📄 আল-মতি বিল্লাহ
আল-মতি বিল্লাহ আবুল কাসেম আল-ফজল বিন মুকতাদর বিন মুতাযদ ৩০ হিজরীতে মাশগালা নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। ৩৩৪ হিজরীতে তিনি মসনদে আরোহণ করেন। মাযাদ্দৌলা দৈনিক ভাতা হিসেবে একশ দিনার খলীফার জন্য নির্ধারণ করে দেয়।
এ বছর বাগদাদে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লোকেরা মৃত প্রাণী ভক্ষণ করে এবং পশুর বিষ্ঠা খেয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা চালায়। ক্ষুধার জ্বালায় অনেকেই পথের ধারে মরে পড়ে থাকত। জঠরজ্বালা নিবারণের জন্য অনেকেই কুকুরের গোশত খেত, রুটি, বাগান এবং জমি বিক্রয় হত। মাযাদ্দৌলার জন্য এক বস্তা আটা কেনা হয়। আর দামেশকে এক বস্তার বাজার দর ১৯ দিনার। এ বছর মাযাদ্দৌলা এবং নসিরুদ্দৌলার মধ্যে লড়াই হয়। মতি মাযাদ্দৌলার সাথে রণাঙ্গনে গমন করেন। ফেরার পথে মতি বন্দীদের সাথে ছিলেন। এ বছর মিসরের আমীর আখশীদ মৃত্যুবরণ করে। তার আসল নাম মুহাম্মাদ বিন ত ফারাগনী। আখশীদের অর্থ শাহানশাহ। ফারগানের সকল বাদশাহকে এ লকবে ভূষিত করা হত। যেমন তরিস্তানের বাদশাহদের ইস্পাহান্দ, জুরজানের সূল, তুর্কীদের খাকান, আশরুসানের আফসীন এবং সমরকন্দ বাদশাহদের লকব সামান। আখশীদ অত্যন্ত সাহসী লোক ছিলেন, কাহিরের যুগে তিনি মিসরের শাসনকর্তা নিয়োগ হন। তার আট হাজার গোলাম ছিল।
এ বছর পশ্চিমাঞ্চলীয় শাসনকর্তা কায়েম উবায়দী মারা যায়, তদস্থলে তদীয় পুত্র আল-মানসুর ইসমাঈল নিযুক্ত হয়। সে তার পিতা থেকেও বেশি অভিশপ্ত ছিল। সে নবীদের শানে গালি দিত। সে আলেমদের হত্যা করে। ৩৩৫ হিজরীতে মাযাদ্দৌলা মতির নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাকে দারুল খুলাফায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। এ বছর মাযাদ্দৌলা আব্বাসীয় খিলাফতের দরবারে অনুরোধ জানায় যে, তার ভাই ইমাদুদ্দৌলাকে তার সহযোগী হিসেবে তাকে দেয়া হোক এবং তার মৃত্যুর পর তার ভাইকে যেন তার স্থলাভিসিক্ত করা হয়। মতি তার আবেদন মঞ্জুর করেন। কিন্তু ইমাদুদ্দৌলা এ বছরেই মারা যাওয়ায় মতি তার আরেক ভাই রুকনদ্দৌলাকে তার সহকারী বানিয়ে দেন।
৩৩৯ হিজরীতে হজরে আসওয়াদ স্ব স্থানে স্থাপন করা হয় এবং এর চারিপাশে সাত হাজার সাতশ সাড়ে সত্তর দিরহাম ওজন সমপরিমাণ রৌপ্য দিয়ে বাঁধাই করা হয়। মুহাম্মাদ বিন নাফে খাযায়ী বলেন, হজরে আসওয়াদ স্থাপনের পূর্বে আমি খুব ভালো করে দেখেছি যে, এর উপরটি কালো এবং বাকী অংশ সাদা। এটি লম্বায় এক হাত। ৩৪১ হিজরীতে একটি কওমের আবির্ভাব ঘটে যারা মৃত্যুর পর পুনঃজন্মে বিশ্বাসী ছিল। তাদের মধ্যে একজন এ দাবী করেছিল যে, আমার মধ্যে হযরত আলী (রা.)-এর রুহ দেয়া হয়েছে। তার স্ত্রী দাবী করত তার মধ্যে হযরত ফাতিমা (রা.)-এর রুহ দেয়া হয়েছে। হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর রুহের দাবী করত আরেকজন। জনতার হাতে তারা প্রহৃত হয়। এ বছর পশ্চিমাঞ্চলীয় শাসনকর্তা মানসুর উবায়দী তার প্রবর্তিত মানুরীয়া শহরে ইন্তেকাল করেন। তার উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ছেলে সাদ 'মযদ্দীন' লকব ধারণ করে তখত নসীন হয়ে কাহেরা শহরের গোড়াপত্তন করেন। মানসুর নেককার লোক ছিলেন। তার পিতার সময় যারা অত্যাচারিত হয়েছিল তিনি তাদের খুঁজে বের করেন। লোকেরা তাকে বন্ধু ভাবাপন্ন মনে করতো। তার ছেলে সাদও নেককার ছিলেন। তার সময় গোটা পশ্চিমাঞ্চল তার অধীনে চলে আসে।
৩৪৩ হিজরীতে খুরাসানের শাসনকর্তা মতির নামে খুতবা পাঠ করেন। এ খবর পেয়ে মতি তাকে খিলআত প্রদান করেন। ৩৪৪ হিজরীতে মিসরে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। এতে অনেক ভবন বিধ্বস্ত হয়। এর স্থায়িত্ব ছিল তিন ঘণ্টা। এ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য লোকেরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করে। ৩৪৬ হিজরীতে সমুদ্রের পানি আশি হাত উঁচু হয়ে যায়। ফলে পর্বতগুলো দ্বীপে পরিণত হয়। রায় এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে ভূমিকম্প হয়। ফলে তালকান শহর সমূলে বিধ্বস্ত হয়। এতে ত্রিশজন লোক ছাড়া শহরের সকলে নিহত