📘 উলামা তলাবা > 📄 প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, উভয় শিবিরের চিন্তা-চেতনায় কোন পার্থক্য নেই

📄 প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, উভয় শিবিরের চিন্তা-চেতনায় কোন পার্থক্য নেই


কিন্তু এই যুগের বৈশিষ্ট্য হল, অর্থ-সম্পদ ও ইহ-জাগতিক উন্নতিকেই প্রকৃত উন্নতি ও চরম সফলতা বলে মনে করা হয়। বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এই উভয় শিবিরের দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন। মতভেদ ও অনৈক্য শুধু অর্থ-সম্পদ ও জীবনোপকরণের উপার্জন ও তা ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কোন মতবাদ ও দর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর অর্থ-সম্পদ ও জীবনোপকরণ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে তা নিয়ে। আমেরিকার বক্তব্য হল- অর্থ-সম্পদে ব্যক্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা ও তা ব্যবহারের যথেচ্ছা স্বাধীনতার নীতিই বিশুদ্ধ ও সঠিক নীতি। পক্ষান্তরে রাশিয়া সহ কমিউনিস্ট ব্লক বিশ্বাস করে যে, অর্থ-সম্পদে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বা কোন বিশেষ শ্রেণীর ইজারাদারী চলবে না। জীবনোপকরণকে ব্যাপক করে দেওয়া উচিত এবং তাতে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। আর তা করতে অর্থ-সম্পদ ও তা উপার্জনের উপকরণ রাষ্ট্রীয় অধিকারে থাকা উচিত। কিন্তু কিভাবে জীবন যাপন করতে হবে; জীবনের শক্তিকে কিভাবে ব্যবহার করা উচিত, জীবনকে কিভাবে সুসংহত করতে হবে, উপকরণ ও লক্ষ্যের মাঝে কিভাবে সেতু বন্ধন গড়ে তুলতে হবে, অতঃপর উৎপাদিত ফল দ্বারা কিভাবে উপকৃত হওয়া যাবে এবং জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য ও মনযিলে মাকসুদ কী, মানুষের প্রকৃত উন্নতি কোন জিনিসের মধ্যে নিহিত রয়েছে ইত্যাদি প্রশ্নে এই দুই মতবাদের মাঝে কোন মতপার্থক্য নেই। উভয় মতবাদ ও উভয় দর্শনই এ বিষয়ে এক ও অভিন্ন চিন্তাধারা লালন করে যে, জীবনের মূল লক্ষ্য হল ভোগ-বিলাসিতা, আনন্দ উপভোগ ও ইচ্ছার স্বাধীনতা। মন যা চায় তাই করা এবং প্রবৃত্তিকে জীবন উপভোগ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দান করা। নিজের পার্থিব লালসাকে পূর্ণ করা, প্রবৃত্তির অধিকার নিশ্চিত করা। এই অস্থি-মাংসের শরীরকে পূর্ণ শান্তি দান। এগুলোই জীবনের লক্ষ্য।

আমরা না অন্য কোথা থেকে এসেছি, না অন্য কোথাও যেতে হবে, না অন্য কারও সামনে আমাদের হিসাব-নিকাশ দিতে হবে। এতদপেক্ষা না উন্নত কোন চারিত্রিক দর্শন আছে, না আধ্যাত্মিক দর্শন, না আকীদা-বিশ্বাসগত কোন দর্শন। এটাই প্রকৃত সত্য এবং মহা সত্য হল- আমরা পৃথিবীতে এসেছি পৃথিবীর ধনভাণ্ডার ও ভোগ্য সামগ্রীকে কাজে লাগাতে। এগুলোকে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে ভোগ করতে। জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে। এ লক্ষ্য অর্জনের পথে যা কিছু বাধা তা দূর করতে হবে। অর্থাৎ ভোগবাদী সব দর্শনের লক্ষ্য হল ভোগ। এই ভোগের পথে অন্তরায় ও বাধা কোন বিষয়টি তা চিহ্নিত করণে ভোগবাদীদের মাঝে কিছুটা মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। কেউ বলে, ব্যক্তি-ক্ষমতা অন্তরায়, কোন গোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ আধিপত্য অন্তরায়। কেউ বলে, ব্যক্তি মালিকানা অন্তরায়। কেউ বলে পুঁজিবাদ অন্তরায়। কেউ বলে, সম্পদের বণ্টন-বৈষম্য অন্তরায়। কেউ বলে, অজ্ঞতা অন্তরায়। কেউ বলে, অন্তরায় হচ্ছে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি, যে প্রতিষ্ঠান জীবনোপকরণকে সকলের মাঝে সুষম বণ্টন করতে সক্ষম হবে।

