📄 নবুওয়াত ও মু'জিযা
নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে যে সকল অস্বাভাবিক ঘটনা প্রকাশ পায় সেইগুলিকে সাধারণত মু'জিযা বলা হয়। তবে ইহা তাঁহাদের নিজেদের ক্ষমতাবলে প্রকাশ পায় না, বরং আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রদত্ত হইয়া থাকে। ইরশাদ হইয়াছে: وَلَقَدْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالْبَيِّنَات (المائدة - ٣٢). "তাহাদের নিকট তো আমার রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদি আনিয়াছিল" (৫ঃ৩২)।
মু'জিযার সংজ্ঞাদানে সায়্যিদ মাহদী আস-সদর বলেন: وَالْمُرَادُ بِالْمُعْجِزَاتِ هِيَ الْأَفْعَالُ الْخَارِقَةُ الَّتِي يُعْجِزُ الْبَشَرُ عَنْهَا عَادَةَ الْمَقْرُونَةُ بِدَعْوَى النُّبُوَّةِ فَإِنْ لَمْ نَقْتَرِنْ بِذلِكَ سُمِّيَتْ كَرَامَةً وَإِرْهَاضًا وَهُوَ مَا يُشْعِرُ بِحُدُوثِ أَمْرٍ غَرِيبٍ خَطِيرٍ.
"মু'জিযা বলিতে সেই সকল কর্মকাণ্ড বুঝায় যাহা প্রদর্শন করিতে সাধারণত মানুষ অক্ষম। এই সকল কর্মকাণ্ডের সহিত নবুওয়াতের দাবি সংশ্লিষ্ট থাকে। নবুওয়াতের দাবি সম্পৃক্ত না থাকিলে ইহাকে কারামত অথবা ইরহাস বলে। ইহা অত্যাশ্চর্য কোন কাজ প্রকাশ হইবার সংবাদবহ হইয়া থাকে"।
মতিউর রহমান নূরী বলেন, নবী-রাসূলগণ দ্বারা যেই সকল অস্বভাবিক অবস্থা, ঘটনা ও ভারধারার সৃষ্টি হয় সাধারণত উহাকে মু'জিযা বলা হইয়া থাকে। কিন্তু কয়েকটি কারণে এই পরিভাষা সঠিক বলিয়া মনে হয় না। প্রথমত এই কারণে যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছের কোথাও এই শব্দটির প্রয়োগ নাই। ইহার পরিবর্তে আয়াত এবং বুরহান শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রাচীন কালের হাদীছ বিশারদগণ উহার পরিবর্তে দলীল বা আলামত শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ব্যবহারের কারণে মু'জিযা শব্দটির সহিত কতিপয় বিশেষ মানসিক ভাবধারা সম্পৃক্ত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে তাহা ত্রুটিমুক্ত নহে। যেমন এই শব্দটি শুনিবামাত্রই সাধারণ মানুষের অন্তরে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, ইহা স্বয়ং নবীর নিজস্ব ক্ষমতায় অনুষ্ঠিত ঘটনা। তাঁহারই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা সম্পাদিত হইয়াছে, উপরন্তু এই শব্দের কারণে উহার মু'জিযা হওয়া যেন উহার নিগূঢ় তত্ত্বের মধ্যেই একান্তভাবে বিলীন হইয়া গিয়াছে। দুইটি ধারণাই মৌলিকভাবে ভ্রান্ত। জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেকের দিক দিয়া মু'জিযা সম্পর্কে যেই সকল প্রশ্ন বা আপত্তি উত্থাপিত হইয়া থাকে, তাহার অধিকাংশ এই মু'জিযা শব্দের ভুল ব্যবহারের কারণে। অতঃপর উপরিউক্ত লেখক বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কোন নবী ও রাসূলের নবুওয়াত দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য দুনিয়ায় যেই সব ঘটনা ঘটাইয়া থাকেন কালাম শাস্ত্রবিদদের মতে তাহাই হইল মু'জিযা। ইহার জন্য কয়েকটি শর্ত রহিয়াছে। অন্যতম এই, ঘটনাটি স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গকারী হইতে হইবে।
📄 নবীগণের চক্ষু ঘুমায়; অন্তর জাগ্রত থাকে
যেই অন্তরগুলিকে আল্লাহ্ তা'আলা ওহী অবতরণের উপযোগী করিয়া সৃষ্টি করেন তাঁহাদের সম্পর্ক আল্লাহ্র সহিত এমন ভাবে হইয়া থাকে যাহা সাধারণত অন্য কাহারও সহিত হয় না। এই জন্য তাঁহারা নিদ্রায় গেলেও তাহাদের কলব বা অন্তর জাগ্রত থাকে। এই কারণে তাহাঁদের স্বপ্নকেও ওহী হিসাবে গণ্য করা হয়। ইবরাহীম (আ) স্বীয় পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-কে কুরবানী করিবার যেই আদেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্বপ্নেই লাভ করিয়াছিলেন। স্বপ্নের হাকীকত ইবরাহীম (আ) অবগত ছিলেন। ইহার সহিত ইসমা'ঈল (আ) ও এই সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন না। যেই কারণে তিনি অকপটে বলিয়াছিলেন: يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ "হে পিতা! আপনি যেই ব্যাপারে আদিষ্ট হইয়াছেন তাহা পালন করুন"। উক্ত আয়াতে স্বপ্নকে আল্লাহ্র আদেশ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই সম্পর্কে বুখারীর হাদীছটি খুবই তাৎপর্যবহ। শারীক ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন:
سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ يُحَدَّثُنَا عَنْ لَيْلَةٍ أُسْرِى بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ مَسْجِدِ الْكَعْبَةِ جَاءَهُ ثَلَاثَةُ نَفَرٍ قَبْلَ أَنْ يُوحَى إِلَيْهِ وَهُوَ نَائِمٌ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَقَالَ أَوَّلُهُمْ أَيُّهُمْ هُوَ فَقَالَ أَوْسَطُهُمْ هُوَ خَيْرُهُمْ وَقَالَ آخِرُهُمْ خُذُوا خَيْرَهُمْ فَكَانَتْ تِلْكَ فَلَمْ يَرَهُمْ حَتَّى جَاءُوا لَيْلَةً أُخْرَى فِيْمَا يَرَى قَلْبُهُ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَائِمَةٌ عَيْنَاهُ وَلَا يَنَامُ قَلْبُهُ وَكَذَالِكَ الأَنْبِيَاءُ تَنَامُ عَيْنَاهُمْ وَلَا تَنَامُ قُلُوبُهُمْ فَتَوَلَاهُ جِبْرِيلُ ثُمَّ عُرِجَ بِهِ إِلَى السماء.
"আমি আনাস ইবন মালিক (রা)-কে বর্ণনা করিতে শুনিয়াছি, রাসূলল্লাহ (স)-এর নিকট ওহী আসিবার পূর্বে যেই রাত্রিতে তাঁহাকে সফর করানো হইয়াছিল সেই রাত্রে তাঁহার নিকট তিনজন ফেরেশতার একটি দল আগমন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মাসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন। এই তিনজন ফেরেশতার প্রথম জন জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কোনজন? দ্বিতীয় ফেরেশতা জবাব দিলেন, তিনি এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। শেষের ফেরেশতা বলিলেন, সর্বাপেক্ষা উত্তম এই ব্যক্তিকে লইয়া আস। এই রাত্রিতে এই পর্যন্ত কথাবার্তার পর তাহাদেরকে আর দেখা গেল না। অপর এক রাত্রে তাহারা আবার রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁহার নিকট আসিলেন। তাঁহার চক্ষুদ্বয় ঘুমাইত কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকিত। অনুরূপ সকল নবীর চক্ষুদ্বয় ঘুমায় কিন্তু তাঁহাদের অন্তরসমূহ ঘুমায় না। অতঃপর জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে নিজ দায়িত্বে লাইয়া ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করিলেন"।
📄 নবুওয়াতের পদ কি একমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট?