হয়। রায়-এর উপকণ্ঠে দেড় শত গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। হালওয়ানের অধিকাংশ ধসে পড়ে। মৃত মানুষের হাড়ে সয়লাব হয়ে যায় নগর-জনপদ। মাটি ফেটে ঝরনাধারার সৃষ্টি হয়। রায়-এর একটি পাহাড় ভেঙে খানখান হয়ে যায়। জায়গায় জায়গায় যমীন ফেটে চৌচির হয়ে যায় এবং গর্তের সৃষ্টি হয়। এ সব ফাটল এবং গহ্বর থেকে পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি বের হয়। আবার কোনগুলো থেকে শুধু ধোঁয়া নির্গত হতে থাকে। এটি ইবনে জাওযী কর্তৃক বর্ণিত। ৩৪৭ হিজরীতে আবার ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানীর ফলে পৃথিবীতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
৩৫০ হিজরীতে মাযাদ্দৌলা বাগদাদে এক সুবিশাল প্রসাদ নির্মাণ করে। এর ভিত ছিল ৩৬ হাত নিচে প্রথিত। গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এ বছর আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহ বিন হাসান বিন শাওয়ারিব বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ বছর রোমানরা আফরিতশ দ্বীপটি দখল করে নেয়, যা ২৩০ হিজরী থেকে মুসলমানরা শাসন করত। এ বছর স্পেনের শাসনকর্তা নাসিরুদ্দীনিল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তদস্থলে তার ছেলে তখতে আরোহণ করেন। ৩৫১ হিজরীতে শীআরা মসজিদের দরজায় দরজায় এ কথাগুলো লিখেছিল- (হযরত) মুআবিয়া (রা.)-এর উপর অভিশাপ। যারা হযরত ফাতিমা (রা.)-এর হক ফিদকের বাগান আত্মসাৎ করেছে তাদের প্রতি লানত। যারা ইমাম হাসান (রা.) কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পার্শ্বে সমাহিত হতে দেয়নি তাদের উপরও অভিশাপ। যারা হযরত আবু যর (রা.)-কে বহিষ্কার করেছে তাদের প্রতিও লানত। রাতে কোন এক ব্যক্তি এ লেখাগুলো মিশে দেয়। সকালে মাযাদ্দৌলা আবার এগুলো লিখতে চাইলে উযীর মাহলাবী বলল, কথাগুলো এমন হওয়া উচিত যে, নবী পরিবারের উপর অত্যাচারকারীদের প্রতি আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক এবং হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর উপর স্পষ্টভাবে অভিশাপ বর্ষণের কথা লিখতে বলল, বস্তুত তাই লিখা হল।
৩৫২ হিজরীতে মাযাদ্দৌলা আশুরার দিন দোকান-পাট বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। বাবুর্চিদের রান্নাবান্না করতে নিষেধ করে। মেয়েরা মাথার চুল খুলে নিজের মুখে আঘাত করে হায় হোসেন বলে মাতম করে। বাগদাদে এটাই প্রথম দিন যে দিন সর্বপ্রথম সেখানে বিদআত হয়। কিছু দিন তা চালু ছিল। সংবাদ পেয়ে খলীফা মতি জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে মাযাদ্দৌলার বাসবভনে হাওজায় আরোহণ পূর্বক আসে। এ কথা জানতে পেয়ে মাযাদ্দৌলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে মাটিতে তিনবার চুমু দিয়ে খলীফাকে কষ্ট করে এসে জানাযায় শরীক হতে বারণ করেন। ফলে খলীফা প্রাসাদে ফিরে যান। এ বছর ১২ যিলহজ তারিখে জাঁকজমকভাবে বাঁশি বাজিয়ে ঈদ করা হয়। ৩৫৩ হিজরীতে সাইফুদ্দৌলার জন্য ২৪/২৫ হাত উঁচু তাঁবু নির্মাণ করা হয়। ৩৫৪ হিজরীতে মাযাদ্দৌলার বোন ইন্তেকাল করে। এ বছর রোমান সম্রাট ইয়াকুব মুসলমানদের শহরের পার্শ্বে কায়সারীয়া শহর আবাদ করেন। ৩৫৬ হিজরীতে মাযাদ্দৌলার অন্তর্ধানে তার ছেলে বখতিয়ারকে "আয্যাদ্দৌলা" উপাধি দিয়ে তদস্থলে নিয়োগ করা হয়। ৩৫৭ হিজরীতে কারমতী দামেশক দখল করে। সিরিয়া ও মিসরের লোকদের হজ্ব বন্ধ করে দেয়। আবার মিসর আক্রমণের পরিকল্পনা করলে বনু উবায়েদ সম্প্রদায় তাদের প্রতিহত করার আগেই তারা মিসর দখল করে। এদিকে শীআরা আকলীম, মিশর এবং ইরাকে নিজেদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা খুতবা থেকে বনু আব্বাসের নাম বাদ দেয়। কালো কাপড় পরতে মানা করে। খতীবদের সাদা কাপড় পরতে আদেশ করে এবং এ শব্দগুলো দিয়ে খুতবা পাঠ করে- "اللهم صلى على محمد المصطفي وعلي على المرتضي وعلي فاطمة البতুল وعلي الحسن وعلي الحسين سط الرسুল وصل علي الائمة اباء أمير المنومنين المعز بالله"
