📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসমাতে আম্বিয়া

📄 ইসমাতে আম্বিয়া


নবুওয়াত হইল সর্বোচ্চ পদমর্যাদা। নবুওয়াতের বড় একটি দিক হইল যাঁহারা এই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন তাঁহারা ছিলেন নিষ্পাপ (মা'সূম) অর্থাৎ ইসমাতের অধিকারী। ইসমাত আরবী শব্দ। শাব্দিক অর্থ রক্ষা করা, বারণ করা। عَصَمْتُهُ عَنِ الطَّعَامِ "আমি তাহাকে খাদ্য গ্রহণ হইতে বারণ করিয়াছি" عَصَمْتُهُ عَنِ الْكَذَّبِ "আমি তাহাকে মিথ্যা বলা হইতে বারণ করিয়াছি"। ইসলামী শরীয়াতে ইসমাত বলা হয়:
حِفْظُ اللَّهِ لِأَنْبِيَائِهِ وَرُسُلِهِ عَنِ الْوُقُوعِ فِي الذُّنُوبِ وَالْمَعَاصِي وَارْتِكَابِ الْمُنْكَرَاتِ وَالْمُحَرَّمَاتِ. "রাসূলগণের গুনাহ, পাপ, নাফরমানীর কাজে জড়াইয়া পড়া হইতে এবং নিষিদ্ধ-ঘৃণ্য ও হারাম কাজ করা হইতে আল্লাহ তা'আলার রক্ষা করা"।
সায়্যিদ মাহদী আস-সদর বলেন:
وَهِيَ حِصَانَةٌ رُوحِيَّةٌ وَمَنَاعَةً نَفِيسَةٌ مَعْصِمُ ذَوِيْهَا مِنْ جَمِيعِ الذُّنُوبِ وَالآثَامِ رَغْمَ قُدْرَتُهَا عَلَيْهَا . "ইহা একটি আত্মিক পবিত্রতা এবং মূল্যবান দৈহিক শক্তি, যাহার অধিকারী শক্তি থাকা সত্ত্বেও সকল প্রকার পাপ-পংকিলতা হইতে সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকেন"।
নবীগণের মা'সূম হওয়া সম্পর্কে ইমাম আবদুল ওয়াহহাব আশ-শা'রানী বলেন, ইহার অর্থ হইল সকল প্রকার কথা, কাজ ও আচার-আচরণে তাঁহাদের এমনভাবে সংযত থাকা যাহাতে তাঁহাদের উচ্চ মর্যাদার হানি না ঘটে। তাঁহাদের এই অবস্থার কারণ এই যে, তাঁহারা সর্বদা আল্লাহ্র খাস দরবারে অবস্থান করেন। কোন সময় তাঁহারা স্বয়ং আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত হন, আর কোন সময় তাঁহাদের এই অবস্থা হয় যে, যদিও আল্লাহকে তাঁহারা দেখিতেছেন না, কিন্তু আল্লাহ তাঁহাদেরকে দেখিতেছেন। আল্লাহর দরবারে উপস্থিতির এই দুই অবস্থা হইতে তাঁহারা কোন সময়ই খালি হন নাই। যাঁহাদের অবস্থান এমন তাঁহারা কখনও প্রকৃতভাবে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করিতে পারেন না।
ইমাম ইব্‌ন হাযম বলেন, নবীগণ আল্লাহর অবাধ্যতা করিতে পারেন কিনা এই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছে। একদল লোক এই অভিমত পোষণ করেন যে, নবী-রাসূলগণ তাঁহাদের উপর অর্পিত দীন প্রচারের ব্যাপারে মিথ্যা বলা ব্যতিরেকে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সগীরা ও কবীরা গুনাহে লিপ্ত হইবার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্য হইতে পারেন। এই অভিমতটি হইল মুরজিয়্যা আকীদার অনুসারী কাররামিয়্যা উপদলের। আশ'আরিয়‍্যা আকীদার সমর্থক ইব্‌ন তাಯ್ಯিব আল-বাকিল্লানী ও তাহার অনুসারীগণও এই অভিমত পোষণ করেন। আর ইহাই হইল ইয়াহুদী-খৃস্টানগণের অভিমত। ইব্‌ন হায্য আরও বলেন, কাররামিয়্যা মতবাদের অনুসারী কোন এক লোক হইতে আমি শুনিয়াছি। উহারা মনে করে যে, ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রেও নবীগণ মিথ্যা বলিতে পারেন। আবূ তায়্যيب আল-বাকিল্লানীর অনুসারী আবু জাফর আস-সিমনানী আরও অগ্রসর হইয়া বলেন, নবীগণের পক্ষে কুফরী করাও সম্ভব। নবী কোন কাজ নিষেধ করিবার পর তাঁহাকে আবার উহা করিতে দেখিলে তাহা এই কথার দলীল হইবে না যে, ইহা রহিত হইয়া গিয়াছে। কারণ নবী অনেক সময় আল্লাহ্র অবাধ্য হইয়া কুফরী কাজও করিয়া থাকেন।
এই সকল অভিমত হইল সরাসরি কুফরী। যাহারা এইরূপ আকীদা পোষণ করে তাহারা ইসলামের গণ্ডী হইতে বাহির হইয়া মুরতাদ হইয়া যায়। ইব্‌ন ফাওরাক আল-আশ'আরী বলেন, নবীগণের দ্বারা কখনও কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নহে, তবে ইচ্ছা করিয়া তাঁহারা সগীরা গুনাহে লিপ্ত হইতে পারেন। কিন্তু সকল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত, এমনকি মু'তাযিলা, নাজ্জারিয়্যা, খারিজী ও শী'আগণের অভিমত হইল, কোন নবীর দ্বারা কখনও ইচ্ছাপূর্বক কোন গুনাহে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়, তাহা সগীরা গুনাহ হউক কিংবা কবীরা। তবে তাঁহাদের দ্বারা আসাবধানতাবশত (سَهْواً) অনিচ্ছায় কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হইতে পারে। অনুরূপ তাঁহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে এমন কোন কাজে জড়াইয়া যাইতে পারেন যাহা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির পরিপন্থী। তবে নবীগণ দ্বারা এমন কোন কাজ সংঘটিত হইয়া গেলে তাঁহারা ইহার উপর স্থির থাকেন না, বরং সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে তাঁহাদেরকে সাবধান করিয়া দেওয়া হয়।
কারী মুহাম্মাদ তাইয়্যিব (র) বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এবং মুসলমানগণের আকীদা হইল, আম্বিয়ায়ে কিরাম নবুওয়াত লাভের পূর্ব হইতেই মা'সূম (নিষ্পাপ)। তাঁহারা জীবনের প্রথম পদক্ষেপ হইতেই গুনাহ হইতে পূত ও পবিত্র। নবুওয়াত লাভের পর তাঁহাদের এই নিষ্পাপতা উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। তখন তাঁহাদের গুনাহ করিবার প্রশ্নই আসে না। কারণ নবীগণের জীবনে যদি কোন নগণ্য পাপ কাজও লক্ষ্য করা যায়, তাহা হইলে তাঁহাদের জীবন কী করিয়া অন্যদের জন্য আদর্শ হইবে, যাহারা তাঁহাদের জীবনকে আদর্শ হিসাবে অনুসরণ করিবে? তাহাদের এই ধারণা হইতে পারে, সম্ভবত নবী ইহা ভুল বশত করিয়াছেন, আসলে ইহা ছিল গুনাহের কাজ। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদেরকে নিষ্পাপ হিসাবে সৃষ্টি করিয়াছেন। আম্বিয়ায়ে কিরাম জন্মগতভাবে মা'সূম হইবার যুক্তি তিনটি।
(এক) তাঁহারা যেই মাটি ও উপাদান দ্বারা তৈরী তাহা এতই পূত ও পবিত্র যে, ইহাতে গুনাহের গন্ধও থাকিবার অবকাশ নাই। হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, নবীগণকে সৃষ্টি করা হইয়াছে মাটি দ্বারা; তবে এই মাটির বড় অংশ হইল জান্নাতের মাটি, পার্থিব মাটির অংশ কম, আর জান্নাতী মাটির অংশ হইল বেশী। সুতরাং জান্নাতী মাটির বেশী প্রভাব থাকার কথা। জান্নাতী মাটির মধ্যে কোন অপবিত্রতা ও অপরিচ্ছন্নতা নাই, ইহাতে রহিয়াছে জ্যোতির্ময়তা। সুতরাং তাঁহাদের দ্বারা গুনাহে লিপ্ত হইবার আশংকা নাই।
(২) নবীগণ সর্বদা আল্লাহ্র দুইটি শান-জালালিয়‍্যাত ও জামালিয়্যত অর্থাৎ চরম মহিমা ও প্রতাপ এবং সীমাহীন করুণার অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁহাদের অন্তর সব সময় আল্লাহপ্রেমে বিভোর থাকে। এমতাবস্থায় তাঁহাদের দ্বারা কোন গুনাহ সংঘটিত হওয়া কি সম্ভব? যদি কেহ বাদশাহের সম্মুখে থাকে তাহা হইলে সে কি হিম্মত করিবে যে, বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন বাদশাহের দরবারে দাঁড়াইয়া সে তাঁহার বিরুদ্ধে কোন কাজে লিপ্ত হইবে? বরং এদিক-সেদিক তাকানো তো দূরের কথা, তখন অধোমুখ হইয়া তাঁহার সম্মুখে নতশিরে দাঁড়াইয়া থাকিবে।
দুনিয়ার সামান্য এক বাদশাহের সম্মুখে দাঁড়াইয়া যদি তাহার বিরুদ্ধাচারণ করিবার সাহস না হয় তাহা হইলে পরাক্রমশালী রাজাধিরাজ আল্লাহর সামনে দাঁড়াইয়া তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবার দুঃসাহস কেহ কি দেখাইতে পারিবে?
(৩) নবীগণ সর্বদা আল্লাহ্ রক্ষণাবেক্ষণের অধীন থকেন। কোন সময় মানবিক দুর্বলতা জনিত কারণে যদি তাঁহারা কোন অসঙ্গত কাজের দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন তখন সঙ্গে সঙ্গে- তাঁহাদিগকে আল্লাহর সংরক্ষণ বেষ্টন করিয়া রাখে। ফলে তাঁহারা আর সেই কাজে লিপ্ত হইতে পারেন না। যেমন ইউসুফ ('আ)-এর ঘটনাটি ইহার সাক্ষ্য বহন করে। যুলায়খার চক্রান্তের বেড়াজালে আবদ্ধ ইউসুফ ('আ)-এর মনের ভাবের কথা আল-কুরআনের এই আয়াতে ব্যক্ত হইয়াছে:
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا إِنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ.
"সেই রমণী (যুলায়খা) তো তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছিল এবং সেও (ইউসুফ) উহার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িত যদি না তাহার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিত" (১২: ২৪)।
হাদীছে বর্ণিত আছে, ইউসুফ ('আ)-এর অন্তরে মানবিক স্বভাববশত কিছু অনিচ্ছাকৃত ঝোঁকের উদ্রেক হইয়া যাইতেছিল। কিন্তু তিনি যখন ছাদের দিকে দৃষ্টি দিলেন তখন তাঁহার পিতা ইয়া'কূব ('আ)-এর চেহারা মুবারক ছাদের উপর ভাসিয়া উঠিল। ইহা দেখিয়াই ইউসুফ দৌড়াইয়া পালাইলেন। তখন এই মু'জিযা তাঁহার দ্বারা প্রকাশ পাইয়াছিল যে, সাতটি কামরার যেইটির দ্বারে তিনি পৌঁছাইয়াছেন সেই দ্বার আপনা আপনি উন্মুক্ত হইয়া গিয়াছে। ইহাই হইল আল্লাহ্র সংরক্ষণে থাকার নমুনা। নবী-রাসূলগণের মা'সূম হওয়া সম্পর্কে ইদরীস কান্ধলাবী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, নক্স ও শয়তানের প্রভাবমুক্তরা হইলেন মা'সূম। নফস ও শয়তানের প্রভাব হইতে মুক্ত থাকা যায় অদৃশ্য সংরক্ষণের (حفاظت غیبی) দ্বারা। আল্লাহ তা'আলা এবং ফেরেশতাগণের সংরক্ষণের ফলে নবীগণ আল্লাহ তা'আলার হিফাযতের ভিতর পরিবেষ্টিত থাকেন। ফলে তাঁহারা সঠিক পথে পরিচালিত হন। অসৎ পথে চলার আসক্তি তাঁহাদের মধ্যে জন্মায় না। আল-কুরআনে নবীগণকে মনোনীত ও উত্তম বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে:
وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بخَالِصَةٍ ذِكْرَى الدَّارِ. وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ. (ص ٤٥-٤٧)
"স্মরণ কর, আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূবের কথা; উহারা ছিল শক্তিশালী ও সূক্ষ্মদর্শী। আমি তাহাদিগকে অধিকারী করিয়াছিলাম এক বিশেষ গুণের, উহা ছিল পরলোকের স্মরণ। অবশ্যই তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮:৪৫-৪৭)।
অভিশপ্ত ইবলীসের কথা এইভাবে ইরশাদ হইয়াছে:
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ الأَ عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ (ص) (٨٢).
"সে বলিল, আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি উহাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদিগকে নহে” (৩৮: ৮২-৮৩)।
আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারা এই কথা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে যে, নবীগণ সকল দিক দিয়া আল্লাহ্র মনোনীত, উত্তম বান্দা ও নিবেদিতপ্রাণ (মুখলিস) ছিলেন। নিবেদিতপ্রাণ হইলেন তাঁহারাই যাঁহারা কেবল আল্লাহ্রই সন্তুষ্টি লাভের আশা রাখেন এবং শয়তানী উপাদান হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকেন। সুতরাং নবীগণ সগীরা ও কবীরা উভয় প্রকার গুনাহ হইতে মুক্ত। কারণ শয়তানী উপাদানের ফলেই এই দুইটি গুনাহ সংঘটিত হয়। অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে:
إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ (الجن ٢٧).
"তাঁহার মনোনীত যে কোন রাসূল ব্যতিত" (৭২ঃ ২০)।
এই আয়াতে من অব্যয়টি বর্ণনামূলক এবং রাসূল শব্দটি অনির্দিষ্ট বাচক (نکره)। ইহাতে বুঝা গেল, সকল রাসূলই আল্লাহর মনোনীত, তাঁহার প্রিয় বান্দা। তাঁহাদের বাহ্যিক ও আত্মিক দিক শয়তানী প্রভাবমুক্ত এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা হইতে পবিত্র। এক মুহূর্তের জন্যও তাঁহারা আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও সাহায্য হইতে দূরে থাকেন না। ফলে নবীগণের সকল কাজ ও কথাকে নির্দ্বিধায় মানিয়া লওয়া অবশ্য কর্তব্য। তাঁহাদের আনুগত্য হইতে বিমুখ হওয়া দুনিয়া-আখিরাত সর্বক্ষেত্রেই চির লাঞ্ছনার কারণ। মানবিক চাহিদায় যদি তাঁহাদের দ্বারা কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশ পায়, তাহা হইলে ইহা তাঁহাদের মধ্যে বাহির হইতে আসা জিনিস। মূলত তাঁহাদের ভিতরে কোন ত্রুটি করার উপাদান নাই। গরম পানিতে উষ্ণতা আসে অন্য কিছুর প্রভাবের ফলে। মূলত পানিতে তো উষ্ণতার কোন নামগন্ধও নাই। পানির স্বভাব হইল সর্বদা ঠাণ্ডা থাকা। এই কারণেই পানি যতই গরম হউক, আগুনের উপর তাহা ঢালিলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন নিভিয়া যায়। এইভাবে নবীগণের আত্মাও গুনাহ করিবার শক্তি হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে কোন কোন সময় পারিপার্শ্বিকতার কারণে তাঁহাদের পদস্খলন ঘটিতে দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সংগে সংগে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে ইহার উপর তাঁহাদেরকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হয়। ফলে নবুওয়াতের আলোকবর্তিকা আগের তুলনায় আরও বেশী উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। ইউসুফ ('আ)-এর ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ.
'আল্লাহ কর্মপদ্ধতি তাঁহার বিশেষ বান্দাগণের সহিত এইরূপই হইয়া থাকে, যাহা ইউসুফ ('আ) হইতে অসদাচরণ ও লজ্জাজনক কাজ (সগীরা ও কবীরা গুনাহ)-কে দূরে রাখে। কারণ তিনি আল্লাহ তা'আলার নিবেদিতপ্রাণ (মুখলিস) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন, আমাদের ইচ্ছা ছিল যে, অসদাচরণ ও লজ্জাকর কাজকে ইউসুফ ('আ) হইতে দূরে রাখিব। ইহা বলেন নাই যে, ইউসুফ ('আ)-কে এইরূপ কাজ হইতে দূরে রাখিব। প্রতিহত করা, হটাইয়া দেওয়া এবং দূরে রাখা ঐ জিনিসের বেলায় প্রযোজ্য হয় যাহা নিকটে আসিতে চায়। ইহা হইতে বুঝা গেল যে, মন্দ ও লজ্জাকর কাজ ইউসুফ ('আ)-এর প্রতি ধাবিত হইতে চাহিয়াছিল, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উপর হইতে তাহা হটাইয়া দিয়াছিলেন। ইউসুফ ('আ) ঐদিকে অগ্রসর হইতেছিলেন না। আল্লাহ না করুন, যদি ইউসুফ ('আ) ঐ লজ্জাকর কাজের দিকে ধাবিত হইতেন তাহা হইলে বলা হইত না, كَذلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ. অর্থাৎ আমি ইউসূফকে অসৎ ও লজ্জাকর কাজ হইতে বারণ করিয়াছি। ইউসুফ ('আ) ঐ জঘন্য কাজ হইতে পালাইতেছিলেন, কিন্তু এই গর্হিত কাজ তাঁহার অনুসরণ করিতেছিল। আল্লাহ্র কুদরতে তিনি তাহা হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়াছিলেন। কারণ তিনি তো আল্লাহ্র নিবেদিতপ্রাণ বান্দা ছিলেন। মোটকথা, বাহিরের প্রভাবে নবীগণ হইতে অসাবধানতা বশত যেই পদস্খলন ঘটিত, শাব্দিক অর্থে ইহার উপর অবাধ্যতা বা গুনাহ শব্দের প্রয়োগ করা হইত। কিংবা এইরূপ বলা যায় যে, তাহাদের সুমহান মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া এইগুলিকে অবাধ্যতা বলা হইত। প্রকৃতপক্ষে তাহা গুনাহ বা অবাধ্যতা ছিল না"।
নবীগণের মা'সূম হওয়া সম্পর্কে শিবলী নু'মানী বলেন, তাঁহাদের মা'সূম (নিষ্পাপ) হওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য। ইয়াহুদীরা মনে করে, নবী কেবল একজন ভবিষ্যত দ্রষ্টা। নবীদের ব্যাপারে ইহা ছাড়া তাহাদের আর কোন বাস্তব ধারণা নাই। এই কারণেই তাহারা নবীগণ সম্পর্কে এমন অনেক প্রলাপ বকিয়া থাকে যাহা নবুওয়াতের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। খৃস্টানগণ কেবল ঈসা ('আ)-কে মা'সূম মনে করে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে সকল নবী-রাসূলকে নিষ্পাপ বলা হইয়াছে। নবীগণের মা'সূম হইবার আকীদাকে ইসলাম অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে গ্রহণ করিয়াছে। মা'সূম হইবার পরিপন্থী যেই সকল ঘটনা পরিলক্ষিত হয় ইসলামে এইগুলির অত্যন্ত বিজ্ঞজনোচিত ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। অংশীবাদী 'আরবরা মনে করিত, জ্যোতিষীরা যে গায়েব সম্পর্কে অবহিত থাকিত এবং কবিরা যেই চিত্তাকর্ষক ছন্দ রচনা করিত এইগুলি তাহারা শয়তানের নিকট হইতে শিখিয়া ব্যক্ত করিত। প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কেও তাহারা একই অভিমত পোষণ করিত (না'উযু বিল্লাহ্)। আল-কুরআন তাহাদের এই সংশয়কে নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা খণ্ডন করিয়াছে:
اِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَلٰى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ، اِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِيْنَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِيْنَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُوْنَ. (النحل ٩٩)
"নিশ্চয় উহার (শয়তানের) কোন আধিপত্য নাই তাহাদের উপর যাহারা ঈমান আনে ও তাহাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে। উহার আধিপত্য তো কেবল তাহাদেরই উপর যাহারা উহাকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে এবং যাহারা আল্লাহর শরীফ করে" (১৬: ৯৯-১০০)।
এই আয়াত হইতে শুরু করিয়া শেষ সূরা পর্যন্ত উক্ত ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। সূরাটির শেষ আয়াতদ্বয় নিম্নরূপ:
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ اِلا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُوْنَ، اِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ.
