📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তত্ত্বসমূহ
Theme: Magnificent Delusion
"Experience without theory is blind, but theory without experience is mere intellectual play." - Immanuel Kant
ভূমিকা: Theory বা তত্ত্ব। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে থিওরি ব্যবহার করা হয় দুটো উদ্দেশ্যে। প্রথমটি হলো Explanation, আর দ্বিতীয়টি হলো Extrapolation। রাষ্ট্রগুলো কেন যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কেন সারা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, চীন কেন তাইওয়ানকে মেইনল্যান্ডের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, নিরপেক্ষ রাষ্ট্র সুইডেন কেন সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দিতে চায় ইত্যাদি চলমান বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা (explain) করতে থিওরি ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, তালেবানদের পুনরুত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, পোস্ট কোভিড বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি কোন দিকে যাবে, দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত হবে কি না ইত্যাদি ভবিষ্যৎ বিষয়গুলোর পূর্বানুমান ও দূরদর্শন (extrapolate) করতেই বিভিন্ন থিওরি ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন মতবাদের ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাঁধন দৃঢ়তর হয়েছে। তাই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির ব্যাখ্যা করা যায় এবং দূরদর্শনও করা যায় এমন কিছু থিওরি নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করব। উল্লেখ্য, একটি থিওরি একেক ডিসিপ্লিনে একেক রকম ব্যাখ্যা করা হয়। তবে আমি এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে থিওরিগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
A Symbiotic Realism Theory (বাস্তববাদ তত্ত্ব)
রাজনৈতিক বাস্তববাদের উপর ভর করে চলছে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি। তাই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে 'Political Realism' বা 'রাজনৈতিক বাস্তববাদ' বোঝাটা অনেক বেশি জরুরি। কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পারের সময়ে সৌদি আরবের সাথে কানাডার এক হাজার দুশো কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জাস্টিন ট্রুডো প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের স্বাক্ষর করা সেই অস্ত্র বিক্রির চুক্তিটি বাতিল করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে দেশটির অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে বিগত বছরগুলোতে কানাডার ফরেইন রিজার্ভের একটি বড় অংশ আসে এই অস্ত্র রপ্তানি থেকে। তাই পুনরায় অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে চুক্তিটি বাতিল করার পরিবর্তে চুক্তিটি নবায়ন করে ট্রুডো সরকার। কানাডার অস্ত্র বিক্রির এই বিষয়টি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা বোঝানোর জন্য উল্লেখ করেছি, সেটি হচ্ছে Realism বা বাস্তববাদ।
পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের দেশ সৌদি আরবের কাছে শুধু কানাডা সরকারই নয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোও প্রতিনিয়ত অস্ত্র বিক্রি করছে। যুক্তরাষ্ট্রও তার সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে অন্য রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি করার মাধ্যমে। তাই এখন প্রশ্ন হতে পারে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইতালি থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ক্রয় করে সৌদি আরব সেই অস্ত্র কোথায় ব্যবহার করছে? উত্তর হলো, সৌদি তার এসব ক্রয়কৃত অস্ত্রের অধিকাংশ ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উপর ব্যবহার করছে। বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক সংকটে থাকা দেশ ইয়েমেনে সৌদি আরবের অস্ত্র নিক্ষেপের ফলে শুধু হুতি বিদ্রোহীরাই মারা যাচ্ছে বিষয়টি এরকম নয় বরং হাজার হাজার ইয়েমেনি সাধারণ জনগণ, শিশু ও বেসামরিক লোকজনও মারা যাচ্ছে। সেজন্য ইয়েমেনি সাধারণ জনগণের জীবনের কথা চিন্তা করে এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে ২০২০ সালে সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব। পশ্চিমা দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা স্থগিত করবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে Normative Goal (আদর্শগত উদ্দেশ্য) নামে একটি বিষয় আছে। এই Normative Goal এর মানে হচ্ছে, নিজের অনৈতিক স্বার্থকে বিবেচনা না করে আমার ঠিক যেটা করা উচিত সেটাই করা। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডা যদি সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে তাহলে তারা বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে কিন্তু সৌদি আরব তাদের থেকে অস্ত্র ক্রয় করার পর সেই অস্ত্র ব্যবহার করেই হুতি বিদ্রোহী দমনের নামে হাজার হাজার নিরীহ ইয়েমেনিকে হত্যা করছে। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই Normative Approach অনুযায়ী কানাডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজেদের স্বার্থের কথা ভুলে ইয়েমেনের মানবিক অবস্থা বিবেচনা করে সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা। কিন্তু এসব নরমেটিভ এপ্রোচ বা মানবিক দিক বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডার কোনো মেটেরিয়াল লাভ হচ্ছে না। তাই তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে পুনরায় রিয়াদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ইয়েমেনে যা হবার হোক, অথবা সৌদি সরকার আমাদের থেকে অস্ত্র নিয়ে যা করার করুক বরং আমরা তো অস্ত্র বিক্রি করে লাভবান হচ্ছি।
দারিদ্রপীড়িত দেশ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব যখন বর্বর সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে রিয়াদ সরকারকে তখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এসব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সৌদি আরব। ইয়েমেনের মানবিক দিক বিবেচনা না করে এবং সাধারণ ইয়েমেনিদের জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে শুধু নিজেদের আর্থিক লাভের জন্য সৌদি আরবের কাছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় অস্ত্র বিক্রি করার যে সিদ্ধান্ত সেটাই Realism বা বাস্তববাদ। এই বাস্তববাদের মূল কথা হচ্ছে অন্য একটি রাষ্ট্র ধ্বংস হোক কিংবা ক্ষতির মুখে পড়ুক তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই যদি আমি সেখান থেকে লাভবান হই। এখন আমরা Realism এর ছয়টি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি জানার চেষ্টা করব।
1. Relative Gain (নিজের স্বার্থ): যে করেই হোক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের মেটেরিয়ালিস্টিক লাভ। যে কাজটি করলে একটি রাষ্ট্র নিজে লাভবান হতে পারবে ঠিক সেই কাজটিই করবে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব দেখা হয় না। ধরুন একটি পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লাভ; কিন্তু সেই নীতিটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল ক্ষতি বয়ে আনবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে না। অর্থাৎ নিজের লাভ হলেই হলো। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটিকে বলা "Relative Gain" বা নিজের স্বার্থ। এটি বাস্তববাদ এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
2. Zero-Sum Game: দুই টাকার মধ্যে আপনি যদি এক টাকা নিয়ে নেন তাহলে আমি মাত্র এক টাকা পাচ্ছি আর এক টাকা হারাচ্ছি। তাই সম্পূর্ণ টাকাটি আমার প্রয়োজন। মূল কথা হচ্ছে একজন নিয়ে নিলে আরেকজন পাবে না। একুশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রগুলো এই "Zero-Sum Game" এ বিশ্বাস করে। এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র জানতো ইরাক বা লিবিয়ায় যুদ্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হবে কিন্তু ইরাক ও লিবিয়া দুটি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজের লাভের কথা বিবেচনা করে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল। রিয়ালিস্টরা মনে করে অন্যের কী ক্ষতি হবে সেটি বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই। নিজের স্বার্থ আগে। স্বার্থের কথা ভেবে রাষ্ট্রগুলো কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে চায় না। সহযোগিতা না করার এই মনোভাবকে টার্ম হিসেবে 'Symbiotic Relation' বলে।
3. Anarchy (নৈরাজ্য): এটি বাস্তববাদ এর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যখন একটি রাষ্ট্রে কোনো সরকার না থাকে তখন দেখা যায় রাষ্ট্রে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। সরকার না থাকলে রাষ্ট্রের আইনকানুন থাকে না। কেউ কারো কথা শুনে না। সবাই সবার মতো চলে। সরকারবিহীন একটি রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। আর এটাকেই বলা হয় Anarchism বা নৈরাজ্যবাদ। যখন একটি দেশে সরকার থাকে তখন সেই সরকার আইন তৈরি করে, সরকার সেই আইন মানতে জনগণকে বাধ্য করে, কেউ আইন অমান্য করলে সরকার তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটি সরকার বা কেন্দ্রীয় শক্তি থাকা প্রয়োজন। ঠিক সেভাবে আমরা যদি বিশ্বের ১৯৫টি দেশকে একসাথে নিয়ে শুধু একটি দেশ হিসেবে কল্পনা করি তখন দেখা যায় এই ১৯৫টি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো একটি কেন্দ্রীয় শক্তি নেই। বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে জাতিসংঘ নিজেই একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের কথা এখন আর কোনো রাষ্ট্র তেমন মেনে চলে না। সেখানে পরাশক্তিগুলোর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই অভিভাবকহীন বর্তমান বিশ্বটিকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় নৈরাজ্যবাদ বা Anarchism হিসেবে চিহ্নিত করি।
4. The Anarchical Society: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর হেডলি বুল এর 'The Anarchical Society' নামে একটি বিখ্যাত বই আছে। সেখানে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় দ্বন্দ্ব ভুলে একত্রিত হওয়ার "কমন গ্রাউন্ড" খুঁজে পাচ্ছে না। ফলস্বরূপ বিশ্ব একটি নৈরাজ্যকর সমাজে পরিণত হয়েছে। এককথায়, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে এই Anarchism বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে সেই রাষ্ট্রকে তার অপরাধের জন্য শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জন্য কিংবা সেই অপরাধ থেকে রাষ্ট্রটিকে বিরত রাখার জন্য কোনো কার্যকরী আন্তর্জাতিক সংস্থা বা অভিভাবক নেই। রিয়ালিজমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই Anarchism এর কারণেই চীন জাতিসংঘের কথা অবাধ্য করে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অংশগ্রহণই করেনি, এই Anarchism এর কারণেই যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানে আক্রমণ করতে সফল হয়েছে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রশ্ন তুলতে পারেনি যে, কেন আপনি শুধু শুধু ইরাকে আক্রমণ করলেন? এই Anarchism এর কারণেই চীনের সহায়তায় মিয়ানমারের সেনারা রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার থেকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই Anarchism এর কারণেই ইয়েমেনে সৌদি তার বোমা হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
5. State-centrism: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে, রাষ্ট্রের আর্থিক উন্নতির স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থে একটি রাষ্ট্রকে যা যা করা প্রয়োজন সে সব করতে প্রস্তুত। এটি হোক নৈতিক কিংবা অনৈতিক। তাই বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্র সব সময় তার নিজের স্বার্থের (rational self-interest) কথা বিবেচনা করবে এবং রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেবে। হ্যান্স জে মরগেনথাউ-এর ভাষায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি হলো ক্ষমতার লড়াইয়ের রাজনীতি ("International politics, like all politics is a struggle for power")。
6. Self-help system: রিয়ালিজম এর প্রবক্তারা বলছেন, নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব (Survival) টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য কোনো রাষ্ট্র আমাকে সাহায্য করবে তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তাই নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য রিয়ালিস্টরা তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করে। প্রথমত, Coercion: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় যদি অন্য রাষ্ট্রের সাথে জোরজবরদস্তি এবং সামরিক আগ্রাসন কিংবা মিলিটারিও মোতায়েন করতে হয় সেটি করতে রাষ্ট্র সদা প্রস্তুত থাকবে। এজন্যই সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি মিলিটারি ঘাঁটি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, Hard Power: এমনকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নিজের স্বার্থ রক্ষায় যদি অন্য রাষ্ট্রে পারমাণবিক বোমা হামলা, ড্রোন হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করতে হয় তাহলে রাষ্ট্র সেটিই করবে। তৃতীয়ত, Cost Benefit Calculations: কোনো একটি বিবদমান ইস্যুতে জড়িত হওয়ার পূর্বে রাষ্ট্রকে এটিও মাথায় রাখতে হবে যে, সেখানে তার কতটুকু লাভ হবে এবং কতটুকু ক্ষতি হবে। আশাকরি বাস্তববাদ কী সেটি এখন পরিষ্কার।
Classical Realism
এটি বাস্তববাদের আদি ধারণা। মূলত থুসিডাইডিস, ম্যাকিয়াভেলি, হবসের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বাস্তববাদকে প্রথম সামনে নিয়ে আসেন। তাদের মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই স্বার্থপর (Selfish)। এমনকি যে মানুষগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকে তারাও আক্রমণাত্মক (Aggressive)। মানুষের এই স্বার্থপরতা ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পৃথিবী এত অস্থিতিশীল। রাষ্ট্রনেতারা তাদের রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি করতে এবং অন্য রাষ্ট্রকে দখল করতে সদা তৎপর থাকে। তাই তাদের মতে, মানুষের এই স্বভাবের কারণেই রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ হয় (inter-state conflict)। দ্বিতীয়ত, ক্লাসিক্যাল রিয়ালিস্টদের মতে, সম্পূর্ণ বিশ্বকে আমরা যদি একটি খেলার মাঠ হিসেবে কল্পনা করি, তাহলে এখানে মূল খেলোয়াড় হচ্ছে রাষ্ট্রগুলো (States)। তাদের দাবি বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংস্থা ও মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন ইত্যাদি অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক মুখ্য ভূমিকা পালন করে না বরং রাষ্ট্রই এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
Neo-realism (নব্য বাস্তববাদ)
এটি মূলত ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজমের বিপরীত। নব্য বাস্তববাদকে অনেকে 'Structural Realism' ও বলে থাকে। পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে ১৯৭০ এর দিকে নব্য বাস্তববাদের ধারণাটি অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটির মূল কথা হচ্ছে, মানুষ স্বার্থপর এবং আক্রমণাত্মক হবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষ স্বার্থপর এবং আক্রমণাত্মক হলেই যে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ হবে এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নব্য বাস্তববাদীদের মতে, মূল সমস্যাটি রাষ্ট্রে নয় বরং সমস্যাটি হচ্ছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সিস্টেমে বা স্ট্রাকচারে। কারণ বৈশ্বিক রাজনৈতিক সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো একক শক্তি নেই। বিশ্বব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে বিশ্বব্যবস্থা তার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রগুলো তার আগ্রাসী মনোভাবকে কাজে লাগাতে পারছে। তথা সমস্যাটি রাষ্ট্রের নয় বরং সমস্যাটি হচ্ছে বিশ্বব্যবস্থায়। যদি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকত তাহলে রাষ্ট্রগুলো তাদের আগ্রাসী মনোভাব চলমান রাখতে পারত না। "Politics Among Nations” বইয়ের লেখক হ্যান্স মর্গেনথাউ-এর মতে, রাষ্ট্রগুলোর মনোভাব স্বভাবগত ভাবেই স্বার্থপর ও আক্রমণাত্মক। তাই রাষ্ট্রগুলোর এই মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় শক্তি থাকা প্রয়োজন।
Offensive realism (আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ)
যুক্তরাষ্ট্র এই মতবাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই মতবাদের মূল কথা হচ্ছে, যেহেতু বিশ্বের সবগুলো দেশের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো অভিভাবক নেই তাই রাষ্ট্রগুলো দিন দিন আগ্রাসী হয়ে উঠছে। বিশ্বে একটি নৈরাজ্যময় (anarchical) পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই নৈরাজ্যময় পরিস্থিতিতে একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ চালায়। এতে করে নতুন আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এখানে একটি ‘Security Dilemma' তৈরি হয়। নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে যখন অন্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করা হয় তখন আক্রমণের শিকার রাষ্ট্রটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। উদাহরণস্বরূপ: মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করল তালেবানদের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপদ নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে আফগানিস্তানে আক্রমণ চালানো হলো। এখন আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষিত হলো ঠিকই; কিন্তু আফগান জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো। আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ হচ্ছে এমন একটি ধারণা যেখানে একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে আরেকটি রাষ্ট্র নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
Defensive realism (প্রতিরোধমূলক বাস্তববাদ)
বর্তমান বিশ্বের ইরান ও উত্তর কোরিয়া এই মতবাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি অফেন্সিভ রিয়ালিজমের বিপরীত। প্রতিরোধমূলক বাস্তববাদীরাও মনে করে বিশ্ব আসলে নৈরাজ্যময়। তাই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যে-কোনো সময় আমাকে আক্রমণ করতে পারে। তাই সেই আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য আমার সর্বদা প্রস্তুত থাকা উচিত। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে একটি রাষ্ট্র যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেসকল পদক্ষেপের সমষ্টিই প্রতিরোধমূলক বাস্তববাদ বা ডিফেন্সিভ রিয়ালিজমের উদাহরণ। ডিফেন্সিভ রিয়ালিজমে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলোর মানসিকতা এমন যে, "কেউ যদি আমাকে আক্রমণ করে তাহলে তাকে জবাব দেওয়ার জন্য আমাকে পূর্ব থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে”। উদাহরণস্বরূপ- ইরান ও উত্তর কোরিয়া মনে করছে যে, পারমাণবিক অস্ত্রের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে-কোনো সময় তাদের উপর আক্রমণ চালাতে পারে। তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রগুলো তাদের মিলিটারির সংখ্যা বৃদ্ধি করছে, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং নিউক্লিয়ার অস্ত্রে সমৃদ্ধ হচ্ছে। ডিফেন্সিভ রিয়ালিজমের সমস্যাটি হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঠিক কতটুকু শক্তিমত্তা অর্জন করতে হবে তার কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। অর্থাৎ ইরান মোট কত সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে ইরানের নিরাপত্তা রক্ষিত হবে সেটি ইরানও জানে না।
Liberalism (উদারতাবাদ)
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে যে সকল থিওরি ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে Liberalism বা উদারতাবাদ অন্যতম। লিবারেলিজমকে 'Liberal Internationalism'ও বলা হয়। Liberalism হচ্ছে Realism এর সম্পূর্ণ বিপরীত। পাঁচটি মূল বৈশিষ্ট্যের আলোকে সম্পূর্ণ লিবারেলিজমের বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। প্রথমেই বলে নেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই লিবারেলিজমকে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এখানে আমরা আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে লিবারেলিজমকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Rejection of Power Politics: যারা লিবারালিজম এ বিশ্বাসী তারা মনে করে, আন্তর্জাতিক কোনো একটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করার লক্ষ্যে একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে বা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সবার জন্যই ক্ষতিকর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু নিজের স্বার্থ অর্জনের জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে রাষ্ট্রগুলোর উচিত একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
2. Absolute Gains: রিয়েলিজমে আমরা দেখেছিলাম, রাষ্ট্র শুধু তার নিজের লাভের কথা চিন্তা করে এবং যে কাজটি করলে একটি রাষ্ট্র নিজে লাভবান হতে পারবে ঠিক সেই কাজটিই করে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব দেখা হয় না। যেটিকে রিয়ালিজমের ভাষায় 'Relative Gain' বলা হয়। কিন্তু লিবারেলিজম বলছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি রাষ্ট্র শুধু তার নিজের লাভের কথা বিবেচনা করবে না বরং অন্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের কথাও বিবেচনা করবে। দুটি রাষ্ট্র যেন সমানভাবে উপকৃত হয় এবং সবার স্বার্থই (Mutual benefits) যেন রক্ষিত হয় সেটার উপরেই লিবারেলিজম গুরুত্বারোপ করে। একটি রাষ্ট্র লাভবান হবে, আর একটি রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটি লিবারেলিজম চায় না। লিবারেলিজমের ভাষায় এটাকে বলা হচ্ছে Absolute Gains বা সবার সমপরিমাণ লাভ।
3. Win-Win Game/Non-Zero-Sum Game: রিয়েলিজম Zero-Sum Game এ বিশ্বাসী কিন্তু অপরদিকে লিবারেলিজম Win-Win Game এ বিশ্বাসী। রিয়েলিজমের বৈশিষ্ট্য এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। কিন্তু লিবারেলিজম বলছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না কিংবা একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়। যেমন- ইরাক যুদ্ধে আমেরিকা জয়ী হলেও আমেরিকার অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, আমেরিকা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক আমেরিকান সেনা ইরাক যুদ্ধে মারা গিয়েছে, অনেকে আবার যুদ্ধে আহত হয়েছে। তৃতীয়ত, আমেরিকার যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বিঘ্নিত হয়েছে। তাই উদারতাবাদে বিশ্বাসীরা বলছেন দুটি রাষ্ট্র যখন দ্বন্দ্বে বা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে (Cooperation), একে অপরের সাথে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে (Free Trade), একে অপরের সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য আদান প্রদান করবে তখন উভয় রাষ্ট্রই সমানভাবে লাভবান হবে। আর সমানভাবে এই লাভবান হওয়ার ধারণাটিকেই বলা হয় "Win Win Game"。
4. International Cooperation: বর্তমান পৃথিবীতে যতগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং রিজিওনাল অর্গানাইজেশন রয়েছে সবগুলোই লিবারেলিজমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো একে অপরের স্বার্থকে বিবেচনা করে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মুক্তবাণিজ্য হয়, নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য একে অপরের সাথে আদান-প্রদান করে। শুধু নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করে ইউনিয়নভুক্ত সবগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ 'Collective Security' কে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
5. Regime Theory: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে যারা রিয়ালিস্ট বা বাস্তববাদী তাদের মতে বিশ্বব্যবস্থা হচ্ছে নৈরাজ্যময়। বাস্তববাদীদের মতে, যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু Regime Theory এর বিপরীত। এটি মূলত লিবারেলিজমের একটি অংশ। 'Regimes' দ্বারা মূলত বোঝায় Principles বা নিয়মনীতি। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে সবাই সমানভাবে লাভবান হওয়া যায়। একটি রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রেখে পারস্পরিক উন্নয়ন সম্ভব। এই থিওরি মতে বিশ্বব্যবস্থা নৈরাজ্যকর হলেও নিয়মনীতির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। রেজিম থিওরিস্টদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোও রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। তাই লিবারেলিজম আঞ্চলিক সংস্থা (যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নাফটা, সার্ক) এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (যেমন- জাতিসংঘ, বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ) ইত্যাদির উপরও জোর দেয়।
Neoliberalism (নব্য উদারতাবাদ)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নব্য উদারতাবাদ ধারণাটি বিস্তার লাভ করে ১৯৯০ এর দশকে। রবার্ট কিয়োহেন এবং জোসেফ নাই এটিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। নব্য উদারতাবাদ মূলত উদারতাবাদের একটি সংশোধিত রূপ। ইকোনমিতে 'autarky system' নামে একটি টার্ম রয়েছে। এর মানে হচ্ছে, নিজ দেশের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যদ্রব্য অন্য রাষ্ট্রের কোনোরূপ সহযোগিতা ছাড়াই নিজেই উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়া। যেহেতু প্রয়োজনীয় সকল কিছুই নিজ রাষ্ট্রে উৎপাদন করা সম্ভব তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ (self-sufficient) রাষ্ট্রকে বলা হয় আটার্কি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আজকের একুশ শতকে এসেরকম কি কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র আছে? এমন কোনো রাষ্ট্র কি আছে যার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নেই? নব্য উদারতাবাদীদের মতে, বর্তমান দুনিয়ায় এরকম স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো দেশের সাথে বাণিজ্য করতে হয়। মূল কথা হচ্ছে একটি রাষ্ট্র কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। যেহেতু রাষ্ট্রগুলো একটি আরেকটির উপর নির্ভরশীল তাই রাষ্ট্রগুলোর উচিত পরস্পরেকে সহযোগিতা করা এবং বাণিজ্যিক বাঁধাগুলো দূর করা। রাষ্ট্রগুলো যখন একে অপরের সাথে বাণিজ্যে লিপ্ত হবে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। আর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব হ্রাস পাবে এবং দ্বন্দ্ব নিরসন হবে। এভাবে নব্য উদারতাবাদ সর্বদা নব্য বাস্তববাদকে চ্যালেঞ্জ করে।
নব্য উদারতাবাদের দ্বিতীয় আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আরোপ থেকে বিরত থাকা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি শিথিল করা। বাণিজ্য উদারীকরণের জন্য রাষ্ট্রের উচিত আঞ্চলিক সংস্থা (সার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নাফটা ইত্যাদি) এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি) এর উপরে গুরুত্বারোপ করা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শুধু রাষ্ট্রই নয় বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন, সংস্থা ইত্যাদিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে নানাভাবে সহযোগিতা করে। যেমন- বিশ্বব্যাংক দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা রাষ্ট্রগুলোর বাণিজ্য মনিটরিং করে এবং বিভিন্ন রুলস রেগুলেশন তৈরির মাধ্যমে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসা করে। এজন্য অনেক স্কলার নব্য উদারতাবাদকে 'liberal institutionalism' হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন।
Constructivism (গঠনবাদ)
"International politics is shaped by persuasive ideas, collective values, culture, and social identities" - Emanuel Adler
Constructivism হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত এমন একটি তত্ত্ব যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯০) পর অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে একটি ডিসকোর্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই থিওরি মতে, একটি রাষ্ট্র অপর আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে। একই সাথে এই চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই দুটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান সম্পর্কটি কেমন সেটিও বিশ্লেষণ করা যায় এবং দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হতে পারে সেটিও অনুমান করা যায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে সেই চারটি বিষয় আসলে কী?