৩৬১ হিজরীতে মিসরে আযানের মধ্যে حي علي خير العمل - এ শব্দটি বৃদ্ধি করা হয়। এ বছর জামে আযহারের ভিত্তি দেয়া হয়। আর তা ৩৬১ হিজরীর রমযান মাসে শেষ হয়। এ বছর ইরাকে একটি তারকা বিকট আওয়াজে পতন হয় এবং পৃথিবীময় সূর্যের ন্যায় আলো ছড়িয়ে পড়ে। ৩৬২ হিজরীতে বখতিয়ার খলীফার উপর কর আরোপ করে। এ কথা শুনে খলীফা মতি, বখতিয়ারকে বললেন, তুমি যদি এটাই চাও যে তাহলে আমি স্বেচ্ছায় নিজ গৃহে আবদ্ধ হয়ে থাকব এবং সর্বস্ব বর্জন করব। এরপরও বখতিয়ার খলীফার প্রতি চাপ অব্যাহত রাখে। ফলে খলীফা নিজ গৃহের আসবাবপত্র বেচে চার লাখ দিরহাম মতির হাতে তুলে দেন। এ কথা জনতার মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। তারা বলতে থাকে খলীফাকেও কর দিতে হচ্ছে। এ বছর বখতিয়ারের গোলাম নিহত হওয়ায় তার উযীর আবুল ফজল শিরাযী এর বদলাস্বরূপ বাগদাদের এক দিকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অনেক ঘর-বাড়ি, সম্পদরাজি এবং বনী আদম পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। এই অভিশপ্ত উযীরও আগুনে পুড়ে মরে। এত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বাগদাদে আর কখনই হয়নি।
৩৬৩ হিজরীতে মতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ বিন শায়বান হাশিমীকে কাযীউল কুযযাতের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি জানান। মতি শর্তাবলীর দীর্ঘ ফিরিস্তি প্রস্তুত করেন। এ পদের কোনো পারিশ্রমিক তিনি নিবেন না। কোন প্রকার খিলাফত গ্রহণ করবেন না। শরীয়ত বিরোধী সুপারিশও তার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। তার কেরানীর জন্য মাসিক তিনশ দিনার, পুলিশের জন্য দেড়শ দিনার, আহকাম জারিকারীর একশ দিরহাম, কোষাগার এবং দফতরীর জন্য সাতশ দিরহাম বেতন দেয়া হয়। ৩৬৩ হিজরীতে অর্ধাঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়ে মতির কথায় জড়তার সৃষ্টি হয়। ইখতিয়ার তার প্রহরী সবক্তগীন মারফত বলে পাঠায় যে, তিনি যেন খিলাফতের দায়িত্ব তদীয় পুত্র আল-তয়েলিল্লাহ-এর উপর অর্পণ করেন। তিনি তাই করেন। ৩৬৩ হিজরীর যিলকাদা মাসের ২৩ তারিখ বুধবারে মতি তার পুত্র তয়ে-এর উপর খিলাফত অর্পণ করেন। মতি ২৯ বছর কয়েক মাস রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। অতঃপর প্রধান বিচারপতি শায়খুল ফাযেল লকব দিয়ে মতিকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। মতি তার ছেলেকে নিয়ে ওসেত গমন করেন। সেখানে ৩৬৪ হিজরীর মুহাররম মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মতির যুগে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- খারকী শায়খে হাম্বলী, আবু বকর শিবলী, ইবনে কাযী, আবু রাযা, আবু বকর সৃলী, হাছিম বিন কালীব, আবু লতীব, আবু জাফর, আবু নসর ফারাবী, আবু ইসহাক মরুযী, আবুল কাসেম দিনুরী, আবু বকর যবয়ী, আবুল কাসিম তুনুখী, ইবনে হুদা, আবু আলী বিন আবু হুরায়রা, আবু উমর মাসউদী, ইবনে দরসতুয়া, আবু আলী তাবারী, ফাকেহী, কবি মুতানাব্বী, ইবনে হিব্বান, ইবনে শাবান, আবু আলী আল-কানী, আবুল ফরাহ প্রমুখ।
📄 আত্ব-তয়েলিল্লাহ
আত্ব-তয়েলিল্লাহ আবু বকর আয়ুন করীম বিন মতি হাম্মার নামক বাঁদির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন। খিলাফত লাভের পর দিন দিন খিলাফতের চাঁদের চেয়েও তেজ পরিবর্তিত অবস্থায় তিনি অশ্বারোহণে বের হন। সেদিনই সওগনীকে সাথী গোপালীক এবং হারর প্রদান করা হয় এবং নাসরুল্লাহ উপাধি দেয়া হয়। কিছুদিন পর আযদুদ্দৌলা এবং সওগনীকের মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হয়। সওগনীক তুর্কীদের সাথে নিয়ে তার সাথে মরণপণ লড়াই-এ অবতীর্ণ হয়।
৩৬৩ হিজরীতে হারামাইন শরীফাইনে আল-মুআয়্যাদ উবায়নীর নামে খুতবা পাঠ করা হয়। ৩৬৪ হিজরীতে সওগনীককে প্রতিহত করার জন্য আযদুদ্দৌলা আযদুদ্দৌলার সাহায্যার্থে বাগদাদে আসে। আযদুদ্দৌলার নিকট বাগদাদ নগরী পছন্দ হওয়ায় তিনি বাগদাদে নিজের বলয় প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন, তিনি কেল্লার উপঢৌকন দিয়ে হাত করেন। তারা আযদুদ্দৌলার উপর চড়াও হয়। আযদুদ্দৌলা দরজা লাগিয়ে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। আযদুদ্দৌলা তায়ে-এর রাজত্বকালে এ বার্তা পাঠিয়ে দিল যে, আযদুদ্দৌলা সাম্রাজ্যের নতুন নায়েব নিযুক্ত হয়েছেন। এ জন্য তায়ে এবং আযদুদ্দৌলা উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। এতে আযদুদ্দৌলার জয় হওয়ায় খুতবা থেকে তায়ে-এর নাম উঠিয়ে দেয়া হয়। ২০ জমাদিউল আউয়ালের থেকে ৩৬৪ হিজরীর ১০ রজব পর্যন্ত কোথাও কোনো খুতবায় তার নাম পঠিত হয়নি।
