📄 তাগুত
তাগুত আরবী طغیان (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎসরিত। যার অর্থ সীমালংঘন করা। এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই "তাগুত" যে, আল্লাহদ্রোহী হয়েছে এবং সীমালংঘন করেছে, আর আমাদের একমাত্র রব হিসাবে আল্লাহ তায়ালার যে সকল রুবুবিয়াত বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার যে কোন একটিকে নিজে পারে বলে দাবী করে কিংবা নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছে এবং এমন বিষয়ে নিজেকে আল্লাহর সাথে সমকক্ষ বানিয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস। অর্থাৎ তাগুত হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে নিজেকে আল্লাহর সাথে শরীক করে আর মুশরেক হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে নিজেকে আল্লাহ তায়ালার সাথে শরীক করে না ঠিকই কিন্তু সে তাগুতকে আল্লাহ তায়ালার (যে কোন একটি কাজের বা বৈশিষ্টের) সাথে শরীক করে।
সুষ্পষ্ট ভাবে তাগুতের অর্থ হচ্ছে, কোনো মাখলুক (আল্লাহ তায়ার সৃষ্টি) কর্তৃক নিয়োক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়কে (আল্লাহর স্থলে) নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা:
এক : রব হিসেবে যেই কাজগুলি একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা সম্পন্ন করেন, আল্লাহর যে কোন সৃষ্ট জীব বা মানুষ যদি দাবী করে যে, সেই কাজ সমূহের যে কোন একটি সে নিজে করতে সক্ষম। যেমন- সৃষ্টি করা, রিজিক দান করা অথবা শরীয়ত (বিধান বা আইন) রচনা করা। অর্থাৎ কেউ যদি বলে, আমি সৃষ্টি করি আমি রিজিক দান করি, আমি বিধান রচনা করি সেই "তাগুত”।
দুই : আল্লাহর যে কোন সৃষ্ট জীব-মানুষ কতৃক আল্লাহ্ তায়ালার কোনো সিফাত (বা গুণ) কে নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা। যেমন এলমে গায়েব জানা। যদি কেউ তা করে (অর্থাৎ বলে আমি এলমে গায়েব বা ভবিষ্যতে কি হবে জানি) তাহলে সে তাগুতে পরিণত হবে।
তিন : যে কোন ইবাদত মাখলুক বা বান্দা কর্তৃক অন্য কোন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা। যেমনঃ দোয়া, মান্নত, নৈকট্য লাভের জন্য পশু জবাই, অথবা বিচার ফয়সালা চাওয়া। যদি (কোনো মাখলুক) এসব ইবাদত (নিজের জন্য) স্বীকার করে নেয় বা মেনে নেয় অর্থাৎ কোন মানুষ তার উদ্দেশ্যে সেজদা করল, তার উদ্দেশ্যে মান্নত করল, পশু জবাই করল, তার উদ্দেশ্যে বিপদ মুক্তির জন্য কিংবা যে কোন কিছু পাওয়ার আশায় দোয়া করল এবং সে (উক্ত মাখলুক) এ সকল বিষয় নিজের জন্য মেনে নিল, তাহলে সেই তাগুত। ব্যক্তির নীরবতা বা ইবাদত গ্রহনে অস্বীকার না করাও স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে যদি না সে এ অবস্থা থেকে নিজেকে পবিত্র অথবা মুক্ত করে নেয়। অর্থাৎ যদি সে এ কথা না বলে যে এ অধিকারগুলি আল্লাহর জন্য খাস। এগুলি তোমরা আমাকে উদ্দশ্যে করে করতে পার না। যেমন ঈসা (আঃ) কে খৃষ্টানরা 'গড' এর পুত্র বলে সাব্যস্ত করে (নাউযুবিল্লাহ) উনার ইবাদত করে। কিন্তু ঈসা (আঃ) শেষ বিচারের দিনে এ ভ্রান্ত আকিদা কে অস্বীকার করবেন। কুরআনে এ বিষয়ে এরশাদ হচ্ছে-
"আল্লাহ তায়ালা যখন বলবেন, হে ঈসা ইবনে মরিয়াম, তুমি কি লোকদেরকে বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত করো? ঈসা বলবেন আপনি পবিত্র। (নবী বললেন) আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের খোজ খবর নিয়েছি। তারপরে যখন আমাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিলেন, তখন আপনি (আল্লাহ) তাদের খোঁজ খবর রেখেছেন। আপনিই সব কিছুরই খবর রাখেন।” (সূরা আল মায়িদা: ১১৭)
অতএব ঈসা (আঃ) তাগুত হওয়ার পরিণতি থেকে বেচে গেলেন।
উপরোক্ত যে তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি বিষয়কে যদি কেউ নিজের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে তাহলে সে তাগুত হিসেবে গণ্য হলো এবং নিজেকে আল্লাহর সমতুল্য বলে সাব্যস্ত করে নিলো।
ইমাম মালেক (রহঃ) তাগুতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেনঃ এমন প্রতিটি জিনিসকেই তাগুত বলা হয়, আল্লাহ্ তায়ালাকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত করা হয়। আল্লাহ্ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয়, এমন সব কিছুই এ সংজ্ঞার অন্ত র্ভুক্ত। যে সব মাবুদ (উপাস্য) কে তাগুত হিসেবে গণ্য করা হয় সে গুলোর মধ্যে রয়েছে মূর্তি, এমন সব কবর, গাছ, পাথর ও অচেতন পদার্থ যেগুলোর উপাসনা করা হয়। আল্লাহর আইন বতীত এমন সব আইন যার মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা চাওয়া হয়। এমন সব বিচারক তাগুতের অন্তর্ভূক্ত যারা আল্লাহর আইনের বিরোধী আইন দ্বারা মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে। শয়তান, যাদুকর, গণক (যারা এলমে গায়েবের বিষয় কথা বলে), উপাস্য হতে যারা রাজী, যারা নিজেদেরকে কোনো কিছু হালাল, হারাম করা ও আইন রচনা করার অধিকার রাখে বলে মনে করে, তারা সবাই তাগুত। তাদেরকে অস্বীকার করা ওয়াযিব, তাদের কাছ থেকে এবং তাদেরকে যারা উপাসনা করে উভয়ের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা অত্যাবশ্যক।
মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী তাফহীমুল কুরআনে সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতের তাফসীরে তাগুত সম্পর্কে বলেনঃ আভিধানিক অর্থে এমন প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে 'তাগুত' বলা হবে, যে নিজের বৈধ অধিকারের সীমানা লংঘন করেছে। কুরআনের পরিভাষায় তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগী ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভু ও খোদা হবার দাবীদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের বন্দেগী ও দাসত্বে নিযুক্ত করে। কোন ব্যক্তি এই তাগুতকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত কোন দিন সঠিক অর্থে আল্লাহর মু'মিন বান্দা হতে পারে না।
যারা আল্লাহর আইন মানে না তারা কাফের। আর যারা আল্লাহর আইন না মানার জন্যে অন্যদেরকে বাধ্য করে তাদেরকে বলা হয় তাগুত। যারা সাধারণ মানুষ তারা কাফের হতে পারে, তাগুত হতে পারে না। কিন্তু যারা রাজ ক্ষমতায় থাকে তারা কাফের এবং তাগুত দুই-ই হতে পারে। নিজে আইন অমান্য করা এটা তো নিঃসন্দেহে কুফরী কিন্তু যারা আইন করে আল্লাহ্ আইনকে অমান্য করায়, তারা প্রকৃতপক্ষে খোদার খোদায়ী নিয়ে টানা-টানি করে। কারণ যে ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর সেই ক্ষমতা তারা ব্যবহার করতে চায়। আমরা বহু তাগুতি আইনকে খুব হালকা নজরে দেখি। কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা হালকা নজরে দেখেন না। যেমন আমরা মনে করি চুরির শাস্তি স্বরূপ হাত কাটার পরিবর্তে জেল দিলে এমনকি গুরুত্ব অপরাধ হয়। চোরের শাস্তি দেয়াই হল। কিন্তু আসল ব্যাপারটা দাঁড়ায় ভিন্নরূপ, যা মানুষ চিন্তা করে না। তা হচ্ছে এই যে, চোরের হাত কাটা আইন হচ্ছে আল্লাহর তৈরী ফৌজদারী আইন। সেটাকে বাতিল করে অন্য আইন তৈরী করার অর্থই হল আইন করে আল্লাহর আইনকে বাতিল করা। আর সুদ মদের লাইসেন্স দেয়ার অর্থ হল আল্লাহর আইনকে অমান্য করার লাইসেন্স দেয়া। এসব কাজ যারা করে তারাই হচ্ছে তাগুত। তারা যে শুধু নিজেরাই আল্লাহর আইন অমান্য করে তাই নয়, বরং তারা আইন করে অন্যদেরকেও আল্লাহর আইন অমান্য করতে বাধ্য করে। আল্লাহর কথা অনুযায়ী বুঝা গেল, যারা এই তাগুতের আইন মানে তারা আল্লাহকে মানতে পারে না। হাঁ তবে এমন কিছু মুসলমান আছে যারা আল্লাহকেও মানে তাগুতদেরকেও মানে। তারা মনে করে যে তারা ঠিকই করছে, কিন্তু আসলে যে তারা আল্লাহর সাথে শরিক করে মুশরিকে পরিণত হচ্ছে যার ফলে তাদের আল্লাহকে মানা হয় না সেই বোধ তাদের নেই। তাদের কথা সূরা নিসার মধ্যে আল্লাহ্ এইভাবে বলেছেন,
"আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি নাযিল হয়েছে, আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতিও ঈমান এনেছি। তারা বিবাদ পূর্ণ বিষয়কে [মীমাংসার জন্য] তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়; অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা তাকে [তাগুতকে] মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করতে চায়।" (আন নিসাঃ ৬০)
এ আয়াত থেকে বুঝা গেল যারা তাগুতকে অস্বীকার না করে (বরং তাদের আইন মেনে নিয়েই) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাবী করে তাদের ওটা শুধু দাবীই। প্রকৃতপক্ষে তাদের ঈমানের প্রতি আল্লাহর কোন স্বীকৃতি নেই। যদি থাকত তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে তারা মনে করে একথা বলতেন না। [ বিঃ দ্রঃ রব, মালিক ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহর পরিচয় খন্দকার আবুল খায়ের- খন্দকার প্রকাশনী।
ঈমান আনার শর্তই হল-তাগুতকে অস্বীকার বা কুফরী করা
“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই। প্রকৃত শুদ্ধ ও নির্ভুল কথাকে ভুল চিন্তাধারা হতে ছাঁটাই করে পৃথক করে রাখা হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারণ করল, যা কখনই ছিঁড়ে যাবার নয় এবং আল্লাহ সবকিছু শ্রবণ করেন ও সবকিছু জানেন।” (আল-বাকারাহ: ২৫৬)
শেখ মুহাম্মদ আলী আল রিফায়ী উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ এ আয়াতে, আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে এমন সীরাতুল মুস্তাকিম বা সহজ-সরল পথের বিবরণ দিচ্ছেন যা আমাদেরকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। এই সহজ-সরল পথ হচ্ছে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' গ্রহণ করার আগে তাগুতের প্রতি কুফরী বা অবিশ্বাস করা। অন্য কথায় আপনি 'আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি' (ইল্লা আল্লাহ্) বলার আগে আপনাকে তাগুত প্রত্যাখ্যান বা অবিশ্বাস করতে হবে (লা ইলাহা)।
যদি কোন ব্যক্তি বলেন, 'লা ইলাহা ইলালাহ্' এবং তিনি তখনও তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেননি, তাহলে তিনি আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) উপরোক্ত আয়াতের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন যাতে তিনি (আল্লাহ) বলেছেন: "এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারন করল, যাহা কখনই ছিঁড়ে যাবার নয়।" এই আয়াতে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) 'মাসাকা' শব্দের পরিবর্তে 'আসতামসাকা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। আরবীতে মাসাকা অর্থ এক হাত দিয়ে বা এক হাতের মধ্যে কোনকিছু ধরা কিন্তু এই আয়াতে 'আসতামসাকা' প্রতীকীরূপে ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে উভয় হাত দিয়ে ধরা অথবা উভয় হাত দিয়ে কোনকিছুকে খুবই মজবুতভাবে ধরা। এটাকে আরো সহজ করতে যদি আমরা বলি যে, আপনি আপনার ডান হাতে কোনকিছু ধরে আছেন তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে আপনার বাম হাত খালি এবং আপনি আপনার বাম হাতে অন্য কিছু ধরতে পারেন। এইভাবে যদি আমরা বলি যে কেউ এক হাতে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ধরে আছে এবং আরেক হাতে তাগুত ধরে আছে তাহলে তার বিশ্বাস (ঈমান) ঠিক নেই এবং তিনি ইসলামের গন্ডির বাইরে। এ কারণে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) উপরোক্ত আয়াতে 'আসতামসাকা' শব্দ ব্যবহার করে আমাদের কাছে এটা সুস্পষ্ট করেছেন যে, আমাদেরকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' আমাদের উভয় হাত দিয়ে ধরতে হবে এবং শুধুমাত্র এক হাতে নয়।
আমরা যারা অজ্ঞ মুসলিম তারা মনে করি নামায আর রোযাই শুধু এবাদত তাই আসল ঘটনা সম্পর্কে কোন জ্ঞানই নেই। কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে মানুষের লিখিত আমলের বই নিয়ে মসজিদে মসজিদে ঘরবাড়ি ছেড়ে গাট্টি বোঝা নিয়ে রাত কাটাই। মাওলানার ওয়াজ শুনে চোখের জলে দাড়ি ভিজাই। অথচ- শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, শাস্তি ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সব তাগুতের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। এত আমল করছি যে তাগুত কাকে বলে জানিই না আর তাগুতকে অস্বীকার করা তো দূরের কথা। অথচ তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করা ব্যতিত কেউ মুসলিম হতে পারে না। বিধান বা আইন দানের একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালার। এরশাদ হচ্ছেঃ
"আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান (দেয়ার ক্ষমতা) নেই।” (ইউসুফ : ৪০)
"তিনি তার রাজ্যশাসনে কাউকে শরীক করেন না।” (কাহাফ : ২৬)
"তোমাদের মাঝে যে ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয় তা ফয়সালা করা আলাহর কাজ"! (আশ-শুরা ৪ ১০)
"অতএব তোমরা আল্লাহর নাযিল করা আইন মোতাবেক লোকদের পারস্পরিক যাবতীয় ব্যাপারের ফয়সালা কর, আর যে মহান সত্য তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে তা হতে বিরত থেকে তাদের খাহেশতের (ইচ্ছা-কামনার) অনুসরণ করো না।" (মায়েদা : ৪৮)
"ইহারা কি আল্লাহর এমন কিছু শরীক বানিয়ে নিয়েছে যারা এদের জন্য 'দ্বীন' ধরনের কোন নিয়ম-বিধান নিদিষ্ট করে দিয়েছে যার কোন অনুমতি আল্লাহ দেন নি? ফয়সালার সময় যদি পূর্ব হতেই নিদিষ্ট করে দেয়া না হোত, তা হলে এতদিন তাদের ব্যাপারটি চুড়ান্ত করে দেয়া হোত। নিশ্চিতই এই যালেমদের জন্য পীড়াদায়ক আযাব রয়েছে।” (আশ-শুরা ৪ ২১)
তাই আপনাদের অবগতির জন্য বলতে চাই যিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জের জন্য কোরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। তিনি আলাহই সুদ, জুয়া, মদ, হারাম করেছেন কুরআনের ওহীর মাধ্যমে। যা কিনা আমাদের জনগণের সার্বভৌম সংসদ হালাল করেছে- সুদী ব্যাংকের লাইসেন্স, লটারী হাউজীর অনুমতি এবং মদের দোকানের (বারের) লাইসেন্স দানের মাধ্যমে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কোরানের অহীর এবং রাসূলের (সাঃ) মাধ্যমে পাঁচ প্রকার অপরাধের ফৌজদারী শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যথাঃ
(১) আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামকে রক্ষা করার জন্য দ্বীন ত্যাগকারী এবং দ্বীন পরিবর্তনকারী মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। সহীহ হাদীস থেকে পাওয়া যায় মুরতাদকে এক থেকে তিন দিনের সময় দিতে হবে ইসলামের সহীহ আকিদায় ফেরত আসার জন্য। না হলে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে হবে। আমাদের জনগণের সার্বভৌম সংবিধান আল্লাহর এ আইনের কোন অস্তিত্ব নেই। তাই বেরেলভি (কবর পুজারী), কাদেয়ানী, শিয়া, সাইয়েদাবাদী, আটরশি, দেওয়ানবাগির মত আরো কয়েক হাজার মুরতাদ ও জিন্দীক আমাদের চারদিকে রোজই মাথা গজিয়ে উঠছে আর কোটি কোটি সরল প্রাণ আল্লাহর বান্দা মুসলিমদের শিরক কুফর ও বিদআতে লিপ্ত করে জাহান্নামের পথ ধরাচ্ছে। অথচ খোলাফায়ে রাশেদার সময় খলিফা আলী (রাঃ) বহু খারেজী এবং শিয়া মুরতাদকে হত্যা করে মুসলিমদেরকে ইসলামের সহীহ আকিদা হতে বের হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন।
