📘 তাগুত > 📄 মুনাফেক

📄 মুনাফেক


মুনাফেক শব্দটি আরবী নেফক (نفق) ধাতু হতে নির্গত। যেমন-(نفق) শব্দটির অর্থ হচ্ছে এমন একটি সুড়ঙ্গপথ যার একদিক হতে প্রবেশ করার এবং অপরদিক হতে বের হবার রাস্তা রয়েছে। শরীয়তের পরিভাষায় অর্থ হচ্ছেঃ “দ্বীন ইসলামের এক দরওয়াজা দিয়ে প্রবেশ করে অপর দরওয়াজা দিয়ে বের হয়ে আসা।" (মুফরাদাতে ইমাম রাগেব)

দ্বীন ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করার পর তা থেকে আবার ফিরে আসা দু'টি কারণে হতে পারে। (১) এ প্রবেশ হয়েছে শুধু লোক দেখানোর জন্য। আন্তরিকভাবে সে ইসলামকে গ্রহণ করেনি, বরং মন আত্মা তার কুফরের উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। (২) দ্বিতীয়তঃ এ প্রবেশ ইসলামের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস-অনুরাগ ও মহব্বত নিয়েই হয়েছে। লোক দেখানোর জন্য সে ইসলামের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেনি। কিন্তু এ সম্পর্কটি এত দুর্বল যে অন্যান্য সম্পর্ক পূর্ণরূপে তার উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে।

প্রথম শ্রেণীর নেফাককে "নেফাকী আকীদা" (বা বিশ্বাসগত মুনাফেক)। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নেফাককে "নেফাকী আমলী" (বা চরিত্রগত মুনাফেক) বলা হয়। যেমন হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলবী (রঃ) তাঁর স্বলিখিত "ফওযুল কবীর” কিতাবে লিখেছেনঃ “নবুয়াতী যুগে দু'ধরনের মুনাফেক বর্তমান ছিল,

(১) এক ধরনের মুনাফেক ছিল যারা মুখে কলেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করতো বটে, কিন্তু তাদের অন্তঃকরণ সম্পূর্ণরূপে কুফর, নাস্তিকতা ও বেঈমানীর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা হচ্ছে সেই মুনাফেক যাদের পরিণতি সম্পর্কে আল-কুরআন কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছেঃ "অর্থাৎ নিঃসন্দেহে এ সব মুনাফেক জাহান্নামের সর্বনিম প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবে।" (আন-নিসা: ১৪৫)।

(২) আর দ্বিতীয় ধরনের হলো ঐ সকল লোক যারা আন্তরিকতার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের ঈমানে দৃঢ়তা ছিল না। নানারূপ দুর্বলতার শিকারে পরিণত হয়েছিল। যেমন এক শ্রেণীর লোক ছিল যারা সর্ব বিষয়ে জাতীয় চরিত্র ও কর্মধারাকে অনুসরণ করে চলতো। যদি তাদের সম্প্রদায় মুসলমান হয়ে যেত, তবে তারাও মুসলমান হত। আর তারা কাফের থাকলে এরাও কাফেরই থাকত। আর এক শ্রেণীর লোক ছিল যাদের অন্তঃকরণ পার্থিব স্বার্থসুলভ লালসায় পরিপূর্ণ ছিল, আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতের জন্য কোন স্থানই তাদের অন্তরে খালি ছিল না। অথবা ধন-সম্পদের লোভ-লালসা ও হিংসা বিদ্বেষের বাতেনী রোগ তাদের মন-মগজ ও অন্তঃকরণকে এমনভাবে বিষাক্ত করেছিল যে, প্রার্থনার স্বাদ ও ইবাদতের বরকত অনুভব করার কোন সুযোগই অবশিষ্ট ছিল না। আবার কিছু লোক ছিল যাদেরকে অর্থনৈতিক চিন্তা ও কর্মব্যস্ততা এমনভাবে বস্তুবাদী ও দুনিয়ামুখী করে রেখেছিল যে, পরকালের চিন্তা-ভাবনা ও আশা-আকাংখা পোষণের কোন সুযোগই তারা পেত না। আবার এমন একদল লোকও ছিল যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের নবুয়াতের প্রতি পূর্ণরূপে আস্থাবান ছিল না এবং তাদের অন্তরে অর্থহীন কুধারণা ও সন্দেহবাদীতা স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু এ কুধারণা ও সন্দেহবাদীতা এমন পর্যায়ে ছিল না যাতে করে তারা ইসলামের গন্ডীসীমা হতে বের হয়ে পড়ে। এ ধরনের আরো কিছু বৈষয়িক কারণ ছিল যার ফলে তাদের নবুয়াতে মুহাম্মদীর উপর অনিশ্চিত ও অসন্তুষ্ট করে রেখেছিল। এমনও লোক ছিল যারা স্বীয় গোত্রীয় ও বংশীয় স্বার্থে এবং তার সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতো। এমন কি হক ও বাতিলের সংগ্রামে ইসলামের স্বার্থকে পদাঘাত করতেও তারা কুণ্ঠিত হতো না। এ দ্বিতীয় শ্রেণীর নেফাককেই নেফাকে আমলী বা চরিত্রগত মুনাফেকী বলা হয়।"

মুনাফিক বনাম গুনাহগারঃ মুনাফেকীর যে সকল নিদর্শন ও আলামত ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি তার কোন একটি নির্দেশ ও আلامত কোন লোকের মধ্যে পরিদৃষ্ট হলে তাকে বিনা চিন্তায় মুনাফেক ধারণা করা উচিত নয়। মুনাফেকের যতগুলো বৈশিষ্ট্য উপরে বর্ণিত হয়েছে তার অধিকাংশের উৎসমূল হচ্ছে মানুষের আত্মিক দুর্বলতা ও সীমাহীন পার্থিব লোভ-লালসা। আর এ আত্মিক দুর্বলতা ও সীমাহীন পার্থিব লোভ-লালসা সমস্ত পাপেরও উৎসমূল। এ কারণেই একজন খাঁটি মুসলমানের থেকে এ সব কার্যাবলী প্রকাশ পাওয়া অসম্ভবের কিছুই নয়। কেননা, নবী-রাসূলগণ ব্যতীত মানুষ যতই দৃঢ় ও মজবুত ঈমানদার হোক না কেন তারা কখনই নিষ্পাপ নয়। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই গুনাহর প্রবৃত্তি (নাফস) বর্তমান। এ জন্যই একজন মুসলমান যেখানে খুব ভাল কাজ করছে সেখানে তার থেকে পাপের কাজও হতে পারে-হচ্ছে। একজন মুনাফেকের যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, কোন সময় একজন মুসলমানের দ্বারা সে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়া কোনক্রমেই অসম্ভব নয়। সুতরাং এখানে মুনাফেক ও গুনাহগার মুসলমানের মর্যাদা এবং তাদের উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য ভালরূপে বুঝে নেয়া উচিত।

