📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 নূহ (আ.)-এর কউমের শির্ক এবং তার উৎসমূল

📄 নূহ (আ.)-এর কউমের শির্ক এবং তার উৎসমূল


ইমাম বুখারী (রহ.) স্বীয় সহীহ বুখারীতে, তাবারানী প্রমুখ স্ব স্ব তাফসীরে এবং ওয়াসীমা 'ক সাসে আমবীয়া' গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেছেন যে, উপরে যে সব নাম উল্লেখ করা হল সেগুলো নূহ ('আ.)-এর কওমের কতিপয় সৎকর্মশীল ধর্মপরায়ণ বুযুর্গ ব্যক্তির নাম। তাদের ইন্তিকালের পর জনসাধারণ তাদের কবরে বসতে শুরু করল, তাদের সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ এবং আশা করে চলল, তারপর তাদের চিত্র আঁকল এবং অবশেষে তাদের মূর্তি বানিয়ে তাদের পূজা শুরু করে দিল! বস্তুতঃ কবরের নিকট অবস্থান করা (তার খিদমতে নিয়োজিত থাকা), তাতে হাত রেখে সেই হাত চুম্বন করা, কবরকে সরাসরি চুম্বন করা এবং তার কাছে গিয়ে দু'আ করা অথবা এই ধরনের অন্য কিছু করা সমস্তই হচ্ছে শির্ক এবং বুৎপরস্তী তথা মূর্তি পূজার মূল শিকড়। (সেই শিকড় থেকেই শির্করূপ মহীরুহের প্রবৃদ্ধি ও প্রসার ঘটে থাকে।)

এ জন্যই আমরা দেখতে পাই যাতে করে তাঁর উম্মত শির্কের মহাপাতকে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য রসূলুল্লাহ ﷺ এই দু'আ পাঠ করতেন:
(اللهم لا تجعل قبرى وثنا يعبد.)
"হে আল্লাহ! আমার কবরকে প্রতীকে রূপান্তরিত করো না যার পূজা করা হয়।"

সমস্ত আলিম-উলামা এই ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এর রওযা মোবারকে অথবা নবী-রসূল, সালিহীন সহাবা অথবা আহলে বায়তের কবরগুলোর কোনটিকেই স্পর্শ করা এবং চুমা দেয়া জায়িয নয়। এমনকি সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র হাজরে আসওয়াদ অর্থাৎ কা'বা শরীফের এক কোণে সুরক্ষিত কৃষ্ণ প্রস্তর ছাড়া অন্য কোন জড় পদার্থকেই চুম্বন করা জায়িয নয়।

বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত হাদীসে হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে 'উমার (রাযি.)-এর বচন বর্ণিত হয়েছে:
(اني لا علم انكي حجر لا تضر ولا تنفع ولو لا اني رأيت رسول الله صلى الله عليه واله وسلم يقبلكي ما قبلتكي.)
"হে কৃষ্ণ প্রস্তর! প্রভুর কসম! আমি জানি, তুমি নিছক একটা প্রস্তর ভিন্ন অন্য কিছু নও, কোন অকল্যাণ অথবা কল্যাণ সাধনের কোন ক্ষমতাই তোমার নাই। রসূলুল্লাহ ﷺ কে তোমায় চুম্বন দিতে যদি আমি না দেখতাম, তবে আমি কিছুতেই তোমায় চুম্বন করতাম না।"

এজন্য সমস্ত আয়িম্মায়ে-দ্বীন এ বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে, বাইতুল্লাহর হাতিমের দিকে অবস্থিত দুই রুকনে, কা'বা শরীফের চারি দেওয়ালে, মাকামে ইব্রাহীমের এবং বাইতুল মাকদিসের গম্বুজে আর নাবী রসূল ও বুযুর্গদের কবরে চুম্বন দেয়া কিংবা তাতে হাত বুলিয়ে সেই হাত চুম্বন খাওয়া (কা'বার পবিত্র গিলাফে চুম্বন খাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না) সমস্তই সুন্নাতের বরখেলাফ। এমনকি রসূলুল্লাহ ﷺ যখন জীবিত ছিলেন, তখন তাঁর ফযীলাতের বিবেচনায় তাঁর মিম্বারকে হস্ত দ্বারা (বারকাত লাভের উদ্দেশে) স্পর্শ করা জায়িয কিনা সে সম্পর্কে ওলামায়ে দ্বীন মতভেদ করেছেন। এরূপ অবস্থায় কবর সম্বন্ধে তো প্রশ্নই উঠে না, উঠতে পারে না।

