📄 যোহরের নামায : আছরের নামায
যোহরের নামাযঃ ঐ সময় পড়া হয় যখন সূর্য তার চূড়ান্ত উচ্চতা স্পর্শ করে অস্তাচলের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আসরের নামাযঃ ঐ সময় পড়া হত, যখন সূর্যের আলো হযরত আয়েশা রাযি. এর হুজরাতে প্রবেশ করত। আর তখন ছায়া থাকত না。
📄 মাগরিবের নামায : এশার নামায : ফজরের নামায
মাগরিবের নামায : ঐ সময় পড়তে হত, যখন নিজের নিক্ষিপ্ত বর্ণা দৃষ্টিগোচর হত।
এশার নামাযঃ রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর পড়া হত।
ফযরের নামাযঃ হুযুর এর যুগে অতি ভোরে পড়া হত। যখন আপন চেহারা স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হত না।
ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানে তখনই মাসায়ালাটি অত্যন্ত গুরুত্ব লাভ করেছে যাতে নামায সমূহের সঠিক সময় নির্ধারণ করা হোক। এ সব বিষয় দু'শতাব্দি পর খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্ধারণ করা হয়। যখন আব্বাসী যুগের সূচনা হয়, আর তা কমবেশী একহাজার বছর কার্যকর থাকে। বছরের সব দিনের নামাযের সময়ের প্রান্তরেখা প্রায় হিজরী তৃতীয় শতক খ্রিস্টীয় নবম শতকে নির্ধারণ করা হয়। আর খ্রিস্টীয় নবম শতকে তা সংশোধন করা হয়। খ্রিস্টীয় পনের শতকে ওসমানী রাজত্বকালে বিশেষ ব্যবস্থায় এর উন্নতি সাধন করা হয়। আর বিভিন্ন প্রকার মাধ্যমে স্পষ্ট প্রান্তরেখা তৈরী করা হয়। ইসলামে সঠিক পরিমাণ নামাযের (ফযর ও মাগরীবের) সময় নির্ধারণ করা ভীষণ জরুরী ছিল। আর জ্যোতির্বিজ্ঞান এ বিষয় সবচেয়ে বেশী গুরুত্বারোপ করেছে যে, যাতে সকালের আলো ফুটে উঠার ও সন্ধ্যায় আসমান লালিমা স্পষ্ট হয়ে উঠা জানতে পারে। মুসলমান জানেন লালিমা ফুটার সূচনা কখন শুরু হয়। যখন সূর্য দিগন্ত থেকে আঠা ডিগ্রী নিচে নেমে যায়। আর রাতও তখন শুরু হয়, যখন সূর্য অস্তমিত হয়ে আঠার ডিগ্রী নিচে নেমে যায়। কিন্তু এ পার্থক্য বিষুব রেখার উপর দৃষ্টিগোচর হয়। আর আমরা যে যে পরিমাণ দূরে থাকব, সময়ও তত বেশী হয়ে যাবে। যদিও প্রাচীনকালের বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে অবগত ছিল। কিন্তু তাঁরা এক মধ্যম সময় বের করে নিয়েছেন। তা হল ২০ ডিগ্রী থেকে ১৬ ডিগ্রী পর্যন্ত। এটা সকল প্রান্তরেখার মধ্যম সময়ের উপর নির্ভর করে তৈরী করা হয়েছে। হাবশুল হাবিস (৮৫০ হিঃ), আর আত্ তারবিজি (১০০৭ হিঃ) সম্ভবতঃ প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিল। তাঁরা সর্বপ্রথম ১৮ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেন। আল বাত্তানী এ সম্পর্কে কোন চিন্তা-ভাবনা করেননি। তবে আল বেরুনী (১২০৫ হিঃ) "আল-কানুনল মাসউদী" নামক গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা করে বলেছেন-
সকালে আমরা প্রথমে আসমানে এক হাল্কা আলোর রাস্তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করি। এটাকে সুবহি কাযিব বলা হয়। শহর পরিবর্তনের সাথে সাথে ঐ সুবহি কাযিবের সময়ের পরিমাণও কম বেশী হতে থাকে। এটাকে "আসির জান" বা ভেড়ার লেজ বলা হয়। কেননা এটা অনুরূপ আকৃতিতে দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর পূর্ব দিগন্তে সাদা আলোর রেখা ফুটতে শুরু করে। এটাকে সুবহি সাদিক বলা হয়। এ সময় সকালের নামাযের ওয়াক্ত হয়। এরপর পূর্ব দিগন্ত লাল হয়ে যায়। সন্ধ্যায় এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা হয়। আল-বেরুনী এর জন্য ১৮ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেছেন। তথাপি তিনি ১৭ ডিগ্রীর পার্থক্যের উল্লেখ করেছেন। ইবনুল হাইছাম ও ১৮ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেছেন। এর দু'শতাব্দী পর আল মারাকেশী সুবহি কাযিব থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়কে ২০ ডিগ্রীতে নির্ধারণ করেন। আর সূর্যাস্তের পর রাত শুরু হওয়া পর্যন্ত সময়ের পার্থক্য ১৬ ডিগ্রী উল্লেখ করেন। এর দু'শতাব্দী পর ইবনে শাতির যথারীতি ১৯ ও ১৭ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেন। তাঁর সমসাময়িক আল-হালিলী ঐ সময়কে তার নিজস্ব প্রান্তরেখা ব্যবহার করে। ওসমানী খিলাফতকালে নামাযের সময় নির্ধারণে ইবনে শাতিরের প্রান্তরেখা ব্যবহার করা হত। বর্তমান যুগেও বলা হয় তখন থেকেই সুবহি কাযিবের সূচনা হয়, যখন পর্যন্ত সূর্য দিগন্ত রেখা থেকে ১৯ ডিগ্রী নিচে অবস্থান করে। আর রাতের সূচনা হয় যখন সূর্য দিগন্ত থেকে ১৭ ডিগ্রী নিচে চলে যায়। বিভিন্ন ধরনের জটিল ও কঠিন ফরমূলার সাথে মুসলমানগণ কিবলার স্পষ্ট প্রান্তরেখা নির্ধারণ করে নিয়েছে। তাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা কাজে লাগানো হয়েছে। আর সর্বত্র স্থান ও এলাকা থেকে কিবলার সঠিক দিক নির্ণয় করা যেতে পারে এই শর্তে যে, প্রথমে ঐ স্থানের ব্যপ্তির দৈর্ঘ ও প্রস্থ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে। আর মুসলমান বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ এ বিষয় ভালোভাবে অবগত থাকার কারণে তাদের নির্ধারিত প্রন্থরেখা কমবেশী চূড়ান্তভাবে পৃথিবীর সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। তুরস্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় বিষয় কম্পিউটারের সাহায্যে প্রতিটি গ্রামে কিবলার সঠিক দিক নির্ণয় করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর জন্য সামান্য পরিমাণ কমবেশী করতে হয়েছে।