৩৬৫ হিজরীতে কুরুদ্দৌলা বিন বুয়া তার পদানত রাজত্বকালে তিন সন্তানের মধ্যে বণ্টন করে দেন। পারস্য এবং কারমান আযদুদ্দৌলাকে, রায় এবং ইস্পাহান মুঈদ্দৌলাকে এবং হামদান ও দিনুর ফখরুদ্দৌলাকে দেয়া হয়। এ বছর রজব মাসে আযদুদ্দৌলার বাসভবনে ইজলাস বসে। সেখানে কাযীউল কুযযাত ইবনে মা'রুফ উপস্থিত ছিলেন। এ বছর আযদুদ্দৌলা এবং আযদুদ্দৌলার মধ্যে লড়াই হয়। এতে আযদুদ্দৌলার এক তুর্কী গোলাম বন্দী হয়। এজন্য তিনি দারুণ মর্মবেদনায় ভোগেন। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেন, শোকের কবিতা আবৃত্তি করেন। কান্না ছাড়া আর কোনো কাজ তার ছিল না। এমনকি ইজলাসও বর্জন করেন। অবশেষে আযদুদ্দৌলা গোলামকে ফিরিয়ে দেন। এ বছর কুফায় আযদুদ্দৌলার নামের পরিবর্তে আযদুদ্দৌলার নামে খুতবা পাঠ করা হয়। এ বছর মিসরের শাসনকর্তা আল-মুআয লিদ্দীনিল্লাহ উবায়দী পরলোকগমন করেন। তদস্থলে তদীয় পুত্র আযীয নিযুক্ত হন। ৩৬৬ হিজরীতে উমাইয়্যা বংশীয় স্পেনের বাদশাহ আল-মুসতানসির বিল্লাহ আল-হাকিম বিন নাসিরুদ্দীনিল্লাহ ইন্তেকাল করেন।
৩৬৭ হিজরীতে আবার আযযুদ্দৌলা এবং আযদুদ্দৌলার মধ্যে যুদ্ধ হয়। আযদুদ্দৌলা জয় লাভ করেন। আযযুদ্দৌলা বন্দী হলে তাকে হত্যা করা হয়। খলীফা আযদুদ্দৌলাকে শাহী পোশাক, জওহরের তাজ এবং স্বর্ণের মালা নিজ হাতে তার গলায় পরিয়ে দেন। সাথে প্রদান করা হয় তলোয়ার এবং স্বর্ণ ও রৌপ্যের দু'টি পতাকা। যা ওলী-এ-আহাদদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। ৩৬৮ হিজরীতে খলীফার পক্ষ হতে এ ফরমান জারী করা হয় যে, সকাল, সন্ধ্যা ও ঈশার সময় আযদুদ্দৌলার বাসভবনে ডংকা বাজানো হবে এবং মিম্বরে দাঁড়িয়ে খতীবগণ খুতবার মধ্যে তার নাম পাঠ করবে।
৩৬৯ হিজরীতে মিসরের ওলী আযীযের দূত বাগদাদ আসে এবং তয়ে-এর নিকট আযদুদ্দৌলা আবেদন করে যে, তার লকবের সাথে তাজুল মিল্লাত লকবটি বৃদ্ধি করে তার খিলআত নবায়ন করা হোক। তার আবেদন গৃহীত হয়। তয়ে তখতে উপবেশন করেন। তার আশেপাশে একশ লোক তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সামনে রাখা হয় হযরত উসমান গনী (রা.)-এর স্বহস্তে লিখিত পবিত্র কুরআন শরীফ। কাঁধে চাদর শরীফ, হাতে লাঠি এবং গলায় ঝোলানো হয় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যবহৃত তলোয়ার। আযদুদ্দৌলা খলীফার খিদমতে যমীন চুম্বন করেন। তয়ে তাকে আসনে বসার নির্দেশ দেন। তয়ে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কাজ করার জন্য যত লোক আমাকে দিয়েছেন এবং আমার অধীনে যতগুলো রাজ্য রয়েছে এগুলো দেখভালের জন্য আমি তোমাকে মনোনীত করছি।
৩৭০ হিজরীতে আযদুদ্দৌলা হামদান থেকে বাগদাদে এলে তয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বাগদাদ থেকে বাইরে আসেন, যা আজ পর্যন্ত আর কখনই হয়নি। ৩৭৬ হিজরীতে আযদুদ্দৌলার ইন্তেকাল হলে তদস্থলে তদীয় পুত্র সিমসামুদ্দৌলাকে শামসুল মিল্লাত লকব দিয়ে নিয়োগ করা হয়। ৩৭৩ হিজরীতে আযদুদ্দৌলার ভাই মুঈদুদ্দৌলার মৃত্যু হয়। ৩৭৫ হিজরীতে সিমসামুদ্দৌলা বাগদাদের আশেপাশে উৎপন্ন কাপড় শিল্পের উপর করারোপের ইচ্ছা করেন। এতে করে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ৩৭৭ হিজরীতে সিমসামুদ্দৌলার উপর তার ভাই শরফুদ্দৌলা আক্রমণ করে। সিমসামুদ্দৌলা পরাজিত হয়। শরফুদ্দৌলা ভাইয়ের চোখ উপড়ে ফেলে। অতঃপর শরফুদ্দৌলা বাগদাদে প্রবেশের সময় তয়ে তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। তিনি তাকে ডেপুটি সুলতান নিয়োগ করেন। ৩৭৮ হিজরীতে বাগদাদে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ৩৭৯ হিজরীতে আযদুদ্দৌলা ইন্তেকাল করে এবং তার ভাই আবু নসরকে নিজের স্থানে বসিয়ে দিয়ে যায়। তয়ে তাকে 'বাহাউদ্দৌলা যিয়াউল মিল্লাত' উপাধি দেন। ৩৮১ হিজরীতে বাহাউদ্দৌলা তয়েকে বন্দী করে এবং তাকে খিলাফত থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ৩৮১ হিজরীর ১৯ শাবান তয়ে অপসারিত হন। তয়ে ৩৯৩ হিজরীর ঈদুল ফিত্রের শেষ রাতে নশ্বর জাহান ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান।
