📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা ও রাজনীতি

📄 যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা ও রাজনীতি


"People shouldn't be afraid of their government. Governments should be afraid of their people." -Alan Moore

কিছু সমসাময়িক প্রশ্ন দিয়েই সূচনা করা যাক। বেসামরিক ইয়েমেনিরা মারা যাবে এটা জেনেও কেন ওয়াশিংটনকে রিয়াদের সাথে অস্ত্র চুক্তি করতে হয়? কেন মস্কোতে বসে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে সিরিয়ায় ড্রোন হামলা চালাতে হয়? কেন তেহরানে প্রতিবছর ইরানি সাইনটিস্টদের মৃত লাশ পাওয়া যায়? সফট পাওয়ারের এই যুগে কেন বেইজিং বহুল আক্রমণাত্মক "Wolf Warrior Diplomacy” বেছে নিয়েছে? প্যারিসের মদদে কেন অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশে কয়েকদিন পরপরই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে? কেনই বা ল্যাটিন আমেরিকার সান্তিয়াগোয়, কারাকাসে, কিংবা হাভানায় 'The Chicago Boys' দের উদ্ভব ঘটে? কেন মুসলিম বিশ্ব প্যান ইসলামিজমের কথা ভুলে গিয়ে তেল আবিবের সাথে সম্পর্ক 'Normalization' এর কথা ভাবছে? ঢাকা কেন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ভাবছে? সম্প্রতি কোয়াড ইস্যুতে সিডনি কেন দিল্লির শরণাপন্ন হয়েছে? কেন দিনদিন আঙ্কারার সাথে কায়রোর দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে?

এসব ফরেইন পলিসি সম্পর্কিত প্রশ্ন বাদ দিয়ে এবার না হয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পলিসি নিয়ে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যাক। শুধু কেন ১৮ বছর হলেই ভোট দেওয়া বৈধ? কেন যে- কোনো পণ্য ক্রয় করতে হলে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়? আমি আয়কর দিতে ইচ্ছুক নই; তারপরেও কেন আমাকে ট্যাক্স প্রদান করতে বাধ্য করা হয়? কেন পুলিশ বিনা নোটিশে ও প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে যে-কারো বাসায় তল্লাশি চালাতে পারে? কেন একটি রাষ্ট্রে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো যায় না? কেন ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হয়? কেন সরকারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে 'অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক' আরোপ করতে হয়? ইকোনমিক ডাউনটার্ন এর সময়ে কেন সরকার প্রাইভেট ফার্মগুলোকে 'bail-out' দেয়? একুশ শতকে এসে, এমনকি বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন সরকারগুলোকে 'Affirmative Action' এর মতো পলিসি গ্রহণ করতে হয়?

জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক এসব অগণিত প্রশ্ন আমাদের মাথায় প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খায়। আর এসবের উত্তরের জন্যই আমাদেরকে 'Government and Politics' নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। যে-কোনো দেশের সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলে ঐ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ফরেইন পলিসি খুব সহজে অনুধাবন করা যায়। একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা জানা থাকলে ঐ দেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতিও খুব সহজে বিশ্লেষণ করা যায়। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করে তাদের লেখার মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকারব্যবস্থা কিংবা Government System প্রায় অনুপস্থিত।

এই অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্ট্রাকচার ও গুরুত্বপূর্ণ পলিসি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রের পলিসি মেকার হতে চান কিংবা রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন হবেন তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা এবং পলিসিগুলো ভালোভাবে জানা দরকার। উল্লেখ্য, সরকারব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা অধ্যয়নের দুইটি বড় Risk বা ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ফিলোসফির প্রফেসর মাইকেল স্যান্ডেল রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করার দুইটি ঝুঁকি উল্লেখ করেছেন। প্রফেসর স্যান্ডেলের মতে, প্রথম ঝুঁকিটি হচ্ছে ব্যক্তিগত। সরকার, রাজনীতি, রাষ্ট্র ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনার কারণে আপনি হয়ে উঠবেন অন্যদের থেকে অনেক বেশি সচেতন। আর দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো রাজনৈতিক। স্যান্ডেলের মতে, এসব অধ্যয়নের কারণে, রাষ্ট্রের অকার্যকর পলিসির বিরুদ্ধে আপনি হয়ে উঠবেন প্রতিবাদী। যে-কারণে স্বয়ং রাষ্ট্র তখন আপনাকে হুমকি মনে করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা

1. Principle of Checks and Balances
তৃতীয় বিশ্বের কোনো প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট চাইলেই নিজের মতো করে আইন তৈরি করতে পারে, নিজের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে পারে, যে-কোনো সময় স্বৈরাচারী বনে যেতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেটা সম্ভব হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিস্টেমটা এমনভাবে সাজানো যে, সেখানে যদি কোনো খারাপ প্রকৃতির মানুষও যায়, সে সিস্টেমের কারণে ভালো হতে বাধ্য। সিস্টেমটা এমন যে, একজন প্রেসিডেন্ট চাইলেও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে না। একজন সরকারি আমলার দুর্নীতি করার ইচ্ছে থাকলেও সে দুর্নীতি করতে পারে না। সেখানে সিস্টেমটাই এমনভাবে সাজানো। যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে সঠিক পথে রাখে।

যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সিনেটের অনুমোদন ছাড়া এককভাবে কোনো বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদন করতে পারে না। একই ভাবে কংগ্রেসে পাশ হওয়া কোনো বিল প্রেসিডেন্টের অনুমতি ছাড়া আইনে পরিণত হয় না। আবার প্রেসিডেন্টের অনুমোদিত কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে সুপ্রিম কোর্ট সেটা বাতিল করে দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট নিজে স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে কিংবা সংবিধান পরিপন্থি কোনো কাজ করলে নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন (Impeachment) করতে পারে। এভাবেই মার্কিন শাসনব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। আর এটাকেই বলা হয় 'Principle of Checks and Balances' (নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের নীতি)। এমন শাসনব্যবস্থার কারণেই কোনো অসৎ কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত লোক ভুলক্রমে ক্ষমতায় চলে আসলেও সে খারাপ কাজ করতে পারে না।

2. Cabinet System
সাধারণত বিশ্বের যে-কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই মন্ত্রীরা হয়ে থাকেন পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্য। যেখানে মন্ত্রীরা আইন তৈরি করেন এবং মন্ত্রীদের হাতে থাকে ব্যাপক ক্ষমতা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাবিনেট সিস্টেম সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রীরা নির্বাচিতও নন, এমনকি পার্লামেন্টের সদস্যও নন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার পছন্দ অনুযায়ী কয়েকজনকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এসব মন্ত্রীরা প্রেসিডেন্টের অধস্তন কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। প্রেসিডেন্ট চাইলে তাদেরকে যে-কোনো সময় বরখাস্ত করতে পারেন।

3. The Spoil System (সরকারি চাকরির সিস্টেম)
সরকারি চাকরিগুলো সাধারণত স্থায়ী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি আমলাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন বাংলাদেশে BCS পরীক্ষা, ভারতে ICS পরীক্ষা। একবার বিসিএস পাশ করে ক্যাডার হয়ে যাওয়ার পর রিটায়ার্ড না করা পর্যন্ত চাকরি থাকে। পাঁচ বছর পরপর সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি আমলারা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে প্রেসিডেন্টের নিজ দলের সমর্থকগণকেই নিযুক্ত করা হয়। পূর্বের প্রেসিডেন্টের আমলের ঐসমস্ত পদাধিকারীদের পদত্যাগ করতে হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট নতুন করে নিয়োগ দেন। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার এই ভাগবাঁটোয়ারার ব্যবস্থাকে "Spoil System" বলে। তবে 'Pendleton Act' নামে নতুন একটি আইন প্রণয়নের পর নির্বাচনমূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নীতি স্বীকৃতি হয়েছে। তাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি চাকরির ২০ ভাগ স্পয়েল সিস্টেমে নিয়োগ, আর ৮০ ভাগ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়।

4. Judiciary (বিচার বিভাগ বা আদালত)
সরকারের যে বিভাগ আইন অনুসারে বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকে তাকে বলা হয় বিচার বিভাগ (সুপ্রিম কোর্ট)। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কর্তৃক গৃহীত যে-কোনো পলিসি এবং কংগ্রেসের পাশকৃত সিদ্ধান্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আদালত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। পুনঃনিরীক্ষণের পর আদালত যদি দেখে তাদের গৃহীত আইন বা পলিসিগুলো জনগণের স্বার্থবিরোধী, সংবিধান পরিপন্থি তখন আদালত সেগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। আর এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Judicial Review' বা 'বিচার-বিভাগীয় পুনঃনিরীক্ষণ'। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে সংবিধানের কোনো বিষয় সম্পর্কে মতপার্থক্য দেখা দিলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা সেটার ব্যাখ্যা (Clarification) দান করেন এবং সেই ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে রক্ষা করা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। এসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ 'The Third House' (পার্লামেন্টের তৃতীয় কক্ষ) হিসেবে পরিচিত।

5. Three Branches of Government
A. Legislative: যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নাম কংগ্রেস। এই কংগ্রেসই হলো আইন বিভাগ। কংগ্রেসের কাজ হলো রাষ্ট্রের আইন তৈরি করা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নাম House of Representatives, যার নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা ৪৩৫। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এই ৪৩৫ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। আর কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম Senate, যার মোট সদস্য সংখ্যা ১০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্য থেকে সমান হারে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সিনেট গঠিত হয়।
B. Executive: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন মন্ত্রী এবং স্পয়েল সিস্টেমে নিয়োগ পাওয়া সরকারি আমলাদেরকে একসাথে শাসন বিভাগ বলা হয়। এই শাসন বিভাগের কাজ হলো কংগ্রেসের তৈরিকৃত আইন বাস্তবায়ন করা।
C. Judicial: যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগ হিসেবে পরিচিত। বিচার বিভাগের কাজ হলো আইনের ব্যত্যয় ঘটলে সেটার বিচার করা।

6. Separation of Power (ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি)
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। এর মানে হচ্ছে, সরকারের উপরিউক্ত তিনটি ব্রাঞ্চকে স্বাতন্ত্র্য প্রদান করা। যেমন- আইন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে শুধু আইন বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। শাসনকার্য পরিচালনার সকল বিষয়ে শুধু শাসন বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। বিচার সংক্রান্ত সকল বিষয়ে শুধু বিচার বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। অর্থাৎ এক বিভাগ অন্য বিভাগের উপর হস্তক্ষেপ করবে না, এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। তিনটি বিভাগ পরস্পরের থেকে স্বতন্ত্র থাকবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই রাষ্ট্রের সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বিচার বিভাগ স্বাধীন না। সেখানে সরকারি বা রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব থাকে। কিন্তু 'Separation of Power' নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো বিভাগ স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট অপরাধ করলেও বিচার বিভাগ তাকে ছাড় দেয় না। ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই হ্যামিল্টন, ম্যাডিসনের মতো নেতারা এটাকে মার্কিন শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। [সূত্র- মার্কিন সংবিধানের Article I, Article II, Article III]

7. A Rigid Constitution
১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান চালু হবার পর থেকে ২০২০ সাল অবধি এই সত্তর বছরে মোট ১০৪ বার সংশোধিত হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৭ বার। আরও কিছু উদাহরণ দেই। তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সংবিধানের ধারায় পরিবর্তন এনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। ২০১৮ সালের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সংবিধান সংশোধন করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত করেন। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২০ সালের জুলাইয়ে পুনরায় সংবিধান পরিবর্তন করছেন। আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া, উগান্ডা-সহ পুরো রিজিওনে সংবিধান সংশোধন করা যেন নিয়মিত ব্যাপার। একুশ শতকে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ-সহ বিশ্বজুড়েই সংবিধান সংশোধনের হিড়িক পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট নিজ স্বার্থে কিংবা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সংবিধান সংশোধন করার মতো সাহস দেখাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, সেখানে সংবিধান পরিবর্তন করা এক কথায় দুরূহ এবং অসাধ্য (Cumbrous & Unwieldy)। এই কারণে ১৭৮৯ সাল থেকে এখন অবধি এই দীর্ঘ ২৩০ বছরে মাত্র ২৭ বার মার্কিন সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। প্রথমত, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি শুধু উত্থাপনের জন্যই কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সর্মথন থাকা লাগবে। দ্বিতীয়ত, মোট ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৩৮টি অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় সংবিধান সংশোধনের সেই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে হবে। ৩৮টি অঙ্গরাজ্য থেকে অনুমোদন পাওয়া কতটা দুরূহ (Rigid) আশা করি বুঝতে পেরেছেন। এমনকি সময়ের পরিবর্তনে এবং অনেক নতুন নতুন বিষয়ের আবির্ভাবের কারণে কখনো সাংবিধানিক জটিলতা কিংবা আইনের অস্পষ্টতা দেখা দিলে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেটা ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তাই মার্কিন সংবিধানকে একটি জীবন্ত সংবিধান (A Living Constitution) বলা হয়। [US Constitution, Article-V]

8. Dual Government (দ্বৈত সরকার)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুই স্তরে দুই ধরনের সরকার রয়েছে। এক. সমগ্র দেশের জন্য একটি জাতীয় বা কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। দুই. ৫০টি স্টেট এর আবার রয়েছে আলাদা আলাদা সরকার। অঙ্গরাজ্যগুলোতে একজন গভর্নর প্রধান হিসেবে কাজ করে। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক এই দুই স্তরে আলাদা আলাদা সরকার থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থাকে বলা হয় 'Dual Government' বা দ্বৈত সরকার। কেন্দ্রীয় ও প্রদেশে ক্ষমতা নিয়ে যেন দ্বন্দ্ব না বাঁধে সেজন্য সংবিধানে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। [Article 1, Section 8]

9. Peaceful Power Distribution
এরকম ফেডারেল সিস্টেমে ক্ষমতা আসলে কীভাবে ভাগ করা হয় সেটার কোনো নির্দিষ্ট থিওরি নেই। তবে সাধারণত ফেডারেল সিস্টেমের দেশগুলোতে দুটি নীতি লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষমতা কেন্দ্রকে দিয়ে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা রাজ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া। অপরটি হলো নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যকে দিয়ে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে মূলত প্রথম নীতিটি অনুসরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের তিন ধরনের ক্ষমতা (Power) রয়েছে। এই ক্ষমতাগুলো হলো:
A. Delegated Powers (হস্তান্তরিত ক্ষমতা): যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা লেখা রয়েছে। যেমন- মিলিটারি গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা, কর আরোপ করা, ঋণ গ্রহণ করা, দেশের মুদ্রা প্রচলন করা ইত্যাদি নির্দিষ্ট বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। সংবিধান অনুযায়ী এসকল বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন তিনি সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এসব নিয়ন্ত্রণ করবেন। আর এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকেই 'Delegated Powers' বলা হয়।
B. Implied Powers (অনুমিত ক্ষমতা): এমন কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে লেখা নেই। কিন্তু ক্ষমতাবলে একজন প্রেসিডেন্ট সে কাজগুলো করতে পারে। যেমন- শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও মজুরি বৃদ্ধির আইন করা (Minimum Wage), তামাক বা এলকোহল রেগুলেট করা (Regulating Tobacco), নাগরিকদের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈষম্য দূর করতে আইন করা (Banning Discrimination), যারা ট্যাক্স আদায় করে না তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা (Punishing tax evaders), সরকারি পোস্ট অফিসে বিভ্রান্তিকর মেইল পাঠানো রোধে পদক্ষেপ নেওয়া (Prohibition of mail fraud), যুদ্ধ বা ক্রান্তিলগ্নে মিলিটারি ড্রাফট তৈরা করা (Creation of the draft) ইত্যাদির ক্ষমতা সংবিধানে না থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার চর্চা করে। এগুলো সংবিধানে লিখিত আকারে নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতাবলে এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। আর এগুলোকেই Implied Powers বলা হয়।
C. Inherent Powers (অন্তনির্হিত ক্ষমতা): একটি রাষ্ট্রের সিকিউরিটি এর সাথে জড়িত পররাষ্ট্রনীতি। তাই জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়ে কিংবা সবাইকে জানিয়ে ভোটাভুটির ভিত্তিতে সকল ফরেইন পলিসি গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে যাচ্ছে, সেই রাষ্ট্র যদি আগেই জেনে যায় তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে তাহলে সেটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রেসিডেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের সাথে গোপন আলোচনার মাধ্যমে কিছু কিছু পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারে। আর এই ধরনের ক্ষমতাকেই Inherent Powers বা অন্তনির্হিত ক্ষমতা বলা হয়।

এবার আসি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে। উপরিউক্ত তিন ধরনের ক্ষমতা ছাড়া বাকিসব বিষয় রাজ্য সরকারের অধীনে। পুলিশ, শিক্ষা, আইন, দেওয়ানি আইন, ফৌজদারি আইন, স্থানীয় শাসন, রাজ্যের ঋণ ইত্যাদি সকল কিছুর দায়িত্ব রাজ্যগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

10. Dual Citizenship (দ্বৈত নাগরিকতা)
দ্বৈত সরকারব্যবস্থার মতো নাগরিকত্বের ব্যাপারেও দ্বৈত নীতি অনুসৃত হয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং একইসাথে ব্যক্তি যে অঙ্গরাজ্যের অধিবাসী সেই অঙ্গরাজ্যের নাগরিক।

11. Dual Constitution
যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেন্দ্রীয় সংবিধান রয়েছে। কিন্তু ৫০টি স্টেটের আবার পৃথক পৃথক সংবিধান রয়েছে। সবগুলো রাজ্যের সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংবিধানের [Art. 4(4)]। এমনকি অঙ্গরাজ্যগুলোর নাম ও তাদের সীমানা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কেন্দ্রের নেই। ভোটের হিসেব নিকেশ মিলাতে অনেকে রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন করতে চায়, যেটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে টার্ম হিসেবে 'Gerrymandering' বলা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটগুলোতে এই টার্মটি অনেক বেশি শোনা যায়। নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় সরকার যেন কোনো অঙ্গরাজ্যের নাম কিংবা সীমানা পরিবর্তন করতে না পারে সেটারও আইন রয়েছে। মার্কিন সংবিধান অনুসারে রাজ্যগুলোর মতামত ছাড়া এর এলাকা বা সীমানা পরিবর্তন করা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা
১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে 'Philadelphia Constitutional Convention' নামে একটি সাংবিধানিক সম্মেলন হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একদিকে সমগ্র জাতির প্রধান; অন্যদিকে শাসনবিভাগের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি (Double Position)। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এত ব্যাপক যে, এ উপাধিকে অনেকে 'রাজকীয় প্রেসিডেন্ট' (Royal Presidency) বলে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা শুধু জটিলই নয় বরং অনেক দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের নির্বাচন পদ্ধতিটি এই পর্বে সহজে তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রতি চার বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন হয়। তাই প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারেন। জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, কমপক্ষে ১৪ বছর আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস এবং সর্বনিম্ন ৩৫ বছর বয়সি; এই তিনটি শর্ত একসাথে পূরণ করে এমন ব্যক্তি নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারেন [Article 2]। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়; রিপাবলিকান পার্টি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি। একজন চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য অনেকগুলো জটিল স্টেপ পার করতে হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই আরেকটি জটিল পদ্ধতির মধ্য দিয়ে প্রার্থীদের মনোনয়ন নিতে হয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে বা কারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবে সেটাও নির্ধারিত হয় গণতান্ত্রিক উপায়ে। চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সাংবিধানিক পদ্ধতি রয়েছে।

Step-1: Caucus (ককাস)
মনে করুন আপনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। এখন আপনি যেই রাজনৈতিক দল থেকে প্রার্থী হতে চাচ্ছেন সেই দলের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে এই লিখে যে, 'আমি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক”। মনে করুন ডেমোক্রেটিক দল থেকে মোট ৩০ জন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য আবেদন করল। তখন দলের নির্ধারিত বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ নেতারা নানা বৈঠক ও আলোচনা করার পর সিক্রেট ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়ে সেখান থেকে কিছু যোগ্য প্রার্থী বাছাই করেন। দলের যে সকল সিনিয়র মেম্বাররা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি করেন তাদেরকে 'ডেলিগেট' বলা হয়। রাজনৈতিক দল কর্তৃক আয়োজিত নির্ধারিত ডেলিগেটদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ এই নির্বাচন পদ্ধতিটি ককাস হিসেবে পরিচিত।

Step-2: Primary (প্রাইমারি)
ককাসের আরেকটি রূপ হচ্ছে প্রাইমারি। ককাসে সাধারণত প্রার্থী বাছাই করে রাজনৈতিক দলের ডেলিগেটরা। কিন্তু প্রাইমারিতে প্রার্থী বাছাই করা হয় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত ভোটারদের মাধ্যমে। প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাইমারি পদ্ধতিটি আয়োজিত হয় অঙ্গরাজ্য সরকার কর্তৃক। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সরাসরি ভোটে প্রার্থী বাছাই করা হয়। আর এই প্রক্রিয়াকেই প্রাইমারি বলে। উল্লেখ্য, কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে শুধু ককাস হয়, কোনো অঙ্গরাজ্যে শুধু প্রাইমারি হয়, কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে আবার দুটোই হয়। কারণ অঙ্গরাজ্যগুলোর আইন ভিন্ন ভিন্ন।

Step-3: Super Tuesday (সুপার টিউসডে)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাশীদের দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ের আরেক নাম 'সুপার টিউসডে'। কিছু অঙ্গরাজ্য ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ককাস ও প্রাইমারি আয়োজন করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দিনে সবাই একসাথে ককাসের আয়োজন করে। বেশির ভাগ সময়ই সেই দিনটি হয়ে থাকে মার্চ কিংবা এপ্রিলের কোনো এক মঙ্গলবার। এদিন প্রায় ১২/১৫টি অঙ্গরাজ্যে একযোগে ভোটাভুটি হয়। মূলত 'সুপার টিউসডে'তে ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি থেকে কোন কোন প্রার্থী নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন তার একটি সম্ভাব্য ধারণা পাওয়া যায়। সে কারণেই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৮ সাল থেকে এ প্রথা চালু হয়।

Step-4: Party Presidential Debate (নির্বাচনি বিতর্ক)
নির্বাচন নিয়ে অনেক ধরনের ডিবেট রয়েছে। মূলত প্রার্থীদের বিচক্ষণতা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা হয় এসব ডিবেটে। যে ১০/১৫ জন প্রার্থী রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন পায় তাদেরকে নিয়ে "Republican Presidential Debate" অনুষ্ঠিত হয়। আর যারা ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন পায় তাদেরকে নিয়ে "Democratic Presidential Debate" অনুষ্ঠিত হয়। এসব ডিবেট টেলিভিশনে প্রচার করা হয় এবং শ্রোতাদের থেকে রেটিং নেওয়া হয়। রেটিং থেকে বোঝা যায় জনগণ আসলে কাকে চাচ্ছে। এভাবে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ককাস, প্রাইমারি, সুপার টিউসডে, পার্টি নির্বাচনি বিতর্ক ইত্যাদি চলতে থাকে। এসবের মধ্যে যে ক্যান্ডিডেট সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকে তাকেই চূড়ান্ত হিসেবে মনোনীত করা হয়। তারপর দুই দল আলাদা আলাদা জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে। সেই সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি পার্টি থেকে একজন করে মাত্র দুইজনকে চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পুরোদমে শুরু হয় নির্বাচনি আমেজ। এই দুই ক্যান্ডিডেট নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। তারপর প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা তাদের রানিং মেট হিসেবে একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্ধারণ করেন। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা তাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে দুইটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে তার পার্টি থেকে তার সাথে আরও যে ২০/২৫ জন প্রতিযোগিতা করেছিল তাদের মধ্যে যার সাপোর্টার বেশি ছিল তাকে প্রায়োরিটি দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এমন অঙ্গরাজ্যের একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় যে অঙ্গরাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন- নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কামালা হ্যারিসকে। অথচ ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটে বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জো বাইডেনের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছিলেন এই কামালা হ্যারিস। জো বাইডেন চাইলে কামালা হ্যারিসের পরিবর্তে তার রানিং মেট হিসেবে বার্নি স্যান্ডার্স, এ্যামি ক্লোবোচার কিংবা তুলসি গ্যাভার্ড এদের মধ্যে থেকে যে কাউকে সিলেক্ট করতে পারতেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো তারপরেও কেন জো বাইডেন তার রানিং মেট হিসেবে কামালা হ্যারিসকে বেছে নিয়েছিলেন? উত্তর হচ্ছে Electoral College এর হিসেব নিকেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি (মোট ৫৫টি) ইলেক্টোরাল কলেজ হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের। আর কামালা হ্যারিস ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট একই অঙ্গরাজ্য থেকে হতে পারেন না।

Step-5: Presidential and Vice Presidential Debate
তারপর শুরু হয় ডিবেট। ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করা হয়ে গেলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে ৩টি, আর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ১টি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বলা হয়ে থাকে এই চারটি বিতর্কের উপরেই নির্ভর করে কে হবেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিতর্ক, প্রচারণা, সম্মেলন ইত্যাদি শেষে শুরু হয় সাধারণ নির্বাচন। নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরদিন মঙ্গলবার ভোট শুরু হয়। দুশো বছরের পুরোনো সিস্টেমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন হয়। বিশ্বের অন্য সব দেশের নির্বাচন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন অনেক জটিল এবং ভিন্ন।

