📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


জাহান্নামের ভয়ে নির্ঘুম রাত্রি পার করা
[১] মালিক রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ- এর মেয়ে তাকে বললেন, 'কী ব্যাপার! আমি সবাইকে ঘুমাতে দেখি; কিন্তু আপনাকে কখনো ঘুমাতে দেখি না।' তখন তিনি বললেন, 'হে মেয়ে, জাহান্নাম তো তোমার বাবাকে ঘুমাতে দেয় না।”

দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ
[২] হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি পরোয়া করি না, আমি তোমাদের এই সুগন্ধি মেশকের ঘ্রাণ শুঁকলাম, নাকি গোবরের গন্ধ নিলাম! আমি কোনো নারীকে দেখলাম, নাকি দেয়ালকে দেখলাম! (আমার কাছে সবই সমান)।”

যাবতীয় চিন্তাকে এক চিন্তায় পরিণত করা
[৩] হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন আবদুল্লাহ ইবনু আমিরের নিকট এ মর্মে বার্তা পাঠালেন-আপনি আমির ইবনু আবদি কাইসের সন্ধান করুন, এরপর তার থেকে উত্তমরূপে অনুমতি গ্রহণ করুন, তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করুন, আর তাকে বলুন যে, তিনি যেন তার ইচ্ছেমতো বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। এরপর আপনি বাইতুল মাল থেকে তার বিয়ের মোহর পরিশোধ করে দিন। আবদুল্লাহ ইবনু আমির এ বার্তা পেয়ে আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এ সংবাদ দিয়ে দূত পাঠালেন—আমিরুল মুমিনিন আমার কাছে এ মর্মে বার্তা প্রেরণ করেছেন, আমি যেন আপনার থেকে উত্তমরূপে অনুমতি গ্রহণ করি এবং আপনাকে উপযুক্ত সম্মান দিই। এ কথা শুনে আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আমার চাইতে অমুক ব্যক্তি এর প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি এখানে এমন একজন ব্যক্তির কথা বোঝাচ্ছিলেন, তার কাছে যার দীর্ঘদিন ধরে যাওয়া-আসা থাকার ফলে (কথা বলতে এলে) তার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। এরপর দূত আবদুল্লাহ ইবনু আমিরের পক্ষ থেকে বলল, 'এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আমি আপনাকে বলি যে, আপনি যাকে ইচ্ছে করেন, তার উদ্দেশে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারেন। আর আমি যেন বাইতুল মাল থেকে আপনার মোহর আদায় করে দিই।' তিনি বললেন, 'বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর কাজ তো আমি সেই কবে থেকেই করে আসছি!' সে জিজ্ঞেস করল, 'কার উদ্দেশে?' তিনি বললেন, 'এমন কারও উদ্দেশে, যে সামান্য খাবার ও শুকনো খেজুর গ্রহণ করে নেবে।' এরপর তিনি তার সঙ্গীদের দিকে ফিরে বললেন, 'আমি তোমাদের জিজ্ঞেস করছি। সুতরাং তোমরা আমাকে অবগত করো, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যার অন্তরে তার স্ত্রীর জন্য বিশেষ স্থান রয়েছে?' তারা বলল, 'জি, অবশ্যই।' তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যার অন্তরে তার সন্তানের জন্য বিশেষ স্থান রয়েছে?' তারা বলল, 'জি, অবশ্যই'। তিনি বললেন, 'ওই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, দেহের প্রতিটি পার্শ্ব বরাবর ফলা বিদ্ধ হওয়া, আমার কাছে এমন হয়ে যাওয়ার চেয়েও বেশি পছন্দনীয়। শোনো, আল্লাহ তাআলার কসম করে বলছি, আমি অবশ্যই যাবতীয় চিন্তাকে এক চিন্তায় পরিণত করব।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "বাস্তবেই তিনি তা করেছেন।"

ইবাদাতের অশেষ আগ্রহ
[৪] সাঈদ রিবয়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, দুনিয়ায় থাকা অবস্থায়ই যদি আমার কাছে এ বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান এসে যায় যে, আমি জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, তাহলে নিজের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়াকে কোনোভাবেই আমার অন্তর খুশির সঙ্গে বরণ করে নেবে না। আমি তখন মহান আল্লাহর নিবিড় ইবাদাত করব এবং চরম অধ্যবসায়ী হব তার ইবাদাতে। আমার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করার পরই ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়াকে আমি মেনে নেব। তখন এটা আমার কাছে নিজের জন্য বড় একটা ওজর হিসেবে গণ্য হবে।”

মৃত্যুর সময়ও ইবাদাতের স্মরণ
[৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ যখন মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলেন তখন তিনি বললেন, 'শুধু শীতকালের সালাত এবং দ্বিপ্রহরের পিপাসা ছাড়া কোনো কিছুর জন্যই আমার পরিতাপ হচ্ছে না।”

আখিরাতের স্মরণ দু-চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নিয়েছে
[৬] আলা ইবনু সালিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর সান্নিধ্যে চার মাস ছিলেন এমন একজন আমার কাছে তার ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন-আমি যত দিন তার কাছে ছিলাম, তাকে দিনে বা রাতে কখনোই ঘুমাতে দেখিনি। তার কাছে দুটো রুটি থাকত। তিনি চর্বি মেখে রাখতেন সে দুটোর ওপর। এরপর তার একটা দিয়ে সাহরি করতেন এবং অপরটা দিয়ে ইফতার করতেন। ভোরবেলা তিনি আমাদের কুরআন শিক্ষা দিতেন। এরপর সালাত পড়ার সুযোগ হলে তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। এভাবে আসর পর্যন্ত সালাতেই কাটিয়ে দিতেন তিনি। এরপর বিকেলবেলা তিনি আমাদের পুনরায় কুরআন শেখাতেন। যখন মাগরিবের সময় হতো তখন তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করতেন। এরপর ভোর পর্যন্ত সালাত আদায় করতে করতে তার রাত কেটে যেত।”

সব ব্যাপারে চূড়ান্ত সতর্কতা
[৭] মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বলা হলো, আমির ইবনু আবদি কাইস আম্বরি গোশত খান না, চর্বি খান না, নারীদের কাছে গমন করেন না, নিজের দেহের চামড়া ছাড়া অন্য কারও চামড়া স্পর্শ করে না, মাসজিদের ধারেকাছেও যান না, আর তিনি দাবি করেন যে, তিনি ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ-এর থেকে শ্রেষ্ঠ। একবার মাকিল ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু আমিরের কাছে আসলেন। লোকেরা তার কাছেও এসব কথা বর্ণনা করেছিল। মাকিল ছিলেন আমির ইবনু আবদি কাইসের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তখন আবদুল্লাহ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ মাকিল ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, 'তুমি কি দেখছ না, এরা তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুর ব্যাপারে কী বলছে?' তিনি বললেন, 'ওরা কী বলছে?' তিনি বললেন, 'ওরা তো এই এই বলছে।' সব শুনে মাকিল আর তাদের সঙ্গে কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেলেন। এরপর তার বাহনে চড়ে এলেন আমিরের ঘরে। আমির তখন তার মাসজিদে ছিলেন। সে সময় তার পরনে ছিল একটি ঢিলেঢালা কোট। তিনি এসে বসলেন তার পাশে। এরপর মাকিল বললেন, 'আমি আপনার কাছে অমুক লোকদের কাছ থেকে এলাম। তারা আমার কাছে আপনার ব্যাপারে কিছু কথা বলেছে, যা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।' আমির বললেন, 'তারা আপনার কাছে কী বলেছে?' তিনি তাদের কথাগুলো বর্ণনা করে বললেন, 'তারা দাবি করেছে, আপনি এই এই কাজ করেন।' তিনি সব শুনে কোনো কথা বললেন না। তার হাত কোটের ভেতর বের করে আনলেন। এরপর তার হাত ধরে বললেন, 'তারা যে বলে, আমি গোশত খাই না। এর কারণ হলো, এরা গোশত কিনে আনে বন্দীদের থেকে, যারা ইসলাম বোঝে না, আর তারাই এসব পশু জবাই করে। আমার যখন গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হয় তখন কাউকে পাঠিয়ে ছাগল এনে নিজেরা জবাই করি। তারা যে আরও বলে, আমি ঘি খাই না। এর কারণ হলো, আমি আরব দেশ থেকে আসা ঘি খাই। যেসব ঘি অনারব শহর থেকে আসে তার সঙ্গে কী মেশানো হয়েছে, তা আমি জানি না। আর এ বিষয়টিই আমাকে তা (অনারব ঘি) পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা যে বলে, আমি নারীদের কাছে গমন করি না। আল্লাহর কসম, তাদের প্রতি আমার কোনো আগ্রহই জাগে না। আর আমার কাছে অর্থকড়িও নেই। তাহলে কী দিয়ে আমি কোনো মুসলিম নারীকে ঠকাব? কীসের বিনিময়ে আমি তাকে আমার ঘরে তুলব? আর তারা যে বলে, আমি মাসজিদের ধারেকাছেও যাই না। দেখো, আমি তো আমার এই মাসজিদেই রয়েছি। যখন জুমুআর দিন আসে তখন আমি মুসলমানদের জামাতের সঙ্গে সালাত আদায় করি। এরপর আবার ফিরে আসি আমার এই মাসজিদে। আর তারা বলে যে, আমি নাকি দাবি করি—আমি ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ-এর থেকে উত্তম। আমি বুঝতে পারি না, কোনো ব্যক্তি কি এই কথা বলার দুঃসাহস করতে পারে!”

