📄 ভূমিকাঃ ওহীর আভিধানিক ও শরয়ী সংজ্ঞা এবং ওহীর প্রকারভেদ
আভিধানিক সংজ্ঞা: অভিধানে ওহী হচ্ছে গোপনে দ্রুত জানানো।
ওহী শব্দটি ইঙ্গিত, লেখা, রিসালাত ও ইলহামের অর্থে ব্যবহৃত হয়। যা কিছুই অন্যের কাছে পরিবেশন করা হয়, যাতে সে ঐ সবের জ্ঞান লাভ করে, তা-ই ওহী, যেভাবেই তা হোক না কেন। এ অর্থে তা নবীদের সাথে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার সাথে নির্ধারিত নয়।
আভিধানিক অর্থে ওহী নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে:
১. মানুষের স্বভাবজাত ইলহাম, যেমন মূসার মায়ের উদ্দেশ্যে প্রেরিত ওহী। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ وَأَوْحَيْنَا إِلَى أَمْ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ ﴾ (القصص: ۷)
"মূসা জননীর অন্তরে আমরা ইলহাম করলাম, তাকে স্তন্য দান কর”। [সূরা আল-কাসাসঃ৭]
২. প্রাণীর প্রকৃতিগত ইলহাম, মধুমক্ষিকার প্রতি ওহী। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِدِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا ﴾ (النحل : ٦٨)
"আপনার প্রভু মৌমাছিকে প্রত্যাদেশ করলেন, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে”। [সূরা আন-নাহল: ৬৮]
৩. সঙ্কেত প্রদান ও ইঙ্গিতের মাধ্যমে দ্রুত ইশারা করা, যেমন স্বীয় সম্প্রদায়ের প্রতি যাকারিয়া (আলাইহিস সালাম) এর ইঙ্গিত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ مِنَ الْمِحْرَابِ فَأَوْحَى إِلَيْهِمْ أَنْ سَبِّحُوا بُكْرَةً وَعَشِيًّا ﴾ (مریم: ۱۱)
"অতঃপর তিনি (ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট) কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে আসলেন এবং ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বললেন”। [সূরা মারইয়াম: ১১]
৪. শয়তানের কুমন্ত্রণা ও শয়তানের অলীদের অন্তরে মন্দকে সুশোভিত করে তোলা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنَّ الشَّيْطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِي اليُجَادِلُوكُمْ (الأنعام: ۱۲۱)
"নিশ্চয়ই শয়তানেরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়”। [সূরা আল-আন'আম : ১২১]
৫. ঐ সকল নির্দেশ যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি পালনের জন্য প্রেরণ করেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِذْ يُوحَى رَبُّكَ إِلَى المَلَكَةِ أَنِّي مَعَكُمُ فَتَبْتُوا الَّذِينَ آمَنُوا (الأنفال: ۱۲)
"স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক ফিরিস্তাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, 'আমি তোমাদের সাথে আছি, সুতরাং মু'মিনদেরকে অবিচলিত রাখ'। [সূরা আল-আনফালঃ ১২]
শরয়ী সংজ্ঞা:
"আল্লাহ তা'আলা যে শরীয়ত কিংবা গ্রন্থ কোন মাধ্যমে অথবা মাধ্যম ছাড়া তাঁর নবীদের কাছে পৌঁছাতে চান, তা তাদেরকে জানিয়ে দেয়া" হল ওহী।
ওহীর প্রকার ভেদ :
আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে ওহী লাভের অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে, যা তিনি স্বীয় বাণী দ্বারা সূরা আশ-শুরাতে বর্ণনা করেছেন ৪
وَمَا كَانَ لِبشير ان كَلِمَهُ اللهُ الأَوَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَأَى حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحَى بِإِذْنِهِ مَا يَشَ وَانَهُ عَلى حَكِيمُ (الشورى: ٥١)
"কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতীত, অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতীত, অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতীত যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করেন। তিনি সুউচ্চ, প্রজ্ঞাময়”। [সূরা আশ-শুরা: ৫১]
আল্লাহ তা'আলা অবহিত করেছেন যে, মানবের উদ্দেশ্যে তাঁর বাক্যালাপ ও ওহী তিনটি স্তরে সংঘটিত হয়।
প্রথম স্তর : শুধুমাত্র ওহী। আর তা হল - ওহীপ্রাপ্ত ব্যক্তির হৃদয়ে আল্লাহ যা চান তা এমনভাবে প্রক্ষেপ করেন যে, তিনি (ওহী প্রাপ্ত ব্যক্তি) তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করেন না। এর দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী :
﴿اَلْوَحْيَا ﴾ (الشূরা : ٥١) অর্থাৎ ওহীর মাধ্যম ব্যতীত। [সূরা আশ-শুরা : ৫১]
এর উদাহরণ হল আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে বর্ণনা এসেছে সেটি। তা হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«إن روح القدس نفث في روعي لن تموت نفس حتى تستكمل رزقها فاتقوا الله وأجملوا في الطلب»
“রূহুল কুদ্দুস (জিবরীল) আমার হৃদয়ে ওহী প্রক্ষেপ করেছে যে, রিযিক পূর্ণ না করে কেউ মারা যাবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সংক্ষেপে চাও”। হাদীসটি ইবনে হিব্বান তার সহীহ গ্রন্থে ও হাকিম মুস্তাদরাকে বর্ণনা করেছেন। হাকিম একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তা সমর্থন করেছেন। হাদীসটি ইবনে মাজাহ তার সুনান গ্রন্থে এবং এতদ্ব্যতীত আরো অনেকেই বর্ণনা করেছেন¹。
আলেমদের কেউ কেউ এ প্রকারের সাথে নবীদের স্বপ্ন দেখাকেও সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। যেমন ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের স্বপ্ন সম্পর্কে আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন :
﴿ قَالَ يُبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ ﴾ (الصافات: ١٠٢)
"তিনি বললেন, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি”। [সূরা আস-সাফফাতঃ১০২]
আরো যেমন নবুওয়াতের প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বপ্ন যা ইমাম বুখারী ও মুসলিম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন:
(أول ما بدئ به رسول الله ﷺ من الوحي الرؤيا الصالحة في النوم فكان لا يرى رؤيا إلا جاءت مثل فلق الصبح)¹
'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রথম যে ওহী দেয়া হয় তা হল নিদ্রাবস্থায় ভাল ভাল স্বপ্ন। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা-ই প্রভাতের আলোর মত স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হত'¹。
দ্বিতীয় স্তর: কোন মাধ্যম ছাড়াই পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলা, যেমনটি সাব্যস্ত হয়েছে কোন কোন রাসূল ও নবীদের ক্ষেত্রে। যেমন মূসার সাথে আল্লাহ তা'আলার কথোপকথন, যে সম্পর্কে তিনি কুরআনের একাধিক স্থানে সংবাদ দিয়েছেন:
وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيمًا (النساء : ١٦٤)
"আর মূসার সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছিলেন”। [সূরা আন-নিসা :১৬৪]
তিনি আরো বলেন:
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَمَة رَبُّهُ ﴾ (الأعراف: ١٤٣)
"মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার প্রতিপালক তার সাথে কথা বললেন"। [সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৩]
অনুরূপভাবে আদমের সাথে আল্লাহর কথোপকথন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَتِ ﴾ (البقرة: ۳۷)
"তারপর আদম তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩৭]
আরো যেমন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ইসরার রাতে আল্লাহ তা'আলার কথোপকথন, যা সুন্নায় সাব্যস্ত রয়েছে। আয়াতে এ স্তরের দলীল হল আল্লাহর বাণীঃ
