📄 ইমাম আবু হানিফা ؒ ও তার শিষ্যের গল্প
গ্য উত্তরসূরী কিংবা প্রতিনিধি রেখে যেতে কে না চায়? আলেম চান তার প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্য আলেম গড়ে যেতে, যিনি হবেন তার যোগ্য উত্তরসূরী। তেমনি পদার্থ, রসায়ন, কিংবা জীববিজ্ঞানীও চান, স্ব স্ব ক্ষেত্রে যোগ্য প্রতিনিধি তৈরি করে যেতে। এ ক্ষেত্রে সেই উত্তরসূরী কিংবা প্রতিনিধি যদি হন মেধাবী, সুযোগ্য, সচ্চরিত্রবান, দীনদার ও বিনম্র, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
ইমাম আবু হানিফা (৮০-১৫০ হি.)। বিশ্বসেরা ফকিহ। মুসলিম উম্মাহর গর্ব। সাহাবায়ে কেরামের সান্নিধ্য ধন্য মহান তাবেঈ। বিশ্বময় মানিত অবিসংবাদিত ইমাম। শাফেয়ি মাযহাবের প্রধান ইমাম শাফেয়ি তার সম্পর্কে বলেছিলেন-
'ফিকহের ক্ষেত্রে আমারা সবাই ইমাম আবু হানিফা-র পরিবারের অন্তর্ভূক্ত।'
আশ্চর্য প্রশ্ন!
ইমাম আবু হানিফা মসজিদে বসে দরস দিতেন। সেখানে উপস্থিত থাকত দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত ছাত্র। এদের মধ্যে দশ-বারো বছরের ছোট্ট একটি বালকও ছিল। সে মাঝে মাঝে দরসে হাজির হতো। সাধারণত কোনো প্রশ্ন করত না। তবে মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্ন করত, যা থেকে তার উন্নত মেধার পরিচয় মিলত।
প্রশ্নের ব্যাপারটা এমনই। কিছু প্রশ্ন ব্যক্তির মেধার আলো ছড়ায়। আর কিছু প্রশ্ন ব্যক্তির নির্বুদ্ধিতার পরিচয় বহন করে।
একবারের কথা। ইমাম আবু হানিফা দরস দিচ্ছেন। হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে দরসে বসল। তার চেহারায় ছিল ব্যক্তিত্বের ছাপ। গায়ে ছিল মূল্যবান পোশাক। পায়ে ব্যথা অনুভব করায় ইমাম আবু হানিফা তার পা দুটি ছড়িয়ে দিয়ে বসেছিলেন। লোকটিকে দেখে তার সম্মানে তিনি পা দুটি খানিকটা গুটিয়ে নিলেন। ইমাম আবু হানিফা লোকটিকে চিনতেন না। ভাবলেন লোকটি হয়তো আলেম হবেন।
দরস শেষে তিনি প্রতিদিনের মতো ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন- তোমাদের কারো কোনো প্রশ্ন আছে?
সেই লোকটি বলল, হুজুর, আমার একটা প্রশ্ন আছে।
জি বলুন, কি প্রশ্ন?
হুজুর, রমযান মাস এলে আমরা কী করব?
আমরা সওম রাখব।
আর হজের মওসুম এলে?
হজের মওসুম এলে আমরা হজ পালন করব।
যদি সওম ও হজ একসাথে আসে তাহলে আমরা কী করব?
এ প্রশ্ন শুনে আবু হানিফা মনে মনে বললেন, এখন আবু হানিফার পা প্রসারিত করার সময় হয়েছে। রমযান আর হজ একসাথে কী করে আসতে পারে? হজ ও রমযান দুটি দু মাসে হয়ে থাকে। ইমাম আবু হানিফা বুঝতে পারলেন, তিনি এর বহ্যিক গাম্ভীর্য দেখে অযথাই প্রয়োজনের অধিক সম্মান দেখিয়েছেন।
কিন্তু সেই বালকটি এমন ছিল না। তার প্রশ্নগুলো হতো অর্থবহ। তাৎপর্যপূর্ণ। বালকটির নাম ছিল আবু ইউসুফ। বালকটি ইমাম আবু হানিফা-র বিশেষ দৃষ্টিতে চলে এলো। কিন্তু তিনি দেখলেন, বালকটি প্রায়ই দরসে অনুপস্থিত থাকছে। একদিন তিনি তাকে দাঁড় করালেন। বললেন, বাবা, তুমি প্রায়ই দরসে অনুপস্থিত থাকো কেন?
