📄 যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা ও রাজনীতি
"People shouldn't be afraid of their government. Governments should be afraid of their people." -Alan Moore
কিছু সমসাময়িক প্রশ্ন দিয়েই সূচনা করা যাক। বেসামরিক ইয়েমেনিরা মারা যাবে এটা জেনেও কেন ওয়াশিংটনকে রিয়াদের সাথে অস্ত্র চুক্তি করতে হয়? কেন মস্কোতে বসে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে সিরিয়ায় ড্রোন হামলা চালাতে হয়? কেন তেহরানে প্রতিবছর ইরানি সাইনটিস্টদের মৃত লাশ পাওয়া যায়? সফট পাওয়ারের এই যুগে কেন বেইজিং বহুল আক্রমণাত্মক "Wolf Warrior Diplomacy” বেছে নিয়েছে? প্যারিসের মদদে কেন অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশে কয়েকদিন পরপরই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে? কেনই বা ল্যাটিন আমেরিকার সান্তিয়াগোয়, কারাকাসে, কিংবা হাভানায় 'The Chicago Boys' দের উদ্ভব ঘটে? কেন মুসলিম বিশ্ব প্যান ইসলামিজমের কথা ভুলে গিয়ে তেল আবিবের সাথে সম্পর্ক 'Normalization' এর কথা ভাবছে? ঢাকা কেন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ভাবছে? সম্প্রতি কোয়াড ইস্যুতে সিডনি কেন দিল্লির শরণাপন্ন হয়েছে? কেন দিনদিন আঙ্কারার সাথে কায়রোর দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে?
এসব ফরেইন পলিসি সম্পর্কিত প্রশ্ন বাদ দিয়ে এবার না হয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পলিসি নিয়ে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যাক। শুধু কেন ১৮ বছর হলেই ভোট দেওয়া বৈধ? কেন যে- কোনো পণ্য ক্রয় করতে হলে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়? আমি আয়কর দিতে ইচ্ছুক নই; তারপরেও কেন আমাকে ট্যাক্স প্রদান করতে বাধ্য করা হয়? কেন পুলিশ বিনা নোটিশে ও প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে যে-কারো বাসায় তল্লাশি চালাতে পারে? কেন একটি রাষ্ট্রে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো যায় না? কেন ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হয়? কেন সরকারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে 'অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক' আরোপ করতে হয়? ইকোনমিক ডাউনটার্ন এর সময়ে কেন সরকার প্রাইভেট ফার্মগুলোকে 'bail-out' দেয়? একুশ শতকে এসে, এমনকি বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন সরকারগুলোকে 'Affirmative Action' এর মতো পলিসি গ্রহণ করতে হয়?
জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক এসব অগণিত প্রশ্ন আমাদের মাথায় প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খায়। আর এসবের উত্তরের জন্যই আমাদেরকে 'Government and Politics' নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। যে-কোনো দেশের সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলে ঐ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ফরেইন পলিসি খুব সহজে অনুধাবন করা যায়। একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা জানা থাকলে ঐ দেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতিও খুব সহজে বিশ্লেষণ করা যায়। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করে তাদের লেখার মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকারব্যবস্থা কিংবা Government System প্রায় অনুপস্থিত।
এই অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্ট্রাকচার ও গুরুত্বপূর্ণ পলিসি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রের পলিসি মেকার হতে চান কিংবা রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন হবেন তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা এবং পলিসিগুলো ভালোভাবে জানা দরকার। উল্লেখ্য, সরকারব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা অধ্যয়নের দুইটি বড় Risk বা ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ফিলোসফির প্রফেসর মাইকেল স্যান্ডেল রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করার দুইটি ঝুঁকি উল্লেখ করেছেন। প্রফেসর স্যান্ডেলের মতে, প্রথম ঝুঁকিটি হচ্ছে ব্যক্তিগত। সরকার, রাজনীতি, রাষ্ট্র ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনার কারণে আপনি হয়ে উঠবেন অন্যদের থেকে অনেক বেশি সচেতন। আর দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো রাজনৈতিক। স্যান্ডেলের মতে, এসব অধ্যয়নের কারণে, রাষ্ট্রের অকার্যকর পলিসির বিরুদ্ধে আপনি হয়ে উঠবেন প্রতিবাদী। যে-কারণে স্বয়ং রাষ্ট্র তখন আপনাকে হুমকি মনে করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা
1. Principle of Checks and Balances
তৃতীয় বিশ্বের কোনো প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট চাইলেই নিজের মতো করে আইন তৈরি করতে পারে, নিজের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে পারে, যে-কোনো সময় স্বৈরাচারী বনে যেতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেটা সম্ভব হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিস্টেমটা এমনভাবে সাজানো যে, সেখানে যদি কোনো খারাপ প্রকৃতির মানুষও যায়, সে সিস্টেমের কারণে ভালো হতে বাধ্য। সিস্টেমটা এমন যে, একজন প্রেসিডেন্ট চাইলেও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে না। একজন সরকারি আমলার দুর্নীতি করার ইচ্ছে থাকলেও সে দুর্নীতি করতে পারে না। সেখানে সিস্টেমটাই এমনভাবে সাজানো। যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে সঠিক পথে রাখে।
যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সিনেটের অনুমোদন ছাড়া এককভাবে কোনো বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদন করতে পারে না। একই ভাবে কংগ্রেসে পাশ হওয়া কোনো বিল প্রেসিডেন্টের অনুমতি ছাড়া আইনে পরিণত হয় না। আবার প্রেসিডেন্টের অনুমোদিত কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে সুপ্রিম কোর্ট সেটা বাতিল করে দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট নিজে স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে কিংবা সংবিধান পরিপন্থি কোনো কাজ করলে নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন (Impeachment) করতে পারে। এভাবেই মার্কিন শাসনব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। আর এটাকেই বলা হয় 'Principle of Checks and Balances' (নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের নীতি)। এমন শাসনব্যবস্থার কারণেই কোনো অসৎ কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত লোক ভুলক্রমে ক্ষমতায় চলে আসলেও সে খারাপ কাজ করতে পারে না।
2. Cabinet System
সাধারণত বিশ্বের যে-কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই মন্ত্রীরা হয়ে থাকেন পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্য। যেখানে মন্ত্রীরা আইন তৈরি করেন এবং মন্ত্রীদের হাতে থাকে ব্যাপক ক্ষমতা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাবিনেট সিস্টেম সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রীরা নির্বাচিতও নন, এমনকি পার্লামেন্টের সদস্যও নন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার পছন্দ অনুযায়ী কয়েকজনকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এসব মন্ত্রীরা প্রেসিডেন্টের অধস্তন কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। প্রেসিডেন্ট চাইলে তাদেরকে যে-কোনো সময় বরখাস্ত করতে পারেন।
3. The Spoil System (সরকারি চাকরির সিস্টেম)
