📄 শরীয়ত মুতাবেক এবং সুন্নাত অনুসারে কবরসমূহের যিয়ারত
কবর যিয়ারতের সুন্নাহ-সম্মত পদ্ধতি এই যে, যিয়ারতকারী কবরের বাসিন্দার প্রতি সালাম জানাবে এবং তার জন্য ঠিক সেভাবে আল্লাহর নিকট দু'আ করবে যেভাবে জানাযার জন্য দু'আ পড়া হয়। রসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে এরূপ শিক্ষাই দিয়ে গিয়েছেন। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন, যখন কবরসমূহ যিয়ারত করবে তখন এই কথাগুলো বলবে,
আস্সালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারি মিনাল মু'মিনীনা ওয়া ইন্না ইনশা আল্লাহু বিকুম লাহিকূন। ইয়ার হামুল্লাহুল মুস্তাকদেমীনা মিন্না ওয়াল মুস্তাখেরীন, নাস্ আলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আফীয়াতা, আল্লাহুম্মা লাতাহরিমনা দআজরাহুম ওয়া লা তাফতিন্না বা'দাহুম।
"হে মুমিন ও মুসলিমদের বস্তির (অর্থাৎ কবরের) অধিবাসীবৃন্দ! আপনাদের প্রতি সালাম (আল্লাহর তরফ থেকে আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক!) আমরা ইনশা আল্লাহ আপনাদের সঙ্গে মিলিত হবো। আমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছেন তাদের প্রতি এবং পরবর্তীদের প্রতি আল্লাহ রহমাত করুন। আমরা আমাদের জন্য এবং আপনাদের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তির প্রার্থনা জানাই। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করো না এবং তাদের পর আমাদেরকে বিপদাপদে নিক্ষেপ করো না।"
রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
"যখন কোন ব্যক্তি এমন কোন কবরের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করে যার বাসিন্দা দুনিয়ায় ছিল তার নিকট পরিচিত, তাকে সে সালাম জানালে আল্লাহ তা'আলা তার রুহকে তার দিকে ফিরিয়ে দেন ফলে সে উক্ত সালামের জওয়াব প্রদান করে।"
মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত ব্যক্তির দু'আর সওয়াব ঠিক সেরূপ, যেরূপ তার জানাযা পড়ার সওয়াব। এজন্যই মুনাফিকদের জন্য দু'আ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে: আল্লাহ বলেনঃ
"তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মধ্যে কেউ মারা গেলে তাদের জন্য কখনো (রহমাতের) দু'আ করবে না; আর তাদের কবরের কাছে গিয়েও দাঁড়াবে না।" (সূরা আত-তাওবাহ ৮৪)
মৃত ব্যক্তির নিকট জীবিত ব্যক্তির কোন প্রয়োজন মিটানোর আকাঙ্ক্ষা জ্ঞাপন করতে এবং তাকে ওয়াসীলারূপে পেশ করতে অনুমতি দেয়া হয়নি। বরং জীবিত ব্যক্তিকে হুকুম করা হয়েছে। সে যেন মৃত ব্যক্তির কল্যাণার্থে চেষ্টা চালায়। তার জানাযার নামাযে অংশ গ্রহণ করে, তার মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ প্রার্থনা করে। কেননা (মুমিন) মৃত ব্যক্তির জন্য (মুমিন) জীবিত ব্যক্তির দু'আ একদিকে যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য রহমাত নাযিলের কারণ হয়, তেমনি সেই ব্যক্তিও সওয়াব ও পুরস্কারের হকদার হয়ে যায়। সহীহ বুখারীতে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মৃত্যুর পর মানুষের আমলের সিলসিলা বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকারের আমল ব্যতীত।