📄 কুরআন, বিজ্ঞান ও অধিবিদ্যা
পৃথিবীতে প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আমরা তিন ভাগে বিভক্ত করেছি। যথা- ১. স্বাভাবিক জ্ঞান। ২. প্রবৃত্তিগত জ্ঞান। ৩. প্রবৃত্তি বহির্ভূত জ্ঞান। প্রথমোক্ত জ্ঞানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু পরে উল্লেখিত জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করা আমার প্রতিপাদ্য। অর্থাৎ অধিবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা। মানুষও তিন ভাগে বিন্যস্ত হয়েছে। অনুভূতি সম্পন্ন, অনুভূতিহীন, অনুভূতি বর্জিত। উক্ত তিন শ্রেণী তিন জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত। আমরা যখন কোন কিছুর বাহ্যিক আকার আকৃতিতে প্রবেশ করি অর্থাৎ আমরা যখন বস্তু সম্পর্কে অনুভব করি, তখন আমরা সে বস্তু প্রত্যক্ষ করি অথবা আমাদের অন্তরে ঐ বস্তুর কামনা-বাসনা বা চাহিদা সৃষ্টি হয়। তখন আমাদের তিন স্তরই পরিভ্রমণ করতে হয়। প্রথমে আমরা কোন বস্তুর সংবাদ পাই। তারপর ঐ সংবাদ অনুযায়ী জল্পনা-কল্পনার চিত্র অংকন করি। তারপর ঐ কাল্পনিক নকশাকে বাস্তব রূপ দান করে আমাদের সামনে নিয়ে আসি। সংবাদ সম্পর্কিত জ্ঞানকে আমরা অন্য এক পদ্ধতিতে বর্ণনা করি।
সৃষ্টিজগতে বিস্তৃত দৃশ্য সম্পর্কে আমরা যদি চিন্তা-ভাবনা করি, তাহলে এ বিষয় আমাদের ধ্যান-ধারনা অর্থাৎ সংবাদ সকল সৃষ্টিজীবে বিদ্যমানতায় যৌথভাবে সাদৃশ্যতা পরিলক্ষিত হয়। এর উদাহরণ স্বরূপ পানি প্রত্যেক লোক, জীব, জন্তু, উদ্ভিদ ও জড় পদার্থ পানি মনে করে। আর তা থেকে এমনভাবে উপকৃত হয়। যেভাবে একজন মানুষ উপকৃত হয়। অনুরূপভাবে আগুন প্রত্যেক সৃষ্টিজীবের জন্য আগুন। যেমন মানুষ আগুন থেকে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে তেমনি ছাগল, বাঘ, কবুতর, জমিনের কীট-পতঙ্গও আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। এক ব্যক্তির মিষ্টি খুব প্রিয়, অপর ব্যক্তি স্বভাবতঃ মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ নেই। কিন্তু ঐ দু'ব্যক্তি মিষ্টিকে মিষ্টি এবং লবণকে লবণ বলতে বাধ্য হয়। পরবর্তী জ্ঞান প্রবৃত্তি বা উৎস বিজ্ঞপ্তির জ্ঞান এমন এক জ্ঞানের পরিধি, যার মাঝে রং পাওয়া যায়। যখন ঐ রংয়ের মধ্যে অনুভূতি হীনতার রং প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার অবস্থা প্রবৃত্তির মত হয়ে যায়। আর যখন এ রং কর্মময় ও স্পন্দশীল হয়ে যায়, তখন তার অবস্থা অনুভূতি সম্পন্ন হয়ে যায়।
অনুভূতি এ ইজেন্সির নাম, যা অর্থকে বাহ্যিক পোশাক পরিয়ে দেয়। অনুভূতিহীনতা ঐ ধারনার নাম, যা কোন সংবাদকে অর্থবহ করে দেয়। আর হরেক রকম অনুভূতিহীনতা এমন বৃত্ত, যাতে জ্ঞানের অবস্থান শুধু জ্ঞানই হয় অর্থাৎ ঐ জ্ঞান শুধু সামর্থ অনুযায়ী জ্ঞানের জন্য শুধু জ্ঞানই হয়। তাতে অর্থ ও আকার আকৃতি পাওয়া যায় না, হরেক রকম অনুভূতিহীনতার স্তর অতিক্রম করে যখন এ জ্ঞান অনুভূতিহীনতায় প্রবেশ করে, তখন এই অনুভূতিহীনতা স্বীয় আগ্রহ ও পরিবেশের সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় চিন্তা ধারা অনুযায়ী তাকে অর্থের আবরণী দান করে। উদাহরণতঃ ক্ষুধা এক ধরনের বিজ্ঞপ্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত এটা অনুভূতিহীনতায় বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ তা শুধু ক্ষিধা থকে। কিন্তু অনুভূতিহীনতায় প্রবেশ করার পর এর চাহিদার পূর্ণাঙ্গতা পৃথক পৃথক অর্থে সজ্জিত করে দেয়। ক্ষুধার খবর বাঘ ও ছাগল উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু ছাগল ঐ খবরের পূর্ণাঙ্গতা ঘাস খেয়ে পূরণ করে। আর বাঘ ঐ খবর পূর্ণাঙ্গ করার জন্য মাংস খায়। তাদের উভয়ের ক্ষুধার ক্রিয়াকর্ম প্রায় এক সমান। কিন্তু ক্ষুধার খবরকে পৃথক পৃথক অর্থে সজ্জিত করা উভয়ের বৈশিষ্ট্য পৃথক পৃথক।
সৃষ্টির আদি থেকে মানুষের মাঝে তত্ত্ব অনুসন্ধানের উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করছে। আদম সন্তান সৃষ্টির সূচনা থেকে সৃষ্টি জগতের মাঝে তার চার পাশে বিদ্যমান বস্তুসমূহ চেনা-জানা ও তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। তারা এর উপর সর্বদা যথারীতি মেধা খাটিয়ে আসছে যে, এ পুরো সৃষ্টিজগত কিভাবে গঠিত হয়েছে? কেন হয়েছে? আমি নিজে কেন অস্তিত্ব লাভ করেছি? কেনইবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব? এ বিষয় জানার জন্য তাকে অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রথম প্রথম তাকে স্বভাবের ময়দানে হাত-পা ছুড়ে মারতে হয়েছে। আর এর মূলতত্ত্ব বুঝার চেষ্টায় লিপ্ত থাকতে হয়েছে। সে স্বীয় কামনা-বাসনা আর প্রয়োজন মোতাবেক আসবাবপত্র সাজানো, ইমারত নির্মান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, অনুরূপ আরো অনেক জ্ঞানের উদ্ভাবন করেছে। সেসব জ্ঞানে ব্যাপক উন্নতি সাধনও করেছে। কিন্তু তারপরও সৃষ্টি জগতের নিগুঢ় তত্ত্ব ও বাস্তবতা বুঝতে অক্ষম রয়ে গেছে। বলা বাহুল্য যে, এটা মানুষের সাধারণ অবস্থা। প্রত্যেক যুগে মানব জাতির মধ্যে এমন অনেক বরেণ্য ব্যক্তি ছিলেন, যারা হতেন এ সব শর্তাবলীর উর্ধে। আর তাদের সংস্কারসমূহকে মানুষ নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
