📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুক্তিভিত্তিক প্রমাণ

📄 যুক্তিভিত্তিক প্রমাণ


মু'তাযিলাদের দাবীর পক্ষে যুক্তি এই যে, তর্কশাস্ত্রের বিধানানুসারে দাবি ও দলীলের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র থাকা অপরিহার্য। কিন্তু মু'জিযা ও নবুওয়াতের মধ্যে কোন প্রকার যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায় না। যেমন, কোন ব্যক্তি যখন নবুওয়াতের দাবি করেন তখন তাঁহার উদ্দেশ্য হয়, তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে মানব জাতির আকীদা ও বিশ্বাস, আমল ও কার্যক্রম এবং আখলাক ও চরিত্র সংশোধনের জন্য প্রেরিত হইয়াছেন। কিন্তু যখন তাঁহার নিকট এই দাবির সত্যতা নিরূপণের জন্য দলীল প্রমাণ তলব করা হয়, তখন তিনি বিশুষ্ক কুয়াকে পানি দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন কিংবা চাঁদকে দুই টুকরা করিয়া দেখান অথবা তাহার যষ্টি সর্পে পরিণত হইয়া যায়। এই সমস্ত ঘটনা যদিও নেহায়েত আশ্চর্যজনক এবং অভাবিতপূর্ব, কিন্তু এই সমস্ত দলীল-প্রমাণের সহিত দাবির কোন যোগসূত্র আছে কি?
'আশাইরা মনীষিগণ মু'তাযিলাদের এই তর্ক-যুক্তির উত্তরে বলেন নবৃওয়াত হইতেছে 'ইলম ও 'আমল-এর সমন্বিত রূপ। যেই ব্যক্তি নবৃওয়াতের দাবি করেন ও তাহার সম্পর্কে এই কথা স্বীকার করিয়া লওয়া হয় যে, তিনি এই 'ইলম ও আমল সম্বন্ধে পরিপূর্ণ দক্ষতার অধিকারী এবং তাঁহার এই পরিপূর্ণতার বিকাশকল্পে তাহার নিকট মু'জিযা তলব করা হয়। নবীগণের মু'জিযা যদিও বিভিন্ন শ্রেণীর হইয়া থাকে, তবুও এইগুলিকে শুধু দুই শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়। যেমন অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রদান করা এবং সৃষ্টি জগতের বস্তুনিচয়ের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখা। এই দুই শ্রেণীর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন অংশের সহিত এবং নবুওয়াতের বিভিন্ন অংশের সহিত রহিয়াছে এক নিবিড় বন্ধন ও একাত্মতা। অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণের জ্ঞান ও মনীষার পরিপূর্ণতা বিকশিত হইয়া উঠে। অপরদিকে সৃষ্টি জগতের বস্তুনিচয়ের উপর কর্তৃত্ব নিষ্পন্ন করিবার দ্বারা তাহার ব্যবহারিক শক্তির বিকাশ সাধিত হয়।
অপর একটি যোগসূত্র হইতেছে, মু'জিযা হইল সহজাত স্বভাবের অভীত কোন স্বভাবের নাম। তবে এই ক্ষেত্রে ইহা লইয়া কোন মতবিরোধ নাই যে, বস্তুনিচয় উহার গুণাবলী এবং উহার কারণসমূহ কেবল আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ ও হুকুম দ্বারা আত্মপ্রকাশ করে। 'এখন যদি কোন শক্তি এইসব বৈশিষ্ট্য ও কারণসমূহকে স্বীয় মু'জিযার দ্বারা নিশ্চিহ্ন কিংবা ভাঙ্গিয়া-চুরিয়া একাকার করিয়া দিতে সক্ষম হন, তাহা হইলে তিনি বস্তুত এই কথার যথার্থতাই তুলিয়া ধরিলেন যে, যেই মহানুভব ও সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তির অধিকারী সত্তা এই সমস্ত কারণ ও উপাদান সৃষ্টি করিয়াছেন, কেবল তিনিই সেইগুলিকে ধ্বংস কিংবা অকেজো করিয়া দিতে পারেন। এই ভাঙ্গা-গড়ার অবিকল ধারা যেহেতু তাঁহার (নবীর) মাধ্যমে প্রকাশ পাইয়াছে, সেহেতু ইহা প্রমাণ করে যে, ইনিই সেই সত্তার প্রতিনিধি।
ইহার দৃষ্টান্ত এইরূপ যে, একজন বাদশাহ স্বীয় প্রজাদের নিকট প্রয়োজনের তাকিদে দূত প্রেরণ করেন। প্রজাগণ জিজ্ঞাসা করিল, এই কথার প্রমাণ কি যে, আপনি মহান বাদশাহর একজন বার্তাবাহক প্রতিনিধি? তখন সে উহার প্রতিউত্তরে বাদশাহর সীলমোহর এবং অঙ্গুরী পেশ করিতে বাধ্য হয়। যদিও প্রকাশ্যভাবে দূতের পয়গাম্বরীসুলভ দাবির সহিত সীলমোহর এবং অঙ্গুরীয়ের সরাসরি কোন যোগসূত্র নাই, কিন্তু তবুও ইহার মধ্যে সম্পর্ক এইভাবে প্রতিপন্ন হয় যে, সীলমোহর এবং অঙ্গুরীয় বাদশাহরই নিদর্শন বটে, যাহা একজন সাধারণ মানুষের হাতে কখনও আসিতে পারে না। সুতরাং ইহাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, এই দূতকে বাদশাহ সরাসরি তাহার একান্ত ব্যক্তিগত নিদর্শন প্রদান করিয়াই প্রেরণ করিয়াছেন।

মু'তাযিলাদের দাবীর পক্ষে যুক্তি এই যে, তর্কশাস্ত্রের বিধানানুসারে দাবি ও দলীলের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র থাকা অপরিহার্য। কিন্তু মু'জিযা ও নবুওয়াতের মধ্যে কোন প্রকার যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায় না। যেমন, কোন ব্যক্তি যখন নবুওয়াতের দাবি করেন তখন তাঁহার উদ্দেশ্য হয়, তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে মানব জাতির আকীদা ও বিশ্বাস, আমল ও কার্যক্রম এবং আখলাক ও চরিত্র সংশোধনের জন্য প্রেরিত হইয়াছেন। কিন্তু যখন তাঁহার নিকট এই দাবির সত্যতা নিরূপণের জন্য দলীল প্রমাণ তলব করা হয়, তখন তিনি বিশুষ্ক কুয়াকে পানি দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন কিংবা চাঁদকে দুই টুকরা করিয়া দেখান অথবা তাহার যষ্টি সর্পে পরিণত হইয়া যায়। এই সমস্ত ঘটনা যদিও নেহায়েত আশ্চর্যজনক এবং অভাবিতপূর্ব, কিন্তু এই সমস্ত দলীল-প্রমাণের সহিত দাবির কোন যোগসূত্র আছে কি?
'আশাইরা মনীষিগণ মু'তাযিলাদের এই তর্ক-যুক্তির উত্তরে বলেন নবৃওয়াত হইতেছে 'ইলম ও 'আমল-এর সমন্বিত রূপ। যেই ব্যক্তি নবৃওয়াতের দাবি করেন ও তাহার সম্পর্কে এই কথা স্বীকার করিয়া লওয়া হয় যে, তিনি এই 'ইলম ও আমল সম্বন্ধে পরিপূর্ণ দক্ষতার অধিকারী এবং তাঁহার এই পরিপূর্ণতার বিকাশকল্পে তাহার নিকট মু'জিযা তলব করা হয়। নবীগণের মু'জিযা যদিও বিভিন্ন শ্রেণীর হইয়া থাকে, তবুও এইগুলিকে শুধু দুই শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়। যেমন অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রদান করা এবং সৃষ্টি জগতের বস্তুনিচয়ের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখা। এই দুই শ্রেণীর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন অংশের সহিত এবং নবুওয়াতের বিভিন্ন অংশের সহিত রহিয়াছে এক নিবিড় বন্ধন ও একাত্মতা। অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণের জ্ঞান ও মনীষার পরিপূর্ণতা বিকশিত হইয়া উঠে। অপরদিকে সৃষ্টি জগতের বস্তুনিচয়ের উপর কর্তৃত্ব নিষ্পন্ন করিবার দ্বারা তাহার ব্যবহারিক শক্তির বিকাশ সাধিত হয়।

ড. হায়কালের এই যুক্তি তথ্যনির্ভর নহে। কারণ হাদীছ ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে এই জাতীয় একাধিক ঘটনা সহীহ সনদ দ্বারা সংরক্ষিত হইয়া আসিতেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা উহার কয়েকটি ঘটনা এখানে উদ্বৃত করিতেছি।
(এক) এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া বলিল, আমি ঐ পর্যন্ত আপনাকে সত্য নবী বলিয়া স্বীকার করিব না, যতক্ষণ না এই খেজুর বৃক্ষের কাঁদিসমূহ আপনার নিকট আসিয়া আপনার রিসালাতের সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করে। আল্লাহর কৃপায় তাহাই ঘটিল। যখন সে এই ঘটনা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিল, তখন ইসলাম গ্রহণ করিল (সুনান তিরমিযী, পৃ. ৬০৩)।
(দুই) একবার এক সফরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এক বেদুঈনের সাক্ষাত হইল। তিনি লোকটিকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাইলেন। লোকটি বলিল, আপনার সত্যতার সাক্ষ্য কে দিতেছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সম্মুখের এই বৃক্ষটি। এই কথা বলিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বৃক্ষটিকে কাছে ডাকিলেন। তৎক্ষণাত বৃক্ষটি তাঁহার সম্মুখে হাযির হইল এবং উহার মধ্য হইতে তিনবার কলেমা তায়্যিবার ধ্বনি উচ্চারিত হইল। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়া লোকটি তৎক্ষণাত ইসলামে দাখিল হইয়া গেল (সীরাতুন্নবী (স), ৪খ., পৃ. ১০২৬)।
(তিন) রাসূলুল্লাহ (স)-এর হিজরতকালে উম্মে মা'বাদ ও আবু মা'বাদ নামক দুইজন মরুবাসীর ইসলাম গ্রহণের কথা সুবিখ্যাত। ইহারা ছিলেন খুযা'আ গোত্রের লোক। মদীনার পথে একটি ঝুপড়ীতে তাহারা বাস করিত এবং পথিক-মুসাফিরদের সেবা ও মেহমানদারী করিত। মেষ পালনই ছিল তাহাদের একমাত্র জীবিকা নির্বাহের উপায়। রাসূলুল্লাহ (স) এবং হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) উম্মে মা'বাদের ঝুপড়ীর পার্শ্ব অতিক্রম করিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহারা কিছু পাথেয় খরীদ করার জন্য উম্মে মা'বাদের ঝুপড়ীতে আগমন করিলেন। কিন্তু খরীদ করার মত কিছুই তাহার নিকট পাওয়া গেল না। রাসূলুল্লাহ (স) দেখিলেন, উম্মে মা'বাদের ঝুপড়ীর এক কোণে একটি ছাগী দাঁড়াইয়া আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ছাগীটি দুধ দেয় কি? উম্মে মা'বাদ বলিল, সে তো হাটিতেই পারে না, এত দুর্বল ছাগী আবার দুধ দেয়?
