📄 স্রষ্টাকে কীভাবে চেনা যায়
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, সব মানুষ কীভাবে কেবল একজন স্রষ্টাকে বিশ্বাস করবে, যেহেতু একেক মানুষ একেক পরিবেশে, সমাজে, সংস্কৃতিতে বসবাস করে? স্রষ্টার ব্যাপারে সে যদি কিছু না-ই জানে, স্রষ্টার জ্ঞান যদি তাকে দেওয়া না হয় তাহলে সে কীভাবে তাঁর উপাসনা করবে। সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে যে, একক স্রষ্টাকে বিশ্বাস করাই মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। এই বিশ্বাসই গেঁথে দেওয়া হয়েছে মানুষের অন্তরে।
মানবজাতির একটি বড় অংশ সর্বদাই স্রষ্টায় বিশ্বাস করে এসেছে। সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে বর্তমান আধুনিক সমাজ পর্যন্ত প্রতিটি যুগেই স্রষ্টাকেন্দ্রিক ধর্মগুলো মানবসভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে। বাস্তবে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীতে সমাজতন্ত্রের উদ্ভবের পূর্ব পর্যন্ত স্রষ্টায় অবিশ্বাস বা নাস্তিক্যবাদ খুব অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এমনকি বর্তমানেও যখন পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ সমাজগুলোতে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা ডারউইনীয় তত্ত্ব দিয়ে স্রষ্টাকে নিছক মনুষ্য কল্পনার ফসল হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যস্ত তখনও নিরক্ষর থেকে বিজ্ঞানী পর্যন্ত মানুষের একটি বড় অংশ স্রষ্টায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী।
ফলাফলস্বরূপ, স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে প্রচুরসংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্ত থেকে কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হয়েছেন যে, স্রষ্টায় বিশ্বাস অবশ্যই একটি জন্মগত ব্যাপার; এটা শিখিয়ে দেওয়া কিছু নয়। সমাজবিজ্ঞানীদের অধিকাংশই এর বিপরীত সিদ্ধান্ত দিলেও সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার 'আস্তিক্যবাদ'-কে জন্মগত বৈশিষ্ট্য বলেই প্রমাণ করে। "God Spot is found in the Brain" শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ভিলাইয়ানুর রামচন্দ্রন বলেছেন যে, স্রষ্টায় বিশ্বাস মানুষের মনে প্রোথিত।
ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের জন্মগত হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকলেও বিভিন্ন সমাজে স্রষ্টায় বিশ্বাস সম্পর্কে বিভিন্ন পার্থক্যের কারণে অনেক আস্তিকও শেষ পর্যন্ত এমন ধারণা পোষণ করতে শুরু করেন যে, সকল ধর্ম মনুষ্যসৃষ্ট। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র রয়েছে; আর তা হলো বিভিন্ন উপাস্যের উপর এক চূড়ান্ত সত্তায় বিশ্বাস। এটি একত্ববাদের এমন এক ভিত্তি যা সর্বেশ্বরবাদী ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যেও দেখতে পাওয়া যায়। যেমন হিন্দুধর্মের মধ্যে স্রষ্টা সম্পর্কে ধারণা হলো, মানবজাতি প্রথমে একত্ববাদী ছিল এবং ধীরে ধীরে অধঃপতনের ফলে বহু ঈশ্বরবাদী হয়ে পড়ে। বহু উপাস্য এবং প্রতিমা থাকার পরও সবার উপর হিন্দুধর্মের একজন চূড়ান্ত সত্তা রয়েছে যাকে তারা বলে ব্রহ্মা।
স্টিভ কনর | বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিবেদক (দ্য সানডে টাইমস, ২ নভেম্বর ১৯৯৭)
বিজ্ঞানীদের দাবি তাঁরা মানুষের মস্তিষ্কে God Module নামে একটি জায়গা আবিষ্কার করেছেন যা মানুষের ধর্মে বিশ্বাস স্থাপনের পিছনে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
স্নায়ুতান্ত্রিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রচুর আধ্যাত্মিক চর্চা করেন তাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশে কিছু স্নায়ু সংযোগ রয়েছে এবং যখন তারা স্রষ্টাকে নিয়ে চিন্তা করেন তখন এই স্নায়ুগুলো বৈদ্যুতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন এই গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ইতোমধ্যে প্রাপ্ত ফলাফল এটাই প্রমাণ করে যে, ধর্মে বিশ্বাস মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।
এপিলেপ্সির যেসব রোগী মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের 'সিজার' সমস্যায় ভোগেন তারা জানিয়েছেন, তারা প্রায়ই ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল নিউরোসায়েন্টিস্ট এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেন, 'সিজার' এর ফলে মস্তিষ্কের একটি অংশের স্নায়ুতে অতিরিক্ত উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় এবং এই অংশের নাম তারা দিয়েছেন God Module.
"মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবে কিছু স্নায়ুকোষ থাকতে পারে যেগুলো ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোই বিবর্তিত হয়ে সমাজে ক্রম এবং স্থায়িত্ব আরোপ করতে পারে।"- গত সপ্তাহে এক সম্মেলনে গবেষকদল একথা জানিয়েছেন।
এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, যেকোনো ব্যক্তি ধর্ম-এমনকি কোনো স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন কি না তা নির্ভর করতে পারে মস্তিষ্কের এই অংশের স্নায়ু সংযোগের গঠন প্রকৃতির উপর।
গবেষক দলের প্রধান ড. ভিলাইয়ানুর রাম চন্দ্রন জানান, তারা তাদের গবেষণায় এপিলেপ্সি আক্রান্ত রোগীদের সাথে একদল সাধারণ মানুষের এবং একদল কট্টর ধার্মিক মানুষের তুলনা করেছেন।
মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবের এক কার্যকর পরীক্ষায় দেখা গেছে, যখন আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সংক্রান্ত কথা বলা হয় তখন এপিলেপ্সি আক্রান্ত রোগী এবং কট্টর ধার্মিক মানুষের মস্তিষ্কে একই ধরনের উদ্দীপনা পাওয়া যায়।