১। সদাকায়ে জারীয়া।
২। তার রেখে যাওয়া ইল্ম যার দ্বারা তার মৃত্যুর পরও মানুষ উপকৃত হয়।
৩। সৎ সন্তান, যে তার জন্য দু'আ করে।"
📄 কবরের কাছে গিয়ে হাজত চাওয়ার তিন প্রকরণ
কোন ব্যক্তি যখন কোন নাবী অথবা ওলীর মাযারে গমন করে অথবা এমন কবরের কাছে গমন করে যে কবর সম্বন্ধে তার ধারণা যে, উক্ত কবর কোন নাবী, ওলী অথবা সালেহ বান্দার কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তা সত্য নয় আর সে ঐ মাযার বা কল্পিত মাযারে গিয়ে কবরের (সত্য অথবা মিথ্যা) বাসিন্দার নিকট তার প্রয়োজন মিটানোর জন্য যে সব প্রার্থনা জ্ঞাপন করে সেগুলোকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে:
১। কবরের বাসিন্দার নিকট প্রার্থনা জানান: যেমন নিজের জান ও মাল এবং পরিবার পরিজনের নিরাপত্তা, ঋণ শোধ, দুশমনের প্রতিশোধ গ্রহণ প্রভৃতি ব্যাপারে তার নিকট এমন প্রার্থনা জানান যা পূরা করার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই নেই, থাকতে পারে না। এরূপ প্রার্থনা জ্ঞাপন হবে পরিষ্কার (সন্দেহাতীত) শির্ক। এরূপ শির্কে যে ব্যক্তি লিপ্ত হবে তাকে অবশ্যই তাওবাহ করতে হবে। তাওবাহ না করলে তা হবে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য।
যদি সে তার কৃতকর্মের সপক্ষে এই দলীল এবং যুক্তি পেশ করে যে, উক্ত কবরের বাসিন্দা আল্লাহর নৈকট্যে আমাদের অপেক্ষা অধিক অগ্রবর্তী, তিনি আমার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন-কবর পূজারীরা বলে, আমরা মৃত ব্যক্তির ওয়াসীলা ঠিক সেভাবেই ধরি বা কামনা করি যেরূপ বাদশাকে ধরবার জন্য তার নিকটতম ব্যক্তি এবং পারিষদকে ধরার প্রয়োজন ঘটে যেন তারা বাদশার নিকট সুপারিশ করে প্রার্থনা মঞ্জুর করাতে পারে। তাদের এই ধরনের বক্তব্য এবং মুশরিক নাসারাদের বক্তব্যের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। কারণ তাদেরও আকীদা এই যে, তাদের পুরোহিত পাদ্রী এবং তাদের ঋষি মনীষী ও সাধু সন্ন্যাসীরা আল্লাহর নিকট তাদের প্রয়োজন মিটানোর জন্য সুপারিশ জানিয়ে থাকে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ মুশরিকদের এই বিশ্বাস এবং যুক্তি সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেছেন, যেমন তারা বলে থাকে:
"আমরা তাদের ইবাদাত শুধু এ জন্যই করে থাকি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌছিয়ে দেবে।" (সূরা আয-যুমার ৩)
"তারা কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কাউকে নিজেদের সুপারিশকারীরূপে নির্বাচন করে নিয়েছে। (আপনি হে রসূল।) বলে দিনঃ যদিও কোন বস্তুর উপর তাদের কোন কর্তৃত্ব না থাকে এবং তাদের বুঝবার মত ক্ষমতাও না থাকে (তবু সেই অবস্থাতেও তাদেরকে তোমরা সুপারিশকারীরূপে আঁকড়ে ধরে থাকবে)? (হে রসূল) আপনি ঘোষণা করে দিন: সমস্ত শাফাআতের ইখতিয়ার একমাত্র আল্লাহরই হাতে, যাঁর হাতে রয়েছে আসমান ও যমীনের সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং যাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হতে হবে সকলকে।" (সূরা আয-যুমার ৪৩ ও ৪৪)