বালকটি বলল, আমি খুবই গরিব ঘরের সন্তান। সংসারের খরচ যোগাতে আমাকে বাজারে কুলির কাজ করতে হয়।
আবু হানিফা বললেন, বাবা! তুমি ইলম অর্জন করো। আল্লাহ তাআলা তোমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন।
উস্তাদের উপদেশ মেনে বালকটি ইলম অর্জনে মনোযোগী হল। কিন্তু তার পিতা তার ইলম অর্জনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। তিনি মসজিদে এসে তাকে জোর করে সেখান থেকে নিয়ে যেতে চাইলেন। আবু হানিফা তার পিতাকে বললেন, আপনি কেন আপনার ছেলেকে ইলম শিখতে দিচ্ছেন না?
তিনি বললেন, হুজুর! আপনার রুটি প্রস্তুত। আমাদের কষ্ট আপনি কি বুঝবেন? আমরা গরিব মানুষ। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা নির্বাহ করি। সে কাজ করে আমাকে সহযোগিতা করে।
ইমাম আবু হানিফা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ছেলে প্রতিদিন কত টাকা উপার্জন করে?
সে প্রতিদিন দু দিরহাম উপার্জন করে।
বেশ, তাকে আমার কাছে রেখে যান। আমি তাকে প্রতিদিন দু দিরহাম দেব।
ইমাম আবু ইউসুফের পিতা এ শর্তে রাজি হল। আবু হানিফা তাকে বললেন, শুনে রাখুন, আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি আপনার সন্তানকে এমন ইলম শিক্ষা দেব, যদি সে তা আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে খলিফার সাথে দামি গালিচায় বসে বাদাম মিশ্রিত ফালুদা খাবে। (এটি তৎকালীন একটি মূল্যবান খাবার; যা সাধারণত ধনাঢ্য ব্যক্তিরা খেয়ে থাকতেন।)
আবু ইউসুফের পিতা অবজ্ঞার সুরে বললেন, আমার ছেলে খাবে বাদাম মিশ্রিত ফালুদা? সে বসবে খলিফার সাথে? হ্যাঁ।
সেদিন থেকে ইমাম আবু হানিফা বালক আবু ইউসুফকে প্রতিদিন দু দিরহাম করে দিতেন।
দেখতে দেখতে আবু ইউসুফ রহ. বড় হয়ে গেলেন। তিনি এখন অনেক ইলমে ঋদ্ধ। বুদ্ধিতে পরিপক্ক।
হঠাৎ একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে তার রোগ তীব্র থেকে তীব্রতর হল। প্রিয় শিষ্যকে দেখতে ইমাম আবু হানিফা তার বাড়ি গেলেন। দেখলেন তিনি খুবই অসুস্থ। একেবারে মুমূর্ষু অবস্থা। এমনকি শেষ অবস্থার ব্যক্তির মতো তাকে কিবলামুখী করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। প্রিয় ছাত্রের এ অবস্থা ইমাম সাহেবকে বিচলিত করে তুলল। তিনি তার জন্য দোআ করলেন। বললেন, আহা! আমি তো আশা করেছিলাম, আমার পর তুমিই উম্মাহকে পথ দেখাবে। এখন তো দেখছি আমার আগে তুমিই চলে যাচ্ছ।
তারপর ইমাম আবু হানিফা ফিরে এলেন। এর কিছুদিন পর ইমাম আবু ইউসুফ সুস্থ হয়ে ওঠলেন। তিনি তার নিজের ব্যাপারে আপন গুরু ইমাম আবু হানিফার সুউচ্চ মন্তব্যটি শুনেছিলেন। তাই তিনি মনে করলেন গুরুর কাছে আমার শিক্ষা অনেকটাই পূর্ণতা পেয়েছে। এমন ভাবনা থেকেই তিনি ভিন্ন একটি জায়গায় নিজেই ছাত্রদের পাঠদান শুরু করলেন। কিছুদিন পর ইমাম আবু হানিফা জানতে পারলেন প্রিয় শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ ভিন্ন একটি জায়গায় স্বতন্ত্র দরস বা শিক্ষাদান করছেন। তখন তিনি প্রিয় ছাত্রকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন দিয়ে এক ব্যক্তিকে তার কাছে পাঠালেন। এ প্রশ্ন ও উত্তর থেকেই ইমাম আবু হানিফা এর সুক্ষ্মদর্শিতার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, আবু ইউসুফকে জিজ্ঞেস করবে, এক ব্যক্তি একটি জামা কিনল। জামাটি তার একটু বড় হতো। তাই তিনি জামাটি ছোট করে দেয়ার জন্য এক দর্জির কাছে দিলেন। ঘটনাক্রমে জামাটি দর্জির পছন্দ হয়ে গেল। কিছুদিন পর দিন পর তিনি জামা আনতে গেলেন। দর্জি অস্বীকার করে বলল আপনি আমাকে কোন জামা দেননি। তখন জামার মালিক পুলিশের শরণাপন্ন হয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানালেন। পুলিশ দর্জির দোকানে অভিযান চালিয়ে জামাটি উদ্ধার করল। এবং তা প্রকৃত মালিককে ফেরত দিল। তারপর দর্জিটি জামার মালিককে বলল, তোমার জামা তো আমি ছোট করেছি। হয়তো তোমাকে যথাসময়ে দিইনি। কিন্তু ছোট তো করেছি। এখন আমার মজুরি দাও। এখন প্রশ্ন হল, এ দর্জি কি জামা ছোট করার মজুরি পাবে?
ইমাম আবু হানিফা ওই ব্যক্তিকে বলে দিলেন, যদি আবু ইউসুফ (কোনো ব্যখ্যা ছাড়া) বলে, হ্যাঁ। তাহলে বলবে, আপনার উত্তর হয়নি। আর যদি (কোনো ব্যখ্যা ছাড়া) বলে, না। তাহলেও বলবে আপনার উত্তর হয়নি।
লোকটি যথারীতি ইমাম আবু ইউসুফের কাছে গিয়ে হুবহু প্রশ্নটি করল। তিনি বললেন, হ্যাঁ., পাবে। লোকটি বলল, আপনার জবাব হয়নি। এবার তিনি বললেন, না পাবে না। লোকটি বলল, আপনার জবাব হয়নি।
আবু ইউসুফ ধরে ফেললেন, এটি অবশ্যই তার গুরুর কাজ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইমাম আবু হানিফা-র কাছে গেলেন। বললেন, আমার ব্যাপারে আপরনার সুউচ্চ মন্তব্যের কারণেই আমি স্বতন্ত্রভাবে দরস শুরু করেছি। এখন আপনিই বলে দিন প্রশ্নটির সমাধান। আমি অপারগ।
ইমাম আবু হানিফা বললেন, আলোচ্য ক্ষেত্রে দেখতে হবে দর্জি জামাটি ছোট করে কার মাপে কেটেছে? যদি সে তার নিজের মাপে কেটে থাকে তাহলে সে কোনো পারিশ্রমিক পাবে না। আর যদি জামার মালিকের মাপে কেটে থাকে তাহলে পারিশ্রমিক পাবে।
আবু ইউসুফ মাসআলাটির সমাধান পেলেন। এরপর থেকে ইমাম আবু হানিফা -র মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তার দরসে বসতেন। পরবর্তীতে তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন。
📄 উস্তাদের কথাই সত্য হল
একদিনের কথা। আবু ইউসুফ খলিফার দরবারে বসা। চারিদিকে সম্মানী লোকদের উপস্থিতি। খলিফা অনচর ও সেবক বেষ্টিত অবস্থায় তার নির্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট। উপস্থিত লোকদের মাঝে বিচারক ও আলেমগণও রয়েছেন। সবাই খলিফার অনুগ্রহ প্রার্থী। আবু ইউসুফ তখন প্রধান বিচারক। সকলের জন্য খাবার আনা হল। খলিফার জন্য আনা হল বিশেষ খাবার- বাদাম মিশ্রিত ফালুদা। খলিফার সামনে সেটি রাখা হলে তিনি সেবককে বললেন, প্রথমে শায়খকে দাও।
সেবদ বাদাম মিশ্রিত ফালুদার পেয়ালাটি আবু ইউসুফ -র সামনে রাখল। তিনি তার সামনে এই বিশেষ খাবারটি দেখে হাসতে লাগলেন। খলিফা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার শায়খ, আপনি হাসছেন কেন?