মোটকথা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে কোন দর্শন ও মতবাদের কোন দ্বিমত নেই, দ্বিমত শুধু শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে। বর্তমান যুগে বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতাকে যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যেভাবে তাকে পরিশীলিত করে তার চটকদার নাম দেওয়া হয়েছে এবং সুদৃশ্য লেবেল লাগানো হয়েছে, এর পিছনে যে শক্তি ও মেধা ব্যয় হচ্ছে, যেভাবে বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতাকে ব্যাপকতা দান করতে এবং তাকে সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, আমাদের জানা মতে মানব ইতিহাসে এর পূর্বে তেমনটা হয়েছে বলে কোন রেকর্ড নেই।

অতএব বর্তমান যুগের সর্বাপেক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হল বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতার চ্যালেঞ্জ। এটা এমন এক সামগ্রিক মতবাদ ও দর্শন যে, এর বাস্তবায়নের নীতিমালা ও শাখা-প্রশাখা তো বিভিন্ন হতে পারে কিন্তু মৌলিকত্বে কোন পার্থক্য নেই। রূপ ও আকারগতভাবে তা হতে পারে পুঁজিবাদ কিংবা সমাজবাদ ও সাম্যবাদ বা অন্য কোন অর্থনৈতিক দর্শন কিন্তু সব মতবাদ ও দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হল ভোগবাদিতা ও প্রবৃত্তি-পূজা।

যখন মানুষ ছিল উদর প্রবৃত্তির দাস, হীন প্রবৃত্তি ও নিকৃষ্ট চাহিদার দাস, যখন মানুষের নিকট নারী, সম্পদ ও জমি-জমা ব্যতীত অন্য কোন কিছুরই কোন মূল্য ছিল না, যখন পৃথিবীর মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ব্যতীত সকলেই মাখলুকের সামনে মাথানত করত, মাখলুকের নিকট আত্মসমর্পণ করত তখন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম স্ব-স্ব যুগে আগমন করলেন এবং তাঁরা পৃথিবীবাসীকে জানালেন যে, এই জগতের পরেও এক জগত আছে। সেই জগত এই জগত অপেক্ষা বৃহৎ, আকর্ষণীয় ও মোহনীয়। যদি তোমরা সেই জগতকে দেখতে তবে এই ইহজগতকে প্রশ্রয় দেওয়া তোমাদের জন্য কঠিন হত। সেই জগত যদি তোমরা দেখ তাহলে এই জগতে জীবন যাপন করা ঐ মাছের ন্যায় হয়ে যাবে যাকে পানি থেকে উঠিয়ে পানিবিহীন শুষ্ক জায়গায় রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে সে ছটফট করে মৃত্যুবরণ করছে। তদ্রূপ তোমরা যদি ঐ জগতকে দেখ তাহলে তোমাদের চোখ খুলে যাবে এবং এই জগতের প্রতি তোমাদের ঘৃণা সৃষ্টি হবে। যে দুনিয়াকে তোমরা সর্বস্ব মনে করছ, যে দুনিয়ার জন্য তোমরা তোমাদের মুল্যবান সম্পদ- নৈতিকতা, চরিত্র ও জ্ঞান বিসর্জন দিচ্ছি সেই দুনিয়া তোমাদের নিকট ঘৃণিত মনে হবে। কোন ব্যক্তিকে যেমন মলমূত্র ও পুঁতিগন্ধময় আবর্জনার স্তূপের নিকট এক মিনিটের জন্যও দাঁড় করিয়ে দিলে তার দম বন্ধ হয়ে যেতে চায়, তার নাড়িভূড়ি বের হয়ে আসতে চায়, বমি হওয়ার উপক্রম হয় ঐ জগত দেখলে এই দুনিয়াকেও তোমাদের নিকট পুঁতিগন্ধময় মলমূত্র ও আবর্জনার স্তূপ বলে মনে হত। এই কথাই বিভিন্ন আসমানী গ্রন্থ বিশেষত কুরআন মাজীদ ব্যক্ত করেছে। বলেছে-

