত্র আল্লাহ ছাড়া যিনি মহিমান্বিত আরশের অধিপতি, নেই কোন আরাধানার যোগ্য-উপাস্য প্রভু একমাত্র আল্লাহ ছাড়া যিনি আসমান সমূহ ও যমীনের প্রভু প্রতিপালক এবং মহান আরশের প্রভু পরোয়ারদিগার।"
হাদীসে আছে যে, নাবী ﷺ এ ধরনের বহু দু'আ তাঁর পরিবার-পরিজনকে শিখিয়েছিলেন।
সুনান হাদীস গ্রন্থ সমূহে আছে, রসূলুল্লাহ ﷺ তাকলীফ অর্থাৎ দুঃখ-কষ্ট যাতনার সময় এই দু'আ পড়তেন:
(يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ اسْتَغِيْتُ)
হে চিরঞ্জীব, হে চিরবিদ্যমান! আপনার রহমাতের আমি ভিখারী।
হাদীসে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী ﷺ তাঁর প্রিয়তমা কন্যা ফাতিমাহ (রাযি.)-কে এই দু'আ শিখিয়েছিলেন-
(يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ يَا بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ بِرَحْمَتِكَ اسْتَغِيتُ أصلح لي شأني كله ولا تكلني إلى نفسي طرفة عَيْنِ وَلا إِلَى أَحَدٍ مِّنْ خلقك)
হে চিরস্থায়ী! হে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর উদ্ভাবক! নেই কোন উপাস্য প্রভু-পরোয়ার্দিগার তুমি ভিন্ন, আমি তোমার রহমাতের ভিখারী। আমার সমস্ত কাজকর্ম বিশুদ্ধ করে দাও! আর চোখের একটি পলকের জন্যও আমার নিজের উপর আমাকে ছেড়ে দিওনা- তোমার সৃষ্টির মধ্যে আর কারোর উপরেও নয় (সর্বক্ষণ আমাকে একমাত্র তোমারই হিফাযাতে রেখো)।
৫। মুসনাদে ইমাম আহমাদ এবং সহীহ আবি হাতিমে রিওয়ায়াত এসেছে যে, ইবনে মাসউদ (রাযি.) রসূল ﷺ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেনঃ
যে ব্যক্তি বিপদ আপদে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সময়ে নিম্নের এই দু'আ খালেস অন্তরে পাঠ করে, আল্লাহ আ'আলা তার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, তার মনের অস্থিরতা এবং বিচলিত অবস্থা দূর করে দেন এবং তৎপরিবর্তে মনে আনন্দ ও প্রশান্তি এনে দেনঃ
(اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ، ابْنُ عَبْدِكَ، ابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ، مَاضٍ فِي حكمك، عدل في قَضَاؤُكَ، أسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمِ هُوَ لَكَ، سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ، أَوْ أَنزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ، أو استأثرت به في علم الغيب عندكَ، أَنْ تَجْعَلَ القُرْآنَ الْعَظِيمَ رَبِيعَ قَلْبِي، وَنُورَ صَدْرِي، وجلاء حُزْنِي وَذَهَابَ هَمِّى وَغَمَى،)
"প্রভু হে! আমি তোমারই দাস, আর তোমার দাসের পুত্র এবং তোমার দাসীর পুত্র (অর্থাৎ আমি নিজেও তোমার দাস এবং আমার পিতা-মাতাও তোমার দাস-দাসী) আমার কপাল অর্থাৎ আমার সত্তা তোমারই হস্তে, তোমার প্রতিটি হুকুম আমার উপর প্রযোজ্য (এবং অবশ্য প্রতিপাল্য) আমার সম্বন্ধে তোমার প্রতিটি ফয়সালা ইনসাফ তথা ন্যায় ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমি তোমার প্রত্যেক সেই নামে (যে নামে তুমি সুপরিচিত) যে নাম তুমি তোমার নিজের জন্য নির্বাচন করেছ অথবা যা তুমি তোমার গ্রন্থে নাযিল করেছ অথবা যা তোমার কোন সৃষ্টজীবকে তুমি শিক্ষা দিয়েছ অথবা যা তুমি ইলমে গায়িবের খাজানায় নিজের কাছেই সুরক্ষিত রেখেছ- তোমার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তুমি কুরআনে আযীমকে আমার হৃদয়ের বসন্ত ও আমার চোখের জ্যোতি বানিয়ে দাও, ঐ কুরআনকে আমার উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অপসারণ এবং আমার চিন্তা ভাবনা দূরীকরণের মাধ্যম করে দাও।"