আবু ইউসুফ বললেন, আল্লাহর কসম করে বলছি, আমার এ হাসির কারণ অন্যকিছু নয়। আসলে আমার একটা কথা মনে পড়ে গেছে। আমার শায়খ ইমাম আবু হানিফা আমার পিতাকে বলেছিলেন, আমি আপনার ছেলেকে এমন ইলম শিক্ষা দেবো, যদি সে তা আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে খলিফার সাথে দামি গালিচায় বসে বাদাম মিশ্রিত ফালুদা খাবে। আমার পিতার তখন সে কথা বিশ্বাস হয়নি। আজ আমি দেখতে পাচ্ছি, সত্যিই আল্লাহ দ্বারা আমার মর্যাদা কত উঁচু করেছেন। আমি আজ খলিফার সাথে দামি গালিচায় বসে সম্মানী লোকদের সাথে বসে বাদাম মিশ্রিত ফালুদা খাচ্ছি। সত্যিই, আল্লাহ ঈমানদার ও আলেমদের মর্যাদা সুউচ্চ করে দেন。
📄 চলো ঘুরে আসি আন্দালুস থেকে
'লো আন্দালুস থেকে ঘুরে আসি কিছুক্ষণ। কল্পনায় চলে যাই হাজার বছর আগের প্রাচীন শহরে। সেখান থেকে মক্কা হয়ে যাব বাগদাদে। আন্দালুসে দেখব ঘরে ঘরে চলছে ইলমের চর্চা। মসজিদগুলোর এখানে ওখানে বসেছে ইলমের মজলিশ। আলোর ফেরিওয়ালা আলেমগণ ব্যস্ত পাঠদানে। ছাত্ররা কিতাব হাতে ছুটোছুটি করছে। তারা ব্যস্ত ইলম অন্বেষণে।
তারপর যখন মক্কায় পৌঁছব, দেখব সেখানে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা হাজিগণ জড়ো হয়েছেন। তারা ভক্তিভরে উচ্চঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করছেন- লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক। লা শারীকা লাকা।
এখন যে গল্পটি বলব সেটি এক ইলম অন্বেষীর। ইলমের জন্য নিবেদিত প্রাণ এক মহামানবের। নাম তার নাকি ইবনে মাখলাদ। তৎকালিন শ্রেষ্ঠ আলেম Imam আহমদ ইবনে হাম্বল -র সান্নিধ্য লাভের জন্য তিনি আন্দালুস থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা হয়ে মক্কায় পৌঁছেন। সেখান থেকে নিরাশ হয়ে চলে যান বাগদাদে। সেখানে গিয়ে শোনেন, Imam আহমদ রহ. কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত রয়েছেন।
কোরআন আল্লাহ -র কালাম। এটি তাঁর সিফাত তথা গুণ। এটি সৃষ্ট নয়- একথার প্রবক্তা তিনি। এই অপরাধে খলিফার মুতাসিম বিল্লাহ তাঁকে কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছেন।
পুরো ঘটনাটি খুলে বলি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন-
وَ إِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلِمَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ
আর মোশরেকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে। এটি এজন্যে যে, এরা জ্ঞান রাখে না। [সুরা তাওবা: ৬]
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا
আর আল্লাহ মুসার সাথে সরাসরি কথোপকথন করেছেন। [সূরা নিসা: ১৬৪]