'বল, দুনিয়ার ভোগসামগ্রী যৎসামান্য।'

কোথাও দুনিয়াকে বলা হয়েছে খড়কুটা। কোথাও বলা হয়েছে শস্যক্ষেত। কোথাও বলা হয়েছে-

শস্যসম্ভারের ন্যায়, যা কৃষককে চমৎকৃত করে।

তা দেখে কৃষকের লোভী জিহ্বা হতে লালা টপকে পড়তে থাকে।

সে বলতে থাকে কী চমৎকার ক্ষেত্র, কী সুন্দর ফসল। অতঃপর এক ঝঞ্ঝা বায়ু আসে আর সব শস্যসম্ভারকে খড়-কুটায় পরিণত করে। কৃষকের কাস্তে তাতে ব্যবহারের পর সে বুঝতে পারে আসলে কিছুই নাই, সব শেষ হয়ে গেছে।

আল্লাহর নবীগণ সর্বপ্রথম দুনিয়ার স্বরূপ মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন যে, দুনিয়া প্রকৃতপক্ষে শিশুদের খেলাধুলা। শিশুরা ধুলোবালি দিয়ে ঘর বানায়, সংসার পাতে অতঃপর নিজের হাতেই তা ভেঙ্গে ফেলে। তাদের নির্মিত ক্ষণস্থায়ী ঘর দেখে তারা খুব আনন্দ বোধ করে কিন্তু ক্ষণকাল পরে নিজেরাই তা ভেঙ্গে ফেলে। যারা বুদ্ধিমান, সত্যসন্ধানী তাদের নিকট এই দুনিয়া শিশুদের নির্মিত ঐ খেলাঘর ব্যতীত কিছুই নয়।

একবার বাগদাদের একটি মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম অতীত যুগের বিভিন্ন সভ্যতা ও সমাজ-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সব নিদর্শন। এছাড়া নমরূদ সহ বিভিন্ন বাদশাহর যুগের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো স্মারক হিসেবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অতঃপর আমার মানসপটে ভেসে উঠল অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগ ও কাল। অতীতে বিচরণ করতে করতে আব্বাসীয় যুগ অতঃপর সেলজুকীয় যুগ, তাতারী যুগ, মোঘল শাসনের যুগ, তুর্কী যুগ, ইংরেজ যুগ, ফয়সাল বিন হুসাইন যুগ- এসব আমার মানসপটে ভেসে উঠল। আপনি বিশ্বাস করুন, ততক্ষণে পৃথিবীর ও যুগের এই পরিবর্তন চিন্তা করে আমার মাথা ঘুরতে লাগল। আমি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। আমার শুধু মনে হল- এই সবই তামাশা আর তামাশা। এসব বাদশাহী যুগের অবসান ঘটতে হাজার বছর লেগেছে। কোন কোন শাসনের অবসান ঘটতে লেগে গিয়েছিল পাঁচশত বৎসর। কিন্তু আমার মনে হতে লাগল, তাদের শাসনকাল ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। যা ছিল মূলত নিছক ধোঁকা আর তামাশা অথবা ছিল স্বপ্ন। মানুষ যাকে হাজার বছরের শাসন মনে করছে। আমরা সেসব শাসনের পরিসমাপ্তি দেখে ফেলেছি। আমরা এমন এক স্থানে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে মানবতার শুধু খড়কুটো পড়ে রয়েছে। আমরা যেন দাঁড়িয়ে আছি সেই খড়-কুটোর উপর। তদ্রূপ আমাদের পরে যারা আসবে তারাও এইরূপই দেখবে। তাদের নিকটও এইরূপই মনে হবে। আল্লাহ তাআলা সত্যই বলেছেন-

বল, দুনিয়ার ভোগ অত্যন্ত স্বল্প। আমরা যাকে অত্যন্ত দীর্ঘ মনে করি তা আসলে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত।

আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা দুনিয়াকে প্রাণচঞ্চল রাখা। এই কারণে দুনিয়ার স্বরূপ সম্পর্কে সকল মানুষের হৃদয়ে সমভাবে উপলব্ধি জাগ্রত করেননি। আল্লাহর অভিজ্ঞানে যাঁরা সমৃদ্ধ তাঁদের হৃদয়েই শুধু দুনিয়ার প্রকৃত রূপ, এর ক্ষণস্থায়িত্ব ও ধ্বংসশীলতার উপলব্ধি পরিপূর্ণভাবে দান করেছেন। সকলেই যদি সমভাবে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব, এর ভঙ্গুরতা সম্যকরূপে উপলব্ধি করত তাহলে দুনিয়া বিরাণভূমিতে পরিণত হত। এই দুনিয়ায় ঘর-বাড়ী নির্মাণ করতে কেউই আগ্রহী হত না। কল-কারখানা নির্মাণ করতে কারও মনে চাইত না। এটা আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল যে, তিনি দুনিয়ার স্বরূপকে মানুষের চোখের আড়াল করে রেখেছেন। দুনিয়ার স্বরূপ যদি সকলের চোখে উন্মোচিত হয়ে যেত, পরে যা ঘটবে তা যদি মানুষ পূর্বেই প্রত্যক্ষ করে ফেলত, তাহলে মানুষ কর্তৃক দুনিয়াতে কোন কর্মই সংঘটিত হত না। তাদের হয়তো দম বেরিয়ে যেত অথবা হাতের উপর হাত রেখে নিশ্চল বসে থাকত। নবীগণ ও নায়েবীনে নবীগণের কথা তো ভিন্ন। এটা তাঁদের পক্ষেই সম্ভব যে, তাঁদের সামনে দুনিয়ার স্বরূপ ও আখেরাত প্রত্যক্ষকরণের ন্যায় সুস্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা দুনিয়ার সকল কর্ম সম্পাদন করেছেন। দুনিয়ার হক আদায় করেছেন। ঘনিষ্ঠজন, সঙ্গী-সাথীর হক আদায় করেছেন। সকল মানুষের হক আদায় করেছেন। দুনিয়াতে তাঁরা বসবাস করেছেন যথোপযুক্ত যোগ্যতার সাথে। প্রশান্তির সাথে থেকেছেন, দৃঢ়তার সাথে থেকেছেন। নিজেদের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েছেন। যে জনপদে থেকেছেন, যে নগরে থেকেছেন তা সংস্কার করেছেন, পরিচ্ছন্ন করেছেন। কিন্তু তাঁরা এক মিনিটের জন্যও নিজের হৃদয়কে দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করেননি। তাঁরা সব সময় বলেছেন-

'হে আল্লাহ! আখেরাতের জীবনই একমাত্র জীবন।'

কেননা তারা পার্থিব জীবনের পরিণতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। তাঁরা নির্মাণ কাজও করেছেন, ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন, মসজিদও নির্মাণ করেছেন। ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। যুদ্ধ করেছেন, জয়লাভ করেছেন। বিভিন্ন দেশকে আল্লাহর আইনভুক্ত করেছেন। নতুন নতুন বিদ্যা ও শাস্ত্রের উদ্ভব ঘটিয়েছেন। ইতিহাসের এরূপ ভিত্তি রচনা করেছেন, যা আজ অবধি মজবুত ও শক্তিশালী রয়েছে। এই সবকিছু তাঁরা করেছেন। কিন্তু আমাদের ও তাঁদের মাঝে পার্থক্য হল, তাঁরা দুনিয়াকে শেষ মনযিল ও চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করেননি। তাঁরা দুনিয়াকে মনে করেছেন জীবন পথের সূচনা মনযিল।

তৎকালে অর্থ-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব ও ক্ষমতার যে সম্মোহনী শক্তি ছিল সেই সম্মোহনী শক্তিকে ভোগবাদিতা থেকে মুক্ত মানুষ ভেঙ্গে চুরমার করে দিত। ভোগবাদিতার দাস হয়ে যেত না। তারা অর্থ-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভবকে নিজেদের অনুগত করে নিত। তারা নিজেরা অর্থ-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভবের অনুগত হত না। তারা অর্থ-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভবের কাঁধে সওয়ার হয়ে চলত। তাদের কাঁধে এগুলো কখনও সওয়ার হতে পারত না। এ কালের সঙ্গে সে কালের পার্থক্য এটাই যে, এই কালে অর্থ-সম্পদ ও ভোগ-লিলা আমাদের কাঁধে সওয়ার হয়ে বসেছে। আমরা সেগুলোর বাহন হয়ে পড়েছি। আমরা সেগুলোকে বাহন বানিয়ে আরোহী হতে পারিনি। আরোহী হলেও এ রকম আরোহী যে, না বাহনের লাগাম আমাদের হাতে, না আমাদের পা বাহনের পা দানিতে।