অন্যান্য দেশে ভোটাররা সরাসরি প্রার্থী কিংবা দলকে ভোট দিয়ে থাকে। যে সবচেয়ে বেশি ভোট পায় তাকেই বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা কোন দল বা প্রার্থীকে ভোট দেন না। তারা মূলত তাদের রাজ্যের একদল মানুষকে (Electoral College) ভোট দিয়ে থাকেন। ওই মানুষগুলো হলো ইলেক্টর বা নির্বাচক। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেস। এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নাম হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ। এই প্রতিনিধি পরিষদের মোট সদস্য ৪৩৫ জন। যুক্তরাষ্ট্রের যে ৫০টি অঙ্গরাজ্য রয়েছে সেগুলোকে জনসংখ্যার অনুপাতে ছোট ছোট ডিস্ট্রিক্ট এ ভাগ করা হয়েছে। যে অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যা বেশি সেই রাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য সংখ্যাও বেশি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বসবাস করে ক্যালিফোর্নিয়াতে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট থেকে মোট ৫৩ জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। অন্যদিকে আলাস্কা, ডেলওয়্যার, ভারমন্ট ইত্যাদি স্টেটে জনসংখ্যা অনেক কম। তাই এসব রাজ্যগুলোর প্রতিনিধি সংখ্যা মাত্র একজন করে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম সিনেট। সিনেটর হওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোর জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আয়তনের দিক থেকে স্টেট ছোট হোক কিংবা বড়, জনসংখ্যা বেশি থাকুক কিংবা কম এসব হিসেব করা হয় না। সমান অনুপাতে ৫০টি রাজ্য থেকে দুই জন করে মোট ১০০ জন সিনেটর কংগ্রেসে আসে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে কোন দুজন সিনেটর হবেন সেটা প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্যরা ভোটাভুটি করে ঠিক করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি ভারতের রাজধানী দিল্লির মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ১৯৬৪ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেখান থেকেও তিনজন সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে মোট সদস্য কত জন হলো?
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ৪৩৫ জন (Representatives)
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ (Senate) ১০০ জন
ওয়াশিংটন ডিসি বা ডিস্ট্রিক্ট অব ৩ জন কলম্বিয়া
মোট: ৫৩৮ জন

তাই দুটি দল কংগ্রেসের সমসংখ্যক এই ৫৩৮ জনকে নিয়ে প্যানেল গঠন করে। এদেরকে একসাথে বলা হয় ইলেক্টোরাল কলেজ (Electoral College)। স্বচ্ছতা রক্ষার্থে মার্কিন কংগ্রেসের যে-কোনো কক্ষের সদস্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর্মচারী ইলেক্টোরাল কলেজের ইলেক্টর হতে পারবে না। সবগুলো অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টর থাকে এবং রিপাবলিকান পার্টি থেকেও মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টর থাকে। সুতরাং সাধারণ ভোটাররা তাদের অঞ্চলের এই ইলেক্টরদের ভোট দেন। আর এটাকে বলা হয় 'Popular Vote'। অর্থাৎ জনগণ ভোট দেবেন ইলেক্টরদেরকে। জনগণের ভোটে যে-সকল ইলেক্টররা বিজয়ী হন তারা একমাস পর তথা ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় বুধবারের পর প্রথম যে সোমবার আসে সেদিন নিজ নিজ রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেন। আর এটাকে বলে 'Electoral Vote'। অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় ইলেক্টররা, তারপর এসব বিজয়ী ইলেক্টরদের ভোটে নির্বাচিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাই যে দল থেকে মোট ২৭০ জন ইলেক্টর বা তারও বেশি ইলেক্টর জয়ী হবে তারাই পরবর্তী সরকার গঠন করবে। এভাবে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তারপর ২০ জানুয়ারি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উল্লেখ্য, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ইলেক্টররা তাদের দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকেই ভোট দেয়। কিন্তু সে তার দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে বিরোধী দলের প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারে। ধরুন আপনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন ইলেক্টর হিসেবে জয়ী হয়েছেন, এখন আপনার এই ইলেক্টোরাল ভোটটি আপনি ডেমোক্রেটিক দলকে না দিয়ে রিপাবলিকান দলকেও দিতে পারেবেন। কিন্তু এটা বিশ্বাসঘাতকতা হয় বলে এমনটি কখনোই হয়নি। এমনকি কিছু অঙ্গরাজ্যে আইনও রয়েছে যে, কেউ যদি এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

নির্বাচন নিয়ে খুঁটিনাটি
Contingent Election (সাপেক্ষ নির্বাচন)
যদি কোনো প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান তাহলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিষয়টি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের কাছে চলে যায়। তখন হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন এবং কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ভাইস প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করবেন। এটাকেই বলা হয় Contingent Election বা সাপেক্ষ নির্বাচন। এরকম যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মাত্র একবারই ঘটেছিল; ১৮২৪ সালে। সেবছর কোনো প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভদের ভোটে জন কুইন্সি এ্যাডামস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অনেক আগে এরকম নিয়মও ছিল যে, সর্বোচ্চ ইলেক্টোরাল ভোট যিনি পাবেন তিনি হবেন প্রেসিডেন্ট। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট যে পাবেন তিনি হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৮০০ সালে জেফারসন ও বারের মধ্যে এরকম হয়েছিল। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে দুই পক্ষের দুইজন হওয়ায় এই নিয়ম বাতিল করা হয়।

Line of Succession (শূন্য পদ পূরণ)
প্রেসিডেন্টের স্বাভাবিক কার্যকাল ৪ বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হলে কিংবা প্রেসিডেন্ট মারা গেলে তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। যেমন- ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়েছিলেন। ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগ করলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্টের পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। যদি ভাইস প্রেসিডেন্টও মারা যায় কিংবা প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ই একসাথে অক্ষম হয়ে পড়ে তাহলে সেক্রেটারি অব স্টেট, তারপর প্রতিরক্ষা সচিব, তারপর অ্যাটর্নি জেনারেল পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে এরকম কখনো হয়নি যে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ই একসাথে মারা গিয়েছেন বা একসাথে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।

Temporarily Transferring Power (সাময়িক ক্ষমতা হস্তান্তর)
প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে কংগ্রেসকে লিখিতভাবে জানিয়ে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিতে পারেন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর প্রেসিডেন্ট সুস্থ হয়ে উঠলে পুনরায় প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন [সোর্স- Section 3 of 25th Amendment)। যেমন- সম্প্রতি জো বাইডেন কোলন পরীক্ষার অংশ হিসেবে এক ঘণ্টা ২৫ মিনিট অ্যানেস্থেসিয়ার (অবেদন বা অচেতন) অধীনে ছিলেন। বাইডেনের এই পরীক্ষার সময় কামালা হ্যারিস ৮৫ মিনিটের জন্য দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন।

Why Tuesday & November? (কেন নভেম্বরের মঙ্গলবারেই ভোট হয়?)
মনে হতে পারে পপুলার ভোট কেন নভেম্বর মাসে এবং মঙ্গলবারে হয়? শুরুর দিকে ভোটের প্রতি মানুষের এত আগ্রহ ছিল না। দেখা যেত মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ কেবল ভোেট দিতে আসত। তাই ভোট প্রদানের হার বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন নেতারা ছুটির দিনকে বাছাই করেছিল। এভাবে ১৮৪৫ সাল থেকেই নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়ম চলে আসছে। কারণ তখন আমেরিকা ছিল কৃষিপ্রধান দেশ। ভোট কেন্দ্র ছিল অনেক দূরে। ঘোড়াগাড়িতে করেও ভোটকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় লেগে যেত কৃষকদের। তার মধ্যে শনিবার ছিল কাজের দিন। রবিবারে আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান নাগরিকদের ধর্মকর্মের দিন এবং বুধবার ছিল বাজারের দিন। ফলে সোমবারকে যাতায়াতের সুবিধার্থে রেখে মঙ্গলবারকেই ভোট দেওয়ার দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। আর মাস হিসেবে নভেম্বরকে বেছে নেওয়ার কারণ সে সময় নভেম্বর মাস পড়তে পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে ফসল কাটা শেষ হয়ে যেত। নভেম্বর শেষ হতেই শীত নামত। তখন সবাই অবসর থাকত।

Symbol for Election (নির্বাচনের প্রতীক)
রিপাবলিকান দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন থমাস জেফারসন, আর ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু জ্যাকশন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক হচ্ছে গাধা। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক কার্টুন প্রচুর জনপ্রিয়। কথিত আছে ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী অ্যান্ড্রু জ্যাকশনকে প্রতিপক্ষরা 'জ্যাকঅ্যাস' বা গাধা নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে একজন কার্টুনিস্ট জ্যাকের চেহারা সম্বলিত এক গাধার ছবি আঁকেন। যা অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের পছন্দ হয়ে যায়। তাই তিনি গাধাকে নিজের দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তখন থেকেই ডেমোক্র্যাটদের প্রতীক হয় গাধা। তাদের মতে গাধা হচ্ছে কষ্টসহিষ্ণুতার প্রতীক। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হলো হাতি। ১৮৭৪ সালে এক রিপাবলিকান কার্টুনিস্ট একটি কার্টুন আঁকেন। সেখানে দেখানো হয় একটি গাধা বনের অন্যান্য প্রাণীদের ভয় দেখাচ্ছে। তখন সকল প্রাণীরা ভয় পেলেও শুধু একটি হাতি ভয় পায়নি। হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই হাতিকে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে রিপাবলিকানরা গ্রহণ করে。

Winner Takes All (সবকিছুই বিজয়ীদের)
সাধারণত কোনো রাজ্যে যে প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান সব ভোট তার পক্ষে চলে যায়। যেমন ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মোট ইলেক্টোরাল ভোট ২৯টি। ধরুন রিপাবলিকানরা পেল ১৩টি, আর ডেমোক্র্যাটরা পেল ১৬টি। যেহেতু ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছে তাই এই রাজ্যের ২৯টি ইলেক্টোরাল ভোটই ডেমোক্র্যাটদের হয়ে যাবে। এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Winner Takes All' বা বিজয়ীরা সব নিয়ে নেবে। এটার কারণেই অনেকে পপুলার ভোেট বেশি পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিন্টন ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে ত্রিশ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। কিন্তু ইলেক্টোরাল ভোেট ট্রাম্প বেশি পাওয়ায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। শুধু নেব্রাস্কা ও মাইন এই দুইটি অঙ্গরাজ্য ছাড়া সকল রাজ্যেই Winner takes all এই নিয়ম। অর্থাৎ নেব্রাস্কা ও মাইনে যে যত ভোট পাবে ততই হিসেব করা হবে।

Impeachment (অভিশংসন)
নির্বাচিত হওয়ার পর যদি কোনো প্রেসিডেন্ট দুর্নীতিমূলক বা বেআইনি কাজ করেন (misdemeanors), যদি তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার অভিযোগ ওঠে (treason), যদি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে (bribery), তাহলে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর এটাকেই 'Impeachment' বা অভিশংসন বলা হয়। তবে অভিশংসনের প্রক্রিয়াটি জটিল। এই প্রক্রিয়াটি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে শুরু হয়, নিম্নকক্ষে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রেসিডেন্ট অভিশংসনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় তাহলে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে পাশ হতে আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটে যায়। সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেলে একজন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়। তবে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখনো হয়নি। কেননা এতে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। তাই প্রেসিডেন্ট অপসারণের প্রস্তাব কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে পাশ হলেও উচ্চকক্ষ সিনেটে কখনো পাশ হয় না। ১৯৭৪ সালে রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে বেআইনি কাজের অভিযোগ উঠলে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হবার পূর্বেই নিক্সন পদত্যাগ করেন। আবার অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটা আর পাশ হয়নি। "Former Presidents Act of 1958" এই এক্টের অধীনে সকল প্রেসিডেন্ট তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পেশাল সিকিউরিটি, পেনশন ফি, বার্ষিক ট্রাভেল ভাতা এসব পেয়ে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় আসতে সম্পূর্ণ জনগণের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। তারা জনগণকে অনেক গুরুত্ব দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- নাগরিকরা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে Issues, Characteristics এবং Loyalty এই তিনটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয় সে কাকে ভোট দেবে।

1. Issues (গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু) : চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এর উপর ভিত্তি করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমটি হলো Retrospective Issue। এর মানে হলো যারা ক্যান্ডিডেট বা প্রার্থী তাদের অতীতের রাজনৈতিক পারফরম্যান্স কেমন ছিল। দ্বিতীয়টি হলো Prospective Issuel তথা যারা ক্যান্ডিডেট তাদের ভবিষ্যতের পারফরম্যান্স কেমন হতে পারে এটা অনুমান করে নিয়ে। প্রার্থীরা ভবিষ্যতে কেমন হবে এটা অনুষ্ঠিত তিনটি প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেট ও রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন দেখে ভোটাররা সহজেই অনুমান করতে পারে। তৃতীয় ইস্যুটি হচ্ছে Special issues। অর্থাৎ প্রতিটি রাষ্ট্রেরই কিছু স্পেশাল ইস্যু থাকে যেগুলো নিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিক দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে Abortion (গর্ভপাত), Minimum Wage (শ্রমিকদের বেতন), Immigration (অভিবাসন), Gun laws (বন্দুক আইন) এগুলো হচ্ছে স্পেশাল ইস্য। আপনি যদি গর্ভপাতকে সমর্থন করেন তাহলে যে প্রার্থী গর্ভপাতকে সমর্থন করে আপনি তাকেই ভোট দেবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা Abortion এর বিপক্ষে কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা পক্ষে। একই ভাবে রিপাবলিকানরা চায় শ্রমিকদের মজুরি কমাতে কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা চায় মজুরি বাড়াতে। ডেমোক্র্যাটরা চায় বন্দুক আইন কঠোর করতে, রিপাবলিকানরা চায় শিথিল করতে। তবে ব্যক্তিভেদে এটা পরিবর্তনও হতে পারে। আর চতুর্থটি হলো Valence Issues। ভ্যালিয়েন্স হচ্ছে ক্যান্ডিডেট নিজে এবং তার রানিং মেট-সহ (ভাইস প্রেসিডেন্ট) যাদেরকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কেমন হবে অথবা তারা সৎ কি না ইত্যাদি বিবেচনা করে ভোটাররা তাদের প্রার্থী পছন্দ করে।

2. Candidate characteristics (প্রার্থীর বৈশিষ্ট্য): ভোটাররা প্রার্থীদের ধর্ম, বর্ণ, সততা, দৃঢ়সংকল্প, অঞ্চল ইত্যাদি দেখে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কাকে ভোট দেবে।

3. Party Loyalty (দলীয় আনুগত্য): কিছু ভোটার রয়েছে যারা ছোটবেলা থেকে যে দলকে সমর্থন করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দলকেই ভোট দেয়। এটা হতে পারে নিজেদের মতাদর্শের সাথে দলের মতাদর্শের মিল থাকার কারণেও। আবার মেরিল্যান্ড, মিশিগানের মতো কিছু অঙ্গরাজ্য আছে যেখানে ডেমোক্র্যাটরা সবসময় বিজয়ী হয়, তাই সেগুলোকে ব্লু স্টেট (Blue state) বলে। একই ভাবে মিসিসিপি, এলাবামার মতো কিছু রাজ্যে রিপাবলিকানরা সবসময়ই বিজয়ী হয়। তাই সেগুলোকে রেড স্টেট (Red state) বলে। আবার টেক্সাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়ার মতো রাজ্যগুলো দোদুল্যমান, কেউ জানে না এসব স্টেটে কে জিততে পারে। তাই এগুলোকে 'Battle Ground' বা 'Swing states' বলে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
বিশ্বের যে-সকল দেশে Two Party System বা দ্বিদলীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল মোট দুইটি; ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি। রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টি মূলত উদারতাবাদে বিশ্বাসী। আর রিপাবলিকান পার্টি কিছুটা রক্ষণশীল ধ্যানধারণা লালন করে। রিপাবলিকান পার্টি Grand Old Party (GOP) হিসেবেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে প্রেসিডেন্টশিয়াল ডিবেটগুলো দেখা আবশ্যকীয়। প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটগুলোতে মূলত কী নিয়ে আলোচনা হয়? আপনি যদি কোনো একটি ডিবেট দেখে থাকেন তাহলে লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ডিবেটের যিনি মডারেটর থাকেন তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে প্রশ্ন করে। উদাহরণস্বরূপ: সরাসরি এরকম প্রশ্ন করা হয় যে, আপনি যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন তাহলে ইকোনমি নিয়ে আপনার পলিসি কী হবে? ইমিগ্রেশন নিয়ে আপনার পলিসি কী হবে? চীনের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন হবে? বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে আপনার পলিসি কী হবে? রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কূটনৈতিক এসবের পলিসি কেমন হবে এসব নিয়ে ডিবেট হয়।

আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে Ideology বা মতাদর্শ নিয়ে তেমন বিতর্ক হয় না বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান এই দুইটি দলের মধ্যে বিতর্ক হয় মূলত রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি ও আইন নিয়ে। পলিসি ভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিদের নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতা থাকে না। কারণ আপনি ক্ষমতায় গেলে সোশ্যাল, ইকোনমি, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে আপনার পলিসি বা নীতি কী হবে তা আপনাকে আগেই স্পষ্ট করে বলে দিতে হয়। পলিসি নির্ভর এধরনের রাজনীতিকে টার্ম হিসেবে 'Programmatic Politics' বলা হয়। তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জনগণকে একটি পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। অনেকে আবার এটাকে 'Politics Meets Policies' হিসেবেও আখ্যায়িত করে।

বিভিন্ন ন্যাশনাল পলিসি
যে-কোনো রাষ্ট্রের পলিটিক্স সাধারণত দুইভাগে বিভক্ত- জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। একটি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে যে রাজনীতি হয় সেটাকে সাধারণত জাতীয় রাজনীতি বা Domestic Politics বলা হয়। অন্যদিকে একটি রাষ্ট্রের সাথে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপন, কূটনৈতিক আলোচনা, ফরেইন পলিসি ইত্যাদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা International Politics বলা হয়। তাই প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির কয়েকটি পলিসি নিয়ে আলোচনা করব।

First Policy - অভিবাসন নীতি
এই নীতিটি খুবই চমকপ্রদ। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বা ইমিগ্রেশনের তিনটি পলিসি রয়েছে। ১ম পলিসি, দেশের অধিকাংশ জনগণ জাতীয়তাবাদের কারণে সমর্থন করে না, ২য় পলিসি- অল্পবয়সি শিশুদের জেলে আটক করে, ৩য় পলিসি- শিশুদেরকে পিতামাতার থেকে আলাদা করে। এই সিচুয়েশনে ধরুন আপনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তাহলে এই তিনটি পলিসির কোনটি গ্রহণ করতেন? আপনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন তখন আপনাকে স্পষ্টভাবে জনগণকে বলে দিতে হবে আপনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইমিগ্রেশনের এই তিনটি পলিসির কোনটি গ্রহণ করবেন।

ক. Catch and Release policy: যারা সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে চায় অথবা লিগ্যাল উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চায় তাদেরকে প্রথমে একটি সেন্টারে নিয়ে সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। অভিবাসন প্রার্থীরা কোনো ক্রিমিনাল কি না, চোরাচালান বা মাদক ব্যবসায়ী কি না এসব যাচাই করা হয়। যদি এসব না হয় তাহলে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হতো। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীল এই পলিসি নিয়েছিলেন। বর্তমানে জো বাইডেন আরও কিছু নিয়ম যোগ করা সাপেক্ষে এটাকেই সমর্থন করছেন। বিরোধী দল রিপাবলিকানরা জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে এই পলিসির প্রচণ্ড বিরোধিতা করে থাকে। রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করতেন এই পলিসিটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর। কারণ অন্য দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইউএস নাগরিকদের চাকরিগুলো দখল করে নিচ্ছে।

খ. Family Detention: অভিবাসনের দুই নম্বর এই নীতিটি হলো মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যারাই যুক্তরাষ্ট্রে আসবে তাদেরকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যারা যুক্তরাষ্ট্রে আসত তারা অধিকাংশই সপরিবারে, ছোট বাচ্চা বা সন্তানাদি নিয়ে আসত। ছোট ছোট বাচ্চা-সহ সপরিবারে সবাইকেই আটক করা হতো। এখন কথা হলো শিশুরা বা ছোট বাচ্চারা তো নিরপরাধ। পিতামাতার সাথে তারা এসেছে। তারা তো কিছুই বুঝে না, পিতামাতা না আসলে তারা তো আসত না। এখন বিনা অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্ক এই শিশুদের জেলে আটক রাখা কতটা যৌক্তিক? ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার দেড় বছর পর্যন্ত এই পলিসিটি ছিল। পরবর্তীতে ডেমোক্র্যাট ও সিভিল সোসাইটির কঠোর সমালোচনায় এই পলিসি থেকে সরে গিয়ে তৃতীয় পলিসিটি গ্রহণ করেন।

গ. Family Separation: এই তৃতীয় পলিসিটি হলো যারা পরিবার-সহ সীমান্তে আটক হবে তাদের মধ্যে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদেরই আটক রাখা হবে, সাথে যে-সকল ছোট বাচ্চা বা শিশু থাকবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। মনে করুন পিতামাতা ও তাদের পাঁচ বছরের দুইটি সন্তান সীমান্তে আটক হলো। এখন পিতামাতাকে ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রেখে সন্তান দুজনকে ছেড়ে দিলেন। এখন ডেমোক্র্যাটদের প্রশ্ন হলো পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানদের সেপারেট বা আলাদা করার অধিকার কারো নেই। এখানে সন্তানদের পিতামাতার সাথে বসবাসের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আসলে ইমিগ্রেশন বা অভিবাসনের উপরিউক্ত তিনটি পলিসির মধ্যেই ঝামেলা রয়েছে। যে- কারণে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীদের ইমিগ্রেশন পলিসি নির্ধারণ করতে হিমশিম খেতে হয়। ইমিগ্রেশন নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন একটি পরিভাষা যুক্ত করেছেন। ট্রাম্প সেই পরিভাষাটির নাম দিয়েছেন "Chain Migration" হিসেবে। এই চেইন মাইগ্রেশনের মানে হলো, প্রথমে আপনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন, কয়েকবছর সেখানে বসবাস করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করবেন। তারপর আপনার ছোট ভাইকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসবেন। আপনার ছোট ভাই আবার কয়েকবছর পর আপনার পিতামাতাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসল। এভাবে আপনার পুরো পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল। তাই ট্রাম্প এই পুরো প্রসেসটার নাম দিয়েছেন Chain Migration। তাই ট্রাম্প তার ক্যাম্পেইনে বলতেন- They should go back to their first country!