কোন মুনাফেক যখন ইসলামের তালিম তরবিয়াত ও জাতীয় কল্যাণের পরিপন্থী কোন কাজ সাফল্যের সাথে করে, তখন তার অন্তর এ খারাপ কাজের জন্য কোন প্রকার অনুতাপ করার পরিবর্তে বরং তার সাফল্যজনক কূটনৈতিকতার জন্য গর্ববোধ করে। কিন্তু একজন মুসলমানের দ্বারা কি এমন কাজ কখনো হতে পারে? যদি অলক্ষ্যে হয়ে যায়, তখন তার অন্তর ও মন-প্রাণের অবস্থা কি হতে পারে-কুরআনে হাকীম তার বর্ণনায় বলেছেঃ "আর জান্নাত হচ্ছে সেই সকল মোত্তাকী লোকদের জন্য, যারা ভুলবশতঃ যদিও কোন অশ্লীল কাজ করে বা পাপের কাজ করে স্বীয় আত্মার উপর যুলুম করে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মনে আল্লাহ তায়ালার খেয়াল ও স্মরণ এসে যায়। আর তারা নিজেদের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর এমন কে আছে যে, গুনাহ ক্ষমা করতে পারে? কেহই নেই। আর এ সকল মোত্তাকী লোকেরা বুঝে শুনে জ্ঞাতস্বারে ঐ সকল কৃত গুনাহর কাজ আর দ্বিতীয়বার করে না।" (আলে-ইমরান: ১৩৫)

আর একস্থানে বর্ণিত হয়েছেঃ "আর নফসের প্রবল আবেগ-উচ্ছাসের মুখে পড়ে অজ্ঞতাবশতঃ যাদের থেকে গুনাহর কাজ হয়ে পড়ে, আর গুনাহ করার পর নিজেরা তাওবা করে এবং সংশোধিত হয়, এমন লোকদের বেলায় নিঃসন্দেহে আপনার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।” (নাহল: ১১৯)

উল্লেখিত আয়াত গুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কয়েকটি বিষয় আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়। প্রথমত : একজন মুসলমানের থেকে পাপের কাজ হওয়া সম্ভব এবং হয়েও থাকে। দ্বিতীয়তঃ মুসলমানদের থেকে গুনাহর কাজ প্রকাশ হয়ে পড়লে তা বুঝে-শুনে হয় না বরং অজ্ঞতা ও নফসের আকস্মিক আবেগ-উচ্ছাসের দ্বারা পরাজিত ও প্রভাবিত হবার দরুনই হয়ে থাকে।

তৃতীয়ত : মুসলমান পাপের কাজ করার পর তাদের অন্তঃকরণ আল্লাহর ভয়ে ব্যাকুল ও অস্থির হয়ে উঠে। আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর সুবিচারী গুণ বৈশিষ্ট্যটি তার চক্ষের সামনে মূর্তিমান হয়ে দন্ডায়মান হয়। তার ঈমানের কারণে ললাটভূমি ভীত, কম্পিত ও শংকায় ঘর্মাক্ত পানি দ্বারা সিক্ত হয়ে উঠে। কাল বিলম্ব না করে তারা স্বীয় অপরাধের জন্য রব্বুল আলামীনের দরবারে সিজদায় পড়ে অঝোরে রোদন করতে থাকে। আর প্রার্থনা করতে থাকে তাঁর নিকট ক্ষমা ও মাগফেরাতের জন্য। সংশোধন হয়ে যায় ভবিষ্যতের আগত দিনগুলোর জন্য। আর চতুর্থ যে বিষয়টি আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়, তা হচ্ছে তৃতীয় বিষয়টির আর একটি দিক। অর্থাৎ তারা নিজেদের কোন পাপের কাজের উপর স্থির হয়ে থাকে না। বরং তা পরিহার করে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং এ জন্য তাদের মন মগজ, লজ্জা ও অবমাননার ব্যাথায় ব্যাথিত হয়ে উঠে। কিন্তু মুনাফেকদের মধ্যে এহেন গুণাবলী আদৌ বর্তমান থাকে না। তারা শরীয়তের বিপরীত কাজগুলো নফসের কোন আকস্মিক আবেগ উচ্ছাসের বশবর্তী হয়ে করে না। বরং জেনে বুঝে ও সজাগ অনুভূতি নিয়েই দ্বিধাহীন চিত্তে করে। শরীয়তের বিরুদ্ধাচারণ করাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নেয়। তাদের কলবে তখন আর তাওবা ও এস্তেগফার দূরের কথা, আল্লাহর ভয় ভীতির নাম-গন্ধও বিদ্যমান থাকে না।