১. Historical Relationship: যে রাষ্ট্রটির সাথে আমি কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলব ওই রাষ্ট্রটির সাথে অতীতে আমার কীরকম সম্পর্ক ছিল সেটি বিবেচনা করা।
২. Identities: যে রাষ্ট্রটির সাথে আমি কূটনৈতিক সম্পর্ক গঠন করতে যাচ্ছি তার সাথে আমার মতাদর্শগত মিল অথবা একরূপতা আছে কি না।
৩. Interests: রাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে সেই রাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থের মিল আছে কি না।
৪. State's behaviour: একটি দেশের আচরণের উপর নির্ভর করে অন্য দেশের সাথে তার সম্পর্ক কেমন হবে।
এখন আমরা কিছু প্রায়োগিক উদাহরণের মাধ্যমে এই চারটি বিষয়ের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Historical Relationship: ঐতিহাসিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে দুটি রাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কটি খুবই সহজে বিশ্লেষণ করা যায় এবং একই সাথে দুটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে সেটিরও একটি ভবিষ্যৎ বাণী দেওয়া যায়। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এই দুটি দেশ ইরাক যুদ্ধে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে, লিবিয়া যুদ্ধে এবং আফগানিস্তানেও একসাথে লড়াই করেছে। অতীতের বিভিন্ন যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার সেনারা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া তার অনেক সৈন্যকে হারিয়েছে। তাই অতীতে যেহেতু এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল সেজন্য বর্তমানেও এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ভালো। পাশাপাশি সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতেও অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আরেকটি উদাহরণ দেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজকের একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার খারাপ সম্পর্ক যাচ্ছে। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৫ বছর এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। Constructivism থিওরি মতে, যেহেতু দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে অতীতকালে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক ছিল তাই বর্তমানেও রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি শত্রুভাবাপন্ন এবং ভবিষ্যতেও দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক বিরাজ করাই স্বাভাবিক। Constructivism এর আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ ও শত্রুভাবাপন্ন। তাই এই থিওরি মতে, ভবিষ্যতেও ভারত-পাকিস্তান উভয়ের মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করবে। মূল বিষয়বস্তু এক লাইনে বললে এরকম দাঁড়ায়- 'History defines international structure'l
2. Identities: দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে Identities বা একরূপতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন সাদৃশ্যতা পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনের একটি অন্যতম নিয়ামক। এই সাদৃশ্যতা হতে পারে ধর্মগত, ভাষাগত, কিংবা মতাদর্শগত। যারা Constructivism এ বিশ্বাসী তারা মনে করছেন, যদি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে উপরিউক্ত বিষয়গুলোর মিল থাকে তাহলে সেই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবেই একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেমন- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো একে অপরের বন্ধু। কারণ এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাষাগত মিল। সবগুলো দেশেরই ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। দ্বিতীয়ত, সবগুলো রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে আদর্শগত মিল। এই রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক মতাদর্শ হচ্ছে গণতন্ত্র। তাই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বভাবগতভাবেই একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকবে। বর্তমান বিশ্বে পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান, কাতার, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন এসব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ধর্মগত মিল থাকার কারণে একটি ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। অর্থাৎ- 'Identity defines international structure'l
3. Ideas and Interests: রিয়ালিজম ও লিবারেলিজম এ আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেমন হবে সেটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর এবং সেখানে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়। কিন্তু যারা কনস্ট্রাকটিভিস্ট তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে 'Key factor' রাষ্ট্র নয় বরং রাষ্ট্রের জনগণই হচ্ছে মূল বিষয়। একটি দেশের জনগণের আর্থসামাজিক কাঠামো এবং জনগণের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কটি মূলত Socially constructed বা সামাজিকভাবে নির্মিত। কয়েকটি উদাহরণ দিলে আশাকরি বিষয়টি আরও সহজ মনে হবে। প্রথমত, বর্তমানে সমাজে বসবাসকারী মানুষ কখনোই চায় না তার রাষ্ট্রটি অপর আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হোক। আর সেজন্যেই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিরোধী মনোভাব দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। এটিকেই বলা হচ্ছে “Norms against war"। তাই কনস্ট্রাকটিভিস্টরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব রাষ্ট্র থেকে নয় বরং রাষ্ট্রের জনগণ থেকে আসছে। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্ট্রাকচার বা প্যাটার্ন গঠিত হচ্ছে জনগণের আইডিয়া কিংবা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে। দ্বিতীয়ত, সমাজের মানুষ বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতি বিরোধী মনোভাব পোষণ করে, সেজন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রকে ট্যাবু হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জনগণের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিরোধী এই মনোভাবটি "Nuclear Taboo" হিসেবে পরিচিত। তৃতীয়ত, সমাজের মানুষ চায় না তার রাষ্ট্রটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর সামরিকভাবে আগ্রাসন চালিয়ে ঐ রাষ্ট্রটির সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করুক। তাই এখন বিশ্বজুড়ে "সার্বভৌমত্ব রক্ষা” একটি Norm বা আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেটিকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে "Norms of sovereignty"। কনস্ট্রাকটিভিজমের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি এক লাইনে বললে- 'People defines international structure'l
4. State's behaviour: একটি রাষ্ট্রের সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হবে নাকি শত্রুভাবাপন্ন হবে সেটি নির্ভর করে ওই রাষ্ট্রের আচরণের উপর। ধরুন একটি রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে এবং সামরিক দিক থেকেও শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই রাষ্ট্রটি আমাকে কখনো হুমকি দিচ্ছে না। এমনকি সেই রাষ্ট্রটি আমার সাথে ভালো আচরণ করছে। তাই রাষ্ট্রটি পারমাণবিক শক্তিধর হলেও আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন উত্তর কোরিয়া। চীন এবং ইরানের সাথে উত্তর কোরিয়া কৌশলগত স্বার্থে সবসময় ভালো ব্যবহার করে। তাই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া ইরান ও চীনের নিরাপত্তার জন্য থ্রেট না। কিন্তু উত্তর কোরিয়া সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছে। রকেট ম্যান হিসেবে পরিচিত কিম জং উন বলছে যে, পিয়ংইয়ং থেকে ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলা করার মতো সক্ষমতা উত্তর কোরিয়ার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোরিয়া কখনো ভালো আচরণ করে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উত্তর কোরিয়া হুমকিস্বরূপ। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে সেটি রাষ্ট্রের আচরণের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
Democratic Peace Theory (গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব)
সবার মনেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেন সারা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়? এটির আদর্শিক ভিত্তিটা আসলে কোথা থেকে আসলো? আমি মনে করি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে সবার মনেই এই প্রশ্নটি জাগা উচিত। কেন যুক্তরাষ্ট্র গোটা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, এটার আদর্শিক (Normative) ভিত্তি মূলত এসেছে জার্মান ফিলোসোফার ইমানুয়েল কান্ট থেকে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তার "Perpetual Peace" নামক গ্রন্থে Democratic Peace Theory নামে একটি আইডিয়া দেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কান্টের এই থিওরিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অন্যতম ডিসকোর্সে পরিণত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন থেকে শুরু করে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা এবং বাইডেন-সহ অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই থিওরির উপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার পর্যন্ত এই থিওরির সমর্থক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই তত্ত্বের মূল কথা আসলে কী এবং কেন এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এত প্রভাবশালী?
Democratic Peace Theory এর মূল বক্তব্য হলো সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা যত বেশি বৃদ্ধি পাবে বিশ্বে ততই শান্তি বিরাজ করবে। এই থিওরি অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অন্য আরেকটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়ায় না। তবে এই থিওরি অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অন্য একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে খুব সহজে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা তেমন নেই। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিন্তু উত্তর কোরিয়া বা চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কিংবা উত্তর কোরিয়ার দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, সংঘাত আবশ্যক। সহজে বুঝতে কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি।
উদাহরণ (০১): War
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতি চার বছর কিংবা প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়। রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হতে হলে অধিকাংশ জনগণের ভোট পেয়ে জয়ী হতে হয়। তাই নির্বাচনে জয়ী হতে তাদের প্রয়োজন জনগণের সমর্থন। একটি রাষ্ট্রের প্রায় সকল জনগণই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াকে সমর্থন করে না। যেহেতু জনগণ যুদ্ধ চায় না সেহেতু রাষ্ট্রনেতারাও জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কেননা যুদ্ধে জড়িয়ে রাষ্ট্রনেতারা জনগণের সমর্থন হারাতে চায় না। একারণে Democracy Peace Theory বলছে যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যুদ্ধে কম জড়ায়। আর যুদ্ধে না জড়ানোর কারণে দেশে শান্তি বিরাজ করে। অপরপক্ষে একটি অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতারা কখনো জনগণের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেয় না। কেননা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে কোনো নির্বাচন হয় না, তাই তাদের জনগণের সমর্থন প্রয়োজন হয় না।
উদাহরণ (০২): War Cost
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। গণতান্ত্রিক সরকার দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ইত্যাদির উন্নয়ন ঘটাতে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেননা নির্বাচনি প্রচারণায় তাদেরকে ম্যান্ডেট দিতে হয় যে, আমাকে নির্বাচিত করলে আমি ক্ষমতায় গিয়ে সবার চাকরির ব্যবস্থা করব, রাস্তাঘাট তৈরি করে দিব, উন্নত চিকিৎসা দিব, দারিদ্র্যের অবসান ঘটাব ইত্যাদি। কিন্তু সরকার যখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তখন সেই যুদ্ধের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। যুদ্ধের পেছনে অধিক টাকা ব্যয় করার ফলে সরকার দেশের শিক্ষা কিংবা অবকাঠামো খাতে বেশি ব্যয় করতে পারে না। তাই Democratic Peace Theory অনুযায়ী সরকার এই দায়বদ্ধতা থেকেই যুদ্ধের পেছনে টাকা খরচ করার পরিবর্তে দেশের উন্নয়নের পেছনে ব্যয় করে। যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি ইউরোপের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে। সেখানকার পার্লামেন্ট গুলোতে সামরিক বাজেট হ্রাস করার উপর নানা পলিসি গৃহীত হচ্ছে। সেখানে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উপর জোর দিতে সরকারের উপর সিভিল সোসাইটির প্রেশার ত্বরান্বিত হচ্ছে। তাই Democratic Peace Theory বলছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে আর যুদ্ধে জড়ায় না।
উদাহরণ (০৩): Economic Interdependence
একটি রাষ্ট্রকে তার প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য অন্য আরেকটি রাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয় এবং নিজ দেশের অতিরিক্ত সম্পদ অন্য রাষ্ট্রের কাছে রপ্তানি করতে হয়। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই Democratic Peace Theory বলছে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়ায় না। কেননা যুদ্ধে জড়ালে সেই রাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিও করতে পারবে না এবং নিজ দেশের অতিরিক্ত সম্পদ ঐদেশে রপ্তানিও করতে পারবে না। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
Economic Peace Theory/ Commercial Liberalism Theory
অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব হলো "International Political Economy" বিশ্লেষণ করতে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি তত্ত্ব। অর্থনৈতিকভাবে যখন দুটি রাষ্ট্র একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয় তখন ঐ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কটি ভালো হয়, দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যায়। যেমন- স্পেন রাষ্ট্রটি ফ্রান্সের কয়লার উপর নির্ভরশীল। একই ভাবে ফ্রান্সও স্পেনের স্টিলের উপর নির্ভরশীল। ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে এই অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। দুটি রাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কথা বিবেচনা করে কখনো যুদ্ধে জড়াতে পারে না। এটিই হচ্ছে Economic Peace Theory এর মূল কথা। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলো একে অপরের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে তাদের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা রাষ্ট্রগুলোকে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান (Peaceful Coexistence) বিরাজ করে। এই ইকোনমিক পিস থিওরিকে আবার অনেকে Capitalist Peace Theory হিসেবেও আখ্যায়িত করে। অনেক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এটিকে আবার The Capitalist Peace কিংবা Commercial Peace কিংবা Economic Peace ইত্যাদি নামেও আখ্যায়িত করেছেন।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদরা এই ইকোনমিক পিস থিওরির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন; এক. Promoting peace, দুই. Preventing conflict। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে এই “ইকোনমিক পিস থিওরি" কিংবা "অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব' কিভাবে সম্পর্কিত সেটি তিনটি প্রায়োগিক উদাহরণ এর মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
1. Export: পৃথিবীর কোনো দেশই অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। একটি দেশ তার জনগণের প্রয়োজনীয় যেসব পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করতে অক্ষম এবং যেসব দ্রব্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে, সেসব পণ্যের জন্য তাকে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবার যে সকল পণ্যদ্রব্য নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত (Surplus) হিসেবে থাকে বা অতিরিক্ত থাকে সেগুলোকে অন্য দেশে রপ্তানি করতে হয়। অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব অনুসারে এই আমদানি ও রপ্তানির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলে। অর্থনৈতিক এই আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণেই রাষ্ট্রগুলো দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধকে এড়িয়ে চলে। যেমন- বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানি করা হয়। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যদি বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো কারণে তিক্ত হয়ে উঠে তাহলে বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাজার সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। ইকোনমিক পিস থিওরি বলছে, তাই বাংলাদেশ সরকার সবসময়ই চেষ্টা করবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে।
2. Import: বাংলাদেশ তার আমদানির সবচেয়ে বড় অংশটি করে চীন ও ভারত থেকে। চীন থেকে আমদানি করে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, গম, মিলিটারি প্রযুক্তি ইত্যাদি। অন্যদিকে পেঁয়াজ, দুগ্ধজাত খাবার, চিনি, তেল, কোমল পানীয় ইত্যাদি আমদানি করে ভারত থেকে। তাই বাংলাদেশ চীন ও ভারত উভয়ের সাথেই ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সুগন্ধি চাল এবং মসলা আমদানি করে ইন্দোনেশিয়া থেকে। গম, চিনি, মাংস এবং নানা ধরনের শুকনো ফল আমদানি করে ব্রাজিল থেকে। তাই ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার সাথেও আমাদের সম্পর্ক ভালো। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কয়লা রপ্তানি করে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার এই কয়লার সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ভারত। তাই অস্ট্রেলিয়া সমসময় চেষ্টা করে ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে।
3. Remittance: ইকোনমিক পিস থিওরির অন্যতম আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে রেমিট্যান্স। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের কথাই বলা যায়। অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্য-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আসে এই প্রবাসীদের আয়কৃত রেমিট্যান্স থেকে। অপ্রিয় হলেও এটি সত্যি যে, বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলে গড়ে উঠা নব্য মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী অনেকটাই রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল। পুরো রেমিট্যান্সের অধিকাংশই মোটাদাগে আসছে ১০টি দেশ থেকে। দেশগুলো হলো- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও সিঙ্গাপুর। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা রেমিট্যান্স নির্ভর তাই "Economic Peace Theory" এর মতে বাংলাদেশ উপরিউক্ত দেশগুলোর সাথে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য।
বাংলাদেশ ও অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব
বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। এই দূতাবাসগুলোরও আবার বিভিন্ন শাখা থাকে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কমার্শিয়াল উইং। এই কমার্শিয়াল উইং এর কাজ হলো বিদেশি রাষ্ট্রগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় যে-সকল পণ্যদ্রব্য বেশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর একটি প্রাথমিক তালিকা করা এবং ওইসব দেশে ব্যবহৃত এই পণ্যগুলোর মধ্যে কোনগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে সেগুলোর একটি লিস্ট করা। যখন দেখা যায় যে, অন্য দেশের যেসব পণ্য তারা ব্যবহার করছে সেগুলো বাংলাদেশেও উৎপাদিত হয়। তখন ঐ দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনীতিকরা কতিপয় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে এবং তাদেরকে এটি বোঝানোর চেষ্টা করে যে, আপনারা যেসব পণ্য অন্য দেশ থেকে নিয়ে আসছেন সেগুলো বাংলাদেশ থেকে আরও কম মূল্যে নিয়ে আসতে পারবেন। গত এক দশক ধরে ভারত এই কাজটি সুকৌশলে করছে। বহির্বিশ্বে ভারতের উৎপাদিত পণ্যগুলোর ব্যাপক বিস্তার লাভের পেছনে ঐসব দেশে অবস্থানরত ভারতের দূতাবাসের এই কমার্শিয়াল উইংগুলোর অবদান অনেক। অর্থাৎ ভারত তাদের বাজার সম্প্রসারণে ঐসব দেশের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করছে।
যে পণ্যগুলোর বহির্বিশ্বে চাহিদা রয়েছে এবং একইসাথে বাংলাদেশও ভালো উৎপাদন করতে পারে সেগুলো হচ্ছে- তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, ফুটওয়্যার, হিমায়িত মাছ, পাটের তৈরি ব্যাগ, হাতমোজা, প্লাস্টিক, এন্টিবায়োটিক, মেডিকেল ইকুইপেন্ট, ইলেকট্রনিক্স, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ফার্নিচার, সিরামিক, পেপার অ্যান্ড কার্ডবোর্ড, স্পোর্টসওয়্যার ইত্যাদি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের যেগুলোতে কমার্শিয়াল উইং রয়েছে, বর্তমানে সেই দেশগুলোতে উপরিউক্ত পণ্যগুলোর রপ্তানি সম্প্রসারণে টার্গেট রাখা উচিত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, রাশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি। তাই Economic Peace Theory আমাদেরকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের উচিত তার সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোকে উপরিউক্ত দেশগুলোর বাজারে রপ্তানি করার জন্য উল্লিখিত দেশগুলোর সাথে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলা এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা।
Dependency theory
অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। হঠাৎ করেই কোনো রাষ্ট্র আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। যেমন প্রথম স্টেজে রাষ্ট্রগুলো গরিব বা অনুন্নত থাকে। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রই একটি সময় দরিদ্র থাকে। তখন রাষ্ট্রের অর্থনীতি সম্পূর্ণ কৃষির উপর নির্ভর করে। তারপর দ্বিতীয় ধাপে রাষ্ট্রগুলো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে শিল্পায়নের যুগে প্রবেশ করে। শিল্পায়নের কারণে রাষ্ট্রগুলোতে নগরায়ণ হয়। তখন উৎপাদনের বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়। তারপর তৃতীয় ধাপে গিয়ে রাষ্ট্রগুলো আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তখন ব্যাপক মানব সম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আবিষ্কার ইত্যাদির কারণে রাষ্ট্রগুলো আধুনিকতার যুগে প্রবেশ করে।
