📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবীগণের চক্ষু ঘুমায়; অন্তর জাগ্রত থাকে

📄 নবীগণের চক্ষু ঘুমায়; অন্তর জাগ্রত থাকে


যেই অন্তরগুলিকে আল্লাহ্ তা'আলা ওহী অবতরণের উপযোগী করিয়া সৃষ্টি করেন তাঁহাদের সম্পর্ক আল্লাহ্র সহিত এমন ভাবে হইয়া থাকে যাহা সাধারণত অন্য কাহারও সহিত হয় না। এই জন্য তাঁহারা নিদ্রায় গেলেও তাহাদের কলব বা অন্তর জাগ্রত থাকে। এই কারণে তাহাঁদের স্বপ্নকেও ওহী হিসাবে গণ্য করা হয়। ইবরাহীম (আ) স্বীয় পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-কে কুরবানী করিবার যেই আদেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্বপ্নেই লাভ করিয়াছিলেন। স্বপ্নের হাকীকত ইবরাহীম (আ) অবগত ছিলেন। ইহার সহিত ইসমা'ঈল (আ) ও এই সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন না। যেই কারণে তিনি অকপটে বলিয়াছিলেন: يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ "হে পিতা! আপনি যেই ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছেন তাহা পালন করুন"। উক্ত আয়াতে স্বপ্নকে আল্লাহ্র আদেশ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই সম্পর্কে বুখারীর হাদীছটি খুবই তাৎপর্যবহ। শারীক ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন:
سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يُحَدَّثُنَا عَنْ لَيْلَةٍ أُسْرِى بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ مَسْجِدِ الْكَعْبَةِ جَاءَهُ ثَلَاثَةُ نَفَرٍ قَبْلَ أَنْ يُوحَى إِلَيْهِ وَهُوَ نَائِمٌ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقَالَ أَوَّلُهُمْ أَيُّهُمْ هُوَ فَقَالَ أَوْسَطُهُمْ هُوَ خَيْرُهُمْ وَقَالَ آخِرُهُمْ خُذُوا خَيْرَهُمْ فَكَانَتْ تِلْكَ فَلَمْ يَرَهُمْ حَتَّى جَاءُوا لَيْلَةً أُخْرَى فِيْمَا يَرَى قَلْبُهُ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَائِمَةٌ عَيْنَاهُ وَلَا يَنَامُ قَلْبُهُ وَكَذَالِكَ الأَنْبِيَاءُ تَنَامُ عَيْنَاهُمْ وَلَا تَنَامُ قُلُوبُهُمْ فَتَوَلَاهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ عُرِجَ بِهِ إِلَى السماء.
"আমি আনাস ইবন মালিক (রা)-কে বর্ণনা করিতে শুনিয়াছি, রাসূলল্লাহ (স)-এর নিকট ওহী আসিবার পূর্বে যেই রাত্রিতে তাঁহাকে সফর করানো হইয়াছিল সেই রাত্রে তাঁহার নিকট তিনজন ফেরেশতার একটি দল আগমন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মাসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এই তিনজন ফেরেশতার প্রথম জন জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কোনজন? দ্বিতীয় ফেরেশতা জবাব দিলেন, তিনি এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। শেষের ফেরেশতা বলিলেন, সর্বাপেক্ষা উত্তম এই ব্যক্তিকে লইয়া আস। এই রাত্রিতে এই পর্যন্ত কথাবার্তার পর তাহাদেরকে আর দেখা গেল না। অপর এক রাত্রে তাহারা আবার রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁহার নিকট আসিলেন। তাঁহার চক্ষুদ্বয় ঘুমাইত কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকিত। অনুরূপ সকল নবীর চক্ষুদ্বয় ঘুমায় কিন্তু তাঁহাদের অন্তরসমূহ ঘুমায় না। অতঃপর জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে নিজ দায়িত্বে লাইয়া ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিলেন"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াতের পদ কি একমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট?

📄 নবুওয়াতের পদ কি একমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট?


অতীত কালের কোন কোন স্ত্রীলোক বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অসামান্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন এবং ইলম ও মা'রিফাতেও পূর্ণতা লাভে সক্ষম হইয়াছিলেন। ইহাতে কাহারও কোন দ্বিমত নাই। কিন্তু স্ত্রীলোকদের কেহ নবী হইয়াছিলেন কিনা এই সম্পর্কে বিস্তর মতপার্থক্য রহিয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, নবুওয়াতের পদটি সর্বদা একমাত্র পুরুষদের জন্যই নির্দিষ্ট, কোন স্ত্রীলোককে এই পদে মনোনীত করা হয় নাই। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন, কোন কোন স্ত্রীলোককে নবুওয়াতের পদে মনোনীত করা হইয়াছিল। যাহারা এই দ্বিতীয় অভিমত পোষণ করেন তাহারা আবার এই ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত যে, কোন্ কোন্ স্ত্রীলোককে এই পদে মনোনীত করা হইয়াছিল।
এই ব্যাপারে মাওলানা হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, শায়খ আবুল হাসান আশআরী, কুরতবী ও ইবন হাযম প্রমুখ এই অভিমতের প্রতি নমনীয় যে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারেন। এমনকি ইব্‌ন হায আন্দালুসী এইরূপ দাবি করিয়াছেন যে, হযরত হাওয়া, সারাহ, হাজার, মূসা (আ)-এর মাতা আসিয়া ও মারয়াম (আ) নবী ছিলেন। মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাক বলেন, অধিকাংশ ফকীহ এই অভিমত পোষণ করেন যে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারেন। কুরতুবী অবশ্য ইন্ন হাযমের সহিত সংখ্যার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করিয়াছেন। তিনি হযরত সারাহ ও হাজিরা (আ)-কে নবুওয়াতের তালিকা হইতে বাদ দিয়াছেন। পক্ষান্তরে হাসান বসরী, ইমামুল হারামায়ন শায়খ আবদুল আযীয, কাদী ইয়াদ ও ইব্‌ন কাছীর প্রমুখ স্ত্রীলোকদের নবুওয়াত পদে মনোনীত না হইবার অভিমতকে অগ্রধিকার দিয়াছেন। কাদী ইয়াদ ও ইব্‌ন কাছীর আরও বলিয়াছেন যে, উম্মতের বেশির ভাগ 'উলামায়ে কিরাম এই অভিমতকে সমর্থন করিয়াছেন।
নারী জাতির মধ্যে কেহ নবী হিসাবে মনোনীত হইতে পারেন কিনা এই প্রশ্নটি অনেকটা উত্থাপিত হইয়াছে হযরত মারয়াম (আ)-কে কেন্দ্র করিয়া। আল-কুরআনে তাঁহার সম্পর্কে যেই সকল প্রশংসামূলক বাণী রহিয়াছে তাহা সাধারণত নবীগণের বেলায়ই প্রযোজ্য হইয়া থাকে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْ قَالَتِ الْمَلائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ اصْطَفْكِ وَطَهَّرَكَ وَاصْطَفُكَ عَلَى نِسَاءِ الْعَلَمِينَ.
"যখন ফেরেশতাগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীগণের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন" (৩ঃ ৪২)।
মহান আল্লাহ মারয়াম (আ) ও তৎপরবর্তী নবীগণের উল্লেখের পর তাঁহাদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ أَدَمَ ...... "ইহারাই তাহারা নবীদের মধ্যে যাহাদিগকে আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছেন আদমের বংশ হইতে ......." (১৯:৫৮)।
আল-কুরআনের আরও বহু আয়াতে মারয়াম (আ)-এর অপূর্ব গুণাবলী ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হইয়াছে যাহা তাঁহার প্রমাণ বহন করে। ইহা ছাড়াও হযরত সারাহ, মূসা (আ)-এর মাতা ও মারয়াম (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনের বিবরণ হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হয় যে, আল্লাহ্ ফেরেশতা তাঁহাদের নিকট ওহী লইয়া আগমন করিতেন। ফেরেশতা তাঁহাদেরকে সুসংবাদ শুনাইতেন, আল্লাহ্র পরিচয় ও তাঁহার ইবাদতের কথা তাঁহাদেরকে অবহিত করিতেন। সূরা হৃদ ও সূরা আয-যারিয়াতে হযরত সারাহ-কে, মূসা (আ)-এর মাতাকে সূরা কাসাসে এবং সূরা আল ইমরান ও সূরা মারায়ামে মারয়াম (আ)-কে ফেরেশতাদের মাধ্যমে এবং কোন মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি আল্লাহ তাআলা সম্বোধন করিয়াছেন। নবুওয়াতের ধারা যদিও আদিকাল হইতে একমাত্র পুরুষদের মধ্যেই চলিয়া আসিতেছিল, কিন্তু উপরিউক্ত মহীয়সী স্ত্রীলোকগণের উল্লিখিত অবস্থানের কারণে নবুওয়াত লাভ কেবল পুরুষদের জন্যই সুনির্দিষ্ট, এই দাবির ভিত্তি দুর্বল হইয়া যায়। এই হাদীছটি এতই প্রসিদ্ধ যে, সহীহ বলিয়া স্বীকৃত হাদীছ গ্রন্থেই ইহার বর্ণনা রহিয়াছে। এই হাদীছের কথা বাদই দিলাম। তেমনি পূর্বে উল্লিখিত আল-কুরআনের আয়াত: إِنَّ اللَّهَ اصْطَفك وطَهَّرَك واصطفك .عَلَى نِسَاءِ الْعَلَمِينَ -এর কথাও বাদ দিলে তবুও নিম্নোক্ত আয়াতটি সম্পর্কে কথা থাকিয়া যায়। আছিয়া ও মারয়াম (আ) সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নরূপ উক্তি রহিয়াছে বলিয়া বুখারীতে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِى رضى اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلا أَسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَإِنَّ فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى الطَّعَامِ.
“আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: পুরুষদের মধ্যে বহু লোক পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছেন, কিন্তু স্ত্রীলোকদের মধ্যে ফিরআওন-স্ত্রী আছিয়া ও ইমরান-তনয়া মারয়াম ব্যতীত আর কেহই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে নাই। স্ত্রী জাতির মধ্যে আইশার মর্যাদা হইল সকল খাদ্যের মধ্যে ছারীদের শ্রেষ্ঠত্বের মত” (বুখারী অধ্যায় ৬০, পরিচ্ছেদ ৩২)।
যেই সকল আলিম মনে করেন, স্ত্রীজাতি নবী হইতে পারেন না তাহারা তাহাদের দাবির অনুকূলে নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ فَاسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষ মানুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানিগণকে জিজ্ঞাসা কর" (নাহল: ৪৩)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ مِّنْ أَهْلِ الْقُرَى.
"তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হইতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম, যাহাদের নিকট ওহী পাঠাইতাম" (১২: ১০৯)।
বিশেষভাবে হযরত মারয়াম (আ)-এর নবুওয়াতের প্রতিকূলে তাহারা এই দলীল পেশ করিয়া থাকেন যে, আল-কুরআনে তাঁহাকে সিদ্দীকা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে:
مَا الْمَسِيحُ بْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ.
"মারয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল। তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে এবং তাহার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল" (৫ঃ ৭৫)।
এই সম্পর্কে হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, সূরা নিসায় পুরস্কৃত ব্যক্তিদের যেই তালিকা আল-কুরআন প্রদান করিয়াছে ইহাতে অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, নবুওয়াতের স্তর হইতে সিদ্দীকিয়াতের স্তর বহু গুণ নিম্নে। ইব্‌ন হাজার আল-আসকালানী বলেন, ইমাম নাওয়াবী তাঁহার 'আল-আযকার' গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, ইমামুল হারামায়ন শায়খ আবদুল আযীয এই ব্যাপার উম্মতের ইজমা' (সর্বসম্মত অভিমত) প্রমাণ করিতে সক্ষম হইয়াছেন যে, মারয়াম (আ) নবী ছিলেন না। হাসান বসরী বলেন:
لَيْسَ فِي النِّسَاءِ نَبِيَّةٌ وَلَا فِي الْجِنِّ.
"নারী জাতির মধ্যে কোন নবী নাই, অনুরূপ জিন্নদের মধ্যেও কোন নবী নাই”।
স্ত্রীজাতির নবুওয়াতের পক্ষ ও বিপক্ষ এই দুই অভিমতের বাহিরে তৃতীয় আরও একটি অভিমত পাওয়া যায়, তাহা হইল এই ব্যাপারে নীরব থাকা। এই শ্রেণীর আলিমগণ মনে করেন, মহিলাদের নবী হওয়া বা না হওয়া এই সম্পর্কিত কোন অভিমত দান হইতে বিরত থাকা উত্তম। এই শ্রেণীর আলিমদের মধ্যে শায়খ তাকিয়্যুাদ্দীন আস-সুবকীর নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন:
أُخْتُلِفَ فِي هَذِهِ الْمَسْئَلَةِ وَلَمْ يَصِحَ عِنْدِي فِي ذَلِكَ شَيْئً.
"এই সম্পর্কে বিতর্ক; তবে আমার মতে এই সম্পর্কিত কোন অভিমতই বিশুদ্ধ নয়"।
মহিলাদের নবুওয়াতের পক্ষে যাহারা অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হাদীছবেত্তা হইলেন ইব্‌ন্ন হাযম আন্দালুসী। তিনি তাঁহার সমসাময়িক স্পেনে এই সম্পর্কে তীব্র মতবিরোধের কথা উল্লেখ করিয়া বলেন, যাহারা মহিলাদের নবুওয়াত পদে মনোনীত হইবার বিরোধিতা করেন তাহাদের নিকট এই অস্বীকৃতির কোন দলীল পরিলক্ষিত হয় না। অবশ্য কেহ কেহ এই অস্বীকৃতির পিছনে এই দলীল উত্থাপন করিয়া থাকেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلاَّ رِجَالاً نُوْحَى إِلَيْهِمْ অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ্ তাআলা স্ত্রীলোককে মাখলুকের হিদায়াতের জন্য রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন।
বিতর্ক হইল নবুওয়াত সম্পর্কে, রিসালাত সম্পর্কে নয়। অতএব আসা যাউক মধুওয়াত শব্দের বিশ্লেষণে। আরবী অভিধান অনুসারে নবুওয়াত শব্দটি اَنْبَاَ ধাতু হইতে নিস্পন্ন যাহার অর্থ হইল 'অবহিতকরণ'। সুতরাং ইহা হইতে বুঝা যায় যেই ব্যক্তিকে, আল্লাহ তাআলা কোন বিষয় সংঘটিত হইবার পূর্বে ওহীর মাধ্যমে অবহিত করেন কিংবা অন্য কোন বিষয়ে তাঁহার প্রতি ওহী নাযিল করেন, তিনিই হইলেন নিঃসন্দেহে নবী। এখানে ওহী বলিতে সেই ইলহাম অর্থ হইবে না যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার সৃষ্টির কোন কোন জীবের মধ্যে স্বভাবত প্রদান করিয়া থাকেন। যেমন মৌমাছি সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ অনুরূপ ওহী বলিতে ধারণা ও অনুমানও লওয়া যাইবে না। কারণ এই দুইটি অনুভূতিকে নিশ্চিত জ্ঞান (علم يقين) মনে করা যায় না। ওহী বলিতে এখানে শয়তানদের আকাশ হইতে চুরি করিয়া শ্রবণ করা বিষয়ও হইবে না, যাহার সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوا شَيْطِيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ يُوْحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ.
"এইরূপে আমি মানব'ও জিন্নের মধ্যে শয়তানদিগকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করিয়াছি, প্রতারণার উদ্দেশে তাহাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করে" (৬: ১১২)।
কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের ফলে আকাশ হইতে এইরূপ কিছু শ্রবণ করিবার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। অনুরূপ এখানে ওহী বলিতে জ্যোতিষবিদ্যাও নয় যাহা শিখা ও শিখানো দ্বারা অর্জিত হয়। ওহী বলিতে স্বপ্ন অর্থ লওয়া যাইবে না, যাহা সত্য হওয়ার কোন নিশ্চয়তা নাই বরং এখানে ওহী বলিতে সেই স্বতন্ত্র অর্থ হইবে যাহা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছায় কোন ব্যক্তিকে এমন কিছু অবহিত করেন যাহা তিনি পূর্বে জানিতেন না। যাহারা মহিলাদের নবী হওয়াকে অস্বীকার করেন তাহারা যদি নবুওয়াতের এই অর্থ গ্রহণ না করেন, তাহা হইলে নবুওয়াতের আসল অর্থ কি তাহার ব্যাখ্যা আবশ্যক। প্রকৃত কথা হইল, তাহারা নবুওয়াতের এই অর্থ ব্যতীত অন্য কোন অর্থই প্রকাশ করিতে পারিবেন না। কুরআন মাজীদে উল্লেখ আছে, আল্লাহ তাআলা স্ত্রীলোকদের নিকট ফেরেশতা পাঠাইয়াছিলেন এবং তাহাদের মাধ্যমে ঐ স্ত্রীলোকদের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলেন। ফেরেশতারা সারাহ্ (রা)-এর নিকট আসিয়া তাঁহাকে ইসহাক (আ)-এর সুসংবাদ দান প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে: وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشِّرْنَهَا بِاسْحَقَ وَمَنْ وَرَاءِ اسْحَقَ يَعْقُوبَ قَالَتْ يُوَيْلَتَي ءَاَلِدٌ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهُذَا بَعْلِى شَيْئًا إِنَّ هَذَا لَشَيْئً عَجِيْبُ. قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ رَحْمَتُ اللهِ وَبَرَكْتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْْبَيْتِ.