অতীত কালের কোন কোন স্ত্রীলোক বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অসামান্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন এবং ইলম ও মা'রিফাতেও পূর্ণতা লাভে সক্ষম হইয়াছিলেন। ইহাতে কাহারও কোন দ্বিমত নাই। কিন্তু স্ত্রীলোকদের কেহ নবী হইয়াছিলেন কিনা এই সম্পর্কে বিস্তর মতপার্থক্য রহিয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, নবুওয়াতের পদটি সর্বদা একমাত্র পুরুষদের জন্যই নির্দিষ্ট, কোন স্ত্রীলোককে এই পদে মনোনীত করা হয় নাই। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন, কোন কোন স্ত্রীলোককে নবুওয়াতের পদে মনোনীত করা হইয়াছিল। যাহারা এই দ্বিতীয় অভিমত পোষণ করেন তাহারা আবার এই ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত যে, কোন্ কোন্ স্ত্রীলোককে এই পদে মনোনীত করা হইয়াছিল।
এই ব্যাপারে মাওলানা হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, শায়খ আবুল হাসান আশআরী, কুরতবী ও ইবন হাযম প্রমুখ এই অভিমতের প্রতি নমনীয় যে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারেন। এমনকি ইব্ন হায আন্দালুসী এইরূপ দাবি করিয়াছেন যে, হযরত হাওয়া, সারাহ, হাজার, মূসা (আ)-এর মাতা আসিয়া ও মারয়াম (আ) নবী ছিলেন। মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক বলেন, অধিকাংশ ফকীহ এই অভিমত পোষণ করেন যে, স্ত্রীলোক নবী হইতে পারেন। কুরতুবী অবশ্য ইন্ন হাযমের সহিত সংখ্যার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করিয়াছেন। তিনি হযরত সারাহ ও হাজিরা (আ)-কে নবুওয়াতের তালিকা হইতে বাদ দিয়াছেন। পক্ষান্তরে হাসান বসরী, ইমামুল হারামায়ন শায়খ আবদুল আযীয, কাদী ইয়াদ ও ইব্ন কাছীর প্রমুখ স্ত্রীলোকদের নবুওয়াত পদে মনোনীত না হইবার অভিমতকে অগ্রধিকার দিয়াছেন। কাদী ইয়াদ ও ইব্ন কাছীর আরও বলিয়াছেন যে, উম্মতের বেশির ভাগ 'উলামায়ে কিরাম এই অভিমতকে সমর্থন করিয়াছেন।
নারী জাতির মধ্যে কেহ নবী হিসাবে মনোনীত হইতে পারেন কিনা এই প্রশ্নটি অনেকটা উত্থাপিত হইয়াছে হযরত মারয়াম (আ)-কে কেন্দ্র করিয়া। আল-কুরআনে তাঁহার সম্পর্কে যেই সকল প্রশংসামূলক বাণী রহিয়াছে তাহা সাধারণত নবীগণের বেলায়ই প্রযোজ্য হইয়া থাকে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে:
وَاذْ قَالَتِ الْمَلائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللهَ اصْطَفْكِ وَطَهَّرَكَ وَاصْطَفُكَ عَلَى نِسَاءِ الْعَلَمِينَ.
"যখন ফেরেশতাগণ বলিয়াছিল, হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীগণের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন" (৩ঃ ৪২)।
মহান আল্লাহ মারয়াম (আ) ও তৎপরবর্তী নবীগণের উল্লেখের পর তাঁহাদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ أَدَمَ ...... "ইহারাই তাহারা নবীদের মধ্যে যাহাদিগকে আল্লাহ অনুগ্রহ করিয়াছেন আদমের বংশ হইতে ......." (১৯:৫৮)।
আল-কুরআনের আরও বহু আয়াতে মারয়াম (আ)-এর অপূর্ব গুণাবলী ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হইয়াছে যাহা তাঁহার প্রমাণ বহন করে। ইহা ছাড়াও হযরত সারাহ, মূসা (আ)-এর মাতা ও মারয়াম (আ) সম্পর্কে আল-কুরআনের বিবরণ হইতে স্পষ্টত প্রতিভাত হয় যে, আল্লাহ্ ফেরেশতা তাঁহাদের নিকট ওহী লইয়া আগমন করিতেন। ফেরেশতা তাঁহাদেরকে সুসংবাদ শুনাইতেন, আল্লাহ্র পরিচয় ও তাঁহার ইবাদতের কথা তাঁহাদেরকে অবহিত করিতেন। সূরা হৃদ ও সূরা আয-যারিয়াতে হযরত সারাহ-কে, মূসা (আ)-এর মাতাকে সূরা কাসাসে এবং সূরা আল ইমরান ও সূরা মারায়ামে মারয়াম (আ)-কে ফেরেশতাদের মাধ্যমে এবং কোন মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি আল্লাহ তাআলা সম্বোধন করিয়াছেন। নবুওয়াতের ধারা যদিও আদিকাল হইতে একমাত্র পুরুষদের মধ্যেই চলিয়া আসিতেছিল, কিন্তু উপরিউক্ত মহীয়সী স্ত্রীলোকগণের উল্লিখিত অবস্থানের কারণে নবুওয়াত লাভ কেবল পুরুষদের জন্যই সুনির্দিষ্ট, এই দাবির ভিত্তি দুর্বল হইয়া যায়। এই হাদীছটি এতই প্রসিদ্ধ যে, সহীহ বলিয়া স্বীকৃত হাদীছ গ্রন্থেই ইহার বর্ণনা রহিয়াছে। এই হাদীছের কথা বাদই দিলাম। তেমনি পূর্বে উল্লিখিত আল-কুরআনের আয়াত: إِنَّ اللَّهَ اصْطَفك وطَهَّرَك واصطفك .عَلَى نِسَاءِ الْعَلَمِينَ -এর কথাও বাদ দিলে তবুও নিম্নোক্ত আয়াতটি সম্পর্কে কথা থাকিয়া যায়। আছিয়া ও মারয়াম (আ) সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নরূপ উক্তি রহিয়াছে বলিয়া বুখারীতে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِى رضى اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلا أَسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَإِنَّ فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى الطَّعَامِ.
“আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: পুরুষদের মধ্যে বহু লোক পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছেন, কিন্তু স্ত্রীলোকদের মধ্যে ফিরআওন-স্ত্রী আছিয়া ও ইমরান-তনয়া মারয়াম ব্যতীত আর কেহই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে নাই। স্ত্রী জাতির মধ্যে আইশার মর্যাদা হইল সকল খাদ্যের মধ্যে ছারীদের শ্রেষ্ঠত্বের মত” (বুখারী অধ্যায় ৬০, পরিচ্ছেদ ৩২)।
যেই সকল আলিম মনে করেন, স্ত্রীজাতি নবী হইতে পারেন না তাহারা তাহাদের দাবির অনুকূলে নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ فَاسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষ মানুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানিগণকে জিজ্ঞাসা কর" (নাহল: ৪৩)।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ مِّنْ أَهْلِ الْقُرَى.
"তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হইতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম, যাহাদের নিকট ওহী পাঠাইতাম" (১২: ১০৯)।
বিশেষভাবে হযরত মারয়াম (আ)-এর নবুওয়াতের প্রতিকূলে তাহারা এই দলীল পেশ করিয়া থাকেন যে, আল-কুরআনে তাঁহাকে সিদ্দীকা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে:
مَا الْمَسِيحُ بْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ.
"মারয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল। তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে এবং তাহার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল" (৫ঃ ৭৫)।
এই সম্পর্কে হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, সূরা নিসায় পুরস্কৃত ব্যক্তিদের যেই তালিকা আল-কুরআন প্রদান করিয়াছে ইহাতে অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, নবুওয়াতের স্তর হইতে সিদ্দীকিয়াতের স্তর বহু গুণ নিম্নে। ইব্ন হাজার আল-আসকালানী বলেন, ইমাম নাওয়াবী তাঁহার 'আল-আযকার' গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, ইমামুল হারামায়ন শায়খ আবদুল আযীয এই ব্যাপার উম্মতের ইজমা' (সর্বসম্মত অভিমত) প্রমাণ করিতে সক্ষম হইয়াছেন যে, মারয়াম (আ) নবী ছিলেন না। হাসান বসরী বলেন:
لَيْسَ فِي النِّسَاءِ نَبِيَّةٌ وَلَا فِي الْجِنِّ.
"নারী জাতির মধ্যে কোন নবী নাই, অনুরূপ জিন্নদের মধ্যেও কোন নবী নাই”।
স্ত্রীজাতির নবুওয়াতের পক্ষ ও বিপক্ষ এই দুই অভিমতের বাহিরে তৃতীয় আরও একটি অভিমত পাওয়া যায়, তাহা হইল এই ব্যাপারে নীরব থাকা। এই শ্রেণীর আলিমগণ মনে করেন, মহিলাদের নবী হওয়া বা না হওয়া এই সম্পর্কিত কোন অভিমত দান হইতে বিরত থাকা উত্তম। এই শ্রেণীর আলিমদের মধ্যে শায়খ তাকিয়্যুাদ্দীন আস-সুবকীর নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন:
أُخْتُلِفَ فِي هَذِهِ الْمَسْئَلَةِ وَلَمْ يَصِحَ عِنْدِي فِي ذَلِكَ شَيْئً.