তাই কোরআন যে আল্লাহ -র কালাম সেটি প্রমাণিত সত্য। এটি তিনি আমাদের নবীজির মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। কিন্তু কিছু লোক একথা মানতে চায় না। তাদের মতে আল্লাহ -র অন্যান্য সৃষ্টির মতো কোরআনও একটি সৃষ্টি। Imam আহমদ -র অভিমত এর বিপরীত। তার মতে কোরআন সাধারণ সৃষ্টি মত সৃষ্টি নয়। কোরআন হল আল্লাহ -র কালাম। তাঁর সিফাত তথা গুণ। তাই তাঁর অন্যান্য গুণাবলির মতো এটিও অনাদি, অবিনশ্বর।
তার এই অভিমত খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর কানে পৌঁছল। আহমদ ইবনে আবি দুআদ নামে খলিফার এক দুষ্ট মন্ত্রী ছিল। Imam আহমদ -র এই মতবাদ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত- বলে সে খলিফাকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলল। ফলে খলিফা Imam আহমদ -কে ডেকে এনে তার ওপর অত্যাচার শুরু করল। তাকে কারাগারে বন্দি করে রাখল। প্রতিদিন সে ইমামকে তার এই মতবাদ থেকে ফিরে আসার জন্য নিপীড়ন করতে লাগল।
আল্লাহ ক্ষমা করুন, নিপীড়নের ধরণ এমন ছিল যে, খলিফা মুতাসিম প্রতিদিন জল্লাদ নিয়ে জেলখানায় যেত। জল্লাদকে বলত, তাকে যে চাবুক দিয়ে মারবে সেটি আমাকে দেখাও। জল্লাদ দেখাতো। খলিফা সেটির প্রহার ক্ষমতা পরীক্ষা করে নিত। যথাযথ মজবুত হলে তা জল্লাদের হাতে তুলে দিয়ে Imam আহমদ -কে প্রহার করতে বলত। জল্লাদ প্রহার করতে থাকত। খলিফা জল্লাদকে ধমক দিয়ে বলত, আল্লাহ তোমার হাতকে বিচ্ছিন্ন করুন, আরো জোরে প্রহার করো। এভাবেই সে জগদ্বিখ্যাত আলেম, বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ Imam আহমদ -র ওপর অত্যাচার চালাতে লাগল।
দু বছর চার মাস পর Imamর আহমদ জেল হতে মুক্তি পেলেন। তাকে যে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল তা ছিল নিতান্ত সংকীর্ণ ও পুরনো। সেখানে ছিল না কোনো খাদেম। ছিল না প্রাকৃতিক কার্যাদি সম্পন্ন করার উত্তম কোনো ব্যবস্থা। এমনকি ছিল না বাতাস চলাচলের জন্য বড় কোনো জানালাও।
এতো কষ্টের পরও তিনি তার মতের ওপর অবিচল ছিলেন। অতঃপর যখন খলিফা বুঝতে পারল, Imam আহমদ -কে তার মত থেকে সরানো সম্ভব নয়, তখন বাধ্য হয়ে তাকে মুক্ত করে দিল। কিন্তু তার ব্যাপারে কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল-
১. তিনি কোথাও দরস দিতে পারবেন না।
২. সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে পারবেন না।
৩. কোনো সভা সেমিনার বক্তৃতা দিতে পারবেন না।
৪. তার সাথে কেউ সাক্ষাত করতে পারব না।
৫. যে তার সাথে সাক্ষাত করবে তাকে বন্দি করা হবে।
তাই ঘরের চার দেয়ালের মাঝেই Imam আহমদ ইবনে হাম্বল -র জীবন কাটতে লাগল। এদিকে নাকি বিন মাখদলদ আন্দালুস থেকে রওয়ানা হলেন। অতঃপর মক্কা হয়ে বাগদাদ পৌঁছলেন। এ দীর্ঘ পথ তিনি পায়ে হেঁটে পাড়ি দিলেন। কারণ, বাহন কেনার সামর্থ্য তার ছিল না। বাগদাদে পৌঁছে তিনি একজনের কাছে আহমদ ইবনে হাম্বল -র ঠিকানা জানতে চাইলেন। লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করল, তার কাছে তোমার কী প্রয়োজন?