"আর তাহার স্ত্রী দণ্ডায়মান এবং সে হাসিয়া ফেলিল। অতঃপর আমি তাহাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়া'কূবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলিল, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! ইহা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তাহারা বলিল, আল্লাহ্ কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করিতেছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রহিয়াছে আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও কল্যাণ" (১১ : ৭১-৭২)।
এই আয়াতে ইসহাক জননী সারাহ্ (রা) নবী না হইলে ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁহার সহিত কথা বলা কি করিয়া সম্ভব হইবে?
অনুরূপ দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ)-কে মারয়াম (আ)-এর নিকট পাঠাইলেন এবং তিনি মারয়াম (আ)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেন: إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا . "আমি তোমার প্রতিপালক প্রেরিত তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য” (১৯: ১৯)।
এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে যে, মারয়াম (আ)-এর নিকট জিবরাঈল (আ)-এর আগমন ঘটিয়াছিল। এই প্রকৃত ওহী নবুওয়াত না হইলে নবুওয়াত বলিতে কী বুঝায়? অনুরূপ মূসা (আ)-এর মাতা সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَالْقِيْهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ.
"মূসা জননীর অন্তরে আমি ইংগিতে নির্দেশ করিলাম, শিশুটিকে স্তন্যদান করিতে থাক। যখন তুমি তাহার সম্পর্কে কোন আশংকা করিবে তখন ইহাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করিও এবং ভয় করিও না, দুঃখ করিও না। আমি অবশ্যই ইহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব এবং ইহাকে রাসূলদের একজন করিব" (২৮ঃ ৭)।
এখানে আল্লাহ তা'আলা মূসা জননীর প্রতি ওহী প্রেরণের যেই কথা ব্যক্ত করিলেন তাহা জানিয়াও কেহ কি সংশয় করিবে যে, ইহা নবুওয়াতের বিষয় নয়? সামান্যতম বিবেকবান মানুষও এই কথা উপলব্ধি করিতে পারিবে যে, আল্লাহ প্রদত্ত নবুওয়াত ব্যতীত কেহ কেবল স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে কিংবা মনের তাড়নায় এইরূপ কাজ করিতে সাহস পাইবে না। ইহা ছাড়াও মারয়াম (আ)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে তো আরও দলীল রহিয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কথা নবীগণের সহিত উল্লেখ করিবার পর ইরশাদ করিয়াছেন:
أُولئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ..
প্রতিপক্ষের একটি কথা যে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তিনি 'সিদ্দীকা'- তাঁহার এই উপাধি তাঁহার নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। যেমন সর্বজনস্বীকৃত নবী ইউসুফ (আ)-এর জন্য সিদ্দীক উপাধি তাঁহার নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। ইরশাদ হইয়াছে يُوْسُفُ أَيُّهَا الصديق সারাহ্, মারয়াম ও মূসা জননীর সহিত নবুওয়াত পদমর্যাদায় আছিয়াও সম্পৃক্ত হইয়া যাইবেন। কারণ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
كَمُل مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلا مَرْيَمُ ابْنَةُ عمران واسية.
(আবূ মুহাম্মাদ আলী ইব্‌ন আহমদ ইব্‌ন হায্য, আল ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, বৈরুত ১৯৭৫ খৃ. ৩খ., পৃ. ৫১৭; হিফজুর রহমান সিউহারূবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ., পৃ. ২৭)।
ইবন হাযম আন্দালুসীর এই দীর্ঘ বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করিতে গিয়া হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, ওহীর অভিধানিক অর্থসমূহ, যেমন ভাব, মনের ধারণা, অন্তরের উদ্রেক ও ইলহাম ইত্যাদি যদি বাদ দিয়া পারিভাষিক অর্থ যাহা আল-কুরআন নবী ও রাসূলগণের জন্য কেবল নির্দিষ্ট করিয়াছে ইবন হাম্ এই প্রসিদ্ধ অর্থ গ্রহণ করিলে ইহার দুইটি রূপ হইবে। (এক) এই ওহীর সম্পর্ক হইবে হিদায়াত, শিক্ষাদান ও আদেশ-নিষেধাবলীর সহিত। (দুই) ইহার সম্পর্ক হইবে সুসংবাদদান, ভবিষ্যতে হইবে এমন কিছু অবহিতকরণ কিংবা প্রত্যাদিষ্ট ব্যক্তির বিশেষ করিয়া কোন আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত। প্রথম প্রকার ওহীর সম্পর্ক হইল এই নবুওয়াতের সহিত যাহার সহিত রিসালাত সম্পৃক্ত। এই প্রকারের নবুওয়াত কেবল পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। এই ব্যাপারে কাহারও দ্বিমত নাই। দ্বিতীয় ধরনের ওহী ইব্‌ন হাযম ও তাঁহার অনুবর্তী উলামার মতে নবুওয়াতের একটি শ্রেণী। কারণ সূরা শূরায় নবীগণের উপর ওহী অবতীর্ণ হইবার যেই পন্থা বর্ণনা করা হইয়াছে ইহা এই ওহীর উপর আরোপিত হয়। ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَائِي حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوْحِيَ بِاذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلَى حَكِيمٌ.
"মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ তাহার সহিত কথা বলিবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে যেই দূত তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন; তিনি সমুন্নত প্রজ্ঞাময়" (৪২: ৫১)।
আল-কুরআন যখন ওহীর এই দ্বিতীয় প্রকারের প্রয়োগ সুস্পষ্ট 'নস' (نص) দ্বারা মারয়াম, সারাহ্, উম্মু মূসা (আ)-এর উপর করিয়াছে, সুতরাং এই বিদূষী মহিলাগণের বেলায় নবী শব্দের প্রয়োগ অকাট্যভাবে সহীহ। মাওলানা হিফজুর রহমান আরও বলেন, এই বিশ্লেষণ হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, স্ত্রীলোকদের নবুওয়াত লাভের অস্বীকৃতির ব্যাপারে ইমামুল হারামায়ন ইজমার যেই দাবি করিয়াছেন তাহা সহীহ নয়। তিনি বলেন, ইব্‌ন কাছীর যে এই দাবি করিয়াছেন যে, জমহুর মহিলাদের নবুওয়াত লাভের বিপক্ষে- এই কথার সহিত আমার দ্বিমত রহিয়াছে। অবশ্য বেশিরভাগ সম্ভবত পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দান করা হইতে বিরত থাকাকে পসন্দ করিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবুওয়াত ও মানবীয় সত্তা

📄 নবুওয়াত ও মানবীয় সত্তা


নবী-রাসূলগণ আল্লাহ ও তাঁহার বান্দাহগণের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র মাধ্যম। মানবজাতির প্রতি তাঁহারা আল্লাহ্র দূত। মানুষের প্রতি আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ সম্বলিত জীবনবিধান তাঁহারাই আল্লাহর নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে গ্রহণ করেন এবং মানবজাতির নিকট পৌঁছাইয়া দেন। আল্লাহ কিসে সন্তুষ্ট এবং কিসে অসন্তুষ্ট, একান্তভাবে আল্লাহ্র দাস হইয়া জীবন যাপন করার পন্থা ও পদ্ধতি কি, এই সকল কথা বান্দাদের পক্ষে অবগত হওয়া একান্তই অপরিহার্য। অন্যথায় আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়া যায়। এই কারণে আল্লাহ স্বয়ং মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্বরূপে নবী-রাসূলগণকে পাঠাইয়াছেন।
আল্লাহ্ একনিষ্ঠ বান্দা হইবার জন্য মানুষের সম্মুখে একটি আদর্শ থাকা একান্তই জরুরী যাহাকে তাহারা অনুসরণ করিবে। একজন মানুষ যখন নিজের পূর্ণাঙ্গ জীবনকে আল্লাহ্র বিধান পালনের মাধ্যমে তৈরি করে তখন সে অন্য মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হইতে পারে। সেই মানুষটিকে অনুসরণ করিয়া জনগণ আল্লাহ্র বান্দারূপে গড়িয়া উঠিতে পারেন। এইরূপ এক অনুসরণীয় আদর্শ ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিধান পালন ও আল্লাহর অনুগত বান্দারূপে গড়িয়া উঠা সম্ভব হয় না। ঠিক এই কারণেই আল্লাহ তা'আলা মানুষের মধ্য হইতেই অনুসরণীয় আদর্শরূপে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছেন। মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ একজন মানুষই হইতে পারে, ফেরেশতা বা জিন্ন হইতে পারে না। কেননা ফেরেশতা ও জিন্নরা প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ হইতে সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা জিন্ন বা ফেরেশতাকে নবী-রাসূল বানাইয়া পাঠান নাই।
কিন্তু কাফিররা এই তত্ত্ব বুঝিতে পারে নাই। তাহারা মনে করে, মানুষ কি করিয়া আল্লাহ্র নবী বা রাসূল হইতে পারে? তাহাদের ধারণা, জিন্ন বা ফেরেশতাই আল্লাহর নবী বা রাসূল হইতে পারেন। আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরদের এই ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ مَلَكٌ وَلَوْ أَنْزَلْنَا مَلَكًا لَّقُضِيَ الْأَمْرُ ثُمَّ لَا يُنْظُرُونَ. وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلاً وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِمْ مَا يَلْبِسُونَ. (الانعام اية ٨-٩)
"তাহারা বলে, তাহার নিকট কোন ফেরেশতা কেন প্রেরিত হয় নাই? যদি আমি ফেরেশতা প্রেরণ করিতাম তাহা হইলে চূড়ান্ত ফয়সালাই তো হইয়া যাইত, আর তাহাদিগকে কোন অবকাশ দেওয়া হইত না। যদি তাহাকে ফেরেশতা করিতাম তবে তাহাকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করিতাম, আর তাহাদিগকে সেরূপ বিভ্রমে ফেলিতাম যেরূপ বিভ্রমে তাহারা এখন রহিয়াছে" (৬:৮-৯)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরবিদ ফাখরুদ্দীন রাযী বলেন, নবুওয়াত যাহারা অস্বীকার করে তাহাদের ইহা তৃতীয় অভিযোগ। তাহাদের অভিযোগের সারকথা হইল, আল্লাহ যদি সৃষ্টি জগতের প্রতি নবী-রাসূল প্রেরণ করিতেন তাহা হইলে নিশ্চয় সেই নবী ফেরেশতাদের একজন হইতেন। কারণ নবী-রাসূলগণ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে মনোনীত হইলে তাহারা প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী হইতেন, তাহাদের শক্তি-সামর্থ্য বেশী হইত, তাহারা মহান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হইতেন, সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাহারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হইতেন ইত্যাদি। ফেরেশতাদের মধ্যে নবুওয়াত প্রদানে যেখানে সন্দেহে পতিত হইবার সম্ভাবনা কম সুতরাং নবী প্রেরণ করিলে তাহাদের হইতে কোন একজনকে মনোনীত করা আবশ্যক ছিল। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের এই অভিযোগের জওয়ার দুই ভাবে দান করিয়াছেন।
একটি হইল لَوْ أَنْزَلْنَا مَلَكًا لَقُضِيَ الْأَمْرُ অর্থাৎ মানুষের উপর ফেরেশতাকে অবতরণ করা হইল একটি মহান নিদর্শন। এই মহান নিদর্শন নাযিল করিবার পরও যদি অবিশ্বাসিগণ ঈমান গ্রহণ না করে তাহা হইলে সমূলে ধ্বংস হইয়া যাওয়া তাহাদের জন্য অনিবার্য হইয়া যাইবে। কারণ আল্লাহর বিধান হইল, মহান নিদর্শন প্রকাশ হইবার পরও যাহারা ঈমান আনে না তাহাদের উপর চরম শাস্তি আপতিত হওয়া। এই কারণে আল্লাহ্ তাহাদের প্রতি কোন ফেরেশতা প্রেরণ করেন নাই যাহাতে অস্বীকার করার মাধ্যমে তাহারা শাস্তির উপযুক্ত না হয়।
দ্বিতীয় কারণটি হইল, মানবজাতি যখন ফেরেশতাকে অবলোকন করিত তখন হয়ত তাহাকে আসল অবয়বে দেখিতে পাইত কিংবা মানব আকারে দেখিত। ফেরেশতাকে আসল অবয়বে দেখিবার পর মানুষ জীবিত থাকিত না। যেমন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) যখন জিবরাঈল (আ)-কে তাঁহার স্বীয় আকৃতিতে দেখিয়াছিলেন তখন তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছিলেন। আর যদি ফেরেশতাকে মানব আকারে দেখে তাহা হইলে মানুষ আর ফেরেশতার মধ্যে পার্থক্য রহিল কোথায়? মানব আকৃতিতে ফেরেশতাকে নবী বানানো আর স্বয়ং মানুষের মধ্য হইতে কাহাকেও নবী বানানোর মধ্যে কোন তফাৎ নাই।
এই সম্পর্কে'সীরাতুন নবী' গ্রন্থে বলা হইয়াছে, নবী যিনি হইয়া থাকেন তাঁহার কতক গুলি পবিত্র বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামের শিক্ষা হইল: নবী আল্লাহ্ মাখলুক, তাঁহার বান্দা এবং তিনি মানুষই হইয়া থাকেন। তিনি আল্লাহ্র অবতার, দেবতা কিংবা ফেরেশতা নহেন। ইসলামের পূর্বে ইয়াহুদীদের এমন একদল লোক ছিল যাহারা নবীগণকে কেবল একজন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা মনে করিত। ইহা ব্যতীত অন্যান্য সকল পর্যায়ে তাঁহাদেরকে তুচ্ছ মানুষ মনে করিত। ইহারা এই বিশ্বাস রাখিত যে, নবীগণ সর্বপ্রকার পাপকার্যে লিপ্ত হইতেন, দুশ্চরিত্রতা তাঁহাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকিত। কোন কোন সময় তাহারা কুফরী কাজ করিয়াও বসিতেন। এত কিছুর পরও তাঁহাদেরকে নবী মনে করা হইত।
অন্যদিকে খৃস্টানরা তাহাদের মুক্তিদাতাকে মানবতার গন্ধ হইতে পবিত্র, এমনকি তাহাদেরকে প্রভু বা প্রভুর অংশবিশেষ মনে করিত। হিন্দুরাও তাহাদের পথপ্রদর্শকদেরকে দেবতা, অবতার এবং মানবরূপী প্রভু মনে করিত।
ইসলাম ধর্ম এই সকল মতবাদে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করিয়াছে। ইসলামের শিক্ষা হইল: একদিক দিয়া নবীগণ হইলেন মাখলুক, মানব, আল্লাহর বান্দা এবং তাঁহার নিকট সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণকারী। কিন্তু অন্য দিক দিয়া তাঁহারা আল্লাহর মনোনীত মা'সূম (নিষ্পাপ), পূত ও পবিত্র এবং তাঁহারই করুণা লাভের দ্বারা পুণ্য এবং হিদায়াতের চালিকাশক্তি। আল্লাহ্ই অনুগ্রহে তাঁহারা এমন সব কাজ সমাধা করিতে পারেন যাহা অন্যদের পক্ষে কল্পনাই করা যায় না। আরববাসীরা হিন্দু, গ্রীক ও খৃস্টানদের ন্যায় এই আকীদা পোষণ করিত যে, মানবজাতির হিদায়াতের জন্য মানুষের মধ্য হইতে কোন লোককে নবী বানাইলে তাহা যথার্থ হইবে না, বরং মানুষের ঊর্ধ্বের কোন সত্তার প্রয়োজন। সেই সত্তাটি হইবে একমাত্র ফেরেশতাদের মধ্য হইতে। আল-কুরআন তাহাদের উক্ত আকীদাকে স্থানে স্থানে ভ্রান্ত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। বলা হইয়াছে, যদি পৃথিবীতে ফেরেশতাগণ বসবাস করিত, তাহা হইলে কোন ফেরেশতাকে তাহাদের মধ্যে নবী-রাসূল বানাইয়া প্রেরণ করা হইত। আর যদি মানবজাতির মধ্যে ফেরেশতা নবী হিসাবে আগমন করিতেন তাহা হইলে মানবরূপেই আসিতেন। যদি এমন হইত তাহা হইলে তোমরা এই ফেরেশতাকে কি করিয়া ফেরেশতা হিসাবে মান্য করিতে? সারকথা, নবীগণের দুইটি দিক রহিয়াছে। একটি হইল, তাঁহারা মানুষরূপেই আবির্ভূত হইতেন, মানুষের মতই পানাহার করিতেন, হাটা-চলা, নিদ্রা-অনিদ্রা, বিবাহ-শাদী ও জীবন-মরণ সবকিছুই মানুষের ন্যায় হইত। দ্বিতীয়টি হইল, তাঁহারা আধ্যাত্মিকতা, নিষ্পাপতা, পবিত্রতা ও নবুওয়াতের অনুপম আদর্শের ফলে মানবকুল হইতে বহু ঊর্ধ্বে অবস্থান করিতেন। ইহার ফলে যাহারা ইয়াহুদীদের মত নবীগণের মানব হইবার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতেন তাহারা তাঁহাদিগকে সর্বক্ষেত্রে সামান্য মানুষ মনে করিতেন। অপরদিকে খৃস্টানদের মত যাহারা তাঁহাদের সাধারণ মানবতার ঊর্ধ্বের বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতি দৃষ্টি দিতেন তাহারা উহাদের মধ্যে প্রভুত্বের গুণাবলী প্রমাণ করিতে ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িতেন।
নবুওয়াতের প্রকৃত মাকাম কিন্তু এই দুইয়ের মাঝামাঝি। মানবিক গুণাবলীর প্রেক্ষিতে নিসন্দেহে তাঁহারা মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে তাঁহারা সাধারণ মানবিক গুণাবলী হইতে অজস্র গুণ ঊর্ধ্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তাঁহারা মানবতার উপরের স্তরের মানব। এই কারণেই অবিশ্বাসীরা, বিভিন্ন সময়ে প্রেরিত নবীগণ যখন তাহাদেরকে স্বীয় নবুওয়াত ও আল্লাহ্র পথে আহবান জানাইতেন, তখন তাহারা নবীগণের মানবিক গুণাবলী দেখিয়া বলিত, আপনারা তো আমাদের মতই মানব। তাই আপনারা কেমন করিয়া আল্লাহ্র নবী বা দূত হইতে পারেন? আল্লাহ তা'আলা অবিশ্বাসীদের এই অভিযোগ এইভাবে উত্থাপন করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَّسُولاً (الاسراء - ٩٤ ).
