📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


সর্বোত্তম দ্বীনদারি
[৪৮৪] উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ্‌ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “কীরূপ দ্বীনদারি সর্বোত্তম?” তিনি বলেন,
الْحَنِيفِيَّةُ السَّمْحَةُ
“সরল-সঠিক অনাবশ্যক দ্বীনদারি।”[৬৪]

বিপদের সময় পড়ার দু‘আ
[৪৮৫] আবদুল্লাহ ইবনু জা‘ফর থেকে উমার ইবনু আবদুল আযীয বর্ণনা করেন, “তাঁর (আবদুল্লাহ্‌র) মা আসমা বিনতে উমাইস বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এমন কিছু কালিমা শিক্ষা দিয়েছেন, যেগুলো আমি বিপদের সময় পড়ে থাকি। তা হলো,
اللهُ رَبِّيْ لَا أُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا
‘আল্লাহ আমার রব, আমি তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করি না।’”[৬৫]

কেবল নিজের মুক্তির চেষ্টায় থাকা গোমরাহি
[৪৮৬] আওযা‘য়ী বলেন, উমার ইবনু আবদুল আযীয বলেছেন, “যখন দেখবে লোকেরা দ্বীনের বিষয়ে সাধারণ মানুষদের বাদ দিয়ে কেবল নিজেরা মুক্তি পাওয়ার চেষ্টায় আছে, তাহলে ধরে নিয়ো তারা গোমরাহিতে আছে।”

তিনি ন্যায়বিচারক হবেন
[৪৪৭] উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাফে বলেন, “আমি ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বহুবার বলতে শুনেছি—যদি আমি জানতাম যে উমারের বংশের সেই সন্তানটি কে হবে, যার চেহারায় এমন আলামত রয়েছে যে সে ন্যায়বিচারে পুরো পৃথিবী ভরিয়ে ফেলবে!”

আল্লাহর পথে লড়াই করার তামান্না
[৪৪৮] হাকীম ইবনু কাসীর বলেন, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হায় আমার বাড়ি যদি কাযবীন হতো এবং অবশেষে (সেখানেই) আমার মৃত্যু হতো। অর্থাৎ আল্লাহর পথে লড়াই করে।”

গ্রাম্য লোকদের জমি ফিরিয়ে দিলেন
[৪৪৯] সুলাইমান ইবনু মূসা বলেন, “তিনি জানতে পেরেছেন যে, কিছু গ্রাম্য লোক উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর নিকট বনু মারওয়ানের অন্য কিছু লোকের বিরুদ্ধে একটি জমি নিয়ে মামলা করল। যেটি ছিল সেই গ্রাম্য লোকদের। তারা সেটি চাষাবাদ করেছিল। অতঃপর ওলীদ ইবনু আবদুল মালিক তা ছিনিয়ে নিয়ে তার পরিবারস্থ কিছু লোককে দিয়েছিল। তখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْبِلَادُ بِلَادُ اللَّهِ وَالْعِبَادُ عِبَادُ اللَّهِ مَنْ أَحْيَا أَرْضًا مَيِّتَةً فَهِيَ لَهُ 'ভূমিসমূহ আল্লাহর। বান্দারাও আল্লাহর। যে ব্যক্তি কোনো অনাবাদি ভূমি আবাদ করল সেই ভূমি তার হয়ে যাবে।' [৬৬] তারপর তিনি তাদের (গ্রাম্য লোকদের) সেই জমি ফিরিয়ে দিলেন।”

তিনি সাজগোজ পছন্দ করতেন না
[৪৫০] ইবনু শাওযাব বলেন, “একদিন মাহালিবা গোত্রের এক মহিলা উমার ইবনু আবদুল আযীযের স্ত্রী ফাতেমার কাছে এসে যখন তাকে ও তার অবস্থা অবলোকন করলেন তখন তাকে বললেন, 'আপনি তো আমিরুল মুমিনিনের স্ত্রী। আপনি কি তার জন্য সেজেগুজে থাকতে পারেন না?' যখন এই কথাগুলো তাকে অনেক বেশি বলল তখন তিনি বললেন, 'স্ত্রীর তো সে রকম সাজগোজ করেই থাকা উচিত যা তার স্বামী পছন্দ করে, তাই না?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'তিনি আমার থেকে এমনটাই পছন্দ করেন।'

শ্রবণ অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করা
[৪৫১] মুহাম্মাদ ইবনু কাব থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, “যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় যে, তুমি যা শ্রবণ করেছো, সে বিষয়ে অন্যকেউ তোমার থেকে বেশি সৌভাগ্যবান না হয় তবে তুমি তাই করো।”[৬৭]

উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর দুআ
[৪৫২] হুসাইন আল-জুফি বলেন, আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহের (প্রতিদান) বৃদ্ধি করে দিন। এবং অন্যায়কারীকে তাওবা করার সুযোগ দিন। অন্যদের দয়া দ্বারা বেষ্টন করে রাখুন।”

তিনি হেদায়াতের ইমাম ছিলেন
[৪৫৩] আবুল আব্বাস বলেন, “আমি খালিদ ইবনু ইয়াজিদ ইবনু মুআবিয়ার সাথে বাইতুল মুকাদ্দাসের বারান্দায় ছিলাম। তখন একজন যুবক এসে খালিদকে সালাম করল। খালিদ সেই যুবকের দিকে ফিরলে সে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের কোনো পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে কি?' আমি খালিদের আগেই উত্তর দিলাম, 'হ্যাঁ, তোমাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে, যে (সবকিছু) শ্রবণ করে ও দেখে।” এটা শুনে যুবকের চক্ষু কোটরাগত হলো। সে তার হাত খালিদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রস্থান করল। আমি খালিদের কাছে জানতে চাইলাম, “সে কে?” তিনি বললেন, সে উমার ইবনু আবদুল আযীয। আমিরুল মুমিনিনের ভাতিজা। যদি তার ও তোমার হায়াত লম্বা হয় তবে তোমরা তাকে হেদায়াতের ইমামরূপে দেখতে পাবে।”

অনেক সময় কথা বলা পাপের কারণ হয়
[৪৫৪] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে তার (অনর্থক) কথা বলাকে পাপের কারণ মনে করে না, তার পাপ বৃদ্ধি পায়।”

মাসজিদের সবাই হেসে দিলো
[৪৫৫] আবদুল্লাহ ইবনু ঈসা বলেন, “আমরা উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তিনি জুমুআর দিন মানুষের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। একজন খ্রিষ্টান তার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আমি গ্রাম্য লোকদের থেকে আল্লাহর কাছে (নিজেকে) মুক্ত ঘোষণা করছি।' তখন মাসজিদের সবাই হেসে দিলো।”
বর্ণনাকারী বলেন, "আমি যেন এখনো তাকে দেখতে পাচ্ছি।"

মৃত্যুকে সহজ করার দুআ
[৪৫৬] সুফিয়ান ইবনু উআইনা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—হে আল্লাহ, মৃত্যুকে আমার জন্য সহজ করো।”

কেবল নিজের মুক্তি চাওয়া গোমরাহি
[৪৫৭] আওযায়ি জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, যার থেকে তিনি শুনেছেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—যে ব্যক্তিরা দ্বীনের ক্ষেত্রে সবাইকে বাদ দিয়ে কেবল নিজেরা মুক্তি পেতে চায় তারা গোমরাহিতে আছে।”

সিদ্ধ রসুন ও যাইতুন
[৪৫৮] নুআইম ইবনু সালামাহ বলেন, "আমি উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে গিয়ে তাকে দেখতে পেয়েছি, তিনি সিদ্ধ রসুন ও একজাতীয় তৃণ ও যাইতুন খাচ্ছেন।”

কান্নার কারণে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরা
[৪৫৯] আওযায়ি বলেন, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ এত কেঁদেছেন যে, একপর্যায়ে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরেছে।”

নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কাছে টানলেন
[৪৬০] হাসান বলেন, “আমি আইয়ুবের মজলিসে ছিলাম। তিনি একজনকে স্বপ্নে দেখার কথা বললেন। তার নাম নেওয়ার পর সবাই চিনল যে, তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি আবূ বাকর ও উমারের মধ্যখানে বসা ছিলেন। ইত্যবসরে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আগমন করলে তিনি তাকে ডান দিকে তার ও আবূ বাকরের মাঝে বসার জন্য ইঙ্গিত করলেন। আবূ বাকর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি মনে করি না আপনি আমার ও আপনার মাঝে অন্য কাউকে বসাবেন।' এবার তিনি তাকে উমারের পাশে ইঙ্গিত করলেন। যেন তার ও উমারের মাঝে এসে তিনি বসেন। তখন উমারও আবূ বাকরের মতো বললেন। অবশেষে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিজের সামনেই বসালেন।”