"(হে লোক সকল!) তিনি (আল্লাহ) ছাড়া তোমাদের জন্য না আছে কোন ওলী-অভিভাবক আর না আছে কোন সুপারিশকারী। এরপরেও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?" (সূরা আস সাজদা ৪)
"কে আছে এমন যে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে?" (সূরা আল-বাকারা ২৫৫)
উপরে উদ্ধৃত আয়াতগুলোতে খালেক ও মাখলুক-স্রষ্টা ও সৃষ্টির মৌলিক পার্থক্য কোথায় তা স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে।
মানুষ বাদশাহ বা কোন বড় হাকিমের নিকট সুপারিশ জ্ঞাপনের জন্য এমন খাস কোন সুহৃদ বা নৈকট্যে অবস্থানকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বেছে নেয় যার সুপারিশ তিনি গ্রহণ করেন বা করতে বাধ্য হন কতিপয় কারণে। যেমন সুপারিশকারী রূপে নির্বাচিত ব্যক্তি বাদশাহ হাকিমের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র, তার প্রতি অনুরাগ-সম্পন্ন, কিংবা তার ভয়ের পাত্র তার ভিতরে এক অপ্রতিহত ব্যক্তিত্ব আছে কিংবা তার প্রভাব প্রতিপত্তি এমন যে, বাদশাহ তাকে সমীহ না করে পারে না, কিংবা বাদশার সঙ্গে তার সম্পর্কটি এমন যে, তার সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করতে তিনি লজ্জা এবং সংকোচবোধ করেন, অথবা সম্পর্কটি ভালবাসা এবং স্নেহের সঙ্গে জড়িত কিংবা এমনি ধরনের অপর কোন সম্পর্ক যার কারণে তাঁর সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করা সম্ভবও নয়, সহজও নয়, বরং তাতে ক্ষতির আশঙ্কাই বিদ্যমান। কিন্তু মহা প্রভু আল্লাহ এ সমস্ত বাধ্যবাধকতা ও ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে পাক পবিত্র। কেউ তার নিকট সুপারিশের সাহসই সঞ্চয় করতে পারবে না যে পর্যন্ত তিনি স্বয়ং কাউকে সুপারিশ করার অনুমতি না দেবেন। আর সেই অবস্থাতেও সে শুধু ঐ পরিমাণ সুপারিশ জ্ঞাপন করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ মর্জি ফরমাবেন, আর সে সুপারিশটিও হবে তার সম্পূর্ণ অনুমতি সাপেক্ষ। কাজেই এই আলোচনা থেকে এই ফল পাওয়া গেল যে, সমুদয় ইখতিয়ার সম্পূর্ণভাবে আল্লাহরই হস্তে ন্যস্ত। এজন্যই বুখারী-মুসলিমের এক হাদীসে আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ প্রদান করেছেন:
"তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার প্রার্থনায় এরূপ না বলে: প্রভু হে! আমাকে মাফ করে দাও যদি তুমি চাও, আমার প্রতি তুমি রহম কর যদি তুমি ইচ্ছা কর, বরং সওয়ালে অর্থাৎ প্রার্থিত বিষয়ের কামনায় দৃঢ়-সংকল্প হতে হবে-কেননা আল্লাহকে কেউ বাধ্য করতে পারে না" (কিন্তু তার নিকট অন্তরের পূর্ণ দৃঢ়তায় প্রার্থনা করা যেতে পারে)।
এই হাদীসে রসূলুল্লাহ ﷺ পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তিই তার আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য আল্লাহ তা'আলাকে বাধ্য করতে পারে না-যেমন পার্থিব জগতে রাজা বাদশাহ ও হাকিম প্রভৃতিকে সুপারিশকারী তার সুপারিশ গ্রহণে বাধ্য করতে সক্ষম হয় অথবা প্রার্থনাকারী দুনিয়ার কোন কর্তা ব্যক্তির নিকট পুনঃ পুনঃ অনুরোধ উপরোধ ও বহু কাকুতি মিনতির পর তার ইচ্ছা না থাকলেও তাকে রাজী করাতে সক্ষম হয় এবং এভাবে প্রার্থী তার উদ্দেশ্য হাসিল করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাবারক ওয়া তা'আলার ব্যাপারে একটি মাত্র দুয়ারই উন্মুক্ত আর তা হচ্ছে এই যে, হৃদয়ের সমস্ত বাসনা কামনা, অনুরাগ আসক্তি একমাত্র প্রভু পরোয়ারদিগারের দিকেই নিবেদিত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেনঃ
"যখন তুমি (তোমার জরুরী কাজ থেকে) ফারেগ হবে বা অব্যাহতি লাভ করবে তখন তুমি (তোমার প্রভুর সহিত আধ্যাত্মিক সম্পর্ক উন্নততর করার জন্য) মেহনত করে চল এবং স্বীয় প্রভুর দিকে অনুরাগ সম্পন্ন হও-তোমার সমস্ত মনোযোগ মনোনিবেশ তাঁরই দিকে একনিষ্ঠ করে নাও।" (সূরা ইনশিরাহ ৭-৮)
আল্লাহর প্রতি অনুরাগের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভয় ও ভীতিও মনে জাগরুক রাখতে হবে। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ
"এবং একমাত্র আমাকেই ভয় করে চল।" (সূরা আল-বাকারাহ ৪০)
কারণ কোন মানুষ নয়, একমাত্র আল্লাহই ভয়ের পাত্র, যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ
"লোকদের ভয় মনে স্থান দিও না, ভয় কর একমাত্র আমাকেই।" (সূরা আল-মায়িদাহ ৪৪)
রসূল ﷺ আমাদেরকে তাঁর প্রতি দরূদ পাঠের নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং তাঁকে আমাদের দু'আ কবুলের যারীআ বলে উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ পথভ্রষ্ট লোক কবরের কোন কোন বাসিন্দা (নাবী, ওলী, আওলিয়া পীর দরবেশ) সম্বন্ধে এই আকীদা পোষণ করে থাকেন যে, (কবরে শায়িত) এই বুযুর্গ আল্লাহর নৈকট্যে অবস্থানকারী আর আমরা রয়েছি তার থেকে অনেক দূরে, কাজেই তারই মধ্যস্থতায় আমরা আল্লাহর নিকট মুনাজাত পেশ করে থাকি। তারা এ ধরনের আরও অনেক বাজে কথা বলে থাকে। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এ সমস্তই হচ্ছে মুশরিকদের উপযোগী কথা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তো কুরআন মজীদে তার সম্বন্ধে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন:
"আর যখন আমার বান্দারা আপনাকে আমার সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞেস করে, তখন (হে রসূল! আপনি তাদের বলে দিন যে,) আমি তাদের নিকটেই রয়েছি-এত নিকটে যে, যখন কেউ আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকি।" (সূরা আল-বাক্বারাহ ১৮৬)
এই আয়াতের শানে নুযূল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা সহাবাগণ রসূলল্লাহ ﷺ এর খিদমতে আরয করলেন, আমাদের প্রভু পরোয়ারদিগার যদি নিকটেই থাকেন, তাহলে তো মনে মনে প্রার্থনা জানানোই যথেষ্ট আর যদি তিনি দূরে অবস্থান করেন তাহলে বুলন্দ আওয়াজে তাকে ডাকা প্রয়োজন। এরই জওয়াবে আল্লাহর নিকট থেকে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।
বুখারীতে রিওয়ায়াত এসেছে যে, (রসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে ভ্রমণরত) সহাবাগণ এক সফরে উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন। রসূলুল্লাহ ﷺ শুনে তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে লোক সকল! তোমরা নিম্নস্বরে তাকবীর পাঠ কর। তোমরা বধির এবং অনুপস্থিত কোন সত্তাকে আহবান জানাচ্ছ না।