"যখন উহাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকদিগকে ঈমান আনা হইতে বিরত রাখে উহাদের এই উক্তি: আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন" (১৭:১৪)।
অবিশ্বাসিগণ মানব হওয়াকে রিসালাতের পরিপন্থী মনে করিত। ইহার জাওয়াবে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নিম্নোক্ত নির্দেশ দেন:
قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلا بَشَرًا رَّسُولاً (الاسراء - ٩٣)
"বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭: ৯৩)।
অবিশ্বাসিগণের এই ব্যাপারে সংশয় ছিল যে, পথহারা মানবজাতিকে কোন মানুষ কি পথ প্রদর্শন করিতে পারিবে? আল-কুরআনে তাহাদের অভিযোগ এইভাবে উত্থাপিত হইয়াছে:
ذَلِكَ بِأَنَّهُ كَانَتْ تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالُوا أَبَشَرٌ يَهْدُونَنَا فَكَفَرُوا وَتَوَلَّوا وَاسْتَغْنَى اللهُ وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَمِيدٌ (التغابن - ٦ ) .
"উহা এইজন্য যে, উহাদের নিকট উহাদের রাসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিত তখন উহারা বলিত, মানুষই কি আমাদিগকে পথের সন্ধান দিবে? অতঃপর উহারা কুফরী করিল ও মুখ ফিরাইয়া লইল। কিন্তু ইহাতে আল্লাহ্ কিছু আসে যায় না; আল্লাহ্ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ" (৬৪:৬)।
এই সংশয়ে পতিত হইয়া খৃস্টানগণ হযরত 'ঈসা (আ)-এর 'মানব' হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করিয়া বসিল। তাহাদের যুক্তি ছিল, উত্তরাধিকার সূত্রে যেই মানবজাতি পাপী-তাপী তাহাদেরকে মানব সন্তান কিভাবে মুক্তি দিতে পারিবে? তাহাদের এই ধারণা যথার্থ ছিল না। কারণ মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাপাচারী নহে। তাহাদের মধ্যে যেমন পাপী-তাপী রহিয়াছে, তেমনি নিষ্পাপ লোকও রহিয়াছে। নিষ্পাপ হইবার জন্য মানবতার ঊর্ধ্বের হওয়া জরুরী নয়। অবিশ্বাসিগণ এই বিষয়টি উপলব্ধি করিতে পারে নাই। তাহারা নবীগণকে রক্তে মাংসে নিজেদের মত মানুষ ভাবিয়া তাহাদেরকে নবুওয়াত লাভের অনুপযুক্ত ভাবিত। ইরশাদ হইয়াছে:
قَالُوا إِنْ أَنْتُمْ إِلا بَشَرٌ مِثْلُنَا (ابراهيم - ١٠) .
"উহারা বলিত, তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ” (১৪: ১০)। তাহারা অন্যান্য লোকদিগকে ও নবীকে অস্বীকার করিবার জন্য এই কথা দিয়া উদ্বুদ্ধ করিত। তাহাদের উক্তি ছিল:
هَلْ هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ (الانبياء - ٣) .
"সে তো তোমাদের মত একজন মানুষই” (২১ঃ ৩)।
فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَأَنْزَلَ مَلَائِكَةً ( المؤمنون - ٢٤ ) .
"তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল, তাহারা (লোকদিগকে) বলিল, সেতো তোমাদের মত একজন মানুষই, তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে চাহিতেছে; আল্লাহ ইচ্ছা করিলে একজন ফেরেশতাই পাঠাইতেন” (২৩ঃ ২৪)।
وَقَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ الَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِلِقَاءِ الْآخِرَةِ وَأَتْرَفْتُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا مَا هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُوْنَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُونَ ( المؤمنون - ٣٣) .
"তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল ও আখিরাতের সাক্ষাৎকার অস্বীকার করিয়াছিল এবং যাহাদিগকে আমি দিয়াছিলাম পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগসম্ভার, তাহারা বলিয়াছিল, সেতো তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা যাহা আহার কর, সে তাহাই আহার করে এবং তোমরা যাহা পান কর, সেও তাহাই পান করে" (২৩: ৩৩)।
অবিশ্বাসিগণ নবীদের উপর ঈমান না আনার উদ্দেশ্যে তাঁহাদের আহবানের জবাবে ।مَا أَنْتَ الأَبَشَرُ مِثْلُنَا - (شعراء - ٢٦:١٥٤)- “তুমি তো আমাদের মতই একজন মানুষ” (২৬:১৫৪) : قَالُوا مَا أَنْتُمْ الأَ بَشَرٌ مِّثْلُنَا - (يس-١٠) “উহারা বলিল, তোমরা আমাদরে মতই মানুষ" (ইয়াসীন ১৫)। مَا نَرَاكَ الأَبَشَرًا مِّثْلُنَا (হুদ - ২৭) “আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ব্যতীত কিছু দেখিতেছি না” (১১: ২৭)। নবীগণ তাহাদের অভিযোগের জবাবে সব সময় ইহাই বলিতেন, হাঁ, আমরা তোমাদের ন্যায় অবশ্যই মানুষ। তবে আমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও কৃপালাভের মাধ্যমে ধন্য। প্রকৃতপক্ষে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে তফাৎ এখানেই। আল-কুরআনের ভাষায়: قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَّحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ (ابراهيم ٦١).
"উহাদের রাসূলগণ উহাদিগকে বলিত, সত্য বটে, আমরা তোমাদের মত মানুষই। কিন্তু আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন" (১৪:১১)।
"অবিশ্বাসিগণের দৃষ্টি ছিল নবীগণের স্বাভাবিক 'মানব হওয়ার' দিকে। নবীগণ উত্তরে তাহাদের অভিযোগকে মানিয়া তাঁহারা যে অপর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইহার কথাও বলিয়া দিলেন। তাঁহারা বলিলেন, আমরা মানুষ বটে, তবে এমন মানুষ যাহাদের উপর আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও অনুকম্পার বারি বর্ষিত হইয়াছে, যাঁহাদেরকে নবুওয়াতের দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করা হইয়াছে। অন্যান্য নবীগণের মত খাতিমু'ল আম্বিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-ও এই কথাই বারংবার ইরশাদ করিয়াছেন। কথাটি মূলত আল্লাহ তা'আলাই ওহীর মাধ্যমে তাঁহার দ্বারা ব্যক্ত করাইয়াছেন যে, "আপনি বলিয়া দিন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ"। তাঁহার এই ঘোষণা আসলে সেই ভ্রান্ত আকীদার মূলোৎপাটনের জন্য ছিল যাহা নবীগণ সম্পর্কে খৃস্টানগণ পোষণ করিত। উহারা নবীগণকে আল্লাহ্র মর্যাদায় সমাসীন মনে করিত। ইহার প্রভাব সাময়িক কালের কিছু লোকের মধ্যেও পড়িয়াছিল। অপরদিকে এই ঘোষণা হইতে সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন একদল লোক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, নবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন তফাৎ নাই। সাধারণ মানুষের উপর তাঁহাদের কোন উচ্চ মর্যাদাও নাই। হাঁ, তবে তাহাদের উপর ওহী আসিত যাহা সাধারণ মানুষ লাভ করিতে পারে নাই। তাহাদের কথার সার ছিল এই যে, নবী কেবল ওহী আসার সময় নবুওয়াতের মর্যদা লাভ করিতেন। ওহী আসার পূর্বে বা পরে তাহারা সাধারণ মানুষ হইয়া যান। ক্ষুদ্র একটি দল আরও কিছু অগ্রসর হইয়া এই দাবি উত্থাপন করিল যে, মুহাম্মাদ (স)-এর উপর কুরআনরূপে যেই ওহী আসিত কেবল তাহাই নবীর আদেশ-নিষেধ। ইহা ব্যতীত আল-কুরআনের আয়াত ভিত্তিক নয় এমন সকল আদেশ-নিষেধকে তাহারা তাঁহার বিবেচনামূলক ও শান্তি-শৃংখলাজনিত আদেশ বলিয়া মনে করে। এই সম্পর্কে তাহারা বলে যে, ইহা ইসলামী বিধান নয়, এমনকি তাহা ইসলামের অনুসরণীয় অংশবিশেষও নয়। এই ধারণার সূত্রপাত হইয়াছে মূলত নবুওয়াত সম্পর্কে যাহারা অযৌক্তিক সীমাহীন উচ্চ ধারণা পোষণ করেন তাহাদের প্রতিরোধে। তবে ইহাও নবুওয়াতের মর্যাদাকে তুচ্ছ জ্ঞান করামূলক একটি ভ্রান্ত ধারণা। বস্তুত এতদুভয়ের মাঝখানেই রহিয়াছে নবুওয়াতের প্রকৃত হাকীকত বা মর্যাদা।
আবদুল করীম আল-খাতীব বলেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী যদি নবী বা রাসূল ফেরেশতাদের মধ্য হইতে হইতেন তাহা হইলে তাঁহার সহিত মানবজাতির কোন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হইত না। তাহাদের কোন কল্যাণও হইত না। পক্ষান্তরে তাহারা ধোকাগ্রস্ত হইত এবং নবুওয়াত সম্পর্কে অমনোযোগী হইয়া পড়িত। ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَّسُولًا، قُلْ لوكَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولاً. "যখন উহাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকদিগকে ঈমান আনা হইতে বিরত রাখে তাহাদের এই উক্তিঃ আল্লাহ্ কি মানুষকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন? বল, ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হইয়া পৃথিবীতে বিচরণ করিত তবে আমি আকাশ হইতে উহাদের নিকট অবশ্যই ফেরেশতা রাসূল করিয়া পাঠাইতাম" (১৭: ৯৪-৯৫)।
আবদুল কারীম আল-খাতীব আরও বলেন, ফেরেশতাদের অবস্থান মানুষের মধ্যে কিভাবে শান্তিপূর্ণ হইবে? কারণ পরীক্ষা করার সময় ব্যতীত অন্য কোন সময়ে ফেরেশতার মানব সমাজে স্বরূপে প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়। আর যখনই আসলরূপে ফেরেশতা মানব সমাজে আবির্ভূত হইবেন তখন মানবজাতি তাহার প্রতি এমনভাবে ধাবিত হইবে যেভাবে কীট-পতঙ্গ আলোর দিকে ধাবিত হয়। অনুরূপ যদি ফেরেশতা মানবাকৃতিতে আবির্ভূত হন তখনও মানব সংস্কৃতি সঠিকভাবে পরিচালিত হইবে না। কেননা মানবরূপী ঐ ফেরেশতা মানব মনের সন্দেহপ্রবণতা যে, মানুষ কি রাসূল হইতে পারেন-দূরীভূত করিতে পারিবেন না। কারণ এই অবস্থায় তাঁহাকে মানুষই গণ্য করা হইবে। এই নির্বোধসুলভ সন্দেহকে আল-কুরআন এইভাবে খণ্ডন করিয়াছে:
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلاً وَالْبَسْنَا عَلَيْهِمْ مَا يَلْبِسُونَ. "যদি তাহাকে ফেরেশতা করিতাম তবে তাহাকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করিতাম, আর তাহাদিগকে সেইরূপ বিভ্রমে ফেলিতাম যেরূপ বিভ্রমে তাহারা এখন রহিয়াছে” (৬:৯)।
অর্থাৎ ফেরেশতাগণ যদি মানব সমাজে রাসূল বা নবী হিসাবে প্রেরিত হইতেন তাহা হইলে তাহারা মানবরূপেই আবির্ভূত হইতেন। কারণ তাহারা স্বরূপে আবির্ভূত হইলে মানব সমাজে তাঁহার অবস্থান শান্তিপূর্ণ হইত না। আর মানবরূপে তাঁহাদের আগমন মানব সমাজে কোন পৃথক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির সহায়ক নয়। সুতরাং নবী-রাসূল ফেরেশতাদের মধ্য হইতে হইবার দাবি যৌক্তিক নয়। নবী-রাসূলগণের মানব হওয়ার বিষয় আলোচনার পর আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মاد (স) সম্পর্কে আল-কুরআনের বর্ণনা আলোচনা করা যায়। আল-কুরআনের তিনটি স্থানে স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ দিয়া তাঁহার মানব হওয়ার কথা ব্যক্ত করা হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ তাওহীদ এবং রাসূলও যে আল্লাহর বান্দা সেই কথা ব্যক্ত করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
"বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক! আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল। যখন উহাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকদিগকে ঈমান আনা হইতে বিরত রাখে উহাদের এই উক্তিঃ আল্লাহ্ কি মানুষকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন" (১৭: ৯৩-৯৪)।
আল্লাহ্র নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (স) হইতে অলৌকিক ঘটনাবলীও প্রকাশ লাভ করিয়াছিল। এই ঘটনাবলীর অলৌকিকত্ব অবিশ্বাসীরা স্বীকারও করিয়াছিল। এতদসত্ত্বেও তাহারা এই ধারণা পরিহার করিতে পারে নাই যে, মানুষ কিভাবে রাসূল হইতে পারেন। অবিশ্বাসীরা অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া বলিল:
هَلْ هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ. "সে তো তোমাদের মত একজন মানুষই, তবুও কি তোমরা দেখিয়া শুনিয়া জাদুর কবলে পড়িবে?” (২১:৩)।
অলৌকিক ঘটনাবলীর অস্বাভাবিকতাকে অবিশ্বাসীরা জাদু বলিয়া চালাইয়া দিল। তাহার পরও 'মানব হওয়া নুবুওয়াতের পরিপন্থী' এই বিশ্বাসে তাহারা স্থির থাকিল। অতঃপর তাহাদিগকে বলা হইল নবুওয়াত ও রিসালাত সম্পর্কে তোমাদের পূর্বসূরী ইয়াহুদীরা অধিক অবহিত। সুতরাং এই সম্পর্কে তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লও। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ فَسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষ মানুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদিগকে জিজ্ঞাসা কর" (২১ঃ ৭)।
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى. "তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হইতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম, যাহাদের নিকট ওহী পাঠাইতাম" (১২: ১০৯)।
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ فَسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ. بالبَيِّنَتِ وَالزُّبُرِ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞাসা কর- প্রেরণ করিয়াছিলাম স্পষ্ট প্রমাণাদি ও গ্রন্থাবলীসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিয়াছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝাইয়া দিবার জন্য যাহা তাহাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হইয়াছিল, যাহাতে উহারা চিন্তা করে" (১৬ঃ ৪৩-৪৪)।
মাওলানা আবুল আলা মওদুদী বলেন, সর্বকালের অজ্ঞ লোকেরা এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হইয়াছিল যে, নবীর পক্ষে মানব হওয়া কোন সময়ই সম্ভব হইতে পারে না। নবীর আগমন হইলেই তাহারা বলিত, যেই লোক আহার করেন, পান করেন, সন্তান-সন্ততি জন্ম দেন, রক্তমাংস দ্বারা গঠিত, তিনি কি করিয়া নবী হইতে পারেন? তিনি তো নবী নহেন, তিনি একজন মানব। তাঁহার ইন্তিকালের কিছুকাল পর আবার আরও একটি দর্শনের উদ্ভব ঘটাইত। বলিত, তিনি তো মানব ছিলেন না, তিনি ছিলেন বার্তাবাহক। এই চিন্তাধারা হইতে কেহ কেহ নবীকে প্রভু জ্ঞান করিত, কেহ বলিত আল্লাহ্ পুত্র, আবার কেহ কেহ এই ধারণায় উপনীত হইত যে, তিনি প্রভুর অবতার। মোটকথা, একটি সত্তায় নবুওয়াত ও মানবতার সমাবেশ ঘটিতে পারে, এই কথা মূর্খরা উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইত না।
আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাবের পর মক্কার অবিশ্বাসীদের নিকটও এই কথা আজগুবি মনে হইয়াছিল যে, মানুষ কিভাবে রাসূল হইতে পারে। আল্লাহ্ বাণী আসিতে হইলে ফেরেশতার মাধ্যমেই আসা বাঞ্ছনীয় ছিল। একান্ত যদি মানিয়া লওয়া হয় যে, মানুষই নবী, তাহা হইলে ন্যূনপক্ষে রাজা-বাদশাহ কিংবা জগতিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিত্বকে এই পদে আসীন করা উচিৎ ছিল। তাহাদের এই অভিযোগকে আল-কুরআনে এইভাবে বলা হইয়াছে:
وَقَالُوا مَا لِهَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ. "উহারা বলে, সে কেমন রাসূল যে, আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফিরা করে" (২৫:৭)।
জাগতিক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কাহাকেও নবী বানানো হইল না কেন? অবিশ্বাসীদের এই অভিযোগ আল-কুরআন এইভাবে ব্যক্ত করিয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ. "এবং ইহারা বলে এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর" (৪৩: ৩১)।
এখানে দুইটি জনপদ বলিতে মক্কা ও তাইফকে বুঝানো হইয়াছে। যখন তাহারা প্রথমদিকে এই কথা স্বীকার করিতে রাজী ছিল না যে, কোন মানুষ নবী হইতে পারেন। কিন্তু যখন এই ব্যাপারে আল-কুরআনে একের পর এক দলীল পেশ করা হইতে লাগিল তখন তাহারা স্বীয় দাবির অসারতা সম্পর্কে অবগত হইয়া আয়াতে বর্ণিত নূতন অভিযোগ উত্থাপন করিল, যাহার সারকথা ছিল, মক্কায় রহিয়াছে ওয়ালীদ ইব্‌ন মুগীরা এবং 'উতবা ইব্‌ন আব্দ রাবীআ। অনুরূপ তাইফেও রহিয়াছে উরওয়া ইবন মাসউদ, হাবীব ইব্‌ন আমর, কিনানা ইবন 'আমর প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। এমতাবস্থায় কি করিয়া এমন এক ব্যক্তিকে নবী মনোনীত করা হইল যিনি ইয়াতীম হিসাবে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, যিনি কোন সম্পত্তির অধিকারী নহেন।
মোটকথা, আদি পিতা আদম (আ) হইতে সকল নবী-রাসূলই মানব ছিলেন। কিন্তু নির্বোধ লোকেরা যুগে যুগে তাহাদের মানব হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছিল। মহান আল্লাহ তাহাদের অভিযোগকে সর্বকালেই প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তবে তাঁহাদের এই মানব হওয়ার সম্পর্ক ছিল দেহ, আকৃতি ও সৃষ্টির দৃষ্টিকোণ হইতে। এই সম্পর্কে শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী বলেন, আয়াতগুলিতে নবী-রাসূলগণ সম্পর্কে যে বলা হইয়াছে, 'তাঁহারা তোমাদের মত মানুষ', ইহার অর্থ হইল এই সাদৃশ্য ও মানবতার সম্পর্ক হইল বাহ্যিক অবয়ব, দৈহিক শক্তি এবং সৃষ্টিগত দিক দিয়া। অপরদিকে চারিত্রিক, আত্মিক, আন্তরিক, জ্ঞান ও কার্যক্রমের দিক দিয়া একজন নবীর সহিত অন্য কাহারও তুলনা করা যায় না। নবী ও অ-নবীর মধ্যে কেবল ওহী আসা না আসার তফাৎ, এই কথা কস্মিন কালেও সঠিক নয়। যদি কেহ মনে করে সকল দোষ-গুণ ও পূর্ণতার ব্যাপারে নবী সাধারণ মানুষের মতই, তাহা হইলে তাহার এই কথা হইবে ঐ লোকের উক্তির মত যে বলে, জ্ঞানী লোক ও মূর্খের মধ্যে কেবল জ্ঞানেরই তফাৎ, অন্যথায় তাহারা উভয়ই সমান মানুষ; জ্ঞান ব্যতীত তাহাদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি, চরিত্র, তাহযীব, কর্মদক্ষতা, প্রতিভা ও কৌশলগত কোন পার্থক্য নাই। এই কথা কি বাস্তবসম্মত হইবে? আবার মানুষের জন্য এখন কোন এক স্তরে উন্নতির চরম সোপানে উন্নীত হওয়া অসম্ভব নয়। কোন ব্যক্তি যদি দেহ-অবয়বে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও অন্য কোন প্রতিভা গুণে অনুরূপ কোন কিছু অর্জন করে তাহা হইলে অবশ্যই সে মহান এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্যক্তি। কেহ কি এই কথা বলিতে পারিবে ইরানী বীর রুস্তম মানুষ ছিলেন না, জ্ঞান-গরীমার মূর্ত প্রতীক গ্রীসের এরিস্টোটল মানবতার ঊর্ধ্বে ছিলেন, আধুনিক বিশ্বের বিস্ময়কর সৃষ্টিসমূহের আবিষ্কারকগণ মানুষ নহেন? হাঁ, তাহারাও মানুষ। তবে স্ব-স্ব উচ্চাসনে সমাসীন হইবার পরও তাহারা চলাফিরা, উঠাবসা, খানাপিনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানুষ। এক অর্থে ইহা নবীগণের উদাহরণ। নবীগণ অনেক অনেক মানবিক গুণে মণ্ডিত হইবার পরও ওহী এবং ইহার বৈশিষ্ট্যের দরুন মানুষ হইতে স্বাতন্ত্র্য মণ্ডিত, উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে মানবিক বৈশিষ্ট্যাবলীরও ঊর্ধ্ব। রাসূলুল্লাহ (স) একাদিক্রমে সাহরী-ইফতারবিহীন সওমে বিসাল (কিছু পানাহার না করিয়া একাধারে কয়েক দিনের রোযা) রাখিতেন। ইহা দেখিয়া কোন কোন সাহাবী কয়েক দিন এইরূপ পরপর রোযা রাখিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে ইহা হইতে বারণ করিয়া বলিলেন:
أَيُّكُمْ مِثْلِي أَبِيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيُسْقِينِي (بخارى كتاب الصوم)
"তোমাদের মধ্যে আমার মত কে আছে? আমি যখন রাত্রি যাপন করি তখন আমাকে আমার রব পানাহার করান"।
এখানে ওহী ছাড়াও ভিন্ন কারণে নবীর সহিত পার্থক্য নির্দেশ করা হইয়াছে। অনুরূপ নিদ্রাবস্থায় নবীর অন্তর ও তাঁহার অনুভূতিসমূহ নিষ্ক্রিয় হয় না। সহীহ হাদীছে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন:
عَيْنَايَ تَنَامُ وَقَلْبِي يَقْضَانٌ وَكَذَالِكَ الْأَنْبِيَاءُ تَنَامُ أَعْيُنُهُمْ وَلَا تَنَامُ قُلُوبُهُمْ.
