মিশকাতুল মাসাবিহ > তৃতীয় অনুচ্ছেদ
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২০৬
عن جابر قال: خرج علينا رسول اللٰه ﷺ ونحن نقرأ القراٰن وفينا الأعرابى ولأعجمى قال: «اقرؤوا فكل حسن وسيجىء أقوام يقيمونه كما يقام القدح يتعجلونه ولا يتأجلونه». رواه أبو داود والبيهقى فى شعب الإيمان
তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এলেন। আমরা তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলাম। এ পাঠের মধ্যে ‘আরব অনারব সবই ছিল (যারা কুরআন পাঠে ঠিক মতো উচ্চারণ করতে পারছিল না) তারপরও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ পড়ে যাও। প্রত্যেকেই ভাল পড়ছো। (মনে রাখবে) অচিরেই এমন কতক দল আসবে যারা ঠিক মতো কুরআন পাঠ করবে, যেভাবে তীর সোজা রাখা হয়। তারা (দুনিয়াতেই) তাড়াতাড়ি এর ফল চাইবে। আখিরাতের জন্য অপেক্ষা করবে না। (আবূ দাঊদ, বায়হাক্বী- শু‘আবূল ঈমান)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২০৭
وعن حذيفة قال: قال رسول اللٰه ﷺ: «اقرؤوا القراٰن بلحون العرب وأصواتها وإياكم ولحون أهل العشق ولحون أهل الكتابين وسيجىئ بعدى قوم يرجعون بالقراٰن ترجع الغناء والنوح لا يجاوز حناجرهم مفتونه قلوبهم وقلوب الذين يعجبهم شأنهم». رواه البيهقى فى شعب الإيمان
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআন পড়ো ‘আরবদের স্বর ও সুরে। আর দূরে থাকো আহলে ইশক ও আহলে কিতাবদের পদ্ধতি হতে। আমার পর খুব তাড়াতাড়ি এমন কিছু লোকের আগমন ঘটবে, যারা কুরআন পাঠে গান ও বিলাপের সুর ধরবে। কুরআন মাজীদ তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করে অন্তরের দিকে যাবে না। তাদের অন্তর হবে দুনিয়ার মোহগ্রস্ত। এভাবে তাদের অন্তরও মোহগ্রস্ত হবে যারা তাদের পদ্ধতি ও সুরে কুরআন তিলাওয়াত করবে। (বায়হাক্বী- শু‘আবূল ঈমান)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২০৮
وعن البراء بن عازب قال: سمعت رسول اللٰه ﷺ يقول: «حسنوا القراٰن بأصواتكم فإن الصوت الحسن يزيد القراٰن حسنا». رواه الدارمى
তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা কুরআনকে তোমাদের কণ্ঠস্বরের মধুর আওয়াজ দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে পড়বে। কারণ সুমিষ্ট স্বর কুরআনের সৌন্দর্য বাড়ায়। (দারিমী)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২০৯
وعن طاووس مرسلا قال: سئل النبى ﷺ: أي الناس أحسن صوتا للقراٰن؟ وأحسن قراءة؟ قال: «من إذا سمعته يقرأ أرأيت أنه يخشى اللٰه». قال طاووس: وكان طلق كذلك. رواه الدارمى
তিনি বলেন, একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, (হে আল্লাহর নাবী!) কুরআনে স্বর প্রয়োগ ও উত্তম তিলাওয়াতের দিক দিয়ে কোন্ ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, যার তিলাওয়াত শুনে তোমার মনে হবে, তিলাওয়াতকারী আল্লাহকে ভয় করছে। বর্ণনাকারী ত্বাঊস বলছেন, ত্বালক্ব (রহঃ) এরূপ তিলাওয়াতকারী ছিলেন। (দারিমী)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২১০
وعن عبيدة المليكى وكانت له صحبة قال: قال رسول اللٰه ﷺ: «يا أهل القراٰن لا تتوسدوا القراٰن واتلوه حق تلاوته من اٰناء الليل والنهار وأفشوه وتغنوه وتدبروا ما فيه لعلكم تفلحون ولا تعجلوا ثوابه فإن له ثوابا». رواه البيهقى فى شعب الإيمان
