📄 দ্বিতীয় প্রকরণ
যদি তুমি এই ধারণা পোষণ করে থাক যে, আমি এক গুনাহগার বান্দা, আমার সরাসরি দু'আ অপেক্ষা কবরের বুযুর্গ অধিবাসী যখন আমার জন্য দু'আ করবেন সেই দু'আ আল্লাহ অতি দ্রুত এবং উত্তমরূপে কবুল করবেন-কবরে শায়িত নাবী অথবা ওলীর নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপনের এ হচ্ছে দ্বিতীয় প্রকরণ। এই ব্যাপারে তোমার বক্তব্য অবশ্য এই যে, তুমি তার নিকট কিছু প্রার্থনা জানাও না আর তার প্রতি আহবানও জানাও না বরং তার নিকট তুমি এই আবেদন জানাও যে, তিনি যেন তোমার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করেন, যেমন জীবিত মানুষের নিকট বলা হয়ে থাকে- "আমার জন্য দু'আ করুন" সহাবাগণ যেমন রসূলুল্লাহ ﷺ -এর নিকট তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করার দরখাস্ত পেশ করতেন। জেনে রাখা প্রয়োজন, জীবিত লোকদের নিকট এ ধরনের আবেদন জ্ঞাপন তো সিদ্ধ এবং শরীয়ত-সম্মত, যা উপরে পূর্বেই বলা হয়েছে। কিন্তু নাবী রসূল, পীর ওলী প্রমুখ সালিহীন-যারা এ দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন, তাদের নিকট এরূপ প্রার্থনা জ্ঞাপন করা যে, আমার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন অথবা আমার জন্য প্রভু পরোয়ারদিগারের নিকট কিছু প্রার্থনা জানান-মোটেই সিদ্ধ নয়। সহাবা এবং তাবিয়ীন থেকেও এরূপ করার কোন প্রমাণ সাব্যস্ত নয়। আয়িম্মাদের মধ্যে কোন ইমামই এরূপ করাকে জায়িয বলেননি, আর তার সিদ্ধতার স্বপক্ষেও কোন একটা হাদীসও দেখতে পাওয়া যায় না।
বরং এর বিপরীত বুখারীতে এই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, 'উমার ফারূক (রাযি.)-এর খিলাফতকালে যখন অনাবৃষ্টির জন্য লোকের দুঃখ কষ্টের অভিযোগ উত্থাপিত হলো, তখন 'উমার (রাযি.) আব্বাস (রাযি.)-এর মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য আল্লাহ্র নিকট দু'আ জানালেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বললেনঃ
(اللهم انا كنا اذا اجد بنا نتوسل اليك بنبينا فتسقينا وانا نتوسل اليك بعم نبينا فاسقنا)
"হে আল্লাহ! নাবী ﷺ এর জীবতকালে কখনও অনাবৃষ্টি দেখা দিলে, আমাদের নাবী ﷺ কে তোমার নিকট ওয়াসীলা স্বরূপ পেশ করতাম, ফলে বৃষ্টিধারা বর্ষিত হতঃ এখন (তিনি ইন্তিকাল করায়) তাঁর চাচাকে ওয়াসীলা করে অর্থাৎ মধ্যস্থ বানিয়ে তোমার নিকট বৃষ্টির প্রার্থনা জানাচ্ছি, হে প্রভু! তুমি আমাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণ কর।"
'উমার (রাযি.) (কিংবা সহাবীদের মধ্যে অন্য কেউই) রসূলুল্লাহ ﷺ এর কবরের কাছে গিয়ে এ কথা বলেননি- 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন' অথবা এ কথাও বলেননি- 'হে নাবী ﷺ! বারি বর্ষণের আবেদন জ্ঞাপন করুন' অথবা তিনি এ কথাও বলেননি, অনাবৃষ্টির ফলে যে দুর্ভিক্ষ এবং বিপদ আমাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আমরা তার অভিযোগ আপনার নিকট নিয়ে এসেছি কিংবা এ ধরনের অন্য কোন কথা কোন একজন সহাবাও কস্মিনকালে বলেননি এবং এসবই হচ্ছে বিদআ'ত নব আবিষ্কৃত প্রথা যার সমর্থনে কুরআন এবং সুন্নাহয় কোনই দলীল নেই।