"এই সম্পর্কে বিতর্ক; তবে আমার মতে এই সম্পর্কিত কোন অভিমতই বিশুদ্ধ নয়"।
মহিলাদের নবুওয়াতের পক্ষে যাহারা অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হাদীছবেত্তা হইলেন ইব্ন্ন হাযম আন্দালুসী। তিনি তাঁহার সমসাময়িক স্পেনে এই সম্পর্কে তীব্র মতবিরোধের কথা উল্লেখ করিয়া বলেন, যাহারা মহিলাদের নবুওয়াত পদে মনোনীত হইবার বিরোধিতা করেন তাহাদের নিকট এই অস্বীকৃতির কোন দলীল পরিলক্ষিত হয় না। অবশ্য কেহ কেহ এই অস্বীকৃতির পিছনে এই দলীল উত্থাপন করিয়া থাকেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلاَّ رِجَالاً نُوْحَى إِلَيْهِمْ অতঃপর তিনি বলেন যে, আল্লাহ্ তাআলা স্ত্রীলোককে মাখলুকের হিদায়াতের জন্য রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন।
বিতর্ক হইল নবুওয়াত সম্পর্কে, রিসালাত সম্পর্কে নয়। অতএব আসা যাউক মধুওয়াত শব্দের বিশ্লেষণে। আরবী অভিধান অনুসারে নবুওয়াত শব্দটি اَنْبَاَ ধাতু হইতে নিস্পন্ন যাহার অর্থ হইল 'অবহিতকরণ'। সুতরাং ইহা হইতে বুঝা যায় যেই ব্যক্তিকে, আল্লাহ তাআলা কোন বিষয় সংঘটিত হইবার পূর্বে ওহীর মাধ্যমে অবহিত করেন কিংবা অন্য কোন বিষয়ে তাঁহার প্রতি ওহী নাযিল করেন, তিনিই হইলেন নিঃসন্দেহে নবী। এখানে ওহী বলিতে সেই ইলহাম অর্থ হইবে না যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার সৃষ্টির কোন কোন জীবের মধ্যে স্বভাবত প্রদান করিয়া থাকেন। যেমন মৌমাছি সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে: وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ অনুরূপ ওহী বলিতে ধারণা ও অনুমানও লওয়া যাইবে না। কারণ এই দুইটি অনুভূতিকে নিশ্চিত জ্ঞান (علم يقين) মনে করা যায় না। ওহী বলিতে এখানে শয়তানদের আকাশ হইতে চুরি করিয়া শ্রবণ করা বিষয়ও হইবে না, যাহার সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوا شَيْطِيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ يُوْحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ.
"এইরূপে আমি মানব'ও জিন্নের মধ্যে শয়তানদিগকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করিয়াছি, প্রতারণার উদ্দেশে তাহাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা প্ররোচিত করে" (৬: ১১২)।
কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের ফলে আকাশ হইতে এইরূপ কিছু শ্রবণ করিবার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। অনুরূপ এখানে ওহী বলিতে জ্যোতিষবিদ্যাও নয় যাহা শিখা ও শিখানো দ্বারা অর্জিত হয়। ওহী বলিতে স্বপ্ন অর্থ লওয়া যাইবে না, যাহা সত্য হওয়ার কোন নিশ্চয়তা নাই বরং এখানে ওহী বলিতে সেই স্বতন্ত্র অর্থ হইবে যাহা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইচ্ছায় কোন ব্যক্তিকে এমন কিছু অবহিত করেন যাহা তিনি পূর্বে জানিতেন না। যাহারা মহিলাদের নবী হওয়াকে অস্বীকার করেন তাহারা যদি নবুওয়াতের এই অর্থ গ্রহণ না করেন, তাহা হইলে নবুওয়াতের আসল অর্থ কি তাহার ব্যাখ্যা আবশ্যক। প্রকৃত কথা হইল, তাহারা নবুওয়াতের এই অর্থ ব্যতীত অন্য কোন অর্থই প্রকাশ করিতে পারিবেন না। কুরআন মাজীদে উল্লেখ আছে, আল্লাহ তাআলা স্ত্রীলোকদের নিকট ফেরেশতা পাঠাইয়াছিলেন এবং তাহাদের মাধ্যমে ঐ স্ত্রীলোকদের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলেন। ফেরেশতারা সারাহ্ (রা)-এর নিকট আসিয়া তাঁহাকে ইসহাক (আ)-এর সুসংবাদ দান প্রসঙ্গে ইরশাদ হইয়াছে: وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشِّرْنَهَا بِاسْحَقَ وَمَنْ وَرَاءِ اسْحَقَ يَعْقُوبَ قَالَتْ يُوَيْلَتَي ءَاَلِدٌ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهُذَا بَعْلِى شَيْئًا إِنَّ هَذَا لَشَيْئً عَجِيْبُ. قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ رَحْمَتُ اللهِ وَبَرَكْتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْْبَيْتِ.
"আর তাহার স্ত্রী দণ্ডায়মান এবং সে হাসিয়া ফেলিল। অতঃপর আমি তাহাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়া'কূবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলিল, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! ইহা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তাহারা বলিল, আল্লাহ্ কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করিতেছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রহিয়াছে আল্লাহ্ অনুগ্রহ ও কল্যাণ" (১১ : ৭১-৭২)।
এই আয়াতে ইসহাক জননী সারাহ্ (রা) নবী না হইলে ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁহার সহিত কথা বলা কি করিয়া সম্ভব হইবে?
অনুরূপ দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ)-কে মারয়াম (আ)-এর নিকট পাঠাইলেন এবং তিনি মারয়াম (আ)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেন: إِنَّمَا أَنَا رَسُولُ رَبِّكِ لِأَهَبَ لَكِ غُلَامًا زَكِيًّا . "আমি তোমার প্রতিপালক প্রেরিত তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করিবার জন্য” (১৯: ১৯)।
এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে যে, মারয়াম (আ)-এর নিকট জিবরাঈল (আ)-এর আগমন ঘটিয়াছিল। এই প্রকৃত ওহী নবুওয়াত না হইলে নবুওয়াত বলিতে কী বুঝায়? অনুরূপ মূসা (আ)-এর মাতা সম্পর্কে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَالْقِيْهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ.
"মূসা জননীর অন্তরে আমি ইংগিতে নির্দেশ করিলাম, শিশুটিকে স্তন্যদান করিতে থাক। যখন তুমি তাহার সম্পর্কে কোন আশংকা করিবে তখন ইহাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করিও এবং ভয় করিও না, দুঃখ করিও না। আমি অবশ্যই ইহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব এবং ইহাকে রাসূলদের একজন করিব" (২৮ঃ ৭)।
এখানে আল্লাহ তা'আলা মূসা জননীর প্রতি ওহী প্রেরণের যেই কথা ব্যক্ত করিলেন তাহা জানিয়াও কেহ কি সংশয় করিবে যে, ইহা নবুওয়াতের বিষয় নয়? সামান্যতম বিবেকবান মানুষও এই কথা উপলব্ধি করিতে পারিবে যে, আল্লাহ প্রদত্ত নবুওয়াত ব্যতীত কেহ কেবল স্বপ্ন দর্শনের মাধ্যমে কিংবা মনের তাড়নায় এইরূপ কাজ করিতে সাহস পাইবে না। ইহা ছাড়াও মারয়াম (আ)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে তো আরও দলীল রহিয়াছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার কথা নবীগণের সহিত উল্লেখ করিবার পর ইরশাদ করিয়াছেন:
أُولئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ..
প্রতিপক্ষের একটি কথা যে মারয়াম (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তিনি 'সিদ্দীকা'- তাঁহার এই উপাধি তাঁহার নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। যেমন সর্বজনস্বীকৃত নবী ইউসুফ (আ)-এর জন্য সিদ্দীক উপাধি তাঁহার নবুওয়াতের পরিপন্থী নয়। ইরশাদ হইয়াছে يُوْسُفُ أَيُّهَا الصديق সারাহ্, মারয়াম ও মূসা জননীর সহিত নবুওয়াত পদমর্যাদায় আছিয়াও সম্পৃক্ত হইয়া যাইবেন। কারণ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে:
كَمُل مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَلَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلا مَرْيَمُ ابْنَةُ عمران واسية.