একজন মুনাফেক ও একজন গুনাহগার মুসলমানের মধ্যে এ হচ্ছে মৌলিক পার্থক্য। মুনাফেকী হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে একটি বিপরীতধর্মী বিষ। তার মধ্যে আদৌ ঈমানের কোন চিহ্ন নেই। পক্ষান্তরে গুনাহ করার পর যদি মানুষ লজ্জিত না হয় এবং নিজের সংশোধনের জন্য ব্যাকুল হয়ে না উঠে, তবে এ গুনাহই শেষ পর্যন্ত মুনাফেকীর বীজ বপন করে। গুনাহর ব্যাপারে তার কর্ম চরিত্র যদি এমনিই থেকে যায়, তবে তার দ্বারাই মুনাফেকীর বীজ অংকুরিত হয়ে ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে কালক্রমে বিরাট বিশাল বৃক্ষের রূপ ধারণ করে। আল্লাহ বলেন : "তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি তাদেরকে তাঁর ফজল-করম দ্বারা অনুগ্রহ করেন, তবে অবশ্যই তারা তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করবে, সদকা দিবে এবং পুণ্যবান মুসলমান হবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যখন তাদেরকে তার ফজল ও করম দ্বারা অনুগ্রহ করলেন তখন তারা কৃপণতা প্রদর্শন করল। ফলে তারা আল্লাহর সহিত সাক্ষাত পর্যন্ত তাদের অন্তরে মুনাফিকী সৃষ্টি করে নিল। কেননা, তারা আল্লাহর সাথে যে চুক্তি করে ছিল সে চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলেছে তারা হল মিথ্যাচারী।” (তাওবা: ৭৫-৭৭)

উল্লেখিত কুরআনে হাকীমের বাণী দ্বারা বোঝা যায় যে, গুনাহ এক জিনিস এবং মুনাফিকী আর এক জিনিস। কিন্তু এদের উভয়ের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ গুনাহ কোন কোন সময় মুনাফিকীর ন্যায় দুরারোগ্য রোগও মানুষের অন্তরে সৃষ্টি করে। কলেরা মহামারীর সময়কার সাধারণ একটি পেটের পীড়া-যেমন কোন কোন সময় কলেরায় রূপান্তরিত হয়। এমনিভাবে গুনাহও কোন কোন সময় মানুষের মধ্যে মুনাফিকী সৃষ্টি করে। এ জন্যই আকস্মিক গুনাহর কাজ হয়ে পড়লে সে জন্য নির্ভয় ও নিশ্চিত থাকা উচিত নয়। বরং তার বিভিষিকাময় পরিণতি হতে নিরাপদ থাকার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। নতুবা তা মুনাফিকীর দূরারোগ্য রোগ আমাদের অলক্ষ্যে সৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ "তোমাদের আমল যেন এমনভাবে নিস্ফল ও ধবংস না হয় যা তোমরা বুঝতেও পারো না।" (হুজুরাত : ২)

📘 তাগুত > 📄 সুন্নাত

📄 সুন্নাত


'সুন্নাত' শব্দের আভিধানিক অর্থ: الطريق 'পথ'। কুরআন মজিদে এই 'সুন্নাত' শব্দটি বহুক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি আয়াত হলঃ "আল্লাহর সুন্নাত, যা পূর্ব থেকেই কার্যকর হয়ে রয়েছে। আর আল্লাহর এ সুন্নাতে কোনরূপ পরিবর্তন দেখবে না কখনো।” (ফাতাহ্: ২৩)

এ আয়াতে ব্যবহৃত সুন্নাত শব্দের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থ طريقه পথ, পন্থা এবং পদ্ধতি। এভাবে দেখা যায় যে, 'সুন্নাত'শব্দটি যেমন আল্লাহর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে, তেমনি করা হয়েছে নবী ও রাসূলদের ক্ষেত্রেও।

আল্লাহর সুন্নাত ও নবীর সুন্নাত: ইমাম রাগেব ইসফাহানী বলেন, আল্লাহ্ তা'য়ালার সুন্নাত বলা হয় তাঁর কর্মকুশলতার বাস্তব পন্থাকে, তাঁর আনুগত্যকারীর নিয়ম পদ্ধতিকে। আর নবীর সুন্নাত হচ্ছে সেই নিয়ম, পন্থা ও পদ্ধতি, যা তিনি বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করে চলতেন।

হাদীস-বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় 'সুন্নাত' হচ্ছে রাসূলে করীম (সাঃ)-এর মুখের কথা, কাজ ও সমর্থন। অনুমোদনের বর্ণনা যাকে প্রচলিত কথায় বলা হয় 'হাদীস'। আর ফিকাহশাস্ত্রে 'সুন্নাত' বলা হয় এমন কাজকে, যা ফরজ বা ওয়াজিব নয় বটে; কিন্তু নবী করীম (সাঃ) তা প্রায়ই করেছেন। এখানে এ দুটো সুন্নাতের কোনটি-ই আলোচ্য নয়।

আমাদের আলোচ্য সুন্নাত হল সেই মূল আদর্শ, যা আল্লাহ তা'য়ালা বিশ্ব- মানবের জন্যে নাযিল করেছেন, যা রাসূলে করীম (সাঃ) নিজে তাঁর জীবনে দ্বীনি দায়িত্ব পালনের বিশাল ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন; কেননা নবী করীম (সাঃ) যা বাস্তবভাবে অনুসরণ করেছেন, তার উৎস হল ওহী, যা আল্লাহর নিকট থেকে তিনি লাভ করেছেন। এ 'ওহী' দু'ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে আল্লাহর কালাম কুরআন মজীদ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ওহীয়ে খফী, বিশেষ পন্থায় আলাহর জানিয়ে দেয়া বিধান ও নির্দেশ। রাসূলে করীম (সাঃ) এর কর্মজীবনে এ দুটোরই সমন্বয় ঘটেছে পুরোপুরিভাবে। আর তাই হচ্ছে 'সুন্নাত' তাই হচ্ছে পরিপূর্ণ দ্বীন-ইসলাম। কুরআন মজীদে রাসূলের জবানীতে বলা হয়েছেঃ "আমি কোন আদর্শই অনুসরণ করি না' করি শুধু তাই যা আমার নিকট ওহীর সূত্রে নাযিল হয়।" ওহীর সূত্রে নাযিল হওয়া আদর্শই রাসূলে করীম (সাঃ) বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করেছেন, তা-ই হচ্ছে আমাদের আলোচ্য 'সুন্নাত'। এই সুন্নাতেরই অপর নাম ইসলাম। কুরআন মজীদে এই সুন্নাতকেই 'সিরাতুল মুস্ত াকীম' বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলের জবানীতে কুরআন মজীদে ঘোষণা করা হয়েছেঃ