সহাবায়ে কেরামের (রাযি.) দস্তুর শুধু এই টুকুই ছিল যে, যখন তারা রসূলুল্লাহ ﷺ এর রওযা মোবারাক যিয়ারত করতে যেতেন তখন তাঁরা তার প্রতি সালাম জানাতেন। যখন দু'আ করার ইচ্ছা করতেন তখন রসূলুল্লাহ ﷺ এর মাযারের দিকে মুখ করতেন না, বরং সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কিবলামুখী হয়ে আল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকালাহুর নিকট প্রার্থনা জানাতেন ঠিক যেমন অন্যত্র অবস্থান কালে কিবলামুখী হয়ে দু'আ করতে তারা অভ্যস্ত ছিলেন। এর প্রমাণের জন্য পেশ করা যেতে পারে রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিম্নোক্ত কয়েকটি হাদীসঃ
১। মুওয়াত্তা এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে সঙ্কলিত হয়েছেঃ রসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নিকট দু'আ করেছেন:
(اللهم لا تجعل قبرى وثنا يعبد اشتد غضب الله على قوم اتخذوا قبور انبيا مهم مساجد)
"প্রভু হে! আমার কবরকে সাজদাহর স্থানে পরিণত হতে দিওনা, সেই কওমের উপর আল্লাহর ভয়াবহ গযব নাযিল হয়েছে যারা নিজেদের নাবীদের কবরগুলোকে সাজদাহর স্থানে পরিণত করছে।"
(لا تتخذوا قبرى عيدا وصلوا على حيثما كنتم فان صلواتكم تبلغني)
"(হে আমার উম্মাতের লোক সকল!) তোমরা আমার কবরস্থানকে উৎসবের স্থানে পরিণত করো না, তোমরা (তৎপরিবর্তে) যেখানেই অবস্থান কর না কেন, আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ করো, কেননা তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌছানো হবে।"
বুখারীতে এসেছে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
(لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور انبياء هم مساجد يحذر ما فعلوا)
"ইয়াহুদী এবং নাসারাদের প্রতি আল্লাহর লা'নাত বর্ষিত হোক! তারা তাদের নাবীদের কবরগুলোকে সাজদাহর স্থান বানিয়ে নিয়েছে। রসূলুল্লাহ ﷺ সহাবাদেরকে তাদের ঐ অপকর্মের পরিণতির কথা বলে হুশিয়ার করে দিয়েছেন।"
'আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, এরূপ হুশিয়ার বাণী উচ্চারিত না হলে রসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর উন্মুক্ত রাখা হতো, তাঁর কবরকে সাজদাহর স্থানে পরিণত করাকে তিনি পছন্দ করেননি।
সহীহ মুসলিমে রিওয়ায়াত এসেছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মহাপ্রয়াণের ৫ দিন পূর্বে বলেছেন:
(ان من كان قبلكم كانوا يتخذون القبور مساجد، الا فلا تتخذوها مساجد، فاني اذهاكم عن ذلك.)
"তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতেরা কবরসমূহকে সাজদাহর স্থান বানিয়ে নিত, খবরদার! তোমরা কখনো এরূপ করো না। আমি তোমাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করে যাচ্ছি।”
সুনানে আবু দাউদে আছে- রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
(لعن الله زوارات القبور والمتخذين عليها المساجد والسوج.)