এখন বিশ্বের মোট দেশ হচ্ছে ১৯৫টি। প্রথমত, বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার কিছু দেশ এখনো অনুন্নত ও কৃষিনির্ভর। যারা এখনো প্রথম ধাপেই আছে। দ্বিতীয়ত ভারত, ব্রাজিল, তুরস্কের মতো কিছু রাষ্ট্র উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের। যারা এখন দ্বিতীয় স্টেজে রয়েছে। তৃতীয়ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, কানাডা ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আধুনিক ও উন্নত। যারা বর্তমানে তৃতীয় স্টেজে আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপরিউক্ত যে তিনটি স্টেজ রয়েছে সেটি আমরা সবাই মোটামুটি জানি। তবে এখানে ডিপেন্ডেন্সি থিওরি দুইটি প্রশ্ন উত্থাপন করে। প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে যেসব রাষ্ট্র এখনো দারিদ্র্য তথা উন্নয়নের প্রথম স্টেজে রয়েছে তারা কেন পরবর্তী দুইটি স্টেজ পাড়ি দিতে পারছে না? এবং কেন তারা আজও অনুন্নত? দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো যারা আজ উন্নত রাষ্ট্র তারা কীভাবে সফলভাবে উন্নয়নের তিনটি স্টেজ পাড়ি দিতে সক্ষম হলো? ডিপেন্ডেন্সি থিওরির মতে, যারা আজ আধুনিক রাষ্ট্রের কাতারে তারা মূলত সমৃদ্ধিশালী হয়েছে অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর উপর নির্ভর করেই।
বর্তমান উন্নত দেশগুলোর অধিকাংশই ছিল দখলদার ও সাম্রাজ্যবাদী। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজেদের কলোনি বানিয়ে সেখান থেকে সম্পদ লুট করে তারা উন্নত হয়েছে। যারা আজ উন্নত তারা দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করার মাধ্যমে সম্পদশালী হয়েছে। কলোনিয়াল পিরিয়ডে এসব দেশ থেকে কাঁচামাল নিয়ে নিজ দেশকে উন্নত করেছে। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান ধনী রাষ্ট্রগুলো উন্নত হয়েছে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর উপর নির্ভর করেই। আর গরিব রাষ্ট্রগুলো একুশ শতকে এসেও গরিব রয়ে গিয়েছে ধনী রাষ্ট্রগুলোর উপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণেই। এখনো দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো সস্তা শ্রম রপ্তানি করছে ধনী রাষ্ট্রগুলোতে। এসব অনুন্নত দেশের শ্রমিক দিয়েই উন্নত দেশগুলোর কলকারখানা চলছে।
এই Dependency theory এর মূল বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ধনী রাষ্ট্রগুলো কৌশলে অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের উপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। এর একটি বাস্তব উদাহরণ দেই। যেমন- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে ঠিকই। কিন্তু বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি বোয়িং বিমান ক্রয় করে সব টাকা আবার যুক্তরাষ্ট্রকেই দিয়ে আসছে। কারণ একটি বিমানের দাম বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণকে মাঠে নামিয়ে দিলেও একটি বিমান তৈরি করতে পারবে না। দশ বছর সময় দিলেও পারবে না। কারণ বিমান তৈরি করার মতো দক্ষ জনশক্তি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশের কাছে নেই। তাই সারা বছরে রাষ্ট্রের কোষাগারে যা জমা হয় শুধু একটি বোয়িং বিমান ক্রয় করলেই তা শেষ হয়ে যায়। একই ভাবে চীনের সাথে সারাবছর বাণিজ্য করে বাংলাদেশ যে টাকা পাচ্ছে, শুধু একটি সাবমেরিন ক্রয় করে সেই টাকা চীনকেই দিয়ে আসতে হচ্ছে। আমি এখানে বাংলাদেশকে ছোট করে দেখছি না। আমি মূলত এটি বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো নির্ভরশীলতার কারণে সম্পদ ধরে রাখতে পারছে না। অর্থাৎ core-peripheral model এর মতো দিনশেষে টাকাগুলো ধনী রাষ্ট্রগুলোর কাছেই পুঞ্জীভূত হচ্ছে। আর এটিকেই বলা হয় Dependency trap বা নির্ভরশীলতার ফাঁদ। এই ফাঁদ থেকে রক্ষার জন্য অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর উচিত নিজেদের শক্তিমত্তার উপর জোর দেওয়া এবং যেসব পণ্য অন্য রাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয় সেই পণ্যগুলোর বিকল্প পণ্য নিজ দেশেই উৎপাদন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। পুঁজির প্রবাহ (Capital flow) যেন Peripheral থেকে Central এ চলে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় Central বা Core বলা হয় উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে, আর Peripheral বলা হয় অনুন্নত ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে।
Feminism (আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নারীবাদী তত্ত্ব)
নারীবাদ বা নারী সমানাধিকার আন্দোলন একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় সূচনা করেছে। এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে Gender বা লিঙ্গ একটি গুরুত্ব বহন করে। নারীবাদ মনে করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি দ্বারা শুধু পুরুষরাই নয় বরং নারী-পুরুষ উভয়েই সমানভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। অথচ চলমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক এবং বৈদেশিক নীতি প্রণয়নেও নারীদের কম গুরুত্বারোপ করা হয়। নারীবাদীদের কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে।
1. Liberal feminism (উদার নারীবাদ): লিবারেল ফেমিনিস্টদের মতে, বিশ্বে নারী-পুরুষের সমানাধিকার থাকতে হবে। নারীদেরকে আলাদাভাবে না দেখে মানুষ হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন- চাকরিজীবী পুরুষরা কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করার পরপর বাসায় এসে বিশ্রাম করে। কিন্তু চাকরিজীবী নারীদের একসাথে দুইটি দায়িত্ব পালন করতে হয়। কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করার পর বাসায় এসে আবার সকল ঘরোয়া কাজ করতে হয় এবং সন্তান লালন-পালনের কাজও করতে হয়। নারীবাদীরা এটিকে টার্ম হিসেবে The second shift বা Double burden হিসেবে আখ্যায়িত করে। লিবারেল ফেমিনিস্টরা এই সেকেন্ড শিফট এর ঘোর বিরোধী। তাদের মতে ঘরোয়া কাজ এবং সন্তান লালন-পালন শুধু নারীরা নয় পুরুষদেরও করতে হবে। একই ভাবে লিবারেল ফেমিনিস্টরা নারীর ভোটাধিকার (suffrage), শিক্ষার অধিকার, সমান বেতন পাওয়ার অধিকার (equal pay), গর্ভপাত অধিকার (abortion rights) ইত্যাদির প্রতি বেশি সচেতন।
2. Radical feminism: রেডিক্যাল ফেমিনিস্টদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাটি অনেক পুরুষতান্ত্রিক (male dominated hierarchy)। তাদের কনসার্ন হচ্ছে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকে মিলিটারিরা। কিন্তু সেনাবাহিনীতে নারীদের প্রতিনিধি অনেক কম। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। রেডিক্যাল ফেমিনিস্টরা মূলত পুরুষতান্ত্রিকতা বা patriarchal society নিয়ে বেশি সরব।
3. Socialist and Marxist feminism: মার্কসবাদীদের মতে সমাজে নারীদের সকল সমস্যার মূলে রয়েছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সিস্টেমে নারীরা সবচেয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারীদের ঘরোয়া কাজ (domestic work) করতে বাধ্য করার কারণে তারা চাকরি করতে পারছে না। যে-কারণে নারীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে পারছে না। কর্মক্ষেত্রে নারীদের কম মজুরি প্রদানের কারণে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজিবাদী এই বিশ্বে পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীদেরকে বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
4. Cultural feminism: এটি মূলত রেডিক্যাল ফেমিনিজমের একটি শাখা। রেডিক্যাল ফেমিনিজম মনে করে, নারীদের উপর পুরুষদের কর্তৃত্ব করার যে মনোভাব সেটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক। নারীদের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন জরুরি। তারা বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে এভাবে চরিত্রায়ন করে যে, সমাজ মনে করে নারীরা প্রকৃতিগতভাবে অধীনস্থ। তাই নারীদের উপর পুরুষদের কর্তৃত্ব করার অধিকার রয়েছে। যা নারীদেরকে একটি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার দিকে ধাবিত করে। তারা মনে করে এই সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু শারীরিক পার্থক্যের কারণে নারীদের প্রতি ভিন্ন মনোভাব পোষণ করার পরিবর্তে সমাজে নারীকে সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তাদের মতে- 'Society needs a female essence'l
5. Eco feminism: পুরুষের ধ্বংসাত্মক কার্যাবলীর কারণে নারীদের উপর পরিবেশগত যে প্রভাব পড়ে সেটিই ইকো ফেমিনিজম। ইকো ফেমিনিস্টদের মতে, পুরুষরা বৃক্ষ নিধন করছে, বন কেটে কলকারখানা তৈরি করছে, কলকারখানা তৈরির মাধ্যমে জলবায়ুর উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। ফলশ্রুতিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বিপুল পরিমাণে জলবায়ু শরণার্থী (Climate migrants) তৈরি হচ্ছে। তাই ইকো ফেমিনিস্টদের দাবি নারীদের উচিত পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসা। এভাবে নারীবাদ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় সূচনা করেছে।
Feminist peace theory (নারীবাদী শান্তি তত্ত্ব)
একুশ শতকের সবচেয়ে আলোচিত একটি থিওরি। তাই এটি বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। নারীবাদী শান্তি তত্ত্বের মূল বক্তব্য হচ্ছে নারীরা দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, কনফ্লিক্ট, সহিংসতা ইত্যাদি চায় না। নারীরা শান্তি চায়। তিনটি উদহারণের মাধ্যমে এই থিওরিটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Wartime sexual violence (যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা): যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত এবং সামরিক দখলদারিত্বের সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত ও ভালনারেবল পজিশনে থাকে। যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে শত্রুকে অপমানিত করার উদ্দেশ্যে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:
* ২০১৬ সালে রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকারি বাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হন।
* ১৭৪২ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত মারাঠা নেতা রঘুজীর সৈন্যরা ক্রমাগত বাংলা আক্রমণ করে। এসময় বাংলার অসংখ্য নারী মারাঠাদের দ্বারা ধর্ষিত হন। মারাঠারা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণ করে। বাঙালি কবি গঙ্গারামের বইয়ে এটির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
* ১৯০৪ সালে রুশ-জাপান যুদ্ধে রুশ সৈন্যরা মাঞ্চুরিয়ায় বহু চীনা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, অসংখ্য চীনা নারীকে ধর্ষণ করে।
* ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ ও দখল করে এবং ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত দেশটি জার্মান সামরিক দখলদারিত্বের অধীনে থাকে। এই সময়ে জার্মান সৈন্যরা অসংখ্য পোলিশ ইহুদি নারীকে ধর্ষণ করে।
* ১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুর আক্রমণ ও দখল করে এবং ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সেখানে ইন্দোনেশীয় দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকে। এসময় হাজার হাজার পূর্ব তিমুরীয় নারী ইন্দোনেশীয় সৈন্য ও পুলিশদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন।
যুদ্ধে সবসময় নারীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই নারীরা কখনো যুদ্ধ চায় না এবং রাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে নারীরা উদ্বুদ্ধ করে। এটি ফেমিনিস্ট পিস থিওরির মৌলিক ধারণা।
2. Shadow Pandemic (ছায়া মহামারি): এটি বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত যে, যে কোন মহামারি বা দুর্যোগে নারীর প্রতি সহিংসতা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। তাই ফেমিনিস্ট পিস থিওরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারির সময়ে নারীদেরকে গৃহ নির্যাতন থেকে নিরাপদ রাখার উপর জোর দেয়। জাতিসংঘের মতে, করোনা মহামারিতে নারীদের উপর সহিংসতার মাত্রা পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি করোনা মহামারিতে প্রতি তিনজনে দুই জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছে। পারিবারিক অত্যাচার ও যৌন সহিংসতার কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। লকডাউনে রাষ্ট্র কর্তৃক চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপের কারণে অনেক নারী থানায় গিয়ে তাদের উপর পারিবারিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে পারেনি। আবার নারীদের মধ্যে 'মানিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি' তাদেরকে বিরত রেখেছে সহিংসতার ঘটনা প্রকাশে। পরিবারের পুরুষ সদস্যের উপর নির্ভরশীলতা এবং আরও বহুবিধ কারণে নারীরা এসব সহিংসতা থেকে প্রতিকার পাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে কভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর গৃহে নারী নির্যাতন (domestic violence) অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই জাতিসংঘ করোনাকালীন নারীদের উপর সহিংসতা বৃদ্ধিকে 'Shadow Pandemic' বা 'ছায়া মহামারি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
3. Environmental Security (পরিবেশগত নিরাপত্তা): জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী ভাঙন হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে সমুদ্রের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলস্বরূপ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ শরণার্থী হয়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, অপর্যাপ্ত কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানির অভাবসহ বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ২১৬ মিলিয়ন মানুষ ঘরছাড়া হবে। তাই যে মানুষগুলো জলবায়ু শরণার্থী হবে তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয় থাকলেও নারীরা সবচেয়ে অনিরাপদ থাকবে। তাই নারীবাদীরা চায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করুক।
Hegemonic stability theory (HST)
আচ্ছা আমাদের ঈশ্বর যদি দুজন হতো তাহলে কেমন হতো? একজন ঈশ্বর বলত আজকে সূর্য পূর্ব দিকে উঠবে। অন্যজন বলত- না! আজ সূর্য পূর্ব দিকে নয় বরং পশ্চিম দিকে উঠবে। তাই দুইজন ঈশ্বর থাকলে পৃথিবীতে একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হতো। এটাই Hegemony stability theory এর মূল কথা। বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষায় হেজিমন রাষ্ট্র থাকবে মাত্র একটি। বিশ্বে যখন শুধু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকবে তখন বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ তখন তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না। কিন্তু বিশ্বে যখন দুই তিনটি রাষ্ট্র একসাথে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠবে তখন বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা ভিন্ন ভিন্ন মত নিয়ে আসবে। তখন বিশ্ব অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
নব্য বাস্তববাদ পড়ার সময় আমরা নৈরাজ্যবাদ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম বিশ্বের সকল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোনো একক নেতৃত্ব নেই। তাই কেউ কারো কথা শুনছে না। তাই হেজিমনিক তত্ত্ব অনুসারে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিশ্বের সব থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি দায়িত্ব নেবে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণ বিশ্বের সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে শুধু একটি রাষ্ট্র হেজিমন হলে কেন বিশ্বব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বিরাজ করবে? তত্ত্বগত জটিলতায় না গিয়ে সরাসরি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব। শুরুতেই বলতে চাই একটি রাষ্ট্র হেজিমন হতে হলে তাকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
1. Capability (সক্ষমতা): বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখতে যে-সকল রুলস-রেগুলেশনের প্রয়োজন সেগুলোকে বাস্তবায়ন করার মতো ঐ রাষ্ট্রের সক্ষমতা থাকা। সক্ষমতা বলতে অর্থনৈতিকভাবে অধিক সমৃদ্ধিশালী হতে হবে, সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক উন্নত হতে হবে।
2. Willingness (ইচ্ছা): হেজিমন হতে চাওয়া রাষ্ট্রের শুধু সক্ষমতা থাকলেই হবে না বরং তার ইচ্ছে থাকতে হবে। মনে করি একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে, সামরিকভাবে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালী। কিন্তু সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের হেজিমন হওয়ার ইচ্ছা তার নেই। তাহলে হবে না। তাই হেজিমন হতে হলে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করতে হবে।
3. Commitments (অঙ্গীকার): ধরি হেজিমন হতে চাওয়া রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও ইচ্ছা দুটোই আছে। তবে তাকে একটি কমিটমেন্ট দিতে হবে যে, সে কারো প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না এবং সকল রাষ্ট্রের স্বার্থকে সমানভাবে দেখবে। কমিটমেন্ট দিতে হবে যে, নিজ স্বার্থের চেয়ে বৈশ্বিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেবে。
Preponderance of Power
উপরিউক্ত তিনটি শর্ত মেনেই একটি রাষ্ট্রকে হেজিমন হতে হবে। বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার উপরিউক্ত তিনটি শর্ত পূরণ করার পর বিশ্বব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে হেজিমন রাষ্ট্রটি "Preponderance of Power" বাস্তবায়ন করবে। তথা হেজিমন রাষ্ট্রটি তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তিনভাবে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে :
1. Diplomacy: ধরা যাক বিশ্বের দুটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। তখন হেজিমন রাষ্ট্রটি বিশ্বের লিডার হিসেবে দুটি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নিরসনে এগিয়ে আসবে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বিরোধ সে মীমাংসা করে দেবে। এভাবে হেজিমন রাষ্ট্রটি বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখবে।
2. Persuasion: ধরা যাক একটি অঞ্চলের কয়েকটি রাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তখন হেজিমন রাষ্ট্রটি বিশ্বের নেতা হিসেবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলোকে সমাধানে আসার জন্য প্ররোচনা দেবে, যুক্তি পরামর্শ প্রভৃতি দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করবে। তখন ওই অঞ্চলে পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
3. Coercion: যদি দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলোকে উপরের দুইটি পদ্ধতি ব্যবহার করে সমাধানে নিয়ে আসা না যায় তাহলে হেজেমনিক রাষ্ট্রটি বিশ্বের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে মিলিটারি শক্তি ব্যবহার করবে।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে, বর্তমান সরকার নির্বাচনে পরাজিত হলে যিনি জয়ী হয়েছে তার হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেয়। ঠিক একই ভাবে পুরো বিশ্বকে একটি Global State হিসেবে কল্পনা করতে হবে। কয়েকবছর পর নতুন কোনো হেজিমনিক রাষ্ট্রের উত্থান হলে বর্তমানে যে রাষ্ট্রটি হেজিমন হিসেবে আছে সে নতুন হেজিমন রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। যেমন- ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের হেজিমন হিসেবে ব্রিটেনের পতন ঘটে। নতুন হেজিমন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। তখন ব্রিটেন মেনে নেয়। এভাবেই Hegemonic stability theory এর মাধ্যমে বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখা যায়। এই থিওরি মূলত আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Robert Gilpin এবং Stephen Krasner বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। যদিও এটি নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে।
After Hegemony
আমেরিকার পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট রবার্ট কিয়োহেন (Robert Keohane) বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য 'After hegemony' এই টার্মটি প্রথম নিয়ে আসেন। এটি মূলত Hegemonic stability theory এর বিপরীত। বিশ্বে যখন শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্র থাকে তখন আসলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। কারণ রাষ্ট্রগুলো স্বার্থপর। হেজিমন হওয়ার পর নিজ স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। ব্রিটেন দীর্ঘ একশো বছর বিশ্বের হেজিমন ছিল কিন্তু বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেনের অবদান নেই। ব্রিটেন নিজেই শতাধিক যুদ্ধে জড়িত হয়েছে। ব্রিটেনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের হেজিমন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বিশ্বকে স্থিতিশীল (Stable) করার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ল্যাটিন আমেরিকা-সহ গোটা বিশ্বেই সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে বিশ্ব আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়েছে। তাই রবার্ট কোহেনের মতে, বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখতে ১৯৪টি রাষ্ট্রের উচিত নয় শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্রের উপর নির্ভর করা। রাষ্ট্রগুলোর উচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর উপর বেশি জোর দেওয়া।
অর্থাৎ Hegemonic stability theory এর মূল কথা হচ্ছে বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া। অন্যদিকে After hegemony এর মূল বক্তব্য হচ্ছে একটি একক রাষ্ট্রের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার উপর গুরুত্বারোপ করা। কেননা বিশ্বব্যবস্থায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে সক্ষম এবং সমস্যাগুলো অঞ্চল ভিত্তিক সমাধান করা বেশি কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ: ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সমস্যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমাধান করবে, দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা সার্ক সমাধান করবে, আফ্রিকার সমস্যাগুলো আফ্রিকান ইউনিয়ন সমাধান করবে ইত্যাদি।
উপসংহার
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ক্ষেত্রে, পঠনপাঠন ও গবেষণায়, রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে জ্ঞান আহরণে এবং প্রয়োগযোগ্য নীতিনির্ধারণে উপরিউক্ত তত্ত্বগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশ্ব রাজনীতি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া আজকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আগামীকাল ইতিহাসে পরিণত হবে। নতুন আরেকটি ইস্যু সামনে আসবে। কখনো আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিছু বৈশ্বিক ঘটনা ভবিষ্যতে নতুন খামে পুরোনো চিঠি নিয়ে হাজির হবে। তাই অতীতের কোনো ঘটনা বিশ্লেষণে, বর্তমানে চলমান কোনো ক্রাইসিসের ব্যাখ্যায় কিংবা ভবিষ্যতের গতিপ্রকৃতি বুঝতে এই অধ্যায়ে বর্ণিত তত্ত্বগুলো আমাদের পাথেয় হিসেবে কাজ করবে। একুশ শতকের জাতিরাষ্ট্রগুলোর আচরণ বিশ্লেষণে দারুণ কাজে দেবে।
Question to think about?