তিনি ন্যায়পরায়ণ বিচারক ছিলেন
[৪৬১] মুআয ইবনু ফুদালা বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ জাযিরার গির্জায় একজন পাদরির কাছে অবস্থান করলেন। যেখানে সেই পাদরি বহুকাল কাটিয়েছেন। তার দিকে কিতাবের ইলমকে সম্বন্ধিত করা হতো। সেই পাদরি তার কাছে নেমে আসলেন। এমনটা তাকে আগে কখনো করতে দেখা যায়নি। আবদুল্লাহকে বলা হলো, 'আপনি কি জানেন, কেন তিনি নেমে এসেছেন আপনার কাছে?' তিনি বললেন, 'না।' বলা হলো, আপনার বাবার খাতিরে। আমরা তাকে ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে পেয়েছি। যেমন রজব মাসের সাথে হারাম মাসসমূহের সম্পর্ক।”
বর্ণনাকারী বলেন, “আইয়ুব ইবনু সুআইদ এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন- (হারام মাসসমূহের মধ্যে ধারাবাহিক তিন মাস যিলকদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররম (দ্বারা ইঙ্গিত হলো ধারাবাহিক তিন খলীফা) আবূ বাকর, উমার ও উসমান। আর রজব হলো আলাদা (অর্থাৎ এর দ্বারা ইঙ্গিত হলো উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ)।”

আল্লাহর বিধান প্রয়োগে দেরি করা অপছন্দনীয়
[৪৬২] আওযায়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কর্মকর্তাদের মধ্যে তার সাথে সবচেয়ে বেশি মিল হলো আমর ইবনু উবাইদ ইবনু তালহা আল-আনসারির। তিনি তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ওমান অঞ্চলের কর্মকর্তা ছিলেন। তার সম্পর্কে জানা যায় যে, একবার ঈশার পর এমন এক ব্যক্তিকে তার কাছে নিয়ে আসা হলো, যার ওপর হদ্দ প্রয়োগ আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর বিধান প্রয়োগকে সকাল পর্যন্ত বিলম্ব করাকে অপছন্দ করি। তারপর রাতেই তার ওপর তা প্রয়োগ করেন।"

তিনি বিবাদমুক্ত খলীফা ছিলেন
[৪৬৩] হাবীব ইবনু হিন্দ আসলামি বলেন, “আরাফা অবস্থানকালে সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, '(বিবাদমুক্ত) খলীফা হলেন তিনজন।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'খলীফা কারা?' তিনি বললেন, 'আবূ বাকর, উমার ও উমার।' আমি জানতে চাইলাম, 'আবূ বাকর ও উমারকে তো চিনলাম। কিন্তু আরেকজন উমার কে?' তিনি বললেন, 'যদি তুমি বেঁচে থাকো তবে তার দেখা পাবে। আর যদি মারা যাও তবে তিনি তোমার পরে আসবেন।"

নতুন মুদ্রা তৈরি
[৪৬৪] মুখতার ইবনু ফুলফুল বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর জন্য কিছু মুদ্রা তৈরি করলাম। সেখানে লেখা ছিল-উমার অঙ্গীকার পূর্ণ করার ও ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বললেন, 'এগুলো ভেঙে ফেলে (নতুন করে মুদ্রা তৈরি করে তার মধ্যে) লেখো—আল্লাহ অঙ্গীকার পূর্ণ করার ও ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দিয়েছেন।"

বুঝ হবার পর থেকে কখনো মিথ্যা বলেননি
[৪৬৫] ইবনু উআইনা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ ওলীদের সাথে কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা বললে তিনি (ওলীদ) তাকে বললেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ।' তখন উমার তাকে বললেন, 'যখন থেকে আমি জেনেছি মিথ্যা মিথ্যাবাদীর ক্ষতি করে থাকে তখন থেকে কখনো মিথ্যা বলিনি।”

সবার কাছে হক পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা
[৪৬৬] উমার ইবনু যর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সুলাইমানের জানাযা থেকে ফিরে এসে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর আযাদকৃত দাস তাকে জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার, আপনাকে চিন্তিত দেখছি যে!' তিনি বললেন, 'চিন্তিত হবার মতো বিষয়ের কারণেই চিন্তিত হচ্ছি। (কেউ তার প্রয়োজনে) আমার কাছে পত্র লেখা বা আবেদন করার আগেই পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত যত উম্মতে মুহাম্মাদি আছে, সবার কাছে আমি তাদের হক পৌঁছে দিতে চাই।”

গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের জ্ঞানের শেষ স্তর
[৪৬৭] উমার ইবনু উসমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি-কুরআনের ব্যাখ্যায় গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা জ্ঞানের শেষ পর্যায়ে এসে এই কথা বলে: آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا 'আমরা এর প্রতি ঈমান রাখি। পুরোটাই আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।”[৬৮]

মেহমানকে কাজে না খাটানো
[৪৬৮] রজা ইবনু হায়ওয়া বলেন, "আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ- এর সাথে এক রাত জাগ্রত ছিলাম। বাতির তেল ফুরিয়ে গিয়েছিল। আমি বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি গোলামকে আদেশ করলেই তো পারেন যাতে সে বাতিতে তেল ভরে দেয়!' তিনি জানালেন, 'সে সারা দিন খুব পরিশ্রম করে এইমাত্র ঘুমিয়েছে।' আমি বললাম, তাহলে আমিই উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে আনি?' তিনি বললেন, 'না।' এরপর তিনি নিজেই উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে এনে আমাকে বললেন, 'দেখো, আমি যখন উঠে যাই তখনো যেমন উমার ইবনু আবদুল আযীয ছিলাম, ফিরে আসার পরও তেমনই উমার ইবনু আবদুল আযীযই আছি। হে রজা, মেহমানকে কাজে খাটানো মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না।'"

ধৈর্য মুমিনের অবলম্বন
[৪৬৯] উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “(সর্বক্ষেত্রে) সন্তুষ্টি অল্পই পাওয়া যায়। তাই ধৈর্যধারণ করাই মুমিনের অবলম্বন।”

সন্তানের প্রতি উপদেশ
[৪৭০] আবদু রব্বিহ ইবনু হিলাল বলেন, “আবদুল মালিক ইবনু আবদুল আযীয তার পিতা বিশ্রাম নিতে গেলে তাকে (অর্থাৎ পিতাকে) বললেন, 'বাবা, আপনি কীভাবে বিশ্রাম নিচ্ছেন, অথচ আপনার ওপর অবিচার দূর করার দায়িত্ব রয়েছে। হতে পারে ঘুমের ভেতরই মৃত্যু আপনাকে এমতাবস্থায় পাকড়াও করে নিল যে, আপনার কাছে আসা বিষয়গুলো আপনি প্রতিকার করে সারতে পারেননি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “সে বিষয়গুলো খুব জোর দিয়ে বলল। দ্বিতীয় দিনও সে এমন কাজ করল। উমার বললেন, 'হে আমার ছেলে, আত্মা হলো আমার বাহন। যদি আমি তার প্রতি দয়াপরবশ না হই, তাহলে সে আমাকে (গন্তব্যে) পৌঁছে দেবে না। হে আমার ছেলে, আল্লাহ তাআলা যদি পুরো কুরআনকে একসাথে অবতীর্ণ করতে চাইতেন, তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এক এক আয়াত করে অবতীর্ণ করেছেন। যাতে তা লোকদের অন্তরে গেঁথে যায়। হে আমার ছেলে, কোনো ক্লান্তিই ফলাফলের দিকে নিয়ে যায় না।"

তিনি অধিক আল্লাহভীরু বান্দা ছিলেন
[৪৭১] উমার ইবনু যর বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয়কারী কাউকে আমি পাইনি।”