(আবূ মুহাম্মাদ আলী ইব্ন আহমদ ইব্ন হায্য, আল ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, বৈরুত ১৯৭৫ খৃ. ৩খ., পৃ. ৫১৭; হিফজুর রহমান সিউহারূবী, কাসাসুল কুরআন, ৪খ., পৃ. ২৭)।
ইবন হাযম আন্দালুসীর এই দীর্ঘ বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করিতে গিয়া হিফজুর রহমান সিউহারবী বলেন, ওহীর অভিধানিক অর্থসমূহ, যেমন ভাব, মনের ধারণা, অন্তরের উদ্রেক ও ইলহাম ইত্যাদি যদি বাদ দিয়া পারিভাষিক অর্থ যাহা আল-কুরআন নবী ও রাসূলগণের জন্য কেবল নির্দিষ্ট করিয়াছে ইবন হাম্ এই প্রসিদ্ধ অর্থ গ্রহণ করিলে ইহার দুইটি রূপ হইবে। (এক) এই ওহীর সম্পর্ক হইবে হিদায়াত, শিক্ষাদান ও আদেশ-নিষেধাবলীর সহিত। (দুই) ইহার সম্পর্ক হইবে সুসংবাদদান, ভবিষ্যতে হইবে এমন কিছু অবহিতকরণ কিংবা প্রত্যাদিষ্ট ব্যক্তির বিশেষ করিয়া কোন আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত। প্রথম প্রকার ওহীর সম্পর্ক হইল এই নবুওয়াতের সহিত যাহার সহিত রিসালাত সম্পৃক্ত। এই প্রকারের নবুওয়াত কেবল পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। এই ব্যাপারে কাহারও দ্বিমত নাই। দ্বিতীয় ধরনের ওহী ইব্ন হাযম ও তাঁহার অনুবর্তী উলামার মতে নবুওয়াতের একটি শ্রেণী। কারণ সূরা শূরায় নবীগণের উপর ওহী অবতীর্ণ হইবার যেই পন্থা বর্ণনা করা হইয়াছে ইহা এই ওহীর উপর আরোপিত হয়। ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَائِي حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوْحِيَ بِاذْنِهِ مَا يَشَاءُ إِنَّهُ عَلَى حَكِيمٌ.
"মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ তাহার সহিত কথা বলিবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে যেই দূত তাঁহার অনুমতিক্রমে তিনি যাহা চাহেন তাহা ব্যক্ত করেন; তিনি সমুন্নত প্রজ্ঞাময়" (৪২: ৫১)।
আল-কুরআন যখন ওহীর এই দ্বিতীয় প্রকারের প্রয়োগ সুস্পষ্ট 'নস' (نص) দ্বারা মারয়াম, সারাহ্, উম্মু মূসা (আ)-এর উপর করিয়াছে, সুতরাং এই বিদূষী মহিলাগণের বেলায় নবী শব্দের প্রয়োগ অকাট্যভাবে সহীহ। মাওলানা হিফজুর রহমান আরও বলেন, এই বিশ্লেষণ হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, স্ত্রীলোকদের নবুওয়াত লাভের অস্বীকৃতির ব্যাপারে ইমামুল হারামায়ন ইজমার যেই দাবি করিয়াছেন তাহা সহীহ নয়। তিনি বলেন, ইব্ন কাছীর যে এই দাবি করিয়াছেন যে, জমহুর মহিলাদের নবুওয়াত লাভের বিপক্ষে- এই কথার সহিত আমার দ্বিমত রহিয়াছে। অবশ্য বেশিরভাগ সম্ভবত পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দান করা হইতে বিরত থাকাকে পসন্দ করিয়াছেন।
📄 নবুওয়াত ও মানবীয় সত্তা
নবী-রাসূলগণ আল্লাহ ও তাঁহার বান্দাহগণের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র মাধ্যম। মানবজাতির প্রতি তাঁহারা আল্লাহ্র দূত। মানুষের প্রতি আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ সম্বলিত জীবনবিধান তাঁহারাই আল্লাহর নিকট হইতে ওহীর মাধ্যমে গ্রহণ করেন এবং মানবজাতির নিকট পৌঁছাইয়া দেন। আল্লাহ কিসে সন্তুষ্ট এবং কিসে অসন্তুষ্ট, একান্তভাবে আল্লাহ্র দাস হইয়া জীবন যাপন করার পন্থা ও পদ্ধতি কি, এই সকল কথা বান্দাদের পক্ষে অবগত হওয়া একান্তই অপরিহার্য। অন্যথায় আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়া যায়। এই কারণে আল্লাহ স্বয়ং মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্বরূপে নবী-রাসূলগণকে পাঠাইয়াছেন।
আল্লাহ্ একনিষ্ঠ বান্দা হইবার জন্য মানুষের সম্মুখে একটি আদর্শ থাকা একান্তই জরুরী যাহাকে তাহারা অনুসরণ করিবে। একজন মানুষ যখন নিজের পূর্ণাঙ্গ জীবনকে আল্লাহ্র বিধান পালনের মাধ্যমে তৈরি করে তখন সে অন্য মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হইতে পারে। সেই মানুষটিকে অনুসরণ করিয়া জনগণ আল্লাহ্র বান্দারূপে গড়িয়া উঠিতে পারেন। এইরূপ এক অনুসরণীয় আদর্শ ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিধান পালন ও আল্লাহর অনুগত বান্দারূপে গড়িয়া উঠা সম্ভব হয় না। ঠিক এই কারণেই আল্লাহ তা'আলা মানুষের মধ্য হইতেই অনুসরণীয় আদর্শরূপে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছেন। মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ একজন মানুষই হইতে পারে, ফেরেশতা বা জিন্ন হইতে পারে না। কেননা ফেরেশতা ও জিন্নরা প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ হইতে সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা জিন্ন বা ফেরেশতাকে নবী-রাসূল বানাইয়া পাঠান নাই।
কিন্তু কাফিররা এই তত্ত্ব বুঝিতে পারে নাই। তাহারা মনে করে, মানুষ কি করিয়া আল্লাহ্র নবী বা রাসূল হইতে পারে? তাহাদের ধারণা, জিন্ন বা ফেরেশতাই আল্লাহর নবী বা রাসূল হইতে পারেন। আল্লাহ্ তা'আলা কাফিরদের এই ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ مَلَكٌ وَلَوْ أَنْزَلْنَا مَلَكًا لَّقُضِيَ الْأَمْرُ ثُمَّ لَا يُنْظُرُونَ. وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلاً وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِمْ مَا يَلْبِسُونَ. (الانعام اية ٨-٩)
"তাহারা বলে, তাহার নিকট কোন ফেরেশতা কেন প্রেরিত হয় নাই? যদি আমি ফেরেশতা প্রেরণ করিতাম তাহা হইলে চূড়ান্ত ফয়সালাই তো হইয়া যাইত, আর তাহাদিগকে কোন অবকাশ দেওয়া হইত না। যদি তাহাকে ফেরেশতা করিতাম তবে তাহাকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করিতাম, আর তাহাদিগকে সেরূপ বিভ্রমে ফেলিতাম যেরূপ বিভ্রমে তাহারা এখন রহিয়াছে" (৬:৮-৯)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরবিদ ফাখরুদ্দীন রাযী বলেন, নবুওয়াত যাহারা অস্বীকার করে তাহাদের ইহা তৃতীয় অভিযোগ। তাহাদের অভিযোগের সারকথা হইল, আল্লাহ যদি সৃষ্টি জগতের প্রতি নবী-রাসূল প্রেরণ করিতেন তাহা হইলে নিশ্চয় সেই নবী ফেরেশতাদের একজন হইতেন। কারণ নবী-রাসূলগণ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে মনোনীত হইলে তাহারা প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী হইতেন, তাহাদের শক্তি-সামর্থ্য বেশী হইত, তাহারা মহান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হইতেন, সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাহারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হইতেন ইত্যাদি। ফেরেশতাদের মধ্যে নবুওয়াত প্রদানে যেখানে সন্দেহে পতিত হইবার সম্ভাবনা কম সুতরাং নবী প্রেরণ করিলে তাহাদের হইতে কোন একজনকে মনোনীত করা আবশ্যক ছিল। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের এই অভিযোগের জওয়ার দুই ভাবে দান করিয়াছেন।
একটি হইল لَوْ أَنْزَلْنَا مَلَكًا لَقُضِيَ الْأَمْرُ অর্থাৎ মানুষের উপর ফেরেশতাকে অবতরণ করা হইল একটি মহান নিদর্শন। এই মহান নিদর্শন নাযিল করিবার পরও যদি অবিশ্বাসিগণ ঈমান গ্রহণ না করে তাহা হইলে সমূলে ধ্বংস হইয়া যাওয়া তাহাদের জন্য অনিবার্য হইয়া যাইবে। কারণ আল্লাহর বিধান হইল, মহান নিদর্শন প্রকাশ হইবার পরও যাহারা ঈমান আনে না তাহাদের উপর চরম শাস্তি আপতিত হওয়া। এই কারণে আল্লাহ্ তাহাদের প্রতি কোন ফেরেশতা প্রেরণ করেন নাই যাহাতে অস্বীকার করার মাধ্যমে তাহারা শাস্তির উপযুক্ত না হয়।
