📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 ইহুদিদের সাথে নবীজি ﷺ-এর সন্ধিচুক্তি

📄 ইহুদিদের সাথে নবীজি ﷺ-এর সন্ধিচুক্তি


মদিনায় হিজরতের পরপরই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার ইহুদিদের সাথে সন্ধিচুক্তি করেন। (মানচিত্র নং-৫) তাঁর এই সন্ধিচুক্তি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে, তিনি অমুসলিমদের সাথে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতে চাইতেন এবং এটার প্রতিই তিনি আগ্রহী ছিলেন। উক্ত চুক্তিনামাতে লিখিত ধারাগুলো ছিল এমন:
এই অঞ্চলের লোকদের ওপর কেউ হামলা করলে তাদের বিরুদ্ধে অঞ্চলের সকলে পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে।
তারা একে অপরের কল্যাণ কামনা করবে, সততা বজায় রাখবে এবং অন্যায় এড়িয়ে যাবে。
কোনো ব্যক্তির হালিফের (চুক্তিবদ্ধ মিত্র) অপরাধ তার ওপর আরোপিত হবে না।
সকলে মিলে মজলুমকে সাহায্য করা হবে।
ইহুদিরা মুসলমানদের সাথে খরচ বহনে শরিকে হবে যতদিন তারা যুদ্ধে লিপ্ত থাকবে।
ইয়াছরিবের জমিন এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত লোকদের জন্য নিষিদ্ধ স্থান বলে বিবেচিত হবে (অর্থাৎ যুদ্ধ, গাছকাটা, প্রাণী শিকার ইত্যাদি)।
এই অঞ্চলের লোকদের মধ্যে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে কিংবা কোনো ঝগড়ার সৃষ্টি হয় এবং তার কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে সেটা ফয়সালা করার জন্য আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সমর্পণ করা হবে।
কুরাইশদের আশ্রয় দেওয়া যাবে না। এমনকি যারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে তাদেরও আশ্রয় দেওয়া যাবে না।
যারা ইয়াছরিবের ওপর আক্রমণ করতে আসবে, তাদের বিরুদ্ধে সকলে মিলে একে অপরকে সাহায্য করবে। প্রত্যেকের দায়িত্ব থাকবে ওই অংশ রক্ষা করার, যে অংশে তারা বসবাস করছে।
কোনো জালেম বা অপরাধীর জন্য এই সন্ধিপত্র তাকে বাঁচানোর কাজে আসবে না। [590]
এখানে যে বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করা প্রয়োজন সেটা হলো, এই চুক্তিনামার মধ্যে বনু কায়নুকা, বনু নাজির এবং বনু কুরায়জার ইহুদিদের কথা নেই। তবে সিরাতের ঘটনাবলিতে এটা প্রমাণিত যে, এই চুক্তিটা ছাড়াও তাদের সাথে আরও অনেক চুক্তি ও সন্ধি সম্পন্ন হয়েছিল।
এই চুক্তিনামা প্রমাণ করে, ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সূচনালগ্ন থেকেই তার নীতি-আদর্শ হলো, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা(৫৯১) প্রদান করা এবং যথাযথ মূল্যায়নের সাথে অন্যদের একত্রে মিলেমিশে বসবাস করার সুযোগ প্রদান করা। উল্লিখিত চুক্তির ধারাগুলোর প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে, ইসলামি রাষ্ট্র অমুসলিমদের স্বীকৃতি প্রদান করে এবং মুসলিম সমাজের সদস্যদের মাঝে সুশৃঙ্খলভাবে জীবনযাপন ও বসবাসের জন্য আইনকানুনও রচনা করে। তাদের যাবতীয় অধিকারও নিশ্চিত করে। কেউ তাদের ওপর জুলুম করতে চাইলে তাদের থেকে সেই জুলুম প্রতিহত করে।
খায়বার খাজরাজ মদিনা মুনাওয়ারা বনু কায়নুকা বনু নাজির বনু কুরাইজা আউস খুজাআ নজদ বনু সুলাইম
মানচিত্র নং-৫ ইহুদিদের সাথে রাসুল সা.-এর সন্ধিচুক্তি
ইহুদিদের পক্ষ থেকে বহু প্রতারণা, কষ্ট প্রদান ও অব্যাহত ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানগণ সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন এই চুক্তির নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য। যার ফলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ইহুদিদের জীবনযাপন ছিল পূর্ণ নিরাপদ। তখন মদিনার অভ্যন্তরে জীবনযাপনের এটা ছিল লক্ষণীয় এক বৈশিষ্ট্য। এর কল্যাণে তাদের মধ্যে ব্যাপকহারে ব্যাবসায়িক লেনদেন চলতে থাকে। মদিনায় অবস্থিত ইহুদিদের বাজারগুলো মুসলমান ক্রেতাদের মাধ্যমে ভরপুর হয়ে যেত। ইহুদিদের বাজারসমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল বনু কায়নুকার বাজার। সাধারণত ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদিত হয় এমন জাতির মাঝেই, যারা একে অপরকে বিশ্বাস করে। এ কারণে একজন মুসলিম নারীও নিজে নিজেই পণ্য ক্রয়ের জন্য ইহুদিদের বাজারে চলে যেত। এতে সে কোনো ধরনের জটিলতা অনুভব করত না। এতে প্রমাণিত হয় যে, তখন মুসলমানগণ ইহুদিদেরকে কী পরিমাণ বিশ্বাস করত। [592] তদ্রূপ উসমান ইবনে আফফান রা.-ও রুমা নামক কূপটি কিনেছিলেন এক ইহুদির কাছ থেকে। [593]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় বসবাসকারী মুসলমান-অমুসলমান সবার সাথেই মিশতেন। ওঠাবসা করতেন। সবার সাথেই কথাবার্তা বলতেন। তারাও তাঁর সাথে কথাবার্তা বলত। এ বিষয়ে তাঁর জীবনে যে ঘটনাগুলো পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো উরওয়া ইবনে যুবায়ের কর্তৃক বর্ণিত ঘটনা। তিনি বলেন, উসামা বিন যায়েদ রা. আমাকে বলেছেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাধায় আরোহণ করলেন। গাধার পিঠে ছিল একটি গদি। গদির নিচে ছিল ফাদাকি [594] একটি বস্ত্র। তিনি পেছনে উসামা বিন যায়েদ [595] রা.-কে তুলে নিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন খাজরাজ গোত্রের হারেস শাখাগোত্রের সাদ বিন উবাদা রা.-কে [596] দেখতে যাচ্ছিলেন। ঘটনাটি ছিল বদরযুদ্ধের আগে। চলতে চলতে তিনি একটি মজলিসের নিকট এসে পৌঁছলেন। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির লোক বসা ছিল-মুসলমান, মুশরিক এবং ইহুদি। সেই মজলিসে আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলও ছিল। ছিলেন আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা.। রাসুলের বাহনের খুরে উত্থিত কিছু ধুলাবালি মজলিসের দিকে উড়ে গেল। তখন আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল নিজের চাদর দিয়ে নাক ঢাকল। এরপর বলল, 'আমাদের ওপর তোমরা ধুলা ছিটিয়ো না।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে সালাম দিলেন। তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন। কুরআনুল কারিম থেকে কিছু তিলাওয়াত করে শোনালেন।
তখন আবদুল্লাহ বিন উবাই বলল, 'তুমি যা বললে, এগুলো যদি সত্য- সঠিকই হয়ে থাকে, তাহলে এর থেকে উত্তম কথা কিছু হতে পারে না। তবে তুমি আমাদের মজলিসে এসে আমাদেরকে কষ্ট দিয়ো না। তুমি তোমার গন্তব্যের দিকে যাও। আমাদের মধ্য থেকে যে তোমার কাছে যায়, তাকে তুমি তোমার এসব কথা শোনাও।'
তখন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. বলে উঠলেন, 'কখনো না, বরং হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাদের মজলিসে আসবেন। আমরা আপনার এ সকল কথা পছন্দ করি।'
ঘটনার এই পর্যায়ে মজলিসে উপস্থিত মুসলমান, মুশরিক ও ইহুদিদের মাঝে হট্টগোল বেধে গেল। এমনকি তারা একে অপরের ওপর চড়াও হওয়ার উপক্রম হলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হট্টগোল থামাতে লাগলেন (একপর্যায়ে তারা শান্ত হলো)।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গাধায় আরোহণ করে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিলেন। সাদ বিন উবাদাহ রা.-এর কাছে পৌঁছে তাকে বললেন, 'হে সাদ, তুমি কি শুনেছ আবু হুবাব কী বলেছে? (আবু হুবাব দ্বারা উদ্দেশ্য আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল) সে তো আমাকে এই এই বলল!'