Second Policy- ট্যাক্স বা শুল্ক নীতি
এই পলিসিটি বুঝতে হলে আমাদের ট্যাক্সের প্রকারভেদ আগে জানা আবশ্যক। ট্যাক্স সাধারণত তিন প্রকার:
ক. Progressive tax: ইনকাম বা আয়ের অনুপাতে ট্যাক্স। আমার ইনকাম বাড়লে ট্যাক্স বাড়বে। ইনকাম কমে গেলে ট্যাক্সের পরিমাণও কমে যাবে।
খ Regressive tax: এটা মূলত ইন্ডাস্ট্রি ট্যাক্স। আমার ইনকাম যত বাড়বে আমার ট্যাক্স তত কমবে। ধরুন আপনার ইনকাম দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন আপনার ট্যাক্সের পরিমাণও কমতে থাকবে।
গ Proportionate tax: এটা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধার্যকৃত ট্যাক্স। অনেক সময় সরকার কিছু স্পেসিফিক কারখানা বা কর্পোরেশনের উপর এটা ধার্য করে থাকে। আপনার ইনকাম হোক বা না হোক, ব্যবসায় লাভ লোকসান যাই হোক না কেন; আপনাকে বছর শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স সরকারকে দিতেই হবে।

ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান: জো বাইডেন ও ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত Progressive tax এর পক্ষে। তাদের মতে যে কর্পোরেট যত বেশি ইনকাম করবে সে কর্পোরেট তত বেশি ট্যাক্স দেবে। তা না হলে দেশে Income inequality বা আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।
রিপাবলিকানদের অবস্থান: রিপাবলিকানরা মনে করে একটি কোম্পানি বা কর্পোরেশনের যত বেশি ইনকাম হবে তত বেশি তাদের ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, আর যত ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে তত জব সৃষ্টি হবে। তাই এসব জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর উপর ট্যাক্স কমিয়ে দিলে অনেক জব সৃষ্টি হবে, সাথে বেকারত্বের হারও কমবে। আর Proportionate tax নিয়ে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলের অবস্থান একই।

Third Policy- ইকোনমি বা অর্থনীতি
অর্থনীতি নিয়ে দুইটি পলিসি রয়েছে।
ক. Supply Side Economy: এই নীতিটি রিপাবলিকানরা সাপোর্ট করেন। সাপ্লাই সাইড ইকোনমি হলো- যে-সকল কর্পোরেশন আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য তৈরি করে বা যোগান দিয়ে থাকে, সেইসব কলকারখানার উপর অধিক পরিমাণে ট্যাক্স ধার্য না করা। রিপাবলিকানরা সবসময় মনে করেন একটি দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে ঐ দেশের বড় বড় কর্পোরেশন বা কলকারখানাগুলোর উপর। কারণ এধরনের কর্পোরেশনগুলো অসংখ্য জব সৃষ্টি করে। তাই রিপাবলিকানরা সবসময় "কর্পোরেট Tax" কমানোর পক্ষে। তারা মনে করে যদি এসব কর্পোরেশনের উপর অধিক পরিমাণে ট্যাক্স আরোপ করা হয় তাহলে ট্যাক্সের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে জব বা চাকরি কমে যায়। ফলস্বরূপ দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। তাই রিপাবলিকান প্রার্থীদের দেখবেন যে ডিবেট বা ক্যাম্পেইনে তারা অসংখ্য বার এই "Job" শব্দটি উচ্চারণ করে। ঠিক একই ভাবে এসব কলকারখানাগুলোর কারণে পরিবেশ দূষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন হয়, তাই রিপাবলিকানরা "Climate change" নিয়ে তেমন কোনো পলিসি নেয় না। তারা মনে করে জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষের হাত নেই। এটা প্রাকৃতিক। ট্রাম্পের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। (রিপাবলিকানরা অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান ও হাইকের লিবারেল ইকোনমি দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত)

✔ Demand Side Economy: ডেমোক্রেটরা এই পলিসিটি সমর্থন করে। ডিমান্ড সাইড ইকোনমি সাধারণত কর্পোরেট ট্যাক্সকে সমর্থন করে। ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন দেশে কর্পোরেট জায়ান্ট বা ধনিকশ্রেণি হলো মুষ্টিমেয়। আর যারা ভোক্তা বা কনজিউমার তারা অধিকাংশই মধ্যম আয়ের পরিবার। তাই অধিকাংশ ভোক্তারা টাকার অভাবে প্রোডাক্ট ক্রয় করতে পারে মিলিটারি অভ্যুত্থান। তাই আমাদের উচিত কর্পোরেট সেক্টর থেকে অধিক পরিমাণে ট্যাক্স নিয়ে এসকল মধ্যবিত্ত পরিবারদের মধ্যে বণ্টন (Redistribution) করে দেওয়া। তাই জো বাইডেন-সহ ডেমোক্র্যাটরা সবসময় Middle Class Family নিয়ে কথা বলে। একই ভাবে একটি কারখানায় যতবেশি পণ্য উৎপাদন হয় ততবেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। আর কার্বন নিঃসরণ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত সে-কারণে ডেমোক্র্যাটরা সবসময় Climate change নিয়ে কথা বলে। (ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত জন মেইনার্ড কেইনসের 'Interventionist economy" দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত)

Fourth Policy- সামাজিক নীতি/Social policy
সামাজিক পলিসিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে "Kitchen Table Issues" বলা হয়। অর্থাৎ রান্না বা খাবার ঘরে বসে আমরা প্রতিদিন যে সকল বিষয় আলোচনা করে থাকি সেগুলো সামাজিক পলিসির অন্তর্ভুক্ত। যেমন- খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি।
ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানঃ জো বাইডেন বা ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত স্বাস্থ্য বিমা বা কম খরচে চিকিৎসা সেবা, বয়স্ক বা বেকার ভাতা, শিক্ষা ক্ষেত্রে খরচ কমানো বা Free School Bussing এসবের পক্ষে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে "Welfare State" বলে।
রিপাবলিকানদের অবস্থানঃ রিপাবলিকানরা সাধারণত স্বাস্থ্য বিমার বিপক্ষে, মিডল ক্লাস ফ্যামিলির চেয়ে তারা বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে পুঁজিপতিদের।

5th policy- Foreign policy/বৈদেশিক নীতি
বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকানদের মধ্যে পলিসিগত তেমন কোনো অমিল নেই। যেমন- রাশিয়া, চায়না, ইরান এসকল দেশ ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই শত্রু। একই ভাবে ইসরায়েল, সৌদি আরব, ভারত উভয় দলেরই মিত্র রাষ্ট্র। কিন্তু এসব রাষ্ট্রগুলোর সাথে উভয় দলের কিছু আচরণগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করতেন তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন, Hard Power বা Economic Sanctions এসবের ভয় দেখিয়ে সরাসরি কাজ আদায় করে নেন। কিন্তু ডেমোক্রেটিকরা বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সরাসরি বা প্রকাশ্যে কিছু না বলে কূটনীতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। বারাক ওবামা ও জো বাইডেন এর পররাষ্ট্রনীতি তাই বলে।

Question to think about?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরো দুনিয়া থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সেখানে স্বৈরাচারবিরোধী বা গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে বিশালাকারের গণ আন্দোলন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে-কারণে ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু চীনে একদলীয় শাসনব্যবস্থা হওয়ায় ভবিষ্যতে সেখানে বড় ধরনের গণ আন্দোলন দেখা দিতে পারে। তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের এই অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থাই চীনের একক পরাশক্তি হওয়ার পেছনে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Raskin, Jamie (2022), Unthinkable: Trauma, Truth, and the Trials of American Democracy, Harper
2. Marche, Stephen (2022), The Next Civil War: Dispatches from the American Future, Avid Reader Press
3. Maddow, Rachel and Yarvitz, Michael (2020), Bag Man: The Wild Crimes, Audacious Cover-Up, and Spectacular Downfall of a Brazen Crook in the White House, Crown
4. Schweizer, Peter (2022), Red-Handed: How American Elites Get Rich Helping China Win, Harper
5. Maisel, Sandy and Brewer, Mark D. (9th ed. 2020), Parties and Elections in America: The Electoral Process, Rowman & Littlefield Publishers
6. Hetherington, Marc J. and Keefe, William J. (11th ed. 2009), Parties, Politics, and Public Policy in America, CQ Press
7. Edwards III, George C.; Wattenberg, Martin, and Lineberry Robert L. (16th ed. 2013), Government in America: People, Politics, and Policy, Pearson Custom Publishing
8. Chamberlain, Lawrence H (1996), The President, Congress and legislation
9. Agar, Herbert (1950), The United States: The Presidents, the Parties & the Constitution
10. Axinn, June and Stern, Mark J. (2007), Social Welfare: A History of the American Response to Need, Boston: Allyn & Bacon
11. Cramer, Richard Ben (1993), What It Takes: The Way to the White House, Vintage

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি

📄 যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি


"The principles that should guide American foreign policy are simple: the world is safer when America leads, only strength ensures peace and freedom, and America must stand with its allies and challenge its adversaries." - Kevin McCarthy

ভূমিকা: একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি জানা আমাদের জন্য আবশ্যক। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বকে মূলত কীভাবে দেখে এবং বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া চাই তা নিয়ে এই অধ্যায়টি সাজানোর চেষ্টা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে 'Department of State' বলা হয়। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলা হয় 'Secretary of State'। কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। যুদ্ধ ঘোষণা করতে প্রেসিডেন্টকে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পেতে হয়। কিন্তু মনে করুন কংগ্রেসে কোনো বিল পাশ হয়েছে কিন্তু সেটা প্রেসিডেন্টের মনঃপূত হয়নি, তখন প্রেসিডেন্ট সেটাতে ভেটো দিতে পারে। প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর না দিলে অনেক বিল আইনে পরিণত হয় না। সেই বিলটির মৃত্যু ঘটে। প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতাকে "Pocket Veto” বলা হয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সে-দেশের মিলিটারির সর্বাধিনায়ক। রাষ্ট্রের সিকিউরিটি রক্ষার্থে যে-কোনো স্টেপ গ্রহণ করার ক্ষমতা তার হাতে রয়েছে। বর্তমান একুশ শতাব্দীতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে প্রেসিডেন্ট একক উৎসে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি স্থাপন, পারমাণবিক শক্তির বিকাশ (Proliferation of Nuclear Weapons), সামরিক জোট গঠন, বিভিন্ন দেশে মিলিটারি ঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি কাজগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট একাই করে থাকেন। এসব বিষয়ে প্রেসিডেন্ট এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। উপরিউক্ত বিষয়গুলো প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তাই মার্কিন স্বার্থকে মাথায় রেখে এবং স্বীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন। সময়ের প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ধারায় পরিবর্তন এসেছে। যুগের সাথে মানানসই সাধারণত এমন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। তাই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার সুবিধার্থে এই অধ্যায়টিতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করব।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কেন এত নিখুঁত

রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, সরকারের গৃহীত পলিসি এবং পররাষ্ট্রনীতিগুলো যতবেশি নিখুঁত হবে একটি রাষ্ট্র ততবেশি উন্নত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি পলিসি নির্ভর। সেখানে চেতনা, মতাদর্শ, আইডিওলজির তেমন প্রভাব নেই। তাদের কার্যকরী নীতির কারণেই আজকে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যকরী পলিসি তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে তাদের কংগ্রেসনাল কমিটিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টে কংগ্রেসের মোট সদস্য ৫৩৫ জন। এই সদস্যদের ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। যে যেই বিষয়ে এক্সপার্ট তাকে সেই কমিটিতে রাখা হয়। সরকার এবং বিরোধী উভয় দলের সদস্যই কমিটিতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই কমিটিগুলো নিজ নিজ সেক্টর নিয়ে কাজ করে, গৃহীত পলিসিগুলোর খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে। পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির নাম হচ্ছে- House Foreign Affairs Committee। বিশ্বের রিজিওন ভেদে আলাদা আলাদা পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ: আফ্রিকা বিষয়ক কমিটি আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি কী হওয়া উচিত সেটা নিয়ে কাজ করে। ইউরোপের কমিটি ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি কী হওয়া উচিত সেটা নিয়ে তারা কাজ করে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আলাদা কমিটি রয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি কী হওয়া উচিত সেটা নিয়ে কাজ করে। উল্লেখ্য, এসব কমিটির মধ্যে আবার উপ-কমিটিও রয়েছে, যারা পুরো রিজিওন নিয়ে কাজ করার পরিবর্তে ঐ রিজিওনের শুধু একটি দেশ নিয়ে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আলাদা কমিটি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে সেটার উপরেও কমিটি রয়েছে। শুধু চীন নিয়েও স্বতন্ত্র একটি কমিটি রয়েছে, চীনকে কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত তারা শুধু সেটা নিয়েই কাজ করে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে এই কমিটিগুলোর ভূমিকা ব্যাপক। ঠিক একারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন কমিটিগুলোকে “ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আইনসভা” বা “Little Legislatures” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সিনেটর এবং প্রতিটি রিপ্রেজেনটেটিভ সে-দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো যোগ্য। তারা সবাই অনেক শিক্ষিত এবং রাজনৈতিক সচেতন। তাই কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে দলীয় রাজনীতি প্রকট থাকলেও রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা সবাই এক। যেমন- এখন জো বাইডেনের শাসনামলে ফরেইন অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক যে স্ট্যান্ডিং কমিটিটা রয়েছে তার মোট সদস্য ৫১ জন। মাইকেল ম্যাকুল এর সভাপতিত্বে এই কমিটির মোট সদস্যদের ২৭ জন রিপাবলিকান পার্টির, আর ২৩ জন ডেমোক্রেটিক পার্টির।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য দেওয়া হয়

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পাঁচটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এই পাঁচটি উদ্দেশ্যকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

1. Security: রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে টিকিয়ে রাখা এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা (State survival)। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান দিক। যুক্তরাষ্ট্রের যে-সকল নাগরিক ও ব্যবসায়ী বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্ত।

2. Access: দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি হচ্ছে বৈশ্বিক সম্পদ ও বিশ্ব বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বৈশ্বিক সম্পদ বলতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা মূলত কী বোঝাচ্ছেন? সাধারণত বৈশ্বিক সম্পদ বলতে প্রাকৃতিক সম্পদ তথা তেল, গ্যাস ইত্যাদি। কথা হলো এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলো তো কোনো না কোনো দেশের অধীনে। যেমন- বিশ্বের অধিকাংশ তেল সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে। একইভাবে স্বর্ণ, আকরিক ধাতু, মিনারেল, ডায়মন্ড, কপার, ইউরেনিয়াম, প্লাটিনাম, কোবাল্ট, বক্সাইট ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদের প্রায় সবই আফ্রিকার দেশগুলোর অধীনে। বিশ্বের এসব সম্পদে যুক্তরাষ্ট্র তার অধিকার চায়। এসব বৈশ্বিক সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই তাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য। বৈশ্বিক সম্পদ আহরণে যদি যুদ্ধ করতে হয়; তারা সেটাই করবে, যদি বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের সরকারকে উৎখাত করতে হয় সেটাই করবে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি বাজার সম্প্রসারিত করা, অস্ত্রের বাজার ধরে রাখা, বহির্বিশ্বে মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা ইত্যাদি অন্যতম উদ্দেশ্য।

3. Balance of Power: বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ধরে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অধিক শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্রের যেন উত্থান না হয় সেদিকে নজর রাখা। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষায় মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বজায় রাখা।

4. Protection of Human rights: যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু গণতন্ত্রের ধারক বাহক তাই বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবাধিকার রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই দায়িত্বটি যুক্তরাষ্ট্র কখনো নিজে পালন করবে কখনো আবার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সম্পাদন করাবে। বিশ্ব মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জাতিসংঘ পরিচালিত হবে এবং ব্রেটনউডস প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে বৈদেশিক সাহায্য প্রদান করাও যাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কৌশল।

5. World Leader: বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মনে করছে, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের লিডারশীপ অনুপস্থিত থাকলে বিশ্বব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তাই বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিশ্চিত করা তাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিের আদ্যোপান্ত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোড়ার দিকে যারা প্রেসিডেন্ট ছিলেন তাদের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বিশ্বরাজনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথক রাখা। বিশ্ব রাজনীতি থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার সেই পররাষ্ট্রনীতিকে "Isolationism” বলা হয়। পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর পররাষ্ট্রনীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ভিত বা Foundation বলা হয়। উনিশ শতকে (১৮২৩) জেমস মনরো পরাশক্তি হওয়ার যে ভিত গেঁথে গিয়েছিলেন সেটার উপর নির্ভর করে আজও যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করছে। মনরোর নীতি ছিল বহির্বিশ্বে থেকে নিজেকে দূরে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে শক্তিশালী করে তোলা। কারণ বৈশ্বিক রাজনীতিতে আধিপত্য করতে প্রথমে প্রয়োজন শক্তি (Power) সঞ্চয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অন্য কোনো রাষ্ট্রকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। এটা ছিল জেমস মনরোর নীতি। এটা দ্বারা জেমস মনরো ইউরোপীয়দের একটি মেসেজ দিয়েছিলেন যে, আমরা তোমাদের ঐদিকে (ইউরোপে) যাব না, তোমরাও আমাদের এদিকে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) এসো না। এটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি ট্র্যাপ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র এই সময়টাতে নিরবচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছিল। আর এই ১০০ বছর যুক্তরাষ্ট্র নিজের ঘরকে গুছিয়েছে। কারণ বিশ্বের পরাশক্তি হতে হলে নিজেকে আগে শক্তিশালী হতে হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের অর্থনীতি, রাজনীতি, মিলিটারি, প্রযুক্তিগত উন্নতিতে মনোনিবেশ করে। অর্থাৎ বিশ্বের রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রথমে শক্তিশালী করেছে। মোটামুটিভাবে শক্তিশালী হওয়ার পর বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের আধিপত্য জানান দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে সময়টিতে নিজেকে গড়েছে, সেই সময়টিতে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মনরোর এই পররাষ্ট্রনীতি "Monroe Doctrine" হিসেবে পরিচিত। ল্যাটিন আমেরিকার অধ্যায়ে মনরো ডকট্রিন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। নিজেকে শক্তিশালী করার পর সগৌরবে বিশ্ব রাজনীতিতে পদার্পণ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেটার সূচনা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

১৯১৩ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন উড্রো উইলসন। ২৮তম এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পতন নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৮ সালের ৮ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসে তাঁর একটি শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় তিনি চৌদ্দটি দফা পেশ করেন। এটাই ইতিহাসে "The Fourteen Points" বা চৌদ্দ দফা নীতি হিসেবে পরিচিত। চৌদ্দ পয়েন্টের সর্বশেষ ১৪তম পয়েন্টে তিনি 'লিগ অব নেশনস' প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। উইলসন লীগ অফ নেশনস-এর স্রষ্টা ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জরুরি অবস্থার কারণে তৃতীয় মেয়াদে আবার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তিনি। চৌদ্দ দফা দাবিতে গোপন চুক্তি, বাণিজ্য শুল্ক, ঔপনিবেশিক বিবাদ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ইত্যাদির অবসান ঘটানোর কথা বলা হলে বিশ্বের বহু দেশই তা মেনে নিয়েছিল। উইলসনের চৌদ্দ দফা নীতিগুলো যুদ্ধোত্তর বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পটভূমি রচনা করতে পেরেছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর মার্কিন নীতিনির্ধারকরা জেমস মনরোর বিচ্ছিন্নতাবাদের নীতি পরিত্যাগ করে। তখন ক্ষমতায় ছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান দেখলেন বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের স্থায়ীকরণ করতে তার কিছু শিষ্য প্রয়োজন যারা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রটোকল দেবে, যারা পেছনে থেকে 'জি ভাই' 'জি ভাই' বলবে। ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭ সালে ট্রুম্যান হাজির হলেন “মার্শাল প্ল্যান” (Marshall Plan) নিয়ে। বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়। অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ইউরোপে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের দ্রুত প্রসার ঘটে। ফ্রান্সের শ্রমিকরাও দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে থাকে। এভাবে পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে দ্রুত গতিতে সোভিয়েত আধিপত্য বিস্তার লাভ করতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপে সাম্যবাদ ও রাশিয়ার অগ্রগতি প্রতিরোধ করতে, ইউরোপে বিপুল পরিমাণে ঋণদানের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে, অর্থসাহায্যের মাধ্যমে সেখানে একটি যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত রাষ্ট্রজোট গঠন এবং তাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব খাটাতেই মার্শাল পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র তাতে দারুণভাবে সফলও হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো দ্রুত সময়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। সোভিয়েত আধিপত্য হ্রাস এবং কমিউনিজমের প্রভাব রোধ করতে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো নিয়ে ১৯৪৯ সালে NATO জোট গঠন করে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু অনুগত রাষ্ট্র পেয়ে যায়। ট্রুম্যান কমিউনিজম প্রতিরোধে মধ্যপ্রাচ্যে CENTO জোট এবং দক্ষিণ এশিয়াতে SEATO জোট গঠন করেছিলেন। ট্রুম্যানের পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। হ্যারি ট্রুম্যানের পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন ইতিহাসে "ট্রম্যান ডকট্রিন" হিসেবে পরিচিত। ট্রুম্যান ১৯৪৫-১৯৫৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসলেন আইসেনহাওয়ার। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত আইসেনহাওয়ার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের নীতি অনুসরণ করেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব হ্রাসে তাদেরকে বৈদেশিক সাহায্য দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

তারপর ক্ষমতায় আসেন আলোচিত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিও পূর্বসূরিদের নীতি অনুসরণ করেন। তার আমলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে দ্বন্দ্ব আরও তীব্রতর হয়। কেনেডির শাসনামলে ১৯৬২ সালে কিউবায় মিসাইল সংকট শুরু হয়। বিশ্বে একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর হাত ধরে কিউবায় অভ্যন্তরীণ বিপ্লব ঘটে, আর স্বৈরাচার বাতিস্তা পরিচালিত সরকারের পতন ঘটে। আর সে বছরেই ফিদেল ক্যাস্ত্রোর হাত ধরে কিউবায় চালু হয় সমাজতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্র কখনো মেনে নিতে পারেনি। ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক গভীর হয়। ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে উৎখাত করতে কিউবা আক্রমণের পরিকল্পনাও নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। একপর্যায়ে কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে কেনেডি সরকার। কিছু কিউবান ছিল যারা সমাজতন্ত্র বিরোধী তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিল। তারা কিউবাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিউবা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য প্রার্থনা করে। আর তাতে সাড়া দেয় তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন অতি গোপনীয়তায় কিউবায় পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম এরকম অসংখ্য আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায়। কিউবায় বসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি-সহ নয়টি প্রধান শহরকে টার্গেট করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। উল্লেখ্য, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ইতালি ও তুরস্কে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে যে হুমকি দিয়েছিল তার এক প্রকার পাল্টা জবাব ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সোভিয়েত এর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা জেনে যায়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। কেনেডিকে কিউবা দখল করতে এবং সোভিয়েত এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরামর্শ দেন তার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা। কিন্তু কেনেডি কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করলেন। মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগ বা Hotline চালু হয়। প্রচণ্ড বাকবিতন্ডার পর কেনেডি নিকিতা ক্রুশ্চেভের সাথে চুক্তি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতালি ও তুরস্ক থেকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো অপসারণ করবে। এর বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় থাকা তাদের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে আনবে। আর ইতিহাসে এটাই "Cuban Missile Crisis" হিসেবে পরিচিত। আর উভয় পরাশক্তির মধ্যে এ উত্তেজনা প্রশমন অবস্থাকে বলা হয় Detente বা দাঁতাত।

কেনেডি অধ্যায় শেষে ক্ষমতায় আসেন জনসন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন জনসন। তার শাসনামলে তথা ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারপর শুরু হয় নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার আমলেই শুরু হয়েছিল। তিনি জনসনের শুরু করা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটান। তিনি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে ১৯৭২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে SALT-I চুক্তি স্বাক্ষরিত করেন। যার পূর্ণরূপ, Strategic Arms Limitation Talks (SALT)। চিলির সমাজতান্ত্রিক সরকার সালভাদর আলেন্দেকে উৎখাত করা হয় মূলত তার নির্দেশেই।

তারপর জিমি কার্টার যুগ শুরু হয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিমি কার্টার। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই, দীর্ঘদিন ধরেই মিশর ও ইসরায়েল বিভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে তিন তিনটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়। জিমি কার্টারের নেতৃত্বে সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবকাশ যাপন কেন্দ্র Camp David এ প্রায় দুই সপ্তাহ গোপন আলোচনার পর, ১৭ সেপ্টেম্বের, ১৯৭৮ সালে 'ক্যাম্প ডেভিড' নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মিশরের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েলের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন। মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত শান্তিতে অবদান রাখায় ১৯৭৮ সালে আনোয়ার সাদাত এবং মেনাখেম বেগিন যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করে। এই চুক্তিতে মূলত ইসরায়েলকে কৌশলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আর মিশর তার অনেক সীমানা হারায়। চুক্তির কারণে মিশরকে ১৯৭৯ সালে আরব লীগ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।

তারপর ক্ষমতায় আসেন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। দুই মেয়াদে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার পুরো শাসনামলে 'সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ'টা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে জিমি কার্টারের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হামলা করে। রোনাল্ড রিগ্যানের আমলে সোভিয়েত আফগান যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে। সাম্রাজ্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা স্থানীয় আফগান মোজাহিদীনদের সহযোগিতা করে রিগ্যান সরকার। রিগ্যানের সহযোগিতায় সোভিয়েত বাহিনী আফগান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। আফগান থেকে সৈন্য অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয় সোভিয়েত সরকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভের মধ্যে ১৯৮৭ সালে নিরস্ত্রীকরণ "INF" চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার পূর্ণরূপ, Intermediate-Range Nuclear Forces Treaty (INF)।

রিগ্যান অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলে ক্ষমতায় আসেন জর্জ হার্বাট ওয়াকার বুশ। যিনি 'সিনিয়র বুশ' হিসেবে পরিচিত। তার শাসনামলে (১৯৮৯-১৯৯৩) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি রোনাল্ড রিগ্যান এর নীতিকেই অনুসরণ করেন। তার শাসনামলেই ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। তিনি রিগ্যানের গৃহীত INF চুক্তি বাস্তবায়ন করতে Biological Weapons হ্রাসের নীতিও গ্রহণ করেন। স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয় তার আমলেই। তখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (First Gulf War) শুরু হয়। কুয়েত অতীতে ইরাকেরই একটি অংশ ছিল। এজন্য ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন যে, যুদ্ধ করে হলেও তিনি কুয়েত পুনরুদ্ধার করবেন। সাদ্দাম হোসেন ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট কুয়েতে প্রায় দুই লক্ষ সেনা পাঠালে কুয়েত তার কোনো প্রতিরোধই করতে পারেনি। সাদ্দাম কুয়েত দখল করে কুয়েতকে ইরাকের ১৯তম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। আমেরিকা-সহ পশ্চিমা দেশগুলো আতঙ্কিত হয়েছিল যে, তেল সমৃদ্ধ আরব দুনিয়া এভাবে সাদ্দাম হোসেনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তাদের প্রভূত ক্ষতি হবে। এজন্য সিনিয়র বুশ প্রশাসন সক্রিয়ভাবে ইরাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কুয়েত থেকে ইরাক সরে না এলে ইরাকের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ। জাতিপুঞ্জের সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারি ইরাক আক্রমণ করে। সাত মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে নির্বিচারে প্রচুর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে মারা যায় হাজারো মানুষ। শীঘ্রই কুয়েত থেকে ইরাকের বাহিনী সরে আসতে বাধ্য হয় এবং যুদ্ধে ইরাক শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এটাই প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।