"তুমি ধৈর্য ধারণ কর, তোমার ধৈর্য তো আল্লাহ্রই সাহায্যে। উহাদের দরুন দুঃখ করিও না এবং উহাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনোক্ষুণ্ণ হইও না। আল্লহ তাহাদেরই সংগে আছেন যাহারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাহারা সৎকর্মপরায়ণ" (১৬ : ১২৭-১২৮)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, নবীগণ শয়তানের চক্রান্ত হইতে মুক্ত। তাঁহারা মুত্তাকী ও সৎকর্মপরায়ণ। সূরা শু'আরায় সকল নবীর অবস্থা বর্ণনার পর অনুরূপ অভিযোগের জওয়াবে ইরশাদ হইয়াছে :
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ. تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ يُلْقُوْنَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ. (الشعراء ٢٢١).
"তোমাদিগকে কি আমি জানাইব কাহার নিকট শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? উহারা তো অবতীর্ণ হয় প্রতিটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। উহারা কান পাতিয়া থাকে এবং উহাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী" (২৬: ২২১-২২৩)।
وَيْلٌ لِكُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ يَسْمَعُ آيَاتِ اللَّهِ تُتْلَى عَلَيْهِ ثُمَّ يَصِرُّ مُسْتَكْبِرًا كَانْ لَّمْ يَسْمَعْهَا فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (الجاثية ٤٧).
"দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহ্ আয়াতসমূহের তিলাওয়াত শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সাথে অটল থাকে, যেন সে উহা শুনে নাই। উহাকে সংবাদ দাও মর্মন্তুদ শাস্তির” (৪৫: ৭-৮)।
উক্ত আয়াতের মমার্থ হইল, নবীগণ মিথ্যাবাদী অথবা পাপিষ্ঠ নন। যদি তাঁহারা এমন হইতেন তাহা হইলে ফেরেশতাদের স্থলে শয়তানদের বন্ধু হইতেন এবং তাঁহাদের সত্যবাদিতায় সন্দেহের সৃষ্টি হইত। প্রকৃত প্রস্তাবে নবুওয়াতের হাকীকত মিথ্যা বলার সম্পূর্ণ বিরোধী। অন্য একটি স্থানে ইরশাদ হইয়াছে :
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُونِ اللَّهِ (ال عمران ٧٩).
"কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাহাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করিবার পর সে মানুষকে বলিবে, 'আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা আমার দাস হইয়া যাও', ইহা তাহার জন্য সঙ্গত নহে" (৩ঃ ৭৯)।
অর্থাৎ নবীগণের দাওয়াতের সারকথা হইল আল্লাহর ইবাদতের ঘোষণা করা। নয় যে, লোকদিগকে তাঁহার নিজের বান্দা ও পূজারী বানাইবে, এইরূপ পাপ নবীদের পক্ষ হইতে প্রকাশ হইতে পারে না। অন্য একটি আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে :
وَمَا كَانَ لِنَّبِي أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ. أَفَمَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَ اللَّهِ كَمَنْ بَاءَ بِسَخَطَ مِّنَ اللَّهِ وَمَاؤُهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ. هُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ اللهِ وَاللهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ. لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ والحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ (ال عمران ١٦٢-١٦٤).
"নবীর জন্য সঙ্গত নহে যে, সে অন্যায়ভাবে কোন বস্তু গোপন করিবে যে যাহা অন্যায়ভাবে গোপন করিবে কিয়ামতের দিন সে তাহা লইয়া আসিবে। অতঃপর প্রত্যেককে, যাহা সে অর্জন করিয়াছে তাহা পূর্ণ মাত্রায় দেওয়া হইবে। তাহাদের প্রতি কোন জুলুম করা ইইবে না। আল্লাহ যাহাতে রাযী, সে তাহারই অনুসরণ করে, সেকি উহার মত যে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হইয়াছে এবং জাহান্নামই যাহার আবাস? এবং উহা কত নিকৃষ্ট প্রত্যবর্তন স্থল! আল্লাহ্র নিকট তাহারা বিভিন্ন স্তরের, তাহারা যাহা করে আল্লাহ তাহার সম্যক দ্রষ্টা। আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদিগকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়; যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল" (৩: ১৬১-১৬৪)।
এই আয়াতগুলিতে সকল নবী সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, তাঁহারা সম্পদ গোপন করিবার অভিযোগে অভিযুক্ত হইতে পারেন না। আরও বলা হইয়াছে যে, নবীগণ সর্বদা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির অনুসরণ করেন। তাঁহারা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত নহেন যাহারা আল্লাহ্ ক্রোধ অর্জন করে। বিশেষত আয়াতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে। ইহাও উক্ত হইয়াছে যে, নবীর শান এইরূপ নহে যে তাঁহার দ্বারা অন্যায় সংঘটিত হইবে। কারণ যাহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভে ব্রতী তাঁহারা কোন সময় তাঁহার অমনোপুত কাজে লিপ্ত হইতে পারেন না। যাঁহারা অন্যদেরকে আল্লাহ্র বাণী শুনান তাঁহারা স্বয়ং ইহার বিপরীত করিতে পারেন না। যাঁহারা অন্যদেরকে পুত-পবিত্র করিবার জন্য আদিষ্ট তাঁহারা নিজেরা পাপী ও অপবিত্র হইতে পারেন না। আল-কুরআনে নবীগণকে বারংবার যাচাই-বাছাই করিয়া মনোনীত করিবার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা পরিপূর্ণরূপে তাঁহাদের ইসমত বা নিষ্পাপ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিতবহ। সব নবী (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ (الحج - ٧٥).
"আল্লাহ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে মনোনীত করেন বাণীবাহক এবং মানুষের মধ্য হইতেও" (২২ঃ ৭৫)।
আবার বিশিষ্ট কয়েকজন নবী সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ اللهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعُلَمِينَ (ال عمران ٣٣).
"নিশ্চয় আল্লাহ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৩৩)।
বিশেষভাবে ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
"পৃথিবীতে তাহাকে আমি মনোনীত করিয়াছি" (২ঃ ১৩০)। وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا (البقرة - ١٣٠).
মূসা (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: اِنِّى اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسْلَتِي وَبِكَلاَمِي (الاعراف ١٤٤).
"আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি" (৭:১৪৪)।
একটি আয়াতে নবীদের জন্য মনোনীতকরণ শব্দের সঙ্গে তাঁহাদের পুণ্যশীলতার গুণের কথাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে: وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بخالصة ذكرى الدارِ. وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ. (ص ٤٥-٤٧)
"স্মরণ কর, আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূবের কথা, উহারা ছিল শক্তিশালী ও সূক্ষ্মদর্শী। আমি তাহাদিগকে অধিকারী করিয়াছিলাম এক বিশেষ গুণের, উহা ছিল পরলোকের স্মরণ। অবশ্যই তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮: ৪৫-৪৭)।
অপর একটি আয়াতে অধিকাংশ নবী (আ)-এর কথা আলোচনার পর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: وَكُلاً جَعَلْنَا صَالِحِينَ. وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ واقام الصلوة وايْتَاءِ الزَّكَوةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ.
"আর আমি প্রত্যেককেই করিয়াছিলাম সৎকর্মপরায়ণ এবং তাহাদিগকে করিয়াছিলাম নেতা; তাহারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করিত, তাহাদিগকে ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম সৎকর্ম করিতে, সালাত কায়েম করিতে এবং যাকাত প্রদান করিতে। তাহারা আমারই 'ইবাদত করিত” (২১ঃ ৭২-৭৩)।
নবীগণের মা'সূম (অপরাধমুক্ত) হইবার ইহা হইতে উত্তম সাক্ষী আর কি হইতে পারে যেখানে স্বয়ং আল্লাহ সাক্ষী প্রদান করিলেন যে, তাঁহারা ছিলেন নেতা-অধিকর্তা, পুণ্যবান, আল্লাহ্ ইবাদতকারী? অনেক নবীর কথা ব্যক্ত করিবার পর সূরা আন'আমে ইরশাদ হইয়াছে:
كُلُّ مِّنَ الصَّلِحِيْنَ "ইহারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত” (৬ঃ ৮৫)। একটু পরেই আবার ইরশাদ হইয়াছে : وَكُلاً فَضَّلْنَا عَلَى الْعُلَمِيْنَ “এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে” (৬ঃ ৮৬)। অতঃপর আরও বলা হইয়াছে:
وَاجْتَبَيْنَاهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ.
"আমি তাহাদিগকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম" (৬ :৮৭)।
পুণ্যবান হওয়া, মনোনীত হওয়া এবং সরল পথে পরিচালিত হওয়া সরাসরি মা'সূম এবং ত্রুটিমুক্ত হওয়া প্রমাণ করে। অবাধ্য ও বাধ্য, পুণ্যবান ও গুনাহগারের জীবন পদ্ধতি ও কর্মকাণ্ডের পার্থক্য এতই উদ্ভাসিত যে, ইহাতে কোন প্রকার মিশ্রণের মোটেই আশংকা নাই। ইহাদের আচরণে আকাশ-পাতাল তারতম্য রহিয়াছে। ইতিহাস, নবীর জীবন-চরিত এবং মানুষের সোচ্চার কণ্ঠ এই দুই শ্রেণীর পার্থক্য তুলিয়া ধরিয়াছে। পবিত্র কুরআনে ইহা এইভাবে ব্যক্ত হইয়াছে :
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ سَوَاءٌ مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ . (الجاثية ٢١).
"দুষ্কৃতিকারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়া উহাদিগকে তাহাদের সমান গণ্য করিব, যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে? তাহাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ" (৪৫: ২১)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় এই দুই শ্রেণীর জীবন ও মৃত্যু কখনও এক হইতে পারে না। তাঁহাদের মধ্যে পর্বতসম পার্থক্য রহিয়াছে। নবীগণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন :
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ (الاحزاب-٣٨) .
"তাহারা আল্লাহ্র বাণী প্রচার করিত এবং তাঁহাকে ভয় করিত আর আল্লাহকে ব্যতীত অন্য কাহাকেও ভয় করিত না" (৩৩ঃ ৩৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহলে বায়ত ও সহধর্মিনীগণের যেই সম্মান ও মর্যাদা তাহা নবুওয়াত ও রিসালাতের মর্যাদার কারণে হইয়াছিল। সহধর্মিনীগণ সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ (احزاب ٣٢).
"হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নহ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর" (৩৩ঃ ৩২)।
অতঃপর আহলে বায়ত ও নবী-পত্নিগণের উদ্দেশে বলা হইয়াছে, আল্লাহর ইচ্ছা হইল তোমাদেরকে মন্দ কাজ হইতে পূত-পবিত্র রাখা। ইরশাদ হইয়াছে:
اِنَّمَا يُرِيْدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ اَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيْرًا (الاحزاب-٣٣).
"হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চাহেন তোমাদিগ হইতে অপবিত্রতা দূর করিতে এবং তোমাদিগকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করিতে” (৩৩: ৩৩)।
অপবিত্রতা ও গুনাহ যদি নবী-পত্নিগণ ও তাঁহাদের সন্তান-সন্ততিদের সম্মান ও মর্যাদার হানি ঘটায় তাহা হইলে স্বয়ং নবীদের মাকাম ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ইহা কত ক্ষতিকর হইবে তাহা উপলব্ধি করা কাহারও পক্ষে কষ্টসাধ্য নহে। উম্মত জননী 'আইশা (রা)-এর অপবাদ মুক্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
الْخَبِيثُتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أولئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ.
"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য; সচ্চরিত্রা নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্রা নারীর জন্য। লোকে যাহা বলে ইহারা তাহা হইতে পবিত্র" (২৪ঃ ২৬)।
এই স্থলে সচ্চরিত্র বলিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। তাঁহারই সচ্চরিত্রতা ও পূত-পবিত্রতা দ্বারা উম্মত জননীগণের চারিত্রিক সচ্চরিত্রতা ও শুচি-শুভ্রতার প্রমাণ দেওয়া হইয়াছে। নবীগণ প্রকৃতপক্ষে ইহজগতে অনুসরণীয়, বরণীয় ও আদর্শ পুরুষ হইয়া আবির্ভূত হইয়া থাকেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ (الاحزاب-٢١).
"তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ্ মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ” (৩৩: ২১)। রাসূলগণের অনুসরণ করা ওয়াজিব। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ (النساء-٦٤).
"রাসূল এই উদ্দেশেই প্রেরণ করিয়াছি যে, আল্লাহ্র নির্দেশ অনুসারে তাহার আনুগত্য করা হইবে" (৪: ৬৪)।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বিশেষভাবে বলা হইয়াছে যে, তাঁহার অনুসরণেই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। ইরশাদ হইয়াছে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ (আল ইমরান-৩১).
"বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদিগকে ভালবাসিবেন" (৩: ৩১)।
কোন পাপী-তাপীর কলুষময় জীবন কাহারও জন্য অনুসরণীয় ও আদর্শ হইতে পারে কি? অন্ধকার কোন সময় আলো ছড়ায় কি? বাসিও পঁচা বস্তু হইতে কখনও সুগন্ধি বাহির হয় কি? পাপিষ্ঠদের আহবান হইতে কোন দিন পুণ্যশীলতা আসে কি? কখনও নহে। অসৎ কাজ এবং গুনাহের কাজের মূল স্রোত হইল শয়তান কিংবা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা। কিন্তু আল্লাহর মনোনীত বিশেষ বান্দাগণ শয়তানী চক্রান্ত হইতে মুক্ত। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلًا (بنى اسرائيل ٦٥).
"নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নাই। কর্মবিধায়ক হিসাবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট” (১৭:৬৫)।
নবীগণ হইতে অন্য কেহ কি আল্লাহ্র উচ্চ স্তরের বান্দা হইতে পারিবে? ইহা মোটেই সম্ভব নয়। কারণ মানুষের পথভ্রষ্টতা ও পাপ কাজের প্রবণতা বৃদ্ধির মূলে রহিয়াছে শয়তানী কুমন্ত্রণা। স্বয়ং কিংবা জিন ও মানুষের আকার ধারণ করিয়া মানুষের অন্তরে এই প্রভাব বিস্তার করে। নবীগণ সকল প্রকার শয়তানী কার্যকলাপ হইতে চিরমুক্ত ও পবিত্র। কোন কোন স্বার্থপর ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদস্খলন ঘটাইবার ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে এই বলিয়া আশ্বস্ত করিয়াছিলেন, আমার করুণা ও অনুগ্রহ তোমার উপর অবারিত, ইহার কারণে তুমি অপকর্ম হইতে নিরাপদ থাকিবে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُ لَهَمَّتْ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ أَنْ يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا (النساء ١١٣).
"তোমার প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তাহাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করিতে চাহিতই। কিন্তু তাহারা নিজদিগকে ব্যতীত আর কাহাকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং তোমার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করিয়াছেন এবং তুমি যাহা জানিতে না তাহা তোমাকে শিক্ষা দিয়াছেন; তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ রহিয়াছে" (৪: ১১৩)।
অবস্থা ও পরিস্থিতির আলোকে এই স্থলে "তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ” বলিতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর 'ইসমত' (নিষ্পাপ) বুঝানো হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
স্বয়ং মানুষের মন নিজের অসঙ্গত আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে ধোঁকা দিয়া থাকে। কিন্তু নবীগণ এইরূপ প্রতারণামূলক আকাঙ্ক্ষা হইতে চিরমুক্ত। মানবিক সহজাত স্বভাবের ফলে তাঁহাদের অন্তরে এই বাসনা উদয় হইতে পারে যে, তাঁহারা যেই দাওয়াতের মিশন লইয়া প্রেরিত হইয়াছেন তাহা খুব দ্রুত প্রসারিত হউক এবং মানুষ তাহা সঙ্গে সঙ্গে কবুল করুক। কিন্তু ইহা যদি আল্লাহ্ হিকমতের অনুকূল না হয় তাহা হইলে মহান আল্লাহ তাঁহাদের এই বাসনাকে তাহাদের অন্তর হইতে বিদূরিত করিয়া দেন এবং নিজ সিদ্ধান্তকে অটুট রাখেন। এই প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أَمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللهُ ايَتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (الحج ٥٢).
"আমি তোমার পূর্বে যে সমস্ত রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করিয়াছি তাহাদের কেহ যখনই কিছু আকাঙ্ক্ষা করিয়াছে তখনই শয়তান তাহার আকাঙ্ক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করিয়াছে। কিন্তু শয়তান যাহা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ্ তাহা বিদূরিত করেন। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁহার আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” (২২ঃ ৫২)।
উক্ত আয়াত হইতে জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা নবীগণকে ভুল চিন্তা-চেতনা হইতেও হিফাজত রাখেন। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى (النجم ٢).
"তোমাদিগের সংগী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়" (৫৩ঃ ২)।