তিনি ছিলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহচর। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে কুরআনের বাহকগণ! কুরআনকে তোমরা বালিশ বানাবে না। বরং তা তোমরা রাতদিন তিলাওয়াত করার মতো তিলাওয়াত করবে। কুরআনকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে সুর করে পড়বে। কুরআনের বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে পড়বে। তাহলেই তোমরা সফলতা অর্জন করবে। দুনিয়ায় এর প্রতিফল পাবার জন্য তাড়াহুড়া করো না। কারণ আখিরাতে এর উত্তম প্রতিফল রয়েছে। (বায়হাক্বী- শু‘আবূল ঈমান)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ > প্রথম অনুচ্ছেদ
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২১১
وعن عمر بن الخطاب قال: سمعت هشام بن حكيم بن حزام يقرأ سورة الفرقان علٰى غير ما أقرأها. وكان رسول اللٰه ﷺ أقرأنيها فكدت أن أعجل عليه ثم أمهلته حتى انصرف ثم لببته بردائه فجئت به رسول اللٰه ﷺ. فقلت يا رسول اللٰه إنى سمعت هٰذا يقرأ سورة الفرقان علٰى غير ما أقرأتنيها. فقال رسول اللٰه ﷺ: أرسله اقرأ فقرأت القراءة التى سمعته يقرأ. فقال رسول اللٰه ﷺ: «هكذا أنزلت». ثم قال لى: «اقرأ». فقرأت. فقال رسول اللٰه ﷺ: «هكذا أنزلت إن هٰذا القراٰن أنزل علٰى سبعة أحرف فاقرءوا ما تيسر منه». متفق عليه، واللفظ لمسلم
তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবনু হাকীম ইবনু হিযামকে ‘সূরা আল ফুরকান’ পাঠ করতে শুনলাম। আমি যেভাবে (কুরআন) পড়ি, তা হতে (তার পড়া) ভিন্ন ধরনের, অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে আমাকে এ সূরা পড়িয়েছেন। তাই আমি এর কারণে ব্যস্ত হতে উদ্যত হলাম। কিন্তু সলাত শেষ করা পর্যন্ত তাকে সুযোগ দিলাম। সলাত শেষ হবার পরই তার চাদর তার গলায় পেঁচিয়ে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাকে যেভাবে ‘সূরা আল ফুরকান’ পড়িয়েছেন তার থেকে ভিন্নরূপে আমি হিশামকে ‘সূরা আল ফুরকান’ পড়তে শুনলাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমারকে বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। হিশামকে বললেন, হিশাম! তুমি ‘সূরা আল ফুরকান’ পড়ো তো দেখি। হিশাম এ সূরাটি সেভাবেই পড়ল আমি তাকে যেভাবে পড়তে শুনেছি। তার পড়া শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবেও এ সূরা নাযিল হয়েছে। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন, এখন তুমিও পড়ো দেখি! আমিও সূরাটি পড়লাম। আমার পড়া শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এ সূরাটি এভাবেও নাযিল হয়েছে। বস্ত্তত এ কুরআন সাত রীতিতে নাযিল করা হয়েছে। তাই তোমাদের যার জন্য যে কিরাআত সহজ হয় সেভাবেই তোমরা পড়বে। (বুখারী, মুসলিম; কিন্তু পাঠ [শব্দ] মুসলিমের)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২১২
وعن ابن مسعود قال: سمعت رجلا قرأ وسمعت النبى ﷺ يقرأ خلافها فجئت به النبى ﷺ فأخبرته فعرفت فى وجهه الكراهية فقال: «كلاكما محسن فلا تختلفوا فإن من كان قبلكم اختلفوا فهلكوا». رواه البخارى
তিনি বলেন, আমি এক লোককে কুরআন পড়তে শুনলাম। অথচ আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অন্যভাবে তা পড়তে শুনেছি। আমি তাকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে গেলাম। তাঁকে এ খবর জানালাম। আমি তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারায় বিরক্তির ভাব লক্ষ্য করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা দু’জনই শুদ্ধ পড়েছ। এ নিয়ে তোমরা কলহ বিবাদ করো না। তোমাদের আগের লোকেরা কলহ-বিবাদে লিপ্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছেন। (বুখারী)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২১৩