"বরং তোমরা এমন একজনকে ডাকছো যিনি সব কিছুই শুনতে পান এবং যিনি নিকটেই অবস্থান করছেন-এত নিকটে যে তিনি তোমাদের নিজেদের চাইতেও নিকটতর অথবা তিনি বলেছিলেন, তিনি তোমাদের সওয়ারীর গরদান অপেক্ষাও নিকটতর।"
আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রত্যেক বান্দাকে তাঁর উদ্দেশে নামায পড়ার এবং তাঁর নিকট মুনাজাত করার হুকুম দিয়েছেন, এছাড়া তিনি প্রত্যেক মুসলমানকে নামাযে এবং নামাযের বাইরেও নির্দেশ দিয়েছেন এই কথা বলতে:
"আমরা (হে প্রভু পরোয়ার্দিগার!) একমাত্র তোমারই ইবাদাত করি এবং একমাত্র তোমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে থাকি।" (সূরা ফাতিহা ৫)
এটা হচ্ছে প্রকৃত মুওয়াহহিদ তথা খাঁটি তাওহীদবাদীর কথা। আর মুশরিকদের-তাদের অংশীবাদিতার সমর্থনে কৈফিয়ত হচ্ছেঃ
"আমরা তো তাদের পূজা এজন্য এবং এই আশা নিয়েই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যাবে।" (সূরা যুমার ৩) অর্থাৎ তাদের সাহায্য সহায়তায় এবং সুপারিশে আমরা নৈকট্য লাভে সক্ষম হবো।
এখন আমরা ঐ মুশরিকদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, তোমরা যে ঐ কবরের বাসিন্দাকে ডেকে থাক, আচ্ছা বল দেখি, তোমাদের ধারণায় কবরের ঐ বাসিন্দা কি আল্লাহর চাইতে বেশি জ্ঞান রাখে? অথবা তোমাদের চাহিদা মিটাতে সে কি আল্লাহর অপেক্ষা বেশী ক্ষমতা রাখে? কিংবা সে কি আল্লাহর চাইতে তোমাদের প্রতি বেশী মেহেরবান? যদি এটাই তোমাদের আকীদা হয়ে থাকে, তবে তা নিরেট মূর্খতা, স্পষ্ট গুমরাহী এবং পরিষ্কার কুফর। আর যদি তোমাদের এই দৃঢ় প্রত্যয় থাকে যে, আল্লাহই হচ্ছেন তোমাদের সম্বন্ধে অন্য সবার চাইতে বেশী ওয়াকেফহাল, তোমাদের অভাব অভিযোগ, চাহিদা প্রয়োজন, কামনা বাসনা পূরণ করার অধিকতর ক্ষমতা রাখেন এবং তোমাদের প্রতি সর্বাপেক্ষা মেহেরবান, তাহলে তাঁকে ছেড়ে অন্যকে ডাকার এবং অন্যের নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন করার কি কারণ থাকতে পারে? এখনও কি রসূলুল্লাহ ﷺ এর সেই হাদীসটি তোমাদের কানে যায়নি যা ইমাম বুখারী এবং অন্যান্য হাদীস সংকলকগণ তাদের স্ব স্ব হাদীস গ্রন্থে সহাবী জাবির (রাযি.) হতে রিওয়ায়াত করেছেন?
তাতে বলা হয়েছে:
রসূলুল্লাহ ﷺ লোকদেরকে যেরূপ কুরআন মাজীদের সূরা শিক্ষা দিতেন, তেমনিভাবে তিনি তাদেরকে ইস্তিখারার দু'আ শিক্ষা দিতেন। এই দু'আ শিক্ষাদানকালে তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে যখন কেউ কোন সংকটে নিপতিত হয় এবং দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে, তখন সে যেন (ইশার) ফরয নামায (এবং সুন্নাত, বিতর) ছাড়াও আরও দু' রাক'আত (অতিরিক্ত নামায) আদায় করে এই দু'আ পাঠ করে:
"হে আল্লাহ! আমি তোমার (গায়িবী) ইল্ম থেকে কল্যাণ কামনা করি, তোমার কুদরত হতে শক্তি যাজ্ঞা করি এবং তোমার মহান অনুগ্রহ লাভের আমি অভিলাষী-কেননা তুমিই কুদরতের অধিকারী, শক্তিবান, আমার কোন ক্ষমতা নেই-শক্তিহীন আমি, আর একমাত্র তুমিই জান (কিসে কল্যাণ, কিসে অকল্যাণ)। আমি কিছুই জানি না, তুমি অদৃশ্য বিষয়ে অত্যধিক জ্ঞানবান, যদি তোমার জ্ঞানে এই কাজ (কাজটির কথা মনে মনে ধ্যান করতে হবে) আমার জন্য কল্যাণকর, আমার