তিনি বললেন, আমি তার কাছ থেকে ইলম শিখতে চাই।
লোকটি বলল, তিনি তো তোমাকে ইলম শেখাতে পারবে না। তিনি গৃহবন্দি হয়ে আছেন।
লোকটির কথা শুনে একরাশ হতাশা তাকে জেঁকে ধরল। কিংতর্বব্যবিমুঢ় হয়ে তিনি এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে এক মসজিদে এসে পৌঁছলেন। দেখলেন, সেখানে বিখ্যাত আলেম ইয়াহইয়া বিন মঈন দরস দিচ্ছেন। তিনি তার কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বললেন, হুজুর, আমি আন্দালুস থেকে এসেছি। আমার কিছু প্রশ্ন ছিল।
ইয়াহইয়া বিন মঈন বললেন, বলুন, কি প্রশ্ন আপনার।
অমুক বর্ণনাকারী সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
তিনি বিশ্বস্ত ব্যাক্তি। তবে খুব বেশি ভুলে যান। তাই তার বর্ণিত হাদিসের ওপর নির্ভর করা যায় না।
অমুক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
তিনি সত্যবাদী এবং খুবই বিশ্বস্ত।
এসময় দরসে উপস্থিত ছাত্ররা তাকে বলল, অনুগ্রহ করে জলদি করুন।
নাকি বিন মাখলাদ ওঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, আরেকজন ব্যক্তি সম্পর্কে আমার জানার ছিল?
কে সে?
আহমদ ইবনে হাম্বল।
ইয়াহইয়া বিন মঈন তাকে ধমক দিয়ে বললেন, আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে মতামত দেয়ার কোনো যোগ্যতা আমার নেই। বরং আমার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে আহমদ বিন হাম্বলের নিকট প্রশ্ন করা যেতে পারে। আহমদ বিন হাম্বলের সামনে আমি নিতান্ত তুচ্ছ ও নগণ্য। তিনি যদি আমার ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করেন তাহলে আমি ধন্য।
নাকি বিন মাখলাদ সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা Imam আহমদ-র বাড়ি চলে গেলেন। দরজার কড়া নাড়তেই আহমদ দরজা খুললেন। নাকি বিন মাখলাদ বললেন, আমি ইলম শেখার জন্য আপনার কাছে এসেছি।
আহমদ বললেন, সম্ভবত আপনি আমার ব্যাপারে সবকিছু শুনেছেন।
জি, শুনেছি।
কিন্তু হুজুর, আমি অনেক দূর থেকে এসেছি।
আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
আন্দালুস থেকে।
আমহদ বিন হাম্বল বললেন, আল্লাহর কসম, আপনার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আপনি তো জেনেছেন আমি কী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এ অবস্থায় আমি আপনাকে কীভাবে শেখাব?