"আমার চক্ষুদ্বয় নিদ্রা যায় এবং অন্তর জাগ্রত থাকে। অনুরূপ অন্যান্য নবীগণের চক্ষুসমূহ নিদ্রা যায় কিন্তু তাঁহাদের অন্তরসমূহ ঘুমায় না"।
সাধারণ মানুষের ঘুমের অবস্থা কি ইহার সহিত তুলনীয়? রাসূলুল্লাহ (স)' সাহাবীগণকে নামাযের কাতারে সোজা করিবার জন্য অত্যন্ত জোর তাগিদ দিতেন। বলিতেন, "আমি সম্মুখ দিয়া যেইভাবে তোমাদের দেখিতে পাই, অনুরূপ পিছন দিক দিয়াও দেখি"। সাধারণ মানুষের সেইরূপ দেখিবার কি সাধ্য আছে? আর কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى.
"সে (নবী) যাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছে তোমরা কি সে বিষয়ে তাহার সঙ্গে বিতর্ক করিবে” (৫৩ঃ ১২)।
وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِيْنِ.
"তিনি তো তাহাকে (ফেরেশতা) স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছেন" (৮১: ২৩)।
সাধারণ মানুষ কি ইহা প্রত্যক্ষ করিতে পারে? রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সম্পর্কিত হইবার ফলে তাঁহার সহধর্মিনিগণ বিশেষ সম্মান লাভ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা মু'মিন জগতের এই মাতাগণকে সম্বোধন করিয়া ইরশাদ করিয়াছেন:
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ (احزاب ٣٢) .
"হে নবীর পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নহ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর" (৩৩: ৩২)।
নবীর স্ত্রীগণ যখন তাকওয়া অবলম্বনের পর সাধারণ মহিলাদের মত থাকেন না, তখন স্বয়ং নবীর স্তর ইহা হইতে কত গুণ ঊর্ধ্বে তাঁহা সহজেই অনুমেয়।
এই ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) যাহা বলিয়াছেন তাহা পর্যালোচনা করা যায়। রাফি'ইবন খাদীজ (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের একটি অংশ নিম্নরূপঃ فَقَالَ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ رَأْيِي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ - (رواه مسلم كتاب الفضائل باب امثال ما قاله شرعا دون ما ذكره معايش الدنيا على سبيل الرائي).
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি নিশ্চয়ই মানুষ। আমি যখন তোমাদেরকে তোমাদের দীন সংক্রান্ত কোন বিষয়ের আদেশ করিব তখন তোমরা তাহা গ্রহণ করিবে। পক্ষান্তরে যখন আমার নিজস্ব অভিমতে কোন বিষয়ে আমি তোমাদেরকে আদেশ করিব, তখন কেবলই আমি একজন মানুষ” (মুসলিম, ২খ, পৃ. ২৬৪)। অপর একটি হাদীছে বর্ণিত আছেঃ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ أَنْسى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيْتُ فَذَكَرُونِي (رواه مسلم باب السهو ).
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "আমি হইলাম একজন মানুষ। তোমরা যেইভাবে বেখবর হইয়া থাক সেইভাবে আমিও বেখবর হই। আমি বেখবর হইয়া পড়িলে তোমরা আমাকে স্মরণ করাইয়া দিও" (মুসলিম, ১খ, পৃ. ২১২)।
নবী-রাসূলগণের মানুষ হওয়া সম্পর্কে আকাইদ গ্রন্থে বলা হইয়াছে: فَالرَّسُولُ بَشَرٌ نَشَأَ بَيْنَ قَوْمٍ عَرَفُوا أَحْوَالَهُ فِي صِغْرِهِ وَكَبْرِهِ.
"রাসূল একজন মানুষ, যিনি এমন এক সম্প্রদায়ে প্রতিপালিত হইয়াছেন যাহারা তাঁহার শিশুকাল ও বৃদ্ধকাল সম্পর্কে অবগত রহিয়াছে"।
এই সম্পর্কে সায়ফুল্লাহ্ হাশিমী বলেন, আশা'ইরা ও হানাফীদের অভিমত হইল, নবীগণের মানব হওয়া অকাট্য (কত্বয়ী) দলীল-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত, যাহা অস্বীকার করা উম্মতের ঐক্যমতে কুফরী। ইয়াহুদী, খৃস্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হইয়া কেহ যদি কোন নবী বা রাসূলকে দাতা মা'বৃদ স্বীকার করে তাহা হইলে আশ'আরী ও হানাফী মতে সে এক মুহূর্তের জন্যও মুসলমান থাকিবে না। অতঃপর সায়ফুল্লাহ হাশিমী বলেন, রাসূলের মানব হওয়াকে অস্বীকার করা একটি মেয়েলী স্বভাব। কারণ যুলায়খা তাহার সম্পর্কে প্রচারিত অভিযোগ খণ্ডন করিবার জন্য যখন ইউসুফ ('আ)-কে শহরের মহিলাগণের সম্মুখে উপস্থিত করিয়াছিল তখন ঐ মহিলারা বলিয়া উঠিল:
حَاشَ لِلَّهِ مَا هُذَا بَشَرًا إِنْ هُذَا إِلَّا مَلَكَ كَرِيمٌ. "অদ্ভূত আল্লাহ্ মাহাত্ম্য! সেতো কোন মানব নহে, সে একজন অতি মহিমান্বিত ফেরেশতা”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসমাতে আম্বিয়া

📄 ইসমাতে আম্বিয়া


নবুওয়াত হইল সর্বোচ্চ পদমর্যাদা। নবুওয়াতের বড় একটি দিক হইল যাঁহারা এই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন তাঁহারা ছিলেন নিষ্পাপ (মা'সূম) অর্থাৎ ইসমাতের অধিকারী। ইসমাত আরবী শব্দ। শাব্দিক অর্থ রক্ষা করা, বারণ করা। عَصَمْتُهُ عَنِ الطَّعَامِ "আমি তাহাকে খাদ্য গ্রহণ হইতে বারণ করিয়াছি" عَصَمْتُهُ عَنِ الْكَذَّبِ "আমি তাহাকে মিথ্যা বলা হইতে বারণ করিয়াছি"। ইসলামী শরীয়াতে ইসমাত বলা হয়:
حِفْظُ اللَّهِ لِأَنْبِيَائِهِ وَرُسُلِهِ عَنِ الْوُقُوعِ فِي الذُّنُوبِ وَالْمَعَاصِي وَارْتِكَابِ الْمُنْكَرَاتِ وَالْمُحَرَّمَاتِ. "রাসূলগণের গুনাহ, পাপ, নাফরমানীর কাজে জড়াইয়া পড়া হইতে এবং নিষিদ্ধ-ঘৃণ্য ও হারাম কাজ করা হইতে আল্লাহ তা'আলার রক্ষা করা"।
সায়্যিদ মাহদী আস-সদর বলেন:
وَهِيَ حِصَانَةٌ رُوحِيَّةٌ وَمَنَاعَةً نَفِيسَةٌ مَعْصِمُ ذَوِيْهَا مِنْ جَمِيعِ الذُّنُوبِ وَالآثَامِ رَغْمَ قُدْرَتُهَا عَلَيْهَا . "ইহা একটি আত্মিক পবিত্রতা এবং মূল্যবান দৈহিক শক্তি, যাহার অধিকারী শক্তি থাকা সত্ত্বেও সকল প্রকার পাপ-পংকিলতা হইতে সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকেন"।
নবীগণের মা'সূম হওয়া সম্পর্কে ইমাম আবদুল ওয়াহহাব আশ-শা'রানী বলেন, ইহার অর্থ হইল সকল প্রকার কথা, কাজ ও আচার-আচরণে তাঁহাদের এমনভাবে সংযত থাকা যাহাতে তাঁহাদের উচ্চ মর্যাদার হানি না ঘটে। তাঁহাদের এই অবস্থার কারণ এই যে, তাঁহারা সর্বদা আল্লাহ্র খাস দরবারে অবস্থান করেন। কোন সময় তাঁহারা স্বয়ং আল্লাহ্র দরবারে উপস্থিত হন, আর কোন সময় তাঁহাদের এই অবস্থা হয় যে, যদিও আল্লাহকে তাঁহারা দেখিতেছেন না, কিন্তু আল্লাহ তাঁহাদেরকে দেখিতেছেন। আল্লাহর দরবারে উপস্থিতির এই দুই অবস্থা হইতে তাঁহারা কোন সময়ই খালি হন নাই। যাঁহাদের অবস্থান এমন তাঁহারা কখনও প্রকৃতভাবে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করিতে পারেন না।
ইমাম ইব্‌ন হাযম বলেন, নবীগণ আল্লাহর অবাধ্যতা করিতে পারেন কিনা এই ব্যাপারে মতভেদ রহিয়াছে। একদল লোক এই অভিমত পোষণ করেন যে, নবী-রাসূলগণ তাঁহাদের উপর অর্পিত দীন প্রচারের ব্যাপারে মিথ্যা বলা ব্যতিরেকে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সগীরা ও কবীরা গুনাহে লিপ্ত হইবার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্য হইতে পারেন। এই অভিমতটি হইল মুরজিয়্যা আকীদার অনুসারী কাররামিয়্যা উপদলের। আশ'আরিয়‍্যা আকীদার সমর্থক ইব্‌ন তাಯ್ಯিব আল-বাকিল্লানী ও তাহার অনুসারীগণও এই অভিমত পোষণ করেন। আর ইহাই হইল ইয়াহুদী-খৃস্টানগণের অভিমত। ইব্‌ন হায্য আরও বলেন, কাররামিয়্যা মতবাদের অনুসারী কোন এক লোক হইতে আমি শুনিয়াছি। উহারা মনে করে যে, ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রেও নবীগণ মিথ্যা বলিতে পারেন। আবূ তায়্যيب আল-বাকিল্লানীর অনুসারী আবু জাফর আস-সিমনানী আরও অগ্রসর হইয়া বলেন, নবীগণের পক্ষে কুফরী করাও সম্ভব। নবী কোন কাজ নিষেধ করিবার পর তাঁহাকে আবার উহা করিতে দেখিলে তাহা এই কথার দলীল হইবে না যে, ইহা রহিত হইয়া গিয়াছে। কারণ নবী অনেক সময় আল্লাহ্র অবাধ্য হইয়া কুফরী কাজও করিয়া থাকেন।
এই সকল অভিমত হইল সরাসরি কুফরী। যাহারা এইরূপ আকীদা পোষণ করে তাহারা ইসলামের গণ্ডী হইতে বাহির হইয়া মুরতাদ হইয়া যায়। ইব্‌ন ফাওরাক আল-আশ'আরী বলেন, নবীগণের দ্বারা কখনও কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নহে, তবে ইচ্ছা করিয়া তাঁহারা সগীরা গুনাহে লিপ্ত হইতে পারেন। কিন্তু সকল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত, এমনকি মু'তাযিলা, নাজ্জারিয়্যা, খারিজী ও শী'আগণের অভিমত হইল, কোন নবীর দ্বারা কখনও ইচ্ছাপূর্বক কোন গুনাহে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়, তাহা সগীরা গুনাহ হউক কিংবা কবীরা। তবে তাঁহাদের দ্বারা আসাবধানতাবশত (سَهْواً) অনিচ্ছায় কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হইতে পারে। অনুরূপ তাঁহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে এমন কোন কাজে জড়াইয়া যাইতে পারেন যাহা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির পরিপন্থী। তবে নবীগণ দ্বারা এমন কোন কাজ সংঘটিত হইয়া গেলে তাঁহারা ইহার উপর স্থির থাকেন না, বরং সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে তাঁহাদেরকে সাবধান করিয়া দেওয়া হয়।
কারী মুহাম্মাদ তাইয়্যিব (র) বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এবং মুসলমানগণের আকীদা হইল, আম্বিয়ায়ে কিরাম নবুওয়াত লাভের পূর্ব হইতেই মা'সূম (নিষ্পাপ)। তাঁহারা জীবনের প্রথম পদক্ষেপ হইতেই গুনাহ হইতে পূত ও পবিত্র। নবুওয়াত লাভের পর তাঁহাদের এই নিষ্পাপতা উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। তখন তাঁহাদের গুনাহ করিবার প্রশ্নই আসে না। কারণ নবীগণের জীবনে যদি কোন নগণ্য পাপ কাজও লক্ষ্য করা যায়, তাহা হইলে তাঁহাদের জীবন কী করিয়া অন্যদের জন্য আদর্শ হইবে, যাহারা তাঁহাদের জীবনকে আদর্শ হিসাবে অনুসরণ করিবে? তাহাদের এই ধারণা হইতে পারে, সম্ভবত নবী ইহা ভুল বশত করিয়াছেন, আসলে ইহা ছিল গুনাহের কাজ। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদেরকে নিষ্পাপ হিসাবে সৃষ্টি করিয়াছেন। আম্বিয়ায়ে কিরাম জন্মগতভাবে মা'সূম হইবার যুক্তি তিনটি।
(এক) তাঁহারা যেই মাটি ও উপাদান দ্বারা তৈরী তাহা এতই পূত ও পবিত্র যে, ইহাতে গুনাহের গন্ধও থাকিবার অবকাশ নাই। হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, নবীগণকে সৃষ্টি করা হইয়াছে মাটি দ্বারা; তবে এই মাটির বড় অংশ হইল জান্নাতের মাটি, পার্থিব মাটির অংশ কম, আর জান্নাতী মাটির অংশ হইল বেশী। সুতরাং জান্নাতী মাটির বেশী প্রভাব থাকার কথা। জান্নাতী মাটির মধ্যে কোন অপবিত্রতা ও অপরিচ্ছন্নতা নাই, ইহাতে রহিয়াছে জ্যোতির্ময়তা। সুতরাং তাঁহাদের দ্বারা গুনাহে লিপ্ত হইবার আশংকা নাই।
(২) নবীগণ সর্বদা আল্লাহ্র দুইটি শান-জালালিয়‍্যাত ও জামালিয়্যত অর্থাৎ চরম মহিমা ও প্রতাপ এবং সীমাহীন করুণার অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁহাদের অন্তর সব সময় আল্লাহপ্রেমে বিভোর থাকে। এমতাবস্থায় তাঁহাদের দ্বারা কোন গুনাহ সংঘটিত হওয়া কি সম্ভব? যদি কেহ বাদশাহের সম্মুখে থাকে তাহা হইলে সে কি হিম্মত করিবে যে, বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন বাদশাহের দরবারে দাঁড়াইয়া সে তাঁহার বিরুদ্ধে কোন কাজে লিপ্ত হইবে? বরং এদিক-সেদিক তাকানো তো দূরের কথা, তখন অধোমুখ হইয়া তাঁহার সম্মুখে নতশিরে দাঁড়াইয়া থাকিবে।
দুনিয়ার সামান্য এক বাদশাহের সম্মুখে দাঁড়াইয়া যদি তাহার বিরুদ্ধাচারণ করিবার সাহস না হয় তাহা হইলে পরাক্রমশালী রাজাধিরাজ আল্লাহর সামনে দাঁড়াইয়া তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ করিবার দুঃসাহস কেহ কি দেখাইতে পারিবে?