সাদ রা. বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং তার কথাবার্তাগুলো এড়িয়ে চলুন! আল্লাহর কসম! আপনাকে তো আল্লাহ তাআলা যা প্রদান করার প্রদান করেছেন এবং মুসলমানদের নিকট আপনাকে যথাযথ সম্মান দান করেছেন। আর তার (আবদুল্লাহ বিন উবাই) এ প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণ হলো, এই অঞ্চলের লোকেরা একমত হয়েছিল যে, তারা তাকে নেতৃত্বের মুকুট পরাবে। নিজেদের নেতা বানাবে। কিন্তু আল্লাহ যখন সত্যের আগমন ঘটিয়ে সেটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, তখন সে ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ল। আর এ কারণেই সে আপনার সাথে এমন আচরণ করেছে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মাফ করে দিলেন। [597]
এটা ঠিক যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইতেন মদিনায় ইহুদিদের সাথে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করবেন। কিন্তু ইহুদিরা বারবার বিভিন্ন উসকানিমূলক কাজ করতে থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হৃদয়ের প্রশস্ততা দিয়ে এবং অসাধারণ কৌশলে এগুলো মোকাবিলা করতেন। আমরা ইহুদিদের সে সকল উসকানিমূলক কাজের কয়েকটি নমুনা এখানে তুলে ধরব। যথা:
সকল জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার ওপর ইহুদিদের বিভিন্ন অপবাদ আরোপ। এটা এমনই এক গর্হিত ও পীড়াদায়ক অপরাধ, যা সর্বোচ্চ শাস্তির উপযুক্ত করে। আর এটা শুধু তাদের ঈমানের দুর্বলতা কিংবা নিজেদের পরিজ্ঞাত সত্যধর্মকে অস্বীকারের কারণেই বরং এ ধরনের ধৃষ্টতামূলক আচরণের মাধ্যমে তারা মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের ভিত্তিমূলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে চাইত। এর মাধ্যমে তারা মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করত, তারা যেন তাদের অনুসরণীয় শরিয়তকে ছুড়ে ফেলে। এ ছিল মদিনার জন্য বড় ধরনের ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টির কারণ। আল্লাহ তাআলার বিষয়ে তাদের অবাঞ্ছিত কথাবার্তার একটি হলো, আল্লাহ তাআলাকে দরিদ্র বলা। তখন তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা নাখিল করেন,
لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ
আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলে, আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী। [সুরা আলে ইমরান : ১৮১) [598]
এ ছাড়া, তারা বিভিন্নভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট প্রদান করত। তারা পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু কামনা করত। অথচ বোঝাতে চাইত অন্যকিছু। এ কারণে তাদের কেউ কেউ বলত (السَّامُ عَلَيْكُمْ )অর্থাৎ তোমার মৃত্যু হোক)। اَلسَّامُ-অর্থ- মৃত্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জবাবে শুধু وَعَلَيْكُمْ )তোমাদের জন্যও অনুরূপ হোক) বলতেন। [599] বাড়তি কিছুই বলতেন না। বরং যে-সকল সাহাবি তাদের এই বদদোয়া শুনতেন, তাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিতেন, উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যেন কোমলতার পরিচয় দেয়। মুখ থেকে যেন কোনো কটু কথা বের না করে।
এ ছাড়া, তাদের আরও কিছু উসকানিমূলক কাজের নমুনা হলো, বিভিন্ন নবী-রাসুল ও কুরআনুল কারিমের ব্যাপারে মিথ্যারোপ করা। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু ইহুদিদের অবস্থা যদি শুধু এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলেও হয়তো তা সহ্য করা যেত, কোনোভাবে হয়তো তা মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তারা হঠকারিতার ক্ষেত্রে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহিষ্ণুতাকে তারা দুর্বলতা মনে করতে থাকে। যার ফলে তারা এমন সব অপকর্মে লিপ্ত হতে থাকে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো ছিল না। তাদের এসব কর্মকাণ্ড ছিল মদিনা চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এজন্য আর তাদেরকে ক্ষমা করা এবং তাদের এইসব কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করা সম্ভবপর ছিল না।
যেমন বনু কায়নুকা জঘন্যভাবে চুক্তি লঙ্ঘন করে। একবার এক মুসলিম মহিলার চেহারা খোলার ব্যাপারে প্ররোচিত করতে থাকে। তারা তার সতর প্রকাশ হয়ে পড়ার বিষয়ে ষড়যন্ত্রমূলক কৌশল অবলম্বন করে। আরেকবার তারা সম্মিলিতভাবে এক মুসলমানকে হত্যা করে। [600]
আর বনু নাজিরের ইহুদিরা চুক্তি ভঙ্গ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার সুস্পষ্ট ষড়যন্ত্র করে। [602]
অন্যদিকে বনু কুরায়জার ইহুদিরা আরও কঠিন ও ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা মদিনায় বসবাসকারী সকল মুসলমানকে হত্যা ও তাদেরকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার মতলব আঁটে। [602]
আর খায়বারের ইহুদিদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধিচুক্তি স্থাপিত হয় তাদের সাথে যুদ্ধ করার পর। তিনি তাদের সাথে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হন। তিনি ঠিক তখনই তাদের সঙ্গে যুদ্ধে নামেন, যখন তিনি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন, আবু রাফে নামে পরিচিত সাল্লাম ইবনে আবিল হুকাইক, কিনানা বিন রবি বিন আবিল হুকাইক এবং হুয়াই বিন আখতাব যারা মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র ধ্বংস করার এবং মদিনার ঘরবাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে, অর্থাৎ তারা খায়বারে এসে ঘাঁটি গাড়ে। এরা ছিল বনু নাজিরের নেতৃস্থানীয়। [603] মুসলমানদের ঘোরতর শত্রু। অপরাধের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদেরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। খায়বারে অবস্থানরত বনু নাজিরের ইহুদি, সেই সাথে খায়বারের স্থানীয় ইহুদি ও তাদের নেতারা মিলে বিভিন্ন গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করে। খায়বার ও বনু নাজিরের ইহুদিদের একটি দল মুসলমানদের অবরোধ করার উদ্দেশে মুশরিক দলগুলোকে একত্রিত করতে থাকে। পরিণামে ‘আহজাব যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে দশ হাজারের ও বেশি মুশরিক লড়াকু সৈন্যদলের এক বিশাল বাহিনী একত্রিত হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল মদিনা থেকে মুসলমানদেরকে উৎখাত করা। তবে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ওপর অনুগ্রহ করেন। তাদেরকে উক্ত যুদ্ধে বিশেষভাবে সাহায্য করেন। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ‘খায়বার’ মুসলমানদের ধ্বংসের ভয়ানক কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিতি পায়। ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধের কারণে তাদেরকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা এবং উচিত শিক্ষা দেওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে। সেই লক্ষ্যেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের সপ্তম বছরে তাদের সাথে লড়াইয়ের জন্য বের হন। অনেকগুলো লড়াই ও একের পর এক তাদের দুর্গগুলো অবরোধ করার একপর্যায়ে ইহুদিরা সন্ধির প্রস্তাব করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আলোচনায় বসতে চায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আবেদন গ্রহণ করেন।
ঘটনার সারসংক্ষেপ হলো, উভয়ের মাঝে এই মর্মে সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন হয় যে, তাদের এবং দুর্গে অবস্থানকারী সকল সৈনিক, সন্তানাদি ও মহিলাদের প্রাণ রক্ষা করা হবে। তারা ঘরবাড়ি, অস্ত্রশস্ত্র, সহায়সম্পত্তি, সোনা-রুপা সবকিছু রেখে খায়বার ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এই সন্ধিচুক্তিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'যদি কোনো ইহুদি কোনো কিছু গোপন করে, তাহলে তার এ অপরাধের কারণে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তাকে যে নিরাপত্তা দিয়েছেন তা রহিত হয়ে যাবে।'(604)
অর্থাৎ ইহুদিদের মধ্যে কেউ যদি কোনো সম্পদ, স্বর্ণ অথবা রুপা গোপন করে, তবে সেই প্রতারণার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করতে পারবেন।'(605)