﴿ أَوْ مِن وَرَانِي حِجَابٍ ﴾ (الشوری: ٥١) অর্থাৎ অথবা পর্দার অন্তরাল হতে। [সূরা আশ-শুরা: ৫১]
তৃতীয় স্তর: ফিরিস্তার মাধ্যমে ওহী প্রদান। এর দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী:
﴿ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولاً فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ ﴾ (الشورى: ٥١)
"অথবা এমন দূত প্রেরণ করবেন, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করেন”। [সূরা আশ-শুরা: ৫১]
এ ধরনের ওহী যেমন জিবরীল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে নবী ও রাসূলগণের নিকট অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
কুরআনের পুরোটাই এ পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর কথা পেশ করেছেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে তা শুনেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তা পৌঁছিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَلَمِينَ * نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ * عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ ﴾ (الشعراء: ١٩٢-١٩٤)
"নিশ্চয়ই এটা (আল-কুরআন) জগতসমূহের প্রতিপালক হতে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরীল) তা নিয়ে অবতরণ করেছে আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন"। [সূরা আশ-শু'আরা: ১৯২-১৯৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَبِّكَ بِالْحَقِّ ﴾ (النحل : ١٠٢)
"বলুন, আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে রূহুল কুদ্দুস (জিবরীল) সত্যসহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন”। [সূরা আন-নাহল: ১০২]
আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিবরীল আলাইহিস সালামের ওহী পৌঁছানোর তিনটি অবস্থা রয়েছে:
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীল আলাইহিস সালামকে ঐ আকৃতিতে দেখতেন, যে আকৃতিতে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ঘটনা শুধু দু'বারই ঘটেছিলো যেমনটি আগের অধ্যায়ে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে¹。
২. তার কাছে ঘন্টাধ্বনির ন্যায় ওহীর আগমন হতো। এরপর জিবরীল চলে যেতেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিমধ্যে তার বক্তব্য আত্মস্থ করে নিতেন।
৩. জিবরীল কোন এক ব্যক্তির আকৃতি ধারণ করে তার কাছে আসতেন এবং ওহী দ্বারা তাকে সম্বোধন করতেন, যেমন পূর্বেকার হাদীসে জিবরীলে উল্লেখ হয়েছে যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দ্বীনের স্তরসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন¹。
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারেস ইবনে হিশামের প্রশ্নের উত্তরদানের প্রাক্কালে শেষোক্ত অবস্থাদ্বয় সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছিলেন। হারেস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে ওহী কিভাবে আসে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেনঃ
«أحياناً يأتيني مثل صلصلة الجرس، وهو أشده علي، فيفصم عني وقد وعيت عنه ما قال. وأحياناً يتمثل لي الملك رجلاً فيكلمني فأعي ما يقول»
"কখনো আমার কাছে ওহী আসে ঘন্টাধ্বনির মত। এটা ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে বেশী কষ্টদায়ক। তারপর তা ছেড়ে যেত এমতাবস্থায় যে, তিনি যা বলেছেন আমি তা গ্রহণ করে নিয়েছি। আবার কখনো ফিরিস্তা আমার কাছে কোন এক লোকের বেশ ধরে আসত এবং আমার সাথে কথা বলত। তাতেই আমি তার বক্তব্য অনুধাবন করে নিতাম”²। মুত্তাফাকুন আলাইহ্। হাদীসে বর্ণিত فصم অর্থ: ছেড়ে যেত।
টিকাঃ
¹ মাওয়ারেদুয যামআন (হাদীস নং ১০৮৪, ১০৮৫), মুস্তাদরাক (২/৪), সুনান ইবনে মাজাহ (হাদীস নং ২১৪৪), ইবনে আবিদ দুনিয়া আলকানা'আয় এবং বায়হাকী শো'আবুল ঈমানে (আলমুগনী 'আন হামলিল আসফার : ৪১৯, ৮৯৫) এবং বাগাবী (১৪/৩০৪, হাদীস নং ৪১১২) এটি বর্ণনা করেছেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩), অনুরূপ হাদীস এসেছে সহীহ মুসলিমে (হাদীস নং ১৬০)
¹ দেখুন পৃঃ ১৩৪,১৫৪-১৫৫。
¹ দেখুন পৃঃ ১৪২-১৪৪。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৩৩৩)
📄 গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়নের হুকুম ও এর দলীল
গ্রন্থসমূহের সংজ্ঞা: আরবীতে الكتب অর্থ গ্রন্থসমূহ যা كتاب এর বহুবচন। আর الكتاب শব্দটি كتب يكتب كتابا এর ক্রিয়ামূল। (এর অর্থঃ লিপিবদ্ধ করা) এরপর লিপিবদ্ধ বস্তুর নামকরণ করা হয়েছে 'কিতাব' দ্বারা। মূলতঃ কিতাব হলো এমন সহীফা বা পুস্তকের নাম যাতে লিখা থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণীতে রয়েছেঃ
يَشْأَلُكَ أَهْلُ الْكِتَابِ أَنْ تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ كِتَابًا مِنَ السَّمَاءِ ﴾ (النساء: ١٥٣)
"আহলে কিতাবগণ আপনার কাছে তাদের জন্য আসমান হতে একটি গ্রন্থ অবতীর্ণ করতে বলে”। [সূরা আন-নিসা: ১৫৩] অর্থাৎ এমন সহীফা যাতে লিখা রয়েছে।
এখানে গ্রন্থসমূহ দ্বারা বুঝানো হয়েছে সে সকল গ্রন্থ ও সহীফা যা আল্লাহ তা'আলার সেই কালামকে ধারণ করেছে, যে কালাম তিনি রাসূলগণের প্রতি ওহীরূপে প্রেরণ করেছিলেন, চাই তিনি যা প্রেরণ করেছেন তা লিপিবদ্ধ হোক যেমন তাওরাত অথবা তা কোন ফিরিস্তার মাধ্যমে মৌখিকভাবে অবতীর্ণ করে পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করা হোক যেমন অন্য সকল গ্রন্থ।
গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমানের হুকুম : যে সকল গ্রন্থ আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের প্রতি নাযিল করেছেন সেগুলোর প্রত্যেকটির উপর ঈমান আনয়ন ঈমানের রুকনসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন ও দ্বীনের মূলনীতিসমূহের একটি বড় মূলনীতি। এ রুকন ছাড়া ঈমান বাস্তবায়িত হয় না। কুরআন ও সুন্নাহ্ সে ব্যাপারে প্রমাণ বহন করছে।
কুরআনের দলীলের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণী:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللهِ وَمَلَيكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا بَعِيدًا ﴾ (النساء : ١३६)
“হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি, যে গ্রন্থ তিনি তাঁর রাসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি এবং যে গ্রন্থ তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি ঈমান আন। আর যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফিরিস্তাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসকে অস্বীকার করবে সে তো ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে”। [সূরা আন-নিসা: ১৩৬]
আয়াতটিতে আল্লাহ তাঁর মু'মিন বান্দাদেরকে ঈমানের সকল শাখা-প্রশাখা ও রুকনে প্রবিষ্ট হওয়ার নির্দেশ প্রদান করছেন। তিনি তাদেরকে ঈমান আনয়নের নির্দেশ প্রদান করেছেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি, যে গ্রন্থ তিনি স্বীয় রাসূলের উপর নাযিল করেছেন তথা কুরআনের প্রতি এবং যে গ্রন্থ তার পূর্বে নাযিল করেছিলেন তথা পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থসমূহ যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূরের প্রতি। এরপর তিনি আয়াতের শেষভাগে বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি ঈমানের রুকনসমূহের কোন কিছুর প্রতি কুফরী করে, সে সুদূর ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয় এবং সঠিক পথ অবলম্বনের সংকল্প হতে বের হয়ে যায়। ঈমানের উল্লেখিত রুকনসমূহের অন্তর্গত হল আল্লাহর গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ ﴾ (البقرة: ١٧٧)
“পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন পুণ্য নেই, কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ, শেষ দিবস, ফিরিস্তাগণ, সকল গ্রন্থ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করলে”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৭]
মহান আল্লাহ এ সংবাদ দিয়েছেন যে, প্রকৃত পুণ্য হল ঈমানের যে সব রুকন উল্লেখ করা হয়েছে সে সবের প্রতি ঈমান আনয়ন এবং এরপর আয়াতটিতে পুণ্যের যে সকল বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে সে অনুযায়ী আমল করা। তিনি 'গ্রন্থের উপর ঈমান আনয়ন' ঈমানের রুকনসমূহের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ইবনে কাসীর বলেন, 'الكتاب বা গ্রন্থ শব্দটি শ্রেণীবাচক নাম যা নবীগণের উপর আসমান থেকে অবতীর্ণ সকল গ্রন্থসমূহকে শামিল করে, যে গ্রন্থসমূহের ধারা সবচেয়ে সম্মানিত গ্রন্থ তথা কুরআন দ্বারা শেষ হয়েছে, যা তার পূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের উপর 'সাক্ষীস্বরূপ'¹。
সকল গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবদেরকে নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা সম্বোধনের জন্য মু'মিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন:
قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِي النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ ) (البقرة: ١٣٦)
"তোমরা বল, আমরা ঈমান রাখি আল্লাহর প্রতি, এবং যা আমাদের প্রতি ও ইব্রাহীম, ইসমা'ঈল, ইসহাক, ইয়া'কুব ও তার বংশধরদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, এবং যা মূসা, 'ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে দেয়া হয়েছে, তার প্রতি। আমরা তাদের কারো মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণকারী”। [সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৩৬]
আয়াতটিতে ঐ বিষয়ের প্রতি মু'মিনদের ঈমান আনয়নের ব্যাপারটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে মু'মিনদের উপর নাযিল করেছেন ও যা অত্র আয়াতে উল্লেখিত রাসূলগণের উপর নাযিল করেছেন এবং এজমালীভাবে যা অপরাপর নবীদের উপর নাযিল করেছেন। আর তারা রাসূলগণের মধ্যে কাউকে বাদ দিয়ে কারো প্রতি ঈমান এনে তারতম্য করে না। এ থেকে সকল রাসূলগণ ও তাদের প্রতি যে গ্রন্থসমূহ নাযিল হয়েছে সে সবের প্রতি ঈমান আনয়নের নিয়মটি সাব্যস্ত হয়ে যায়।
এ বিষয়টি প্রতিপাদনে কুরআনে প্রচুর আয়াত রয়েছে।
অনুরূপভাবে সুন্নাহ্ও প্রমাণ বহন করছে গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন ওয়াজিব হওয়ার উপর এবং এ কথার উপরও যে, এগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন ঈমানেরই একটি রুকন। জিবরীলের হাদীস এবং তিনি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঈমানের রুকন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তা উক্ত ব্যাপারে দলীল পেশ করেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীলের প্রশ্নের উত্তরে ঈমানের অন্য রুকনগুলোর সাথে গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমানের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে সরাসরি বক্তব্যসহ হাদীসটি উল্লেখ করায় তার পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন এখানে নেই¹。
এদ্বারা সকল গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান ও সেগুলোকে সত্য প্রতিপন্ন করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারটি সাব্যস্ত হয় এবং এ আক্বীদা পোষণ করাও সাব্যস্ত হয় যে, এসব গ্রন্থের প্রতিটি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অবতারিত, যা তিনি সত্য, হেদায়াত, আলো ও জ্যোতি সহকারে স্বীয় রাসূলগণের উপর অবতীর্ণ করেছেন, আর যে ব্যক্তি এগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অথবা এর অন্তর্গত কোন কিছু অস্বীকার করে সে আল্লাহকে অস্বীকারকারী কাফির ও দ্বীন থেকে বহিষ্কৃত।
গ্রন্থসমূহের উপর ঈমান আনয়নের ফলাফলঃ মু'মিনের উপর গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমানের বিশাল প্রভাব রয়েছে। তম্মধ্যে কিছু হলঃ
১. সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহের কারণে আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করা; কেননা তিনি তাদের প্রতি এমন গ্রন্থ নাযিল করেছেন যাতে তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
২. এদ্বারা আল্লাহ তা'আলার হেকমত ও প্রজ্ঞার প্রকাশ; কেননা তিনি এ গ্রন্থসমূহে প্রত্যেক জাতির জন্য এমন শরীয়ত প্রণয়ন করেছেন যা তাদের জন্য সমীচীন। আর সর্বশেষ গ্রন্থ হল মহান আলকুরআন যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক জনপদের সকল সৃষ্টির উপযোগী।
৩. আল্লাহ তা'আলার জন্য কথা বলার গুণ সাব্যস্ত করা এবং এটাও সাব্যস্ত করা যে তার কথা সৃষ্টিজগতের কথার অনুরূপ নয়, অনুরূপভাবে এটাও প্রমাণ করা যে, সৃষ্টিজগতের সবাই তাঁর কথার অনুরূপ কথা আনয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
টিকাঃ
¹তাফসীরে ইবনে কাসীর (১/২৯৭)
¹ দেখুন পৃঃ ১৪২-১৪৪।
📄 গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়নের পদ্ধতি
আল্লাহর গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমানের বিভিন্ন দিক রয়েছে। আরকানুল ঈমানের এ মহান রুকনটিকে বাস্তবায়নের জন্য সেদিকগুলোর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তা দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নার দলীল প্রমাণ বহন করছে। সে দিকগুলো হলঃ
১. এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা যে, এ গ্রন্থগুলোর প্রতিটিই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। এগুলো আল্লাহ তা'আলারই বাণী অন্য কারো বাণী নয় এবং এগুলো দ্বারা আল্লাহ বাস্তবিকই কথা বলেছেন যেমন তিনি ইচ্ছা করেছেন এবং যে পদ্ধতিতে তিনি চেয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ اللهُ لا إِلهَ إِلا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ * نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ الثَّوريةَ وَالْإِنجيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَاللهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامٍ ﴾ (آل عمران : ٢-٤)
“আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন প্রকৃত ইলাহ্ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যা তার পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী। আর তিনি অবর্তীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল - ইতিপূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য। আর তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন। যারা আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী”। [সূরা আলে-ইমরান: ২-৪]
