📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টাকে মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনা

📄 স্রষ্টাকে মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনা


যে প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে তা হলো, 'স্রষ্টা কি সত্যিই মানুষ হতে পারেন?' যুক্তি বলে, 'না'। কারণ, স্রষ্টার মানুষে পরিণত হওয়ার মতবাদ স্বয়ং স্রষ্টার সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানুষ সাধারণভাবে বলে থাকে, স্রষ্টা সবকিছু করতে সক্ষম; তিনি যা করতে চান তাই করতে পারেন। খ্রিষ্টানদের বাইবেলে বলা হয়েছে, "...স্রষ্টার পক্ষে সবকিছুই সম্ভব।” (মথি, ১৯:২৬; মার্ক, ১০:২৭, ১৪:৩৬)
মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন বলে, إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। (আল বাকারা, ২:২০)
হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোও একই ধরনের কথা বলে। সবগুলো প্রধান ধর্মগ্রন্থই স্রষ্টার সর্বময় ক্ষমতা সম্পর্কে একই ধরনের কথা বলে। তিনি সবকিছু থেকে মহান এবং তাঁর পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব। এই সাধারণ ধারণাটিকে বাস্তবে বুঝতে হলে একজনকে প্রথমেই স্রষ্টার গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে হবে। অধিকাংশ সমাজেই স্রষ্টাকে একজন চিরন্তন সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয় যার কোন শুরু কিংবা শেষ নেই। এখন, স্রষ্টা সবকিছুই করতে সক্ষম, এর ভিত্তিতে যদি প্রশ্ন করা হয়, 'স্রষ্টা কি মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম?' তাহলে এর উত্তর কী হবে? যেহেতু 'মৃত্যুবরণ করা' 'সবকিছু'র একটি অংশ সেহেতু এটা কি বলা যেতে পারে, "যদি তিনি চান?" না, কখনোই এটা বলা যেতে পারে না।
এখানেই সমস্যা। স্রষ্টাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় চিরন্তন সত্তা হিসেবে যাঁর কোনো শেষ নেই; আর মৃত্যুর অর্থই হলো 'কোনো কিছুর শেষে উপনীত হওয়া'। ফলে, 'স্রষ্টা মারা যেতে পারেন কি না'-এ ধরনের প্রশ্ন একেবারেই অর্থহীন এবং স্রষ্টার সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে, 'স্রষ্টা জন্মগ্রহণ করতে পারেন কি না' এই ধরনের প্রশ্নও অবান্তর, কারণ ইতিমধ্যেই স্রষ্টাকে শাশ্বত সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যাঁর কোন শুরু নেই। জন্মগ্রহণ করা অর্থ একটি শুরু থাকা, অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসা। এই ধারণা থেকেই নাস্তিক