আল্লাহ লা'নাত করেছেন- ১। কবর যিয়ারতকারী নারীদের উপর, ২। তাতে মাসজিদ নির্মাণকারীদের উপর এবং ৩। তাতে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর (আলোক সজ্জাকারীদের) উপর।
এসব কারণেই আমাদের আলিম ওলামা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ জায়িয রাখেন নাই। তাদের নিকট কবর মাযারের উদ্দেশে নযর নিয়ায মানৎ করা, তার খাদিমকে নগদ অর্থ, তৈল, বাতি, মোম, পশু (গরু-বকরী, হাঁস-মুরগী) প্রভৃতি মানৎ অথবা নযর নিয়াষরূপে প্রদান করা কোন ক্রমেই জায়িয নয়। এই ধরনের সর্ববিধ মানৎ ও নযর নিয়ায গুনাহের মধ্যে শামিল।
📄 কেউ নাজায়িয কাজে নযর মানলে তা পুরা না করণ
সহীহ বুখারীতে রসূলুল্লাহ ﷺ এর এই এরশাদ রয়েছেঃ
(من نذر أن يطيع الله فليطعه، ومن نذر أن يعصى الله فلا بعصه.)
"আল্লাহর আনুগত্য বরণে তথা তাঁর হুকুম মানার উদ্দেশে যে ব্যক্তি কোন নযর-মানৎ করে, তা অবশ্যই পুরা করবে, কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যাচরণে তথা তার নিষিদ্ধ কাজে নযর মানলে তা পুরা করা চলবে না।"
নিষিদ্ধ কাজে নযর মানৎ করলে তা কুফরের পর্যায়ে পড়বে কিনা সে সম্পর্কে আলিমগণের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলেও আয়েম্মায়ে সলফের (পূর্ববর্তী যুগের ইমামদের) মধ্যে কোন একজনও কবরের পার্শ্বে অথবা তার চত্বরে কিংবা তার দরগাহে নামায পড়ার অধিক ফযীলত কিংবা তার মুস্তাহাব হওয়ার কায়েল (প্রবক্তা) নন। তাদের মধ্যে কেউ এ কথা বলেননি যে, অন্য সব স্থান অপেক্ষা মাযারের পার্শ্বে নামায পড়া অথবা দু'আ করা উত্তম, বরং আয়িম্মায়ে সলফের সর্বসম্মত অভিমত এই যে, কবরের পার্শ্বে-সে কবর নাবী রসূল ও ওলী আউলিয়ারই হোক না কেন, নামায পড়া অপেক্ষা মাসজিদে এবং গৃহে নামায পড়া অধিক উত্তম।
আল্লাহ এবং তাঁর রসূল এ মাসজিদ সম্পর্কে অনেক স্থলে অনেক কথা বলেছেন কিন্তু মাযার তথা সাধারণ্যে প্রচলিত দরগাহ প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁরা কিছুই বলেননি। এতদসম্পর্কীয় কয়েকটি আয়াত নিম্নে (অনুবাদসহ) উদ্ধৃত হচ্ছে। আল্লাহ বলেন,
(وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ مَنَعَ مَسَاجِدَ اللَّهِ أَنْ يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَى فِي خَرَابِهَا) (البقرة : ١١٤)
"সেই ব্যক্তি অপেক্ষা বড় যালিম আর কে আছে যে ব্যক্তি মাসজিদসমূহে আল্লাহর নাম যিক্র করার ব্যাপারে অন্তরায় সৃষ্টি করে এবং তার বিরাণ হওয়ার জন্য চেষ্টা চালায়।” (সূরা আল-বাকারাহ ১১৪)
আল্লাহ বলেন,
(الوَانتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ) (البقرة : ۱۸۷)
"তোমরা মাসজিদগুলিতে যে অবস্থায় ই'তিকাফে থাকবে (সে অবস্থায় স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করবে না)।" (সূরা আল-বাকারাহ ১৮৭)
(القُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ وَأَقِيمُوا وُجُوهَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدِ) (الأعراف : ٢٩)
"হে রসূল! আপনি বলে দিন, আমার প্রভু পরোয়ার্দিগার যে হুকুমই জারী করেছেন, তার সমস্তই ন্যায়সঙ্গত আর তিনি হুকুম করেছেন যে, তোমরা প্রত্যেক মাসজিদে (নামাযের প্রাক্কালে) তোমাদের মুখমণ্ডল সোজা করে নাও।" (সূরা আরাফ ২৯)