ইমাম মালিক (রহ.) এবং তার সম মতাবলম্বীগণ এটাকে মাকরুহ বলেন, কেননা এ কাজ বিদ'আত। বলা হয়েছে, ইমাম মালিক যখন আতা (রহ.)-কে এরূপ করতে দেখলেন তখন থেকে তার নিকট হতে আর কোন হাদীস রিওয়ায়াত করতেন না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং তার সমর্থকবৃন্দ তা জায়িয বলেছেন। কেননা 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'উমার (রাযি.) এরূপ করেছেন।
কিন্তু রসূলুল্লাহ ﷺ -এর কবর স্পর্শ করা এবং চুম্বন করাকে সকলেই ঐকমত্যে মাকরুহ বলেছেন এবং ঐরূপ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তারা জানতেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ শির্কের মূলোচ্ছেদ, তাওহীদের প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করার ব্যাপারে কিরূপ প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছেন।

📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 কোন বুযুর্গ লোকের জীবিতকাল এবং মৃত্যুর পর তার অবস্থার মধ্যে পার্থক্য

📄 কোন বুযুর্গ লোকের জীবিতকাল এবং মৃত্যুর পর তার অবস্থার মধ্যে পার্থক্য


রসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা অন্য কোন সালেহ বান্দা অথবা কোন বুযুর্গ ব্যক্তিকে তাদের জীবিতাবস্থায় কোন ব্যক্তির জন্য দু'আ করতে বলা এবং তাদের মৃত্যুর পর অথবা অনুপস্থিতিকালে তাদেরকে ডেকে দু'আ করতে বলার মধ্যে যে পার্থক্য তা অতিশয় সুস্পষ্ট। কেননা তাদের জীবিতকালে তাদের সামনে কেউ তাদের পূজা করতে পারে না, কেউ কোন শির্কী কাজ করতে সক্ষম হয় না। কারণ নাবী রসূলগণ এবং আল্লাহর সালেহ (বুযুর্গ) বান্দাগণ তাদের সম্মুখে কাউকে কখনো কোন শির্কী কাজ করার অনুমতি দেন না। কেউ ভুলক্রমে করতে ধরলে তারা বাধা প্রদান করেন এবং করে ফেললে রীতিমত শাস্তি প্রদান করে। এখানে কুরআন মাজীদ থেকে কয়েকটি ঘটনা আমাদের দাবীর সমর্থনে পেশ করা হচ্ছেঃ

আল্লাহ কিয়ামাত দিবসে যখন ঈসা ('আ.)-কে তার উম্মাতের (খৃষ্টানদের) পদস্খলন সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞেস করবেন, "তুমিই কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে এবং আমার মাতাকে অপর দুই উপাস্য প্রভু রূপে গ্রহণ কর?" তখন তার জওয়াবে অন্যান্য কথা বলার পর ঈসা বললেন,
(مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنْ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ) (المائدة : ۱۱۷)
(প্রভু হে!) তুমি আমাকে যা বলতে আদেশ করেছিলে তা ছাড়া অন্য কিছুই আমি তাদেরকে বলি নাই। (আমি বলেছি যে,) আমার প্রভু-পরোয়ারদিগার এবং তোমাদের সকলের প্রভু-পরোয়ারদিগার যে আল্লাহ, তোমরা সকলে ইবাদাত করবে একমাত্র তাঁরই, আর আমি যতদিন তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলাম ততদিনই কেবল আমি তাদের পরিদর্শক ছিলাম কিন্তু যখন আমাকে তুমি উঠিয়ে আনলে তখন থেকে একমাত্র তুমিই তো ছিলে তাদের নেগাহবান-পর্যবেক্ষক, বস্তুতঃ তুমিই তো সকল বিষয়ে সম্যক্ ওয়াকেফহাল। (সূরা আল-মায়িদাহ ১১৭)