উক্ত আয়াতে যেই বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা কোন বিশেষ কালের সহিত সম্পর্কিত নহে। ইহাতে অতীতের সব সময়ে গুনাহ হইতে পবিত্র থাকিবার কথা ব্যক্ত করা হইয়াছে। তিনি সর্বদা এই সকল পাপ-পংকিলতা হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র ছিলেন।
আল্লামা ইদরীস কান্ধলাবী নবগণের 'ইসমাত সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, নবী-রাসূল সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ (النساء ٨٠).
"কেহ রাসূলের আনুগত্য করিলে সে তো আল্লাহ্রই আনুগত্য করিল" (নিসা, ৪:৮০)। আরও ইরশাদ হইয়াছে:
أطِيعُوا اللهُ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (ال عمران ١٣٢).
"তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর যাহাতে তোমরা কৃপা লাভ করিতে পার" (৩: ১৩২)।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা'আলা রাসূলের আনুগত্যকে তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। কোন গুনাহগারের আনুগত্যকে আল্লাহ্ হুবহু আনুগত্য বলা যাইতে পারে কি? রাসূলের ও আল্লাহ্র আনুগত্য অভিন্ন হইবে তখনই যখন রাসূল আল্লাহর অবাধ্যতা হইতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র থাকিবেন। দ্বিতীয় আয়াতে বিনাশর্তে রাসূলের অনুসরণ করিবার আদেশ দেওয়া হইয়াছে এবং ইহা দ্বারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হইয়াছে। ইহা হইতে বুঝা যায়, নবী-রাসূলগণ সম্পূর্ণরূপে মাসুম, অন্যথায় বিনা শর্তে অনুসরণ করিবার আদেশ দেওয়া হইত না। মুসলিম খলীফা ও শাসকগণ মা'সূম (নিষ্পাপ) নহেন বলিয়া তাঁহাদের অনুসরণ করিবার ব্যাপারে শর্তারোপ করা হইয়াছে। বুখারী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীছে আছে:
السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أَمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ.
"মুসলিম শাসকের আদেশ পালন ও তাহার অনুসরণ সে পর্যন্ত যেই পর্যন্ত না কোন গুনাহের আদেশ দেওয়া হয়। কোন গুনাহের আদেশ দেওয়া হইলে তাহা পালন ও অনুসরণ করিতে নাই"।
আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٌ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هؤُلاء شَهِيدًا. (النساء ٤١) .
"যখন প্রত্যেক উম্মত হইতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করিব এবং তোমাকে উহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করিব তখন কী অবস্থা হইবে” (৪:৪১)।
এই আয়াত হইতে বুঝা যায়, কিয়ামতের দিন সকল নবীকে তাঁহার উম্মতের ব্যাপারে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করা হইবে। এমতাবস্থায় যদি নবী মা'সূম বা নিষ্পাপ না হইয়া ফাসিক হন তাহা হইলে তাঁহার সাক্ষী কিভাবে আল্লাহর দরবারে গৃহীত হইবে? কারণ আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন।:
إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا (الحجرات ٢).
"যদি কোন পাপাচারী তোমাদিগের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে তোমরা তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিবে" (৪৯:৬)।
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلا تَعْقِلُونَ. ( البقرة ٤٤ ) .
"তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও, আর নিজদিগকে বিস্তৃত হও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর? তবে কি তোমরা বুঝ না” (২:৪৪)
لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُوْنَ. كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ. (الصف ٣).
"তোমরা যাহা কর না তাহা তোমরা কেন বল? তোমরা যাহা কর না তোমাদিগের তাহা বলা আল্লাহ্ দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক" (৬১:২-৩)।
নবীগণের দায়িত্ব হইল লোকজনকে আল্লাহ্র পথে আহবান করা। এমতাবস্থায় যদি তাঁহারা স্বয়ং আল্লাহ্র আনুগত্যশীল না হন তাহা হইলে তো উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ের বর্ণনা তাঁহাদের উপর প্রযোজ্য হইবে। আল-কুরআনে আরও ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّنَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ (الجمعة ٢)
"তিনিই উম্মীদিগের মধ্যে তাহাদিগের একজনকে পাঠাইয়াছেন রাসূলরূপে, যে তাহাদিগের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াত এবং তাহাদিগকে পবিত্র করে" (৬২ : ২)।
অতএব নবী যদি নিষ্পাপ না হন তাহা হইলে কি করিয়া তিনি অন্যদেরকে পবিত্র করিবেন? শেষ কথা, কোন লোক নবীর উপস্থিতিতে কোন কাজ করিলে এবং নবী তাহা দেখিয়া মৌনতা অবলম্বন করলে এই কাজ বৈধ হওয়া সাব্যস্ত হয়। যদি নবীর মৌনতা দ্বারা কোন কাজ বৈধ সাব্যস্ত হয় তাহা হইলে স্বয়ং তাঁহার কোন কাজ অবৈধ ও গুনাহের হইবে কি করিয়া (ইদরীস কান্ধলাবী, মাআরিফুল কুরআন, ১খ., পৃ. ১০৯)।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী বলেন, ইসমাত (নিষ্পাপ) চারিটি জিনিসের সহিত সংশ্লিষ্টঃ (এক) আকাইদ, (দুই) আল্লাহর বিধানাবলীর তাবলীগ, (তিন) ফাতওয়া ও ইজতিহাদ, (চার) কার্যকলাপ, অভ্যাস ও সীরাত।
প্রথম, আকাইদ সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, নবীগণ জন্মলগ্ন হইতেই তাওহীদ ও ঈমানের ব্যাপারে আপোষহীন ছিলেন। তখন হইতেই তাঁহাদের অন্তর কুফ্র-শিরক হইতে পাক এবং ইয়াকীন ও বিশ্বাসে ভরপুর ছিল। তাঁহাদের পবিত্র মুখমণ্ডল আল্লাহ্র ধ্যান ও তাঁহার নৈকট্য লাভের জ্যোতিতে সর্বদা উদ্ভাসিত থাকিত। আজ অবধি কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই যে, আল্লাহ তা'আলা নবুওয়াত ও রিসালাত এমন কোন ব্যক্তিকে দান করিয়াছিলেন যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হইবার পূর্বে কুফ্র ও শিরকে জড়াইয়াছিলেন, ইহা কস্মিন কালেও সম্ভব নহে। এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার বাণী :
وَآتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ (الانبياء ٥١) .
"আমি তো ইহার পূর্বে ইবরাহীমকে সৎপথের জ্ঞান দিয়াছিলাম এবং আমি তাহার সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক পরিজ্ঞাত” (২১ : ৫১)।
নবীগণ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হইবার পূর্বে নবী না হইলেও আল্লাহর ওলী বা প্রিয় বান্দা ছিলেন। তাঁহারা আল্লাহ্ এইরূপ প্রিয় বান্দা ছিলেন যে, অন্যান্য ওলীর মর্যাদা তাঁহাদের তুলনায় সমুদ্রের সহিত একবিন্দু পানিবৎ। এই কারণে মুসলিম উম্মাহ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, নবীগণের অন্তরে কুফর ও গোমরাহী থাকা অসম্ভব ব্যাপার।
দ্বিতীয়, আল্লাহর বিধানাবলীর তাবলীগ। এই সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, আল্লাহ্র বিধানাবলীর তাবলীগের ক্ষেত্রে নবীগণ সম্পূর্ণরূপে মা'সূম। তাঁহাদের দ্বারা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এই ব্যাপারে কোন ত্রুটি হইতে পারে না। এই সম্পর্কে তাঁহাদের পক্ষে মিথ্যা বলা বা দাওয়াতের হেরফের করা সম্ভব নয়। সুস্থ-অসুস্থ, আনন্দ-নিরানন্দ সর্বাবস্থাতেই তাঁহাদের দ্বারা আল্লাহ্ ওহী পৌঁছানোর ব্যাপারে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কোন প্রকার ত্রুটি হওয়া অসম্ভব। অন্যথায় আল্লাহ্ ওহীর উপর সম্পূর্ণভাবে আস্থা ও বিশ্বাস তিরোহিত হইবে। এই কারণেই ওহী অবতরণের সময় ফেরেশতাদের 'পাহারা বসানো হয়, যাহাতে আল্লাহ্ ওহী শয়তানের প্রভাব হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً . إِلا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَداً ، لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصى كُلَّ شَيْءٍ عَدَداً (الجن ٢٦).
"তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন রাসূলগণ তাহাদিগের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছেন কিনা জানিবার জন্য। রাসূলগণের নিকট যাহা আছে তাহা তাঁহার জ্ঞানগোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন" (৭২: ২৬-২৮)।
তৃতীয়, ফাতওয়া ও ইজতিহাদ। এই ব্যাপারে আলিমগণের অভিমত হইল, ওহীর জন্য অপেক্ষান্তে নবীগণ কোন কোন বিষয়ে ইজতিহাদ করিতেন। এই প্রেক্ষিতে যদি তাঁহাদের ইজতিহাদে কোন ত্রুটি প্রকাশ পাইত তখন সংগে সংগে ওহীর সাহায্যে তাঁহাদিগকে সাবধান করিয়া দেওয়া হইত। ইহা কস্মিন কালেও সম্ভব নহে যে, নবীগণের দ্বারা কোন ইজতিহাদী ত্রুটি প্রকাশ পাইবে আর তাঁহাদিগকে আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহা শোধরাইয়া দেওয়া হইবে না।
চতুর্থ, অভ্যাস ও সীরাত। এই সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অভিমত হইল, নবীগণ কবীরা গুনাহসমূহ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তবে সগীরা গুনাহ অর্থাৎ অনুত্তম কোন কাজ ভুলক্রমে বা বেখবর অবস্থায় তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হইতে পারে, যাহা বাহ্যত পাপ মনে হইলেও প্রকৃতপক্ষে ইহার মাধ্যমে কোন বিধান প্রবর্তন উদ্দেশ্য হইয়া থাকে। যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুহর বা আসরের কোন এক সালাতে বাহ্যত ভুল দেখা গেলেও ইহার দ্বারা মূলত সিজদায়ে সাহুর বিধান প্রবর্তন করা মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল। যদি তাঁহার সালাতে ভুল না হইত তাহা হইলে এই উম্মত কিভাবে সিজদায়ে সাহুর বিধান লাভ করিত? লায়লাতুত তা'রীসে (যাহাতে ফজরের সালাত কাযা হইয়াছিল) যদি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সালাত কাযা না হইত তাহা হইলে সালাতের কাযা করিবার যে বিধান তাহা কিভাবে জানা যাইত? এই কারণে নবীগণের ভুলও সরাসরি আল্লাহ্র করুণা ও রহমত। এই কারণেই আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিতেন: يَا لَيْتَنِي كُنْتُ سَهْوَ مُحَمَّدٍ. "হায়! আমি যদি মুহাম্মাদ (স)-এর ভুল হইয়া যাইতাম! অর্থাৎ আমার স্মরণ থাকা হইতে মুহাম্মাদ (স)-এর ভুলিয়া যাওয়া ছিল উত্তম"। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى إِلا مَا شَاءَ اللهُ (الاعلى ٦-٧). "নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করিবেন তাহা ব্যতীত” (৮৭:৬-৭)।
উক্ত আয়াত হইতেও প্রমাণিত হয় যে, নবীর ভুল হওয়া প্রকৃতপক্ষে কোন অন্তর্নিহিত কারণে হইয়া থাকে। মানবিক প্রয়োজনে নবীগণ হইতে ভুল হওয়া ও কোন বিষয়ে বেখবর হওয়ার কারণ হইল তাঁহারাও যে মানুষ এই কথা প্রকাশ করা। তাঁহাদের ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে, আনন্দ-ক্লেশ আছে, তাঁহারা হাসেন, আবার দুঃখ-ভারাক্রান্তও হন। নবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁহারা মানুষ, ফেরেশতা নহেন। ভুলত্রুটি মানুষের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যেইভাবে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নবুওয়াত ও ইসমাতের পরিপন্থী নহে সেইভাবে কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণে ভুল-ত্রুটিও নবুওয়াত ও ইসমাতের পরিপন্থী নয়। তবে এই কথা নিশ্চিত যে, নবীগণের এই সকল পদস্খলন স্থায়ী থাকে না। কোন নবীর দ্বারা এইরূপ কোন কোন কাজ একবার হইয়া গেলেও তাঁহার জীবনে ইহার পুনরাবৃত্তি ঘটে নাই। আদম (আ) কর্তৃক নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا (طه ١١٥). "কিন্তু সে ভুলিয়া গিয়াছিল; আমি তাহাকে সংকল্পে দৃঢ় পাই নাই" (২০: ১১৫)।
অর্থাৎ মানবিক গুণের ফলে তাঁহার দ্বারা এই অসাবধানতামূলক কাজ সংঘটিত হইয়া গিয়াছিল, ইহা তাঁহার ইচ্ছায় ছিল না। অনিচ্ছামূলক কাজ যে গুনাহের কাজ নহে এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত আয়াত লক্ষণীয়: لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ (الاحزاب ٥) "এই ব্যাপারে তোমরা কোন ভুল করিলে তোমাদিগের কোন অপরাধ নাই, কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকিলে অপরাধ হইবে" (৩৩ঃ ৫)।
আয়াতটির মমার্থ অনুযায়ী যদি ত্রুটি-বিচ্যুতিতে গুনাহ না হয় তাহা হইলে ইহা ইসমাত বিরোধী হইবে কিভাবে? একই কারণে রোযার কথা ভুলিয়া গিয়া পানাহার করিলে ইহার দ্বারা রোযা ভঙ্গ হয় না। আদম (আ)-এর অন্তর মহান আল্লাহ্র মহিমা ও মাহাত্ম্য দ্বারা ভরপুর ছিল বিধায় যখন শয়তান আল্লাহ্ নামে শপথ করিয়া বলিয়াছিল : إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ (নিশ্চয় আমি তোমাদের কল্যাণকামী, একজন। ৭: ২১) তখন ইহা শুনিয়া আদম (আ) কল্পনাই করিতে পারেন নাই যে, ধূর্ত শয়তান আল্লাহর নাম লইয়া মিথ্যা শপথ করিবে। এই ধোঁকার দ্বারাই আদম (আ)-কে শয়তান ফাঁদে ফেলিয়াছিল। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَدَلَهُمَا بِغُرُورِ “তাহাদেরকে শয়তান ধোঁকার দ্বারা পিছলাইয়া নিয়াছিল'। غُرُور শব্দ হইতে স্পষ্টত বুঝা যাইতেছে যে, এই বিচ্যুতি ধোঁকার ফলে হইয়াছিল। আদম (আ)-এর এই ব্যাপারে কোন সংকল্প ছিল না। বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে শত্রু তাহার নীলনক্সা অনুযায়ী ক্ষতির মধ্যে ফেলিয়াছিল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইহা গুনাহ মনে হইলেও মূলত ইহার উদ্দেশ্য ছিল তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার পন্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেইভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর, সালাতে ভুল হইয়া যাওয়া হইতে সাহু সিজদার বিধান প্রবর্তিত হইয়াছিল। অনুরূপ আল্লাহ আদম সন্তানকে শিক্ষা দিলেন যে, তোমাদের দ্বারা কোন সময় কোন পাপকার্য সংঘটিত হইয়া গেলে তোমাদের পিতার ন্যায় সংগে সংগে কাকুতি-মিনতির সহিত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করিবে, শয়তানের ন্যায় অহংকার করিতে উদ্যত হইবে না।
'আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী বলেন, আল-কুরআনের কিছু শব্দ দ্বারা সরলপ্রাণ কিছু লোকের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি হইতে পারে যে, কোন কোন নবী মা'সুম ছিলেন না। কিন্তু বিশেষজ্ঞ আলিমগণ এই সকল সন্দেহের যথোচিত জবাব দিয়াছেন। ইব্‌ন হাযম আন্দালুসী তাঁহার রচিত গ্রন্থ আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে, কাযী ইয়াদ শিফা গ্রন্থে এবং মোল্লা দোস্ত মুহাম্মাদ কাবুলী তুহফাতুল আখিল্লা' ফী ইসমাতিল আম্বিয়া গ্রন্থে প্রতিটি সন্দেহের অপনোদন করিয়াছেন। এই বিষয়ে ভুল বুঝাবুঝির মৌলিক কারণ দুইটিঃ (এক) সকল বান্দা এমনকি নবীগণের মর্যাদা যতই ঊর্ধ্বে হউক আর তাহারা গুনাহ ও অবাধ্যতা হইতে যতই ঊর্ধ্বে থাকুন না কেন মহান আল্লাহ্র দরবারে তাঁহাদের অবস্থান হইল বান্দার ও মাখলুকের। একজন বান্দা বা গোলাম যতই অনুগত ও বাধ্যগত হউক সে তাহার মালিকের সামনে স্বীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা স্বীকার করে এবং স্বীয় কৃতকর্মের ব্যাপারে মালিকের সামনে অবনত মস্তক থাকে। হযরত ইবরাহীম (আ), যিনি পুণ্যশীল ও পবিত্রাত্মা ছিলেন বলিয়া আল-কুরআনে ভুরিভুরি প্রমাণ রহিয়াছে, তিনি আল্লাহ্র মহিমা, মাহাত্ম্য ও তাঁহার করুণার উল্লেখ করিয়া বলেনঃ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ (الشعراء ٨٢). "এবং আশা কারি তিনি কিয়ামত দিবসে আমার অপরাধসমূহ মার্জনা করিবেন" (২৬:৮২)।
নবী কৃর্তক এই স্বীকারোক্তি ও আত্মসমর্পণ তাঁহার ত্রুটি ও হীনতা নয় বরং ইহা তাঁহার পূর্ণ ইবাদত ও দাসত্ববোধের পরিচায়ক।
বান্দা আনুগত্যের ও আত্মসমর্পণের শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করিলেও মালিক অধিকতর বিনম্রতা ও আনুগত্যের প্রত্যাশী হন, যাহাতে তাঁহার দরবারে উহার আমল উচ্চতর হয়। কোন কোন আয়াতে কোন কোন নবীকে ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলা হইয়াছে। ইহা এইজন্য নয় যে, তিনি গুনাহগার ছিলেন বরং ইহার উদ্দেশ্য ছিল আনুগত্যের উপর ধৈর্য ধারণ করিবার জন্য সতর্ক করা এবং আরও বেশী মাত্রার আনুগত্য তলব করা, যাহাতে ইহা তাঁহার জন্য অধিকতর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া ইরশাদ হইয়াছে : اِذَا جَآءَ نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِيْنِ اللهِ اَفْوَاجًا . فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ اِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا (النصر).
"যখন আসিবে আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহ্র দীনে প্রবেশ করিতে দেখিবে তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিও এবং তাঁহার ক্ষমা প্রার্থনা করিও; তিনি তো তওবা কবুলকারী" (১১০ : ১-৩)।
এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর সাহায্য, মক্কা বিজয়, পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন এবং দলে দলে মুসলমান হওয়াতে তো কোন পাপ নাই যাহা হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে হইবে। অনুরূপ ইরশাদ হইয়াছে : اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِيْنًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا ، وَيَنْصُرَكَ اللهُ نَصْرًا عَزِيزًا (الفتح ١).