তিনি আরও বলেছেন,
(إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ) (التوبة : ۱۸)
"আল্লাহ তা'আলার মাসজিদগুলোকে আবাদ করে থাকে তারাই যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর এবং আখিরাত সম্পর্কে প্রত্যয় রাখে।" (সূরা আত্-তাওবাহ ১৮)
(وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا) (الجن : ۱۸)
"আর মাসজিদগুলো হচ্ছে একমাত্র আল্লাহরই (যিকিরের) জন্য, সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।" (সূরা জ্বিন ১৮)
এগুলোর কোনটিতেই, অথবা অন্য কোথাও আল্লাহ মাসজিদের সঙ্গে মাযার দরগার কোনই উল্লেখ করেননি।
আর রসূল ﷺ বলেছেন,
(১) (صلوة الرجل في المسجد تفضل على صلوته في بيته وسوقه بخمس وعشرين درجة)
"কোন ব্যক্তির স্বীয় গৃহে অথবা বাজারে নামায পড়ার চাইতে মাসজিদে নামায পড়ার সওয়াব ২৫ গুণ বেশী।"
(২) (من بنى الله مسجدا بنى الله له بيتا في الجنة)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে মাসজিদ তৈরী করে, তার জন্য আল্লাহ বেহেশতে (আলিশান) গৃহ নির্মাণ করে রাখেন।"
অপর পক্ষে মাযার দরগাহ সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ হচ্ছে:
তাকে মাসজিদ বানিয়ে নিওনা-সাজদার স্থানে পরিণত করো না। যে ব্যক্তি, কবরকে সাজদাহর স্থান অথবা মাসজিদ বানিয়ে নেয়, তার উপর তিনি লা'নাত করেছেন।
বহু সহাবা এবং তাবিয়ীন এই প্রসঙ্গে নিম্নোধৃত আয়াত উল্লেখ করেছেন:
(لَا تَدْرُنَّ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَعُوثَ وَيَعُوقَ وَتَسْرًا) (نوح ٢٣)
"নূহ ('আ.)-এর কওমের লোকেরা (তাদের স্বজাতিকে আরও বলেছে, সাবধান!) তোমরা নিজেদের কোনও উপাস্য ঈশ্বরকে কোন মতেই বর্জন করবে না, বিশেষতঃ "ওয়াদ, সোওয়াআ এবং য়াগ্স, য়াউক ও নাসার-এই পঞ্চ দেবতাকে।" (সূরা নূহ ২৩)
📄 নূহ (আ.)-এর কউমের শির্ক এবং তার উৎসমূল
ইমাম বুখারী (রহ.) স্বীয় সহীহ বুখারীতে, তাবারানী প্রমুখ স্ব স্ব তাফসীরে এবং ওয়াসীমা 'ক সাসে আমবীয়া' গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেছেন যে, উপরে যে সব নাম উল্লেখ করা হল সেগুলো নূহ ('আ.)-এর কওমের কতিপয় সৎকর্মশীল ধর্মপরায়ণ বুযুর্গ ব্যক্তির নাম। তাদের ইন্তিকালের পর জনসাধারণ তাদের কবরে বসতে শুরু করল, তাদের সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ এবং আশা করে চলল, তারপর তাদের চিত্র আঁকল এবং অবশেষে তাদের মূর্তি বানিয়ে তাদের পূজা শুরু করে দিল! বস্তুতঃ কবরের নিকট অবস্থান করা (তার খিদমতে নিয়োজিত থাকা), তাতে হাত রেখে সেই হাত চুম্বন করা, কবরকে সরাসরি চুম্বন করা এবং তার কাছে গিয়ে দু'আ করা অথবা এই ধরনের অন্য কিছু করা সমস্তই হচ্ছে শির্ক এবং বুৎপরস্তী তথা মূর্তি পূজার মূল শিকড়। (সেই শিকড় থেকেই শির্করূপ মহীরুহের প্রবৃদ্ধি ও প্রসার ঘটে থাকে।)
এ জন্যই আমরা দেখতে পাই যাতে করে তাঁর উম্মত শির্কের মহাপাতকে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য রসূলুল্লাহ ﷺ এই দু'আ পাঠ করতেন:
(اللهم لا تجعل قبرى وثنا يعبد.)