দ্বিতীয় কারণটি হইল, মানবজাতি যখন ফেরেশতাকে অবলোকন করিত তখন হয়ত তাহাকে আসল অবয়বে দেখিতে পাইত কিংবা মানব আকারে দেখিত। ফেরেশতাকে আসল অবয়বে দেখিবার পর মানুষ জীবিত থাকিত না। যেমন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) যখন জিবরাঈল (আ)-কে তাঁহার স্বীয় আকৃতিতে দেখিয়াছিলেন তখন তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছিলেন। আর যদি ফেরেশতাকে মানব আকারে দেখে তাহা হইলে মানুষ আর ফেরেশতার মধ্যে পার্থক্য রহিল কোথায়? মানব আকৃতিতে ফেরেশতাকে নবী বানানো আর স্বয়ং মানুষের মধ্য হইতে কাহাকেও নবী বানানোর মধ্যে কোন তফাৎ নাই।
এই সম্পর্কে'সীরাতুন নবী' গ্রন্থে বলা হইয়াছে, নবী যিনি হইয়া থাকেন তাঁহার কতক গুলি পবিত্র বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামের শিক্ষা হইল: নবী আল্লাহ্ মাখলুক, তাঁহার বান্দা এবং তিনি মানুষই হইয়া থাকেন। তিনি আল্লাহ্র অবতার, দেবতা কিংবা ফেরেশতা নহেন। ইসলামের পূর্বে ইয়াহুদীদের এমন একদল লোক ছিল যাহারা নবীগণকে কেবল একজন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা মনে করিত। ইহা ব্যতীত অন্যান্য সকল পর্যায়ে তাঁহাদেরকে তুচ্ছ মানুষ মনে করিত। ইহারা এই বিশ্বাস রাখিত যে, নবীগণ সর্বপ্রকার পাপকার্যে লিপ্ত হইতেন, দুশ্চরিত্রতা তাঁহাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকিত। কোন কোন সময় তাহারা কুফরী কাজ করিয়াও বসিতেন। এত কিছুর পরও তাঁহাদেরকে নবী মনে করা হইত।
অন্যদিকে খৃস্টানরা তাহাদের মুক্তিদাতাকে মানবতার গন্ধ হইতে পবিত্র, এমনকি তাহাদেরকে প্রভু বা প্রভুর অংশবিশেষ মনে করিত। হিন্দুরাও তাহাদের পথপ্রদর্শকদেরকে দেবতা, অবতার এবং মানবরূপী প্রভু মনে করিত।
ইসলাম ধর্ম এই সকল মতবাদে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করিয়াছে। ইসলামের শিক্ষা হইল: একদিক দিয়া নবীগণ হইলেন মাখলুক, মানব, আল্লাহর বান্দা এবং তাঁহার নিকট সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণকারী। কিন্তু অন্য দিক দিয়া তাঁহারা আল্লাহর মনোনীত মা'সূম (নিষ্পাপ), পূত ও পবিত্র এবং তাঁহারই করুণা লাভের দ্বারা পুণ্য এবং হিদায়াতের চালিকাশক্তি। আল্লাহ্ই অনুগ্রহে তাঁহারা এমন সব কাজ সমাধা করিতে পারেন যাহা অন্যদের পক্ষে কল্পনাই করা যায় না। আরববাসীরা হিন্দু, গ্রীক ও খৃস্টানদের ন্যায় এই আকীদা পোষণ করিত যে, মানবজাতির হিদায়াতের জন্য মানুষের মধ্য হইতে কোন লোককে নবী বানাইলে তাহা যথার্থ হইবে না, বরং মানুষের ঊর্ধ্বের কোন সত্তার প্রয়োজন। সেই সত্তাটি হইবে একমাত্র ফেরেশতাদের মধ্য হইতে। আল-কুরআন তাহাদের উক্ত আকীদাকে স্থানে স্থানে ভ্রান্ত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। বলা হইয়াছে, যদি পৃথিবীতে ফেরেশতাগণ বসবাস করিত, তাহা হইলে কোন ফেরেশতাকে তাহাদের মধ্যে নবী-রাসূল বানাইয়া প্রেরণ করা হইত। আর যদি মানবজাতির মধ্যে ফেরেশতা নবী হিসাবে আগমন করিতেন তাহা হইলে মানবরূপেই আসিতেন। যদি এমন হইত তাহা হইলে তোমরা এই ফেরেশতাকে কি করিয়া ফেরেশতা হিসাবে মান্য করিতে? সারকথা, নবীগণের দুইটি দিক রহিয়াছে। একটি হইল, তাঁহারা মানুষরূপেই আবির্ভূত হইতেন, মানুষের মতই পানাহার করিতেন, হাটা-চলা, নিদ্রা-অনিদ্রা, বিবাহ-শাদী ও জীবন-মরণ সবকিছুই মানুষের ন্যায় হইত। দ্বিতীয়টি হইল, তাঁহারা আধ্যাত্মিকতা, নিষ্পাপতা, পবিত্রতা ও নবুওয়াতের অনুপম আদর্শের ফলে মানবকুল হইতে বহু ঊর্ধ্বে অবস্থান করিতেন। ইহার ফলে যাহারা ইয়াহুদীদের মত নবীগণের মানব হইবার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতেন তাহারা তাঁহাদিগকে সর্বক্ষেত্রে সামান্য মানুষ মনে করিতেন। অপরদিকে খৃস্টানদের মত যাহারা তাঁহাদের সাধারণ মানবতার ঊর্ধ্বের বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতি দৃষ্টি দিতেন তাহারা উহাদের মধ্যে প্রভুত্বের গুণাবলী প্রমাণ করিতে ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িতেন।
নবুওয়াতের প্রকৃত মাকাম কিন্তু এই দুইয়ের মাঝামাঝি। মানবিক গুণাবলীর প্রেক্ষিতে নিসন্দেহে তাঁহারা মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে তাঁহারা সাধারণ মানবিক গুণাবলী হইতে অজস্র গুণ ঊর্ধ্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তাঁহারা মানবতার উপরের স্তরের মানব। এই কারণেই অবিশ্বাসীরা, বিভিন্ন সময়ে প্রেরিত নবীগণ যখন তাহাদেরকে স্বীয় নবুওয়াত ও আল্লাহ্র পথে আহবান জানাইতেন, তখন তাহারা নবীগণের মানবিক গুণাবলী দেখিয়া বলিত, আপনারা তো আমাদের মতই মানব। তাই আপনারা কেমন করিয়া আল্লাহ্র নবী বা দূত হইতে পারেন? আল্লাহ তা'আলা অবিশ্বাসীদের এই অভিযোগ এইভাবে উত্থাপন করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَّسُولاً (الاسراء - ٩٤ ).
"যখন উহাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকদিগকে ঈমান আনা হইতে বিরত রাখে উহাদের এই উক্তি: আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন" (১৭:১৪)।
অবিশ্বাসিগণ মানব হওয়াকে রিসালাতের পরিপন্থী মনে করিত। ইহার জাওয়াবে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নিম্নোক্ত নির্দেশ দেন:
قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلا بَشَرًا رَّسُولاً (الاسراء - ٩٣)
"বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭: ৯৩)।
অবিশ্বাসিগণের এই ব্যাপারে সংশয় ছিল যে, পথহারা মানবজাতিকে কোন মানুষ কি পথ প্রদর্শন করিতে পারিবে? আল-কুরআনে তাহাদের অভিযোগ এইভাবে উত্থাপিত হইয়াছে:
ذَلِكَ بِأَنَّهُ كَانَتْ تَأْتِيهِمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالُوا أَبَشَرٌ يَهْدُونَنَا فَكَفَرُوا وَتَوَلَّوا وَاسْتَغْنَى اللهُ وَاللَّهُ غَنِيٌّ حَمِيدٌ (التغابن - ٦ ) .
"উহা এইজন্য যে, উহাদের নিকট উহাদের রাসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিত তখন উহারা বলিত, মানুষই কি আমাদিগকে পথের সন্ধান দিবে? অতঃপর উহারা কুফরী করিল ও মুখ ফিরাইয়া লইল। কিন্তু ইহাতে আল্লাহ্ কিছু আসে যায় না; আল্লাহ্ অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ" (৬৪:৬)।
এই সংশয়ে পতিত হইয়া খৃস্টানগণ হযরত 'ঈসা (আ)-এর 'মানব' হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করিয়া বসিল। তাহাদের যুক্তি ছিল, উত্তরাধিকার সূত্রে যেই মানবজাতি পাপী-তাপী তাহাদেরকে মানব সন্তান কিভাবে মুক্তি দিতে পারিবে? তাহাদের এই ধারণা যথার্থ ছিল না। কারণ মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাপাচারী নহে। তাহাদের মধ্যে যেমন পাপী-তাপী রহিয়াছে, তেমনি নিষ্পাপ লোকও রহিয়াছে। নিষ্পাপ হইবার জন্য মানবতার ঊর্ধ্বের হওয়া জরুরী নয়। অবিশ্বাসিগণ এই বিষয়টি উপলব্ধি করিতে পারে নাই। তাহারা নবীগণকে রক্তে মাংসে নিজেদের মত মানুষ ভাবিয়া তাহাদেরকে নবুওয়াত লাভের অনুপযুক্ত ভাবিত। ইরশাদ হইয়াছে:
قَالُوا إِنْ أَنْتُمْ إِلا بَشَرٌ مِثْلُنَا (ابراهيم - ١٠) .