সরকারি চাকরিগুলো সাধারণত স্থায়ী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি আমলাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন বাংলাদেশে BCS পরীক্ষা, ভারতে ICS পরীক্ষা। একবার বিসিএস পাশ করে ক্যাডার হয়ে যাওয়ার পর রিটায়ার্ড না করা পর্যন্ত চাকরি থাকে। পাঁচ বছর পরপর সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি আমলারা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে প্রেসিডেন্টের নিজ দলের সমর্থকগণকেই নিযুক্ত করা হয়। পূর্বের প্রেসিডেন্টের আমলের ঐসমস্ত পদাধিকারীদের পদত্যাগ করতে হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট নতুন করে নিয়োগ দেন। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার এই ভাগবাঁটোয়ারার ব্যবস্থাকে "Spoil System" বলে। তবে 'Pendleton Act' নামে নতুন একটি আইন প্রণয়নের পর নির্বাচনমূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নীতি স্বীকৃতি হয়েছে। তাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি চাকরির ২০ ভাগ স্পয়েল সিস্টেমে নিয়োগ, আর ৮০ ভাগ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়।
4. Judiciary (বিচার বিভাগ বা আদালত)
সরকারের যে বিভাগ আইন অনুসারে বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকে তাকে বলা হয় বিচার বিভাগ (সুপ্রিম কোর্ট)। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কর্তৃক গৃহীত যে-কোনো পলিসি এবং কংগ্রেসের পাশকৃত সিদ্ধান্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আদালত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। পুনঃনিরীক্ষণের পর আদালত যদি দেখে তাদের গৃহীত আইন বা পলিসিগুলো জনগণের স্বার্থবিরোধী, সংবিধান পরিপন্থি তখন আদালত সেগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। আর এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Judicial Review' বা 'বিচার-বিভাগীয় পুনঃনিরীক্ষণ'। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে সংবিধানের কোনো বিষয় সম্পর্কে মতপার্থক্য দেখা দিলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা সেটার ব্যাখ্যা (Clarification) দান করেন এবং সেই ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে রক্ষা করা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। এসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ 'The Third House' (পার্লামেন্টের তৃতীয় কক্ষ) হিসেবে পরিচিত।
5. Three Branches of Government
A. Legislative: যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নাম কংগ্রেস। এই কংগ্রেসই হলো আইন বিভাগ। কংগ্রেসের কাজ হলো রাষ্ট্রের আইন তৈরি করা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নাম House of Representatives, যার নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা ৪৩৫। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এই ৪৩৫ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। আর কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম Senate, যার মোট সদস্য সংখ্যা ১০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্য থেকে সমান হারে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সিনেট গঠিত হয়।
B. Executive: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন মন্ত্রী এবং স্পয়েল সিস্টেমে নিয়োগ পাওয়া সরকারি আমলাদেরকে একসাথে শাসন বিভাগ বলা হয়। এই শাসন বিভাগের কাজ হলো কংগ্রেসের তৈরিকৃত আইন বাস্তবায়ন করা।
C. Judicial: যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগ হিসেবে পরিচিত। বিচার বিভাগের কাজ হলো আইনের ব্যত্যয় ঘটলে সেটার বিচার করা।
6. Separation of Power (ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি)
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। এর মানে হচ্ছে, সরকারের উপরিউক্ত তিনটি ব্রাঞ্চকে স্বাতন্ত্র্য প্রদান করা। যেমন- আইন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে শুধু আইন বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। শাসনকার্য পরিচালনার সকল বিষয়ে শুধু শাসন বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। বিচার সংক্রান্ত সকল বিষয়ে শুধু বিচার বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। অর্থাৎ এক বিভাগ অন্য বিভাগের উপর হস্তক্ষেপ করবে না, এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। তিনটি বিভাগ পরস্পরের থেকে স্বতন্ত্র থাকবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই রাষ্ট্রের সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বিচার বিভাগ স্বাধীন না। সেখানে সরকারি বা রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব থাকে। কিন্তু 'Separation of Power' নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো বিভাগ স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট অপরাধ করলেও বিচার বিভাগ তাকে ছাড় দেয় না। ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই হ্যামিল্টন, ম্যাডিসনের মতো নেতারা এটাকে মার্কিন শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। [সূত্র- মার্কিন সংবিধানের Article I, Article II, Article III]
7. A Rigid Constitution
১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান চালু হবার পর থেকে ২০২০ সাল অবধি এই সত্তর বছরে মোট ১০৪ বার সংশোধিত হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৭ বার। আরও কিছু উদাহরণ দেই। তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সংবিধানের ধারায় পরিবর্তন এনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। ২০১৮ সালের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সংবিধান সংশোধন করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত করেন। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২০ সালের জুলাইয়ে পুনরায় সংবিধান পরিবর্তন করছেন। আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া, উগান্ডা-সহ পুরো রিজিওনে সংবিধান সংশোধন করা যেন নিয়মিত ব্যাপার। একুশ শতকে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ-সহ বিশ্বজুড়েই সংবিধান সংশোধনের হিড়িক পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট নিজ স্বার্থে কিংবা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সংবিধান সংশোধন করার মতো সাহস দেখাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, সেখানে সংবিধান পরিবর্তন করা এক কথায় দুরূহ এবং অসাধ্য (Cumbrous & Unwieldy)। এই কারণে ১৭৮৯ সাল থেকে এখন অবধি এই দীর্ঘ ২৩০ বছরে মাত্র ২৭ বার মার্কিন সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। প্রথমত, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি শুধু উত্থাপনের জন্যই কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সর্মথন থাকা লাগবে। দ্বিতীয়ত, মোট ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৩৮টি অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় সংবিধান সংশোধনের সেই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে হবে। ৩৮টি অঙ্গরাজ্য থেকে অনুমোদন পাওয়া কতটা দুরূহ (Rigid) আশা করি বুঝতে পেরেছেন। এমনকি সময়ের পরিবর্তনে এবং অনেক নতুন নতুন বিষয়ের আবির্ভাবের কারণে কখনো সাংবিধানিক জটিলতা কিংবা আইনের অস্পষ্টতা দেখা দিলে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেটা ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তাই মার্কিন সংবিধানকে একটি জীবন্ত সংবিধান (A Living Constitution) বলা হয়। [US Constitution, Article-V]
8. Dual Government (দ্বৈত সরকার)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুই স্তরে দুই ধরনের সরকার রয়েছে। এক. সমগ্র দেশের জন্য একটি জাতীয় বা কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। দুই. ৫০টি স্টেট এর আবার রয়েছে আলাদা আলাদা সরকার। অঙ্গরাজ্যগুলোতে একজন গভর্নর প্রধান হিসেবে কাজ করে। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক এই দুই স্তরে আলাদা আলাদা সরকার থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থাকে বলা হয় 'Dual Government' বা দ্বৈত সরকার। কেন্দ্রীয় ও প্রদেশে ক্ষমতা নিয়ে যেন দ্বন্দ্ব না বাঁধে সেজন্য সংবিধানে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। [Article 1, Section 8]