"হে আল্লাহ! আমার কবরকে প্রতীকে রূপান্তরিত করো না যার পূজা করা হয়।"
সমস্ত আলিম-উলামা এই ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ এর রওযা মোবারকে অথবা নবী-রসূল, সালিহীন সহাবা অথবা আহলে বায়তের কবরগুলোর কোনটিকেই স্পর্শ করা এবং চুমা দেয়া জায়িয নয়। এমনকি সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র হাজরে আসওয়াদ অর্থাৎ কা'বা শরীফের এক কোণে সুরক্ষিত কৃষ্ণ প্রস্তর ছাড়া অন্য কোন জড় পদার্থকেই চুম্বন করা জায়িয নয়।
বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত হাদীসে হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে 'উমার (রাযি.)-এর বচন বর্ণিত হয়েছে:
(اني لا علم انكي حجر لا تضر ولا تنفع ولو لا اني رأيت رسول الله صلى الله عليه واله وسلم يقبلكي ما قبلتكي.)
"হে কৃষ্ণ প্রস্তর! প্রভুর কসম! আমি জানি, তুমি নিছক একটা প্রস্তর ভিন্ন অন্য কিছু নও, কোন অকল্যাণ অথবা কল্যাণ সাধনের কোন ক্ষমতাই তোমার নাই। রসূলুল্লাহ ﷺ কে তোমায় চুম্বন দিতে যদি আমি না দেখতাম, তবে আমি কিছুতেই তোমায় চুম্বন করতাম না।"
এজন্য সমস্ত আয়িম্মায়ে-দ্বীন এ বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন যে, বাইতুল্লাহর হাতিমের দিকে অবস্থিত দুই রুকনে, কা'বা শরীফের চারি দেওয়ালে, মাকামে ইব্রাহীমের এবং বাইতুল মাকদিসের গম্বুজে আর নাবী রসূল ও বুযুর্গদের কবরে চুম্বন দেয়া কিংবা তাতে হাত বুলিয়ে সেই হাত চুম্বন খাওয়া (কা'বার পবিত্র গিলাফে চুম্বন খাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না) সমস্তই সুন্নাতের বরখেলাফ। এমনকি রসূলুল্লাহ ﷺ যখন জীবিত ছিলেন, তখন তাঁর ফযীলাতের বিবেচনায় তাঁর মিম্বারকে হস্ত দ্বারা (বারকাত লাভের উদ্দেশে) স্পর্শ করা জায়িয কিনা সে সম্পর্কে ওলামায়ে দ্বীন মতভেদ করেছেন। এরূপ অবস্থায় কবর সম্বন্ধে তো প্রশ্নই উঠে না, উঠতে পারে না।
ইমাম মালিক (রহ.) এবং তার সম মতাবলম্বীগণ এটাকে মাকরুহ বলেন, কেননা এ কাজ বিদ'আত। বলা হয়েছে, ইমাম মালিক যখন আতা (রহ.)-কে এরূপ করতে দেখলেন তখন থেকে তার নিকট হতে আর কোন হাদীস রিওয়ায়াত করতেন না। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং তার সমর্থকবৃন্দ তা জায়িয বলেছেন। কেননা 'আব্দুল্লাহ ইবনে 'উমার (রাযি.) এরূপ করেছেন।
কিন্তু রসূলুল্লাহ ﷺ -এর কবর স্পর্শ করা এবং চুম্বন করাকে সকলেই ঐকমত্যে মাকরুহ বলেছেন এবং ঐরূপ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তারা জানতেন যে, রসূলুল্লাহ ﷺ শির্কের মূলোচ্ছেদ, তাওহীদের প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করার ব্যাপারে কিরূপ প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছেন।
📄 কোন বুযুর্গ লোকের জীবিতকাল এবং মৃত্যুর পর তার অবস্থার মধ্যে পার্থক্য
রসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা অন্য কোন সালেহ বান্দা অথবা কোন বুযুর্গ ব্যক্তিকে তাদের জীবিতাবস্থায় কোন ব্যক্তির জন্য দু'আ করতে বলা এবং তাদের মৃত্যুর পর অথবা অনুপস্থিতিকালে তাদেরকে ডেকে দু'আ করতে বলার মধ্যে যে পার্থক্য তা অতিশয় সুস্পষ্ট। কেননা তাদের জীবিতকালে তাদের সামনে কেউ তাদের পূজা করতে পারে না, কেউ কোন শির্কী কাজ করতে সক্ষম হয় না। কারণ নাবী রসূলগণ এবং আল্লাহর সালেহ (বুযুর্গ) বান্দাগণ তাদের সম্মুখে কাউকে কখনো কোন শির্কী কাজ করার অনুমতি দেন না। কেউ ভুলক্রমে করতে ধরলে তারা বাধা প্রদান করেন এবং করে ফেললে রীতিমত শাস্তি প্রদান করে। এখানে কুরআন মাজীদ থেকে কয়েকটি ঘটনা আমাদের দাবীর সমর্থনে পেশ করা হচ্ছেঃ
আল্লাহ কিয়ামাত দিবসে যখন ঈসা ('আ.)-কে তার উম্মাতের (খৃষ্টানদের) পদস্খলন সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞেস করবেন, "তুমিই কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহকে ছাড়াও আমাকে এবং আমার মাতাকে অপর দুই উপাস্য প্রভু রূপে গ্রহণ কর?" তখন তার জওয়াবে অন্যান্য কথা বলার পর ঈসা বললেন,
(مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنْ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ) (المائدة : ۱۱۷)
(প্রভু হে!) তুমি আমাকে যা বলতে আদেশ করেছিলে তা ছাড়া অন্য কিছুই আমি তাদেরকে বলি নাই। (আমি বলেছি যে,) আমার প্রভু-পরোয়ারদিগার এবং তোমাদের সকলের প্রভু-পরোয়ারদিগার যে আল্লাহ, তোমরা সকলে ইবাদাত করবে একমাত্র তাঁরই, আর আমি যতদিন তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলাম ততদিনই কেবল আমি তাদের পরিদর্শক ছিলাম কিন্তু যখন আমাকে তুমি উঠিয়ে আনলে তখন থেকে একমাত্র তুমিই তো ছিলে তাদের নেগাহবান-পর্যবেক্ষক, বস্তুতঃ তুমিই তো সকল বিষয়ে সম্যক্ ওয়াকেফহাল। (সূরা আল-মায়িদাহ ১১৭)
যখন রসূলুল্লাহ ﷺ কে লক্ষ্য করে এক ব্যক্তি বললো, (مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ)
"যা আল্লাহর মরযী এবং আপনার মরযী।" তখন সঙ্গে সঙ্গে রসূল ﷺ তাকে বললেন, (اجعلتني لله ندا ما شاء الله وحده) "কী! তুমি আমাকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে দিলে? বরং বল-যা কিছু আল্লাহ এককভাবে চান।"
এরূপ কখনো বলবে না - (ما شاء الله وشاء محمد) যা আল্লাহ চান এবং মুহাম্মাদ ﷺ চান! তবে এতটুকু বলতে পার (ما شاء الله ثم شاء محمد) যা আল্লাহর মরযী এবং তারপর (আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে) যা মুহাম্মাদ ﷺ এর মরযী।"
যখন একজন কৃতদাসী বলেছিল,
"আমাদের মধ্যে অবস্থান করছেন আল্লাহর রসূল যিনি কাল কী ঘটবে তা জানেন" তখন রসূল ﷺ তাকে বললেন, এ রকম কথা বলো না, বরং (قولي بالذي كنت تقولين) তুমি আগে যা বলছিলে তাই শুধু বল। শেষের কথাটি অর্থাৎ রসূল ﷺ আগামীকাল কী ঘটবে তা জানেন এই কথা খবরদার বলো না!
রসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছে,
(لا تطروني كما تطرت النصارع ابن مريم، انما انا عبد فقولوا عبد الله ورسوله)
খৃষ্টানরা যেরূপ মারঈয়ামের পুত্র [ঈসা ('আঃ)]-কে বাড়িয়ে (তাকে আল্লাহর পুত্রের আসনে সমাসীন করে) উর্ধ্বে তুলেছে তোমরা সাবধান! আমাকে ঐরূপ বাড়িয়ো না। মনে রেখো! আমি বান্দাহ! কাজেই তোমরা বলবে আব্দুহু ওয়া রসূলুহু আমি (প্রথমে) আল্লাহর দাস ও (তারপর) আল্লাহর রসূল।
একদিন যখন সহাবীগণ নামায পড়ার জন্য রসূলুল্লাহ ﷺ এর পিছনে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছেন (আর তিনি বসা অবস্থায় ছিলেন) তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন,
(لا تعظمو ني كما تعظم الا عاجم بعضهم بعضا)
আমার প্রতি তোমরা ঐরূপ সম্মান প্রদর্শন করো না, যেরূপ আযমীগণ (অনারবরা) পরস্পরে পরস্পরের প্রতি (দণ্ডায়মান হয়ে) সম্মান প্রদর্শন করে থাকে।
আনাস (রাযি.) বলেন, সহাবীদের নিকট রসূলুল্লাহ ﷺ অপেক্ষা প্রিয়তর (এবং অধিকতর শ্রদ্ধার পাত্র) আর কেউ ছিল না, সে সত্ত্বেও যখন তিনি তাদের মাঝে তাশরীফ আনতেন তখন তাঁর সম্মানার্থে তারা দণ্ডায়মান হতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এরূপ দাঁড়ানো মোটেই পছন্দ করেন না (বরং তিনি ঐ অবস্থায় দাঁড়াতে নিষেধ করেছেন)।
মা'আয (রাযি.) আযমীদের মধ্যে প্রচলিত প্রথা দেখে এসে রসূলুল্লাহ ﷺ কে সাজদাহ করতে চাইলেন, তখন রসূলুল্লাহ ﷺ তা করতে নিষেধ করে দিলেন এবং বললেন,
(انه لا يصلح المسجود الا لله لوكنت امرا احدا أن يسجد لا حد لامرت المرأة أن تسجد لزوجها من عظم حقه عليها)
"সাজদাহ একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য, তিনি ছাড়া আর কারো জন্যই সাজদাহ সিদ্ধ নয়। আমি যদি কোন মানুষকে অপর কোন মানুষের জন্য সাজদাহর হুকুম দিতাম, তাহলে আমি স্ত্রীকে হুকুম দিতাম তার স্বামীকে সাজদাহ করতে-স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রাপ্য বড় রকম হকের জন্য।"
আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু যখন খলীফা, তখন যিন্দীকদের সেই দলটিকে তার সামনে উপস্থাপন করা হলো যারা আলীকে বলত, প্রভু। আলী (রাযি.) তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারার হুকুম দিলেন।
এই হচ্ছে নাবী রসূল এবং অলী আউলিয়াদের অবস্থা। যারা তাদেরকে বাড়িয়ে তাদেরকে বহু উর্ধ্বে সমাসীন করে, তাদের প্রতি না-হক সম্মান দেখাতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করে, তারা পৃথিবীতে অনাচার এবং ফাসাদ সৃষ্টি করে ধ্বংস ডেকে আনতে চায়, যেমন ফিরআউন এবং তার দলের লোকেরা করেছিল যার পরিণামে তাদের নিস্তনাবুদ হতে হয়েছিল। মাশায়েখদের মধ্যে যারা এরূপ কাজের প্রশ্রয় দিয়ে থাকে তারাও ফিরআউনেরই গোত্রভুক্ত। নাবী রসূল এবং ওলী আউলিয়াদের জীবিতকালে এই অনাচার সম্ভব হয় না, তাদের মৃত্যুর পর অথবা অনুপস্থিতিকালে এই অনাচার এবং বাড়াবাড়ি (শয়তানের প্ররোচনায়) প্রশ্রয় প্রাপ্ত হয়।