তার যুগে নিম্ন বর্ণিত ওলামা হযরত ইন্তেকাল করেন- হাফেজ ইবনে সানা, ইবনে আদী কাবীর, নাহুবিদ সিরানী, আবু সোহেল, আবু বকর রারী হানাফী, ইবনে খালুয়া, ইমামুল লোগাত যহরী, দেওয়ানুল আদবের লেখক আবু ইবরাহীম ফারাবী, কবি রিফা, আবু যায়েদ আল-উমুরী শাফী, দারকী, আবু বকর আবহারী শায়খুল মালিকী, ইমামুল হানাফীয়া আবুল লায়ছ সমরকন্দী, নাহুবিদ আবু আলী আল-কারসী, ইবনে হাল্লাব মালিকী, ইবনুল ফুখার, আলী বিন ঈসা প্রমুখ।
📄 আল-কাদের বিল্লাহ
আল-কাদের বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমদ বিন ইসহাক বিন মুকতাদার মওসুমা তামান্না অথবা দিমনা নামক বাঁদীর গর্ভে ৩৩৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তয়ে অপসারিত হওয়ার পর তিনি তখতে আরোহণ করেন। তয়ে অপসারিত হওয়ার সময় তিনি বাগদাদে ছিলেন না। ১০ই রমযানে তাকে ডেকে আনা হয়। ১১ই রমযানে সাধারণ পরিষদের সামনে তিনি মসনদে উপবেশন করেন। খতীব বলেন, কাদের বিল্লাহ অত্যন্ত সাধু, সুবিবেচক, ঝানু রাজনীতিবিদ, তাহাজ্জুদ গুজার এবং সদকা-খয়রাতকারী ছিলেন। তিনি আল্লামা আবু বশর হারবী শাফীর নিকট ফিকহ অর্জন করেন। তিনি "فضائل صحابه تكفير معتزله قائلين خلق القرآن" শীর্ষক একটি কিতাব লিখেন।
খিলাফত লাভের প্রথম বর্ষের শাওয়াল মাসে একটি আড়ম্বরপূর্ণ সভার আহ্বান করা হয়। এতে কাদের বিল্লাহ এবং বাহাউদ্দৌলা প্রতিজ্ঞা রক্ষাকরণের শপথ করে এবং কাদের বিল্লাহ নিজের প্রাসাদ ছাড়া গোটা সাম্রাজ্য তার উপর সোপর্দ করেন। এ বছর মক্কা শরীফের শাসনকর্তা আবুল ফুতুহ আল-হাসান বিন জাফর উলুবী খিলাফতের দাবী তোলে। মিসরশাহীর শাসন মক্কায় পরাভূত হয়। ৩৮২ হিজরীতে উযীর আবু নসর করখ অঞ্চলে একটি ভবন নির্মাণ করে। এর নাম রাখা হয় 'দারুল ইলম'। ৩৮৪ হিজরীতে ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়ামনের লোকেরা হজ্ব করতে গিয়ে রাস্তা থেকে ফিরে আসে। কারণ এ বছর ট্যাক্স ছাড়া হজ্ব করতে যেতে বাধা দেয়া হয়। ৩৮৭ হিজরীতে সুলতান ফখরুদ্দৌলার তিরোধানে তার চার বছরের শিশু তদস্থলে নিয়োগ হয়। কাদের বিল্লাহ তাকে মাজদুদ্দৌলা উপাধি দেন। ৩৮৬ হিজরীতে মিসরশাহী আযীয মৃত্যুবরণ করে। তদস্থলে তদীয় পুত্র মানসুর আল-হাকিম বিআমরিল্লাহ উপাধি ধারণ করে সমাসীন হয়। ৩৯৩ হিজরীতে দামেশকের নায়েব আসওয়াদ পশ্চিমাঞ্চলীয় এক লোককে ধরে হত্যা করে, কারণ সে আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-কে ভালোবাসত।
৩৯৫ হিজরীতে হাকিম মিসরে একদল ওলামাকে হত্যা করে। ৩৯৬ হিজরীতে হাকিম মিশর এবং হারামাইন শরীফাইনে এ ফরমান জারি করে, যে কোনো স্থানে আমার নাম উচ্চারিত হলে শ্রবণকারী আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাবে এবং সিজদা করবে। ৩৯৮ হিজরীতে বাগদাদে শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব হয়। এতে কাদের বিল্লাহ রাগান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি একদল অশ্বারোহী ফৌজ সুন্নতের অনুসারীদের সাহায্যার্থ প্রেরণ করেন। ৩৯৯ হিজরীতে বসরার কাযী আবু আমরকে অপসারণ করে আবুল হাসান বিন শাওয়ারিবকে কাযী পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ৪০০ হিজরীতে দজলা নদীর পানি এতটাই কমে যায়, যা ইতোপূর্বে আর কখনই হয়নি। ৪১১ হিজরীতে হাকিম মিসরের হালওয়ান নামক গ্রামে নিহত হয়। ৪২২ হিজরীর যিলহজ মাসের এগারো তারিখ সোমবার রাতে কাদের বিল্লাহ ইন্তেকাল করেন।