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি অনুমতি দিলে আমি দোহন করিয়া দেখিতে পারি। উম্মে মা'বাদ বলিল আচ্ছা, আপনি দোহন করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বিসমিল্লাহ বলিয়া উহার দুধ দোহন করিতে লাগিলেন। দেখা গেল দুধ বাহির হইয়া আসিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স), তাঁহার সাথীগণ, উম্মে মা'বাদ ও তাঁহার ঝুপড়ীর লোকজন সকলেই তৃপ্তি সহকারে পেট ভরিয়া দুধ পান করিলেন। তৎপর আরও কিছু দুধ উম্মে মা'বাদের কাছে অবশিষ্ট রহিয়া গেল।
দুধ পান করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সাথীসহ মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হইয়া গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই আবূ মা'বাদ মরুভূমিতে মেষ চারণ করিয়া ঝুপড়ীতে ফিরিয়া আসিল। আবূ মা'বাদ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনিয়া বলিল, আল্লাহ্র শপথ! ইনি মনে হয় কুরায়শ গোত্রের সেই লোকটি। তাঁহার কথা অনেক শুনিয়াছি। আমাদের সুযোগ হইলে আমরা তাঁহার দরবারে উপস্থিত হইব। ইব্‌ন কাছীর রিওয়ায়াত করিয়াছেন, এই ঘটনার পর উম্মে মা'বাদ ও আবূ মা'বাদ উভয় ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল (ইবন হিশাম, ১খ., পৃ. ১৭২; আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৮৯)।
কতিপয় আধুনিক সীরাতকার উম্মে মা'বাদের হাদীছটিকে সনদের দিক হইতে দুর্বল আখ্যায়িত করিয়াছেন। কিন্তু মুহাক্কিক আলিমগণ হাদীছটির সনদ সম্বন্ধে তথ্য-তালাশের পর হাদীছটিকে সহীহ বলিয়া স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন। তাঁহাদের অনুসন্ধান মতে এই হাদীছটি একাধিক সাহাবী হইতে একাধিক সনদে বর্ণিত হইয়াছে। যথা-
(এক) উম্মে মা'বাদ-এর সনদে ইবনুস-সাকান, আল-ইসাবায় (দ্র. ইসাবা, বাবুল-আসমা ওয়াল- কুনা); (দুই) আবূ মা'বাদ-এর সনদে ইমাম বুখারী তাঁহার "তারীখ” গ্রন্থে (দ্র. তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ১৫৫); (তিন) হুবায়শ ইন্ন খালিদ-এর সনদে আল্লামা বাগাবী, ইব্‌ন শাহীন, ইবনুস-সাকান ও ইমাম তাবারানী প্রমুখ মুহাদ্দিছ নিজ নিজ গ্রন্থে (দ্র. তাহযীবুল-কামাল, ১খ., পৃ. ৩৪); (চার) আবূ সালীত বদরী-এর সনদে হাদীছটি 'উয়ুনুল- আছার গ্রন্থে বর্ণিত আছে (দ্র. সীরাতে মোস্তফা, ১খ., পৃ. ৩৯০); (পাঁচ) হিশামের সনদে মুস্তাদরাক হাকেম গ্রন্থে। হাকেম হাদীছটি রিওয়ায়াত কারার পর মন্তব্য কারিয়াছেন, هذا حديث صحيح الاسناد "এই হাদীছটির সনদ সহীহ” (মুস্তাদরাক, ৩খ., পৃ. ১০)।
উপরন্তু এই ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর হিজরতের সাথী হযরত আবু বকর (রা) হইতেও সহীহ সনদে বর্ণিত হইয়াছে (দ্র. দালায়েল লিল-বায়হাকী, মুস্তাদরাক লিল-হাকেম ও আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া লি ইব্‌ন কাছীর, ৩খ., পৃ. ১৯১)। ইব্‌ন কাছীর বলেন, اسناده حسن "উহার সনদ হাসান-নির্ভরযোগ্য"।
অতএব, উম্মে মা'বাদের বর্ণিত এই মু'জিযার ঘটনাটি সম্বন্ধে কোন প্রকার সন্দেহ-সংশয় পোষণ করিবার কোনই যুক্তিসংগত কারণ নাই।
ড. হায়কালের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণের জন্য সূরা আল-কামারের প্রথম দুইটি আয়াতই যথেষ্ট। ইরশাদ হয়েছে:
"কিয়ামত নিকটবর্তী হইয়াছে, আর চন্দ্র বিদীর্ণ হইয়াছে। ইহারা কোন নিদর্শন দেখিলে মুখ ফিরাইয়া লয় এবং বলে, ইহাত চিরাচরিত যাদু” (৫৪:১-২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মু'জিযা নবৃওয়াতের প্রমাণ হওয়ার অনুকূলে কুরআন-হাদীছের দলীল

📄 মু'জিযা নবৃওয়াতের প্রমাণ হওয়ার অনুকূলে কুরআন-হাদীছের দলীল


(এক) আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এব যুগের মুশরিক ও পৌত্তলিকদের নিন্দা, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করিয়াছেন এবং এই মর্মে তাহাদের বর্ণনা দিয়াছেন যে, মুশরিকরা আল্লাহর আয়াত ও মু'জিযায় বিশ্বাসী নহে। যদি মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণই না হইত তাহা হইলে মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিবার পর উহাতে ঈমান আনয়ন না করিলে তাহারা ভর্ৎসনা ও নিন্দার যোগ্য হইবে কেন? অথচ দেখুন, নিজের আয়াতসমূহে মু'জিযা অস্বীকার করার কারণে মুশরিকদেরকে কিরূপ ভর্ৎসনা করা হইয়াছে।
وَمَا تَأْتِيهِمْ مِّنْ آيَةٍ مِّنْ أَيْتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ ، فَقَدْ كَذَّبُوا بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَ هُمْ فَسَوْفَ يَأْتِيهِمْ أَنْبُوا مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
"তাহাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর এমন কোন নির্dশন তাহাদের নিকট উপস্থিত হয় না যাহা হইতে তাহারা মুখ না ফিরায়। সত্য যখন তাহাদের নিকট আসিয়াছে, তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। যাহা লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহার যথার্থ বিবরণ অচিরেই তাহাদের নিকট পৌঁছিবে” (৬:৪-৫)।
وَمِنْهُمْ مِّنْ يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ وَجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَنْ يُفْقَهُوهُ وَفِي أَذَانِهِمْ وَقْرًا وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا حَتَّى إِذَا جَاءُوكَ يُجَادِلُونَكَ يَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هُذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ ، وَهُمْ يَنْهَوْنَ عَنْهُ وَيَنْشُونَ عَنْهُ وَإِنْ يُهْلِكُونَ لِلا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ وَلَوْ تَرَى إِذْ وَقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يُلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا تُكَذِّبَ بِايَتِ رَبَّنَا وَنَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
"তাহাদের মধ্যে কতকলোক তোমার দিকে কান পাতিয়া রাখে, কিন্তু আমি তাহাদের অন্তরের উপর আবরণ দিয়াছি যেন তাহারা তাহা উপলব্ধি করিতে না পারে। আমি তাহাদেরকে বধির করিয়াছি এবং তাহারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিলেও উহাতে ঈমান আনিবে না, এমনকি তাহারা যখন তোমার নিকট উপস্থিত হইয়া বিতর্কে লিপ্ত হয় তখন কাফিররা বলে, ইহা তো সেকালের উপকথা ব্যতীত কিছুই নহে। তাহারা অন্যকেও উহা শ্রবণে বিরত রাখে এবং নিজেরাও উহা হইতে দূরে থাকে। আর তাহারা নিজেরাই শুধু নিজেদেরকে ধ্বংস করে, অথচ তাহারা উপলব্ধি করে না। তুমি যদি দেখিতে পাইতে যখন তাহাদেরকে অগ্নির পার্শ্বে দাঁড় করান হইবে এবং তাহারা বলিবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটিত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহে অস্বীকার করিতাম না এবং আমরা মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত হইতাম" (৬: ২৫-২৭)।
মু'জিযা যদি হুজ্জত বা প্রমাণই না হয় তাহা হইলে কিসের ভিত্তিতে উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে মু'জিযা অস্বীকারকারীদেরকে এইরূপ তিরস্কার করা হইল?
(দুই) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَمَا مَنَعَنَا إِنْ تُرْسِلَ بِالْآيَتِ إِلا أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُونَ وَأَتَيْنَا ثَمُودَ النَّاقَةَ مُبْصِرَةً فَظَلَمُوا بِهَا وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَتِ الأَ تَخْوِيفًا
"পূর্ববর্তীগণ কর্তৃক নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা হইতে বিরত রাখে। আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ ছামুদ জাতিকে উষ্ট্র দিয়াছিলাম, অতঃপর তাহারা উহার প্রতি জুলুম করিয়াছিল। আমি ভীতি প্রদর্শনের জন্যই নিদর্শন প্রেরণ করি” (১৭: ৫৯)।
এই আয়াতের সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তা'আলা দয়াপরবশ হইয়া মানুষের প্রতি মু'জিযা প্রেরণ করেন না। কেননা মু'জিযা প্রকাশের পর মানুষ যদি তাহা অস্বীকার করে তাহা হইলে তাহারা আযাবের যোগ্য হইয়া পড়িবে। যেমন অতীতের উম্মতসমূহের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটিয়াছে। সুতরাং ইহাই এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, মু'জিযা নবুওয়াতের হুজ্জত বা প্রমাণ, যাহার প্রকাশের পর আর কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই। ইহার পরও কেহ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করিলে সে শাস্তিযোগ্য হইয়া যাইবে। সুতরাং মু'জিযা হুজ্জত না হইলে উহা অস্বীকার করার প্রেক্ষিতে আযাব অবধারিত হয় কিরূপে?
(তিন) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . قَالُوا نُرِيدُ أَنْ نَّاكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّهِدِينَ . قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لأولنَا وأخرنَا وَآيَةً مِّنْكَ وَارْزُقْنَا وَ أَنْتَ خَيْرُ الرَّزْقِينَ . قَالَ اللهُ إِنِّي مُنْزِلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أَعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أَعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ الْعُلَمِينَ .