বিবর্তন বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সারা বিশ্বে এবং সমগ্র ইতিহাসের মানব সমাজে স্রষ্টায় বিশ্বাসের যে সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা ডারউইনীয় অভিযোজন হিসেবে মস্তিষ্কের জটিল স্নায়ুসংযোগে সংস্থাপিত হয়ে থাকতে পারে, যাতে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।
যদি এই গবেষণা সত্য হয় এবং God Module বলে সত্যিই কিছু থেকে থাকে তাহলে প্রমাণিত হয়, নাস্তিকদের মস্তিষ্কের স্নায়ুসংযোগ অন্যদের চেয়ে আলাদা।
অক্সফোর্ডে বিশপ রিচার্ড হ্যারিসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, God Module এর অস্তিত্ব ধর্মতাত্ত্বিকদের নয়; বরং বিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয়। "যদি স্রষ্টা আমাদেরকে ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্মগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেন তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।"
প্রথাগতভাবে, অনেক নৃতাত্ত্বিকের মতে ধর্ম বহু ঈশ্বরবাদ থেকে ধাপে ধাপে একেশ্বরবাদের দিকে ধাবিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার প্রথমদিকে মানুষ প্রাকৃতিক শক্তির উপর দেবত্ব আরোপ করত এবং এর ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে সব অতি প্রাকৃতিক শক্তিকে দুইটি প্রধান দেবতা (একজন 'মঙ্গল'-এর দেবতা ও অপরজন 'অমঙ্গল'-এর দেবতা) হিসেবে কল্পনা করে এবং শেষ পর্যন্ত একেশ্বরবাদের ধারণায় উপনীত হয়।
সুতরাং নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ম কোনো স্বর্গীয় উৎস থেকে আসেনি বরং তা আদিম মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাবপ্রসূত কুসংস্কারের ফসল মাত্র। এসব তাত্ত্বিকগণের মতে, বিজ্ঞান একসময় প্রকৃতির সব ঘটনার গোপন রহস্য উন্মোচন করে ধর্মকে অকার্যকর প্রমাণ করবে এবং তার সাথে সাথে ধর্মেরও বিলুপ্তি ঘটবে।
অথচ এক চূড়ান্ত সত্তায় বিশ্বাসের উপর মানুষের যে-জন্মগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেটা উপরোক্ত মতের বিপরীত মতকেই সমর্থন করে। আর তা হলো, মানুষ শুরুতে একত্ববাদের উপরেই ছিল; কিন্তু কালের বিবর্তনে বহু ঈশ্বরবাদী হয়ে পড়ে। যেসব তথাকথিত আদিম গোত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তাদের মাঝেও একজন চূড়ান্ত সত্তায় বিশ্বাসের প্রমাণ মেলে। এসব আবিষ্কারের সময় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বিবর্তনের যে ধাপেই থাকুক না কেন তাদের অধিকাংশই সব উপাস্য ও আত্মার উপর এক চূড়ান্ত সত্তায় বিশ্বাস করত বলে প্রমাণিত হয়। অধিকাংশ ধর্মেই এক চূড়ান্ত সত্তার ধারণা এটাই প্রমাণ করে যে, মানবীয় মাত্রায় হলেও স্রষ্টার কিছু গুণাবলি সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান থাকার কারণে বেশিরভাগ মানুষ একত্ববাদ থেকে দূরে সরে যায়, ফলে সেসব সৃষ্টি কিছু ক্ষেত্রে 'ক্ষুদ্রতর স্রষ্টা'য় এবং কিছু ক্ষেত্রে সুপারিশকারীতে পরিণত হয়। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে একজন চূড়ান্ত সত্তায় বিশ্বাস-তা যেমনই হোক না কেন।
আল কুরআনে স্রষ্টা বলেছেন যে, তিনি যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন, তখন কিয়ামাত পর্যন্ত আদমের যত বংশধর আসবে, তাদের সবাইকে উপস্থিত করে এই অঙ্গীকার নিলেন যে,
أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا
'আমি কি তোমাদের প্রভু নই?' এর উত্তরে সবাই বলেছিল, 'হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।'
আল্লাহ এরপর তাদের ব্যাখ্যা করলেন, তিনি কেন সব মানুষের কাছ থেকে এই সাক্ষ্য নিলেন যে, তিনিই তাদের স্রষ্টা: তিনিই উপাসনা লাভের অধিকারী একমাত্র প্রকৃত স্রষ্টা। তিনি বলেছেন,
أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ
এটা এজন্য যে, তোমরা যেন পুনরুত্থানের দিন একথা না বলো, 'আমরা এই ব্যাপারে কিছুই জানতাম না।' (আল আ'রাফ, ৭:১৭২)
অর্থাৎ সেদিন আমরা একথা বলে পার পাবো না যে, আল্লাহ যে আমাদের স্রষ্টা সে ব্যাপারে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। কেউ আমাদের এটা বলেওনি যে, শুধু আল্লাহকেই আমাদের উপাসনা করতে হবে। পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ এই বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন,
أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِن قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِّن بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ
অথবা যেন এটা বলতে না পারো, "আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আগে শির্ক করেছে; আর আমরা হলাম তাদেরই বংশধর। আপনি কি এসব বাতিলপন্থীদের কাজের জন্য আমাদের ধ্বংস করে দিবেন?” (আল আ'রাফ, ৭:১৭৩)
প্রতিটি শিশুই তাই স্রষ্টার প্রতি স্বাভাবিক বিশ্বাস এবং কেবল তাঁকেই উপাসনা করার জন্মগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্মগত এই বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্যকে আরবিতে বলা হয় "ফিত্রাহ”।