তার শাসনামলে বর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবু আহমদ আসকারী আদীব, রুমানী নাহুবিদ, আবুল হাসান মাসরজসী, আবু আব্দুল্লাহ মরযুবানী, মুঈদুদ্দৌলার উযীর সাহেব বিন উবাদা, হাফেজ দারা কুতনী, ইবনে শাহীন, আবু বকর আওদী ইমামুশ শাফীয়া, ইউসুফ ইবনে সিরানী, ইবনে রুলাক আল-মিসরী, ইবনে আবী যায়েদ আল-মালিকী, কওতুল কুবের লেখক আবু তালিব আল-মালী, ইবনে বার্তা আল-হাম্বলী, ইবনে শামউন খাতায়ী, খাতেমিল লগবী, আওফু আবু বকর, ইবনে গালবুন আল-মাকরী, কাশমিহনা, মাআনী বিন যাকারিয়া আন-নাহরুয়ানী, ইবনে খুওয়ায মিন্দাদ, ইবনে জনা, সহীহ-এর লেখক জওহরী, আল-জামালের লেখক ইবনে ফারেস, ইবনে মান্দাত আল-হাফেজ ইসমাঈল শায়খে শাফীয়াহ, আসবানা বিনিল ফারাজ শায়খে মালিকীয়া, বদিউয্যামান, ইবনে লাল, ইবনে আবী যাযনীন, আবু হায়ান আত-তাওহিদী, কবি আলওয়াদ, আল-ফারিবিনের লেখক আল-হারবী, কবি আবুল ফাতাহ আল-বাস্ত্রী, হালিমী শায়খে শাফীয়াহ, ইবনুল ফারিয, আবুল হাসান আল-কালবেসী, কাযী আবু বকর বাকলানী, আবু তবীব সালুকী, ইবনে আকফানী, আল-খুত্ব-এর লেখক ইবনে নাযাতাহ, সামিরী শায়খে শাফিয়াহ, মুসতাদরাকের লেখক হাকীম ইবনে কুজ, শায়েখ আবু হামেদ, ইবনে ফুরাক, শরীফ রেজা, আবু বকর আর-রাযী, হাফেজ আব্দুল গেনা বিন সাঈদ, ইবনে মারদুয়া, হাফতুল্লাহ বিন সালামা, ইবনুল বাওয়াব, আব্দুর রহমান মুহামেলী, আবু বকর আল-কাফাল, ইবনুল ফুখার, আলী বিন ঈসা প্রমুখ। যাহাবী এছাড়াও অসংখ্য মনীষীর নাম উল্লেখ করেছেন।
📄 আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ
আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবু জাফর আব্দুল্লাহ বিন আল-কাদের বিল্লাহ ৩৯১ হিজরীর যিলকদ মাসের মাঝামাঝিতে উম্মে ওলাদ মাসুমা বদরুদ্দোজা ভিন্ন মতে কতরুননিদা নামক দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার জীবদ্দশায় ওলীয়ে আহাদ ছিলেন। তিনিই তাকে কায়িম বি আমরিল্লাহ খেতাব দেন। পিতার ইন্তেকালের পর ৪২২ হিজরীতে তিনি খিলাফতের তখতে আরোহণ করেন।
ইবনে আছীর (রহ.) বলেন, তিনি অত্যন্ত সুদর্শন, সংযমী, ইবাদতকারী, দানশীল, আলেম, আল্লাহর উপর ভরসাকারী, ধৈর্যশীল, সুসাহিত্যিক, সদা প্রফুল্ল, ইনসাফকারী এবং অভাব পূরণকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কোনো কিছু চাইলে তিনি কাউকে বঞ্চিত করতেন না।
খতীব বলেন, মুসলিম সাম্রাজ্যে বসাসীরী অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিংস্র হয়ে উঠে। তাকে প্রতিহত করার মত কেউ ছিল না। আরবে আযমে সকলেই তার ভয়ে কাঁপত। তার থেকে পরিত্রাণের জন্য দু'আ করা হতো। সে লোকদের সম্পদ আত্মসাত করতো। গ্রামের পর গ্রাম লুণ্ঠন করতো। কায়িম তাকে প্রতিহত করেন। প্রথমে উভয়ের মধ্যে প্রীতিকর সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে সম্পর্কে চিড় ধরলে বসাসীরী দারুল খুলাফা লুণ্ঠন এবং খলীফাকে বন্দী করার ষড়যন্ত্র করে। ফলে খলীফা রায়ের শাসনকর্তা আবু তালিব মুহাম্মাদ বিন মাকয়ালের সাহায্য প্রার্থনা করেন। রায়ের শাসনকর্তা টগর বেগ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। সে ৪৪৭ হিজরীতে এসে বসাসীরীর বাসগৃহে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে রহবা শহরে পালিয়ে যায়। তুর্কীরা বসাসীরীর পতাকা তলে সমবেত হয়। সে খলীফার বিরুদ্ধে মিসর শাসনকর্তার সাহায্য চাইলে সে তাকে অর্থ-সম্পদ দিয়ে সহযোগিতা করে। অতঃপর সে গটর বেগের ভাই টপালকে তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানায়। সে তাকে লোভ দিয়ে এ মর্মে পত্র লেখে যে, আমি বিজিত হলে তোমাকে রায়ের শাসনকর্তা বানাব। লোভে পড়ে টপাল টগর বেগের উপর আক্রমণ করলে বসাসীরী ৪৫০ হিজরীতে বাগদাদের দিকে কুজ করে। খলীফা বাগদাদের বাইরে এসে তার সাথে লড়াই করেন। মানসুর জামে মসজিদে মিসর শাসনকর্তার নামে খুতবা পাঠ করা হয়। আযানে حَيَّ عَلَىٰ خَيْرِ الْعَمَلِ শব্দগুলো বৃদ্ধি করা হয়। সে সময় খলীফা নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছাড়া সর্বত্র তার নামে খুতবা পঠিত হতে থাকে। এক মাস পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকে। যিলহজ মাসের শেষ দিকে সে খলীফাকে বন্দী করে গানায় নিয়ে গিয়ে কয়েদ করে রাখে।