"নিশ্চয় আমি তোমাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়, যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ তোমাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন" (৪৮ : ১-৩)।
এখানেও লক্ষণীয় যে, মক্কার পূর্ণ বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে ক্ষমা করিবার ইহা ব্যতীত আর কি অর্থ হইতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দার উত্তম অবদানকে কবুল করিয়া ইহার উপর তাঁহার সন্তুষ্টি প্রকাশ করিতেছেন। এখানে নবী (স)-এর কোন গুনাহে লিপ্ত হইবার কোনই আশংকাই নাই, বরং এখানে তাঁহার পূর্ণ দাসত্বের বহিপ্রকাশ ঘটিয়াছে।
খৃস্টানরা হযরত 'ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলিয়া আখ্যায়িত করিত এবং তদানিন্তন আরবরা ফেরেশতাগণকে আল্লাহর কন্যাসন্তান বলিয়া অভিহিত করিত এবং এতদুভয়কে প্রভুত্বের আসনে আসীন করিত। তাহাদের ব্যাপারে আল-কুরআনের ইরশাদ হইয়াছে : لَنْ يَسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلهِ وَلَا الْمَلَائِكَةُ الْمُقَرِّبُونَ وَمَنْ يَسْتَنْكِفْ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرْ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعًا. (النساء).
"মসীহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে হেয় জ্ঞান করে না এবং ঘনিষ্ট ফেরেশতাগণও নহে এবং কেহ তাঁহার বান্দা হওয়াকে হেয় জ্ঞান করিলে এবং অহংকার করিলে তিনি তাহাদের সকলকে তাঁহার নিকট একত্র করিবেন" (৪: ১৭২)।
উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য ঈসা (আ)-কে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়, বরং ইহার দ্বারা তাঁহার দাসত্ব ও ইবাদতের ঘোষণা মূল লক্ষ্য। মোটকথা, নবীগণ কর্তৃক আল্লাহ্র দরবারে স্বীয় কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি দ্বারা তাঁহাদের গুনাহ প্রমাণিত হয় না। পক্ষান্তরে ইহাতে তাঁহাদের পূর্ণ দাসত্বের বহিপ্রকাশ ঘটে। অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কোন নবী সম্পর্কে 'আমি তোমাকে মাফ করিয়া দিয়াছি' বলায় নবীর অপরাধী হওয়া বুঝায় না; বরং ইহা দ্বারা এই কথাই ঘোষণা করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তাঁহার উপর সন্তুষ্ট হইয়াছেন এবং তাঁহাকে কবূল করিয়া নিয়াছেন।
পূর্বোল্লিখিত সূরা ফাতহের আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করিলে জানা যায় যে, মক্কাকে পবিত্রকরণ এবং সমগ্র আরব উপদ্বীপ সত্যাসত্যের মাপকাঠিকরণ নির্ভরশীল ছিল মক্কা বিজয়ের উপর। নবী করীম (স) ও মুসলমানদের নিরলস প্রচেষ্টায় যখন ইহা সম্ভব হইয়াছিল তখন মহান আল্লাহ ঘোষণা করিলেন, এই বিজয়ের দ্বারা নবুওয়াতের দায়িত্ব এবং তোমার উপর আমার অনুগ্রহাদি পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছে। এখন আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালনার এবং নিজের বলিষ্ঠ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিতেছেন। অথচ এই সকল জিনিস রাসূলুল্লাহ (স) পূর্ব হইতেই প্রাপ্ত ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পূর্বে কি রাসূলুল্লাহ (স) সিরাতে মুসতাকীম অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের উপর ছিলেন না? তিনি কি আল্লাহর বলিষ্ঠ সাহায্য লাভকারী ছিলেন না? এই সকল মর্যাদা তিনি পূর্ব হইতেই লাভ করিয়াছিলেন, এতদসত্ত্বেও এইগুলির পুনরাবৃত্তির দ্বারা আল্লাহ তা'আলার এই উপলক্ষ্যে তাহার উপর স্বীয় সন্তুষ্টির আধিক্যের কথাই ব্যক্ত করিয়াছেন। যদি তাঁহার অসাবধানতাবশত সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হইয়া থাকে তাহা হইলে ইহার আগের-পিছের সকল কিছু মার্জনা করিয়া দিবার ঘোষণা করা হয়, যাহাতে তিনি গৌরবময় নূতন মর্যাদা ও আসনে আসীন হন।
বাইবেলে পূর্ণ দাসত্বের একটি বর্ণনা আছে। হযরত ঈসা (আ)-কে জনৈক নেতা 'হে পুণ্যবান' গুরু বলিয়া আহবান করিলে তিনি প্রত্যুত্তরে বলিয়াছিলেন, "তুমি আমাকে কেন পুণ্যবান বলিয়া আহবান করিতেছ? এক আল্লাহ ব্যতীত আর কেহই পুণ্যবান নাই" (লুক, ১৮: ১৯)। হযরত ঈসা (আ)-এর এই কথা হইতে কেহ যেন এই ধারণা করিয়া না বসেন যে, 'ঈসা (আ) পূণ্যবান ছিলেন না। এইরূপ ধারণা বড়ই ভ্রান্তিমূলক।
আরবী ভাষায় পাপ বুঝাইবার জন্য বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগ করা হয়, যেমন: جرم حنث اثم ذنب- ইত্যাদি। এই শব্দাবলীর মধ্যে কেবল ذنب শব্দটি ব্যতীত অন্য সকল শব্দ ইচ্ছাকৃত গুনাহের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ذنب শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায় শুধুমাত্র ভুল কর্মের ক্ষেত্রে- তাহা জ্ঞাতসারে কিংবা অজান্তে অসাবধানতার কারণেই করা হউক। ক্ষেত্রবিশেষে এই শব্দটিকে ইচ্ছাকৃত সেই কার্যাবলীর জন্যও প্রয়োগ করা হয় যাহা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ উম্মাহর জন্য গুনাহের কাজ নয়। তবে নবীগণের বেলায় এই অসাবধানতাও কৈফিয়তযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয়। নবীগণের ব্যাপারে যেখানেই ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলা হইয়াছে সেখানেই ذنب শব্দের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়, কোথাও اثم جنث-جرم বলা হয় নাই। ইহা হইতে প্রতিভাত হয় যে, নবীগণ হইতে প্রকাশ্য কোন গুনাহ প্রকাশ পায় নাই। তাঁহাদের দ্বারা যাহা কিছু সংঘটিত হইয়াছিল তাহা ছিল মানবিক পদস্খলন বা ভুলত্রুটি, যাহার সংশোধন ও সতর্কীকরণ মহান আল্লাহ তদীয় কৃপা দ্বারা করিয়া দেন। ইহারই উদ্দেশ্যে তাঁহাদেরকে তিনি ইস্তিগফার করিবার নির্দেশ দিয়া থাকেন। ইহা হইতে আরও একটি রহস্য উদঘাটিত হয় যে, অনিচ্ছাজনিত ভুলত্রুটি উম্মতের জন্য কোন পাকড়াওযোগ্য অপরাধ নয়। তবে হাঁ, আম্বিয়া 'আলায়হিমুস সালামগণের মর্যাদা যেহেতু বহু গুণ ঊর্ধ্বে, সুতরাং তাঁহাদের ক্ষেত্রে ইহা ধর্তব্য। কারণ তাঁহাদের আচরণ ও উক্তিমালা শরী'আত হিসাবে গণ্য হয়। সুতরাং শরী'আতের বিধানকে সংরক্ষিত রাখার জন্য তাঁহাদের সকল কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া আবশ্যক। ইহার ফলে তাঁহাদের দ্বারা কদাচিৎ তেমন কোন কার্যকলাপ সংঘটিত হইয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ইহার উপর হুঁশিয়ারী সংকেত দেওয়া হইত। ক্ষমা ঘোষণা করিবার সহিত তাঁহাদেরকে সুসংবাদও প্রদান করা হইত। জানা-অজানা, ছোট-বড় সকল প্রকার পদস্খলন হইতে তাঁহাদিগকে পূত-পবিত্র রাখা হইত।
নিম্নের আয়াতগুলি লক্ষণীয় : )٢٧ - فَتَلَقَى أَدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ (البقرة "অতঃপর আদম তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হইল। আল্লাহ তাহার প্রতি ক্ষমাপরবশ হইলেন” (২:২৮) । )١٢٢ - ثُمَّ اجْتَبَهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى (طه "ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হইলেন এবং তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন” (২০ : ১২২( : )١١٧ - لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ (التوبة "আল্লাহ্ অনুগ্রহপরায়ণ হইলেন নবীর প্রতি" (৯: ১১৭)। فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَهُ مِنَ الْغَمَّ وَكَذلك )٨٨- تنجى الْمُؤْمِنِينَ. (الانبياء "তখন আমি তাহার ডাকে সাড়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে উদ্ধার করিয়াছিলাম দুশ্চিন্তা হইতে। এইভাবেই আমি মুমিনদিগকে উদ্ধার করি থাকি" (২১: IR COR GET " لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ (الفتح) | (bb ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন" (৪৮:২)।
পূর্ণ ও সাধারণ ক্ষমার এই উচ্চ মর্যাদা নবীগণ ব্যতীত অন্য কাহারও ভাগ্যে জুটে নাই। আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের মা'সূম হওয়ার ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝির দ্বিতীয় কারণ হইল, তাঁহাদের নবুওয়াত-পূর্ব জীবন এবং নবুওয়াত পরবর্তী জীবনে শক্তি-সামর্থ্য ও ক্রিয়াকলাপের যে তফাৎ রহিয়াছে তাহাকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। জানা-অজানা, গোমরাহী ও হিদায়তকে আপেক্ষিক শব্দাবলী হিসাবে গণ্য করা হয়। জ্ঞানের সকল সীমাকে তাহার উপরস্থ জ্ঞানের তুলনায় মূর্খতা বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। অনুরূপ হিদায়াতের উচ্চ পর্যায়কে তাহার হইতে অধিক হিদায়াতের তুলনায় গোমরাহী বলিয়া অভিহিত করা হয়। নবীগণের নবুওয়াত লাভের পূর্ব জীবন ও পরবর্তী জীবনের মধ্যে সামর্থ্য ও কার্যক্রমের তারতম্য রহিয়াছে। যেইভাবে বীজের মধ্যে বৃক্ষের পাতা ও অন্যান্য গুণ লুকায়িত থাকে কিন্তু তখনও তাহা বৃক্ষ হিসাবে গণ্য হয় না, ইহাতে কাণ্ড, ডালপালা ও পাতা ফুল গজায় না, কিন্তু এক সময় এই বীজ বৃদ্ধি পাইয়া একটি নূতন বৃক্ষের সৃষ্টি হয়। ইহার পাতায় মসৃণতা আসে, ফুলের সৌরভে মানুষ আকৃষ্ট হয়, ফলে মাধূর্য আসে, ইহার বিস্তৃত ছায়ার নীচে পথিক বিশ্রাম গ্রহণ করে। এই প্রকারের বিরাট পার্থক্য রহিয়াছে নবীগণের নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের মধ্যে। এই তারতম্যের কারণেই নবীর নবুওয়াত লাভের পূর্বের জীবন অন্ধকারময় ও গোমরাহী এবং পরবর্তী জীবন জ্যোতির্ময় ও হিদায়াতের আলোয় আলোকিত বলিয়া বর্ণনা করা হয়। যেমনটি সাধারণ মানুষের জীবন ইসলাম ও ঈমান গ্রহণের পূর্বে গোমরাহীর জীবন এবং ইসলাম গ্রহণের পর তাহা হিদায়াতময় জীবন হইয়া যায়। তবে একটি কথা লক্ষণীয় যে, নবীগণের গোমরাহী ও হিদায়াত লাভের অর্থ সেইরূপ নয় যেইভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হিদায়াত ও গোমরাহীর অর্থ গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ তা'আলা যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর তাঁহার অনুগ্রহের কথা বর্ণনা দিয়াছেন সেখানে ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ يَجِدُكَ يَتِيمًا فَاوى. وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى وَوَجَدَكَ عَائِلاً فَأَغْنَى (الضحى ٦-٨).
"তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নাই আর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নাই? তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন। তিনি তোমাকে পাইলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাবমুক্ত করিলেন" (৯৩ঃ ৬-৮)।
এই আয়াত হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হইতেছে যে, এখানে হিদায়াত দ্বারা নবুওয়াত এবং ضلالت বা গোমরাহী দ্বারা নবুওয়াত পূর্ব জীবনকে বুঝানো হইয়াছে, যাহা নবুওয়াত লাভের পরবর্তী জীবনের তুলনায় গোমরাহী হইয়া থাকে। দালালাত শব্দ আরবীতে কেবল গোমরাহী অর্থেই ব্যবহৃত হয় না, বরং অজান্তে ভুলিয়া যাওয়া ও বেখবর হওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন স্ত্রীলোকদের সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে ইরশাদ হইয়াছে:
أَنْ تَضِلَّ احْدُهُمَا فَتُذكِّرَ احْدُهُمَا الْأُخْرى (البقرة ٢٨٢). "স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুল করিলে তাহাদের অপরজন স্মরণ করাইয়া দিবে" (২:১৮২)।
আল্লাহ্র ইল্ম সম্পর্কে অপর এক আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে: لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى (طه ٥٢) "আমার প্রতিপালক ভুল করেন না এবং বিস্মৃতও হন না" (২০ঃ ৫২)।
উপরিউক্ত আয়াত হইতে এই কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইতেছে যে, আরবী ভাষা ও আল-কুরআনের পরিভাষায় ضلالت-এর অর্থ কেবল গোমরাহী নয় বরং ভুলিয়া যাওয়া অর্থেও ইহার প্রয়োগ রহিয়াছে। অনুরূপ ضلالت শব্দের প্রয়োগ পাওয়া যায় সেই অর্থেও যেখানে গোমরাহীকে গোমরাহী বলিয়া মনে হইতেছে, কিন্তু এখনও আল্লাহ্র হিদায়াতের আলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট প্রস্ফুটিত হয় নাই। ত্রুটি অনুভূত হইতেছে, কিন্তু এই ত্রুটির স্থলে এখনও সঠিক পন্থা উদ্ভাবিত হয় নাই। অজ্ঞতার কুফল অনুভূত হইতেছে, কিন্তু এখনও জ্ঞানের সিংহদ্বার উন্মুক্ত হয় নাই। ইহাই হইল নবুওয়াতের পূর্বাবস্থার উপমা। হযরত মূসা ('আ) নবুওয়াত লাভের পূর্বাবস্থায় একজন নিগৃহীত কিবতীকে ঘুষি দিয়াছিলেন, যাহার আঘাতে আকস্মিক লোকটি মারা যায়। নবুওয়াত লাভের পর যখন তিনি আবির্ভূত হইলেন তখন ফিরআওন তাঁহাকে এই বলিয়া অভিযুক্ত করিল যে, তুমি আমার ফেরারী আসামী। তখন মূসা ('আ) এই বলিয়া জওয়াব দিয়াছিলেন:
فَعَلْتُهَا إِذًا وَأَنَا مِنَ الضَّالِّينَ (الشعراء ٢٠).
"আমি ইহা করিয়াছিলাম তখন যখন আমি ছিলাম অনবধান" (২৬ : ২০)।
এই ضلالت বা অনবধানতার অর্থ ছিল, তখন আমি নবুওয়াতের মর্যাদায় আসীন ছিলাম না। কেননা এই কথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মূসা ('আ) নবুওয়াত লাভের পূর্বে কোন গোমরাহীর কথা বলেন নাই। ইহা ছাড়া তিনি না কোন প্রতিমার পূজা করিয়াছিলেন, না ফিরআওনকে সিজদা করিয়াছিলেন বা অন্য কোন শিরকী কাজে লিপ্ত হইয়াছিলেন। চপেটাঘাতের ফলে কোন দুর্বল ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যুর জন্য প্রহারকারী ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী বলিয়া দায়ী করা যায় না। ইহা তাঁহার ইচ্ছাকৃত গুনাহও নয় যাহাকে গোমরাহী বলিয়া আখ্যা দেওয়া যায়। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, এই স্থলে মূসা ('আ) নিজেকে গোমরাহ বলিয়া আখ্যায়িত করিবার অর্থ হইল তখন ছিল তাঁহার নবুওয়াত পূর্ববর্তী অবস্থা। নবুওয়াত পরবর্তী অবস্থার তুলনায় পূর্ববর্তী অবস্থাকে গোমরাহী বলা হইয়াছে। নবুওয়াতের এই পূর্ববর্তী অবস্থাকে অন্যত্র 'গাফলত' বা অসর্তকতা হিসাবে উপস্থাপন করা হইয়াছে। ইউসুফ ('আ)-এর ঘটনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছেঃ
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ. (يوسف-٣)
"আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া, যদিও ইহার পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদিগের অন্তর্ভুক্ত” (১২:৩)।
এখানে যে নবুওয়াত পূর্ববর্তী অবস্থাকে 'গাফলত' বা অনবহিত অবস্থা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে নিম্নোক্ত আয়াতে ইহার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِى مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ (شوری ٥٢).
"এইভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছি রূহ (ওহী অথবা আল-কুরআন) তথা আমার নির্দেশ। তুমি তো জানিতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি? পক্ষান্তরে আমি ইহাকে করিয়াছি আলো যাহা দ্বারা আমি আমার বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি; তুমি তো প্রদর্শন কর কেষল সরল পথ" (৪২ঃ ৫২)।
কিতাব (আল-কুরআন) ও ঈমানের নূর ও হিদায়াত লাভের পূর্বের সেই অবস্থাকেই কোন স্থানে গোমরাহী আর কোন স্থানে গাফলত বা অনবধানতা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা প্রকৃত অর্থে পাপী হওয়া, অবাধ্য হওয়া কিংবা গোমরাহ হওয়া নয়, বরং ইহার অর্থ হইল তখন পর্যন্ত হক উদঘাটন করিতে না পারা। ইহাই ছিল তাঁহাদের ক্ষেত্রে গোমরাহী বা অসাবধানতা। অবশেষে তাঁহাদের জীবনে সময় আসিত যখন তাঁহাদের নিকট হেদায়তের আলো উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। তাঁহারা নিজেরা মনযিলে মকসুদে পৌঁছিয়া যাইতেন এবং অন্যদেরকেও সেই পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তাঁহাদের উপর অর্পিত হইত। একটি আয়াতে হিদায়াত শব্দ দ্বারা নবীগণের নবুওয়াত লাভ করাকে বুঝানো হইয়াছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ اسْحَقَ وَيَعْقُوبَ كُلاً هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ (الانعام ٨٤).
"এবং আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কূব ও ইহাদের প্রত্যেকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম; পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম" (৬:৮৪)।
এই আয়াতে হিদায়াত বা সৎপথে পরিচালিত করিবার দ্বারা যদি নবুওয়াত দান করা উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে বাহ্যত বুঝা যাইতেছে যে, নবুওয়াত লাভ করিবার পূর্বকালকে ضلالت বা অনভিজ্ঞতার কাল হিসাবেই ধরিয়া লওয়া হইয়াছে। তবে ইহার দ্বারা কেবল নবুওয়াত লাভের পূর্বকালীন অবস্থাকেই বুঝানো হইয়াছে।
উপরিউক্ত বক্তব্য হইতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামগণের বেলায় যে গোমরাহীর কথা বলা হইয়াছে ইহার দ্বারা পাপাচার, অবাধ্যতা ও পথভ্রষ্টতা বুঝানো হয় নাই, বরং নবুওয়াত লাভের পূর্ব-জীবনকে বুঝানো হইয়াছে যাহা পরবর্তী জীবনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত গোমরাহী।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবী-রাসূলগণের উপর যাদুর প্রভাব