এই অধ্যায় জুড়ে আমরা দেখেছি পুরো বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কিংবা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো একক কার্যকরী সংস্থা বর্তমানে নেই। একই ভাবে গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার এবং স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব যদি শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্রের উপর থাকে তাহলে বিশ্ব আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে, একুশ শতকের বিশ্বকে স্থিতিশীল (Stable) রাখতে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Jacobsen, Kurt (2017), International Politics and Inner Worlds: Masks of Reason Under Scrutiny, Palgrave Macmillan
2. Dunne, Tim; Kurki, Milja and Smith, Steve (2017), International Relations Theories, Oxford University Press
3. Schuett, Robert (2010), Political Realism, Freud, and Human Nature in International Relations, New York: Palgrave
4. Braumoeller, Bear. (2013), The Great Powers and the International System: Systemic Theory in Empirical Perspective, Cambridge University Press
5. Hayes, Jarrod (2012), The democratic peace and the new evolution of an old idea, European Journal of International Relations
6. Hook, Steven W. (2010), Democratic Peace in Theory and Practice, Kent State University Press
7. Oatley, Thomas (2019), International Political Economy, Routledge
8. Shepherd, Laura J. (2nd ed. 2014). Gender matters in global politics: a feminist introduction to international relations, Routledge
9. Baylis, John (2011), The Globalization of World Politics, Oxford University Press
10. Mearsheimer, John J. (2011), Why Leaders Lie: The Truth About Lying in International Politics, Oxford University Press.
11. Finnemore, Martha (2003), The Purpose of Intervention: Changing Beliefs About the Use of Force, Cornell University Press
📄 শক্তি ও নিরাপত্তা
Theme: The Illusion of Security
“In the end, peace can be achieved only by hegemony or by balance of power." - Henry A. Kissinger
বুর্কিনা ফাসো। আফ্রিকার এই দেশটির নাম শুনলে আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সারা জাগে না, মাথায় প্রথমে কাজ করে দেশটি মনে হয় দারিদ্র্যপীড়িত। বিশ্ব রাজনীতিতে যার তেমন কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু যখন আমরা 'ইসরায়েল' বা 'আমেরিকা' বা 'চীন' এই দেশগুলোর নাম শুনি তখন কেমন যেন একটি উত্তেজনা কাজ করে, আমেরিকা শব্দটি শুনলেই আমাদের মাথায় স্বাভাবিকভাবেই এটা কাজ করে যে, রাষ্ট্রটি অনেক শক্তিশালী ও উন্নত। বুর্কিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু থেকে যদি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না এবং বিষয়টি অতটা গুরুত্বসহকারে নেওয়া হবে না। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসি থেকে যখন মাত্র কয়েকজন বাংলাদেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তখন আমরা সবাই একটু নড়েচড়ে বসি। নিষেধাজ্ঞাটি শুধু কয়েকজনের উপর আরোপ করা হলেও এর তাৎপর্য কিন্তু আমাদের কাছে অনেক মনে হয়। বুর্কিনা ফাসো ও আমেরিকা দুটিই কিন্তু স্বাধীন দেশ। অথচ বুর্কিনা ফাসো আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সাড়া জাগাতে পারে না। এটাই National Power বা জাতীয় শক্তির বহিঃপ্রকাশ। বুর্কিনা ফাসোর থেকে আমেরিকার জাতীয় শক্তি অনেক। জাতীয় শক্তি বলতে বোঝায় আমার নিজ স্বার্থ ও উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য অন্য রাষ্ট্রকে আমি কতটুকু প্রভাবিত করতে পারি অথবা অন্য রাষ্ট্রকে আমার কথা শুনতে বাধ্য করানোর মতো কতটুকু সামর্থ্য আমার আছে। অর্থাৎ অন্য রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বা তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে আমার সামর্থ্য কতটুকু।
National Power (জাতীয় শক্তি)
ব্যক্তি তার স্বার্থ রক্ষার জন্য যেমন অন্যকে প্রভাবিত করে, তেমনি রাষ্ট্রেরও প্রয়োজন হয় তার স্বার্থকে সংরক্ষণের জন্য অন্য রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার। নিজের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী অন্য রাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জাতীয় শক্তি বা ন্যাশনাল পাওয়ার। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে National Power বা জাতীয় শক্তিকে চার ভাবে দেখা হয়। তথা এর চারটি দিক রয়েছে।
1. Military Power: অন্য রাষ্ট্র কর্তৃক যুদ্ধ এবং আক্রমণ আমার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে এমন সম্ভাবনা থেকে প্রতিটি রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনী গঠন করে। প্রতিটি জাতির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সামরিক শক্তিকে প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও গুরুত্ব নির্ভর করে তার সামরিক শক্তির উপর। বড় সামরিক শক্তি না হয়ে কোনো রাষ্ট্র সুপার পাওয়ার বা বড় শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সুপার পাওয়ার। কারণ এর রয়েছে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে জাপান এবং জার্মানি বড় অর্থনৈতিক শক্তি কিন্তু তারা সুপার পাওয়ার বা মহান শক্তি হিসেবে স্বীকৃত নয়। কারণ তারা সামরিক শক্তির দিক থেকে পরাশক্তির তুলনায় কিছুটা দুর্বল।
2. Economic Power: ন্যাশনাল পাওয়ার এর দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে অর্থনৈতিক শক্তি। বর্তমানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাশিয়াকে বর্তমানে একটি সুপার পাওয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে না। কারণ সামরিক দিক থেকে রাশিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিকভাবে সে বর্তমানে অনেকটাই দুর্বল। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে সামরিক শক্তি বেশিদিন টিকে থাকে না। সেনাবাহিনী গঠন, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়করণ, সেনাবাহিনীর বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক শক্তি না থাকলে কোনো রাষ্ট্রই সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে আমি অন্য রাষ্ট্রকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে আমার বলয়ে নিয়ে আসতে পারি, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে কোনো রাষ্ট্র আমার কথা না শুনলে তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারি।
3. Psychological Power: সাইকোলজিক্যাল পাওয়ার হচ্ছে, আমি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রকে সফট পাওয়ার ব্যবহার করে কতটা প্রভাবিত করতে পারি এবং অন্য রাষ্ট্রের কাছে আমার 'National Image' টা কেমন। কুশলী কূটনীতি, মিডিয়া প্রচার কৌশল বা প্রপাগান্ডা, আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্ক, ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও ভৌগোলিক বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি জাতীয় শক্তির অন্যতম নির্ধারক। মিলিটারি শক্তি না থাকা সত্ত্বেও আজকে কাতার কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এত প্রভাবশালী? উত্তর হচ্ছে, কাতারের আছে একটি শক্তিশালী মিডিয়া- আল জাজিরা। আল জাজিরার মাধ্যমে কাতার নিজেদের পক্ষে জনমত গঠন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তালেবানদের সাথে পশ্চিমাদের যত নেগোসিয়েশন, চুক্তি, মতবিনিময় হয়েছে সবই কাতারের রাজধানী দোহাতে বসে। অর্থাৎ কাতার তার মিডিয়ার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে তার একটি ইমেইজ তৈরি করতে পেরেছে। এই সাইকোলজিক্যাল পাওয়ারটাই কাতারের অন্যতম জাতীয় শক্তি।
4. Weapons of Mass Destruction (WMD): যার বাংলা হচ্ছে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। যে অস্ত্রের দ্বারা বৃহৎ সংখ্যক জনগোষ্ঠী নিহত হয় সেটাই ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। যেমন- পারমাণবিক অস্ত্র, হাইড্রোজেন বোমা, রাসায়নিক জীবাণু ইত্যাদি। একটি রাষ্ট্র সামরিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে অধিক শক্তিশালী হওয়ার পর যখন তার হাতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র চলে আসে তখন সে পরাশক্তিতে পরিণত হয়। জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচটি সদস্য রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন) হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যে রাষ্ট্রগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তাদের জাতীয় শক্তি সর্বোচ্চ।
জাতীয় শক্তি প্রয়োগের মাধ্যম
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় শক্তি প্রয়োগের ৪টি মেথড রয়েছে; (ক) Persuasion: প্ররোচনা বা যুক্তি-পরামর্শ দ্বারা কাউকে রাজি করানো। সাধারণত জাতীয় স্বার্থ বা National Interests রক্ষার্থে কূটনীতি প্রয়োগ করাকেই 'Persuasion' বলা হয়। (খ) Rewards: এখানে পুরস্কার বলতে একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অপর রাষ্ট্রকে সাহায্য করা বোঝাচ্ছি। শক্তি প্রয়োগের দ্বিতীয় জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো এই পুরস্কার প্রদান। এটা হতে পারে বস্তুগত বা অর্থনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সংকটের সময়ে অর্থনৈতিক সাহায্য, সহজ ঋণ, অনুদান ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে তার থেকে সমর্থন আদায় এবং তার আচরণে পরিবর্তন নিয়ে আসে। (গ) Punishment: একটি রাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাওয়ার যখন অধিক শক্তিশালী থাকবে তখন যে রাষ্ট্রটি আমার কথা শুনবে না কিংবা আমার অবাধ্য হবে তাকে বিভিন্ন শাস্তি প্রদান করা। শাস্তি প্রদান বলতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বোঝায়। (ঘ) Force: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় শক্তি প্রয়োগের শেষ পদ্ধতি হলো সামরিক শক্তি বা সহিংসতার প্রকৃত ব্যবহার। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে বাধ্য করাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও লিবিয়াতে যেটা করেছিল।
Balance of Power (শক্তি সাম্য)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিসাম্য তত্ত্বটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিক পরিচিতি পেলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কলাররা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করায় একটু জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাই চেষ্টা করব উদাহরণসহ সহজ করে বোঝানোর জন্য। বাস্তববাদীদের (Realists) মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিটা আসলে নৈরাজ্যময়। তাই কে-কখন আমাকে আক্রমণ করে বসবে সেটা আমরা জানি না। তাই তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ভারসাম্যের স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। (১) কোনো শত্রু রাষ্ট্র যদি সামরিকভাবে আমার থেকেও অধিক শক্তিশালী হয়ে পড়ে তাহলে সে আমার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই শত্রু রাষ্ট্রটি যেন আমার থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়ে না উঠে সেজন্য তাকে বাধা দিতে হবে এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দিয়ে তাকে দমিয়ে রাখতে হবে। ইরানের কথাই বলা যাক। ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দমিয়ে রাখার জন্য নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। এটাই Balance of Power বা শক্তিসাম্য তত্ত্বের বর্তমান উদাহরণ। (২) মনে করি A ও B দুটি রাষ্ট্র সামরিক ও অস্ত্রের দিক থেকে বর্তমানে সমান অবস্থানে আছে। কিন্তু দেখা গেল কয়েকবছর পর B রাষ্ট্রটি A এর তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে গিয়েছে। তখন B এর সমপরিমাণ শক্তিশালী হতে যা যা করা প্রয়োজন A রাষ্ট্রটি তাই করবে। অর্থাৎ যেকরেই হোক আমারও সমপরিমাণ শক্তি লাগবে (Power Equilibrium)। কারণ শক্তির দিক থেকে আমি পিছিয়ে গেলে আমাকে আক্রমণ করে বসতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্র এই কাজটি করেছে। এটাও শক্তিসাম্যের উদাহরণ।
শক্তিসাম্য যেভাবে রক্ষা করা যায়:
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারসাম্য তৈরি করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:
1. Policy of Nuclear Deterrence: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। বর্তমানে যে-সকল রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তারা সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি নিয়ে একটি প্রতিযোগিত্তাও শুরু হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অন্য রাষ্ট্রকে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে বিরত রাখাকে টার্ম হিসেবে 'Nuclear Deterrence' বলা হয়। যেমন- বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যুত্তরে উত্তর কোরিয়াও তার পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখাচ্ছে। এটাই হচ্ছে Balance Of Power বা শক্তিসাম্য। অর্থাৎ পেন্টাগন যদি উত্তর কোরিয়ায় দশটি রকেট হামলাও চালায়, উত্তর কোরিয়াও ন্যূনতম একটি হলেও ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। তাই উভয়েরই ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে যদিও কারো কম কারো আবার বেশি। Balance Of Power বলছে এজন্যই কেউ কাউকে হামলা চালাতে পারবে না। এখানে একটি ভারসাম্য রয়েছে। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো পরস্পরকে এতটাই সমীহ করে যে, তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে এমন পরিস্থিতির আশপাশে যেতেও ভয় পাচ্ছে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নিয়ে এতটা চিন্তিত। ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।
2. Military Alliance (সামরিক জোট): রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিপক্ষের সমকক্ষ হতে জোট গঠন করার মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতন্ত্রের বিকাশ লাভ করে। সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। ফলশ্রুতিতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সমাজতন্ত্রের বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রও বিচলিত হয়ে ওঠে। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো নিয়ে গঠিত হয় সামরিক জোট ন্যাটো (NATO)। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও ভারসাম্য রক্ষা করতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো নিয়ে ওয়ারশ প্যাক্ট (The Warsaw Pact) নামে আরেকটি সামরিক জোট গঠন করে। তথা সামরিক জোট গঠন করেও Balance of Power রক্ষা করা যায়।
3. Economic Alliance (অর্থনৈতিক জোট): ব্রেটনউডসের অন্যতম দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। বিশ্বর সবগুলো রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কাজ করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ ও অনুদান প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। চীনের দাবি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র মূলত এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করছে। তাই চীন ২০১৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে প্রতিষ্ঠা করে ব্রিকস ব্যাংক (BRICS)। এভাবে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা জোট গঠন করেও শক্তিসাম্য বজায় রাখা যায়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল প্ল্যানও ছিল Balance of Power এর উদাহরণ। উল্লেখ্য, মার্শাল প্ল্যান হলো পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে নিয়ে আসা।
4. Local Balance (স্থানীয় ভারসাম্য): যেমন- ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভারসাম্য। পাকিস্তানের সাথে পরাশক্তি চীনের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একই ভাবে ভারতের সাথে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক। কিন্তু চীন ও পাকিস্তান যদি একত্রে শুধু ভারতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে তখন ভারতের কাছে সেটা হুমকি মনে হতে পারে। চীন ও পাকিস্তান একসাথে, অন্যদিকে ভারত একা। অর্থাৎ এখানে কোনো ভারসাম্য নেই। তখন ভারত ভারসাম্য তৈরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তার পক্ষে নিয়ে আসে। পাকিস্তান + চীন = ভারত + যুক্তরাষ্ট্র, এরকম হলে এখানে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। এভাবে রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা রক্ষায় ভারসাম্য তৈরি করে।
5. Regional Balance (আঞ্চলিক ভারসাম্য): অঞ্চল ভিত্তিক যে-সকল সংস্থা রয়েছে সেগুলোও শক্তিসাম্যের উদাহরণ। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য মনে করুন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নেই। তখন বিষয়টি কেমন হবে? দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো একটি শূন্যতা অনুভব করবে যে, ইউরোপের একটি আঞ্চলিক সংস্থা রয়েছে অথচ আমাদের নেই। এখন আমরা বলতে পারি আমাদেরও 'সার্ক' রয়েছে। আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো বলতে পারে আমাদেরও 'আফ্রিকান ইউনিয়ন' রয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বলতে পারে আমাদেরও 'OIC' রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো বলতে পারে আমাদেরও 'ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশন' রয়েছে। অর্থাৎ এভাবে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একটি শক্তিসাম্য তৈরি করা যায়। যদিও সার্ক বা OIC এর অনেক দুর্বলতা রয়েছে।
6. Armaments (অস্ত্রসজ্জা): অন্য রাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দিয়ে অস্ত্র বৃদ্ধি, পুনঃপুন সামরিক মহড়া, মিলিটারির সংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্ষেপণাস্ত্র বৃদ্ধি ইত্যাদির প্রতিযোগিতাকে 'Armament' বলা হয়। অতীতের মতো বর্তমানেও যুদ্ধের জন্য সামরিক বাহিনী বৃদ্ধি ও রণসজ্জার মাধ্যমে ভারসাম্য তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ চীন সাগরে নিজের উপস্থিতি জোরদার করছে বেইজিং। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে গতিরোধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান প্রায় সাবমেরিন নিয়ে মহড়া চালায়। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই সোভিয়েত ও মার্কিন উভয়েই পারমাণবিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়াতে থাকে। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম এটম বোমা বানাতে সক্ষম হলে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেটা তার নিরাপত্তার হুমকি মনে করে। তখন পাঁচ বছর পরেই ১৯৫০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও এটম বোমা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র হাইড্রোজেন বোমা বানায়, সোভিয়েতও হাইড্রোজেন বোমা বানায়। যুক্তরাষ্ট্র আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, একই পথে হাঁটে সোভিয়েত। এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল যেন আরেকটি পারমাণবিক যুদ্ধ হতে চলেছে। তখন বিশ্বের ধ্বংসসাধনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই ধ্বংস প্রক্রিয়া MAD (Mutually Assured Destruction) তত্ত্ব নামে পরিচিত। তৃতীয়ত, ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ঘোষণা করে, এই প্রথম ভারত একটি পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। মাত্র কয়েকদিন পরেই পাল্টা জবাব হিসেবে পাকিস্তানও তাদের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এই যে পারমাণবিক অস্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার প্রতিযোগিতা এটাকে টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Balance of Terror' বা ত্রাসের সাম্য।
7. Disarmament (নিরস্ত্রীকরণ): নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমেও ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। নিরস্ত্রীকরণ বলতে মূলত অস্ত্রের পরিমাণ হ্রাস বা অস্ত্রের বিলুপ্তি বোঝানো হয়। যেহেতু রাষ্ট্রগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, তাই সবাই মিলে অস্ত্রের পরিমাণ সংকোচন করাই শ্রেয়। ভারসাম্যটা এরকম যে, একটি রাষ্ট্র একাই নিরস্ত্রীকরণ করবে না, তার সমতুল্য অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের মধ্যে SALT, START ইত্যাদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য উপরিউক্ত সাতটি পদ্ধতি ছাড়াও আরও অনেক পদ্ধতি রয়েছে। আশাকরি শক্তিসাম্য নিয়ে আমাদের বুঝতে আর সমস্যা হবে না। এবার নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে বিস্তারিত কিছু কথা বলি।
নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে গৃহীত পদক্ষেপ:
আণবিক শক্তি কমিশন গঠন: ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের সাধারণ সভার প্রস্তাব অনুসরণে একটি পরমাণু শক্তি কমিশন (United Nation Atomic Energy Commission) গঠন করা হয়। এই কমিশন আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনা রচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
জেনেভা নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন: জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন হয়।
জাতিসংঘের অসংখ্য উদ্যোগ: ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আণবিক অস্ত্র রোধের লক্ষ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক একাধিক পদক্ষেপ গৃহীত হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মহাকাশে ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি): ইংরেজিতে Non-Proliferation Treaty (NPT) বলা হয়। ১৯৬৮ সালে চুক্তি হলেও বাস্তবায়ন হয় ১৯৭০ সাল থেকে। কিন্তু পঁচিশ বছর পর ১৯৯৫ সালে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রথম মিলিত হয়। ২০০৩ সালে উত্তর কোরিয়া চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও দক্ষিণ সুদান চুক্তিতে এখনো স্বাক্ষর করেনি।
মার্কিন ও সোভিয়েতের যৌথ প্রচেষ্টা: ১৯৭২ সালের ২৬ মে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র সীমিতকরণের লক্ষ্যে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মস্কোতে সল্ট-১ (SALT-I) চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ জুন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় সল্ট-২ (SALT-II) চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের পর ১৯৯১ সালের ৩১ জুলাই তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ ও জর্জ বুশ START-১ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত করেন। তারপর ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে রুশ প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের সঙ্গে START-২ চুক্তি সম্পাদন করেন।
রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংস্থা: যার ইংরেজি হচ্ছে, Organisation for the Prohibition of Chemical Weapons নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে যার সদরদপ্তর অবস্থিত। আণবিক অস্ত্র ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্য ১৯৯৭ সালে গঠিত হয় 'রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংস্থাটি'। বিশ্বের প্রায় সকল দেশ এর সদস্যপদ গ্রহণ করলেও ইসরায়েল, মিশর, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ সুদান- এই চারটি দেশ এখনো এর সদস্য হয়নি।
শক্তির ভারসাম্য কিংবা বিশ্বের অস্তিত্বের কথা বিবেচনা করে অসংখ্য নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি এবং এখনো হচ্ছে না। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন। দক্ষিণ আফ্রিকাই একমাত্র দেশ, যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার পর ধ্বংসাত্মকের কথা বিবেচনা করে ১৯৯১ সালে নিজেরাই সেই পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলে। সেকারণে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ক এখনো বিশ্বে প্রশংসিত। ইরান, ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া হয়তোবা শীঘ্রই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও দক্ষিণ সুদান এই চারটি রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও এরা কেউই এনপিটি চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ভারত ২০২১ সালে প্রথম দেশ হিসেবে জাপানের সঙ্গে 'সিভিল নিউক্লিয়ার ডিল' করার ঘোষণা দিয়েছে। ইসরায়েলও বলছে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি শান্ত না হলে তারা এনপিটি চুক্তিতে যোগ দেবে না। আসলে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এখন অনিশ্চয়তায়। কথা হচ্ছে, সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলো তো আর প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে না। আণবিক অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে রাষ্ট্রের গোপন গবেষণাগারে। তাই শতশত চুক্তি, সংস্থা, কমিটি ইত্যাদি গঠিত হলেও রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র বৃদ্ধি করছে। যা একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। বিশ্বের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
Security (নিরাপত্তা)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় শক্তি, শক্তিসাম্য, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি বিষয়গুলো সবসময়ই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, রাষ্ট্রের টিকে থাকা, বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এই বিষয়গুলো বারবার চলে আসে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- বিশ্ব রাজনীতিতে সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায়? সবচেয়ে প্রচলিত সংজ্ঞা হচ্ছে, সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে মুক্তি এবং বাহ্যিক ভয়ের বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা। সাধারণত নিরাপত্তার বিষয়টি দুইভাবে দেখা হয়। তাই নিরাপত্তাকে দুইভাবে ভাগ করা হয়েছে। এক. Traditional security বা প্রচলিত নিরাপত্তা। দুই. Non-Traditional Security বা অপ্রচলিত নিরাপত্তা।
Traditional Security (প্রচলিত নিরাপত্তা): প্রচলিত নিরাপত্তার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রের সিকিউরিটি। অর্থাৎ এই নিরাপত্তায় শুধু রাষ্ট্রকেই জোর দেওয়া হয়। এর বিষয়বস্তু ব্যাপক। মিলিটারির মাধ্যমে যে-সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয় সেটাই প্রচলিত নিরাপত্তা। যেমন- রাষ্ট্রের ভূখণ্ড রক্ষা করা, বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা, জঙ্গিবাদ দমন, গৃহযুদ্ধ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদগুলো রক্ষা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ইত্যাদি। অর্থাৎ এটা State based বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক যত নিরাপত্তা। প্রচলিত নিরাপত্তার উপাদান হচ্ছে- State, territory, Survival, Sovereignty, Military, War, Hard Power, Foreign Policy ইত্যাদি।
Non-Traditional Security (অপ্রচলিত নিরাপত্তা): অপ্রচলিত নিরাপত্তার মূল বিষয়বস্তু রাষ্ট্র নয় বরং রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের জনগণের নিরাপত্তা। এটাকে 'Human Security' বা মানব নিরাপত্তাও বলা হয়। যেমন- জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের নিশ্চয়তা, পরিবেশগত সুরক্ষা, ডমেস্টিক ভায়ালেন্স থেকে নারীর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, মাদক পাচার ও মানব পাচার থেকে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি। অর্থাৎ এটা Human based বা নাগরিকদের নিয়ে কাজ করে। দারিদ্র্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, সাইবার ক্রাইম, বাল্যবিবাহ, শরণার্থী, আত্মহত্যা, বেকারত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো অপ্রচলিত নিরাপত্তার অংশ। অপ্রচলিত নিরাপত্তার উপাদান হচ্ছে- (ক) স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা (মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য), (খ) খাদ্য নিরাপত্তা (পুষ্টিকর খাদ্য, ক্রয়সাধ্যতা), (গ) শিক্ষার নিরাপত্তা (সমান সুযোগ ও প্রবেশাধিকার), (ঘ) পরিবেশগত নিরাপত্তা (দূষণমুক্ত, সবুজায়ন, বনায়ন), (ঙ) রাজনৈতিক নিরাপত্তা (মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলন করার স্বাধীনতা, দল গঠনের স্বাধীনতা), (চ) অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (জব বা চাকরি, কর্মসংস্থান), (ছ) ডিজিটাল নিরাপত্তা (সাইবার ক্রাইম, সাইবার বুলিং, হ্যাকিং) ইত্যাদি。
প্রচলিত নিরাপত্তার (Traditional Security) সমস্যাগুলো কোথায়?