"উহারা বলিত, তোমরা তো আমাদেরই মত মানুষ” (১৪: ১০)। তাহারা অন্যান্য লোকদিগকে ও নবীকে অস্বীকার করিবার জন্য এই কথা দিয়া উদ্বুদ্ধ করিত। তাহাদের উক্তি ছিল:
هَلْ هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ (الانبياء - ٣) .
"সে তো তোমাদের মত একজন মানুষই” (২১ঃ ৩)।
فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَأَنْزَلَ مَلَائِكَةً ( المؤمنون - ٢٤ ) .
"তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল, তাহারা (লোকদিগকে) বলিল, সেতো তোমাদের মত একজন মানুষই, তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে চাহিতেছে; আল্লাহ ইচ্ছা করিলে একজন ফেরেশতাই পাঠাইতেন” (২৩ঃ ২৪)।
وَقَالَ الْمَلَأُ مِنْ قَوْمِهِ الَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِلِقَاءِ الْآخِرَةِ وَأَتْرَفْتُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا مَا هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُوْنَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُونَ ( المؤمنون - ٣٣) .
"তাহার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ, যাহারা কুফরী করিয়াছিল ও আখিরাতের সাক্ষাৎকার অস্বীকার করিয়াছিল এবং যাহাদিগকে আমি দিয়াছিলাম পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগসম্ভার, তাহারা বলিয়াছিল, সেতো তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা যাহা আহার কর, সে তাহাই আহার করে এবং তোমরা যাহা পান কর, সেও তাহাই পান করে" (২৩: ৩৩)।
অবিশ্বাসিগণ নবীদের উপর ঈমান না আনার উদ্দেশ্যে তাঁহাদের আহবানের জবাবে ।مَا أَنْتَ الأَبَشَرُ مِثْلُنَا - (شعراء - ٢٦:١٥٤)- “তুমি তো আমাদের মতই একজন মানুষ” (২৬:১৫৪) : قَالُوا مَا أَنْتُمْ الأَ بَشَرٌ مِّثْلُنَا - (يس-١٠) “উহারা বলিল, তোমরা আমাদরে মতই মানুষ" (ইয়াসীন ১৫)। مَا نَرَاكَ الأَبَشَرًا مِّثْلُنَا (হুদ - ২৭) “আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ব্যতীত কিছু দেখিতেছি না” (১১: ২৭)। নবীগণ তাহাদের অভিযোগের জবাবে সব সময় ইহাই বলিতেন, হাঁ, আমরা তোমাদের ন্যায় অবশ্যই মানুষ। তবে আমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও কৃপালাভের মাধ্যমে ধন্য। প্রকৃতপক্ষে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে তফাৎ এখানেই। আল-কুরআনের ভাষায়: قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَّحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ (ابراهيم ٦١).
"উহাদের রাসূলগণ উহাদিগকে বলিত, সত্য বটে, আমরা তোমাদের মত মানুষই। কিন্তু আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন" (১৪:১১)।
"অবিশ্বাসিগণের দৃষ্টি ছিল নবীগণের স্বাভাবিক 'মানব হওয়ার' দিকে। নবীগণ উত্তরে তাহাদের অভিযোগকে মানিয়া তাঁহারা যে অপর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইহার কথাও বলিয়া দিলেন। তাঁহারা বলিলেন, আমরা মানুষ বটে, তবে এমন মানুষ যাহাদের উপর আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও অনুকম্পার বারি বর্ষিত হইয়াছে, যাঁহাদেরকে নবুওয়াতের দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করা হইয়াছে। অন্যান্য নবীগণের মত খাতিমু'ল আম্বিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-ও এই কথাই বারংবার ইরশাদ করিয়াছেন। কথাটি মূলত আল্লাহ তা'আলাই ওহীর মাধ্যমে তাঁহার দ্বারা ব্যক্ত করাইয়াছেন যে, "আপনি বলিয়া দিন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ"। তাঁহার এই ঘোষণা আসলে সেই ভ্রান্ত আকীদার মূলোৎপাটনের জন্য ছিল যাহা নবীগণ সম্পর্কে খৃস্টানগণ পোষণ করিত। উহারা নবীগণকে আল্লাহ্র মর্যাদায় সমাসীন মনে করিত। ইহার প্রভাব সাময়িক কালের কিছু লোকের মধ্যেও পড়িয়াছিল। অপরদিকে এই ঘোষণা হইতে সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন একদল লোক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, নবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন তফাৎ নাই। সাধারণ মানুষের উপর তাঁহাদের কোন উচ্চ মর্যাদাও নাই। হাঁ, তবে তাহাদের উপর ওহী আসিত যাহা সাধারণ মানুষ লাভ করিতে পারে নাই। তাহাদের কথার সার ছিল এই যে, নবী কেবল ওহী আসার সময় নবুওয়াতের মর্যদা লাভ করিতেন। ওহী আসার পূর্বে বা পরে তাহারা সাধারণ মানুষ হইয়া যান। ক্ষুদ্র একটি দল আরও কিছু অগ্রসর হইয়া এই দাবি উত্থাপন করিল যে, মুহাম্মাদ (স)-এর উপর কুরআনরূপে যেই ওহী আসিত কেবল তাহাই নবীর আদেশ-নিষেধ। ইহা ব্যতীত আল-কুরআনের আয়াত ভিত্তিক নয় এমন সকল আদেশ-নিষেধকে তাহারা তাঁহার বিবেচনামূলক ও শান্তি-শৃংখলাজনিত আদেশ বলিয়া মনে করে। এই সম্পর্কে তাহারা বলে যে, ইহা ইসলামী বিধান নয়, এমনকি তাহা ইসলামের অনুসরণীয় অংশবিশেষও নয়। এই ধারণার সূত্রপাত হইয়াছে মূলত নবুওয়াত সম্পর্কে যাহারা অযৌক্তিক সীমাহীন উচ্চ ধারণা পোষণ করেন তাহাদের প্রতিরোধে। তবে ইহাও নবুওয়াতের মর্যাদাকে তুচ্ছ জ্ঞান করামূলক একটি ভ্রান্ত ধারণা। বস্তুত এতদুভয়ের মাঝখানেই রহিয়াছে নবুওয়াতের প্রকৃত হাকীকত বা মর্যাদা।
আবদুল করীম আল-খাতীব বলেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী যদি নবী বা রাসূল ফেরেশতাদের মধ্য হইতে হইতেন তাহা হইলে তাঁহার সহিত মানবজাতির কোন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হইত না। তাহাদের কোন কল্যাণও হইত না। পক্ষান্তরে তাহারা ধোকাগ্রস্ত হইত এবং নবুওয়াত সম্পর্কে অমনোযোগী হইয়া পড়িত। ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَّسُولًا، قُلْ لوكَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولاً. "যখন উহাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকদিগকে ঈমান আনা হইতে বিরত রাখে তাহাদের এই উক্তিঃ আল্লাহ্ কি মানুষকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন? বল, ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হইয়া পৃথিবীতে বিচরণ করিত তবে আমি আকাশ হইতে উহাদের নিকট অবশ্যই ফেরেশতা রাসূল করিয়া পাঠাইতাম" (১৭: ৯৪-৯৫)।
আবদুল কারীম আল-খাতীব আরও বলেন, ফেরেশতাদের অবস্থান মানুষের মধ্যে কিভাবে শান্তিপূর্ণ হইবে? কারণ পরীক্ষা করার সময় ব্যতীত অন্য কোন সময়ে ফেরেশতার মানব সমাজে স্বরূপে প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়। আর যখনই আসলরূপে ফেরেশতা মানব সমাজে আবির্ভূত হইবেন তখন মানবজাতি তাহার প্রতি এমনভাবে ধাবিত হইবে যেভাবে কীট-পতঙ্গ আলোর দিকে ধাবিত হয়। অনুরূপ যদি ফেরেশতা মানবাকৃতিতে আবির্ভূত হন তখনও মানব সংস্কৃতি সঠিকভাবে পরিচালিত হইবে না। কেননা মানবরূপী ঐ ফেরেশতা মানব মনের সন্দেহপ্রবণতা যে, মানুষ কি রাসূল হইতে পারেন-দূরীভূত করিতে পারিবেন না। কারণ এই অবস্থায় তাঁহাকে মানুষই গণ্য করা হইবে। এই নির্বোধসুলভ সন্দেহকে আল-কুরআন এইভাবে খণ্ডন করিয়াছে:
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلاً وَالْبَسْنَا عَلَيْهِمْ مَا يَلْبِسُونَ. "যদি তাহাকে ফেরেশতা করিতাম তবে তাহাকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করিতাম, আর তাহাদিগকে সেইরূপ বিভ্রমে ফেলিতাম যেরূপ বিভ্রমে তাহারা এখন রহিয়াছে” (৬:৯)।