(২) মানুষের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেসাসের শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের সাথে সমাজে চলার জন্য মুয়ামিলাত সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সম্পৃক্ত হতে হয়। শয়তানের প্ররোচনায় এবং নাফসের তারনায় একে অপরের বিরুদ্ধে নানা প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, শত্রুতা, অঙ্গহানী, খুন যখমের সৃষ্টি হতে পারে। বান্দাদের পারস্পরিক বিবাদ মিটানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা কেসাসের বিধান নাযিল করেছেন। কিন্তু বর্তমানে আল্লাহর দেয়া কেসাসের বিধান উঠানোর পরিনাম কতটা ভয়াবহ হয়েছে তা কি একবার চিন্তা করেছেন। সমাজে চারিদিকে আজ ভয়াবহ করুন চিত্র। ধরুন কোন এক ব্যক্তি কর্তৃক দ্বিতীয় ব্যক্তি অনিচ্ছায় কিংবা সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে খুন হয়ে গেল তবে ইসলামের কেসাস মোতাবেক প্রথম ব্যক্তির বিচারের ফায়সালা কাজী (জর্জ) সাহেবকে দিতে হবে দ্বিতীয় ব্যক্তির পরিবারের সাথে আলোচনা করে তাদের আল্লাহর দেয়া অধিকারের উপর। অপরাধ প্রমাণিত হলে তারা খুনের বদলী খুনের ফায়সালা নিতে পারে কিংবা মুক্তিপণ (BLOOD MONEY) আদায় করে খুনী প্রথম ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়ার ফায়সালাও চাইতে পারে। এতে উভয় পরিবারই কিছুটা হলেও নিস্কৃতি পায়। কিন্তু বর্তমান তাগুতদের তৈরি করা আইনের পরিণতি আমাদের সামনে উপস্থিত। যে মারল সে এবং তার পরিবার তো ভুক্ত ভোগী হয়ই উপরন্ত যাদের পরিবারের সদস্য মারা গেল তারা পর্যন্ত পুলিশের দৌড়ের উপর থাকে। উভয় পরিবারের উপর যেন ভয়ানক আযাব নেমে আসে। আল্লাহ তায়ালা আইন নাযিল করেছেন সাধারণ মানুষের ইনসাফ, প্রশান্তি, উপকারের জন্য। কিন্তু মানুষের তৈরিকৃত আইনে উপকার পাচ্ছে- পুলিশ, উকিল, মেজিষ্ট্রেট ও জর্জ। কারণ এক নম্বর দুনিতীবাজ দেশের কিছুদিন আগে দেয়া রিপোর্টে দেখানো হয়েছে এদেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নিতীবাজ পুলিশ ও নি আদালত। (দৈনিক ইত্তেফাক রিপোর্ট)
(৩) মানুষের আল ইলম (জ্ঞানকে) রক্ষা করার জন্য মদ পানের অপরাধের জন্য হদ বা হুদুদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
মদ খেলে মানুষের সুস্থ বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়। মানুষ চিন্তা করা ছেড়ে দেয় এবং নফসের দাসত্ব করা শুরু করে। আল্লাহ তায়ালা মদ পানকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং মদ পানের জন্য নির্দিষ্ট হদ বা শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। আজ দুনিয়ার জনগণের সার্বভৌম সংসদগুলি মদের দোকান (বারের) লাইন্সেস, মদ আমদানী করা ও কেনা বেচা করার লাইন্সেস দানের মাধ্যমে মদ কেনাকে সহজ প্রাপ্য ও মদ খাওয়াকে হালাল করে দিয়েছে। তাই থার্টি ফাস্ট নাইটে এবং এ জাতীয় পাশ্চাত্যের ও হিন্দুদের থেকে আমদানী করা অনুষ্ঠানগুলিতে যেমন-গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের নামে ব্যান্ডশো ও মদের আসরে কলেজ, ইউনিভার্সিটি ছাত্রদের থেকে শুরু করে সকল স্তরের মদখোর লোকেরা অংশগ্রহণ করছে। প্রতি সপ্তাহে চলছে মদের পাটি বড় ও ছোট হোটেল ও ক্লাবগুলিতে, অপরাধীদের ফ্লাট বা ম্যাসে, অভিজাত এলাকার বাড়ীগুলিতে ও মদের দোকানগুলিতে। সমাজের ধনী ও ক্ষমতাবানদের একটি দল ছুটছে এ মদের দিকে। এরাই সমাজের রক্ষক, সমাজ যাবে কোনদিকে? পরিণতি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। যারা চোখ থাকতে অন্ধ তাদের কথা আলাদা।
(৪) মানুষের বংশ এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্য ব্যভিচার এবং ব্যভিচারের দোষারোপের উপর শাস্তির (হুদুদের ও রজমের) ব্যবস্থা করেছেন।
আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া, ইসরাইলের কথাই একবার চিন্তা করুণ। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আলাহর কাছে জবাবদিহির ভয় ত্যাগ করে তারা কুফরী রাষ্ট্র কায়েম করেছে। উপর দিয়ে মাকাল ফলের মত যতই সৌন্দর্য মন্ডিত করে রাখুক না কেন ভিতরে তাদের অবস্থা যে কতটা জঘন্য পশুর ন্যায় তা একটু খোঁজ করলেই বেরিয়ে আসবে। মেয়েদের অধিকার বা হকের কথা চিন্তা করুন। আলাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মেয়েদেরকে একটি নিদিষ্ট মর্যাদা দিয়েছেন। মাতৃত্বের সম্মান দিয়েছেন, বোনের অধিকার এবং স্ত্রীর মর্যাদা ও হক নির্ধারণ করেছেন। অথচ কুফরী রাষ্ট্র সমূহ মেয়েদের পুরুষের সাথে সম অধিকারের নামে তাদের পরিণতি কি করেছে তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? আমেরিকা, ইউরোপ সহ সকল কুফর রাষ্ট্র সমূহে মদের দোকানে (বারে) প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় কারা মদের বোতল আর গ্লাস পরিবেশন করছে? বড় বড় জুয়ার আড্ডাগুলিতে একটা একটা করে কাপড় খুলে দর্শকদের দিকে কে উড়িয়ে দিচ্ছে? তাদের প্রতিটা ছোটবড় শহর গুলিতে যে সব ম্যাসেজ পার্লার আর বেশ্যালয় রয়েছে তাতে কারা এ সব কাজে নিয়োজিত। তাদের বানানো নগ্ন ছবিগুলিতে কাদেরকে তারা ব্যবহার করছে? এভাবে সম অধিকারের নামে মেয়েরা আজ পরিণত হয়েছে তাদের ভোগ্য পণ্যে। আমেরিকাতে প্রতিদিন গড়ে ২৫০টি মেয়ে ধর্ষন হয়- এটা তাদেরই পরিসংখ্যান। তাদের দেশের ২০% মহিলা কাজ করছে উলঙ্গ মদের দোকান, কেসিনো (জুয়ার আড্ডা) ম্যাসেজ পার্লার, বেশ্যালয় এবং নীল ছবি গুলিতে। এটা কোন ধরনের মানবাধিকার? সচেতন মানুষ কি একবার চিন্তা করবে না? আফগান মুসলিম মহিলাদের জন্য তাদের যে মায়া কান্না তা নিজেদের মেয়েদের জন্য কোথায়?
আল্লাহর দেয়া ব্যাভিচারের শাস্তির হুকুমকে পিছে নিক্ষেপ করে পাশ্চাত্যের সমাজ অবাধ মেলামেশার স্বাধীনতার নামে যে আইন বানিয়েছে তার পরিণতি আমাদের চোখের সামনে সুস্পষ্ট। বিয়ে না করে লিভিং টুগেদারের নামে বাপের পরিচয় ছাড়া যে লক্ষ লক্ষ শিশুর জন্ম নিচ্ছে তাদের বড় হয়ে মানসিক কি পরিণতি হয় তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? আমেরিকাতে ৪০% এর উপরে মহিলারা তাদের সন্তানদের পিতার পরিচয় দিতে পারছে না, ইংল্যান্ডে ৭০ লক্ষ মহিলা রয়েছে যাদের সন্তানদের কোন পিতার পরিচয় নেই। আল্লাহর্ দেয়া বিধানকে পিছে নিক্ষেপ করে যে আইন তারা বানিয়েছে তার একটা ছোট চিত্র হল এগুলি। প্রতিটা বিষয়ে যেখানেই আল্লাহর আইনকে পরিবর্তন করা হয়েছে সেখানেই সাধারণ মানুষের উপর দুঃখ দুদর্শা নেমে এসেছে। সকল জনগণ পরিণত হয়েছে কিছু তাগুত শাসকের নব্য যুগের দাস-দাসীতে। মুসলমান নামধারী দেশগুলির কাফের তাগুত সরকারগুলি আমদানী করেছে পাশ্চাত্যের কুফর শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা, বিচার পদ্ধতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে। ফলে মুসলিম দেশগুলিতে মুসলমান জনগণ আস্তে আস্তে নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে তাদের মন মগজে কাফেরদের নীতি ভরে নিয়েছে। তারা কথা বলে কাফেরের ভাষায়, চিন্তা করে কুফর দৃষ্টিকোণ থেকে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে পাকে বলেছেনঃ
"হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা এই আহলে কিতাবদের (ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের) মধ্যে একটি দলের কথা মানো তাহলে তারা তোমাদের ঈমান থেকে কুফরীর দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।" (আলে ইমরান : ১০০)
মুসলিম দেশগুলিতে এখনও ব্যভিচারের মাত্রা খুবই কম। কারণ ১৪০০ বৎসর পূর্বে মদিনাতে ব্যভিচারের বিরুদ্ধে যে অহি নাযিল হয়েছিল এবং রাসূল (সাঃ) সহ খলিফারা সেই ব্যভিচারের বিরুদ্ধে আল্লাহর নাযিলকৃত যে রজম ও হদের শাস্তি, তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তারই সুফল আজও আমরা মুসলিমরা সমাজে পাচ্ছি। আমাদের আলহামদুলিল্লাহ এখনও সমাজের বেশি ভাগ লোকেরই চিন্তা করতে হচ্ছে না- "আমার বাচ্চার বাবা কি আমি নিজে"- যা কিনা ইউরোপ আমেরিকান ও ভারতীয় কাফেরদের জন্য প্রতিদিনের চিন্তার বিষয়। তবে যেভাবে জনগণের সার্বভৌমত্ব শুরু হয়েছে এবং বেহায়াপনা, নগ্ন চিত্র প্রদর্শনী, টিভিতে অবৈধ মেলা মেশার উৎসাহ প্রদানকারী নাটক, সিনেমা, গান, অর্ধ নগ্ন বিজ্ঞাপন, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, ফ্যাশন শো, থিয়েটারের নাটক, বিল বোডের মাধ্যমে রাস্তায় মোরে মোরে এবং বাসের গায়ে মহিলাদের অধ নগ্ন ছবি প্রদর্শনী ইত্যাদি বিষয় কিছু সময়ের মধ্যেই প্রাশ্চাত্যের সমাজের মত ব্যাভিচারের আখরা হতে বাধ্য। এ সমস্ত শুরু হওয়ার মূল কারণ ব্যভিচার সংক্রান্ত আল্লাহর আইনকে পিছে নিক্ষেপ করে মানুষের দ্বারা আইন রচনা করা।
(৫) মানুষের জান-মাল বা সম্পদ রক্ষা করার জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির উপর হুদুদের ব্যবস্থা করেছেন।
বর্তমানে পশ্চিমা অপশক্তির প্রচারনায় আমাদের মনে ঢুকেছে যে, চুরি করলে কারো হাত কেটে ফেলা বর্বরতা। ইসলাম যে কোন অপরাধকে তার গোড়া থেকে উৎখাত করে দেয়। যেমন চোরের হাত কাটা-একজন চোরের ধরুন একটি মোবাইল চুরি করার সুযোগ আসল। তখন সে চিন্তা করে যদি চুরি করতে পারি তাহলে এ মোবাইলটা আমার আর যদি ধরা পড়ি তবে হয়ত বর্তমানে মানুষের তৈরী আইনের বিচারে তিন থেকে ছয় মাস জেল খানায় বসে বসে খাব। কিন্তু যদি আল্লাহর আইন থাকতো তবে অবশ্যই চোরটা চিন্তা করত দশবার যে, যদি মোবাইলটা চুরি করতে ধরা পড়ি তবে ডান হাতের কব্জি কাটা যাবে। জীবনে বেচে থাকলে হয়ত মোবাইল কিনার পয়সা কামানো যাবে কিন্তু ডান হাতের কব্জি আর ফেরত আসবে না। অতএব অবশ্যই অবশ্যই এটা ফেতরাত মানুষের চুরির প্রবণতা সমাজ থেকে একেবারে দূরুভীত হবে। সেই ১৪০০ বৎসর পূর্বে যখন মদিনাতে চোরের হাত কাটার হুকুম হয়েছিল তখন থেকে ৩০০ বৎসরে কয়জন লোকের হাত কাটা হয়েছিল চুরির অপরাধে আপনারা জানেন কি? মাত্র ৬ জনের। আশ্চর্য হলেও সত্য আজও আরব বিশ্বে চুরি নেই বললেই চলে। এটাই আল্লাহ তায়ালার আইন, যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন কিভাবে সমাজে অপরাধ গোড়া থেকে দূরুভীত করতে হবে।
[বিঃ দ্রঃ-জগতের সাধারণ আইনে অপরাধ সম্পর্কিত সব শাস্তিকেই 'দন্ডবিধি' নামে অভিহিত করা হয়। 'ভারতীয় দণ্ডবিধি' 'বাংলাদেশ দন্ডবিধি' ইত্যাদি নামে যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে সর্বপ্রকার অপরাধ ও সব ধরনের শাস্তিই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত এরূপ নয়। ইসলামী শরীয়তে অপরাধের শাস্তিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে : হুদুদ, কেছাছ ও তা'যীরাত অর্থাৎ দন্ডবিধি। যেসব অপরাধের দরুন অন্য মানুষের কষ্ট অথবা ক্ষতি হয়, তাতে সৃষ্টজীবের প্রতিও অন্যায় করা হয় এবং স্রষ্টারও নাফরমানী করা হয়। তাই এ জাতীয় অপরাধে 'হক্কুল্লাহ' (আল্লাহর হক) এবং 'হক্কল আবদ' (বান্দার হক) উভয়টিই বিদ্যমান থাকে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উভয়ের কাছেই অপরাধী বলে বিবেচিত হয়। একথা জানা জরুরী যে, ইসলামী শরীয়ত বিশেষ বিশেষ অপরাধ ছাড়া অবশিষ্ট অপরাধসমূহের শাস্তির কোন পরিমাণ নির্ধারণ করেনি; বরং খলিফার নিয়োগকৃত বিচারকের অভিমতের উপর ছেড়ে দিয়েছে। বিচারক স্থান, কাল ও পরিবেশ বিবেচনা করে অপরাধ দমনের জন্যে যেরূপ ও যতটুকু শাস্তির প্রয়োজন মনে করবেন, ততটুকুই দেবেন। যেসব অপরাধের কোন শাস্তি কুরআন ও সুন্নাহ নির্ধারণ করেনি, বরং বিচারকদের অভিমতের উপর ন্যস্ত করেছে, সেসব শাস্তিকে শরীয়তের পরিভাষায় 'তাযিরাত' তথা দন্ড বলা হয়। পক্ষান্তরে যেসব অপরাধের শাস্তি কুরআন ও সুন্নাহ নির্ধারণ করে দিয়েছে সেগুলো দু'রকম- কুরআন পাক যেসব অপরাধের শাস্তিকে আল্লাহর হক হিসেবে নির্ধারণ করে জারি করেছে, সেসব শাস্তিকে 'হুদুদ' বলা হয় এবং যেসব শাস্তিকে বান্দার হক হিসেবে জারি করেছে,, সেগুলোকে 'কেছাছ' বলা হয়। পক্ষান্তরে যেসব অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেনি, সে জাতীয় শাস্তিকে বলা হয় 'তাষীর' 'দন্ড'। দন্ডগত শাস্তিকে অবস্থানুযায়ী লঘু থেকে লঘুতর, কঠোর থেকে কঠোরতর এবং ক্ষমাও করা যায়। এ ব্যাপারে বিচারকদের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু হুদুদের বেলায় কোন সরকার, শাসনকর্তা অথবা বিচারকই সামান্যতম পরিবর্তন, লঘু অথবা কঠোর করার অধিকারী নয়। স্থান ও কাল ভেদেও এতে কোন পার্থক্য হয় না এবং কোন শাসক ও বিচারক তা ক্ষমাও করতে পারেনা। শরীয়তে হুদুদ মাত্র পাচঁটি : ডাকাতি, চুরি, ব্যভিচার ও ব্যভিচারের অপবাদ এ চারটির শাস্তি কুরআনে বর্ণিত রয়েছে। পঞ্চমটি মদ্যপানের হদ। এটি সাহাবায়ে কেরামের এজমা তথা ঐক্যমত্য দ্বারা প্রমাণিত। এভাবে মোট পাঁচটি অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত ও হুদরূপে চিহ্নিত হয়েছে। এসব শাস্তি যেমন কোন শাসক ও বিচারক ক্ষমা করতে পারেনা, তেমনি তওবা করলেও ক্ষমা হয়ে যায় না। তবে খাঁটি তওবা দ্বারা আখেরাতের গোনাহ মাফ হয়ে সেখানকার হিসাব-কিতাব থেকে অব্যহতি লাভ হতে পারে। তন্মধ্যে শুধু ডাকাতির শাস্তির বেলায় একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। ডাকাত যদি গ্রেফতারীর পূর্বে তওবা করে এবং তার আচার-আচরণের দ্বারাও তওবার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায়, তবে সে হুদ থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু গ্রেফতারীর পরবর্তী তওবা ধর্তব্য নয়। অন্যান্য হুদুদ তওবা দ্বারা মাফ হয় না। এ তওবা গ্রেফতারীর পূর্বে হোক অথবা পরে। সব দন্ডনীয় অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়ের অনুকূলে সুপারিশ শ্রবণ করা যায়; কিন্তু হুদুদের বেলায় সুপারিশ করা এবং তা শ্রবণ করা দুই-ই নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ (স) এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হুদুদের শান্তি সাধারণত কঠোর। এগুলো প্রয়োগ করার আইনও নির্মম। অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই তা পরিবর্তন ও লঘু করা যায় না এবং কেউ ক্ষমা করারও অধিকারী নয়। কিন্তু সাথে সাথে সামগ্রিক ব্যাপারে সমতা বিধানের উদ্দেশ্যে অপরাধ এবং অপরাধ প্রমাণের শর্তাবলীও অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। নির্ধারিত শর্তাবলীর মধ্যে থেকে যদি কোন একটি শর্তও অনুপস্থিত থাকে, তবে হুদ অপ্রযোজ্য হয়ে যায়। অর্থাৎ, অপরাধ সামান্যতম সন্দেহ পাওয়া গেলেও হদ প্রয়োগ করা যায় না। এ ব্যাপারে শরীয়তের স্বীকৃত নীতি হলো- 'সন্দেহের অবস্থায় হুদুদের শাস্তি রহিত হয়ে যায়'।]