1. The Frankfurt School of Security: প্রচলিত নিরাপত্তা বা Traditional security এর সমালোচনা করে এমন স্কলার যারা রয়েছে তারা "The Frankfurt School" হিসেবে পরিচিত। ফ্রাঙ্কফোর্ট আইডিয়াটি ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস, হেগেল, ম্যাক্স ওয়েবার ইত্যাদি ব্যক্তিত্বের মতাদর্শে গঠিত। তারা নিরাপত্তার বিষয়গুলো একেবারে ভিতর থেকে খুব ক্রিটিক্যালি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। ফ্রাঙ্কফোর্ট স্কুল অব থট এটা মূলত নিউ মার্কসিস্ট ধারণা। যার মূল কথা হচ্ছে, একটি সোসাইটির নিরাপত্তা বুঝতে হলে ওই সোসাইটির ইতিহাস সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানা জরুরি। হিস্ট্রিক্যাল বিষয়গুলো অ্যানালাইসিস এর মাধ্যমে ওই সোসাইটির সিকিউরিটি সম্পর্কে যাবতীয় ধারণা পাওয়া যায়। সমাজব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যেখানে মানুষকে দাস বানানো হয়, মানুষকে পরাধীন করে রাখা হয়, পুঁজিবাদী সিস্টেমে শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে বিবেচিত না করে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে নারীদেরকে পুরুষদের অধীন মনে করা হয়। প্রচলিত নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্র নিয়ে পড়ে থাকে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়েই প্ল্যান পরিকল্পনা করে। কিন্তু সমাজের কাঠামো বা স্ট্রাকচার পরিবর্তন নিয়ে তেমন কোনো জোর দেওয়া হয় না। প্রচলিত নিরাপত্তা নিয়ে নারীবাদীরাও সন্তুষ্ট নয়। নারীবাদীরা দাবি করছে, যুদ্ধের সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত অথচ যুদ্ধ সৃষ্টিতে নারীদের কোনো অবদান নেই।
2. The Copenhagen School of Security: কোপেনহেগেন মতাদর্শের মূল বক্তব্য হচ্ছে সিকিউরিটির বিষয়গুলো সামাজিকভাবে নির্মিত। কোনটি নিরাপত্তা এবং কোনটি নিরাপত্তা না ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাজে তৈরিকৃত। রাজনৈতিক নেতারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে নিরাপত্তা সম্পর্কিত কিছু বিষয়কে অধিক পরিমাণে গুরুত্ব দিয়ে বা অতিরঞ্জিত করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ: সারাদিন টেরোরিস্ট, জঙ্গিবাদ, জঙ্গিদমন ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে, এগুলো নিয়ে পলিসি তৈরি করবে, সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করবে, মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করাবে, বুদ্ধিজীবীরা দিনরাত কলাম লিখবে। মনে হবে যেন একঘণ্টা পরপরই দেশে জঙ্গি হামলা হচ্ছে, মনে হবে জঙ্গি হামলায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে, আর দেখানো হবে রাষ্ট্র সেগুলো সফলতার সঙ্গে দমন করছে। এই যে নিরাপত্তা সম্পর্কিত কোনো একটি বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে ফোকাস দেওয়া সেটাকে 'Securitization' বলা হয়। অথচ প্রতি এক বছরে জঙ্গি হামলায় যে পরিমাণ মানুষ মারা যাচ্ছে তার থেকে দশগুণ বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে, দরিদ্রতায়, আত্মহত্যায়, রোড এক্সিডেন্টে। কোপেনহেগেন স্কুলের দাবি জঙ্গি দমনকে রাষ্ট্র যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে রোড এক্সিডেন্ট বা সড়ক দুর্ঘটনাকে অতটা গুরুত্ব দিচ্ছে না, প্রতিবছর আত্মহত্যা করে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু রাষ্ট্র সেটাতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর বন্দুক হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, ফ্লোরিডায় বন্দুক হামলায় ৪০ জন নিহত, অ্যালাবামায় স্কুল শিক্ষার্থীর বন্দুক হামলায় ১৫ জন নিহত, নিউইয়র্কের রেস্টুরেন্টে বন্দুক হামলায় ২০০ জন নিহত। তিন-চার দিন পরপরই এরকম খবর আসে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী দমনে। যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়দা, আইএস ইত্যাদি গোষ্ঠীর উপর যতটা ফোকাস দেয় নিজ দেশের বন্দুক হামলায় ততটা গুরুত্ব দেয় না।
আরেকটি উদাহরণ দেই- রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা একরকম হাইপ তৈরি করে, মনে হবে যেন চীন এখনি ভারতকে আক্রমণ করে বসবে, উত্তর কোরিয়া মনে হয় এখনই পেন্টাগনে মিসাইল নিক্ষেপ করবে, রাশিয়া যে-কোনো সময় আক্রমণ চালাতে পারে ইত্যাদি। জনগণকে বোঝানো হয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় যুদ্ধ অনিবার্য। তাই প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বাড়াও, মডার্ন ওয়েপনস ক্রয় কর। অথচ প্রতিরক্ষা খাতে যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় সেই টাকা দিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের উন্নয়নে, অবকাঠামো নির্মাণে, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে, মানব সম্পদ বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যেত। ইরানে বর্তমানে বেকারত্ব প্রকট, অবকাঠামো খাতে ভঙ্গুরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। কিন্তু এসবের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ইরান প্রতিবছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে তার পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধিতে। অর্থাৎ কোপেনহেগেন এর মূল কথা হচ্ছে, রাষ্ট্র নিরাপত্তার যে বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন (যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান) সেগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে তৈরিকৃত কিছু বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশল কেমন হওয়া উচিত:
প্রতিটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কিছু ঝুঁকি থাকে। তন্মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি (Internal Threats) হচ্ছে সামরিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সেনা অভ্যুত্থানের প্রবণতা, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ইত্যাদি। আর বৈদেশিক ঝুঁকি (External Threats) হচ্ছে প্রতিবেশি বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সীমান্ত বিরোধ, শক্তিশালী রাষ্ট্রের উপর অধিক নির্ভরশীলতা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি। তাই একটি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা কীভাবে রক্ষা করবে সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্রটি মূলত কোন ধরনের। চীনের সাথে ১৪টি রাষ্ট্রের বর্ডার রয়েছে, তাই চীনের নিরাপত্তা কৌশল একরকম হবে। বাংলাদেশের তিনদিকে ভারত আর একদিকে সমুদ্র। তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজি আরেকরকম হবে। অস্ট্রেলিয়ার চারদিকে সমুদ্র, তাই অস্ট্রেলিয়াকে জোর দিতে হয় নৌবাহিনীর উপর। আফগানিস্তান একটি ল্যান্ডলকড বা স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। তাই আফগানিস্তানের নিরাপত্তা কৌশল অস্ট্রেলিয়ার থেকে ভিন্ন হবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলের সাথে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল মিলবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তার ধরন পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশ যেহেতু তুলনামূলকভাবে একটি ক্ষুদ্র বা ছোট রাষ্ট্র, তাই ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কীভাবে রক্ষা করা যায় সেটা নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করব।
1. Alliance (জোটে অংশগ্রহণ করে): ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিজ শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষা করা অনেক কঠিন। একটি বড় রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার সামর্থ্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর নেই। তাই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক গঠিত জোটগুলোতে যোগ দিয়ে ছোট রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে। কারণ জোটগুলোর সনদে এটা বলা থাকে যে, জোটভুক্ত সদস্যের নিরাপত্তা রক্ষায় একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, আলবেনিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আয়তনের দিক থেকে অনেক ছোট কিন্তু এগুলো ন্যাটো জোটের সদস্য। সামরিক ন্যাটো জোটের সদস্য হওয়ার কারণে এই রাষ্ট্রগুলোকে কেউ আক্রমণ করার সাহস পায় না。
2. Balance of Power (শক্তিসাম্য বজায় রেখে): ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তার নিরাপত্তা রক্ষা করা যায়। যেমন- ওশেনিয়া মহাদেশের ছোট দেশ নাউরু। নাউরু অস্ট্রেলিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করেছে। তাই এখন নাউরু একা নয়, তার সাথে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। নাউরুকে কেউ আক্রমণ করলে অস্ট্রেলিয়া সেটাকে প্রতিহত করবে। অস্ট্রেলিয়ার সাথে যেহেতু নাউরুর সম্পর্ক রয়েছে তাই নাউরুকে আক্রমণ করার সামর্থ্য কেউ দেখাবে না। অনেক সময় এভাবে ছোট রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রকে আস্থায় নিয়ে টিকে থাকে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্থান করে নেয়।
3. Collective Security (যৌথ নিরাপত্তা): কোনো একটি রাষ্ট্র যদি যুদ্ধে লিপ্ত হয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, তাহলে ঐ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাধিক রাষ্ট্র মিলে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটাকেই বলা হয় যৌথ নিরাপত্তা। যৌথ নিরাপত্তার এই ধারণাটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন প্রথম সামনে নিয়ে আসেন। বর্তমানে যৌথ নিরাপত্তা রক্ষা করা হয় জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, সামরিক জোট ইত্যাদি মাধ্যমে। ছোট রাষ্ট্রগুলো যেহেতু নিজ সামর্থের উপর নির্ভর করে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তাই তাদের উচিত যৌথ নিরাপত্তার উপর গুরুত্বারোপ করা।
4. Pilot Fish Behaviour (পাইলট ফিসের মতো আচরণ করে): Pilot Fish মূলত এমন এক ধরনের ছোট সামুদ্রিক মাছ যা আমরা ক্যারিবিয়ান সাগরে দেখতে পাই। এই ছোট মাছগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা বড় বড় হাঙ্গরের গা ঘেঁষে চলে এবং সেই হাঙ্গরের গায়ে জমা শেওলা খেয়েই বেঁচে থাকে। এই মাছগুলোর চতুরতার জন্য হাঙ্গরের আশেপাশে থাকা সত্ত্বেও এই মাছগুলোকে হাঙ্গর খেতে পারে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে Pilot Fish Behaviour এর সম্পর্ক কী?
বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে কিছু ছোট রাষ্ট্র থাকে এবং একটি বা দুটো বড় বা শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকে। যেমন- আমাদের এই উপমহাদেশের কথা বললে এখানে চীন ও ভারত দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। অন্যদিকে ভুটান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও নেপাল ছোট রাষ্ট্র। তাই ছোট রাষ্ট্রগুলোকে এমনভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে যাতে করে এই রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রতিবেশি বৃহৎ শক্তির সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে টিকে থাকতে পারে। এই তত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন Erling Bij নামে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এক বিশেষজ্ঞ। এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে তুমি হাঙ্গরের পাশাপাশি থাকো কিন্তু এমনভাবে থাকো যাতে হাঙ্গর তোমাকে খেতে না পারে।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী নর্ডিকভুক্ত দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক কীভাবে রক্ষা করবে এটা বোঝাতে গিয়ে তিনি Pilot Fish Behaviour এর তত্ত্ব দিয়েছিলেন। অর্থাৎ পাইলট মাছ যেভাবে আচরণ করে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোরও সেভাবে আচরণ করা উচিত। যাতে করে বড়রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে গ্রাস করতে না পারে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি সাথে পার্শ্ববর্তী বড় দেশের সম্পর্কের প্রশ্নে এই তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এ্যান্ডোরা এই তত্ত্ব সফলভাবে প্রয়োগ করছে। পাইলট ফিসের মতো পুঁচকে দেশ এ্যান্ডোরা খুবই কূটনৈতিক দূরদর্শীসম্পন্ন রাষ্ট্র। প্রতিবেশি ফ্রান্স ও স্পেন দুটোই দখলদার রাষ্ট্র। নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ্যান্ডোরা ফ্রান্স ও স্পেন থেকে একজন করে রাজা নিয়োগ দেয়। এ্যান্ডোরার রাজা দুইজন। একজন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, অন্যজন স্পেনের বিশপ। বলা হচ্ছে ইউক্রেন রাষ্ট্রটি Pilot Fish Behaviour থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবেশি বড় রাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধাচারণ করেছে বলেই ইউক্রেন আজ পতনের দিকে।
বর্তমানে আমরা গ্লোবাল রাজনীতির যেই যুগটা পার করছি সেটাকে এনার্কি বা নৈরাজ্যের যুগ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। রাজনীতিতে সাধারণত নৈরাজ্য বলতে একটি রাষ্ট্রে শাসক বা সরকারের অনুপস্থিতিকে বোঝায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তেমনিভাবে বর্তমানে কোনো শাসক (কার্যকরী আন্তর্জাতিক সংস্থা) নেই। কেউ কারো কথা শুনছে না। বিশ্বের এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তার প্রতিবেশি ছোট রাষ্ট্রগুলোকে হাঙ্গর মাছের মতো গিলে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তাই ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় রাষ্ট্রগুলোর থাবা থেকে বাঁচতে পাইলট ফিসের মতো ধূর্ত হতে হবে।
Question to think about?
ধরুন আপনি বাংলাদেশের একজন সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক। একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে আপনি প্রচলিত এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করবেন?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Buzan, B. and L. Hansen (2009), The Evolution of International Security Studies, Cambridge University Press
2. Collins, Alan, ed. (2016), Contemporary Security Studies (4th ed.), Oxford, United Kingdom: Oxford University Press
3. Morgan, P. (2007), Security in International Politics: Traditional Approaches, New York
4. Treverton, Gregory F. (2005), Measuring national power, RAND Corporation
5. Howard, Sir Esme (May 1925), British Policy and the Balance of Power, The American Political Science Review
6. Myrdal, Alva (1978), The Game of Disarmament: How the United States and Russia run the arms race, New York: Pantheon
7. Walt, Stephen M. (1987), The Origins of Alliances, New York: Cornell University Press
8. Wendt, Alexander (1992), Anarchy Is What States Make of It: The Social Construction of international Politics, International Organization
9. Buzan, Barry; Wæver, Ole (2003), Regions and Powers: The Structure of International Security, Cambridge University Press.
