📄 ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. এর বক্তব্য
আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বিখ্যাত ইমাম হলেন ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী রহ.। সালাফে-সালেহীনের আকিদা-বিশ্বাস সংকলন ও ভ্রান্ত আকিদা খন্ডনে তাঁর অমর কীর্তি আজও অম্লান। মুসলিম বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান আকিদার ক্ষেত্রে এই মহান ইমামের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকে গ্রহণ করেছেন। প্রায় সমস্ত হানাফী এই ইমামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণ করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করে থাকেন। কুরআন-হাদীস থেকে গৃহীত আকিদা-বিশ্বাস অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ও সাবলীল ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপনের কারণে আজ তিনি কোটি মুসলমানের মহান ইমাম। মৌলিক দিক থেকে আশআরী ও মাতুরিদি আকিদা এক ও অভিন্ন হওয়াই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ইসলামী আকিদা বিশ্লেষণে ইমাম মাতুরিদীর অবস্থানের সাথে সহীহ আকিদার সমস্ত মুসলিম একমত পোষণ করেছে। হাজার বছর ধরে এই আকিদা-বিশ্বাস লালন করে সমস্ত বাতিল ফেরকা থেকে মুক্ত থেকে জান্নাতের পথ সুগম করেছে।
আকিদার উপর ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী রহ. এর অসংখ্য কিতাব রয়েছে। কিছু কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। অনেক কিতাব এখনও হস্তলিপিতে রয়েছে। ইমাম মাতুরিদী রহ. এর বিখ্যাত একটি কিতাব হলো, কিতাবুত তাউহীদ। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সঠিক আকিদা বর্ণনা ও বাতিল ফেরকার দাঁতভাঙা জবাব প্রদানে এটি অদ্বিতীয় একটি কিতাব। ইসলামি আকিদার পাশাপাশি ইমাম মাতুরিদী রহ. ফিকহ ও তাফসীর শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। বৃহৎ কলেবরের বিখ্যাত তাফসীর লিখেছেন। তা'বিলাতু আহলিস সুন্নাহ। তুরষ্ক থেকে এটি ১৮ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
ইমাম মাতুরিদি রহ. তার অবিস্মরণীয় গ্রন্থ কিতাবুত তাউহীদ -এ লিখেছেন, “আল্লাহর অবস্থানের ক্ষেত্রে মুসলমানদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
১. তাদের কেউ কেউ ধারণা করছে যে, আল্লাহ তায়ালা আরশে স্থিতি গ্রহণ করেছেন। তাদের নিকট আরশ হলো একটি সিংহাসন। যেটি ফেরেশতাগণ বহন করে এবং এর চার দিকে প্রদক্ষিণ করে। কেননা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, "সেদিন আপনার প্রভূর আরশকে আটজন ফেরেশতা বহন করবে”।— (সূরা হাক্কা, আয়াত-১৭)। অপর আয়াতে রয়েছে, [অর্থ:] আপনি ফেরেশতাদেরকে আরশ প্রদক্ষিণ করতে দেখবেন।— (সূরা-ঝুমার, আয়াত-৭৫)। অন্য আয়াতে রয়েছে, যে সকল ফেরেশতা আরশ বহন করে এবং আরশের চার পাশে প্রদক্ষিণ করে.... (সূরা মু'মিন, আয়াত-৭)। এরা পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বাহার পাঁচ নং আয়াতে রয়েছে, "দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর ইস্তাওয়া করেছেন"। এছাড়া তাদের দলিল হলো, মানুষ দুয়ার সময় উপরের দিকে হাত উত্তোলন করে এবং উপর থেকে নিজেদের কল্যাণের আশা রাখে। এদের বক্তব্য হলো, আল্লাহ তায়ালা পূর্বে আরশে ছিলেন না, পরবর্তীতে আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কেননা, আল্লহা তায়ালা বলেছেন, “অত:পর তিনি আরশে ইস্তাওয়া করলেন” (সূরা আ'রাফ, আয়াত নং ৫৪)।
২. কেউ কেউ বিশ্বাস করে, আল্লাহ তায়ালা সব জায়গায় রয়েছেন। এরা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত দ্বারা দলিল দিয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, "তিন ব্যক্তি যদি কথোপকথন করে, তবে আল্লাহ তায়ালা হলেন চতুর্থজন”। (সূরা মুজাদালা, আয়াত নং ৭)। অপর আয়াতে রয়েছে, "আমি তাদের ঘাড়ের রগের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী”। (সূরা ক্বাফ, আয়াত নং ১৬)। অন্য আয়াতে রয়েছে, "আমি তোমাদের চেয়ে মৃত ব্যক্তির অধিক নিকটবর্তী। অথচ তোমরা দেখো না"। (সূরা ওয়াক্বিয়া, আয়াত নং ৮৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, [অর্থ], তিনি সেই মহান আল্লাহ, যিনি আসমানেও প্রভু, জমিনেও প্রভূ (সূরা জুখরুফ, আয়াত নং ৮৪)। এরা ধারণা করেছে যে, যদি আল্লাহ তায়ালাকে সব জায়গায় বিরাজমান না বলা হয়, তাহলে এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালাকে সীমিত করা হয়। প্রত্যেক সীমিত জিনিস তার চেয়ে বড় জিনিস থেকে ছোট। এটি আল্লাহর