নাকি বিন মাখলাদ অনেক পীড়াপীড়ি করলেন। অবশেষে Imam আহমদ রাজি হলেন। কিন্তু তিনি জানতে খলিফা তার গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে অবশ্যই তার চারপাশে গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে। তাই তিনি তাকে একটি শর্ত দিলেন। বললেন, আপনাকে প্রতিদিন ভিক্ষুকের বেশ ধরে এখানে আসতে হবে। আপনি দরজায় এসে ভিক্ষা চাই, ভিক্ষা চাই বলে আওয়াজ দিলে আমি দরজা খুলব। আপনার জন্য খাবার তৈরি করব এবং সেই ফাঁকে আপনার কাছে হাদিস বর্ণনা করব। পাশাপাশি আপনি অন্য কোনো ইলমের মজলিসে অংশগ্রহণ করবেন না।
নাকি বিন মাখলাদের সামনে আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে ইলম অর্জন করার এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তাই প্রতিদিন ভিক্ষুকের পোশাক, লাঠি ও থলে নিয়ে ভিক্ষাচাওয়ার ভান করে Imam আহমদ বিন হাম্বল-র ঘরের দরজায় আওয়াজ দিতেন- আমাকে কিছু ভিক্ষা দিন। আমাকে সাহায্য করুন। আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করবেন।
Imam আহমদ ঘর থেকে বের হয়ে তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতেন। তার কাছে হাদিস বর্ণনা করতেন। প্রতিদিন তিনি তার কাছে চার পাঁচটি হাদিস বর্ণনা করতেন। নাকি বিন মাখলাদ রহ. সেগুলো মুখস্ত করে ঘর থেকে বের হয়ে যেতেন। এভাবে সময় বয়ে চলল।
কিছুদিন পর খলিফা আহমদ বিন হাম্বল -র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল। এমনকি তার জন্য কিছু হাদিয়াও পাঠাল। আহমদ বিন হাম্বল তা গ্রহণ করলেন না। তার কোনো এক সন্তান তা গ্রহণ করল। Imam আহমদ আবার আগের মতো মসজিদে দরস দিতে শুরু করলেন। নাকি বিন মাखলাদ অন্যান্য ছাত্রদের সাথে সেই দরসে উপস্থিত হতে লাগলেন। আহমদ তাকে কাছে কাছে রাখতেন। কারণ ইলম অর্জনের প্রতি তার আগ্রহ ও ভালোবাসার কথা তিনি জানতেন。
📄 ইলমের বরকত...
নাকি বিন মাখলাদ একবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আহমদ বিন হাম্বল তাকে দরসে উপস্থিত না দেখে তাকে দেখতে গেলেন। তিনি এক বাসায় ভাড়া থাকতেন। নাকি বিন মাখলাদের নিজের বর্ণনা। তিনি বলেন, একদিন আমি ঘরের বাইরে লোক সমাগমের আওয়াজ শুনলাম। কেউ একজন বলছিলেন, জি, তিনি এখানে আছেন। আসুন, আপনারা ভেতরে আসুন। আমি কামরার ভেতর থেকে বুঝতে পারছিলাম না, তারা কার সম্পর্কে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর দেখি Imam আহমদ বিন হাম্বল। তিনি নিজে এসেছেন আমাকে দেখতে। তার সাথে রয়েছে ছাত্রদের বিশাল এক জামাত। তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। ছাত্ররা এ দৃশ্য দেখছিল আর রাসুল -র সুন্নত শিখছিল।
তিনি আমাকে বললেন, ধৈর্য ধরো, আল্লাহর নিকট সাওয়াবের প্রত্যাশা করো। পীড়ার সময় সুস্থতা নেই। আশা করছি, আল্লাহ তোমার সাওয়াব বাড়িয়ে দেবেন।
তিনি চলে যাবার পর বাসার মালিক এসে বলল, Imam আহমদের সাথে আপনার কি সম্পর্ক?
আমি বললাম, আমি তার ছাত্র। তিনি আমাকে মুহাব্বত করেন।
মালিক বলল, আজ থেকে আপনি বিনা ভাড়ায় এখানে থাকবেন।
নাকি বিন মাখলাদ বলেন, এরপর থেকে সেখানে আমার কদর বেড়ে গেল। বাড়ির মালিক আমার দিকে খুব খেয়াল করতে লাগল। এমনকি আমার মনে হতে লাগল যে, হয়তো নিজের বাড়িতেও আমি এতোটা নিরাপদ ও সুবিধা পেতাম না। আল্লাহর কসম, এসবই ছিল Imam আহমদ বিন হাম্বল -র আগমনের বরকত。