আল্লাহর কাছে তিনটি বিষয়ের প্রার্থনা
[৮] সাব্বাহ ইবনু আবী উবায়দাহ আল-আম্বারি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “আমাদের এক শাইখ বলেছেন, আমি এক সফরে আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গী ছিলাম। যখন কাফেলার যাত্রীরা বিশ্রামের জন্য যাত্রাবিরতি করল তখন তিনি উঠে নিজের আসবাবপত্র গুছিয়ে নিলেন। এরপর এক ঝোপের ভেতর প্রবেশ করে সেখানে সালাত আদায় করা আরম্ভ করলেন। আমি তার পেছনে বসা ছিলাম। যখন রাতের শেষাংশ বা সাহরির সময় হলো তখন তিনি দুআয় বললেন, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছি। আপনি আমাকে দুটো জিনিস দান করেছেন। আর একটা থেকে আমাকে বঞ্চিত রেখেছেন। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে তা দিয়ে দিন, যাতে করে আমি যেভাবে ভালোবাসি, সেভাবে আপনার ইবাদাত করতে পারি।' যখন ভোর হলো তখন তিনি পেছনে ফিরে তাকালেন। সে সময় আমাকে দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, 'তার মানে রাত থেকে তুমি এখানেই আছো এবং আমাকে লক্ষ করেছ!' তিনি আমার দিকে ফিরে জিহ্বায় কামড় দিলেন। আমি বললাম, 'এ বিষয়টি বাদ দিন। আল্লাহর কসম, আপনি আমাকে দুআর তিনটি বিষয়ে অবগত করবেন। নয়তো আপনি রাতভর যা কিছু করেছেন, তা আমি মানুষকে বলে দেবো।' তিনি বললেন, 'তুমি আমার বিষয়টা গোপন রেখো।' আমি বললাম, 'আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাউকে এ বিষয়ে অবগত করব না।' তখন তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছে চেয়েছি, তিনি যেন আমার অন্তর থেকে নারীদের ভালোবাসা দূর করে দেন। আল্লাহর কসম, আমি পরোয়া করি না, আমি কোনো নারীকে দেখলাম নাকি দেয়াল দেখলাম। আমি আরও চেয়েছিলাম, যেন আমি আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় না করি। আমি তার কাছে আরও চেয়েছিলাম, তিনি যেন আমার ঘুম দূর করে দেন, ফলে আমি রাত-দিনের যেকোনো সময় নিজের ইচ্ছেমতো ইবাদাত করতে পারব। কিন্তু তিনি আমাকে এর থেকে বঞ্চিত রেখেছেন।”

পেটকে যতই বোঝাই করবে, তা ততই বোঝাই হবে
[৯] সালামা বিন আদম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাতিজি তার জন্য দুধ দিয়ে এক থালা খাবার তৈরি করল। সে বলল, 'আমি চাচাজানের কাছে খাবার নিয়ে এলাম, যাতে তিনি এর মাধ্যমে নাশতা করতে পারেন।' এমন সময় হঠাৎ এক ভিক্ষুক বলে উঠল, 'কে আছে এমন, যে এক ক্ষুধার্ত নারীকে কলজে খাওয়াবে?' তখন তিনি বললেন, 'হে ভাতিজি, এই খাবার কি আমার জন্য নয়? আর আমি কি এর দ্বারা যা ইচ্ছা তা করতে পারি না?' আমি বললাম, 'অবশ্যই।' তখন তিনি ভিক্ষুককে এই খাবার দিয়ে দিলেন। এ দেখে দাসী অনুনয় করে উঠল। তখন তিনি বললেন, 'আনো, এদিকে আনো।' তখন সে খেজুর এবং সামান্য খাবার নিয়ে এল। তিনি তা-ই খেয়ে নিলেন এবং এরপর পানি পান করলেন। এরপর তিনি বললেন, 'হে ভাতিজি, এ পেট তো হলো একটা পাত্র। তুমি একে যতই বোঝাই করবে, তা ততই বোঝাই হবে। আর তোমার সংগ্রহ করা জন্য সে জিনিসই অবশিষ্ট থাকবে, যা তুমি আখিরাতের জন্য প্রেরণ করবে।”

দুনিয়ার ব্যাপারে নির্মোহ
[১০] হুসাইন ইবনুল হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'শামে এসে আমির রাহিমাহুল্লাহ- এর খোঁজ করলাম আমি। আমাকে বলা হলো, এখানে এক বৃদ্ধের কাছে থাকেন তিনি। তখন আমি সেই বৃদ্ধকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, 'সে তো রাত-দিন ওই পাহাড়ের পাদদেশে থাকে। তার কাছে তোমার যদি কোনো প্রয়োজন থাকে, তাহলে তুমি তার নাশতার সময় তাকে সন্ধান করো।' এভাবে আমি আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আসলাম। তাকে সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের উত্তর দিলেন। এরপর আমাকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, যাকে তিনি গতকাল অঙ্গীকার দিয়েছিলেন। আমাকে তার নিজ পরিজন এবং আত্মীয়দের সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। তিনি আমাকে রাতের খাবার খেতেও বললেন না। আমি বললাম, 'হে আমির, আমি আপনার মধ্যে কিছু আশ্চর্যজনক বিষয় দেখছি।' তিনি বললেন, 'কী তা?' আমি বললাম, 'আপনি আপনার পরিবার এবং পরিজনের থেকে দূরে সরে গেছেন। যেটা আপনিও জানেন। আপনি আমাকে তাদের কারও সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন না—কে মৃত্যুবরণ করেছে আর কে এখনো বেঁচে আছে, এসবও জানতে চাইলেন না। অথচ তাদের সাথে আমার নৈকট্যের বিষয়ে আপনি জ্ঞাত আছেন। আপনি আমাকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, গতকাল যাকে আপনি কোনো অঙ্গীকার দিয়েছিলেন। আর আপনি আমাকে রাতের খাবার খেতেও বললেন না।' তিনি বললেন, 'তুমি আমাকে তোমার কাছে কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে বলেছ। কথা হলো, তোমাকে আমার নেককার ব্যক্তি মনে হয়েছে। তো তোমাকে আমি কী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করব? আর আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে তোমাকে আর কীই-বা জিজ্ঞাসা করব? তাদের মধ্যে যে মৃত্যুবরণ করেছে, সে তো মৃত্যুবরণ করেছে। আর যারা এখনো বেঁচে আছে, তারাও শীঘ্রই মৃত্যুবরণ করবে। আর তুমি যে বলেছ, আমি তোমাকে রাতের খাবার খেতে বলিনি। আমি তো তোমার ব্যাপারে জেনেছি, তুমি রাজা-বাদশাহর খাবার খাও। আর আমার খাবারে রয়েছে রুক্ষতা। আমার ধারণা, তোমার এর কোনো প্রয়োজন নেই।”

পোশাকাদির প্রতি অমনোযোগিতা
[১১] আবূ সাখরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমির রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, আমি আপনার সম্ভ্রান্ততা এবং পরিবারের বংশমর্যাদার প্রতি সন্তুষ্ট। কিন্তু আপনার পোশাকের এ কী অবস্থা! তিনি বললেন, 'আল্লাহ তো এর মধ্যেই আমিরের চোখের শীতলতা রেখেছেন।"

পার্থিব দুশ্চিন্তাকে আমলে না নেওয়া
[১২] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমির রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে প্রবেশ করে শুনতে পেলেন, কিছু মানুষ-সমাজে চলতে গিয়ে নিত্যদিন যে সকল দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হতে হয়-সেসব দুশ্চিন্তা নিয়ে পরস্পর আলোচনা করছে। তখন আমির রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আল্লাহর কসম, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে সত্য বলেছ। আল্লাহর কসম, আমি যদি পারতাম তাহলে সকল চিন্তাকে এক চিন্তায় (অর্থাৎ আখিরাতমুখী চিন্তায়) রূপান্তরিত করতাম।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তিনি তা করেছেন।”