আল্লাহ তা'আলা অবহিত করেছেন যে, তিনি উল্লেখিত গ্রন্থসমূহ তথা তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআন তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নাযিল করেছেন। এদ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, তিনিই এগুলো দ্বারা বক্তব্য প্রদানকারী এবং তাঁরই পক্ষ থেকে এসকল বাণীর উদ্ভব হয়েছে, অন্য কারো পক্ষ থেকে নয়। এজন্যই তিনি বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ঐ ব্যক্তিকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন যে আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।
তিনি তাওরাত সম্পর্কে খবর দিয়ে বলেন:
﴿ إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَيةَ فِيهَا هُدًى وَنُورُ ﴾ (المائدة : ٤٤)
"অবশ্যই আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, যাতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো"। [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৪]
আল্লাহ তা'আলা জানিয়েছেন যে, তিনিই তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে যে হেদায়াত ও আলো রয়েছে তা তাঁরই পক্ষ থেকে।
আল্লাহ তা'আলা অন্য আরেকটি প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, তাওরাত তাঁরই বাণী। একথা তিনি বলেছেন ইয়াহুদীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে:
﴿ أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُو اللَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَّمَ اللهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ ﴾ (البقرة: ٧٥)
"তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, তারপর তারা তা অনুধাবন করার পর বিকৃত করে”। [সূরা আল-বাকারাহ : ৭৫]
সুদ্দী, ইবনে যায়েদ ও একদল মুফাসসির বলেন, এখানে আল্লাহর যে বাণী তারা শ্রবণ করার পর বিকৃত করেছিলো তা হল তাওরাত।
আল্লাহ তা'আলা ইঞ্জিল সম্পর্কে বলেন:
﴿ وَلْيَحْكُمُ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنزَلَ اللهُ فِيهِ ﴾ (المائدة : ٤٧)
"ইঞ্জিল অনুসারীগণ যেন আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে হুকুম দেয়”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৭] অর্থাৎ সে সকল নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা যা আল্লাহরই বাণীর অন্তর্ভুক্ত।
তিনি কুরআন কারীম সম্পর্কে বলেন:
﴿ الركب أَحْمَتُ ابْتُهُ ثُمَّ فَصَلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ﴾ (هود: 1)
"আলিফ-লাম-রা, এমন গ্রন্থ, যার আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত ও পরে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে বিশদভাবে বিবৃত”। [সূরা হুদঃ ১]
আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন:
﴿ وَإِنَّكَ لَتُلَقَّى الْقُرْآنَ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ عَلِيمٍ ﴾ (النمل: ٦)
"আর নিশ্চয়ই আপনাকে আল-কুরআন দেয়া হচ্ছে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে”। [সূরা আন-নামলঃ ৬]
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَبِّكَ ﴾ (النحل : ١٠٢)
"বলুন, রূহুল কুদ্দুস (জিবরীল) আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে তা অবতীর্ণ করেছেন”। [সূরা আন-নাহল: ১০২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجْرُهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلمَ اللهِ ﴾ (التوبة : ٦ )
"মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দেবেন যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়”। [সূরা আত-তাওবাহঃ ৬]
তাদেরকে ঐ কুরআন শ্রবণ করার নির্দেশই শুধু দেয়া হয়েছিলো যা আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল করেছিলেন। অতএব তা প্রকৃতই আল্লাহর বাণী।
২. এ বিষয়ের প্রতি ঈমান আনয়ন করা যে, এ সকল গ্রন্থের প্রতিটিই একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহ্বান করেছে এবং যাবতীয় কল্যাণ, হেদায়াত, আলো ও জ্যোতি নিয়ে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَا كَانَ لِبَشَرِ أَن يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتٰبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادُ انِي مِنْ دُونِ اللهِ (آل عمران: ۷۹)
"কোন ব্যক্তির জন্য এটা সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে গ্রন্থ, নির্দেশ ও নবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা আমার দাস হয়ে যাও”। [সূরা আলে-ইমরান: ৭৯]
আল্লাহ তা'আলা এখানে বর্ণনা করেছেন যে, কোন মানবের জন্য এটা সমীচীন নয় - যাকে আল্লাহ গ্রন্থ, নির্দেশ ও নবুওয়াত দান করেছেন - মানুষকে এ নির্দেশ দেয়া যে, তারা যেন আল্লাহর পরিবর্তে তাকেই ইলাহ্ হিসাবে গ্রহণ করে নেয়; কেননা আল্লাহর গ্রন্থসমূহ ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করার নির্দেশ নিয়েই এসেছে।
আল্লাহর গ্রন্থসমূহ যে, সত্য ও হেদায়াত নিয়ে এসেছে সে কথা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেনঃ
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ (آل عمران : ٣-٤)
"তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন যা তার পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী। আর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল - ইতিপূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য"। [সূরা আলে-ইমরান: ৩-৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَتَ اللهُ النَّبِّيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الكتب بِالْحَقِّ (البقرة : ۲۱۳)
"সমস্ত মানুষ ছিলো একই উম্মাত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাদের সাথে সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেন"। [সূরা আল-বাকারাহ : ২১৩]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ ﴾ (المائدة : ٤٤)
"নিশ্চয়ই আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, এতে ছিলো হেদায়াত ও আলো"। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَآتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورُ ﴾ (المائدة : ٤٦)
"আর আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো"। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৬]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ (البقرة : ١٨٥)
"রামাদান মাস, এতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের জন্য হেদায়াতস্বরূপ এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে"। [সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৫]
এতদ্ব্যতীত আরো সে সকল আয়াতও এর অন্তর্ভুক্ত যাতে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার গ্রন্থসমূহ তাঁরই পক্ষ থেকে হেদায়াত ও আলো নিয়ে এসেছে।
৩. এ বিষয়ে ঈমান আনয়ন করা যে, আল্লাহর গ্রন্থসমূহের একটি অন্যটিকে সত্য প্রতিপন্ন করে। অতএব এগুলোর মধ্যে কোন পরস্পর বিরোধ ও বৈপরীত্য নেই, যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন:
﴿ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّ قَالَمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنَّا عَلَيْهِ ﴾ (المائدة : ٤٨ )
"আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপনকারীরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৮]
ইঞ্জিল সম্পর্কে তিনি বলেনঃ
﴿ وَاتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورُ وَ مُصَدٍ قَالِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَيةِ ﴾ (المائدة : ٤٦)
"আর আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো, তা ছিলো পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৬]
সুতরাং এ বিষয়ে ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহর গ্রন্থসমূহ যে সকল প্রকার পরস্পর বিরোধ ও বৈপরীত্য থেকে মুক্ত এ বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। এটা মূলতঃ সৃষ্টিজগতের গ্রন্থসমূহ থেকে স্বতন্ত্র আল্লাহর গ্রন্থসমূহের ও সৃষ্টির বাণী থেকে স্বতন্ত্র আল্লাহর বাণীর সুমহান বৈশিষ্ট্যেরই অন্তর্গত; কেননা সৃষ্টিজগতের গ্রন্থসমূহ ত্রুটি, বিচ্যুতি ও পরস্পর বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআনের বর্ণনায় বলেছেন:
﴿ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ﴾ (النساء: ۸۲)
“যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসংগতি পেত”। [সূরা আন-নিসা: ৮২]
৪. আল্লাহ তা'আলা সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর যে সব গ্রন্থের নামোল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা এবং সেগুলোকে সত্য বলে স্বীকার করা। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সেগুলো সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন তারও সত্যায়ন করা। এ গ্রন্থসমূহ হল:
ক. তাওরাত : এটি আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِنْ بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ الْأُولَى بَصَائِرَ لِلنَّاسِ﴾ (القصص: ٤٣)
“পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর আমরা তো মূসাকে দিয়েছিলাম গ্রন্থ, মানব জাতির জন্য জ্ঞান-বর্তিকাস্বরূপ”। [সূরা আল-কাসাস: ৪৩]
ইমাম বুখারী ও মুসলিম আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস থেকে শাফা'আতের যে দীর্ঘ হাদীসটি মারফু' পন্থায় সঙ্কলন করেন তাতে রয়েছেঃ
.. فيأتون إبراهيم فيقول : لست هناكم ويذكر خطيئته التي أصابها ولكن ائتوا موسى عبداً آتاه الله التوراة وكلمه تكليماً
"... অতঃপর তারা ইব্রাহীমের কাছে আসবে। তিনি বলবেন, 'আমি তোমাদের ঐ কাজের উপযুক্ত নই' এবং তিনি নিজের সে ভুলের কথা উল্লেখ করবেন যা তিনি করেছিলেন, 'তোমরা বরং মূসার কাছে যাও, যিনি এমন এক বান্দা যাকে আল্লাহ তাওরাত প্রদান করেছেন এবং তার সাথে বাক্যালাপ করেছেন'.."¹। আল্লাহ মূসার উপর তাওরাত ফলকে লিপিবদ্ধ অবস্থায় নাযিল করেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ﴾ (الأعراف: ١٤٥)
"আমরা তার জন্য ফলকে সর্ববিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি”। [সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৫]
ইবনে আব্বাস বলেন, '(আলওয়াহ দ্বারা) আল্লাহ তাওরাতের ফলক বুঝিয়েছেন'। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আদম ও মূসার বাদানুবাদের হাদীসে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত:
.. قال له آدم يا موسى اصطفاك الله بكلامه وخط لك التوراة بيده»
"...আদম তাকে বললেন, 'হে মূসা! আল্লাহ আপনাকে স্বীয় বাণী দ্বারা মনোনীত করেছেন এবং নিজ হাতে আপনার জন্য তাওরাত লিখেছেন"¹। ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে অনেকগুলো সনদে এটি সঙ্কলন করেছেন।
তাওরাত বনী ইসরাঈলের সর্ববৃহৎ গ্রন্থ। এতে তাদের শরীয়ত এবং মূসার উপর আল্লাহ যে হুকুম-আহকাম নাযিল করেছেন তার বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে। মূসার পরে আগত বনী ইসরাঈলের নবীগণ এ গ্রন্থ মোতাবেক আমল করতেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَيٰةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُواْ لِلَّذِينَ هَادُواْ وَالرَّبَّـٰنِيُّونَ وَالأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُواْ مِن كِتَـٰبِ اللَّهِ وَكَانُواْ عَلَيْهِ شُهَدَاء ۚ﴾ (المائدة : ٤٤)
"নিশ্চয়ই আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, এতে ছিলো হেদায়াত ও আলো। নবীগণ, যারা ছিলেন আল্লাহর অনুগত, তারা এবং আল্লাহওয়ালা ও বিদ্বানগণ ইয়াহুদীদেরকে তদনুসারে হুকুম দিতেন কারণ তাদেরকে আল্লাহর গ্রন্থ সংরক্ষনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আর তারা ছিলো এর সাক্ষী”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪]
ইয়াহুদীরা তাওরাতের যে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধন করেছিলো আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে সে সংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ চাহেত অচিরেই পরবর্তী পরিচ্ছেদে এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আসবে।
খ. ইঞ্জিল : এটি হচ্ছে আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি 'ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিমাস সালামের উপর নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَقَفَّيْنَا عَلَىٰ آثَارِهِم بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَيٰةِ وَآتَيْنَاهُ الْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَيٰةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ ۚ﴾ (المائدة : ٤٦)
"আর আমরা তাদের পশ্চাতে মারইয়াম তনয় 'ঈসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারীরূপে প্রেরণ করেছিলাম। আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো, তা ছিলো পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী এবং মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশ”। [সূরা আল- মায়িদাহ: ৪৬]
আল্লাহ তা'আলা তাওরাতকে সত্য প্রতিপন্নকারী ও এর সমার্থকরূপে ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেন, যেমনটি পূর্বেকার আয়াতটিতে বলা হয়েছে।
কোন কোন আলেম¹ বলেন, 'লোকেরা তাওরাতের যে সকল আহকামের মধ্যে মতভেদে লিপ্ত ছিলো তার খুব কম সংখ্যকের ক্ষেত্রেই ইঞ্জিল তাওরাতের খেলাফ করেছে, যেমন আল্লাহ মাসীহ সম্পর্কে খবর দিয়েছেন যে, তিনি বনী ইসরাঈলের উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ
وَ لِاُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ (آل عمران : ٥٠)
“এবং তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ ছিলো তার কিছু যেন আমি বৈধ করে দেই”। [সূরা আলে-ইমরান : ৫০]
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থ কুরআন কারীমে জানিয়েছেন যে, তাওরাত ও ইঞ্জিল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পেশ করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ (الأعراف: ١٥٧)
"যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়"। [সূরা আল-আ'রাফ : ১৫৭]
তাওরাতে যে বিকৃতি ঘটেছিল, ইঞ্জিলেও সে একই বিকৃতি সাধন করা হয়েছিল, আল্লাহ চাহেত যার বর্ণনা আগত পরিচ্ছেদে করা হবে।
গ. যাবুর : এটি আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি দাউদ আলাইহিস সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَآتَيْنَا دَاوُدَ زَبُورًا ﴾ (النساء: ١٦٣)