এক ইয়াহুদির সতর্কতা
[৪৭২] ওলীদ ইবনু হিশাম বলেন, “এক ইয়াহুদির সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে সে জানাল যে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ শীঘ্রই শাসন-দায়িত্ব পাবেন এবং ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করবেন। আমি উমারের সাথে দেখা হলে ইয়াহুদির কথা তাকে জানালাম। উমার খেলাফতের দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই ইয়াহুদির সাথে আমার আবার সাক্ষাৎ হলে সে আমাকে বলল, 'আমি কি তোমাকে জানাইনি যে, তোমার এই সঙ্গী অচিরেই শাসন দায়িত্ব পাবে?' তারপর সে বলল, 'তোমার এই সঙ্গীকে (বিষ) পান করানো হয়েছে। সে যেন এর প্রতিকার করে।' উমারের সাথে আমার সাক্ষাৎ হবার পর তাকে বললাম, 'যে ইয়াহুদির সাথে আমার সাক্ষাৎ হবার পর জানিয়েছিল যে, আপনি অচিরেই শাসনকার্যের দায়িত্ব পাবেন এবং ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করবেন। সে আমাকে জানাল, আপনাকে (বিষ) পান করানো হয়েছে। সে আপনাকে নিজের প্রতিকার করার কথা বলেছে।' তিনি তখন বললেন, 'সে তোমাকে যা জানিয়েছে, সে জন্য আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন। যে সময় আমাকে (বিষ) পান করানো হয়েছে সে সময়ের ব্যাপারে আমি জানি। যদি কানের লতি ধরাটা আমার চিকিৎসা হতো অথবা নাকের কাছে ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য কোনো সুগন্ধি আমাকে দেওয়া হতো, তবুও আমি তা করতাম না।'”[৬৯]

তিনি খাবার ফিরিয়ে দিলেন
[৪৭৩] আবদুল্লাহ বিন আওন আনসারি থেকে বর্ণিত, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ অনারবদের একটি মঠে অবতরণ করলেন। সে মঠের লোক তার কাছে একটা পাত্রে করে প্রথম ফল নিয়ে উপস্থিত হয়ে সেটা তার সামনে রাখল। তার কাছে তখন ওলীদ ইবনু হিশাম ও হুসাইন ইবনু রুস্তম বসা ছিল। ওলীদ ইবনু হিশাম তাকে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, খানা শুরু করুন এবং তাকে এর দ্বিগুণ মূল্য দিন।' হুসাইন ইবনু রুস্তম বলল, 'এটি খেয়ে নিন হে আমিরুল মুমিনিন। কারণ, আপনার চেয়ে যিনি উত্তম তিনিও তা খেয়েছেন।' তিনি উত্তরে বললেন, 'তোমার ধ্বংস হোক হে ইবনু রুস্তম। তখন তো সেটা হাদিয়া ছিল। আর আজকে এটা ঘুষ।' তারপর তিনি তা খেতে অস্বীকার করে ফিরিয়ে দিলেন।”

প্রকাশ্যে পাপাচারের কারণে সবাই শাস্তি পায়
[৪৭৪] ইসমাঈল ইবনু হাকীম উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছেন, “বিশেষ ব্যক্তিদের পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা সাধারণ মানুষদের শাস্তি দেন না। তবে যখন প্রকাশ্যে পাপাচার হতে থাকে তখন তখন সবাই শাস্তিযোগ্য হয়ে যায়।"

তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন
[৪৭৫] হিশাম বলেন, যখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ মারা গেলেন তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “সর্বোত্তম ব্যক্তিটি মারা গেল।”

খলীফা হবার পর বাড়িতে আসতেন না তেমন
[৪৭৬] হিশাম ইবনু হাসসান বলেন, "আবদুল মালিকের কন্যা ফাতিমা রজা ইবনু হায়ওয়া-এর কাছে এই মর্মে সংবাদ পাঠাল যে-আমিরুল মুমিনিন এমন এমন কিছু করছেন, যা ধর্মসম্মত নয় বলেই আমি মনে করি। তিনি জানতে চাইলেন, 'কী সেটা?' তিনি জানালেন, 'তিনি খলীফা হবার পর থেকে (ঠিকঠাক) বাড়িতে আসেন না।' তখন রজা ইবনু হায়ওয়া তার কাছে এসে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি এমন কিছু করছেন, যা ধর্মসম্মত নয় বলেই আমি মনে করি।' এ কথা শুনে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে রজা, কী সেটা?' তিনি বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার পরিবারেরও তো আপনার ওপর কিছু হক রয়েছে।' (এ কথা শুনে) তার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, 'হে রজা, যার ঘাড়ে মুসলিম ও চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদের এমন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, যে বিষয়ে কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেন-তিনি কী করে প্রফুল্ল থাকতে পারেন!"

নিকৃষ্ট মানুষ সম্পর্কে সংবাদ
[৪৭৭] মুহাম্মাদ ইবনু কাব কুরাযি বলেন, “যখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ খলীফা, তখন আমি মদীনাতে ছিলাম। তিনি আমার কাছে সংবাদ পাঠালেন। আমি তার কাছে উপস্থিত হয়ে এমনভাবে আশ্চর্যজনক দৃষ্টি হেনে তাকাচ্ছিলাম যে, দৃষ্টি সরাতে পারছিলাম না। তিনি জানতে চাইলেন, 'হে ইবনু কাব, তুমি এমনভাবে তাকাচ্ছ! আগে তো কখনো এভাবে তোমাকে তাকাতে দেখিনি!' আমি বললাম, 'আশ্চর্য হয়েছি তো তাই।' তিনি জানতে চাইলেন, 'কিসে তোমাকে আশ্চর্যান্বিত করল?' আমি বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার (দেহের) রঙের যে অবস্থা হয়েছে আর শরীর যেভাবে ভেঙে পড়েছে এবং চুল যেভাবে পড়ে গেছে, তা দেখে আশ্চর্য হয়েছি।' তিনি বললেন, 'কেমন হতো যদি তুমি আমাকে কবরে রেখে আসার তিন দিন পর দেখতে এমতাবস্থায় যে, আমার চক্ষুগোলক গলে গণ্ডদেশ বেয়ে পড়ছে আর আমার নাকের ছিদ্র পুঁজ ও কীটে মাখামাখি হয়ে আছে। তখন নিশ্চয়ই আমাকে আরও বীভৎস দেখাত! একটা হাদীস শোনাও, যা আমরা ইবনু আব্বাস থেকে মুখস্থ করেছি।' আমি বললাম, 'ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشْرَفِ الْمَجَالِسِ مَا اسْتُقْبِلَ بِهِ الْقِبْلَةَ وَلَا تُصَلُّوا خَلْفَ نَائِمٍ وَلَا مُتَحَدِّثٍ وَلَا تَشْتَرُوا الْحُرَرَ بِالرِّيَابِ وَاقْتُلُوا الْحَيَّةَ وَالْعَقْرَبَ وَإِنْ كُنْتُمْ فِي صَلَاتِكُمْ، وَمَنْ نَظَرَ فِي كِتَابِ أَخِيهِ بِغَيْرِ إِذْنِهِ فَإِنَّمَا يَنْظُرُ فِي النَّارِ
'সর্বোত্তম মজলিস হলো সেটা, যাতে কেবলার দিকে মুখ করা হয়। তোমরা ঘুমন্ত অথবা আলাপরত ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় কোরো না। (সাধারণ) কাপড়ের বিনিময়ে রেশম ক্রয় কোরো না। সাপ-বিচ্ছুকে হত্যা করো। যদিও সালাতের মধ্যে থাকো। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের লেখার দিকে অনুমতি ছাড়া তাকাল, সে যেন জাহান্নামের দিকেই তাকাল।”[৭০]
তিনি আরও বলেছেন, 'সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ হওয়া যাকে আনন্দিত করে, সে যেন আল্লাহর ওপর ভরসা করে। সবচেয়ে সম্মানিত হওয়া যাকে আনন্দিত করে, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। সবচেয়ে বিত্তশালী হওয়া যাকে আনন্দিত করে, সে যেন আল্লাহ প্রদত্ত রিযককে যথেষ্ট মনে করে।' তারপর তিনি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি কি তোমাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যে একাকী অবতরণ করে, ভাগ্যকে অস্বীকার করে (বিনা কারণে) গোলামকে প্রহার করে।' তারপর তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাদের এর চেয়ে আরও নিকৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যে মানুষকে ঘৃণা করে আর মানুষেরাও তাকে ঘৃণা করে।' তারপর তিনি বললেন, 'আমি কি এর চেয়ে আরও নিকৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যে মানুষের ভুল ক্ষমা করে না, নিজের ভুলের কারণে ক্ষমা চায় না এবং অন্যদের ওজর গ্রহণ করে না।' তারপর তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাদের এর চেয়ে আরও নিকৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যার অকল্যাণের আশঙ্কা করা হয় এবং কল্যাণের আশা করা হয় না। ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালাম বানী ইসরাঈলের মাঝে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—হে বানী ইসরাঈল, মূর্খদের সামনে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বোলো না, তাহলে এটা হিকমতের প্রতি অবিচার হবে। আর যে এর যোগ্য তাকে এর থেকে বঞ্চিত কোরো না, তাহলে তাদের প্রতি জুলুম হবে। কোনো জালেমকে তার জুলুমের কারণে শাস্তি দিয়ো না। তাহলে তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব (অর্জনের মাধ্যম) নষ্ট হয়ে যাবে। বিষয়সমূহ তিন ধরনের হতে পারে। এক. এমন বিষয়, যার সঠিকতা তোমার কাছে সুস্পষ্ট। তুমি এর অনুগামী হও। দুই. এমন বিষয়, যার ভ্রষ্টতা তোমার কাছে পরিষ্কার। তুমি এর থেকে দূরে থাকো। তিন. এমন বিষয়, যা নিয়ে মতানৈক্য আছে, তা তুমি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করো।”