9. Peaceful Power Distribution
এরকম ফেডারেল সিস্টেমে ক্ষমতা আসলে কীভাবে ভাগ করা হয় সেটার কোনো নির্দিষ্ট থিওরি নেই। তবে সাধারণত ফেডারেল সিস্টেমের দেশগুলোতে দুটি নীতি লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষমতা কেন্দ্রকে দিয়ে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা রাজ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া। অপরটি হলো নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যকে দিয়ে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে মূলত প্রথম নীতিটি অনুসরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের তিন ধরনের ক্ষমতা (Power) রয়েছে। এই ক্ষমতাগুলো হলো:
A. Delegated Powers (হস্তান্তরিত ক্ষমতা): যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা লেখা রয়েছে। যেমন- মিলিটারি গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা, কর আরোপ করা, ঋণ গ্রহণ করা, দেশের মুদ্রা প্রচলন করা ইত্যাদি নির্দিষ্ট বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। সংবিধান অনুযায়ী এসকল বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন তিনি সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এসব নিয়ন্ত্রণ করবেন। আর এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকেই 'Delegated Powers' বলা হয়।
B. Implied Powers (অনুমিত ক্ষমতা): এমন কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে লেখা নেই। কিন্তু ক্ষমতাবলে একজন প্রেসিডেন্ট সে কাজগুলো করতে পারে। যেমন- শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও মজুরি বৃদ্ধির আইন করা (Minimum Wage), তামাক বা এলকোহল রেগুলেট করা (Regulating Tobacco), নাগরিকদের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈষম্য দূর করতে আইন করা (Banning Discrimination), যারা ট্যাক্স আদায় করে না তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা (Punishing tax evaders), সরকারি পোস্ট অফিসে বিভ্রান্তিকর মেইল পাঠানো রোধে পদক্ষেপ নেওয়া (Prohibition of mail fraud), যুদ্ধ বা ক্রান্তিলগ্নে মিলিটারি ড্রাফট তৈরা করা (Creation of the draft) ইত্যাদির ক্ষমতা সংবিধানে না থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার চর্চা করে। এগুলো সংবিধানে লিখিত আকারে নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতাবলে এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। আর এগুলোকেই Implied Powers বলা হয়।
C. Inherent Powers (অন্তনির্হিত ক্ষমতা): একটি রাষ্ট্রের সিকিউরিটি এর সাথে জড়িত পররাষ্ট্রনীতি। তাই জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়ে কিংবা সবাইকে জানিয়ে ভোটাভুটির ভিত্তিতে সকল ফরেইন পলিসি গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে যাচ্ছে, সেই রাষ্ট্র যদি আগেই জেনে যায় তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে তাহলে সেটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রেসিডেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের সাথে গোপন আলোচনার মাধ্যমে কিছু কিছু পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারে। আর এই ধরনের ক্ষমতাকেই Inherent Powers বা অন্তনির্হিত ক্ষমতা বলা হয়।
এবার আসি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে। উপরিউক্ত তিন ধরনের ক্ষমতা ছাড়া বাকিসব বিষয় রাজ্য সরকারের অধীনে। পুলিশ, শিক্ষা, আইন, দেওয়ানি আইন, ফৌজদারি আইন, স্থানীয় শাসন, রাজ্যের ঋণ ইত্যাদি সকল কিছুর দায়িত্ব রাজ্যগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
10. Dual Citizenship (দ্বৈত নাগরিকতা)
দ্বৈত সরকারব্যবস্থার মতো নাগরিকত্বের ব্যাপারেও দ্বৈত নীতি অনুসৃত হয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং একইসাথে ব্যক্তি যে অঙ্গরাজ্যের অধিবাসী সেই অঙ্গরাজ্যের নাগরিক।
11. Dual Constitution
যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেন্দ্রীয় সংবিধান রয়েছে। কিন্তু ৫০টি স্টেটের আবার পৃথক পৃথক সংবিধান রয়েছে। সবগুলো রাজ্যের সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংবিধানের [Art. 4(4)]। এমনকি অঙ্গরাজ্যগুলোর নাম ও তাদের সীমানা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কেন্দ্রের নেই। ভোটের হিসেব নিকেশ মিলাতে অনেকে রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন করতে চায়, যেটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে টার্ম হিসেবে 'Gerrymandering' বলা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটগুলোতে এই টার্মটি অনেক বেশি শোনা যায়। নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় সরকার যেন কোনো অঙ্গরাজ্যের নাম কিংবা সীমানা পরিবর্তন করতে না পারে সেটারও আইন রয়েছে। মার্কিন সংবিধান অনুসারে রাজ্যগুলোর মতামত ছাড়া এর এলাকা বা সীমানা পরিবর্তন করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা
১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে 'Philadelphia Constitutional Convention' নামে একটি সাংবিধানিক সম্মেলন হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একদিকে সমগ্র জাতির প্রধান; অন্যদিকে শাসনবিভাগের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি (Double Position)। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এত ব্যাপক যে, এ উপাধিকে অনেকে 'রাজকীয় প্রেসিডেন্ট' (Royal Presidency) বলে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা শুধু জটিলই নয় বরং অনেক দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের নির্বাচন পদ্ধতিটি এই পর্বে সহজে তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রতি চার বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন হয়। তাই প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারেন। জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, কমপক্ষে ১৪ বছর আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস এবং সর্বনিম্ন ৩৫ বছর বয়সি; এই তিনটি শর্ত একসাথে পূরণ করে এমন ব্যক্তি নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারেন [Article 2]। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়; রিপাবলিকান পার্টি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি। একজন চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য অনেকগুলো জটিল স্টেপ পার করতে হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই আরেকটি জটিল পদ্ধতির মধ্য দিয়ে প্রার্থীদের মনোনয়ন নিতে হয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে বা কারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবে সেটাও নির্ধারিত হয় গণতান্ত্রিক উপায়ে। চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সাংবিধানিক পদ্ধতি রয়েছে।
Step-1: Caucus (ককাস)
মনে করুন আপনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। এখন আপনি যেই রাজনৈতিক দল থেকে প্রার্থী হতে চাচ্ছেন সেই দলের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে এই লিখে যে, 'আমি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক”। মনে করুন ডেমোক্রেটিক দল থেকে মোট ৩০ জন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য আবেদন করল। তখন দলের নির্ধারিত বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ নেতারা নানা বৈঠক ও আলোচনা করার পর সিক্রেট ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়ে সেখান থেকে কিছু যোগ্য প্রার্থী বাছাই করেন। দলের যে সকল সিনিয়র মেম্বাররা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি করেন তাদেরকে 'ডেলিগেট' বলা হয়। রাজনৈতিক দল কর্তৃক আয়োজিত নির্ধারিত ডেলিগেটদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ এই নির্বাচন পদ্ধতিটি ককাস হিসেবে পরিচিত।