অর্থাৎ ফেরেশতাগণ যদি মানব সমাজে রাসূল বা নবী হিসাবে প্রেরিত হইতেন তাহা হইলে তাহারা মানবরূপেই আবির্ভূত হইতেন। কারণ তাহারা স্বরূপে আবির্ভূত হইলে মানব সমাজে তাঁহার অবস্থান শান্তিপূর্ণ হইত না। আর মানবরূপে তাঁহাদের আগমন মানব সমাজে কোন পৃথক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির সহায়ক নয়। সুতরাং নবী-রাসূল ফেরেশতাদের মধ্য হইতে হইবার দাবি যৌক্তিক নয়। নবী-রাসূলগণের মানব হওয়ার বিষয় আলোচনার পর আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মاد (স) সম্পর্কে আল-কুরআনের বর্ণনা আলোচনা করা যায়। আল-কুরআনের তিনটি স্থানে স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ দিয়া তাঁহার মানব হওয়ার কথা ব্যক্ত করা হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ তাওহীদ এবং রাসূলও যে আল্লাহর বান্দা সেই কথা ব্যক্ত করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
"বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক! আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল। যখন উহাদের নিকট আসে পথনির্দেশ তখন লোকদিগকে ঈমান আনা হইতে বিরত রাখে উহাদের এই উক্তিঃ আল্লাহ্ কি মানুষকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন" (১৭: ৯৩-৯৪)।
আল্লাহ্র নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (স) হইতে অলৌকিক ঘটনাবলীও প্রকাশ লাভ করিয়াছিল। এই ঘটনাবলীর অলৌকিকত্ব অবিশ্বাসীরা স্বীকারও করিয়াছিল। এতদসত্ত্বেও তাহারা এই ধারণা পরিহার করিতে পারে নাই যে, মানুষ কিভাবে রাসূল হইতে পারেন। অবিশ্বাসীরা অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া বলিল:
هَلْ هُذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ. "সে তো তোমাদের মত একজন মানুষই, তবুও কি তোমরা দেখিয়া শুনিয়া জাদুর কবলে পড়িবে?” (২১:৩)।
অলৌকিক ঘটনাবলীর অস্বাভাবিকতাকে অবিশ্বাসীরা জাদু বলিয়া চালাইয়া দিল। তাহার পরও 'মানব হওয়া নুবুওয়াতের পরিপন্থী' এই বিশ্বাসে তাহারা স্থির থাকিল। অতঃপর তাহাদিগকে বলা হইল নবুওয়াত ও রিসালাত সম্পর্কে তোমাদের পূর্বসূরী ইয়াহুদীরা অধিক অবহিত। সুতরাং এই সম্পর্কে তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়া লও। ইরশাদ হইয়াছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ فَسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষ মানুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদিগকে জিজ্ঞাসা কর" (২১ঃ ৭)।
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى. "তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হইতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম, যাহাদের নিকট ওহী পাঠাইতাম" (১২: ১০৯)।
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلا رِجَالاً نُوحِي إِلَيْهِمْ فَسْتَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ. بالبَيِّنَتِ وَالزُّبُرِ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ.
"তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষগণকেই প্রেরণ করিয়াছিলাম। তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞাসা কর- প্রেরণ করিয়াছিলাম স্পষ্ট প্রমাণাদি ও গ্রন্থাবলীসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিয়াছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝাইয়া দিবার জন্য যাহা তাহাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হইয়াছিল, যাহাতে উহারা চিন্তা করে" (১৬ঃ ৪৩-৪৪)।
মাওলানা আবুল আলা মওদুদী বলেন, সর্বকালের অজ্ঞ লোকেরা এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হইয়াছিল যে, নবীর পক্ষে মানব হওয়া কোন সময়ই সম্ভব হইতে পারে না। নবীর আগমন হইলেই তাহারা বলিত, যেই লোক আহার করেন, পান করেন, সন্তান-সন্ততি জন্ম দেন, রক্তমাংস দ্বারা গঠিত, তিনি কি করিয়া নবী হইতে পারেন? তিনি তো নবী নহেন, তিনি একজন মানব। তাঁহার ইন্তিকালের কিছুকাল পর আবার আরও একটি দর্শনের উদ্ভব ঘটাইত। বলিত, তিনি তো মানব ছিলেন না, তিনি ছিলেন বার্তাবাহক। এই চিন্তাধারা হইতে কেহ কেহ নবীকে প্রভু জ্ঞান করিত, কেহ বলিত আল্লাহ্ পুত্র, আবার কেহ কেহ এই ধারণায় উপনীত হইত যে, তিনি প্রভুর অবতার। মোটকথা, একটি সত্তায় নবুওয়াত ও মানবতার সমাবেশ ঘটিতে পারে, এই কথা মূর্খরা উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইত না।
আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাবের পর মক্কার অবিশ্বাসীদের নিকটও এই কথা আজগুবি মনে হইয়াছিল যে, মানুষ কিভাবে রাসূল হইতে পারে। আল্লাহ্ বাণী আসিতে হইলে ফেরেশতার মাধ্যমেই আসা বাঞ্ছনীয় ছিল। একান্ত যদি মানিয়া লওয়া হয় যে, মানুষই নবী, তাহা হইলে ন্যূনপক্ষে রাজা-বাদশাহ কিংবা জগতিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিত্বকে এই পদে আসীন করা উচিৎ ছিল। তাহাদের এই অভিযোগকে আল-কুরআনে এইভাবে বলা হইয়াছে:
وَقَالُوا مَا لِهَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ. "উহারা বলে, সে কেমন রাসূল যে, আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফিরা করে" (২৫:৭)।
জাগতিক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কাহাকেও নবী বানানো হইল না কেন? অবিশ্বাসীদের এই অভিযোগ আল-কুরআন এইভাবে ব্যক্ত করিয়াছে:
وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ. "এবং ইহারা বলে এই কুরআন কেন নাযিল করা হইল না দুই জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর" (৪৩: ৩১)।
এখানে দুইটি জনপদ বলিতে মক্কা ও তাইফকে বুঝানো হইয়াছে। যখন তাহারা প্রথমদিকে এই কথা স্বীকার করিতে রাজী ছিল না যে, কোন মানুষ নবী হইতে পারেন। কিন্তু যখন এই ব্যাপারে আল-কুরআনে একের পর এক দলীল পেশ করা হইতে লাগিল তখন তাহারা স্বীয় দাবির অসারতা সম্পর্কে অবগত হইয়া আয়াতে বর্ণিত নূতন অভিযোগ উত্থাপন করিল, যাহার সারকথা ছিল, মক্কায় রহিয়াছে ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা এবং 'উতবা ইব্ন আব্দ রাবীআ। অনুরূপ তাইফেও রহিয়াছে উরওয়া ইবন মাসউদ, হাবীব ইব্ন আমর, কিনানা ইবন 'আমর প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। এমতাবস্থায় কি করিয়া এমন এক ব্যক্তিকে নবী মনোনীত করা হইল যিনি ইয়াতীম হিসাবে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, যিনি কোন সম্পত্তির অধিকারী নহেন।