📘 উলামা তলাবা > 📄 অল্পে তুষ্টি এক মহাসম্পদ

📄 অল্পে তুষ্টি এক মহাসম্পদ


সুধী! প্রকৃতপক্ষে বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতার মোকাবেলা ঐ সকল আলেমই করতে পারেন, যাঁদের মধ্যে অল্পে তুষ্টির মহা সম্পদ বিদ্যমান, যে সম্পদের কোন মূল্য হয় না। যাঁরা বলতে পারেন- যাও, অন্য কাউকে চেষ্টা করো, আমাদেরকে খরিদ করতে চেষ্টা করো না। আমরা অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে অথবা তোমাদের পদ ও পদবীর বিনিময়ে, সিংহাসনের বিনিময়ে অথবা সম্মানের বিনিময়ে নিজেদেরকে বিক্রি করে দেব, নিজেদের হৃদয়ের প্রশান্তিকে বিক্রি করে দেব তা হবে না। এর আশাটিও করো না।

হযরত মির্জা মাজহার জানে জাঁনা-র নিকট দিল্লীর বাদশাহ অনুরোধ জানিয়ে পাঠাল যে, হযরত! আপনি আমাকে কখনও আপনার খেদমতের সুযোগ দেন না। একটিবার অন্তত আপনার খেদমতের সুযোগ দিন। অন্তত একটিবার আমাকে আপনার জন্য কিছু করতে নির্দেশ দিন। এরপর দিল্লীর বাদশাহ তাঁর জন্য এক হাজার টাকা পাঠাতে চাইলেন। তিনি বলে পাঠালেন, দেখুন আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

বল, দুনিয়ার সামগ্রী অতি স্বল্প ও তুচ্ছ।

এই বিশাল পৃথিবীর মধ্যে এশিয়া মহাদেশ একটি অংশ মাত্র। এশিয়া মহাদেশের একটি ক্ষুদ্র দেশ হিন্দুস্তান। তারও একটি অংশবিশেষ আপনার শাসনাধীন। সেখান থেকেও আমি কিছু অংশ নিয়ে আপনার রাজত্ব ছোট করে দেব- তা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি কথাটি বলেছিলেন, অকৃত্রিমভাবেই, সম্পূর্ণ মন থেকে। এরূপ ঘটনা তো বহু আছে।

বুরহানপুরে এক বুযুর্গ ছিলেন। বাদশাহ আলমগীর তাঁর নিকট আসা-যাওয়া শুরু করলে তিনি বললেন, আমি আমার একটি স্থান নির্বাচিত করে নিয়েছি, এটাও যদি বাদশাহর পছন্দ হয়ে যায় তাহলে আমি অন্য কোথাও চলে যাব। দুঃখের বিষয়, বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন চরিত, তাঁদের ইতিহাস এমনভাবে লিখিত হয়েছে যে, তাতে তাঁদের শরীয়ত অনুসরণের আবেগ ও প্রেরণা, ইত্তিবায়ে সুন্নাতের জযবা ও আবেগ তাঁদের রাত্রি জাগরণ, কুরআন তেলাওয়াত, কুরআন ও হাদীসের সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় অনালোচিত থেকে গেছে। ‘তারীখে গুজরাট’-এর প্রণেতা মাওলানা হাকীম সাইয়েদ আবদুল হাই মরহুমের ভাষায়- যে বুযুর্গেরই জীবন চরিত পাঠ করবে তাতে মনে হবে যে, অলৌকিক ঘটনাবলী সংঘটিত করণ ও কারামত প্রদর্শন ব্যতীত যেন ঐ সকল বুযুর্গের আর কোন কাজ ছিল না। মৌল উপাদান-চতুষ্টয় (মাটি ও বাতাস, আগুন ও পানি) এবং সৃষ্টিত্রয় (উদ্ভিদ, জড়বস্তু ও প্রাণীকুল) এর উপর নিজেদের কর্তৃত্ব ও শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই যেন তারা সদা সচেষ্ট থাকতেন। অমুককে মেরে ফেলল, তমুককে যিন্দা করল, নৌকা ডুবে গেল তো আঙ্গুলের ইশারায় তাকে আবার পানির উপরে উঠিয়ে আনল ইত্যাদি। ঐ সকল বুযুর্গের জীবন ইতিহাস ভ্রান্ত ধারায় লিখিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ছিলেন অনেক বড় জ্ঞানী, পর্যাপ্ত জ্ঞানের অধিকারী। হাঁ কখনও কখনও কোন কোন বুযুর্গ কর্তৃক বিশুদ্ধ হাদীস জানা না থাকার কারণে অথবা হাদীস শাস্ত্রীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ দখল না থাকার কারণে এরূপ কাজ সংঘটিত হয়ে গেছে, যা হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয় না। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা জ্ঞান ও ইলমের অধিকারী ছিলেন। ইলম ব্যতীত মুরশিদের পদে কেউ অধিষ্ঠিত হতে পারে না।