জন্য একটি ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত। এদের এই অসার বক্তব্যে আল্লাহ তায়ালাকে স্থানের মুখাপেক্ষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সেই সাথে আল্লাহর জন্য সীমা সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা, কোন কিছু যদি বাস্তবে কোন স্থানে অবস্থান করে, তাহলে উক্ত বস্তুটির ঐ স্থান থেকে বড় হওয়াটা সম্ভব নয়। কেননা, এটি যদি স্থান থেকে বড় হয়, তাহলে উক্ত স্থানে তার অবস্থান সম্ভব নয়। কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকবে, অথচ সে স্থান থেকে বড় হবে, এটি একটি হাস্যকর বিষয়। সুতরাং যারা আল্লাহ তায়ালাকে সব জায়গায় বলেন, তারাও আল্লাহ তায়ালাকে সব জায়গার মধ্যে সীমিত করে দিয়েছেন। এদের বক্তব্য অনুযায়ী মহাবিশ্বের সীমা ও আল্লাহর সীমা একই হওয়া আবশ্যক হয়। আর মহান আল্লাহ তায়ালা এধরনের ধ্যান-ধারণা থেকে মহাপবিত্র।
৩. তৃতীয় দলের বক্তব্য হলো, আল্লাহ তায়ালা সকল স্থান ও জায়গা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। রুপক অর্থে কখনও কোন স্থানের দিকে আল্লাহ তায়ালাকে সম্পৃক্ত করলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালা উক্ত স্থানের সংরক্ষণ ও লালন-পালনকারী।— [কিতাবুত তাউহীদ, ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. (মৃত:৩৩৩ হিজরী), পৃ. ১৩১, প্রকাশনী, মাকতাবাতুল ইরশাদ, ইস্তাম্বুল, প্রকাশকাল, ২০০১]
আহলে সুন্নতের বরেণ্য ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. পরবর্তীতে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাস স্পষ্টভাষায় তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, "আল্লাহ তায়ালার অবস্থানের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মূলনীতি হলো, যখন কোন স্থান ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালা ছিলেন। কোন জায়গার অস্তিত্ব না থাকলেও আল্লাহর অস্তিত্ব সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা অনাদি থেকে বিদ্যমান রয়েছেন। কোন সৃষ্টি বা স্থান যখন ছিলো না, তখনও আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব ছিলো। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা এখনও স্থান থেকে মুক্ত অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে। যেমন কোন স্থানের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও আজালী তথা অসীম থেকে ছিলেন। মহান আল্লাহর সত্ত্বা বা গুণাবলী পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজন, হ্রাস-বৃদ্ধি ও বিলুপ্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত”।— [কিতাবুত তাউহীদ, ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি রহ. (মৃত:৩৩৩ হিজরী), পৃ. ১৩২, প্রকাশনী, মাকতাবাতুল ইরশাদ, ইস্তাম্বুল, প্রকাশকাল, ২০০১]
এই আলোচনার পর ইমাম মাতুরিদি রহ. আহলে সুন্নতের বিরোধী আকিদা পোষণকারী উভয় দলের বক্তব্য খন্ডন করেছেন তার কিতাবুত তাউহীদে। যারা আল্লাহ তায়ালাকে আরশে বিশ্বাস করে এবং যারা আল্লাহর তায়ালাকে সব জায়গায় বিশ্বাস করে, উভয় দলের বক্তব্য তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় খন্ডন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। উলামায়ে কেরামের জন্য মাতুরিদি রহ. এর আলোচনাটি দলিল সমৃদ্ধ একটি সুপাঠ্য গবেষণা বলে মনে করি। আগ্রহী পাঠকগণ অবশ্যই ইমাম মাতুরিদি রহ: আলোচনাগুলি দেখে নিবেন।
📄 ইমাম গাজালী রহ. এর বক্তব্য
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী রহ. জাহাম ইবনে সাফওয়ানের বক্তব্য খন্ডন করতে গিয়ে বলেন,
ولا ترتبك في مواقع غلطه فمنه غلط من قال: إنه في كل مكان. وكل من نسبه إلى مكان أو جهة فقد زل فضل ورجع غاية نظره إلى التصرف في محسوسات البهائم ولم يجاوز الأجسام وعلائقها
অর্থ: তুমি জাহাম ইবনে সাফওয়ানের আকিদাগত ভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকো। কিছু লোকের ভ্রান্ত বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালা সব জায়গায় রয়েছেন। যারা আল্লাহ তায়ালাকে কোন জায়গা অথবা দিকের সাথে সম্পৃক্ত করেছে, তাদের পদস্খলন হয়েছে। তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। সে তার সমস্ত চিন্তাভাবনাকে জীব-জন্তুর ইন্দ্রিয় ক্ষমতার মধ্যেই কেন্দ্রীভূত করে রেখেছে। তার চিন্তাশক্তি দেহ ও দেহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গণ্ডি থেকেও মুক্ত হয়নি।— [আল-আরবায়ীন ফি উসুলীদ্দীন, পৃ. ১৯৮]