শাসকের অনুদান থেকে বিমুখতা
[১৩] আমবাসা খাওয়াস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আবদুল্লাহ ইবনু আমির যখন বসরার শাসক হয়ে আগমন করল তখন সে বলল, 'হে বসরাবাসী, তোমরা প্রত্যেকে গড়ে পাঁচজনের মধ্য থেকে আমার জন্য একজন করে আলিমের নাম লিখে দাও-যাদের সঙ্গে আমি আমার বিষয়ে পরামর্শ করব, আমার গোপন বিষয়ে তাদের অবগত করব এবং আল্লাহ আমাকে যে দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেছেন সে ব্যাপারে তাদের কাছে সহযোগিতা চাইব।' তখন তার কাছে জিয়াদ ইবনু মাতার আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-এর নাম লিখে পাঠানো হলো। তিনি পরীক্ষিত হয়েছিলেন, একপর্যায়ে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়। তার কাছে আরও লিখে পাঠানো হলো বানু রাক্কাশ গোত্রের গাজওয়ান রাহিমাহুল্লাহ-এর নাম। যিনি কসম করেছিলেন, তিনি কখনো হাসবেন না, যতক্ষণ না জানতে পারেন—আল্লাহ তাকে কোন স্থানে উপনীত করেন (জান্নাতে নাকি জাহান্নামে)। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'বাস্তবেই তিনি কখনো হাসেননি, এভাবেই আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।' তার কাছে আরও লিখে পাঠানো হলো গাতফান গোত্রের জাবির ইবনু আশতার রাহিমাহুল্লাহ-এর নাম। (অন্য বর্ণনায় তার নাম এসেছে—আশতার ইবনু জাবির।) তার কাছে আরও লিখে পাঠানো হলো আমির ইবনু আবদি কাইস আল-আম্বারি রাহিমাহুল্লাহ-এর নাম। তার কাছে আরও লিখে পাঠানো হলো নুমান ইবনু শাওয়াল আল-আবাদি রাহিমাহুল্লাহ-এর নাম। যখন তারা শাসকের কাছে আসলেন তখন সে বলল, আপনারা আলিম সম্প্রদায়। আমি আপনাদের প্রত্যেকের জন্য দু-দুহাজার মুদ্রা এবং সমপরিমাণ শস্য ভাতা হিসেবে প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছি। তখন নুমান ইবনু শাওয়াল রাহিমাহুল্লাহ—তিনি ছিলেন সকলের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ, উপস্থিত সকলে উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব তার ওপরই দিয়েছিলেন, তারা তাকে কাফেলার আমির নির্ধারণ করেছিলেন—তার কথার জবাবে বলে উঠলেন, 'হে আমির, এটা কি বিশেষভাবে আমাদের জন্য নাকি সাধারণভাবে সমগ্র বসরাবাসীর জন্য?' সে বলল, 'বিশেষভাবে আপনাদের জন্য। এই পরিমাণ সম্পদ সমগ্র বসরাবাসীর জন্য যথেষ্ট হবে না।' তিনি বললেন, 'তুমি তা-ই বলবে, যা আমি বলি—এ হলো সদাকা। যদি এটা সদাকাই হয়ে থাকে, তাহলে তা আমাদের পেটে প্রবেশ করবে না। আমাদের চামড়ার ওপরও চড়বে না (অর্থাৎ পোশাক পরিধান করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে)। (জাকাত-সদাকা উশুলকারী) শ্রমিক কেবল তার শ্রমের বিনিময় গ্রহণ করতে পারে। আমরা তো আমাদের প্রতিপালকের জন্য কাজ করি। সুতরাং তোমার কাছে যা আছে, আমাদের তা লাগবে না।' তখন (আবদুল্লাহ ইবনু আমির) তাকে বলল, 'আমি তোমাকে নিন্দুক হিসেবে দেখছি। তুমি বেরিয়ে যাও আমার কাছ থেকে।' তখন তিনি বললেন, 'তুমি তো আমাকে শাসকদের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আগমনকারী হিসেবে নির্ধারণ করোনি!' এরপর আবদুল্লাহ আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর দিকে অভিমুখী হয়ে বলল, 'আমি আপনার জন্য দুহাজার করে মুদ্রা এবং এই পরিমাণ ভাতা জারি করার নির্দেশ দিয়েছি।' তিনি তখন বললেন, 'আপনি মাসজিদের দুয়ারে দণ্ডায়মান চুক্তিবদ্ধ (মুকাতাব) দাসদের প্রতি লক্ষ করুন। তারা এর দিকে আমার থেকে অধিক মুখাপেক্ষী।' সে বলল, 'আমি আদেশ জারি করে দিয়েছি, যেন আমার কাছে আসতে কখনো আপনার সামনে দুয়ারকে রুদ্ধ রাখা না হয়।' আমির রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আপনি সাঈদ ইবনু কারহাকে গ্রহণ করুন। সে শাসকদের দরবারে আমার থেকে বেশি আনাগোনা করে।' ইবনু আমির বলল, 'আপনি খেয়াল করুন তো, বসরায় কোন নারীকে আপনি চান, আমি তার সঙ্গে আপনাকে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ করে দেবো। আমির রাহিমাহুল্লাহ তখনো পর্যন্ত কোনো বিয়ে করেননি।' তিনি বললেন, 'হে আমির, আপনি কি মনে করেন, কোনো ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তান থাকলে সেসব তার অন্তরকে ব্যস্ত রাখে?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'তাহলে আমার এতে কোনো প্রয়োজন নেই। আমি সকল চিন্তাকে এক চিন্তায় পরিণত করে রাখব, যতক্ষণ না আমার মহান প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হই।”

নফল সালাত ঘরে আদায় করা
[১৪] উমারা ইবনু আবদুল্লাহ আম্বরি, তার ছেলে ও সাবিত আবুল ফজল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা কখনো আমির ইবনু আবদি কাইসকে মাসজিদে নফল সালাত আদায় করতে দেখিনি। তিনি মুসল্লিদের মধ্যে সবার শেষে মাসজিদে প্রবেশ করতেন এবং সবার আগে মাসজিদ থেকে বেরিয়ে যেতেন।”

সালাতে মনোযোগ ধরে রাখা
[১৫] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমির ইবনু আবদি কাইস এক মজলিসে সালাত চলাকালে — ঘরের কথা স্মরণ আসা সম্পর্কিত — আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, 'তোমরা কি এমনটা অনুভব করো?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমার কাছে সালাতে এমনটা হওয়ার থেকে পেট বারবার বর্শার ফলাবিদ্ধ হওয়া অধিক পছন্দনীয়।”

অসাধারণ বিনয়
[১৬] আবূ আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, 'আপনি আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন, আপনি আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।' তিনি বললেন, 'তুমি এমন কারও কাছে আবেদন জানাচ্ছ, যে নিজের ব্যাপারেই অক্ষম হয়ে পড়েছে। তবে তুমি আল্লাহর আনুগত্য করো, এরপর তার কাছে দুআ করো। তিনি তোমার দুআ কবুল করবেন।”

গোপনে ইবাদাত করার প্রতি আগ্রহ
[১৭] ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে দেখতাম তিনি তার মাসজিদে সালাতরত অবস্থায় আছেন। আমাদের দেখে তিনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। এরপর আমাদের উদ্দেশে বলতেন — তোমরা কী চাও? তিনি এটা অপছন্দ করতেন যে, লোকজন তাকে সালাতরত অবস্থায় দেখে ফেলুক।”

দুনিয়া অন্তরে স্থান না পাওয়া
[১৮] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি মানুষের সুখ দেখেছি চার জিনিসের মধ্যে—নারী, খাবার, কাপড় এবং ঘুম। কাপড়—আল্লাহর কসম, কোন কাপড় দিয়ে আমি আমার লজ্জাস্থান আবৃত করলাম—আমি পরোয়া করি না। নারী—আল্লাহর কসম, আমি কোনো নারীকে দেখলাম নাকি কোনো দেয়ালকে দেখলাম—আমি পরোয়া করি না। আর খাবার এবং ঘুম—এ দুটো আমার ওপর প্রবল হতে পেরেছে ততটুকু পর্যন্ত, যতটুকু আমি এর থেকে গ্রহণ করি। আল্লাহর কসম, এ দুটোর ব্যাপারে আমি আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাব।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, তিনি এ দুটোর ব্যাপারে তার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। অবশেষে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন।"

দিনমান ইবাদাতে ব্যস্ত থাকা
[১৯] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ ফজরের সালাত শেষে মাসজিদের এক প্রান্তে সরে যেতেন। এরপর বলতেন, 'কে আছো, যাকে আমি পড়াব?' তখন একদল মানুষ আসত। তিনি তাদের পড়াতেন, যতক্ষণ না সূর্যোদয় হয় এবং (নিষিদ্ধতার সময় অতিক্রান্ত হয়ে) সালাত পড়ার সুযোগ হয়। এরপর তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। দ্বিপ্রহর পর্যন্ত সেই সালাত অব্যাহত থাকত। এরপর তিনি তার ঘরে ফিরে সামান্য বিশ্রাম করতেন। যখন সূর্য মধ্যাকাশ থেকে হেলে যেত তখন মাসজিদে ফিরে এসে সালাতে দাঁড়াতেন। যোহর আদায় করা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকত। যোহর আদায় শেষে আবার সালাত পড়তেন, যতক্ষণ না আসর আদায় করার সময় হয়। আসরের সালাতের পর মাসজিদের এক প্রান্তে সরে বসতেন, এরপর বলতেন, 'কে আছো, যাকে আমি পড়াব?' তখন একদল লোক তার কাছে আসত, তিনি তাদের পড়াতেন। এরপর যখন সূর্যাস্ত হয়ে যেত তখন মাগরিবের সালাত আদায় করতেন। এভাবে ততক্ষণ সালাত পড়তে থাকতেন, যতক্ষণ না ঈশার সালাত আদায় করার সময় হয়। ঈশা আদায় শেষে বাড়িতে ফিরে আসতেন। তখন কেউ তাকে রুটি পরিবেশন করত আর তিনি তা খেয়ে নিতেন। এরপর সামান্য বিশ্রাম নিতেন। এরপর আবার উঠে যেতেন। যখন সাহরির সময় হতো তখন তার শেষ রুটিটি নিয়ে খেতেন। এরপর অল্প পানি পান করতেন। আর তারপর মাসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে যেতেন।"
খালাফ রাহিমাহুল্লাহ তার সূত্রে বর্ণনা করেন, “মানসুর ইবনু জাযান রাহিমাহুল্লাহ-ও এসব করতেন। তবে একটি বিশেষ গুণের কারণে তার শ্রেষ্ঠত্ব বেশি ছিল। (সেটি হলো) তিনি ততক্ষণ রাতে বিশ্রাম করতেন না, যতক্ষণ না চোখের জলে তার পাগড়ি ভিজে যেত। এরপর তিনি পাগড়ি রেখে দিতেন।”

দান করা সত্ত্বেও অর্থ হ্রাস না পাওয়া
[২০] আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার কাছে আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাতিজা বর্ণনা করেছেন, আমির রাহিমাহুল্লাহ তার ভাতা গ্রহণ করে চাদরের এক প্রান্তে রাখতেন। এরপর এমন যত মিসকিনের সঙ্গেই তার দেখা হতো, যে তার কাছে কিছু চাইত, তিনি তাকেই তা থেকে দিতেন। এরপর যখন পরিবারের কাছে আসতেন, তখন সেই অর্থকড়ি তাদের দিকে ছুঁড়ে দিতেন। অতঃপর তাঁরা তা গণনা করতেন। তখন তারা সমপরিমাণ অর্থই পেতেন, ঠিক যেমন তাকে দেওয়া হয়েছিল।”

আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উপদেশ
[২১] মুহাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আবূ মূসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু আমির ইবনু আবدي কাইস রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে পত্র পাঠালেন : আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ-যিনি আবদু কাইস নামে পরিচিত ছিলেন-এর পুত্র আমিরের প্রতি, হামদ ও সালাতের পর, আমি তোমাকে একটি দায়িত্ব দিয়েছিলাম। আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে-তুমি নাকি বদলে গেছ। তুমি যদি সে অবস্থায় থেকে থাকো, যে অবস্থায় আমি তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তবে তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং অবিচল থাকো। আর যদি তুমি বদলে গিয়ে থাকো তবে আল্লাহকে ভয় করো এবং ফিরে এসো।”

সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা
[২২] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "আমির ইবনু আবদি কাইস রাহিমাহুল্লাহ-কে শামে পাঠানো হলো। তখন তিনি বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে আরোহী অবস্থায় হাশর করিয়েছেন।”