ইহুদিরা এই সন্ধি মেনে নেয়। খায়বার থেকে তারা বের হতে শুরু করে। যদিও ইতিমধ্যেই তারা অনেক ধরনের মন্দকাজ করেছে, তারপরও এই সন্ধিচুক্তির কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সকলের প্রাণ রক্ষা করেন। কাউকেই তিনি হত্যা করেননি। তবে যার ব্যাপারে এই প্রতিশ্রুতির সুস্পষ্ট খেয়ানত প্রকাশ পেয়েছে, এমন দু-একজন ছাড়া। যেমন হয়েছিল কিনানা বিন আবিল হুকাইকের ক্ষেত্রে।(606)
চিন্তা করে দেখুন, এ সময় মুসলমানদের হাতে ক্ষমতা ছিল। খায়বার থেকে বের হয়ে যাওয়া ছাড়া ইহুদিদের সামনে দ্বিতীয় কোনো পথও ছিল না। তারপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যদের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে ইহুদিদের সেই অবাঞ্ছিত প্রস্তাবটিও মেনে নেন। সেটা এই যে, ইহুদিরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দাবি করল, তিনি যেন তাদেরকে এই অঞ্চলে চাষাবাদ করার সুযোগ প্রদান করেন, বিনিময়ে তারা অর্ধেক ফসল প্রদান করবে।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদেরকে খায়বারের ভূমি প্রদান করেছিলেন। শর্ত ছিল, তারা সেখানে চাষাবাদ করবে। বিনিময়ে সেখান থেকে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক তারা পাবে। [607]
এটা ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে খায়বারের ইহুদিদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ এবং এটা ছিল তাদের মরুভূমির অজানা অনিশ্চিত পথে বের হওয়া থেকে মুক্তির উপায়। কারণ, প্রথম চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, তাদেরকে বের করে দেওয়া হবে। চুক্তির পর স্বাভাবিক নিয়মেই খায়বারের ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের জীবনযাত্রা অতিবাহিত হচ্ছিল। পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে খায়বারের ইহুদিরা সেখানে তাদের কাজ ও জীবন চালিয়ে যাচ্ছিল। তখনকার এমন কোনো ঘটনা নেই যা প্রমাণ করতে পারে, মুসলমানগণ তাদের সাথে কোনো হঠকারিতামূলক আচরণ করেছে।
এমনই উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির সাথে এবং অপরের প্রতি এমনই সম্প্রীতির পরিচয় দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের সাথে সন্ধিচুক্তি বাস্তবায়িত করেছিলেন। কিন্তু তারা সে চুক্তি রক্ষা করেনি। এরপরও তারা বারবার চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

টিকাঃ
৫৯০. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫০৩, ৫০৪।
৫৯১ 'স্বাধীনতা' শব্দের বদলে এখানে 'ছাড়' শব্দ ব্যবহার যথোপযোগী।-সম্পাদক
৫৯২. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/৩১৪, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/৪৪১।
৫৯৩. ইয়াকুত হামাবি: মুজামুল বুলদান: ৩/১০৪।
৫৯৪. ‘ফাদাক’ মদিনার উত্তরাঞ্চলীয় একটি গ্রামের নাম। গদিটি সম্ভবত সেখানকার তৈরি ছিল, তাই একে ফাদাকি গদি বলা হয়েছে।
৫৯৫. পুরো নাম: উসামা বিন যায়েদ বিন হারেসা বিন শুরাহবিল কালবি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আজাদকৃত গোলাম যায়েদের পুত্র। তার ক্ষেত্রে বলা হতো, প্রিয়ের পুত্র প্রিয়। অর্থাৎ যায়েদ বিন হারেসা যেমন নবীর প্রিয় ছিলেন, তেমন উসামা বিন যায়েদও ছিলেন তার খুব প্রিয়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে রাসুল তাকে বড় বড় সাহাবির মধ্যে সেনাপতি নির্বাচন করেছিলেন। তিনি ৫৮ বা ৫৯ হিজরি সনে মদিনায় ইনতেকাল করেন। তিনি ফেতনা থেকে নিরাপদে ছিলেন। সূত্র: আল-ইসতিআব: ১/১ ৭০, উসদুল গাবাহ: ১/৯১, আল-ইসাবা: ৮৯।
৫৯৬. পুরো নাম: সাদ ইবনে উবাদা খাজরাজি আনসারি সায়িদি। তিনি ছিলেন বিজ্ঞ নেতা। আকাবার বাইআত এবং বদরযুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন আনসারদের অগ্রগামী, বদান্য ও সম্মানিত নেতা। নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন, যা ছিল তার জাতির মাঝে সর্বস্বীকৃত। তিনি ১৫ হিজরি সনে শামে ইনতেকাল করেন। দেখুন, আল-ইসতিআব: ২/১৬১, উসদুল গাবাহ: ২/২২১, আল-ইসাবা: ৩১৬৯।
৫৯৭. সহিহ বুখারি: ৪৫৬৬, ২৬৯১; সহিহ মুসলিম: ১৭৯৮, মুসনাদে আহমাদ: ২১৮১৫।
৫৯৮. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫৫৮, ৫৫৯; ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/২৮৫।
৬০০. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪৭, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/৬।
৬০২. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/২২০, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ৪/৩৭৩।
৬০০. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/৫১৩, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৩৪২।
৬০৪. বাইহাকি : দালায়িলুন নুবুওয়া: ৪/২০৪, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ : ৩/২৮৩।
৬০০. ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৪৭, ইবনুল কাইয়িম : জাদুল মাআদ : ৩/১২৯, ২৮৯-২৯০।
৬০০. এক ইহুদি এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবগত করে যে, কিনানা বিন আবিল হুকাইক সম্পদ গোপন করেছে। তখন তাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আনা হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি সম্পদ গোপন করেছ?' সে বলল, 'না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বললেন, 'চিন্তা করে বলো, আমরা যদি তোমার নিকট গোপন সম্পদ প্রাপ্ত হই, তবে কি তোমাকে হত্যা করতে পারব?' কিননা বলল, 'হ্যাঁ।' নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম তল্লাশির আদেশ দিলেন। সেখানে বিশাল ধনভান্ডার পাওয়া গেল। এভাবে মুসলমানদের সাথে প্রতারণার কারণে তাকে হত্যা করা হয়। সূত্র : ইবনে কাছির, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/৩৭৪, ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৩৬৬-৩৬৭।
৬০৭. সহিহ বুখারি: ২৫৭১, সহিহ মুসলিম: ১৫৫১।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 খ্রিষ্টানদের সাথে নবীজি ﷺ-এর চুক্তিসমূহ

📄 খ্রিষ্টানদের সাথে নবীজি ﷺ-এর চুক্তিসমূহ


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ দুই বছরে খ্রিষ্টানদের সাথে কয়েকটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। (মানচিত্র নং-৬) সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথে। নাজরানের খ্রিষ্টানরা চৌদ্দ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গঠন করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রেরণ করে। [608]
উক্ত প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিল 'আকেব' নামের এক ব্যক্তি। তবে তাদের মধ্যে আরেকজন ছিল দল পরিচালক। তারা তার উপাধি দিয়েছিল সাইয়েদ (নেতা)। এ ছাড়া তাদের ধর্মীয় বিষয়াবলির দায়িত্বে ছিল তৃতীয় আরেকজন। সে ছিল তাদের ধর্মযাজক বা পাদরি। তার নাম ছিল আবুল হারেস। উল্লিখিত এই তিনজনই ছিল উক্ত প্রতিনিধিদলের প্রধান ব্যক্তিবর্গ। দলের কোনো বিষয়ে প্রধানত তারাই পরস্পর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। [609]
ভূমধ্যসাগর শাম মরুভূমি আজরুহ জারবা (উকায়দির কিন্দি) দুমাতুল জান্দাল নুফুদ মরুভূমি আইলা দাহনা সুয়েজ উপসাগর লোহিত সাগর নজদ মিশর মদিনা মুনাওয়ারা খুজাআ
মানচিত্র নং-৬ খ্রিষ্টানদের সাথে রাসুল সা.-এর সন্ধিচুক্তি
আলোচনার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ইসলামগ্রহণের প্রস্তাব প্রদান করেন। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে বলল, তোমাদের পূর্ব থেকেই আমরা মুসলমান। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, তিনটি কারণে তোমরা মুসলমান নও। ১. ক্রুশের ইবাদত করা। ২. শূকরের গোশত খাওয়া। ৩. 'আল্লাহ তাআলার সন্তান আছে' এমন বিশ্বাস পোষণ করা। [610]
এই তিনটি বিষয়ে তোমরা ইনজিলের বাণী পরিবর্তন করেছ। এগুলোর ক্ষেত্রে তোমরা বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহ তাআলার কথা মেনে নিতে পারোনি। অতএব, এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কর্ম পরিহার না করে তোমরা নিজেদের 'মুসলমান' দাবি করতে পারো না।
এভাবে দীর্ঘ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাদের তর্কবিতর্ক চলতে থাকে। তারা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও আপত্তি উত্থাপন করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোর যথাযথ উত্তর প্রদান করেন। তাদের একটি প্রশ্ন ছিল এমন— ‘তোমাদের এ কেমন আচরণ যে তোমরা আমাদের নবীকে গালি দাও? (নবী বলতে তারা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে বুঝিয়েছে) আর বলো যে, সে আল্লাহর বান্দা?’
