📄 তামাক-এর পরিচয়
তামাক এক ধরনের গাছ। এর পাতা এবং ডাল থেকে নানা ধরনের দ্রব্য তৈরি হয়। এগুলো বিভিন্নভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন- কেউ সরাসরি তামাকপাতা পানের সাথে ব্যবহার করে, আবার কেউ জর্দা হিসেবে ব্যবহার করে, আবার কেউ গুল হিসেবে ব্যবহার করে, আবার কেউ হুক্কা হিসেবেও ব্যবহার করে। তবে বিড়ি-সিগারেট হিসেবেই তামাকের ব্যবহার বেশি হয়ে থাকে। এই ব্যবহারকে আমরা “ধূমপান” বলে থাকি। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
📄 ধূমপান
ধূমপান একটি নিরব ঘাতক। এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। আমরা সকলেই শ্লোগান দিই যে, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অথচ ধূমপানের ক্ষতির তুলনায় আমাদের শ্লোগানটা খুবই হালকা। কারণ ধূমপান শুধু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; বরং মস্তিষ্কের জন্য, আত্মার জন্য, স্বভাব-চরিত্রের জন্য এবং সমাজ ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। বড় ক্ষতিকর বিষয় হলো, ধূমপানের মাধ্যমে ইসলামি নৈতিকতা নষ্ট হওয়া। ধোঁয়ার কারণে যেমন রান্নাঘরে কালো আবরণ পড়ে, তেমনি ধূমপানের কারণে দাঁতে, মুখে ও ফুসফুসে কালো আবরণ তৈরি হয়। ঘরের আবরণ পরিষ্কার করা সহজ কিন্তু ফুসফুসের আবরণ পরিষ্কার করা কঠিন তো বটে; বরং অসম্ভব। সমাজে যারা বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়ায় তাদের ৯৮% ভাগ ধূমপান করে থাকে। যারা মাদকদ্রব্য সেবন করে তাদের ৯৫% ভাগ প্রথমে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়। তারপর মাদক সেবন শুরু করে। এমনকি ধূমপানকারী মায়ের সন্তানও উগ্র স্বভাবের হয়ে থাকে।
ধূমপান নারীদের জরায়ু ও স্তনে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। নারীর ধূমপানের ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে, গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। মায়ের ধূমপানের কারণে বাচ্চার মধ্যে ঘনঘন খিচুনি ও রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয় এবং বুক ও চামড়া সংবেদনশীল হয়। ব্যবসায়ীরা জীবনের মূল্য তেমন বুঝে না, যেমন বুঝে না অপ্রাপ্ত বয়স্করা। ফলে তামাক ব্যবসায়ীরা অর্থের লোভে এ ব্যবসা করে থাকে। ছোটরা কৌতুহলবশত এমন কাজ করে থাকে। আমাদের উচিত তাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া এবং সতর্ক করা।
টিকাঃ
১. দৈনিক ইনকিলাব, তারিখ ১৫-১২-২০০০ ইং
📄 ধূমপানের ইতিহাস
১৪৯২ ইং সালে ইউরোপে সর্বপ্রথম তামাক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রেড ইন্ডিয়ানরা তাদের ভূমিতে তামাক চাষ করত এবং তা জ্বালিয়ে ধোঁয়া গ্রহণ করত। ১৬০০ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপে তামাক চাষ শুরু হয়। প্রথমে ফ্রান্স, তারপর পর্তুগাল, স্পেন এবং ব্রিটেনে তামাক চাষ শুরু হয়। আমেরিকায় সর্বপ্রথম সিগারেটের কারখানা তৈরি হয় ১৮৮১ ইং সালে। ভারত, ইরান ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তামাক আমদানী হয় ১৭০০ শতাব্দীতে। অতঃপর দুর্ভাগ্যক্রমে আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশে তুর্কীদের মাধ্যমে তামাকের অনুপ্রবেশ ঘটে। ইসলামের শত্রুরা মুসলিম দেশে তামাকের প্রসার করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে। মরক্কোকে সর্বপ্রথম ধূমপানের প্রচলন ঘটায় এক ইয়াহুদী। জনৈক অগ্নিপূজক সুদানে ধূমপানের প্রচলন শুরু করে। এভাবে বাংলাদেশ সহ অন্যান্য মুসলিম দেশে এই ব্যাধির প্রসার ঘটে।
📄 শরীয়তের দৃষ্টিতে ধূমপান
ধূমপানকারীরা সাধারণত এ কথা বলে যে, কুরআন-হাদীসে ধূমপান নিষিদ্ধ হওয়ার কোন প্রমাণ নেই। অথচ কুরআনের একাধিক আয়াত ও হাদীসের একাধিক ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ধূমপান নিষিদ্ধ। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ )
অর্থ: তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। ২
উক্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, ধূমপান নিষেধ। কারণ প্রত্যক্ষভাবে আমরা অবলোকন করি যে, ধূমপানের কারণে নানা ধরণের প্রাণনাশী রোগ-ব্যাধি হয়ে থাকে। আর উক্ত আয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সুতরাং উক্ত আয়াত দ্বারা ধূমপান নিষিদ্ধ হয়, সেটা জীবন বিধ্বংসী কাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ্ তা'য়ালা বলেন-
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ)
অর্থ: তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে হত্যা করো না। ৩
এই আয়াতে আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর জেনে শুনে ধূমপান করা মানে এক ধরনের আত্মহত্যা করা। সুতরাং উক্ত আয়াত দ্বারা ধূমপান নিষিদ্ধ হওয়া প্রমাণিত হলো।
অনুরুপভাবে সহীহ দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, ধূমপান নিষিদ্ধ।
যেমন- মু'আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি যে,
إِنَّ اللهَ كَرِهَ لَكُمْ ثَلاثًا: قِيلَ وَقَالَ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ
অর্থ: “আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের জন্য তিনটি বিষয়কে অপছন্দ করেন। ১. অযথা কথাবার্তা বলা, ২. সম্পদ নষ্ট করা এবং ৩. অধিক হারে প্রশ্ন করা।”৪
আর ধূমপানকারীরা অনর্থক সম্পদ নষ্ট করে থাকে। তাই উক্ত হাদীস অনুযায়ী আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে অপছন্দ করেন।
সুতরাং বুঝা গেল, ধূমপান নিষিদ্ধ; তা না হলে আল্লাহ তা'আলা ধূমপানকারীদের অপছন্দ করতেন না।
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُؤْذِي جَارَهُ
অর্থ: আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। ৫
আর নিঃসন্দেহে ধূমপানকারী ধূমপানের দ্বারা তার স্ত্রী, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী ও আশেপাশের লোকজনকে কষ্ট দিয়ে থাকে। আর মানুষকে কষ্ট দেয়া নিষেধ। সুতরাং ধূমপান নিষেধ।
অতএব, কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারলাম যে, ধূমপান হারাম ও নিষিদ্ধ।
পূর্বোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয়েছিল যে, ধূমপান আত্মহত্যার শামিল। তাই বিস্তারিতভাবে শরীয়তের দৃষ্টিতে আত্মহত্যার শাস্তির বর্ণনা করা উচিত মনে করছি।
টিকাঃ
২ (সূরা বাকারাহ্-২:১৯৫)
৩. সূরা নিসা-৪:২৯
৪ (সহীহ বুখারী, হা/১৪৭৭; সহীহ মুসলিম, হা/৪৫৮২, ৫৯৩)
৫. সহীহ বুখারী, হা/৫১৮৫: সহীহ মুসলিম, হা/১৮৩)