যখন রসূলুল্লাহ ﷺ কে লক্ষ্য করে এক ব্যক্তি বললো, (مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ)
"যা আল্লাহর মরযী এবং আপনার মরযী।" তখন সঙ্গে সঙ্গে রসূল ﷺ তাকে বললেন, (اجعلتني لله ندا ما شاء الله وحده) "কী! তুমি আমাকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে দিলে? বরং বল-যা কিছু আল্লাহ এককভাবে চান।"
এরূপ কখনো বলবে না - (ما شاء الله وشاء محمد) যা আল্লাহ চান এবং মুহাম্মাদ ﷺ চান! তবে এতটুকু বলতে পার (ما شاء الله ثم شاء محمد) যা আল্লাহর মরযী এবং তারপর (আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে) যা মুহাম্মাদ ﷺ এর মরযী।"

যখন একজন কৃতদাসী বলেছিল,
"আমাদের মধ্যে অবস্থান করছেন আল্লাহর রসূল যিনি কাল কী ঘটবে তা জানেন" তখন রসূল ﷺ তাকে বললেন, এ রকম কথা বলো না, বরং (قولي بالذي كنت تقولين) তুমি আগে যা বলছিলে তাই শুধু বল। শেষের কথাটি অর্থাৎ রসূল ﷺ আগামীকাল কী ঘটবে তা জানেন এই কথা খবরদার বলো না!
রসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছে,
(لا تطروني كما تطرت النصارع ابن مريم، انما انا عبد فقولوا عبد الله ورسوله)
খৃষ্টানরা যেরূপ মারঈয়ামের পুত্র [ঈসা ('আঃ)]-কে বাড়িয়ে (তাকে আল্লাহর পুত্রের আসনে সমাসীন করে) উর্ধ্বে তুলেছে তোমরা সাবধান! আমাকে ঐরূপ বাড়িয়ো না। মনে রেখো! আমি বান্দাহ! কাজেই তোমরা বলবে আব্দুহু ওয়া রসূলুহু আমি (প্রথমে) আল্লাহর দাস ও (তারপর) আল্লাহর রসূল।

একদিন যখন সহাবীগণ নামায পড়ার জন্য রসূলুল্লাহ ﷺ এর পিছনে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছেন (আর তিনি বসা অবস্থায় ছিলেন) তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন,
(لا تعظمو ني كما تعظم الا عاجم بعضهم بعضا)
আমার প্রতি তোমরা ঐরূপ সম্মান প্রদর্শন করো না, যেরূপ আযমীগণ (অনারবরা) পরস্পরে পরস্পরের প্রতি (দণ্ডায়মান হয়ে) সম্মান প্রদর্শন করে থাকে।
আনাস (রাযি.) বলেন, সহাবীদের নিকট রসূলুল্লাহ ﷺ অপেক্ষা প্রিয়তর (এবং অধিকতর শ্রদ্ধার পাত্র) আর কেউ ছিল না, সে সত্ত্বেও যখন তিনি তাদের মাঝে তাশরীফ আনতেন তখন তাঁর সম্মানার্থে তারা দণ্ডায়মান হতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এরূপ দাঁড়ানো মোটেই পছন্দ করেন না (বরং তিনি ঐ অবস্থায় দাঁড়াতে নিষেধ করেছেন)।

মা'আয (রাযি.) আযমীদের মধ্যে প্রচলিত প্রথা দেখে এসে রসূলুল্লাহ ﷺ কে সাজদাহ করতে চাইলেন, তখন রসূলুল্লাহ ﷺ তা করতে নিষেধ করে দিলেন এবং বললেন,
(انه لا يصلح المسجود الا لله لوكنت امرا احدا أن يسجد لا حد لامرت المرأة أن تسجد لزوجها من عظم حقه عليها)
"সাজদাহ একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য, তিনি ছাড়া আর কারো জন্যই সাজদাহ সিদ্ধ নয়। আমি যদি কোন মানুষকে অপর কোন মানুষের জন্য সাজদাহর হুকুম দিতাম, তাহলে আমি স্ত্রীকে হুকুম দিতাম তার স্বামীকে সাজদাহ করতে-স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রাপ্য বড় রকম হকের জন্য।"

আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু যখন খলীফা, তখন যিন্দীকদের সেই দলটিকে তার সামনে উপস্থাপন করা হলো যারা আলীকে বলত, প্রভু। আলী (রাযি.) তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারার হুকুম দিলেন।
এই হচ্ছে নাবী রসূল এবং অলী আউলিয়াদের অবস্থা। যারা তাদেরকে বাড়িয়ে তাদেরকে বহু উর্ধ্বে সমাসীন করে, তাদের প্রতি না-হক সম্মান দেখাতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করে, তারা পৃথিবীতে অনাচার এবং ফাসাদ সৃষ্টি করে ধ্বংস ডেকে আনতে চায়, যেমন ফিরআউন এবং তার দলের লোকেরা করেছিল যার পরিণামে তাদের নিস্তনাবুদ হতে হয়েছিল। মাশায়েখদের মধ্যে যারা এরূপ কাজের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে তারাও ফিরআউনেরই গোত্রভুক্ত। নাবী রসূল এবং ওলী আউলিয়াদের জীবিতকালে এই অনাচার সম্ভব হয় না, তাদের মৃত্যুর পর অথবা অনুপস্থিতিকালে এই অনাচার এবং বাড়াবাড়ি (শয়তানের প্ররোচনায়) প্রশ্রয় প্রাপ্ত হয়।

📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 মৃত ব্যক্তিকে মধ্যস্থ মেনে দু‘আ প্রার্থনা

📄 মৃত ব্যক্তিকে মধ্যস্থ মেনে দু‘আ প্রার্থনা


ঈসা ('আ.)-এর গায়িব হওয়ার এবং উষায়র ('আ.)-এর ইন্তিকালের পর তাদেরকে (আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নিয়ে) শির্ক করা হয়েছে।
চিন্তা করলে এখানেই উপলব্ধি করা যাবে নাবী অথবা কোন সালেহ ওলী-আল্লাহর জীবিতাবস্থায় তাদের নিকট সওয়াল করার এবং তাদের মৃত্যুর পর অথবা অনুপস্থিতি কালে তাদের স্মরণ করে কিছু সওয়াল করার তথা তাদের নিকট নিজেদের কোন দরখাস্ত পেশ করার মধ্যে কী পার্থক্য রয়েছে। আর তাই আমরা দেখতে পাই যে, সহাবীদের যুগে, তাদের পর তাবিয়ীনদের যুগে এবং তাদেরও পর তাবা-তাবিয়ীদের যুগে, এমনকি সমগ্র সলফে সালিহীনের মধ্যে এমন একজন লোক খুঁজে পাওয়া যায় না যিনি কবরের কাছে গিয়ে নামায পড়া পছন্দ করেছেন, অথবা মাযারসমূহে দু'আ করার জন্য উপস্থিত হয়েছেন। তারা কেউ কখনো না জানিয়েছেন মৃত বুযুর্গ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কোন প্রার্থনা, না পেশ করেছেন কোন ফরিয়াদ। এভাবে সংসারের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন করে কবরের কাছে গিয়ে সাধন ভজনে নীরব থাকারও কোনই প্রামাণ এবং নযীর নেই।