Step-2: Primary (প্রাইমারি)
ককাসের আরেকটি রূপ হচ্ছে প্রাইমারি। ককাসে সাধারণত প্রার্থী বাছাই করে রাজনৈতিক দলের ডেলিগেটরা। কিন্তু প্রাইমারিতে প্রার্থী বাছাই করা হয় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত ভোটারদের মাধ্যমে। প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাইমারি পদ্ধতিটি আয়োজিত হয় অঙ্গরাজ্য সরকার কর্তৃক। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সরাসরি ভোটে প্রার্থী বাছাই করা হয়। আর এই প্রক্রিয়াকেই প্রাইমারি বলে। উল্লেখ্য, কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে শুধু ককাস হয়, কোনো অঙ্গরাজ্যে শুধু প্রাইমারি হয়, কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে আবার দুটোই হয়। কারণ অঙ্গরাজ্যগুলোর আইন ভিন্ন ভিন্ন।
Step-3: Super Tuesday (সুপার টিউসডে)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাশীদের দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ের আরেক নাম 'সুপার টিউসডে'। কিছু অঙ্গরাজ্য ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ককাস ও প্রাইমারি আয়োজন করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দিনে সবাই একসাথে ককাসের আয়োজন করে। বেশির ভাগ সময়ই সেই দিনটি হয়ে থাকে মার্চ কিংবা এপ্রিলের কোনো এক মঙ্গলবার। এদিন প্রায় ১২/১৫টি অঙ্গরাজ্যে একযোগে ভোটাভুটি হয়। মূলত 'সুপার টিউসডে'তে ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি থেকে কোন কোন প্রার্থী নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন তার একটি সম্ভাব্য ধারণা পাওয়া যায়। সে কারণেই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৮ সাল থেকে এ প্রথা চালু হয়।
Step-4: Party Presidential Debate (নির্বাচনি বিতর্ক)
নির্বাচন নিয়ে অনেক ধরনের ডিবেট রয়েছে। মূলত প্রার্থীদের বিচক্ষণতা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা হয় এসব ডিবেটে। যে ১০/১৫ জন প্রার্থী রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন পায় তাদেরকে নিয়ে "Republican Presidential Debate" অনুষ্ঠিত হয়। আর যারা ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন পায় তাদেরকে নিয়ে "Democratic Presidential Debate" অনুষ্ঠিত হয়। এসব ডিবেট টেলিভিশনে প্রচার করা হয় এবং শ্রোতাদের থেকে রেটিং নেওয়া হয়। রেটিং থেকে বোঝা যায় জনগণ আসলে কাকে চাচ্ছে। এভাবে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ককাস, প্রাইমারি, সুপার টিউসডে, পার্টি নির্বাচনি বিতর্ক ইত্যাদি চলতে থাকে। এসবের মধ্যে যে ক্যান্ডিডেট সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকে তাকেই চূড়ান্ত হিসেবে মনোনীত করা হয়। তারপর দুই দল আলাদা আলাদা জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে। সেই সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি পার্টি থেকে একজন করে মাত্র দুইজনকে চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পুরোদমে শুরু হয় নির্বাচনি আমেজ। এই দুই ক্যান্ডিডেট নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। তারপর প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা তাদের রানিং মেট হিসেবে একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্ধারণ করেন। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা তাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে দুইটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে তার পার্টি থেকে তার সাথে আরও যে ২০/২৫ জন প্রতিযোগিতা করেছিল তাদের মধ্যে যার সাপোর্টার বেশি ছিল তাকে প্রায়োরিটি দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এমন অঙ্গরাজ্যের একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় যে অঙ্গরাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন- নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কামালা হ্যারিসকে। অথচ ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটে বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জো বাইডেনের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছিলেন এই কামালা হ্যারিস। জো বাইডেন চাইলে কামালা হ্যারিসের পরিবর্তে তার রানিং মেট হিসেবে বার্নি স্যান্ডার্স, এ্যামি ক্লোবোচার কিংবা তুলসি গ্যাভার্ড এদের মধ্যে থেকে যে কাউকে সিলেক্ট করতে পারতেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো তারপরেও কেন জো বাইডেন তার রানিং মেট হিসেবে কামালা হ্যারিসকে বেছে নিয়েছিলেন? উত্তর হচ্ছে Electoral College এর হিসেব নিকেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি (মোট ৫৫টি) ইলেক্টোরাল কলেজ হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের। আর কামালা হ্যারিস ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট একই অঙ্গরাজ্য থেকে হতে পারেন না।
Step-5: Presidential and Vice Presidential Debate
তারপর শুরু হয় ডিবেট। ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করা হয়ে গেলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে ৩টি, আর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ১টি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বলা হয়ে থাকে এই চারটি বিতর্কের উপরেই নির্ভর করে কে হবেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিতর্ক, প্রচারণা, সম্মেলন ইত্যাদি শেষে শুরু হয় সাধারণ নির্বাচন। নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরদিন মঙ্গলবার ভোট শুরু হয়। দুশো বছরের পুরোনো সিস্টেমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন হয়। বিশ্বের অন্য সব দেশের নির্বাচন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন অনেক জটিল এবং ভিন্ন।
অন্যান্য দেশে ভোটাররা সরাসরি প্রার্থী কিংবা দলকে ভোট দিয়ে থাকে। যে সবচেয়ে বেশি ভোট পায় তাকেই বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা কোন দল বা প্রার্থীকে ভোট দেন না। তারা মূলত তাদের রাজ্যের একদল মানুষকে (Electoral College) ভোট দিয়ে থাকেন। ওই মানুষগুলো হলো ইলেক্টর বা নির্বাচক। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেস। এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নাম হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ। এই প্রতিনিধি পরিষদের মোট সদস্য ৪৩৫ জন। যুক্তরাষ্ট্রের যে ৫০টি অঙ্গরাজ্য রয়েছে সেগুলোকে জনসংখ্যার অনুপাতে ছোট ছোট ডিস্ট্রিক্ট এ ভাগ করা হয়েছে। যে অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যা বেশি সেই রাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য সংখ্যাও বেশি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বসবাস করে ক্যালিফোর্নিয়াতে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট থেকে মোট ৫৩ জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। অন্যদিকে আলাস্কা, ডেলওয়্যার, ভারমন্ট ইত্যাদি স্টেটে জনসংখ্যা অনেক কম। তাই এসব রাজ্যগুলোর প্রতিনিধি সংখ্যা মাত্র একজন করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম সিনেট। সিনেটর হওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোর জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আয়তনের দিক থেকে স্টেট ছোট হোক কিংবা বড়, জনসংখ্যা বেশি থাকুক কিংবা কম এসব হিসেব করা হয় না। সমান অনুপাতে ৫০টি রাজ্য থেকে দুই জন করে মোট ১০০ জন সিনেটর কংগ্রেসে আসে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে কোন দুজন সিনেটর হবেন সেটা প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্যরা ভোটাভুটি করে ঠিক করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি ভারতের রাজধানী দিল্লির মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ১৯৬৪ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেখান থেকেও তিনজন সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে মোট সদস্য কত জন হলো?