মুসলিমদের সংবিধান পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। যেই সংবিধান দিয়ে মুসলিম খলিফারা এক হাজারেরও বেশী সময় পর্যন্ত সম্পূর্ণ উম্মাহকে শান্তিতে পরিচালিত করেছেন। অতএব এই কুফরী আইন যারা রচনা করেছে এবং এই কুফর আইন দ্বারা যারা দেশ পরিচালনা পূর্বে করেছে এবং বর্তমানে করছে তারা সকলেই তাগুত। আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ তাদের প্রত্যাখ্যান করা।
কাফের কুফরী করে আল্লাহ তায়ালার সাথে উনাকে ইলাহ মেনে নেয়ার ব্যাপারে এবং উনার হুকুম আহকাম অনুসারে চলার ব্যাপারে। তাই আল্লাহ তায়ালা আমাদের মুসলিমদের হুকুম দিয়েছেন তাগুতের সাথে কুফরী বা কুফর-বিত তাগুত করার জন্য অর্থাৎ তাগুতের হুকুম অনুসরন করতে নিষেধ করেছেন এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করে তার থেকে নিরাপদ দূরুত্ব বজায় রাখার হুকুম করেছেন। প্রতিটি যুগেই নবী পাঠানোর উদ্দেশ্যে ছিল একটাই আর তা হচ্ছে
"আমি প্রত্যেক উম্মতে একজন রাসূল পাঠিয়েছি, আর তাহার সাহায্যে সকলকে সাবধান করিয়া দিয়াছি, যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো আর তাগুত থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকো। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোককে আল্লাহ হেদায়েت করেছেন, আর কিছু সংখ্যক লোকের জন্য গোমরাহী অবধারিত হয়ে গেলো। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমন করো, আর লক্ষ্য করো মিথ্যারূপকারীদের কি রকম পরিণতি হয়েছে।” (সুরা নাহল- ৩৬)
যারা তাগুতের বাহিনীতে কর্মে নিয়োজিত তাদের সম্পর্কে নিােক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন-
"যারা ঈমানদার তারা তো যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহেই পক্ষান্তরে যারা কাফের তারা লড়াই করে তাগুতের পক্ষে। সুতরাং তোমরা জেহাদ করতে থাক শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে; শয়তানের চক্রান্ত একান্তই দুর্বল।" (সূরা নিসা ৪ ৭৬)
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ শেষ যামানায় যালেম শাসক, ফাসেক মন্ত্রী, অনিষ্টকারী বিচারক এবং মিথ্যাবাদী ফকীহদের আবির্ভাব ঘটাবে। তোমাদের মধ্যে যারা সে যুগে বেঁচে থাকবে তারা যেনো এদের কর আদায়কারী না হয়। তাদের কোনো সরদারী জমিদারী গ্রহণ না করে এবং পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগে কোনো পদ গ্রহণে রাজী না হয়। (তাবরানী) { এন্তেখাবে হাদীস পৃষ্ঠা-৭২ আধুনিক প্রকাশনী।
যারা তাগুতের আইন (মানুষের দ্বারা লিখিত আইন) দ্বারা বিচার ফয়সালা করে আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পর্কে বলেছেন- "যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।” [মায়েদা: ৪৪]
"তারা বিবাদ পূর্ণ বিষয়কে [মীমাংসার জন্য] তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়; অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা তাকে [তাগুতকে] মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করতে চায়।" (আন নিসা: ৬০)
যারা তাগুতকে অস্বীকার করে নির্যাতিত নিষ্পেষিত অবস্থায় রয়েছেন তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা নিলেক্ত আয়াতের মাধ্যমে চিরস্থায়ী জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন
“যারা তাগুতের বন্দেগী থেকে (ইবাদতের ক্ষেত্রে বা হুকুমের অনুসরনের ক্ষেত্রে) পাশ কাটাইয়া রইল (দূরে থাকে) এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে (অনুতপ্ত হয়ে), তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ। অতএব, সুসংবাদ দিন আমার সেই বান্দাদেরকে” (যুমার: ১৭)
তাগুতের বন্দেগী বা তাগুতের হুকুমের অনুসরনকারীদের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
"বল : আমি কি নির্দিষ্ট করিয়া সেই সব লোকের নাম বলিব, যাহাদের পরিণতি আল্লাহর নিকট ফাসেক লোকদের পরিণতি হইতেও নিকৃষ্টতম হইবে? তাহারা সেই লোক যাহাদের উপর আল্লাহ্ অভিশাপ বর্ষণ করিয়াছেন, যাহাদের উপর তাঁহার অসন্তোষ নাযিল হইয়াছে, যাহাদের মধ্য হইতে কিছু লোককে বানর ও শুকর বানাইয়া দেওয়া হইয়াছে, যাহারা 'তাগুতের বন্দেগী করিয়াছে; তাহাদের অবস্থা অধিকতর খারাপ এবং তাহারা 'সওয়াউস-সাবীল' হইতে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হইয়া বহুদুরে গিয়া পড়িয়াছে।” (আল-মায়েদা ৬০)
"যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের সাহায্যকারী ও সহায়। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর মধ্যে নিয়ে আসেন। আর যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করে তাদের সাহায্যকারী ও সহায় হচ্ছে তাগুত। সে তাদেরকে আলোক থেকে অন্ধকারের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। এরা আগুনের অধিবাসী। সেখানে থাকবে এরা চিরকালের জন্য।" (সূরা আল বাকারাহ : ২৫৭)
📄 মুনাফেক
মুনাফেক শব্দটি আরবী নেফক (نفق) ধাতু হতে নির্গত। যেমন-(نفق) শব্দটির অর্থ হচ্ছে এমন একটি সুড়ঙ্গপথ যার একদিক হতে প্রবেশ করার এবং অপরদিক হতে বের হবার রাস্তা রয়েছে। শরীয়তের পরিভাষায় অর্থ হচ্ছেঃ “দ্বীন ইসলামের এক দরওয়াজা দিয়ে প্রবেশ করে অপর দরওয়াজা দিয়ে বের হয়ে আসা।" (মুফরাদাতে ইমাম রাগেব)
দ্বীন ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করার পর তা থেকে আবার ফিরে আসা দু'টি কারণে হতে পারে। (১) এ প্রবেশ হয়েছে শুধু লোক দেখানোর জন্য। আন্তরিকভাবে সে ইসলামকে গ্রহণ করেনি, বরং মন আত্মা তার কুফরের উপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। (২) দ্বিতীয়তঃ এ প্রবেশ ইসলামের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস-অনুরাগ ও মহব্বত নিয়েই হয়েছে। লোক দেখানোর জন্য সে ইসলামের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেনি। কিন্তু এ সম্পর্কটি এত দুর্বল যে অন্যান্য সম্পর্ক পূর্ণরূপে তার উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে।
প্রথম শ্রেণীর নেফাককে "নেফাকী আকীদা" (বা বিশ্বাসগত মুনাফেক)। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নেফাককে "নেফাকী আমলী" (বা চরিত্রগত মুনাফেক) বলা হয়। যেমন হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলবী (রঃ) তাঁর স্বলিখিত "ফওযুল কবীর” কিতাবে লিখেছেনঃ “নবুয়াতী যুগে দু'ধরনের মুনাফেক বর্তমান ছিল,
(১) এক ধরনের মুনাফেক ছিল যারা মুখে কলেমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করতো বটে, কিন্তু তাদের অন্তঃকরণ সম্পূর্ণরূপে কুফর, নাস্তিকতা ও বেঈমানীর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা হচ্ছে সেই মুনাফেক যাদের পরিণতি সম্পর্কে আল-কুরআন কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছেঃ "অর্থাৎ নিঃসন্দেহে এ সব মুনাফেক জাহান্নামের সর্বনিম প্রকোষ্ঠে অবস্থান করবে।" (আন-নিসা: ১৪৫)।