সহাবীগণ রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি এই দু'আ শিখে মুখস্থ করে নিব? তিনি এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এই দু'আ শুনবে, সে যেন তা শিখে মুখস্থ করে নেয়।
৬। রসূলুল্লাহ ﷺ স্বীয় উম্মতের শিক্ষা এবং হুশিয়ারীর জন্য আরও বলেনঃ
(ان الشمس والقمر ايا تان من آيات الله لا ينكسفان لموت أحد ولا الحياته ولكن الله بخوف بهما عباده فاذا رايتم ذلك فانزعوا الى الصلوة وذكر الله والاستغفار-)
"সূর্য গ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ আল্লাহর অসীম কুদরতের বহু নিদর্শনের মধ্যে দু'টি নিদর্শন মাত্র। কারো জন্ম অথবা মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনই সম্পর্ক নেই। মহীয়ান ও গরীয়ান আল্লাহ রব্বুল আলামীন স্বীয় কুদরতের মাধ্যমে তাঁর শক্তিমত্তা এবং মহিমার কিছু নিদর্শন দেখিয়ে থাকেন মাত্র। যখন তোমরা তোমাদের তখন ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহ্র কাছে তোমরা পানাহ চাবে- সলাত, আল্লাহর যিক্র আযকার ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে।" তিনি সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের সময় সলাত পড়ার, দু'আ করার, দান খয়রাত করার এবং গোলাম আজাদ করার আদেশ প্রচার করেন। তিনি তাদেরকে এ কথা বলেননি যে, চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণের সময় কোন সৃষ্ট জীব বা বস্তু, কোন ফেরেশতা, কোন নাবী, কোন ওলী আউলিয়াকে সাহায্যের জন্য ডাকবে!
📄 শির্ক ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজের প্রতি আকর্ষণ
যদি কেউ এই কথা বলে যে, এভাবে মৃত বুযুর্গ ব্যক্তিকে ডাকার ফলে তার অভাব দূর হয়েছে, তার প্রয়োজন মিটে গেছে এবং বুযুর্গ ব্যক্তির চেহারা তার সম্মুখে ভেসে উঠেছে, তাহলে তার জানা প্রয়োজন যে, নক্ষত্র-পূজক, মূর্তি পূজক প্রভৃতি মুশরিকদের বেলাতেও এরূপ ঘটনা অনেক ঘটে থাকে। বস্তুতঃ অতীত কালে এবং বর্তমান মুশরিকদের এ ধরনের বহু ঘটনার বিবরণ বহু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এরূপ বিস্ময়কর ঘটনা যদি প্রকাশিত না হতো তা হলে মূর্তি প্রভৃতির পূজায় কেউ কোন দিনই আত্মনিয়োগ করত না।
কুরআন মাজীদেই আমরা এর প্রমাণ দেখতে পাই। ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ ('আ.) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন প্রসঙ্গে বলেন:
"আর আমাকে এবং আমার সন্তানসন্ততিকে তুমি মূর্তি ও প্রতীক পূজা থেকে দূরে রেখো, প্রভু হে। নিশ্চয় ওগুলো (ঐ মূর্তি ও প্রতীকগুলো) বহু মানুষকে গুমরাহ ও পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে।" (সূরা ইব্রাহীম ৩৫ ও ৩৬)*
কথিত আছে যে, ইব্রাহীম (আ.)-এর পর মাক্কাহয় প্রথম শির্কের আমদানী করে আমর ইবনে লাহয়ীল খাযায়ী যাকে রসূল ﷺ দোযখে এই অবস্থায় দেখেছিলেন যে, তার নাড়িভুঁড়ি পড়ে আছে আর সে তা টেনে বেড়াচ্ছে!