নবী ﷺ বলেছেন যে, আল্লাহ বলেছেন, 'সঠিক ধর্মের উপরই আমি আমার দাসদের সৃষ্টি করেছি। যদিও শয়তান তাদের অনেককে বিপথে নিয়ে গেছে।' নবী ﷺ আরও বলেছেন, 'প্রত্যেক শিশুই ফিত্রাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা জরুথুস্ট্রি বানায়।' শিশুটিকে যদি একা ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে তার নিজের মতো করে স্রষ্টার উপাসনা করবে। কিন্তু প্রত্যেক শিশুই তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিশুটি যেভাবে প্রাকৃতিক আইনের (Natural Law) বাধ্যবাধকতা মেনে নেয়, ঠিক তেমনি তার অন্তর প্রাকৃতিকভাবেই সায় দেয় যে, একমাত্র আল্লাহই তার প্রভু, তার সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু তার বাবা-মা যদি তাকে ভিন্ন কোনো পথে চালানোর চেষ্টা করে, সেক্ষেত্রে জীবনের প্রথমদিকে শিশুটি তার বাবা-মা'র সেই ইচ্ছার প্রতিরোধ করতে পারে না। পারে না বাধা দিতে। ফলে শিশুটি তখন স্থানীয় রীতিনীতি ও শৈশবের শিক্ষাদীক্ষার মাঝে বেড়ে উঠতে শুরু করে। তবে একটি নির্দিষ্ট বয়স পার হওয়ার আগপর্যন্ত স্রষ্টা এই ধর্ম পালন করার জন্য তাকে দায়ী করবেন না, তাকে শাস্তিও দেবেন না।
এছাড়াও জন্মের পর থেকে মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্রষ্টা মানুষকে তাঁর বিভিন্ন নিদর্শন দেখিয়ে থাকেন। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন সময়ে তিনি মানুষকে তাঁর নিদর্শন দেখান। বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে তিনি এই ইঙ্গিত দেন যে, স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে, স্রষ্টা একজনই এবং তিনি এক ও একক আল্লাহ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন,
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ
(পৃথিবীর) দিক-দিগন্তে ও তাদের নিজেদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাব, যতক্ষণ না এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনি সত্য। (ফুসসিলাত, ৪১:৫৩)
বিভিন্ন ইঙ্গিত ও নিদর্শন দেখানোর মাধ্যমে স্রষ্টা কীভাবে মানুষকে তার ভুল শুধরে দেন, এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গলের আদিম উপজাতিদের একদল মানুষ স্কোয়াচ নামক মূর্তির পূজা করে। তাদের বিশ্বাস সব সৃষ্টির সর্বোচ্চ স্রষ্টা স্কোয়াচ। একটি কুঁড়েঘরে স্কোয়াচের মানুষরূপী মূর্তিটা বসানো ছিল। স্রষ্টাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার জন্য এক যুবক একদিন সেই ঘরে ঢোকে। তাকে শেখানো হয়েছিল এই মূর্তিই তার স্রষ্টা, তার পালনকর্তা। সে যখন মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে মূর্তির সামনে সিজদা করছিল, তখন কুঁড়েঘরের ভেতর একটি নেড়ি কুকুর চুপিসারে ঢুকে পড়ল। লোকটা সিজদা শেষ করে মাথা ওঠাতেই দেখল, একটি কুকুর মূর্তিটার উপর মূত্রত্যাগ করছে।
সে এটা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারল না। কুকুরটাকে ধরার জন্য সে উঠে দাঁড়াল। এই ফাঁকে কুকুরটাও ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়। অপমানের জ্বালায় দগ্ধ সেই যুবক বহুদূর পর্যন্ত তাড়া করে ফিরল কুকুরটাকে। ক্রোধ কিছুটা কমে আসার পর সে শান্ত হয়ে বসল। হঠাৎ তার মনে এই বোধোদয় হলো যে, এই মূর্তি কখনোই মহাবিশ্বের প্রভু হতে পারে না। নিজের মনের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে সে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে, এই মূর্তি তার স্রষ্টা নয়; স্রষ্টা নিশ্চয়ই অন্য কেউ। শুনতে যতই আশ্চর্যজনক মনে হোক না কেন, এই যুবকের জন্য এটাই ছিল স্রষ্টার পক্ষ থেকে নিদর্শন। এই নিদর্শন তাকে সেই ঐশীবার্তাই দিয়েছে যে, সে যার উপাসনা করছে সেটা মিথ্যে। প্রথাগতভাবে মিথ্যা উপাস্য পূজোর যে শৃঙ্খলে সে বন্দি ছিল, এই ঘটনা তাকে সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছে। তাকে দুটো পথের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে: প্রকৃত স্রষ্টাকে অন্বেষণ করা অথবা ভুল পথেই রয়ে যাওয়া।
স্রষ্টার নিদর্শন যারা খুঁজে ফিরবে তারাই সঠিক পথের দিশা পাবে। যেমনটা পেয়েছিলেন নবী ইবরাহীম (আঃ)। তাঁর ঘটনা তুলে ধরে কুরআনে বলা হয়েছে,
“আর এভাবেই আমি ইবরাহীমকে মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর আশ্চর্য বস্তুসমূহ দেখাতে থাকি, যাতে তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে। যখন রাতের অন্ধকার নামে সে তখন একটি তারকা দেখতে পায়। সে বলে, 'এই তো আমার প্রভু।' কিন্তু যখন সেটা ডুবে যায় তখন বলে, 'যারা ডুবে যায় আমি তাদের পছন্দ করি না।' তারপর যখন উদীয়মান চাঁদ দেখতে পায় তখন বলে, 'এই আমার প্রভু।' কিন্তু যখন তা-ও ডুবে যায় তখন বলে, 'আমার প্রভু যদি আমাকে পথ না দেখান তাহলে আমি অবশ্যই পথহারা লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকব।' এরপর যখন উদীয়মান সূর্য দেখে তখন বলে, 'এটাই আমার প্রভু হবে, (কারণ) এটা আরও বড়।' কিন্তু যখন তা-ও ডুবে গেল তখন বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর সাথে যাকে শরিক করো তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি একনিষ্ঠ হয়ে সেই মহান সত্তার দিকে আমার মুখ ফেরালাম যিনি মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন; যারা তাঁর সাথে শরিক করে আমি তাদের দলে নই।” (আল আন'আম, ৬: ৭৫-৭৯)
স্রষ্টার প্রতি মানুষের স্বভাবজাত বিশ্বাস এবং তাঁর উপাসনা করার জন্মগত বৈশিষ্ট্যকে সহায়তা করার জন্য প্রত্যেক জাতি ও গোষ্ঠীর কাছেই নবীদের পাঠানো হয়েছে। এই শাশ্বত সত্যকে আরও দৃঢ় করার জন্য স্রষ্টা মানুষকে তাঁর বিভিন্ন নিদর্শন দেখিয়েছেন। যদিও এসব নবীগণ যা প্রচার করেছিলেন তার অনেক কিছুই আজ বিকৃত হয়ে গেছে, এরপরও এসবের মধ্যে এখনো বেশ কিছু কথা অবিকৃত রয়ে গেছে। সত্যানুসন্ধানীরা এগুলোর সূত্র ধরে ঠিকই সত্য ও ভুল পথের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে আইন ও শাসন ব্যবস্থায় স্রষ্টার প্রত্যাদেশের প্রয়োগ দেখা যায়। ইহুদিদের তাওরাতে 'মুসার দশ অনুশাসন' নামে পরিচিত যে বিধিবিধান ছিল, পরবর্তীকালে সেটাই খ্রিষ্টানদের ধর্মের মধ্যে গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও আধুনিক ও প্রাচীন যুগের বিভিন্ন সমাজে হত্যা, চুরি ও ব্যভিচারের জন্য যেসব আইন রয়েছে, সেগুলোতেও এই দশ অনুশাসনের বেশ প্রভাব পাওয়া যায়।