দার্শনিকগণ আস্তিকদেরকে উপহাস করে জিজ্ঞেস করে, “স্রষ্টা কি এমন পাথর তৈরি করতে সক্ষম যা তার পক্ষে ওঠানো অসম্ভব?” সেই আস্তিক যদি বলে থাকে- “হ্যাঁ”, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, স্রষ্টা তাঁর নিজের থেকে উচ্চতর কিছু তৈরি করতে সক্ষম। এবং যদি সে উত্তর দেয়, “না”, তাহলে এর অর্থ হয় স্রষ্টা সবকিছু করতে অক্ষম।
তাই "স্রষ্টা সবকিছু করতে সক্ষম" বাক্যের 'সবকিছু' শব্দ থেকে সেগুলো বাদ যাবে যেগুলো স্রষ্টার গুণাবলির সাথে সাংঘর্ষিক। এর মাঝে এমন কিছু থাকবে না যেগুলো তাঁর শাশ্বত গুণাবলির বিরুদ্ধে যায় এবং তাঁকে নিম্নতর আসনে নামিয়ে দেয়। যেমন, ভুলে যাওয়া, ঘুমানো, অনুশোচনা, বেড়ে উঠা, পানাহার ইত্যাদি। বরং 'সবকিছু' শব্দের ভেতর কেবল সেসব বিষয়ই থাকবে যেগুলো তাঁর স্রষ্টা হওয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ—“স্রষ্টা সবকিছু করতে সক্ষম” এর অর্থ এটাই। একে পরম অর্থে বোঝা যাবে না, সীমিত অর্থে বুঝতে হবে।
স্রষ্টার মানুষে রূপান্তরের দাবি খুব স্বাভাবিক কারণেই অযৌক্তিক। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায় স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছেন; আর স্রষ্টার পক্ষে মানুষের বৈশিষ্ট্য ধারণ করা বেমানান। বরং সৃষ্টি হলো স্রষ্টার প্রত্যক্ষ সৃষ্টি। স্রষ্টা যদি তাঁর সৃষ্টিতে পরিণত হন তবে এর অর্থ দাঁড়ায়, স্রষ্টাই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, যা স্পষ্টই অযৌক্তিক। সৃষ্ট হতে হলে প্রথমে তাঁকে অস্তিত্বহীন হতে হবে, আর যদি তিনি অস্তিত্বহীন হন তবে কীভাবে নিজেকে সৃষ্টি করবেন? অধিকন্তু যদি তিনি সৃষ্ট হন তবে এর অর্থ হয় তাঁর একটি শুরু আছে যা কিনা তাঁর শাশ্বত চিরন্তন হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। স্বাভাবিক নিয়মেই সৃষ্টির একজন স্রষ্টা প্রয়োজন। সৃষ্টবস্তুর অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন একজন স্রষ্টার যিনি তাদেরকে অস্তিত্বে নিয়ে আসবেন। স্রষ্টার কোনো স্রষ্টা প্রয়োজন হতে পারে না, কারণ তিনি নিজেই স্রষ্টা। সুতরাং এখানে শব্দগুলোর মধ্যেই স্পষ্ট বৈপরিত্য আছে। স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির রূপ নিয়েছেন এই দাবির অর্থ দাঁড়ায়, তাঁর একজন স্রষ্টার প্রয়োজন—যা একটি চরম হাস্যকর ধারণা। এটা স্রষ্টার অসৃষ্ট হওয়া, অমুখাপেক্ষী হওয়া এবং স্রষ্টা হওয়ার প্রধান ধারণাগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 মানুষকে স্রষ্টার পর্যায়ে উন্নীতকরণ