হিজরী দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষষ্ঠদশ শতকে তুর্কীরা উন্নতির চরম শিখরে আরোহনে করতে শুরু করে। অবশেষে খ্যাতির শীর্ষে আরোহন করে। উনবিংশ ও বিংশ শতকে যে ইসলামী বর্ষপঞ্জি হিসেবে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে মানুষের স্বভাবগত জ্ঞানে বিপ্লবের সূচনা হয়। মানুষের সামনে নতুন নতুন পথ ও জ্ঞানে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। মানুষ শব্দ তরঙ্গ উদ্ভাবন করে, বেতার যন্ত্র ও টেলিভিশন আবিষ্কার করে, বিদ্যুৎ আবিষ্কার করে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করে শক্তির সাহায্যে স্থানের দূরত্ব কমিয়ে নিয়ে আসে। আর সময়ের ব্যবধানকে এমনভাবে কমিয়ে আনে যে, কয়েক বছরের ভ্রমণের দূরত্বকে কয়েক ঘণ্টায় নিয়ে আসে। এসব উন্নত চিন্তা-ভাবনা মানুষের মেধাকে উন্নতি দান করে। আর তারা জেনে নিয়েছিল যে, মানুষের অনুভূতি ও সত্ত্বাগত স্পন্দনের পেছনে সূক্ষ্ম স্পন্দন কাজ করছে। যার মাধ্যমে মূলে স্পন্দন করছে। শব্দের তরঙ্গ সমূহ উদ্ভাবন করে তাতে প্রশস্ত ঢেউ সৃষ্টি করে। আর তরঙ্গ সমূহের উদ্ভাবন তাদের ধ্যান-ধারনাকে শক্তিশালী করে দেয়। মানুষ আরো বেশী আবিষ্কার করে প্রবৃত্তির বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করে। তাকে এক বাস্তব জ্ঞানের আকৃতি দান করে। ধ্যান-ধারনা আকার আকৃতি অনুভূতি যথা অনড় হাড়ে অস্তিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিক্রিয়াশীল উদাহরণ মনে করে এ সম্পর্কে গবেষণার দরজা উন্মুক্ত করে দেয়।
তারপর মানুষ আরো এক কদম সামনে অগ্রসর হয়ে স্বীয় গবেষণায় স্বভাব ও প্রবৃত্তির ঐ দিক তাকে লাগিয়ে আরো এক দুনিয়ায় আলো জ্বালায়। আর পরবর্তীতে স্বভাব এটাকে ম্যাটাফিজিক্স আর প্রবৃতি পরবর্তীকে প্যারা সাইকোলোজি নামে অবিহিত করে। বিজ্ঞানীগণ ফটোগ্রাফারের উন্নতি সাধন করে উন্নততর প্রযুক্তিক ফারলীযুক্ত ফটোগ্রাফি ব্যবহার করে রং ও আলোর পৃথিবীতে প্রবেশাধীকার লাভ করে। তারা এ উপমার দেহ বা নূরের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগতি লাভ করে। যা প্রত্যেক সত্ত্বাগত বস্তুকে আবেষ্টন করে আছে। তারা ওটাকে (AURA) নামে অভিহিত করে। আমেরিকা, ইউরোপ বিশেষ করে রাশিয়া ভ্রমণ কারীদের জবাব এ বিষয়কে বাস্তবতায় পৌঁছে দিয়েছে যে, এ তরঙ্গ সমূহ যা সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর তাদের বুনিয়াদের উপর সত্ত্বাকে স্থিতিশীল করে দেয়। এখন এ বিষয় গোপন ও অপ্রকাশ্য নয় যে, মানুষের আভ্যন্তরীণ কর্মদক্ষতার অনেক বড় এক ভাণ্ডার হাতে রয়েছে। যাতে টেলিপাথি, ভবিষ্যৎ দেখার যেরূপ কর্মদক্ষতা সামনে এসে গেছে। আর এর উপর গবেষণার কাজ চলছে। আজ মানুষ ঐ বিন্দুতে রয়েছে, যেখানে সে সত্ত্বাকে অনুভব করার পর তরঙ্গ সমূহের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পবিত্র কুরআন মজীদ সমস্ত সৃষ্টিজীবের বিধি-বিধান জ্ঞানের মূল উৎস। তাতে সব জ্ঞানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বিদ্যমান।
পবিত্র কুরআন মজীদের বিষয় বস্তু সমূহকে মৌলিকত্বের দিক থেকে বিরাট বিরাট দু'ভাগে বিভক্ত করেছে। এর এক অংশে ঐ বিধিবিধান নিয়মাবলীর অন্তর্ভূক্ত করেছে, যা এক উন্নত সমাজের জন্য জরুরী। এ অংশে চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব লাভ ও বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতনের কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশ যা কুরআন মজীদের এক বিরাট অংশ, তাতে ঐ ফরমূলা ও বিধিবিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যার উপর মহান আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিজীব সৃষ্টি করেছেন। এ অংশে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অবস্থাকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ অংশকে পরকাল নামে অবিহিত করা হয়েছে। তাছাড়া এ বিশ্বজগতের বিধিবিধান সমূহ অপরিবর্তনীয় ও অলংঘনীয়। এটা আদি থেকে একইরূপে চলছে। অনন্তকাল পর্যন্ত তাই একইভাবে চলতে থাকবে। পবিত্র কুরআন মজীদে এটাকে "ফিতরাতিল্লাহ" বা আল্লাহর আদেশ বলা হয়েছে। আল্লাহর আদেশ ঐ বিধি-বিধান ও ফরমুলা সমূহের সমষ্টি, যার অধিনে প্রতি মুহূর্তে ও প্রতিক্ষণে সৃষ্টিজীবের জীবনে অস্তিত্ব সংশ্লীষ্ট হচ্ছে।