وعن أبى بن كعب قال: كنت فى المسجد فدخل رجل يصلى فقرأ قراءة أنكرتها عليه ثم دخل اٰخر فقرأ قراءة سوٰى قراءة صاحبه فلما قضينا الصلاة دخلنا جميعا علٰى رسول اللٰه ﷺ فقلت إن هٰذا قرأ قراءة أنكرتها عليه ودخل اٰخر فقرأ سوٰى قراءة صاحبه فأمرهما النبى ﷺ فقراٰ فحسن شأنهما فسقط فى نفسى من التكذيب ولا إذ كنت فى الجاهلية فلما رأى رسول اللٰه ﷺ ما قد غشينى ضرب فى صدرى ففضت عرقا وكأنما أنظر إلى الله عز وجل فرقا فقال لى: «يا أبى أرسل إلى أن اقرأ القراٰن علٰى حرف فرددت إليه أن هون على امتى فرد إلى الثانية اقرأه علٰى حرفين فرددت إليه أن هون على امتى فرد إلى الثالثة اقرأه علٰى سبعة أحرف ولك بكل ردة رددتكها مسألة تسألنيها فقلت اللٰهم اغفر لأمتى اللٰهم اغفر لأمتى وأخرت الثالثة ليوم يرغب إلى الخلق كلهم حتٰى ابراهيم ؑ». رواه مسلم
তিনি বলেন, আমি মাসজিদে আছি, এমন সময় এক লোক মাসজিদে এসে সলাত আদায় করতে শুরু করল। সে এমন পদ্ধতিতে কিরাআত পড়ল যা আমার জানা ছিল না। এরপর আর একজন লোক এলো। সে প্রথম ব্যক্তির কিরাআতের ভিন্ন ধরনে পড়ল। সলাত শেষে আমরা সকলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! এ ব্যক্তি সলাতে এভাবে কিরাআত পড়েছে, যা আমার জানা নেই। আবার দ্বিতীয় ব্যক্তি এসে ওর চেয়ে ভিন্নভাবে কিরাআত পড়ল। এসব কথা শুনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে হুকুম দিলেন, আবার কুরআন পড়তে। তারা আবার পড়ল। পড়া শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উভয়ের পাঠকেই ঠিক বললেন। এ কথা শুনে আমার মনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি এমন এক সন্দেহের জন্ম দিলো যা জাহিলিয়্যাতের সময়েও আমার মধ্যে ছিল না। সন্দেহের ছায়া আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে লক্ষ্য করে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার সিনার উপর হাত মারলেন। এতে আমি ঘামে ভিজে গেলাম। আমি এতই ভীত হলাম, যেন আমি আল্লাহকে দেখছি। এ সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন, হে উবাই! আমার কাছে ওহী পাঠানো হয়েছিল এক রীতিতে কুরআন পাঠের। কিন্তু আমি আল্লাহর নিকট আবেদন করলাম। (হে আল্লাহ!) আপনি আমার উম্মাতের জন্য কুরআন পাঠ পদ্ধতি সহজ করে দিন। আল্লাহ দ্বিতীয়বার বললেন, তবে দু’ রীতিতে কুরআন পড়ো। আমি আবার নিবেদন করলাম, (হে আল্লাহ!) আপনি আমার উম্মাতের জন্য কুরআন পাঠ আরো সহজ করে দিন। তিনি তৃতীয়বার আমাকে বলে দিলেন, তাহলে সাত রীতিতে কুরআন পড়ো। কিন্তু তোমার প্রতিটি নিবেদনের পরিবর্তে আমি তোমাকে যা দিয়েছি এর বাইরেও আরো নিবেদন অধিকার তোমার রইল। তুমি তা চাইতে পারো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মাতকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মাতকে ক্ষমা করুন। আর তৃতীয় আবেদনটি আমি এমন এক দিনের জন্য পিছিয়ে রাখলাম যেদিন সব সৃষ্টি আমার সুপারিশের দিকে চেয়ে থাকবে। এমনকি ইব্রাহীম (আঃ)-ও। (মুসলিম)[১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ২২১৪
وعن ابن عباس رضي اللٰه عنهما قال: إن رسول اللٰه ﷺ قال: «أقرأنى جبريل علٰى حرف فراجعته فلم أزل استزيده ويزيدنى حتى انتهٰى إلٰى سبعة أحرف». قال ابن شهاب: بلغنى أن تلك السبعة الأحرف إنما هى فى الأمر تكون واحدا لا تختلف فى حلال ولا حرام. (متفق عليه)
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল (আঃ) আমাকে এক রীতিতে কুরআন পড়ালেন। আমি তাকে এর পাঠ রীতির সংখ্যা বৃদ্ধি করে আনতে আল্লাহর নিকট ফেরত পাঠালাম। আল্লাহ আমার জন্য এ রীতি বৃদ্ধি করতে লাগলেন। অতঃপর এ পাঠ সাত রীতিতে গিয়ে পৌঁছল। বর্ণনাকারী ইবনু শিহাব যুহরী বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে আমার নিকট খবর পৌঁছেছে যে, এ সাত রীতি অর্থের দিক দিয়ে একই। এর দ্বারা হালাল হারামে কোন পার্থক্য পড়েনি। (বুখারী, মুসলিম)[১]