📄 মানুষকে স্রষ্টার পর্যায়ে উন্নীতকরণ


সৃষ্টি হিসেবে মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়। এগুলো এমন বৈশিষ্ট্য যেগুলোকে স্রষ্টার উপর অর্পণ করা যায় না। কারণ এগুলো স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির সমতুল্য করে দেয়। সুতরাং স্রষ্টা কখনোই মানুষের রূপ নেয়নি এবং নেবেনও না।
অপরপক্ষে মানুষও কখনো স্রষ্টার রূপ নিতে পারে না। সৃষ্ট বস্তু কখনোই তার স্রষ্টায় পরিণত হতে পারে না। এটা অসম্ভব। একটি সময় সৃষ্ট বস্তুর কোনো অস্তিত্ব ছিল না; একজন সদা বিরাজমান স্রষ্টার প্রত্যক্ষ কর্মের ফলেই তা অস্তিত্বে আসে। যার কোনো অস্তিত্বই নেই তা কখনো নিজেকে অস্তিত্বশীল করতে পারে না।
এছাড়াও মানুষের আত্মা শাশ্বত ও চিরন্তন হওয়ার যে ধারণা রয়েছে তা মূলত এই বিশ্বাসের ভিত্তি রচনা করে যে, মানুষও স্রষ্টার রূপ নিতে পারে। এই মতবাদ গ্রিক ও খ্রিষ্টান আধ্যাত্মিকতাবাদ, মুসলিম সুফিবাদ ও হিন্দু ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিমূল। এই মতবাদ সব মানুষ ও জীবন্ত প্রাণীর উপর ঐশ্বরিকতা আরোপ করে। এই মতবাদ অনুযায়ী ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে স্রষ্টার অংশবিশেষ বস্তু দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পৃথিবীতে রয়ে যায়। অন্যভাবে বলা যায়, অসীম সত্তা আটকে পড়ে সসীমের ভেতর। এই বিশ্বাস সব মন্দকে স্রষ্টার প্রতি অর্পণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ভালো ও মন্দের অর্থই হারিয়ে ফেলে।
যখন মানুষের মন মন্দ কিছু ইচ্ছা করে এবং শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার অনুমতিক্রমেই তা করে ফেলে, তখন তা সত্যিই শাস্তিযোগ্য গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে 'কর্ম'-এর ধারণার সূত্রপাত হয়। এই ধারণা অনুযায়ী বর্তমান জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট হলো পূর্ববর্তী জীবনের কুকর্মের ফল। মানুষের মাঝে স্রষ্টার যে অংশ বাস করে তা যখন কোনো কুকর্ম করে ফেলে তখনই স্রষ্টা শাস্তি দিয়ে থাকেন। যদি মানুষের ইচ্ছাশক্তি স্রষ্টা থেকে স্বাধীন হয়, তাহলে তারা একই সাথে স্রষ্টা ও মানুষ হতে পারে না। এভাবেই প্রতিটি মানুষ নিজেরাই দেবতায় পরিণত হয়ে যায়।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টার স্বরূপ নিয়ে বিভ্রান্তির মূল কারণ