প্রশ্নকারী তার ইস্তিফতায় যা উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ মৃত ওলী আউলিয়া কিংবা অনুপস্থিত কোন পীর মুরশিদের নাম করে এরূপ প্রার্থনা করা যে, হে অমুক সাইয়েদ, হে অমুক পীর! আমার ফরিয়াদ শুনুন, আমার সাহায্য করুন অর্থাৎ তার নিকট বিপদ থেকে উদ্ধার এবং কল্যাণ লাভের আশা পোষণ করার প্রার্থনা জ্ঞাপন, তো এ সম্পর্কে জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এরূপ প্রর্থানা জ্ঞাপন ও ফরিয়াদ পেশ করণ মারাত্মক ও নিকৃষ্টতম শির্কের অন্তর্ভুক্ত। খৃষ্টানগণ তো ঈসা ('আ.) সম্বন্ধে এবং তাদের পোপ-বিশপ, পাদরী পুরোহিত ও সন্ন্যাসী দরবেশদের সম্বন্ধে ঠিক এই ধারণাই পোষণ করে থাকে। এ কথা তো সর্বজনবিদিত যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট সৃষ্টির মুকুটমণি এবং মনুষ্যকুলের মধ্যে ফযীলতে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মাদ ﷺ। আর এ কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাঁর পবিত্র সাহচর্য ও সংস্পর্শ-ধন্য সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.)। এ সত্ত্বেও তারা তাঁর মহাপ্রয়াণের পর কিংবা তাঁর অনুপস্থিতি কালে এক মুহূর্তের জন্যও এ ধরনের কোন কাজ করেন নাই।

📘 যিয়ারুল কুবুর বা কবর যিয়ারাত > 📄 শির্কের সঙ্গে মিথ্যার অবিচ্ছিন্ন সংযোগ

📄 শির্কের সঙ্গে মিথ্যার অবিচ্ছিন্ন সংযোগ


মুশরিকরা মহাপাপ তো করেই, তার সঙ্গে তারা মিথ্যাকেও মিশ্রিত করে, আর মিথ্যা হচ্ছে শির্কের অনুগামী, সহমর্মী। এজন্যই আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন:
(مِنْ جِيَّةٍ قَوْلَةِ الوَلَهُ وَالْأَسْلَمِيَّةُ لِمَنْ لَاهِيَ فِي أُذُنِيْ صَيرِيَا السَّيِّرُ المُسْتَقِلَةُ) (الحج : ٣١٣٠)
মূর্তিপূজার কদর্য সংস্পর্শ হতে বেঁচে চলবে তোমরা, আর মিথ্যা কথা হতেও আত্মরক্ষা করে চলবে তোমরা, একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহরই (অনুগত) হয়ে থাকবে তোমরা, কোন প্রকারেই অন্য কিছুকেই তাঁর সহিত শরীক করবে না তোমরা। (সূরা হাজ্জ ৩০ ও ৩১)

(عدلت شهادة الزور بالا شراك بالله)
মিথ্যা সাক্ষ্যদান আল্লাহর সাথে শির্ক করার সমতুল্য। সূরা আ'রাফে আল্লাহ মুশরিকদের পরিণতি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

(إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَذِلَّةٍ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُقْتَرِينَ) (اعراف : ١٥٢)
"যে সব লোক বাছুরকে পূজার জন্য গ্রহণ করেছে তাদের উপর শীঘ্রই তাদের পরোয়ারদিগারের তরফ থেকে গযব নেমে আসবে আর (আপতিত হবে) পার্থিব-জীবনে অসম্মান অবমাননা, এভাবেই আমরা মিথ্যা রচনাকারীদরকে প্রতিফল প্রদান করে থাকি।" (সূরা আ'রাফ ১৬২)

আর ইব্রাহীম খলীলুল্লার ('আ.) কথা আল্লাহ উধৃত করেছেন এভাবে :
{اَفَكَ آلِهَةً دُونَ اللَّهِ تُرِيدُونَ (٨٦) فَمَا ظَنَّكُم بِرَبِّ الْعَالَمِينَ (الصافات : ٨٦-٨٧)}
ইব্রাহীম তার পিতা ও স্বজাতিদেরকে প্রশ্ন করছেন, "কী! আল্লাহকে ছেড়ে মিছামিছি অন্য দেবতার পিছনে পড়ে আছ তোমরা, বলতো তোমরা বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ সম্বন্ধে কী ধারণা পোষণ করছ?" (সূরা সাফ্ফাত ৮৬ ও ৮৭)