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘নিশ্চয় তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসুল এবং তাঁর কালিমা, যাকে আল্লাহ তাআলা প্রেরণ করেছিলেন কুমারী মারয়াম আলাইহাস সালামের নিকট।(611)
অতএব, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের দিকে ‘আল্লাহ তাআলার বান্দা’ কথাটি সম্বন্ধ করা তার মর্যাদা লাঘব করে না; বরং আরও বৃদ্ধি করে। তিনি ছিলেন দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ রাসুলদের অন্যতম। তা ছাড়া তিনি আল্লাহর কালিমা, যাকে আল্লাহ তাআলা প্রেরণ করেছিলেন মারয়াম আলাইহাস সালামের নিকট। আমরা মারয়াম আলাইহাস সালামকেও সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। তাকে সব ধরনের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত বলে বিশ্বাস করি। এ কারণে আমরা বলি, তিনি ছিলেন কুমারী সতী নারী মারয়াম।’
কিন্তু এতসব আলোচনার পরও নাজরানের প্রতিনিধিদল তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ত্যাগ করল না বরং হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে ‘মানুষ’ ও ‘আল্লাহর বান্দা’ বলাতে তারা ভীষণ রাগান্বিত হয়ে উঠল।
তারপর তারা বলে, ‘তুমি কি কখনো পিতা ছাড়া পুত্র দেখেছ? তুমি যদি তোমার দাবিতে সত্যবাদীই হয়ে থাকো, তাহলে আমাদেরকে তার দৃষ্টান্ত দেখাও।’
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে আমার কাছে বিশেষ কোনো বক্তব্য নেই। তাই তোমরা আমাদের এখানে অবস্থান করো। এ বিষয়ে আমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানানো হবে তাই তোমাদেরকে জানিয়ে দেবো। [612]
পরের দিন সকাল হলো। এর মাঝেই আল্লাহ তাআলা নবীজির ওপর নিচের এই আয়াতগুলো নাজিল করেন,
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُنْ مِنَ الْمُمْتَرِينَ فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ ﴾
আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মতো। আল্লাহ তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন। তারপর তাকে বলেন, হয়ে যাও। ফলে সে হয়ে যায়। সত্য সেটাই যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে। সুতরাং তুমি সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।
তোমার কাছে (হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের ঘটনা সম্পর্কে) যে প্রকৃত জ্ঞান এসেছে তারপরও যারা এ বিষয়ে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়, (তাদেরকে) বলে দাও, এসো, আমরা ডাকি আমাদের সন্তানদেরকে এবং তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে, আমরা আমাদের নারীদেরকে এবং তোমরা তোমাদের নারীদেরকে, আর আমাদের নিজ লোকদেরকে এবং তোমরা তোমাদের নিজ লোকদেরকে, এরপর আমরা সকলে মিলে (আল্লাহর সামনে) কাকুতিমিনতি করি এবং যারা মিথ্যাবাদী তাদের ওপর আল্লাহর লানত পাঠাই। [সুরা আলে ইমরান : ৫৯-৬১]
(সকালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদলকে এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনান) কিন্তু এই ধরনের 'মহাসত্য' বাণীও খ্রিষ্টানদের মনঃপূত হলো না। তাদের সাথে আলোচনার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে মুবাহালার প্রস্তাব পেশ করলেন। কিন্তু তাদের যেহেতু পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, তিনি আল্লাহ তাআলার একজন প্রেরিত রাসুল, তাই তারা উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরিশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এইসব হঠকারিতা ও দম্ভপূর্ণ আচরণ সত্ত্বেও কর দেওয়ার শর্তে তাদের সাথে সন্ধি করেন। যদিও তারাই ছিল সন্ধির প্রথম প্রস্তাবকারী ও অক্ষম দূর্বল এক সম্প্রদায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বড় সেনাদল পাঠাতে পারতেন। কিন্তু না, নবীজি সেদিকে না গিয়ে তাদের সাথে সন্ধি করেন। কারণ, নবীজি মুসলমানদের মাঝে ও কাছে-দূরের সকল শত্রু-সম্প্রদায়ের মাঝে শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত রচনা করতে চেয়েছিলেন।
এ উদ্দেশ্যে তিনি নাজরানের অধিবাসীদের জন্য একটি চুক্তিপত্র প্রেরণ করেন। পত্রটির ভাষ্য ছিল এমন :
পরম দয়ালু অসীম করুণাময় আল্লাহ তাআলার নামে শুরু করছি। নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে বিশপ আবুল হারেস ও নাজরানের অন্য পাদরিবর্গ, জ্যোতিষবর্গ এবং যাজকদের জন্য ও তাদের মালিকানায় থাকা ছোট-বড় সকল কিছুকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কোনো বিশপকে তার বিশপের পদ থেকে, কোনো যাজককে তার যাজকের পদ থেকে, কোনো জ্যোতিষকে তার জ্যোতিষের পদ থেকে পরিবর্তন করা হবে না। তাদের অধিকার, কর্তৃত্ব ও প্রতিপত্তি এবং তাদের পূর্ব পদ-পদবির কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটানো হবে না। যতদিন তারা শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলবে, অধীনস্থদের প্রতি কল্যাণকামী থাকবে, জুলুম করবে না, নির্যাতন-নিপীড়নে লিপ্ত হবে না, ততদিন তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিরাপত্তা বিদ্যমান থাকবে।(613)
বলার অপেক্ষা রাখে না, উক্ত চুক্তিপত্রে বেশ উদারতা ও ইনসাফের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর যখন নাজরানের প্রতিনিধিদল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দাবি করে, তিনি যেন কর আদায়ের জন্য তাদের সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি পাঠান, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই আমি তোমাদের সঙ্গে একজন পূর্ণ বিশ্বস্ত ব্যক্তি পাঠাব।
বিশ্বস্ততার এই মহান মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার জন্য সকল সাহাবিই চরম উৎসুকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এ সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ওঠো হে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ!' হজরত উবাইদা ইবনুল জাররাহ উঠে দাঁড়ালে নবীজি বললেন, 'এ হলো এই উম্মতের আমিন বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি।' [614]
এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত চুক্তিনামা প্রণয়ন করেছিলেন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের ইচ্ছা নিয়ে। আর তিনি কখনোই ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে কোনো চুক্তি করতেন না, যেমনটি করে থাকে অন্য অমুসলিম শক্তিধর জাতিগোষ্ঠীগুলো।
ফলে নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথে সম্পাদিত এই চুক্তি স্থায়িত্ব লাভ করে, কোনো পক্ষই তা ভঙ্গ করেনি। এই চুক্তির ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতেকাল পর্যন্ত নাজরান ও মদিনা মুনাওয়ারার মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো ও স্থিতিশীল থাকে।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধিচুক্তি স্থাপন করেছিলেন 'জারবা' ও 'আজরুহ'-এর খ্রিষ্টানদের সাথেও। তাদের উদ্দেশে লিখিত চিঠিতে নবীজির ভাষ্য ছিল এমন :
এটা নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে আজরুহবাসীদের উদ্দেশে প্রেরিত চিঠি। তারা (আজরুহবাসী) আল্লাহ ও মুহাম্মাদের নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হবে। চুক্তির শর্তানুসারে তারা প্রতি রজব মাসে পূর্ণ একশ দিনার প্রদান করবে। আর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন মুসলমানদের সাথে সদাচরণ ও কল্যাণকামনার। [615]
বিভিন্ন দুর্বল সম্প্রদায়, যাদের লোকসংখ্যা কম, কোনো দিক দিয়েই যারা মুসলমানদের মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়, এমন সম্প্রদায়গুলোকে নামমাত্র কর পরিশোধের বিনিময়ে নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরাট মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। মুসলমান-পরিবেষ্টিত সকল অধিবাসী এই নিরাপত্তা-চুক্তির মাধ্যমে নিরাপদে বসবাসের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছে।
আয়লা অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয় দুমাতুল জান্দালের খ্রিষ্টানদের ক্ষমা ও উত্তম আচরণের পর, তখন আয়লা ও তার আশপাশের এলাকার খিষ্টান বাদশাহ ইউহান্না বিন রুবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আগমন করেছিল। এ সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবুকের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন,
ইউহান্না বিন রুবা যেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসে, সেদিন আমি তাকে দেখেছি। তার গলায় ছিল স্বর্ণের তৈরি একটি ক্রুশ। মাথার সামনের অংশে ছিল চুলের ঝুঁটি। সে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, তখন সে মাথা দ্বারা ইশারা করল (সম্মানার্থে মাথা ঝুঁকালো এবং বুকের ওপর হাত রাখল)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে ইশারা করে বললেন, 'মাথা উত্তোলন করো।' সেই দিনই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং তাকে একটি ইয়ামেনি চাদর পরিধান করান। [616]
সম্ভবত ইউহান্নাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশ্য ছিল, সে যেন বুঝতে পারে তিনি প্রতিপক্ষের পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে সন্ধি করতে আগ্রহী। কারণ, লোকটি এসেছিল খ্রিষ্টধর্মের প্রতীক 'ক্রুশ' পরিধান করে। তারপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করেননি।