ওদিকে টগর বেগ তার ভাইকে পরাজিত এবং হত্যা করে গানার প্রশাসককে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক খলীফাকে দারুল খুলাফায় পৌছে দেবার জন্য পত্র লেখে। সে তাই করে। ৪৫১ হিজরীর যিলকদ মাসের পাঁচ তারিখে খলীফা এসে পৌছেন। সে সময় তিনি অত্যন্ত খোশ হাল অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর টগর বেগ সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে বসাসীরীর উপর হামলা করে। যুদ্ধে বসাসীরী পরাজিত হয়। সে তাকে হত্যা করে তার কর্তিত মস্তকখানা বাগদাদে পাঠিয়ে দেয়। খলীফা দারুল খুলাফায় ফিরে এসে জায়নামাযে ঘুমাতেন। দিনে রোযা রাখতেন, রাতে নামায পড়তেন। যারা তাকে কষ্ট দিত তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন। তিনি তার লুণ্ঠিত সম্পদ মূল্য প্রদান ছাড়া ফেরত নিতেন না। তিনি বলতেন, সর্ব বিষয়ের সওয়াব আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে নিব। তিনি বালিশে মাথা রাখতেন না। কথিত আছে, তার প্রাসাদ লুণ্ঠন হওয়ার সময় খেলাধুলার কোন আসবাবপত্র পাওয়া যায়নি। এটা তার বুযুর্গীর উন্নত দলিল।
বর্ণিত আছে, বসাসীরী তাকে কয়েদ করে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এ দু'আটি লিখে কাবা গৃহের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেবার জন্য মক্কা শরীফে পাঠিয়ে দেন- "বান্দা মিসকিনের পক্ষ হতে মহান আল্লাহর দরবারে, হে ত্রিভুবনের শাহানশাহ! আপনি মনের গোপন অভিব্যক্তি সম্পর্কেও অবগত। অন্তরের অবস্থা আপনার সামনে দিবাকরের ন্যায় ভাস্বর। হে মাবুদ! আপনার অপার জ্ঞানভাণ্ডার নিজের সৃজনশীলতার ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত। ইলাহী! আপনার এ বান্দা আপনার নেয়ামত অস্বীকার করেছে, কৃতজ্ঞতা আদায় করেনি। নিয়ামতরাজির উপর নির্ভর করেনি। আপনার হুকুম মানার ক্ষেত্রে অমনোযোগী হয়েছে। ফলে আমার উপর এক বিদ্রোহীকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে- যাদের সাথে আমাদের দুশমনী, হে প্রতিপালক! সাহায্য হ্রাস পেয়েছে এবং অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। হে পালনকর্তা! আপনিই প্রত্যেক বিষয়ে অবিসংবাদিত, পরিজ্ঞাত, নিয়ন্ত্রক এবং বিচারক। আপনারই সমীপে ফরিয়াদ, প্রত্যাবর্তন এবং পানাহ চাইছি। হে দয়াময়! আপনার মাখলুক আমার উপর প্রভুত্ব করছে। আমি আপনার কাছেই ফরিয়াদ করছি। আমি আপনার ইনসাফ প্রার্থী। আপনি আমার উপর থেকে অন্ধকারের যবনিকা অপসৃত করুন। আপনার দয়া ও মমতার দুয়ার অবারিত করুন। আমাদের মাঝে ইনসাফ করুন। আপনিই খাইরুল হাকেমীন।"
৪২৮ হিজরীতে মিসর শাসনকর্তা আয-যাহের উবায়দী আট বছর চার মাস রাজত্ব করে মারা যায়। তার স্থানে তদীয় পুত্র আল-মুসতানসির সাত বছরের জন্য কায়েম থাকে। যাহাবী বলেন, তার শাসনামলে মিসরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়- যার তীব্রতা একমাত্র ইউসুফ (আ.)-এর যুগের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, এ দুর্ভিক্ষ সাত বছর স্থায়ী হয়। লোকেরা একে অপরকে কেটে ভক্ষণ করতো। সে সময় একটি রুটি পঞ্চাশ দিনারে বিক্রি হয়। ৪৪৩ হিজরীতে মুআয বিন নাদিস খুতবা থেকে উবায়দীদের নাম বাদ দিলে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বনু আব্বাসের নাম পঠিত হতে থাকে। ৪৫১ হিজরীতে গাযনার বাদশাহ সুলতান ইবরাহীম মাহমুদ বিন সবক্তগীন এবং টগর বেগের ভাই খুরাসানের শাসনকর্তা জাফর বেগ বিন সালজুকের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। পরে উভয়ের মাঝে সন্ধি হয়। এর এক বছর পর জাফর বেগ ইন্তেকাল করে। তদস্থলে তদীয় পুত্র তখত নসীন হয়।
৪৫৪ হিজরীতে খলীফা নিজ কন্যাকে টগর বেগের সাথে বিয়ে দেন- যা কখনই এমনটা হয়নি। বনূ আব্বাস স্ববংশীয় ছাড়া কোথাও (কন্যা) বিয়ে দেয়নি। এমনকি বনূ যুয়া, যারা খলীফাদের উপর হুকুমত চালিয়েছে তাদেরকেও বন্ আব্বাস কন্যা দেয়নি। আর আমার (গ্রন্থকার) যুগে খলীফা তার মেয়েকে ডেপুটি সুলতানের গোলামের সাথে বিয়ে দেন। ৪৫৫ হিজরীতে টগর বেগ খলীফার মেয়েকে নিয়ে বাগদাদে এসে মাওয়ারিছ এবং খারাজ ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর বাগদাদের উপর দেড় লাখ দিনার ট্যাক্স বসিয়ে রায়ে চলে যায়। সেখানে পৌছে সে মারা যায়। আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ ক্ষমা করবেন না। তার শূন্য পদে তার ভাতিজা খুরাসানের শাসনকর্তা আরসালান অধিষ্ঠিত