📄 নবী-রাসূলগণের উপর যাদুর প্রভাব


নবী-রাসূলগণ যে কিছু সময়ের জন্য হইলেও যাদু-প্রভাবিত হইতে পারেন, তাহার বড় প্রমাণ হইল হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনের ঘোষণা। হযরত মূসা (আ) ফিরআওনের যাদুকরদের সম্মুখবর্তী হইলে তাহারা জিজ্ঞাসা করিল:
امَّا أَنْ تُلْقَى وَأَمَّا أَنْ تَكُونَ أَوَّلَ مَنْ الْقَى قَالَ بَلْ الْقُوا (طه ٦٦-٦٥) .
"(হে মূসা!) হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা প্রথমে আমরাই নিক্ষেপ করি। মূসা বলিল, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর" (২০: ৬৫-৬৬)।
প্রথমে ফিরআওনের যাদুকররা যখন তাহাদের যাদু নিক্ষেপ করিল, তখন যে অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছিল আল-কুরআনে উহার বর্ণনা নিম্নরূপ:
فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى. فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً موسى (طه ٦٦-٦٧) .
"উহাদিগের যাদুর প্রভাবে অকস্মাৎ মূসার মনে হইল উহাদিগের দড়ি ও লাঠিগুলি ছোটাছুটি করিতেছে। মূসা তাহার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করিল" (২০: ৬৬-৬৭)।
এইরূপ অবস্থায় আল্লাহ তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন :
لاَ تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى وَالْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سِحْرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى (طه ٦٨-٦٩).
"ভয় করিও না, তুমিই প্রবল। তোমার দক্ষিণ হস্তে যাহা আছে তাহা নিক্ষেপ কর, ইহা উহারা যাহা করিয়াছে তাহা গ্রাস করিয়া ফেলিবে। উহারা যাহা করিয়াছে তাহা তো কেবল যাদুকরের কৌশল। যাদুকর যেথায়ই আসুক, সফল হইবে না" (২০: ৬৮-৫৯)।
সূরা আল-আ'রাফে ইরশাদ হইয়াছেঃ
فَلَمَّا أَلْقَوْا سَحَرُوا أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ (الاعراف - ١١٦ ) .
“যখন তাহারা নিক্ষেপ করিল তখন তাহারা লোকের চোখে যাদু করিল, তাহাদিগকে আতংকিত করিল" (৭: ১১৬)।
এই আয়াতে সাধারণ লোকদের পক্ষে যাদু-প্রভাবিত ও তদ্দরুন ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। আর উপরে উল্লিখিত আয়াতে হযরত মূসা (আ)-এর নিজের ক্ষেত্রে অনুরূপ অবস্থার কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে। ইহাতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাসূল হওয়া সত্ত্বেও যাদুর নিকট সাধারণ মানুষের অনুরূপ পরিণতির সম্মুখীন হইয়াছিলেন। কেননা তিনি আল্লাহ্র নবী ও রাসূল হওয়া সত্ত্বেও মানবীয় বৈশিষ্ট্য হইতে মুক্ত ছিলেন না। তবে তাঁহার সেই অবস্থা বেশীক্ষণ স্থায়ী হইতে দেওয়া হয় নাই। কারণ তিনি আল্লাহ্র মহান নবী ও রাসূল ছিলেন। দ্বিতীয়ত, যাদু নবীর নবুওয়াত হরণ করিতে বা যাদুর প্রভাব তাঁহাকে বিভ্রান্ত করিতে পারে নাই। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যাদু করা হইয়াছিল এবং ইহার প্রভাবে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত দৈহিকভাবে কষ্ট পাইয়াছিলেন (মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুয়‍্যাত ও রিসালাত, পৃ. ২৪)। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর যে যাদু করা হইয়াছিল এই সম্পর্কে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ سُحْرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَفْعَلُ وَمَا يَفْعَلُهُ حَتَّى كَانَ ذَاتَ يَوْمٍ دَعَا وَدَعَا ثُمَّ قَالَ أَشَعَرْتِ أَنَّ اللَّهَ قَدِ افْتَانِي فِيْمَا فِيهِ شِفَائِي أَتَانِي رَجُلَانِ فَقَعَدَ أَحَدُهُمَا عِنْدَ رَأْسِي وَالآخَرُ عِنْدَ رِجْلَةً فَقَالَ أَحَدُهُمَا لِلْآخِرِ مَا وَجْعُ الرَّجُلِ قَالَ مَطْبُوبٌ قَالَ وَمَنْ طَبَّهُ قَالَ لَبِيْدُ بْنُ الأَعْصَمِ قَالَ فِيْمَا قَالَ فِي مِشْطَ وَمُشَاقَةٍ وَجُفَ طَلْعَةٍ ذَكَرٍ قَالَ فَأَيْنَ هُوَ قَالَ فِي بِئْرٍ ذَرْوَانَ فَخَرَجَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لِعَانَاشَةَ حِيْنَ رَجَعَ نَخْلُهَا كَأَنَّهَا رُؤُسُ الشَّيَاطِينِ فَقُلْتُ اسْتَخْرَجْتَهُ فَقَالَ لَا أَمَا أَنَا فَقَدْ شَفَانِي اللهُ وَخَشِيتُ أَنْ تُثِيْرَ ذَلِكَ عَلَى النَّاسِ شَرَّا ثُمَّ دفنت البئر (رواه البخاري ج- ١-٤٦٢ و ج - ٢-٨٥٧/ المطبعة كلكته)
"আইশা (রা) বলেন, নবী (স)-কে যাদু করা হইয়াছিল। ফলে তাঁহার এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, কোন কাজ না করিয়াও ধারণা করিতেন যে, তিনি ইহা করিয়াছেন। একদা তিনি আল্লাহর দরবারে বারবার দু'আ করিলেন। অতঃপর বলিলেন, (হে আইশা!) তুমি কি জান যে, আল্লাহ আমাকে জানাইয়া দিয়াছেন কিসে এই অবস্থা হইতে আমার মুক্তি নিহিত? আমার কাছে দুইজন লোক আসিয়া একজন আমার মাথার নিকট এবং অপর জন আমার পদদ্বয়ের নিকট বসিলেন। তাহারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যক্তির রোগ কি? একজন বলিলেন, ইনি যাদুগ্রস্ত। কে তাঁহাকে যাদু করিয়াছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অপর ব্যক্তি বলিলেন, লাবীদ ইবনুল আ'সাম যাদু করিয়াছে। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, চিরুনী, সুতার ডোর ও নর খেজুরের কলির আরবণী দ্বারা। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, সেইগুলি কোথায়? অপরজন বলিলেন, যারওয়ান নামক কূপে (কোন কোন বর্ণনায় যি-আরওয়ান)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) ঐদিকে বাহির হইলেন। সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া আইশা (রা)-কে বলিলেন, এই খেজুর বৃক্ষগুলি যেন শয়তানের মাথার ন্যায় হইয়া গিয়াছে। আইশা (রা) বলেন, আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তাহা কি বাহির করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, না, তবে আল্লাহ আমাকে ইহা হইতে আরোগ্য দান করিয়াছেন। আমি আশংকা করিয়াছিলাম লোকালয়ে ফাসাদ ছড়াইয়া পড়িবে। অতঃপর কূপটিকে বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়" (বুখারী, কিতাবু ইদইল খালক, বাবু সিফাতি ইবলীস ও জুনুদিহা, ১খ, পৃ. ৪৬২ হি.; কিতাবুত তিব, বাবুস সিহ্র, বাবু হাল য়ূসতাখারাজুস সিহর, ২খ, পৃ. ৮৫৭-৮৫৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যাদুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া সম্পর্কে মুফতী শফী বলেন, যাদুগ্রস্ত হওয়া নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিপন্থী নয়। যাহারা যাদুর প্রকৃতি সম্পর্কে অনবগত তাহারাই কেবল এই ঘটনা দ্বারা আশ্চর্য বোধ করে (মাআরিফুল কুরআন, ৮খ., পৃ. ৪৪৭)।
মাওলানা সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী বলেন, মহানবী (স) ব্যক্তি হিসাবে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হইতে পারেন, অশ্বপৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া যাইতে পারেন, বিষাক্ত বিছা দ্বারা দংশিত হইতে পারেন, যাদুর প্রতিক্রিয়ায় রোগাক্রান্তও হইতে পারেন ইত্যাদি। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াতের উপর যাদুর বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয় নাই, তাহা সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। তাঁহার উপর ইহার প্রতিক্রিয়া যাহা দেখা দিয়াছিল তাহা শুধু এতটুকুই যে, তিনি শারীরিকভাবে ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি কোন কাজ করিয়াছেন বলিয়া মনে হইলেও মূলত তাহা করা হয় নাই, কোন জিনিস দেখিয়াছেন বলিয়া মনে হইলেও আসলে তাহা দেখেন নাই। এইসব প্রতিক্রিয়া তাঁহার ব্যক্তিসত্তা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু নবী হিসাবে তাঁহার যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, তাহা যথাযথভাবে পালনের ব্যাপারে যাদুর ক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত সৃষ্টি হইতে পারে নাই। ঐ সময় তিনি কুরআনের কোন আয়াত ভুলিয়া গিয়াছেন বা কোন আয়াত ভুল পড়িয়াছেন অথবা তাঁহার ওয়াজ-নসীহতে, তাঁহার প্রদত্ত শিক্ষা-দীক্ষায় কোনরূপ পার্থক্য বা ব্যতিক্রম দেখা দিয়াছে, ওহীর মাধ্যমে নাযিল না হওয়া কোন বক্তব্যকে তিনি ওহীরূপে পেশ করিয়াছেন, নামায পড়া ভুলিয়া গিয়াছেন বা তিনি মনে করিয়াছেন যে, তাহা পড়িয়াছেন, অথচ তাহা পড়েন নাই, এই ধরনের কোন ঘটনা বা কথা ইতিহাসের বিপুল সম্ভারে কোনও একটি ক্ষুদ্রতম বা ইঙ্গিতপূর্ণ বর্ণনায়ও পাওয়া যাইবে না। কেননা আল্লাহ না করুন, এমন ঘটনা যদি আদৌ ঘটিয়া থাকিত তাহা হইলে উহা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িত। সমগ্র আরব চীৎকার করিয়া বলিত, যে নবীকে কোন শক্তিই পরাস্ত করিতে পারে নাই, সাধারণ এক যাদুকরই তাঁহাকে পর্যুদস্ত করিয়া দিয়াছে।
অতএব যাদুর প্রতিক্রিয়া মহানবী (স)-এর দেহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি নিজ শরীরে ও স্বাস্থ্যে উহার প্রতিক্রিয়া অনুভব করিতেন। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াতের মর্যাদা অর্থাৎ তিনি যে আল্লাহর নবী ছিলেন এবং এই হিসাবে তাঁহার যেসব দায়িত্ব, কর্তব্য ও বিশেষ গুণাবলী ছিল তাহা পালনে ও আচার-আচরণে সম্পূর্ণরূপে যাদুর প্রভাবমুক্ত ছিলেন। যাদুর ক্রিয়া ইহার উপর আদৌ কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই (দ্র. তাফহীমুল কুরআন, সূরা ফালাক ও সূরা নাস-এর ভূমিকা)।