যুগ যুগ ধরে নবীদের প্রতি অবতীর্ণ ওহী এবং মানবজাতির প্রতি স্রষ্টার বিভিন্ন নির্দশনের মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষকেই প্রকৃত ও একমাত্র স্রষ্টাকে চেনার পথ বাতলে দেওয়া হয়েছে। কাজেই, মানুষ তার স্রষ্টার প্রতি সঠিকভাবে ঈমান আনয়ন করেছে কি না এবং তাঁর মনোনীত একমাত্র সত্য ধর্ম 'ইসলাম' গ্রহণ করেছে কি না, এ ব্যাপারে সবাইকেই জবাবদিহি করতে হবে।
📄 সৃষ্টিকে যখন স্রষ্টা মনে করা হয়
স্রষ্টায় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অনেক মানুষের মধ্যে এমন একটি অযৌক্তিক ধারণা বাসা বেঁধে আছে যা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়; আর তা হলো স্রষ্টা মানুষে পরিণত হন বলে মনে করা। যখনই স্রষ্টায় বিশ্বাসের প্রাচীন একত্ববাদী ধারণার অধঃপতন ঘটে এই ভেবে যে, স্রষ্টার কাছে মানুষের আবেদন জানাতে কিংবা পৃথিবীতে স্রষ্টার প্রতিনিধি হয়ে কাজ করার জন্য স্রষ্টা ও মানুষের মাঝে একটি মাধ্যম দরকার; তখনই ওইসব কাল্পনিক মাধ্যমগুলো ইবাদাতের বস্তুতে পরিণত হয়। এই মাধ্যমগুলোকে কখনো কখনো প্রকৃতিতে বিদ্যমান সত্তা হিসেবেও কল্পনা করা হয়।
এসব কারণে আদিমকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পথভ্রষ্ট মানুষ বন, নদী, আকাশ, পৃথিবী ইত্যাদির উপাসনা করে আসছে। কখনো কখনো খোদ প্রকৃতিরই উপাসনা করেছে। আবার, কখনো প্রকৃতিকে উপস্থাপনকারী নানাবিধ প্রতীক উপাসনার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের বিশ্বাস থেকে যেসব ধর্মীয় ব্যবস্থা বিবর্তিত হয়েছে সেগুলো আদিমকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মানুষের মাঝে সীমিত ও বিক্ষিপ্তভাবে রয়ে গেছে। বর্তমান ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, এসব বিশ্বাস কখনো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী একটি মৌলিক বিশ্বাসে রূপ নিতে পারেনি।।
অন্যদিকে, যেখানেই একত্ববাদী বিশ্বাস থেকে ক্রমান্বয়ে স্রষ্টার ক্ষমতাকে পৃথক মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এজন্য ছবি-মূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানেই ঐসব ছবি-মূর্তি উপাসনার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। স্রষ্টার ক্ষমতাই উপাস্যে রূপ নিয়েছে। এই ধরনের বিশ্বাস প্রাচীন ও বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক প্রভাবসম্পন্ন ধর্মবিশ্বাসগুলোর শীর্ষে অবস্থান করছে। খ্রিষ্টানরা প্রাচীন মিশর, গ্রিক ও রোম সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করে। এর ফলে সেসব স্থানের ধর্মগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপরেও মুসলিম ও খ্রিষ্টান উপনিবেশগুলোতে হিন্দুধর্মের ভারতীয় দর্শন এখনো টিকে আছে এবং সেখানকার প্রায় এক বিলিয়ন মানুষের জাতীয় ধর্মে পরিণত হয়েছে। একমাত্র ইন্দোনেশিয়ার বালি ছাড়া দূর প্রাচ্যের অধিকাংশ জায়গায় খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম সরাসরি আন্তর্জাতিক প্রভাব স্থাপন করলেও বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন রূপ ও তার শাখা-প্রশাখাগুলো সেখানে কোটি কোটি মানুষের প্রধান ধর্মে রূপ নিয়েছে। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলনও বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করছে।
হিন্দুধর্মের মূলনীতি অনুযায়ী সবকিছুই স্রষ্টা; সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর সৃষ্টির মাঝে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। হিন্দু দর্শন অনুযায়ী, প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুরই একটি অন্তর্নিহিত শক্তি আছে যার নাম- 'আত্মা'। সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয় এই অন্তর্নিহিত শক্তিই প্রকৃত স্রষ্টা যার নাম- 'ব্রহ্মা'। এ কারণে হিন্দুধর্মের বিশ্বাসের সারাংশ হলো: 'আত্মা এবং ব্রহ্মা এক ও অবিচ্ছেদ্য'; অন্যভাবে বলা যায়, মানুষের আত্মা স্বর্গীয়। অধিকন্তু, মানবসমাজ কতগুলো জাতিপ্রথা কিংবা শ্রেণিপ্রথায় বিভক্ত এবং মনে করা হয়, বিভিন্ন শ্রেণি স্বর্গীয় সত্তা 'ব্রহ্মা'র বিভিন্ন অংশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেণি 'ব্রাহ্মণ' এসেছে স্রষ্টার মাথা থেকে, আবার সর্বনিম্ন শ্রেণি 'শূদ্র' এসেছে স্রষ্টার পা থেকে। রীতি অনুযায়ী চারটি প্রধান শ্রেণি থাকলেও বাস্তবে এর আবার অনেকগুলো উপশ্রেণি রয়েছে। প্রতিটি প্রধান শ্রেণি আবার হাজারো ক্ষুদ্রতর শ্রেণিতে বিভক্ত।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে। এ বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির আত্মা কখনো মারা যায় না বরং ক্রমাগতভাবে পুনর্জন্ম নিতে থাকে। কেউ যদি প্রথম জীবনে ভালো হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতে সে উচ্চতর শ্রেণিতে পুনর্জন্ম গ্রহণ করবে। বিপরীতভাবে, কেউ যদি প্রথম জীবনে খারাপ হয়ে থাকে তবে পরবর্তীকালে সে নিম্নতর শ্রেণিতে পুনর্জন্ম গ্রহণ করবে। আর মূলত এ কারণেই প্রতি বছর অসংখ্য হিন্দু আত্মহত্যা করে থাকে। সংবাদপত্রগুলো প্রতিদিন বাসায় ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যার খবর প্রকাশ করছে। একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ক্রিকেট ম্যাচে ভারত শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গেলে এক হিন্দু আত্মহত্যা করে। আসলে যখন কারও ধর্মীয় বিশ্বাস 'পুনর্জন্ম' মতবাদকে সমর্থন করে, তখন তার অনুসারীদের কাছে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আত্মহত্যা 'খুব সহজ' সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।