ফলতঃ এদের মিথ্যা সংস্কার ও মিথ্যা ধারণার উপরে গড়ে উঠা একটি আক্বীদাহ এই যে, তারা বিশ্বাস করে যে, পীর যদি অবস্থান করেন পূর্ব দিগন্তে আর মুরীদ থাকে পশ্চিম দিগন্তে তবু তিনি কষ্ণের প্রবল আকর্ষণে স্বীয় মুরীদকে নিজের দিকে টেনে আনতে সক্ষম হন। পীরের মধ্যে যদি এই গুণটি না থাকে তবে সে প্রকৃত পীরই নয়।
কখনও কখনও শয়তান তাদেরকে ঠিক সেভাবেই পথভ্রষ্ট করে থাকে যেভাবে আরবের অধিবাসীদেরকে তাদের বুতপরস্তীতে এবং নক্ষত্র-পূজকদেরকে তাদের শির্কী চাল চলন ও যাদুর ভোজবাজিতে শয়তান স্বীয় চাল চেলে গুমরাহীর পথে পরিচালিত করেছে। এমনিভাবে তাতার, হিন্দ, সুদান প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন রূপী মুশরিকদের মধ্যেও শয়তান নানাভাবে তার প্ররোচনার জাল ফেলে ও ফাঁদ পেতে তাদের পথভ্রষ্ট করেছে। পীরপরস্ত ও মাশায়েখ ভক্তবৃন্দের মধ্যেও এমনিভাবে শয়তান তার গুমরাহী বিস্তারের কাজ চালিয়ে যায়। বিশেষ করে তাদের গানের আসর সঙ্গীতের তালে তালে বাঁশি (টুংরী তবলা) ও অন্যান্য বাদক দ্রব্যের সুর ও রাগ রাগিণীতে যখন সবাই বুঁদ হয়ে থাকে তখন শয়তান তাদের মাঝে অবতীর্ণ হয়ে তার ফাঁদে তাদরকে আটকে ফেলে। মৃত নাবী অথবা অলী-আউলিয়ার মাধ্যমে প্রার্থনা জ্ঞাপনের আর একটি প্রকরণ হচ্ছে এরূপ: যেমন কেউ বলে, "হে আল্লাহ! অমুক নাবী বা পীরের সম্মানে, বা অমুকের বরকতে বা অমুকের মাহাত্ম্যে আমার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে দাও, আমার প্রার্থনা মঞ্জুর কর।" এ ধরনের কাজ (অধুনা) অনেকেই করে থাকে, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়ীন এবং আয়িম্মায়ে সলফ থেকে এ ধরনের কাজের সমর্থনে কোনই প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাদের দু'আয় তারা এ ধরনের কোন কথা বলেছেন-এমন কোন নযীর দেখতে পাওয়া যায় না। এ কাজে ওলামায়ে-দ্বীনের এমন কোন কওল, কোন সমর্থন আমার কাছে পৌঁছায়নি যা আমি এখানে উদ্ধৃত করতে পারি। ফকীহ আবূ মুহাম্মাদ ইবনে আবদিস সালামের সেই ফতোয়াটি আমি দেখেছি যাতে তিনি বলেছেন যে, একমাত্র নাবী ছাড়া অপর আর কারোর জন্য এরূপ করা জায়িয নয়। রসূলুল্লাহ ﷺ এর তুফায়লে দু'আ করার সমর্থনে যে হাদীস পেশ করা হয় তা যদি সহীহ হয় তাহলে বেশীর বেশী শুধু নাবী ﷺ এর মাহাত্মের উল্লেখে আল্লাহর নিকট এরূপ দু'আ করা যেতে পারে। (কিন্তু এ কথাও পরীক্ষা সাপেক্ষ যার পর্যালোচনা ও মন্তব্য পরে আসছে-অনুবাদক) প্রশ্নের জবাবে উক্ত ফকীহ তার ফতোয়ায় যা লেখেছেন তার বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ

নাসায়ী, তিরমিযী প্রভৃতি বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ কোন কোন সাহাবীকে এই দু'আ শিক্ষা দিয়েছেন:
(اللهم اني اسألك واتوسل اليك بنبيك نبي الرحمة يا محمد يارسول الله اني اتوسل بك إلى ربي في حاجتي ليقضيهالي اللهم فشفعه في-)
অর্থাৎ "হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকটেই আমার প্রার্থনা জানাচ্ছি আর আপনার নাবী, রহমাতের নাবী ﷺ কে আপনার সমীপে ওয়াসীলা স্বরূপ (মাধ্যম রূপে) পেশ করছি- হে মুহাম্মাদ, হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনাকে আমার প্রয়োজনে আমার প্রভু পরোয়ারদিগারের দিকে ওয়াসীলা স্বরূপ পেশ করছি, (আপনার ওয়াসীলায়) যেন তিনি আমার প্রার্থনা পূরণ করেন। অতএব হে আল্লাহ! আমার সম্বন্ধে তাঁর সুপারিশ আপনি মঞ্জুর করুন।"

এই হাদীস দ্বারা কতিপয় লোক রসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবিতকালে এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও তাকে ওয়াসীলা ধরার সিদ্ধতা প্রমাণ করতে চান। তারা বলতে চান, এতে আল্লাহর কোন সৃষ্টির নিকট দু'আ প্রার্থনা অথবা অভিযোগ পেশ করা হচ্ছে না বরং শুধু রসূলুল্লাহ ﷺ এর মাহাত্ম্য ও মর্যাদার তুফাইলে আল্লাহর নিকটেই প্রার্থনা জ্ঞাপন করা হচ্ছে।
সুনানে ইবনে মাজাহর সেই হাদীসও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয় যাতে রসূলুল্লাহ ﷺ মাসজিদে নামায পড়ার জন্য ঘর থেকে নিষ্ক্রমণকারীকে এই দু'আ পাঠ করতে উপদেশ দিয়েছেন:
(اللهم اني اسالك بحق السائلين عليك ويحق ممشاي هذا فاني لم اخرج اشرا ولا بطرا ولارياء ولا سمعة خرجت اتفاء سخطك وابتغاء مرضاتك اسألك أن تنقذني من النار وأن تغفر لي ذنربي فانه لا يغفر الذنوب الا انت-)
"প্রভু হে! নিশ্চয় আমি প্রার্থনাকারী এবং নামাযের দিকে গমনকারীদের হক এর দাবীতে (তাদের ওয়াসীলায়) তোমার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি, নামাযের উদ্দেশে আমার বের হওয়ার মধ্যে নেই কোন অহঙ্কার ও গর্বের মনোভাব, নেই এর পেছনে কোন কিছু লোক দেখানো ও শোনানোর বাতিক, আমি বের হয়েছি তোমার রোষ থেকে বাঁচার ব্যাকুলতায় এবং তোমার সন্তোষ লাভের আগ্রহ-উৎসাহের তাকীদে। আমি তোমার কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি। আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, আমার গুনাহ্ খাতা মাফ করে দাও, তুমি ছাড়া আর কেউই গুনাহ্ খাতা মাফ করতে পারে না।"
তারা বলে থাকেন, এই হাদীসে প্রার্থনাকারী এবং নামাযে গমনকারীদের আল্লাহর উপর হকের দাবীতে প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তারা এ দাবীর সমর্থনে আরও বলেন যে, আল্লাহ তাঁর অপার অনুগ্রহে নিজের উপর বান্দার হক স্বয়ং স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি কুরআন মাজীদে বলেছেন:
(وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ) (الروم : ٤٧)
"মুমিনদের সাহায্য করা আমার উপর তাদের হক অর্থাৎ পাপ্য অধিকার।" (সূরা রুম ৪৭)

অন্যত্র তিনি বলেন,
(كَانَ عَلَى رَبِّكَ وَعْدًا مسئولا)
"তোমার প্রভু পরোয়ারদিগার নিজের উপর তাঁর প্রদত্ত ওয়াদা পূরণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন- যা তাঁর নিকট চাওয়া যেতে পারে।" (সূরা আল ফুরকান ১৬)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00