📄 নয়া বিশ্বব্যবস্থা
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা থিংকট্যাংকরা নড়েচড়ে বসল। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা বলল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন মানে সমাজতন্ত্রের পতন। তাঁর মতে সমাজতন্ত্র বিশ্বব্যবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি, তাই এর পতন হয়েছে। অন্যদিকে ক্যাপিটালিজম জয়ী হয়েছে। যেহেতু পুঁজিবাদের জয় হয়েছে তার মানে পুঁজিবাদ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার সাথে মানানসই। এতদিন সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল তার অবসান ঘটল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে। এখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো আর কোনো মতাদর্শ (Ideology) অবশিষ্ট নেই। তাই ইতিহাসের সমাপ্তি হলো। ফুকোয়ামা এটার নাম দিয়েছে "The End of History” বা ইতিহাসের সমাপ্তি। ইতিহাসের সমাপ্তি বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, পৃথিবীতে পুঁজিবাদের চেয়ে উত্তম কোনো মতাদর্শ আর আসবে না। পুঁজিবাদই সেরা। আর এখন থেকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ১৯৯১ সাল থেকে পুরো বিশ্বব্যবস্থার হর্তাকর্তা হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র। এভাবে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা নতুন এই বিশ্বব্যবস্থাকে নাম দেওয়া হলো New-World Order তথা নয়া বিশ্বব্যবস্থা।
কীভাবে চলবে নয়া এই বিশ্বব্যবস্থা
তারপর ইন্টেলেকচুয়াল অঙ্গনে প্রশ্ন উঠল কীভাবে চলবে নয়া বিশ্বব্যবস্থা? ফুকোয়ামা বলল বিশ্ব চলবে গণতন্ত্র ও ক্যাপিটালিজমের উপর ভিত্তি করে। জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস এর অনুসারীরা বলল ফুকোয়ামার সাথে আমরা একমত নই। তারা বলল কয়েকবছর পরপর পৃথিবীতে নতুন নতুন মতাদর্শ তৈরি হবে। এখন থেকে শুধু পুঁজিবাদ আজীবন একক নেতৃত্বে থাকবে বিষয়টি এরকম নয়। যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন আইডিওলজি তৈরি হবে, তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হবে, যে জয়ী হবে সে পৃথিবী শাসন করবে। একসময় কৃষি ছিল, তারপর সামন্তবাদ, তারপর কলোনিয়ালিজম, তারপর পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। এভাবে পর্যায়ক্রমে বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তন হবে। তাদের মতে পুঁজিবাদ নিয়েও সমস্যা দেখা দেবে। তখন পুঁজিবাদের সংস্করণ হবে। উদাহরণস্বরূপ: ১. Thesis: একদল বলবে পুঁজিবাদী সিস্টেম সর্বোত্তম। কেননা এর কারণে শিল্পায়ন হয়েছে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যদ্রব্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২. Antithesis: অন্যদল বলবে পুঁজিবাদী সিস্টেম সর্বোত্তম না। পুঁজিবাদের কারণে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে এবং গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। তার মানে পুঁজিবাদী সিস্টেমেও সমস্যা আছে। ৩. Synthesis: এভাবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার পর তারা সমাধানে আসবে। যেহেতু আয় বৈষম্য কমাতে সরকার কর আরোপের মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরিবদের মাঝে বণ্টন করবে (Redistribution), যেহেতু পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তাই সরকার কলকারখানাগুলোর উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করবে। এভাবে প্রতিনিয়ত পুজিবাদেরও সংস্করণ হবে। অর্থাৎ Thesis এবং Antithesis এর সমন্বয়ে Synthesis হয়। এই যে থিসিস এবং এন্টিথিসিসের মধ্যকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ সিনথেসিস গঠনের যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)।
আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমানে ঠিক তাই হচ্ছে। ১৯৯০ সালের যে পুঁজিবাদ আজকের দুনিয়ায় কিন্তু সেই পুঁজিবাদ নেই। তার অনেক সংস্করণ হয়েছে। আজকে উন্নত দেশগুলো Welfare Economy বা কল্যাণমূলক অর্থনীতিকে বেছে নিয়েছে। কল্যাণমূলক অর্থনীতির মানে হচ্ছে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র দুটোর মিশ্রণ। এই দুটোর ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বর্তমান বিশ্বে। ধনীদের থেকে টাকা নিয়ে সেটা গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতে ফ্রিতে যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়, শিক্ষাব্যবস্থায় যে ভর্তুকি দেওয়া হয় ইত্যাদি সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। বেকারভাতা ও বয়স্কভাতা ইত্যাদিও সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদ কিন্তু এগুলো সমর্থন করে না। তাই বর্তমানে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রণে নতুন যে অর্থব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সেটাকে “Mixed Economy" ও বলা হচ্ছে।
সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations)
মার্ক্স ও ফুকোয়ামার অনুসারীদের পর আলোচনায় যুক্ত হলেন মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেমুয়েল হান্টিংটন। সমাজতন্ত্র পতনের পর নয়া বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে সেটার উপর থিসিস নিয়ে হাজির হলেন। তিনি "Clash of Civilizations" বা "সভ্যতার সংঘাত” নামে নতুন একটি থিওরি নিয়ে আসলেন। পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়েছিল কলোনির দখল নিয়ে, যুদ্ধ হয়েছিল ভূখণ্ড দখলের জন্য, যুদ্ধ হয়েছিল কলোনি থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য। অর্থাৎ পূর্বে যুদ্ধ হয়েছিল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি রাষ্ট্রের। তারপর ১৯৪৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধ হয়েছিল পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের। কিন্তু নয়া বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধ হবে এক সভ্যতার সাথে অপর সভ্যতার। আগামী দিনে সভ্যতা বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সংঘাতের কারণ হবে। আর একেই নাম দেয়া হয়েছে "সভ্যতার সংঘাত" নামে। ১৯৯৬ সালে উপরিউক্ত বিশ্বব্যবস্থার অনুকল্প হিসেবে "The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order" নামে হান্টিংটনের একটি বিখ্যাত বই প্রকাশিত হয়।
এই বইয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে কীভাবে পুনর্গঠন করা যায় এবং কীভাবে সাজানো যায় এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করেন। হান্টিংটনের এই থিওরি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তার পরবর্তী দুই দশকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণয়ন করেছে। বইয়ে মোট ৮টি সভ্যতার কথা বলা হয়েছিল। বিশ্বের সকল রাষ্ট্র তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে এই আটটি সভ্যতার ছত্রছায়ায় একত্রিত হবে। এদের মধ্যকার দ্বন্দ্বই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে।
সভ্যতাগুলো হলো: ১. পশ্চিমা সভ্যতা: যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা, পশ্চিম এবং মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ওশেনিয়া এবং ফিলিপাইন। সবগুলোই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র। ২. ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতা: মেক্সিকো, কিউবা, গায়ানা, সুরিনাম-সহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমূহ। ৩. স্লাভিক-অর্থোডক্স বিশ্ব: মুসলিম অধ্যুষিত আজারবাইজান এবং আলবেনিয়া বাদে সাবেক সোভিয়েত সংঘের দেশসমূহ। এছাড়া সাবেক যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, জর্জিয়া, গ্রীস এবং রোমানিয়া। ৪. মুসলিম সভ্যতা: বিশ্বের সকল মুসলিম দেশগুলো নিয়ে। বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক, বাংলাদেশ, বসনিয়া, হার্জেগোভেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সাউথ সুদান, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপ। মুসলিম বিশ্বের এই রাষ্ট্রগুলো ইসলামি সভ্যতার ছায়াতলে থাকবে। ৫. সিনিক বা চীনা সভ্যতা (Sinic Civilization): চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান। ৬. সাব-সাহারান আফ্রিকান সভ্যতা: আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো বাদে সাব- সাহারান আফ্রিকার খ্রিষ্টান দেশসমূহ। ৭. জাপানিজ সভ্যতা। ৮. হিন্দু সভ্যতা।
আটটি সভ্যতা উল্লেখ করলেও হান্টিংটন মনে করেন দ্বন্দ্ব হবে মূলত তিনটি সভ্যতাকে কেন্দ্র করে। এই তিনটি হলো: 'পশ্চিমা সভ্যতা, 'ইসলামি সভ্যতা' এবং 'চীনা সভ্যতা'। পশ্চিমা সভ্যতা বাকি দুইটি সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ইসলামি সভ্যতার এবং পশ্চিমা সভ্যতার সাথে চীনা সভ্যতার দ্বন্দ্ব। একটি সময় পর চীনা ও ইসলামি সভ্যতা একসাথে হয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়বে। চীনের সাথে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়বে এটাকে তিনি "Sino-Islamic connection" হিসেবে দেখিয়েছেন।
হান্টিংটন বলেন, 'পশ্চিমের কাছে সমস্যা ইসলামি মৌলবাদ নয়, সমস্যা হলো ইসলামি ধর্ম যা আলাদা একটি সভ্যতার জন্ম দিয়েছে'। হান্টিংটন তার তত্ত্বে সম্ভাব্য ৩য় বিশ্বযুদ্ধের রূপরেখা দিয়েছেন, যেটি মুসলিম বিশ্বের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সংঘটিত হবে, আর মুসলিম বিশ্বের সাথে থাকবে চীন অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে থাকবে ভারত। হান্টিংটনের উদ্বেগের জায়গা হলো, ক্রমান্বয়ে পশ্চিমা সভ্যতা কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে জনসংখ্যার দিক থেকে, মুসলিম এবং ল্যাটিন অভিবাসীদের কারণে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও।
তাঁর মতে মুসলমানদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার এবং চীনের সামরিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পশ্চিমা সভ্যতাকে হুমকির সম্মুখীন করছে। তবে এডওয়ার্ড সাঈদ এবং নোয়াম চমস্কি এই তত্ত্বের অন্যতম সমালোচক। হান্টিংটন সভ্যতাগুলোর মধ্যে যে বিভাজন টেনে দিয়েছেন সেটার সুনির্দিষ্টভাবে অ্যাকাডেমিক অঙ্গন থেকে প্রথম প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড সাঈদ। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, আমরা এখন বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি। তাই পৃথিবীর আকারও ছোট হয়েছে। এখন মানুষ সভ্যতাকেন্দ্রিক আলাদা আলাদা বসবাস করছে না। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে। যেমন- এক যুক্তরাষ্ট্রেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত লোকজন একসাথে বসবাস করছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা নাগরিক হতে শুরু করে মুসলিম আমেরিকান নাগরিক, আফ্রিকান আমেরিকান নাগরিক, হিস্প্যানিক আমেরিকান নাগরিক, তথা সবাই একসঙ্গে বসবাস করছে। সভ্যতার মধ্যে সংঘাত যদি হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রথম সংঘাত হওয়ার কথা ছিল। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, সংঘাত এড়ানোর যে অনেক উপাদান রয়েছে হান্টিংটন সেগুলোকে অবজ্ঞা করে গিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বায়ন, আন্তঃনির্ভরতা, সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো হান্টিংটনের নজরে পড়েনি। সেমুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের প্রত্যুত্তরে এডওয়ারড সাঈদও "Clash of Ignorance" (অবজ্ঞার সংঘাত) নামে আরেকটি বই লিখেন।
আমেরিকার সমালোচক নোয়াম চমস্কির মতে, সাম্রাজ্যবাদ শক্তির বিস্তার বা তেল সম্পদের লণ্ঠনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে যায়েজ করার জন্য মার্কিন প্রশাসন ইসলামি সভ্যতাকে সন্ত্রাসবাদের লেবাস পরিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। হান্টিংটনের থিওরি প্রচুর সমালোচিত হলেও কিছু কারণে একুশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসেও প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।
১. Two forms of conflict: হান্টিংটন দুই ধরনের সংঘাতের কথা বলেছেন। প্রথমটি হলো "Fault line conflicts"। এর মানে হচ্ছে দুটি রাষ্ট্র পাশাপাশি অবস্থিত কিন্তু তাদের সভ্যতা ভিন্ন। যেমন ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। ভারত হিন্দু সভ্যতার, আর পাকিস্তান মুসলিম সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত। ভারত-চীন দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও একই। এই সংঘাতটা হবে স্থানীয় পর্যায়ে। অর্থাৎ একই অঞ্চলের পাশাপাশি অবস্থিত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সংঘাত। হান্টিংটনের দ্বিতীয় সংঘাতটি হচ্ছে “Core state conflicts"। এর মানে হলো বৈশ্বিক পর্যায়ের সংঘাত। যেমন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। চীনের অবস্থান এশিয়াতে আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমেরিকা মহাদেশে। হান্টিংটনের বর্ণিত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই দুই ধরনের সংঘাতই বর্তমানে বেশি হচ্ছে।
২. Sino-Islamic connection: হান্টিংটন বলেছিল চীনা সভ্যতা ও মুসলিম সভ্যতা একসাথে হয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এটা তো আজকের দুনিয়ায় অস্বীকার করা যাবে না। এটা বরং সত্যি হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, কাতার আজ চীনের বলয়ে। এখানে হান্টিংটনের থিওরি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও ধীরে ধীরে চীন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
৩. Theory of "band-wagoning": 'Band Wagoning' পরিভাষাটির মানে হলো, যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে লাভ ক্ষতি হিসেব-নিকেশ করা। যুদ্ধ শুরু করলে আমার লাভ হবে কতটুকু এবং ক্ষতি হবে কতটুকু (Cost Benefit Analysis)। যদি লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয় তাহলে যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়াটাই উত্তম। এটাই ব্যান্ডওয়াগনিং তত্ত্বের মূল কথা। হান্টিংটন বলেছিলেন সংঘাত এড়াতে অন্যান্য দেশগুলোর উচিত পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে মেনে নেওয়া। তাঁর মতে যদি নিজেকে রক্ষা করার মতো শক্তি-সামর্থ্য না থাকে তাহলে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টক্কর দিয়ে পুরো দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজকের ইরাকের এই দুরবস্থার জন্য অর্ধেক দায়ী সাদ্দাম হোসেনের হটকারিতা আর অর্ধেক দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে সাদ্দাম হোসেনের নিজ শক্তি সামর্থের কথা আমলে নেওয়া উচিত ছিল।
৪. War against Terrorism: সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বে যেটা বলা হয়েছিল সেটা গত বিশ বছরে মুসলিম বিশ্বে প্রতিফলিত হয়েছে। আফগানিস্তান, বসনিয়া, কসোভো, চেচনিয়ার উদাহরণ তো এই তত্ত্বের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। টুইনটাওয়ার হামলার পর ওসামা বিন লাদেনকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট বুশের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা সেটা সভ্যতার সংঘাত তত্তেরই প্রতিফলন।
করোনা পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা (World Order After Covid-19)
১৯৯০ এ সোভিয়েত পতনের পর সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব দিয়ে যে নয়া বিশ্বব্যবস্থা শুরু হয়েছিল সেটা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। নয়া বিশ্বব্যবস্থার পর ২০১৯ সাল থেকে পৃথিবীতে নতুন আরেকটি বিশ্বব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে "World Order after Covid-19" নামে। বার্লিন দেয়াল পতনের পরবর্তী সময়ের মতো করোনাসংকট পরবর্তী বিশ্বের চিত্রপট আমাদের সামনে বেশ কিছুটা পরিবর্তিত রূপেই হাজির হয়। তার কিছু চিত্র তুলে ধরা যাক-
Multipolar System বা বহু-মেরু ব্যবস্থা: করোনা পরবর্তী বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের রাজনীতি কোনো একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্বের নেতা হিসেবে উত্থান হয়েছে আঞ্চলিক শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যেমন- দক্ষিণ এশিয়াতে আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও পাকিস্তান। দূরপ্রাচ্যে চীন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, কাতার ও ইসরায়েল। ইউরোপে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইতালি। উত্তর আমেরিকায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। ল্যাটিন আমেরিকায় ব্রাজিল, চিলি ও পেরু। আফ্রিকায় মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইথিওপিয়া ইত্যাদি। কূটনৈতিক অঙ্গনে উপরিউক্ত দেশগুলোর নামই বেশি শুনা যাচ্ছে। করোনা পরবর্তী বহু-মেরু ব্যবস্থা (Multipolar System) সবচেয়ে বেশি জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-সহ অতীতে যারা বিশ্বের মোড়ল ছিল তারা করোনাকালে বিশ্বকে মোটেই নেতৃত্ব দিতে পারেনি। তাঁদের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগও পাওয়া যায়নি, যা বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে কোভ্যাক্স গঠিত হলেও রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপাক্ষিকতার উপর বেশি প্রাধান্য পাওয়ায় সেটাও ব্যর্থ হয়েছে। যা বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদলের তাগিদ দিয়েছে ভবিষ্যৎকে। যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের জায়গায় চীন-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের দিকে ঝুঁকেছে অর্থনীতি।
Covid Nationalism (করোনা-জাতীয়তাবাদ): করোনার সংক্রমণে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে নিজ নিজ সীমান্ত নিয়ে সচেতন হয়ে গেল, তাতে মার্শাল ম্যাকলুহান 'বিশ্বগ্রাম' এর যে ধারণা দিয়েছিলেন তা একটু হলেও সর্বজনীনতা হারিয়েছে। করোনা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিটি দেশ কীভাবে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, বন্ধ করে দিয়েছে বিমান চলাচল। সীমানাবিহীন রাষ্ট্রের (Borderless State) যে ধারণা নিয়ে বিশ্ব আগাচ্ছিল তা অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা চলমান থাকার সম্ভাবনা প্রবল। খোদ 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন'ও এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি; বরং ইউনিয়নভুক্তরা একে অপরের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার চেষ্টায় ছিল। এভাবে এক দেশ অন্য দেশের জন্য সীমানা বন্ধ করে দেওয়ার যে প্রবণতা চালু হয়েছে সেটাকে বলা হয়েছে 'Covid Nationalism' বা 'করোনা-জাতীয়তাবাদ'। করোনাকালে ইতালি ও সার্বিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলো অসহায় হয়ে পড়লে ইউরোপীয় অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। এটা মূলত ইউরোপীয় ঐক্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে আঞ্চলিক মেরুকরণ বেড়েছে ও কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।
The rise of surveillance state (গণ-নজরদারির রাষ্ট্র): মহামারি পরবর্তী এক গণ- নজরদারি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে সরকার প্রতিটি নাগরিকের প্রতিটি মুহূর্তের চলাফেরা শুধু নয়, তার আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দের খবরও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারির মতে, মহামারির সময় লকডাউন, নজরদারি, বিধিনিষেধ, ট্র্যাকিং ইত্যাদি যেসব স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ রাষ্ট্র নিয়েছিলো, সেগুলো এখন রাষ্ট্রের পাকাপাকি ব্যবস্থায় পরিগনিত হওয়ার প্রবণতা প্রবল। আর সেই পথ ধরে উত্থান হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়নে ২৪ কোটি জনগণের উপর সার্বক্ষণিক নজরদারির কোনো সুযোগ রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির ছিল না। কারণ তখন প্রযুক্তিগত এত উন্নতি ছিল না। তাই কেজিবিকে নির্ভর করতে হতো তাদের এজেন্টদের উপর। কিন্তু এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এমন প্রযুক্তি এসে গেছে যা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আজকে চীনে সব মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হচ্ছে। চেহারা চিনতে পারে এরকম লাং লাখ ক্যামেরা দিয়েও নজর রাখা হচ্ছে মানুষের উপর। একুশ শতকের বিশ্বে এভাবে গণ নজরদারিমূলক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটছে, যেটাকে "Nightmarish Surveillance State হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