"নিশ্চয়ই এ হচ্ছে আমার সঠিক সরল দৃঢ় পথ (সিরাতুল মুস্তাকীম)। অতএব তোমরা এ পথই অনুসরণ করে চলবে, এ ছাড়া অন্যান্য পথের অনুসরণ তোমরা করবে না। তা করলে তা তোমাদের এ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে নিয়ে যাবে। আল্লাহ্ তোমাদের এরূপ-ই নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা ভয় করে চল।" (আনআমঃ১৫৩)

ইমাম শাতেবী 'সিরাতুল মুস্তাকীম'-এর পরিচয় দান প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ 'সিরাতুল মুস্তাকীম' হচ্ছে আল্লাহর সেই পথ, যা অনুসরণের জন্যে তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। আর তা-ই সুন্নাত; আর অন্যান্য পথ বলতে বোঝানো হয়েছে বিরোধ ও বিভেদপন্থীদের পথ, যা মানুষকে 'সিরাতুল মুস্তাকীম' থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর তারাই হচ্ছে বিদয়াতপন্থী লোক।

📘 তাগুত > 📄 বিদয়াত

📄 বিদয়াত


সুন্নাত হচ্ছে তা-ই, যা বিদয়াতের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কেননা এ সুন্নাতের বিপরীতই হচ্ছে বিদয়াত। ইমাম রাগেব 'বিদয়াত' শব্দের অর্থ লিখেছেনঃ কোনরূপ পূর্ব নমুনা না দেখে এবং অন্য কিছুর অনুসরণ না করেই কোন কার্য নতুনভাবে সৃষ্টি করা। অর্থাৎ শরীয়াত প্রবর্তক যে কথা বলেন নি সে কথা বলা এবং তিনি যা করেন নি এমন কাজকে আদর্শরূপে গ্রহণ করা-তা-ই হচ্ছে বিদয়াত। এমন সব কাজ করা বিদয়াত, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। কুরআন মজিদে এ বিদআত শব্দটি আল্লাহ্ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়েছে দুটো আয়াতে।

"আসমান-যমীনের সম্পূর্ণ নবোদ্ভাবনকারী, নতুন সৃষ্টিকারী।” (আল-বাকারা)

"তিনি তো আসমান-যমীনের নব সৃষ্টিকারী।" (আনআম: ১০১)

এ দুটো আয়াতেই আল্লাহ্ তা'য়ালাকে 'আসমান যমীনের বদীউন'-পূর্ব দৃষ্টান্ত পূর্ব উপাদান ও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সৃষ্টিকারী বলা হয়েছে। সূরা 'আল-কাহাফ'-এর এক আয়াতে 'বিদয়াত' শব্দের এ অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়। ইরশাদ হচ্ছেঃ

"বল হে নবী, আমি আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের কথা কি তোমাদের বলব? তারা হচ্ছে এমন লোক, যাদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই দুনিয়ার জীবনে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে আর তারাই মনে মনে ধারনা করে যে, তারা খুবই ভাল কাজ করেছে।" (আল কাহাফ: ১০৩-১০৪)

বিদয়াতপন্থীরাও ঠিক এমনি। তারা যেসব কাজ করে, আসলে তা আল্লাহর দেয়া নীতির ভিত্তিতে নয়। তা সত্ত্বেও তারা তাকেই নেক আমল এবং বড় সওয়াবের কাজ বলে মনে করে।

হযরত ইরবাদ ইবনে সারিয়া (রাঃ) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেন "তোমাদের অবশ্যই অনুসরণ করে চলতে হবে আমার সুন্নাত এবং হিদায়াত প্রাপ্ত সত্যপন্থী খলীফাদের সুন্নাত! তোমরা তা শক্ত করে ধরবে, দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে থাকবে (যেন কোন অবস্থায়ই তা হাতছাড়া হয়ে না যায়, তোমরা তা থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিচ্যুত হয়ে না পড়)"। (মুসনাদে আহমদ)

কুরআন মজীদে দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেনঃ

"আজকের দিনে তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ-পরিণত করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্যকভাবে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম-মনোনীত করলাম।" (আল-মায়েদা ৩)

এ আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম পরিপূর্ণ। তাতে নেই কোন অসম্পূর্ণতা, কোন কিছুর অভাব। এ দ্বীনে বিশ্বাসী ও এর অনুসরণকারীদের কোন প্রয়োজন হবে না এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোন দিকে তাকাবার, বাইরের কোন কিছু এতে শামিল করার এবং ভিতর থেকে কোন কিছু বাদ দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়ার কেননা এতে মানুষের সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অতএব না তাতে কোন জিনিস বৃদ্ধি করা যেতে পারে, না পারা যায় তা থেকে কোন কিছু বাদ দিতে। এ দুটোই দ্বীনের পরিপূর্ণতার বিপরীত এবং আলাহর উপরোক্ত ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধী। ইসলামী ইবাদতের ক্ষেত্রে সওয়াবের কাজ বলে এমন সব অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করা, যা নবী করীম (সাঃ) ও সাহাবায়ে কিরামের জামানায় চালু হয়নি এবং তা দেখতে যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন তা স্পষ্টই বিদয়াত, তা দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতার কুরআনী ঘোষণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ কারণেই ইমাম মালিক বলেছিলেনঃ "সেকালে যে কাজ দ্বীনি কাজ বলে ঘোষিত ও নির্দিষ্ট হয়নি, আজও তাকে দ্বীনি কাজ বলে মনে করা যেতে পারে না।"

অতীতকালের নবীর উম্মতদের দ্বারা নবীর উপস্থাপিত দ্বীন বিকৃত ও বিলীন হয়ে যাওয়ারও একমাত্র কারণই ছিল যে, তারা নবীর প্রবর্তিত ইবাদতে মনগড়াভাবে নতুন জিনিস শামিল করে নিয়েছিল। কিছুকাল পরে আসল দ্বীন কি, তা চিনবার আর কোন উপায়ই থাকল না।