(৩) নবীগণ সর্বদা আল্লাহ্ রক্ষণাবেক্ষণের অধীন থকেন। কোন সময় মানবিক দুর্বলতা জনিত কারণে যদি তাঁহারা কোন অসঙ্গত কাজের দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন তখন সঙ্গে সঙ্গে- তাঁহাদিগকে আল্লাহর সংরক্ষণ বেষ্টন করিয়া রাখে। ফলে তাঁহারা আর সেই কাজে লিপ্ত হইতে পারেন না। যেমন ইউসুফ ('আ)-এর ঘটনাটি ইহার সাক্ষ্য বহন করে। যুলায়খার চক্রান্তের বেড়াজালে আবদ্ধ ইউসুফ ('আ)-এর মনের ভাবের কথা আল-কুরআনের এই আয়াতে ব্যক্ত হইয়াছে:
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا إِنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ.
"সেই রমণী (যুলায়খা) তো তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছিল এবং সেও (ইউসুফ) উহার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িত যদি না তাহার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিত" (১২: ২৪)।
হাদীছে বর্ণিত আছে, ইউসুফ ('আ)-এর অন্তরে মানবিক স্বভাববশত কিছু অনিচ্ছাকৃত ঝোঁকের উদ্রেক হইয়া যাইতেছিল। কিন্তু তিনি যখন ছাদের দিকে দৃষ্টি দিলেন তখন তাঁহার পিতা ইয়া'কূব ('আ)-এর চেহারা মুবারক ছাদের উপর ভাসিয়া উঠিল। ইহা দেখিয়াই ইউসুফ দৌড়াইয়া পালাইলেন। তখন এই মু'জিযা তাঁহার দ্বারা প্রকাশ পাইয়াছিল যে, সাতটি কামরার যেইটির দ্বারে তিনি পৌঁছাইয়াছেন সেই দ্বার আপনা আপনি উন্মুক্ত হইয়া গিয়াছে। ইহাই হইল আল্লাহ্র সংরক্ষণে থাকার নমুনা। নবী-রাসূলগণের মা'সূম হওয়া সম্পর্কে ইদরীস কান্ধলাবী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, নক্স ও শয়তানের প্রভাবমুক্তরা হইলেন মা'সূম। নফস ও শয়তানের প্রভাব হইতে মুক্ত থাকা যায় অদৃশ্য সংরক্ষণের (حفاظت غیبی) দ্বারা। আল্লাহ তা'আলা এবং ফেরেশতাগণের সংরক্ষণের ফলে নবীগণ আল্লাহ তা'আলার হিফাযতের ভিতর পরিবেষ্টিত থাকেন। ফলে তাঁহারা সঠিক পথে পরিচালিত হন। অসৎ পথে চলার আসক্তি তাঁহাদের মধ্যে জন্মায় না। আল-কুরআনে নবীগণকে মনোনীত ও উত্তম বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে:
وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بخَالِصَةٍ ذِكْرَى الدَّارِ. وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ. (ص ٤٥-٤٧)
"স্মরণ কর, আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূবের কথা; উহারা ছিল শক্তিশালী ও সূক্ষ্মদর্শী। আমি তাহাদিগকে অধিকারী করিয়াছিলাম এক বিশেষ গুণের, উহা ছিল পরলোকের স্মরণ। অবশ্যই তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮:৪৫-৪৭)।
অভিশপ্ত ইবলীসের কথা এইভাবে ইরশাদ হইয়াছে:
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ الأَ عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ (ص) (٨٢).
"সে বলিল, আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি উহাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদিগকে নহে” (৩৮: ৮২-৮৩)।
আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারা এই কথা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে যে, নবীগণ সকল দিক দিয়া আল্লাহ্র মনোনীত, উত্তম বান্দা ও নিবেদিতপ্রাণ (মুখলিস) ছিলেন। নিবেদিতপ্রাণ হইলেন তাঁহারাই যাঁহারা কেবল আল্লাহ্রই সন্তুষ্টি লাভের আশা রাখেন এবং শয়তানী উপাদান হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র থাকেন। সুতরাং নবীগণ সগীরা ও কবীরা উভয় প্রকার গুনাহ হইতে মুক্ত। কারণ শয়তানী উপাদানের ফলেই এই দুইটি গুনাহ সংঘটিত হয়। অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে:
إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ (الجن ٢٧).
"তাঁহার মনোনীত যে কোন রাসূল ব্যতিত" (৭২ঃ ২০)।
এই আয়াতে من অব্যয়টি বর্ণনামূলক এবং রাসূল শব্দটি অনির্দিষ্ট বাচক (نکره)। ইহাতে বুঝা গেল, সকল রাসূলই আল্লাহর মনোনীত, তাঁহার প্রিয় বান্দা। তাঁহাদের বাহ্যিক ও আত্মিক দিক শয়তানী প্রভাবমুক্ত এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা হইতে পবিত্র। এক মুহূর্তের জন্যও তাঁহারা আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও সাহায্য হইতে দূরে থাকেন না। ফলে নবীগণের সকল কাজ ও কথাকে নির্দ্বিধায় মানিয়া লওয়া অবশ্য কর্তব্য। তাঁহাদের আনুগত্য হইতে বিমুখ হওয়া দুনিয়া-আখিরাত সর্বক্ষেত্রেই চির লাঞ্ছনার কারণ। মানবিক চাহিদায় যদি তাঁহাদের দ্বারা কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশ পায়, তাহা হইলে ইহা তাঁহাদের মধ্যে বাহির হইতে আসা জিনিস। মূলত তাঁহাদের ভিতরে কোন ত্রুটি করার উপাদান নাই। গরম পানিতে উষ্ণতা আসে অন্য কিছুর প্রভাবের ফলে। মূলত পানিতে তো উষ্ণতার কোন নামগন্ধও নাই। পানির স্বভাব হইল সর্বদা ঠাণ্ডা থাকা। এই কারণেই পানি যতই গরম হউক, আগুনের উপর তাহা ঢালিলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন নিভিয়া যায়। এইভাবে নবীগণের আত্মাও গুনাহ করিবার শক্তি হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে কোন কোন সময় পারিপার্শ্বিকতার কারণে তাঁহাদের পদস্খলন ঘটিতে দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সংগে সংগে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে ইহার উপর তাঁহাদেরকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হয়। ফলে নবুওয়াতের আলোকবর্তিকা আগের তুলনায় আরও বেশী উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। ইউসুফ ('আ)-এর ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ.
'আল্লাহ কর্মপদ্ধতি তাঁহার বিশেষ বান্দাগণের সহিত এইরূপই হইয়া থাকে, যাহা ইউসুফ ('আ) হইতে অসদাচরণ ও লজ্জাজনক কাজ (সগীরা ও কবীরা গুনাহ)-কে দূরে রাখে। কারণ তিনি আল্লাহ তা'আলার নিবেদিতপ্রাণ (মুখলিস) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন, আমাদের ইচ্ছা ছিল যে, অসদাচরণ ও লজ্জাকর কাজকে ইউসুফ ('আ) হইতে দূরে রাখিব। ইহা বলেন নাই যে, ইউসুফ ('আ)-কে এইরূপ কাজ হইতে দূরে রাখিব। প্রতিহত করা, হটাইয়া দেওয়া এবং দূরে রাখা ঐ জিনিসের বেলায় প্রযোজ্য হয় যাহা নিকটে আসিতে চায়। ইহা হইতে বুঝা গেল যে, মন্দ ও লজ্জাকর কাজ ইউসুফ ('আ)-এর প্রতি ধাবিত হইতে চাহিয়াছিল, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উপর হইতে তাহা হটাইয়া দিয়াছিলেন। ইউসুফ ('আ) ঐদিকে অগ্রসর হইতেছিলেন না। আল্লাহ না করুন, যদি ইউসুফ ('আ) ঐ লজ্জাকর কাজের দিকে ধাবিত হইতেন তাহা হইলে বলা হইত না, كَذلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ. অর্থাৎ আমি ইউসূফকে অসৎ ও লজ্জাকর কাজ হইতে বারণ করিয়াছি। ইউসুফ ('আ) ঐ জঘন্য কাজ হইতে পালাইতেছিলেন, কিন্তু এই গর্হিত কাজ তাঁহার অনুসরণ করিতেছিল। আল্লাহ্র কুদরতে তিনি তাহা হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়াছিলেন। কারণ তিনি তো আল্লাহ্র নিবেদিতপ্রাণ বান্দা ছিলেন। মোটকথা, বাহিরের প্রভাবে নবীগণ হইতে অসাবধানতা বশত যেই পদস্খলন ঘটিত, শাব্দিক অর্থে ইহার উপর অবাধ্যতা বা গুনাহ শব্দের প্রয়োগ করা হইত। কিংবা এইরূপ বলা যায় যে, তাহাদের সুমহান মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া এইগুলিকে অবাধ্যতা বলা হইত। প্রকৃতপক্ষে তাহা গুনাহ বা অবাধ্যতা ছিল না"।
নবীগণের মা'সূম হওয়া সম্পর্কে শিবলী নু'মানী বলেন, তাঁহাদের মা'সূম (নিষ্পাপ) হওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য। ইয়াহুদীরা মনে করে, নবী কেবল একজন ভবিষ্যত দ্রষ্টা। নবীদের ব্যাপারে ইহা ছাড়া তাহাদের আর কোন বাস্তব ধারণা নাই। এই কারণেই তাহারা নবীগণ সম্পর্কে এমন অনেক প্রলাপ বকিয়া থাকে যাহা নবুওয়াতের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। খৃস্টানগণ কেবল ঈসা ('আ)-কে মা'সূম মনে করে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে সকল নবী-রাসূলকে নিষ্পাপ বলা হইয়াছে। নবীগণের মা'সূম হইবার আকীদাকে ইসলাম অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে গ্রহণ করিয়াছে। মা'সূম হইবার পরিপন্থী যেই সকল ঘটনা পরিলক্ষিত হয় ইসলামে এইগুলির অত্যন্ত বিজ্ঞজনোচিত ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। অংশীবাদী 'আরবরা মনে করিত, জ্যোতিষীরা যে গায়েব সম্পর্কে অবহিত থাকিত এবং কবিরা যেই চিত্তাকর্ষক ছন্দ রচনা করিত এইগুলি তাহারা শয়তানের নিকট হইতে শিখিয়া ব্যক্ত করিত। প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কেও তাহারা একই অভিমত পোষণ করিত (না'উযু বিল্লাহ্)। আল-কুরআন তাহাদের এই সংশয়কে নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা খণ্ডন করিয়াছে:
اِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَلٰى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ، اِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِيْنَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِيْنَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُوْنَ. (النحل ٩٩)
"নিশ্চয় উহার (শয়তানের) কোন আধিপত্য নাই তাহাদের উপর যাহারা ঈমান আনে ও তাহাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে। উহার আধিপত্য তো কেবল তাহাদেরই উপর যাহারা উহাকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে এবং যাহারা আল্লাহর শরীফ করে" (১৬: ৯৯-১০০)।
এই আয়াত হইতে শুরু করিয়া শেষ সূরা পর্যন্ত উক্ত ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। সূরাটির শেষ আয়াতদ্বয় নিম্নরূপ:
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ اِلا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُوْنَ، اِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ.
"তুমি ধৈর্য ধারণ কর, তোমার ধৈর্য তো আল্লাহ্রই সাহায্যে। উহাদের দরুন দুঃখ করিও না এবং উহাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনোক্ষুণ্ণ হইও না। আল্লহ তাহাদেরই সংগে আছেন যাহারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাহারা সৎকর্মপরায়ণ" (১৬ : ১২৭-১২৮)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, নবীগণ শয়তানের চক্রান্ত হইতে মুক্ত। তাঁহারা মুত্তাকী ও সৎকর্মপরায়ণ। সূরা শু'আরায় সকল নবীর অবস্থা বর্ণনার পর অনুরূপ অভিযোগের জওয়াবে ইরশাদ হইয়াছে :
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ. تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ يُلْقُوْنَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ. (الشعراء ٢٢١).
"তোমাদিগকে কি আমি জানাইব কাহার নিকট শয়তানরা অবতীর্ণ হয়? উহারা তো অবতীর্ণ হয় প্রতিটি ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। উহারা কান পাতিয়া থাকে এবং উহাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী" (২৬: ২২১-২২৩)।
وَيْلٌ لِكُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ يَسْمَعُ آيَاتِ اللَّهِ تُتْلَى عَلَيْهِ ثُمَّ يَصِرُّ مُسْتَكْبِرًا كَانْ لَّمْ يَسْمَعْهَا فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (الجاثية ٤٧).
"দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহ্ আয়াতসমূহের তিলাওয়াত শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সাথে অটল থাকে, যেন সে উহা শুনে নাই। উহাকে সংবাদ দাও মর্মন্তুদ শাস্তির” (৪৫: ৭-৮)।
উক্ত আয়াতের মমার্থ হইল, নবীগণ মিথ্যাবাদী অথবা পাপিষ্ঠ নন। যদি তাঁহারা এমন হইতেন তাহা হইলে ফেরেশতাদের স্থলে শয়তানদের বন্ধু হইতেন এবং তাঁহাদের সত্যবাদিতায় সন্দেহের সৃষ্টি হইত। প্রকৃত প্রস্তাবে নবুওয়াতের হাকীকত মিথ্যা বলার সম্পূর্ণ বিরোধী। অন্য একটি স্থানে ইরশাদ হইয়াছে :
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُونِ اللَّهِ (ال عمران ٧٩).
"কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাহাকে কিতাব, হিকমত ও নবুওয়াত দান করিবার পর সে মানুষকে বলিবে, 'আল্লাহ্র পরিবর্তে তোমরা আমার দাস হইয়া যাও', ইহা তাহার জন্য সঙ্গত নহে" (৩ঃ ৭৯)।
অর্থাৎ নবীগণের দাওয়াতের সারকথা হইল আল্লাহর ইবাদতের ঘোষণা করা। নয় যে, লোকদিগকে তাঁহার নিজের বান্দা ও পূজারী বানাইবে, এইরূপ পাপ নবীদের পক্ষ হইতে প্রকাশ হইতে পারে না। অন্য একটি আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে :
وَمَا كَانَ لِنَّبِي أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ. أَفَمَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَ اللَّهِ كَمَنْ بَاءَ بِسَخَطَ مِّنَ اللَّهِ وَمَاؤُهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ. هُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ اللهِ وَاللهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ. لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ والحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ (ال عمران ١٦٢-١٦٤).