দ্বীন-ধর্মের জন্য শুভ, আমার জীবিকার জন্য মঙ্গলকর এবং আমার সমুদয় কাজের পরিণামে কল্যাণবহ হয়, তাহলে তুমি তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও, তা আমার জন্য সহজ সাধ্য করে দাও তারপর তাতে তুমি বরকত প্রদান কর। আর তোমার জ্ঞানে এই কাজ যদি আমার দ্বীন-ধর্ম, আমার জীবিকায় এবং আমার কাজের পরিণতিতে অশুভ ও ক্ষতিকর হয়, তাহলে এই কাজকে আমার নিকট থেকে দূরে সরিয়ে নাও, আর আমাকেও ঐ কাজ থেকে দূরে অপসৃত করে দাও। অতঃপর আমার জন্য যা শুভ ও কল্যাণবহ তাই নির্ধারিত করে দাও এবং তাতেই আমার হৃদয়ে সন্তোষ প্রদান কর।"
এই দু'আ পাঠ করে নিজের আকাঙ্ক্ষিত প্রার্থনা জানাবে। এই দু'আয় আল্লাহর নিকট মঙ্গল ও কল্যাণ প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে, কারণ তিনিই সর্বজ্ঞাতা (সর্বকাজের ভাল মন্দ একমাত্র তিনিই জানেন)। তিনি শ্রেষ্ঠতম শক্তিধর। যা কিছু চাওয়ার তাঁরই নিকট চাইতে বলা হয়েছে-অন্য কারোর নিকটেই নয়, কারণ তিনিই যে শ্রেষ্ঠ সম্পদের অধিকারী, তিনিই যে মহা অনুগ্রহপরায়ণ।
📄 কবরের অধিবাসী (নবী ওলী) এর নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপনের দুই প্রকরণ
কবরের অধিবাসীর (তিনি নাবী হোক অথবা ওলী) নিকট প্রার্থনা জ্ঞাপন দুই প্রকার হতে পারে।
📄 প্রথম প্রকরণ
যদি তুমি কবরের অধিবাসীর নিকট এজন্য কিছু প্রার্থনা বা যাজ্ঞা করে থাক যে, তোমার ধারণায় তিনি তোমার চাইতে আল্লাহর অধিকতর নৈকট্যের অধিকারী এবং আল্লাহর নিকট তার পদ-মর্যাদা তোমার অপেক্ষা অনেক উচ্চ, তাহলে হয়তো কথাটা একদিক দিয়ে সত্য, কিন্তু সেটা এমন এক সত্য যার থেকে তুমি একটা ভুল অর্থ বুঝে নিয়েছো-একটা ভ্রান্ত ধারণা মনে মনে পোষণ করে চলেছে। কেননা যদি তিনি তোমার চাইতে আল্লাহর কাছে অধিকতর নৈকট্যের অধিকারী হয়ে থাকেন এবং উচ্চতর মর্যাদার হকদার হন, তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়াবে যে, আল্লাহ তাকে তোমার চাইতে বেশী নিয়ামত দ্বারা অনুগৃহীত করবেন এবং তোমার চাইতে উচ্চতর মর্যাদা তাকে প্রদান করবেন। তার অর্থ এটা নয় যে, যখন তুমি মৃত বুযুর্গকে ডাকবে তখন সেই ডাকের কারণে আল্লাহ তোমার সরাসরি ডাকের চাইতে বেশী করে এবং সুন্দরতররূপে তোমার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবেন। (অর্থাৎ তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর হওয়ার যোগ্য হলে তোমার সরাসরি ডাকেই তা মঞ্জুর হবে আর মঞ্জুর হওয়ার যোগ্য না হলে মৃত কোন বুযুর্গের মাধ্যমে তা পেশ করলেও মঞ্জুর হবে না)।
কেননা যে পাপাচারের কারণে তুমি হবে আযাব লাভের হকদার অথবা যখন তোমার প্রার্থনার বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত হয় গুনাহের উপর এবং সে কারণে তা প্রত্যাখ্যানের যোগ্য বিবেচিত হবে তখন সে অবস্থায় নাবীগণ এবং সালিহীন কিছুতেই তোমার সহায়তায় এগিয়ে আসবেন না- আসতে পারেন না। কারণ আল্লাহর নিকট যে বন্ধু বা বিষয় অপ্রীতিকর এবং হারাম তেমন বিষয়ে তোমাকে সাহায্য করার জন্য রাখা কর্তব্য যে, তোমার সরাসরি প্রার্থনাই কবুল হওয়ার যোগ্য, কেননা আল্লাহর পবিত্র সত্তাই সব চাইতে বেশী দয়াশীল এবং সর্বাধিক করুণাময়।