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিতে সক্ষম? সে বলিয়াছিল, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হও। তাহারা বলিয়াছিল, আমি চাহি যে, উহা হইতে আমরা কিছু খাইব ও আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করিবে। আর আমরা জানিতে চাহি যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলিয়াছ এবং আমরা উহার সাক্ষী থাকিতে চাহি। মরিয়ম-তনয় ঈসা বলিল, হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক। আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর। ইহা আমাদের এবং পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসবস্বরূপ এবং তোমার নিকট হইতে নিদর্শন। আর আমাদেরকে জীবিকা দান কর আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বলিলেন, আমিই তোমাদের নিকট উহা প্রেরণ করিব, কিন্তু ইহার পর তোমাদের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না” (৫: ১১২-১১৫)।
কুরআনের উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে পরিষ্কার বলা হইয়াছে যে, হাঁ, আমি তোমাদের কাঙ্ক্ষিত মু'জিযা প্রদান করিব। কিন্তু উহা প্রদানের পর কেহ উহা অস্বীকার করিলে তাহাকে নজীরবিহীন শাস্তির সম্মুখীন হইতে হইবে। 'মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ'-এই অভিমতের সমর্থনে কুরআনের এই আয়াতগুলি অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ। (চার) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُبِينٍ . قَالَ فَأْتِ بِهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ . فَالْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ تُعْبَانٌ مُّبِينٌ، وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّظِرِينَ ، قَالَ لِلْمَلَا حَوْلَهُ إِنَّ هَذَا لسحر عَلِيمٌ .
"মূসা বলিল, আমি তোমার কাছে স্পষ্ট কোন প্রমাণ আনয়ন করিলেও? ফিরআওন বলিল, তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে উহা (প্রমাণ) পেশ কর। অতঃপর মূসা তাহার যষ্ঠি নিক্ষেপ করিলে তৎক্ষণাৎ উহা এক সাক্ষাৎ অজগর হইল। এবং মূসা হাত বাহির করিল আর তৎক্ষণাৎ উহা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হইল। ফিরআওন তাহার পরিষদবর্গকে বলিল, এ তো সুদক্ষ যাদুকর” (২৬ : ৩০-৩৪)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযাকে بشيء مبين স্পষ্ট ব্যাপার' তথা প্রমাণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন এবং ফিরআওনও উহাকে তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উপস্থিত করিবার জন্য আহবান করিয়াছে। অতঃপর মূসা (আ) তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসাবে তাঁহাকে প্রদত্ত মু'জিযা পেশ করিয়াছেন।
(পাঁচ) নবী ও রাসূলগণকে প্রদত্ত মু'জিযা তাহাদের নবৃওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ-একথা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত দুইটি মু'জিযা সম্বন্ধে স্পষ্টত বলিয়াছেন। যেমন: وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسَى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْأَمِنِيْنَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسَقَيْنَ .
"আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। 'তাহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস! ভয় করিও না, তুমি তো নিরাপদ। তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৮ : ৩১-৩২)।
অতএব কুরআনের এ জাতীয় সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্তমান থাকিবার পর-মু'জিযা প্রমাণ না নিদর্শন-এই বিষয়ে কোনরূপ মতবিরোধ এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই।

১ ৪১
অপর একটি যোগসূত্র হইতেছে, মু'জিযা হইল সহজাত স্বভাবের অভীত কোন স্বভাবের নাম। তবে এই ক্ষেত্রে ইহা লইয়া কোন মতবিরোধ নাই যে, বস্তুনিচয় উহার গুণাবলী এবং উহার কারণসমূহ কেবল আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ ও হুকুম দ্বারা আত্মপ্রকাশ করে। 'এখন যদি কোন শক্তি এইসব বৈশিষ্ট্য ও কারণসমূহকে স্বীয় মু'জিযার দ্বারা নিশ্চিহ্ন কিংবা ভাঙ্গিয়া-চুরিয়া একাকার করিয়া দিতে সক্ষম হন, তাহা হইলে তিনি বস্তুত এই কথার যথার্থতাই তুলিয়া ধরিলেন যে, যেই মহানুভব ও সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তির অধিকারী সত্তা এই সমস্ত কারণ ও উপাদান সৃষ্টি করিয়াছেন, কেবল তিনিই সেইগুলিকে ধ্বংস কিংবা অকেজো করিয়া দিতে পারেন। এই ভাঙ্গা-গড়ার অবিকল ধারা যেহেতু তাঁহার (নবীর) মাধ্যমে প্রকাশ পাইয়াছে, সেহেতু ইহা প্রমাণ করে যে, ইনিই সেই সত্তার প্রতিনিধি।
ইহার দৃষ্টান্ত এইরূপ যে, একজন বাদশাহ স্বীয় প্রজাদের নিকট প্রয়োজনের তাকিদে দূত প্রেরণ করেন। প্রজাগণ জিজ্ঞাসা করিল, এই কথার প্রমাণ কি যে, আপনি মহান বাদশাহর একজন বার্তাবাহক প্রতিনিধি? তখন সে উহার প্রতিউত্তরে বাদশাহর সীলমোহর এবং অঙ্গুরী পেশ করিতে বাধ্য হয়। যদিও প্রকাশ্যভাবে দূতের পয়গাম্বরীসুলভ দাবির সহিত সীলমোহর এবং অঙ্গুরীয়ের সরাসরি কোন যোগসূত্র নাই, কিন্তু তবুও ইহার মধ্যে সম্পর্ক এইভাবে প্রতিপন্ন হয় যে, সীলমোহর এবং অঙ্গুরীয় বাদশাহরই নিদর্শন বটে, যাহা একজন সাধারণ মানুষের হাতে কখনও আসিতে পারে না। সুতরাং ইহাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, এই দূতকে বাদশাহ সরাসরি তাহার একান্ত ব্যক্তিগত নিদর্শন প্রদান করিয়া পাঠাইয়াছেন।
মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ হওয়ার অনুকূলে কুরআন-হাদীছের দলীল
(এক) আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এব যুগের মুশরিক ও পৌত্তলিকদের নিন্দা, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করিয়াছেন এবং এই মর্মে তাহাদের বর্ণনা দিয়াছেন যে, মুশরিকরা আল্লাহর আয়াত ও মু'জিযায় বিশ্বাসী নহে। যদি মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণই না হইত তাহা হইলে মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিবার পর উহাতে ঈমান আনয়ন না করিলে তাহারা ভর্ৎসনা ও নিন্দার যোগ্য হইবে কেন? অথচ দেখুন, নিজের আয়াতসমূহে মু'জিযা অস্বীকার করার কারণে মুশরিকদেরকে কিরূপ ভর্ৎসনা করা হইয়াছে।
وَمَا تَأْتِيهِمْ مِّنْ آيَةٍ مِّنْ أَيْتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ ، فَقَدْ كَذَّبُوا بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَ هُمْ فَسَوْفَ يَأْتِيهِمْ أَنْبُوا مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
"তাহাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর এমন কোন নির্দশন তাহাদের নিকট উপস্থিত হয় না যাহা হইতে তাহারা মুখ না ফিরায়। সত্য যখন তাহাদের নিকট আসিয়াছে, তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। যাহা লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহার যথার্থ বিবরণ অচিরেই তাহাদের নিকট পৌঁছিবে” (৬:৪-৫)।
وَمِنْهُمْ مِّنْ يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ وَجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَنْ يُفْقَهُوهُ وَفِي أَذَانِهِمْ وَقْرًا وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا حَتَّى إِذَا جَاءُوكَ يُجَادِلُونَكَ يَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هُذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ ، وَهُمْ يَنْهَوْنَ عَنْهُ وَيَنْشُونَ عَنْهُ وَإِنْ يُهْلِكُونَ لِلا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ وَلَوْ تَرَى إِذْ وَقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يُلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا تُكَذِّبَ بِايَتِ رَبَّنَا وَنَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
"তাহাদের মধ্যে কতকলোক তোমার দিকে কান পাতিয়া রাখে, কিন্তু আমি তাহাদের অন্তরের উপর আবরণ দিয়াছি যেন তাহারা তাহা উপলব্ধি করিতে না পারে। আমি তাহাদেরকে বধির করিয়াছি এবং তাহারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিলেও উহাতে ঈমান আনিবে না, এমনকি তাহারা যখন তোমার নিকট উপস্থিত হইয়া বিতর্কে লিপ্ত হয় তখন কাফিররা বলে, ইহা তো সেকালের উপকথা ব্যতীত কিছুই নহে। তাহারা অন্যকেও উহা শ্রবণে বিরত রাখে এবং নিজেরাও উহা হইতে দূরে থাকে। আর তাহারা নিজেরাই শুধু নিজেদেরকে ধ্বংস করে, অথচ তাহারা উপলব্ধি করে না। তুমি যদি দেখিতে পাইতে যখন তাহাদেরকে অগ্নির পার্শ্বে দাঁড় করান হইবে এবং তাহারা বলিবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটিত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহে অস্বীকার করিতাম না এবং আমরা মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত হইতাম" (৬: ২৫-২৭)।
মু'জিযা যদি হুজ্জত বা প্রমাণই না হয় তাহা হইলে কিসের ভিত্তিতে উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে মু'জিযা অস্বীকারকারীদেরকে এইরূপ তিরস্কার করা হইল?
(দুই) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَمَا مَنَعَنَا إِنْ تُرْسِلَ بِالْآيَتِ إِلا أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُونَ وَأَتَيْنَا ثَمُودَ النَّاقَةَ مُبْصِرَةً فَظَلَمُوا بِهَا وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَتِ الأَ تَخْوِيفًا
"পূর্ববর্তীগণ কর্তৃক নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা হইতে বিরত রাখে। আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ ছামুদ জাতিকে উষ্ট্র দিয়াছিলাম, অতঃপর তাহারা উহার প্রতি জুলুম করিয়াছিল। আমি ভীতি প্রদর্শনের জন্যই নিদর্শন প্রেরণ করি” (১৭: ৫৯)।
এই আয়াতের সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তা'আলা দয়াপরবশ হইয়া মানুষের প্রতি মু'জিযা প্রেরণ করেন না। কেননা মু'জিযা প্রকাশের পর মানুষ যদি তাহা অস্বীকার করে তাহা হইলে তাহারা আযাবের যোগ্য হইয়া পড়িবে। যেমন অতীতের উম্মতসমূহের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটিয়াছে। সুতরাং ইহাই এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, মু'জিযা নবুওয়াতের হুজ্জত বা প্রমাণ, যাহার প্রকাশের পর আর কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই। ইহার পরও কেহ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করিলে সে শাস্তিযোগ্য হইয়া যাইবে। সুতরাং মু'জিযা হুজ্জত না হইলে উহা অস্বীকার করার প্রেক্ষিতে আযাব অবধারিত হয় কিরূপে?