'দ্বীন' তো আল্লাহর দেয়া এবং রাসূলের উপস্থাপিত জিনিস। তাতে যখন কেউ নতুন কিছু শামিল করে, তখন তার অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ্ বা রাসুলে করীম (সাঃ) যেন বুঝতেই পারছিলেন না দ্বীন কিরূপ হওয়া উচিত আর এরা এখন বুঝতে পারছে, তাই নিজেদের বুঝমত সব নতুন জিনিস এর মাঝে শামিল করে এর ত্রুটি দূর করতে চাইছে এবং অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করে তুলছে। আর এর ভিতর থেকে কিছু বাদ-সাদ দিয়ে একে যুগোপযোগী করে তুলতে চাইছে। এরূপ কিছু করার অধিকার তাকে কে দিল? আল্লাহ্ দিয়েছেন? তাঁর রাসূল দিয়েছেন? ---না, কেউ ই দেয় নি, নিজ ইচ্ছে মতই সে করেছে। ঠিক এ দিকে লক্ষ্য করেই হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেছেন। "যে ইবাদত সাহাবায়ে কেরাম করেন নি, সে ইবাদত তোমরা কর না। তাকে ইবাদত বলে মনে কর না, তাতে সওয়াব হয় বলেও বিশ্বাস কর না।"

এ বিদয়াত এমনই এক মারাত্মক জিনিস, যা শরীয়তের অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া ও রাসূলের প্রদর্শিত ফরজ ওয়াজিবকে পর্যন্ত বিকৃত করে দেয়। শরীয়াতের ফরজ ওয়াজিবের প্রতি অন্তরে থাকে না কোন মান্যতা গণ্যতার ভাবধারা। শরীয়াতের সীমালংঘন করার অভ্যাস হতে থাকে। শরীয়াত বিরোধী কাজগুলোকে তখন মনে হতে থাকে খুবই উত্তম। যে লোক ইসলামে কোন বিদয়াত উদ্ভাবন করবে এবং তাকে ভাল ও উত্তম মনে করবে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে, নবী (সাঃ) রিসালাত ও নবুয়‍্যাতের দায়িত্ব পালন করেন নি, খেয়ানত করেছেন। কেননা তিনি যদি দায়িত্ব পালন করেই থাকেন, তাহলে ইসলাম ও সুন্নাত ছাড়া আর তো কোন কিছুর প্রয়োজন পরে না। সব ভালই তো তাতে রয়েছে।

সত্যিকারভাবে যে দ্বীন রাসূলের নিকট থেকে পাওয়া গেছে, ঠিক তা-ই পালন করে চলা উচিত সব মুসলমানের। না তাতে কিছু কম করা উচিত, না তাতে কিছু বেশী করা সঙ্গত হতে পারে। কুরআনের নিগেক্ত আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছে 'আহলি কিতাব কে লক্ষ্য করে।

"হে আহলি কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কর না আর আল্লাহ্ সম্পর্কে প্রকৃত হক ছাড়া কোন কথা বল না।”

বিদয়াত কিভাবে চালু হয়

বিদয়াত চালু হওয়ার মূলে চারটি কার্যকরণ লক্ষ্য করা যায় প্রথমটি : এই যে, বিদয়াতী তা নিজের থেকে উদ্ভাবিত করে সমাজে চালিয়ে দেয়। পরে তা সাধারণভাবে সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়টি: কোন আলিম ব্যক্তিই হয়ত শরীয়তের বিরোধী একটা কাজ করেছেন, করেছেন তা শরীয়তের বিরোধী জানা সত্ত্বেও; কিন্তু তা দেখে জাহিল লোকেরা মনে করতে শুরু করে যে, এ কাজ শরীয়তসম্মত না হয়ে যায় না। এভাবে এক ব্যক্তির কারনে গোটা সমাজেই বিদয়াতের প্রচলন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়টি : এই যে জাহিল লোকেরা শরীয়াত বিরোধী কোন কাজ করতে শুরু করে। তখন সমাজের আলিমগণ সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে থাকেন, তার প্রতিবাদও করেন না, সেকাজ করতে নিষেধও করেন না। বলেন না যে, এ কাজ শরীয়াতের বিরোধী তোমরা এ কাজ কিছুতেই করতে পারবে না। বিরুদ্ধতা না করার ফলে সাধারন লোকদের মনে ধারণা জন্মে যে, এ কাজ নিশ্চয়ই নাজায়েয হবে না, বিদয়াত হবে না। হলে কি আর আলিম সাহেবরা তার প্রতিবাদ করতেন না। এভাবে সমাজে সম্পূর্ণ বিদয়াত বা নাজায়েয কাজ শরীয়াতসম্মত কাজরূপে পরিচিত ও প্রচলিত হয়ে পড়ে।

চতুর্থটি: বহুকাল পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমকৃত ও রাসূল (সাঃ)-এর প্রদর্শিত কোন একটি সুন্নাত তা সমাজের লোকদের সামনে বলা হয়নি, প্রচার করা হয়নি। তখন সে সম্পর্কে সাধারণের ধারণা হয় যে, এ কাজই নিশ্চয়ই জায়েয নয়, হুকুম হলে আলিম সাহেবরা কি এতদিন তা বলতেন না! এভাবে একটি শরীয়াতসম্মত কাজকে শেষ পর্যন্ত শরীয়ত বিরোধী বলে লোকেরা মনে করতে থাকে আরএ-ও একটি বড় বিদয়াত। যেমন- কুরআন আর সুন্নাহর সুস্পষ্ট হুকুম শুধুমাত্র ইসলামী আইন বা শরীয়াহ মুতাবিক রাষ্ট্রীয় সংবিধান হওয়া, শুধুমাত্র আলাহর আইন দ্বারা বিচার ফায়সালা করা, দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) থাকুক আর না থাকুক সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে এক খলিফার নেতৃত্বে একত্রিত থাকা এবং ইসলামের নামে ফিরকা বা দলাদলি না করা ইত্যাদি। এ সকল কাজ সমূহের ফরয হুকুম থাকা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজের বেশীরভাগ লোকই জানে না যে তারা সকলে আল্লাহর ফরয হুকুম পালন করা ছেড়ে দিয়েছে এবং বিদয়াত নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। ফলে তারা শির্ক কুফর ও বিদয়াতে পতিত আছে।