সকল বিষয় আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা
[২৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, "আমির রাহিমাহুল্লাহ তার দু-ভাতিজাকে বললেন, “তোমরা তোমাদের বিষয়-আশয় আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করো, প্রশান্তি পাবে।"
আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ তার সূত্রে বর্ণনা করেন, আমির ইবনু আবদি কাইস যখন ভোর যাপন করতেন তখন বলতেন, “হে আল্লাহ, এ সকল মানুষও তো ভোর এবং সন্ধ্যা যাপন করে। প্রত্যেকের রয়েছে বিভিন্ন প্রয়োজন। আর আমিরের প্রয়োজন হলো, তুমি তাকে ক্ষমা করে দেবে।”

ইবাদাত এবং ত্যাগের কথা স্মরণ
[২৪] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইরাকে হারিয়ে এসেছি, এমন কোনো কিছুর জন্য আমার আফসোস হয় না, তবে দ্বিপ্রহরের পিপাসা এবং এমন সব মানুষদের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারা, যারা হাদীসের সন্ধানে থাকে—এই দুটো জিনিসের জন্য শুধু আফসোস হয়।”

বাইতুল মাকদিসে সালাত আদায়ের ফযীলত
[২৫] জারিয়া ইবনু কুদামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি শামে আগমন করলাম। শেষমেশ আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গিয়ে উপনীত হলাম। সে সময় তিনি মাসজিদে বসা ছিলেন। আমি তার পাশে বসলাম, তখন তার পাশে আরেকজন উপবিষ্ট ছিলেন, যাকে আমি চিনি না। আমি তাকে বললাম, ‘আমি কাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছি।’ তিনি জানতে চাইলেন, ‘কীসের জন্য?’ আমি বললাম, ‘একটা বর্ণনার কারণে, যা তার সূত্রে আমার কাছে পৌঁছেছে, যে কেউ এই মাসজিদে, অর্থাৎ বাইতুল মাকদিসে শুধু সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে আসবে সে ওই দিনের মতো হয়ে ফিরে যাবে, যেদিন তার মা তাকে নিষ্পাপ অবস্থায় জন্ম দিয়েছিলেন। আমির রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘তোমার উদ্দেশিত ব্যক্তি তোমার পাশেই উপবিষ্ট।’ তখন কাব রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘কোনো রাত অপর রাতের বিনিময়ে নয়। কোনো দিন অপর দিনের বিনিময়ে নয়। কোনো বস্তু অন্য বস্তুর অনুরূপ নয়। একবার উমরা করা দুইবার বাইতুল মাকদিসে আসার চাইতে উত্তম। একবার হাজ্জ করা দুটো উমরার থেকে উত্তম। কোনো বান্দা যখন রাতে ঘুম থেকে উঠে উত্তমরূপে ওজু করে, এরপর দু-রাকাত সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।”

শীতকালের বৈশিষ্ট্য
[২৬] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফেরেশতারা মুমিনের জন্য শীতকালের ব্যাপারে আনন্দিত হয়। তখন দিন সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ফলে সে সাওম রাখে। রাত দীর্ঘায়িত হয়, ফলে সে সালাত পড়ে।"
আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, “যখন তিনি মুমূর্ষু হয়ে পড়লেন তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। এ দেখে লোকেরা বলল, ‘কোন জিনিস আপনাকে কাঁদাচ্ছে?’ তিনি বললেন, ‘আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না, দুনিয়ার লোভেও কাঁদছি না; কিন্তু দ্বিপ্রহরের তৃষ্ণা এবং শীতকালের সালাতের কথা স্মরণ করে আমি কাঁদছি।”

পার্থিব ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকা
[২৭] উকবা ইবনু ফুজালা তার শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, “আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ যখন ফলফলাদির পাশ দিয়ে যেতেন তখন বলতেন—কর্তিত, নিষিদ্ধ।”

সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি
[২৮] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মাসজিদে আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর এক মজলিস হতো। তিনি কিছুদিন পর সেই মজলিস বাদ দিয়ে দিলেন। তখন আমরা ধারণা করলাম, তিনি বোধ হয় প্রবৃত্তির অনুসারীদের মতো হয়ে গেছেন। আমরা তখন তার কাছে এসে বললাম, 'মাসজিদে আপনার একটা মজলিস হতো। আপনি সেটা বাদ দিয়ে দিলেন!' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তা তো অধিক পরিমাণ শোরগোল এবং মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশার মজলিস। তখন আমরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিলাম, আদতেই তিনি প্রবৃত্তির অনুসারীদের মতো হয়ে গেছেন।' আমরা বললাম, 'তাদের ব্যাপারে আপনি কী বলেন?' তিনি বললেন, 'তাদের ব্যাপারে আমার কিছু বলার মুরোদ নেই। আমি আল্লাহর রাসূলের কিছু সাহাবিকে দেখেছি এবং তাদের সান্নিধ্যে থেকেছি। তারা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন—কিয়ামাতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ঈমানের অধিকারী হবে ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ায় তার নফসের সবচেয়ে বেশি হিসেব নেবে। আর কিয়ামাতের দিন সর্বাধিক খুশির অধিকারী হবে ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হবে। কিয়ামাতের দিন সবচেয়ে বেশি হাস্যোজ্জ্বল হবে ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কাঁদবে।'
তারা আমাদের কাছে আরও বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা ফরজ বিধানগুলোকে ফরজ করে দিয়েছেন, সুন্নত বিধানগুলোকে সুন্নত করেছেন এবং কিছু সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে আল্লাহর ফরজ এবং সুন্নত অনুযায়ী আমল করবে এবং তার সীমানাসমূহ অতিক্রম করা থেকে দূরে থাকবে, সে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে তার ফরজ এবং সুন্নতসমূহ পালন করবে, এরপর তার সীমানাসমূহ অতিক্রম করবে, তারপর তাওবা করবে, এরপর পুনরায় তা অতিক্রম করবে, তারপর আবার তাওবা করবে, সে ভবিষ্যতে ভয়াবহ অবস্থা, দুর্যোগ এবং কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। পরিশেষে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে আল্লাহর ফরজ এবং সুন্নাত অনুসারে আমল করবে এবং তার সীমানাসমূহ অতিক্রম করবে, এরপর এর ওপর অবিচল থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে আল্লাহর সঙ্গে একজন মুসলিম হিসেবে সাক্ষাৎ করবে—তিনি যদি চান, তাকে ক্ষমা করবেন। আর যদি চান, তাকে শাস্তি দেবেন।”

কুরআনের ধারকরা দুনিয়াবিমুখ হবে
[২৯] আবূ যাকারিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ তার শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, "আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর এক ভাতিজি—যার নাম ছিল আবিদা—আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর ব্যক্তিগত প্রয়োজনাদির প্রতি লক্ষ রাখত। তার যা প্রয়োজন হতো নিজে প্রস্তুত করে দিত। তার জন্য সারিদ বানিয়ে তার কাছে নিয়ে আসত। আমির রাহিমাহুল্লাহ তা নিয়ে চলে যেতেন গাঁয়ের এতিমদের কাছে। তাদের ডাকতেন। সে সময় আবিদা বলত, আমি আমার নিজ হাতে এটা প্রস্তুত করেছি, যাতে আপনি তা খান। তিনি এর উত্তরে বলতেন, তুমি কি এটা চাও না যে, আমার উপকার হোক? বর্ণনাকারী বলেন, আমির রাহিমাহুল্লাহ তার ভাতিজিকে বলতেন, তুমি কুরআনকে আঁকড়ে ধরে দুনিয়া থেকে বিমুখ হয়ে যাও। কারণ, কুরআনকে আঁকড়ে ধরেও যে দুনিয়া থেকে বিমুখ হতে পারেনি, তার অন্তর আফসোসের কারণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে।"

ইবাদাতে রয়েছে চোখের শীতলতা
[৩০] সাঈদ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমির রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, আপনাকে যদি অধঃপতিত করে বসরায় প্রেরণ করা হয়! তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, তা তো সেই শহর, যাকে আমি ভালোবাসি। আমি সেখানে হিজরত করেছিলাম, সেখানে কুরআন শিখেছিলাম; কিন্তু তা ছিল প্রবৃত্তির যাত্রা। শুধু দুটো জিনিস ছাড়া ইরাকের বিচ্ছেদে আমার কোনো আক্ষেপ নেই—তার (ইরাকের) দ্বিপ্রহর ও আমার ভাইয়েরা; যাদের মধ্যে একজন হলেন আসওয়াদ ইবনু কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ।"