পুর্নজন্ম প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যখন কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ শ্রেণিতে জন্ম নেয় তখন তার চক্র শেষ হয় এবং এই অবস্থায় সে 'ব্রহ্মা'র সাথে মিলিত হয়। এই মিলিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে হিন্দু ধর্মে বলা হয় 'মোক্ষ' এবং বৌদ্ধধর্মে বলা হয় 'নির্বাণ'।[১] এভাবে 'আত্মা' পুনরায় 'ব্রহ্মা'র সাথে মিলিত হয় এবং মানুষ স্রষ্টায় পরিণত হয়।
হিন্দুধর্মে 'ব্রহ্মা'র গুণাবলি বিভিন্ন উপাস্য হিসেবে বিবেচিত হয়। সৃষ্টির গুণাবলি পরিণত হয় 'ব্রহ্মা'য়, রক্ষণাবেক্ষণের গুণাবলি পরিণত হয় 'বিষ্ণু'-তে, ধ্বংসের ক্ষমতা পরিণত হয় 'শিব'-এ। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় উপাস্য 'বিষ্ণু' বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেন। এভাবে মানুষের মাঝে স্রষ্টার আত্নপ্রকাশকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় 'অবতার' যার অর্থ 'অবতরণ করা'। এই মতবাদ অনুযায়ী স্রষ্টা মানুষরূপে অথবা অন্য কোনো সৃষ্টির আকারে এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন। প্রাথমিকভাবে 'অবতার' বলতে 'বিষ্ণু'র দশটি প্রধান রূপকে বুঝায়। মাছের আকারে বিষ্ণুর অবতরণকে 'মৎস্য', কচ্ছপের আকারে 'কুর্মা', বন্য শূকরের আকারে 'বরাহ', আধা-মানুষ আধা-সিংহের আকারে 'নরসিংহ' ও ক্ষুদ্রকায় আকারে অবতরণকে 'বামণ' বলা হয়। এগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত হলো মানুষের আকারে স্রষ্টার অবতরণ যাকে বলা হয় 'রাম'। যে 'রামায়ণ' মহাকাব্যের উপর ভারতে বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় এই 'রাম' তারই নায়ক।
আরেকটি জনপ্রিয় স্রষ্টা হলো 'কৃষ্ণ' যা মানুষের মাঝে 'বিষ্ণু'র আত্মপ্রকাশের আরেক রূপ। তাকে নিয়ে লিখিত মহাকাব্য হচ্ছে 'মহাভারত'। এতে রয়েছে পৃথিবীকে অপদেবতা, জনসংখ্যার আধিক্য ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মানুষের আকৃতিতে দেবতাদের অবতরণের কাহিনি। [২] সব মিলিয়ে মোট কতভাবে সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার প্রকাশ ঘটতে পারে এবং স্রষ্টা আরও কী কী প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারেন, সে ব্যাপারে অনেক মত থাকলেও সেগুলোর সবগুলোই মূলত এই কয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একারণেই গোটা মানবজাতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী এই বিশ্বাস লালন করে যে সৃষ্টিই স্রষ্টা অথবা স্রষ্টার অংশ এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির পার্থক্য শুধুই বাহ্যিক।
বৌদ্ধধর্মও হিন্দুধর্মের পুনর্জন্ম মতবাদকে ধারণ করে, তবে কিছুটা পরিবর্তিত আকারে।
এ ধর্মের বক্তব্য হলো, প্রতিটি সচেতন সত্তাই 'বুদ্ধ প্রকৃতি' ধারণ করে এবং 'বুদ্ধ' হতে সক্ষম। প্রাচীন শিক্ষা [১] অনুযায়ী বুদ্ধ ছিলেন প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক। বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখার বিশ্বাস অনুযায়ী বুদ্ধকে অনাদি অনন্ত হিসেবে, অবিনশ্বর সত্য হিসেবে ঈশ্বরের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। বৌদ্ধধর্মের প্রবক্তা সিদ্ধার্থ গৌতমের পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য ছিল, যেন তিনি বুদ্ধের চিরন্তন ও ঐশ্বরিকতার এ বার্তাটা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। [২] এভাবেই গৌতম বুদ্ধ আর মানুষ রইলেন না, হয়ে গেলেন চিরন্তন বুদ্ধের অলীক অপচ্ছায়া। বৌদ্ধধর্ম হিন্দুধর্মের ভক্তিবাদ দিয়ে এভাবেই প্রভাবিত হয়েছে এবং ঈশ্বর ও স্বর্গের এমন অলীক ধারণা তাতে জেঁকে বসেছে। আসন গেড়ে বসেছে কল্পিত ত্রাণকর্তা হিসেবে নানান মূর্তির প্রতি অন্ধভক্তি ও ভালোবাসা। অনেকেই ধারণা করে থাকেন, 'বুদ্ধ প্রকৃতি'র মাঝে 'শ্বাশ্বত বুদ্ধ' এবং 'বোধিসভা'র [৩] কিছু গুণাবলি আছে। যারা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিচরণ করে তাদের সব অনুসারীদেরকে তাদের মেধা, নিরাপত্তা ও শিক্ষা দান করে থাকে।
শাশ্বত বোধিসভার প্রধান হলো Avalokitesvara, যাকে করুণার মনুষ্যরূপ হিসেবে ধরা হয়, প্রজ্ঞার মনুষ্যরূপ হিসেবে ধরা হয় 'মাঞ্জুস্রী'-কে এবং শাশ্বত বুদ্ধের মধ্যে Aksobhya (প্রশান্ত), Amitabha (শাশ্বত আলো) এবং Amitayus (শাশ্বত জীবন) কে গণ্য করা হয়।
খ্রিষ্টান ধর্মে স্রষ্টার পুনর্জন্ম ধারণার উৎসমূলে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক বিশ্বাস। স্রষ্টার মানুষে পরিণত হওয়ার প্রমাণ মেলে গসপেল অব জন-এর ১:১ ও ১:১৪ অনুচ্ছেদে, যেখানে বলা হয়েছে- "শুরুতে ছিল শব্দ (logos), শব্দটি ছিল স্রষ্টার সাথে এবং শব্দটাই ছিল স্রষ্টা”। এরপর জন-এর লেখক আরও বলেন, "...এবং শব্দটি পরিণত হয় রক্তে, এরপর পরিপূর্ণ দয়া ও সত্যের সাথে তা আমাদের ভেতর বাস করতে থাকে..."। যদিও গ্রিক শব্দ logos কে 'শব্দ' হিসেবে অনুবাদ করা হয়, কিন্তু মূলত এর সমার্থবোধক কোনো বাংলা শব্দ নেই।