📄 স্রষ্টার স্বরূপ নিয়ে বিভ্রান্তির মূল কারণ


স্রষ্টার মানুষে পরিণত হওয়া অথবা স্রষ্টা এবং মানুষ একই সত্তার মধ্যে একাকার হওয়ার এই ধারণা উদ্ভব হওয়ার প্রধান কারণ হলো, যে-মহান স্রষ্টা শূন্য থেকে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন তাঁকে চেনার অক্ষমতা। তারা স্রষ্টাকে তাদের নিজেদের মতোই বিদ্যমান বস্তু থেকে সৃষ্ট মনে করে থাকে।
মানুষ বিদ্যমান বস্তুকে বিভিন্ন অবস্থা এবং আকার-আকৃতিতে রূপ দিয়ে বিভিন্ন কাজের উপযোগী নতুন বস্তু তৈরি করে। যেমন: একটি কাঠের টেবিল একসময় বনের একটি গাছ হিসেবে ছিল এবং তার পেরেক ও ক্রুগুলো একসময় ভূগর্ভস্থ খনিতে লোহার আকর হিসেবে বিদ্যমান ছিল। মানুষ গাছ কেটে তাকে টেবিলের রূপ দান করে, খনি থেকে আকর সংগ্রহ করে তাকে গলিয়ে এবং ছাঁচে ঢেলে পেরেক ও স্ক্রু তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করে বিভিন্ন কাজের উপযোগী একটি টেবিল তৈরি করে।
একইভাবে মানুষ এখন যেসব প্লাস্টিক চেয়ার ব্যবহার করে সেগুলো একসময় ভূগর্ভে তেলের আকারে ছিল। মানুষ যেভাবে চেয়ারে বসে থাকে সেভাবে তেলের উপর বসার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না। তেলের রাসαινিক উপাদান থেকে প্লাস্টিক তৈরি করে মানুষ তা দিয়ে চেয়ার বানিয়ে ব্যবহার করে। মনুষ্য ক্ষমতার এটাই মূলকথা; মানুষ শুধু বিদ্যমান বস্তুর সংস্কার ও রূপান্তর করতে পারে। তারা গাছ সৃষ্টি করতে পারে না কিংবা তেলও তৈরি করতে পারে না। মানুষ যখন তেল উৎপাদনের কথা বলে তখন আসলে তেল শোধনের কথাই বলে। লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেল সৃষ্ট হয়; অতঃপর মানুষ সেটিকে ভূপৃষ্ঠ থেকে শোধন করে সংস্কার করে। মানুষ গাছও সৃষ্টি করেনি। এমনকি যদি তারা বীজও বপন করে তবুও বলা যায়, যে-বীজ তারা বপন করল সেটাও তো তাদের সৃষ্ট নয়।
স্রষ্টার ব্যাপারে এমন নিদারুণ অজ্ঞতার কারণে মানুষ স্রষ্টাকে ঠিক তাদের নিজেদের মতোই মনে করে বসেছে। যেমন ওল্ড টেস্টামেন্টে রয়েছে যে, 'স্রষ্টা নিজের প্রতিচ্ছবির উপর মানুষ তৈরি করেন; তিনি স্রষ্টার প্রতিচ্ছবিতেই মানুষকে তৈরি করেন।' হিন্দুধর্ম অনুযায়ী সৃষ্টির ঈশ্বর 'পুরুষা' যার মনুষ্য রূপ হলো 'ব্রহ্মা' এবং মানুষ যেভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক কিছু তৈরি করেছে সেভাবেই সৃষ্টির ঈশ্বরও সবকিছু তৈরি করে থাকেন।
হিন্দু দর্শন অনুযায়ী 'পুরুষা' হলো 'ব্রহ্মা'র এক বৃহৎ সন্তান, যার এক হাজার মাথা এবং এক হাজার চোখ রয়েছে। তাঁর থেকেই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় তার সঙ্গিনী 'বিরাজ'-এর আবির্ভাব ঘটে। শাশ্বত 'পুরুষা' বলির জন্য নিবেদিত এবং তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে চারটি প্রচলিত সামাজিক শ্রেণির (বর্ণ)[১] উদ্ভব ঘটে। পেরুষা স্তোত্রগীত অনুযায়ী ব্রাহ্মনরা 'পুরুষা'র মুখ থেকে, ক্ষত্রিয়রা তার বাহু থেকে, বৈশ্যরা উরু থেকে এবং শূদ্ররা পা থেকে সৃষ্টি হয়েছে।[২] শূন্য থেকে স্রষ্টার পৃথিবী সৃষ্টি করার ক্ষমতা উপলব্ধিতে অক্ষমতার কারণেই হিন্দুরা এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, স্রষ্টা পৃথিবী এবং পৃথিবীর মানুষকে তার নিজের দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে সৃষ্টি করেছেন।
মানুষের চিন্তা ও বোধশক্তি সীমিত, আর তাই মানুষ অসীমকে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারে না। স্রষ্টা আদমকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হলো স্রষ্টা এই পৃথিবী শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যখন তিনি কোনো কিছু অস্তিত্বে আনতে চান তখন শুধু বলেন, 'হও'; আর তাঁর আদেশে তা অস্তিত্ব লাভ করে। এই পৃথিবী কিংবা তার কোনো বস্তু স্রষ্টার সত্তা থেকে সৃষ্ট হয়নি। এ ধারণা স্রষ্টাকে তাঁর সেই সৃষ্টির স্তরে নামিয়ে আনে যারা কেবল বস্তুর রূপান্তর ঘটাতে পারে, কোনো মৌলিক সৃষ্টিতে সক্ষম নয়। এমন বিশ্বাস পোষণকারীরা প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টার একত্ববাদ অনুধাবন করতেই ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এক ও অদ্বিতীয় এবং তাঁর সমতুল্য কোনো কিছুই নেই। তিনি যদি তাঁর নিজের সত্তা থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করতেন তবে তিনি তাঁর সৃষ্টির অনুরূপ হয়ে যেতেন।

টিকাঃ
[১] ডিকশনারি অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস; পৃ-৫৮৭।
[২] দ্য নিউ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা; খন্ড-২০; পৃ-৫৫২।