তাছাড়া করোনাকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছিল অন্য আরেকটি রাষ্ট্রেকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম হাতিয়ার। উন্নত দেশগুলো ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছে। এমনকি চীন তার ভ্যাকসিন সরবরাহ করার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছে যে রাষ্ট্রগুলো চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অংশ সে রাষ্ট্রগুলোকে। ভ্যাকসিন সরবরাহে উন্নত ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল সেটাকে 'Vaccine Apartheid' বা ভ্যাকসিন বর্ণবাদ বলা হয়। পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাসের বিস্তার তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে এক তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে উত্তর-দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বৈষম্য তা প্রকট আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছিল কাউকে নিয়ন্ত্রণ, বশে রাখা, সম্পর্ক উন্নয়ন কিংবা শিক্ষা দেয়ার অন্যতম উপকরণ। এভাবে ভ্যাকসিন এর মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সেই রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসার প্রয়াসকে বলা হচ্ছিল 'Vaccine Imperialism' বা ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যবাদ। ভ্যাকসিন কূটনীতির আবরণে চলছিলে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ।
আগামী বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে এবং সেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে এসব নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের কাজ চিকিৎসা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা নয়, বরং এই করোনাউত্তর সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যে পরিবর্তনটা আসবে, তা দেখিয়ে দেওয়া। আমরা সাধারণত জানি, রাষ্ট্র তার চরম সংকটময় মুহূর্তে 'জরুরি অবস্থা' জারি করার ক্ষমতা রাখে। যেমন- মহামারি ও যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার অধিকার সরকারের রয়েছে। কিন্তু ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেন দেখিয়েছেন, জরুরি অবস্থা এখন আর 'স্টেট অব এক্সসেপশন' তথা নিয়মের 'ব্যতিক্রম' নয়, সদা সর্বদা জরুরি অবস্থাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহামারি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে শাসকশ্রেণি যেভাবে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিজীবনে হস্তক্ষেপ ও সার্বক্ষণিক নজরদারি করেছে ঠিক তেমনি 'জরুরি অবস্থা' ঘোষণা ছাড়াই প্রতিনিয়ত শাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে একই কাজ করে।
'State of Exception' শিরোনামে জর্জিও আগামবেন ২০০৭ সালের দিকে একটি বইও লিখেছেন। মোটাদাগে এই প্রত্যয়টি দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের কিছু অধিকার থাকে, যা রাষ্ট্র আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়েও খর্ব করতে পারে না। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে সরকার সাংবিধানিকভাবেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, যেখানে এসব অধিকার বাতিল করা হয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেখা যায়, সরকার সবসময়ই একধরনের অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রাখে এবং মানুষের অধিকার খর্ব করে এবং প্রচার করা হয় যে, মানুষের ভালোর জন্যই এ কাজ করা হচ্ছে।
আগামবেনের আরও একটি বিখ্যাত ধারণা রয়েছে যা 'Naked Life' বা 'নগ্ন জীবন' হিসেবে পরিচিত। এই ধারণাটি তার 'হোমো সাকের' বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এর মানে হচ্ছে মানুষের জীবন এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে শুধু বেঁচে থাকাটাই আসল। এখানে আগামবেন বলতে চাচ্ছেন, করোনা মহামারির কারণে মানুষ গৃহবন্দী হয়েছিলো, তাতে মানুষের জীবন এমন অবস্থাতেই রূপান্তরিত হয়েছিলো। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বজুড়ে কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন এবং সরকারি মনিটরিং- এই পলিসিগুলো বিদ্যমান, এবং এসবের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কতদিন পর্যন্ত থাকবে, আমরা কেউই বলতে পারছি না। দীর্ঘ সময় ধরে এসব বিদ্যমান থাকায় জনগণের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এসেছে, যা মানুষকে সরকার কর্তৃক প্রণীত যে-কোনো আইন বা পলিসিকে গ্রহণ করতে সহজলভ্য করে তুলেছে। মহামারির নামে, জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার বাহানা দিয়ে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ও কৌশলগুলো আরও নিখুঁত হয়েছে এখন। সেজন্যই আতঙ্ক বা প্যানিক তৈরি করা হয়। প্রতিটি ব্যক্তিকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলার মধ্য দিয়ে এমন একটি অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সেটা আর ব্যক্তির পর্যায়ে না থেকে সামষ্টিক বা সামাজিক আতঙ্কে পরিণত হয়। নৈরাশ্যবাদীরা মনে করছে আধুনিক কালের শাসনের ধরনই হচ্ছে মানুষকে Naked Life এ বা নগ্ন জীবনে পর্যবসিত করা।
সারা বিশ্ব যখন মিল্টন ফ্রিডম্যানের মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও জন মেইনার্ড কেইন্সের সংশোধনবাদী বা হস্তক্ষেপবাদী অর্থনীতির যোজন দ্যোতনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এবং প্রযুক্তিগত সফলতার ধারাবাহিকতায়, এমনকি বিজ্ঞান যখন মহাকাশে বসবাসের কথাও ভাবছে, তখনই এই নভেল করোনাভাইরাস এসে প্রশ্ন তুলেছে নয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে, নব্য উদারবাদ নিয়ে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে, স্বাস্থ্যখাতের সফলতা নিয়ে, বাজার ব্যবস্থায় অ্যাডাম স্মিথের অদৃশ্য হাত নিয়ে এবং দেখিয়ে দিয়েছে, নিউক্লিয়ার অস্ত্র নয়, বরং জীবাণুই হবে আগামী বিশ্বের অদৃশ্য শত্রু। করোনাউত্তর সময়ে সারা বিশ্ব যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে, তা সমসাময়িক অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করেই নিচ্ছেন। আগামীর বিশ্বে এই অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় বিভিন্ন দেশের শাসকশ্রেণিকে নিয়মিত বিরতিতে নৈরাজ্য, শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণও তখন রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা (Contemporary World Order): করোনাউত্তর বিশ্বব্যবস্থায় নতুন আরেকটি মাত্রা যুক্ত করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী মস্কোর কিয়েভ আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। নীতিগত ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের আধিপত্য সমুন্নত রাখার যুদ্ধ। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর এখন যদি এই যুদ্ধ থেকেও পিছু হটতে হয়, তাহলে সেটা হেজিমনিক প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। অপরদিকে রাশিয়া এই যুদ্ধকে দেখছে একটি 'বৃহত্তর রাশিয়া' গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে। নিজেদের অতীত ঐতিহ্যের (Great Power Status) পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে, রাশিয়া যে রুশ সাম্রাজ্য বা ইউরেশিয়া সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা ভাবছে সেটা এই যুদ্ধ থেকে মুটামুটি স্পষ্ট। ইউক্রেনকে ভাবা হচ্ছে 'New Russia' হিসেবে। কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনগুলোর দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এসব আগ্রাসনের পেছনে রাশিয়ার ভৌগোলিক দুরভিসন্ধি রয়েছে। ২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণ, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, ২০২০ সালে বেলারুশে সামরিক আগ্রাসন, ২০২২ সালে কাজাখস্তান আক্রমণ এবং সর্বশেষ ইউক্রেনে আক্রমণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, পুতিনের মস্তিষ্ক খ্যাত আলেকসান্দর দুগিন নয়া রুশ সাম্রাজ্যের যে ধারণা দিয়েছিলেন, সেই পথেই হাটছে আজকের রাশিয়া। একদিকে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী নয়া বিশ্বব্যবস্থার মতো ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য ধরে রাখার প্রশ্ন, অন্যদিকে রাশিয়ার ইউরেশিয়া সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ধরে রাখার সংগ্রাম হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে পূজিঁবাদী মতাদর্শ নিয়ে, নাইন ইলাভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ডিসকোর্স নিয়ে, আর আজকের কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই নিয়ে। তৃতীয়ত, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উপজাত হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মিটাতে কিংবা Kitchen Table Issues নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বিগ্নতা, বৈশ্বিক বিনিয়োগে Speculation বা Bad Expectations এর নেতিবাচক প্রভাব, উত্তরের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর Recessionary Path এর মধ্য দিয়ে যাওয়া, বিশ্বজুড়ে Inflation Rate ও Unemployment Rate বৃদ্ধি পাওয়া, ইকোনমিক পাওয়ার হাউজগুলোতে Industrial Production হ্রাস পাওয়া, Consumer Spendings কমে যাওয়া ইত্যাদি নিদর্শন আমাদেরকে বৈশ্বিক মহামন্দার মতো বড় একটি সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামসময়িক বিশ্বে ঘটে যাওয়া এই পরিবর্তনগুলোকেই আমরা 'Cosmic Play' বা 'বড় ধরনের বৈশ্বিক পরিবর্তন' হিসেবে দেখছি।
চতুর্থত, আমেরিকার পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট রবার্ট কিয়োহেন "After Hegemony" নামে যে বয়ান উপস্থাপন করেন, বর্তমান বিশ্ব সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে কিনা সেটাও এখন আলোচনায়। কিয়োহেন এর মতে, বিশ্বব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন গড়ে তুলছে একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক জোট। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একুশ শতকের চীনকে মোকাবেলায় গড়ে উঠেছে IPAC বা Inter-Parliamentary Alliance on China, অকাস, I2U2, Build Back Better World, ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক, কোয়াড, PBP বা Partners in the Blue Pacific এর মতো সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় চীনের নেতৃত্বে ব্রিকস ও সাংহাই জোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এশিয়া এবং আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে হাজির হয়েছে, যেটাকে "New Regionalism" বলা হচ্ছে। এই সংস্থার মাধ্যমে মধ্য এশিয়া হতে যাচ্ছে রাশিয়ার বিকল্প বাজার এবং মধ্য এশীয় দেশ কাজাখস্তানের মাধ্যমে চীনের জন্য বিনা বাধায় স্থলপথে ইউরোেপ পর্যন্ত বাণিজ্য রুট সম্প্রসারণের পথ সুগম হয়েছে।
ব্রাজিলে রেজিম পরিবর্তন হয়ে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী লুলা ডি সিলবার ক্ষমতায় ফিরে আসা, সৌদি-ইরানের ব্রিকস জোটে অংশগ্রহণ, গ্লোবাল সাউথকে কেন্দ্র করে ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ ইত্যাদি পশ্চিমা আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে। আগামী দিনে বিশ্বব্যবস্থায় ডলারের বিপরীতে যদি কোন শক্তিশালী মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, সেটা হয়তো এই ব্রিকস জোটের হাত ধরেই হবে। একইভাবে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র 'Chain Ganging' প্রক্রিয়ায় সংঘাতে জড়ালেও বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের একক সুপারপাওয়ার বা হেজিমনি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু রাশিয়া নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনিক প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন। Bipolar World Order বা স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বব্যবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের জোট গঠন করলেও আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে জোট গঠনের প্রতিযোগিতা চলছে উভয়ের মধ্যে একটি সুক্ষ পার্থক্য রয়েছে। সেটি হচ্ছে কনটেম্পোরারি বিশ্বে গঠিত হওয়া এই জোটগুলোতে পরস্পরবিরোধী রাষ্ট্রগুলোও একই জোটের সদস্য হতে দেখা যায়নি। ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র, আবার যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ব্রিকস জোটেরও সদস্য। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হওয়া কোয়াডের সদস্য রাষ্ট্র, আবার একইসাথে রাশিয়া ও চীনের জোট সাংহাই কোঅপারেশন সংস্থারও সদস্য। তুরস্ক ন্যাটো জোটের অন্যতম সদস্য হওয়া সত্ত্বেও চীন ও রাশিয়ায় সঙ্গেও উঞ্চ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তিন দশকের মিত্র রাষ্ট্র, আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অগ্রাহ্য করে ওপেক প্লাসের নেতৃত্বে তেল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান তিন ধরনের ছিলো; হয় পুজিঁবাদী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে, না হয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে পক্ষে, না হয় নিরপেক্ষ বা Non Alignment Movement এর পক্ষে। অর্থাৎ, তখন রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান স্পষ্ট থাকলেও সামসময়িক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান অনেকটা অস্পষ্ট। ফলশ্রুতিতে বলা হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা আরো তীব্র হবে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই Strategic Ambiguity বা কৌশলগত অস্পষ্টতা বিশ্বের সংকটগুলোকে সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘায়িত করণে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে।
📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহ
ভূমিকা : কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা রয়েছে, যা নিয়ে আমরা প্রায়ই দ্বিধান্বিত থাকি। যেমন আমরা অনেকে State এবং Country এর মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারি না। বুঝতে পারি না যে Power এবং Authority এর মধ্যে মূল তফাত কী। Government এবং Governance এর মধ্যে পার্থক্যের জায়গাটি আসলে কোথায়। আমরা অনেকে এটিও জানি না যে Regionalism এবং Regionalization এর মধ্যে অনেক মিল থাকা সত্ত্বেও কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আমরা বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেক পরিভাষা ব্যবহার করলেও ব্যবহৃত এই পরিভাষাগুলো সাধারণত একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু এদেরও বিভিন্ন আঙ্গিক বা দৃষ্টিকোণ রয়েছে তা আমরা সামগ্রিকভাবে চিন্তা করি না। এই অধ্যায়ের শেষে পাঠক সমাজ ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পরিভাষা সম্পর্কে জানতে পারবেন। তাছাড়াও পরবর্তী অধ্যায়গুলো বুঝতে এই পরিভাষাগুলো জানা আবশ্যক।
Country and State
বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা ভূখণ্ড থাকে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক যে সীমানাটি রয়েছে সেটিকে বলা হয় দেশ। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের যে ভূখণ্ডটি রয়েছে এটিকে বলা হয় দেশ। কিন্তু যখন এই ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী মানুষগুলো রাজনৈতিকভাবে আইনকানুন প্রণয়ন করা হয়, যখন ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী এই মানুষগুলোকে আইনকানুন বা নিয়মনীতি ইত্যাদি মানতে বাধ্য করাতে কিছু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তখন সেটিকে রাষ্ট্র বলে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলতে মূলত বোঝায় পলিটিক্যাল পার্টি, সরকার, পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইত্যাদি। এক কথায়, দেশ হলো শুধু একটি ভূখণ্ড, আর সেই ভূখণ্ডটি যখন আইনকানুন, সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সমন্বয়ে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত হয় তখন তাকে রাষ্ট্র বলে।
রাষ্ট্রের উপাদান হিসেবে ভূখণ্ডের গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশ কতটা শক্তিশালী সেটি অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একটি দেশের ভূখণ্ড (Territory)। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, চীন, ইরান, সৌদি আরব, ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। মানচিত্রে নজর দিলে দেখা যায় যে, এই সবগুলো রাষ্ট্রই ভৌগোলিকভাবে বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী। পুরো মানচিত্র যেন এরাই দখল করে রেখেছে। প্রশ্ন হতে পারে Large territory থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিশাল ভূখণ্ড থাকা চারটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
১. বিশাল ভূখণ্ড থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণও বেশি থাকে।
২. বিশাল ভূখণ্ডের কারণে অনেক বেশি কলকারখানা তৈরি করা যায়। খাদ্যশস্য উৎপাদন কিংবা চাষাবাদের জন্যও বিস্তর ভূমি পাওয়া যায়।
৩. সাধারণত দেশের সীমানা অনেক বড় হলে জনসংখ্যাও বেশি থাকে। যত বড় ভূখণ্ড ততবেশি জনগণ, আর যত বেশি জনগণ ততবেশি সেনাবাহিনী গঠন করা যায়।
৪. একটি দেশ যখন বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী হয় তখন সে দেশটি মিলিটারিদের বিভিন্ন গোপন প্রশিক্ষণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প তৈরি করতে পারে এবং বিভিন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে।
এই বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করি। যেমন- সিঙ্গাপুর, কাতার, দুবাই, মোনাকো, হাঙ্গেরি, লিচেনস্টাইন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বে অনেক শক্তিশালী। কিন্তু এসব রাষ্ট্রের সীমানা বা ভূখণ্ড অনেক ছোট। জনসংখ্যাও অনেক কম। যে কারণে তারা আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও সামরিকভাবে অতটা শক্তিশালী হতে পারছে না। আর সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে না পারলে ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে আপনার প্রভাব কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।
Power and Authority
এবার আসি Power ও Authority এর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে। অন্য আরেকটি মানুষকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা কাউকে আমার কথামতো চলতে বাধ্য করার যে সক্ষমতা সেটিকে Power (ক্ষমতা) বলা হয়। অন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার কিংবা কথা শুনতে বাধ্য করার মাধ্যমটি যখন বৈধ হয় এবং আইন অনুযায়ী হয় তখন সেটিকে কর্তৃত্ব (Authority) বলে। যেমন- একজন পুলিশের কথাই ধরুন। সে আপনাকে ট্রাফিক আইন মান্য করতে বাধ্য করায়, ট্রাফিক আইন না মানলে পুলিশ আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, আপনার থেকে জরিমানা নিতে পারে। এই যে পুলিশের আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারা কিংবা আপনার থেকে জরিমানা নেওয়ার যে সক্ষমতা সেটি আমাদের আইনে আছে। তাই পুলিশের এই Power টিকে বলা হয় Authority (কর্তৃত্ব)। এক কথায়, আইনকানুন ও সংবিধান অনুযায়ী বৈধ ক্ষমতাকেই বলা হয় Authority বা কর্তৃত্ব। তথা ক্ষমতা বৈধ ও অবৈধ দুটোই হতে পারে কিন্তু কর্তৃত্ব অবশ্যই বৈধ হতে হবে।
Political Power and Politics
আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নিয়মনীতি, আইনকানুন তৈরি করার মাধ্যমে দেশের সকল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালিত করার ক্ষমতাকে বলা হয় Political Power বা রাজনৈতিক ক্ষমতা। তাই আপনি যদি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান, কিংবা আপনার মতো করে রাষ্ট্রের আইনকানুন তৈরি করতে চান, তাহলে আপনার Political Power বা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন। অর্থাৎ আপনি যদি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা নিজের মতো করে সাজাতে চান, যদি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়মনীতি তৈরি করতে চান কিংবা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে চান, তাহলে আপনার প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা (Political Power)।
এখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই রাজনৈতিক ক্ষমতাটি অর্জন করার জন্য এবং আপনার মতাদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য আপনার প্রয়োজন সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল (Political Party) গঠন করা। রাজনৈতিক দল গঠন করার পর আপনাকে মিছিল-মিটিং, সভা-সেমিনার, ক্যাম্পেইন, প্রচারণা ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের আপনার পক্ষে নিয়ে আসতে হবে। তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে আপনাকে রাজনৈতিক ক্ষমতাটি অর্জন করতে হবে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আপনি যখন প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন তখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতাটি সংবিধান অনুযায়ী আপনার হয়ে গেল।
এই ক্ষমতা বলে এবং সংবিধান মেনে আপনি এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি, আইন, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি তৈরি করতে পারবেন। এই যে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইচ্ছে পোষণ করা, রাজনৈতিক দল গঠন করা, সভা-সেমিনার-মিছিল-মিটিং করে জনসমর্থন আদায় করা, সবশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতাটি দখল করা, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে (Process) বলা হয় Politics বা রাজনীতি। আরও সহজ করে বললে Politics হলো রাষ্ট্রের নিয়মনীতি প্রণয়ন করার এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision Making) করার সক্ষমতা অর্জন। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড ল্যাসওয়েলের মতে, “Politics is the process of who gets what, when and how."