"নবীর জন্য সঙ্গত নহে যে, সে অন্যায়ভাবে কোন বস্তু গোপন করিবে যে যাহা অন্যায়ভাবে গোপন করিবে কিয়ামতের দিন সে তাহা লইয়া আসিবে। অতঃপর প্রত্যেককে, যাহা সে অর্জন করিয়াছে তাহা পূর্ণ মাত্রায় দেওয়া হইবে। তাহাদের প্রতি কোন জুলুম করা ইইবে না। আল্লাহ যাহাতে রাযী, সে তাহারই অনুসরণ করে, সেকি উহার মত যে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হইয়াছে এবং জাহান্নামই যাহার আবাস? এবং উহা কত নিকৃষ্ট প্রত্যবর্তন স্থল! আল্লাহ্র নিকট তাহারা বিভিন্ন স্তরের, তাহারা যাহা করে আল্লাহ তাহার সম্যক দ্রষ্টা। আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট একজন রাসূল পাঠাইয়াছেন, যে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদিগকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়; যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিল" (৩: ১৬১-১৬৪)।
এই আয়াতগুলিতে সকল নবী সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, তাঁহারা সম্পদ গোপন করিবার অভিযোগে অভিযুক্ত হইতে পারেন না। আরও বলা হইয়াছে যে, নবীগণ সর্বদা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির অনুসরণ করেন। তাঁহারা ঐ লোকদের অন্তর্ভুক্ত নহেন যাহারা আল্লাহ্ ক্রোধ অর্জন করে। বিশেষত আয়াতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে। ইহাও উক্ত হইয়াছে যে, নবীর শান এইরূপ নহে যে তাঁহার দ্বারা অন্যায় সংঘটিত হইবে। কারণ যাহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভে ব্রতী তাঁহারা কোন সময় তাঁহার অমনোপুত কাজে লিপ্ত হইতে পারেন না। যাঁহারা অন্যদেরকে আল্লাহ্র বাণী শুনান তাঁহারা স্বয়ং ইহার বিপরীত করিতে পারেন না। যাঁহারা অন্যদেরকে পুত-পবিত্র করিবার জন্য আদিষ্ট তাঁহারা নিজেরা পাপী ও অপবিত্র হইতে পারেন না। আল-কুরআনে নবীগণকে বারংবার যাচাই-বাছাই করিয়া মনোনীত করিবার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা পরিপূর্ণরূপে তাঁহাদের ইসমত বা নিষ্পাপ হওয়ার প্রতি ইঙ্গিতবহ। সব নবী (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ (الحج - ٧٥).
"আল্লাহ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে মনোনীত করেন বাণীবাহক এবং মানুষের মধ্য হইতেও" (২২ঃ ৭৫)।
আবার বিশিষ্ট কয়েকজন নবী সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ اللهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعُلَمِينَ (ال عمران ٣٣).
"নিশ্চয় আল্লাহ আদমকে, নূহকে ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করিয়াছেন" (৩: ৩৩)।
বিশেষভাবে ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
"পৃথিবীতে তাহাকে আমি মনোনীত করিয়াছি" (২ঃ ১৩০)। وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا (البقرة - ١٣٠).
মূসা (আ) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: اِنِّى اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسْلَتِي وَبِكَلاَمِي (الاعراف ١٤٤).
"আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি" (৭:১৪৪)।
একটি আয়াতে নবীদের জন্য মনোনীতকরণ শব্দের সঙ্গে তাঁহাদের পুণ্যশীলতার গুণের কথাও ব্যক্ত করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে: وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بخالصة ذكرى الدارِ. وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ. (ص ٤٥-٤٧)
"স্মরণ কর, আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়া'কূবের কথা, উহারা ছিল শক্তিশালী ও সূক্ষ্মদর্শী। আমি তাহাদিগকে অধিকারী করিয়াছিলাম এক বিশেষ গুণের, উহা ছিল পরলোকের স্মরণ। অবশ্যই তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮: ৪৫-৪৭)।
অপর একটি আয়াতে অধিকাংশ নবী (আ)-এর কথা আলোচনার পর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: وَكُلاً جَعَلْنَا صَالِحِينَ. وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ واقام الصلوة وايْتَاءِ الزَّكَوةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ.
"আর আমি প্রত্যেককেই করিয়াছিলাম সৎকর্মপরায়ণ এবং তাহাদিগকে করিয়াছিলাম নেতা; তাহারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করিত, তাহাদিগকে ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম সৎকর্ম করিতে, সালাত কায়েম করিতে এবং যাকাত প্রদান করিতে। তাহারা আমারই 'ইবাদত করিত” (২১ঃ ৭২-৭৩)।
নবীগণের মা'সূম (অপরাধমুক্ত) হইবার ইহা হইতে উত্তম সাক্ষী আর কি হইতে পারে যেখানে স্বয়ং আল্লাহ সাক্ষী প্রদান করিলেন যে, তাঁহারা ছিলেন নেতা-অধিকর্তা, পুণ্যবান, আল্লাহ্ ইবাদতকারী? অনেক নবীর কথা ব্যক্ত করিবার পর সূরা আন'আমে ইরশাদ হইয়াছে:
كُلُّ مِّنَ الصَّلِحِيْنَ "ইহারা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত” (৬ঃ ৮৫)। একটু পরেই আবার ইরশাদ হইয়াছে : وَكُلاً فَضَّلْنَا عَلَى الْعُلَمِيْنَ “এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম বিশ্বজগতের উপর প্রত্যেককে” (৬ঃ ৮৬)। অতঃপর আরও বলা হইয়াছে:
وَاجْتَبَيْنَاهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ.
"আমি তাহাদিগকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম" (৬ :৮৭)।
পুণ্যবান হওয়া, মনোনীত হওয়া এবং সরল পথে পরিচালিত হওয়া সরাসরি মা'সূম এবং ত্রুটিমুক্ত হওয়া প্রমাণ করে। অবাধ্য ও বাধ্য, পুণ্যবান ও গুনাহগারের জীবন পদ্ধতি ও কর্মকাণ্ডের পার্থক্য এতই উদ্ভাসিত যে, ইহাতে কোন প্রকার মিশ্রণের মোটেই আশংকা নাই। ইহাদের আচরণে আকাশ-পাতাল তারতম্য রহিয়াছে। ইতিহাস, নবীর জীবন-চরিত এবং মানুষের সোচ্চার কণ্ঠ এই দুই শ্রেণীর পার্থক্য তুলিয়া ধরিয়াছে। পবিত্র কুরআনে ইহা এইভাবে ব্যক্ত হইয়াছে :
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ سَوَاءٌ مَّحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ . (الجاثية ٢١).
"দুষ্কৃতিকারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়া উহাদিগকে তাহাদের সমান গণ্য করিব, যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে? তাহাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ" (৪৫: ২১)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় এই দুই শ্রেণীর জীবন ও মৃত্যু কখনও এক হইতে পারে না। তাঁহাদের মধ্যে পর্বতসম পার্থক্য রহিয়াছে। নবীগণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন :
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ (الاحزاب-٣٨) .
"তাহারা আল্লাহ্র বাণী প্রচার করিত এবং তাঁহাকে ভয় করিত আর আল্লাহকে ব্যতীত অন্য কাহাকেও ভয় করিত না" (৩৩ঃ ৩৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহলে বায়ত ও সহধর্মিনীগণের যেই সম্মান ও মর্যাদা তাহা নবুওয়াত ও রিসালাতের মর্যাদার কারণে হইয়াছিল। সহধর্মিনীগণ সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ (احزاب ٣٢).
"হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নহ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর" (৩৩ঃ ৩২)।
অতঃপর আহলে বায়ত ও নবী-পত্নিগণের উদ্দেশে বলা হইয়াছে, আল্লাহর ইচ্ছা হইল তোমাদেরকে মন্দ কাজ হইতে পূত-পবিত্র রাখা। ইরশাদ হইয়াছে:
اِنَّمَا يُرِيْدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ اَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيْرًا (الاحزاب-٣٣).
"হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চাহেন তোমাদিগ হইতে অপবিত্রতা দূর করিতে এবং তোমাদিগকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করিতে” (৩৩: ৩৩)।
অপবিত্রতা ও গুনাহ যদি নবী-পত্নিগণ ও তাঁহাদের সন্তান-সন্ততিদের সম্মান ও মর্যাদার হানি ঘটায় তাহা হইলে স্বয়ং নবীদের মাকাম ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ইহা কত ক্ষতিকর হইবে তাহা উপলব্ধি করা কাহারও পক্ষে কষ্টসাধ্য নহে। উম্মত জননী 'আইশা (রা)-এর অপবাদ মুক্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
الْخَبِيثُتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أولئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ.
"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য; সচ্চরিত্রা নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্রা নারীর জন্য। লোকে যাহা বলে ইহারা তাহা হইতে পবিত্র" (২৪ঃ ২৬)।
এই স্থলে সচ্চরিত্র বলিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। তাঁহারই সচ্চরিত্রতা ও পূত-পবিত্রতা দ্বারা উম্মত জননীগণের চারিত্রিক সচ্চরিত্রতা ও শুচি-শুভ্রতার প্রমাণ দেওয়া হইয়াছে। নবীগণ প্রকৃতপক্ষে ইহজগতে অনুসরণীয়, বরণীয় ও আদর্শ পুরুষ হইয়া আবির্ভূত হইয়া থাকেন। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ (الاحزاب-٢١).
"তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ্ মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ” (৩৩: ২১)। রাসূলগণের অনুসরণ করা ওয়াজিব। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ (النساء-٦٤).
"রাসূল এই উদ্দেশেই প্রেরণ করিয়াছি যে, আল্লাহ্র নির্দেশ অনুসারে তাহার আনুগত্য করা হইবে" (৪: ৬৪)।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বিশেষভাবে বলা হইয়াছে যে, তাঁহার অনুসরণেই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। ইরশাদ হইয়াছে:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ (আল ইমরান-৩১).
"বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদিগকে ভালবাসিবেন" (৩: ৩১)।
কোন পাপী-তাপীর কলুষময় জীবন কাহারও জন্য অনুসরণীয় ও আদর্শ হইতে পারে কি? অন্ধকার কোন সময় আলো ছড়ায় কি? বাসিও পঁচা বস্তু হইতে কখনও সুগন্ধি বাহির হয় কি? পাপিষ্ঠদের আহবান হইতে কোন দিন পুণ্যশীলতা আসে কি? কখনও নহে। অসৎ কাজ এবং গুনাহের কাজের মূল স্রোত হইল শয়তান কিংবা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা। কিন্তু আল্লাহর মনোনীত বিশেষ বান্দাগণ শয়তানী চক্রান্ত হইতে মুক্ত। ইরশাদ হইয়াছে:
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ وَكَفَى بِرَبِّكَ وَكِيلًا (بنى اسرائيل ٦٥).
"নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নাই। কর্মবিধায়ক হিসাবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট” (১৭:৬৫)।
নবীগণ হইতে অন্য কেহ কি আল্লাহ্র উচ্চ স্তরের বান্দা হইতে পারিবে? ইহা মোটেই সম্ভব নয়। কারণ মানুষের পথভ্রষ্টতা ও পাপ কাজের প্রবণতা বৃদ্ধির মূলে রহিয়াছে শয়তানী কুমন্ত্রণা। স্বয়ং কিংবা জিন ও মানুষের আকার ধারণ করিয়া মানুষের অন্তরে এই প্রভাব বিস্তার করে। নবীগণ সকল প্রকার শয়তানী কার্যকলাপ হইতে চিরমুক্ত ও পবিত্র। কোন কোন স্বার্থপর ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদস্খলন ঘটাইবার ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে এই বলিয়া আশ্বস্ত করিয়াছিলেন, আমার করুণা ও অনুগ্রহ তোমার উপর অবারিত, ইহার কারণে তুমি অপকর্ম হইতে নিরাপদ থাকিবে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُ لَهَمَّتْ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ أَنْ يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِنْ شَيْءٍ وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا (النساء ١١٣).
"তোমার প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তাহাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করিতে চাহিতই। কিন্তু তাহারা নিজদিগকে ব্যতীত আর কাহাকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং তোমার কোনই ক্ষতি করিতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করিয়াছেন এবং তুমি যাহা জানিতে না তাহা তোমাকে শিক্ষা দিয়াছেন; তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ রহিয়াছে" (৪: ১১৩)।
অবস্থা ও পরিস্থিতির আলোকে এই স্থলে "তোমার প্রতি আল্লাহ্ মহাঅনুগ্রহ” বলিতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর 'ইসমত' (নিষ্পাপ) বুঝানো হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
স্বয়ং মানুষের মন নিজের অসঙ্গত আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষকে ধোঁকা দিয়া থাকে। কিন্তু নবীগণ এইরূপ প্রতারণামূলক আকাঙ্ক্ষা হইতে চিরমুক্ত। মানবিক সহজাত স্বভাবের ফলে তাঁহাদের অন্তরে এই বাসনা উদয় হইতে পারে যে, তাঁহারা যেই দাওয়াতের মিশন লইয়া প্রেরিত হইয়াছেন তাহা খুব দ্রুত প্রসারিত হউক এবং মানুষ তাহা সঙ্গে সঙ্গে কবুল করুক। কিন্তু ইহা যদি আল্লাহ্ হিকমতের অনুকূল না হয় তাহা হইলে মহান আল্লাহ তাঁহাদের এই বাসনাকে তাহাদের অন্তর হইতে বিদূরিত করিয়া দেন এবং নিজ সিদ্ধান্তকে অটুট রাখেন। এই প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أَمْنِيَّتِهِ فَيَنْسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللهُ ايَتِهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (الحج ٥٢).
"আমি তোমার পূর্বে যে সমস্ত রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করিয়াছি তাহাদের কেহ যখনই কিছু আকাঙ্ক্ষা করিয়াছে তখনই শয়তান তাহার আকাঙ্ক্ষায় কিছু প্রক্ষিপ্ত করিয়াছে। কিন্তু শয়তান যাহা প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহ্ তাহা বিদূরিত করেন। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁহার আয়াতসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়” (২২ঃ ৫২)।
উক্ত আয়াত হইতে জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা নবীগণকে ভুল চিন্তা-চেতনা হইতেও হিফাজত রাখেন। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى (النجم ٢).
"তোমাদিগের সংগী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়" (৫৩ঃ ২)।
উক্ত আয়াতে যেই বিভ্রান্তি ও বিপথগামিতার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা কোন বিশেষ কালের সহিত সম্পর্কিত নহে। ইহাতে অতীতের সব সময়ে গুনাহ হইতে পবিত্র থাকিবার কথা ব্যক্ত করা হইয়াছে। তিনি সর্বদা এই সকল পাপ-পংকিলতা হইতে সম্পূর্ণ পবিত্র ছিলেন।
আল্লামা ইদরীস কান্ধলাবী নবগণের 'ইসমাত সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, নবী-রাসূল সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন:
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ (النساء ٨٠).
"কেহ রাসূলের আনুগত্য করিলে সে তো আল্লাহ্রই আনুগত্য করিল" (নিসা, ৪:৮০)। আরও ইরশাদ হইয়াছে:
أطِيعُوا اللهُ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (ال عمران ١٣٢).
"তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর যাহাতে তোমরা কৃপা লাভ করিতে পার" (৩: ১৩২)।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা'আলা রাসূলের আনুগত্যকে তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। কোন গুনাহগারের আনুগত্যকে আল্লাহ্ হুবহু আনুগত্য বলা যাইতে পারে কি? রাসূলের ও আল্লাহ্র আনুগত্য অভিন্ন হইবে তখনই যখন রাসূল আল্লাহর অবাধ্যতা হইতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র থাকিবেন। দ্বিতীয় আয়াতে বিনাশর্তে রাসূলের অনুসরণ করিবার আদেশ দেওয়া হইয়াছে এবং ইহা দ্বারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হইয়াছে। ইহা হইতে বুঝা যায়, নবী-রাসূলগণ সম্পূর্ণরূপে মাসুম, অন্যথায় বিনা শর্তে অনুসরণ করিবার আদেশ দেওয়া হইত না। মুসলিম খলীফা ও শাসকগণ মা'সূম (নিষ্পাপ) নহেন বলিয়া তাঁহাদের অনুসরণ করিবার ব্যাপারে শর্তারোপ করা হইয়াছে। বুখারী শরীফে বর্ণিত একটি হাদীছে আছে:
السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أَمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ.
"মুসলিম শাসকের আদেশ পালন ও তাহার অনুসরণ সে পর্যন্ত যেই পর্যন্ত না কোন গুনাহের আদেশ দেওয়া হয়। কোন গুনাহের আদেশ দেওয়া হইলে তাহা পালন ও অনুসরণ করিতে নাই"।
আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٌ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هؤُلاء شَهِيدًا. (النساء ٤١) .
"যখন প্রত্যেক উম্মত হইতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করিব এবং তোমাকে উহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করিব তখন কী অবস্থা হইবে” (৪:৪১)।
এই আয়াত হইতে বুঝা যায়, কিয়ামতের দিন সকল নবীকে তাঁহার উম্মতের ব্যাপারে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করা হইবে। এমতাবস্থায় যদি নবী মা'সূম বা নিষ্পাপ না হইয়া ফাসিক হন তাহা হইলে তাঁহার সাক্ষী কিভাবে আল্লাহর দরবারে গৃহীত হইবে? কারণ আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন।:
إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا (الحجرات ٢).
"যদি কোন পাপাচারী তোমাদিগের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে তোমরা তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিবে" (৪৯:৬)।
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلا تَعْقِلُونَ. ( البقرة ٤٤ ) .
"তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও, আর নিজদিগকে বিস্তৃত হও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর? তবে কি তোমরা বুঝ না” (২:৪৪)
لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُوْنَ. كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ. (الصف ٣).