অন্যায়ভাবে আরোপিত অপবাদের যৌক্তিক খণ্ডন
[৩১] আবদুল্লাহ ইবনু আইয়াশ রাহিমাহুল্লাহ তার বাবা থেকে, তিনি তার শাইখের সূত্রে বর্ণনা করেন, “যিনি সেই মজলিস পেয়েছিলেন, যাতে আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ তার দেশ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কথা স্মরণ করেছিলেন। একবার তিনি বাদশাহর এক সহচরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে সময় লোকটি এক জিম্মিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল আর জিম্মি ব্যক্তি তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিল। তিনি জিম্মির দিকে ফিরে বললেন, 'তুমি কি তোমার জিযয়া কর আদায় করেছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' এরপর সেই সহচরের দিকে ফিরে বললেন, 'তুমি এর থেকে কী চাও?' সে বলল, 'আমি চাই, সে শাসকের বাড়ি ঝাড়ু দেবে।' তিনি জিম্মির দিকে ফিরে বললেন, 'তুমি কি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট?' সে বলল, 'এটা আমাকে আমার পেশা থেকে সরিয়ে রাখবে।' তিনি বললেন, 'ওকে ছেড়ে দাও।' সে বলল, 'ছাড়ব না।' তিনি বললেন, 'ছাড়ো।' সে বলল, 'ছাড়ব না।' তখন তিনি তার চাদর রাখলেন। এরপর তিনি বললেন, 'আমি জীবিত থাকতে তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জিম্মাকে লঙ্ঘন করতে পারবে না।' এরপর তিনি জিম্মিকে সেই সহচরের হাত থেকে মুক্ত করলেন। বিষয়টি বড় হতে হতে (এতদূর গড়াল যে) এটি তার দেশ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণ হয়ে গেল।
এরপর একদিন বসরার শাসক ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এলেন। তাকে বলা হলো, শাসক দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তাকে আসার অনুমতি দিলেন, সে সময় তিনি তার গদির ওপর শোয়া ছিলেন। সে বলল, 'এ হলো আপনার উদ্দেশে প্রেরিত আমিরুল মুমিনিনের চিঠি এই মর্মে—আপনি নাকি গোশত খান না, বিয়ে করেন না, ঘি খান না আর ইমামদের ব্যাপারে বিষোদ্গার করেন।' তিনি বললেন, 'আমি গোশত খাই না। কারণ, আমি এক কসাইয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সে সময় সে বলছিল, নিফাক নিফাক! এ কথা বলতে বলতে সে তার পশু জবাই করে ফেলল। আর আমি এমন পশুকে অপছন্দ করি, যা জবাই করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় না। যখন আমাদের গোশত খাওয়ার ইচ্ছা জাগে তখন আমরা নিজেরা ছাগল জবাই করে নিই। আর সেটাকে তো আমরা নিজেরাই লালনপালন করেছি। তাই আমরা এর গোশত খাই। আপনি বলেছেন যে, আমি ঘি খাই না। এর কারণ হলো, আমরা যুদ্ধের সময় দেখেছি, লোকেরা ছাগলের নিতম্ব কেটে সেটাকে ঘিয়ের সঙ্গে মিশ্রিত করে। অথচ তা হলো মৃত। তাই আমাদের এই পল্লি থেকে যে ঘি আসে, আমি শুধু সেই ঘি খাই। আপনি বলেছেন, আমি ইমামদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করি। কোনো ইমামের ওপর বিষোদ্গার করা থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আপনি বলেছেন, আমি কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হই না। এর কারণ হলো, আপনার মা আপনাকে জন্ম দেওয়ার আগে আমি আমার প্রতিপালকের কাছে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছি।' তখন হামরান বলল, 'মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহ তোমার মতো লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি না করুন!' এ সময় আমির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তবে মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহ আপনার মতো লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি করুন। কারণ, মুসলমানদের জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো বিকল্প নেই।”

মাতৃভূমির স্মরণ
[৩২] জাফর ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ তার কতিপয় শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, আমির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি নিজেকে দেখি, বসরার ব্যাপারে আমার পরিতাপ হয় চারটি বিষয়ের কারণে—মুয়াজ্জিনের আজানের জবাব, দ্বিপ্রহরের পিপাসা এবং সেখানে রয়েছে আমার কিছু ভাই (যাদের জন্য আমার দুঃখ হয়)। এবং সেখানেই আমার মাতৃভূমি।”

যাইতুনের তেল ব্যবহার
[৩৩] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ একজনকে ডেকে তেল আনালেন। তখন তা নিজ হাতে বইয়ে দিলেন। এরপর এক হাত অপর হাতের ওপর মুছলেন। তাকে সে সময় দেখেছে এমন একজন আমাকে এটা বলেছেন। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: “এটা হলো এমন বৃক্ষ, যা সিনাই পর্বতে জন্ম নেয় এবং আহারকারীদের জন্য তেল ও সুগন্ধী মশলা উৎপন্ন করে।”[১] এরপর সেই তেল তিনি তার মাথায় এবং দাড়িতে মেখে নিলেন।"

জিম্মিকে অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করা
[৩৪] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ উন্মুক্ত প্রান্তর দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন এক জিম্মির ওপর জুলুম করা হচ্ছিল। এ দেখে আমির রাহিমাহুল্লাহ তার চাদর ফেলে দিয়ে বললেন, 'আমি বেঁচে থাকতে আল্লাহর জিম্মাকে লঙ্ঘিত হতে দেখতে পারি না।' তারপর তিনি তাকে উদ্ধার করলেন।”

কল্যাণকামনা
[৩৫] সাঈদ আল-জারিরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "যখন আমির ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-কে দেশান্তর করা হলো তখন তিনি বললেন, 'আমিরের ভাইয়েরা তাকে বিদায় জানিয়েছে।' এরপর তিনি জাহরুল মিরবাদ নামক জায়গায় গেলেন। সেখানে বললেন, 'আমি (আল্লাহর পথে) আহ্বানকারী। সুতরাং তোমরা ঈমান আনো।' তারা বলল, 'আপনি উপস্থাপন করুন। আমরা আপনাকে সময় দিচ্ছি।' তখন তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ, যে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছে, আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, আমাকে আমার শহর থেকে বিতাড়িত করেছে এবং আমার মধ্যে ও আমার ভাইদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। হে আল্লাহ, আপনি তার সন্তান বৃদ্ধি করুন, তার দেহকে সুস্থ রাখুন এবং তাকে দীর্ঘজীবী করুন।”

স্বজন হারানোর শোকে সমবেদনা
[৩৬] আবূ মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর সম্প্রদায়ের জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, “আমির রাহিমাহুল্লাহ বালআম্বার গোত্রের এক নারীর কাছে তার ভাইয়ের মৃত্যুতে সমবেদনা জানানোর জন্য আসলেন, সে ভাইটি ছিল তার পরিবারের সর্বশেষ ব্যক্তি। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কুরআনের মাধ্যমে সুদৃঢ় হয়ে (দুনিয়া-বিমুখ হয়ে) যাও। কারণ, যে কুরআনের মাধ্যমে সুদৃঢ় হয়ে দুনিয়া-বিমুখ হতে পারেনি, তার অন্তর আফসোসের কারণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে।”

কুরআনের ধারকদের আত্মমর্যাদা
[৩৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর আজাদ করে দেওয়া এক বৃদ্ধা ক্রীতদাসী ছিল। সে তার সঙ্গে তার বাড়িতে থাকত। সেই বৃদ্ধা বলেন, 'আমি ছাড়া আর কারও সঙ্গেই আমির রাহিমাহুল্লাহ নির্জনে মিলিত হতেন না।' একবার কতিপয় লোক তার কাছে এসে কিছু কথা বলল, আমি জানি না, তারা কী বলেছে। তবে আমি আমিরকে বলতে শুনেছি, আমি তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও দোহাই দিয়ে বলছি—তোমরা কুরআনের অনুসারীদের জন্য লজ্জার কারণ হোয়ো না।”

দুনিয়ার ব্যাপারে অল্পেতুষ্টি
[৩৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “জারিয়া ইবনু কুদামা রাহিমাহুল্লাহ আমির রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আসলেন। তখন তিনি সালাতে ছিলেন। তিনি এসে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তখন আমির ঘরকে প্রশস্ত করে দিলেন এবং জারিয়া ঘরে প্রবেশ করে ভেতরে বসলেন। তিনি ঘরে শুধু পানির একটা মটকা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলেন না। আর আমিরের পরিধানে ছিল একটা কোট। তিনি তখন সালাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর আমির সালাত শেষ করলেন। তখন জারিয়া তাঁকে বললেন, 'হে আমির, আমি যা দেখছি, তুমি কি দুনিয়ার ব্যাপারে এতটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট? তুমি তো অনেক অল্পেই তুষ্ট!' তখন আমির বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি এবং আপনার সঙ্গীরাও সেসব লোক, যারা এ দুটোর ব্যাপারে অল্পেতুষ্ট।' এরপর তিনি উঠে (পুনরায়) সালাতে দাঁড়ালেন।”

টিকাঃ
[১] সূরা আল মুমিনুন, ২৩: ২০

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 মালিক ইবনু আবদিল্লাহ আল-খাসআমি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 মালিক ইবনু আবদিল্লাহ আল-খাসআমি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


ষাট বছর সাওম রাখা
[৩৯] হাসান ইবনু আবদিল আযীয রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার কাছে যামরা রাহিমাহুল্লাহ রাজা ইবনু আবী সালামা রাহিমাহুল্লাহ-এর সূত্রে লিখে পাঠালেন যে-মালিক ইবনু আবদিল্লাহ আল-খাসআমি রাহিমাহুল্লাহ-এর সারাজীবনের সাওম গণনা করা হলো। তখন দেখা গেল এর পরিমাণ ষাট বছরের সমতুল্য।”

লোক দেখানোর জন্য কান্না
[৪০] ইবরাহীম ইবনু আবদিল্লাহ আল-কাত্তানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার কাছে এ মর্মে বর্ণনা পৌঁছেছে যে, কান্নার দশটা অংশ রয়েছে; যার নয় অংশ লৌকিকতা আর এক অংশ মহামহিম আল্লাহর জন্য। বছরে যদি একবার সেই কান্না আসে-যা আল্লাহর জন্য হয়ে থাকে-তাহলে তা-ই বেশি।”

ভালো কাজে মানুষের তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করা
[৪১] সালিহ ইবনু খালিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তুমি কোনো ভালো কাজ করতে চাইবে, তখন মানুষদের গরুর পর্যায়ে গণ্য করবে। তবে তুমি তাদের তাচ্ছিল্য করবে না।"

সহনশীলতা বিবেকের চেয়েও বেশি দামি
[৪২] রাজা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সহনশীলতা আকল (যুক্তি, বুদ্ধি) থেকে সুউচ্চ। কারণ, মহামহিম আল্লাহ নিজেকে সেই নামেই অভিহিত করেছেন।”

সর্বাবস্থায় তাসবিহ পাঠ করতে থাকা
[৪৩] আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা আব্বাজানের সাথে চলছিলাম। তখন তিনি আমাদের বললেন, 'যতক্ষণ না ওই গাছ পর্যন্ত গমন করবে, ততক্ষণ তাসবিহ পাঠ করতে থাকো।' আমরা সেই গাছের নিকট পৌঁছা পর্যন্ত তাসবিহ পাঠ করতে থাকলাম। যখন আমাদের দৃষ্টির সীমায় অন্য একটি গাছ এল তখন তিনি বললেন, 'তোমরা তাকবির পাঠ করতে থাকো, যতক্ষণ না ওই গাছের কাছে পৌঁছো।' তখন আমরা তাকবির পাঠ করতে থাকলাম। তিনি (প্রত্যেক সফরে) আমাদের সঙ্গে এরূপ করতেন।"