মোটকথা, আদি পিতা আদম (আ) হইতে সকল নবী-রাসূলই মানব ছিলেন। কিন্তু নির্বোধ লোকেরা যুগে যুগে তাহাদের মানব হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছিল। মহান আল্লাহ তাহাদের অভিযোগকে সর্বকালেই প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তবে তাঁহাদের এই মানব হওয়ার সম্পর্ক ছিল দেহ, আকৃতি ও সৃষ্টির দৃষ্টিকোণ হইতে। এই সম্পর্কে শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী বলেন, আয়াতগুলিতে নবী-রাসূলগণ সম্পর্কে যে বলা হইয়াছে, 'তাঁহারা তোমাদের মত মানুষ', ইহার অর্থ হইল এই সাদৃশ্য ও মানবতার সম্পর্ক হইল বাহ্যিক অবয়ব, দৈহিক শক্তি এবং সৃষ্টিগত দিক দিয়া। অপরদিকে চারিত্রিক, আত্মিক, আন্তরিক, জ্ঞান ও কার্যক্রমের দিক দিয়া একজন নবীর সহিত অন্য কাহারও তুলনা করা যায় না। নবী ও অ-নবীর মধ্যে কেবল ওহী আসা না আসার তফাৎ, এই কথা কস্মিন কালেও সঠিক নয়। যদি কেহ মনে করে সকল দোষ-গুণ ও পূর্ণতার ব্যাপারে নবী সাধারণ মানুষের মতই, তাহা হইলে তাহার এই কথা হইবে ঐ লোকের উক্তির মত যে বলে, জ্ঞানী লোক ও মূর্খের মধ্যে কেবল জ্ঞানেরই তফাৎ, অন্যথায় তাহারা উভয়ই সমান মানুষ; জ্ঞান ব্যতীত তাহাদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি, চরিত্র, তাহযীব, কর্মদক্ষতা, প্রতিভা ও কৌশলগত কোন পার্থক্য নাই। এই কথা কি বাস্তবসম্মত হইবে? আবার মানুষের জন্য এখন কোন এক স্তরে উন্নতির চরম সোপানে উন্নীত হওয়া অসম্ভব নয়। কোন ব্যক্তি যদি দেহ-অবয়বে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও অন্য কোন প্রতিভা গুণে অনুরূপ কোন কিছু অর্জন করে তাহা হইলে অবশ্যই সে মহান এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্যক্তি। কেহ কি এই কথা বলিতে পারিবে ইরানী বীর রুস্তম মানুষ ছিলেন না, জ্ঞান-গরীমার মূর্ত প্রতীক গ্রীসের এরিস্টোটল মানবতার ঊর্ধ্বে ছিলেন, আধুনিক বিশ্বের বিস্ময়কর সৃষ্টিসমূহের আবিষ্কারকগণ মানুষ নহেন? হাঁ, তাহারাও মানুষ। তবে স্ব-স্ব উচ্চাসনে সমাসীন হইবার পরও তাহারা চলাফিরা, উঠাবসা, খানাপিনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানুষ। এক অর্থে ইহা নবীগণের উদাহরণ। নবীগণ অনেক অনেক মানবিক গুণে মণ্ডিত হইবার পরও ওহী এবং ইহার বৈশিষ্ট্যের দরুন মানুষ হইতে স্বাতন্ত্র্য মণ্ডিত, উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে মানবিক বৈশিষ্ট্যাবলীরও ঊর্ধ্ব। রাসূলুল্লাহ (স) একাদিক্রমে সাহরী-ইফতারবিহীন সওমে বিসাল (কিছু পানাহার না করিয়া একাধারে কয়েক দিনের রোযা) রাখিতেন। ইহা দেখিয়া কোন কোন সাহাবী কয়েক দিন এইরূপ পরপর রোযা রাখিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে ইহা হইতে বারণ করিয়া বলিলেন:
أَيُّكُمْ مِثْلِي أَبِيْتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيُسْقِينِي (بخارى كتاب الصوم)
"তোমাদের মধ্যে আমার মত কে আছে? আমি যখন রাত্রি যাপন করি তখন আমাকে আমার রব পানাহার করান"।
এখানে ওহী ছাড়াও ভিন্ন কারণে নবীর সহিত পার্থক্য নির্দেশ করা হইয়াছে। অনুরূপ নিদ্রাবস্থায় নবীর অন্তর ও তাঁহার অনুভূতিসমূহ নিষ্ক্রিয় হয় না। সহীহ হাদীছে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন:
عَيْنَايَ تَنَامُ وَقَلْبِي يَقْضَانٌ وَكَذَالِكَ الْأَنْبِيَاءُ تَنَامُ أَعْيُنُهُمْ وَلَا تَنَامُ قُلُوبُهُمْ.
"আমার চক্ষুদ্বয় নিদ্রা যায় এবং অন্তর জাগ্রত থাকে। অনুরূপ অন্যান্য নবীগণের চক্ষুসমূহ নিদ্রা যায় কিন্তু তাঁহাদের অন্তরসমূহ ঘুমায় না"।
সাধারণ মানুষের ঘুমের অবস্থা কি ইহার সহিত তুলনীয়? রাসূলুল্লাহ (স)' সাহাবীগণকে নামাযের কাতারে সোজা করিবার জন্য অত্যন্ত জোর তাগিদ দিতেন। বলিতেন, "আমি সম্মুখ দিয়া যেইভাবে তোমাদের দেখিতে পাই, অনুরূপ পিছন দিক দিয়াও দেখি"। সাধারণ মানুষের সেইরূপ দেখিবার কি সাধ্য আছে? আর কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى.
"সে (নবী) যাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছে তোমরা কি সে বিষয়ে তাহার সঙ্গে বিতর্ক করিবে” (৫৩ঃ ১২)।
وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِيْنِ.
"তিনি তো তাহাকে (ফেরেশতা) স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছেন" (৮১: ২৩)।
সাধারণ মানুষ কি ইহা প্রত্যক্ষ করিতে পারে? রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সম্পর্কিত হইবার ফলে তাঁহার সহধর্মিনিগণ বিশেষ সম্মান লাভ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলা মু'মিন জগতের এই মাতাগণকে সম্বোধন করিয়া ইরশাদ করিয়াছেন:
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ (احزاب ٣٢) .
"হে নবীর পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নহ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর" (৩৩: ৩২)।
নবীর স্ত্রীগণ যখন তাকওয়া অবলম্বনের পর সাধারণ মহিলাদের মত থাকেন না, তখন স্বয়ং নবীর স্তর ইহা হইতে কত গুণ ঊর্ধ্বে তাঁহা সহজেই অনুমেয়।
এই ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) যাহা বলিয়াছেন তাহা পর্যালোচনা করা যায়। রাফি'ইবন খাদীজ (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের একটি অংশ নিম্নরূপঃ فَقَالَ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِّنْ رَأْيِي فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ - (رواه مسلم كتاب الفضائل باب امثال ما قاله شرعا دون ما ذكره معايش الدنيا على سبيل الرائي).
"রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি নিশ্চয়ই মানুষ। আমি যখন তোমাদেরকে তোমাদের দীন সংক্রান্ত কোন বিষয়ের আদেশ করিব তখন তোমরা তাহা গ্রহণ করিবে। পক্ষান্তরে যখন আমার নিজস্ব অভিমতে কোন বিষয়ে আমি তোমাদেরকে আদেশ করিব, তখন কেবলই আমি একজন মানুষ” (মুসলিম, ২খ, পৃ. ২৬৪)। অপর একটি হাদীছে বর্ণিত আছেঃ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ أَنْسى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيْتُ فَذَكَرُونِي (رواه مسلم باب السهو ).
রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "আমি হইলাম একজন মানুষ। তোমরা যেইভাবে বেখবর হইয়া থাক সেইভাবে আমিও বেখবর হই। আমি বেখবর হইয়া পড়িলে তোমরা আমাকে স্মরণ করাইয়া দিও" (মুসলিম, ১খ, পৃ. ২১২)।
নবী-রাসূলগণের মানুষ হওয়া সম্পর্কে আকাইদ গ্রন্থে বলা হইয়াছে: فَالرَّسُولُ بَشَرٌ نَشَأَ بَيْنَ قَوْمٍ عَرَفُوا أَحْوَالَهُ فِي صِغْرِهِ وَكَبْرِهِ.
"রাসূল একজন মানুষ, যিনি এমন এক সম্প্রদায়ে প্রতিপালিত হইয়াছেন যাহারা তাঁহার শিশুকাল ও বৃদ্ধকাল সম্পর্কে অবগত রহিয়াছে"।
এই সম্পর্কে সায়ফুল্লাহ্ হাশিমী বলেন, আশা'ইরা ও হানাফীদের অভিমত হইল, নবীগণের মানব হওয়া অকাট্য (কত্বয়ী) দলীল-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত, যাহা অস্বীকার করা উম্মতের ঐক্যমতে কুফরী। ইয়াহুদী, খৃস্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হইয়া কেহ যদি কোন নবী বা রাসূলকে দাতা মা'বৃদ স্বীকার করে তাহা হইলে আশ'আরী ও হানাফী মতে সে এক মুহূর্তের জন্যও মুসলমান থাকিবে না। অতঃপর সায়ফুল্লাহ হাশিমী বলেন, রাসূলের মানব হওয়াকে অস্বীকার করা একটি মেয়েলী স্বভাব। কারণ যুলায়খা তাহার সম্পর্কে প্রচারিত অভিযোগ খণ্ডন করিবার জন্য যখন ইউসুফ ('আ)-কে শহরের মহিলাগণের সম্মুখে উপস্থিত করিয়াছিল তখন ঐ মহিলারা বলিয়া উঠিল:
حَاشَ لِلَّهِ مَا هُذَا بَشَرًا إِنْ هُذَا إِلَّا مَلَكَ كَرِيمٌ. "অদ্ভূত আল্লাহ্ মাহাত্ম্য! সেতো কোন মানব নহে, সে একজন অতি মহিমান্বিত ফেরেশতা”।