কথা ও আমলের অন্তর্গত
[৪৭৮] আলি ইবনু যায়দ জুদআনি থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করবে সে অল্পতে তুষ্ট থাকবে। আর যে ব্যক্তি জানবে যে তার কথা বলাটাও আমলের অন্তর্গত, সে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে (কথা বলা থেকে) বিরত থাকবে।”

কর্মকর্তার কাছে লিখিত পত্র
[৪৭৯] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ তার কোনো এক কর্মকর্তার কাছে এই মর্মে লিখে পাঠালেন—আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহের অনুসরণ করবে। পরবর্তীকালে বিদআতীরা যেসব বিদআত আবিষ্কার করেছে, (সুন্নাহর পরিবর্তে) সেগুলো পরিহার করবে। জেনে রাখো, কোনো মানুষ যখন কোনো বিদআত চালু করে তখন এর বিপক্ষে অবশ্যই কোনো-না-কোনো দলিল থাকে। সুতরাং সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা তোমাদের কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ চাহে তো তা তোমার রক্ষাকবচ হবে। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি এমন রীতিনীতি চালু করল যার বিপরীতে থাকা ভুল, স্খলন, গভীরতা, নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে সে অবগত; তবে (শুনে রাখো) পূর্ববর্তীরা এমন জ্ঞান থেকে বিরত থেকেছেন, ছিদ্রান্বেষী দৃষ্টি দেওয়া থেকে বেঁচে রয়েছেন। যদি তারা আলোচনা করতে চাইতেন তবে এই বিষয়ে তাদের অধিক সক্ষমতা ছিল।”

তিনটি উপদেশ
[৪৮০] ইবনুল আইযার বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ শামে মাটির তৈরি মিম্বরে দাঁড়িয়ে আমাদের সম্মুখে খুতবা দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তার স্তুতি গাইলেন। তারপর তিনটি কথা বললেন :
এক. হে লোকসকল, তোমরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সংশোধন করো, তাহলে তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়গুলো সংশোধন হয়ে যাবে।
দুই. পরকালের জন্য আমল করো, দুনিয়া তোমাদের জন্য যথেষ্ট হবে।
তিন. জেনে রাখো, একজন ব্যক্তি—যার ও আদম আলাইহিস সালাম-এর মাঝে কোনো পিতা নেই—মৃত্যু তার জন্য ঘাম বের হওয়ার মতো (কষ্টকর)।”

ফরজ আদায় করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা
[৪৮১] আলি ইবনু আবূ যায়েদা বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ খুনাসিরা নামক স্থানে আমাদের সম্মুখে খুতবা দিতে গিয়ে বলেছিলেন—জেনে রাখো, ইবাদাত হলো ফরজগুলো আদায় করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।”

বর্মের মাধ্যমে শাফাআতের আশা করা
[৪৮২] শুবা ইবনু যিয়াদাহ আল-উমাবি বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে আবদুল্লাহ ইবনু হাসানের একটি বর্ম ধরে ইশারা করে বলতে দেখেছি—আমি কিয়ামতের দিন এর মাধ্যমে শাফাআতের আশা করি।”

পাদরির ভবিষ্যদ্বাণী
[৪৮৩] ওলীদ ইবনু হিশাম বলেন, “আমরা অমুক অমুক জায়গায় অবতরণ করলাম। তখন এক ব্যক্তি বলল, 'আপনি কি শুনছেন না, এই পাদরি কী বলছে? সে বলছে, আমিরুল মুমিনিন সুলাইমান মৃত্যুবরণ করেছেন।' তিনি বললেন, 'তার পরে কে খলীফা হয়েছেন?' সে জানাল, 'উমার ইবনু আবদুল আযীয।' তারপর যখন আমরা শামে এলাম দেখলাম তার কথাই ঠিক হয়েছে। চতুর্থ বছরে আমরা আবার সেই জায়গায় অবতরণ করলাম। তখন সেই ব্যক্তি পাদরির কাছে এসে বলল, 'হে পাদরি, আপনি যেমনটা বলেছেন আমরা তেমনটাই দেখতে পেয়েছি।' সে বলল, 'আল্লাহর শপথ, উমারকে বিষ পান করানো হয়েছে।' আমি উমারের কাছে ফিরে এসে তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, যদি তুমি চাও তবে তোমাকে আমি ঠিক সে সময়ের কথা জানাতে পারব, যখন আমাকে বিষ পান করানো হয়েছে।' আমি বললাম, 'আপনি কি এর প্রতিকার করবেন না?' তিনি বললেন, 'চিকিৎসার জন্য কান ঘষাও আমার অপছন্দ।'

আল্লাহর পছন্দের বিরোধিতা না করা
[৪৮৪] রজা ইবনু আবূ সালামাহ বলেন, “যখন উমার ইবনু আবদুল আযীযের ছেলে আবদুল মালিক মারা গেলেন, তখন তিনি বিভিন্ন শহরে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যাতে তার জন্য বিলাপ করা না হয়। তিনি আরও লেখেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাকে মৃত্যু দিতে পছন্দ করেছেন। আর আমি তার পছন্দের বিরোধিতা করা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।”

দুজন শাসনকর্তাকে ধমক দেওয়া
[৪৮৫] ইবনু শাওযাব বলেন, “সালেহ ইবনু আবদুর রহমান এবং তার একজন সঙ্গীকে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ ইরাকের কিছু জায়গার শাসনকার্যের দায়িত্ব দিলেন। তখন তারা উমারের কাছে এই মর্মে পত্র লিখল যে, মানুষদের কেবল তরবারিই সংশোধন করতে পারে। তিনি তখন তাদের কাছে ফিরতি পত্রে লেখলেন, তোমরা দুজন নিকৃষ্ট ও অপদার্থ। আমার কাছে মুসলিমদের রক্তকে উপেক্ষা করার কথা বলছ! মানুষদের মধ্যে তোমাদের দুজনের রক্তই আমার কাছে বেশি গুরুত্বহীন।”

তার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দেওয়ার দুআ
[৪৮৬] আবদুল কারীম বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, ‘আল্লাহ আপনাকে ইসলামের পক্ষে উত্তম প্রতিদান দিন।’ তিনি বললেন, ‘বরং আল্লাহ ইসলামকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দিন।”

নেককারদের সাথে মৃত্যুবরণ করার আকাঙ্ক্ষা
[৪৮৭] তালহা ইবনু ইয়াহইয়া বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বসা ছিলাম। তখন তার নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, যত দিন আপনার বেঁচে থাকা কল্যাণকর হয় তত দিন আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন।’ তিনি বললেন, ‘এমনটা আগেও বলা হয়েছে। তুমি বরং বলো, আল্লাহ আপনাকে উত্তম হায়াত দান করুন এবং নেককারদের সাথে মৃত্যু দিন।”

মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ না হওয়ার ইচ্ছা
[৪৮৮] আওযায়ি থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমার জন্য মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ হোক তা আমি চাই না। কারণ, এটিই সর্বশেষ বস্তু, যার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির পাপমোচন করা হয়।”

জুমুআর দিন গোসল করা
[৪৮৯] আওযায়ি থেকে বর্ণিত, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ জুমুআর দিন তার স্ত্রী ও কন্যাদের গোসল করার আদেশ করতেন।”

ইবলীস শয়তানকে অভিসম্পাত
[৪৯০] মুসআব ইবনু আবী আইয়ুব বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে মিম্বরের ওপর বলতে শুনেছি—আল্লাহ যদি চাইতেন তার অবাধ্যতা না হোক, তবে তিনি ইবলীস শয়তানকে সৃষ্টি করতেন না। আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করুন।"