৬০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত গ্রিক দর্শনশাস্ত্রে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টান চিন্তাবিদেরা একে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করেছেন। এটা পরিবর্তনশীল মহাবিশ্বের নীতি হিসেবে প্রথম হেরাক্লিয়াস কর্তৃক ব্যবহৃত হলেও অ্যারিস্টটলের সময়ে অবস্তুগত শক্তি 'ন্যুস' কর্তৃক বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং বস্তুগত শক্তি তৈরি করে। Logos পুনরায় স্টোইকস-এর ব্যবস্থায় ফিরে আসে, যারা তাদের 'পরমকারণবাদ'-কে Logos ও God উভয় শব্দে ব্যাখ্যা করে। ইহুদি আলেকজান্দ্রিয়ান দার্শনিক ফিলো ওল্ড টেস্টামেন্ট এর গঠনমূলক শব্দকে স্টোইক এর logos হিসেবে চিহ্নিত করেন। এভাবেই পৃথিবীতে স্রষ্টার নিজেকে প্রকাশ করার সীমাহীন নীতি হয়ে দাঁড়ায় logos. এছাড়া logos এর একটি পরিত্রাণমূলক কাজও রয়েছে আর তা হলো এটি উচ্চতর আধ্যাত্মিক প্রকৃতির একটি মাধ্যম। গসপেল অব জন অনুসারে logos একই সাথে গঠনমূলক ও ধ্বংসাত্মক; তবে শেষের গুণটিকে প্রথমটির চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।[১]
এই বিশ্বাসের পেছনে যে কারণ রয়েছে তার ফলেই আদি পাপ (original sin) এবং শাশ্বত ত্যাগের ধারণার উদ্ভব ঘটে। বলা হয়ে থাকে, আদমের পাপ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়ে এত বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, তা আর কোনো মানুষের ছোটোখাটো ত্যাগ স্বীকার দ্বারা মুছে ফেলা সম্ভব নয়; বরং এজন্যে প্রয়োজন একটি বড় মাপের ত্যাগ। এমন বিশ্বাসের সূত্র ধরেই এই ধারণার সৃষ্টি হয় যে, স্রষ্টার এক পুত্র রয়েছেন যার মধ্যে স্বয়ং স্রষ্টা অবস্থান নিয়েছেন। পরবর্তীকালে স্রষ্টার এই পুত্রই সব মানুষের পক্ষ থেকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে নিজেকে স্রষ্টার নিকট উৎসর্গ করেন। এরপর তাকে পুনরুত্থিত করা হয় এবং বর্তমানে তিনি স্রষ্টার আসনের ডানদিকে বসে পৃথিবী ধ্বংসের পর সব মানুষের বিচারের জন্য অপেক্ষা করছেন। এ কারণে খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীর এই এক এবং একমাত্র জায়গায় স্রষ্টা মানুষের রূপ নিয়েছেন। আর তাই পাপ থেকে পরিত্রাণের জন্য স্রষ্টার মনুষ্যরূপ ধারণে বিশ্বাস করা একান্ত জরুরি। খ্রিষ্টানরা মনে করে যে, মানুষের মাঝে একমাত্র তাঁকেই স্রষ্টার আসনে উন্নীত করা যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইসলাম ধর্মের কিছু অনুসারীও হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের মতো মানুষকে স্রষ্টার আসনে আসীন করার এই গর্হিত বিশ্বাস পোষণ করে। তথাকথিত সুফিবাদী আধ্যাত্মিকতা থেকে তাদের এই বিশ্বাসের সূত্রপাত ঘটেছে, যার মূলে রয়েছে প্রাচীন গ্রিসের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ধর্মসমূহ। আধ্যাত্মিকতা বলতে বোঝায় স্রষ্টার সাথে মানুষের একীভূত হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং এই অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য নিহিত আছে বলে বিশ্বাস করা। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর লেখনীতে ও বিভিন্ন আলোচনা সভায় এই ধারণার প্রস্তাব করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে মানুষের আত্মা আধ্যাত্মিকতার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে অবশেষে স্রষ্টার সাথে মিলিত হয়।[১] এ ধরনের ধারণার ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস করা যে— ‘মানুষ বস্তুজগতে আটকে পড়া স্রষ্টার একটি অংশ’। দৈহিক কাঠামো মানুষের আত্মাকে ঢেকে রাখে। আত্মা তাদের দৃষ্টিতে একটি শাশ্বত সত্তা। বস্তুজগতে আটকে পড়া স্রষ্টার এই অংশ নিজেকে মুক্ত করে পুনরায় স্রষ্টার সাথে মিলিত হয়।
মুসলিমদের মধ্যেও একটি দল আছে যারা ঠিক একই রকম মতবাদ প্রচার করে থাকে। এই মতবাদের অনুসারীদের বলা হয় ‘সুফি’ এবং এই মতবাদকে বলা হয় ‘সুফিবাদ’। একে ইংরেজিতে বলা হয় 'Mysticism' অথবা 'Islamic mysticism'। این মতবাদও গ্রিক আধ্যাত্মিকতাবাদের ভিত্তিতে রচিত যেখানে বলা হয় মানুষের আত্মা শাশ্বত এবং আধ্যাত্মিক চর্চার নির্দিষ্ট কিছু স্তর পেরিয়ে তা স্রষ্টার সাথে পুনর্মিলিত হয়।
সুফিদের বিভিন্ন দল এই চর্চার কিছু বিশেষ নিয়ম তৈরি করেছে যেগুলোকে তারা বলে ‘তরিকা’ তথা নিয়ম বা পন্থা। প্রতিটি তরিকার নামকরণ করা হয়েছে তার প্রকৃত কিংবা কথিত প্রতিষ্ঠাতার নামে এবং প্রতিটি তরিকার কিছু বিশেষ নিয়মকানুন আছে যেগুলো তার অনুসারীদের কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। বেশিরভাগ তরিকাই তাঁর অনুসারীদের শিক্ষা দিয়ে থাকে যে, কিছু নির্দিষ্ট আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও দৈহিক চর্চার পরে তারা মহান স্রষ্টার সাথে মিলিত হতে পারে। এই মিলনকে তারা অভিহিত করেন 'ফানা'-যার অর্থ 'মিশে যাওয়া বা বিলীন হয়ে যাওয়া'[১] অথবা 'ওসূল'-যার অর্থ 'সাক্ষাৎ, আগমন বা মিলন'-এসব আরবি শব্দ দিয়ে।
'স্রষ্টার সাথে মিলন' এর এই ধারণা সালাফ আস-সালিহীন[২] থেকে নিয়ে শুরু করে আজ পর্যন্ত মূলধারার সব হকপন্থী আলিমগণ প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও বহু সাধারণ মুসলিম এসব ভ্রান্ত মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। দশম শতাব্দীর একজন নিবেদিতপ্রাণ সুফি আল হাল্লাজ (৮৫৮-৯২২) প্রকাশ্যে নিজেকে স্রষ্টা ঘোষণা করেন। এই বিষয়ে তিনি বহু কবিতা লিখেছেন, এমনকি 'কিতাব আত-তাওয়াসিন' নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, 'তুমি যদি স্রষ্টাকে চিনতে না পার, অন্তত তাঁর নিদর্শনকে চেনো; আমিই চূড়ান্ত শাশ্বত সত্য, কারণ সত্যের মাঝেই আমি শাশ্বত সত্য। আমার বন্ধু ও শিক্ষকেরা হলেন ইবলীস[৩] ও ফিরআউন। ইবলীসকে আগুনের ভয় দেখানোর পরও সে তার ও স্রষ্টার মাঝে কোনো কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করেনি এবং আমাকে যদি হত্যা ও ক্রুশবিদ্ধও করা হয়, আমার হাত-পা কেটে ফেলা হয়, তবুও আমি আমার মতবাদ পরিত্যাগ করব না।'[৪]