(তিন) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . قَالُوا نُرِيدُ أَنْ نَّاكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّهِدِينَ . قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاء تَكُونُ لَنَا عِيدًا لأولنَا وأخرنَا وَآيَةً مِّنْكَ وَارْزُقْنَا وَ أَنْتَ خَيْرُ الرِّزْقِينَ . قَالَ اللهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أَعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أَعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ الْعُلَمِينَ .
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিতে সক্ষম? সে বলিয়াছিল, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হও। তাহারা বলিয়াছিল, আমি চাহি যে, উহা হইতে আমরা কিছু খাইব ও আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করিবে। আর আমরা জানিতে চাহি যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলিয়াছ এবং আমরা উহার সাক্ষী থাকিতে চাহি। মরিয়ম-তনয় ঈসা বলিল, হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক। আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর। ইহা আমাদের এবং পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসবস্বরূপ এবং তোমার নিকট হইতে নিদর্শন। আর আমাদেরকে জীবিকা দান কর আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বলিলেন, আমিই তোমাদের নিকট উহা প্রেরণ করিব, কিন্তু ইহার পর তোমাদের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না” (৫: ১১২-১১৫)।
কুরআনের উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে পরিষ্কার বলা হইয়াছে যে, হাঁ, আমি তোমাদের কাঙ্ক্ষিত মু'জিযা প্রদান করিব। কিন্তু উহা প্রদানের পর কেহ উহা অস্বীকার করিলে তাহাকে
নজীরবিহীন শাস্তির সম্মুখীন হইতে হইবে। 'মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ'-এই অভিমতের সমর্থনে কুরআনের এই আয়াতগুলি অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ। (চার) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُبِينٍ . قَالَ فَأْتِ بِهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ . فَالْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ تُعْبَانٌ مُّبِينٌ، وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّظِرِينَ ، قَالَ لِلْمَلَا حَوْلَهُ إِنَّ هَذَا لسحر عَلِيمٌ .
"মূসা বলিল, আমি তোমার কাছে স্পষ্ট কোন প্রমাণ আনয়ন করিলেও? ফিরআওন বলিল, তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে উহা (প্রমাণ) পেশ কর। অতঃপর মূসা তাহার যষ্ঠি নিক্ষেপ করিলে তৎক্ষণাৎ উহা এক সাক্ষাৎ অজগর হইল। এবং মূসা হাত বাহির করিল আর তৎক্ষণাৎ উহা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হইল। ফিরআওন তাহার পরিষদবর্গকে বলিল, এ তো সুদক্ষ যাদুকর” (২৬ : ৩০-৩৪)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযাকে بشيء مبين স্পষ্ট ব্যাপার' তথা প্রমাণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন এবং ফিরআওনও উহাকে তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উপস্থিত করিবার জন্য আহবান করিয়াছে। অতঃপর মূসা (আ) তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসাবে তাঁহাকে প্রদত্ত মু'জিযা পেশ করিয়াছেন।
(পাঁচ) নবী ও রাসূলগণকে প্রদত্ত মু'জিযা তাহাদের নবৃওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ-একথা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত দুইটি মু'জিযা সম্বন্ধে স্পষ্টত বলিয়াছেন। যেমন: وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسَى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْأَمِنِيْنَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسَقَيْنَ .
"আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। 'তাহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস! ভয় করিও না, তুমি তো নিরাপদ। তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৮ : ৩১-৩২)।
অতএব কুরআনের এ জাতীয় সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্তমান থাকিবার পর-মু'জিযা প্রমাণ না নিদর্শন-এই বিষয়ে কোনরূপ মতবিরোধ এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই।

সহীহ বুখারীতে ইবন মাসউদ (রা) হইতে বর্ণিত আছে :
قال انشق القمر على عهد رسول الله ﷺ فرقتين فرقة فوق الجبل وفرقة دونه وقال رسول الله ﷺ اشهدوا .
"তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সময়ে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল, এক খণ্ড পাহাড়ের উপরের দিকে এবং অপর খণ্ড পাহাড়ের নীচের দিকে ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা সাক্ষী থাক” (বুখারী, কিতাবুত-তাফসীর)।
আধুনিক মুসলিম পণ্ডিতদের এইরূপ অভিমতের কারণ
জড়বাদী, বস্তু পূজারী ইউরোপীয় লেখকদের মধ্যে একটি প্রবণতা বিশেষভাবে দেখা যায় যে, তাহারা নবী-রাসূলগণের জীবদ্দশায় সংঘটিত যথার্থ তথ্য-প্রমাণে সুপ্রতিষ্ঠিত অলৌকিক (মু'জিযা) ঘটনাবলী অস্বীকার করিয়া থাকেন অথবা তাহারা নিজেদের সীমাবদ্ধ মানবীয় বিচার- বুদ্ধি ও যুক্তি দ্বারা উহা বিকৃত করিবার অপচেষ্টা চালাইয়া থাকেন। তাহাদের এই সংকীর্ণ মানসিকতা সম্বন্ধে ইহাই যথার্থ বক্তব্য হইবে যে, যাহারা আধ্যাত্মিক জগতের খোঁজ জানে না, যাহাদের জ্ঞানের দৌড় বস্তুতান্ত্রিক জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যাহাদের অন্তর ও মস্তিষ্ক জড় জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ—তাহাদের চক্ষে এই সমস্ত অলৌকিক (মু'জিযা) ঘটনাবলী এইভাবে প্রতিভাত হওয়াই স্বাভাবিক।
যাহারা নিজেদের রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এর অলৌকিক জন্মের কথা অস্বীকার করিতে পারিয়াছে, তাহারা যে অন্যান্য নবী-রাসূলের, বিশেষত শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর জীবনে সংঘটিত অলৌকিক (মু'জিযা) ঘটনাবলী অস্বীকার করিবে, ইহাতে বিস্মিত হইবার কি আছে? তবে বিস্ময় লাগে আমাদের কতিপয় মুসলিম পণ্ডিতের জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তি-বিবেচনার উপর। কারণ তাহারা আল্লাহ তা'আলার জড়-ঊর্ধ্ব মহান কুদরত ও অসাধারণ ক্ষমতায় বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও সহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত মু'জিয়াসমূহকে নিজেদের প্রসার যুক্তি ও সংকীর্ণ মেধা বুদ্ধি দ্বারা অস্বীকার করিতে কিংবা উহার অপব্যাখ্যা সন্ধানে উদ্যত হইয়াছেন। তাহারা যে নিরপেক্ষ, সুস্থ যুক্তি ও বিবেক দ্বারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান নাই বরং ইউরোপীয়া জড়বাদী লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত হইয়াছেন-উহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ মিলে তাহাদেরই অন্যতম লেখক বন্ধু মিসরের ড. হুসায়ন হায়কালের এই বক্তব্য হইতে। তিনি তাহার হায়াতে মুহাম্মাদ গ্রন্থের ভূমিকায় মু'জিযা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন যে, খুব সম্ভব সে কালের ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখকগণ যুগের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট পবিত্র কুরআন বহির্ভূত অলৌকিক ঘটনাবলী তাহাদের গ্রন্থরাজিতে সংকলন করিয়াছিল। বলা চলে, যুগের প্রয়োজনে এই ব্যাপারে তাহারা নিরুপায় ছিলেন। পরবর্তী যুগের লেখক ও চিন্তাবিদগণও এই ব্যাপারে তাহাদের পূর্ববর্তীদের অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা বোধ করিয়াছেন। তাহারা মনে করিয়াছেন যে, এই সমস্ত অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান সুদৃঢ় হইবে। এমনকি এই
সমস্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি করাও তাহাদের ধারণায় উপকার বৈ ক্ষতি ছিল না। তাহারা যদি এই ধরনের সু-ধারণা পোষণ না করিতেন তাহা হইলে অবশ্যই তাহারা এই সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করা হইতে বিরত থাকিতেন। তাহারা বর্তমানে জীবিত থাকিলে দেখিতে পাইতেন, ইসলামের শত্রুরা এই সমস্ত অলৌকিক ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া ইসলাম সম্পর্কে জঘন্য সমালোচনা করিয়াছে। এই পরিণতি দোখতে পাইলে পবিত্র কুরআন বহির্ভূত অলৌকিক ঘটনাবলী কখনও তাহারা নিজেদের গ্রন্থরাজিতে সংকলন করিতেন না (দ্র. হায়াতে মুহাম্মাদ, ভূমিকা, মু'জিযা প্রসংগে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মু'জিযার সত্যতা প্রতিষ্ঠা

📄 মু'জিযার সত্যতা প্রতিষ্ঠা


হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনাক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী আকাইদ ও মু'জিযা সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক কোন বিতর্কের সৃষ্টি হয় নাই। কিন্তু হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন গ্রীক দর্শন সম্বলিত গ্রন্থাবলীর আরবী তরজমা মুসলমানদের মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করে, তখন ইহা ইসলামের 'ইলমে কালাম তথা আকাইদ তর্কশাস্ত্রের একটি প্রয়োজনীয় বিষয় হিসাবে রচিত হয় এবং এই সমস্ত যুক্তি-তর্কের গুরুত্ব এতই বৃদ্ধি পায় যে, তখন এই গ্রীক দর্শনের কষ্টিপাথরে যাচাই ব্যতীত কোন বিষয়ই গ্রহণযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইত না।
গ্রীসের অধিবাসীরা আল্লাহ-প্রদত্ত শরী'আত সম্বন্ধে পরিচিত ছিল না। তাহারা ছিল পৌত্তলিক। এইজন্য তাহারা নবৃওয়াত, নবৃওয়াতের বৈশিষ্ট্য, ওহী, ইলহাম ও মু'জিযা সম্পর্কেও ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং অপরিচিত। এই কারণে গ্রীক দর্শনে এই সমস্ত বিষয়ের কোন আলোচনাই স্থান পায় নাই। এই প্রসঙ্গে আল্লামা ইব্‌ন রুশদ তাঁহার "তাহাফাতুত-তাহাফুত" নামক গ্রন্থে বিস্তৃত বিশ্লেষণ পেশ করিয়াছেন। আল্লামা ইব্‌ন তাইমিয়াও স্বীয় রচনাবলীতে এই প্রসঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করিয়াছেন। তবে এই ক্ষেত্রে সবচাইতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়াছেন মুসলিম দার্শনিক শায়খ ইয়া'কূব আল-কিন্দী। তাঁহার পর দার্শনিক ফারাবীও এই সম্পর্কে যথেষ্ট লেখালেখি করিয়াছেন। তিনি মু'জিযা সম্পর্কে লিখিয়াছেন: নবৃওয়াতের অধিকারী সত্তার রূহের মধ্যে এক ধরনের পবিত্র শক্তির বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। যেমন তোমাদের দেহের মধ্যে তোমাদের প্রাণশক্তি রহিয়াছে এবং তোমাদের দেহ তোমাদের রূহের অনুগত হইয়া থাকে, অনুরূপ সেই পবিত্র শক্তিসম্পন্ন রূহ সার্বিকভাবে বিশ্বের অবয়বধারী বস্তুনিচয়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে এবং সমগ্র বিশ্বজগত তাহার প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং এই কারণেই পবিত্র রূহানী শক্তিসম্পন্ন সত্তা হইতে সহজাত স্বভাবের অতীত কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাইয়া থাকে। ইহাই মু'জিযা (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ৯১৮)।
"যে কোন বস্তুর সহজাত স্বভাবের অতীত কর্মকাণ্ডের নাম মু'জিযা"— কথাটির ব্যাখ্যা এই যে, প্রত্যেক বস্তুর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ও নিয়মতান্ত্রিকতা আছে যাহা উহা হইতে কখনও পৃথক হয় না। যেমন আগুনের সহজাত বৈশিষ্ট্য হইল ভস্মিভূত কর, সমুদ্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য হইল প্রবাহিত থাকা, বৃক্ষের সহজাত স্বভাব হইল স্থির থাকা, পাথরের বৈশিষ্ট্য হইল চলিতে না পারা, মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হইল, মৃত্যুর পর পুনরায় দুনিয়াতে জীবিত না হওয়া ইত্যাদি। এখন যদি এমন হয় যে, আগুন ভস্মিভূত করে নাই, সমুদ্র স্থির হইয়া রহিয়াছে, প্রবাহ নাই, পাথর চলিতে শুরু করিয়াছে, কথা বলিতে আরম্ভ করিয়াছে, মৃত জীবিত হইয়া গিয়াছে, তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, ইহা পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মকে বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছে। ইহা সেই বস্তুর সহজাত কার্যকারণ সম্পর্কের সুশৃংখল ব্যবস্থাকে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে, প্রাকৃতিক নিয়মাবলীকে পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, পৃথিবীর বস্তুনিচয়ের এই সহজাত নিয়মাবলী কি পরিবর্তনযোগ্য? দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের একটি দলের অভিমত এই যে, বস্তুনিচয়ের সহজাত নিয়মতান্ত্রিকতার কোনরূপ পরিবর্তন সম্ভব নহে। এই ভিত্তিতে তাহারা মু'জিয়ার অসম্ভাব্যতা প্রতিপন্ন করিবার প্রয়াস পান। মুসলিম দার্শনিকদের একটি শ্রেণীও এই অভিমত সমর্থন করিয়াছেন। যেমন ফারাবী, ইব্‌ন সীনা, ইব্‌ন মিসকাওয়ায়হ্ প্রমুখ. (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ৯৪৩)।
ইব্‌ন তায়মিয়্যা তাঁহার "রাদ্দুল মানতিক” নামক গ্রন্থে এবং ইবন হাযম জাহিরী তাঁহার 'আল-ফিসাল ফিল-মিলালি ওয়ান-নিহাল' নামক গ্রন্থে ফারাবী, ইব্‌ন সীনা প্রমুখ দার্শনিকের অভিমতকে পরিত্যজ্য বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছেন। কারণ "প্রকৃতির সহজাত নিয়মাবলীর পরিবর্তন সম্ভব নহে” কথাটি বাস্তবসম্মত নহে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোন প্রাণীর জন্মের প্রাকৃতিক নিয়ম হইল, এক ফোটা বীর্য হইতে রক্ত উৎপন্ন হয়; রক্ত হইতে গোশত উৎপন্ন হয়, তৎপর পর্যায়ক্রমে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত উহা মাতৃ উদরে প্রতিপালিত হয়, ফলে উহা পরিণত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ দেহাবয়বে। অতঃপর উহা নবজাত শিশুরূপে ভূমিষ্ঠ হয় এবং পর্যায়ক্রমে শিশুরূপ ধীরে ধীরে বড় হইতে থাকে এবং পরবর্তীতে সুস্থ, সুডৌল দৈহিক কান্তির অধিকারী একজন শৌর্য-বীর্য সমৃদ্ধ যুবকে রূপান্তরিত হয় এবং তাহার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটায়।
এই হইল একটি মানুষের জন্মের সহজাত প্রাকৃতিক নিয়ম। এখন এই নিয়ম ভঙ্গ করিয়া অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়সমূহ অতিক্রম করা ব্যতীত কাহারও পক্ষে সুদেহী প্রাণী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করাও সম্ভব। মোটেও অসম্ভব নহে। এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য এই যে, এক ফোটা বীর্য রক্তে রূপান্তরিত হইতে, তৎপর গোশতে, তৎপর অস্থি-মজ্জায় ও সুডৌল- সুঠাম হইতে অন্তর্বর্তীকালীন যেই পর্যায়গুলি অতিক্রম করিবার আবশ্যকতা রহিয়াছে, তাহা যদি কোনভাবে পূরণ করিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে উক্ত অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়গুলি অতিক্রম করা ছাড়াই এক ফোটা বীর্য একটি সুঠাম-সুডৌল দেহে রূপান্তরিত হইতে পারে। আধুনিক কালে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে নানান ফসলাদির উৎপাদন বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গের প্রকৃষ্ট উদাহরণ নহে কি?
কতিপয় দার্শনিক মনে করেন, পৃথিবীর ঘটনাবলী কোন না কোন প্রাকৃতিক কার্যকারণ দ্বারাই সংঘটিত হইয়া থাকে। কিন্তু সহজাত প্রকৃতির অতীত কর্মকাণ্ডে এই কার্যকারণ অনুপস্থিত। এই ভিত্তিতেও তাহারা মু'জিযা অস্বীকার করিবার প্রয়াস পান। ইহার সমাধান এই যে, হাঁ, যাবতীয় ঘটনার পশ্চাতে কোন না কোন কার্যকারণ ক্রিয়াশীল রহিয়াছে। কিন্তু ইহা তো জরুরী নহে যে, সকল ধরনের প্রাকৃতিক কারণসমূহ আমরা আমাদের জ্ঞান ও মনীষা দ্বারা সার্বিকভাবে অনুধাবন করিতে সক্ষম হইব? কিছু কিছু কার্যকারণ এমনও রহিয়াছে, যাহা অতিশয় প্রচ্ছন্ন ও সূক্ষ্ম হওয়ার দরুন স্বভাবত মানুষের জ্ঞান ও মনীষা তাহা অনুধাবন করিতে সক্ষম হয় না। এই পৃথিবীতে অসংখ্য-অগণিত সৃষ্টি রহিয়াছে যাহার সূক্ষ্ম রহস্যটির যৎসামান্যই মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হইয়াছে। আবার বহু সংখ্যক এমনও আছে যে, উহার কার্যকারণের গূঢ় রহস্য আজও অজানার পর্দার অন্তরালেই রহিয়া গিয়াছে। যেমন নবী-রাসূলগণ চল্লিশ দিন পর্যন্ত একটানা সিয়াম সাধনা করিয়াছেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁহারা সামান্যতম আহার্য-পানীয় গ্রহণ করেন নাই। কিন্তু ইহাতেও তাহাদের শারীরিক শক্তির মধ্যে কোনই পরিবর্তন দেখা দেয় নাই। ইহা স্পষ্টত আশ্চর্যজনক বিষয়। কিন্তু এই ঘটনাও কার্যকারণ হইতে পৃথক নহে। কেননা আমরা যদি অনুসন্ধান করি, মানুষের ক্ষুধার তাড়না দেখা দেয় কেন, তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, মানুষের উদরস্থ হজমশক্তি ভক্ষিত খাদ্যকণাকে পরিপূর্ণরূপে হজম করিবার পর উহা হইতে উদ্ভূত রক্ত কণিকাগুলিকে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌঁছাইয়া দেয়। ইহার উদরস্থ হজম শক্তির আর কোন কাজ অবশিষ্ট থাকে না, যাহার ফলে উহার মধ্যে তালাশ করার প্রবণতা প্রবল হইয়া উঠে। ইহারই ফলে মানুষ ক্ষুধার তাড়না অনুভব করিয়া থাকে।