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ৪৩৫ জন (Representatives)
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ (Senate) ১০০ জন
ওয়াশিংটন ডিসি বা ডিস্ট্রিক্ট অব ৩ জন কলম্বিয়া
মোট: ৫৩৮ জন
তাই দুটি দল কংগ্রেসের সমসংখ্যক এই ৫৩৮ জনকে নিয়ে প্যানেল গঠন করে। এদেরকে একসাথে বলা হয় ইলেক্টোরাল কলেজ (Electoral College)। স্বচ্ছতা রক্ষার্থে মার্কিন কংগ্রেসের যে-কোনো কক্ষের সদস্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর্মচারী ইলেক্টোরাল কলেজের ইলেক্টর হতে পারবে না। সবগুলো অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টর থাকে এবং রিপাবলিকান পার্টি থেকেও মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টর থাকে। সুতরাং সাধারণ ভোটাররা তাদের অঞ্চলের এই ইলেক্টরদের ভোট দেন। আর এটাকে বলা হয় 'Popular Vote'। অর্থাৎ জনগণ ভোট দেবেন ইলেক্টরদেরকে। জনগণের ভোটে যে-সকল ইলেক্টররা বিজয়ী হন তারা একমাস পর তথা ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় বুধবারের পর প্রথম যে সোমবার আসে সেদিন নিজ নিজ রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেন। আর এটাকে বলে 'Electoral Vote'। অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় ইলেক্টররা, তারপর এসব বিজয়ী ইলেক্টরদের ভোটে নির্বাচিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাই যে দল থেকে মোট ২৭০ জন ইলেক্টর বা তারও বেশি ইলেক্টর জয়ী হবে তারাই পরবর্তী সরকার গঠন করবে। এভাবে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তারপর ২০ জানুয়ারি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উল্লেখ্য, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ইলেক্টররা তাদের দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকেই ভোট দেয়। কিন্তু সে তার দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে বিরোধী দলের প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারে। ধরুন আপনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন ইলেক্টর হিসেবে জয়ী হয়েছেন, এখন আপনার এই ইলেক্টোরাল ভোটটি আপনি ডেমোক্রেটিক দলকে না দিয়ে রিপাবলিকান দলকেও দিতে পারেবেন। কিন্তু এটা বিশ্বাসঘাতকতা হয় বলে এমনটি কখনোই হয়নি। এমনকি কিছু অঙ্গরাজ্যে আইনও রয়েছে যে, কেউ যদি এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
নির্বাচন নিয়ে খুঁটিনাটি
Contingent Election (সাপেক্ষ নির্বাচন)
যদি কোনো প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান তাহলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিষয়টি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের কাছে চলে যায়। তখন হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন এবং কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ভাইস প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করবেন। এটাকেই বলা হয় Contingent Election বা সাপেক্ষ নির্বাচন। এরকম যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মাত্র একবারই ঘটেছিল; ১৮২৪ সালে। সেবছর কোনো প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভদের ভোটে জন কুইন্সি এ্যাডামস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অনেক আগে এরকম নিয়মও ছিল যে, সর্বোচ্চ ইলেক্টোরাল ভোট যিনি পাবেন তিনি হবেন প্রেসিডেন্ট। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট যে পাবেন তিনি হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৮০০ সালে জেফারসন ও বারের মধ্যে এরকম হয়েছিল। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে দুই পক্ষের দুইজন হওয়ায় এই নিয়ম বাতিল করা হয়।
Line of Succession (শূন্য পদ পূরণ)
প্রেসিডেন্টের স্বাভাবিক কার্যকাল ৪ বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হলে কিংবা প্রেসিডেন্ট মারা গেলে তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। যেমন- ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়েছিলেন। ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগ করলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্টের পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। যদি ভাইস প্রেসিডেন্টও মারা যায় কিংবা প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ই একসাথে অক্ষম হয়ে পড়ে তাহলে সেক্রেটারি অব স্টেট, তারপর প্রতিরক্ষা সচিব, তারপর অ্যাটর্নি জেনারেল পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে এরকম কখনো হয়নি যে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ই একসাথে মারা গিয়েছেন বা একসাথে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
Temporarily Transferring Power (সাময়িক ক্ষমতা হস্তান্তর)
প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে কংগ্রেসকে লিখিতভাবে জানিয়ে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিতে পারেন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর প্রেসিডেন্ট সুস্থ হয়ে উঠলে পুনরায় প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন [সোর্স- Section 3 of 25th Amendment)। যেমন- সম্প্রতি জো বাইডেন কোলন পরীক্ষার অংশ হিসেবে এক ঘণ্টা ২৫ মিনিট অ্যানেস্থেসিয়ার (অবেদন বা অচেতন) অধীনে ছিলেন। বাইডেনের এই পরীক্ষার সময় কামালা হ্যারিস ৮৫ মিনিটের জন্য দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন।
Why Tuesday & November? (কেন নভেম্বরের মঙ্গলবারেই ভোট হয়?)
মনে হতে পারে পপুলার ভোট কেন নভেম্বর মাসে এবং মঙ্গলবারে হয়? শুরুর দিকে ভোটের প্রতি মানুষের এত আগ্রহ ছিল না। দেখা যেত মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ কেবল ভোেট দিতে আসত। তাই ভোট প্রদানের হার বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন নেতারা ছুটির দিনকে বাছাই করেছিল। এভাবে ১৮৪৫ সাল থেকেই নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়ম চলে আসছে। কারণ তখন আমেরিকা ছিল কৃষিপ্রধান দেশ। ভোট কেন্দ্র ছিল অনেক দূরে। ঘোড়াগাড়িতে করেও ভোটকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় লেগে যেত কৃষকদের। তার মধ্যে শনিবার ছিল কাজের দিন। রবিবারে আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান নাগরিকদের ধর্মকর্মের দিন এবং বুধবার ছিল বাজারের দিন। ফলে সোমবারকে যাতায়াতের সুবিধার্থে রেখে মঙ্গলবারকেই ভোট দেওয়ার দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। আর মাস হিসেবে নভেম্বরকে বেছে নেওয়ার কারণ সে সময় নভেম্বর মাস পড়তে পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে ফসল কাটা শেষ হয়ে যেত। নভেম্বর শেষ হতেই শীত নামত। তখন সবাই অবসর থাকত।
Symbol for Election (নির্বাচনের প্রতীক)