সম্ভবত এটাও উদ্দেশ্য ছিল, সে যেন বুঝতে পারে, রোমের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনকারী, বহু ক্ষমতার অধিকারী মুসলিমজাতির সাথে সন্ধি স্থাপন লাঞ্ছনাকর কোনো বিষয় নয়, বরং এই নির্ভেজাল সন্ধিটা হতে যাচ্ছে প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী এমন এক জাতির সাথে, যারা প্রতিপক্ষকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে জানে।
এই সন্ধিচুক্তির ভাষ্য ছিল এমন:
পরম দয়ালু অসীম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে ইউহান্না ইবনে রুবা ও আয়লাবাসীর জন্য প্রদত্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। তাদের জল ও স্থলের জাহাজ ও যানবাহনের জন্যও আল্লাহ ও নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। শাম, ইয়ামেন ও সমুদ্রদ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে থাকবে, তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। আর তাদের মধ্য থেকে কেউ কোনো অঘটন ঘটালে তার অর্থসম্পদ তাকে রক্ষা করতে পারবে না। যে ব্যক্তি এমন ব্যক্তির সম্পদ নিজ দখলে নিয়ে নেবে, সে ব্যক্তির সম্পদ তার জন্য হালাল হয়ে যাবে। তারা যেকোনো জলাশয় ব্যবহার করতে চাইবে এবং জল ও স্থলের যেকোনো পথে যাতায়াত করতে চাইবে, তাতে তাদেরকে বাধা দেওয়ার অবকাশ থাকবে না। [617]
এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, উক্ত চুক্তিনামাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জল-স্থলের জাহাজ ও যানবাহনেরও নিরাপত্তা প্রদান করেছেন। বলাবাহুল্য, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানগণই সর্বোত্তম এবং প্রতিশ্রুতি পালনে সর্বাধিক গুরুত্বারোপকারী।
আর সকলের জানা আছে, 'আয়লা' অঞ্চলটি লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। স্বাভাবিকভাবেই আয়লার সকল অধিবাসী কিংবা কমপক্ষে তাদের বড় একটা অংশ (সাগরে) মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। আর এদিকে মুসলমানগণ হাবশায় হিজরত করা ছাড়া এ যাবৎ কোনো সময়ই সমুদ্র ব্যবহার করেননি। সমুদ্র ছিলো তাদের কাছে প্রায় অপরিচিত। সমুদ্রযাত্রার ব্যাপারে তাদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতাও ছিল না। সুতরাং চুক্তিবদ্ধ আয়লার অধিবাসীদের জলে ও স্থলে নিরাপত্তা প্রদানের অর্থ হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ওপর ও অন্য মুসলমানগণের ওপর সমুদ্রে আয়লাবাসীদেরকে রক্ষার একটি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব চাপিয়ে নিলেন। কারণ, চুক্তি মোতাবেক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আবশ্যক হয়ে পড়ে।
একটি নৌবহর তৈরি করা এবং যখনই আয়লাবাসীর ওপর কোনো আক্রমণ আসবে, তখনই তাদের রক্ষার্থে উক্ত নৌবহর প্রেরণ করা। আর এর জন্য প্রয়োজন কঠোর শ্রম, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় এবং সেইসাথে নিজেদের ধনসম্পদও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। তবুও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবকিছু মেনে নিয়েছেন শুধু এই কারণে যে, মুসলমানগণ যেন চারপাশের সকল জাতি-গোষ্ঠীর সাথে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারেন।
আরও লক্ষণীয় যে, তারা যে-সকল জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহে ও ব্যবহারে অভ্যস্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সে সকল জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহের ও ব্যবহারের সুযোগ প্রদানের দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। অতএব 'মুসলমানগণ তাদেরকে বাধা দিতে পারবে না' কথা এখানেই শেষ নয়; উক্ত চুক্তির কারণে আবশ্যক হয়ে পড়ে, অন্য কেউ তাদেরকে সেখান থেকে বাধা দিতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানগণ লড়াই করবেন ও আয়লাবাসীর পানি ব্যবহারের পথ সুগম করবেন।
এটা বেশ কঠিন এবং বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব। তারপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানগণ তা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এই অঞ্চলের এমন এক সম্প্রদায়ের সাথে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে, যারা ইসলামকে মান্য করে না এবং ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তকেও স্বীকার করে না। এভাবেই, অন্যের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুহাব্বত, সম্মান ও মূল্যায়নের প্রেরণা সর্বত্র ছেয়ে গিয়েছিল। খ্রিষ্টানদের সাথে সম্পাদিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুক্তিসমূহে এটাই ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।

টিকাঃ
৬০৮. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩৫৭, ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৩/১১২।
৬০৯. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/১০৬, ১০৭; সুহাইলি: আর-রওজুল উনুফ: ৫/৫, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/২৮৯।
৬১০. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/১১৪, ইবনে সাইয়েদিন নাস: উয়ুনুল আছার: ১/৩৪৮।
৬১১. তাবারি: জামিউল বায়ান: ৩/২৯৩, জালালুদ্দিন সুয়তি আদ-দুররুল মানছুর: ২/২২৮।
৬১২. ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ: ৩/৫৪৯।
৬১৩. ইবনে কাছির : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা : ৪/১০৬, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৫/৫৫, ইবনুল কাইয়িম : জাদুল মাআদ : ৩/৫৪৯।
৬১৪. সহিহ বুখারি: ৩৭৪৪, সহিহ মুসলিম: ২৪১৯।
৬১৫. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/২৯০, ইবনে কাছির: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/৩০।
৬১৬. বাইহাকি: আস-সুনানুল কুবরা : ৯/১৮৫, সালেহি শামি: সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ: ৫/৪৬০।
৬১৭. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ২/৫২৫, ৫২৬; ইবনে সাইয়েদিন নাস : উয়ুনুল আছার: ২/২৫৮, ইবনুল কাইয়িম: জাদুল মাআদ: ৩/৪৬৬।

📘 উসওয়াতুল লিল আলামিন > 📄 মুশরিকদের সাথে নবীজি ﷺ-এর চুক্তিসমূহ

📄 মুশরিকদের সাথে নবীজি ﷺ-এর চুক্তিসমূহ


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের সাথেও কয়েকটি সন্ধিচুক্তি করেছিলেন। (মানচিত্র নং-৭) এই চুক্তির আওতায় মদিনার আশেপাশে বসবাসকারী মুশরিকরা যেমন ছিল, ছিল মক্কার প্রধান মুশরিকরাও।
জুহায়না বনু মুদলিজ ইয়ামবু মদিনা মুনাওয়ারা বনু জমরা লোহিত সাগর হুদাইবিয়ার সন্ধি হুদাইবিয়া نجد মক্কা মুকাররমা
মানচিত্র নং-৭ মুশরিকদের সাথে রাসুল সা.-এর সন্ধিচুক্তি
মদিনার আশপাশের মুশরিক গোত্রগুলোর সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহের মধ্যে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে বনু জমরার [618] সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কৃত সন্ধিচুক্তির কথা। সেই সময় তাদের নেতা ছিল মাখশি ইবনে আমর জমরি। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, [619] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে এই চুক্তিটি করেছিলেন হিজরি দ্বিতীয় সনের সফর মাসে। [620] অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় হিজরতের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে। এর দ্বারা বোঝা যায়, মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সহাবস্থানের এই নীতি-আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু মুদলিজের সাথেও সন্ধিচুক্তি করেছিলেন। তারা বসবাস করত 'ইয়ামবু' নামক অঞ্চলে। এই সন্ধিচুক্তিটাও সম্পাদিত হয় হিজরি দ্বিতীয় সনের জুমাদাল উলা মাসে। [621] এরপর চুক্তি করেন জুহায়না গোত্রের সাথে। তারা ছিল অনেক বড় একটি গোত্র। এ গোত্র বসবাস করত মদিনা মুনাওয়ারার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে। [622]
এভাবেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা চেষ্টা করেছেন মুসলমানগণ যেন আশপাশের গোত্র ও সম্প্রদায়ের সাথে সব সময় শান্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারে। তিনি কখনোই কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাননি। তিনি সব সময়ই যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধিকে এবং বিরোধের পরিবর্তে ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন।
এর বহু পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ষষ্ঠ হিজরির শেষ দিকে মক্কার কুরাইশদের সাথে হুদাইবিয়াতে সন্ধি করেন। [623] অথচ সকলের জানা, এই সন্ধিচুক্তির আগে তিনি কুরাইশদের পক্ষ থেকে দীর্ঘ উনিশটি বছর অনেকপ্রকার অত্যাচার সহ্য করেছেন। তিনি নিজে এবং তাঁর সাহাবিগণ মুশরিকদের বিভিন্নরকম জুলুম, নির্যাতন ও সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। এতকিছুর পরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের সাথে সম্পাদিত হুদাইবিয়ার এই সন্ধিচুক্তিকে পূর্ণতাদানের প্রতি ছিলেন পূর্ণ আগ্রহী। এর দ্বারাই বোঝা যায় তিনি শত্রুদের সাথে আচার-আচরণে ছিলেন কতটা নমনীয় এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির প্রতি কতটা আগ্রহী!