সৃষ্টিজগত এক মজবুত ও সুশৃঙ্খল নিয়মত্রান্ত্রিক তার নাম, যাতে কোন প্রকার অসঙ্গতী ও অনিয়মের দখল নেই। সব কিছু চিরন্তন অলঙ্ঘনীয় এক বিধানের অধিনে সংঘটিত হচ্ছে। তবে আক্ষেপের বিষয় হল, প্রথম অংশের প্রতি আমরা মনোযোগ দিয়েছি বটে। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ বাদ দিয়েছি। কারণ তা সর্ব সাধারণের বোধগম্য নয়। তা বুঝার জন্য বাস্তবিক প্রতিবন্ধকতার মুকাবিলা করতে হয়। কেননা তাতে অনুভূতির সাথে জ্ঞানের সম্পর্কের প্রয়োজন। যে কোন অনুভূতিহীন জ্ঞান তখন লাভ হয়, যখন শিক্ষার্থী অনুভূতিশীল আশা নিজে অনুভব করে। অনুভূতিহীন জ্ঞান বুঝার জন্য ভীষণ জরুরী হল, আমরা স্বীয় প্রবৃত্তির কামনা বাসনা ও জীবনের বাহ্যিক উপকরণে আঘাত করে প্রার্থিব আকর্ষণ যথাসম্ভব কমিয়ে নিতে হবে। কুরআন মজীদে এ জ্ঞানকে কিতাবের জ্ঞান বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। হযরত সুলাইমান আ. এর ঘটনায় বলা হয়েছে, তিনি তাঁর দরবারে উপস্থিত সভাসদগণকে সম্বোধন করে বলেছেন, "সুলাইমান বললেন, হে আমার সভাসদ বর্গ! তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে তার সিংহাসন আমার নিকট নিয়ে আসতে পারো, সে আমার নিকট অনুগত হয়ে উপস্থিত হওয়ার পূর্বে? এক বড় দুষ্ট জ্বিন বলল, আমি উক্ত সিংহাসন আপনার সম্মুখে উপস্থিত করে দেব, হুজুর সভার সমাপ্তি ঘোষণার পূর্বে। আর আমি নিঃসন্দেহে সেটা করার ক্ষমতা সম্পন্ন বিশ্বস্ত। ঐ ব্যক্তি আরয করল, যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল। আমি সেটা হুযুরের সামনে হাযির করব চোখের পলক পড়ার পূর্বেই। (সুরা-নামল-৩৮-৩৯)"
হযরত সুলাইমান আ. চোখের পলক ফিরিয়ে দেখলেন যে, রানীর সিংহাসন তার সামনে বিদ্যমান। অথচ ইয়ামান থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দূরত্ব ছিল প্রায় ১৫০০ মাইল। আর এ দূরত্ব চোখের পলকের মধ্যে সমাপ্ত হয়ে যায়। এ কিতাবের জ্ঞান ঐ সৃষ্টি জীবের বিধি-বিধান ও ফরমূলা সমূহের নাম। যার অধীনে সৃষ্টিজীব জীবন্ত ও স্পন্দনশীল হয়। জমিনের আবর্তন, আসমান থেকে পানি বর্ষণ, উদ্ভিদের উদগমন, জমিনে বিদ্যমান উদ্ভিদ, জীবজন্তু ও জড়পদার্থের জন্ম-মৃত্যু, তাদের প্রাণ স্পন্দন, গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন-বিবর্তন মোটকথা প্রতিটি স্পন্দন যে কোন এক বিধানের অনুগত। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ বিশেষ জ্ঞান হযরত আদম আ. কে দান করা হয়েছে। এটাকে কুরআন মজীদে "ইলমুল আসমা" নামে অভিহিত করা হয়েছে। এ জ্ঞানই হযরত আদম আ. কে ফিরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। এ জ্ঞানই হল মুমিনের মিরাজ। এ জ্ঞান শিখার পর যদি কোন মানুষ সৃষ্টিজীবের ফরমূলা অবগত হয় এবং উপকরণ সমূহকে এভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে, যার উদাহরণ হযরত সুলাইমান আ. এর ঘটনায় কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে। ঐ জ্ঞান অর্জনের পর মানুষ উপায়-উপকরণের মুখাপেক্ষী থাকে না বরং উপায়-উপকরণ তার অনুগত হয়ে যায়।
আর তখন সে উপায়-উপকরণের উপর ইঙ্গিতে কাজ চালাতে সক্ষম হয়। এ জ্ঞান এ বৃত্তি থেকে শুরু হয়, যাকে আমি স্বভাব পরবর্তী বা প্রবৃত্তি পরবর্তী জ্ঞান বলে উল্লেখ করেছি। অধিবিদ্যা বা গোপনীয় বিদ্যা কাকে বলা হয়? আর তা কিভাবে বুঝানো যাবে? তার দ্বারা কিভাবে উপকৃত হওয়া যাবে? এর দু'টি পদ্ধতি রয়েছে। এক. রাহমানী। দুই. যাদু মন্ত্র। যদি খবর সৃজনশীল ও গঠনমূলক হয়, তাহলে এ জ্ঞান রাহমানী। আর যদি অর্থের বিকৃত হয় তাহলে হুযুর জ্জ্বালালাইন এর ঘোষণা অনুযায়ী তা যাদুমন্ত্র। এ সূত্র হচ্ছে, যদি জ্ঞানের তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থার গঠনমূলক হয়, তাহলে তা সত্য হবে। আর যদি জ্ঞানের মৌলিক অবস্থা বিকৃত হয়, তাহলে তা হবে শয়তানী। গঠনমূলক হোক বা বিকৃত হোক, সত্য হোক বা শয়তানী হোক। উভয়ই চিন্তা-ভাবনার সাথে সম্পৃক্ত। আর যে কোন চিন্তা-ভাবনাকে সুদৃঢ় মজবুত বানানোর জন্য তার নিয়ম-কানুন নির্দিষ্ট করা জরুরী। রাহমানী ও শয়তানী উভয় দলের চিন্তা-ভাবনা ও বাক্য পদ্ধতি পৃথক। পৃথক। আর এ বাক্য পদ্ধতি চিন্তা-ভাবনাকে গতিশীল করার জন্য ব্যবহার করা হয়। দুনিয়া প্রত্যাশি ব্যক্তির বা যাদুমন্ত্রের বাক্য পদ্ধতি হচ্ছে দেও, কালি, ওয়াহলীন। এ শব্দসমূহ প্রথমে হিব্রু ভাষায় মিশরে প্রচলিত হয়। হযরত নূহ আ. এর যুগ পর্যন্ত সত্যপন্থি ওলামায়ে কিরাম বাক্য পদ্ধতি ছিল নিছক "আল্লাহ" ও "ইল্লাল্লাহ”। হযরত নূহ আ. এরপর তামখা ও তাখমিয়া সত্যপন্থিদের এ পদ্ধতি এটা নির্ধারিত হয়। দেওয়াহ ও কালীওয়াহ তারা রহিত করে দেয়। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি তা সমর্থন করেনি। তারা তাদের বিকৃত চিন্তা-ভাবনায় সেটাকেই বাক্য পদ্ধতি বানিয়ে নেয়। ঐ সব লোকদের অস্বীকৃতির কারণে এ বাক্য যাদুর বাক্য ও পদ্ধতি হয়ে যায়। তারপর হযরত ইবরাহীম আ. এর কয়েক শতাব্দি পূর্বে "আল্লাহ" ও "ইল্লাল্লাহ" বাক্য একাত্ববাদের বাক্য ঘোষণা করা হয়। তামখাহ ও তাখমিয়াহ রহিত হয়ে যায়। এ সময় হতে এখন পর্যন্ত সত্যপন্থি সত্য সন্ধানীদের বাক্য ও পদ্ধতি আল্লাহ ও ইল্লাল্লাহ নির্ধারিত আছে। কিয়ামত পর্যন্ত তা-ই বহাল থাকবে।