রিপাবলিকান দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন থমাস জেফারসন, আর ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু জ্যাকশন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক হচ্ছে গাধা। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক কার্টুন প্রচুর জনপ্রিয়। কথিত আছে ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী অ্যান্ড্রু জ্যাকশনকে প্রতিপক্ষরা 'জ্যাকঅ্যাস' বা গাধা নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে একজন কার্টুনিস্ট জ্যাকের চেহারা সম্বলিত এক গাধার ছবি আঁকেন। যা অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের পছন্দ হয়ে যায়। তাই তিনি গাধাকে নিজের দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তখন থেকেই ডেমোক্র্যাটদের প্রতীক হয় গাধা। তাদের মতে গাধা হচ্ছে কষ্টসহিষ্ণুতার প্রতীক। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হলো হাতি। ১৮৭৪ সালে এক রিপাবলিকান কার্টুনিস্ট একটি কার্টুন আঁকেন। সেখানে দেখানো হয় একটি গাধা বনের অন্যান্য প্রাণীদের ভয় দেখাচ্ছে। তখন সকল প্রাণীরা ভয় পেলেও শুধু একটি হাতি ভয় পায়নি। হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই হাতিকে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে রিপাবলিকানরা গ্রহণ করে。
Winner Takes All (সবকিছুই বিজয়ীদের)
সাধারণত কোনো রাজ্যে যে প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান সব ভোট তার পক্ষে চলে যায়। যেমন ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মোট ইলেক্টোরাল ভোট ২৯টি। ধরুন রিপাবলিকানরা পেল ১৩টি, আর ডেমোক্র্যাটরা পেল ১৬টি। যেহেতু ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছে তাই এই রাজ্যের ২৯টি ইলেক্টোরাল ভোটই ডেমোক্র্যাটদের হয়ে যাবে। এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Winner Takes All' বা বিজয়ীরা সব নিয়ে নেবে। এটার কারণেই অনেকে পপুলার ভোেট বেশি পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিন্টন ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে ত্রিশ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। কিন্তু ইলেক্টোরাল ভোেট ট্রাম্প বেশি পাওয়ায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। শুধু নেব্রাস্কা ও মাইন এই দুইটি অঙ্গরাজ্য ছাড়া সকল রাজ্যেই Winner takes all এই নিয়ম। অর্থাৎ নেব্রাস্কা ও মাইনে যে যত ভোট পাবে ততই হিসেব করা হবে।
Impeachment (অভিশংসন)
নির্বাচিত হওয়ার পর যদি কোনো প্রেসিডেন্ট দুর্নীতিমূলক বা বেআইনি কাজ করেন (misdemeanors), যদি তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার অভিযোগ ওঠে (treason), যদি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে (bribery), তাহলে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর এটাকেই 'Impeachment' বা অভিশংসন বলা হয়। তবে অভিশংসনের প্রক্রিয়াটি জটিল। এই প্রক্রিয়াটি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে শুরু হয়, নিম্নকক্ষে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রেসিডেন্ট অভিশংসনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় তাহলে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে পাশ হতে আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটে যায়। সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেলে একজন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়। তবে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখনো হয়নি। কেননা এতে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। তাই প্রেসিডেন্ট অপসারণের প্রস্তাব কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে পাশ হলেও উচ্চকক্ষ সিনেটে কখনো পাশ হয় না। ১৯৭৪ সালে রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে বেআইনি কাজের অভিযোগ উঠলে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হবার পূর্বেই নিক্সন পদত্যাগ করেন। আবার অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটা আর পাশ হয়নি। "Former Presidents Act of 1958" এই এক্টের অধীনে সকল প্রেসিডেন্ট তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পেশাল সিকিউরিটি, পেনশন ফি, বার্ষিক ট্রাভেল ভাতা এসব পেয়ে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় আসতে সম্পূর্ণ জনগণের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। তারা জনগণকে অনেক গুরুত্ব দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- নাগরিকরা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে Issues, Characteristics এবং Loyalty এই তিনটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয় সে কাকে ভোট দেবে।
1. Issues (গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু) : চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এর উপর ভিত্তি করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমটি হলো Retrospective Issue। এর মানে হলো যারা ক্যান্ডিডেট বা প্রার্থী তাদের অতীতের রাজনৈতিক পারফরম্যান্স কেমন ছিল। দ্বিতীয়টি হলো Prospective Issuel তথা যারা ক্যান্ডিডেট তাদের ভবিষ্যতের পারফরম্যান্স কেমন হতে পারে এটা অনুমান করে নিয়ে। প্রার্থীরা ভবিষ্যতে কেমন হবে এটা অনুষ্ঠিত তিনটি প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেট ও রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন দেখে ভোটাররা সহজেই অনুমান করতে পারে। তৃতীয় ইস্যুটি হচ্ছে Special issues। অর্থাৎ প্রতিটি রাষ্ট্রেরই কিছু স্পেশাল ইস্যু থাকে যেগুলো নিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিক দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে Abortion (গর্ভপাত), Minimum Wage (শ্রমিকদের বেতন), Immigration (অভিবাসন), Gun laws (বন্দুক আইন) এগুলো হচ্ছে স্পেশাল ইস্য। আপনি যদি গর্ভপাতকে সমর্থন করেন তাহলে যে প্রার্থী গর্ভপাতকে সমর্থন করে আপনি তাকেই ভোট দেবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা Abortion এর বিপক্ষে কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা পক্ষে। একই ভাবে রিপাবলিকানরা চায় শ্রমিকদের মজুরি কমাতে কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা চায় মজুরি বাড়াতে। ডেমোক্র্যাটরা চায় বন্দুক আইন কঠোর করতে, রিপাবলিকানরা চায় শিথিল করতে। তবে ব্যক্তিভেদে এটা পরিবর্তনও হতে পারে। আর চতুর্থটি হলো Valence Issues। ভ্যালিয়েন্স হচ্ছে ক্যান্ডিডেট নিজে এবং তার রানিং মেট-সহ (ভাইস প্রেসিডেন্ট) যাদেরকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কেমন হবে অথবা তারা সৎ কি না ইত্যাদি বিবেচনা করে ভোটাররা তাদের প্রার্থী পছন্দ করে।
2. Candidate characteristics (প্রার্থীর বৈশিষ্ট্য): ভোটাররা প্রার্থীদের ধর্ম, বর্ণ, সততা, দৃঢ়সংকল্প, অঞ্চল ইত্যাদি দেখে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কাকে ভোট দেবে।
3. Party Loyalty (দলীয় আনুগত্য): কিছু ভোটার রয়েছে যারা ছোটবেলা থেকে যে দলকে সমর্থন করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দলকেই ভোট দেয়। এটা হতে পারে নিজেদের মতাদর্শের সাথে দলের মতাদর্শের মিল থাকার কারণেও। আবার মেরিল্যান্ড, মিশিগানের মতো কিছু অঙ্গরাজ্য আছে যেখানে ডেমোক্র্যাটরা সবসময় বিজয়ী হয়, তাই সেগুলোকে ব্লু স্টেট (Blue state) বলে। একই ভাবে মিসিসিপি, এলাবামার মতো কিছু রাজ্যে রিপাবলিকানরা সবসময়ই বিজয়ী হয়। তাই সেগুলোকে রেড স্টেট (Red state) বলে। আবার টেক্সাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়ার মতো রাজ্যগুলো দোদুল্যমান, কেউ জানে না এসব স্টেটে কে জিততে পারে। তাই এগুলোকে 'Battle Ground' বা 'Swing states' বলে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