Government and Governance
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যে কাজটি করতে হয় সেটি হচ্ছে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা, মন্ত্রীদের নিয়ে আলাপআলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, সংসদে বিল উত্থাপন করে রাষ্ট্রের আইনকানুন প্রণয়ন করা ইত্যাদি। এই যে সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করার মাধ্যমে এবং সংসদে পক্ষে বিপক্ষে ডিবেট করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পলিসি তৈরি করার পুরো ব্যবস্থাটিকে বলা হয় Government (সরকার)। একটি রাষ্ট্রের পলিসি সাধারণত দুই ধরনের হয়। ০১. Domestic Policy: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও সামাজিক নিয়মনীতি ইত্যাদি। ০২. Foreign Policy: অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারণ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার নীতি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জোটে অংশগ্রহণ করার নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়গুলো পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্ত। আর সরকারের তৈরিকৃত এসব অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক পলিসি বা নিয়মনীতি সরকারি আমলা ও সরকারি প্রতিনিধিদের (Representatives) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাকে বলা হয় Governance বা শাসন।
Sovereign State and Vassal State
একটি রাষ্ট্র যখন তার পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে পারে তখন সেই রাষ্ট্রটিকে বলা হয় Sovereign State (সার্বভৌম রাষ্ট্র)। অর্থাৎ যে রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে সরকারি কার্যনীতি নির্ধারণ করতে পারবে, সেটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলা হয়। পৃথিবীর সবগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রই Sovereign State বা সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে সেটি বাংলাদেশই ঠিক করবে, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চায়নার কথামতো বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাবে না। এই সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল কথা হচ্ছে, সকল বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজ দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা।
উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ যেন কোয়াডে অংশগ্রহণ না করে সেজন্য হুমকি দিয়েছিল চীনা রাষ্ট্রদূত। জবাবে বাংলাদেশ বলেছিল আমরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত কোয়াডে যোগ দেবে নাকি চায়নার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে যোগ দেবে সেটি একান্ত নির্ভর করে বাংলাদেশ-এর উপর। এতে চীন আমাদের হুমকি দিতে পারে না বরং বাংলাদেশ তার স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে অপর কোনো শক্তি প্রভাবিত করতে পারে না। যেমন: পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে ফ্রান্সের কথামতো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে রাশিয়ার কথামতো, ওশেনিয়া মহাদেশের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নাউরু তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে অস্ট্রেলিয়ার কথামতো। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে রাশিয়ার নির্দেশে। তাই গিনি, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও নাউরুকে আমরা Sovereign State বলতে পারি না। অন্যের কথানুযায়ী যেসব রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেগুলোকে কেউ কেউ মুখাপেক্ষী রাষ্ট্র (Vassal State) বলে। কেউ আবার সংজ্ঞায়িত করেছেন অধীন রাষ্ট্র (Tributary State) হিসেবে।
বিশ্বকে বিভক্তকরণ (Three World Model)
বিশ্বকে বিভক্তকরণ প্রক্রিয়াকে অনেকে আবার 'three-world theory'ও বলে থাকেন। সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে বিশ্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
1. First World (প্রথম বিশ্ব): স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পূর্ব ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে প্রথম বিশ্বের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সকল উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়। একটি রাষ্ট্র প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কয়েকটি ক্রাইটেরিয়া রয়েছে; এমন সকল রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্র রয়েছে (Democracy), যেখানে আইনের শাসন রয়েছে (Rule of Law), প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা থাকার কারণে যেখানে রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক কম (Little Political Risk), যে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী (Capitalist Economy), যেসব রাষ্ট্রের মোট জাতীয় উৎপাদন অনেক বেশি (GDP Growth), যাদের শিক্ষার হার অনেক বেশি (Literacy Rate) ইত্যাদি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রগুলোকেই প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়। প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে Big State বা বৃহৎ রাষ্ট্রও বলা হয়। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বের দেশ হতে হলে রাষ্ট্রের সীমানা ছোট না বড় এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। যেমন- সিঙ্গাপুর, কাতার, আরব আমিরাত, লিচেনস্টাইন, অস্ট্রিয়া এসব রাষ্ট্র আয়তনের দিক থেকে ছোট হলেও অন্যান্য দিক থেকে অনেক উন্নত। তাই তারাও প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।
2. Second World (দ্বিতীয় বিশ্ব): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে দ্বিতীয় বিশ্বের দেশ বলা হতো। চীন, লাওস, কিউবা, ভিয়েতনাম ইত্যাদি ১৯টি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখন দ্বিতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্ব বলতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। তথা যে রাষ্ট্রগুলো অধিক পরিমাণে উন্নতও না, আবার একেবারে গরিবও না। উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোকে বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন- ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি।
3. Third World (তৃতীয় বিশ্ব): প্রথম বিশ্ব বলতে “developed”, দ্বিতীয় বিশ্ব বলয়ে "developing”, আর তৃতীয় বিশ্ব বলতে "underdeveloped” রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। তথা যে সব রাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল, যেখানে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষা-দীক্ষায় যে রাষ্ট্রগুলো এখনো পিছিয়ে আছে, সেগুলো মূলত তৃতীয় বিশ্বের কাতারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে আবার Small State বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও বলা হয়। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত এই তিনটি বিশ্ব ছাড়াও বর্তমানে চতুর্থ বিশ্ব নামে আরেকটি বিশ্ব রয়েছে।
Fourth World (চতুর্থ বিশ্ব): চতুর্থ বিশ্বের ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অন্তত হলেও কিছুটা উন্নত। যেমন- বাংলাদেশ একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অনেক দিক থেকেই মোটামুটি উন্নত এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। শিক্ষার হার একসময় কম থাকলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তা এখন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চতুর্থ বিশ্বের দেশ বলা হয় এমন সব দেশকে যাদের শিক্ষার হার ক্রমহ্রাসমান বা স্থির, যাদের রয়েছে একেবারে নিম্ন গড় আয়ু, সম্পূর্ণ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ নির্ভর অর্থনীতি। যেমন- সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদান। তাছাড়াও চতুর্থ বিশ্ব বলতে এমন কিছু জাতিগোষ্ঠীকে বোঝায় যারা আধুনিকতার একেবারে বাহিরে এবং বিশ্বের সাথে যাদের কোন যোগাযোগ নেই। যেমন- আমাজন বনে যে-সকল নৃগোষ্ঠী জাতি বসবাস করে, বিভিন্ন দেশে যেসব যাযাবর শ্রেণি রয়েছে তারাও চতুর্থ বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।
Types of Relationships (সম্পর্কের ধরন)
যখন দুটি সার্বভৌম দেশ একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তখন সেটিকে বলা হয় Bilateral Relationship বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। সম্পর্ক স্থাপন বলতে এক দেশ অপর দেশের সাথে বাণিজ্য, তথ্য আদান প্রদান, একে অপরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ইত্যাদিকে বোঝায়। যেমন- বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এই দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। পরস্পর তিনটি রাষ্ট্র একসাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হলে সেটিকে বলা হয় Trilateral Relationship বা ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক। যেমন তুরস্ক-পাকিস্তান-ইরান এই তিন দেশের সম্পর্ক হলো ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক। কিন্তু যখন তিনের অধিক রাষ্ট্র একসাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হয় তখন সেটিকে Multilateral Relations বা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বলে। যেমন মনে করুন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এই চারটি রাষ্ট্র মিলে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, তখন এই চারটি রাষ্ট্রের যৌথ সম্পর্ককে বলা হয় বহুপাক্ষিক সম্পর্ক।
Regionalism (আঞ্চলিকতাবাদ)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হচ্ছে Regionalism বা আঞ্চলিকতাবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৫০ এর দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তার অংশ হিসেবে আঞ্চলিকতাবাদ ধারণাটি ব্যাপক সাড়া পায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠতে থাকে ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি রাষ্ট্রের একে অপরের বিভিন্ন সাহায্য প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজনে একই অঞ্চলে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলো যখন একতাবদ্ধ হয়ে একটি আঞ্চলিক সংস্থা বা সংগঠন গড়ে তোলে তখন সেটিকে বলা হয় Regionalism বা আঞ্চলিকতাবাদ। অর্থাৎ আঞ্চলিকতাবাদের মূল কথা হচ্ছে একটি অঞ্চলের অনেকগুলো রাষ্ট্র এক ও অভিন্ন একটি প্লাটফর্মে এসে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন এগ্রিমেন্ট বা চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাবাদ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
আঞ্চলিকতাবাদ কেন গুরুত্বপূর্ণ তার কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রথমত, বোঝার সুবিধার্থে মনে করুন, ফ্রান্সের কিছু হ্যাকার স্পেন সরকারের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। এখন এই হ্যাকাররা তো ফ্রান্সের, তাই স্পেনে বসে তাদের বিরুদ্ধে স্পেন সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ঠিক এজন্যই স্পেনের প্রয়োজন ফ্রান্স সরকারের সাহায্য। দ্বিতীয়ত, একই ভাবে মনে করুন, ভারতের কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী ভারত থেকে পালিয়ে গিয়ে মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। এখন এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের প্রয়োজন মিয়ানমার সরকারের সাহায্য। অথবা মনে করুন, বাংলাদেশের কিছু অপরাধী বর্ডার দিয়ে গোপনে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তখন সেই অপরাধীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজন ভারতের সাহায্য। তৃতীয়ত, ধরুন নেপাল ও ভুটানে কোনো ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠী নেই। কিন্তু ভুটান বা নেপালের সীমান্তবর্তী ভারতের যে অঙ্গরাজ্যটি রয়েছে সেখানের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো প্রচুর তৎপর। ধরুন সেখানে কয়েকদিন পরপরই জঙ্গি হামলা হয় এবং সেখান থেকে নেপালেও সহজে হামলা চালানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই নেপাল ও ভুটানে কোনো ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠী না থাকা সত্ত্বেও এই দুটি দেশ তার নিরাপত্তা নিয়ে সংকটে পড়তে হয় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের জঙ্গি গোষ্ঠীদের কারণে। তাই নেপাল ও ভুটানের প্রয়োজন ভারত সরকারের সাহায্য। চতুর্থত, পাশাপাশি অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাণিজ্যিক সুবিধা। যেমন- বাংলাদেশকে তার প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য আমদানি করতে হলে সেটি খুবই কম সময়ে ও কম খরচের মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করতে পারে। ভারতের পণ্য বর্ডার দিয়ে ঢাকা আসতে সর্বোচ্চ চার পাঁচ ঘণ্টা লাগে এবং Transaction Cost বা পরিবহন খরচও কম হয়। কিন্তু ভারতের পরিবর্তে ইউরোপ থেকে পণ্য আমদানি করতে বাংলাদেশের সময়ও লাগে অনেক এবং পরিবহন খরচও অনেক বেশি। একই ভাবে কম খরচে এবং অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য আমদানি রপ্তানি করতে ভারতের প্রয়োজন পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে। পঞ্চমত, আরেকটি বিষয় হচ্ছে মহামারি। দুই দেশের সীমান্তে কাঁটাতার কিংবা দেয়াল তৈরি করে মানুষের যাতায়াত বন্ধ করা যায়। কিন্তু মহামারি কিংবা ভাইরাসের প্রকোপ রোধ করা যায় না। পশুপাখি কিংবা প্রাণীদের মাধ্যমে এক দেশের ভাইরাস তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এসব ভাইরাস মোকাবিলায় একে অপরের সাহায্য প্রয়োজন। পাবলিক হেলথ (Public Health) কোনোভাবেই একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রের ব্যাপার না, এটি পুরো অঞ্চলের এমনকি পুরো বিশ্বের ব্যাপার। ষষ্ঠত, আমার প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আমরা কেউই নিরাপদে থাকব না। মনে করুন ভারত-পাকিস্তান হঠাৎ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। তখন পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান কেউই নিরাপদে থাকবে না। তাই দুটি দেশকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসতে হয়। সাইবার সিকিউরিটি, জঙ্গিবাদ দমন, কম খরচের বাণিজ্য, সংকটে খাদ্য সামগ্রীর সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজনেই দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশ মিলে গড়ে তুলেছে আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক (SAARC)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মিলে গড়ে তুলেছে তাদের আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ান (ASEAN)। ইউরোপীয় দেশগুলো গড়ে তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)। আফ্রিকার দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন ইত্যাদি।
উপ আঞ্চলিকতাবাদ (Sub Regionalism)
এটির মানে হচ্ছে সংস্থার ভিতরে সংস্থা। একটি আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে অনেকগুলো সদস্য রাষ্ট্র থাকে। আঞ্চলিকতাবাদের নিয়ম হচ্ছে, যখনই কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি করবে তখন সদস্যভুক্ত সবগুলো রাষ্ট্র একসাথে মিলে সেটি করবে। কিন্তু একটি সংস্থার সবাইকে অন্তর্ভুক্ত না করে যখন সেই সংস্থার তিন বা চারটি রাষ্ট্র মিলে আলাদাভাবে কোনো চুক্তি সম্পন্ন বা সম্পর্ক তৈরি করে তখন সেটিকে বলা হয় Sub Regionalism বা উপ আঞ্চলিকতাবাদ। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সার্ক হচ্ছে আঞ্চলিকতাবাদের একটি উদাহরণ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো রাষ্ট্র নিয়েই সার্ক গঠিত। এখন এই সার্কের মোট ০৮টি সদস্যের মধ্য থেকে যখন তিন বা চারটি সদস্য রাষ্ট্র মিলে আলাদা একটি কোরাম গঠন করবে তখন সেটিকে বলা হয় Sub Regionalism বা উপ আঞ্চলিকতাবাদ। 'BBIN' হলো উপ আঞ্চলিকতাবাদের একটি অন্যতম উদাহরণ। যার পূর্ণরূপ হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল সংযুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সার্কভুক্ত চারটি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সড়ক বা রাস্তা গড়ে তোলা। তথা সার্কের সদস্য রাষ্ট্র মোট আটটি হলেও এই BBIN প্রকল্পে মাত্র চারটি রাষ্ট্র রয়েছে। তাই এটি যেন একটি বড় সংস্থার মধ্যে আরেকটি ছোট সংস্থা।
Trans Regionalism
যখন দুইটি ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে কোনো এগ্রিমেন্ট বা চুক্তি বা সম্পর্ক স্থাপিত হয় তখন সেটিকে 'Trans Regionalism' বলা হয়। যেমন- সার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যদি সম্পর্ক গড়ে ওঠে বা এই দুটি আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তখন সেটিকে Trans Regionalism বলা হবে। কারণ সার্ক হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হচ্ছে ইউরোপের আঞ্চলিক সংস্থা। তথা দুটি ভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মধ্য যে চুক্তি বা সম্পর্ক সেটিই ট্রান্স রিজিওনালিজম।
Regionalization (আঞ্চলিকীকরণ)
একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে যখন অর্থনৈতিক লেনদেন, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য (cross-border flow of capital), জন যাতায়াত (People Mobility), যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় (Cultural Exchange) ইত্যাদি ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায় তখন সেটিকে বলে Regionalization বা আঞ্চলিকীকরণ। উদাহরণস্বরূপ: যদি আমরা ইউরোপীয় অঞ্চলের কথা বিবেচনা করি তখন দেখা যায় যে, সেই অঞ্চলের অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া ইত্যাদি সকল রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে মানুষ যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে। এই যে একই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে জন যাতায়াত বা People Mobility বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটাই আঞ্চলিকীকরণ। আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিউজিক, নাচ, মুভি, পপ কালচার ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তথা আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো আত্মস্থ করছে। এটিও আঞ্চলিকীকরণ (Regionalization) এর উদাহরণ। উল্লেখ্য, আঞ্চলিকীকরণ (Regionalization) এবং আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism) এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যও রয়েছে।
পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো কোনো কমন প্লাটফর্মে এসে তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কোনো অফিশিয়াল চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন সেটিকে বলা হয় আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism)। তথা আঞ্চলিকীকরণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অফিশিয়াল সম্পর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আঞ্চলিকতাবাদ হতে হলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অফিশিয়াল সম্পর্ক থাকাটি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- সার্ক এর গঠনতন্ত্র রয়েছে। সবগুলো রাষ্ট্র এই গঠনতন্ত্র মানতে বাধ্য।
ফাংশনালিজম তত্ত্ব (Functionalism Theory)
একটি জিনিস কার্যকর হতে হলে অন্য একটি জিনিসের উপর নির্ভর করতে হয়। এমনিভাবে একাধিক উপাদান যখন একে অপরের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে কার্যকর হয়ে ওঠে তখন সেটিকে বলে ফাংশনালিজম। আমাদের সমাজে বিভিন্ন সামাজিক উপাদান বিদ্যমান। যেমন- পরিবার (Family), সামাজিক প্রতিষ্ঠান (Social Institutions), আইন (Laws), প্রথা (Norms), মূল্যবোধ (Values) ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোর সমন্বয়ে একটি সমাজ পরিচালিত হয় বা ফাংশন করে। আর এটাই ফাংশনালিজমের মূল কথা। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম এর মতে, একটি সমাজের মূল ভিত্তি পরিবার। আর এই পরিবার গঠনে পুরুষ ও নারী একে অপরের উপর নির্ভরশীল। শুধু একজন পুরুষ বা শুধু একজন নারীর মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয় না অথবা পরিবারটি ফাংশন করে না।
একই ভাবে আমরা যদি কোনো কারখানার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই শ্রমিক এবং মালিক একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একজন কারখানার মালিকের যতই অবকাঠামোগত সামর্থ্য থাকুক না কেন শ্রমিক ছাড়া তার কারখানাটি সে চালাতে পারে না। অর্থাৎ শ্রমিক ছাড়া তার কারখানাটি ফাংশন করে না। তেমনিভাবে শ্রমিকরাও নির্ভরশীল কারখানার মালিকের উপর। কারণ কারখানায় কাজ করার মাধ্যমেই তারা তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থাটি করতে পারে। এই যে একটি পরিবার ফাংশন করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং একটি কারখানা ফাংশন করার ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সেটিকেই এমিল ডুর্খেইম আখ্যায়িত করেছেন Organic Solidarity হিসেবে। এই Organic Solidarity ই হচ্ছে ফাংশনালিজম তত্ত্বের সারকথা।
ঠিক একই ভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ফাংশনালিজম তত্ত্বের প্রয়োগ দেখতে পাই। একটি অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ফাংশন বা পরিচালিত হতে পারে না। এখন আমরা অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতায় ফাংশনালিজম তত্ত্বের ব্যবহার দেখব।
প্রথমত, একটি রাষ্ট্র কখনোই অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। রাষ্ট্রটি তার জনগণের প্রয়োজনীয় যেসব পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করতে অক্ষম এবং যেসব পণ্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে, সেসব পণ্যের জন্য তাকে তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবার যে সকল পণ্যদ্রব্য নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত (Surplus) হিসেবে থাকে বা অতিরিক্ত থাকে সেগুলোকেও অন্য দেশে রপ্তানি করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ভারতের সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলোতে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠী তৎপর। তাই সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলো যেহেতু বাংলাদেশের পাশে, তাই সেখানকার জঙ্গি তৎপরতা রোধে ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশ-এর সাহায্য। তৃতীয়ত, মনে করুন সাইক্লোন বা বন্যার কবলে মালদ্বীপ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই মালদ্বীপে এখন প্রচুর খাদ্য সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মালদ্বীপের সাহায্য প্রয়োজন তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো থেকে। মালদ্বীপ থেকে ইউরোপ-আমেরিকার দূরত্ব অনেক। তাই ইউরোপ থেকে মালদ্বীপে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে অনেক সময়ের প্রয়োজন এবং ততক্ষণে খাদ্যের অভাবে অনেক মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু ভারত কিংবা বাংলাদেশ যেহেতু মালদ্বীপের একেবারে পাশেই অবস্থিত তাই খুবই দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ত্রাণসামগ্রী মালদ্বীপে পাঠানো সম্ভব। তাই মালদ্বীপের প্রয়োজন ভারত ও বাংলাদেশকে। এভাবে একটি রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাহায্য ব্যতীত ফাংশন করে না।
উত্তর আধুনিকতাবাদ (Postmodernism)
পোস্টমডার্নিজম শব্দটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছ। অনেকে এটিকে বলে নয়া আধুনিকতাবাদ, আবার অনেকে বলে আধুনিকতার পরের আধুনিকতা। তবে পোস্টমডার্নিজম এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে উত্তর আধুনিকতাবাদ শব্দটি বেশি প্রচলিত। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে উত্তর আধুনিকতাবাদ মূলত একটি দার্শনিক চিন্তা, যা আধুনিকতাকে সামষ্টিকভাবে সমালোচনা করে। জাঁক লাকা, মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা এসব দার্শনিকরা আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমালোচক এবং উত্তর আধুনিকতাবাদের প্রবক্তা। এখন এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদেরকে সংক্ষেপে তিনটি পরিভাষা জানতে হবে; Traditional Society, Modern Society এবং Postmodern Society।
1. Traditional Society (অতীত সমাজব্যবস্থা): প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বৈশ্বিক সমাজব্যবস্থা ছিল কৃষিনির্ভর। মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল ছিল (agrarian society)। তাদের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল শুধু তাই উৎপাদন করত (subsistence economy)। মানুষ গ্রামীণ সমাজে সম্প্রদায়ভিত্তিক বসবাস করত (community based)। রাজা, সম্রাট বা ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা মানুষ শাসিত হতো (imperial state)। কোনো পদবি বা স্বীকৃতি অর্জনের বিষয় ছিল না। ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মর্যাদা বা সম্মান (ascriptive oriented)। মানুষ অনেক বেশি ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন করত (religion based)। মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক ছোঁয়া বলতে কিছুই ছিল না (unscientific)। মানুষ ছিল অনেক বেশি কুসংস্কারচ্ছন্ন (primordial sentiments)।
2. Modern Society (আধুনিক সমাজব্যবস্থা): ১৬ শতকে যখন ইউরোপীয় রেনেসাঁস শুরু হয় তখন আধুনিকতার ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে (enlightenment period) ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই আধুনিকতা ত্বরান্বিত হতে থাকে। তখন সমাজব্যবস্থাটি ট্র্যাডিশনাল সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিকতার দিকে রূপান্তরিত (transformation) হতে থাকে। তথা কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে মানুষ শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হয়। কলকারখানাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে (industry based)। নিজের প্রয়োজন বা বেঁচে থাকার জন্যই মানুষ পণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য পণ্য উৎপাদন করতে থাকে (market based economy)। মানুষ সমাজ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে থাকে (individualism)। সাম্রাজ্য বা রাজা-বাদশা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রগুলো রূপান্তরিত হয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় (nation state)। এই আধুনিকতার যুগে মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পদবি বা শ্রেষ্ঠত্ব থেকে নিজের অর্জন এবং স্বীকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেয় (achievement oriented)। মানুষ ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন বর্জন করে ধর্ম নিরপেক্ষতার দিকে ঝুঁকতে থাকে (secularization)। মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক ছোঁয়া আসে এবং মানুষ তখন যুক্তিনির্ভর হতে থাকে (rationality)। মানুষ কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হতে থাকে (scientific)। অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হতে থাকে, যা ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে (technobased)। এক কথায় আধুনিকতাবাদ বলছে, উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, যুক্তিবাদী ও মানব কেন্দ্রিক চিন্তা। মানুষের মানবিক জীবন ব্যবস্থার যুক্তিশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযাত্রার মধ্যে দিয়েই শুধু আধুনিক চিন্তার বিকাশ ঘটে।
3. Postmodern Society (উত্তর আধুনিক সমাজ): উপরে দেখালাম যে, কীভাবে ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি থেকে আমরা রূপান্তরিত হয়ে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় পৌঁছেছি। ইউরোপে ষোল শতক থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই সময়টি আধুনিককালের ব্যাপ্তি। অর্থাৎ এই সময়টিতে মানুষ প্রবৃদ্ধি ভিত্তিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর থেকেই অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সে উত্তর আধুনিকতাবাদ ধারণাটি পরিচিত হতে থাকে। এই উত্তর আধুনিকতাবাদের কাজ হচ্ছে, আধুনিকতার যে বৈশিষ্ট্যগুলো উপরে আমরা উল্লেখ করেছিলাম সেগুলো সমালোচনা করা। অর্থাৎ আধুনিকতাবাদের উপজাত (by-product) হিসেবে মানব জীবনে যে সংকটগুলো দেখা দিয়েছে সেগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আধুনিকতার অসারতা প্রমাণ করা। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকরা বলছেন যে, আধুনিকতা আমাকে শিল্পায়নের ছোঁয়া দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিবেশ দূষণকে রোধ করতে পারেনি। আধুনিকতা আমাদের জিডিপি বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, কিন্তু আয়বৈষম্য কমাতে পারেনি। আধুনিকতা আমাকে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাকে সুখ দিতে পারেনি। ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি করছে মানব জীবনে হতাশা এবং বাধাগ্রস্ত করছে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। আধুনিকতা কলকারখানায় শ্রমিকদের জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ন্যায্য মজুরিটি নিশ্চিত করতে পারেনি। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকরা আরও বলছেন যে, আধুনিকতা আমাদের স্বাধীনতার বয়ান দিলেও আমরা আজও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। আমরা আজ একেকজন প্রযুক্তিগত দাস (technological slave)।
আধুনিকতা প্রচার করে মানব চিন্তার শক্তি, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং যুক্তির সর্বজনীনতা ও প্রগতির জয়জয়কার। অন্যদিকে উত্তর আধুনিকতাবাদ বলে উন্নয়ন মানেই সুখ নয়, আধুনিকতা মানেই সীমাহীন প্রগতি নয়, যুক্তিও সবক্ষেত্রে সর্বজনীন নয়।