পাপের ব্যাপারে সন্তুষ্টি বঞ্চনার কারণ
[৪৪] আবদুল্লাহ ইবনু শুমায়ত রাহিমাহুল্লাহ তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলতেন, “যে ব্যক্তি পাপাচারের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলো, সে পাপাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো। যে আল্লাহর অবাধ্যতার প্রতি সন্তষ্ট হলো, তার কোনো নেক আমল ওপরে উঠবে না (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না)।”
আবদুল্লাহ ইবনু শুমায়ত রাহিমাহুল্লাহ তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, "আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি—মুমিনের মূল পুঁজি হলো তার দ্বীন। সে যেখানে যায়, তার সঙ্গে তার দ্বীনও সেখানে যায়। সে তা ঘরে রেখে যেতে পারে না এবং লোকদের থেকে তার ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করে না।”

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শেষ রাতের আমল
[৪৫] আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের বেলায় যখন উঠতেন, তখন তার দুহাত উত্তোলন করতেন এবং আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতেন। এরপর তিনবার বলতেন,
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ، اللَّهُ أَكْبَرُ
'হে আল্লাহ, আপনার প্রশংসাসহ বড়ত্ব ঘোষণা করছি। আপনার নাম বরকতপূর্ণ এবং সমুন্নত। এবং আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ সর্বাধিক বড়।' এরপর তিনবার বলতেন,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।'
এরপর তিনবার বলতেন,
أَعُوذُ بِاللهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْثِهِ وَنَفْخِهِ
'সর্বজ্ঞানী সর্বশ্রোতা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি বিতাড়িত শয়তান থেকে—তার খোঁচা, ফুঁক ও কুমন্ত্রণা থেকে।”

মুমিনের পদস্খলনে উল্লাস কোরো না
[৪৬] ইয়াজিদ ইবনু মাইসারা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনের (ক্রোধের) আগুনকে ভয় করো, যেন তা তোমাকে পোড়াতে না পারে। কারণ, সে যদি দিনে সাতবারও হোঁচট খায়, তথাপি তার হাত মহামহিম আল্লাহর হাতেই থাকে। তিনি যখন চাইবেন, তাকে উঠিয়ে দেবেন।”

লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কতা
[৪৭] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ নেওয়ার সময় কমিয়ে নিতেন, আর দেওয়ার সময় ওজন করে দিতেন।”

বিদায়ের সময় সালামের ফযীলত
[৪৮] ইয়াহইয়া ইবনু রাশিদ আল-জারিরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের কাছে মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ আসলেন। তিনি তার পরিধেয় বস্ত্র খুলে রাখলেন। এরপর তার ওপর ভর দিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর মজলিস ত্যাগ করার জন্য উঠলেন। তখন তিনি সালাম দিলেন এবং বললেন, 'আমার কাছে এ মর্মে বর্ণনা পৌঁছেছে—যে ব্যক্তি কোনো কওমের মজলিসে বসবে, আর তাদের কাছ থেকে উঠে যাওয়ার সময় সময় সালাম দেবে, তবে সে (ব্যক্তি) উঠে যাওয়ার পরও লোকেরা যত ভালো কাজ করবে, সে তার সাওয়াবে অংশীদার থাকবে। (অর্থাৎ তাদের নেক আমলেরও বদলা পাবে)।"

হাজ্জাজের কারাগারে বন্দীদের আধিক্য
[৪৯] সালিহ ইবনু আবদির রহমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সুলায়মানের শাসনামলে আমরা হাজ্জাজের কারাগারে থাকা বন্দীদের সংখ্যা গণনা করেছি। তখন আমরা তাদের সংখ্যা পেয়েছি তেত্রিশ হাজার। (আর এই তেত্রিশ হাজার ছিল শুধু সেসব বন্দী) যাদের ওপর তখন পর্যন্ত কোনো অঙ্গ কর্তন কিংবা শূলে চড়ানোর ফায়সালা আরোপিত হয়নি।"
কাসিম ইবনু মুখাইমিরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো মুসলিমের কবর মাড়ানোর থেকেও আগুন নিভে যাওয়া পর্যন্ত অঙ্গারের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা বিঁধে যাওয়া পর্যন্ত বর্শার ফলার ওপর পা রাখা—আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।”
ইয়াহইয়া ইবনু আবী আমর আশ-শাইবানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাজা ইবনু হাইওয়া রাহিমাহুল্লাহ আসরের সালাত বিলম্বে পড়াকে উত্তম মনে করতেন এবং তিনি যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে সালাত পড়তেন।”
আলি ইবনু আবী হামলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক আমাকে তার সান্নিধ্যে রাখার ইচ্ছা করলেন। আমি এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু আবী যাকারিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে পরামর্শ করলাম। তিনি বললেন, তুমি স্বাধীন মানুষ। নিজেকে কিনা এখন দাস বানাতে চাচ্ছ!”

বাইতুল মাকদিসে ইবাদাতের ফযীলত
[৫০] আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইলয়াস এবং খাজির (আলাইহিমাস সালাম) রমাদান মাসে বাইতুল মাকদিসে সিয়াম পালন করতেন এবং প্রতিবছর সময় পূরণ করতেন।”
সুলাইমান ইবনু কাইসান আবী ঈসা খুরাসানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি বাইতুল মাকদিসে জামাতের সঙ্গে ফরজ সালাত আদায় করবে, তাকে পঁচিশ হাজার সালাতের সওয়াব দেওয়া হবে। আর যে একাকী সালাত আদায় করবে, তাকে এক হাজার সালাতের প্রতিদান দেওয়া হবে।”

জান্নাতে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না
[৫১] আবদুল কারীম ইবনু রশিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন জান্নাতিরা জান্নাতের দরজার কাছে এসে পৌঁছবে, তখন তারা পরস্পরের দিকে ষাঁড়ের (ন্যায় হিংস্র) দৃষ্টিতে তাকাবে। এরপর যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরের সব হিংসা দূর করে দেবেন। ফলে তারা ভাই ভাই হয়ে যাবে।”

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 হারিম ইবনু হাইয়্যান রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 হারিম ইবনু হাইয়্যান রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


আখিরাতের কথা স্মরণ
[৫২] মাতার আল-ওয়াররাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হারিম আল-আবদি রাহিমাহুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি হুমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে রাত যাপন করলেন। সে রাত পুরোটাই হুমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে কেঁদে কাটালেন। এভাবেই ভোর হলো। ভোর হওয়ার পর হারিম রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'হে হুমামাহ, কোন জিনিস আপনাকে কাঁদাল?' তিনি বললেন, 'আমার সেই রাতের কথা স্মরণ এসেছে-যার ভোর হবে এমন-যাতে কবরগুলো উন্মোচিত হবে, এরপর তার (কবরের) অধিবাসীদের বের করে আনা হবে।' এরপর একদিন হুমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হারিম রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে রাত যাপন করলেন। সে রাতও তিনি কেঁদে কেঁদে কাটালেন। অবশেষে ভোর হলো। ভোরে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসের স্মরণ আপনাকে কাঁদাল?' তিনি বললেন, 'আমার সেই রাতের কথা স্মরণে এসেছে, যার ভোরে আকাশের তারকাগুলো খসে পড়বে-এ বিষয়টি আমাকে কাঁদিয়েছে।' কখনো তারা দিনের বেলা একসাথে বের হয়ে 'রায়হান' (সুগন্ধ ফুল)-এর বাজারে আসতেন। সেখানে আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করতেন এবং এ ছাড়া আরও অনেক দুআ করতেন। তারপর তারা কামারদের কাছে এসে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। অবশেষে তারা আলাদা (পথ) ধরে নিজ নিজ বাড়ির দিকে যাত্রা করতেন।”

ফিতনা থেকে পানাহ চাওয়া
[৫৩] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমি আল্লাহর কাছে এমন কালে পৌঁছা থেকে পানাহ চাই-যাতে প্রবীণরা দীর্ঘ জীবনের স্বপ্ন দেখবে, নবীনরা অবাধ্য হয়ে যাবে, আর সে সময় মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে।"

পবিত্র বারিধায় সিক্ত সমাধি
[৫৪] আওন ইবনু আবী শাদ্দাদ রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি তার পিতার সূত্রে বলেন, আমি হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখেছি। এক গ্রীষ্মের দিনে তাকে দাফন করা হয়েছে। তখন একখণ্ড মেঘ এসে তার কবর এবং কবরের চতুষ্পার্শ্বে পানি বর্ষণ করেছে। পানি বর্ষণ শেষে সেই মেঘখণ্ড সরে গেছে।”

মৃত্যুকালীন ওসিয়ত
[৫৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের ইলমি মজলিসে আলোচনা হয়েছে, হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তাকে বলা হলো, আপনি ওসিয়ত করুন। তিনি বললেন, 'আমি জানি না, আমি কী ওসিয়ত করব। তবে তোমরা আমার বর্ম বিক্রি করে আমার ঋণ পরিশোধ করে দিয়ো। যদি এতে পুরোপুরি পরিশোধ (করা সম্ভব) না হয়, তাহলে আমার গোলামকেও বিক্রি করে দিয়ো। আর আমি তোমাদের সূরা নাহলের শেষের দিকের আয়াতগুলোর ওসিয়ত করছি,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ 'আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমাত এবং সদুপদেশের মাধ্যমে।”[২]

জান্নাত-জাহান্নাম প্রত্যাশীদের হতাশাব্যঞ্জক চিত্র
[৫৬] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি জাহান্নামের মতো এমন কিছু দেখিনি, যা থেকে পলায়নপর ব্যক্তি উদাসীনতায় মত্ত থাকে। আর আমি জান্নাতের মতো এমন কিছু দেখিনি, যার সন্ধানী নিদ্রায় বিভোর থাকে।”