নিজেই চেরাগে তেল ভরলেন
[৪৯১] আবদুল আযীয ইবনু উমার বলেন, “আমাকে রজা ইবনু হায়ওয়া বললেন, 'তোমার পিতার থেকে বেশি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অধিকারী কাউকে আমি দেখিনি। আমি একবার রাতে তার কাছে ছিলাম। চেরাগ নিভে গেলে তিনি আমাকে বললেন, 'রজা, চেরাগ তো নিভে গেল। ভৃত্য পাশেই ঘুমিয়ে আছে।' আমি বললাম, 'তাকে কি ডাক দেবো?' তিনি বললেন, 'সে তো ঘুমিয়ে গেছে।' আমি বললাম, 'আমি উঠে গিয়ে তা ঠিক করে আনি?' তিনি বললেন, 'মেহমানকে কাজে লাগানো ব্যক্তিত্বের কাতারে পড়ে না।' তারপর তিনি মাথায় পাগড়ি পরে চেরাগের কাছে গিয়ে সলতা বের করলেন এবং বোতল খুলে তার থেকে চেরাগে (তেল) ঢাললেন। তারপর ফিরে এসে বললেন, 'যখন উঠেছিলাম তখনো আমি যেমন উমার ইবনু আবদুল আযীয ছিলাম আর এখন ফিরে আসার পরও আমি উমার ইবনু আবদুল আযীযই রয়ে গেছি।”

তার দৈনিক খরচ ছিল মাত্র দুই দিরহাম
[৪৯২] আমর ইবনু মুহাজির বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর দৈনিক খরচ ছিল মাত্র দুই দিরহাম।”

কথাকে আমলের অন্তর্ভুক্ত মনে করা
[৪৯৩] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার কথাকে আমলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না, তার পাপ বৃদ্ধি পায়।”

সারা রাত কান্নাকাটি করা
[৪৯৪] মুগীরা ইবনু হাকীম বলেন, “আবদুল মালিকের কন্যা ও উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী ফাতেমা বলল, 'হে মুগীরা, আমি জানি মানুষের মাঝে এমন লোক থাকতে পারে, যে উমারের থেকে বেশি সালাত আদায় করে ও সিয়াম পালন করে। তবে উমারের চেয়ে বেশি এমন কাউকে আমি দেখিনি, যে আল্লাহকে প্রচন্ড ভয় করে। কারণ, আমি দেখেছি, তিনি যখনই ঈশার সালাত আদায় করতেন, তখন সাজদার জায়গাতেই অবস্থান করে দুআ করতেন এবং কান্নাকাটি করতেন। অবশেষে একসময় তার চোখ লেগে আসত। তারপর যখন আবার জাগ্রত হতেন তখন দুআ ও কান্নাকাটিতে লিপ্ত হতেন যতক্ষণ না চোখ লেগে আসে। সকাল হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই করতে থাকতেন।”

খরচের টাকা থেকে দান করা
[৪৯৫] জিয়াদ ইবনু আবী জিয়াদ বলেন, “ইবনু আইয়াশ ইবনু আবী রবিআ আমাকে উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে কিছু প্রয়োজনে পাঠালেন। আমি তার কাছে এলাম। তখন তার কাছে একজন লেখক লিখছিলেন। তাকে বললাম, 'আসসালামু আলাইকুম।' তিনি বললেন, 'ওয়ালাইকুমুস সালাম।' তারপর আমি থেমে আবার বললাম, 'আসসালামু আলাইকা ইয়া আমিরুল মুমিনিন।' তিনি বললেন, 'হে ইবনু জিয়াদ, তুমি প্রথমবার যেটা বলেছ সেটা আমরা অপছন্দ করিনি।' লেখক তাকে বসরা থেকে আগত কিছু অনাচারের অভিযোগ পড়ে শোনাচ্ছিল। তিনি আমাকে বললেন, 'বসো।' আমি দরজার চৌকাঠের ওপর বসলাম। লেখক তাকে পড়ে পড়ে শোনাচ্ছিলেন আর তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিলেন। ফারেগ হওয়ার পর ঘরে যারা ছিল সবাইকে তিনি বের করে দিলেন। এমনকি ঘরে যে পরিচারক ছিল তাকেও বের করে দিলেন। তারপর আমার দিকে হেঁটে এসে আমার সামনে বসলেন এবং দুই হাত আমার হাঁটুর ওপর রেখে বললেন, 'হে ইবনু আবী জিয়াদ, তুমি কি তোমার এই মোটা পোশাক দিয়ে উষ্ণতা গ্রহণ করছ? এবং আমরা যে অবস্থায় আছি তা থেকে আরাম নিচ্ছ?' তখন আমার গায়ে একটি মোটা পশমের পোশাক ছিল। তারপর তিনি আমাকে মদীনার ভালো নারী- পুরুষদের খোঁজখবর জিজ্ঞাসা করলেন। তাদের কারও কথাই তিনি বাদ দিলেন না, সবার কথাই জানতে চাইলেন। এমন কিছু বিষয় সম্পর্কেও জানতে চাইলেন, মদীনাতে যার ব্যাপারে তিনি নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। আমি তাকে সেই বিষয়ে অবগত করালাম। তারপর তিনি বললেন, 'হে ইবনু আবী জিয়াদ, দেখছ না আমি কেমন অবস্থায় নিপতিত হয়েছি?' আমি বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমি আপনার জন্য কল্যাণের আশা রাখি।' তিনি বললেন, 'তা কতই-না সুদূরপরাহত!' তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। আমি তাকে বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি এমন কিছু করছেন যে, আমি আপনার জন্য কল্যাণের প্রত্যাশা রাখি।' তিনি বললেন, 'কতই-না সুদূরপরাহত! আমি বকাঝকা করি কিন্তু আমাকে তো বকাঝকা করা হয় না। আমি মারধর করি কিন্তু আমাকে তো মারধর করা হয় না। আমি কষ্ট দিই কিন্তু আমাকে কষ্ট দেওয়া হয় না।' তারপর তিনি আবার কাঁদলেন। আমি উঠে গেলাম। তিনি নিজের প্রয়োজন সারলেন এবং আমার মনিবের কাছে পত্র লেখলেন তার থেকে আমাকে কিনে নেওয়ার জন্য। তারপর বিছানার নিচ থেকে বিশ স্বর্ণমুদ্রা বের করে বললেন, 'এগুলো দিয়ে (নিজেকে মুক্ত করার ব্যাপারে) সাহায্য নাও। কারণ, যদি ফাইয়ের মালের ক্ষেত্রে তোমার হক থাকত তবে আমি তোমাকে তা দিতাম। কিন্তু তুমি তো দাস।' আমি তা নিতে অস্বীকার করলাম। তিনি বললেন, 'এগুলো আমার খরচের টাকা থেকে।' আমি তা গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি আমার পিছু ছাড়লেন না। তারপর আমার মনিবের কাছে তার থেকে আমাকে কিনে নেওয়ার জন্য পত্র লিখলেন। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। আমাকে এমনিতেই মুক্ত করে দিলেন।"

শান্তির জন্য দুআ
[৪৯৬] আইয়াশ ইবনু উকবা বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বেশি বেশি এটা বলতেন—হে আল্লাহ, শান্তি দাও শান্তি দাও।”

সর্দার নিজেকে নিয়ে বড়াই করে না
[৪৯৭] মালিক থেকে বর্ণিত, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কওমের সর্দার কে?’ সে বলল, ‘আমি।’ তিনি বললেন, ‘যদি তুমি তেমন হতে তবে তা এভাবে বলতে না।”

রাগের মুহূর্তে শাস্তি স্থগিত করা
[৪৯৮] ইবরাহীম ইবনু আবী আবলাহ বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ একবার এক ব্যক্তির ওপর প্রচণ্ড রাগ করলেন। তিনি তার কাছে সংবাদ পাঠালেন। সে এলে তাকে জামা খুলে রশি দিয়ে বাঁধলেন। তারপর একটা চাবুক চেয়ে নিলেন। অবশেষে যখন আমরা বলাবলি শুরু করলাম, তিনি এখনই তাকে প্রহার করবেন তখন তিনি বললেন, ‘তাকে মুক্ত করে দাও। যদি তার অপকর্মের কারণে আমি রাগান্বিত না হতাম তবে কি আর তাকে আনা হতো!’ তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন :
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা ক্রোধদমনকারী ও মানুষকে ক্ষমাকারী। এবং আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’”[৭১]

কড়াকড়ির আগে মানুষকে সংশোধন করা
[৪৯৯] মায়মুন ইবনু মিহরান থেকে বর্ণিত, “আবদুল আযীযের পুত্র আবদুল মালিক তাকে বললেন, ‘বাবা, আপনি যে ন্যায়-ইনসাফের ইচ্ছা করেন তা বাস্তবায়নে কিসে আপনাকে বাধা দেয়? আল্লাহর কসম, আমি কোনো ভ্রুক্ষেপ করতাম না। যদিও এই কারণে আপনাকে ও আমাকে নিয়ে (কিছু লোকের ক্রোধের) ডেগ টগবগ করত।’ তিনি বললেন, ‘হে আমার আদরের সন্তান, আমি মানুষের জন্য কষ্টের বাগান তৈরি করছি। আমি ন্যায়-পরিপন্থী কোনো আদেশ জারি করতে চাই না। তবে আমি তাদের দুনিয়ার প্রতি লোভী হওয়া থেকে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত এটাকে বিলম্বিত করছি। নয়তো এটাকে তারা ঘৃণা করবে ও এভাবেই জীবন কাটাবে।”