ইব্ন আরাবী (মৃত্যু ১২৪০ইং) স্রষ্টার সাথে মিলনের ধারণাকে আরও একধাপ এগিয়ে গ্রহণ করেছেন এই বলে যে 'একমাত্র স্রষ্টাই অস্তিত্বশীল'। তিনি তার বইতে লিখেছেন- 'কত মহান তিনি যিনি দৃশ্যমান সবকিছু তৈরি করেছেন যখন তিনি নিজেই তাদের নির্যাস।'[৫] অন্য জায়গায় তিনি লিখেন, 'যা কিছুই ঘটে তিনি তারই নির্যাস এবং যা কিছু লুকায়িত আছে তিনি তারও নির্যাস যখন তিনি দৃশ্যমান। তাঁকে তিনি ছাড়া আর কেউই দেখতে পায় না এবং কেউই তাঁর থেকে লুক্কায়িত নয় কারণ, তিনি লুক্কায়িত থেকেও দৃশ্যমান।'[৬] তাঁর এই মতবাদের নাম দেওয়া হয় 'ওয়াহদাত-উল-উজুদ' এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সুফিদের মাঝে এই মতবাদের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
টিকাঃ
[১] এটি একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ 'নিশ্চিহ্ন করা'। দুনিয়াবী কামনা থেকে মুক্ত হয়ে চিরন্তন মুক্তি লাভের পন্থা হিসেবে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বৈদিক রচনা (ভগবদগীতা এবং বেদ) থেকে এর উদ্ভব হলেও এটি মূলত বৌদ্ধধর্মের সাথে সম্পৃক্ত। বৌদ্ধধর্মের হীনযান শাখায় শব্দটিকে 'বিলুপ্তি' হিসেবে ব্যবহার করলেও মহাযান শাখায় একে এক আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হয়। (ডিকশনারি অব ফিলোসফি অ্যান্ড রিলিজিয়ন; পৃ-৩৯৩)।
[২] এই মহাকাব্যের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে ভগবদগীতা (ডিকশনারি অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস; পৃ-৪৪৮)
[১] বৌদ্ধধর্মের Theravada শাখা মূলত একটি বিধিবদ্ধ পন্থা যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজে থেকেই চিরন্তন মুক্তি লাভের চর্চা করতে পারে। শুধুমাত্র যেসব সন্ন্যাসীর তীব্র সহনশক্তি এবং ক্ষমতা আছে তারাই এই চর্চায় সফল হতে পারে এবং যে তা অর্জন করতে পারে তাকে বলা হয় Arhant. দুই প্রকারের নির্বাণ রয়েছে-একটি হলো 'অবশেষসহ' এবং অপরটি 'অবশেষ ছাড়া'। প্রথমটি কেবল Arhant-রাই অর্জন করতে পারে এবং এর মাঝে পাঁচটি জিনিস-স্কন্ধ-যার মাঝে সব মানুষই অন্তর্ভুক্ত; পদার্থ, সংবেদন, উপলব্ধি, পূর্বানুরাগ ও চেতনা এখনও বর্তমান। যদিও পুনর্জন্মের সনির্বন্ধ প্রার্থনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশেষ ছাড়াই নির্বাণ মূলত মৃত্যুর পর Arhant-এর অবস্থা বুঝিয়ে থাকে যে ব্যাপারে বুদ্ধ নীরব। এক মহাকালে কেবল একজনই বুদ্ধ থাকতে পারে এবং খুব অল্প কিছু সম্ভ্রান্তেরই এই আলোকপ্রাপ্তির সৌভাগ্য জোটে। বৌদ্ধধর্মের এই মতবাদকে বলা হয় হীনযান।
[২] ডিকশনারি অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস; পৃ. ১২৯।
[৩] এই শব্দটি মূলত প্রাচীন বুদ্ধদের বোঝাতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যারা তাদের আলোকপ্রাপ্তির অপেক্ষায় থাকতেন। মহাযান শাখার বিশ্বাস অনুযায়ী অন্য সবকে আলোকপ্রাপ্তিতে সাহায্য করার জন্যই বোধিসভা তার চূড়ান্ত আলোকপ্রাপ্তির মাধ্যমে নির্বাণ লাভে বিলম্ব করে থাকে। (ডিকশনারি অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন্স; পৃ. ১১২)।
[১] ডিকশনারি অব ফিলোসফি এন্ড রিলিজিয়নস; পৃ-৩১৪।
[১] কলিয়ারস এনসাইক্লোপিডিয়া; খন্ড-১৭; পৃ-১১৪।
[১] এহইয়াউ উলুম আদ-দ্বীন; খন্ড-৪; পৃ-২১২।
[২] ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্মের ন্যায়নিষ্ঠ মুসলিমগণ-রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবা, সাহাবাদের ছাত্ররা এবং সেসব ছাত্রদের ছাত্ররা।
[৩] ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী শয়তানের প্রকৃত নাম।
[৪] আইডিয়া অব পার্সোনালিটি; পৃ-৩২।
[৫] আল ফুতুহাত আল মাক্কিয়্যাহ; খণ্ড-২; পৃ-৬০৪।
[৬] ফুসুস আল হিকাম; খন্ড-১; পৃ-৭৭।
📄 স্রষ্টাকে মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনা
যে প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে তা হলো, 'স্রষ্টা কি সত্যিই মানুষ হতে পারেন?' যুক্তি বলে, 'না'। কারণ, স্রষ্টার মানুষে পরিণত হওয়ার মতবাদ স্বয়ং স্রষ্টার সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানুষ সাধারণভাবে বলে থাকে, স্রষ্টা সবকিছু করতে সক্ষম; তিনি যা করতে চান তাই করতে পারেন। খ্রিষ্টানদের বাইবেলে বলা হয়েছে, "...স্রষ্টার পক্ষে সবকিছুই সম্ভব।” (মথি, ১৯:২৬; মার্ক, ১০:২৭, ১৪:৩৬)
মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন বলে, إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। (আল বাকারা, ২:২০)
হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোও একই ধরনের কথা বলে। সবগুলো প্রধান ধর্মগ্রন্থই স্রষ্টার সর্বময় ক্ষমতা সম্পর্কে একই ধরনের কথা বলে। তিনি সবকিছু থেকে মহান এবং তাঁর পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব। এই সাধারণ ধারণাটিকে বাস্তবে বুঝতে হলে একজনকে প্রথমেই স্রষ্টার গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে হবে। অধিকাংশ সমাজেই স্রষ্টাকে একজন চিরন্তন সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয় যার কোন শুরু কিংবা শেষ নেই। এখন, স্রষ্টা সবকিছুই করতে সক্ষম, এর ভিত্তিতে যদি প্রশ্ন করা হয়, 'স্রষ্টা কি মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম?' তাহলে এর উত্তর কী হবে? যেহেতু 'মৃত্যুবরণ করা' 'সবকিছু'র একটি অংশ সেহেতু এটা কি বলা যেতে পারে, "যদি তিনি চান?" না, কখনোই এটা বলা যেতে পারে না।