অন্যায় কাজ থেকে বারণ না করার কারণে তিরস্কার
[৫৭] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ কোনো এক যুদ্ধে ছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তি তার কাছে অনুমতি চাইল। তিনি ভাবলেন, সে হয়তো কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন সারার জন্য অনুমতি চাচ্ছে। (তাই তিনি তাকে অনুমতি দিলেন।) সে ব্যক্তিটি বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে এল। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি (এতকাল) কোথায় ছিলে?' সে বলল, 'আমি অমুক দিন আপনার কাছে অনুমতি চেয়েছিলাম। আপনিও অনুমতি দিয়েছিলেন।' তিনি বললেন, 'তুমি তাহলে সেই অনুমতির দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নিয়েছিলে?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি তখন সেই ব্যক্তিটিকে অনেক শক্ত কথা বললেন। এ দেখে তার সঙ্গীদের কেউ আর তার সঙ্গে কথা বলেনি। কারণ, তারা তাকে রাগ করতে এবং এক মুসলিম ভাইকে শক্ত কথা বলতে দেখে (চুপ ছিল)।' তিনি বলেন, 'এরপর হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ সঙ্গীদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের ভাগ্যে মন্দ সাথি জুটুক। তোমরা দেখেছ, আমি আমার ভাইকে কী কথা বলেছি। এরপরেও তোমাদের কেউ আমাকে তা থেকে বারণ করলে না! হে আল্লাহ, আপনি মন্দ লোকদের মন্দ যুগের জন্য রেখে দিন।”

আল্লাহর অভিমুখী বান্দার পুরস্কার
[৫৮] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমাদের ইলমি মজলিসে আলোচনা হয়েছে যে, হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, কোনো বান্দা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহমুখী হয়, তবে আল্লাহর মুমিনদের অন্তর তার অভিমুখী করে দেন। তিনি তাকে বান্দাদের ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা দান করেন।"

শেষ রাতে কাব্যচর্চার কারণে নিন্দা জ্ঞাপন
[৫৯] মুহাম্মাদ বিন নাফি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা হারিম ইবনু হাইয়ানের সঙ্গে খোরাসান থেকে ফিরছিলাম। যখন আমরা মাঝপথে ছিলাম তখন এক রাতের শেষ প্রহরে আমি কবিতার একটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করছিলাম। তখন হারিম রাহিমাহুল্লাহ চাবুক উঠিয়ে আমার পিঠে একটা আঘাত করলেন। আমি তখন (কবিতা আবৃতি করা থেকে নিজেকে) গুটিয়ে নিলাম। তিনি আমাকে বলেন, 'যে সময় রহমান (দুনিয়ার আকাশে) নেমে আসেন এবং যে সময় দুআ কবুল করা হয়, তুমি সে সময়ে কবিতা আবৃত্তি করছ!”
অন্য বর্ণনায় কথাটা এভাবে এসেছে, “যে সময়ে দুআ কবুল হয় এবং রহমত নেমে আসে (তুমি সে সময়ে কবিতা আবৃত্তি করছ!)।”

পাপাচারী আলিম থেকে দূরে থাকা
[৬০] হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তোমরা পাপাচারী আলিম থেকে দূরে থাকো। কথাটি উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে পৌঁছল। তিনি এতে উদ্বিগ্ন হয়ে তার কাছে পত্র লিখলেন—পাপাচারী আলিমের স্বরূপ কী? তার পত্রের জবাবে হারিম রাহিমাহুল্লাহ লিখে পাঠালেন—আল্লাহর কসম হে আমিরুল মুমিনিন, আমি এর দ্বারা মন্দ কিছু উদ্দেশ্য নিইনি। একজন আলিম এমন ইমাম হয়, যে মানুষদের ইলমের কথা বলে আবার নিজে পাপাচারেও লিপ্ত থাকে। তখন জনসাধারণের কাছে বিষয়টা অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়।”

অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা থেকে দূরে থাকা
[৬১] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ-কে গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। তিনি বলেন, তখন তার ধারণা হলো—সম্প্রদায়ের লোকেরা তার কাছে যাতায়াত করবে। তাই তিনি অগ্নি প্রজ্বালনের নির্দেশ দিলেন। তার নির্দেশে তার বাসস্থান এবং তার সাক্ষাৎ-প্রত্যাশীদের মধ্যবর্তী স্থানে অগ্নি প্রজ্বালিত করা হলো। এরপর সম্প্রদায়ের লোকেরা তার কাছে এসে দূর থেকে সালাম দিলো। তখন তিনি বললেন, 'আমার সম্প্রদায়ের লোকদের স্বাগতম! আপনারা কাছে আসুন।' তখন তারা বলল, 'আল্লাহর কসম, আমরা আপনার কাছে আসতে পারব না। আগুন আমাদের এবং আপনার মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বললেন, আপনারা তো এর চেয়ে ভয়াবহ আগুন—জাহান্নামের আগুনে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান!'" বর্ণনাকারী বলেন, “তখন তারা ফিরে গেল।”

মৃত্যুকালীন উপদেশ
[৬২] আবু কাজআ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ মৃত্যুকালে ওসিয়ত করলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সূরা নাহলের শেষের দিকের আয়াতগুলোর ওসিয়ত করছি, ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ 'আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমাত এবং সদুপদেশের মাধ্যমে।'

জান্নাতের তাঁবু
[৬৩] খুলাইদ আল-উমারি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার কাছে বর্ণনা পৌঁছেছে যে, (জান্নাতের) তাঁবু হবে শূন্যগর্ভ মুক্তো (-নির্মিত); যার সত্তরটি কপাটই মোতির থাকবে।”

আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়
[৬৪] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হারিম ইবনু হাইয়ান ও আবদুল্লাহ ইবনু আমির (রাহিমাহুমাল্লাহ) হাজ্জের উদ্দেশ্যে বেরোলেন। পথ চলতে চলতে তাদের উষ্ট্রীবাহনের সামনে সিল্লিয়ানা[৩] পড়ল। এ দেখে তাদের উভয়ের উষ্ট্রীই সেদিকে দ্রুত ছুটে গেল। এরপর তাদের একজনের উষ্ট্রী তা খেয়ে ফেলল। তখন হারিম রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু আমিরকে বললেন, 'তোমাকে কি এ বিষয়টি আনন্দ দেবে যে, তুমি এই সিল্লিয়ানা হবে আর এ ধরনের কোনো পশু এসে তোমাকে খেয়ে চলে যাবে?' তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, আমি তার রহমতের প্রত্যাশা রাখি, প্রত্যাশা রাখি এবং প্রত্যাশা রাখি।' তখন হারিম বললেন, 'কিন্তু আল্লাহর কসম আমি এটা ভালোবাসি যে, আমি এই সিল্লিয়ানা হব আর এ ধরনের কোনো পশু এসে আমাকে খেয়ে চলে যাবে। এরপর আমার আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।"
[৬৫] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "হারিম ইবনু হাইয়ান এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আমির (রাহিমাহুমাল্লাহ) হিজায ভূমির উদ্দেশে বের হলেন। তারা নিজ নিজ উষ্ট্রীর ওপর চড়ে পথ চলছিলেন। একপর্যায়ে তারা এমন স্থান দিয়ে অতিক্রম করলেন যেখানে ঘাস, তৃণ ও লতাগুল্ম রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তাদের উভয়ের উষ্ট্রী সেই লতাগাছ নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হে ইবনু আমির, তোমাকে কি এ বিষয়টি আনন্দ দেবে যে, তুমি এই গাছগুলোর মধ্য থেকে একটি গাছ হবে, আর এমন কোনো উষ্ট্রী এসে তোমাকে খেয়ে যাবে, এরপর তোমাকে মলরূপে ত্যাগ করবে, ফলে তুমি মলরূপে গৃহীত হবে।' আবদুল্লাহ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, আমি মহান আল্লাহর থেকে যে রহমতের প্রত্যাশা রাখি, তা এর থেকে অনেক উত্তম।' তখন হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি এটা ভালোবাসি যে, আমি এই গাছগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি গাছ হব। আর এমন কোনো উষ্ট্রী এসে আমাকে খেয়ে মলরূপে ত্যাগ করে চলে যাবে। এরপর আমি পশুর মল হিসেবে গৃহীত হব। আর কিয়ামাত দিবসে আমাকে আর হিসাবের কষ্ট—হয়তো জান্নাত অভিমুখে কিংবা জাহান্নামের দিকে—ভোগ করতে হবে না। হে ইবনু আমির, আফসোস তোমার জন্য! আমি তো মহাদুর্যোগের আশঙ্কা করি।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তিনি ছিলেন তাদের উভয়ের মধ্যে মহান আল্লাহর ব্যাপারে অধিক ফিকহ এবং ইলমের অধিকারী।”

জাহান্নাম নিশ্চিত হয়ে গেলেও আমল পরিত্যাগ না করা
[৬৬] জামরাহ ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে যদি বলা হয়, আমি জাহান্নামীদের একজন তাহলে আমি আমল পরিত্যাগ করব না, যাতে আমার নফস আমাকে এই বলে তিরস্কার না করে যে, কেন করলে না! কেন করলে না!”