ব্যাবিলনীদের যুগ থেকে ইবলিসের বংশধরগণ দেওয়াহ ও কালিওয়াহকে এই পর্যন্ত তাদের বাক্য ও পদ্ধতি মেনে চলছে। তারা সে যুগের শেষ পয়গাম্বর (সাঃ) কর্তৃক বিলুপ্তিকে সমর্থন করে না। এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ও ব্যাখ্যার সারমর্ম হল জ্ঞানের অবস্থান একই। কিন্তু এর মধ্যে অর্থ প্রবেশ হওয়ার পর জ্ঞানের অবস্থানকে দু' ভাগে বিভক্ত করা হয়। এক ভাগকে ফকিরী ও আহলুল্লাহদের পদ্ধতি বলা হয়। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিকে শয়তান ও ইবলিসের বংশধরদের পদ্ধতি বলা হয়। ঐ জ্ঞান আহলুল্লাহদের হোক বা ইবলিসের বংশধরদের বিপ্লবের কারণে সময়ের সাথে সাথে অসংখ্য শাখায় বিভক্ত হতে থাকে। আর তখন প্রত্যেক শাখাকে পৃথক পৃথক নামকরণ করা হয়। যেমন জ্যোতিষ বিদ্যা, নক্ষত্র বিদ্যা, সংখ্যা বিদ্যা, গণনার জ্ঞান, হ্যাফটানিজম, টেলিপাথি, মুখমণ্ডল দর্শনের জ্ঞান, হাতি গণনার জ্ঞান, হাযির করার জ্ঞান, যাদুমন্ত্র, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও অন্যান্য আরো অনেক জ্ঞানের উদ্ভব হয়।
আধ্যাত্মিক জ্ঞানের কানুনের যে কোন শাখা হোক তার সম্পর্ক সর্বোপরি সর্বাবস্থায় অনুভূতিহীনতা বা সবরের উৎস থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি ঐ সব জ্ঞানকে এক বৃত্তে সমবেত করা হয়, তাহলে এতটুকু বলা যথেষ্ট হবে যে, এটা এক অনুভূতি বহির্ভূত জ্ঞান অর্জন করার জন্য আমাদের পথপ্রদর্শক হল আল-কুরআন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন।
وَخَلَقْنَاكُمْ أَزْوَاجًا
আমরা প্রত্যেক বস্তু জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। (-সুরা নাবা)
মানুষের অনুভূতিরও দু'টি দিক রয়েছে। এক প্রকার অনুভূতি দ্বারা সময় ও স্থানকে সীমিত করে রাখা হয়েছে। আর দ্বিতীয় প্রকারের অনুভূতিকে সময় ও স্থান থেকে অবমুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যে অনুভূতি সময় ও স্থানকে বন্ধ করে দেয়, কুরআন তার নামকরণ করেছে দিন। আর যে অনুভূতি স্থান ও কাল থেকে অবমুক্তি দান করে, কুরআন তার নামকরণ করেছে রাত। কুরআন মজীদের একাধিক স্থানে রাত ও দিনের অনুভূতির স্তরকে বন্ধি করে দেওয়া হয়েছে। যথা- আমরা রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করালাম। আর দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করালাম, অতঃপর দিন থেকে রাত বের করি, আর রাত থেকে দিন বের করি। অপর এক স্থানে ইরশাদ হয়েছে। আমরা প্রাধান্য দেই দিনের উপর রাতকে। অর্থাৎ অনুভূতি একই, তাতে স্তরের রদবদল হতে থাকে।
রাতের গুরুত্বের বিষয়কে মহান আল্লহ তা'আলা হযরত মূসা আ. এর ঘটনায় স্পষ্ট ভাবে ইরশাদ করেছেন, আর আমি ওয়াদা করেছি, হযরত মূসা আ. এর সাথে ত্রিশ রাতের, তাকে পূর্ণ করেছি দশ রাত দ্বারা, তখন তার মেয়াদ পূর্ণ করেছেন তোমার রব চল্লিশ রাত। (আল-কুরআন)
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, আমি মূসাকে চল্লিশ রাতে তাওরাত (আসমানী জ্ঞান) দান করেছি। আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা অতীব চিন্তার বিষয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেননি যে, আমরা চল্লিশ দিনে ওয়াদা পূর্ণ করেছি। শুধু রাতের উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ হযরত মূসা আ. চল্লিশ দিন তুর পাহাড়ে অবস্থান করেছেন। বিষয়বস্তু স্পষ্ট হয়েছে যে, পুরো চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত। হযরত মূসা আ. এর উপর রাতের অনুভূতি প্রবল হয়। আর রাতের অনুভূতি সময় ও স্থানের (সময় ও ব্যবধান) শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এ মুক্ত অনুভূতির ফলে হযরত মূসা আ. কে অদৃশ্য বিষয়ের দলিল দস্তাবেজ তাওরাত দান করা হয়েছে। যখন হযরত মূসা আ. কে সত্যানুসন্ধানীদের প্রতিনিধি মনোনীত করে ফিরাউনের নিকট প্রেরণ করা হয়, তখন ফিরাউন হযরত মূসা আ. এর মুজিজা সমূহকে যাদু বিদ্যার সাথে মিলিয়ে দেয়। সে হযরত মূসা আ. কে যাদুবিদ আখ্যায়িত করে। তার রাজ্যের খ্যাতনামা যাদুবিদদের আহবান করে। যাতে তারা হযরত মূসা আ. কে পরাভূত করে ফেলে।
উক্ত ঘটনায় লক্ষনীয় সূক্ষ্ম বিষয় হল, হযরত মূসা আ. হাতের লাঠি ছেড়ে দেওয়ার পর, তা বিরাট অজগরে পরিণত হয়ে যায়। আর যাদুগররাও তাদের হাতের রশি নিক্ষেপ করার পর সেগুলোও রূপ ধরে। এ পর্যন্ত যাদুবিদদের যাদু ও হযরত মূসা আ. এর মুজিজা মধ্যে কোন পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয়নি। কেননা উভয়ের কাজ অজগর ও সাপের রূপ ধারন করেছে। কিন্তু এক কদম সামনে অগ্রসর হয়ে আমরা দেখতে পাই যে, হযরত মূসা আ. মুজিজা যাদুবিদদের যাদুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। যাদুবিদ ও হযরত মূসা আ. এর প্রতিদ্বন্ধী যাদু ও খোদায়ী জ্ঞানের মাঝে পার্থক্যের ব্যাখ্যা হল ঐ ঘটনা। কেননা এ ঘটনা যাদুবিদ ও রহমানী দলের বাক্য ও পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত চিন্তা-ভাবনাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। এতে যাদুবিদদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তারা ঐ পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের প্রতিটি পূর্ববর্তী দিন পরবর্তী দিন থেকে উত্তম ছিল। কিন্তু যখনই মুসলমানগণ তাদের নিজেদের যৌক্তিকতার আলোকে পূর্ববর্তীদের ধ্যান-ধারনার রীতি-নীতি পরিত্যাগ করেছে, তখনই তাদের পতনের সূচনা হয়েছে। আজও তারা বঞ্চনার অন্ধকারে নিপতিত হচ্ছে। কিরূপ বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আজকের আলোচিত প্রায় সবগুলো বিষয়ই মুসলমানদের আবিষ্কার।