তারপরে ক্ষমতায় আসেন বিল ক্লিনটন। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মোট ছয় বছর তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিল ক্লিনটন প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ২০০০ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বিল ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারি ক্লিন্টন এর বন্ধু হচ্ছেন নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনুস। বলা হয়ে থাকে, ড. ইউনুসের অনুরোধে বিল ক্লিনটন বাংলাদেশে এসেছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধ শেষে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল একমাত্র পরাশক্তি। একক বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের শাসন কেমন হওয়া উচিত সেই সম্পর্কে থিসিস নিয়ে হাজির হন ক্লিনটনের বৈদেশিকনীতি এডভাইজার স্যামুয়েল হান্টিংটন। উপস্থাপন করলেন "সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব"। এই তত্ত্বকে ওয়েপন হিসেবে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে ভূরাজনৈতিক প্লে-গ্রাউন্ডে পরিণত করে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা।

ক্লিনটনের পর ক্ষমতায় আসলেন জুনিয়র বুশ। জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি জুনিয়র বুশ হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বাট ওয়াকার বুশের ছেলে। পররাষ্ট্রনীতিতে তার বাবাকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল যুদ্ধ দিয়েই। ৯/১১ বা টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলাকে জের ধরে ২০০১ সালে বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে হামলা চালায়। শুরু হয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধ (War Against Terrorism)। হামলার মাধ্যমে আফগানিস্তানের তখনকার তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তার পিতার শাসনামলে সংগঠিত হয়েছিল প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ তিনি আসার পর সংগঠিত হয়েছে দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ। বুশ প্রশাসন দাবি করে যে, আমেরিকাকে আক্রমণ করার জন্য সাদ্দাম ইরাকে প্রচুর মারাত্মক পারমাণবিক ও রাসায়নিক মারণাস্ত্র মজুত করছে। অভিযোগ তোলা হয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ওসামা বিন লাদেন এবং তার সংগঠন 'আল-কায়দা'-র সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের যোগসূত্র আছে। এসব অভিযোগে ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (জুনিয়র) উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা সমাবেশ করেন। শুরু হয় যুদ্ধ। আর এটাই দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। তার শাসনামলে ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মহামন্দা দেখা দেয়।

জুনিয়র বুশের পর ৪৪তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৯ সালে হোয়াইট হাউসে আসেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওবামা যখন ওভাল অফিসে ঢোকেন তখন জুনিয়র বুশ ও ক্লিনটন কর্তৃক তৈরিকৃত অনেক সমস্যা তাকে মোকাবিলা করতে হয়। ক্ষমতায় বসার মাত্র দু'বছর পরেই তথা ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। যেটা ইতিহাসে "আরব বসন্ত” হিসেবে পরিচিত। তিউনিসিয়াতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পতন হয় তিউনিসিয়ায় স্বৈরশাসক বেন আলীর। আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে গোটা আরব বিশ্বে। লিবিয়ায় পতন ঘটে মুয়াম্মার গাদ্দাফির, মিশরে পতন ঘটে হোসনি মোবারকের, ইয়েমেনে ক্ষমতাচ্যুত হন তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা একনায়ক আবদুল্লাহ সালেহ। আরব বসন্তের শুরু থেকে সেখানকার বিপ্লবীদের সমর্থন দিয়ে যাওয়া ওবামা প্রশাসন ব্যর্থ হয় বিপ্লবীদের শাসনতান্ত্রিক বিবর্তনের পথ দেখাতে। এসব দেশে কয়েক বছর পরেই পুনরায় ফিরে এসেছে সামরিক শাসন। সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন-সহ অনেক দেশে সরকার বনাম বিদ্রোহীদের মধ্যে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সেই সংঘাত কাজে লাগিয়ে আরব বিশ্বে উত্থান ঘটে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর। জন্ম হয় আইএস এর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর। সিরিয়াকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

সরকার বদলেছে, প্রেসিডেন্ট পাল্টেছে, বদলায়নি যুদ্ধবাজ নীতি। ২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামা পুনরায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য যেমন ছিল, তার দ্বিতীয় মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য আরও বহুগুণে অনিরাপদ হয়েছে। ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলে বিশ্ব রাজনীতিতে যে দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় সেগুলো হচ্ছে; ছয় জাতির 'P5+1' চুক্তি এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি। ২০০৬ সালে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদি নেজাদের এক বক্তব্যে উঠে এসেছিল ইরানের কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি রয়েছে। সেই ঘোষণা থেকেই মূলত ইরান সংকট জন্ম নেয়। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বিস্তার রোধে ২০০৬ সালের জুন মাসে একটি জোট গঠিত হয়। জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র আর জার্মানি মিলে সেই জোট গঠিত হওয়ায় তার নাম দেওয়া হয় "P5+1” বা “ছয় বিশ্ব শক্তির জোট”। এই জোট দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়েও ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে পারেনি। অবশেষে ২০১৫ সালে বারাক ওবামার নেতৃত্বে ইরানের সাথে ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংকোচিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের উপর থেকে জ্বালানি এবং ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলেন। এটা ওবামা প্রশাসনের অন্যতম কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হলেও বিশ্লেষকদের দাবি ইরান গোপনে ঠিকই পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছে। ওবামার শাসনামলেই ২০১৫ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত কপ-২১ সম্মেলনে "প্যারিস জলবায়ু চুক্তি” সই হয়। বিশ্ব উষ্ণায়নের কথা মাথায় রেখে ওই চুক্তিতে স্থির হয়, অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নিয়ে আসা। উপরিউক্ত দুটি বিষয় ওবামার পররাষ্ট্রনীতির অর্জন হলেও তার থেকে বিশ্ব যা প্রত্যাশা করেছিল সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। তার আমলেই বিদেশে অন্তত ৫৪০ বারেরও বেশি অভিযান চালানো হয়েছে। তার আমলে শুরু হওয়া সিরিয়া ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ এখনো চলমান।

তারপর ২০১৬ সালে সাবেক স্টেট সেক্রেটারি ও ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনকে হারিয়ে ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বারাক ওবামার রেখে যাওয়া কুর্দি, সিরীয়, ইরাকি, তুর্কি-সহ স্থানীয় নানা জটিল সমস্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ট্রাম্প শাসন। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ক্ষমতায় এসেই ওবামার স্বাক্ষরিত P5+1 চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি প্রত্যাহার করেন। উত্তর কোরিয়ার সাথে দুইবার বৈঠক করেও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ট্রাম্পের নির্দেশে ইরান রেভ্যুলশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অভিজাত বাহিনী কুদস ফোর্সের সেনা অধিনায়ক কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলা করে হত্যা করা হয়। বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন- সবার শরীর থেকেই কমবেশি বারুদের গন্ধ এসেছে। তাই ট্রাম্প নিজেকে পিছিয়ে রাখবেন কেন? ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দামামা বাজিয়েই ছাড়লেন। বারাক ওবামার নেতৃত্বে ওসামা বিন লাদেনের হত্যার ঘটনা তার দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের প্রচারণায় কাজে লাগিয়েছিলেন। হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্বাচনকে মাথায় রেখে সেরকমই কিছু করতে চেয়েছিলেন। তার আমলে সন্ত্রাস দমন প্রশ্নে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় যুক্তরাষ্ট্রের। আফগানিস্তানে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বে ইমরান খানকেও তখন "তালেবান খান" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন ভেটেরান জো বাইডেন। বারাক ওবামার যোগ্য উত্তরসূরি। ১৯৭৩ সালে মার্কিন ইতিহাসে পঞ্চম সর্বকনিষ্ঠ সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতিতে দীর্ঘ ৬০ বছরের ক্যারিয়ার। বাইডেন দীর্ঘদিন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে কাজ করেছেন। সিনেটের এই কমিটির সভাপতি হিসেবে ২০১২ সালে আমেরিকার ইরাক যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টিকে অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তার উপর। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এই অভিযোগে যখন ইরাকে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তাব করেন, তখন বাইডেন তাতে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন। পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে আগাগোড়া পাকা খেলোয়াড় এই জো বাইডেন এখন ক্ষমতায়। একুশ শতকের আগামী বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেবে সেটা নির্ভর করছে জো বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির উপর। ক্ষমতায় এসেই অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে পুনরায় যোগদান, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ, ইরানের সাথে ছয় জাতির পরমাণু চুক্তিতে বহাল থাকা ইত্যাদি নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেছেন। সম্প্রতি বাইডেন কর্তৃক গৃহীত পারমাণবিক সাবমেরিন বিষয়ক 'অকাস চুক্তি', চীনের বিরুদ্ধে 'বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড' পলিসি, ভারতের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি, বিআরআই প্রজেক্টের বিপরীতে কোয়াড নিয়ে তৎপরতা, প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনবিরোধী অবস্থান শক্তিশালী করা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়াকে সাথে নিয়ে তাইওয়ানকে প্রোটেক্ট করার ঘোষণা, ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো পাল্টে দিচ্ছে পোস্ট-কোভিড বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ। প্রেসিডেন্টরা ক্ষমতায় আসবেন আর নানান অজুহাত ধরে যুদ্ধ বাঁধাবেন- যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যাধি অনেক পুরোনো। তাই দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে নতুন কোনো যুদ্ধে নেমে পড়বেন কি না সেটা জানার জন্য হয়তোবা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আর যুদ্ধে জড়াবে কি না (Loss Aversion Theory)

মনে করুন, আপনার অনেক দিনের শখ একটি আইফোন মোবাইল ক্রয় করার। আপনি খুব চাচ্ছেন আপনার একটি আইফোন মোবাইল থাকুক। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আশি হাজার টাকা দিয়ে আপনি একটি আইফোন মোবাইল ক্রয় করলেন। যার মধ্য দিয়ে আপনার দীর্ঘ দিনের ইচ্ছেটাও পূরণ হলো। এবার প্রশ্ন হলো- অনেক দিনের ইচ্ছে পূরণ হবার কারণে আপনি কতটুকু খুশি হলেন? শখের আইফোনটি কাছে পেয়ে আপনি নিজেকে কতটা আনন্দিত মনে করবেন? একইভাবে মনে করুন, আশি হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করা আপনার সেই আইফোনটি মাত্র কিছুদিন ব্যবহার করার পর আপনার বাসা থেকে চুরি হয়ে গেল। শখের মোবাইলটি চুরি হয়ে যাওয়ায় এখন আপনি কতটা কষ্ট অনুভব করবেন? মানুষের সুখ-দুঃখ কখনো মাপা যায় না, পরিমাপও করা যায় না। কিন্তু সুখ কিংবা দুঃখ অনুভব করা যায়, আমরা ভিতর থেকে তা অনুভব করতে পারি। আপনার শখের আইফোন ক্রয় করার পর আপনি যে পরিমাণ আনন্দিত হয়েছিলেন তার থেকে কয়েকগুণ বেশি কষ্ট পেয়েছেন মোবাইলটি চুরি হয়ে যাওয়ায়। অর্থাৎ আপনি ৮০ হাজার টাকার আইফোন ক্রয় করতে পেরে যে-পরিমাণে খুশি হয়েছিলেন, সেই ৮০ হাজার টাকার আইফোনটি চুরি হয়ে যাওয়াতে তার চেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছেন। আইফোন ক্রয়ের আনন্দটার চেয়ে আইফোন হারিয়ে ফেলার কষ্টটা অনেক বেশি। আমরা সমপরিমাণ জিনিস লাভের আনন্দের চেয়ে সমপরিমাণ জিনিস হারানোর দুঃখটা বেশি অনুভব করি। আর এটাকেই "Loss Aversion" বলা হয়। কোনো কিছু অর্জন করার পথকে কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়টা আমাদের বেশি কাজ করে। Loss aversion এটা সমপরিমাণ জিনিস তুলনা করার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। যেমন ধরুন সকালে আপনি একশো টাকা আয় করলেন এবং রাতে মাত্র দশ টাকা হারিয়ে ফেললেন। তখন আপনার মধ্যে একশো টাকা আয় করার আনন্দটাই বেশি থাকবে, দশ টাকা হারানোর কষ্ট তেমন বেশি অনুভব হবে না। কিন্তু যখন আপনি সকালে একশো টাকা আয় করবেন এবং রাতে আবার একশো টাকা হারিয়ে ফেলবেন তখন হারিয়ে ফেলার কষ্টটা বেশি অনুভব হবে। এখানে টাকা সমপরিমাণই অর্থাৎ আয় করলেন একশো এবং হারালেনও একশো। টাকা সমপরিমাণ হওয়া সত্ত্বেও হারিয়ে ফেলার কষ্টটা বেশি অনুভব হয়।

এজন্যই মানুষ হারানোর ভয়টা বেশি করে। যখন কোনো কিছু অর্জন করার চেয়ে হারানোর ভয়টাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় তখন সেটাকে বলে "Loss Aversion Bias"। আমরা ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি এরকম চিন্তা করি যে, ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করলে আমার ব্যবসায় লোকসান হতে পারে, আমি হয়তোবা বিজনেস করে লাভ করতে পারব না; তাই আমার উচিত বিজনেসে টাকা ইনভেস্ট না করা। টাকাটা বরং আমি ব্যাংকে জমা রেখে দেই। এই যে ব্যবসায় লোকসান হওয়ার ভয়ে আপনি বিনিয়োগ করলেন না, সেটাকেই বলে "Loss aversion bias"। অথচ টাকা ব্যাংকে জমা না রেখে সেটাকে ইনভেস্ট করলে প্রচুর পরিমাণে লাভ হওয়ারও সম্ভাবনা ছিল। অর্থাৎ লাভের দিকটাকে কম গুরুত্ব দিয়ে ক্ষতির দিকটা আমরা বেশি ভাবি। তাই Loss aversion bias বিজনেস এর জন্য ক্ষতিকর।

এই টার্মটি মূলত Behavioural Economy তে পড়ানো হয়। কিন্তু এখন বর্তমানে "Loss Aversion Bias" এই টার্মটি রাজনীতিতেও প্রচুর ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে Electoral Politics এর ক্ষেত্রে। এই পরিভাষাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধের লাভ-ক্ষতি হিসেব করার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। একটি সাধারণ উদাহরণ দেই। যুক্তরাষ্ট্র এই পর্যন্ত অনেক যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়াতে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে, সেখানে গাদ্দাফির পতন ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধে জয়ী হয়েছে, সেখানেও সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটিয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র অসংখ্য যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। কিন্তু এত যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পরেও শুধু ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাওয়ার কারণে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছিল। অর্থাৎ মাত্র একটি যুদ্ধে হারার কারণে বাকি যেসব যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল সেগুলোর আনন্দ মলিন হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক যোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অসংখ্য যুদ্ধে জয় হলে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে-পরিমাণ ইমেজ বৃদ্ধি পায়, মাত্র একটি যুদ্ধে হেরে গেলেই তার চেয়ে বেশি ইমেজ সংকটে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ইমেজ সংকট উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে প্রচুর ডিবেট হয় এই নিয়ে যে, যুক্তরাষ্ট্র যেন ভবিষ্যতে আর যুদ্ধে না জড়ায়।

আফগানিস্তান ইস্যুতেও যুক্তরাষ্ট্র ইমেজ সংকটে পড়েছে। বিশ বছর আগে যাদেরকে উৎখাত করতে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানে এসেছিল, টানা বিশ বছর যুদ্ধ করে আবার ঠিক তাদেরকেই ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে মার্কিনীদের আফগান ছাড়তে হয়েছে। ২০০১ সালে তালেবানদের হটাতে ন্যাটো জোট আফগানিস্তানে হামলা চালায়, টানা চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তানে যুদ্ধ করে, ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে, হাজারও মার্কিন সেনা নিহত হয়, ২০২১ সালে সেই তালেবানদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে ন্যাটো জোট আফগানিস্তান ত্যাগ করে। তাই বলা হচ্ছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এটাও যুক্তরাষ্ট্রের লস প্রজেক্ট। এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের 'Strategic Failure' বলা হচ্ছে। চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ইস্যুতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি বড় করে তুলে ধরছে। চীন এটাকে 'Biggest Miscalculation' হিসেবে উত্থাপন করছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যেন ভবিষ্যতে আর যুদ্ধে না জড়ায় সেই মত দিচ্ছেন ওয়ারফেয়ার স্পেশালিস্টরা।

সফট পাওয়ার স্ট্র্যাটেজি

1. Deceptive diplomacy: বলা হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মাঝে মাঝে নিজেদের গোপন তথ্যগুলো নিজেরাই ফাঁস করে দেয়। বিভিন্ন দেশে সিক্রেট অপারেশনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অসংখ্য রাষ্ট্রপ্রধান উৎখাত করেছে। মনে করুন দশ বছর পূর্বে কোনো একটি দেশের সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র উৎখাত করেছিল। তারপর দশ বছর পর সরকার উৎখাতের ঐ ঘটনাটি নিয়ে সিআইএ সুন্দর করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। কীভাবে সিআইএ সেই সরকার উৎখাতে সফল হয়েছিল সেটা প্রতিবেদনে অতিরঞ্জিত করে ফুটিয়ে তোলা হয়। তারপর তারাই সেটা ফাঁস করে দেয়। তারপর বড় বড় জার্নালে সেই প্রতিবেদন পাবলিশ করা হয়। বিশ্বজুড়ে হইচই শুরু হয়। এটা দ্বারা তারা মূলত তুলনামূলক কম শক্তিধর দেশগুলোকে এই বার্তা দেয় যে, তারা গোপনে অনেক কিছু করতে সক্ষম; তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তারা এরকম একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে যে, যারা মার্কিন বিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে তারাই সেনা অভ্যুত্থান, গুপ্তহত্যা ও গৃহযুদ্ধ-সহ বিভিন্ন উপায়ে উৎখাত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তা অধিকাংশই গোপন ছলচাতুরিমূলক কূটনীতি দ্বারা। আর এরকম প্রতারণাপূর্ণ, কূট, বিভ্রান্তিকর পলিসি দিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার কূটনীতিকে “Deceptive Diplomacy” বা প্রতারণামূলক কূটনীতি বলা হয়।

2. Hegemonic Sovereignty: একটি রাষ্ট্রের নিজ ভূখণ্ডের উপর সে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্বকে বলা হয় ওয়েস্টফেলিয়ান সার্বভৌমত্ব (Westphalian Sovereignty)। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অন্য কোনো রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। একটি রাষ্ট্র বড় কিংবা ছোট, ধনী কিংবা গরিব যা-ই হোক না কেন তার নির্দিষ্ট সীমানা বা ভূখণ্ডের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব বজায় থাকবে এবং একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন এই Westphalian Sovereignty যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য কোনো দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার বৈধতা দিচ্ছে না। একইভাবে ওয়েস্টফেলিয়ান সার্বভৌমত্ব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তান-সহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। কিন্তু তাই বলে কি যুক্তরাষ্ট্র নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্য দেশগুলোর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না? এই অবৈধ হস্তক্ষেপকে বৈধ বা লেজিটিমাইট করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র Westphalian Sovereignty এর বিপরীতে নতুন আরেকটি টার্ম নিয়ে হাজির হয়েছে। যার নাম দিয়েছে "Hegemonic Sovereignty"। এই Hegemonic Sovereignty এর মানে হলো বিশ্বের কোনো দেশে গণতন্ত্র না থাকলে কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সেই দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং কথিত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সেই দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা এবং সেটা বৈধ। এই Hegemonic Sovereignty অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন, ইরাকে সাদ্দামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের হামলাকে বৈধতা দিচ্ছে। শুধু একটি তকমা লাগিয়ে দেবেন যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় হস্তক্ষেপ করেছি! বর্তমান দুনিয়ায় এই Westphalian Sovereignty এর বিপরীতে Hegemonic Sovereignty দিনদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বহির্বিশ্বে তার হস্তক্ষেপকে বৈধ হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আপনি অ্যান্ড্রো বাখচিভের 'The Limits Of Power' বইয়েও পাবেন।

3. The Limits of Power: যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরই সমালোচনা করে যারা গোটা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছেন এমন দুইজন ব্যক্তি হলেন প্রফেসর অ্যানডু বাখচিভ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি। “The Limits of Power”- পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রফেসর অ্যানডু বাখচিভের লেখা একটি বিখ্যাত বই। এই বইয়ে আমেরিকান হয়েও আমেরিকার সমালোচক অ্যানডু বাখভিচ আমেরিকার রাষ্ট্রব্যবস্থার পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছেন। বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে: ১. বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার বিশ্বনেতৃত্বকে (domination) কল্যাণকর বলে ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকার উদ্দেশ্য অন্যের মঙ্গল করা। ২. ধরে নিতে হবে বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যে-কোনো ধরনের দুর্বলতা (lapse) বিশ্বব্যাপী বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছাড়া বা যুক্তরাষ্ট্র ওয়ার্ল্ড পলিটিক্সে নেতৃত্ব না দিলে বিশ্বে নৈরাজ্য দেখা দেবে বলে মনে করে আমেরিকানরা। ৩. সে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং তার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা জরুরি হলেও ন্যায়সংগত। ৪. অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের লক্ষ্যে আমেরিকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে একাধিক অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক তৎপরতা কার্যকর করা প্রয়োজন। ৫. আমেরিকার বৈদেশিক নীতি ও রাজনীতি হবে আক্রমণাত্মক এবং যে-কোনো শক্তিকে পরাজিত করা তার একমাত্র লক্ষ্য।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোড়ার দিকের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে আজকের জো বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে পর্যন্ত উপরিউক্ত পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের একটিও অনুপস্থিত নেই।

4. হেজিমনি (Hegemony): Hegemony বা চিন্তার আধিপত্যবাদ। এই হেজিমনি শব্দটি সামনে নিয়ে আসেন দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি। সরল বাংলায় হেজিমনি এর মানে হচ্ছে, কোনো একটি বিষয় সবার মাথায় ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করা এবং সাধারণ মানুষকে ভাবতে বাধ্য করা যে উক্ত ধারণাটি সত্যি। একটি আইডিয়া এমন ভাবে প্রয়োগ করা যেন দলে দলে মানুষ বিশ্বাস করে এটাই মনে হয় সত্যি, এটাই মনে হয় বাস্তব। যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে চিন্তার আধিপত্যকে বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব কার্যকলাপকে আন্তোনিও গ্রামসির হেজিমনি তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই তত্ত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ্লোমেসি সম্পর্কে একটি বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়। হেজিমনি প্রচারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার গণমাধ্যম। বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে মিডিয়াকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ: উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর বোমায় হাজার হাজার ইরাকি মারা গিয়েছে। অনেক আগে যুদ্ধ হলেও এসব যুদ্ধের কাহিনি মানুষের মনে একটি সংবেদনশীলতা তৈরি করে এবং সেই সংবেদনশীলতা থেকে মার্কিন বিরোধী একটি মনোভাব গড়ে উঠতে পারে। তাই এখন গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে মানুষের সেই সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই যুদ্ধকে কনভার্ট করে বানানো হচ্ছে ভিডিও গেইম; যেখানে ইরাকের সেনাদের উপর বোমা ফেলে ফেলে গেইমের একেকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ভিডিও গেইমের মধ্য দিয়ে ইরাকিদের নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে মর্মাহত হওয়ার পরিবর্তে মানুষ বিষয়টিকে এখন একটি স্রেফ বিনোদন বা মজা হিসেবে নিচ্ছে। এভাবে মানুষের সংবেদন নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়াকে টার্ম হিসেবে "Desensitization” বলা হয়। বিশ্বায়নের এই যুগে ভিডিও গেইমও চিন্তার আধিপত্যবাদ হিসেবে কাজ করছে। আরব বিশ্বে এসব ভিডিও গেইম নিয়ে নানা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে, বিভিন্ন ভিডিও গেইমসের মাধ্যমে কৌশলে সহিংসতা ও উগ্রতাকে ইনজেক্ট করা হচ্ছে।

Question to think about?
মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্ব না দেয় তাহলে বিশ্বে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্ব রাজনীতির নেতৃত্ব থেকে আসলেই নিজেকে প্রত্যাহার করে তাহলে পৃথিবী কি আরও নৈরাজ্যময় হবে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে পৃথিবী আরও স্থিতিশীল হবে?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Chomsky, Noam (2003), Hegemony or Survival: America's Quest for Global Dominance, Metropolitan Books
2. Russell Mead, Walter (2012), Special Providence: American Foreign Policy and How It Changed the World, Knopf
3. Gries, Peter Hays (2014), The Politics of American Foreign Policy: How Ideology Divides Liberals and Conservatives over Foreign Affairs, Stanford University Press
4. Hixson, Walter L. (2009), The Myth of American Diplomacy: National Identity and U.S. Foreign Policy, Yale University Press
5. Jentleson, Bruce W. (2010), American Foreign Policy: The Dynamics of Choice in the 21st Century, 4th ed. W. W. Norton
6. Freedman, Lawrence (2009), A Choice of Enemies: America Confronts the Middle East, Public Affairs
7. Cullinane, Michael Patrick and Ryan, David (2014), U.S. Foreign Policy and the Other, Berghahn Books
8. Herring, George C. (2008), From Colony to Superpower: U.S. Foreign Relations Since 1776, Oxford History of the United States

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট

📄 যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট


Theme: The Past is Never Dead

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট

"Domestic policy can only defeat us; foreign policy can kill us." - John F. Kennedy

ঢাকাতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবাই-ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। "যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার শত্রুর দরকার নেই” এরকম একটি ন্যারেটিভ প্রচলিত থাকলেও বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত বন্ধু হতে পারলে আসলে ক্ষতি নেই। বরং অনেক লাভ রয়েছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। পূর্বে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কতটা বিভীষিকাময় ছিল কল্পনাও করা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে আক্রমণ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। দুই দুটি পারমাণবিক বোমার তেজে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় জাপান। তখন জাপানের নেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুধাবন করল, তা হচ্ছে- "যে আমেরিকা আমাকে ধ্বংস করতে পারে সে আমেরিকাই ভবিষ্যতে আমাকে রক্ষা করতে পারবে”। তাই পেছনের ইতিহাস ভুলে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করল জাপান। সেদিনের এই অনুধাবনটি জাপানকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। গোটা এশিয়ায় জাপান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। এমনকি জাপানের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে। জাপান উন্নতির কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বন্ধু দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। দক্ষিণ কোরিয়া আজ একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেন ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় এটা বোঝার জন্য জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণই যথেষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট

একুশ শতকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয় বরং অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত সেই বিষয়টি বোঝার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করব। বিগত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে বাংলাদেশের সাথে একটি এগ্রিমেন্ট করার কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কোনোমতেই রাজি হচ্ছে না। এমন কী আছে সেই চুক্তিতে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ রাজি হচ্ছে না?