আমরা দেখতে পাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের এসব হঠকারিতা ও নির্যাতনের মুখোমুখি সত্ত্বেও স্বপ্নে দেখা 'ওমরা'-র কার্যাবলি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণভাবে মুশরিকদের আবাসভূমি মক্কাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু এবারও যখন তারা হঠকারিতা প্রদর্শন করল, তখনও তিনি কোনো ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাত ছাড়াই পুনরায় মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসার ইচ্ছা করেন।
এ ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষেই তিনি শান্তিপূর্ণ পথে হাঁটার অভিপ্রায়ে ছিলেন। তাই এ লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি অবলম্বন করে তিনি সেটা বাস্তবায়িত করেন। সে লক্ষ্যে তিনি চৌদ্দশ সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাত নিয়ে মদিনা থেকে বের হন। [624] সুতরাং তিনি মদিনা মুনাওয়ারার সকল জনশক্তি সঙ্গে নিয়ে বের হননি, আহজাব বা খন্দকের যুদ্ধের সময় যাদের সংখ্যা তিন হাজারকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আর অস্ত্র বলতে শুধু মুসাফিরের আত্মরক্ষার তরবারিই সঙ্গে নিয়ে যান। কাফেলার সম্মুখভাগে অনেক হাদি (মিকাতের হারাম অঞ্চলে জবাইয়ের জন্য যে পশু নিয়ে যাওয়া হয়) রাখেন, যাতে করে সকলেই বুঝতে পারে, তিনি কেবল 'ওমরা' পালনের লক্ষ্যেই এসেছেন, অন্য কোনো উদ্দেশ্য তাঁর নেই। জুল হুলাইফা নামক স্থানে এসে তিনি ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধলেন। তাঁর সঙ্গে সাহাবিরাও ইহরাম বাঁধেন। পুরো পথ তালবিয়া পড়তে পড়তে তারা অগ্রসর হতে থাকেন। [625]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশর ইবনে সুফিয়ান আল-খুজায়ি রা.-কে [626] আগে পাঠিয়ে দেন রাস্তা পর্যবেক্ষণের জন্য এবং এই তথ্য জানার জন্য যে, কুরাইশরা মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান এবং সন্তুষ্টচিত্তে তাদের ওমরার কার্যাবলি ও বাইতুল্লাহ তাওয়াফের প্রতি সম্মত, নাকি তারা অহমিকা প্রদর্শন করবে ও মুসলমানদের ওপর চড়াও হবে! তবে বিশর ইবনে সুফিয়ান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, কুরাইশরা আপনার আগমনের সংবাদ শুনেই স্ত্রী-পরিজন ও সন্তানসন্ততি নিয়ে বের হয়ে পড়েছে। তারা বাঘের চামড়া পরিধান করে এসেছে। তারা আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে যে, তারা বেঁচে থাকতে আপনি কিছুতেই মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন না। খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ তাদের ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিয়ে 'কুরাউল গামিম' [627] পর্যন্ত চলে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা শোনার পরও সামান্যতম বিচলিত হলেন না। তিনি বরং খুব শান্তভাবে বললেন, আহা কুরাইশ! যুদ্ধবিগ্রহই তাদের শেষ করে দিলো। কী ক্ষতি হতো, যদি তারা আমার ও অন্যান্য মানুষের মাঝে বাধার প্রাচীররূপে না দাঁড়িয়ে পথ উন্মুক্ত করে দিত! এরপর যদি অন্যান্য মানুষই আমার ওপর জয়লাভ করত, তবে তো এমনিতেই কুরাইশের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়ে যেত। আর যদি আল্লাহ আমাকে জয়দান করতেন, তখন কুরাইশরাও দলে-দলে ইসলামগ্রহণ করে নিত। এরপরও যদি তারা ইসলামে প্রবেশ করতে অনীহ হতো, তবে তো তাদের শক্তি ছিলই, তখনই না হয় যুদ্ধে জড়াত!! [628]
যুদ্ধের প্রতি কুরাইশদের এ ধরনের আগ্রহবোধ এবং অব্যাহতভাবে তাদের শত্রুতা প্রদর্শনের পরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তাঁর শান্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসেননি। তাই তিনি খালেদ ইবনুল ওয়ালিদের অবস্থান সম্পর্কে জেনে মুসলমানদেরকে সেই পথ ছেড়ে আরেকটি দুর্গম পথে যাত্রার নির্দেশ প্রদান করেন। আসলাম গোত্রের একজন তাকে এই পথের সন্ধান দেয়। [629] এর মাধ্যমে তিনি মুশরিকদের সাথে সংঘাত এড়িয়ে যান (যদিও তা সাময়িক ছিল)। আর এটা এ কারণে ছিল না যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভয় পেয়েছিলেন, বরং তা ছিল যথাসম্ভব যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার জন্য। [630]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমরা-ইচ্ছুক সাহাবিদের নিয়ে হুদাইবিয়াতে পৌছে গেলেন। খবর পেয়ে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ নিজ বাহিনীকে নিয়ে দ্রুত মক্কায় চলে যায় তাদেরকে সতর্ক করার জন্য। এদিকে হুদাইবিয়াতে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী সেখানে এসে থেমে পড়ে। সামনে চলা বন্ধ করে দেয়। মানুষেরা 'ওঠো ওঠো' বলে তাকে ওঠাতে চায়। কিন্তু উটনী তার জায়গাতে অনড় বসে থাকে। মানুষেরা বলা শুরু করে 'কসওয়া' (রাসুলের উটনীর নাম) চলা বন্ধ করে দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কসওয়া চলা বন্ধ করেনি। এমনটি করার স্বভাব তার নেই। তবে হস্তিবাহিনীকে যিনি আটকে দিয়েছিলেন, সেই সত্তাই তাকে আটকে দিয়েছেন।'
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! কুরাইশরা আল্লাহ তাআলার সম্মানিত বিষয়সমূহকে সম্মান দেখানোর জন্য (হারাম অঞ্চলে রক্তপাত এড়ানোর জন্য) আমার কাছে যেকোনো শর্তারোপ করবে, আমি সে শর্ত মেনে নেব। [631]
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শান্তিপূর্ণ কর্মপন্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি কসম করে বলেছেন, পবিত্র নগরী মক্কাভূমি, মানুষের প্রাণ ও তাদের ইজ্জত-আবরু হেফাজতের জন্য তিনি যেকোনো ধরনের শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত রয়েছেন; যদিও সেই শর্ত মানতে গেলে তাদেরকে নমনীয়তা প্রদর্শন করতে হয়।
আলোচনার জন্য কুরাইশরা একের পর এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করতে থাকল। তাদের সকলেরই উদ্দেশ্য ছিল, নবীজিকে ভয় দেখানো, নবীজিকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা এবং কোনো শর্ত ও সুযোগ দেওয়া ছাড়াই মক্কা মুকাররমা থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের পক্ষ থেকে আগত প্রথম দূত বুদাইল(৬৩২) ইবনে ওয়ারকা আল-খুজায়িকে জানিয়ে দেন যে, তিনি সন্ধি চান। তিনি উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্থাপন করতে আগ্রহী। নবীজি তাকে বলেছিলেন,
আমরা তো কারও সঙ্গে লড়াই করতে আসিনি, আমরা এসেছি ওমরা করতে। আমাদের জানা আছে, যুদ্ধবিগ্রহ কুরাইশদেরকে দুর্বল করে ফেলেছে, তাদের বড় ক্ষতিসাধন করেছে। অতএব তারা যদি চায়, আমি তাদের সঙ্গে কিছুদিনের মেয়াদে সন্ধিচুক্তি স্থাপন করব এবং তারা আমার ও অন্য মানুষদের জন্য ওমরার পথ উন্মুক্ত করে করে দেবে। এরপর আমি যদি আমার দাওয়াতি কাজে সফল হতে পারি, তাহলে তারা অন্য মানুষদের মতো ইসলামে প্রবেশ করতে চাইলে করতে পারবে আর যদি না চায়, তাহলে কমপক্ষে তারা লড়াই করার কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। আর তারা যদি এই প্রস্তাবকে মানতে অস্বীকার করে, তাহলে ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমার গর্দান আমার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত অবশ্যই আমি তাদের সঙ্গে আমার এই লক্ষ্য অর্জনে লড়াই করে যাব। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। [633]