📘 স্রষ্টা ধর্ম জীবন > 📄 স্রষ্টা এবং সৃষ্টি কখনো এক বা একাকার হতে পারে না

📄 স্রষ্টা এবং সৃষ্টি কখনো এক বা একাকার হতে পারে না


এখানে আরেকটা কথা জোর গুরুত্বের দাবি রাখে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এটা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ভিন্ন দুই সত্তা। স্রষ্টা যেমন তাঁর সৃষ্টির সমান বা এর কোনো অংশ হতে পারে না, তেমনি তাঁর সৃষ্টিও তাঁর সমান কিংবা তাঁর কোনো অংশ হতে পারে না।
স্রষ্টা ও সৃষ্টি ভিন্ন হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অজ্ঞতা ও অবহেলার দরুন এ বিষয়ট অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। না-জানার ফলে তারা স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির উপাসনা করতে লেগে যায়। স্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান, কিংবা স্রষ্টার ঐশ্বরিক সত্তা তাঁর সৃষ্টির কিছু অংশ জুড়ে ছিল বা আছে—এ ধরনের বিশ্বাসই স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে মানুষকে সৃষ্টির উপাসনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ ধরনের বিশ্বাসই এমন ধারণার উদ্ভব ঘটিয়েছে যে, সৃষ্টির উপাসনা করলেই স্রষ্টা বা ঈশ্বরের উপাসনা করা হয়। অপরদিকে ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে—কেবল আল্লাহর উপাসনা করা এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যে ভাবেই হোক না কেন, তাঁর সৃষ্টির উপাসনা ত্যাগ করা। সব নবীগণ এই বার্তা নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন। আল কুরআনে আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন,
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই এই আহ্বান নিয়ে একজন করে বার্তাবাহক পাঠিয়েছি, "তোমরা আমার ইবাদাত করো এবং মিথ্যা উপাস্য থেকে দূরে থাকো।" (আন-নাহ্, ১৬:৩৬)
বিভিন্ন ধর্মের মূর্তিপূজারীদের যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তারা কেন মানুষের তৈরি প্রতিমার সামনে মাথা নত করে, তখন তাদের সবাই প্রায় এক ও অভিন্ন উত্তর দিয়ে থাকেন। তারা বলেন, আমরা আসলে পাথরের প্রতিমার পূজো করছি না; বরং পূজো করছি এই প্রতিমার মধ্যে মূর্তিমান ঈশ্বরকে। তাদের দাবি, স্বয়ং পাথরের মূর্তিটিই ঈশ্বর নয় বরং ঈশ্বরের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু! যিনি এই ধ্যানধারণা পোষণ করেন যে, স্রষ্টা যেকোনো উপায়েই হোক, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে উপস্থিত থাকতে পারেন-প্রতিমাপূজোর জন্য তিনি এই যুক্তি মানতে বাধ্য। পক্ষান্তরে যিনি ইসলামের মূল বার্তা ও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝেন, যত যুক্তিই দেখানো হোক না-কেন, তিনি কখনোই প্রতিমাপূজা করতে রাজি হবেন না।
পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব লোক নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের এই দাবির ভিত্তি ছিল 'স্রষ্টা মানুষের মধ্যে বিরাজমান'-এই ধারণা। একধাপ এগিয়ে এদের কেউ কেউ এমনও দাবি করেছে যে, অন্যান্যদের চেয়ে তার মধ্যেই স্রষ্টা বেশি বিরাজ করে। কাজেই বাকি লোকেরা যেন তার কাছে নতি স্বীকার করে এবং তাকেই যেন ঈশ্বর হিসেবে উপাসনা করে। অন্যদিকে কিছু লোক ছিল যারা নিজেদের ঈশ্বর দাবি না করলেও, অন্যকে ঈশ্বর হিসেবে প্রচার করত। কথিত এসব ঈশ্বরের মৃত্যুর পর, এ লোকগুলো ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসীদের সমাজে আরও ব্যাপকভাবে এসব অপবিশ্বাস ছড়াতে থাকে।
কোনো লোক যদি ইসলামের বার্তা ও এর অন্তর্নিহিত অর্থ একবার বুঝে যান, তার পক্ষে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা সম্ভব নয়। স্রষ্টার সত্য ধর্মের মূল কথা স্পষ্ট; আর তা হলো শুধু স্রষ্টার উপাসনা করা এবং সৃষ্টির যাবতীয় উপাসনা পরিত্যাগ করা। আর এটাই ইসলামের মূলমন্ত্র- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো উপাস্য নেই।
অকপটভাবে এ কথা ঘোষণা করে নবী মুহাম্মাদ -কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে মেনে নিলেই একজন লোক ইসলামের বলয়ে চলে আসেন। এ দুটো কথার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস তাকে দেয় জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতের নিশ্চয়তা। নবী মুহাম্মাদ বলেছেন, “যে লোক বলবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং এই বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এই ঘোষণার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করতে হলে নবীর দেখানো পথে নিজের ইচ্ছাকে স্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করতে হবে। সেই সাথে বাদ দিতে হবে সব মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00