A Status of Forces Agreement (SOFA)

সোফা এগ্রিমেন্ট হচ্ছে একধরনের সামরিক বা নিরাপত্তা চুক্তি। সাধারণত একটি দেশে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অবস্থান করার বৈধতা নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সাথে প্রায়ই চুক্তি করে এবং সেই চুক্তির মাধ্যমে ঐসব দেশে নিজেদের মিলিটারি ঘাঁটি স্থাপন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন করার অনুমতি আদায় করে নেয়। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে তার সেনা মোতায়েন করার বৈধতা পায়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিটি করেছে। ১৯৯৮ সালে মার্কিন সেনাপ্রধান ডেনিস রাইমা বাংলাদেশের কাছেও সোফা এগ্রিমেন্টটি প্রস্তাব করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনা সরকারকেও কয়েকবার প্রস্তাব করেছে এধরনের একটি চুক্তি করার। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সোফা প্রস্তাবে অনেকটা এরকম শর্ত থাকে:

1. Entry and Exit: বাংলাদেশে মার্কিন সেনাদের বিনা ভিসায় প্রবেশাধিকার এবং দেশের মধ্যে তাদেরকে অবাধ চলাচলের অনুমতি দেওয়া।

2. Tax liabilities: হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশ তাদের উপর কোনো ট্যাক্স আরোপ করতে পারবে না। তাদেরকে কাস্টমস ছাড়পত্র ছাড়াই বিভিন্ন মিলিটারি সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে বাংলাদেশে আসার সুযোগ দিতে হবে।

3. Criminal Status: বাংলাদেশে প্রবেশের পর কোনো মার্কিন সেনা যদি অপরাধ কিংবা ক্রাইমে লিপ্ত হয় তখন তাকে মার্কিন আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিচার করা যাবে না।

উপরিউক্ত শর্তগুলো দেখে নতুন করে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সাবেক স্টেট সেক্রেটারি হিলারি ক্লিনটনও বাংলাদেশের সাথে সোফা এগ্রিমেন্টটি করার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এ নিয়ে বাংলাদেশে এখনো বিতর্ক চলছে। মার্কিনদের এমন প্রস্তাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকার অত্যন্ত কৌশলের সাথে সোফা চুক্তির প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও তারা বলেছিল বাংলাদেশে ঐরকমভাবে কোনো মিলিটারি ঘাঁটি স্থাপনের আগ্রহ নেই, তারা বাংলাদেশে শুধু মাঝে মাঝে কিছু সেনা মোতায়েন করবে।

সোফা এগ্রিমেন্ট ও ঝুঁকিসমূহ

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা এগ্রিমেন্টে আবদ্ধ হলে একটি রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিগুলো কী কী?

প্রথমত, Host Nation Concerns: সাউথ কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সোফা এগ্রিমেন্ট রয়েছে। সেখানে ২০০২ সালে এক মার্কিন সেনা প্রশিক্ষণ শেষে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে ক্যাম্পে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে এক্সিডেন্টে দুজন স্থানীয় কোরিয়ান মেয়ে তাৎক্ষণিক মারা যায়। যেহেতু চুক্তিতে বলা ছিল মার্কিন আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে সেহেতু দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত সেই অভিযুক্ত মার্কিন সেনাকে বিচারের আওতায় আনতে পারেনি। সেই ঘটনার জেরে পুরো দক্ষিণ কোরিয়া জুড়ে তাদের দেশে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি বিরোধী বিক্ষোভ হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো মার্কিন সেনারা হোস্ট কান্ট্রির যে অঞ্চলে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে ঐ অঞ্চলের মেয়েরা কিছুটা অনিরাপদ বোধ করে। জাপানে মার্কিন সেনাদের অনেক রেইপ স্ক্যানডাল এর কাহিনিও আমরা শুনতে পাই।

দ্বিতীয়ত, Sovereignty Issues: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা। সোফা এগ্রিমেন্ট এর সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। যে এত সাল থেকে এত সাল পর্যন্ত আপনি আমার দেশে সেনা মোতায়েন রাখতে পারবেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পোন্নত কোনো দেশের সাথে একবার সোফা চুক্তি স্বাক্ষরিত করলে সেই চুক্তিটির বৈধতা তারা আজীবন ধরে রাখতে চাইবে। যেমন- প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাকের সাথে সোফা চুক্তি করেছিলেন সেই ২০০৮ সালে। চুক্তিটির নাম ছিল- "U.S.-Iraq Status of Forces Agreement"। কিন্তু চুক্তির দশ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে এখনো ইরাকে মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখার বৈধ অধিকার আছে। কিন্তু বর্তমানে ইরাক বলছে চুক্তি হয়েছিল এক দশক আগে এবং তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী। তাই বর্তমানে আমাদের মাটিতে কোনো বিদেশি সেনার উপস্থিতি মেনে নিতে পারব না। বিষয়টি ঠিক এরকম যে, ধরুন বাংলাদেশ আজকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করল। মনে করি আজ থেকে বিশ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট এর আগমন ঘটল। তখন সেই যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট দেখল শত্রু রাষ্ট্র চীনের সাথে যুদ্ধ অবধারিত। তাই চীন এবং বাংলাদেশের দূরত্ব কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্র দেখল বাংলাদেশ থেকে চীনকে আক্রমণ করা অনেক সহজ। তখন সে বলবে চীনকে শায়েস্তা করতে বাংলাদেশে মার্কিন সেনা পাঠাও। আমরা তো বাংলাদেশের সাথে অতীতে একবার সোফা চুক্তি করেছিলামই। তাই এখন আর সেনা মোতায়েনে বাংলাদেশের অনুমতি লাগবে না। যদি এরকম একটি চিত্র ভবিষ্যতে দাঁড়ায় তাহলে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে তা সার্বভৌমত্বের জন্য কতটুকু হুমকি? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি শুধু একটি উদাহরণ হলেও পৃথিবীর অনেক দেশে এটি একটি তিক্ত বাস্তবতা। প্রিয়া সাহা যখন হোয়াইট হাউসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের 'মাইনরিটি অপ্রেশন' নিয়ে অভিযোগ দিচ্ছিলেন তখন এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ট্রাম্প বলেছিলেন আমরা কি সেখানে এখনো আমাদের সেনা পাঠাইনি? "Has it landed the helicopter? Have we landed out there yet?"- Donald Trump

তৃতীয়ত, Political Issues: সোফা এগ্রিমেন্ট এর তৃতীয় ঝুঁকি হচ্ছে রাজনৈতিক। একটি দেশে যখন মার্কিন সেনা অবস্থান করে তখন বিভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সেনাদের সাথে বিভিন্ন গোপন চুক্তি করার মাধ্যমে তাদের সাথে আঁতাত করার চেষ্টা করে। এমনকি নিজ স্বার্থের জন্য মার্কিন সেনাদের সাথে গোপনে রাষ্ট্র বিরোধী চুক্তিও করে থাকে। ১৯৭০ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন করা হলো। অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭২ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন আদর্শবাদী নেতা এডওয়ার্ড গগ হুইটল্যাম। তখন এডওয়ার্ড হুইটল্যাম অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বললেন আমাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পলিসিতে কেন অন্য আরেকটি দেশের প্রভাব থাকবে? তাই এখন থেকে অস্ট্রেলিয়া সকল বৈদেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে এবং অস্ট্রেলিয়াও এখন থেকে অন্য দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। হুইটল্যাম যুক্তরাষ্ট্রকে তোয়াক্কা না করেই ভিয়েতনাম থেকে অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিলেন, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা ও রোডেশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপকে সমর্থন করলেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের নিয়ম বাতিল করলেন। হুইটল্যামের পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন স্বার্থবিরোধী হওয়ায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশে সিআইএ হুইটল্যামকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

সোফা এগ্রিমেন্ট নিয়ে এতটুকু আলোচনাই যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা এগ্রিমেন্ট এর বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়তা ও কৌশলের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশও বটে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্ভর করে তার বৈদেশিক সম্পর্ক বা নীতির উপর। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকগণ গোড়া থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাজতান্ত্রিক নীতি বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন সরকারের অনেক অসন্তুষ্টি ছিল। অসন্তুষ্টি থাকা সত্ত্বেও এবং বঙ্গবন্ধুর আমলেই যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য ও পণ্য দিয়ে বাংলাদেশকে মানবিক সহযোগিতা করেছিল। প্রশ্ন হলো কেন যুক্তরাষ্ট্র তখন বাংলাদেশকে মানবিক সাহায্য দিয়েছিল? উত্তরটি হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব হ্রাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ছিল। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে কিউবায় পাটের থলি রপ্তানি করার উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য প্রদান স্থগিত করে দেয়। কারণ কিউবা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে হয়েছিল। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সামগ্রীর খুবই প্রয়োজন ছিল তখন। এবার আমরা মার্কিনদের চোখে বাংলাদেশের কিছু অর্জন নিয়ে আলোচনা করব।

1. Non-Proliferation Treaty (NPT): বঙ্গবন্ধুর পর ক্ষমতায় আসে জিয়াউর রহমান। তার শাসনামলে বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালেই এনপিটি বা পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলে। এনপিটি চুক্তি নিয়ে সংক্ষেপে দুচারটা কথা বলি। এটি মূলত বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধের জন্য একটি চুক্তি, যা ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত হয় কিন্তু ১৯৭০ সাল থেকে কার্যকর হয়। এই চুক্তির তত্ত্বাবধায়নকারী (Depositary) তিনটি রাষ্ট্র হচ্ছে; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করলেও পাঁচটি দেশ (ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান ও সাউথ সুদান) এখনো অংশগ্রহণ করেনি। এমনকি সম্প্রতি ভারত প্রথম দেশ হিসেবে জাপানের সঙ্গে 'সিভিল নিউক্লিয়ার ডিল' করার কথাও ব্যক্ত করেছে। যেখানে ভারত-পাকিস্তানের মতো দুটি পরমাণুশক্তিধর রাষ্ট্র এখনো এনপিটি চুক্তি স্বাক্ষর করেনি সেখানে ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ চল্লিশ বছর আগেই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে ফেলে। সেজন্য মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে।

2. The United Nations Iran-Iraq Military Observer Group (UNIIMOG): ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে বাংলাদেশি সেনারা ইরাকের বিরুদ্ধে লড়েছে। ১৯৯০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নিলে শুরু হয়েছিল উপসাগরীয় যুদ্ধ। বাংলাদেশ সেই উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম অংশ ছিল। এই যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে বাংলাদেশ ২,৩০০ সৈন্য প্রেরণ করেছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর এটাই ছিল বাংলাদেশি সৈন্যদের জন্য প্রথম বৈদেশিক যুদ্ধ।

3. Comprehensive Nuclear-Test-Ban Treaty (CTBT): সিটিবিটি হলো পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি। চুক্তির লক্ষ্য সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে যাবতীয় পারমাণবিক পরীক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। ১৯৯৬ সালের জুনে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসেই ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সিটিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। দ্রুত সময়ে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান মার্কিনদের কাছে প্রশংসিত হয়।

4. Humanitarian Assistance Needs Assessment (HANA): সংক্ষেপে হানা চুক্তি। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হানা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মূল কথা হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বাংলাদেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে মানবিক সহযোগিতা করবে। প্রয়োজন হলে খাদ্যসামগ্রী-সহ মার্কিন সেনাদের বাংলাদেশে পাঠাবে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যখন ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে তখন হানা চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন সেনারা দুটি হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ নিয়ে বাংলাদেশে আসে। মার্কিন মেরিন সেনারা বাংলাদেশের উপকূলীয় দুর্গম অঞ্চলে হেলিকপ্টার নিয়ে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়। এমনকি মার্কিন সেনারা দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থান করেছিল।

বাংলাদেশের কেন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন

অর্থাৎ অতীতে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে মেজর জিয়া, জেনারেল এরশাদ, বেগম জিয়া, শেখ হাসিনা সরকার সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বের সাথে দেখেছে। বর্তমান একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের খুবই দরকার। প্রথমত, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৃহত্তম বাজার এখন যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে থাকার পেছনে তৈরি পোশাকের ভূমিকা অন্যতম। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। যদি বাংলাদেশ মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে চায় তাহলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রকে। কেননা যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ ছাড়া মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। তৃতীয়ত, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা ইত্যাদির উদ্দেশ্যে অসংখ্য মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা আবশ্যক। চতুর্থত, বাংলাদেশের পোশাক কিংবা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে যেন বিনা শুল্কে (জিএসপি সুবিধা) প্রবেশ করতে পারে সেটার জন্যও বাংলাদেশ বর্তমানে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ঢাকাতে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১১৩২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সরব হয় যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংস্থাগুলোর তৎপরতায় বারাক ওবামা প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (GSP) স্থগিত করে দেয়। "Trade Act of 1974" নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ট্রেড প্রোগ্রাম রয়েছে। এই প্রোগ্রামের অধীনে কিছু দেশকে যুক্তরাষ্ট্র তার দেশে স্বল্প শুল্কে, কখনো আবার সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। এটাকেই GSP সুবিধা বলে, যার পূর্ণরূপ Generalized System of Preferences (GSP)।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন বাংলাদেশকে প্রয়োজন

শুধু বাংলাদেশেরই যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার বিষয়টি এরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রেরও বাংলাদেশকে খুব প্রয়োজন দুটো কারণে। একটি অর্থনৈতিক, আরেকটা রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক কারণটা হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বঙ্গোপসাগরে ভবিষ্যতে তেল-গ্যাস আবিষ্কারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিককালে তেল ও গ্যাস আহরণের সম্ভাবনাপূর্ণ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি বর্তমান সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে বেশ কটি মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিজেদেরকে জড়িত করেছে। আর রাজনৈতিক কারণটা হলো এই অঞ্চল থেকে চীনের প্রভাব সংকুচিত করা। অতীতে সোভিয়েত প্রভাব প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যেভাবে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ঠিক সেভাবেই বর্তমানে চীনকে মোকাবিলা করতে বাংলাদেশকে প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুবই স্ট্র্যাটেজিক মনে হয়েছে। তবে ইম্পরটেন্ট বিষয় হচ্ছে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় মিত্র ভারত। তাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে নাকি বাংলাদেশকে স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্ব দেবে সেটা অনেকটা নির্ভর করে ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতার উপর। তার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন 'Diplomatic Capital' বৃদ্ধি করা। ড্যানিস রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রেবেকা এডলারের মতে, বিচক্ষণ কূটনীতিক গড়ে তোলা, বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করা এবং নেগোসিয়েশন করার দক্ষতা অর্জন করাকেই ডিপ্লোমেটিক ক্যাপিটাল বলে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

১৯৫৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে আলোচিত ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে, পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শাসন করেছিলেন। নিক্সনের পরামর্শদাতা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। যিনি বাংলাদেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি বিশ্বজুড়ে দাবার ঘুঁটি চালিয়েছিলেন। "One Man Against the World: The Tragedy of Richard Nixon” এই বিখ্যাত বইটি লিখেছেন আমেরিকান লেখক টিম ওয়েনার। বইটি রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার এর শাসনামল নিয়ে লেখা। নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার বইটি এটি। লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঐ সময়ে নিক্সন প্রশাসন অনেক সিদ্ধান্তই নিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি মার্কিন কংগ্রেস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের বিরোধিতা সত্ত্বেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে সহায়তা করেছিল। নিক্সন বাংলাদেশে গণহত্যার কথা আমলে নেননি। বরং মার্কিন কংগ্রেস ভারত ও পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা উপেক্ষা করে তিনি তৃতীয় দেশ ইরান ও জর্ডানের মাধ্যমে পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠান।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাটি ছিল কিছুটা প্যারাডক্সিকাল। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্যারাডক্সিকাল এই অর্থে যে, একদিকে আমেরিকা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও সিভিল সোসাইটি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করেছিল। দ্বিতীয়ত, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সে সময়ে পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রাখে, আবার অন্যদিকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য ভারতকে সাহায্য পাঠাতে থাকে। একাত্তরের মে মাসে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য ত্রিশ লক্ষ মার্কিন ডলার সাহায্য দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি একসাথে বাংলাদেশকে সহযোগিতা ও বিরোধিতা দুটোই করেছিল?

আমি যখন বলছি মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে, তখন মূলত রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় এসে উভয়ই একই অর্থ বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র বলতে ওই আমলের নিক্সন সরকারকে বোঝাচ্ছে। আমি যদি বলি বর্তমানে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো নয়, এখানে বাংলাদেশ বলতে মূলত বর্তমান সরকারকে বোঝায়। আশাকরি বিষয়টি এখন বোধগম্য। তাই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বলতে মূলত সরকারের সিদ্ধান্তকেই বোঝায়। পররাষ্ট্রনীতিিতে দেশের জনগণ কী ভাবছে, জনগণ কোন দেশের পক্ষে অবস্থান করেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সরকার কোন পক্ষকে সমর্থন করছে সেটা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। যেমন- উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ইরাকি জনগণের পক্ষে ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে লড়েছে। যেহেতু রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তাই বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধটি সংগঠিত হয়েছিল। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিল ভারত। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। তাই স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। যে-কারণে নিক্সন প্রশাসন বাংলাদেশ সমস্যাকে পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে উল্লেখ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে নাইজেরিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী বায়াফ্রার সঙ্গে তুলনা করে। এটিকে ভারত বনাম পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে লেবেল করা হয়।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে পাকিস্তানের পক্ষে যাবতীয় সমর্থন আদায়ের নির্দেশ দেন। কূটনৈতিক ভাষায় যাকে বলা হয় 'Tilt Policy'- কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা। এই পলিসির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকে এবং ভারতের জন্য আর্থিক সাহায্য স্থগিত করে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কিছু সিনেটর, রিপ্রেজেনটেটিভস, বুদ্ধিজীবী, কিছু মার্কিন সংবাদপত্র-সহ বেসরকারি পর্যায়ের অনেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ কনসার্ট' জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। মার্কিন সরকারের মুখ্য কর্মকর্তা হিসেবে তখন ঢাকাতে ছিলেন হার্বার্ট স্পাইভ্যাক। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের একটি বার্তা হস্তান্তর করেন। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের সাথে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ৯ এপ্রিল একটি চিঠি পাঠান যাতে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। সে বছরেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৭২ সালের ১৮ই মে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হার্বার্ট স্পাইভ্যাক হন ভারপ্রাপ্ত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করেন। ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় ভাষণ দান করেন। ১৯৭৪ সালে অক্টোবরে হেনরি কিসিঞ্জার দক্ষিণ এশিয়ায় সফরকালে ঢাকায় এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার পর তিনি বঙ্গবন্ধুকে 'A man of vast conception' বলে অভিহিত করেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন: স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৫৫ সালের ১৮ থেকে ২৪ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার বান্দুংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল 'বান্দুং এশিয়ান আফ্রিকা কনফারেন্স'। সেখানে বলা হয়েছিল এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলো কোন জোটে বা ব্লকে যোগ না দিয়ে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। বান্দুং সম্মেলনের পর ১৯৬০ সালের দিকে এশিয়া ও আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো সিদ্ধান্ত নেয় তারা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো ব্লকে যোগ দেবে না। ফলশ্রুতিতে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, ঘানার কাওয়ামে ক্রুমাহ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ সুকর্ণ এসব রাষ্ট্রনেতারা গড়ে তোলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম)। যাকে ইংরেজিতে Non-Aligned Movement (NAM) বলা হয়। ১৯৬১ সালে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ২৫টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ন্যামের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। ১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ই সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয় ন্যামের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন। এতে প্রথমবারের মতো যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান সৃদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখে এই সফর। সম্মেলনে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি-সহ অন্যান্য বিশ্বনেতারাও অংশ নিয়েছিলেন। যারা ন্যাম গঠনের অগ্রদূত ছিলেন তারা সবাই মূলত পরোক্ষভাবে কিছুটা সোভিয়েত ঘেঁষা ছিলেন। এমনকি মার্শাল টিটু, ফিদেল ক্যাস্ত্রো নিজ নিজ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই যুক্তরাষ্ট্র জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনকে ভালো চোখে দেখেনি। ১৯৭২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর চার দিনের সোভিয়েত সফর, বৈশ্বিক অঙ্গনে সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর উঠা বসা এবং বাংলাদেশের সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি কারণে বঙ্গবন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হন।

Track I এবং Track II পলিসি: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নাম হচ্ছে- Central Intelligence Agency (CIA)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে এবং মার্কিন বিরোধী যে-কোনো ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করতে বিভিন্ন সিক্রেট এজেন্ডা নিয়ে থাকে এই গোয়েন্দা সংস্থাটি। তাদের গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে যেসব অপারেশন পরিচালনা করা হয় সেগুলোর বিভিন্ন কোড নেইম বা Cryptonym থাকে। পূর্ব থেকেই তাদের অপারেশন সম্পর্কে যেন কেউ আঁচ করতে না পারে সেজন্যই এসব কল সাইন ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: Track I এবং Track II হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম দুটি সিক্রেট প্রজেক্ট। এই কর্মসূচির শিকার হয়েছিলেন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে, বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান, কঙ্গোর লুমুম্বা, এবং ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো-সহ অসংখ্য রাষ্ট্রপ্রধান। "Track I" পদ্ধতি অনুযায়ী বিদেশে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে তৎপরতা চালায়, বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপ এবং কর্পোরেশনগুলোকে অর্থায়ন করে তাদের পক্ষ হয়ে কাজ করতে। ট্র্যাক ওয়ান পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে "Track II" গ্রহণ করা হয়। চিলির আলেন্দে হত্যার পর আলেন্দের স্ত্রী ১৯৭৪ সালে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে Track II সম্পর্কে বলেছিলেন। মিসেল আলেন্দে বলেছিলেন, কোনো পপুলার গভার্নমেন্টকে উৎখাত করার জন্য সিআইএ প্রথমে সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে দেয়। তারপর নানা গোলযোগ সৃষ্টি করে। শ্রমিক ধর্মঘট উসকে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। দেশব্যাপী আন্দোলন নামাতে পেশাজীবীদের মদদ দেয়, বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্রের চালান পাঠায়। এভাবে পপুলার নেতা বা গভর্নমেন্টের জনপ্রিয়তা নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। জনমতকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের দিকে নেয়। প্রথমে ওরা ভাব দেখায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে মিলিটারির মধ্য থেকে ওদের বাছাই করা লোকটিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়। এভাবে কঙ্গোতে লুমুম্বাকে মেরে ওরা বসিয়েছে মবুতুকে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণকে সরিয়ে বসিয়েছে সুহার্তোকে। চিলিতে আলেন্দেকে সরিয়ে বসিয়েছে পিনোচেটকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্র্যাক ওয়ান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেন স্বাধীন হতে না পারে সেজন্য মার্কিন ভূমিকা ছিল বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে। ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দ্বিতীয় ট্র্যাক ব্যবহার করা হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে মোট ৮ জন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়। লাগাতার পাটের গুদামে আগুন, চোরাচালান বৃদ্ধি, খাদ্যশস্য মজুদ, চালের চালান আটক করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি, জাসদের নামে জামায়াত-রাজাকার- আলবদরদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে প্রকাশ্য মুজিব বিরোধিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ জন ছাত্র খুনের ঘটনা যেন মিসেস আলেন্দের ভাষায় সিআইএর সেট প্যাটার্ন। [দেখুন- ইতিহাসের রক্ত পলাশ: পনেরো আগস্ট, পঁচাত্তর- আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী]