অমুসলমান চিন্তাশীল গবেষকগন আমাদের পূর্বপুরুষদের এ জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করার পথ বেছে নিয়েছে। তারা গবেষণা ও অনুসন্ধানকে নিজেদের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্থির করেছে। আর আমরা মুসলমান তা থেকে হাত গুটিয়ে বসে আছি। বিজ্ঞানীগণ যে বস্তুকে (AURA) নামে অভিহিত করেছে, হযরত শাহ ওলী উল্লাহ রহ. তাঁর লেখায় এ সম্পর্কে বিস্তারিতা আলোচনা করেছেন। তিনি এ (AURA) কে মানবাত্মা বলে উল্লেখ করেছেন। আর তিনি মানবাত্মার সৃষ্টির ধারাবাহিকতার সাথে সাথে এর বৈশিষ্ট্যও উল্লেখ করেছেন। তিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন, মূলতঃ মানুষ হলো মানবাত্মা। যত প্রকার ব্যাধি বা বিপদ মাপদ হতাশা মানুষের মোাকবিলা করতে হয়, তা মানবাত্মার মধ্যে হয়। রক্ত মাংসের মাটির যৌগিক দেহে তা হয় না। তবে মানবাত্মা মধ্যে বিদ্যমান যে কোন ব্যাধি বা বিপদ আপদের বহিঃপ্রকাশ দেহের উপরই প্রতিফলিত হয় অর্থাৎ দেহ মূলতঃ এক প্রকার পদার্থ, আর মানবাত্মা হল ফিল্ম। যদি ফিল্ম থেকে দাগ ও খুঁত ইত্যাদি দূর করে দেওয়া হয়, তাহলে পর্দার উপর নিখুঁত স্পষ্ট ছবি দৃষ্টিগোচর হতে শুরু হয়। আর অন্য শব্দে যদি মানবাত্মার ভিতর থেকে ব্যধিকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে দেহ এমনিতেই সুস্থ ও সবল হয়ে যায়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. মানবাত্মার গঠন প্রণালীকে দু'তরঙ্গের উপর কায়েম করেছেন। এক তরঙ্গকে তিনি যৌগিক তরঙ্গ নামে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ মানবাত্মার গঠনে একক ও যৌগিক পদার্থ কাজ করে। তরঙ্গের জ্ঞানের মাধ্যমে শাহ সাহেব রহ. জ্ঞানকে বিন্যাস করেছেন। তাঁর অভিমত হল, যৌগিক তরঙ্গ সম্পর্কে অবগত হয়ে মানুষ জড় জগতকে বুঝতে সক্ষম হয়। আর একক তরঙ্গ জানার পর মানুষে ঐ বস্তু সমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। বস্তুর সূক্ষ্ম তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়ার অর্থ হল, এর দ্বারা সে সৃষ্টিজীবের সূত্র সম্পর্কে অবগতি লাভ করে। মানবাত্মার সম্পর্কে অবগত যে কোন ব্যক্তি জ্বিন ও ফিরিশতার সাথে কথা বলতে পারে। তাতে পৃথিবীর মানুষের অতীত ও ভবিষ্যত উজ্জ্বল হয়ে যায়।
হযরত শাহ ওলী উল্লাহ রহ. এ জ্ঞান সম্পর্কে কিভাবে অবগত হয়েছেন? এর জবাব হল, তিনি স্বীয় চিন্তা-ভাবনাকে গঠণ করে নিয়ে উপায়-উপকরণের অমুখাপ্রেক্ষি হন অথবা অনুভূতিহীন হয়ে স্বীয় আত্মায় প্রবেশ করে ঐ জ্ঞানকে বুঝার চেষ্টা করেছে। এর বিপরীতে বিজ্ঞান প্রত্যেক বস্তুর মূলতত্ত্ব জানার চেষ্টা করে। যার ফলে আসল উদ্দেশ্য পর্দার অন্তরালে চলে যায়। এ কারণ জানার জন্য প্রয়োজন হল চিন্তা-ভাবনায় সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা। আর তাতে যাদুমন্ত্রের দখল না হওয়া। আজ পৃথিবী চর্তুদশ হিজরী অতিক্রম করে পঞ্চদশ শতকে পদার্পন করছে। আজ এক দিক থেকে মানব জাতির জ্ঞানবুদ্ধি এক সীমারেখা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ হয়েছে, তারা নিজেদের কর্মদক্ষতা গোপন ও অপ্রকাশ্য বলে এক আলোকিত যথার্থতাকে সমর্থন করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে মানব অনুভূতি বিজ্ঞানের উন্নতির আলোকিত দিক সমূহের কারণে এ বিষয় ভালোভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে যে, মানুষের দৈহিক আকৃতির পেছনে অগণিত কর্মদক্ষতা লুকিয়ে আছে। যদি মানুষ সেই লুকায়িত কর্মদক্ষতা ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। তাহলে তার সামনে ঐ সব জ্ঞান হাযির হয়ে যায় তখন কোন শিরোনামে গোপন জ্ঞানের তালিকাভূক্ত। নিঃসন্দেহে বলা যায়, হিজরী চতুর্দশ শতকের সমাপ্তি লগ্নে এবং পঞ্চদশ শতকের সূচনার সাথে সাথে এমন এক যুগের সূচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে, যাতে মানব ইতিহাসে বিরাট বিপ্লবের সূচনা হবে।
📄 ভূ-গোল বিদ্যা
মুসলমানদের ভূ-গোল বিদ্যা অনুশীলনের উৎস হল এলাকার ব্যাপকতা ও পবিত্র ভৌগলিক বর্ণনার সাথে সংশ্লিষ্ট যে জমিনকে আধ্যাত্মিক পৃথিবীর প্রতিচ্ছায়া গণ্য করা হয়েছে। ভৌগলিক সীমারেখার সঠিক চূড়ান্ত ভৌগলিক পরিমাপ করা ভূ-প্রকৃতির অনুশীলন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ইসলামী ভূ-গোলবিদ্যার কেন্দ্র মক্কার পবিত্র জমিনের উচ্চতা জগতের মেরুদণ্ডকে স্পর্শ করেছে। যদিও পবিত্র ভূগোল বিদ্যা কুরআন ও হাদীস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, প্রচলিত ভূ-গোলকের উৎস হল গ্রীক, ভারতীয় ও ফার্সী বর্ণনা। আরববাসীয় যুগে সুবীয়া সাদাহানতের অনুবাদ ভারতীয় ভূগোল বিদ্যার অভিজ্ঞতা ইসলামী সাহিত্যের সংশ্লিষ্টতার বহিঃপ্রকাশ। মুসলমানগণ বাতলিমুসের ভূ-গোল, আফলাতুন ও আরসতা তালিসের লেখা অধ্যায়ন করে পুরোপুরি উপকৃত হয়েছে। ইসলামী ভূগোল ও উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রীক ভূগোল, জ্যামিতিক ভূগোল ব্যবহার করেছে। ইসলাম সারা পৃথিবীতে বিস্তৃতির কারণ হল, মুসলমানদের পৃথিবী ভ্রমণ। মুসলমানদের পূর্বে কোন জাতি পৃথিবী ভ্রমণের এতো ব্যাপক সুযোগ লাভ করতে পারে নি। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভূগোল বিদ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে।