প্রথম প্রথম সে (মাক্কাহয়) ষাড় ছেড়ে দিয়েছিল এবং সে-ই সর্বপ্রথম (মাক্কাহয়) দ্বীনে ইব্রাহীম অর্থাৎ খালেস তাওহীদের ধর্মকে মিটিয়ে দিয়েছিল। কথিত আছে যে, সে সিরিয়ায় গিয়ে বাল্কা নামক স্থানে মূর্তি পূজার প্রচলন দেখতে পায়। সেখানে লোকদের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, প্রতিমাগুলো তাদের কল্যাণ বিধান এবং অকল্যাণ ও ক্ষয়ক্ষতি দূরীকরণে সহায়তা করে থাকে। ফলে সে ঐ মূর্তিগুলোকে মাক্কাহয় স্থানান্তরিত করলো। এভাবে সে মাক্কাহয় মূর্তিপূজার মাধ্যমে শির্কের রেওয়াজ প্রবর্তন করল। সে সেখানে সেই সব নিষিদ্ধ কাজের প্রথা জারি করে দিল যা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলগণ হারাম করে দিয়েছেন। সেই নিষিদ্ধ কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: শির্ক, যাদু, না হক খুনখারাবী, ব্যাভিচার, মিথ্যা সাক্ষ্যদান প্রভৃতি। এই সব পাপক্রিয়ায় মানুষ আকৃষ্ট হয় কখনও নফসে আম্মারার তাকীদে অর্থাৎ অসৎ প্রবৃত্তির তাড়নায় আর কখনও অজ্ঞানতার কারণে।
মনের অসৎ প্রবণতা মানুষকে নিষিদ্ধ কাজের মধ্যে তার জন্য কল্যাণ নিহিত এবং ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্তির পথ আছে বলে মিথ্যা ধারণা জন্মায়। এই মিথ্যা ধারণার সৃষ্টি না হলে সে কিছুতেই এমন কাজে প্রবৃত্ত হতো না যার ভিতর দৃশতঃ কোন কল্যাণ নেই।
অজ্ঞানতার বশবর্তী হয়ে এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় শির্ক এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজের ফাঁদে কেন মানুষ পা দেয় তার খোলাসা বিবরণ অতঃপর পেশ করা হচ্ছে।
টিকাঃ
* নোটঃ ইব্রাহীম (আ.)-এর এই দু'আ কবুল হয়েছিল। তাঁর দুই পুত্র ইসমাঈল ('আ.) ও ইসহাক ('আ.) পৌত্তলিকতার সংস্রব থেকে শুধু নিজেরাই দূরে অবস্থান করেন নাই, তারা অন্যকেও মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। ইসহাক ('আ.)-এর পুত্র ইয়াকুব (আ.) জীবনভর এই সাধানায় রত থেকে মৃত্যুর প্রাক্কালে তার পুত্রদের ডেকে যখন জিজ্ঞাস করেন, আমার পরে তোমরা কার ইবাদাত করবে? তখন তারা এক বাক্যে উত্তর দিয়ে ছিলেন, আমরা আপনার প্রভু পরোয়ারদিগারের এবং আপনার পিতৃ পুরুষ-ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের সেই এক ও একক আল্লাহরই ইবাদাত করব এবং তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পিত মুসলিম আমরা। (সূরা আল-বাকারা ১৩৩)
ইয়াকুব (আ.)-এর নাবী-পুত্র ইউসুফ ('আ.) কারাগারে বসেও তাওহীদের শিক্ষা প্রচার করে গিয়েছেন। তিনি কারাগারেই ঘোষণা করেছেন: আমি অনুসরণ করে চলেছি আমার পিতৃ পুরুষ ইব্রাহীমের, ইসহাকের ও ইয়াকুবের মিল্লাতের। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কিছুকেই শরীক করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।...
তারপর তিনি কারাগারে তাঁর দুই সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, "হে আমার কারাগারের সঙ্গীদ্বয়! (বল দেখিঃ) বহু বিচ্ছিন্ন ঈশ্বরই শ্রেয়, না এক অদ্বিতীয় পরম-পরাক্রান্ত আল্লাহ।"
"তিনি ব্যতীত আর যা কিছুর পূজা অর্চনা তোমরা করে আসছ সেগুলো তো (অবাস্তব) নামমাত্র-যেগুলোর নামকরণ করেছ তোমরা এবং তোমাদের পিতৃপুরুষেরা, যার সম্বন্ধে আল্লাহ কোনই সনদ নাযিল করেন নাই। জেনে রাখো, হুকুমের একমাত্র মালিক তো হচ্ছে আল্লাহ। তিনি আদেশ করেছেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই বন্দেগী করবে না। এটাই হচ্ছে সত্য ও সুদৃঢ় ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।" (সূরা ইউসুফ ৩৮-৪০)