কিন্তু আমরা চলমান জীবনে এমন অভিজ্ঞতারও সম্মুখীন হই যে, কোন রোগের কারণে অথবা ভয়ভীতির কারণে অথবা গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকার কারণে আমাদের দেহে এমন এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, যাহার প্রভাবে দীর্ঘ কয়েক দিন পর্যন্ত আমাদের পাকস্থলীর হজমশক্তি লোপ পাইয়া যায়। ইহার ফলে আমরা ক্ষুদার তাড়না অনুভব করি না। ঠিক একই নীতির ভিত্তিতে যদি কোনও ব্যক্তির মধ্যে আধ্যাত্মিকতার সহিত নিবিড় সম্পর্ক গড়িয়া-উঠে এবং দৈহিক অবস্থার সহিত তাহার সম্পর্ক শিথিল হয়, এমতাবস্থায়ও তাহার শারীরিক শক্তির মধ্যে স্থবিরতা বা শক্তিহীনতা দেখা দিতে পারে। এই ক্ষেত্রেও সে কয়েক দিন পর্যন্ত উপবাস থাকিতে পারে।
মোটকথা, আধ্যাত্মিক শক্তির সহিত যখন গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তখন দৈহিক স্বাভাবিক গতিবিধি এবং কার্যক্রমের মধ্যে নিস্পৃহ ভাব দেখা দেয়। এই নাজুক লগ্নেও মানুষ দীর্ঘ দিন পর্যন্ত উপবাস করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে পারে। সুতরাং এই সহজাত প্রকৃতির বরখেলাপ কার্যপ্রবাহকে যদি স্বীকার করিয়া লইতে কষ্ট না হয়, তাহা হইলে অতি প্রকৃত আধ্যাত্মিক শক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকিতে পারে না (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ৯৫০)।
বস্তুত কার্যকারণ সম্পর্কের উপর সর্বাঙ্গীন অভিজ্ঞতা মানুষের নাই। মানুষ যাহা কিছু জানিবার সুযোগ লাভ করিয়াছে, উহার তুলনা বিশাল সমুদ্রের একফোঁটা পানি অথবা উহা হইতও স্বল্প ও ক্ষীণ। উপরন্তু মানুষ যাহা কিছু জানিবার এবং অনুধাবন করিবার সুযোগ পাইয়াছে, তাহাও পৃথিবীর কতিপয় বস্তুর চলমান গতি-প্রকৃতির সামান্য নিরীক্ষা মাত্র। উহার হাকীকতও প্রকৃত জ্ঞান নহে। মানুষ জ্ঞানের এই সীমানায় পৌছিতে অক্ষম যে, বস্তুটি কেন চলিতেছে এবং যদি বস্তুটি বিপরীত দিকে চলিত তাহা হইলে কি কি অসামঞ্জস্য প্রকাশ পাইত? এই কারণেই পৃথিবীর স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিকগণ একবাক্যে এই কথা স্বীকার করিয়া লইয়াছেন যে, তাহারা কেমন প্রশ্নটির উত্তর দিতে সক্ষম, কিন্তু কেন প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর দেওয়া তাহাদের আলোচ্য বিষয়ের বাহিরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পানি কেমন? ইহার উত্তর বৈজ্ঞানিকগণ তাহাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু পানি কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর তাহারা দিতে পারেন নাই, এমনকি এই প্রশ্নের আলোচনাও তাহারা করেন নাই।
প্রকৃত সত্য এই যে, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ কার্যকারণ সম্বন্ধে যেই মতাদর্শ দৃঢ়ভাবে আকড়াইয়া ধরিয়াছেন, বস্তুত ইহার পরিণতি অজ্ঞতা ও বুদ্ধিহীনতা বৈ কিছু নহে। কারণ তাহাদের বিশ্বাস যে, এই বস্তুটি এই কার্যকারণ ও উপাদানে সৃষ্টি হইয়াছে। ইহা ব্যতীত এই বস্তুটি অস্তিত্বে আসিতেই পারে না। যেমন বীর্য হইতে প্রাণের উৎপত্তি, ডিম হইতে পাখির উৎপত্তি, উদ্ভিদের উৎস বীজ, তাহাদের বিশ্বাসের এই সমস্ত উপাদান ছাড়া এইসব বস্তু অস্তিত্বে আসিবার কথা কল্পনাও করা যায় না। এখানে আমাদের প্রশ্ন যে, দুনিয়ার প্রথম প্রাণী, প্রথম পাখি এবং প্রথম উদ্ভিদ কি বীর্য, ডিম ও বীজ ছাড়াই সৃষ্টি হইয়াছে? এর উত্তরে যদি তাহারা হাঁ বলেন, তাহা হইলে তো তাহারা নিজেদের দাবি ও মতাদর্শের বিপরীত সাক্ষ্য প্রদান করিবেন। আর যদি ইহা অস্বীকার করেন তাহা হইলে এই কথাও তাহাদেরকে অবশ্যই স্বীকার করিয়া লইতে হইবে যে, প্রথম বীর্য, প্রথম ডিম এবং প্রথম বীজ, প্রাণী, পাখী ও উদ্ভিদ ছাড়াই সৃষ্টি হইয়াছে।
মোটকথা, এই লক্ষ্যমাত্রাকে কখনও বিজ্ঞান তাহার বুদ্ধির শাণিত অস্ত্র দ্বারা নির্মূল করিতে পারিবে না। এমতাবস্থায় কার্যকারণ সম্পর্কিত কতিপয় দর্শন এবং মতাদর্শ তাহাদেরকে অবশ্যই পরিহার করিতে হইবে। পাশাপাশি তাহাদেরকে এই কথারও স্বীকৃতি দিতে হইবে যে, এক মহা শক্তিমান ইচ্ছাশক্তির অস্তিত্ব অবশ্যই বর্তমান রহিয়াছে, যাঁহার ইচ্ছা ও নির্দেশে বিশ্বজগতের এই কারখানা পরিচালিত হইতেছে। উপরন্তু তাহাকে এই কথাও মানিয়া লইতে হইবে যে, কার্যকারণ সম্পর্কে সেই মহান শক্তিমান সত্তার ইচ্ছা এবং নির্দেশ বিকাশের বাহ্যিক দৃষ্টান্ত ছাড়া অতিরিক্ত আর কিছু নহে। বস্তুত কার্যকারণও তাহার সার্বভৌম ইচ্ছার অধীন। পবিত্র কুরআনে এই কথাই বিবৃত হইয়াছে :
‏اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبْرَكَ اللهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ.
"জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই। মহিমাময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ” (৭:৫৪)।
সুতরাং বিশ্বজগতের সব কিছুর পশ্চাতে আল্লাহ্ কুদরত এবং তাঁহার ইচ্ছাই হইল মূল কারণ।
আল্লামা রূমী বলিয়াছেন, বাহ্যিক কারণসমূহের উপর হাকীকী ও মৌলিক কারণসমূহের নিয়ন্ত্রণাধিকার থাকে। সুতরাং হে দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ! তোমরা বাহ্যিক কারণসমূহ দেখিয়া অভিভূত হইও না, বরং হাকিকী ও মৌলিক কারণসমূহ সম্পর্কেও গভীর চিন্তা-গবেষণা কর। কেননা নবীগণ বাহ্যিক কারণ ও উপাদান সম্পর্ককে পরিহার করিয়া নিজেদের লক্ষ্যের দিকে আগাইয়া যান এবং আল্লাহ প্রদত্ত মু'জিযা ও অলৌকিক শক্তির ঝাণ্ডা সর্বত্র সমুন্নত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাই দেখা যায়, কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক ছাড়াই তাহারা গহীন সমুদ্রকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া নিজেদের চলার পথ রচনা করেন এবং কৃষিক্ষেত-খামার ছাড়াই গম ও যবের ফসল লাভ করেন। এমনকি পবিত্র কুরআনে যেই দিকনির্দেশনা মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে, তাহাও এই যে, কার্যকারণ সম্পর্ক শক্তিহীন ও নিষ্ক্রিয়। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (সা) সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে বিজয়ী হইয়াছেন এবং তাঁহারই পার্শ্বে আবু জাহল হইয়াছে ধ্বংস। এইভাবে ক্ষুদ্র আবাবিল পাখির প্রস্তর খণ্ডে আবিসিনিয়ার হস্তিবাহিনী হইয়াছে পর্যুদস্ত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তর কণা আবাবীলের চঞ্চু হইতে নিক্ষিপ্ত হইত হস্তি বাহিনীর উপর, ফলে দীর্ণ-বিদীর্ণ এবং ঝাঁঝরা করিয়া দিত চর্বিত তৃণলতার মত।
মোটের উপর পবিত্র কুরআনে আগাগোড়া এই কথাই তুলিয়া ধরা হইয়াছে যে, কার্যকারণ সম্পর্কিত চলমান দুনিয়ার বাহ্যিক কারণের মধ্যে কোনই মৌলিক ক্ষমতা ও শক্তি নাই। মূল কার্যকারণের নিয়ন্ত্রণকারী মহান আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছানুসারে বাহ্যিক কার্যকারণের মধ্যে কখনও কখনও কার্যকরী শক্তি ও ক্ষমতার বিকাশ ঘটাইয়া থাকেন। তথাপি এই বিকাশ কারণসম্ভূত নহে, বরং আল্লাহ প্রদত্ত গুণাবলীর বাহ্যিক প্রতিফলন মাত্র (মছনবী)।
এই পর্যন্ত আমরা যাহা কিছু আলোচনা করিয়াছি উহার সারমর্ম এই যে, সহজাত স্বভাবকে এবং কার্যকারণ সম্পর্কের নিয়মতান্ত্রিকতাকে সর্বতোভাবে পরাজিত করার নাম হইতেছে মু'জিযা, যাহা মহান আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মনোনীত পয়গাম্বরের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ মানুষের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া থাকেন। দ্বিতীয় কথা এই যে, সহজাত স্বভাবের বিপরীত কোন কিছু সংঘটিত হওয়া এবং কার্যকারণ সম্পর্কের বাঁধন ছিন্ন-বিছিন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু স্মরণ রাখিতে হইবে যে, কোন বিষয়ের জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাব্যতা উহার কার্যত সংঘটিত হওয়ার দলীল বহন করে না, বরং কোন বিষয়ের কার্যত সংঘটিত হওয়াকে কবূল করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য।
(এক) বর্ণনাকারীর সন্দেহাতীত প্রত্যক্ষ করা এবং গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া।
(দুই) বর্ণনাকারীর সত্যবাদী হওয়া এবং তাহার স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ ও সুস্থ হওয়া, তাহার মধ্যে প্রতারণা ও প্রবঞ্চণার প্রবণতা না থাকা। (তিন) বর্ণনাটি শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সমগুণ সম্পন্ন বর্ণনাকারীদের দ্বারা বিবৃত হওয়া। চার. উপরন্তু এই প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ অবিচ্ছিন্ন ধারায় সকল যুগের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্র-পরম্পরায় সংরক্ষিত হইয়া আমাদের পর্যন্ত পৌছা।
এখন উল্লিখিত নীতি ও মানদণ্ডের আলোকে আমাদেরকে দেখিতে হইবে যে, হাদীছ, ইতিহাস ও ধর্মীয় কিতাবাদিতে মহানবী (স)-এর যেই সমস্ত মু'জিযার বর্ণনা লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তাহাতে উপরিউক্ত শর্তানুসারে দলীল-প্রমাণ ও সাক্ষ্য পাওয়া যায় কিনা?