হিজরী তৃতীয় শতকে আববাসী খলীফা আল-মামুনের যুগে সর্বপ্রথম ইসলামী ভূগোল লিপিবদ্ধ করার সূচনা হয়। ঐ যুগে "আছ দুরাতি মামুনীয়া" নামে পৃথিবীর ভৌগলিক নকশা অংকন করা হয়। ঐ নকশা বর্তমানে বিদ্যমান নেই। তথাপি আবুল হাসান আল মাসুদী তা পর্যবেক্ষণ করে বতলি মুসের নকশার মুকাবিলায় এটা অতি বিশুদ্ধ ও সঠিক বলে অভিমত প্রকাশ করেন। ঐ যুগে আল-কেন্দী আহমদ আস সারাখসি ও অন্যান্য ভূগোল বিদদের রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া আবু আব্দুল্লাহ আল বাত্তানী, আবুল আব্বাস ফরখানী ও ইবনে ইউনুসের মতো খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের লেখায় ভৌগলিক খোরাক পাওয়া যায়। শেষে উল্লেখিত বিষয় সমূহে গণিত দর্শন, প্রকৌশল বিদ্যায় ও উভয় প্রকার উপকরণ বিদ্যমান, তার পরবর্তীতে উল্লেখিত অধিকাংশ বিবরণ ভ্রমণ বৃত্তান্ত সংশ্লিষ্ট। তখন শ্রমসাধনা কারী ভূগোল প্রণেতা ছিল বাতলি মুস। প্রাথমিক যুগে খ্যাতনামা শ্রমসাধণা করে মুহাম্মদ বিন মূসা আল খাওয়ারেমীর "সরাতুল আরয" ও ইবনে রিসতার "আল আখলাফুল নাফসীয়া" বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
হিজরী চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে মুসলমানগণ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ায় ভূগোল শাস্ত্রে ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়। আর খ্যাতনামা ঐতিহাসিকগণ বিশেষ করে আহমদ ইয়াকুবী ইতিহাস শাস্ত্র ছাড়াও ভূ-গোল শাস্ত্র লেখা শুরু করেন। আল মাসুদী সৃষ্টিজীবের ইতিহাস ও ভূ-গোল শাস্ত্রে "মরুরুজ্জাহাব" নামে এক অভিধান গ্রন্থ রচনা করেন। যা কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত খ্যাতনামা গ্রন্থ হিসেবে প্রচলিত ছিল। ঐ যুগে পৃথিবীর সীমারেখা লিপিবদ্ধ করা হয়। তা আবু ইছহাক আল আসাফরীর রচনা অনুসারে লিপিবদ্ধ করা হয়। আবু জায়িদ আল বালখী ও ইবনে হাইকালো অতি উত্তম রূপে ভূগোল শাস্ত্রকে ইসলামী রংয়ে আলোকিত করেন। তাঁর লেখায় ইসলামী রাষ্ট্র সমূহের বিবরণ উল্লেখ রয়েছে। মুসলমান পর্যটকগণ জাভা, সুমাত্রা ও চীন ভ্রমণ করে ভূগোল শাস্ত্রে অতিরিক্ত অধ্যায়ের সূচনা করে। ঐ সব জমি পরিমাপের পরিণামে চিত্তাকর্ষক ভ্রমণ কাহিনী লিপিবদ্ধ হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সামনে এসে যায়। ঐ যুগে আমরা সুলাইমান ব্যবসায়ীর "আখবারূসসীন" ও "আখবারুল হিন্দ” ও খ্যাতনামা ইবনে শাহরিয়ারে "আজায়িবুল হিন্দ" নামক গ্রন্থাবলী লাভ করি। এ সব গ্রন্থাবলীর প্রতিপাদ্য জানায় মুসলমানের উপর গ্রীক উত্তরাধিকারীদের অনভিজ্ঞতা স্পষ্ট হয়ে যায়। আর তাতে ভূগোল শাস্ত্রের অগ্রগতি সাধিত হয়। ঐ যুগে আবু রায়হান আল-বেরুনীর লেখায় ভূগোল শাস্ত্র উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করে। শুধু তাই নয় বরং তাঁর লেখা অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ ও সারগর্ব ছিল। তাছাড়া তাঁর অন্যান্য গ্রন্থাবলীর মাধ্যমে ভূগোল শাস্ত্রের তথ্য বিদ্যমান পাওয়া যায়। যথা "কিতাবুল হিন্দ", "কানুনে মাসুদী" প্রভৃতি।
হিজরী ষষ্ঠ শতক বা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের দ্বিতীয় নবজাগরণ পর্যন্ত মুসলমানগণ ভূ-গোল শাস্ত্রকে বিস্তৃত করে রীতিমত বাস্তব রূপদান করে। সে যুগে সৃষ্টিজগতের উপর অভিধানগ্রন্থ রচিত হয়। যথা আদ্দামেশকীর "নাজনাতুর দাহার" ও আল-কাজবিনীর রচিত গ্রন্থ "আজায়িবুল বুলদান" অস্তিত্ব লাভ করে। সে যুগে আবুল ফিদা ও আল ইদ্রিসির মত ভূ-গোল শাস্ত্রবিদগণের আবির্ভাব হয়। তাঁরা ভূ-গোল শাস্ত্রকে অত্যাধুনিক তত্ত্বও তথ্য দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেয়। ঐতিহাসিক আল ইয়াকুতীর "মুজামুল বুলদান" নামক গ্রন্থ ভৌগলিক বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ময়দানে এখন পর্যন্ত অত্যাবশ্যক উপাদান হয়ে আছে। সে যুগে ইবনে বতুতার মত খ্যাতনামা পর্যটকের আবির্ভাব হয়। তিনি তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে এ শাস্ত্রকে সমৃদ্ধশালী করে তোলে। তাঁর রচিত "তোহফাতুন নজুর" বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে যুগে সুলাইমান নদভীর "উমদাতুল মারীয়া ও ইবনে মাজিদের রচিত “আলফিদালিল্লাহ ফী উসূলি ইলমুল বাহার ওয়াল কাওয়ায়িদের" মত ভৌগলিক-সামুদ্রিক বিবরণ সম্পর্কিত গ্রন্থ রচিত হয়। সে যুগের রচিত গ্রন্থাবলীর দ্বারা পাশ্চাত্যের ঋতু পরিবর্তন সম্পর্কে ধারনা লাভ হয়। যাতে এরূপ সংস্কার করা হয়েছে। যেমন টাইফুন, যা আরবী তুফান ও "মনসুন" থেকে গৃহীত হয়েছে। তিনি ঐ ইবনে মাজিদ যিনি ভাসকো-দা-গামাকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে কালিকট বন্দর পর্যন্ত পথপ্রদর্শন করেছে। তথাপি পর্তুগীজদের এভাবে সমূদ্র ভ্রমণ তুর্কী উসমানীদের যুগ পর্যন্ত মুসলমানদেরকে সমূদ্র ভ্রমণ থেকে পৃথক রাখার উল্লেখযোগ্য কারণ হয়েছে।