দি ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার (The Trial of Henry Kissinger)

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিবলয় প্রভাব- প্রতিপত্তির ক্ষেত্রে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বলয় নিয়ে মার্কিন প্রশাসনও নানামুখী তৎপরতা শুরু করে। এছাড়া সত্তরের দশকে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার রাজনীতি প্রতিহত করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের গোয়েন্দা সংস্থা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। "The Trial of Henry Kissinger" নামে আমেরিকান কলামিস্ট ক্রিস্টোফার হিচেন্স এর একটি বই আছে। ১৪৫ পৃষ্ঠার এই বিখ্যাত বইটি ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। লেখক পুরো বই জুড়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চিলি, সাইপ্রাস, পূর্ব তিমুর, ইন্দোচীন ইত্যাদি রাষ্ট্রে হেনরি কিসিঞ্জারের সম্পৃক্ততা। তার বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়টি হচ্ছে, Bangladesh: One Genocide, One Coup and One Assassination! এই অধ্যায়ে পাকিস্তানি সেনাদের হামলার নিন্দা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সিআইএর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সমর্থন করেছেন। ক্রিস্টোফার হিচেন্স লিখেছেন, 'চুয়াত্তরের নভেম্বরে কিসিঞ্জার দক্ষিণ এশিয়ায় সফরে গিয়ে বাংলাদেশে আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেন এবং এখন আমরা জানতে পারছি যে, এর পরপরই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের একাংশ গোপনীয়ভাবে মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্ররত একদল বাংলাদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।

"In November 1974, on a brief face-saving tour of the region, Kissinger made an eight-hour stop in Bangladesh and gave a three-minute press conference in which he refused to say why he had sent the USS Enterprise into the Bay of Bengal three years before. Within a few weeks of his departure, we now know, a faction at the US embassy in Dacca began covertly meeting with a group of Bangladeshi officers who were planning a coup against Mujib. On 14 August 1975, Mujib and forty members of his family were murdered in a military takeover."
- Christopher Hitchens

লরেন্স লিফশুলজের গবেষণায় বাংলাদেশ

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের লরেন্স লিফশুলজ বাংলাদেশ নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। ক্রিস্টোফার হিচেন্স তার বইয়ে লরেন্সের গবেষণাটিও উল্লেখ করেছেন। লরেন্সের গবেষণায় উঠে এসেছে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডেও মার্কিন ভূমিকা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। নিক্সন প্রশাসন এবং কিসিঞ্জার বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সহজভাবে নিতে পারেনি। ভারত এবং রাশিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশের জন্ম হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে বিচলিত ছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় গভীর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে উপদলীয় কোন্দল, খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করে সরকারকে অজনপ্রিয় করার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। ১৯৭৪ সালে মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশে খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল কিউবায় বাংলাদেশের পাট রপ্তানির অজুহাতে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের লরেন্স লিফশুলজ তার গবেষণায় দাবি করছেন যে, বাংলাদেশেও ওই Track I এবং Track II দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল। সিআইএ মুজিব হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালিদের ব্যবহার করেছিল।

[বিস্তারিত দেখুন: Christopher Hitchens, The Trial of Henry Kissinger, Page-53]

Question to think about?
স্নায়ুযুদ্ধকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। আজকের একুশ শতাব্দীতে এসেও কি যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের মধ্যকার নয়া স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বাংলাদেশের বিরোধিতা করবে?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
১. ইতিহাসের রক্ত পলাশ: পনেরো আগস্ট, পঁচাত্তর- আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী।
২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলিলপত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড- মিজানুর রহমান খান।
৩. বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি- তারেক শামসুর রেহমান।
4. Bass, Gary J. (2014), The Blood Telegram: Nixon, Kissinger and a Forgotten Genocide, Vintage
5. Hitchens, Christopher (2001), The Trial of Henry Kissinger, Verso Books
6. Lewis, David (2011), Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society, Cambridge University Press
7. Weiner, Tim (2016), One Man Against the World: The Tragedy of Richard Nixon, Griffin
8. Voetelink, Joop (2015), Status of Forces: Criminal Jurisdiction over Military Personnel Abroad, Springer
9. Mason, R. Chuck (2009), Status of Forces Agreement: What Is It, and How Has it Been Utilized? Congressional Research Service
10. United States Embassy (1996), Backgrounder: Status of Forces Agreement; A summary of U.S. foreign policy issues

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 ল্যাটিন আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতি

📄 ল্যাটিন আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতি


Theme: The Return of Geopolitics and A Problem from Hell
ল্যাটিন আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতি

"It's not that China understands Latin America better than the U.S. Rather, China has a pragmatic approach that fits the profile of Latin American governments and leaders." - Thiago de Aragao

ভূমিকা: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ল্যাটিন আমেরিকা একটি উপেক্ষিত বিষয়। অনেকে মনে করেন ল্যাটিন আমেরিকা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিলে সেখানে আলোচনার আর কিছুই থাকে না। তবে ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি অনেক বৈচিত্র্যময়। চিলির রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে সেটি অনেকের মাথায় না-ও আসতে পারে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতেও যে থাকতে পারে বাংলাদেশের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনা; তা মোটামুটি আলোচনারই বাহিরে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভেনেজুয়েলার “Dutch Disease” থেকে বাংলাদেশও যে শিক্ষা নিতে পারে সেটি ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্কে আলোচনা না করলে বোঝা সম্ভব নয়। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুকে না দেখলে বুঝতেই পারবেন না যে, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশেও “Impeachment” এর মতো ঘটনা সম্ভব। দরিদ্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বশ্যতা খুব সহজে মেনে নিলেও ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলমান রাখতে পারেনি। আমরা গত শতাব্দী ধরে ল্যাটিন আমেরিকাকে কেন্দ্র করে কেমন ভূরাজনৈতিক খেলা হয়েছে তা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। তবে বর্তমানে চীনের উত্থান এবং ল্যাটিন আমেরিকাকে ঘিরে তাদের Pragmatic Embrace Strategy ল্যাটিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতে কেমন মাত্রা যোগ করবে তাই এখন দেখার পালা।

মনরো ডকট্রিন: যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে ওঠে
ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছে যাদের হাত ধরে তাদেরকে বলা হয় 'Founding Fathers'। তাদের মধ্যে ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন, জন এ্যাডামস, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, থমাস জেফারসন, জেমস মনরোর মতো প্রমুখ নেতা। ১৮১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন জেমস মনরো। মনরো শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কুটনীতিক। উনিশ শতকে জেমস মনরো পরাশক্তি হওয়ার যে ভিত গেঁথে গিয়েছিলেন সেটার উপর নির্ভর করে আজও যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করছে।

বলতে পারবেন, একটি দেশের সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক পলিসি কোনটি? উত্তর হচ্ছে ফরেইন পলিসি বা পররাষ্ট্রনীতি। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে সেটি কখনো জনগণ নির্ধারণ করে দেয় না। এমনকি জনগণকে জানিয়ে কোনো রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে না। রাজনীতি বিজ্ঞানে "Camarilla" নামে একটি টার্ম রয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে সরকারের গোপন পরামর্শদাতা। প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক বা শাসকদের কিছু গোপন এডভাইজার থাকে। আনঅফিশিয়াল এই পরামর্শদাতারা রাজনৈতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এরা মূলত লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে কাজ করে (Behind the Scene)। ক্ষমতাসীন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান মূলত এদের থেকেই পরামর্শ নিয়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে। তাই পররাষ্ট্রনীতিকে "Least Democratic Policy" বলা হয়।

একজন দক্ষ ও কূটনৈতিক দূরদর্শীসম্পন্ন নেতা একাই একটি রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। শুধু রিয়ালিস্টিক পররাষ্ট্রনীতির উপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র যে বিশ্বের হেজিমন হতে পারে সেটি আমেরিকার উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট। এই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের যারা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাদের অনেকেই ছিলেন দক্ষ কূটনীতিক। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে জেমস মনরো। এই পর্বে তার যুগান্তকারী মনরো ডকট্রিন (Monroe Doctrine) নিয়ে কিছু কথা বলব। পরবর্তী আলোচনা থেকে আঁচ করতে পারবেন তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে কতটা দূরদর্শীসম্পন্ন ছিলেন।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অন্যতম শক্তিশালী দেশ আমেরিকা। অর্থ, সম্পদ, সামরিক সরঞ্জাম, তথ্য ও প্রযুক্তি সব দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে দারুণ আধিপত্য। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলে আমি-আপনিও হয়তোবা এই আধিপত্যের প্রশংসা করতাম। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ঠিকই এটি প্রত্যাশা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিক এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নেতা হোক। এখন প্রশ্ন হলো বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা হলো? আজকের যুক্তরাষ্ট্র হুট করেই বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি। তারা পরিকল্পনা করে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়েছে। মনরো ডকট্রিনের মাধ্যমে প্রথমে নিজেদের প্রতিবেশি অঞ্চল ল্যাটিন আমেরিকায়, তারপর মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপে, সোভিয়েত পতনের পর মিডল ইস্ট পলিসির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে, ওয়াশিংটন কনশেনসাসের মাধ্যমে আফ্রিকা ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সেই আধিপত্য ধরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে নিয়েছিল নানা থিওরি ও তত্ত্ব। উদাহরণস্বরূপ- কখনো হেজিমনিক স্ট্যাবিলিটি পলিসি, কখনো ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন তত্ত্ব, কখনো আবার ডেমোক্রেটিক পিস থিওরি, কখনো হেজিমনিক সভরেন্টি, কখনো ডুয়াল ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি ইত্যাদি।

১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। লক্ষ্য করে দেখবেন যে, ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত এই সময়টিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ঐ সময়টিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সবগুলো দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মান ও পুর্তগিজদের কলোনিতে পরিণত হয়েছিল। এসব অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আধিপত্যই ছিল না। ১৮১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ক্ষমতায় এসে চিন্তা করল যে, আমাদের পার্শবর্তী এসব অঞ্চল থেকে ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য হটাতে হবে এবং এখানে কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ মনরো বুঝতে পেরেছিল নিজ ঘরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে পুরো বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। তারপর সে অনুযায়ী মনরো তার পররাষ্ট্রনীতি সাজালেন। ১৮২৩ সালে তিনি কংগ্রেসে ঘোষণা করলেন মনরো নীতি। তার সেই পররাষ্ট্রনীতিকেই বলা হয় Monroe Doctrine বা মনরো নীতি। কী ছিল মনরো নীতিতে?

১. ল্যাটিন আমেরিকার যে-কোনো বিষয়ে ইউরোপের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বা উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অবৈধ হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ ল্যাটিন আমেরিকার ভূখণ্ডে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের প্রভাব বা কর্তৃত্ব আমেরিকা মেনে নেবে না। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা ও পানামাকে নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে স্পেন থেকে স্বাধীন করায়। সে আলোচনা একটু পর বিস্তারিত বলছি।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ ভৌগোলিক সীমানার বাইরে তথা আটলান্টিক এর উপারের অন্য কোনো রাষ্ট্রকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। এটি দ্বারা জেমস মনরো ইউরোপীয়দের একটি মেসেজ দিয়েছিলেন যে, আমরা তোমাদের ঐদিকে (ইউরোপে) যাব না, তোমরাও আমাদের এদিকে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) এসো না। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফাঁদ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এই সময়টিতে নিরবচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছিল। আর এই ১০০ বছর যুক্তরাষ্ট্র নিজের ঘরকে গুছিয়েছে। কারণ বিশ্বের পরাশক্তি হতে হলে নিজেকে আগে শক্তিশালী হতে হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের অর্থনীতি, রাজনীতি, মিলিটারি ও প্রযুক্তিগত উন্নতিতে মনোনিবেশ করে। পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে শক্তিশালী করার এই নীতিকে টার্ম হিসেবে “Non-Interventionist Policy" বলা হয়। অর্থাৎ বিশ্বের রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রথমে শক্তিশালী করেছে। মোটামুটিভাবে শক্তিশালী হওয়ার পর বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের আধিপত্য জানান দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে সময়টিতে নিজেকে গড়েছে সেই সময়টিতে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

৩. ট্র্যাপ হিসেবে মনরো নীতিতে উল্লেখ করা হয় যে, আমেরিকা ইউরোপের কোনো প্রকার রাজনীতিতে অংশ নেবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের কোনো প্রকার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। মূলত মনরো নীতির উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পৃথিবীর প্রায় সকল ঘটনার সাথে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজের ঘরকে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) আগে সামলানো। আর একারণেই মনরো নীতিকে বলা হয়- Policy of Isolation বা বিচ্ছিন্ন থাকার নীতি।

৪. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূখণ্ডকে পৃথিবীর কোনো দেশের রাজনৈতিক বা ঔপনিবেশিক স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। তথা এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার সীমানা বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। মেক্সিকো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, ওয়াইয়োমিং, ইউটাহ, কলোরাডো, অ্যারিজোনা এবং নিউ মেক্সিকো শহরগুলোর পুরোপুরি বা অংশবিশেষ দখল করে নেয়। এক লাফে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা বহুগুণ বেড়ে যায়।

৫. ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি ভুল পথে চলে তবে সেই দেশকে শাসন করার অধিকার থাকবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের। এখানে ভুল পথে চলা বলতে মার্কিন বিরোধী হওয়া। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি ল্যাটিন আমেরিকার যে রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয়ে আশ্রয় নিয়েছিল কিংবা যারা সমাজতান্ত্রিক মতবাদে দেশ পরিচালনা করেছিল তাদের যুক্তরাষ্ট্র পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

লক্ষ্য করে দেখবেন যে, মনরো নীতির এই বৈশিষ্ট্যগুলো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার করার পথ সুগম করে দিয়েছিল। আমরা দেখেছি পরবর্তীতে ঠিক সেটাই হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকায় ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য কমে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি মেনে নিয়েছিল কী? প্রথমত, "উপনিবেশবাদের একাল সেকাল" অধ্যায়ে আমরা দেখেছিলাম ফ্রান্সে নেপোলিয়নের উত্থান, শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, নিজেদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল ইত্যাদির কারণে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া ব্রিটেন এই মনরো ডকট্রিনকে সাদরে গ্রহণ করেছিল তাদের সুবিধার্থে। কারণ ব্রিটেনের জন্য সেই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। লন্ডনে ব্যাপক শিল্পায়নের কারণে সেই শিল্প থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাজার দরকার ছিল ব্রিটেনের। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা ল্যাটিন আমেরিকায় বাণিজ্য করত। তাই অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করেনি। দ্বিতীয়ত, ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে ইউরোপিয়ান কলোনি বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এই পলিসি ল্যাটিন আমেরিকার নেতাদের কাছে আশীর্বাদ হিসেবে মনে হয়েছিল। সিমন বলিভারও মনরো ডকট্রিন আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেন। কারণ তখন গোটা আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে ইউরোপীয় কলোনি বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছিল। তাই সবাই তখন 'Pan-Americanism' এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিল। প্যান আমেরিকানিজমের মানে হচ্ছে, আমেরিকা মহাদেশীয় সকল রাষ্ট্র একতাবদ্ধ থাকা এবং একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসা।

পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও মনরোর এই লিগ্যাসি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এই নীতির প্রথম আক্রমণাত্মক প্রয়োগ দেখান থিওডোর রুজভেল্ট। তিনি বলেছিলেন পশ্চিম গোলাধে (Western Hemisphere) কোনো রাষ্ট্রের সমস্যা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে আন্তর্জাতিক পুলিশি ভূমিকা, সেক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। বিংশ শতকের শুরুতে ২৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট মনরো ডকট্রিনে আরও কয়েকটি নতুন বিষয় যুক্ত করেন। তিনি এটিকে আরেকটু ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয় ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল পথে চালিত হয়, তবে সেই দেশকে শাসন করার অধিকারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে। এই যে মনরো নীতিকে ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে রুজভেল্ট নতুন একটি আগ্রাসী সংস্করণ দাঁড় করালেন সেটিকে "Roosevelt Corollary" বলা হয়। এর মানে হচ্ছে রুজভেল্ট মূলত ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে চেয়েছিলেন। এভাবে মনরো ডকট্রিন ঘোষিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকায় আগ্রাসন শুরু করে এবং সে দেশগুলোর জন্য নিজেদের পছন্দের শাসক বেছে নেয়। কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করি।

• মার্কিন প্রশাসন ১৯৮০ সালে এল সালভাদরে যে সামরিক অভ্যুত্থানটি হয়েছিল সেখানে সহায়তা করে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী সরকারকে সরিয়ে আমেরিকার মদদপুষ্ট সরকারকে বসানো হয়。
• ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন নিকারাগুয়ার কন্ট্রা বিদ্রোহীদের সহায়তা করেন, যারা দীর্ঘ নয় বছর লড়াই করে প্রায় ত্রিশ হাজার নিকারাগুয়ান মানুষকে হত্যা করে।
• ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র গ্রানাডায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
• ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাদকবিরোধী অভিযানের অজুহাতে পানামায় সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেছিল এবং নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।
• ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে জৈব অস্ত্র আধুনিকায়নের অভিযোগ তুলে দেশটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল।
• ২০০৯ সালে হন্ডুরাসের সামরিক অভ্যুত্থানে মার্কিন প্রশাসন সমর্থন দিয়েছিল। সমসাময়িক ভেনেজুয়েলা, পেরু, বলিভিয়া, চিলিতে যুক্তরাষ্ট্র একই কায়দায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায় লিপ্ত। ল্যাটিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্র যে কাজটি বেশি করেছিল সেটি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোকে উৎখাত করে তদস্থলে সামরিক শাসক বসানোর চেষ্টা করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সেখানে মিলিটারি শাসনও প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এরকম দ্বিচারিতা শুধু বিংশ শতাব্দীতেই নয় একবিংশ শতাব্দীতেও বহাল তবিয়তে রয়েছে। কেমেলিওনের মতো যুক্তরাষ্ট্র তার রং বদল করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনি এমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। পরাশক্তি হওয়ার জন্য যে কৌশলে কাজ করতে হয় প্রতিটি কৌশল সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা একটু খারাপ হলেও বিশ্বে দেশটির প্রভাব কখনোই কমবে না, যেটি সোভিয়েতের ক্ষেত্রে হয়েছিল। চীন যতই চেষ্টা করুক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে অতিক্রম করে তদস্থলে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

কিউবা: যাকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হওয়ার দ্বিতীয় যাত্রাটি শুরু হয়
একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় চরিত্র (National Character) খুবই আগ্রাসী। কিন্তু আজকের আধিপত্যবাদী এই আমেরিকা একটি সময়ে বিশ্ব রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ১৮৬৫ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ সমাপ্তির পর, ১৮৯৮ সালেই আমেরিকা স্পেনের সাথে একটি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাল্টে যায় আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ধরন এবং বিশ্ব রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় আমেরিকা হয়ে ওঠে প্রবল সাম্রাজ্যবাদী। বিশ্বে পরাশক্তি হয়ে উঠার পেছনে মনরো ডকট্রিনের পর এই যুদ্ধটি ছিল আমেরিকার দ্বিতীয় পদক্ষেপ।

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত ফিদেল ক্যাস্ত্রোর দেশ কিউবা। ভারতীয় উপমহাদেশে যারা বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের কাছে সমাজতান্ত্রিক কিউবা একটি ফ্যান্টাসির জায়গা। কিউবা আজকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শত্রু রাষ্ট্র। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় এই কিউবা স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। কলোনিয়াল পিরিয়ডে কিউবা ছিল স্পেনের একটি উপনিবেশ। ১৮৯৫ সালে কিউবাতে স্পেনবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমাতে স্প্যানিশ সরকার আন্দোলনকারীদের বন্দি করে বন্দিশিবিরে আটক করে রাখত। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বন্দিশিবিরেই অসংখ্য কিউবানদের মৃত্যু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো কিউবার এই করুণ ইতিহাস সম্প্রচার করত। এমনকি সংবাদপত্রের কাটতি বাড়ানোর জন্য মিডিয়াগুলো অতিরঞ্জিত ভাবে কিউবানদের নিয়ে সংবাদ উপস্থাপন করত। সেখান থেকেই মূলত 'Yellow Journalism' বা হলুদ সাংবাদিকতার সূচনা।

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও কিউবার প্রতি একটি সহনাভূতি জাগে। ২৫তম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি তখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায়। কিউবাকে কেন্দ্র করে ১৮৯৮ সালে শুরু হয় স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধ। যুদ্ধে স্পেন পরাজিত হয় এবং প্যারিসে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী স্পেন কিউবাকে স্বাধীনতা দেয় এবং পুয়ের্তো রিকো ও গুয়াম দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় আসে। যুক্তরাষ্ট্র যে কিউবাকে মানবিক কারণে সহযোগিতা করেছে বিষয়টি এরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি স্বার্থ ছিল। প্রথমত, কিউবাতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানির বাণিজ্য ছিল। দ্বিতীয়ত, আরেকটি স্বার্থ ছিল আমেরিকার অঞ্চল থেকে উপনিবেশবাদী স্পেনের আধিপত্য হ্রাস করা। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯০৩ সালে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে 'Platt Amendment' নামে একটি চুক্তি করে। প্ল্যাট চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কিউবার পররাষ্ট্রনীতিতে, অর্থনীতিতে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার পায়। সেই চুক্তি অনুযায়ী কিউবার বিখ্যাত 'গুয়ান্তানামো বে' ইজারা নিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক "বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের" বন্দি করে রাখা হয় এই গুয়ান্তানামো বে ক্যাম্পে। গোপনে পরিচালিত এই ক্যাম্পে বন্দিদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকে এখন পর্যন্ত পুরো গুয়ানতানামো বে কারাগারেই চলছে বন্দিদের উপর অমানবিক নির্যাতন। ৯/১১-এ যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ২০০২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ কারাগার চালু করেন। কিউবার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিতে এ কারাগার অবস্থিত। এভাবে স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবেশ করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা মত দেয় যে, বিশ্বের পরাশক্তি হতে হলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আবশ্যক।

চীন: ল্যাটিন আমেরিকায় চীনের 'Pragmatic Embrace Strategy'
লাটিন আমেরিকাকেন্দ্রিক চীনের স্ট্র্যাটেজিগুলো যুক্তরাষ্ট্র এখনো বুঝে উঠতে পারছে না। বৈদেশিক নীতি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক থিয়াগো আরাগা-ও এমনটি দাবি করেছেন। বিগত দুশো বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ল্যাটিন আমেরিকায় ফলপ্রসূ হচ্ছে না। মিলিটারি ইন্টারভেনশন কিংবা শিকাগো বয়েজদের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তন করে সাময়িক কিছু সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র পেলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান আসছে না। কারণ ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো ক্ষমতাসীন সরকারকে (Incumbent Government) উৎখাত করে তদস্থলে মার্কিন মদদপুষ্ট কাউকে বসালেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। যেমন- বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্রী ইভো মোরালেস সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট জিনাইন এ্যানেজকে ক্ষমতায় বসালেও মাত্র দুই বছর যেতে না যেতেই বলিভিয়ায় পুনরায় ইভো মোরালেসের উত্তরসূরিরা ক্ষমতায় চলে এসেছে। অথচ চীন এগুচ্ছে ভিন্ন আরেকটি কৌশলে।

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিভিন্ন অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থ এবং সোভিয়েত পলিসি মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ভালোভাবে বুঝে উঠতে পেরেছিলেন বলেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আজকের একুশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট প্রতিপক্ষ হচ্ছে চীন। চীনের সক্ষমতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে চীনের পররাষ্ট্রনীতি বুঝে উঠতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চীনের পার্থক্য এখানেই। মার্কিনীরা চীনের এপ্রোচ বুঝে উঠতে পারছে না। তাই নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা চীনের এই কৌশলগত অবস্থানকে 'Pragmatic Embrace Strategy' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিই চীনের এপ্রোচ বুঝে উঠতে পারছে না সেখানে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের নিম্ন ডিপ্লোমেটিক ক্যাপিটাল নিয়ে কীভাবে চীনের কৌশলগত আচরণ বুঝে উঠবে? তাই এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বিরোধ চলছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্বকে বলা হচ্ছে "A Prelude to a Second Cold War" বা দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধের পূর্বরঙ্গ। ল্যাটিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি হচ্ছে, মার্কিন বিরোধী সরকারদের উৎখাত করে সেখানে মার্কিনপন্থি কাউকে ক্ষমতায় বসানো। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র একটি স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন চায়। রাশিয়া পূর্বের তুলনায় ল্যাটিন আমেরিকায় কিছুটা নিষ্ক্রিয়। তবে রাশিয়ার নীতি হচ্ছে এখানে আইডিওলজি পিচ করা। তথা সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া। অন্যদিকে চীনের ফরেইন পলিসি সরকার পরিবর্তন নিয়েও নয়, এখানে মতাদর্শ প্রচার করাও নয়। চীনের নীতি হচ্ছে যে পন্থি সরকারই ক্ষমতায় আসুক আমার এতে সমস্যা নেই, তারা যেসব মতাদর্শে বিশ্বাস করে, তাতেও আমার সমস্যা নেই। আমি (চীন) আগাবো অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে। অন্য রাষ্ট্রগুলোকে কীভাবে চীনের উপর নির্ভরশীল করে রাখা যায় সেই কৌশলে এগুচ্ছে বেইজিং। উদাহরণস্বরূপ: চীনের কৌশলটি এরকম যে, চীন প্রথমে একটি দেশে কূটনৈতিক সফরে যাবে। তারপর বলবে আপনার দেশে তো কোনো রেলওয়ে নেই। তাই যাতায়াতের সুবিধার্থে আমি এখানে একটি রেললাইন করে দিতে চাই। আপনাদের তো কোনো সাবমেরিন নেই। নিরাপত্তা জোরদারে আমি কয়েকটি সাবমেরিন উপহার দিতে চাই। সমস্যা নেই টাকা-পয়সা যা লাগে পরে দিলেও হবে। চীনা কোম্পানিগুলো আপনার দেশে বিনিয়োগ করলে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। তখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে। এটিই হচ্ছে চীনের কৌশল। তথা এভাবে অর্থনৈতিক সাহায্য ও বিনিয়োগ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোকে বশে আনার যে কৌশল চীন বেছে নিয়েছে সেটিকে “Checkbook Diplomacy” বলা হয়।