বিদয়াত প্রচলিত হওয়ার আর একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। আর তা হল এই যে, মানুষ স্বভাবতই চিরন্তন শান্তি ও সুখ-বেহেশত লাভ করার আকাঙক্ষী। আর এ কারণে সে বেশী বেশী নেক কাজ করতে চেষ্টিত হয়ে থাকে। দ্বীনের হুকুম আহকাম যথাযথ পালন করা কঠিন বোধ হলেও সহজসাধ্য সওয়াবের কাজ করার জন্যে লালায়িত হয় খুব বেশী। আর তখনি সে শয়তানের ষড়যন্ত্রে পড়ে যায়। নিজ থেকেই মনে করে নেয় যে, এগুলো সব নেক কাজ, সওয়াবের কাজ। সেগুলো শরীয়াতের ভিত্তিতেও বাস্তবিকই সওয়াবের কাজ কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবার মত ইল্মী যোগ্যতাও যেমন থাকে না, তেমনি সে দিকে বিশেষ উৎসাহও দেখানো হয় না। কেননা তাতে করে চিরন্তন সুখ লাভের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আর তাতেই তাদের ভয়।

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বিশ্বাস করতেন যে, শিরক তাওহীদের পরিপন্থী আর বিদয়াত সুন্নাতের বিপরীত। শির্ক 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু কালেমার' এই প্রথম অংশের অস্বীকৃতি। আর বিদয়াত হচ্ছে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' কালেমার এই শেষাংশের বিপরীত এবং অন্তর থেকে তার অস্বীকৃতি।”

মুসনাদে দারেমী হাদীস গ্রন্থে হযরত হিসনের উদ্ধৃতি রয়েছেঃ "জনগণ তাদের দ্বীনের মধ্যে যে বিদয়াতই চালু করে আল্লাহ্ তা'য়ালা তাদের নিকট থেকে অনুরূপ একটি সুন্নাত তুলে নিয়ে যান। পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর তা ফিরিয়ে আনেন না।"

📘 তাগুত > 📄 শীয়া, খারেজী, মুর্জিয়া ও মুতাযিলা ফিরকা সমূহ

📄 শীয়া, খারেজী, মুর্জিয়া ও মুতাযিলা ফিরকা সমূহ


হিজরীর পয়ত্রিশ সনে ওসমান (রাঃ) এর শাহাদতের পর আলী (রাঃ) এর বায়আত সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে মুসলিম জাতির মধ্যে দলীয় কোন্দল ও ঘরোয়া বিবাদের সুত্রপাত হয়। ঐ সময় মুসলিম সমাজে দলীয় কোন্দলের ইন্ধন যোগানোর জন্য এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য যে দুষ্ট শ্রেণীর লোক ইসলামে অনুপ্রবেশ করে উহাদের অধিকাংশ অগ্নিপূজক ও ইয়ামানের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের লোক ছিল। ইসলামে অনুপ্রবেশকারীগণ মুসলিম সম্প্রদায়ের আকীদা, সাহাবাগণ (রাঃ) সম্পর্কে এবং তাওহীদী আকিদায় গন্ডগোল সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মতামত যাহির করে এক কুহেলিকার সৃষ্টি করেছে। এরা কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত। এক শ্রেণীর মতে- আলী (রাঃ) হচ্ছেন স্বয়ং খোদা (নাউযু বিল্লাহ)। এরা আলীর (রাঃ) আমলেই আত্ম প্রকাশ করে। আলী (রাঃ) এদের মুখচেনা পান্ডাগুলিকে ধরে আগুনে পুড়িয়ে মারেন। কিন্তু আবর্জনা শেষ হয়নি। এই দলের সদস্যরা যুগ যুগ ধরে এই ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রচার করে আসছিল। সে সময় হিন্দুদেরকে বুঝানোর জন্য এরা বলেছিল যে, আলী হলেন বিষ্ণুর দশম অবতার। এরা আলীর নামে একখানা কিতাব রচনা করে নেয়। উহার নাম রাখা হয় মাহদী পুরান। উহাতে উমাচারী বুদ্ধমত এমন কতগুলি শ্লোক, মন্ত্র ও টীকা লিখানো হয় যা সাধারণের বোধগম্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দুদেরকে উহা গ্রহণে আগ্রহী করা। অপর দলের মতে আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের অংশীদার। আলীর নিকট এমন অনেক গোপন ইলম বা তথ্য ছিল যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল মাত্র তাকে দিয়ে গেছেন। এই সংবাদ প্রমাণ করার জন্য তারা নিম্নে তথ্য রচনা করেছে। "আমি ও আলী একই নূরে সৃজিত হয়েছি”। এই হাদিসটি জাফর ইবনে আহম্মদ ইবনে আলী নামক ব্যক্তির প্রস্তুতকৃত। হারুন (আঃ) মুসা (আঃ) এর যেমন নবুয়তের অংশীদার ছিলেন, এই হিসাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত গোপন কথা আলী (রাঃ) নিকট বা মাধ্যমে বলেছেন। তারা এই প্রসঙ্গে কুরআন চল্লিশ পারা বলে দাবী করে তন্মধ্যে দশ পারা আলীর (রাঃ) নিকট ওয়াহী হয় অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দিয়ে যান। এই সুবাদে তারা একটি হাদীস বানিয়েছে যা বহুল প্রচারিত। "আমি ইলমের শহর, আলী উহার দরজা। অতএব ইলমের ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রবেশপ্রার্থী যেন দরজায় এসে পৌঁছায়।” অর্থাৎ আলীর (রাঃ) মাধ্যমে উহা অর্জন করে। এবং উক্ত ইলম কেবলমাত্র আলীর (রাঃ) ভক্ত শীয়াদের নিকটই আছে। এই হাদীস সম্পর্কে হাদীসশাস্ত্রে পন্ডিতগণ মন্তব্য করেছেন। ইমাম বুখারী (রাঃ) বলেন: উহার কোনও সঠিক সূত্রই নেই। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেন: উহা প্রত্যাখ্যাত কথা।