হিজরী নবম শতক বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের পর ভারতীয় ও ইরানী লেখকগণ ফার্সী ভাষায় আর উসমানী শাসকগণ ফার্সী ও তুর্কী ভাষা ছাড়াও আরবী ভাষায় অনেক নতুন তথ্য সংযোজন করান। এসব গ্রন্থের মধ্যে কোন কোন গ্রন্থ যেমন ইবনুল আশিকের রচিত "মানজিরুল আলম" "আজায়িবুল মাখলুকাত" নামক গ্রন্থের মত ছিল। তথাপি আমরা "আনাতোলিয়া ও বলকান" সংক্রান্ত তাতে নিত্য নতুন তথ্য উপাত্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করি। যা পূর্ববর্তী ইসলামী গ্রন্থ সমূহে বিদ্যমান পাওয়া যায় না। এ ছাড়াও আলা আকার খাত্তায়ীর "খাত্তায়ী নামায়" চীনের নিত্য নতুন ভৌগলিক বিবরণ ভ্রমণ কাহিনীরূপে প্রনয়ন করা হয়। সে যুগের বিস্ময়কর ইতিহাস দশম শতকের সূচনা লগ্নে পীর মহিউদ্দীন সর্দারের প্রণীত পৃথিবীর নকশা, যাতে আফ্রিকা ও আমেরিকার নকশা রয়েছে। সাইয়্যেদ আলী রইস ছানীর প্রণীত "আল হাইয়্যাত" নামক গ্রন্থে সামুদ্রিক ভূগোল সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য সংযোজন করেন। উসমানী যুগের এ ধারাবাহিকতা হাজী খলীফার ত্রয়োদশ শতকে গ্রন্থ প্রণয়নকে জগতে খ্যাতির শীর্ষে পৌছে দেয়। এ উল্লেখযোগ্য কীর্তি মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সময়ের জ্ঞানকে ভূগোলের অন্তর্ভূক্ত করেছে। আর হিজরী দ্বাদশ শতক বা খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকে ইউকোপীয় উপকরণ সংযোজন করা হয়। অন্যান্য কতিপয় ইসলামী বিজ্ঞানীদের মত ভূগোল শাস্ত্রে শুধু মুসলমানগণ উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করে পাশ্চাত্য জগত পর্যন্ত এ বিষয় পৌছে দেয়। এমনকি ইউরোপের দ্বিতীয় নবজাগরণ এবং পরবর্তী পাশ্চাত্য উপকরণ লাভ করে এ বিষয়কে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু ইসলামী জ্ঞানের সূত্রকে সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ হয়ে যেতে দেননি।
মুসলমান ভূগোলবিদগণ জমি পরিমাপের বিষয়ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করে। আল বেরুনীকে ভূগোল শাস্ত্রের জনক বলা হয়। মুসলমান ভূগোলবিদগণ জ্যামিতি অনুশীলনের মাধ্যমে জমিনের উচ্চতা পরিমাপ করাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। তাঁরা শহর সমূহের দৈর্ঘ্য প্রস্ত, পাহাড়-পর্বতের উচ্চতা নির্ণয় ও জমিনের ব্যাস ইত্যাদি বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করে। তন্মধ্যে কোন কোন বিষয় কা'বার দিক নির্ণয়ের ক্রমধারায় বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল। এছাড়া নামাযের সময়, সেহরী-ইফতিারের সময় নির্ধারণ করার জন্য তাদের এ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল। ইসলামী সাহিত্যে দিনের দীর্ঘ্যতা, কাবার দিক নির্ণয় প্রভৃতি বিষয় প্রভৃত অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। মুসলমান শুধু এ সমস্ত বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে ক্ষান্ত হয়নি। অবশ্য এ সব অভিজ্ঞতা তাদের জন্য মৌলিক গুরুত্ব লাভ করেছে। তারা শহরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত পরিমাপ করার পদ্ধতি এবং অন্যান্য ভৌগলিক পরিমাপ করার বিষয়কে উন্নততর করার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। হিজরী তৃতীয় শতকে তারা এক পর্যায়ে শহরের ৩৬ ডিগ্রী উত্তরে ৭৭ মাইল দূরত্বে ২৮ ফিট সমান পরিমাপ করে। আল-বেরুনী এ বিষয়ে প্রায় ১৫ টি গ্রন্থ রচনা করেন। তার পরিমাপের পদ্ধতিকে বিশুদ্ধ গণ্য করা হয়েছে। অথচ তাঁর সমসাময়িক ইবনে ইউনুস উত্তম রুপে ব্যসার্ধ্য পরিমাপের প্রতি মনোযোগী ছিল। হিজরী সপ্তম শতকের নিকটবর্তী সময় আবুল আলা মারাকাশী "জামেউল আবাদী ওয়াল গায়াত" প্রণয়ন করেন। এছাড়াও তাঁর রচিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রন্থও রয়েছে। এ কারণে স্যারটন তাঁর নামকে শুধু মুসলিম যুগে নয় বরং সারা বিশ্বের জ্যামিতিক ভূগোল শাস্ত্রে সর্বোচ্চ বিখ্যাত বলে অভিহিত করেছে। মুসলমানগণ হিজরী তৃতীয় শতক বা খ্রিস্টীয় নবম শতকে ভূ-পৃষ্ঠের ব্যাস পরিমাপের উদ্দেশ্যে সিরিয়াতে মূসা বিন শাকিবের দুই পুত্রের তত্ত্বাবধানে এ কাজের সূচনা করে। উদাহরণ স্বরূপ বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল বেরুনী ও ফরগানী ও ভূ-পৃষ্ঠের ব্যাস পরিমাপ করে। আল-বেরুনী ভূ-পৃষ্ঠের ব্যাস পরিমাপের সূত্র বর্ণনা করে। আর জলমের নাহমা নামক স্থানে (বর্তমান পাকিস্তান) ভূ-পৃষ্ঠের গভীরতা প্রায় ২৫,০০০ মাইল নির্ধারণ করেন। তিনি পাহাড়ের উচ্চতা পরিমাপের সূত্র উদ্ভাবন করেন। তাকে বর্তমান ভূ-পৃষ্ঠ পরিমাপের জনক বলা হয়েছে। তাঁর পরবর্তীতে আগত মুসলমান ভূ-গোল শাস্ত্রবিদগণ কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত এ শাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করে।