এক পরিবারের তিনজন উত্তম ব্যক্তি
[৫০০] মায়মুন ইবনু মিহরان বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয, তার ছেলে আবদুল মালিক এবং তার আযাদকৃত গোলাম মুযাহিম থেকে উত্তম এক পরিবারের তিনজনকে দেখিনি।"

নিজ সন্তানকে কবরস্থ করার পর প্রার্থনা
[৫০১] ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম ইবনু জিয়াদ ইবনু আবী হাসসান থেকে বর্ণিত, “তিনি উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে উপস্থিত ছিলেন, যখন তিনি তার ছেলে আবদুল মালিককে দাফন করেছেন। তিনি তাকে কবরস্থ করে তার ওপর মাটি দিয়ে সমান করে দিলেন। লোকেরাও জমিনের সাথে তার কবরকে সমান করে দিলো এবং যাইতুন গাছের দুইটি কাষ্ঠখণ্ড তার কাছে রাখল। একটা মাথার কাছে, অপরটা দুই পায়ের কাছে। তারপর তার কবরকে নিজের ও কেবলার মাঝে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। লোকেরাও তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তিনি বললেন, 'হে আমার পুত্র, আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। তুমি তোমার পিতার প্রতি সদাচারী ছিলে। আল্লাহর কসম, তিনি তোমাকে উপহারস্বরূপ দান করার পর আমি তোমার প্রতি সব সময়ই খুশি ছিলাম। আল্লাহর কসম, আমি কখনো তোমার প্রতি কঠোর ছিলাম না। আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। তিনি তোমার পাপরাশি ক্ষমা করুন। তোমার কর্মের উত্তম প্রতিফল দান করুন। প্রত্যেক উপস্থিত ও অনুপস্থিত যারাই তোমার জন্য কল্যাণের সুপারিশ করবে তাদের প্রতিও আল্লাহ রহম করুন। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি আমরা সন্তুষ্ট। তার সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে নিয়েছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার।' তারপর তিনি প্রস্থান করলেন।”

অহংকারের আশঙ্কায় বহু কথা পরিহার করা
[৫০২] হুমাইদ থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয বলেছেন, "আমি জাঁকজমক ও অহংকারের আশঙ্কায় বহু কথা পরিহার করেছি।”

পুত্রের প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকা
[৫০৩] যমরা বর্ণনা করেন, "আবদুল মালিক ইবনু উমার ইবনু আবদুল আযীয মারা গেলে হাফস ইবনু উমার তার প্রশংসা করে যা বলার বললেন। তখন মাসলামা তাকে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনিও কিছু বলুন।' তিনি বললেন, 'না, আমি বলব না।' মাসলামা জানতে চাইলেন, 'কেন আপনি তার প্রশংসা করতে চাচ্ছেন না?' তিনি বললেন, 'আমার আশঙ্কা হয় যে, পিতার চোখে পুত্রের সব ভালো লাগার বিষয়টি আমার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।”

তার থেকে শিখে আসা
[৫০৪] মুজাহিদ বলেন, “আমরা তাকে শেখাতে গিয়ে নিজেরাই তার থেকে শিখে আসলাম।” অর্থাৎ উমার ইবনু আবদুল আযীযের কথা বললেন তিনি।

খলীফা হবার পর সব ধরনের বিলাসিতা পরিহার
[৫০৫] রজা ইবনু হায়ওয়া বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি ব্যবহারকারী, সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধানকারী ও সবচেয়ে সুন্দর চলনের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু খলীফা হবার পর লোকেরা তার পোশাককে মাত্র বারো দিরহাম মূল্য নির্ধারণ করল, যা ছিল মিসরি। সেগুলো হলো : টুপি, পাগড়ি, জামা, আলখিল্লা, মোজা এবং চাদর।”

দিরহামের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল না
[৫০৬] হুমাইদ থেকে বর্ণিত, “যখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ খলীফা হলেন তখন কেঁদেছেন এবং বলেছেন, ‘হে আবূ কিলাবা, তুমি কি আমার ব্যাপারে আশঙ্কা করো?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘দিরহামের প্রতি আপনার ভালোবাসা কেমন?’ তিনি বললেন, ‘আমি তা ভালোবাসি না।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তো ভয়ের কিছুই নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে সাহায্য করবেন।’”

ইলম ছাড়া আমল করার পরিণতি
[৫০৭] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া আমল করে, সে সংশোধনের চেয়ে বিনষ্ট বেশি করে।”

সালেম ইবনু উমারের কাছে প্রেরণ করা পত্র
[৫০৮] জাফর ইবনু বুরকান বলেছেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ সালেম ইবনু উমারের কাছে পত্র লিখেলেন—পরসমাচার হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমাকে এই কাজের (খেলাফতের দায়িত্ব) মাধ্যমে যে পরীক্ষায় ফেলার, সে পরীক্ষায় ফেলেছেন, কোনোরূপ পরামর্শ বা আবেদন করা ছাড়াই। কিন্তু আল্লাহ যা চূড়ান্ত করেন, তা-ই হয়। সুতরাং যে আল্লাহ আমাকে এই পরীক্ষায় ফেললেন তার কাছে আমি প্রার্থনা করছি, যেন তিনি আমাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করেন। তোমার কাছে আমার এই পত্র পৌঁছলে তুমি উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চিঠিপত্র, সিদ্ধান্তাবলি এবং মুসলিম রাষ্ট্রের চুক্তিবদ্ধ ও যিম্মি নাগরিকদের ব্যাপারে তার কর্মপন্থা আমার কাছে প্রেরণ করবে। কারণ, আমি তার পদাঙ্ক অনুসরণ করব ও তার দেখানো পথে চলব। যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে সাহায্য করেন। ওয়াসসালাম।
তখন সালেম তার কাছে লেখলেন—আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। আপনি বলেছেন, কোনো পরামর্শ বা আপনার পক্ষ থেকে কোনো আবেদন ব্যতিরেকে আল্লাহ আপনাকে এই কাজে (শাসনভারের) যে পরীক্ষায় ফেলার, সে পরীক্ষায় ফেলেছেন। আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা-ই হয়েছে। সুতরাং যে আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন তার কাছে আমি প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করেন। কারণ, আপনি উমারের যুগে নন। আর আপনার কাছে উমারের ব্যক্তিবর্গও (যারা তাকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিত) নেই। সুতরাং যদি আপনি হকের অভিলাষী হন, তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সাহায্য করবেন। আপনার জন্য বিভিন্ন কর্মচারীর ব্যবস্থা করে দেবেন। এবং তাদের মাধ্যমে এমন বিষয় দান করবেন, যা আপনার কল্পনাতেও ছিল না। কারণ, আল্লাহর সাহায্য নিয়ত অনুসারে হয়ে থাকে। কল্যাণের কাজে যার নিয়ত পরিপূর্ণ হয়ে থাকে, সে আল্লাহর পরিপূর্ণ সাহায্য পেয়ে থাকে। আর যার নিয়ত অপূর্ণাঙ্গ থাকে তার অপূর্ণাঙ্গতা অনুপাতে সাহায্যেও হ্রাস ঘটে। ওয়াসসালাম।”

দ্বীনকে ঝগড়া-বিবাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষতি
[৫০৯] ইউনুস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ঝগড়া-বিবাদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তার (দ্বীন থেকে) সরে যাওয়ার (আশঙ্কা) বৃদ্ধি পায়।”

তার মৃত্যুতে আকাশও কেঁদেছে
[৫১০] খালেদ রবঈ বলেন, “তাওরাত বা অন্য কোনো কিতাবে আছে, আকাশ চল্লিশ বছর উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর জন্য দুঃখের কাঁদা কেঁদেছে।”