শায়খুল ইসলাম ইমাম তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি শীয়া মতবাদের আবিস্কার করেছে, তার ধর্মীয় মনোভাবের ভিত্তি আদৌ ছিল না, বরং তার উদ্দেশ্য বড়ই অসৎ ছিল। বলা হয়, সে যিনদীক ও মোনাফেক ছিল, পরে ইসলাম স্বীকার করে তলে কুফরী মত প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল। এদের মাযহাবের ভিত্তি হল মিথ্যা কথার উপর। অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম দিয়ে মিথ্যা কথা শরীয়তের বাণী বলে প্রচার করা এবং সহীহ হাদীস সমূহকে অস্বীকার করা। (মাজমু আতুল ফাতাওয়া এদোদশ খন্ড ৩১ পৃষ্ঠা।)

শীয়াদের বদনীতির মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক নীতি হল, ব্যক্তি বিশেষকে বাড়াতে বাড়াতে এতদূর পৌছানো যে, যেন তারা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে এজেন্ট বা মাধ্যম স্বরূপ। তাই এরা এদের বোযর্গ নামীয় শ্রেণীকে এমন সব উপাধিতে উল্লেখ করে যা কেবল অতিরঞ্জিতই নয়, বরং ইসলামী রীতির বর্হিভূত। এ পরিপেক্ষিতে শীয়ারা তাদের ধর্মীয় নেতাদেরকে বাবুল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহ আয়াতুল্লাহ ইত্যাদি খেতাবে ভূষিত করে অর্থাৎ আল্লাহর নিকট পৌছানোর জন্য এরাই সোপন স্বরূপ। আল্লাহ তা'আলাকে পাবার জন্য এদের দরজায় ধর্ণা দিতে হবে; পরিত্রাণ পাওয়া; হক না না হক পথের সবকিছুর এরাই মাধ্যম; এমনকি জগতের সবাই এদের মুখাপেক্ষী, তাই এদের কতিপয় লোককে গাউস উপাধী দেয় কাউকে কুতুব বলে থাকে। শীয়ারা মুসলিমদের আকীদা লন্ডভন্ড করার জন্য বিভিন্ন কথা জাল করেছে এবং হাদীসের নামে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছে যার ফলে সাধারণ লোক তো দূরের কথা, অনেক আলেমও ধোঁকা খাচ্ছে।

খারেজী
শীআ মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মতবাদের অধিকারী দলটি ছিল খারেজী। এরা ইসলামে সর্বপ্রথম বিদআতী দল এদের বক্তব্যের মধ্যে ছিল। মু'মিন হবে নিখুত খাটি। যে ব্যক্তি ঐরূপ না হবে সে কাফির- চিরজাহান্নামী। তাদের মতে পাপ কুফরীর সমার্থক। সকল কবীরা গুণাহকারীকে এরা কাফের বলে আখ্যায়িত করে (যদি তারা তওবা করে গুণাহ থেকে প্রত্যাবর্তন না করে) উপরন্তু সাধারণ মুসলমানকেও এরা কাফের বলতো। কারণ, প্রথমত, তারা পাপমুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, পূর্বোক্ত সাহাবীদেরকে তারা কেবল মুমিনই স্বীকার করতো না, বরং নিজেদের নেতা বলেও গ্রহণ করতো।

খলীফাকে কুরাইশী বংশোদ্ভূত হতেই এ কথা তারা স্বীকার করতো না। তারা বলতো, কুরাইশী, অ-কুরাইশী-যাকেই মুসলমানরা নির্বাচিত করে, সে-ই বৈধ খলীফা।

কুরআনকে তারা ইসলামী আইনের মৌলিক উৎস হিসেবে মানতো। কিন্তু হাদীস এবং ইজমার ক্ষেত্রে তাদের মত সাধারণ মুসলমান থেকে স্বতন্ত্র ছিল।

এদের সবচেয়ে বড় দল আযারেকা নিজেদের ছাড়া অন্য সকল মুসলমানকে মুশরিক বলতো। এদের মতে নিজেদের ছাড়া আর কারো আযানে সাড়া দেয়া খারেজীদের জন্য জায়েজ নয়। অন্য কারো জবাই করা পশু তাদের জন্য হালাল নয়; কারো সাথে বৈবাহিক সম্পর্কও জায়েয নয়। খারেজী আর অ- খারেজী একে অন্যের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। এরা অন্য সব মুসলমানের বিরুদ্ধে জিহাদকে ফরযে আইন মনে করতো। তাদের স্ত্রী-পুত্র হত্যা করা এবং ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করাকে 'মোবাহ' মনে করতো। তাদের নিজেদের মধ্যকার যেসব লোক এ জিহাদে অংশ গ্রহণ করে না, তাদেরকেও কাফের মনে করতো। তারা তাদের বিরোধীদের ধন-সম্পদ আত্মসাত করাকে হালাল মনে করতো। মুসলমানদের প্রতি তাদের কঠোরতা এমন পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, মুসলমানদের তুলনায় তাদের কাছে অমুসলিমরা অধিক নিরাপত্তা লাভ করতো।

মুর্জিয়া
শিআ এবং খারেজীদের চরম পরস্পর-বিরোধী মতবাদের প্রতিক্রিয়া একটি তৃতীয় দলের আকারে প্রকাশ পেয়েছে। এ দলটিকে মুর্জিয়া বলে অভিহিত করা হয়।

এক: কেবল আল্লাহ এবং রাসূলের মা'রেফাতের নামই ঈমান। আমল ঈমানের মূলতত্ত্বের পর্যায়ভূক্ত নয়। তাই, ফরয পরিত্যাগ এবং কবিরা গুণাহ করা সত্ত্বেও একজন লোক মুসলমান থাকে।