নবী-রাসূলগণ যে কিছু সময়ের জন্য হইলেও যাদু-প্রভাবিত হইতে পারেন, তাহার বড় প্রমাণ হইল হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনের ঘোষণা। হযরত মূসা (আ) ফিরআওনের যাদুকরদের সম্মুখবর্তী হইলে তাহারা জিজ্ঞাসা করিল:
امَّا أَنْ تُلْقَى وَأَمَّا أَنْ تَكُونَ أَوَّلَ مَنْ الْقَى قَالَ بَلْ الْقُوا (طه ٦٦-٦٥) .
"(হে মূসা!) হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা প্রথমে আমরাই নিক্ষেপ করি। মূসা বলিল, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর" (২০: ৬৫-৬৬)।
প্রথমে ফিরআওনের যাদুকররা যখন তাহাদের যাদু নিক্ষেপ করিল, তখন যে অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছিল আল-কুরআনে উহার বর্ণনা নিম্নরূপ:
فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى. فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً موسى (طه ٦٦-٦٧) .
"উহাদিগের যাদুর প্রভাবে অকস্মাৎ মূসার মনে হইল উহাদিগের দড়ি ও লাঠিগুলি ছোটাছুটি করিতেছে। মূসা তাহার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করিল" (২০: ৬৬-৬৭)।
এইরূপ অবস্থায় আল্লাহ তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন :
لاَ تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى وَالْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سِحْرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى (طه ٦٨-٦٩).
"ভয় করিও না, তুমিই প্রবল। তোমার দক্ষিণ হস্তে যাহা আছে তাহা নিক্ষেপ কর, ইহা উহারা যাহা করিয়াছে তাহা গ্রাস করিয়া ফেলিবে। উহারা যাহা করিয়াছে তাহা তো কেবল যাদুকরের কৌশল। যাদুকর যেথায়ই আসুক, সফল হইবে না" (২০: ৬৮-৫৯)।
সূরা আল-আ'রাফে ইরশাদ হইয়াছেঃ
فَلَمَّا أَلْقَوْا سَحَرُوا أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ (الاعراف - ١١٦ ) .
“যখন তাহারা নিক্ষেপ করিল তখন তাহারা লোকের চোখে যাদু করিল, তাহাদিগকে আতংকিত করিল" (৭: ১১৬)।
এই আয়াতে সাধারণ লোকদের পক্ষে যাদু-প্রভাবিত ও তদ্দরুন ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। আর উপরে উল্লিখিত আয়াতে হযরত মূসা (আ)-এর নিজের ক্ষেত্রে অনুরূপ অবস্থার কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে। ইহাতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাসূল হওয়া সত্ত্বেও যাদুর নিকট সাধারণ মানুষের অনুরূপ পরিণতির সম্মুখীন হইয়াছিলেন। কেননা তিনি আল্লাহ্র নবী ও রাসূল হওয়া সত্ত্বেও মানবীয় বৈশিষ্ট্য হইতে মুক্ত ছিলেন না। তবে তাঁহার সেই অবস্থা বেশীক্ষণ স্থায়ী হইতে দেওয়া হয় নাই। কারণ তিনি আল্লাহ্র মহান নবী ও রাসূল ছিলেন। দ্বিতীয়ত, যাদু নবীর নবুওয়াত হরণ করিতে বা যাদুর প্রভাব তাঁহাকে বিভ্রান্ত করিতে পারে নাই। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যাদু করা হইয়াছিল এবং ইহার প্রভাবে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত দৈহিকভাবে কষ্ট পাইয়াছিলেন (মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুয়‍্যাত ও রিসালাত, পৃ. ২৪)। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর যে যাদু করা হইয়াছিল এই সম্পর্কে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ سُحْرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَفْعَلُ وَمَا يَفْعَلُهُ حَتَّى كَانَ ذَاتَ يَوْمٍ دَعَا وَدَعَا ثُمَّ قَالَ أَشَعَرْتِ أَنَّ اللَّهَ قَدِ افْتَانِي فِيْمَا فِيهِ شِفَائِي أَتَانِي رَجُلَانِ فَقَعَدَ أَحَدُهُمَا عِنْدَ رَأْسِي وَالآخَرُ عِنْدَ رِجْلَةً فَقَالَ أَحَدُهُمَا لِلْآخِرِ مَا وَجْعُ الرَّجُلِ قَالَ مَطْبُوبٌ قَالَ وَمَنْ طَبَّهُ قَالَ لَبِيْدُ بْنُ الأَعْصَمِ قَالَ فِيْمَا قَالَ فِي مِشْطَ وَمُشَاقَةٍ وَجُفَ طَلْعَةٍ ذَكَرٍ قَالَ فَأَيْنَ هُوَ قَالَ فِي بِئْرٍ ذَرْوَانَ فَخَرَجَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لِعَانَاشَةَ حِيْنَ رَجَعَ نَخْلُهَا كَأَنَّهَا رُؤُسُ الشَّيَاطِينِ فَقُلْتُ اسْتَخْرَجْتَهُ فَقَالَ لَا أَمَا أَنَا فَقَدْ شَفَانِي اللهُ وَخَشِيتُ أَنْ تُثِيْرَ ذَلِكَ عَلَى النَّاسِ شَرَّا ثُمَّ دفنت البئر (رواه البخاري ج- ١-٤٦٢ و ج - ٢-٨٥٧/ المطبعة كلكته)
"আইশা (রা) বলেন, নবী (স)-কে যাদু করা হইয়াছিল। ফলে তাঁহার এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, কোন কাজ না করিয়াও ধারণা করিতেন যে, তিনি ইহা করিয়াছেন। একদা তিনি আল্লাহর দরবারে বারবার দু'আ করিলেন। অতঃপর বলিলেন, (হে আইশা!) তুমি কি জান যে, আল্লাহ আমাকে জানাইয়া দিয়াছেন কিসে এই অবস্থা হইতে আমার মুক্তি নিহিত? আমার কাছে দুইজন লোক আসিয়া একজন আমার মাথার নিকট এবং অপর জন আমার পদদ্বয়ের নিকট বসিলেন। তাহারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যক্তির রোগ কি? একজন বলিলেন, ইনি যাদুগ্রস্ত। কে তাঁহাকে যাদু করিয়াছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অপর ব্যক্তি বলিলেন, লাবীদ ইবনুল আ'সাম যাদু করিয়াছে। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, চিরুনী, সুতার ডোর ও নর খেজুরের কলির আরবণী দ্বারা। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, সেইগুলি কোথায়? অপরজন বলিলেন, যারওয়ান নামক কূপে (কোন কোন বর্ণনায় যি-আরওয়ান)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) ঐদিকে বাহির হইলেন। সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া আইশা (রা)-কে বলিলেন, এই খেজুর বৃক্ষগুলি যেন শয়তানের মাথার ন্যায় হইয়া গিয়াছে। আইশা (রা) বলেন, আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তাহা কি বাহির করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, না, তবে আল্লাহ আমাকে ইহা হইতে আরোগ্য দান করিয়াছেন। আমি আশংকা করিয়াছিলাম লোকালয়ে ফাসাদ ছড়াইয়া পড়িবে। অতঃপর কূপটিকে বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়" (বুখারী, কিতাবু ইদইল খালক, বাবু সিফাতি ইবলীস ও জুনুদিহা, ১খ, পৃ. ৪৬২ হি.; কিতাবুত তিব, বাবুস সিহ্র, বাবু হাল য়ূসতাখারাজুস সিহর, ২খ, পৃ. ৮৫৭-৮৫৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যাদুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া সম্পর্কে মুফতী শফী বলেন, যাদুগ্রস্ত হওয়া নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিপন্থী নয়। যাহারা যাদুর প্রকৃতি সম্পর্কে অনবগত তাহারাই কেবল এই ঘটনা দ্বারা আশ্চর্য বোধ করে (মাআরিফুল কুরআন, ৮খ., পৃ. ৪৪৭)।
মাওলানা সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী বলেন, মহানবী (স) ব্যক্তি হিসাবে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হইতে পারেন, অশ্বপৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া যাইতে পারেন, বিষাক্ত বিছা দ্বারা দংশিত হইতে পারেন, যাদুর প্রতিক্রিয়ায় রোগাক্রান্তও হইতে পারেন ইত্যাদি। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াতের উপর যাদুর বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয় নাই, তাহা সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। তাঁহার উপর ইহার প্রতিক্রিয়া যাহা দেখা দিয়াছিল তাহা শুধু এতটুকুই যে, তিনি শারীরিকভাবে ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি কোন কাজ করিয়াছেন বলিয়া মনে হইলেও মূলত তাহা করা হয় নাই, কোন জিনিস দেখিয়াছেন বলিয়া মনে হইলেও আসলে তাহা দেখেন নাই। এইসব প্রতিক্রিয়া তাঁহার ব্যক্তিসত্তা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু নবী হিসাবে তাঁহার যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, তাহা যথাযথভাবে পালনের ব্যাপারে যাদুর ক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত সৃষ্টি হইতে পারে নাই। ঐ সময় তিনি কুরআনের কোন আয়াত ভুলিয়া গিয়াছেন বা কোন আয়াত ভুল পড়িয়াছেন অথবা তাঁহার ওয়াজ-নসীহতে, তাঁহার প্রদত্ত শিক্ষা-দীক্ষায় কোনরূপ পার্থক্য বা ব্যতিক্রম দেখা দিয়াছে, ওহীর মাধ্যমে নাযিল না হওয়া কোন বক্তব্যকে তিনি ওহীরূপে পেশ করিয়াছেন, নামায পড়া ভুলিয়া গিয়াছেন বা তিনি মনে করিয়াছেন যে, তাহা পড়িয়াছেন, অথচ তাহা পড়েন নাই, এই ধরনের কোন ঘটনা বা কথা ইতিহাসের বিপুল সম্ভারে কোনও একটি ক্ষুদ্রতম বা ইঙ্গিতপূর্ণ বর্ণনায়ও পাওয়া যাইবে না। কেননা আল্লাহ না করুন, এমন ঘটনা যদি আদৌ ঘটিয়া থাকিত তাহা হইলে উহা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িত। সমগ্র আরব চীৎকার করিয়া বলিত, যে নবীকে কোন শক্তিই পরাস্ত করিতে পারে নাই, সাধারণ এক যাদুকরই তাঁহাকে পর্যুদস্ত করিয়া দিয়াছে।
অতএব যাদুর প্রতিক্রিয়া মহানবী (স)-এর দেহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি নিজ শরীরে ও স্বাস্থ্যে উহার প্রতিক্রিয়া অনুভব করিতেন। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াতের মর্যাদা অর্থাৎ তিনি যে আল্লাহর নবী ছিলেন এবং এই হিসাবে তাঁহার যেসব দায়িত্ব, কর্তব্য ও বিশেষ গুণাবলী ছিল তাহা পালনে ও আচার-আচরণে সম্পূর্ণরূপে যাদুর প্রভাবমুক্ত ছিলেন। যাদুর ক্রিয়া ইহার উপর আদৌ কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই (দ্র. তাফহীমুল কুরআন, সূরা ফালাক ও সূরা নাস-এর ভূমিকা)।

নবী-রাসূলগণ যে কিছু সময়ের জন্য হইলেও যাদু-প্রভাবিত হইতে পারেন, তাহার বড় প্রমাণ হইল হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনের ঘোষণা। হযরত মূসা (আ) ফিরআওনের যাদুকরদের সম্মুখবর্তী হইলে তাহারা জিজ্ঞাসা করিল: امَّا أَنْ تُلْقَى وَأَمَّا أَنْ تَكُونَ أَوَّلَ مَنْ الْقَى قَالَ بَلْ الْقُوا. "(হে মূসা!) হয় তুমি নিক্ষেপ কর অথবা প্রথমে আমরাই নিক্ষেপ করি। মূসা বলিল, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর" (২০: ৬৫-৬৬)।
প্রথমে ফিরআওনের যাদুকররা যখন তাহাদের যাদু নিক্ষেপ করিল, তখন যে অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছিল আল-কুরআনে উহার বর্ণনা নিম্নরূপ: فَإِذَا حِبَالُهُمْ وَعِصِيُّهُمْ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ مِنْ سِحْرِهِمْ أَنَّهَا تَسْعَى. فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً موسى. "উহাদিগের যাদুর প্রভাবে অকস্মাৎ মূসার মনে হইল উহাদিগের দড়ি ও লাঠিগুলি ছোটাছুটি করিতেছে। মূসা তাহার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করিল" (২০: ৬৬-৬৭)।
এইরূপ অবস্থায় আল্লাহ তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন : لاَ تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى وَالْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سِحْرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى. "ভয় করিও না, তুমিই প্রবল। তোমার দক্ষিণ হস্তে যাহা আছে তাহা নিক্ষেপ কর, ইহা উহারা যাহা করিয়াছে তাহা গ্রাস করিয়া ফেলিবে। উহারা যাহা করিয়াছে তাহা তো কেবল যাদুকরের কৌশল। যাদুকর যেথায়ই আসুক, সফল হইবে না" (২০: ৬৮-৫৯)।
সূরা আল-আ'রাফে ইরশাদ হইয়াছেঃ فَلَمَّا أَلْقَوْا سَحَرُوا أَعْيُنَ النَّاسِ وَاسْتَرْهَبُوهُمْ. “যখন তাহারা নিক্ষেপ করিল তখন তাহারা লোকের চোখে যাদু করিল, তাহাদিগকে আতংকিত করিল" (৭: ১১৬)।
এই আয়াতে সাধারণ লোকদের পক্ষে যাদু-প্রভাবিত ও তদ্দরুন ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। আর উপরে উল্লিখিত আয়াতে হযরত মূসা (আ)-এর নিজের ক্ষেত্রে অনুরূপ অবস্থার কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হইয়াছে। ইহাতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রাসূল হওয়া সত্ত্বেও যাদুর নিকট সাধারণ মানুষের অনুরূপ পরিণতির সম্মুখীন হইয়াছিলেন। কেননা তিনি আল্লাহ্র নবী ও রাসূল হওয়া সত্ত্বেও মানবীয় বৈশিষ্ট্য হইতে মুক্ত ছিলেন না। তবে তাঁহার সেই অবস্থা বেশীক্ষণ স্থায়ী হইতে দেওয়া হয় নাই। কারণ তিনি আল্লাহ্র মহান নবী ও রাসূল ছিলেন। দ্বিতীয়ত, যাদু নবীর নবুওয়াত হরণ করিতে বা যাদুর প্রভাব তাঁহাকে বিভ্রান্ত করিতে পারে নাই। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যাদু করা হইয়াছিল এবং ইহার প্রভাবে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত দৈহিকভাবে কষ্ট পাইয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপর যে যাদু করা হইয়াছিল এই সম্পর্কে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছেঃ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ سُحْرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى كَانَ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَفْعَلُ وَمَا يَفْعَلُهُ حَتَّى كَانَ ذَاتَ يَوْمٍ دَعَا وَدَعَا ثُمَّ قَالَ أَشَعَرْتِ أَنَّ اللَّهَ قَدِ افْتَانِي فِيْمَا فِيهِ شِفَائِي أَتَانِي رَجُلَانِ فَقَعَدَ أَحَدُهُمَا عِنْدَ رَأْسِي وَالآخَرُ عِنْدَ رِجْلَةً فَقَالَ أَحَدُهُمَا لِلْآخِرِ مَا وَجْعُ الرَّجُلِ قَالَ مَطْبُوبٌ قَالَ وَمَنْ طَبَّهُ قَالَ لَبِيْدُ بْنُ الأَعْصَمِ قَالَ فِيْمَا قَالَ فِي مِشْطَ وَمُشَاقَةٍ وَجُفَ طَلْعَةٍ ذَكَرٍ قَالَ فَأَيْنَ هُوَ قَالَ فِي بِئْرٍ ذَرْوَانَ فَخَرَجَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لِعَانَاشَةَ حِيْنَ رَجَعَ نَخْلُهَا كَأَنَّهَا رُؤُسُ الشَّيَاطِينِ فَقُلْتُ اسْتَخْرَجْتَهُ فَقَالَ لَا أَمَا أَنَا فَقَدْ شَفَانِي اللهُ وَخَشِيتُ أَنْ تُثِيْرَ ذَلِكَ عَلَى النَّاسِ شَرَّا ثُمَّ دفنت البئر. "আইশা (রা) বলেন, নবী (স)-কে যাদু করা হইয়াছিল। ফলে তাঁহার এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, কোন কাজ না করিয়াও ধারণা করিতেন যে, তিনি ইহা করিয়াছেন। একদা তিনি আল্লাহর দরবারে বারবার দু'আ করিলেন। অতঃপর বলিলেন, (হে আইশা!) তুমি কি জান যে, আল্লাহ আমাকে জানাইয়া দিয়াছেন কিসে এই অবস্থা হইতে আমার মুক্তি নিহিত? আমার কাছে দুইজন লোক আসিয়া একজন আমার মাথার নিকট এবং অপর জন আমার পদদ্বয়ের নিকট বসিলেন। তাহারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যক্তির রোগ কি? একজন বলিলেন, ইনি যাদুগ্রস্ত। কে তাঁহাকে যাদু করিয়াছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অপর ব্যক্তি বলিলেন, লাবীদ ইবনুল আ'সাম যাদু করিয়াছে। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, চিরুনী, সুতার ডোর ও নর খেজুরের কলির আরবণী দ্বারা। আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, সেইগুলি কোথায়? অপরজন বলিলেন, যারওয়ান নামক কূপে (কোন কোন বর্ণনায় যি-আরওয়ান)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) ঐদিকে বাহির হইলেন। সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া আইশা (রা)-কে বলিলেন, এই খেজুর বৃক্ষগুলি যেন শয়তানের মাথার ন্যায় হইয়া গিয়াছে। আইশা (রা) বলেন, আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তাহা কি বাহির করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, না, তবে আল্লাহ আমাকে ইহা হইতে আরোগ্য দান করিয়াছেন। আমি আশংকা করিয়াছিলাম লোকালয়ে ফাসাদ ছড়াইয়া পড়িবে। অতঃপর কূপটিকে বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়" (বুখারী, কিতাবু ইদইল খালক, বাবু সিফাতি ইবলীস ও জুনুদিহা, ১খ, পৃ. ৪৬২ হি.; কিতাবুত তিব, বাবুস সিহ্র, বাবু হাল য়ূসতাখারাজুস সিহর, ২খ, পৃ. ৮৫৭-৮৫৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যাদুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া সম্পর্কে মুফতী শফী বলেন, যাদুগ্রস্ত হওয়া নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিপন্থী নয়। যাহারা যাদুর প্রকৃতি সম্পর্কে অনবগত তাহারাই কেবল এই ঘটনা দ্বারা আশ্চর্য বোধ করে (মাআরিফুল কুরআন, ৮খ., পৃ. ৪৪৭)।
মাওলানা সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী বলেন, মহানবী (স) ব্যক্তি হিসাবে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হইতে পারেন, অশ্বপৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া যাইতে পারেন, বিষাক্ত বিছা দ্বারা দংশিত হইতে পারেন, যাদুর প্রতিক্রিয়ায় রোগাক্রান্তও হইতে পারেন ইত্যাদি। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াতের উপর যাদুর বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয় নাই, তাহা সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। তাঁহার উপর ইহার প্রতিক্রিয়া যাহা দেখা দিয়াছিল তাহা শুধু এতটুকুই যে, তিনি শারীরিকভাবে ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি কোন কাজ করিয়াছেন বলিয়া মনে হইলেও মূলত তাহা করা হয় নাই, কোন জিনিস দেখিয়াছেন বলিয়া মনে হইলেও আসলে তাহা দেখেন নাই। এইসব প্রতিক্রিয়া তাঁহার ব্যক্তিসত্তা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু নবী হিসাবে তাঁহার যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, তাহা যথাযথভাবে পালনের ব্যাপারে যাদুর ক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত সৃষ্টি হইতে পারে নাই। ঐ সময় তিনি কুরআনের কোন আয়াত ভুলিয়া গিয়াছেন বা কোন আয়াত ভুল পড়িয়াছেন অথবা তাঁহার ওয়াজ-নসীহতে, তাঁহার প্রদত্ত শিক্ষা-দীক্ষায় কোনরূপ পার্থক্য বা ব্যতিক্রম দেখা দিয়াছে, ওহীর মাধ্যমে নাযিল না হওয়া কোন বক্তব্যকে তিনি ওহীরূপে পেশ করিয়াছেন, নামায পড়া ভুলিয়া গিয়াছেন বা তিনি মনে করিয়াছেন যে, তাহা পড়িয়াছেন, অথচ তাহা পড়েন নাই, এই ধরনের কোন ঘটনা বা কথা ইতিহাসের বিপুল সম্ভারে কোনও একটি ক্ষুদ্রতম বা ইঙ্গিতপূর্ণ বর্ণনায়ও পাওয়া যাইবে না। কেননা আল্লাহ না করুন, এমন ঘটনা যদি আদৌ ঘটিয়া থাকিত তাহা হইলে উহা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িত। সমগ্র আরব চীৎকার করিয়া বলিত, যে নবীকে কোন শক্তিই পরাস্ত করিতে পারে নাই, সাধারণ এক যাদুকরই তাঁহাকে পর্যুদস্ত করিয়া দিয়াছে।
অতএব যাদুর প্রতিক্রিয়া মহানবী (স)-এর দেহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি নিজ শরীরে ও স্বাস্থ্যে উহার প্রতিক্রিয়া অনুভব করিতেন। কিন্তু তাঁহার নবুওয়াতের মর্যাদা অর্থাৎ তিনি যে আল্লাহর নবী ছিলেন এবং এই হিসাবে তাঁহার যেসব দায়িত্ব, কর্তব্য ও বিশেষ গুণাবলী ছিল তাহা পালনে ও আচার-আচরণে সম্পূর্ণরূপে যাদুর প্রভাবমুক্ত ছিলেন। যাদুর ক্রিয়া ইহার উপর আদৌ কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই।

টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুয়‍্যাত ও রিসালাত, পৃ. ২৪।
২. দ্র. তাফহীমুল কুরআন, সূরা ফালাক ও সূরা নাস-এর ভূমিকা।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে

📄 নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে


নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে
নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ কি মা'সূম হইতে পারেন? নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম (নিষ্পাপ) ও সংরক্ষিত হইতে পারেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। কারণ তাঁহারা ব্যতীত অন্য সকলেই সাধারণ মানুষের পর্যায়ে গণ্য যাহারা ভুল ভ্রান্তি হইতে ঊর্ধ্বে নহেন। তবে আল্লাহ তাঁহার কোন কোন ওলীকে কাবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত রাখিতে পারেন। কেহ এইরূপ মুক্ত থাকিলে ইহা আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের ব্যাপার। কিন্তু ইহা সেই ইসমাত বা নিষ্পাপতা নয়, যাহা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণকে প্রদান করিয়াছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَءَامِنُوا۟ بِرَسُولِهِۦ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِۦ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُّورًا تَمْشُونَ بِهِۦ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الحديد - ২৮)
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁহার আনুগ্রহে তোমাদিগকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদিগকে দিবেন আলো যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫৭: ২৮)।
আয়াতটিতে যে নূরের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে আল্লাহ্র বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যাহা আল্লাহ্ ওলী ও মুত্তাকীগণ লাভ করিয়া থাকেন। ইহা এক প্রকার সংরক্ষণ বটে, তবে তাহা কোনক্রমেই 'ইসমাত' নয়। ফলে তাঁহারা কেহই মা'সূম অভিহিত হইতে পারেন না। কেহ তেমন দাবি করিলে তাহা হইবে ভিত্তিহীন, ইহার পক্ষে শরী'আতের কোন দলীল নাই। কেননা মানুষের স্বভাবেই ভুল-ত্রুটির সংমিশ্রণ রহিয়াছে। এই কারণেই ইমাম মালিক (র) মদীনায় রাসূলে করীম (স)-এর কবরের প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছিলেন:
مَا مِنَّا إِلَّا مَنْ رَّدَّ وَرُدَّ عَلَيْهِ إِلَّا صَاحِبُ هَذَا لَقَبْرِ. "আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই এমন যিনি কাহারও কথা রদ করিয়াছেন এবং তাহার কথাও রদ করা হইয়াছে। কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ইহার ব্যতিক্রম"।
ইমাম মালিক (র)-এর বক্তব্য এভাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে: كُلُّ أَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْهُ وَيُرَدُّ عَلَيْهِ الأَ صَاحِبَ هُذَا الْقَبْرِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "প্রত্যেকের কথার মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য অংশ আছে, এই কবরবাসী (মহানবী স) ব্যতীত"।
ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, مَا جَاءَنَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَى الرَّأْسِ وَالْعَيْنِ وَمَا جَاءَنَا عَنِ الصَّحَابَةِ اخْتَرْنَا وَمَا جَاءَنَا عَنِ التَّابِعِينَ فَهُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ. "রাসূলুল্লাহ' (স) হইতে যাহা আমাদের নিকট আসিয়াছে তাহা শিরোধার্য। আর সাহাবীগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে তাহা আমরা যাচাই করিয়া গ্রহণ করিব। আর তাবিঈগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে সেই ক্ষেত্রে তাহারাও মানুষ, আমরাও মানুষ"।
ইমাম আহমাদ ইবন জাম্বল (র) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ مَّعَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَلامٌ. "আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সম-পর্যায়ে অপর কাহারও কথা হইতে পারে না"।
ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, لا حُجَّةَ فِي قَوْلِ أَحَدٍ دُونَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অপর কাহারও কথা দলীল হইতে পারে না"।
আর রাসূলে করীম (স)-এর এই অতুলনীয় মর্যাদা কেবল এইজন্যই যে, তিনি ছিলেন মা'সূম (মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুওয়াত ও রিসালাত, পৃ. ৩২)।

নবীগণ ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম নহে
নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ কি মা'সূম হইতে পারেন? নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম (নিষ্পাপ) ও সংরক্ষিত হইতে পারেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। কারণ তাঁহারা ব্যতীত অন্য সকলেই সাধারণ মানুষের পর্যায়ে গণ্য যাহারা ভুল ভ্রান্তি হইতে ঊর্ধ্বে নহেন। তবে আল্লাহ তাঁহার কোন কোন ওলীকে কাবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত রাখিতে পারেন। কেহ এইরূপ মুক্ত থাকিলে ইহা আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের ব্যাপার। কিন্তু ইহা সেই ইসমাত বা নিষ্পাপতা নয়, যাহা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণকে প্রদান করিয়াছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَءَامِنُوا۟ بِرَسُولِهِۦ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِۦ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُّورًا تَمْشُونَ بِهِۦ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (الحديد - ২৮)
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁহার আনুগ্রহে তোমাদিগকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদিগকে দিবেন আলো যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫৭: ২৮)।
আয়াতটিতে যে নূরের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে আল্লাহ্র বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যাহা আল্লাহ্ ওলী ও মুত্তাকীগণ লাভ করিয়া থাকেন। ইহা এক প্রকার সংরক্ষণ বটে, তবে তাহা কোনক্রমেই 'ইসমাত' নয়। ফলে তাঁহারা কেহই মা'সূম অভিহিত হইতে পারেন না। কেহ তেমন দাবি করিলে তাহা হইবে ভিত্তিহীন, ইহার পক্ষে শরী'আতের কোন দলীল নাই। কেননা মানুষের স্বাভাবই ভুল-ত্রুটির সংমিশ্রণ রহিয়াছে। এই কারণেই ইমাম মালিক (র) মদীনায় রাসূলে করীম (স)-এর কবরের প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছিলেন:
مَا مِنَّا إِلَّا مَنْ رَّدَّ وَرُدَّ عَلَيْهِ إِلَّا صَاحِبُ هَذَا لَقَبْرِ. "আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই এমন যিনি কাহারও কথা রদ করিয়াছেন এবং তাহার কথাও রদ করা হইয়াছে। কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ইহার ব্যতিক্রম"।
ইমাম মালিক (র)-এর বক্তব্য এভাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে: كُلُّ أَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْهُ وَيُرَدُّ عَلَيْهِ الأَ صَاحِبَ هُذَا الْقَبْرِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "প্রত্যেকের কথার মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য অংশ আছে, এই কবরবাসী (মহানবী স) ব্যতীত"।
ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, مَا جَاءَنَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَى الرَّأْسِ وَالْعَيْنِ وَمَا جَاءَنَا عَنِ الصَّحَابَةِ اخْتَرْنَا وَمَا جَاءَنَا عَنِ التَّابِعِينَ فَهُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ. "রাসূলুল্লাহ' (স) হইতে যাহা আমাদের নিকট আসিয়াছে তাহা শিরোধার্য। আর সাহাবীগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে তাহা আমরা যাচাই করিয়া গ্রহণ করিব। আর তাবিঈগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে সেই ক্ষেত্রে তাহারাও মানুষ, আমরাও মানুষ"।
ইমাম আহমাদ ইবন জাম্বল (র) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ مَّعَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَلامٌ. "আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সম-পর্যায়ে অপর কাহারও কথা হইতে পারে না"।
ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, لا حُجَّةَ فِي قَوْلِ أَحَدٍ دُونَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অপর কাহারও কথা দলীল হইতে পারে না"।
আর রাসূলে করীম (স)-এর এই অতুলনীয় মর্যাদা কেবল এইজন্যই যে, তিনি ছিলেন মা'সূম (মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুওয়াত ও রিসালাত, পৃ. ৩২)।

নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ কি মা'সূম হইতে পারেন? নবী-রাসূল ব্যতীত অন্য কেহ মা'সূম (নিষ্পাপ) ও সংরক্ষিত হইতে পারেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। কারণ তাঁহারা ব্যতীত অন্য সকলেই সাধারণ মানুষের পর্যায়ে গণ্য যাহারা ভুল ভ্রান্তি হইতে ঊর্ধ্বে নহেন। তবে আল্লাহ তাঁহার কোন কোন ওলীকে কাবীরা গুনাহ হইতে মুক্ত রাখিতে পারেন। কেহ এইরূপ মুক্ত থাকিলে ইহা আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের ব্যাপার। কিন্তু ইহা সেই ইসমাত বা নিষ্পাপতা নয়, যাহা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে নবী-রাসূলগণকে প্রদান করিয়াছেন। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَءَامِنُوا۟ بِرَسُولِهِۦ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِۦ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُّورًا تَمْشُونَ بِهِۦ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "হে মু'মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তাঁহার আনুগ্রহে তোমাদিগকে দিবেন দ্বিগুণ পুরস্কার এবং তিনি তোমাদিগকে দিবেন আলো যাহার সাহায্যে তোমরা চলিবে এবং তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫৭: ২৮)।
আয়াতটিতে যে নূরের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে আল্লাহ্র বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যাহা আল্লাহ্ ওলী ও মুত্তাকীগণ লাভ করিয়া থাকেন। ইহা এক প্রকার সংরক্ষণ বটে, তবে তাহা কোনক্রমেই 'ইসমাত' নয়। ফলে তাঁহারা কেহই মা'সূম অভিহিত হইতে পারেন না। কেহ তেমন দাবি করিলে তাহা হইবে ভিত্তিহীন, ইহার পক্ষে শরী'আতের কোন দলীল নাই। কেননা মানুষের স্বভাবেই ভুল-ত্রুটির সংমিশ্রণ রহিয়াছে। এই কারণেই ইমাম মালিক (র) মদীনায় রাসূলে করীম (স)-এর কবরের প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছিলেন: مَا مِنَّا إِلَّا مَنْ رَّدَّ وَرُدَّ عَلَيْهِ إِلَّا صَاحِبُ هَذَا لَقَبْرِ. "আমাদের মধ্যকার প্রত্যেক ব্যক্তিই এমন যিনি কাহারও কথা রদ করিয়াছেন এবং তাহার কথাও রদ করা হইয়াছে। কিন্তু এই কবরের অধিবাসী ইহার ব্যতিক্রম"।
ইমাম মালিক (র)-এর বক্তব্য এভাবেও উদ্ধৃত হইয়াছে: كُلُّ أَحَدٍ يُؤْخَذُ مِنْهُ وَيُرَدُّ عَلَيْهِ الأَ صَاحِبَ هُذَا الْقَبْرِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "প্রত্যেকের কথার মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যানযোগ্য অংশ আছে, এই কবরবাসী (মহানবী স) ব্যতীত"।
ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, مَا جَاءَنَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَى الرَّأْسِ وَالْعَيْنِ وَمَا جَاءَنَا عَنِ الصَّحَابَةِ اخْتَرْنَا وَمَا جَاءَنَا عَنِ التَّابِعِينَ فَهُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ. "রাসূলুল্লাহ' (স) হইতে যাহা আমাদের নিকট আসিয়াছে তাহা শিরোধার্য। আর সাহাবীগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে তাহা আমরা যাচাই করিয়া গ্রহণ করিব। আর তাবিঈগণের নিকট হইতে আমাদের নিকট যাহা আসিয়াছে সেই ক্ষেত্রে তাহারাও মানুষ, আমরাও মানুষ"।
ইমাম আহমাদ ইবন জাম্বল (র) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ مَّعَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ كَلامٌ. "আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সম-পর্যায়ে অপর কাহারও কথা হইতে পারে না"।
ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, لا حُجَّةَ فِي قَوْلِ أَحَدٍ دُونَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. "রাসূলুল্লাহ (স) ব্যতীত অপর কাহারও কথা দলীল হইতে পারে না"।
আর রাসূলে করীম (স)-এর এই অতুলনীয় মর্যাদা কেবল এইজন্যই যে, তিনি ছিলেন মা'সূম।

টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আল-কুরআনে নবুওয়াত ও রিসালাত, পৃ. ৩২।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা

📄 নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা


নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা
বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কারণে মানুষ সকল প্রাণীর উপর শ্রেষ্ঠত্বে অভিষিক্ত এবং সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য কায়েম করিয়া ইহাদিগকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। অনুরূপভাবে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামও তাঁহাদের পবিত্র সত্তার কারণে মানব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন থাকেন। তাঁহারা তাঁহাদের পবিত্র সত্তা ও নবীসুলভ আচরণ দ্বারা অন্যদিগকে সরল পথে আহবান করেন।
তাঁহাদের নবীসুলভ বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবনশক্তি সকল মানবিক বিবেক-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আল্লাহ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের ফলে তাঁহারা সকল মানুষের আত্মার সংশোধন ও পরিমার্জন করিয়া থাকেন। নবীর অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের নিকট মু’জিযারূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। যদিও নবীগণও মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী থাকেন তবুও বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৌল গুণাবলীতে তাঁহারা সাধারণ মানব সমাজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কারণ নবীর মধ্যে ওহী গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা বিদ্যমান তাহা অন্যান্য মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى (الكهف - (۱۱). “আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়” (১৮: ১১০)।
মানবীয় গুণে যদিও নবীগণ মানুষের পর্যায়ভুক্ত, কিন্তু 'ওহী' প্রাপ্তির ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা হইয়াছে।
নিম্নোক্ত তিনটি বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে: (এক) মানুষের মধ্যে তিন ধরনের ঐচ্ছিক আচরণ বিদ্যমান রহিয়াছেঃ চিন্তাগত, বক্তব্যগত ও কর্মগত। এই তিনটি প্রক্রিয়ায় মানুষ যে কর্ম সম্পাদন করে তাহা ভালও হইতে পারে, মন্দও হইতে পারে। চিন্তাধারা শুদ্ধও হইতে পারে, ভুলও হইতে পারে। বক্তব্য সত্যও হইতে পারে মিথ্যাও হইতে পারে। কর্ম ভালও হইতে পারে, আবার মন্দও হইতে পারে। এখন প্রশ্ন হইল, শুদ্ধ ও ভুল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ নিরূপিত হইবে কিভাবে? এই নিরূপণ কি সকলের দ্বারা সম্ভব, না ইহা কেহই করিতে পারিবে না, না কেহ করিতে পারে, আর কেহ পারে না? প্রথম দুই সম্ভাবনা সর্বৈব ভুল। তৃতীয় সম্ভাবনা অর্থাৎ কেহ কেহ ইহা নিরূপণ করিতে পারেন যে, অমুক পথ ও মত শুদ্ধ আর অমুকটি ভুল। অমুক ব্যক্তি সত্যবাদী, আর অমুক মিথ্যাবাদী, এই কাজটি কল্যাণকর, আর এই কাজ অকল্যাণকর। যেই ব্যক্তিকে জগৎস্রষ্টা আপন করুণা ও অনুগ্রহে এই শক্তি দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন নবী ও শরীআতের বিধানদাতা।
(দুই) মানবজাতির জন্য স্বীয় কর্ম, আচার-আচরণ ও লেনদেনের মধ্যে পারস্পরিক একতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে। যদি তাহাদের মধ্যে এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না থাকে তাহা হইলে তাহাদের জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের সংরক্ষণের উপায় থাকিবে না। জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান সংরক্ষণ রাখিবার এই বিধানের নামই হইল শরী'আত। তাই মানুষের জন্য দুই ধরনের কাজের প্রয়োজন। একটি হইল, ভাল কাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। দ্বিতীয়টি হইল, মন্দ কাজ হইতে একজন অপরজনকে বিরত রাখিবার চেষ্টা করা। এই সহযোগিতার ফলেই মানুষ খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের উপাদান উপকরণ যোগাড় করিয়া থাকে। ইহারই দ্বারা বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের অধিকার ও সম্পর্ক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়। পরস্পরকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেকেরই জীবন, ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান হিফাজতের ও নিরাপত্তার পন্থা-পদ্ধতি বাহির হইয়া আসে। এই সহযোগিতা ও বিরত রাখার মূলনীতিতে প্রয়োজনীয় হইল তাহা যেন সুশৃংখলিত ও সুপরিজ্ঞাত হয় এবং তাহা যেন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যে, ইহাতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী জাতি ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া না হয়, এই ব্যাপারে যেন সকলেরই এমন কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এইরূপ বিধান প্রবর্তন কোন মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ইহা আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং তাঁহারই শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রণীত হওয়া সম্ভব। আরও কথা হইল কোন মানুষের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ইহা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন দেশের অধিবাসী। সমগ্র ভূমণ্ডলের সকল সৃষ্টিকুলের জন্য একইরূপে অনুসরণযোগ্য সমতা ভিত্তিক পক্ষপাতহীন বিধান প্রর্বতন করা মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এইজন্য প্রয়োজন যে, এই বিধানগুলি তাঁহারই পক্ষ হইতে প্রেরিত হইবে, যাহার হাতে রহিয়াছে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি, যিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর ভিতর-বাহিরের সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। এই মূলনীতিরাজি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহার উপর ওহীরূপে প্রেরিত হয় তিনি হইলেন রাসূল বা নবী।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার একটি কাজ হইল সৃজন করা। দ্বিতীয়টি হইল, আমর বা আদেশ করা। যেইভাবে ফেরেশতাগণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে দূত-এর ভূমিকা পালন করেন, তেমনিভাবে নবী আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইবার জন্য মধ্যস্থতা করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ্র উপর সৃষ্টিকর্তা ও আদেশদাতা হিসাবে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব সেইভাবে ফেরেশতাগণের উপর ঈমান আনা জরুরী যে, তাহারা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ বহনে দূতের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। অনুরূপভাবে নবীগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক যে, তাঁহারা হইলেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইয়া দিবার মাধ্যম।
নিম্নে কতিপয় প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের আলোচনা করা হইল। (১) যাহা সম্ভব তাহার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব একই সমান। এই কারণে অস্তিত্বে আসার জন্য একজন অগ্রাধিকারদাতার প্রয়োজন, যাহার কারণে অস্তিত্বও অনস্তিত্বের উপর প্রাধান্য পাইবে এবং বস্তুটি অস্তিত্বে আসিবে। এই প্রাধান্য লাভকারী হইল সম্ভাবনার কারণ।
(২) সর্বপ্রকার আলোড়নের জন্য একজন আলোড়নকারীর প্রয়োজন হয়, যিনি সব সময় নব নব আলোড়ন সৃষ্টি করিতে থাকিবেন। আলোড়নও আবার দুই প্রকার : প্রকৃতিগত ও ইচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত আলোড়নের জন্য প্রয়োজন হইল আলোড়নকারীর মধ্যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় থাকা। অনুরূপ প্রকৃতিগত আলোড়নের জন্যও প্রয়োজন হইল আলোড়নকারী বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহী হইবেন। চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য নভোমণ্ডলীয় সৃষ্টির আলোড়ন যদিও প্রকৃতিগত, তবুও ইহাতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোন বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহীর প্রয়োজন রহিয়াছে এই কারণেই আল-কুরআনে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاء أَمْرَهَا (حم السجده ١٢٠) "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ২২)।
(৩) এখন যেমন মানবীয় আচরণ আলোড়ন, অভিপ্রায় ও ইচ্ছার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ইচ্ছা অভিপ্রায় ব্যতীত ইহা সংঘটিত হইতে পারে না তেমনিভাবে এই আলোড়নসমূহের জন্য এমন দিশারীর প্রয়োজন যিনি সেই কর্ম ও আলোড়নের সঠিক পন্থা দেখাইয়া দিবেন। হককে বাতিল হইতে, সত্যকে মিথ্যা হইতে এবং শুভকে অশুভ হইতে পৃথক করিয়া দিবেন।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ দুই প্রকার: ব্যবস্থাপনামূলক ( تدبیری ) ও বাধ্যতামূলক ( تکلیفی )। প্রথম প্রকার আদেশটি বিশ্ব-ব্যবস্থাপনায় চালু রহিয়াছে, যাহার কারণে সমগ্র বিশ্বে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ (الاعراف - ٥٤ ) .
"আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন, তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই" (৭:৫৪)।
বাধ্যতামূলক আদেশ কেবল মানুষের জন্য। সুতরাং আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ (البقرة - ٢١).
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন" (২: ২১)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হইল যে, মানুষের সকল আলোড়ন সম্ভাবনাময়। এইজন্য অগ্রাধিকার দানকারীর প্রয়োজন ভাল ও মন্দের, নির্দেশের জন্য দিশারীর প্রয়োজন। এই দিশারীর নাম হইল নবী (শিবলী নু'মানীও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৭)।