টিকাঃ
[৬৪] সনদ সহীহ : আল-আদাবুল মুফরাদ : ৩৯৭; মুসনাদ আহমাদ : ২৩০৮
[৬৫] সনদ সহীহ : আবূ দাউদ : ১৫২৫; ইবনু মাজাহ : ৩৮৮২
[৬৬] সনদ যঈফ। যঈফুল জামি: ২৩৮১
[৬৭] অর্থাৎ, তুমি যা শ্রবণ করেছো সে অনুযায়ী আমল করো। এমন যেন না হয় যে, তুমি শুনলে কিন্তু আমল করলে না। ফলে অন্যরা তা আমল করার মাধ্যমে তোমার থেকে বেশি সৌভাগ্যবান হয়ে গেলো। -অনুবাদক
[৬৮] সূরা আল ইমরান, ০৩: ৭
[৬৯] কারণ তিনি বলেছেন, "আমার জন্য মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ হোক তা আমি চাই না। কারণ, এটিই সর্বশেষ বস্তু, যার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির পাপমোচন করা হয়।" (হাদীস: ৪৮৮)
[৭০] সনদ যঈফ। 'সর্বোত্তম মজলিস হলো সেটা, যাতে কেবলার দিকে মুখ করা হয়'-এই অংশটুকু তাবারানির, এতে একজন মাতরূক রাবী আছেন। (আল-মাজমা: ৮/৫৯) 'তোমরা ঘুমন্ত অথবা আলাপরত ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় কোরো না।' এই অংশটুকু বর্ণিত আছে যেসব গ্রন্থে তার কয়েকটি হলো, আবূ দাউদ: ৬৯৪, সহীহুল জামি: ৭৩৪৯; ইরওয়াউল গলীল: ৩৭৫
[৭১] সূরা আল ইমরান, ৩ : ১৩৪

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


এক সময় মানুষ কুরআন বিমুখ হয়ে যাবে
[৫১১] জাফর থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষের অন্তর কুরআন থেকে বিমুখ হয়ে যাবে। তারা কুরআনের মিষ্টতা ও স্বাদ পাবে না। তারা তাদের প্রতি আদিষ্ট বিষয়ে অলসতা প্রদর্শন করার সময় বলবে—নিশ্চয়ই আল্লাহ অসীম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। আর নিষিদ্ধ কাজ করার সময় বলবে—আমরা তো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করিনি। তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। তাদের ব্যাপারটা পুরোই লোকদেখানো। সেখানে সত্যের লেশমাত্র নেই। তারা নেকড়ে-অন্তরের ওপর বকরির চামড়া চড়িয়ে থাকে। (অর্থাৎ প্রকৃত সত্যকে ঢেকে রাখে। প্রকাশ হতে দেয় না।) তাদের মধ্যে তোষামোদকারী ব্যক্তিকে দ্বীনদারিতে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ (মনে করা হবে)।"

বাড়তি আয়োজন করতে তিনি নিষেধ করলেন
[৫১২] শুআইব ইবনু হাজ্জাব বলেন, “একদিন আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ আমাদের ঘরে আমাদের কাছে আসলেন। তখন আমরা কিছুটা বাড়তি আয়োজন করতে চাইলে তিনি বললেন, 'আমাকে ঘরে থাকা খাবারই দাও। বাড়তি আয়োজন কোরো না।”

সাওম পালনকারী ব্যক্তি ইবাদাতের ভেতর থাকে
[৫১৩] হিশাব ইবনু হাফসা থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সাওম পালনকারী ব্যক্তি ইবাদাতের ভেতর থাকে, যতক্ষণ না সে গীবতে লিপ্ত হয়। যদিও সে আপন বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে।”

ঘরের লোকেরাই ঘরের অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত
[৫১৪] শুআইব থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি কোনো কওমের কাছে যাবার পর যখন তারা তোমার দিকে কিছু এগিয়ে দেয়, তখন ঠিক সেখানেই বসো যেখানে তোমার জন্য বালিশ বিছানো হয়েছে। কারণ, ঘরের লোকেরাই তাদের ঘরের অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত।”

ইবাদাতে মগ্ন থাকার নাসীহাত
[৫১৫] রবী থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইবাদাতে মগ্ন থাকো এবং যে ইবাদাতে মগ্ন থাকে, তাকে ভালোবাসো। আর পাপাচার থেকে দূরে থাকো এবং যে পাপাচারে লিপ্ত হয়, তার বিরুদ্ধাচরণ করো। আল্লাহ যদি চান তবে পাপীদের শাস্তি দেবেন। অথবা চাইলে তিনি তাদের ক্ষমাও করে দিতে পারেন।”

কুরআন শিখে তা তিলাওয়াত না করা অপরাধ
[৫১৬] আবূ খালদাহ আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “আমরা যে পাপকে সবচেয়ে মারাত্মক মনে করতাম তা হলো, কোনো ব্যক্তির কুরআন শিখে তা তিলাওয়াত না করে ঘুমিয়ে থাকা।”
[৫১৭] খালিদ ইবনু দীনার বলেন, “আমি আবুল আলিয়াকে বলতে শুনেছি— কুরআন শিক্ষা করে তা তিলাওয়াত না ঘুমিয়ে থাকা এবং একপর্যায়ে তা ভুলে যাওয়াকে আমরা সবচেয়ে জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য করতাম।”

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আবু কিলাবা রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আবু কিলাবা রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


কিয়ামাতের দিন মুনাফিকরা মাথা নিচু করে রাখবে
[৫১৮] আবূ কিলাবা বলেন, “আরশের দিক থেকে কিয়ামাতের দিন একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
'মনে রেখো যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোনো ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে।[৭২]
তখন প্রত্যেকেই মাথা তুলে বলবে :
الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
'যারা ঈমান এনেছিল এবং তাকওয়া অবলম্বন করত।[৭৩]
তখন মুনাফিক যারা তারা মাথা নিচু করে ফেলবে।”

বেশি হাদীস বর্ণনা করা
[৫১৯] আমর ইবনু মাইমুন বলেন, “আবূ কিলাবা একবার উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এলে তিনি তাকে বললেন, 'হে আবূ কিলাবা, বর্ণনা করো।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি বেশি হাদীস (বর্ণনা করা) অপছন্দ করি আবার বেশি চুপ থাকাও অপছন্দ করি।'”

হাদীস না জানলে তা বর্ণনা না করা
[৫২০] আইয়ুব থেকে বর্ণিত, আবূ কিলাবা বলেন, “যে ব্যক্তি হাদীস জানে না, সে যেন তা বর্ণনা না করে। এটি তার ক্ষতির কারণ হবে। তাকে উপকৃত করবে না।”

মৃতের সামনে চুপচাপ থাকা
[৫২১] আইয়ুব বলেন, “আমি আবূ কিলাবার সাথে এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। আমরা একজন কিচ্ছাকারের আওয়াজ শুনতে পেলাম। তার সঙ্গীদের আওয়াজও উঁচু ছিল। তখন আবূ কিলাবা বললেন, যদি তারা চুপচাপ থাকার মাধ্যমে মৃতকে সম্মান জানাত (তাহলে কতই-না ভালো হতো)।”

টিকাঃ
[৭২] সূরা ইউনুস, ১০: ৬২
[৭৩] সূরা ইউনুস, ১০: ৬৩

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 বাকর ইবনু আবদুল্লাহ মুযানি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 বাকর ইবনু আবদুল্লাহ মুযানি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


বান্দা ও আল্লাহর মাঝে কোনো দোভাষীর প্রয়োজন পড়ে না
[৫২২] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ মুযানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমার মতো কে আছে হে বানী আদম? তোমার মাঝে আর পানি ও মিহরাবের মাঝে কোনো প্রতিবন্ধকতা রাখা হয়নি। যখন ইচ্ছা তুমি আল্লাহর কাছে যেতে পারো। তোমার ও তার মাঝে কোনো দোভাষীর প্রয়োজন পড়ে না।”

অশ্লীলতা
[৫২৩] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "অশ্লীলতা হলো এক ধরনের আবর্জনা। আর এমন আবর্জনা জাহান্নামে যাবে। লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্তর্গত। আর ঈমান (যে গ্রহণ করবে সে) জান্নাতে যাবে।”

লোভ ও ক্রোধ থেকে মুক্ত হওয়া
[৫২৪] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ মুযানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কেউ ততক্ষণ মুত্তাকী হতে পারবে না, যতক্ষণ না লোভমুক্ত ও ক্রোধমুক্ত হবে।”

আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে তিক্ত বিষয়ের সম্মুখীন করান
[৫২৫] হুমাইদ থেকে বর্ণিত, বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে তিক্ত বিষয়ের সম্মুখীন করান, যাতে করে তিনি তার পরিণতিকে শুভ করতে পারেন। তোমরা কি দেখো না সেই মহিলাকে—যে তার সন্তানকে তিক্ত জিনিস পান করায় তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য।"