বিশ্বের যে-সকল দেশে Two Party System বা দ্বিদলীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল মোট দুইটি; ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি। রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টি মূলত উদারতাবাদে বিশ্বাসী। আর রিপাবলিকান পার্টি কিছুটা রক্ষণশীল ধ্যানধারণা লালন করে। রিপাবলিকান পার্টি Grand Old Party (GOP) হিসেবেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে প্রেসিডেন্টশিয়াল ডিবেটগুলো দেখা আবশ্যকীয়। প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটগুলোতে মূলত কী নিয়ে আলোচনা হয়? আপনি যদি কোনো একটি ডিবেট দেখে থাকেন তাহলে লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ডিবেটের যিনি মডারেটর থাকেন তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে প্রশ্ন করে। উদাহরণস্বরূপ: সরাসরি এরকম প্রশ্ন করা হয় যে, আপনি যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন তাহলে ইকোনমি নিয়ে আপনার পলিসি কী হবে? ইমিগ্রেশন নিয়ে আপনার পলিসি কী হবে? চীনের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন হবে? বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে আপনার পলিসি কী হবে? রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কূটনৈতিক এসবের পলিসি কেমন হবে এসব নিয়ে ডিবেট হয়।
আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে Ideology বা মতাদর্শ নিয়ে তেমন বিতর্ক হয় না বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান এই দুইটি দলের মধ্যে বিতর্ক হয় মূলত রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি ও আইন নিয়ে। পলিসি ভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিদের নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতা থাকে না। কারণ আপনি ক্ষমতায় গেলে সোশ্যাল, ইকোনমি, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে আপনার পলিসি বা নীতি কী হবে তা আপনাকে আগেই স্পষ্ট করে বলে দিতে হয়। পলিসি নির্ভর এধরনের রাজনীতিকে টার্ম হিসেবে 'Programmatic Politics' বলা হয়। তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জনগণকে একটি পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। অনেকে আবার এটাকে 'Politics Meets Policies' হিসেবেও আখ্যায়িত করে।
বিভিন্ন ন্যাশনাল পলিসি
যে-কোনো রাষ্ট্রের পলিটিক্স সাধারণত দুইভাগে বিভক্ত- জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। একটি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে যে রাজনীতি হয় সেটাকে সাধারণত জাতীয় রাজনীতি বা Domestic Politics বলা হয়। অন্যদিকে একটি রাষ্ট্রের সাথে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপন, কূটনৈতিক আলোচনা, ফরেইন পলিসি ইত্যাদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা International Politics বলা হয়। তাই প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির কয়েকটি পলিসি নিয়ে আলোচনা করব।
First Policy - অভিবাসন নীতি
এই নীতিটি খুবই চমকপ্রদ। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বা ইমিগ্রেশনের তিনটি পলিসি রয়েছে। ১ম পলিসি, দেশের অধিকাংশ জনগণ জাতীয়তাবাদের কারণে সমর্থন করে না, ২য় পলিসি- অল্পবয়সি শিশুদের জেলে আটক করে, ৩য় পলিসি- শিশুদেরকে পিতামাতার থেকে আলাদা করে। এই সিচুয়েশনে ধরুন আপনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তাহলে এই তিনটি পলিসির কোনটি গ্রহণ করতেন? আপনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন তখন আপনাকে স্পষ্টভাবে জনগণকে বলে দিতে হবে আপনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইমিগ্রেশনের এই তিনটি পলিসির কোনটি গ্রহণ করবেন।
ক. Catch and Release policy: যারা সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে চায় অথবা লিগ্যাল উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চায় তাদেরকে প্রথমে একটি সেন্টারে নিয়ে সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। অভিবাসন প্রার্থীরা কোনো ক্রিমিনাল কি না, চোরাচালান বা মাদক ব্যবসায়ী কি না এসব যাচাই করা হয়। যদি এসব না হয় তাহলে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হতো। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীল এই পলিসি নিয়েছিলেন। বর্তমানে জো বাইডেন আরও কিছু নিয়ম যোগ করা সাপেক্ষে এটাকেই সমর্থন করছেন। বিরোধী দল রিপাবলিকানরা জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে এই পলিসির প্রচণ্ড বিরোধিতা করে থাকে। রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করতেন এই পলিসিটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর। কারণ অন্য দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইউএস নাগরিকদের চাকরিগুলো দখল করে নিচ্ছে।
খ. Family Detention: অভিবাসনের দুই নম্বর এই নীতিটি হলো মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যারাই যুক্তরাষ্ট্রে আসবে তাদেরকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যারা যুক্তরাষ্ট্রে আসত তারা অধিকাংশই সপরিবারে, ছোট বাচ্চা বা সন্তানাদি নিয়ে আসত। ছোট ছোট বাচ্চা-সহ সপরিবারে সবাইকেই আটক করা হতো। এখন কথা হলো শিশুরা বা ছোট বাচ্চারা তো নিরপরাধ। পিতামাতার সাথে তারা এসেছে। তারা তো কিছুই বুঝে না, পিতামাতা না আসলে তারা তো আসত না। এখন বিনা অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্ক এই শিশুদের জেলে আটক রাখা কতটা যৌক্তিক? ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার দেড় বছর পর্যন্ত এই পলিসিটি ছিল। পরবর্তীতে ডেমোক্র্যাট ও সিভিল সোসাইটির কঠোর সমালোচনায় এই পলিসি থেকে সরে গিয়ে তৃতীয় পলিসিটি গ্রহণ করেন।
গ. Family Separation: এই তৃতীয় পলিসিটি হলো যারা পরিবার-সহ সীমান্তে আটক হবে তাদের মধ্যে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদেরই আটক রাখা হবে, সাথে যে-সকল ছোট বাচ্চা বা শিশু থাকবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। মনে করুন পিতামাতা ও তাদের পাঁচ বছরের দুইটি সন্তান সীমান্তে আটক হলো। এখন পিতামাতাকে ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রেখে সন্তান দুজনকে ছেড়ে দিলেন। এখন ডেমোক্র্যাটদের প্রশ্ন হলো পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানদের সেপারেট বা আলাদা করার অধিকার কারো নেই। এখানে সন্তানদের পিতামাতার সাথে বসবাসের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
আসলে ইমিগ্রেশন বা অভিবাসনের উপরিউক্ত তিনটি পলিসির মধ্যেই ঝামেলা রয়েছে। যে- কারণে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীদের ইমিগ্রেশন পলিসি নির্ধারণ করতে হিমশিম খেতে হয়। ইমিগ্রেশন নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন একটি পরিভাষা যুক্ত করেছেন। ট্রাম্প সেই পরিভাষাটির নাম দিয়েছেন "Chain Migration" হিসেবে। এই চেইন মাইগ্রেশনের মানে হলো, প্রথমে আপনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন, কয়েকবছর সেখানে বসবাস করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করবেন। তারপর আপনার ছোট ভাইকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসবেন। আপনার ছোট ভাই আবার কয়েকবছর পর আপনার পিতামাতাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসল। এভাবে আপনার পুরো পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল। তাই ট্রাম্প এই পুরো প্রসেসটার নাম দিয়েছেন Chain Migration। তাই ট্রাম্প তার ক্যাম্পেইনে বলতেন- They should go back to their first country!