এখানেই সমস্যা। স্রষ্টাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় চিরন্তন সত্তা হিসেবে যাঁর কোনো শেষ নেই; আর মৃত্যুর অর্থই হলো 'কোনো কিছুর শেষে উপনীত হওয়া'। ফলে, 'স্রষ্টা মারা যেতে পারেন কি না'-এ ধরনের প্রশ্ন একেবারেই অর্থহীন এবং স্রষ্টার সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে, 'স্রষ্টা জন্মগ্রহণ করতে পারেন কি না' এই ধরনের প্রশ্নও অবান্তর, কারণ ইতিমধ্যেই স্রষ্টাকে শাশ্বত সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যাঁর কোন শুরু নেই। জন্মগ্রহণ করা অর্থ একটি শুরু থাকা, অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আসা। এই ধারণা থেকেই নাস্তিক দার্শনিকগণ আস্তিকদেরকে উপহাস করে জিজ্ঞেস করে, “স্রষ্টা কি এমন পাথর তৈরি করতে সক্ষম যা তার পক্ষে ওঠানো অসম্ভব?” সেই আস্তিক যদি বলে থাকে- “হ্যাঁ”, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, স্রষ্টা তাঁর নিজের থেকে উচ্চতর কিছু তৈরি করতে সক্ষম। এবং যদি সে উত্তর দেয়, “না”, তাহলে এর অর্থ হয় স্রষ্টা সবকিছু করতে অক্ষম।
তাই "স্রষ্টা সবকিছু করতে সক্ষম" বাক্যের 'সবকিছু' শব্দ থেকে সেগুলো বাদ যাবে যেগুলো স্রষ্টার গুণাবলির সাথে সাংঘর্ষিক। এর মাঝে এমন কিছু থাকবে না যেগুলো তাঁর শাশ্বত গুণাবলির বিরুদ্ধে যায় এবং তাঁকে নিম্নতর আসনে নামিয়ে দেয়। যেমন, ভুলে যাওয়া, ঘুমানো, অনুশোচনা, বেড়ে উঠা, পানাহার ইত্যাদি। বরং 'সবকিছু' শব্দের ভেতর কেবল সেসব বিষয়ই থাকবে যেগুলো তাঁর স্রষ্টা হওয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ—“স্রষ্টা সবকিছু করতে সক্ষম” এর অর্থ এটাই। একে পরম অর্থে বোঝা যাবে না, সীমিত অর্থে বুঝতে হবে।
স্রষ্টার মানুষে রূপান্তরের দাবি খুব স্বাভাবিক কারণেই অযৌক্তিক। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায় স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছেন; আর স্রষ্টার পক্ষে মানুষের বৈশিষ্ট্য ধারণ করা বেমানান। বরং সৃষ্টি হলো স্রষ্টার প্রত্যক্ষ সৃষ্টি। স্রষ্টা যদি তাঁর সৃষ্টিতে পরিণত হন তবে এর অর্থ দাঁড়ায়, স্রষ্টাই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, যা স্পষ্টই অযৌক্তিক। সৃষ্ট হতে হলে প্রথমে তাঁকে অস্তিত্বহীন হতে হবে, আর যদি তিনি অস্তিত্বহীন হন তবে কীভাবে নিজেকে সৃষ্টি করবেন? অধিকন্তু যদি তিনি সৃষ্ট হন তবে এর অর্থ হয় তাঁর একটি শুরু আছে যা কিনা তাঁর শাশ্বত চিরন্তন হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। স্বাভাবিক নিয়মেই সৃষ্টির একজন স্রষ্টা প্রয়োজন। সৃষ্টবস্তুর অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন একজন স্রষ্টার যিনি তাদেরকে অস্তিত্বে নিয়ে আসবেন। স্রষ্টার কোনো স্রষ্টা প্রয়োজন হতে পারে না, কারণ তিনি নিজেই স্রষ্টা। সুতরাং এখানে শব্দগুলোর মধ্যেই স্পষ্ট বৈপরিত্য আছে। স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির রূপ নিয়েছেন এই দাবির অর্থ দাঁড়ায়, তাঁর একজন স্রষ্টার প্রয়োজন—যা একটি চরম হাস্যকর ধারণা। এটা স্রষ্টার অসৃষ্ট হওয়া, অমুখাপেক্ষী হওয়া এবং স্রষ্টা হওয়ার প্রধান ধারণাগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
📄 মানুষকে স্রষ্টার পর্যায়ে উন্নীতকরণ
সৃষ্টি হিসেবে মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়। এগুলো এমন বৈশিষ্ট্য যেগুলোকে স্রষ্টার উপর অর্পণ করা যায় না। কারণ এগুলো স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টির সমতুল্য করে দেয়। সুতরাং স্রষ্টা কখনোই মানুষের রূপ নেয়নি এবং নেবেনও না।
অপরপক্ষে মানুষও কখনো স্রষ্টার রূপ নিতে পারে না। সৃষ্ট বস্তু কখনোই তার স্রষ্টায় পরিণত হতে পারে না। এটা অসম্ভব। একটি সময় সৃষ্ট বস্তুর কোনো অস্তিত্ব ছিল না; একজন সদা বিরাজমান স্রষ্টার প্রত্যক্ষ কর্মের ফলেই তা অস্তিত্বে আসে। যার কোনো অস্তিত্বই নেই তা কখনো নিজেকে অস্তিত্বশীল করতে পারে না।
এছাড়াও মানুষের আত্মা শাশ্বত ও চিরন্তন হওয়ার যে ধারণা রয়েছে তা মূলত এই বিশ্বাসের ভিত্তি রচনা করে যে, মানুষও স্রষ্টার রূপ নিতে পারে। এই মতবাদ গ্রিক ও খ্রিষ্টান আধ্যাত্মিকতাবাদ, মুসলিম সুফিবাদ ও হিন্দু ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিমূল। এই মতবাদ সব মানুষ ও জীবন্ত প্রাণীর উপর ঐশ্বরিকতা আরোপ করে। এই মতবাদ অনুযায়ী ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে স্রষ্টার অংশবিশেষ বস্তু দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পৃথিবীতে রয়ে যায়। অন্যভাবে বলা যায়, অসীম সত্তা আটকে পড়ে সসীমের ভেতর। এই বিশ্বাস সব মন্দকে স্রষ্টার প্রতি অর্পণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ভালো ও মন্দের অর্থই হারিয়ে ফেলে।
যখন মানুষের মন মন্দ কিছু ইচ্ছা করে এবং শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার অনুমতিক্রমেই তা করে ফেলে, তখন তা সত্যিই শাস্তিযোগ্য গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে 'কর্ম'-এর ধারণার সূত্রপাত হয়। এই ধারণা অনুযায়ী বর্তমান জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট হলো পূর্ববর্তী জীবনের কুকর্মের ফল। মানুষের মাঝে স্রষ্টার যে অংশ বাস করে তা যখন কোনো কুকর্ম করে ফেলে তখনই স্রষ্টা শাস্তি দিয়ে থাকেন। যদি মানুষের ইচ্ছাশক্তি স্রষ্টা থেকে স্বাধীন হয়, তাহলে তারা একই সাথে স্রষ্টা ও মানুষ হতে পারে না। এভাবেই প্রতিটি মানুষ নিজেরাই দেবতায় পরিণত হয়ে যায়।