তবুও, এরপরও একের পর এক কুরাইশদের দূত বা প্রতিনিধি আসতে থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সকলকে ঠিক ওই কথাই বলেন, যা বলেছিলেন বুদাইল ইবনে ওয়ারকাকে। তারপর নবীজি সিদ্ধান্ত নেন, কুরাইশদের সামনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের জন্য তিনি তাদের নিকট একজন দূত প্রেরণ করবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি উসমান ইবনে আফফান রা.-কে নির্বাচন করেন। উসমান রা. পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেন। কুরাইশদের সঙ্গে তার অনেক আলোচনা ও কথাবার্তা হয়। কিন্তু দীর্ঘ কয়েকদিন আলোচনা হওয়ার পরেও আলোচনা ব্যর্থ হয়। ইতিমধ্যে কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে যায়। এদিকে সাহাবিদের মাঝে কথা ছড়িয়ে পড়ে যে, মক্কায় উসমানকে হত্যা করা হয়েছে।
সেই সময় দূত হত্যা করাকে যুদ্ধের ঘোষণা বলে বিবেচনা করা হতো। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের জিহাদের ওপর বাইআত করতে বাধ্য হন, যা ইতিহাসে 'বাইআতে রিদওয়ান' নামে প্রসিদ্ধ। যুদ্ধের ময়দান থেকে কেউ 'পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবেন না' এই মর্মে সাহাবিগণ বাইআত গ্রহণ করেন। [634] যুদ্ধ যেন বেধেই যাচ্ছিল। সেই সময় হজরত উসমান রা. যদি জীবিত ফিরে না আসতেন, তাহলে যুদ্ধ হয়তো বেধেই যেত। অবশেষে যখন প্রমাণিত হলো যে ছড়িয়ে পড়া কথাটি ছিল ভুল, তখন মুসলমানদের অন্তর-আত্মা শান্ত হয় এবং স্বস্তি লাভ করে।
এরপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে আরেকজন দূতের আগমন ঘটে। তিনি ছিলেন সুহাইল ইবনে আমর। [635]
এতসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেকোনো উপায়ে সন্ধি করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কুরাইশরা তা বরাবর প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছিল। তবে শেষমেশ কুরাইশরাও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তাদের পরিবর্তন শুরু হয় সুহাইল ইবনে আমরকে দূত হিসেবে প্রেরণের মাধ্যমে। সে ছিল কূটনীতি ও আলাপ- আলোচনায় পারদর্শী, প্রসিদ্ধ একজন ব্যক্তি। এ ছাড়া কুরাইশের অন্য নেতাদের মতো তার স্বভাবচরিত্রে একগুঁয়েমি ছিল না। এমনকি বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আগমন করতে দেখে বলে উঠলেন, 'হে সাহাবিগণ, এবার তোমাদের জন্য বিষয়টি সহজ হয়ে গিয়েছে'। [636] আর বাস্তবেও দেখা গিয়েছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনটি আশা করেছিলেন, ঠিক তেমনটিই হয়েছে।
সুহাইল কুরাইশ ও মুসলমানদের মধ্যে সন্ধিস্থাপন করতে আগ্রহী হয়। তবে সে সন্ধিচুক্তির মধ্যে হঠকারিতা ও কঠোরতামূলক কিছু প্রস্তাব ও কাজও করে বসে। এরপরও সন্ধিচুক্তির বিভিন্ন ধারা ও তার বাক্য চয়নের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নমনীয়তা ও সন্ধির ব্যাপারে তাঁর প্রবল আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাতেবকে (চুক্তি লেখক) ডেকে বললেন, লেখো, 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম'। তৎক্ষণাৎ সুহাইল বলে উঠল, আল্লাহর কসম! 'রহমান' কে আমি তা জানি না! বরং তুমি লেখো, 'হে আল্লাহ, তোমার নামে শুরু করছি', যেমনটি তুমি আগে লিখতে। তখন মুসলমানগণ বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম' ছাড়া অন্যকিছু লিখতে পারব না। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লেখো, 'হে আল্লাহ, তোমার নামে শুরু করছি।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, লেখো, 'এই চুক্তিনামাতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ'। এটা দেখে সুহাইল বলে উঠল, যদি আমরা তোমাকে আল্লাহর রাসুল বলেই বিশ্বাস করতাম, তবে তো আমরা তোমাকে আল্লাহর ঘর থেকে বাধা দিতাম না এবং তোমাদের সাথে লড়াই করতেও উদ্যত হতাম না। তাই এর পরিবর্তে তুমি লেখো, 'আবদুল্লাহর পুত্র'। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি আল্লাহর রাসুল, যদিও তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করো। আচ্ছা লেখো, 'আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ'। (বর্ণনাকারী ইমাম যুহরি বলেন, রাসুলের এই নমনীয়তা প্রদর্শনের কারণ ছিল তার পূর্বোক্ত ওই কথা—তারা আল্লাহর সম্মানিত বিষয়সমূহের প্রতি সম্মান দেখানো ও হারাম অঞ্চলে হত্যাকাণ্ড এড়ানোর জন্য যেকোনো শর্তারোপ করবে, আমি সেই শর্ত মেনে নেব।)
এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এই মর্মে যে, তোমরা আমাদের জন্য বাইতুল্লাহর পথ উন্মুক্ত করে দেবে, আমরা বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করব।' তখন সুহাইল বলল, 'আল্লাহর কসম! কোনোভাবেই আরববাসী এ কথা বলার সুযোগ পেতে পারে না যে, আমরা বাধ্য হয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছি। (তাই এ বছর তোমাদের তাওয়াফের সুযোগ হবে না) তবে আগামী বছর তা হতে পারে।'
পরে সেভাবেই লেখা হলো। অতঃপর সুহাইল বলল, 'এবং এই শর্তে যে, আমাদের মধ্য হতে কোনো ব্যক্তি তোমার কাছে চলে গেলে, তুমি তাকে আমাদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেবে, যদিও সে তোমার ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকে।'
মুসলমানগণ বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! এটা কীভাবে সম্ভব যে, তাকে মুশরিকদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া হবে অথচ সে মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে এসেছে?'
তারা সকলে সন্ধির এই ধারা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তে সুহাইল ইবনে আমরের ছেলে আবু জান্দাল বেড়ি পরিহিত অবস্থায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। সে এসেছিল মক্কার নিম্নাঞ্চল থেকে। আবু জান্দাল এসে মুসলমানদের মাঝে অবস্থান নিলো। তখন সুহাইল বলে উঠল, 'হে মুহাম্মাদ, যে ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে চুক্তি করেছি, এটাই কিন্তু তা পূরণের প্রথম ক্ষেত্র, তুমি তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে দেবে।'
নবীজি বললেন, 'এখনো তো আমরা চুক্তি সম্পূর্ণ করিনি!'
সুহাইল বলল, '(যদি তা কার্যকর না করো) তাহলে আমি তোমার সঙ্গে আর কখনো কোনো বিষয়ে সন্ধি করব না।'
নবীজি বললেন, 'কেবল ওকে আমার নিকট থাকার অনুমতি দাও।'
সুহাইল বলল, 'কিছুতেই আমি তাকে তোমার নিকট থাকার অনুমতি দিতে পারি না।'
নবীজি বললেন, 'অবশ্যই তোমাকে এটা করতে হবে।'
সুহাইল বলল, 'আমি পারব না।'
এদিকে তখন আবু জান্দাল (মুসলমানদেরকে উদ্দেশ্য করে) বললেন, 'হে মুসলমানগণ! আমি তোমাদের কাছে মুসলমান হয়ে এসেছি। এখন কীভাবে আবার আমাকে মুশরিকদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে! তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না ইসলামের জন্য আমি কী পরিমাণ জুলুম- নির্যাতনের শিকার হয়েছি!'
বাস্তবেও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার কারণে তাকে চরম জুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। [637]
এভাবে আমরা দেখতে পাই, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি পরিমাণ ছাড় দিয়েছেন! চুক্তিপত্রের শুরুতেই পূর্ণ 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম' লেখার ব্যাপারে। এরপর তার নামের সঙ্গে 'আল্লাহর ‘রাসুল' এই বিশেষণটি যুক্ত করার ব্যাপারে। তা ছাড়া এ বছর বাইতুল্লাহ তাওয়াফ না করে ফিরে যাওয়ার মতো কঠিন প্রস্তাবকেও তিনি সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছেন!
