মিশকাতুল মাসাবিহ > তৃতীয় অনুচ্ছেদ
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৪
عن معاذ بن جبل قال قال رسول الله ﷺ إن الشيطان ذئب الإنسان كذئب الغنم يأخذ الشاة والقاصية والناحية وإياكم والشعاب وعليكم بالجماعة والعامة. رواه أحمد
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মেষপালের ক্ষেত্রে নেকড়ে বাঘের ন্যায় শয়তান মানুষের জন্য নেকড়ে বাঘ। পালের যে মেষটি দল হতে আলাদা হয়ে যায় অথবা যেটি খাবারের সন্ধানে দূরে সরে পড়ে অথবা যেটি অলসতাবশতঃ এক কিনারায় পড়ে থাকে, নেকড়ে সেটিকে শিকার করে নিয়ে যায়। সুতরাং সাবধান! তোমরা কক্ষণও (দল ছেড়ে) গিরিপথে চলে যাবে না, আর জামা‘আতবদ্ধ হয়ে (মুসলিম) জনগণের সাথে থাকবে। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৫
وعن أبي ذر قال قال رسول الله ﷺ من فارق الجماعة شبرا فقد خلع ربقة الإسلام من عنقه. رواه أحمد وأبو داوٗد
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যে ব্যক্তি জামা‘আত (দল) হতে এক বিঘত পরিমাণও দূরে সরে গেছে, সে ইসলামের রশি (বন্ধন) তার গলা হতে খুলে ফেলেছে। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৬
وعن مالك بن انس مرسلا قال قال رسول الله ﷺ تركت فيكم أمرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة رسوله. رواه فى الموطا
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহ্র কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস। (ইমাম মালিক মুওয়াত্তায় বর্ণনা করেছেন)। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৭
وعن غضيف بن الحارث الثمالى قال قال رسول الله ﷺ ما أحدث قوم بدعة الا رفع مثلها من السنة فتمسك بسنة خير من إحداث بدعة. رواه أحمد
তিনি বলেন,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যখনই কোন জাতি একটি বিদ‘আত সৃষ্টি করেছে, তখনই সমপরিমাণ সুন্নাত বিদায় নিয়েছে। সুতরাং একটি সুন্নাতের উপর ‘আমাল করা (সু্ন্নাত যত ক্ষুদ্রই হোক), একটি বিদ‘আত সৃষ্টি করা অপেক্ষা উত্তম। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৮
وعن حسان قال ما ابتدع قوم بدعة في دينهم الا نزع الله من سنتهم مثلها ثم لا يعيدها إليهم إلى يوم القيامة. رواه الدارمي
তিন বলেন, কোন জাতি যখনই দ্বীনের মধ্যে কোন বিদ‘আত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। ক্বিয়ামাত পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৯
وعن ابراهيم بن ميسرة قال قال رسول الله ﷺ من وقر صاحب بدعة فقد اعان على هدم الاسلام. رواه البيهقي فى شعب الإيمان مرسلا
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন বিদ‘আতীকে সম্মান দেখাল, সে নিশ্চয়ই ইসলামের ধ্বংস সাধনে সাহায্য করল। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯০
وعن ابن عباس قال من تعلم كتاب الله ثم اتبع ما فيه هداه الله من الضلالة في الدنيا ووقاه يوم القيامة سوء الحساب. وفي رواية قال من اقتدى بكتاب الله لا يضل في الدنيا ولا يشقى في الاۤخرة ثم تلا هذه الاۤية (فمن اتبع هداي فلا يضل ولا يشقى) رواه رزين
তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র কিতাবের শিক্ষা লাভ করল, অতঃপর এ কিতাবের মধ্যে যা আছে তা অনুসরণ করল, আল্লাহ্ তা‘আলা এ ব্যক্তিকে পৃথিবীতে পথভ্রষ্টতা হতে বাঁচিয়ে রাখবেন এবং ক্বিয়ামাত দিবসে তাকে নিকৃষ্ট হিসাবের কষ্ট হতে রক্ষা রকবেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে- তিনি বলেছেন, যে আল্লাহ্ তা‘আলার কিতাবের অনুসরণ করবে, সে দুনিয়াতে পথভ্রষ্ট হবে না এবং আখিরাতেও হতভাগ্য হবে না। অতঃপর এ কথার প্রমাণ স্বরূপ তিনি তিলাওয়াত করলেন: (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আমার হিদায়াত গ্রহণ করল, সে (দুনিয়াতে) পথভ্রষ্ট হবে না এবং (পরকালেও) ভাগ্যাহত হবে না”- (সূরাহ্ ত্ব-হা ২০ : ১২৩) [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯১