প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথা না বলা
[৫২৬] মুআররিক ইজলি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার কাছে কখনো যাকাতের সম্পদ পাওয়া যায়নি। আমি বিশ বছর যাবৎ আল্লাহ তাআলার কাছে একটি প্রয়োজনের প্রার্থনা করেছি, তিনি আমাকে তা দেননি। তবুও আমি সেই ব্যাপারে নিরাশ হইনি।” লোকেরা জানতে চাইল, “কী সেটা?” তিনি বললেন, “তার কাছে প্রার্থনা করেছি যাতে করে (আমাকে এমন তাওফীক দেন যে) আমি প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথা না বলি।”

আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করার আবেদন
[৫২৭] আবদুর রহমান ইবনু জিয়াদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি তার প্রতিবেশী বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে অভিযোগ জানিয়ে পত্র লিখলেন যে—আপনি আমার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করুন। তখন বাকর রাহিমাহুল্লাহ তার কাছে জবাব লিখলেন—আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। আপনি আল্লাহর দরবারে আপনার জন্য প্রার্থনা করার আবেদন জানিয়েছেন। একজন বান্দার অবস্থা হলো সে যদি এমন কোনো গুনাহ করে ফেলে যা করতে সে বাধ্য ছিল না এবং সে মৃত্যুকেও ভয় করে, তবে তার কর্তব্য হলো এর জন্য ভীত হওয়া। আমি আপনার জন্য দুআ করব। তবে আমি এই আশা করি না যে, আমার আমলের জোরে বা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার কারণে সেই দুআ কবুল করা হবে।”

আরাফার দিন ক্রন্দন করা
[৫২৮] মুআবিয়া ইবনু আবদুল কারীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-কে আরাফার দিন আসরের পর ধীরে ধীরে ঘটনা বর্ণনা করতে দেখলাম। তিনি কাঁদছিলেন আর কাঁদছিলেন। তার আওয়াজ ঠিকমতো শোনা যাচ্ছিল না।

আল্লাহর ইবাদাতে শক্তি ব্যয় করা
[৫২৯] আবূ খায়রাহ বলেন, “আমি বাকর ইবনু আবদুল্লাহর সাথে দেখা করার জন্য তার কাছে আসলাম। তার সাথে দেখা হলো। তিনি তার প্রয়োজনে উঠে দাঁড়ালেন। আমরা ঘরেই বসে থাকলাম। (কিছুক্ষণ পর) তিনি দুই ব্যক্তির মধ্যখানে নাসীহাত করতে করতে এলেন। এসে সালাম দিলেন এবং আমাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা এমন বান্দাকে রহম করুন, যাকে শক্তিমত্তা দেওয়ার কারণে সে তার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাত করে। অথবা দুর্বলতার কারণে সে অক্ষমতায় আক্রান্ত হয়েছে, ফলে হারাম কাজসমূহ থেকে বেঁচে থাকে।”

ইস্তিগফার পাপকে গোপন রাখে
[৫৩০] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, “তোমরা যখন অধিক পরিমাণে পাপ করো তখন অধিক পরিমাণে ইস্তিগফারও করো। কেননা, মানুষ যখন একটি পাপ করে অতঃপর ইস্তিগফার করে, তখন সেটা গোপন থাকে।”

একজন বাদশাহর ঘটনা
[৫৩১] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ মুযানি বলেন, “অতীত যামানায় একজন বাদশাহ ছিল। সে ছিল আল্লাহর অবাধ্য। মুসলিমরা তার সাথে যুদ্ধ করে অক্ষত অবস্থায় তাকে বন্দী করল। তারপর কোন পদ্ধতিতে তাকে হত্যা করা হবে, এটা নিয়ে তারা আলোচনা করে মতৈক্যে পৌঁছল যে, তার জন্য বড় একটি পাত্র বানিয়ে তার নিচে আগুন প্রজ্বলিত করবে এবং কঠিন শাস্তির স্বাদ আস্বাদন না করিয়ে তারা তাকে হত্যা করবে না। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা তা-ই করল। অতঃপর সে ব্যক্তি একে একে তার প্রভুদের ডাকতে লাগল এই বলে—হে অমুক, আমি তোমার ইবাদাত করেছি, তোমার জন্য সালাত আদায় করেছি এবং তোমার চেহারা মুছে দিয়েছি। সুতরাং তুমি আমাকে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করো। যখন সে দেখল এতে কোনো কাজ হচ্ছে না, তখন সে আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করে বলল, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ—আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই’। এবং সে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর কাছে দুআ করল। তখন আল্লাহ তার জন্য আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। ফলে আগুন নিভে গেল। অতঃপর প্রবল বাতাস এসে সেই পাত্রটি উড়িয়ে নিয়ে গেল এবং আকাশ-জমিনের মধ্যস্থলে তা ঘুরপাক খেতে লাগল। সে ব্যক্তি বলতে থাকল—লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তারপর আল্লাহ তাআলা তাকে এমন লোকদের কাছে নিয়ে ফেললেন যারা তার ইবাদাত করত না। ওই অবস্থাতেও সে বলছিল—লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। লোকেরা তাকে বাইরে বের করে এনে বলল, 'তোমার ধ্বংস হোক, কে তুমি?' সে বলল, 'আমি অমুক গোত্রের বাদশাহ।' তারপর তাদের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলল। (এসব শুনে) তারা সকলে ঈমান গ্রহণ করল।”

স্ত্রীর সামনে বাস্তব কথা বলা
[৫৩২] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ তার স্ত্রীকে বললেন, “আমার মধ্যেও কিছু নেই— এমনটা তুমি বলতে পারো, সে আশঙ্কা যদি আমার না হতো—তবে আমি বলতাম, তোমার মধ্যে কিছু নেই।”

তিনি ঋণী অবস্থায় মারা যান
[৫৩৩] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, “আমি বিত্তশালীদের মতো জীবনযাপন করব আর দরিদ্রদের মতো মৃত্যুবরণ করব।” বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি যখন মারা যান তখন তার ওপর কিছু ঋণ ছিল।”

বান্দার সাথে আল্লাহর আচরণ
[৫৩৪] বাকর ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে তার মুমিন বান্দার যত্ন নেন, যেভাবে তোমাদের কেউ অসুস্থ ব্যক্তির যত্ন নিয়ে থাকো। তোমরা কি দেখো না, এক নারী কীভাবে তার সন্তানকে বারবার তেতো জিনিস জোর করে খাওয়ায় তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য। এমনিভাবে আল্লাহও তার বান্দার সাথে অনুরূপ করে থাকেন (অর্থাৎ বিভিন্ন বিপদ-মুসিবত দিয়ে তাকে সংশোধন করেন ও গুনাহ মাফ করেন)।”

শক্তিকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করা
[৫৩৫] আবূ হায়ওয়া বলেন, "আমরা বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে তাকে দেখতে আসলাম। পরে এই রোগেই তিনি মারা যান। এ সময় তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, 'আল্লাহ সেই বান্দাকে রহম করুন, যাকে তিনি শক্তি দিয়েছেন আর সে আল্লাহর আনুগত্যে তা কাজে লাগিয়েছে। অথবা দুর্বলতা তাকে অক্ষম বানিয়েছে, ফলে সে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হতে পারেনি।"

বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর দুআ
[৫৩৬] মুবারক বলেন, "বাকর ইবনু আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-কে আমি সব সময়ই এই দুআ করতে শুনেছি-হে আল্লাহ, তোমার রহমতের ভান্ডার আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দাও। দুনিয়া-আখিরাতে এরপর আর কখনো তুমি আমাদের শাস্তি দিয়ো না। এবং তোমার প্রশস্ত অনুগ্রহের হালাল উত্তম আমাদের দান করো। এরপর আমাদের আর কখনো তুমি ছাড়া অন্য কারও দ্বারস্থ কোরো না। এর দ্বারা আমরা তোমার বেশি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারব। অভাব-অনটনের অভিযোগ কেবল তোমারই কাছে। অন্যদের বাদ দিয়ে তোমার কাছেই ঐশ্বর্য এবং নিস্কুলষতার প্রার্থনা করি।”

পরিধেয় বস্ত্র নিয়ে সমালোচনা না করা
[৫৩৭] ইয়াজিদ ইবনু উমার বলেন, "বাকর ইবনু আবদুল্লাহ মুযানি রাহিমাহুল্লাহ-কে আমি বসরার মাসজিদে বলতে শুনেছি, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গীরা (উত্তম পোশাক) পরিধান করতেন। যারা পরিধান করতেন না, তাদের অন্যরা কিছু বলতেন না। আবার যারা পরিধান করতেন না, তারাও যারা পরিধান করতেন তাদের কিছু বলতেন না।” [৭৪]

টিকাঃ
[৭৪] অর্থাৎ তাদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি বহাল ছিল। পোশাকের আভিজাত্য ছিল তাদের কাছে ছিল গৌণ।-অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00