বৃষ্টি এসে তার কবরকে সিক্ত করে দিয়ে গেল
[৬৭] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হারিম রাহিমাহুল্লাহ এক গ্রীষ্মের দিনে কোনো এক যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন। যখন তার দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়, তখন একখণ্ড মেঘ এসে তার কবরকে সিক্ত করে দিয়ে যায়। তবে একফোঁটা পানিও কবরকে অতিক্রম করেনি (অর্থাৎ কবরের ভেতরে প্রবেশ করেনি)। এরপর সে (মেঘ) যেখান থেকে এসেছে, সেখানেই হারিয়ে যায়।”

টিকাঃ
[২] وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُمْ بِهِ وَلَبِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ “এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন উৎকৃষ্ট পন্থায়। নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক তাদের সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন, যারা তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি তাদের সম্পর্কেও পরিপূর্ণ জ্ঞাত, যারা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত। তোমরা যদি প্রতিশোধ নাও, তবে ঠিক ততটুকুই নেবে, যতটুকু জুলুম তোমাদের ওপর করা হয়েছে। আর যদি সবর করতে পারো তবে সবর অবলম্বনকারীদের পক্ষে তা-ই কল্যাণকর।" (সূরা নাহল, ১৬: ১২৫-১২৬)
[৩] পশুর খাদ্যবিশেষ।

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


দুটো অনন্য-সাধারণ স্বভাব
[৬৮] হারিস ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ বসরার এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'কী ব্যাপার! আপনি কঙ্কর স্পর্শ করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'তা স্পর্শ করার মধ্যে কোনো প্রতিদান নেই এবং তা পরিহার করার মধ্যে কোনো গুনাহ নেই। তবে আমার মধ্যে দুটো স্বভাব রয়েছে—আমার সঙ্গী যখন আমার কাছ থেকে চলে যায় তখন আমি তার দোষচর্চা করি না এবং আমি কোনো সম্প্রদায়ের এমন বিষয়ে নাক গলাই না, যে বিষয়ে তারা আমাকে সাথে রাখেনি।”

অবসর সময়ে কুরআন পাঠ
[৬৯] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে আহনাফ ইবনু কায়সের গোলাম অবগত করেছে—আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ যখন একান্ত সময় পেতেন তখনই তাকে কুরআন মাজিদ দেওয়ার জন্য আহ্বান করতেন।”

অসাধারণ বিনয়
[৭০] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি সহনশীল নই। তবে আমি সহনশীলতার ভান করি।"

পিঁপড়াদের স্থান ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ
[৭১] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একবার পিঁপড়া অনেক বেড়ে গেল। পিঁপড়ারা আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে অনেক কষ্ট দিচ্ছিল। তখন তিনি একটি চেয়ার আনার নির্দেশ দিলেন। ফলে একটি চেয়ার এনে পিঁপড়ার গর্তের ওপর রাখা হলো। এরপর তিনি আল্লাহর তাআলার প্রশংসা ও তার গুণ বর্ণনা করলেন। এরপর বললেন, 'তোমরা তো আমাদের কষ্ট দিচ্ছ। সুতরাং তোমরা নিবৃত্ত হয়ে যাও, অন্যথায় আমরাও তোমাদের কষ্ট দেবো।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "এরপর পিঁপড়ারা নিবৃত্ত হলো এবং সেখান থেকে চলে গেল।"

কথা বলা থেকে বিরত থাকা
[৭২] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, বানু তামিম গোত্রের এক শাইখ বলেন, "আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, (আল্লাহর কাছে) জবাব দানের ভয় আমাকে অধিকাংশ সময় কথা বলা থেকে বিরত রাখে।"

কৃতজ্ঞতার সাজদা
[৭৩] জুবায়র ইবনু হাবিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “দু-ব্যক্তি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছাল যে, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেছেন। (এ কথা শুনে তিনি) তখন তিনি সাজদায় লুটিয়ে পড়লেন।”

বিনয়ী দুআ
[৭৪] মারওয়ান আল-আসগার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে শাস্তি দেন, তাহলে আমি তো শাস্তিরই উপযুক্ত। আর আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে আপনি তো তারও অধিকার রাখেন।"

উম্মাহর ধ্বংস মুনাফিকের হাতে
[৭৫] আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি একবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসা ছিলাম। সে সময় তিনি বললেন, 'এই উম্মাহর ধ্বংস জ্ঞানী মুনাফিকের দু-হাতের মধ্যে রয়েছে। আমি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। ফলে তোমার মধ্যে কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি। সুতরাং তুমি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ফিরে যাও। কারণ, তারা তোমার মতামত-সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না।"

আগুনের ওপর হাত রেখে অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা
[৭৬] সালামাহ ইবনু মানসুর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার বাবা একটি গোলাম কিনলেন। গোলামটি এককালে আহনাফের মালিকানায় ছিল। পরবর্তীকালে তিনি তাকে আজাদ করে দেন। আমি তাকে তার বৃদ্ধ বয়সে পেয়েছি। তিনি বর্ণনা করতেন, আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ-এর রাতের বেলার সাধারণ সালাত ছিল দুআ। তিনি নিজের কাছে প্রদীপ রাখতেন। এরপর তার ওপর হাত রেখে বলতেন, 'অনুভব করো হে আহনাফ, কোন জিনিস তোকে অমুক অমুক দিন এই এই (গোনাহের) কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল?”

বাসগৃহ হিসেবে কুঁড়েঘরই পছন্দনীয়
[৭৭] সাঈদ ইবনু মাসউদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে—তিনি ছিলেন নিজ গোত্রের নেতা—বলা হলো, 'আমরা কি আপনার জন্য কখনো একটি বেষ্টনী তৈরি করব না?' তিনি বললেন, 'আমি জাহান্নাম ছাড়া অন্য কোনো স্থানের বেষ্টনীর কথা জানি না। আল্লাহর কসম, আমার এখানে কোনো বেষ্টনী তৈরি করা হবে না।"
বর্ণনাকারী বলেন, “তার বাসস্থান চিরকাল বাঁশনির্মিত কুঁড়েঘরই ছিল, যতদিন না তিনি মহান আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।”

বার্ধক্যের দিনগুলোতেও অবিরাম সিয়াম পালন
[৭৮] সাঈদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'আপনি অনেক বয়োবৃদ্ধ। সিয়াম পালন আপনাকে দুর্বল করে ফেলবে।' তিনি বললেন, 'দীর্ঘ অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আমি এগুলোকে গণনা করে রাখছি।"

লৌকিকতা বর্জন করা
[৭৯] আবুজ জিনবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক যুবক আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে হাঁটত। একদিন তিনি তার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সেই যুবকটি তার সামনে লৌকিকতা প্রদর্শন করল। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি বোধ হয় প্রদর্শনকারীদের একজন!' সে তখন বলল, 'হে আবূ বাহর, প্রদর্শনকারী কী?' তিনি বললেন, 'যারা এমন বিষয়ে প্রশংসা করা পছন্দ করে, যা তারা করেনি। হে ভাতিজা, যখন তোমার সামনে হক প্রকাশিত হয় তখন তুমি তা গ্রহণ করার জন্য মনকে স্থির কোরো এবং তা ছাড়া অন্য সকল কিছু থেকে বিমুখ হোয়ো।”

তিন কাজে তাড়াহুড়ো করা
[৮০] আবদুল আযীয ইবনু কারিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবূ বাহর, আমরা আপনার চেয়ে অধিক ধীরস্থির কোনো ব্যক্তি দেখিনি।' তিনি বললেন, 'তিনটি বিষয়ে আমার তাড়াহুড়ো রয়েছে।' তারা জিজ্ঞেস করলেন, 'সেগুলো কী?' তিনি বললেন, 'সালাত—যখন তার ওয়াক্ত আসে, আর আমি যতক্ষণ না তা আদায় করি; কুমারী মেয়ে—যখন তার উপযুক্ত পাত্র (তাকে বিয়ের) প্রস্তাব দেয়, যতক্ষণ না আমি তাকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিই। এবং মৃত ব্যক্তি—যখন সে মুস্তাযাব করে, যতক্ষণ না আমি তাকে তার কবরে রেখে আসি (এ তিনটি বিষয়ে আমার তাড়াতাড়ি রয়েছে)।"

বিপদের কথা কারও নিকট উল্লেখ না করা
[৮১] মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ্‌-এর এক ভাতিজা তার কাছে দায়িত্বভার অভিযোগ করল। তখন আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ্‌ তাকে বললেন, ‘চল্লিশ বছর হলো আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে। আজও আমি এ কথা কারও সামনে উল্লেখ করিনি'।”

আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা
[৮২] ইবনু শওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি নিজেকে কুরআনের সামনে উপস্থাপন করলাম। তখন আমি নিজেকে এই আয়াতের থেকে অন্য কিছুর সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ পেলাম না :
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ
'আর কিছু লোক এমন, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা ভালো কাজের সাথে খারাপ কাজ মিশ্রিত করে ফেলেছিল। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন'।”[৪]

মিথ্যা বলার চেয়ে নীরব থাকা ভালো
[৮০] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “লোকেরা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মতবিনিময় করল। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ তখন নীরব ছিলেন। তাই মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'কী ব্যাপার, তুমি কিছু বলছ না যে!' তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি, যদি আমি মিথ্যা বলি। আর আমি তোমাদের ভয় করি, যদি আমি সত্য বলি'।”

সজ্জিত ঘরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকা
[৮৪] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ এক সফর থেকে ফিরলেন। এসে দেখলেন, লোকেরা তার ঘরের ছাদকে পরিবর্তন করে ফেলেছে (অন্য বর্ণনায় কথাটা এ বাক্যে এসেছে-ছাদে লাল-সবুজ রং করে ফেলেছে)। লোকেরা তাকে বলল, 'আপনার ঘরের ছাদ সম্পর্কে আপনার কী মন্তব্য?' তিনি বললেন, 'তোমাদের কাছে ওজর পেশ করছি। আমি এই ঘরে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রবেশ করব না, যতক্ষণ না তোমরা তাকে পূর্বের রূপে ফিরিয়ে আনো।”

দুনিয়াতে গুনাহগারের জন্য প্রশান্তি নেই
[৮৫] আবূ মুআবিয়া আল-গালাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বনু তামিম গোত্রের একজন লোক বর্ণনা করেছেন, 'আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—মিথ্যুকের কোনো ব্যক্তিত্ববোধ নেই। হিংসুকের কোনো প্রশান্তি নেই। কৃপণের কোনো অন্তরঙ্গতা নেই। দুশ্চরিত্রের কোনো সম্মান নেই। বিরক্ত ব্যক্তির কোনো ভ্রাতৃত্ব নেই।”

আত্মমর্যাদাবোধ
[৮৬] হাজানা ইবনু কাইস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'অপদস্থতার বিনিময়ে অসংখ্য লাল উটের অধিকারী হওয়াকেও আমি অপছন্দ করি।”

টিকাঃ
[৪] সূরা তাওবা, ৯:১০২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00