Second Policy- ট্যাক্স বা শুল্ক নীতি
এই পলিসিটি বুঝতে হলে আমাদের ট্যাক্সের প্রকারভেদ আগে জানা আবশ্যক। ট্যাক্স সাধারণত তিন প্রকার:
ক. Progressive tax: ইনকাম বা আয়ের অনুপাতে ট্যাক্স। আমার ইনকাম বাড়লে ট্যাক্স বাড়বে। ইনকাম কমে গেলে ট্যাক্সের পরিমাণও কমে যাবে।
খ Regressive tax: এটা মূলত ইন্ডাস্ট্রি ট্যাক্স। আমার ইনকাম যত বাড়বে আমার ট্যাক্স তত কমবে। ধরুন আপনার ইনকাম দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন আপনার ট্যাক্সের পরিমাণও কমতে থাকবে।
গ Proportionate tax: এটা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধার্যকৃত ট্যাক্স। অনেক সময় সরকার কিছু স্পেসিফিক কারখানা বা কর্পোরেশনের উপর এটা ধার্য করে থাকে। আপনার ইনকাম হোক বা না হোক, ব্যবসায় লাভ লোকসান যাই হোক না কেন; আপনাকে বছর শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স সরকারকে দিতেই হবে।
ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান: জো বাইডেন ও ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত Progressive tax এর পক্ষে। তাদের মতে যে কর্পোরেট যত বেশি ইনকাম করবে সে কর্পোরেট তত বেশি ট্যাক্স দেবে। তা না হলে দেশে Income inequality বা আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।
রিপাবলিকানদের অবস্থান: রিপাবলিকানরা মনে করে একটি কোম্পানি বা কর্পোরেশনের যত বেশি ইনকাম হবে তত বেশি তাদের ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, আর যত ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে তত জব সৃষ্টি হবে। তাই এসব জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর উপর ট্যাক্স কমিয়ে দিলে অনেক জব সৃষ্টি হবে, সাথে বেকারত্বের হারও কমবে। আর Proportionate tax নিয়ে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলের অবস্থান একই।
Third Policy- ইকোনমি বা অর্থনীতি
অর্থনীতি নিয়ে দুইটি পলিসি রয়েছে।
ক. Supply Side Economy: এই নীতিটি রিপাবলিকানরা সাপোর্ট করেন। সাপ্লাই সাইড ইকোনমি হলো- যে-সকল কর্পোরেশন আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য তৈরি করে বা যোগান দিয়ে থাকে, সেইসব কলকারখানার উপর অধিক পরিমাণে ট্যাক্স ধার্য না করা। রিপাবলিকানরা সবসময় মনে করেন একটি দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে ঐ দেশের বড় বড় কর্পোরেশন বা কলকারখানাগুলোর উপর। কারণ এধরনের কর্পোরেশনগুলো অসংখ্য জব সৃষ্টি করে। তাই রিপাবলিকানরা সবসময় "কর্পোরেট Tax" কমানোর পক্ষে। তারা মনে করে যদি এসব কর্পোরেশনের উপর অধিক পরিমাণে ট্যাক্স আরোপ করা হয় তাহলে ট্যাক্সের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে জব বা চাকরি কমে যায়। ফলস্বরূপ দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। তাই রিপাবলিকান প্রার্থীদের দেখবেন যে ডিবেট বা ক্যাম্পেইনে তারা অসংখ্য বার এই "Job" শব্দটি উচ্চারণ করে। ঠিক একই ভাবে এসব কলকারখানাগুলোর কারণে পরিবেশ দূষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন হয়, তাই রিপাবলিকানরা "Climate change" নিয়ে তেমন কোনো পলিসি নেয় না। তারা মনে করে জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষের হাত নেই। এটা প্রাকৃতিক। ট্রাম্পের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। (রিপাবলিকানরা অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান ও হাইকের লিবারেল ইকোনমি দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত)
✔ Demand Side Economy: ডেমোক্রেটরা এই পলিসিটি সমর্থন করে। ডিমান্ড সাইড ইকোনমি সাধারণত কর্পোরেট ট্যাক্সকে সমর্থন করে। ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন দেশে কর্পোরেট জায়ান্ট বা ধনিকশ্রেণি হলো মুষ্টিমেয়। আর যারা ভোক্তা বা কনজিউমার তারা অধিকাংশই মধ্যম আয়ের পরিবার। তাই অধিকাংশ ভোক্তারা টাকার অভাবে প্রোডাক্ট ক্রয় করতে পারে মিলিটারি অভ্যুত্থান। তাই আমাদের উচিত কর্পোরেট সেক্টর থেকে অধিক পরিমাণে ট্যাক্স নিয়ে এসকল মধ্যবিত্ত পরিবারদের মধ্যে বণ্টন (Redistribution) করে দেওয়া। তাই জো বাইডেন-সহ ডেমোক্র্যাটরা সবসময় Middle Class Family নিয়ে কথা বলে। একই ভাবে একটি কারখানায় যতবেশি পণ্য উৎপাদন হয় ততবেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। আর কার্বন নিঃসরণ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত সে-কারণে ডেমোক্র্যাটরা সবসময় Climate change নিয়ে কথা বলে। (ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত জন মেইনার্ড কেইনসের 'Interventionist economy" দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত)
Fourth Policy- সামাজিক নীতি/Social policy
সামাজিক পলিসিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে "Kitchen Table Issues" বলা হয়। অর্থাৎ রান্না বা খাবার ঘরে বসে আমরা প্রতিদিন যে সকল বিষয় আলোচনা করে থাকি সেগুলো সামাজিক পলিসির অন্তর্ভুক্ত। যেমন- খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি।
ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানঃ জো বাইডেন বা ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত স্বাস্থ্য বিমা বা কম খরচে চিকিৎসা সেবা, বয়স্ক বা বেকার ভাতা, শিক্ষা ক্ষেত্রে খরচ কমানো বা Free School Bussing এসবের পক্ষে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে "Welfare State" বলে।
রিপাবলিকানদের অবস্থানঃ রিপাবলিকানরা সাধারণত স্বাস্থ্য বিমার বিপক্ষে, মিডল ক্লাস ফ্যামিলির চেয়ে তারা বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে পুঁজিপতিদের।
5th policy- Foreign policy/বৈদেশিক নীতি
বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকানদের মধ্যে পলিসিগত তেমন কোনো অমিল নেই। যেমন- রাশিয়া, চায়না, ইরান এসকল দেশ ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই শত্রু। একই ভাবে ইসরায়েল, সৌদি আরব, ভারত উভয় দলেরই মিত্র রাষ্ট্র। কিন্তু এসব রাষ্ট্রগুলোর সাথে উভয় দলের কিছু আচরণগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করতেন তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন, Hard Power বা Economic Sanctions এসবের ভয় দেখিয়ে সরাসরি কাজ আদায় করে নেন। কিন্তু ডেমোক্রেটিকরা বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সরাসরি বা প্রকাশ্যে কিছু না বলে কূটনীতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। বারাক ওবামা ও জো বাইডেন এর পররাষ্ট্রনীতি তাই বলে।
Question to think about?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরো দুনিয়া থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সেখানে স্বৈরাচারবিরোধী বা গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে বিশালাকারের গণ আন্দোলন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে-কারণে ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু চীনে একদলীয় শাসনব্যবস্থা হওয়ায় ভবিষ্যতে সেখানে বড় ধরনের গণ আন্দোলন দেখা দিতে পারে। তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের এই অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থাই চীনের একক পরাশক্তি হওয়ার পেছনে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Raskin, Jamie (2022), Unthinkable: Trauma, Truth, and the Trials of American Democracy, Harper
2. Marche, Stephen (2022), The Next Civil War: Dispatches from the American Future, Avid Reader Press
3. Maddow, Rachel and Yarvitz, Michael (2020), Bag Man: The Wild Crimes, Audacious Cover-Up, and Spectacular Downfall of a Brazen Crook in the White House, Crown
4. Schweizer, Peter (2022), Red-Handed: How American Elites Get Rich Helping China Win, Harper
5. Maisel, Sandy and Brewer, Mark D. (9th ed. 2020), Parties and Elections in America: The Electoral Process, Rowman & Littlefield Publishers
6. Hetherington, Marc J. and Keefe, William J. (11th ed. 2009), Parties, Politics, and Public Policy in America, CQ Press
7. Edwards III, George C.; Wattenberg, Martin, and Lineberry Robert L. (16th ed. 2013), Government in America: People, Politics, and Policy, Pearson Custom Publishing
8. Chamberlain, Lawrence H (1996), The President, Congress and legislation
9. Agar, Herbert (1950), The United States: The Presidents, the Parties & the Constitution
10. Axinn, June and Stern, Mark J. (2007), Social Welfare: A History of the American Response to Need, Boston: Allyn & Bacon
11. Cramer, Richard Ben (1993), What It Takes: The Way to the White House, Vintage