(২) আর দ্বিতীয় ধরনের হলো ঐ সকল লোক যারা আন্তরিকতার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের ঈমানে দৃঢ়তা ছিল না। নানারূপ দুর্বলতার শিকারে পরিণত হয়েছিল। যেমন এক শ্রেণীর লোক ছিল যারা সর্ব বিষয়ে জাতীয় চরিত্র ও কর্মধারাকে অনুসরণ করে চলতো। যদি তাদের সম্প্রদায় মুসলমান হয়ে যেত, তবে তারাও মুসলমান হত। আর তারা কাফের থাকলে এরাও কাফেরই থাকত। আর এক শ্রেণীর লোক ছিল যাদের অন্তঃকরণ পার্থিব স্বার্থসুলভ লালসায় পরিপূর্ণ ছিল, আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতের জন্য কোন স্থানই তাদের অন্তরে খালি ছিল না। অথবা ধন-সম্পদের লোভ-লালসা ও হিংসা বিদ্বেষের বাতেনী রোগ তাদের মন-মগজ ও অন্তঃকরণকে এমনভাবে বিষাক্ত করেছিল যে, প্রার্থনার স্বাদ ও ইবাদতের বরকত অনুভব করার কোন সুযোগই অবশিষ্ট ছিল না। আবার কিছু লোক ছিল যাদেরকে অর্থনৈতিক চিন্তা ও কর্মব্যস্ততা এমনভাবে বস্তুবাদী ও দুনিয়ামুখী করে রেখেছিল যে, পরকালের চিন্তা-ভাবনা ও আশা-আকাংখা পোষণের কোন সুযোগই তারা পেত না। আবার এমন একদল লোকও ছিল যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের নবুয়াতের প্রতি পূর্ণরূপে আস্থাবান ছিল না এবং তাদের অন্তরে অর্থহীন কুধারণা ও সন্দেহবাদীতা স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু এ কুধারণা ও সন্দেহবাদীতা এমন পর্যায়ে ছিল না যাতে করে তারা ইসলামের গন্ডীসীমা হতে বের হয়ে পড়ে। এ ধরনের আরো কিছু বৈষয়িক কারণ ছিল যার ফলে তাদের নবুয়াতে মুহাম্মদীর উপর অনিশ্চিত ও অসন্তুষ্ট করে রেখেছিল। এমনও লোক ছিল যারা স্বীয় গোত্রীয় ও বংশীয় স্বার্থে এবং তার সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতো। এমন কি হক ও বাতিলের সংগ্রামে ইসলামের স্বার্থকে পদাঘাত করতেও তারা কুণ্ঠিত হতো না। এ দ্বিতীয় শ্রেণীর নেফাককেই নেফাকে আমলী বা চরিত্রগত মুনাফেকী বলা হয়।"
মুনাফিক বনাম গুনাহগারঃ মুনাফেকীর যে সকল নিদর্শন ও আলামত ইতিপূর্বে বর্ণনা করেছি তার কোন একটি নির্দেশ ও আلامত কোন লোকের মধ্যে পরিদৃষ্ট হলে তাকে বিনা চিন্তায় মুনাফেক ধারণা করা উচিত নয়। মুনাফেকের যতগুলো বৈশিষ্ট্য উপরে বর্ণিত হয়েছে তার অধিকাংশের উৎসমূল হচ্ছে মানুষের আত্মিক দুর্বলতা ও সীমাহীন পার্থিব লোভ-লালসা। আর এ আত্মিক দুর্বলতা ও সীমাহীন পার্থিব লোভ-লালসা সমস্ত পাপেরও উৎসমূল। এ কারণেই একজন খাঁটি মুসলমানের থেকে এ সব কার্যাবলী প্রকাশ পাওয়া অসম্ভবের কিছুই নয়। কেননা, নবী-রাসূলগণ ব্যতীত মানুষ যতই দৃঢ় ও মজবুত ঈমানদার হোক না কেন তারা কখনই নিষ্পাপ নয়। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই গুনাহর প্রবৃত্তি (নাফস) বর্তমান। এ জন্যই একজন মুসলমান যেখানে খুব ভাল কাজ করছে সেখানে তার থেকে পাপের কাজও হতে পারে-হচ্ছে। একজন মুনাফেকের যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, কোন সময় একজন মুসলমানের দ্বারা সে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়া কোনক্রমেই অসম্ভব নয়। সুতরাং এখানে মুনাফেক ও গুনাহগার মুসলমানের মর্যাদা এবং তাদের উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য ভালরূপে বুঝে নেয়া উচিত।
কোন মুনাফেক যখন ইসলামের তালিম তরবিয়াত ও জাতীয় কল্যাণের পরিপন্থী কোন কাজ সাফল্যের সাথে করে, তখন তার অন্তর এ খারাপ কাজের জন্য কোন প্রকার অনুতাপ করার পরিবর্তে বরং তার সাফল্যজনক কূটনৈতিকতার জন্য গর্ববোধ করে। কিন্তু একজন মুসলমানের দ্বারা কি এমন কাজ কখনো হতে পারে? যদি অলক্ষ্যে হয়ে যায়, তখন তার অন্তর ও মন-প্রাণের অবস্থা কি হতে পারে-কুরআনে হাকীম তার বর্ণনায় বলেছেঃ "আর জান্নাত হচ্ছে সেই সকল মোত্তাকী লোকদের জন্য, যারা ভুলবশতঃ যদিও কোন অশ্লীল কাজ করে বা পাপের কাজ করে স্বীয় আত্মার উপর যুলুম করে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মনে আল্লাহ তায়ালার খেয়াল ও স্মরণ এসে যায়। আর তারা নিজেদের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর এমন কে আছে যে, গুনাহ ক্ষমা করতে পারে? কেহই নেই। আর এ সকল মোত্তাকী লোকেরা বুঝে শুনে জ্ঞাতস্বারে ঐ সকল কৃত গুনাহর কাজ আর দ্বিতীয়বার করে না।" (আলে-ইমরান: ১৩৫)
আর একস্থানে বর্ণিত হয়েছেঃ "আর নফসের প্রবল আবেগ-উচ্ছাসের মুখে পড়ে অজ্ঞতাবশতঃ যাদের থেকে গুনাহর কাজ হয়ে পড়ে, আর গুনাহ করার পর নিজেরা তাওবা করে এবং সংশোধিত হয়, এমন লোকদের বেলায় নিঃসন্দেহে আপনার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।” (নাহল: ১১৯)
উল্লেখিত আয়াত গুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কয়েকটি বিষয় আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়। প্রথমত : একজন মুসলমানের থেকে পাপের কাজ হওয়া সম্ভব এবং হয়েও থাকে। দ্বিতীয়তঃ মুসলমানদের থেকে গুনাহর কাজ প্রকাশ হয়ে পড়লে তা বুঝে-শুনে হয় না বরং অজ্ঞতা ও নফসের আকস্মিক আবেগ-উচ্ছাসের দ্বারা পরাজিত ও প্রভাবিত হবার দরুনই হয়ে থাকে।
তৃতীয়ত : মুসলমান পাপের কাজ করার পর তাদের অন্তঃকরণ আল্লাহর ভয়ে ব্যাকুল ও অস্থির হয়ে উঠে। আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর সুবিচারী গুণ বৈশিষ্ট্যটি তার চক্ষের সামনে মূর্তিমান হয়ে দন্ডায়মান হয়। তার ঈমানের কারণে ললাটভূমি ভীত, কম্পিত ও শংকায় ঘর্মাক্ত পানি দ্বারা সিক্ত হয়ে উঠে। কাল বিলম্ব না করে তারা স্বীয় অপরাধের জন্য রব্বুল আলামীনের দরবারে সিজদায় পড়ে অঝোরে রোদন করতে থাকে। আর প্রার্থনা করতে থাকে তাঁর নিকট ক্ষমা ও মাগফেরাতের জন্য। সংশোধন হয়ে যায় ভবিষ্যতের আগত দিনগুলোর জন্য। আর চতুর্থ যে বিষয়টি আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়, তা হচ্ছে তৃতীয় বিষয়টির আর একটি দিক। অর্থাৎ তারা নিজেদের কোন পাপের কাজের উপর স্থির হয়ে থাকে না। বরং তা পরিহার করে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং এ জন্য তাদের মন মগজ, লজ্জা ও অবমাননার ব্যাথায় ব্যাথিত হয়ে উঠে। কিন্তু মুনাফেকদের মধ্যে এহেন গুণাবলী আদৌ বর্তমান থাকে না। তারা শরীয়তের বিপরীত কাজগুলো নফসের কোন আকস্মিক আবেগ উচ্ছাসের বশবর্তী হয়ে করে না। বরং জেনে বুঝে ও সজাগ অনুভূতি নিয়েই দ্বিধাহীন চিত্তে করে। শরীয়তের বিরুদ্ধাচারণ করাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নেয়। তাদের কলবে তখন আর তাওবা ও এস্তেগফার দূরের কথা, আল্লাহর ভয় ভীতির নাম-গন্ধও বিদ্যমান থাকে না।
একজন মুনাফেক ও একজন গুনাহগার মুসলমানের মধ্যে এ হচ্ছে মৌলিক পার্থক্য। মুনাফেকী হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে একটি বিপরীতধর্মী বিষ। তার মধ্যে আদৌ ঈমানের কোন চিহ্ন নেই। পক্ষান্তরে গুনাহ করার পর যদি মানুষ লজ্জিত না হয় এবং নিজের সংশোধনের জন্য ব্যাকুল হয়ে না উঠে, তবে এ গুনাহই শেষ পর্যন্ত মুনাফেকীর বীজ বপন করে। গুনাহর ব্যাপারে তার কর্ম চরিত্র যদি এমনিই থেকে যায়, তবে তার দ্বারাই মুনাফেকীর বীজ অংকুরিত হয়ে ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে কালক্রমে বিরাট বিশাল বৃক্ষের রূপ ধারণ করে। আল্লাহ বলেন : "তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি তাদেরকে তাঁর ফজল-করম দ্বারা অনুগ্রহ করেন, তবে অবশ্যই তারা তা থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করবে, সদকা দিবে এবং পুণ্যবান মুসলমান হবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যখন তাদেরকে তার ফজল ও করম দ্বারা অনুগ্রহ করলেন তখন তারা কৃপণতা প্রদর্শন করল। ফলে তারা আল্লাহর সহিত সাক্ষাত পর্যন্ত তাদের অন্তরে মুনাফিকী সৃষ্টি করে নিল। কেননা, তারা আল্লাহর সাথে যে চুক্তি করে ছিল সে চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলেছে তারা হল মিথ্যাচারী।” (তাওবা: ৭৫-৭৭)