"তোমরা যাহা কর না তাহা তোমরা কেন বল? তোমরা যাহা কর না তোমাদিগের তাহা বলা আল্লাহ্ দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক" (৬১:২-৩)।
নবীগণের দায়িত্ব হইল লোকজনকে আল্লাহ্র পথে আহবান করা। এমতাবস্থায় যদি তাঁহারা স্বয়ং আল্লাহ্র আনুগত্যশীল না হন তাহা হইলে তো উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ের বর্ণনা তাঁহাদের উপর প্রযোজ্য হইবে। আল-কুরআনে আরও ইরশাদ হইয়াছে:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّنَ رَسُولاً مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ (الجمعة ٢)
"তিনিই উম্মীদিগের মধ্যে তাহাদিগের একজনকে পাঠাইয়াছেন রাসূলরূপে, যে তাহাদিগের নিকট আবৃত্তি করে তাঁহার আয়াত এবং তাহাদিগকে পবিত্র করে" (৬২ : ২)।
অতএব নবী যদি নিষ্পাপ না হন তাহা হইলে কি করিয়া তিনি অন্যদেরকে পবিত্র করিবেন? শেষ কথা, কোন লোক নবীর উপস্থিতিতে কোন কাজ করিলে এবং নবী তাহা দেখিয়া মৌনতা অবলম্বন করলে এই কাজ বৈধ হওয়া সাব্যস্ত হয়। যদি নবীর মৌনতা দ্বারা কোন কাজ বৈধ সাব্যস্ত হয় তাহা হইলে স্বয়ং তাঁহার কোন কাজ অবৈধ ও গুনাহের হইবে কি করিয়া (ইদরীস কান্ধলাবী, মাআরিফুল কুরআন, ১খ., পৃ. ১০৯)।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী বলেন, ইসমাত (নিষ্পাপ) চারিটি জিনিসের সহিত সংশ্লিষ্টঃ (এক) আকাইদ, (দুই) আল্লাহর বিধানাবলীর তাবলীগ, (তিন) ফাতওয়া ও ইজতিহাদ, (চার) কার্যকলাপ, অভ্যাস ও সীরাত।
প্রথম, আকাইদ সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, নবীগণ জন্মলগ্ন হইতেই তাওহীদ ও ঈমানের ব্যাপারে আপোষহীন ছিলেন। তখন হইতেই তাঁহাদের অন্তর কুফ্র-শিরক হইতে পাক এবং ইয়াকীন ও বিশ্বাসে ভরপুর ছিল। তাঁহাদের পবিত্র মুখমণ্ডল আল্লাহ্র ধ্যান ও তাঁহার নৈকট্য লাভের জ্যোতিতে সর্বদা উদ্ভাসিত থাকিত। আজ অবধি কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই যে, আল্লাহ তা'আলা নবুওয়াত ও রিসালাত এমন কোন ব্যক্তিকে দান করিয়াছিলেন যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হইবার পূর্বে কুফ্র ও শিরকে জড়াইয়াছিলেন, ইহা কস্মিন কালেও সম্ভব নহে। এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার বাণী :
وَآتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ (الانبياء ٥١) .
"আমি তো ইহার পূর্বে ইবরাহীমকে সৎপথের জ্ঞান দিয়াছিলাম এবং আমি তাহার সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক পরিজ্ঞাত” (২১ : ৫১)।
নবীগণ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হইবার পূর্বে নবী না হইলেও আল্লাহর ওলী বা প্রিয় বান্দা ছিলেন। তাঁহারা আল্লাহ্ এইরূপ প্রিয় বান্দা ছিলেন যে, অন্যান্য ওলীর মর্যাদা তাঁহাদের তুলনায় সমুদ্রের সহিত একবিন্দু পানিবৎ। এই কারণে মুসলিম উম্মাহ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, নবীগণের অন্তরে কুফর ও গোমরাহী থাকা অসম্ভব ব্যাপার।
দ্বিতীয়, আল্লাহর বিধানাবলীর তাবলীগ। এই সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, আল্লাহ্র বিধানাবলীর তাবলীগের ক্ষেত্রে নবীগণ সম্পূর্ণরূপে মা'সূম। তাঁহাদের দ্বারা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এই ব্যাপারে কোন ত্রুটি হইতে পারে না। এই সম্পর্কে তাঁহাদের পক্ষে মিথ্যা বলা বা দাওয়াতের হেরফের করা সম্ভব নয়। সুস্থ-অসুস্থ, আনন্দ-নিরানন্দ সর্বাবস্থাতেই তাঁহাদের দ্বারা আল্লাহ্ ওহী পৌঁছানোর ব্যাপারে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কোন প্রকার ত্রুটি হওয়া অসম্ভব। অন্যথায় আল্লাহ্ ওহীর উপর সম্পূর্ণভাবে আস্থা ও বিশ্বাস তিরোহিত হইবে। এই কারণেই ওহী অবতরণের সময় ফেরেশতাদের 'পাহারা বসানো হয়, যাহাতে আল্লাহ্ ওহী শয়তানের প্রভাব হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। এই সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً . إِلا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَداً ، لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصى كُلَّ شَيْءٍ عَدَداً (الجن ٢٦).
"তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন রাসূলগণ তাহাদিগের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছেন কিনা জানিবার জন্য। রাসূলগণের নিকট যাহা আছে তাহা তাঁহার জ্ঞানগোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন" (৭২: ২৬-২৮)।
তৃতীয়, ফাতওয়া ও ইজতিহাদ। এই ব্যাপারে আলিমগণের অভিমত হইল, ওহীর জন্য অপেক্ষান্তে নবীগণ কোন কোন বিষয়ে ইজতিহাদ করিতেন। এই প্রেক্ষিতে যদি তাঁহাদের ইজতিহাদে কোন ত্রুটি প্রকাশ পাইত তখন সংগে সংগে ওহীর সাহায্যে তাঁহাদিগকে সাবধান করিয়া দেওয়া হইত। ইহা কস্মিন কালেও সম্ভব নহে যে, নবীগণের দ্বারা কোন ইজতিহাদী ত্রুটি প্রকাশ পাইবে আর তাঁহাদিগকে আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহা শোধরাইয়া দেওয়া হইবে না।
চতুর্থ, অভ্যাস ও সীরাত। এই সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অভিমত হইল, নবীগণ কবীরা গুনাহসমূহ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তবে সগীরা গুনাহ অর্থাৎ অনুত্তম কোন কাজ ভুলক্রমে বা বেখবর অবস্থায় তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হইতে পারে, যাহা বাহ্যত পাপ মনে হইলেও প্রকৃতপক্ষে ইহার মাধ্যমে কোন বিধান প্রবর্তন উদ্দেশ্য হইয়া থাকে। যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুহর বা আসরের কোন এক সালাতে বাহ্যত ভুল দেখা গেলেও ইহার দ্বারা মূলত সিজদায়ে সাহুর বিধান প্রবর্তন করা মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল। যদি তাঁহার সালাতে ভুল না হইত তাহা হইলে এই উম্মত কিভাবে সিজদায়ে সাহুর বিধান লাভ করিত? লায়লাতুত তা'রীসে (যাহাতে ফজরের সালাত কাযা হইয়াছিল) যদি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সালাত কাযা না হইত তাহা হইলে সালাতের কাযা করিবার যে বিধান তাহা কিভাবে জানা যাইত? এই কারণে নবীগণের ভুলও সরাসরি আল্লাহ্র করুণা ও রহমত। এই কারণেই আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিতেন: يَا لَيْتَنِي كُنْتُ سَهْوَ مُحَمَّدٍ. "হায়! আমি যদি মুহাম্মাদ (স)-এর ভুল হইয়া যাইতাম! অর্থাৎ আমার স্মরণ থাকা হইতে মুহাম্মাদ (স)-এর ভুলিয়া যাওয়া ছিল উত্তম"। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى إِلا مَا شَاءَ اللهُ (الاعلى ٦-٧). "নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করিবেন তাহা ব্যতীত” (৮৭:৬-৭)।
উক্ত আয়াত হইতেও প্রমাণিত হয় যে, নবীর ভুল হওয়া প্রকৃতপক্ষে কোন অন্তর্নিহিত কারণে হইয়া থাকে। মানবিক প্রয়োজনে নবীগণ হইতে ভুল হওয়া ও কোন বিষয়ে বেখবর হওয়ার কারণ হইল তাঁহারাও যে মানুষ এই কথা প্রকাশ করা। তাঁহাদের ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে, আনন্দ-ক্লেশ আছে, তাঁহারা হাসেন, আবার দুঃখ-ভারাক্রান্তও হন। নবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁহারা মানুষ, ফেরেশতা নহেন। ভুলত্রুটি মানুষের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যেইভাবে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নবুওয়াত ও ইসমাতের পরিপন্থী নহে সেইভাবে কার্যকলাপ এবং আচার-আচরণে ভুল-ত্রুটিও নবুওয়াত ও ইসমাতের পরিপন্থী নয়। তবে এই কথা নিশ্চিত যে, নবীগণের এই সকল পদস্খলন স্থায়ী থাকে না। কোন নবীর দ্বারা এইরূপ কোন কোন কাজ একবার হইয়া গেলেও তাঁহার জীবনে ইহার পুনরাবৃত্তি ঘটে নাই। আদম (আ) কর্তৃক নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا (طه ١١٥). "কিন্তু সে ভুলিয়া গিয়াছিল; আমি তাহাকে সংকল্পে দৃঢ় পাই নাই" (২০: ১১৫)।
অর্থাৎ মানবিক গুণের ফলে তাঁহার দ্বারা এই অসাবধানতামূলক কাজ সংঘটিত হইয়া গিয়াছিল, ইহা তাঁহার ইচ্ছায় ছিল না। অনিচ্ছামূলক কাজ যে গুনাহের কাজ নহে এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত আয়াত লক্ষণীয়: لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ (الاحزاب ٥) "এই ব্যাপারে তোমরা কোন ভুল করিলে তোমাদিগের কোন অপরাধ নাই, কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকিলে অপরাধ হইবে" (৩৩ঃ ৫)।
আয়াতটির মমার্থ অনুযায়ী যদি ত্রুটি-বিচ্যুতিতে গুনাহ না হয় তাহা হইলে ইহা ইসমাত বিরোধী হইবে কিভাবে? একই কারণে রোযার কথা ভুলিয়া গিয়া পানাহার করিলে ইহার দ্বারা রোযা ভঙ্গ হয় না। আদম (আ)-এর অন্তর মহান আল্লাহ্র মহিমা ও মাহাত্ম্য দ্বারা ভরপুর ছিল বিধায় যখন শয়তান আল্লাহ্ নামে শপথ করিয়া বলিয়াছিল : إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ (নিশ্চয় আমি তোমাদের কল্যাণকামী, একজন। ৭: ২১) তখন ইহা শুনিয়া আদম (আ) কল্পনাই করিতে পারেন নাই যে, ধূর্ত শয়তান আল্লাহর নাম লইয়া মিথ্যা শপথ করিবে। এই ধোঁকার দ্বারাই আদম (আ)-কে শয়তান ফাঁদে ফেলিয়াছিল। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَدَلَهُمَا بِغُرُورِ “তাহাদেরকে শয়তান ধোঁকার দ্বারা পিছলাইয়া নিয়াছিল'। غُرُور শব্দ হইতে স্পষ্টত বুঝা যাইতেছে যে, এই বিচ্যুতি ধোঁকার ফলে হইয়াছিল। আদম (আ)-এর এই ব্যাপারে কোন সংকল্প ছিল না। বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে শত্রু তাহার নীলনক্সা অনুযায়ী ক্ষতির মধ্যে ফেলিয়াছিল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইহা গুনাহ মনে হইলেও মূলত ইহার উদ্দেশ্য ছিল তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার পন্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া। যেইভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর, সালাতে ভুল হইয়া যাওয়া হইতে সাহু সিজদার বিধান প্রবর্তিত হইয়াছিল। অনুরূপ আল্লাহ আদম সন্তানকে শিক্ষা দিলেন যে, তোমাদের দ্বারা কোন সময় কোন পাপকার্য সংঘটিত হইয়া গেলে তোমাদের পিতার ন্যায় সংগে সংগে কাকুতি-মিনতির সহিত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করিবে, শয়তানের ন্যায় অহংকার করিতে উদ্যত হইবে না।
'আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী বলেন, আল-কুরআনের কিছু শব্দ দ্বারা সরলপ্রাণ কিছু লোকের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি হইতে পারে যে, কোন কোন নবী মা'সুম ছিলেন না। কিন্তু বিশেষজ্ঞ আলিমগণ এই সকল সন্দেহের যথোচিত জবাব দিয়াছেন। ইব্‌ন হাযম আন্দালুসী তাঁহার রচিত গ্রন্থ আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে, কাযী ইয়াদ শিফা গ্রন্থে এবং মোল্লা দোস্ত মুহাম্মাদ কাবুলী তুহফাতুল আখিল্লা' ফী ইসমাতিল আম্বিয়া গ্রন্থে প্রতিটি সন্দেহের অপনোদন করিয়াছেন। এই বিষয়ে ভুল বুঝাবুঝির মৌলিক কারণ দুইটিঃ (এক) সকল বান্দা এমনকি নবীগণের মর্যাদা যতই ঊর্ধ্বে হউক আর তাহারা গুনাহ ও অবাধ্যতা হইতে যতই ঊর্ধ্বে থাকুন না কেন মহান আল্লাহ্র দরবারে তাঁহাদের অবস্থান হইল বান্দার ও মাখলুকের। একজন বান্দা বা গোলাম যতই অনুগত ও বাধ্যগত হউক সে তাহার মালিকের সামনে স্বীয় ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা স্বীকার করে এবং স্বীয় কৃতকর্মের ব্যাপারে মালিকের সামনে অবনত মস্তক থাকে। হযরত ইবরাহীম (আ), যিনি পুণ্যশীল ও পবিত্রাত্মা ছিলেন বলিয়া আল-কুরআনে ভুরিভুরি প্রমাণ রহিয়াছে, তিনি আল্লাহ্র মহিমা, মাহাত্ম্য ও তাঁহার করুণার উল্লেখ করিয়া বলেনঃ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ (الشعراء ٨٢). "এবং আশা কারি তিনি কিয়ামত দিবসে আমার অপরাধসমূহ মার্জনা করিবেন" (২৬:৮২)।
নবী কৃর্তক এই স্বীকারোক্তি ও আত্মসমর্পণ তাঁহার ত্রুটি ও হীনতা নয় বরং ইহা তাঁহার পূর্ণ ইবাদত ও দাসত্ববোধের পরিচায়ক।
বান্দা আনুগত্যের ও আত্মসমর্পণের শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করিলেও মালিক অধিকতর বিনম্রতা ও আনুগত্যের প্রত্যাশী হন, যাহাতে তাঁহার দরবারে উহার আমল উচ্চতর হয়। কোন কোন আয়াতে কোন কোন নবীকে ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলা হইয়াছে। ইহা এইজন্য নয় যে, তিনি গুনাহগার ছিলেন বরং ইহার উদ্দেশ্য ছিল আনুগত্যের উপর ধৈর্য ধারণ করিবার জন্য সতর্ক করা এবং আরও বেশী মাত্রার আনুগত্য তলব করা, যাহাতে ইহা তাঁহার জন্য অধিকতর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-কে উদ্দেশ্য করিয়া ইরশাদ হইয়াছে : اِذَا جَآءَ نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِيْنِ اللهِ اَفْوَاجًا . فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ اِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا (النصر).
"যখন আসিবে আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহ্র দীনে প্রবেশ করিতে দেখিবে তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিও এবং তাঁহার ক্ষমা প্রার্থনা করিও; তিনি তো তওবা কবুলকারী" (১১০ : ১-৩)।
এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর সাহায্য, মক্কা বিজয়, পৌত্তলিকতার মূলোৎপাটন এবং দলে দলে মুসলমান হওয়াতে তো কোন পাপ নাই যাহা হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে হইবে। অনুরূপ ইরশাদ হইয়াছে : اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِيْنًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا ، وَيَنْصُرَكَ اللهُ نَصْرًا عَزِيزًا (الفتح ١).
"নিশ্চয় আমি তোমাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়, যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ তোমাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন" (৪৮ : ১-৩)।
এখানেও লক্ষণীয় যে, মক্কার পূর্ণ বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে ক্ষমা করিবার ইহা ব্যতীত আর কি অর্থ হইতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দার উত্তম অবদানকে কবুল করিয়া ইহার উপর তাঁহার সন্তুষ্টি প্রকাশ করিতেছেন। এখানে নবী (স)-এর কোন গুনাহে লিপ্ত হইবার কোনই আশংকাই নাই, বরং এখানে তাঁহার পূর্ণ দাসত্বের বহিপ্রকাশ ঘটিয়াছে।
খৃস্টানরা হযরত 'ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলিয়া আখ্যায়িত করিত এবং তদানিন্তন আরবরা ফেরেশতাগণকে আল্লাহর কন্যাসন্তান বলিয়া অভিহিত করিত এবং এতদুভয়কে প্রভুত্বের আসনে আসীন করিত। তাহাদের ব্যাপারে আল-কুরআনের ইরশাদ হইয়াছে : لَنْ يَسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلهِ وَلَا الْمَلَائِكَةُ الْمُقَرِّبُونَ وَمَنْ يَسْتَنْكِفْ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرْ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعًا. (النساء).
"মসীহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে হেয় জ্ঞান করে না এবং ঘনিষ্ট ফেরেশতাগণও নহে এবং কেহ তাঁহার বান্দা হওয়াকে হেয় জ্ঞান করিলে এবং অহংকার করিলে তিনি তাহাদের সকলকে তাঁহার নিকট একত্র করিবেন" (৪: ১৭২)।
উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য ঈসা (আ)-কে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়, বরং ইহার দ্বারা তাঁহার দাসত্ব ও ইবাদতের ঘোষণা মূল লক্ষ্য। মোটকথা, নবীগণ কর্তৃক আল্লাহ্র দরবারে স্বীয় কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি দ্বারা তাঁহাদের গুনাহ প্রমাণিত হয় না। পক্ষান্তরে ইহাতে তাঁহাদের পূর্ণ দাসত্বের বহিপ্রকাশ ঘটে। অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক কোন নবী সম্পর্কে 'আমি তোমাকে মাফ করিয়া দিয়াছি' বলায় নবীর অপরাধী হওয়া বুঝায় না; বরং ইহা দ্বারা এই কথাই ঘোষণা করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তাঁহার উপর সন্তুষ্ট হইয়াছেন এবং তাঁহাকে কবূল করিয়া নিয়াছেন।
পূর্বোল্লিখিত সূরা ফাতহের আয়াতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করিলে জানা যায় যে, মক্কাকে পবিত্রকরণ এবং সমগ্র আরব উপদ্বীপ সত্যাসত্যের মাপকাঠিকরণ নির্ভরশীল ছিল মক্কা বিজয়ের উপর। নবী করীম (স) ও মুসলমানদের নিরলস প্রচেষ্টায় যখন ইহা সম্ভব হইয়াছিল তখন মহান আল্লাহ ঘোষণা করিলেন, এই বিজয়ের দ্বারা নবুওয়াতের দায়িত্ব এবং তোমার উপর আমার অনুগ্রহাদি পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছে। এখন আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালনার এবং নিজের বলিষ্ঠ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিতেছেন। অথচ এই সকল জিনিস রাসূলুল্লাহ (স) পূর্ব হইতেই প্রাপ্ত ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পূর্বে কি রাসূলুল্লাহ (স) সিরাতে মুসতাকীম অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের উপর ছিলেন না? তিনি কি আল্লাহর বলিষ্ঠ সাহায্য লাভকারী ছিলেন না? এই সকল মর্যাদা তিনি পূর্ব হইতেই লাভ করিয়াছিলেন, এতদসত্ত্বেও এইগুলির পুনরাবৃত্তির দ্বারা আল্লাহ তা'আলার এই উপলক্ষ্যে তাহার উপর স্বীয় সন্তুষ্টির আধিক্যের কথাই ব্যক্ত করিয়াছেন। যদি তাঁহার অসাবধানতাবশত সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হইয়া থাকে তাহা হইলে ইহার আগের-পিছের সকল কিছু মার্জনা করিয়া দিবার ঘোষণা করা হয়, যাহাতে তিনি গৌরবময় নূতন মর্যাদা ও আসনে আসীন হন।
বাইবেলে পূর্ণ দাসত্বের একটি বর্ণনা আছে। হযরত ঈসা (আ)-কে জনৈক নেতা 'হে পুণ্যবান' গুরু বলিয়া আহবান করিলে তিনি প্রত্যুত্তরে বলিয়াছিলেন, "তুমি আমাকে কেন পুণ্যবান বলিয়া আহবান করিতেছ? এক আল্লাহ ব্যতীত আর কেহই পুণ্যবান নাই" (লুক, ১৮: ১৯)। হযরত ঈসা (আ)-এর এই কথা হইতে কেহ যেন এই ধারণা করিয়া না বসেন যে, 'ঈসা (আ) পূণ্যবান ছিলেন না। এইরূপ ধারণা বড়ই ভ্রান্তিমূলক।
আরবী ভাষায় পাপ বুঝাইবার জন্য বিভিন্ন শব্দ প্রয়োগ করা হয়, যেমন: جرم حنث اثم ذنب- ইত্যাদি। এই শব্দাবলীর মধ্যে কেবল ذنب শব্দটি ব্যতীত অন্য সকল শব্দ ইচ্ছাকৃত গুনাহের জন্য প্রয়োগ করা হয়। ذنب শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায় শুধুমাত্র ভুল কর্মের ক্ষেত্রে- তাহা জ্ঞাতসারে কিংবা অজান্তে অসাবধানতার কারণেই করা হউক। ক্ষেত্রবিশেষে এই শব্দটিকে ইচ্ছাকৃত সেই কার্যাবলীর জন্যও প্রয়োগ করা হয় যাহা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ উম্মাহর জন্য গুনাহের কাজ নয়। তবে নবীগণের বেলায় এই অসাবধানতাও কৈফিয়তযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হয়। নবীগণের ব্যাপারে যেখানেই ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার কথা বলা হইয়াছে সেখানেই ذنب শব্দের প্রয়োগ দেখিতে পাওয়া যায়, কোথাও اثم جنث-جرم বলা হয় নাই। ইহা হইতে প্রতিভাত হয় যে, নবীগণ হইতে প্রকাশ্য কোন গুনাহ প্রকাশ পায় নাই। তাঁহাদের দ্বারা যাহা কিছু সংঘটিত হইয়াছিল তাহা ছিল মানবিক পদস্খলন বা ভুলত্রুটি, যাহার সংশোধন ও সতর্কীকরণ মহান আল্লাহ তদীয় কৃপা দ্বারা করিয়া দেন। ইহারই উদ্দেশ্যে তাঁহাদেরকে তিনি ইস্তিগফার করিবার নির্দেশ দিয়া থাকেন। ইহা হইতে আরও একটি রহস্য উদঘাটিত হয় যে, অনিচ্ছাজনিত ভুলত্রুটি উম্মতের জন্য কোন পাকড়াওযোগ্য অপরাধ নয়। তবে হাঁ, আম্বিয়া 'আলায়হিমুস সালামগণের মর্যাদা যেহেতু বহু গুণ ঊর্ধ্বে, সুতরাং তাঁহাদের ক্ষেত্রে ইহা ধর্তব্য। কারণ তাঁহাদের আচরণ ও উক্তিমালা শরী'আত হিসাবে গণ্য হয়। সুতরাং শরী'আতের বিধানকে সংরক্ষিত রাখার জন্য তাঁহাদের সকল কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া আবশ্যক। ইহার ফলে তাঁহাদের দ্বারা কদাচিৎ তেমন কোন কার্যকলাপ সংঘটিত হইয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ইহার উপর হুঁশিয়ারী সংকেত দেওয়া হইত। ক্ষমা ঘোষণা করিবার সহিত তাঁহাদেরকে সুসংবাদও প্রদান করা হইত। জানা-অজানা, ছোট-বড় সকল প্রকার পদস্খলন হইতে তাঁহাদিগকে পূত-পবিত্র রাখা হইত।
নিম্নের আয়াতগুলি লক্ষণীয় : )٢٧ - فَتَلَقَى أَدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ (البقرة "অতঃপর আদম তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হইল। আল্লাহ তাহার প্রতি ক্ষমাপরবশ হইলেন” (২:২৮) । )١٢٢ - ثُمَّ اجْتَبَهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى (طه "ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হইলেন এবং তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন” (২০ : ১২২( : )١١٧ - لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ (التوبة "আল্লাহ্ অনুগ্রহপরায়ণ হইলেন নবীর প্রতি" (৯: ১১৭)। فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَهُ مِنَ الْغَمَّ وَكَذلك )٨٨- تنجى الْمُؤْمِنِينَ. (الانبياء "তখন আমি তাহার ডাকে সাড়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে উদ্ধার করিয়াছিলাম দুশ্চিন্তা হইতে। এইভাবেই আমি মুমিনদিগকে উদ্ধার করি থাকি" (২১: IR COR GET " لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ (الفتح) | (bb ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন" (৪৮:২)।
পূর্ণ ও সাধারণ ক্ষমার এই উচ্চ মর্যাদা নবীগণ ব্যতীত অন্য কাহারও ভাগ্যে জুটে নাই। আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের মা'সূম হওয়ার ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝির দ্বিতীয় কারণ হইল, তাঁহাদের নবুওয়াত-পূর্ব জীবন এবং নবুওয়াত পরবর্তী জীবনে শক্তি-সামর্থ্য ও ক্রিয়াকলাপের যে তফাৎ রহিয়াছে তাহাকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। জানা-অজানা, গোমরাহী ও হিদায়তকে আপেক্ষিক শব্দাবলী হিসাবে গণ্য করা হয়। জ্ঞানের সকল সীমাকে তাহার উপরস্থ জ্ঞানের তুলনায় মূর্খতা বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। অনুরূপ হিদায়াতের উচ্চ পর্যায়কে তাহার হইতে অধিক হিদায়াতের তুলনায় গোমরাহী বলিয়া অভিহিত করা হয়। নবীগণের নবুওয়াত লাভের পূর্ব জীবন ও পরবর্তী জীবনের মধ্যে সামর্থ্য ও কার্যক্রমের তারতম্য রহিয়াছে। যেইভাবে বীজের মধ্যে বৃক্ষের পাতা ও অন্যান্য গুণ লুকায়িত থাকে কিন্তু তখনও তাহা বৃক্ষ হিসাবে গণ্য হয় না, ইহাতে কাণ্ড, ডালপালা ও পাতা ফুল গজায় না, কিন্তু এক সময় এই বীজ বৃদ্ধি পাইয়া একটি নূতন বৃক্ষের সৃষ্টি হয়। ইহার পাতায় মসৃণতা আসে, ফুলের সৌরভে মানুষ আকৃষ্ট হয়, ফলে মাধূর্য আসে, ইহার বিস্তৃত ছায়ার নীচে পথিক বিশ্রাম গ্রহণ করে। এই প্রকারের বিরাট পার্থক্য রহিয়াছে নবীগণের নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের মধ্যে। এই তারতম্যের কারণেই নবীর নবুওয়াত লাভের পূর্বের জীবন অন্ধকারময় ও গোমরাহী এবং পরবর্তী জীবন জ্যোতির্ময় ও হিদায়াতের আলোয় আলোকিত বলিয়া বর্ণনা করা হয়। যেমনটি সাধারণ মানুষের জীবন ইসলাম ও ঈমান গ্রহণের পূর্বে গোমরাহীর জীবন এবং ইসলাম গ্রহণের পর তাহা হিদায়াতময় জীবন হইয়া যায়। তবে একটি কথা লক্ষণীয় যে, নবীগণের গোমরাহী ও হিদায়াত লাভের অর্থ সেইরূপ নয় যেইভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হিদায়াত ও গোমরাহীর অর্থ গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ তা'আলা যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর তাঁহার অনুগ্রহের কথা বর্ণনা দিয়াছেন সেখানে ইরশাদ হইয়াছে:
أَلَمْ يَجِدُكَ يَتِيمًا فَاوى. وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى وَوَجَدَكَ عَائِلاً فَأَغْنَى (الضحى ٦-٨).
"তিনি কি তোমাকে ইয়াতীম অবস্থায় পান নাই আর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নাই? তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন। তিনি তোমাকে পাইলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাবমুক্ত করিলেন" (৯৩ঃ ৬-৮)।
এই আয়াত হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হইতেছে যে, এখানে হিদায়াত দ্বারা নবুওয়াত এবং ضلالت বা গোমরাহী দ্বারা নবুওয়াত পূর্ব জীবনকে বুঝানো হইয়াছে, যাহা নবুওয়াত লাভের পরবর্তী জীবনের তুলনায় গোমরাহী হইয়া থাকে। দালালাত শব্দ আরবীতে কেবল গোমরাহী অর্থেই ব্যবহৃত হয় না, বরং অজান্তে ভুলিয়া যাওয়া ও বেখবর হওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন স্ত্রীলোকদের সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে ইরশাদ হইয়াছে:
أَنْ تَضِلَّ احْدُهُمَا فَتُذكِّرَ احْدُهُمَا الْأُخْرى (البقرة ٢٨٢). "স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুল করিলে তাহাদের অপরজন স্মরণ করাইয়া দিবে" (২:১৮২)।
আল্লাহ্র ইল্ম সম্পর্কে অপর এক আয়াতে ইরশাদ হইয়াছে: لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى (طه ٥٢) "আমার প্রতিপালক ভুল করেন না এবং বিস্মৃতও হন না" (২০ঃ ৫২)।
উপরিউক্ত আয়াত হইতে এই কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইতেছে যে, আরবী ভাষা ও আল-কুরআনের পরিভাষায় ضلالت-এর অর্থ কেবল গোমরাহী নয় বরং ভুলিয়া যাওয়া অর্থেও ইহার প্রয়োগ রহিয়াছে। অনুরূপ ضلالت শব্দের প্রয়োগ পাওয়া যায় সেই অর্থেও যেখানে গোমরাহীকে গোমরাহী বলিয়া মনে হইতেছে, কিন্তু এখনও আল্লাহ্র হিদায়াতের আলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট প্রস্ফুটিত হয় নাই। ত্রুটি অনুভূত হইতেছে, কিন্তু এই ত্রুটির স্থলে এখনও সঠিক পন্থা উদ্ভাবিত হয় নাই। অজ্ঞতার কুফল অনুভূত হইতেছে, কিন্তু এখনও জ্ঞানের সিংহদ্বার উন্মুক্ত হয় নাই। ইহাই হইল নবুওয়াতের পূর্বাবস্থার উপমা। হযরত মূসা ('আ) নবুওয়াত লাভের পূর্বাবস্থায় একজন নিগৃহীত কিবতীকে ঘুষি দিয়াছিলেন, যাহার আঘাতে আকস্মিক লোকটি মারা যায়। নবুওয়াত লাভের পর যখন তিনি আবির্ভূত হইলেন তখন ফিরআওন তাঁহাকে এই বলিয়া অভিযুক্ত করিল যে, তুমি আমার ফেরারী আসামী। তখন মূসা ('আ) এই বলিয়া জওয়াব দিয়াছিলেন:
فَعَلْتُهَا إِذًا وَأَنَا مِنَ الضَّالِّينَ (الشعراء ٢٠).
"আমি ইহা করিয়াছিলাম তখন যখন আমি ছিলাম অনবধান" (২৬ : ২০)।
এই ضلالت বা অনবধানতার অর্থ ছিল, তখন আমি নবুওয়াতের মর্যাদায় আসীন ছিলাম না। কেননা এই কথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মূসা ('আ) নবুওয়াত লাভের পূর্বে কোন গোমরাহীর কথা বলেন নাই। ইহা ছাড়া তিনি না কোন প্রতিমার পূজা করিয়াছিলেন, না ফিরআওনকে সিজদা করিয়াছিলেন বা অন্য কোন শিরকী কাজে লিপ্ত হইয়াছিলেন। চপেটাঘাতের ফলে কোন দুর্বল ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যুর জন্য প্রহারকারী ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী বলিয়া দায়ী করা যায় না। ইহা তাঁহার ইচ্ছাকৃত গুনাহও নয় যাহাকে গোমরাহী বলিয়া আখ্যা দেওয়া যায়। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, এই স্থলে মূসা ('আ) নিজেকে গোমরাহ বলিয়া আখ্যায়িত করিবার অর্থ হইল তখন ছিল তাঁহার নবুওয়াত পূর্ববর্তী অবস্থা। নবুওয়াত পরবর্তী অবস্থার তুলনায় পূর্ববর্তী অবস্থাকে গোমরাহী বলা হইয়াছে। নবুওয়াতের এই পূর্ববর্তী অবস্থাকে অন্যত্র 'গাফলত' বা অসর্তকতা হিসাবে উপস্থাপন করা হইয়াছে। ইউসুফ ('আ)-এর ঘটনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছেঃ
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ. (يوسف-٣)
"আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া, যদিও ইহার পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদিগের অন্তর্ভুক্ত” (১২:৩)।
এখানে যে নবুওয়াত পূর্ববর্তী অবস্থাকে 'গাফলত' বা অনবহিত অবস্থা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে নিম্নোক্ত আয়াতে ইহার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়:
وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِى مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ (شوری ٥٢).
"এইভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছি রূহ (ওহী অথবা আল-কুরআন) তথা আমার নির্দেশ। তুমি তো জানিতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি? পক্ষান্তরে আমি ইহাকে করিয়াছি আলো যাহা দ্বারা আমি আমার বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি; তুমি তো প্রদর্শন কর কেষল সরল পথ" (৪২ঃ ৫২)।
কিতাব (আল-কুরআন) ও ঈমানের নূর ও হিদায়াত লাভের পূর্বের সেই অবস্থাকেই কোন স্থানে গোমরাহী আর কোন স্থানে গাফলত বা অনবধানতা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা প্রকৃত অর্থে পাপী হওয়া, অবাধ্য হওয়া কিংবা গোমরাহ হওয়া নয়, বরং ইহার অর্থ হইল তখন পর্যন্ত হক উদঘাটন করিতে না পারা। ইহাই ছিল তাঁহাদের ক্ষেত্রে গোমরাহী বা অসাবধানতা। অবশেষে তাঁহাদের জীবনে সময় আসিত যখন তাঁহাদের নিকট হেদায়তের আলো উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। তাঁহারা নিজেরা মনযিলে মকসুদে পৌঁছিয়া যাইতেন এবং অন্যদেরকেও সেই পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব তাঁহাদের উপর অর্পিত হইত। একটি আয়াতে হিদায়াত শব্দ দ্বারা নবীগণের নবুওয়াত লাভ করাকে বুঝানো হইয়াছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ اسْحَقَ وَيَعْقُوبَ كُلاً هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ (الانعام ٨٤).
"এবং আমি তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কূব ও ইহাদের প্রত্যেকে সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম; পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম" (৬:৮৪)।
এই আয়াতে হিদায়াত বা সৎপথে পরিচালিত করিবার দ্বারা যদি নবুওয়াত দান করা উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে বাহ্যত বুঝা যাইতেছে যে, নবুওয়াত লাভ করিবার পূর্বকালকে ضلالت বা অনভিজ্ঞতার কাল হিসাবেই ধরিয়া লওয়া হইয়াছে। তবে ইহার দ্বারা কেবল নবুওয়াত লাভের পূর্বকালীন অবস্থাকেই বুঝানো হইয়াছে।
উপরিউক্ত বক্তব্য হইতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামগণের বেলায় যে গোমরাহীর কথা বলা হইয়াছে ইহার দ্বারা পাপাচার, অবাধ্যতা ও পথভ্রষ্টতা বুঝানো হয় নাই, বরং নবুওয়াত লাভের পূর্ব-জীবনকে বুঝানো হইয়াছে যাহা পরবর্তী জীবনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত গোমরাহী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00