আমাদের উসূলে হাদীছে প্রত্যেকটি রিওয়ায়াত গ্রহণ করার জন্য উপরে উল্লিখিত নীতিসমূহকে পূর্বশর্তরূপে নির্ধারণ করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযাত সম্পর্কে যেই সমস্ত সাহাবী প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছেন, তাহাদের সত্যবাদিতা জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা, স্মরণশক্তি এবং সুষ্ঠ বিচার-বিশ্লেণনী প্রতিভার প্রমাণ সর্বজন স্বীকৃত। তাহাদের নিকট হইতে পরবর্তী সময়ে যেই সমস্ত মুহাদ্দিছীনে কেরাম উক্ত বর্ণনাসমূহ নকল করিয়াছেন তাঁহাদের সত্যবাদিতা, জ্ঞান-বুদ্ধি এবং তীক্ষ্ণ ধীশক্তির কথা আসমাউর রিজাল-এর কিতাবসমূহে বিস্তারিতভাবে সুসংরক্ষিত রহিয়াছে। উপরন্তু তাহাদের সামনে সর্বদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সতর্ক হুঁশিয়ারী বারংবার ঝংকৃত হইতঃ
من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار "যেই ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, তাহার ঠিকানা হইবে জাহান্নাম" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৭)।
এই কারণে তাঁহারা যখনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সম্পর্কিত কোন বক্তব্য রিওয়ায়াত করিতেন, তখন পরিপূর্ণ মানবিক সচেতনতা এবং বিশেষ বিবেচনার সহিত তাহা বর্ণনা করিতেন। তবে যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে সকলের সচেতনতা ও স্মৃতিশক্তি সমান নহে, সেইহেতু সার্বিক সতর্কতা এবং মনোনিবেশের পরও সকলের বর্ণনা একই মূল্যমানের হওয়া সম্ভব ছিল না। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সম্পর্কিত মু'জিযার বর্ণনাসমূহ নির্ভরযোগ্যতার মাত্রা বা স্তর বিবেচনায় কম-বেশী হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু আমাদের সচেতন মুহাদ্দিছীনে কেরাম অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরিপূর্ণ আমানতদারির সহিত নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্বল বর্ণনাসমূহকে সহীহ বর্ণনাসমূহ হইতে পৃথক করিতে সক্ষম হইয়াছেন এবং এই মানদণ্ডের দ্বারা সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।
সারকথা এই যে, মু'জিযার সত্যতা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিদ্যমান থাকা একান্ত জরুরী। সহীহ মু'জিযাতই পরবর্তী সাক্ষ্য-প্রমাণ সম্বলিত রিওয়ায়াত-সমূহ এতই মজবুত ও সুদৃঢ় যে, দুনিয়ার কোন বর্ণনা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম নহে। ইহার ফলে মু'জিযার অকাট্যতা এবং সহজাত প্রকৃতির বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বাস্তবতাকে কেহই অস্বীকার করিতে পারে না।

১৪৫ হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনাক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী আকাইদ ও মু'জিযা সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক কোন বিতর্কের সৃষ্টি হয় নাই। কিন্তু হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন গ্রীক দর্শন সম্বলিত গ্রন্থাবলীর আরবী তরজমা মুসলমানদের মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করে, তখন ইহা ইসলামের 'ইলমে কালাম তথা আকাইদ তর্কশাস্ত্রের একটি প্রয়োজনীয় বিষয় হিসাবে রচিত হয় এবং এই সমস্ত যুক্তি-তর্কের গুরুত্ব এতই বৃদ্ধি পায় যে, তখন এই গ্রীক দর্শনের কষ্টিপাথরে যাচাই ব্যতীত কোন বিষয়ই গ্রহণযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইত না।
গ্রীসের অধিবাসীরা আল্লাহ-প্রদত্ত শরী'আত সম্বন্ধে পরিচিত ছিল না। তাহারা ছিল পৌত্তলিক। এইজন্য তাহারা নবৃওয়াত, নবৃওয়াতের বৈশিষ্ট্য, ওহী, ইলহাম ও মু'জিযা সম্পর্কেও ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং অপরিচিত। এই কারণে গ্রীক দর্শনে এই সমস্ত বিষয়ের কোন আলোচনাই স্থান পায় নাই। এই প্রসঙ্গে আল্লামা ইব্‌ন রুশদ তাঁহার "তাহাফাতুত-তাহাফুত" নামক গ্রন্থে বিস্তৃত বিশ্লেষণ পেশ করিয়াছেন। আল্লামা ইব্‌ন তাইমিয়াও স্বীয় রচনাবলীতে এই প্রসঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করিয়াছেন। তবে এই ক্ষেত্রে সবচাইতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়াছেন মুসলিম দার্শনিক শায়খ ইয়া'কূব আল-কিন্দী। তাঁহার পর দার্শনিক ফারাবীও এই সম্পর্কে যথেষ্ট লেখালেখি করিয়াছেন। তিনি মু'জিযা সম্পর্কে লিখিয়াছেন: নবৃওয়াতের অধিকারী সত্তার রূহের মধ্যে এক ধরনের পবিত্র শক্তির বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। যেমন তোমাদের দেহের মধ্যে তোমাদের প্রাণশক্তি রহিয়াছে এবং তোমাদের দেহ তোমাদের রূহের অনুগত হইয়া থাকে, অনুরূপ সেই পবিত্র শক্তিসম্পন্ন রূহ সার্বিকভাবে বিশ্বের অবয়বধারী বস্তুনিচয়ের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে এবং সমগ্র বিশ্বজগত তাহার প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং এই কারণেই পবিত্র রূহানী শক্তিসম্পন্ন সত্তা হইতে সহজাত স্বভাবের অতীত কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাইয়া থাকে। ইহাই মু'জিযা (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ৯১৮)।
"যে কোন বস্তুর সহজাত স্বভাবের অতীত কর্মকাণ্ডের নাম মু'জিযা"— কথাটির ব্যাখ্যা এই যে, প্রত্যেক বস্তুর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ও নিয়মতান্ত্রিকতা আছে যাহা উহা হইতে কখনও পৃথক হয় না। যেমন আগুনের সহজাত বৈশিষ্ট্য হইল ভস্মিভূত কর, সমুদ্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য হইল প্রবাহিত থাকা, বৃক্ষের সহজাত স্বভাব হইল স্থির থাকা, পাথরের বৈশিষ্ট্য হইল চলিতে না পারা, মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হইল, মৃত্যুর পর পুনরায় দুনিয়াতে জীবিত না হওয়া ইত্যাদি। এখন যদি এমন হয় যে, আগুন ভস্মিভূত করে নাই, সমুদ্র স্থির হইয়া রহিয়াছে, প্রবাহ নাই, পাথর চলিতে শুরু করিয়াছে, কথা বলিতে আরম্ভ করিয়াছে, মৃত জীবিত হইয়া গিয়াছে, তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, ইহা পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মকে বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছে। ইহা সেই বস্তুর সহজাত কার্যকারণ সম্পর্কের সুশৃংখল ব্যবস্থাকে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে, প্রাকৃতিক নিয়মাবলীকে পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, পৃথিবীর বস্তুনিচয়ের এই সহজাত নিয়মাবলী কি পরিবর্তনযোগ্য? দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের একটি দলের অভিমত এই যে, বস্তুনিচয়ের সহজাত নিয়মতান্ত্রিকতার কোনরূপ পরিবর্তন সম্ভব নহে। এই ভিত্তিতে তাহারা মু'জিযার অসম্ভাব্যতা প্রতিপন্ন করিবার প্রয়াস পান। মুসলিম দার্শনিকদের একটি শ্রেণীও এই অভিমত সমর্থন করিয়াছেন। যেমন ফারাবী, ইব্‌ন সীনা, ইব্‌ন মিসকাওয়ায়হ্ প্রমুখ. (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ৯৪৩)।
ইব্‌ন তায়মিয়্যা তাঁহার "রাদ্দুল মানতিক” নামক গ্রন্থে এবং ইবন হাযম জাহিরী তাঁহার 'আল-ফিসাল ফিল-মিলালি ওয়ান-নিহাল' নামক গ্রন্থে ফারাবী, ইব্‌ন সীনা প্রমুখ দার্শনিকের অভিমতকে পরিত্যজ্য বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছেন। কারণ "প্রকৃতির সহজাত নিয়মাবলীর পরিবর্তন সম্ভব নহে” কথাটি বাস্তবসম্মত নহে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোন প্রাণীর জন্মের প্রাকৃতিক নিয়ম হইল, এক ফোটা বীর্য হইতে রক্ত উৎপন্ন হয়; রক্ত হইতে গোশত উৎপন্ন হয়, তৎপর পর্যায়ক্রমে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত উহা মাতৃ উদরে প্রতিপালিত হয়, ফলে উহা পরিণত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ দেহাবয়বে। অতঃপর উহা নবজাত শিশুরূপে ভূমিষ্ঠ হয় এবং পর্যায়ক্রমে শিশুরূপ ধীরে ধীরে বড় হইতে থাকে এবং পরবর্তীতে সুস্থ, সুডৌল দৈহিক কান্তির অধিকারী একজন শৌর্য-বীর্য সমৃদ্ধ যুবকে রূপান্তরিত হয় এবং তাহার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটায়।
এই হইল একটি মানুষের জন্মের সহজাত প্রাকৃতিক নিয়ম। এখন এই নিয়ম ভঙ্গ করিয়া অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়সমূহ অতিক্রম করা ব্যতীত কাহারও পক্ষে সুদেহী প্রাণী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করাও সম্ভব। মোটেও অসম্ভব নহে। এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য এই যে, এক ফোটা বীর্য রক্তে রূপান্তরিত হইতে, তৎপর গোশতে, তৎপর অস্থি-মজ্জায় ও সুডৌল- সুঠাম হইতে অন্তর্বর্তীকালীন যেই পর্যায়গুলি অতিক্রম করিবার আবশ্যকতা রহিয়াছে, তাহা যদি কোনভাবে পূরণ করিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে উক্ত অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়গুলি অতিক্রম করা ছাড়াই এক ফোটা বীর্য একটি সুঠাম-সুডৌল দেহে রূপান্তরিত হইতে পারে। আধুনিক কালে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে নানান ফসলাদির উৎপাদন বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গের প্রকৃষ্ট উদাহরণ নহে কি?