উল্লেখিত কুরআনে হাকীমের বাণী দ্বারা বোঝা যায় যে, গুনাহ এক জিনিস এবং মুনাফিকী আর এক জিনিস। কিন্তু এদের উভয়ের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। অর্থাৎ গুনাহ কোন কোন সময় মুনাফিকীর ন্যায় দুরারোগ্য রোগও মানুষের অন্তরে সৃষ্টি করে। কলেরা মহামারীর সময়কার সাধারণ একটি পেটের পীড়া-যেমন কোন কোন সময় কলেরায় রূপান্তরিত হয়। এমনিভাবে গুনাহও কোন কোন সময় মানুষের মধ্যে মুনাফিকী সৃষ্টি করে। এ জন্যই আকস্মিক গুনাহর কাজ হয়ে পড়লে সে জন্য নির্ভয় ও নিশ্চিত থাকা উচিত নয়। বরং তার বিভিষিকাময় পরিণতি হতে নিরাপদ থাকার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। নতুবা তা মুনাফিকীর দূরারোগ্য রোগ আমাদের অলক্ষ্যে সৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ "তোমাদের আমল যেন এমনভাবে নিস্ফল ও ধবংস না হয় যা তোমরা বুঝতেও পারো না।" (হুজুরাত : ২)
📄 সুন্নাত
'সুন্নাত' শব্দের আভিধানিক অর্থ: الطريق 'পথ'। কুরআন মজিদে এই 'সুন্নাত' শব্দটি বহুক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি আয়াত হলঃ "আল্লাহর সুন্নাত, যা পূর্ব থেকেই কার্যকর হয়ে রয়েছে। আর আল্লাহর এ সুন্নাতে কোনরূপ পরিবর্তন দেখবে না কখনো।” (ফাতাহ্: ২৩)
এ আয়াতে ব্যবহৃত সুন্নাত শব্দের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থ طريقه পথ, পন্থা এবং পদ্ধতি। এভাবে দেখা যায় যে, 'সুন্নাত'শব্দটি যেমন আল্লাহর ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে, তেমনি করা হয়েছে নবী ও রাসূলদের ক্ষেত্রেও।
আল্লাহর সুন্নাত ও নবীর সুন্নাত: ইমাম রাগেব ইসফাহানী বলেন, আল্লাহ্ তা'য়ালার সুন্নাত বলা হয় তাঁর কর্মকুশলতার বাস্তব পন্থাকে, তাঁর আনুগত্যকারীর নিয়ম পদ্ধতিকে। আর নবীর সুন্নাত হচ্ছে সেই নিয়ম, পন্থা ও পদ্ধতি, যা তিনি বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করে চলতেন।
হাদীস-বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় 'সুন্নাত' হচ্ছে রাসূলে করীম (সাঃ)-এর মুখের কথা, কাজ ও সমর্থন। অনুমোদনের বর্ণনা যাকে প্রচলিত কথায় বলা হয় 'হাদীস'। আর ফিকাহশাস্ত্রে 'সুন্নাত' বলা হয় এমন কাজকে, যা ফরজ বা ওয়াজিব নয় বটে; কিন্তু নবী করীম (সাঃ) তা প্রায়ই করেছেন। এখানে এ দুটো সুন্নাতের কোনটি-ই আলোচ্য নয়।
আমাদের আলোচ্য সুন্নাত হল সেই মূল আদর্শ, যা আল্লাহ তা'য়ালা বিশ্ব- মানবের জন্যে নাযিল করেছেন, যা রাসূলে করীম (সাঃ) নিজে তাঁর জীবনে দ্বীনি দায়িত্ব পালনের বিশাল ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন; কেননা নবী করীম (সাঃ) যা বাস্তবভাবে অনুসরণ করেছেন, তার উৎস হল ওহী, যা আল্লাহর নিকট থেকে তিনি লাভ করেছেন। এ 'ওহী' দু'ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে আল্লাহর কালাম কুরআন মজীদ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ওহীয়ে খফী, বিশেষ পন্থায় আলাহর জানিয়ে দেয়া বিধান ও নির্দেশ। রাসূলে করীম (সাঃ) এর কর্মজীবনে এ দুটোরই সমন্বয় ঘটেছে পুরোপুরিভাবে। আর তাই হচ্ছে 'সুন্নাত' তাই হচ্ছে পরিপূর্ণ দ্বীন-ইসলাম। কুরআন মজীদে রাসূলের জবানীতে বলা হয়েছেঃ "আমি কোন আদর্শই অনুসরণ করি না' করি শুধু তাই যা আমার নিকট ওহীর সূত্রে নাযিল হয়।" ওহীর সূত্রে নাযিল হওয়া আদর্শই রাসূলে করীম (সাঃ) বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করেছেন, তা-ই হচ্ছে আমাদের আলোচ্য 'সুন্নাত'। এই সুন্নাতেরই অপর নাম ইসলাম। কুরআন মজীদে এই সুন্নাতকেই 'সিরাতুল মুস্ত াকীম' বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলের জবানীতে কুরআন মজীদে ঘোষণা করা হয়েছেঃ
"নিশ্চয়ই এ হচ্ছে আমার সঠিক সরল দৃঢ় পথ (সিরাতুল মুস্তাকীম)। অতএব তোমরা এ পথই অনুসরণ করে চলবে, এ ছাড়া অন্যান্য পথের অনুসরণ তোমরা করবে না। তা করলে তা তোমাদের এ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে নিয়ে যাবে। আল্লাহ্ তোমাদের এরূপ-ই নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা ভয় করে চল।" (আনআমঃ১৫৩)
ইমাম শাতেবী 'সিরাতুল মুস্তাকীম'-এর পরিচয় দান প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ 'সিরাতুল মুস্তাকীম' হচ্ছে আল্লাহর সেই পথ, যা অনুসরণের জন্যে তিনি দাওয়াত দিয়েছেন। আর তা-ই সুন্নাত; আর অন্যান্য পথ বলতে বোঝানো হয়েছে বিরোধ ও বিভেদপন্থীদের পথ, যা মানুষকে 'সিরাতুল মুস্তাকীম' থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর তারাই হচ্ছে বিদয়াতপন্থী লোক।
📄 বিদয়াত
সুন্নাত হচ্ছে তা-ই, যা বিদয়াতের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কেননা এ সুন্নাতের বিপরীতই হচ্ছে বিদয়াত। ইমাম রাগেব 'বিদয়াত' শব্দের অর্থ লিখেছেনঃ কোনরূপ পূর্ব নমুনা না দেখে এবং অন্য কিছুর অনুসরণ না করেই কোন কার্য নতুনভাবে সৃষ্টি করা। অর্থাৎ শরীয়াত প্রবর্তক যে কথা বলেন নি সে কথা বলা এবং তিনি যা করেন নি এমন কাজকে আদর্শরূপে গ্রহণ করা-তা-ই হচ্ছে বিদয়াত। এমন সব কাজ করা বিদয়াত, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। কুরআন মজিদে এ বিদআত শব্দটি আল্লাহ্ সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়েছে দুটো আয়াতে।
"আসমান-যমীনের সম্পূর্ণ নবোদ্ভাবনকারী, নতুন সৃষ্টিকারী।” (আল-বাকারা)
"তিনি তো আসমান-যমীনের নব সৃষ্টিকারী।" (আনআম: ১০১)
এ দুটো আয়াতেই আল্লাহ্ তা'য়ালাকে 'আসমান যমীনের বদীউন'-পূর্ব দৃষ্টান্ত পূর্ব উপাদান ও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সৃষ্টিকারী বলা হয়েছে। সূরা 'আল-কাহাফ'-এর এক আয়াতে 'বিদয়াত' শব্দের এ অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায়। ইরশাদ হচ্ছেঃ
"বল হে নবী, আমি আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের কথা কি তোমাদের বলব? তারা হচ্ছে এমন লোক, যাদের যাবতীয় চেষ্টা সাধনাই দুনিয়ার জীবনে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে আর তারাই মনে মনে ধারনা করে যে, তারা খুবই ভাল কাজ করেছে।" (আল কাহাফ: ১০৩-১০৪)
বিদয়াতপন্থীরাও ঠিক এমনি। তারা যেসব কাজ করে, আসলে তা আল্লাহর দেয়া নীতির ভিত্তিতে নয়। তা সত্ত্বেও তারা তাকেই নেক আমল এবং বড় সওয়াবের কাজ বলে মনে করে।
হযরত ইরবাদ ইবনে সারিয়া (রাঃ) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেন "তোমাদের অবশ্যই অনুসরণ করে চলতে হবে আমার সুন্নাত এবং হিদায়াত প্রাপ্ত সত্যপন্থী খলীফাদের সুন্নাত! তোমরা তা শক্ত করে ধরবে, দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে থাকবে (যেন কোন অবস্থায়ই তা হাতছাড়া হয়ে না যায়, তোমরা তা থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিচ্যুত হয়ে না পড়)"। (মুসনাদে আহমদ)
কুরআন মজীদে দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'য়ালা ঘোষণা করেছেনঃ
"আজকের দিনে তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ-পরিণত করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্যকভাবে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম-মনোনীত করলাম।" (আল-মায়েদা ৩)