দুই: নাজাত কেবল ঈমানের ওপর নির্ভরশীল। ঈমানের সাথে কোন পাপাচার মানুষের ক্ষতি করতে পারে না। কেবল শিরক থেকে বিরত থেকে তাওহীদ বিশ্বাসের ওপর মৃত্যু বরণই মানুষের নাজাতের জন্য যথেষ্ট।

কোন কোন মূর্জিয়া আরও একটু অগ্রসর হয়ে বলে যে, শিরক থেকে নিকৃষ্ট যতবড় পাপই করা হোক না কেন, অবশ্যই তা ক্ষমা করা হবে।

এসব চিন্তাধারা পাপাচার ফাসেকী ও অশালীন কার্যকলাপ এবং যুলুম নির্যাতনকে বিরাট উৎসাহ যুগিয়েছে। মানুষকে আল্লাহর ক্ষমার আশ্বাস দিয়ে পাপাচারে উৎসাহী করে তুলেছে। এ চিন্তাধারার কাছাকাছি আর একটি দৃষ্টিভঙ্গি এই ছিল যে, আমর বিল মারূফ এবং নাহী আনিল মুনকার-ভাল কাজের নির্দেশ এবং খারাপ কাজে নিষেধ-এর জন্য যদি অস্ত্র ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়-তা হলে এটা একটা ফেতনা। সরকার ছাড়া অন্যদের খারাপ কাজে বাধা দেয়া নিঃসন্দেহে জায়েয-কিন্তু সরকারের যুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খোলা জায়েয নয়। আলামা আবুবকর জাসসাস এ জন্য অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করে বলেন, এসব চিন্তা যালেমের হস্ত সুদৃঢ় করেছে। অন্যায় এবং ভ্রান্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিরোধ শক্তিকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মুরজিয়া ও জাহমিয়া মতবাদ তারা একে অপরের সহায়ক ও পরিপূরক। মুরজিয়ারা 'আমলের দিক দিয়ে ইসলামকে পঙ্গু করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে প্রকাশ করল যে, নামায, যাকাত, রোযা ইত্যাদি ইসলামী আদেশ সংক্রান্ত আমল সমূহের সাথে ঈমানের কোনই সম্পর্ক নেই। ফলে নামায, যাকাত বা রোযা আদায় করলে ঈমানের কোনও উন্নতি সাধিত হয় না বা এসব পুন্য কর্মের দ্বারা ঈমান বাড়ে না। অনুরূপ ব্যভিচার, মদ্যপান, জুয়া, চুরি ইত্যাদি অন্যায় কাজ ঈমানের জন্য ঈমান কমে যায় না। অতএব আমল সমূহ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহকে স্বীকার করার পর কোন গোনাহই মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। মুরজিয়ারা এভাবে শরীয়াতের অনুশাসন বাতিল করে ঈমান কেবল মুখে মুখে উচ্চারণ ও মনে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট বলে প্রচার করল। অতএব যদি কেহ নামাযও পড়ে তার ফজিলত হবে ঈমানের সাথে সম্পর্কহীন পৃথক। অর্থাৎ নামায না পড়লে বা মদ্যপান করলে ঈমানের কোন ক্ষতি হবে না। এভাবে এরা ইসলামের বিধিনিষেধ পালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শিথিলতা ও সুবিধার আমদানী করল। এদের পর জাহমিয়া গোত্ররা বলল: ঈমান মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না, অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করাই যথেষ্ট। অর্থাৎ কেবল তাসদীক বিল জিনানা-অন্তরে অন্তরে বিশ্বাস রাখা।

ইমাম ইবনুল জাওযী (রহঃ) তাদের আক্বীদা প্রসঙ্গে বলেছেন: তাদের বিশ্বাস কালেমা শাহাদাত একবার পাঠ করার পর যত প্রকার অন্যায় করুক ঐ অন্যায়ের শাস্তি ভোগের জন্য আদৌ জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে না।

মুতাযিলা
এ সংঘাত মুখর যুগে একটি চতুর্থ মতবাদও জন্ম নেয়। খারেজী এবং মুর্জিয়াদের মধ্যে কুফর এবং ঈমানের ব্যাপারে যে বিরোধ চলে আসছিল, সে ব্যাপারে এদের নিজস্ব ফায়সালা এই ছিল যে, পাপী মুসলমান মুমিনও নয়, কাফেরও নয়, বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে। এছাড়াও অনেক মু'তাযিলা ইসলামী আইনের উৎসের মধ্য থেকে হাদীস এবং ইজমাকে প্রায় বাতিলই করে।

শায়খুল ইসলাম বলেছেন, খাওয়ারেজ ও মুতাযেলী উভয়ের বক্তব্য হল- "আমি নিশ্চিতরূপে স্বীকার করছি যে, ধর্মীয় অনুশাসনগুলি সমস্তই ঈমানের অন্ত র্ভুক্ত। অতএব যখন ধর্মীয় অনুশাসনগুলি কিয়দংশ ছেড়ে দেয়া হল তখন ঈমানের কিছু অংশ চলে গেল। অতএব যখন কিছু অংশ নষ্ট হল তখন তার ঈমান সম্পূর্ণভাবে চলে গেল। যেহেতু ঈমান অংশযুক্ত বস্ত নয়; উহার কিছু অংশ পরিত্যাগ করলে অন্যান্য অংশগুলি পালন সত্ত্বেও সে মু'মিন থাকবে না, কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে; বিধায় তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বৈধ হবে" মু'তাযিলীদের মতে সে মু'মিনও নয়, কাফিরও নয়। এই মাসআলায় মু'তাযিলীদের সাথে খারেজীদের মতপার্থক্য হয়েছে।

মুতাযেলীগণ আবূ বকর (রাঃ), ওসমান (রাঃ) ও আলী (রাঃ) এই ৪ জন খলিফার খিলাফত স্বীকার করে থাকে। খারেজীগণ আবু বকর ও ওমরের (রাঃ) খিলাফত স্বীকার করে। ওসমান ও আলীর (রাঃ) খিলাফত স্বীকার করে না। রাফেযীগণ কেবল মাত্র আলী (রাঃ) ছাড়া প্রথম তিনজন খলীফার খেলাফত আদৌ স্বীকার করে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00