📘 উলামা তলাবা > 📄 হিকমাহ বলে আখলাক বোঝানো হয়েছে

📄 হিকমাহ বলে আখলাক বোঝানো হয়েছে


হিকমাহ্ বলে আখলাকে ফাযেলা ও উন্নত চরিত্র বোঝানো হয়েছে। আমাদের উস্তাদ স্ব-যুগের বিশিষ্ট গবেষক মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর গবেষণা ও তাহকীক তেমনটাই বলে। তিনি বলেন যে, হিকমাহ শব্দটি কুরআন কারীমের যত জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে, সর্বত্র তা দ্বারা চরিত্র বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

'আমি লুকমানকে হেকমত দান করেছি।'

এরপর যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে সবই চরিত্র আর চরিত্র। প্রথমে হিকমাহ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর হিকমাহর যে শাখা-প্রশাখা আলোচিত হয়েছে তার সবই আখলাক ও চরিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। সূরা বনী ইসরাঈলে আখলাক সংক্রান্ত বিষয়াবলী বর্ণনার পর আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

'তোমার প্রতিপালক ওহীর দ্বারা যে হিকমাহ দান করেছেন এইগুলি তার অন্তর্ভুক্ত।' (সূরা বনী ইসরাঈল ৩৯)

এখানে উন্নত চরিত্রসমূহ বর্ণনার পর সেইগুলোকে হিকমাহ'র অন্তর্ভুক্ত বলে বলা হয়েছে। অতএব বোঝা গেল যে, হিকমাহ হল চরিত্র, উন্নত চরিত্র।

📘 উলামা তলাবা > 📄 তাযকিয়াহ ব্যতীত কিতাব ও হিকমাহ’র শিক্ষা অসম্পূর্ণ

📄 তাযকিয়াহ ব্যতীত কিতাব ও হিকমাহ’র শিক্ষা অসম্পূর্ণ


এরপর আসে নফসের পবিত্রতা অর্জনের বিষয়। মন্দ চরিত্রকে অন্তর থেকে বের করে দেওয়া, হিংসা-বিদ্বেষকে দূরীভূত করা। পার্থিব লালসা, অর্থ ও ক্ষমতা লিপ্সাকে দূরীভূত করা। এর পরিবর্তে অন্তরে আল্লাহর প্রেম, আখেরাতের আকাঙ্ক্ষা, জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা অন্তরে সৃষ্টি করা। যে কোন জামেয়া ও দারুল উলুমের লক্ষ্য হওয়া উচিত এরূপ ব্যক্তিত্ব তৈরি করা, যারা তেলাওয়াত, তালীমে কিতাব, তালীমে হিকমাহ এবং তাযকিয়ায়ে নফস- এই চার বিভাগেই আম্বিয়ায়ে কেরামের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তেলাওয়াত ও তালীমে কিতাব ও তালীমে হিকমাহ অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত থেকে যাবে যদি এগুলোর সঙ্গে তাযকিয়ায়ে নফস না থাকে। অর্থাৎ আমাদের উলামায়ে কেরামকে নফস ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যেতে হবে। সম্পদ ও সম্মানের কোন বিশাল পরিমাণও তাদেরকে নিজস্ব নীতি হতে, দাওয়াতী কার্যক্রম হতে, তাদের স্বকীয়তা হতে, শিক্ষা হতে এবং জীবন পদ্ধতি হতে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারবে না- তাদেরকে এরূপ হতে হবে।