এক কথায় যুক্তরাষ্ট্র এগুচ্ছে Political Approach নিয়ে, রাশিয়া এগুচ্ছে Ideological Approach নিয়ে, আর চীন এগুচ্ছে Economic Approach নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ ব্রাজিলের কথা বলা যায়। এটি স্বীকৃত যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র রাষ্ট্র। ভবিষ্যতে হয়তোবা ব্রাজিল ন্যাটো জোটেরও সদস্য হবে। কিন্তু সেই ব্রাজিলের 5G বাজার এখন চীনের দখলে। চীনের হুয়াওয়ে মোবাইল ব্রাজিলে খুবই জনপ্রিয়। ব্রাজিলও এখন আকরিক ধাতু ও শস্যদানা (Ore and Grains) বেইজিংয়ে রপ্তানি করছে। আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা ও নিকারাগুয়াতে চীন একই পদ্ধতিতে এগোচ্ছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরকার পরিবর্তনে গুরুত্বারোপ করছে না, রাশিয়ার মতো আলোচনার টেবিলে কোনো মতাদর্শ নিয়ে আসছে না, চীন নেগোসিয়েশন করছে অর্থনীতি নিয়ে।

চিলি: যে দেশটির সাথে মিশে আছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের রক্তাক্ত ইতিহাস
স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যে-সকল নেতারা তৃতীয় বিশ্বের গণমানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এবং যারা জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছিলেন তাদের মধ্যে বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান ও চিলির সালভাদর আলেন্দে অন্যতম। ঢাকার সাথে সান্তিয়াগোর যে দুইটি মিল রয়েছে তন্মধ্যে একটি ভৌগোলিক অন্যটি রাজনৈতিক। বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র ভেদ করে সরলরেখা বরাবর যদি কোনো গর্ত খুঁড়ে যাওয়া যায় তবে আমরা সবাই চিলির নিকট প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে বের হব। কারণ বাংলাদেশের প্রতিপাদস্থান (Antipodal point) হচ্ছে চিলির নিকট প্রশান্ত মহাসাগরে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের ঠিক অপজিটে চিলির অবস্থান। চিলির সাথে বাংলাদেশের দ্বিতীয় যে সাদৃশ্যটি রয়েছে সেটি খুব বেদনাদায়ক। বঙ্গবন্ধু ও সালভাদর আলেন্দে সমকালীন নেতা ছিলেন। এক চিঠিতে সালভাদর আলেন্দে বাংলাদেশে সফর করে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার ইচ্ছেও ব্যক্ত করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই দুই নেতাকেই মার্কিন সহযোগিতায় স্বীয় দেশের সেনাবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে ১৯৭৩ সালে সে দেশের সেনাবাহিনী হত্যা করেছিল। তার মাত্র দুবছর পরেই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।

রাজনীতি বিজ্ঞানের একজন স্টুডেন্ট হওয়ার সুবাদে চিলির রাজনীতি আমাদেরকে আকৃষ্ট করেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সরু দেশ হিসেবে পরিচিত চিলিকে আজ হয়তো বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় কম দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের সাথে চিলির রাজনৈতিক ইতিহাসের মিল থাকায় চিলি সম্পর্কে কিছু মৌলিক ধারণা থাকা আবশ্যক। কলম্বাসের নতুন দুনিয়া আবিষ্কারের পর থেকে তিনশো বছর দেশটি স্পেনের কলোনি ছিল। তাই চিলির ভাষা স্প্যানিশ, মুদ্রা পেসো। ১৮১৮ সালে স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং বর্তমান সংবিধানটি ১৯৮০ সালে প্রণয়ন করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী চিলি একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজধানী ও বৃহত্তম শহর সান্তিয়াগো। বর্তমানে চিলি বিশ্বের বৃহত্তম তামা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। চিলির রাজনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে; গণতান্ত্রিক, সামরিক এবং পুনরায় গণতন্ত্র।

সালভাদর আলেন্দে ও চিলির গণতান্ত্রিক শাসন (১৯৩২-৭৩)
১৯৩২-৭৩ সাল পর্যন্ত চিলিতে গণতান্ত্রিক শাসন ছিল। তখন চিলি ছিল ল্যাটিন আমেরিকার একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা ছিল এবং দীর্ঘ চল্লিশ বছরে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেনি। তখন সেখানে কোনো বিশাল গণ আন্দোলন হয়নি এবং নির্বাচনগুলো ছিল স্বচ্ছ। চিলি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয় যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসীন হন। তার নাম সালভাদর আলেন্দে। সময়টি যেহেতু স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন; তাই এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কুনজর পড়তে সময় লাগেনি। আলেন্দে ক্ষমতায় আসীন হয়েই সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেন। ব্যাপকহারে শিল্প প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করেন। নারীশিক্ষা ও নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য চিলিতে প্রথম নারী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনিই। এসব সমাজতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞ পছন্দ হয়নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের। ফলশ্রুতিতে চিলিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয় নিক্সন প্রশাসন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার চিলির সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। প্ল্যান অনুযায়ী ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হত্যা করা হয় আলেন্দেকে। আলেন্দে হত্যাকাণ্ডের পর চিলির সেনাপ্রধান পিনোচেটকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

বাংলাদেশ ও চিলি: ভাগ্য যেন একসূত্রে গাঁথা
চিলিতে প্রায় সতেরো বছর সামরিক শাসন ছিল (১৯৭৩-৯০)। মার্কিন মদদপুষ্ট পিনোচেট ক্ষমতায় এসেই তামা ইন্ডাস্ট্রিগুলো বেসরকারিকরণ করেন। চিলির ২৬ জন অর্থনীতিবিদকে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। এসব অর্থনীতিবিদরা চিলির অর্থনীতি এমনভাবে সাজান যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষিত হয়। ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যায় চিলির অর্থনীতি। মার্কিনপন্থি এসব অর্থনীতিবিদরাই টার্ম হিসেবে 'The Chicago Boys' নামে পরিচিত। এসব অর্থনীতিবিদদের কাজ হচ্ছে এরা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে প্রশিক্ষণ নেবে। তারপর নিজ দেশে এসে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে এমন সব ইকোনমিক পলিসি গ্রহণ করবে। দীর্ঘ সেনা শাসনের পর চিলিতে ১৯৮১ সালে একটি গণভোট হয়, যেখানে জনগণ পুনরায় গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে যাওয়ার পক্ষে রায় দেয়। গণ আন্দোলনে পিনোচেটও এরশাদের মতো পদত্যাগ করেন। ১৯৯০ সালে চিলিতে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। চিলির রাজনৈতিক এই ইতিহাস বাংলাদেশের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়; তাই না? বাংলাদেশ এবং চিলির ভাগ্য যেন একসূত্রে গাঁথা ছিল।

আলেন্দে সমাজতান্ত্রিক পলিসি গ্রহণ করায় নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন চিলিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত ইউনিয়নে সফর, সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ, সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবায় পাট রপ্তানির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন বাংলাদেশের কাছেও খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। আলেন্দেকে হত্যা করার পর চিলিতে সেনা শাসন জারি হয়। একই ভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশেও সেনা শাসন কায়েম হয়। আলেন্দে হত্যার বিচার যাতে না হয় সেজন্য তার হত্যাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা হয়। তেমনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার যাতে না হয় সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকারীদের ক্ষমতায় রাখা হয়। ১৯৯০ সালে সেনাশাসক পিনোচেটের পতন ঘটিয়ে চিলিতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। একই ভাবে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার হয়। শুধু সালের দিক থেকেই মিল নয়; এমনকি চিলির বর্তমান জনসংখ্যাও বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখার সমান (১৭ কোটি)। চিলিয়ান রাজনীতির তৃতীয় ধাপ হচ্ছে ১৯৯০ এর পর থেকে বর্তমান সময়টি।

চিলিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের মূলত দুটি স্বার্থ ছিল। প্রথমটি হলো ল্যাটিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্রের বিস্তার রোধ। সালভাদর আলেন্দে ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকারপ্রধান, যিনি কি না নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তিনিই বিশ্বের প্রথম নেতা যিনি সাহস দেখিয়েছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে ইতিহাস গড়া যায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় স্বার্থটি হলো মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। যুদ্ধাস্ত্র, গাড়ি, এমনকি নিত্য ব্যবহার্য টিভি ও ফ্রিজে তামার ব্যবহার অপরিহার্য। অন্যদিকে পৃথিবীতে তামার সর্বোচ্চ উৎপাদক হলো চিলি। কিন্তু চিলির তামা খনিসমূহের উৎপাদন ও রপ্তানি ছিল অ্যানাকোন্ডা ও কেইনকোট নামক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দুই কোম্পানির অধীনে। সালভাদর আলেন্দে ক্ষমতায় এসে কয়েক মাসের মধ্যে কংগ্রেসে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে উক্ত কোম্পানি দুটোর জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। ফলে চিলির তামা শিল্প হাতছাড়া হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের। এই হচ্ছে চিলির বিস্তারিত ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিলির সাথে আমাদের ঐতিহাসিক অনেক মিল থাকলেও চিলিতে বাংলাদেশের কোন অ্যাম্বাসি নেই। এমনকি চিলির সাথে সম্পর্ক জোরদারে ঢাকার কোন তৎপরতাও নেই। চিলিতে বর্তমানে কমুউনিস্ট বিরোধী ডানপন্থি নেতারা ক্ষমতায়। পৃথিবীর যে-সকল দেশে আয়বৈষম্য প্রকট চিলি তাদের মধ্যে একটি। এই আয়বৈষম্যের কারণে চিলিতে কয়েকদিন পরপর গণ আন্দোলন হয়। আর তখনই মাঝে মাঝে পত্রিকার পাতায় চিলির নামটি উঠে আসে। সেই উঠে আসা থেকে মানসপটে চিত্রাঙ্কিত হয় বঙ্গবন্ধু, আলেন্দে ও ফিদেল ক্যাস্ত্রোর চরিত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দিয়েছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমন্ত্রিত বিশ্ব নেতাদের মাঝে ছিলেন সালভাদর আলেন্দে, ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রমুখেরা। সেখানে ফিদেল বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, "মুজিব, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি অনুসরণের জন্য আমাদের বুকে ও পিঠে বুলেট বরাদ্দ হয়ে গেল। তাই সাবধানে থাকবেন।" সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি অনুসরণের কারণে তাদের সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেও তাদের আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। তাদের আদর্শ তো একটি জ্বলন্ত লাভার মতো, সেই লাভা নিভানোর সাধ্য কার? সুহার্তো, বঙ্গবন্ধু, ক্যাস্ত্রো, আলেন্দের প্রীতির কাছে হেরে গিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা। চিলির সামনের দিনগুলো কেমন হবে সেটি জানতে আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে চিলির একেবারেই বিপরীত প্রান্তে অবস্থিত দেশটির পক্ষ থেকে সবসময় শুভকামনা।

ভেনেজুয়েলা: বাংলাদেশ যেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে
পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তেলের মজুত, হীরক-সহ নানাবিধ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা। অথচ দেশটি বর্তমানে খুবই জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকট তৈরি হয়েছে প্রেসিডেন্ট পদটিকে কেন্দ্র করে। কারণ দেশটির প্রেসিডেন্ট এখন একসাথে দুইজন। একজন নিকোলাস মাদুরো, আরেকজন হুয়ান গুয়াইদো। দেশটির জনগণ ও সেনাবাহিনী দুভাগে বিভক্ত। কেউ সমর্থন করছে মাদুরোকে, কেউ আবার হুয়ান গুয়াইদোকে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার বলয়াধীন কানাডা, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে হুয়ান গুয়াইদোকে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন এবং তাদের বলয়াধীন তুরস্ক, ইরান এই রাষ্ট্রগুলো প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে নিকোলাস মাদুরোকে। এ যেন নতুন কোনো স্নায়ুযুদ্ধ। বৃহৎ শক্তিগুলো দ্বিধা বিভক্ত হয়ে দুটি পক্ষকে সমর্থন দেওয়ায় ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট কোন দিকে মোড় নিতে পারে সেটি নিশ্চিত করে বলাটা বেশ মুশকিল হয়ে পড়েছে। ১৯৬২ সালের কিউবার মিসাইল সংকটকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে যে ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল- ভেনেজুয়েলার সংকটকে নিয়েও সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশ ভেনেজুয়েলা। তিনশো বছর স্পেনের কলোনি থাকার পর ১৮১১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। বর্তমান সংবিধান প্রণয়ন করা হয় ১৯৯৯ সালে। বিপ্লবী নেতা সিমন বলিভারের স্মরণে দেশটির অফিশিয়াল নাম 'Bolivarian Republic of Venezuela'। কারাকাস হচ্ছে দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। সংবিধান অনুযায়ী ভেনেজুয়েলায় রয়েছে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা। দেশটির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হচ্ছে- United Socialist Party of Venezuela, এই দলের আলোচিত নেতা হচ্ছে হুগো শ্যাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো। বিশ্বে বামধারার রাজনীতির সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত কিংবা যারা কমুউনিস্টপন্থি তাদের কাছে এই সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ শ্রদ্ধার পাত্র।

১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা চৌদ্দ বছর ভেনেজুয়েলাকে শাসন করেছিলেন হুগো শ্যাভেজ। তার শাসনামলে ভেনেজুয়েলাতে একধরনের 'সমাজতন্ত্র কায়েম' করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শ্যাভেজের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। মাদুরো ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে মিলিটারিদের বসান। সংবিধান অনুযায়ী প্রতি ছয় বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়। সেই অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০১৮ সালে হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝখানে দেশটিতে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ভেনেজুয়েলার সাংবিধানিক পার্লামেন্টের নাম হচ্ছে National Assembly, যার বর্তমান আসন সংখ্যা ২৭৭টি।

২০১৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরোধী Democratic Unity Roundtable নামের এই দলটি সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। পার্লামেন্টে যেহেতু বিরোধী দলের প্রাধান্য, তাই ২০১৮ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দল থেকেই প্রেসিডেন্ট আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তাই নিকোলাস মাদুরো নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে এবং পুনরায় নির্বাচিত হতে সেনাবাহিনীর কিয়দংশের সমর্থন নিয়ে নতুন আরেকটি প্যারালাল পার্লামেন্ট তৈরি করেন। যার নাম দেন ‘National Constituent Assembly’। নতুন এই পার্লামেন্টের অধীনে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়। পরিকল্পিতভাবে মাদুরো পুনরায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দল বলছে আমাদের তো সাংবিধানিক পার্লামেন্ট আছেই কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক সুবিধার্থে নতুন আরেকটি পার্লামেন্ট তৈরি করা সম্পূর্ণ অবৈধ (illegitimate)। দ্বিতীয়ত, সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে এবং এতে কারচুপি হয়েছে। তাই মাদুরো প্রেসিডেন্ট হিসেবে বৈধ নয়। ভেনেজুয়েলার সংবিধানে বলা আছে যে, প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হলে পার্লামেন্টের তথা National Assembly এর যিনি সভাপতি তিনিই প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ফলস্বরূপ যেহেতু নিকোলাস মাদুরো অবৈধ; তাই পার্লামেন্টের সভাপতি হিসেবে বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। সেনাবাহিনীর আরেক অংশ হুয়ান গুয়াইদোকে সমর্থন দিচ্ছেন। মূলত সেখান থেকেই সংকটের সূচনা। এই দুই প্রেসিডেন্টকে নিয়ে শুরু হয় বিশ্ব রাজনীতি। ভূরাজনৈতিক এই পরিপ্রেক্ষিতে ভেনেজুয়েলার অবস্থা এখন খুবই দুর্দশাগ্রস্ত। দেশটির বর্তমান রাজনীতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চারটি টার্ম দিয়ে খুব সহজে ফুটিয়ে তোলা যায়।

১. Deep state: রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ থাকা কখনোই উচিত না। যখন রাষ্ট্রের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী প্রভাব খাটায় কিংবা রাষ্ট্রের পলিসি তৈরিতে তাদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় তখন সেই রাষ্ট্রকে 'Deep state' বলা হয়। ভেনেজুয়েলার রাজনীতি বিগত কয়েক দশক ধরে সেদেশের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় এসেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনাদের বসিয়েছেন。

২. Kleptocracy: দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার। যে দেশের রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা নিজ দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে- ঐদেশের রাজনীতিকে 'Kleptocracy' বলা হয়। ভেনেজুয়েলার বর্তমান অবস্থা ঠিক এরকমই।

৩. Kakistocracy: নিকৃষ্ট এবং অদক্ষ মানুষদের শাসন। অধিক মাত্রায় রাজনৈতিক দলীয়করণের কারণে যখন যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য স্থানে না বসিয়ে অযোগ্যদের বসানো হয় তখন সেই শাসনব্যবস্থাকে 'Kakistocracy' বলা হয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ব্যক্তিগত জীবনে একজন ট্রাকচালক ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উঠে এসেছিলেন। রাজনীতিতে অজ্ঞ এই ব্যক্তি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিজের অনুসারীদের বসান। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই আজকে শাসিত হচ্ছে Kakistocracy এর মাধ্যমে। যেটাকে 'Ruled by worst people'ও বলা যায়。

৪. Plutocracy: ধনিকগোষ্ঠীর শাসন। রাষ্ট্রে যারা আর্থিকভাবে অনেক ধনী তাদের কর্তৃক রাষ্ট্র শাসনকেই 'Plutocracy' বলা হয়। ভেনেজুয়েলাতে যারা বড় বড় কোম্পানি বা কর্পোরেশনের মালিক তারাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে। জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে তারা নিজ স্বার্থে দেশ পরিচালনা করে।

শুধু একটি আর্থিক সোর্সের উপর নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না। তার জ্বলন্ত উদাহরণ ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি শুধু তেলের উপর নির্ভরশীল ছিল। ভেনেজুয়েলার সরকার তেল ছাড়া অন্য কোনো শিল্পের উপর অতটা নজর দেয়নি। আজকে ভেনেজুয়েলাতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির (Hyperinflation) কারণে শুধু একটি পাউরুটি ক্রয় করতেই একবস্তা সমপরিমাণ টাকা লাগে। এভাবে বিশেষ একটি সেক্টরের অর্থনৈতিক উন্নতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াকে টার্ম হিসেবে "Dutch Disease" বলে। ১৯৫৯ সালে নেদারল্যান্ডসের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। কারণ নেদারল্যান্ডস অধিক পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর হয়ে গিয়েছিল। গ্যাস শিল্পে বিপর্যয় আসলে নেদারল্যান্ডস অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে। ভেনেজুয়েলারও একই অবস্থা। শুধু তেলের উপর নির্ভরতার কারণে আজ ভেনেজুয়েলার করুণ দশা। বাংলাদেশও এই Dutch Disease এ আক্রান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে শুধু পোশাক শিল্পের উপরেই অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত শুধু পোশাকশিল্পের উপরেই জোর না দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক অন্য খাতগুলো আরও ডাইভার্সিফাই করা। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ভবিষ্যতেও যে এরকম রমরমা থাকবে সেটির নিশ্চয়তা আমরা কেউ দিতে পারছি না। কারণ সময়টি এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের। বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে দারুণ উন্নতি করতে পেরেছে তার অন্যতম কারণ আমাদের সস্তাশ্রম (Cheap labour)। আমাদের এখানে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায়। কিন্তু রোবটিক্স, অটোমেশন ইত্যাদি কারণে ভবিষ্যতে সস্তা শ্রম অতটা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। দুশো জন শ্রমিক দশ দিনে যে পরিমাণ পোশাক তৈরি করতে পারে সেখানে একটি রোবট মাত্র এক ঘণ্টায় তার চেয়ে বেশি পোশাক তৈরিতে সক্ষম হবে। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে দেশগুলো রোবটের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের প্রয়োজনীয় পোশাক তৈরি করে নেবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নেওয়া খুবই জরুরি।

বলিভিয়া: একুশ শতকে রেজিম (regime) পরিবর্তনের নতুন প্যাটার্ন
একজন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে, একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে যে-সকল নতুন ট্রেন্ড যুক্ত হচ্ছে সেগুলোর সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বিশ্বজুড়ে সরকার পতনের অনেক ট্র্যাডিশনাল মডেল রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সরকার পতনের নতুন একটি মডেল আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথমে ট্র্যাডিশনাল মডেলগুলো একটু জেনে নেই।

১. A coup d'état (সেনা অভ্যুত্থান) ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ইতিহাস বিশ্বে অসংখ্য। যেমন- মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে সে-দেশের সামরিক বাহিনী উৎখাত করে। সুদানে তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার পর প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত করে সুদানের সেনাবাহিনী। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারের নিয়মতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে সে-দেশের সেনাবাহিনী।

২. Mass Upsurge (গণ অভ্যুত্থান) ক্ষমতাসীন সরকারের লাগামহীন ব্যর্থতা, দুর্নীতি ইত্যাদির কারণে দেশজুড়ে গণ অভ্যুত্থান হয়। সেই গণ অভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও এর অসংখ্য নজির রয়েছে। ২০১১ সালের গণ আন্দোলনে পতন হয়েছিল তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বেন আলীর। মিশরে পতন হয়েছিল ত্রিশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা হোসনি মোবারকের। পতন হয়েছিল ইয়েমেনের স্বৈরশাসক সালেহ এর।

আর বর্তমানে সরকার পতনের নতুন মডেলটি উপরের দুটি পদ্ধতির সংমিশ্রণে গঠিত। নতুন মডেলটি হচ্ছে Military-People Coup তথা সেনা-গণ অভ্যুত্থান। বর্তমানে সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলকে বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। তাই আজকের দুনিয়ায় সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। পূর্বে সাধারণত সামরিক বাহিনী নিজেই অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করত অথবা জনসাধারণের গণ অভ্যুত্থান হতো। কিন্তু এখনকার নয়া কৌশল হচ্ছে গণ-সামরিক অভ্যুত্থান। এ প্রক্রিয়ার শুরুতে সেনাবাহিনী কিছু মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দেয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে। তারপর কিছু স্বার্থান্বেষী জনগণ দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ এনে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। তখন বাহির থেকে মনে হয় সরকার বিরোধী আন্দোলনটি জনগণ থেকেই শুরু হয়েছে। এরপর সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে।

ফলস্বরূপ দূর থেকে পুরো ঘটনাই গণতান্ত্রিক আন্দোলন মনে হয়। কিন্তু এর অন্তরালে থাকে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক স্বার্থ। আর এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় Military-People Coup বা সেনা-গণ অভ্যুত্থান। এতে সরাসরি সামরিক শাসন কায়েম করা হয় না, আবার সামরিক সামরিক একটি ভাব থাকে। এতে সব কুলই রক্ষা হয়। জিম্বাবুয়ে, সুদানে সম্প্রতি এ ধরনের অভ্যুত্থান হয়েছে। সেনা-গণ অভ্যুত্থানের আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ বলিভিয়া।

ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোকে পরিবর্তন করতে যুক্তরাষ্ট্রও বর্তমানে একই পন্থা বেছে নিয়েছে। কোনো দেশের রেজিম পরিবর্তন করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ঐদেশের সেনাবাহিনীর সাথে আঁতাত করে, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সেনাবাহিনীরা কিছু জনগণকে আন্দোলনের জন্য মাঠে নামিয়ে দেয়। তারপর জনগণ আন্দোলন শুরু করে এবং মিলিটারিরা ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। তারপর মিলিটারি সমর্থিত বিরোধীদলীয় নেতা নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে ঘোষণা করে। তারপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব অন্তর্বর্তীকালীন সেই সরকারকে সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে এরকমই হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ও বলিভিয়া তার টেক্সটবুক এক্সাম্পল। মনে করুন ল্যাটিন আমেরিকার কোনো একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গেল। তখন ঐদেশের মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমথর্ন নিয়ে পশ্চিমা গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিশ্বাসী এমন একজন বিরোধীদলীয় নেতা আন্দোলন শুরু করে দেবে। অভিযোগ ওঠাবে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। সুতরাং যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি অবৈধ। তাই এখন থেকে আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তখন যুক্তরাষ্ট্র এসে বলবে হ্যাঁ হ্যাঁ নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি। তাই যিনি নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে আমরা তাকেই সরকার হিসেবে সমর্থন করি।