وعن ابن مسعود أن رسول الله ﷺ قال ضرب الله مثلا صراطا مستقيما وعن جنبتي الصراط سوران فيها أبواب مفتحة وعلى الأبواب ستور مرخاة وعند رأس الصراط داع يقول استقيموا على الصراط ولا تعوجوا وفوق ذلك داع يدعو كلما هم عبد أن يفتح شيئا من تلك الأبواب قال ويحك لا تفتحه فإنك إن تفتحه تلجه. ثم فسره فأخبر أن الصراط هو الإسلام وأن الأبواب المفتحة محارم الله وأن الستور المرخاة حدود الله وأن الداعي على رأس الصراط هو القران وأن الداعي من فوقه هو واعظ الله في قلب كل مؤمن. رواه رزين ورواه أحمد
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা‘আলা একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। তা হল একটি সরল সঠিক পথ আছে, এর দু’দিকে দু’টি দেয়াল। এসব দেয়ালে খোলা দরজা রয়েছে এবং সে সব দরজায় পর্দা ঝুলানো রয়েছে। আর রাস্তার মাথায় একজন আহ্বায়ক, যে (লোকদেরকে) আহ্বান করছে, এসো সোজা রাস্তা দিয়ে চলে যাও। ভুল ও বাঁকা পথে যাবে না। আর এ আহ্বানকারীর একটু আগে আছেন আর একজন আহ্বানকারী। যখনই কোন বান্দা সে দরজাগুলোর কোন একটি দরজা খুলতে চায়, তখনই সে তাকে ডেকে বলেন, সর্বনাশ! এ দরজা খুলো না। যদি তুমি এটা খুলো তাহলে ভিতরে ঢুকে যাবে (প্রবেশ করলেই পথভ্রষ্ট হবে)। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাখ্যা করলেনঃ সঠিক সরল পথের অর্থ হচ্ছে ‘ইসলাম’ (সে পথ জান্নাতে চলে যায়)। আর খোলা দরজার অর্থ হল, ঐ সব জিনিস আল্লাহ্ তা‘আলা যা হারাম করেছেন এবং দরজার মধ্যে ঝুলানো পর্দার অর্থ হল আল্লাহ্র নির্ধারিত সীমাসমূহ। রাস্তার মাথায় আহ্বায়ক হচ্ছে কুরআন। আর তার সামনের আহ্বায়ক হচ্ছে নাসীহাতকারী মালাক, যা প্রত্যেক মু‘মিনের অন্তরে আল্লাহ্র তরফ থেকে বিদ্যমান। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯২
والبيهقى في شعب الإيمان عن النواس بن سمعان وكذا الترمذي عنه الا أنه ذكر أخصر منه
ইমাম তিরমিযীও একই সহাবী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন, তবে অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্তাকারে।
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯৩
وعن ابن مسعود قال من كان مستنا فليستن بمن قد مات فإن الحي لا تؤمن عليه الفتنة. أولئك أصحاب محمد ﷺ كانوا أفضل هذه الأمة أبرها قلوبا وأعمقها علما وأقلها تكلفا اختارهم الله لصحبة نبيه ولإقامة دينه فاعرفوا لهم فضلهم واتبعوهم على آثرهم وتمسكوا بما استطعتم من أخلاقهم وسيرهم فإنهم كانوا على الهدى المستقيم. رواه رزين
তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কারো কোন ত্বরীক্বাহ্ অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাদের পথ অনুসরণ করে যারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। কারণ জীবিত মানুষ (দ্বীনের ব্যাপারে) ফিত্নাহ হতে মুক্ত নয়। মৃত ব্যক্তিরা হলেন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহাবীগণ, যারা এ উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ। পরিচ্ছন্ন অন্তঃকরণ হিসেবে ও পরিপূর্ণ জ্ঞানের দিক দিয়ে এবং দূরে ছিলেন কৃত্রিমতার দিক দিয়ে। আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে তাঁর প্রিয় রসূলের সাথী ও দ্বীন ক্বায়িমের জন্য মনোনীত করেছিলেন। সুতরাং তোমরা তাদের ফাযীলাত ও মর্যাদা বুঝে নাও। তাদের পদাংক অনুসরণ কর এবং যথাসাধ্য তাদের আখলাক্ব ও জীবন পদ্ধতি মজবুত করে আকঁড়ে ধর। কারণ তাঁরাই (আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের নির্দেশিত) সহজ-সরল পথের পথিক ছিলেন। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯৪
وعن جابر أن عمر بن الخطاب أتى رسول الله ﷺ بنسخة من التوراة فقال يا رسول الله هذه نسخة من التوراة فسكت فجعل يقرأ ووجه رسول الله يتغير فقال أبو بكر ثكلتك الثواكل ما ترى ما بوجه رسول الله ﷺ فنظر عمر إلى وجه رسول الله ﷺ فقال أعوذ بالله من غضب الله وغضب رسوله رضينا بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد نبيا فقال رسول الله ﷺ والذي نفس محمد بيده لو بدا لكم موسى فاتبعتموه وتركتموني لضللتم عن سواء السبيل ولو كان حيا وأدرك نبوتي لاتبعني. رواه الدارمي
তিনি বলেন, ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে তাওরাত কিতাবের একটি পাণ্ডুলিপি এনে বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! এটা হল তাওরাতের একটি পাণ্ডুলিপি। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপ থাকলেন। এরপর ‘উমার (রাঃ) তাওরাত পড়তে আরম্ভ করলেন। (এদিকে রাগে) রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চেহারা বিবর্ণ হতে লাগল। আবূ বাক্র (রাঃ) বললেন, ‘উমার! তোমার সর্বনাশ হোক। তুমি কি রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিবর্ণ চেহারা মুবারক দেখছো না? ‘উমার (রাঃ) রসূলের চেহারার দিকে তাকালেন এবং (চেহারায় ক্রোধান্বিত ভাব লক্ষ্য করে) বললেন, আমি আল্লাহ্র গযব ও তাঁর রসূলের ক্রোধ হতে পানাহ চাচ্ছি। আমি ‘রব’ হিসেবে আল্লাহ্ তা‘আলার উপর, দ্বীন হিসেবে ইসলামের উপর এবং নাবী হিসেবে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর সন্তুষ্ট আছি। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আল্লাহ্র কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি (তাওরাতের নাবী স্বয়ং) মূসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে থাকতেন আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করতে আর আমাকে ত্যাগ করতে, তাহলে তোমরা সঠিক সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে। মূসা (আঃ) যদি এখন জীবিত থাকতেন এবং আমার নবূওয়াতের যুগ পেতেন, তাহলে তিনিও নিশ্চয়ই আমার অনুসরণ করতেন। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯৫
وعنه قال قال رسول الله ﷺ كلامى لا ينسخ كلام الله وكلام الله ينسخ كلامى وكلام الله ينسخ بعضه بعضا
তিনি বলেন, রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমার কথা আল্লাহ্র কথাকে রহিত করতে পারে না, কিন্তু আল্লাহ্র কথা আমার কথাকে রহিত করে। এছাড়া কুরআনের একঅংশ অপরাংশকে রহিত করে। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯৬
وعن ابن عمر قال قال رسول الله ﷺ ان احاديثنا ينسخ بعضها بعضا كنسخ القران
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমার কোন হাদীস অপর হাদীসকে রহিত করে; যেমন কুরআনের কোন অংশ অপর অংশকে রহিত করে। [১]
মিশকাতুল মাসাবিহ ১৯৭
وعن ابي ثعلبة الخشني قال قال رسول الله ﷺ ان الله فرض فرائض فلا تضيعوها وحرم حرمات فلا تنتهكوها وحد حدودا فلا تعتدوها وسكت عن اشياء من غير نسيان فلا تبحثوا عنها. روى الأحاديث الثلاثة الدارقطني
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা‘আলা কিছু জিনিসকে ফার্য হিসেবে নির্ধারিত করে দিয়েছেন, সেগুলো ছেড়ে দিবে না। তিনি কিছু জিনিসকে হারাম করে দিয়েছেন সে (হারাম) কাজগুলো করবে না। আর কতকগুলো (জিনিসের) সীমা নির্ধারন করে দিয়েছেন, সেগুলোর সীমালঙ্ঘন করবে না। আর কিছু বিষয়ে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই নীরব রয়েছেন, সে সকল বিষয়ে বিতর্ক-বাহাসে লিপ্ত হবে না। উপরের তিনটি হাদীসই দারাকুত্বনী বর্ণনা করেছেন। [১]