নবুওয়াত ও রিসালাত প্রমাণের পন্থা
বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কারণে মানুষ সকল প্রাণীর উপর শ্রেষ্ঠত্বে অভিষিক্ত এবং সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য কায়েম করিয়া ইহাদিগকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। অনুরূপভাবে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামও তাঁহাদের পবিত্র সত্তার কারণে মানব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন থাকেন। তাঁহারা তাঁহাদের পবিত্র সত্তা ও নবীসুলভ আচরণ দ্বারা অন্যদিগকে সরল পথে আহবান করেন।
তাঁহাদের নবীসুলভ বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবনশক্তি সকল মানবিক বিবেক-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আল্লাহ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের ফলে তাঁহারা সকল মানুষের আত্মার সংশোধন ও পরিমার্জন করিয়া থাকেন। নবীর অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের নিকট মু’জিযারূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। যদিও নবীগণও মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী থাকেন তবুও বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৌল গুণাবলীতে তাঁহারা সাধারণ মানব সমাজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কারণ নবীর মধ্যে ওহী গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা বিদ্যমান তাহা অন্যান্য মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى (الكهف - (۱۱). “আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়” (১৮: ১১০)।
মানবীয় গুণে যদিও নবীগণ মানুষের পর্যায়ভুক্ত, কিন্তু 'ওহী' প্রাপ্তির ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা হইয়াছে।
নিম্নোক্ত তিনটি বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে: (এক) মানুষের মধ্যে তিন ধরনের ঐচ্ছিক আচরণ বিদ্যমান রহিয়াছেঃ চিন্তাগত, বক্তব্যগত ও কর্মগত। এই তিনটি প্রক্রিয়ায় মানুষ যে কর্ম সম্পাদন করে তাহা ভালও হইতে পারে, মন্দও হইতে পারে। চিন্তাধারা শুদ্ধও হইতে পারে, ভুলও হইতে পারে। বক্তব্য সত্যও হইতে পারে মিথ্যাও হইতে পারে। কর্ম ভালও হইতে পারে, আবার মন্দও হইতে পারে। এখন প্রশ্ন হইল, শুদ্ধ ও ভুল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ নিরূপিত হইবে কিভাবে? এই নিরূপণ কি সকলের দ্বারা সম্ভব, না ইহা কেহই করিতে পারিবে না, না কেহ করিতে পারে, আর কেহ পারে না? প্রথম দুই সম্ভাবনা সর্বৈব ভুল। তৃতীয় সম্ভাবনা অর্থাৎ কেহ কেহ ইহা নিরূপণ করিতে পারেন যে, অমুক পথ ও মত শুদ্ধ আর অমুকটি ভুল। অমুক ব্যক্তি সত্যবাদী, আর অমুক মিথ্যাবাদী, এই কাজটি কল্যাণকর, আর এই কাজ অকল্যাণকর। যেই ব্যক্তিকে জগৎস্রষ্টা আপন করুণা ও অনুগ্রহে এই শক্তি দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন নবী ও শরীআতের বিধানদাতা।
(দুই) মানবজাতির জন্য স্বীয় কর্ম, আচার-আচরণ ও লেনদেনের মধ্যে পারস্পরিক একতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে। যদি তাহাদের মধ্যে এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না থাকে তাহা হইলে তাহাদের জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের সংরক্ষণের উপায় থাকিবে না। জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান সংরক্ষণ রাখিবার এই বিধানের নামই হইল শরী'আত। তাই মানুষের জন্য দুই ধরনের কাজের প্রয়োজন। একটি হইল, ভাল কাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। দ্বিতীয়টি হইল, মন্দ কাজ হইতে একজন অপরজনকে বিরত রাখিবার চেষ্টা করা। এই সহযোগিতার ফলেই মানুষ খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের উপাদান উপকরণ যোগাড় করিয়া থাকে। ইহারই দ্বারা বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের অধিকার ও সম্পর্ক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়। পরস্পরকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেকেরই জীবন, ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান হিফাজতের ও নিরাপত্তার পন্থা-পদ্ধতি বাহির হইয়া আসে। এই সহযোগিতা ও বিরত রাখার মূলনীতিতে প্রয়োজনীয় হইল তাহা যেন সুশৃংখলিত ও সুপরিজ্ঞাত হয় এবং তাহা যেন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যে, ইহাতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী জাতি ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া না হয়, এই ব্যাপারে যেন সকলেরই এমন কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এইরূপ বিধান প্রবর্তন কোন মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ইহা আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং তাঁহারই শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রণীত হওয়া সম্ভব। আরও কথা হইল কোন মানুষের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ইহা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন দেশের অধিবাসী। সমগ্র ভূমণ্ডলের সকল সৃষ্টিকুলের জন্য একইরূপে অনুসরণযোগ্য সমতা ভিত্তিক পক্ষপাতহীন বিধান প্রর্বতন করা মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এইজন্য প্রয়োজন যে, এই বিধানগুলি তাঁহারই পক্ষ হইতে প্রেরিত হইবে, যাহার হাতে রহিয়াছে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি, যিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর ভিতর-বাহিরের সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। এই মূলনীতিরাজি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহার উপর ওহীরূপে প্রেরিত হয় তিনি হইলেন রাসূল বা নবী।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার একটি কাজ হইল সৃজন করা। দ্বিতীয়টি হইল, আমর বা আদেশ করা। যেইভাবে ফেরেশতাগণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে দূত-এর ভূমিকা পালন করেন, তেমনিভাবে নবী আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইবার জন্য মধ্যস্থতা করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ্র উপর সৃষ্টিকর্তা ও আদেশদাতা হিসাবে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব সেইভাবে ফেরেশতাগণের উপর ঈমান আনা জরুরী যে, তাহারা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ বহনে দূতের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। অনুরূপভাবে নবীগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক যে, তাঁহারা হইলেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইয়া দিবার মাধ্যম।
নিম্নে কতিপয় প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের আলোচনা করা হইল। (১) যাহা সম্ভব তাহার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব একই সমান। এই কারণে অস্তিত্বে আসার জন্য একজন অগ্রাধিকারদাতার প্রয়োজন, যাহার কারণে অস্তিত্বও অনস্তিত্বের উপর প্রাধান্য পাইবে এবং বস্তুটি অস্তিত্বে আসিবে। এই প্রাধান্য লাভকারী হইল সম্ভাবনার কারণ।
(২) সর্বপ্রকার আলোড়নের জন্য একজন আলোড়নকারীর প্রয়োজন হয়, যিনি সব সময় নব নব আলোড়ন সৃষ্টি করিতে থাকিবেন। আলোড়নও আবার দুই প্রকার : প্রকৃতিগত ও ইচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত আলোড়নের জন্য প্রয়োজন হইল আলোড়নকারীর মধ্যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় থাকা। অনুরূপ প্রকৃতিগত আলোড়নের জন্যও প্রয়োজন হইল আলোড়নকারী বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহী হইবেন। চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য নভোমণ্ডলীয় সৃষ্টির আলোড়ন যদিও প্রকৃতিগত, তবুও ইহাতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোন বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহীর প্রয়োজন রহিয়াছে এই কারণেই আল-কুরআনে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاء أَمْرَهَا (حم السجده ١٢٠) "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ২২)।
(৩) এখন যেমন মানবীয় আচরণ আলোড়ন, অভিপ্রায় ও ইচ্ছার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ইচ্ছা অভিপ্রায় ব্যতীত ইহা সংঘটিত হইতে পারে না তেমনিভাবে এই আলোড়নসমূহের জন্য এমন দিশারীর প্রয়োজন যিনি সেই কর্ম ও আলোড়নের সঠিক পন্থা দেখাইয়া দিবেন। হককে বাতিল হইতে, সত্যকে মিথ্যা হইতে এবং শুভকে অশুভ হইতে পৃথক করিয়া দিবেন।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ দুই প্রকার: ব্যবস্থাপনামূলক ( تدبیری ) ও বাধ্যতামূলক ( تکلیفی )। প্রথম প্রকার আদেশটি বিশ্ব-ব্যবস্থাপনায় চালু রহিয়াছে, যাহার কারণে সমগ্র বিশ্বে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছেঃ
وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ (الاعراف - ٥٤ ) .
"আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন, তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই" (৭:৫৪)।
বাধ্যতামূলক আদেশ কেবল মানুষের জন্য। সুতরাং আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ (البقرة - ٢١).
"হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন" (২: ২১)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হইল যে, মানুষের সকল আলোড়ন সম্ভাবনাময়। এইজন্য অগ্রাধিকার দানকারীর প্রয়োজন ভাল ও মন্দের, নির্দেশের জন্য দিশারীর প্রয়োজন। এই দিশারীর নাম হইল নবী (শিবলী নু'মানীও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৭)।

বুদ্ধিমত্তা ও মেধার কারণে মানুষ সকল প্রাণীর উপর শ্রেষ্ঠত্বে অভিষিক্ত এবং সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য কায়েম করিয়া ইহাদিগকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে। অনুরূপভাবে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামও তাঁহাদের পবিত্র সত্তার কারণে মানব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন থাকেন। তাঁহারা তাঁহাদের পবিত্র সত্তা ও নবীসুলভ আচরণ দ্বারা অন্যদিগকে সরল পথে আহবান করেন।
তাঁহাদের নবীসুলভ বিবেক-বুদ্ধি ও অনুধাবনশক্তি সকল মানবিক বিবেক-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। আল্লাহ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যের ফলে তাঁহারা সকল মানুষের আত্মার সংশোধন ও পরিমার্জন করিয়া থাকেন। নবীর অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের নিকট মু’জিযারূপে প্রতিভাত হইয়া থাকে। যদিও নবীগণও মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী থাকেন তবুও বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৌল গুণাবলীতে তাঁহারা সাধারণ মানব সমাজ হইতে সম্পূর্ণ আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কারণ নবীর মধ্যে ওহী গ্রহণ করিবার যে যোগ্যতা বিদ্যমান তাহা অন্যান্য মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى. “আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়” (১৮: ১১০)।
মানবীয় গুণে যদিও নবীগণ মানুষের পর্যায়ভুক্ত, কিন্তু 'ওহী' প্রাপ্তির ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সীমারেখা টানা হইয়াছে।
নিম্নোক্ত তিনটি বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে: (এক) মানুষের মধ্যে তিন ধরনের ঐচ্ছিক আচরণ বিদ্যমান রহিয়াছেঃ চিন্তাগত, বক্তব্যগত ও কর্মগত। এই তিনটি প্রক্রিয়ায় মানুষ যে কর্ম সম্পাদন করে তাহা ভালও হইতে পারে, মন্দও হইতে পারে। চিন্তাধারা শুদ্ধও হইতে পারে, ভুলও হইতে পারে। বক্তব্য সত্যও হইতে পারে মিথ্যাও হইতে পারে। কর্ম ভালও হইতে পারে, আবার মন্দও হইতে পারে। এখন প্রশ্ন হইল, শুদ্ধ ও ভুল, সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দ নিরূপিত হইবে কিভাবে? এই নিরূপণ কি সকলের দ্বারা সম্ভব, না ইহা কেহই করিতে পারিবে না, না কেহ করিতে পারে, আর কেহ পারে না? প্রথম দুই সম্ভাবনা সর্বৈব ভুল। তৃতীয় সম্ভাবনা অর্থাৎ কেহ কেহ ইহা নিরূপণ করিতে পারেন যে, অমুক পথ ও মত শুদ্ধ আর অমুকটি ভুল। অমুক ব্যক্তি সত্যবাদী, আর অমুক মিথ্যাবাদী, এই কাজটি কল্যাণকর, আর এই কাজ অকল্যাণকর। যেই ব্যক্তিকে জগৎস্রষ্টা আপন করুণা ও অনুগ্রহে এই শক্তি দান করিয়াছেন তিনিই হইলেন নবী ও শরীআতের বিধানদাতা।
(দুই) মানবজাতির জন্য স্বীয় কর্ম, আচার-আচরণ ও লেনদেনের মধ্যে পারস্পরিক একতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে। যদি তাহাদের মধ্যে এই সহযোগিতা ও সহমর্মিতা না থাকে তাহা হইলে তাহাদের জানমাল ও ইজ্জত-সম্মানের সংরক্ষণের উপায় থাকিবে না। জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান সংরক্ষণ রাখিবার এই বিধানের নামই হইল শরী'আত। তাই মানুষের জন্য দুই ধরনের কাজের প্রয়োজন। একটি হইল, ভাল কাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। দ্বিতীয়টি হইল, মন্দ কাজ হইতে একজন অপরজনকে বিরত রাখিবার চেষ্টা করা। এই সহযোগিতার ফলেই মানুষ খাওয়া-পরা ও বাসস্থানের উপাদান উপকরণ যোগাড় করিয়া থাকে। ইহারই দ্বারা বিবাহ বন্ধন, আত্মীয়তা, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের অধিকার ও সম্পর্ক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়। পরস্পরকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখার মাধ্যমে প্রত্যেকেরই জীবন, ধন-সম্পত্তি, ইজ্জত-সম্মান হিফাজতের ও নিরাপত্তার পন্থা-পদ্ধতি বাহির হইয়া আসে। এই সহযোগিতা ও বিরত রাখার মূলনীতিতে প্রয়োজনীয় হইল তাহা যেন সুশৃংখলিত ও সুপরিজ্ঞাত হয় এবং তাহা যেন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যে, ইহাতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী জাতি ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া না হয়, এই ব্যাপারে যেন সকলেরই এমন কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এইরূপ বিধান প্রবর্তন কোন মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়, বরং ইহা আল্লাহ প্রদত্ত ওহী এবং তাঁহারই শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রণীত হওয়া সম্ভব। আরও কথা হইল কোন মানুষের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ইহা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন দেশের অধিবাসী। সমগ্র ভূমণ্ডলের সকল সৃষ্টিকুলের জন্য একইরূপে অনুসরণযোগ্য সমতা ভিত্তিক পক্ষপাতহীন বিধান প্রর্বতন করা মানবীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। এইজন্য প্রয়োজন যে, এই বিধানগুলি তাঁহারই পক্ষ হইতে প্রেরিত হইবে, যাহার হাতে রহিয়াছে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি, যিনি সমগ্র মানবমণ্ডলীর ভিতর-বাহিরের সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। এই মূলনীতিরাজি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে যাহার উপর ওহীরূপে প্রেরিত হয় তিনি হইলেন রাসূল বা নবী।
(তিন) আল্লাহ তা'আলার একটি কাজ হইল সৃজন করা। দ্বিতীয়টি হইল, আমর বা আদেশ করা। যেইভাবে ফেরেশতাগণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে দূত-এর ভূমিকা পালন করেন, তেমনিভাবে নবী আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইবার জন্য মধ্যস্থতা করিয়া থাকেন। যেইভাবে আল্লাহ্র উপর সৃষ্টিকর্তা ও আদেশদাতা হিসাবে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব সেইভাবে ফেরেশতাগণের উপর ঈমান আনা জরুরী যে, তাহারা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে সংবাদ বহনে দূতের ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। অনুরূপভাবে নবীগণের উপর ঈমান আনা আবশ্যক যে, তাঁহারা হইলেন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে আদেশ-নিষেধ পৌঁছাইয়া দিবার মাধ্যম।
নিম্নে কতিপয় প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের আলোচনা করা হইল। (১) যাহা সম্ভব তাহার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব একই সমান। এই কারণে অস্তিত্বে আসার জন্য একজন অগ্রাধিকারদাতার প্রয়োজন, যাহার কারণে অস্তিত্বও অনস্তিত্বের উপর প্রাধান্য পাইবে এবং বস্তুটি অস্তিত্বে আসিবে। এই প্রাধান্য লাভকারী হইল সম্ভাবনার কারণ।
(২) সর্বপ্রকার আলোড়নের জন্য একজন আলোড়নকারীর প্রয়োজন হয়, যিনি সব সময় নব নব আলোড়ন সৃষ্টি করিতে থাকিবেন। আলোড়নও আবার দুই প্রকার : প্রকৃতিগত ও ইচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত আলোড়নের জন্য প্রয়োজন হইল আলোড়নকারীর মধ্যে ইচ্ছা ও অভিপ্রায় থাকা। অনুরূপ প্রকৃতিগত আলোড়নের জন্যও প্রয়োজন হইল আলোড়নকারী বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহী হইবেন। চন্দ্র, সূর্য ও অন্যান্য নভোমণ্ডলীয় সৃষ্টির আলোড়ন যদিও প্রকৃতিগত, তবুও ইহাতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোন বুদ্ধিমান ও কার্যনির্বাহীর প্রয়োজন রহিয়াছে এই কারণেই আল-কুরআনে এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاء أَمْرَهَا. "এবং তিনি প্রত্যেক আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন" (৪১: ২২)।
(৩) এখন যেমন মানবীয় আচরণ আলোড়ন, অভিপ্রায় ও ইচ্ছার মুখাপেক্ষী অর্থাৎ ইচ্ছা অভিপ্রায় ব্যতীত ইহা সংঘটিত হইতে পারে না তেমনিভাবে এই আলোড়নসমূহের জন্য এমন দিশারীর প্রয়োজন যিনি সেই কর্ম ও আলোড়নের সঠিক পন্থা দেখাইয়া দিবেন। হককে বাতিল হইতে, সত্যকে মিথ্যা হইতে এবং শুভকে অশুভ হইতে পৃথক করিয়া দিবেন।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ দুই প্রকার: ব্যবস্থাপনামূলক ( تدبیری ) ও বাধ্যতামূলক ( تکلیفی )। প্রথম প্রকার আদেশটি বিশ্ব-ব্যবস্থাপনায় চালু রহিয়াছে, যাহার কারণে সমগ্র বিশ্বে সুন্দর ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتِ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ. "আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যাহা তাঁহারই আজ্ঞাধীন, তাহা তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই" (৭:৫৪)।
বাধ্যতামূলক আদেশ কেবল মানুষের জন্য। সুতরাং আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ. "হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন" (২: ২১)।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে প্রমাণিত হইল যে, মানুষের সকল আলোড়ন সম্ভাবনাময়। এইজন্য অগ্রাধিকার দানকারীর প্রয়োজন ভাল ও মন্দের, নির্দেশের জন্য দিশারীর প্রয়োজন। এই দিশারীর নাম হইল নবী।

টিকাঃ
১. শিবলী নু'মানীও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00