দক্ষিণ আমেরিকার একটি ল্যান্ডলকড কান্ট্রি বলিভিয়া। দেশটির অফিশিয়াল নাম 'Plurinational State of Bolivia'। প্রশাসনিক রাজধানী হচ্ছে লাপাজ। এই লাপাজ পৃথিবীর উচ্চতম রাজধানী। বলিভিয়ার সবচেয়ে বৃহত্তম শহর হচ্ছে সেন্ট্রা ক্রুজ। এখানেই রাষ্ট্রের বড় বড় শিল্পকারখানাগুলো অবস্থিত। সিমন বলিভারের নেতৃত্বে দেশটি ১৮২৫ সালে স্পেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তাই তাদের ভাষা হচ্ছে স্প্যানিশ। দেশের অধিকাংশ জনগণই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ২০০৯ সালে দেশটি একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। সংবিধান অনুযায়ী বলিভিয়া একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সম্পূর্ণ দেশকে প্রশাসনিকভাবে ০৯টি জেলায় (Departments) বিভক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকেই সবগুলো জেলা শাসন করা হয় (Unitary)। প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়।

চার পাঁচটি সক্রিয় রাজনৈতিক দল রয়েছে। 'Movement for Socialism' নামের এই দলটি সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের এবং কিছুটা চীন ও রাশিয়াপন্থি। বর্তমানে আলোচিত প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস এই দলেরই। 'Civic Community' নামের দলটি উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং সংস্কারক। আর 'Creemos' নামের এই দলটি ডানপন্থি এবং সমাজতন্ত্র বিরোধী। এগুলো হচ্ছে বলিভিয়ার সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক দল। নিয়ম অনুযায়ী দুই বারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারে না। প্রেসিডেন্ট এর সহযোগী হিসেবে একজন ভাইস প্রেসিডেন্টও রয়েছে। পেরু ও ফ্রান্সের মতো বলিভিয়ার নির্বাচনেও Runoff System রয়েছে। এই সিস্টেমের মানে হচ্ছে নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ৫০% এর উপরে ভোট না পেলে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে এমন দুজন প্রার্থীকে নিয়ে পুনরায় নির্বাচন হয়। এটাই রানঅফ সিস্টেম হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে বলিভিয়া একটি রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের সাথে বলিভিয়ার রাজনৈতিক সংকটটি হুবহু মিলে যায়। সংকটটি 'Bolivian political crisis' হিসেবেও পরিচিত। এই সংকটটি শুরু হয়েছে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব একপক্ষকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া ও চীন অন্য পক্ষকে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আমেরিকার চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিনপন্থি সরকাররা ক্ষমতায়। তাই যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে গোটা দক্ষিণ আমেরিকাতেই মার্কিন ঘেঁষা সরকাররা ক্ষমতায় আসুক। সম্পূর্ণ দক্ষিণ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। কিন্তু ভেনেজুয়েলা ও বলিভিয়ার মতো কয়েকটি রাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়। তাই এগুলো যত দ্রুত দূর করা যায় ততই আমেরিকার মঙ্গল।

বলিভিয়ার প্রথম আদিবাসী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচিত হন ইভো মোরালেস। ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোরালেস চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হন। বলিভিয়ার ইতিহাসে মোরালেসই প্রথম টানা চারবার নির্বাচিত হয়েছেন। তবে মোরালেসের টানা ক্ষমতায় থাকাকে তাঁর সমর্থক-সহ অনেকেই সহজভাবে নেননি। তাছাড়াও সংবিধানের নিয়ম হচ্ছে দুইবারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তাই সংবিধান পরিবর্তন করতে মোরালেস গণভোটের আয়োজন করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সংবিধান পরিবর্তন না করার জন্য রায় দেয়। জনগণেরও রায় দুইবারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। কিন্তু তার মধ্যে হঠাৎ সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা দেয় নির্বাচনে প্রার্থীর জন্য কোনো বাঁধা নেই। যতবার ইচ্ছে ততবারই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। তাই ২০১৯ সালে মোরালেস চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে দাঁড়ান এবং জয়ী হন। তারপর দুইটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, বিরোধী দলগুলোর দাবি এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তাই মোরালেস বৈধ সরকার নয়। তারা শুরু করে আন্দোলন। দ্বিতীয়ত, মোরালেস হচ্ছে মার্কিন বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই চাচ্ছে মোরালেসের পতন ঘটিয়ে একজন মার্কিনপন্থি নেতাকে বলিভিয়ার ক্ষমতায় বসাতে। তখন যুক্তরাষ্ট্র দেখল এটাই বড় সুযোগ মোরালেসকে হটানোর। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিতে লাগল আন্দোলনকারীদের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যাগুলো আসলে কোথায়?

এক. মোরালেস বিভিন্ন সময় ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন, কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপকে ঘৃণার চোখে দেখেছেন, মার্কিন সমর্থিত হন্ডুরাসের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন, ফকল্যান্ড দ্বীপের উপর আর্জেন্টিনার মালিকানার বিষয়েও তিনি সোচ্চার ছিলেন।

দুই. তিনি ভেনেজুয়েলার প্রয়াত নেতা হুগো শ্যাভেজের নেতৃত্বে ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপে যোগ দিয়েছিলেন। এই জোটে যুক্তরাষ্ট্রকে রাখা হয়নি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সমন্বয় সাধনের জন্য এ জোটের উপর মোরালেস গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তিন. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি এজেন্সি হিসেবে কাজ করে 'NSA'। যার পূর্ণরূপ National Security Agency-এর ব্যাপ্তি বিশ্বজুড়ে। এই NSA এর কাজ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন মিলিটারি রিলেটেড তথ্যগুলো সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রকে অভিহিত করানো। এডওয়ার্ড স্নোডেন নামের একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ সিআইএ এর সাথে কাজ করত। কিন্তু ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেন যুক্তরাষ্ট্র মিলিটারি অপারেশনের কিছু গোপন তথ্য ফাঁস করে দেন। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। ইভো মোরালেস এই এডওয়ার্ড স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের পক্ষে কথা বলেছিলেন।

চার. মোরালেস বলিভিয়ার খনিজ সম্পদ জাতীয়করণ করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্রি মার্কেটের নামে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে সেগুলো প্রাইভেটাইজেশন করা হোক। যেন মার্কিন কোম্পানিগুলো খনিজ সম্পদ উত্তোলনের অংশীদার হতে পারে। মোরালেস নয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধে সবাইকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

পাঁচ. তিনি বলিভিয়ায় শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আদিবাসীদের জন্য ভূমি নীতি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। উল্লেখ্য, বলিভিয়া-সহ গোটা ল্যাটিন আমেরিকায় আজকে যারা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী তারা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপ থেকে এসেছিলেন। আর আদিবাসীরাই হচ্ছে এখানকার স্থায়ী অধিবাসী যারা প্রাচীনকাল থেকেই এখানে বসবাস করছে। বিভিন্ন সংস্কার নীতি গ্রহণ করে মোরালেস বলিভিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা করেছেন।

মোরালেসকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সফল গণতান্ত্রিক শাসক বলা হয়। ইভো মোরালেস বলিভিয়ার অর্থনীতিতে একটি সংস্কার আনেন যা "ইভোনোমিক্স" হিসেবে পরিচিত। এই সংস্কারের মাধ্যমে তিনি আয়বৈষম্য হ্রাস করেন। তাঁর শাসনামলে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায়, ইকোনমিতে স্থিতিশীলতা আসে, সম্পদের পুনর্বণ্টনের (redistribution) মাধ্যমে বৈষম্য কমিয়ে আনতেও সফল হয়েছিলেন মোরালেস। তার আমলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা (Purchasing power) বৃদ্ধি পায়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাম ধারার এই রাজনীতিবিদ চেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক ইকোনমিক পলিসি গ্রহণ করতে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ায় এবং তার সরকারের কিছু মানুষের দুর্নীতির জন্য জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে যায়। এ সুযোগেই মার্কিনঘেঁষা ডানপন্থিদের উত্থান ঘটে। তাই ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সেনাবাহিনীর চাপে মোরালেস পদত্যাগ করেন এবং বলিভিয়া ত্যাগ করে মেক্সিকোতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে মার্কিনপন্থি জিনাইন এ্যানেজকে ক্ষমতায় বসানো হয়। উল্লেখ্য, জিনাইন এ্যানেজ বলিভিয়ার ইতিহাসে দ্বিতীয় মহিলা প্রেসিডেন্ট। তার আগে লিডিয়া টেজাডা ছিলেন প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে ২০২০ সালের নির্বাচনে বলিভিয়ার জনগণ পুনরায় মোরালেসেরই এক সহযোগীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে। বলিভিয়ার রাজনীতি পুনরায় স্থিতিশীল হবে কি না সেটি সামনের দিনগুলোই বলে দেবে। কিংবা সেখানে পুনরায় মার্কিন মদদপুষ্ট Chicago Boys দের উত্থান ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পেরু: ইনকা সাম্রাজ্যের এই দেশটি বিশ্বে পরিচিত তার স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনজন প্রেসিডেন্টের অদলবদল হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনজন প্রেসিডেন্টের অদলবদল হয়েছিল উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতেও, যা এখন পর্যন্ত বিশ্ব রেকর্ড। বিশ্বের ১৭টি 'Megadiverse Country' এর মধ্যে অন্যতম ইনকা সাম্রাজ্যের দেশ পেরু। যে-সকল দেশে সবচেয়ে বেশি বর্গের প্রাণী বা প্রজাতি রয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য অনেক এমন সকল দেশকে মেগাডাইভার্স কান্ট্রি বলা হয়। পেরুর সরকার ব্যবস্থাও আমাদের কাছে আকর্ষণীয়।

একসাথে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী: পেরুতে একইসাথে একজন প্রেসিডেন্ট, একজন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও একজন প্রধানমন্ত্রী তিনজনই রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন সাধারণত দুইজন অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকেন (যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে) অথবা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী থাকেন (যেমন- বাংলাদেশ ও জাপানে), অপরদিকে পেরুতে তিনজনই একসাথে আছে। এই ধরনের সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “প্রিমিয়র” (Premier)। এখানে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার প্রধান হিসেবে কাজ করেন। পেরুর মন্ত্রিসভার মোট ১৮ জন সদস্যের প্রধান এই প্রিমিয়র। আর রাষ্ট্রপতি সরকার প্রধান।

রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা: বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই অনেক রাজনৈতিক দল (Multi-Party System) থাকলেও প্রধান বা ডমিনেন্ট রাজনৈতিক দল কিন্তু থাকে মাত্র দুইটি। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, যুক্তরাজ্যের কনজার্ভেটিভ ও লেবার পার্টি, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান, ভারতের কংগ্রেস ও জনতা পার্টি। কিন্তু পেরু এমন এমন একটি দেশ যেখানে প্রধান বা ডমিনেন্ট রাজনৈতিক দল দশটির উপরে, নির্দিষ্ট করে বললে ১২টি। তাই পেরুর পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর ফলাফলের দিকে তাকালে দেখবেন যে, কোনো দল সাধারণত ১৩% এর বেশি ভোট পায় না।

Runoff Voting/Two Round System: নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আপনাকে যদি কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট হতে হয় তাহলে আপনাকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৫০% ভোট পেতে হয়। একটি রাষ্ট্রে যখন অনেকগুলো সক্রিয় রাজনৈতিক দল থাকে তখন আপনি একাই ৫০% ভোট পাবেন না। পেরুতে প্রায় ১০/১২টি সক্রিয় দল থাকায় কোনো দলই সাধারণত ১৩% এর বেশি ভোট পায় না, সেহেতু পেরুতে সেকেন্ড রাউন্ড ভোট হয়। যেটিকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানে "Runoff Voting" বা "Ballotage" বলি। কোনো কোনো দেশে এটিকে "Two Round System"ও বলে। তখন এই ১০/১২টি দলের সকল প্রার্থীদের মধ্যে যে দুইজন প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল তাদের দুইজনকে নিয়ে পুনরায় নির্বাচন হয় পেরুতে। এভাবে সেকেন্ড রাউন্ড ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এইরকম Runoff Voting পেরু ছাড়াও ২০০২ সালে ফ্রান্সে হয়েছিল। এই সিস্টেমটি চেক রিপাবলিকে সিনেটর নির্বাচনে এবং ইরানের পার্লামেন্টেও ব্যবহার হয়।

কেন পেরুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি স্বচ্ছ?
একটি উদাহরণ দেই- ২০২০ সালে পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ঘুষের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারাকে সংসদে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট Impeachment করার পদ্ধতি তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেটি পেরুকে না দেখলে বোঝা যেত না। মার্টিন ভিজকারা অভিশংসিত হওয়ার পর পেরুর সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতায় আসেন কংগ্রেসের প্রধান ও স্পিকার ম্যানুয়েল মেরিনো। মেরিনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মার্টিন ভিজকারার সমর্থকরা পেরুতে গত দুই দশকের সবচেয়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলে। মেরিনো বললেন, “জনগণ যেহেতু আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, তারা যেহেতু আমাকেও চাচ্ছে না তাই আমি ক্ষমতায় থেকে কী করব?” আন্দোলনের তোপে পড়ে মেরিনোও পদত্যাগ করেন। তারপর কংগ্রেসের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন জনপ্রিয় আইনজীবী ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ফ্রানসিসকো সাগান্তি। সাগস্তি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন। তারপর নির্বাচন চলে আসলে সাগস্তিও ক্ষমতা ছেড়ে দেন। আজকে একুশ শতাব্দীতে এসে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ (Transparent) রাজনীতি হয় যে দেশে সেটি হলো এই ইনকা সাম্রাজ্যের দেশ পেরুতে। আমাজন, আন্দিজ পর্বতমালা, টিটিকাকা লেক, সেক্রেড ভ্যালি এসবের জন্য পেরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ টুরিস্টদের কাছে, ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন মাচু-পিচুর কারণে পেরু যেমন আকর্ষণীয় ইতিহাসবিদের কাছে, কফি-তামা-স্বর্ণের জন্য পেরু যেমন লোভনীয় ব্যবসায়ীদের কাছে, ঠিক তেমনি রাজনীতি বিজ্ঞানে পেরু গুরুত্বপূর্ণ তার ট্রান্সপারেন্ট পলিটিকাল কালচারের কারণে。

একজন চে গুয়েভারা ও তার আদর্শ
পুরো ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ হয়ে গেল অথচ চে গুয়েভারা নিয়ে কোনো আলোচনা আসল না। তাহলে অপূর্ণতা থেকে যায়। ছোট করে মূল বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। "নিষ্ঠুর নেতাদের পতন ও প্রতিস্থাপন চাইলে নতুন নেতৃত্বকেই নিষ্ঠুর হতে হবে।"-এই উক্তিটি বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার। তরুণদের টি-শার্টে চে গুয়েভারার ছবি না থাকলে আজকাল মানায় না। ১৯২৮ সালে আইরিশ পিতা ও স্প্যানিশ মাতার ঘরে আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণ করেন চে গুয়েভারা। জন্ম আর্জেন্টিনায়, মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন কিউবায় আর মারা গিয়েছেন বলিভিয়ায়। ১৯৫১ সালে ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করে বাইসাইকেল চড়ে পুরো ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ভ্রমণ করার সময় তার চোখে ভালো করে ধরা পড়ে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সার্বিক অসহায়ত্ব ও শোষিত মানুষের জগৎ। বুঝতে পেরেছিলেন এসবের পেছনে মূল কারণ বৈষম্য, একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। যা চে গুয়েভারাকে বিপ্লবী করে তুলে।

কিউবাতে তখন একনায়ক বাতিস্তার শাসন চলছে। স্বৈরাচারী বাতিস্তাকে উৎখাত করতে মেক্সিকো সিটিতে বসে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও তার ভাই রাউল ক্যাস্ট্রো পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। চে গুয়েভারা ঘটনাক্রমে মেক্সিকো সিটিতেই ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেখা পান, তাদের সাথে পরিচিত হন। তাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হন চে। সিদ্ধান্ত নেন তিনিও গণমানুষের পক্ষে কিউবার বিপ্লবে যোগদান করবেন। ১৯৫৯ সালে কিউবায় যে বিপ্লবে একনায়ক বাতিস্তাকে উৎখাত করা হয়, তাতে চে-র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারপর ১৯৬৪ সালে কিউবার হয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তিনি ভাষণ দেন। কমিউনিস্ট বিপ্লবের কারণে সিআইএ এর তালিকাভুক্ত হয়ে যান চে। ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার একদিন পর তাকে হত্যা করা হয়। যে সকল ব্যক্তিদের নিয়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বই লেখা হয়েছে তাদের মধ্যে চে গুয়েভারা অন্যতম। শুধু সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার মানুষদের কাছেই নয় বরং সারা বিশ্বের নিপীড়িত মজলুম জনতার কাছে চে গুয়েভারার আদর্শ এখনো অম্লান।

বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন
২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দূতাবাস খুলেছে আর্জেন্টিনা। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় "Sport Diplomacy" নয়া রূপ লাভ করেছে। ১৯৭১ সালে টেবিল টেনিস খেলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক উঞ্চ হয়। যেটাকে আমরা Ping Pong Diplomacy হিসেবে জানি। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে Football Diplomacy কে কেন্দ্র করে এশিয়ার দেশগুলোতে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে মেরাডোনা-মেসিদের দেশ আর্জেন্টিনা। মূলত গত কাতার বিশ্বকাপে এশিয়ার দেশগুলোতে এতো বেশি আর্জেন্টাইন সমর্থক দেখে এশিয়ার দেশগুলোতে সম্পর্ক স্থাপনে অনুপ্রাণিত হয়েছে আর্জেন্টিনা। যেটিকে মূলত "Messi-led Renaissance" বলা হয়。

বাংলাদেশের সাথে আর্জেন্টিনার পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হলে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হতে পারে সেই দিকটি আলোচনা করা জরুরি। উল্লেখ্য, তার পূর্বে উভয় দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কটিও জানা জরুরি। আর্জেন্টিনার সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয় ১৯৭২ সালে। মাত্র ছয় বছর পর তথা ১৯৭৮ সালে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তী ভঙ্গুর, অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা আর্জেন্টিনার জন্য সুবিধাজনক ছিলো না। উভয় দেশের মধ্যে বিনিময়যোগ্য পণ্য ও সেবা তখন সেভাবে ছিলো না। বিশাল দূরত্বের দুটো দেশে সাংস্কৃতিক বিনিময় কিংবা পিপল মুভিলাইজেশনও তেমন হতো না। সবদিক বিবেচনা করে প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে ঢাকার সাথে বুয়েন্স আয়ার্সের নতুন করে সম্পর্কে স্থাপনের তেমন কোন উপলক্ষ তৈরি হয়নি বলে দাবি উভয় দেশের। আর্জেন্টিনায় আমাদের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও ঢাকা থেকেও সম্পর্ক উন্নয়নে তেমন তোরজোর নেওয়া হয়নি। তবে এতোদিন ধরে বাংলাদেশের একজন অ্যাম্বাসেডর যিনি ব্রাজিলে অবস্থান করে বাংলাদেশ ও আর্জেটিনার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর দেখভাল করেছেন। একইভাবে আর্জেন্টিনার একজন অ্যাম্বাসেডর ভারতের নয়া দিল্লিতে অবস্থান করে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে একটি শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পারস্পরিক সুবিধা নিয়ে আসার এবং উভয় দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে অবদান রাখার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এবং আর্জেন্টিনা উভয়ই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য, যেমন জাতিসংঘ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এই ফোরামগুলিতে সহযোগিতা করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি উভয়ের ভাগ করা স্বার্থ প্রচার করতে একসাথে কাজ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বাণিজ্য মূলত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা কেন্দ্রিক। দক্ষিণ আমেরিকায় আমাদের উপস্থিতি যৎসামান্য, তাই রপ্তানির পরিমাণও কম। তাছাড়া ল্যাটিন আমেরিকায় যেতে চাইলে ভিসা পেতেও বেশ জটিলতা পোহাতে হয়। তাই আর্জেন্টিনার সাথে দূতাবাস খোলার একটি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ আছে। আমাদের দৃষ্টিকোন সেখানে রপ্তানি বাণিজ্যের বিস্তার ঘটানো। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই তার বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন নতুন বাজার খুঁজছে। তাই আর্জেন্টিনা আমাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ হতে পারে।

ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাব্য বড় রপ্তানি গন্তব্যস্থল হিসেবে অবহেলিত এক মহাদেশের নাম ল্যাটিন আমেরিকা। পেরু ল্যাটিন আমেরিকার একটি অন্যতম সমৃদ্ধিশালী দেশ যা তামা, স্বর্ণ ও কফির জন্য বিখ্যাত। অথচ পেরুতে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। ফাইন্যান্সিয়াল রিজার্ভের দিক থেকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়াও এখন অনেক এগিয়ে। এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে বলিভিয়ায়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভিসের তথ্যমতে, বিশ্বের মোট লিথিয়ামের ৫০-৭০% রিজার্ভ রয়েছে বলিভিয়াতেই। অথচ বলিভিয়ার রাজধানী লাপাজের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ঢাকার কোনো তোড়জোড় নেই。

ল্যাটিন আমেরিকার মোট ২০টি দেশের মধ্যে মাত্র তিনটি দেশে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসি রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা আর মেক্সিকোতে। আর গোটা আমেরিকা মহাদেশের ৩৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ০৫টি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। দেশগুলো হলো কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তবে চিলিতে নতুন দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা বাংলাদেশের থাকলেও এর বাস্তবায়ন কবে হবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশে যেহেতু বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই ফলে সেখানকার ক্রেতারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানে না। ফলশ্রুতিতে সেখানে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির বিকাশ হচ্ছে না। অথচ ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সব দেশই হতে পারে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বড় বাজার। তাই আমরা আশা করব ঢাকা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের জন্য কী কী সম্ভাবনা থাকতে পারে তা খতিয়ে দেখার মাধ্যমে সেখানে বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণের দিকে মনোযোগ দেবে।

উপসংহার: পড়শি দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকাকে সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তুলতে পারত। অথচ সমাজতন্ত্র দমনের নামে দেশগুলোকে শেষ করে দিয়েছে। তাই আজ ল্যাটিন আমেরিকার প্রত্যেকটি দেশে তীব্র মার্কিন বিদ্বেষী (Anti-Americanism) মনোভাব বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র দুটি প্যারাডক্সিক্যাল পররাষ্ট্রনীতির উপর জোর দিয়েছিল। একটি মার্শাল প্ল্যান, অপরটি ট্রম্যান ডকট্রিন। যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে ইউরোপে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে 'Truman Doctrine' এর মূল কথা ছিল বিশ্বের যেখানেই যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী কিংবা সমাজতন্ত্রী সরকার ক্ষমতায় আসবে, সেখানেই হস্তক্ষেপ করে সেই সরকারকে উৎখাত করতে হবে। এই ট্রুম্যান ডকট্রিনের আলোকে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকাতে গণতান্ত্রিক সরকারদের উৎখাত করে সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। অস্থিতিশীল করে তুলেছিল পুরো অঞ্চলকে। আসলে এটাই আমেরিকার রাজনীতি। তাদের দাবার ছকে মন্ত্রীর চেয়ে ঘোড়ার চাল কখন বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে কেউ বলতে পারে না。

Question to think about?
লাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে ঢাকা কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Bryne, Alex (2020), The Monroe Doctrine and United States National Security in the Early Twentieth Century, Springer
2. May, Robert E. (2017), The Irony of Confederate Diplomacy: Visions of Empire, the Monroe Doctrine, and the Quest for Nationhood, Journal of Southern History
3. Ryan, Keegan D. (2018), The Extent of Chinese Influence in Latin America, Naval Postgraduate School
4. Weeks, Gregory (2014), Understanding Latin American Politics, Pearson
5. Hellinger, Daniel C. (2014), Comparative Politics of Latin America: Democracy at Last? Routledge
6. Chasteen, John Charles (2001), Born in Blood and Fire: A Concise History of Latin America, Norton
7. Jozsa Jr., Frank P. (2013), Baseball beyond Borders: From Distant Lands to the Major Leagues, Scarecrow Press.
8. Winn, Peter (2004), Victims of the Chilean Miracle: Workers and Neoliberalism in the Pinochet Era, 1973–2002, Duke University Press
9. McGuire, J.W. (2010), Wealth, Health, and Democracy in East Asia and Latin America, Cambridge University Press
10. Sweig, Julia E. (2004), Inside the Cuban Revolution: Fidel Castro and the Urban Underground (New ed.), Harvard University Press
11. Crompton, Samuel (2009), Che Guevara: The Making of a Revolutionary, Gareth Stevens

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00