শুধু তাই নয়, এরপর আমরা দেখেছি, মক্কাবাসীর মধ্যে কেউ মুসলমান হয়ে তাঁর নিকট গমন করলে তার পরিবারের লোকেরা যদি তাকে ফেরত চায়, তাহলে তিনি তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। এরকম প্রস্তাবও তিনি মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। বিষয়টি আরও করুণ হয়ে উঠেছিল, যখন সুহাইল ইবনে আমরের ছেলে আবু জান্দালের আগমন ঘটেছিল। ইসলামগ্রহণ করার কারণে সে তখন মুশরিকদের নিকট ভীষণ জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। তাকে শিকলে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এ অবস্থাতেই সে এসে মুসলমানদের নিকট সাহায্যের আবেদন করে। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুহাইল ইবনে আমরের কাছে তাকে রেখে দেওয়ার দাবি করেন। কিন্তু সুহাইল সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং সন্ধির সকল আলোচনার অগ্রগতি এই নির্যাতিত মুসলিম যুবককে রেখে দেওয়ার সাথে শর্তযুক্ত করে দেয়। অর্থাৎ তাকে ফেরত না দিলে আর সন্ধি হবে না। এভাবে সন্ধি-আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশেষে এটাতেও সম্মতি প্রদান করেন। সন্ধিচুক্তি পূর্ণ করার জন্য তিনি দৃশ্যত এসব জটিলতা ও প্রতিকূলতা মেনে নেন। এতে তিনি সাহাবায়ে কেরামের আপত্তিকেও উপেক্ষা করেন, যাদের অগ্রভাগে ছিলেন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। পরিশেষে রাসুলের লক্ষ্য বাস্তবতায় পরিণত হয়, চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তিনামা লিখে দুটি কপি বানানো হয়। মুসলমানগণ ও মক্কাবাসী প্রত্যেকে একটি করে কপি নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই লিখিত সন্ধিচুক্তির সবচেয়ে লক্ষণীয়, মুগ্ধকর ব্যাপার ছিল, সন্ধি-পরবর্তী জটিল সময়গুলোতেও সেই শর্তগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ঘটানো। কারণ, সেই চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি আবু বসির রা.-কেও ফিরিয়ে দেন। সে ছিল কুরাইশদের একজন। ইসলামগ্রহণের পর নিজের ধর্ম রক্ষার্থে সে মক্কা থেকে মদিনায় পালিয়ে এসেছিল।
কুরাইশরা তাকে ধরে আনার জন্য দুজন লোক পাঠায়। তারা এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, 'সেই প্রতিশ্রুতি পালন করুন, যা আপনি আমাদেরকে দিয়েছেন।'
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বসির রা.-কে তাদের হাতে দিয়ে দেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুক্তিপালন এমনই সততাপূর্ণ ছিল যে, একজন মুসলমান হয়ে (আশ্রয়ের জন্য) মদিনায় এসেছে, কিন্তু রাসুল তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। অথচ সেই সময় মদিনায় লড়াকু সৈনিকের একান্ত প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া মক্কায় একজন মুসলমানকে ইসলাম গ্রহণের কারণে বহু বিপদের মুখোমুখি হতে হতো। তার ওপর জুলুম-নির্যাতন করা হতো। এরপরও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজেদের কাছে রেখে দেননি। বরং ফেরত পাঠিয়েছেন। কারণ, চুক্তির ধারাগুলোতে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে লেখা ছিল। এ কারণে সেটা পালন করা ছিল অবশ্য কর্তব্য।
অথচ এদিকে আবু বসির রা. নিজেও রাসুলের ফেরত প্রদান দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে যান এবং তাঁকে প্রশ্ন করে বলেন, 'হে আল্লাহর নবী, আপনি আমাকে মুশরিকদের হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছেন! তারা তো আমাকে আমার ধর্মের কারণে কষ্ট দেবে!'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'হে আবু বসির, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অচিরেই তোমার এবং তোমার সঙ্গে থাকা দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য মুক্তি ও পরিত্রাণের ব্যবস্থা করবেন।' [638]
পরে, মক্কা যাওয়ার পথে আবু বসির সমুদ্র উপকূলের দিকে পালিয়ে যান। সেখানে একটি শিবির স্থাপন করেন এবং কুরাইশদের বিভিন্ন কাফেলার ওপর অতর্কিত হামলা করতে থাকেন। কিন্তু কুরাইশরা তার কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারেনি এবং তারা রাসুলকেও এ ব্যাপারে দোষারোপ করতে পারেনি। কারণ, আবু বসির তো তখন তাঁর অধীনে ছিলেন না।
এদিকে মক্কার অন্যান্য নির্যাতিত মুসলমান আবু বসিরের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারে এবং কুরাইশের কাফেলার ওপর হামলার কাজে সহযোগিতার জন্য তার সাথে গিয়ে মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ উদ্দেশ্যেই সুহাইল ইবনে আমরের ছেলে আবু জান্দাল আবু বসিরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়। তাকে অনুসরণ করে এভাবে আরও ৭০ জন মুসলমান। এইসব নির্যাতিত নওমুসলিম সন্ধিচুক্তির শর্তের কারণে মদিনায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারছিল না, আবার কাফেরদের নির্যাতনের কারণে মক্কাতেও অবস্থান করতে পারছিল না। মক্কা থেকে এইসব মুসলমান আবু বসিরের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কারণে তাদের জনশক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে কুরাইশ কাফেলা ও আবু বসিরের এই দলের মাঝে লড়াইয়ের তীব্রতাও বেড়ে যায়। অবশেষে কুরাইশরা বাধ্য হয়ে রাসুলের কাছে আগমন করে এবং এই মুসলমান দলকে মদিনায় তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার আবেদন করে। [639] যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃত অর্থেই আশেপাশের মুশরিকদের সাথে শান্তি ও শৃঙ্খলার সঙ্গে বসবাস করার ইচ্ছা করতেন, এ কারণে তিনি তাদের আবেদন গ্রহণ করেন এবং এই মুসলমানদেরকে তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে নেন।
লক্ষণীয় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করলে তাদেরকে আগের অবস্থায় ছেড়ে রাখতে পারতেন। আর এভাবেই তারা অতর্কিত আক্রমণে কুরাইশদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলত। তাদের শক্তি খর্ব করে দিত। ধনসম্পদ নিঃশেষ করে দিত। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় কুরাইশদের সঙ্গে পরিচ্ছন্ন অন্তর নিয়ে আচার-ব্যবহার করেছেন। এটা ভালোভাবে উপলদ্ধি করতে পেরেছে তারাই, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনেছে এবং জেনেছে।
এমনটাই ছিল অমুসলিমদের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সন্ধিচুক্তি, যে চুক্তিগুলোর মূল ভিত্তিই ছিল প্রতিশ্রুতি পালন, ন্যায়পরায়ণতা ও শান্তির প্রতি আগ্রহবোধ। বর্তমান বিশ্বের জন্যও কতই-না প্রয়োজন তাঁর এই রীতিনীতিগুলো ধারণ করার!

টিকাঃ
৬১৮. বনু জমরা গোত্র : আদনান গোত্রের একটি শাখাগোত্র। যারা মদিনার পশ্চিম অঞ্চল ওয়াদ্দানে বসবাস করত।
৬১৯. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/১৩৫।
৬২০. ইবনে হিব্বান: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ১/১৫১, ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/১৩৫।
৬২১. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৩/১৪৩।
৬২২. ইবনে সাদ: আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/২৭২।
৬২৩. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/২৭৫।
৬২৪. সহিহ মুসলিম: ১৮৫৬।
৬২৫. ইবনে সাদ : আত-তাবাকাতুল কুবরা : ২/৯৫।
৬২৬. বিশর ইবনে সুফিয়ান খুজায়ি: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ও বুদাইল বিন উম্মে আসরামকে খুজায়া গোত্রের শাখা গোত্র বনু কাবকে মক্কা অভিযানে শরিক হতে আহ্বান জানানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন এবং বনু কাবের জাকাত উসুলের জন্যও তাকে পাঠিয়েছিলেন। পাশাপাশি হুদাইবিয়াতে রাসুলের এক গুপ্তচর হিসেবেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। সূত্র: ইসাবা: ১/২২৬।
৬২৭. কুরাউল গামিম: মক্কা-মদিনায় মধ্যবর্তী হেজাজের এক প্রান্তে অবস্থিত একটি স্থান। গামিম হলো উপত্যকার নাম, কুরা হলো পাহাড়ের নাম। সূত্র: লিসানুল আরব: ৮/৩০৮।
৬২৮. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৯৩০।
৬২৯. ইবনে হিশাম: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/২৭৬।
৬৩০. মাহমুদ শিত খাত্তাব: আর-রাসুলুল কায়িদ: ১৮৬, ১৮৭।
৬৩১. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৭২।
৬৩২. বুদাইল বিন ওয়ারকা: মক্কা বিজয়ের দিন ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন কুরাইশের লোকেরা তার ঘরে ও তার আজাদকৃত গোলাম রাফের ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করে। তিনি ও তার ছেলে আবদুল্লাহ হুনাইন, তায়েফ ও তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আর তিনি ছিলেন মক্কা বিজয়ের সময় ইসলামগ্রহণকারী মহান ব্যক্তিদের একজন। একটি মতে বলা হয় তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বেই ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। সূত্র: আল-ইসতিআব: ১/২৩৬, উসদুল গাবাহ: ১/২৩৬, ইসাবা: ৬১১।
৬৩৩. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৭২, মুজামুল কাবির ১৩, আস-সুনানুল কুবরা: ১৮৫৮৭।
৬৩৪. সহিহ মুসলিম: ১৮৫৬-১৮৫৮, সুনানে তিরমিজি: ১৫৯১, সুনানে নাসায়ি: ৪১৫৮।
৬৩৫. সুহাইল ইবনে আমর ইবনে লুআই ইবনে গালেব। সে ছিল জাহেলি যুগে কুরাইশদের মধ্যে প্রসিদ্ধ বাগ্মী এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। কাফের অবস্থায় সে বদরযুদ্ধের দিন মুসলমানদের হাতে বন্দি হয়। তখন হজরত উমর রা. বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তার সামনের দাঁত ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিন, তাহলে আর সে কোনোদিন আপনার বিপক্ষে বিতর্ক করতে পারবে না।' তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। আশা করা যায় সে একদিন এমন অবস্থানে পৌছাবে, তুমি নিজেই তার প্রশংসা করবে।' পরে তিনি ইসলামগ্রহণ করেন। এরপর রাসুলের ইনতেকালের পর আরবের কিছু লোক যখন মুরতাদ হয়ে যেতে লাগল, তখন তিনি ভাষণ দিয়ে বলতে লাগলেন, আল্লাহর কসম, নিশ্চয় এই ধর্ম সম্প্রসারিত হবে সূর্যের উদয় ও অন্তের সম্প্রসারণের মতো। সূত্র: ইবনে হাজার আসকালানি: আল-ইসাবা : ৩৫৬৯, ইবনুল আছির: উসদুল গাবাহ: ২/৩৪৬।
৬৩৬. সহিহ বুখারি: ২৭৩১-২৭৩২, সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮৭২।
৬৩৭. সহিহ বুখারি: ২৭৩১, ২৭৩২; সহিহ মুসলিম: ১৭৮৪।
৬৩৮. ইবনে হিশাম : আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা: ৪/২৯১।
৬৩৯. প্রাগুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00