এ আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন-ইসলাম পরিপূর্ণ। তাতে নেই কোন অসম্পূর্ণতা, কোন কিছুর অভাব। এ দ্বীনে বিশ্বাসী ও এর অনুসরণকারীদের কোন প্রয়োজন হবে না এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোন দিকে তাকাবার, বাইরের কোন কিছু এতে শামিল করার এবং ভিতর থেকে কোন কিছু বাদ দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়ার কেননা এতে মানুষের সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অতএব না তাতে কোন জিনিস বৃদ্ধি করা যেতে পারে, না পারা যায় তা থেকে কোন কিছু বাদ দিতে। এ দুটোই দ্বীনের পরিপূর্ণতার বিপরীত এবং আলাহর উপরোক্ত ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধী। ইসলামী ইবাদতের ক্ষেত্রে সওয়াবের কাজ বলে এমন সব অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করা, যা নবী করীম (সাঃ) ও সাহাবায়ে কিরামের জামানায় চালু হয়নি এবং তা দেখতে যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন তা স্পষ্টই বিদয়াত, তা দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণতার কুরআনী ঘোষণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ কারণেই ইমাম মালিক বলেছিলেনঃ "সেকালে যে কাজ দ্বীনি কাজ বলে ঘোষিত ও নির্দিষ্ট হয়নি, আজও তাকে দ্বীনি কাজ বলে মনে করা যেতে পারে না।"
অতীতকালের নবীর উম্মতদের দ্বারা নবীর উপস্থাপিত দ্বীন বিকৃত ও বিলীন হয়ে যাওয়ারও একমাত্র কারণই ছিল যে, তারা নবীর প্রবর্তিত ইবাদতে মনগড়াভাবে নতুন জিনিস শামিল করে নিয়েছিল। কিছুকাল পরে আসল দ্বীন কি, তা চিনবার আর কোন উপায়ই থাকল না।
'দ্বীন' তো আল্লাহর দেয়া এবং রাসূলের উপস্থাপিত জিনিস। তাতে যখন কেউ নতুন কিছু শামিল করে, তখন তার অর্থ এই হয় যে, আল্লাহ্ বা রাসুলে করীম (সাঃ) যেন বুঝতেই পারছিলেন না দ্বীন কিরূপ হওয়া উচিত আর এরা এখন বুঝতে পারছে, তাই নিজেদের বুঝমত সব নতুন জিনিস এর মাঝে শামিল করে এর ত্রুটি দূর করতে চাইছে এবং অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করে তুলছে। আর এর ভিতর থেকে কিছু বাদ-সাদ দিয়ে একে যুগোপযোগী করে তুলতে চাইছে। এরূপ কিছু করার অধিকার তাকে কে দিল? আল্লাহ্ দিয়েছেন? তাঁর রাসূল দিয়েছেন? ---না, কেউ ই দেয় নি, নিজ ইচ্ছে মতই সে করেছে। ঠিক এ দিকে লক্ষ্য করেই হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেছেন। "যে ইবাদত সাহাবায়ে কেরাম করেন নি, সে ইবাদত তোমরা কর না। তাকে ইবাদত বলে মনে কর না, তাতে সওয়াব হয় বলেও বিশ্বাস কর না।"
এ বিদয়াত এমনই এক মারাত্মক জিনিস, যা শরীয়তের অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া ও রাসূলের প্রদর্শিত ফরজ ওয়াজিবকে পর্যন্ত বিকৃত করে দেয়। শরীয়াতের ফরজ ওয়াজিবের প্রতি অন্তরে থাকে না কোন মান্যতা গণ্যতার ভাবধারা। শরীয়াতের সীমালংঘন করার অভ্যাস হতে থাকে। শরীয়াত বিরোধী কাজগুলোকে তখন মনে হতে থাকে খুবই উত্তম। যে লোক ইসলামে কোন বিদয়াত উদ্ভাবন করবে এবং তাকে ভাল ও উত্তম মনে করবে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে, নবী (সাঃ) রিসালাত ও নবুয়্যাতের দায়িত্ব পালন করেন নি, খেয়ানত করেছেন। কেননা তিনি যদি দায়িত্ব পালন করেই থাকেন, তাহলে ইসলাম ও সুন্নাত ছাড়া আর তো কোন কিছুর প্রয়োজন পরে না। সব ভালই তো তাতে রয়েছে।
সত্যিকারভাবে যে দ্বীন রাসূলের নিকট থেকে পাওয়া গেছে, ঠিক তা-ই পালন করে চলা উচিত সব মুসলমানের। না তাতে কিছু কম করা উচিত, না তাতে কিছু বেশী করা সঙ্গত হতে পারে। কুরআনের নিগেক্ত আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছে 'আহলি কিতাব কে লক্ষ্য করে।
"হে আহলি কিতাব! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি কর না আর আল্লাহ্ সম্পর্কে প্রকৃত হক ছাড়া কোন কথা বল না।”
বিদয়াত কিভাবে চালু হয়
বিদয়াত চালু হওয়ার মূলে চারটি কার্যকরণ লক্ষ্য করা যায় প্রথমটি : এই যে, বিদয়াতী তা নিজের থেকে উদ্ভাবিত করে সমাজে চালিয়ে দেয়। পরে তা সাধারণভাবে সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়টি: কোন আলিম ব্যক্তিই হয়ত শরীয়তের বিরোধী একটা কাজ করেছেন, করেছেন তা শরীয়তের বিরোধী জানা সত্ত্বেও; কিন্তু তা দেখে জাহিল লোকেরা মনে করতে শুরু করে যে, এ কাজ শরীয়তসম্মত না হয়ে যায় না। এভাবে এক ব্যক্তির কারনে গোটা সমাজেই বিদয়াতের প্রচলন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়টি : এই যে জাহিল লোকেরা শরীয়াত বিরোধী কোন কাজ করতে শুরু করে। তখন সমাজের আলিমগণ সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে থাকেন, তার প্রতিবাদও করেন না, সেকাজ করতে নিষেধও করেন না। বলেন না যে, এ কাজ শরীয়াতের বিরোধী তোমরা এ কাজ কিছুতেই করতে পারবে না। বিরুদ্ধতা না করার ফলে সাধারন লোকদের মনে ধারণা জন্মে যে, এ কাজ নিশ্চয়ই নাজায়েয হবে না, বিদয়াত হবে না। হলে কি আর আলিম সাহেবরা তার প্রতিবাদ করতেন না। এভাবে সমাজে সম্পূর্ণ বিদয়াত বা নাজায়েয কাজ শরীয়াতসম্মত কাজরূপে পরিচিত ও প্রচলিত হয়ে পড়ে।
চতুর্থটি: বহুকাল পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমকৃত ও রাসূল (সাঃ)-এর প্রদর্শিত কোন একটি সুন্নাত তা সমাজের লোকদের সামনে বলা হয়নি, প্রচার করা হয়নি। তখন সে সম্পর্কে সাধারণের ধারণা হয় যে, এ কাজই নিশ্চয়ই জায়েয নয়, হুকুম হলে আলিম সাহেবরা কি এতদিন তা বলতেন না! এভাবে একটি শরীয়াতসম্মত কাজকে শেষ পর্যন্ত শরীয়ত বিরোধী বলে লোকেরা মনে করতে থাকে আরএ-ও একটি বড় বিদয়াত। যেমন- কুরআন আর সুন্নাহর সুস্পষ্ট হুকুম শুধুমাত্র ইসলামী আইন বা শরীয়াহ মুতাবিক রাষ্ট্রীয় সংবিধান হওয়া, শুধুমাত্র আলাহর আইন দ্বারা বিচার ফায়সালা করা, দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) থাকুক আর না থাকুক সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে এক খলিফার নেতৃত্বে একত্রিত থাকা এবং ইসলামের নামে ফিরকা বা দলাদলি না করা ইত্যাদি। এ সকল কাজ সমূহের ফরয হুকুম থাকা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজের বেশীরভাগ লোকই জানে না যে তারা সকলে আল্লাহর ফরয হুকুম পালন করা ছেড়ে দিয়েছে এবং বিদয়াত নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। ফলে তারা শির্ক কুফর ও বিদয়াতে পতিত আছে।
বিদয়াত প্রচলিত হওয়ার আর একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। আর তা হল এই যে, মানুষ স্বভাবতই চিরন্তন শান্তি ও সুখ-বেহেশত লাভ করার আকাঙক্ষী। আর এ কারণে সে বেশী বেশী নেক কাজ করতে চেষ্টিত হয়ে থাকে। দ্বীনের হুকুম আহকাম যথাযথ পালন করা কঠিন বোধ হলেও সহজসাধ্য সওয়াবের কাজ করার জন্যে লালায়িত হয় খুব বেশী। আর তখনি সে শয়তানের ষড়যন্ত্রে পড়ে যায়। নিজ থেকেই মনে করে নেয় যে, এগুলো সব নেক কাজ, সওয়াবের কাজ। সেগুলো শরীয়াতের ভিত্তিতেও বাস্তবিকই সওয়াবের কাজ কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবার মত ইল্মী যোগ্যতাও যেমন থাকে না, তেমনি সে দিকে বিশেষ উৎসাহও দেখানো হয় না। কেননা তাতে করে চিরন্তন সুখ লাভের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আর তাতেই তাদের ভয়।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বিশ্বাস করতেন যে, শিরক তাওহীদের পরিপন্থী আর বিদয়াত সুন্নাতের বিপরীত। শির্ক 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু কালেমার' এই প্রথম অংশের অস্বীকৃতি। আর বিদয়াত হচ্ছে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' কালেমার এই শেষাংশের বিপরীত এবং অন্তর থেকে তার অস্বীকৃতি।”
মুসনাদে দারেমী হাদীস গ্রন্থে হযরত হিসনের উদ্ধৃতি রয়েছেঃ "জনগণ তাদের দ্বীনের মধ্যে যে বিদয়াতই চালু করে আল্লাহ্ তা'য়ালা তাদের নিকট থেকে অনুরূপ একটি সুন্নাত তুলে নিয়ে যান। পরে কিয়ামত পর্যন্ত আর তা ফিরিয়ে আনেন না।"