"আর আমরা দাউদকে যাবুর প্রদান করেছিলাম”। [সূরা আন-নিসা : ১৬৩]
কাতাদাহ আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'আমরা বলাবলি করতাম যে, এটা ছিলো এমন দো'আ যা আল্লাহ দাউদকে শিখিয়েছিলেন এবং মহান আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি এবং গৌরব ও মহিমা কীর্তন। এতে কোন হালাল ও হারাম এবং ফরয ও দন্ডনীয় শাস্তির বর্ণনা ছিলো না'।
ঘ. ইব্রাহীম ও মুসার সহীফাঃ কুরআনের দু'টি স্থানে এগুলোর উল্লেখ এসেছে। প্রথমটি হল সূরা আন-নাজমে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীতেঃ
أَمْ لَمْ يُنَأُ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى * وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِى وَفَى * أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى * وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (النجم: ٣٦-৩৯)
“তাকে কি অবগত করা হয়নি যা আছে মূসার গ্রন্থে, এবং ইব্রাহীমের গ্রন্থে যিনি পালন করেছিলেন তার দায়িত্ব? তা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না, আর এই যে, মানুষ তা-ই পায় যা সে করে”। [সূরা আন-নাজম: ৩৬-৩৯]
আর দ্বিতীয় স্থানটি হল সূরা আল-আ'লার মধ্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى * وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى * bَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا * وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وابقى * إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الأولى * صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى (الأعلى: ১৪-১৯)
"নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও সালাত আদায় করে। কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী। এতো আছে পূর্ববর্তী সহীফাসমূহে, ইব্রাহীম ও মুসার সহীফাসমূহে”। [সূরা আল-আ'লা: ১৪-১৯]
আল্লাহ তা'আলা এ সহীফাসমূহে স্বীয় রাসূলদ্বয় ইব্রাহীম ও মূসা আলাইহিমাস সালামের উপর যে ওহী নাযিল করেছিলেন তার কিয়দংশ সম্পর্কে এখানে অবহিত করেছেন। জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে।
৬. মহাগ্রন্থ আলকুরআন : এটি আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের উপর পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী ও সত্যাসত্য নিরূপনকারীরূপে অবতীর্ণ করেছেন। নাযিল হওয়ার দিক থেকে এ হল আল্লাহর সর্বশেষ গ্রন্থ এবং গ্রন্থসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ও সর্বাধিক পরিপূর্ণ। এটি পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের রহিতকারী। জ্বিন ও মানব এ উভয় জাতির সবার জন্যই এর আহ্বান। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَّا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ (المائدة: ٤٨)
“আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর উপর সাক্ষীরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৮]
আয়াতে বর্ণিত مُهَيْمِنًا শব্দের অর্থ হলঃ পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের উপর সাক্ষী ও সত্যাসত্য নিরূপকরূপে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَادَةً قُلِ اللهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآنُ لِأُنذِرَكُمْ بِهِ وَمَن بَلَغَ (الأنعام: ١٩)
“বলুন, কোন্ জিনিস সবচেয়ে বড় সাক্ষী? বলুন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা। আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যাতে তোমাদেরকে ও যাদের নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এর দ্বারা আমি সতর্ক করি”। [সূরা আল-আন'আম : ১৯]
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا (الفرقان : ١)
“কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল-ফুরকান: ১]
কুরআনের অনেকগুলো নাম রয়েছে। তম্মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হল: কুরআন, ফুরকান, আল-কিতাব, আত-তানযীল ও আয-যিক্র।
অতএব এ সকল গ্রন্থের যে সব নামের উল্লেখ কুরআন ও সুন্নার দলীলে এসেছে সে অনুযায়ী এগুলোর প্রতি ঈমান রাখা এবং এগুলো যাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, এগুলো সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু অবহিত করেছেন ও এসব গ্রন্থধারীদের যে সকল কাহিনী আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে, সে সব কিছুর প্রতি ঈমান রাখা ওয়াজিব।
৫. এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, (পূর্ববর্তী) যে সকল গ্রন্থ ও সহীফা আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের উপর নাযিল করেছিলেন, কুরআন কারীম দ্বারা সে সব গ্রন্থ রহিত হয়ে গেছে এবং মানব কিংবা জ্বিন কারো পক্ষেই এটা সম্ভব নয় - না পূর্ববর্তী গ্রন্থধারীদের কারো পক্ষে ও না তারা ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে - যে, তারা কুরআন নাযিলের পর কুরআনে যে হুকুম এসেছে তার পরিবর্তে অন্য হুকুম দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করবে কিংবা বিচার ফয়সালার জন্য অন্য বিধানের দ্বারস্থ হবে। কুরআন ও সুন্নায় এ বিষয়ে দলীলের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا (الفرقان : 1)
"কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল-ফুরকান: ১]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
يَاَهْلَ الْكِتٰبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتٰبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُورُ وَكِتٰبُ مُّبِينٌ * يَهْدِي بِهِ اللهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلٰمِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ (المائدة: ١٥-١٦)
"হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে থাকেন। আল্লাহর নিকট হতে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট গ্রন্থ তোমাদের নিকট এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান, আর তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৫-১৬]
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আহলে কিতাবদের মধ্যে কুরআন দ্বারা ফয়সালা করার নির্দেশ প্রদান করে বলেন:
فَاحْكُمُ بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَ كَ مِنَ الحَقِّ (المائدة: ٤٨)
"সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুসারে আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৮]
তিনি আরো বলেন:
وَأَنِ احْكُمُ بَيْنَهُم بِمَا أَنْزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَفْتِنُوكَ عَنْ بَعْضِ مَا انزَلَ اللهُ إِلَيْكَ (المائدة : ٤٩)
“আর আপনি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং তাদের খেয়াল-খশীর অনুসরণ করবেন না। আর তাদের ব্যাপারে সতর্ক হোন যাতে আল্লাহ আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন তারা এর কোন কিছু হতে আপনাকে বিচ্যুত না করে”। [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৯]