আজ আরব ও আযম কোন জায়গাতেই কোন কিছুর অভাব নেই, অভাব শুধু একটি জিনিসের। আর তা হল সাদাসিধা ও দুনিয়াবিমুখ জীবন যাপন এবং অল্পে তুষ্টি গুণ। মানুষ সেখানেই যায় যেখানে তার প্রয়োজনীয় ও অভাবের বস্তুর সন্ধান পায়। এটাই রীতি। আমার যদি কোন জিনিসের অভাব থাকে তাহলে আমি ভীত ও হীনবল থাকব। হাঁ তা যদি আমার নিকট বিশের জায়গায় ঊনিশ পরিমাণও থাকে তাহলে আমি মার খাব না অন্যের নিকট মাথা নত করব না। তো যারা এখন ভোগবাদিতা ও বস্তুবাদিতার আঘাতে জর্জরিত এরা যখন নিজেদের ক্ষত প্রশমনের জন্য উলামায়ে কেরামের নিকট যায় এবং দেখে যে, উলামায়ে কেরামও আমাদের চেয়ে ভোগবাদিতা ও বিলাসিতায় কোন অংশে কম নয়, তখন তারা উলামায়ে কেরাম কর্তৃক প্রভাবিত হওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রতি অনাস্থাশীল হয়ে ওঠে, তাদের অন্তরের কুধারণা আরও বৃদ্ধি পায়। অতএব এই দেশে ঐ জাতীয় আলেম গড়ে উঠুক, যাঁরা হবেন-

এর উপর আমলকারী। হবেন নববী উত্তরাধিকারের বাহক-

'নবীগণ দীনার ও দিরহাম (তথা টাকা-পয়সার) উত্তরাধিকার রেখে যান না বরং তারা রেখে যান ইলমের উত্তরাধিকার।'

বর্তমান যুগের চ্যালেঞ্জ হল বস্তুবাদিতা ও ভোগবাদিতা। এই চ্যালেঞ্জের জবাব হল ভোগবাদিতা ও বস্তুবাদিতার ঊর্ধ্বে অবস্থান। ভোগবাদিতার ভূমি থেকে উচ্চে বিচরণ এবং এটা প্রমাণ করণ যে, অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আমাদেরকে কিছুমাত্র বিচলিত করে না। এগুলো আমাদেরকে প্রভাবান্বিত করতে পারে না। আমরা অর্থ-সম্পদের গোলাম নই। আমি একথা বলছি না যে, আমরা হালাল বস্তুকেও নিজেদের জন্য হারাম ও অবৈধ জ্ঞান করব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

'বল, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের জন্য যে শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে?' (সূরা আরাফ ৩২) এবং বলেছেন-

'হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন তা তোমার জন্য নিষিদ্ধ করছ কেন?' (সূরা তাহরীম ১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন আল্লাহ তাআলা এরূপ বলেছেন, তখন আমরা তো কোন ছার? আমরা হালাল বস্তুকে পূর্ণরূপে কাজে লাগাব। আল্লাহর নেয়ামত রাজি কে সোৎসাহে কাজে লাগাব। আমরা যদি উন্নত ও উপাদেয় খাদ্য খেতে সক্ষম হই তবে অযথাই তাকে বিস্বাদ বানিয়ে নেব না। যেমন অনেক অতি সুফীদের কথা শোনা যায় যে, তরকারীতে অতিরিক্ত পানি দিয়ে দিয়েছে, যাতে তা বিস্বাদে পরিণত হয়। প্রতিবেশীদেরকে দেওয়ার জন্য নয় বরং তরকারীকে বিস্বাদযুক্ত বানানোর জন্য অতিরিক্ত পানি ঢেলে দিয়েছে অথবা বেশি করে লবণ দিয়ে দিয়েছে, যাতে তরকারী বিস্বাদযুক্ত হয়। এটা ইসলামের তাযকিয়া নয়। শরীয়ত এরূপ করতে উৎসাহিত করে না। আপনার যদি সুস্বাদু খাবার খাওয়ার সামর্থ থাকে, তবে অবশ্যই তা খাবেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন, প্রত্যেক লুকমায়, প্রত্যেক গ্রাসে শুকরিয়া আদায় করবেন। কিন্তু 'আরো চাই'-এর লালসা- যা আজ সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, অর্থ-সম্পদের কোন পরিমাণই, ক্ষমতার কোন স্তরই তাদেরকে তৃপ্ত করতে পারছে না, সর্বদা 'আরও চাই' -ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে; তা থেকে উলামায়ে কেরামকে মুক্ত থাকতে হবে। ঐরূপ মানসিকতা থেকে মুক্ত থেকে তাদেরকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00