হয়। খলীফা তার কাছে খিলাআত পাঠান। যাহাবী বলেন, আরসালান সর্বপ্রথম বাগদাদে মিম্বরে আরোহণপূর্বক নিজের উপাধি সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে। সে অন্যান্য সুলতানের চেয়ে অধিক শক্তিশালী হওয়ায় খ্রিস্টানদের অধিকাংশ শহর, নগর, জনপদ দখল করে নেয়। সে নিযামুল মুলুককে উযীর নিয়োগ করে। উমায়দুল মুলুকসহ সভাসদদের বরখাস্ত করে। সে শাফী মাযহাবের মদদদাতা। হারামাইন শরীফাইনের ইমাম এবং আবুল কাসিম আল-কুশায়রীকে অত্যন্ত সমাদর ও সম্মান করত। সে মাদরাসায়ে নিযামিয়ার ভিত্তি স্থাপন করে। বর্ণিত রয়েছে যে, সর্বপ্রথম ফিকহ-এর জন্য এ মাদরাসার ভিত্তি দেয়া হয়।
৪৫৮ হিজরীতে দুই চেহারাবিশিষ্ট এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এ বছর আকাশে চাঁদের সমান একটি তারকা দেখা দেয়। এ থেকে তীব্র তাপদাহ নির্গত হয়। এ দৃশ্য দেখে লোকেরা ভীষণ ভয় পায়। দশরাত পর্যন্ত এর অস্তিত্ব ছিল। পরে তা আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যায়। ৪৫৯ হিজরীতে মাদরাসা নিযামিয়ার কাজ সমাপ্ত হয়। শিক্ষক হিসেবে শায়খ আবু ইসহাক শিরাজী নিয়োগ পান। ৪৬০ হিজরীতে রমলায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। এতে রমলা সমূলে বিধ্বস্ত হয়। পঁচিশ হাজার লোক নিহত হয়। ৪৬১ হিজরীতে দামেশকের জামে মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কারুকার্য ও স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত সাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ৪৬২ হিজরীতে মক্কার আমীরের দূত এসে সুলতান আল্ব আরসালানকে এ সংবাদ দেয় যে, মক্কা শরীফে মুসতানসিরের নামে খুতবা বন্ধ হয়ে বনু আব্বাসের নামে খুতবা পড়া আরম্ভ হয়েছে এখান থেকে حَيَّ عَلَىٰ خَيْر الْعَمَلِ শব্দগুলো বাদ পড়েছে। এ কথা শুনে সুলতান দূতকে খুশি হয়ে ত্রিশ হাজার দিনার এবং খিলআত প্রদান করে।
৪৬৩ হিজরীতে বনূ আব্বাস ও সুলতান আল্ব আরসালানের শক্তি এবং মুসতানসিরের সালতানাতের পতন দেখে লোকেরা বনূ আব্বাসের নামে খুতবা পাঠ করতে থাকে। এ বছর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে রোমানরা মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়। এ যুদ্ধে সুলতান আরসালান স্বয়ং সেনাপতিত্বের দায়িত্ব পালন করেন এবং রোম সম্রাটকে বন্দী করে নিয়ে আসেন। অতঃপর মোটা অংশের মুক্তিপণ নিয়ে সম্রাটকে ছেড়ে দেয়া হয়। ৪৬৪ হিজরীতে ছাগলের মাঝে মরণ ব্যাধি রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় পালের পর পাল ছাগল মরে সাফ হয়ে যায়। ৪৬৫ হিজরীতে আল্ব আরসালান নিহত হয়। তার জায়গায় পুত্র মুলক শাহ অধিষ্ঠিত হয়। তাকে জালালুদ্দৌলা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ৪৬৬ হিজরীতে দজলা নদীর ৩০ হাত খাড়া পানিতে বাগদাদ প্লাবিত হয়। এতে প্রচুর জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। এক লাখের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ায় বাগদাদ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। ৪৬৭ হিজরীতে ৪৫ বছর খিলাফত পরিচালনার পর তিনি শাবান মাসের ১৩ তারিখ বৃহস্পতিবার রাতে জগতের মায়া কাটিয়ে পরপারে পাড়ি জমান।
তার খিলাফত কালে নিম্নবর্ণিত ওলামায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন- আবু বকর ইয়ূরকানী, আবুল ফজল ফালকী, ছাআলাবী, কুদদারী শায়খে হানাফীয়া, ইবনে সীনা দার্শনিক, কবি মিহয়ার, আবু নাঈম, আবু যায়েদ, তাহযীবের লেখক বুরুয়ী মালিকী, আবুল হাসান বসরী মুতাযানী, মক্কী, শায়খ আবু মুহাম্মাদ জুবিনী, মাহদী সাহেবে তাফসীর, আকলিলী, ছুমানিনী, ইরশাদের লেখক আবু আমর দাদানী জালিল, সালিম রাযী, আবুল আলা মুফযী, আবু উসমান ছাবুনী, ইবনে বাত্তাল বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার, কাযী আবু তয়্যব তাবারী, ইবনে শায়তী মাকরী, মাদরদী শাফী, ইবনে বাব শাদ, শিহাব বিন বুরহান নাহুবিদ, ইবনে হাযাম যাহেরী, বায়হাকী, ইবনে সায়্যেদাহ, আবু ইয়ালা বিন ফারার শায়খে হানাবালা, শাফী হাযালী, শায়খে বাগদাদী ইবনে রাশীক, উমদাহ বিন আব্দুল বার প্রমুখ।