আর সুন্নাহ্ থেকে দলীল হল জাবের ইবনে عبدالله রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস। তা হল উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন একটি গ্রন্থ নিয়ে এলেন যা তিনি আহলে কিতাবদের কারো কাছে পেয়েছিলেন। তিনি তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠ করে শোনালেন। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেগে গিয়ে বললেনঃ
أمتهوكون فيها يا ابن الخطاب والذي نفسي بيده لقد جئتكم بها بيضاء نقية، لا تسألوهم عن شيء فيخبروكم بحق فتكذبوا به أو بباطل فتصدقوا، والذي نفسي بيده لو أن موسى كان حياً، ما وسعه إلا أن يتبعني
"হে ইবনুল খাত্তাব! তোমরা কি আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে পেরেশান? যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! আমি তো শ্বেত-শুভ্র পরিচ্ছন্ন হুকুম নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। তোমরা আহলে কিতাবদেরকে কোন কিছু সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করো না; কেননা তারা তোমাদেরকে সত্য সংবাদ দিলে তোমরা তা মিথ্যা মনে করতে পার অথবা তারা কোন বাতিল খবর তোমাদেরকে দিলে তোমরা তা সত্য বলে ভাবতে পার। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যদি মূসা জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ না করার সাধ্য তার হতো না”¹। হাদীসটি আহমাদ, বাযযার, বায়হাকী ও অন্যান্য আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন। সকল সনদ মিলে হাদীসটি হাসান (উত্তম)। হাদীসে ব্যবহৃত متهوکون শব্দটির অর্থ: পেরেশান।
সংক্ষিপ্তভাবে আল্লাহর গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা চাহেত একটি পৃথক পরিচ্ছেদে বিশেষভাবে কুরআনের ক্ষেত্রে কি আক্বীদা পোষণ করা ওয়াজিব তার বিস্তারিত বিবরণ আসবে।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৪১০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৯৩)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৬১৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৫২), একটি বর্ণনায় এসেছে, "তিনি আপনার জন্য নিজ হাতে তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন"。
¹ তাফসীরে ইবনে কাসীর (২/৩৬)
¹ মুসনাদে ইমাম আহমাদ (৩/৩৮৭), কাশফুল আসতার (১৩৪), শোআ'বুল ঈমান, বায়হাকী (১৭৭)
📄 একথার বর্ণনা যে, তাওরাত, ইঞ্জিল ও অন্যান্য কতিপয় গ্রন্থে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং কুরআন তা থেকে মুক্ত
আহলে কিতাব কর্তৃক আল্লাহর বাণীর বিকৃতি সাধন :
আহলে কিতাবগণ তাদের উপর অবতীর্ণ আল্লাহর গ্রন্থসমূহের যে বিকৃতি, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেছিলো সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে অবহিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলেনঃ
﴿اَفَتَطْمَعُونَ اَنْ يُّؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلمَ اللهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ﴾ (البقرة: ٧٥)
"তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, তারপর তারা তা অনুধাবন করার পর বিকৃত করে এমতাবস্থায় যে, তারা জানে”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৭৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
﴿مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ ﴾ (النساء: ٤٦)
"ইয়াহুদীদের মধ্যে কিছু লোক কথাগুলো স্থানচ্যুত করে বিকৃত করে”। [সূরা আন-নিসা: ৪৬]
নাসারাদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصْرَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ * يَاهْلَ الْكِتٰبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الكِتٰبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ ﴾ (المائدة: ١٤-١٥)
“যারা বলে, 'আমরা নাসারা' তাদেরও অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তার একাংশ তারা ভুলে গিয়েছে। সুতরাং আমরা তাদের মধ্যে ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রেখেছি। আর তারা যা করত আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন। হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে থাকেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৪-১৫]
এ আয়াতসমূহে এ প্রমাণ রয়েছে যে, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ তাদের উপর অবতীর্ণ আল্লাহর গ্রন্থসমূহের বিকৃতি সাধন করেছে। কখনো এ বিকৃতি সাধিত হয়েছে (গ্রন্থে নতুন কিছু) সংযোজনের মাধ্যমে এবং কখনো (গ্রন্থের কিছু) বাদ দেয়ার মাধ্যমে।
সংযোজনের দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী:
۞ فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۖ فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ ۞ (البقرة : ٧٩)
"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, 'এটা আল্লাহর নিকট হতে'। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস এবং তারা যা উপার্জন করেছে সে জন্য তাদের ধ্বংস”। [সূরা আল-বাকারাহ: ৭৯]
বাদ দেয়ার দলীল আল্লাহর বাণী:
۞ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ ۞ (المائدة: ١٥)
“হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৫]
এবং আল্লাহর বাণী:
۞ قُلْ مَنْ أَنْزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَىٰ نُورًا وَهُدًى لِلنَّاسِ ۖ تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا ۞ (الأنعام: ٩١)
"বলুন, কে নাযিল করেছে মূসার আনীত গ্রন্থ মানুষের জন্য আলো ও হেদায়াতস্বরূপ, যা তোমরা বিভিন্ন পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করে কিছু প্রকাশ কর ও অনেকাংশ গোপন রাখ”। [সূরা আল-আন'আম : ৯১]
তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিকৃতি সাধন এবং এর দলীলঃ
ইতিপূর্বে যা বলা হয়েছে তা ছিলো আহলে কিতাবগণ আল্লাহর বাণী ও গ্রন্থসমূহের যে বিকৃতি সাধন করেছিলো সংক্ষিপ্তভাবে তার বর্ণনা। তবে বিশেষভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিলে যে বিকৃতি সাধিত হয়েছে পুর্বে বর্ণিত কিছু দলীল ও অন্য আরো অনেক দলীল এর প্রমাণ বহন করছে।
তাওরাতে বিকৃতি সাধনের দলীলের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণীঃ
قُلْ مَنْ أَنْزَلَ الْكِتَبَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَى نُورًا وَ هُدًى لِلنَّاسِ تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا وَعِلْمُهُمْ قَالَمْ تَعْلَمُوا أَنْتُمْ وَلَا آبَاؤُكُمْ قُلِ اللهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ (الأنعام: ٩١)
"বলুন, কে নাযিল করেছে মূসার আনীত গ্রন্থ মানুষের জন্য আলো ও হেদায়াতস্বরূপ, যা তোমরা বিভিন্ন পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করে কিছু প্রকাশ কর ও অনেকাংশ গোপন রাখ এবং যা তোমাদের পিতৃপুরুষগণ ও তোমরা জানতে না তাও তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল? বলুন, আল্লাহই; অতঃপর তাদেরকে তাদের বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দিন তারা খেলা করতে থাকুক”। [সূরা আল-আন'আম : ৯১]
আয়াতটির তাফসীরে এসেছে: 'অর্থাৎ মূসা যে গ্রন্থ নিয়ে এসেছিলেন তোমরা তাকে কাগজের পাতায় রাখ; যাতে তোমরা এর যে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধনসহ তাতে উল্লেখিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গুণাবলী গোপন করতে চাচ্ছ তা সম্পন্ন হয়'।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
افَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَمَ اللهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ ﴾ (البقرة : ٧٥)
“তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে তারপর তারা তা অনুধাবন করার পর বিকৃত করে”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৭৫]
সুদ্দী আয়াতটির তাফসীরে বলেন, 'তা হল তাওরাত, যাকে তারা বিকৃত করেছিল'। ইবনে যায়েদ বলেন, 'যে তাওরাত আল্লাহ তাদের উপর নাযিল করেছিলেন তারা তা বিকৃত করে ফেলে, এর মধ্যে বর্ণিত হালালকে তারা হারাম, হারামকে হালাল, হককে বাতিল এবং বাতিলকে হকে পরিণত করে নিয়েছিল'।
আর ইঞ্জিলকে বিকৃত করার দলীল আল্লাহর বাণী:
﴿ وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصْرَى أَخَذْنَا مِيْثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظَّامِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ * يَاهْلَ الْكِتٰبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الكِتُبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ ﴾ (المائدة: ١٤-١٥)
"যারা বলে, 'আমরা নাসারা' তাদেরও অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তার একাংশ তারা ভুলে গিয়েছে। সুতরাং আমরা তাদের মধ্যে ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রেখেছি। আর তারা যা করত আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন। হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে থাকেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৪-১৫]
শেষোক্ত আয়াতটির তাফসীরে তাফসীরবিদ ইমামদের কেউ বলেন, 'অর্থাৎ তারা যার পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করেছিলো এবং যাকে প্রকৃত অর্থ হতে ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করেছিলো ও এতে আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করেছিল, রাসূল তা বর্ণনা করে দেবেন। আর তারা এতে যে পরিবর্তন এনেছিলো তার বহু কিছু সম্পর্কে তিনি চুপ থাকবেন, তা বর্ণনায় কোন লাভ নেই"¹。
তাওরাত ও ইঞ্জিলে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধিত হওয়ার উপর এ আয়াতগুলোতে প্রমাণ রয়েছে। এজন্যই মুসলিম ওলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, তাওরাত ও ইঞ্জিলে বিকৃতি ও পরিবর্তনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
বিকৃতি থেকে কুরআনের মুক্তি ও আল্লাহ কর্তৃক এর সংরক্ষণ এবং তার দলীল : পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে যে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে মহাগ্রন্থ আলকুরআন তা থেকে মুক্ত এবং আল্লাহর হেফাযত ও সংরক্ষণ দ্বারা সে সব কিছু থেকে তা সুরক্ষিত, যেমন আল্লাহ সে সম্পর্কে তাঁর নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা জানিয়ে দিয়েছেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ ﴾ (الحجر: ٩)
"আমরাই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক”। [সূরা আর- হিজর : ৯]
ত্বাবারী আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'আল্লাহ বলেন, আমি অবশ্যই কুরআনের হেফাযত করব তাতে কোন বাতিল সংযোজিত হওয়া থেকে যা কোনক্রমেই কুরআনের অন্তর্গত নয়, অথবা তার কোন হুকুম, শাস্তি ও ফরযের কোন কিছুতে ঘাটতি সৃষ্টি করা থেকে”¹。
অনুরূপভাবে আল্লাহ যে কুরআনকে সুদৃঢ় ও বিশদ ব্যাখ্যা সম্বলিত করেছেন এবং সকল প্রকার বাতিল হতে তাকে মুক্ত রেখেছেন, সে সম্পর্কে অন্যান্য আয়াতসমূহে তিনি সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
﴿ لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ ﴾ (فصلت: ٤٢)
"কোন বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না - অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ”। [সূরা ফুসিলাত : ৪২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
الركب أحكمت ايته ثُمَّ فَصَلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ﴾ (هود: 1)
"আলিফ-লাম-রা, এমন গ্রন্থ যার আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত ও পরে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে বিশদভাবে বিবৃত”। [সূরা হুদ: ১]
মহান আল্লাহ বলেনঃ
لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ * إِنَّ عَلَيْنَا جَمُعَهُ وَقُرَانَهُ ﴾ (القيامة : ١٦-١٧)
"তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা এর সাথে সঞ্চালন করবেন না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমাদেরই”। [সূরা আল- কিয়ামাহঃ ১৬-১৭]
কুরআন নাযিল হওয়া থেকে শুরু করে সকল প্রকার পরিবর্তন ও রূপান্তর থেকে মুক্তাবস্থায় আল্লাহ নিজের কাছে তা উঠিয়ে নেয়ার অনুমতি দেয়া পর্যন্ত শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে তা যে আল্লাহর পরিপূর্ণ হেফাযতে রয়েছে এ আয়াতগুলোতে সে প্রমাণ বিদ্যমান; কেননা আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআন শিক্ষা দেয়ার ভার নিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তার বক্ষে তা জমা করেন। আর কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা রয়েছে তার পবিত্র সুন্নায়। এরপর আল্লাহ একদল বিশ্বস্ত লোক প্রস্তুত করে দিয়েছেন যারা বক্ষে ও লিপিবদ্ধ করে কুরআনকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হেফাযত করেছে। ফলে কুরআন থেকে গেছে সকল প্রকার বাতিল হতে নিরাপদ ও মুক্ত, যা দেশ-কাল ভেদে ছোট বড় সকলেই পাঠ করে, টাটকা তাজাবস্থায় যেভাবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল হয়েছিল।
ওলামাগণ এ স্থানে একটি সুক্ষ্ম রহস্য ও চমৎকার বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যা তাওরাতে বিকৃতি সংঘটিত হতে পারা এবং কুরআনে তা সংঘটিত হতে না পারার সাথে সংশ্লিষ্ট, যেমনটি আবু 'আমর আদ-দানী বর্ণনা করেছেন আবুল হাসান আল-মুন্তাব থেকে। তিনি বলেছেন: 'আমি একদিন কাযী আবু ইসহাক ইসমা'ঈল ইবনে ইসহাকের কাছে ছিলাম। তাকে প্রশ্ন করা হল: তাওরাত অনুসারীদের উপর পরিবর্তন সাধনের ব্যাপারটি কেন ছাড়পত্র পেল অথচ কুরআন অনুসারীদের কাছে তা পেল না? কাযী সাহেব বললেন, মহান আল্লাহ তাওরাত গ্রন্থধারীদের ব্যাপারে বলেছেন:
بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِن كتب الله (المائدة : ٤٤)
"কারণ তাদেরকে আল্লাহর গ্রন্থ সংরক্ষন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪]
আল্লাহ হেফাযতের ভারটি তাদের উপর অর্পণ করেছেন। ফলে তাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অথচ কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ ﴾ (الحجر : ٩)
“আমরাই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক”। [সূরা আল- হিজর : ৯]
ফলে কুরআন অনুসারীদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন হতে পারেনি'। আবু 'আমর বললেন, এরপর আমি আবু عبدالله আল-মুহামেলীর কাছে গেলাম। তাকে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন, 'আমি এর চেয়ে সুন্দর কথা আর শুনিনি'।
টিকাঃ
¹ তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৬৩)
¹ তাফসীরে ইবনে জারীর (১৪/৭)