কতিপয় দার্শনিক মনে করেন, পৃথিবীর ঘটনাবলী কোন না কোন প্রাকৃতিক কার্যকারণ দ্বারাই সংঘটিত হইয়া থাকে। কিন্তু সহজাত প্রকৃতির অতীত কর্মকাণ্ডে এই কার্যকারণ অনুপস্থিত। এই ভিত্তিতেও তাহারা মু'জিযা অস্বীকার করিবার প্রয়াস পান। ইহার সমাধান এই যে, হাঁ, যাবতীয় ঘটনার পশ্চাতে কোন না কোন কার্যকারণ ক্রিয়াশীল রহিয়াছে। কিন্তু ইহা তো জরুরী নহে যে, সকল ধরনের প্রাকৃতিক কারণসমূহ আমরা আমাদের জ্ঞান ও মনীষা দ্বারা সার্বিকভাবে অনুধাবন করিতে সক্ষম হইব? কিছু কিছু কার্যকারণ এমনও রহিয়াছে, যাহা অতিশয় প্রচ্ছন্ন ও সূক্ষ্ম হওয়ার দরুন স্বভাবত মানুষের জ্ঞান ও মনীষা তাহা অনুধাবন করিতে সক্ষম হয় না। এই পৃথিবীতে অসংখ্য-অগণিত সৃষ্টি রহিয়াছে যাহার সূক্ষ্ম রহস্যটির যৎসামান্যই মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হইয়াছে। আবার বহু সংখ্যক এমনও আছে যে, উহার কার্যকারণের গূঢ় রহস্য আজও অজানার পর্দার অন্তরালেই রহিয়া গিয়াছে। যেমন নবী-রাসূলগণ চল্লিশ দিন পর্যন্ত একটানা সিয়াম সাধনা করিয়াছেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁহারা সামান্যতম আহার্য-পানীয় গ্রহণ করেন নাই। কিন্তু ইহাতেও তাহাদের শারীরিক শক্তির মধ্যে কোনই পরিবর্তন দেখা দেয় নাই। ইহা স্পষ্টত আশ্চর্যজনক বিষয়। কিন্তু এই ঘটনাও কার্যকারণ হইতে পৃথক নহে। কেননা আমরা যদি অনুসন্ধান করি, মানুষের ক্ষুধার তাড়না দেখা দেয় কেন, তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, মানুষের উদরস্থ হজমশক্তি ভক্ষিত খাদ্যকণাকে পরিপূর্ণরূপে হজম করিবার পর উহা হইতে উদ্ভূত রক্ত কণিকাগুলিকে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌঁছাইয়া দেয়। ইহার উদরস্থ হজম শক্তির আর কোন কাজ অবশিষ্ট থাকে না, যাহার ফলে উহার মধ্যে তালাশ করার প্রবণতা প্রবল হইয়া উঠে। ইহারই ফলে মানুষ ক্ষুধার তাড়না অনুভব করিয়া থাকে।
কিন্তু আমরা চলমান জীবনে এমন অভিজ্ঞতারও সম্মুখীন হই যে, কোন রোগের কারণে অথবা ভয়ভীতির কারণে অথবা গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকার কারণে আমাদের দেহে এমন এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, যাহার প্রভাবে দীর্ঘ কয়েক দিন পর্যন্ত আমাদের পাকস্থলীর হজমশক্তি লোপ পাইয়া যায়। ইহার ফলে আমরা ক্ষুদার তাড়না অনুভব করি না। ঠিক একই নীতির ভিত্তিতে যদি কোনও ব্যক্তির মধ্যে আধ্যাত্মিকতার সহিত নিবিড় সম্পর্ক গড়িয়া-উঠে এবং দৈহিক অবস্থার সহিত তাহার সম্পর্ক শিথিল হয়, এমতাবস্থায়ও তাহার শারীরিক শক্তির মধ্যে স্থবিরতা বা শক্তিহীনতা দেখা দিতে পারে। এই ক্ষেত্রেও সে কয়েক দিন পর্যন্ত উপবাস থাকিতে পারে।
মোটকথা, আধ্যাত্মিক শক্তির সহিত যখন গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তখন দৈহিক স্বাভাবিক গতিবিধি এবং কার্যক্রমের মধ্যে নিস্পৃহ ভাব দেখা দেয়। এই নাজুক লগ্নেও মানুষ দীর্ঘ দিন পর্যন্ত উপবাস করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে পারে। সুতরাং এই সহজাত প্রকৃতির বরখেলাপ কার্যপ্রবাহকে যদি স্বীকার করিয়া লইতে কষ্ট না হয়, তাহা হইলে অতি প্রকৃত আধ্যাত্মিক শক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ মু'জিযাসমূহকে অস্বীকার করার কোনই কারণ থাকিতে পারে না (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ৯৫০)।
বস্তুত কার্যকারণ সম্পর্কের উপর সর্বাঙ্গীন অভিজ্ঞতা মানুষের নাই। মানুষ যাহা কিছু জানিবার সুযোগ লাভ করিয়াছে, উহার তুলনা বিশাল সমুদ্রের একফোঁটা পানি অথবা উহা হইতও স্বল্প ও ক্ষীণ। উপরন্তু মানুষ যাহা কিছু জানিবার এবং অনুধাবন করিবার সুযোগ পাইয়াছে, তাহাও পৃথিবীর কতিপয় বস্তুর চলমান গতি-প্রকৃতির সামান্য নিরীক্ষা মাত্র। উহার হাকীকতও প্রকৃত জ্ঞান নহে। মানুষ জ্ঞানের এই সীমানায় পৌছিতে অক্ষম যে, বস্তুটি কেন চলিতেছে এবং যদি বস্তুটি বিপরীত দিকে চলিত তাহা হইলে কি কি অসামঞ্জস্য প্রকাশ পাইত? এই কারণেই পৃথিবীর স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিকগণ একবাক্যে এই কথা স্বীকার করিয়া লইয়াছেন যে, তাহারা কেমন প্রশ্নটির উত্তর দিতে সক্ষম, কিন্তু কেন প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর দেওয়া তাহাদের আলোচ্য বিষয়ের বাহিরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পানি কেমন? ইহার উত্তর বৈজ্ঞানিকগণ তাহাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু পানি কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর তাহারা দিতে পারেন নাই, এমনকি এই প্রশ্নের আলোচনাও তাহারা করেন নাই।
প্রকৃত সত্য এই যে, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকগণ কার্যকারণ সম্বন্ধে যেই মতাদর্শ দৃঢ়ভাবে আকড়াইয়া ধরিয়াছেন, বস্তুত ইহার পরিণতি অজ্ঞতা ও বুদ্ধিহীনতা বৈ কিছু নহে। কারণ তাহাদের বিশ্বাস যে, এই বস্তুটি এই কার্যকারণ ও উপাদানে সৃষ্টি হইয়াছে। ইহা ব্যতীত এই বস্তুটি অস্তিত্বে আসিতেই পারে না। যেমন বীর্য হইতে প্রাণের উৎপত্তি, ডিম হইতে পাখির উৎপত্তি, উদ্ভিদের উৎস বীজ, তাহাদের বিশ্বাসের এই সমস্ত উপাদান ছাড়া এইসব বস্তু অস্তিত্বে আসিবার কথা কল্পনাও করা যায় না। এখানে আমাদের প্রশ্ন যে, দুনিয়ার প্রথম প্রাণী, প্রথম পাখি এবং প্রথম উদ্ভিদ কি বীর্য, ডিম ও বীজ ছাড়াই সৃষ্টি হইয়াছে? এর উত্তরে যদি তাহারা হাঁ বলেন, তাহা হইলে তো তাহারা নিজেদের দাবি ও মতাদর্শের বিপরীত সাক্ষ্য প্রদান করিবেন। আর যদি ইহা অস্বীকার করেন তাহা হইলে এই কথাও তাহাদেরকে অবশ্যই স্বীকার করিয়া লইতে হইবে যে, প্রথম বীর্য, প্রথম ডিম এবং প্রথম বীজ, প্রাণী, পাখী ও উদ্ভিদ ছাড়াই সৃষ্টি হইয়াছে।
মোটকথা, এই লক্ষ্যমাত্রাকে কখনও বিজ্ঞান তাহার বুদ্ধির শাণিত অস্ত্র দ্বারা নির্মূল করিতে পারিবে না। এমতাবস্থায় কার্যকারণ সম্পর্কিত কতিপয় দর্শন এবং মতাদর্শ তাহাদেরকে অবশ্যই পরিহার করিতে হইবে। পাশাপাশি তাহাদেরকে এই কথারও স্বীকৃতি দিতে হইবে যে, এক মহা শক্তিমান ইচ্ছাশক্তির অস্তিত্ব অবশ্যই বর্তমান রহিয়াছে, যাঁহার ইচ্ছা ও নির্দেশে বিশ্বজগতের এই কারখানা পরিচালিত হইতেছে। উপরন্তু তাহাকে এই কথাও মানিয়া লইতে হইবে যে, কার্যকারণ সম্পর্কে সেই মহান শক্তিমান সত্তার ইচ্ছা এবং নির্দেশ বিকাশের বাহ্যিক দৃষ্টান্ত ছাড়া অতিরিক্ত আর কিছু নহে। বস্তুত কার্যকারণও তাহার সার্বভৌম ইচ্ছার অধীন। পবিত্র কুরআনে এই কথাই বিবৃত হইয়াছে :
‏اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبْرَكَ اللهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ.
"জানিয়া রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁহারই। মহিমাময় বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ” (৭:৫৪)।
সুতরাং বিশ্বজগতের সব কিছুর পশ্চাতে আল্লাহ্ কুদরত এবং তাঁহার ইচ্ছাই হইল মূল কারণ।
আল্লামা রূমী বলিয়াছেন, বাহ্যিক কারণসমূহের উপর হাকীকী ও মৌলিক কারণসমূহের নিয়ন্ত্রণাধিকার থাকে। সুতরাং হে দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ! তোমরা বাহ্যিক কারণসমূহ দেখিয়া অভিভূত হইও না, বরং হাকিকী ও মৌলিক কারণসমূহ সম্পর্কেও গভীর চিন্তা-গবেষণা কর। কেননা নবীগণ বাহ্যিক কারণ ও উপাদান সম্পর্ককে পরিহার করিয়া নিজেদের লক্ষ্যের দিকে আগাইয়া যান এবং আল্লাহ প্রদত্ত মু'জিযা ও অলৌকিক শক্তির ঝাণ্ডা সর্বত্র সমুন্নত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাই দেখা যায়, কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক ছাড়াই তাহারা গহীন সমুদ্রকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া নিজেদের চলার পথ রচনা করেন এবং কৃষিক্ষেত-খামার ছাড়াই গম ও যবের ফসল লাভ করেন। এমনকি পবিত্র কুরআনে যেই দিকনির্দেশনা মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে, তাহাও এই যে, কার্যকারণ সম্পর্ক শক্তিহীন ও নিষ্ক্রিয়। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (সা) সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে বিজয়ী হইয়াছেন এবং তাঁহারই পার্শ্বে আবু জাহল হইয়াছে ধ্বংস। এইভাবে ক্ষুদ্র আবাবিল
পাখির প্রস্তর খণ্ডে আবিসিনিয়ার হস্তিবাহিনী হইয়াছে পর্যুদস্ত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তর কণা আবাবীলের চঞ্চু হইতে নিক্ষিপ্ত হইত হস্তি বাহিনীর উপর, ফলে দীর্ণ-বিদীর্ণ এবং ঝাঁঝরা করিয়া দিত চর্বিত তৃণলতার মত।
মোটের উপর পবিত্র কুরআনে আগাগোড়া এই কথাই তুলিয়া ধরা হইয়াছে যে, কার্যকারণ সম্পর্কিত চলমান দুনিয়ার বাহ্যিক কারণের মধ্যে কোনই মৌলিক ক্ষমতা ও শক্তি নাই। মূল কার্যকারণের নিয়ন্ত্রণকারী মহান আল্লাহ স্বীয় ইচ্ছানুসারে বাহ্যিক কার্যকারণের মধ্যে কখনও কখনও কার্যকরী শক্তি ও ক্ষমতার বিকাশ ঘটাইয়া থাকেন। তথাপি এই বিকাশ কারণসম্ভূত নহে, বরং আল্লাহ প্রদত্ত গুণাবলীর বাহ্যিক প্রতিফলন মাত্র (মছনবী)।
এই পর্যন্ত আমরা যাহা কিছু আলোচনা করিয়াছি উহার সারমর্ম এই যে, সহজাত স্বভাবকে এবং কার্যকারণ সম্পর্কের নিয়মতান্ত্রিকতাকে সর্বতোভাবে পরাজিত করার নাম হইতেছে মু'জিযা, যাহা মহান আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মনোনীত পয়গাম্বরের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ মানুষের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া থাকেন। দ্বিতীয় কথা এই যে, সহজাত স্বভাবের বিপরীত কোন কিছু সংঘটিত হওয়া এবং কার্যকারণ সম্পর্কের বাঁধন ছিন্ন-বিছিন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু স্মরণ রাখিতে হইবে যে, কোন বিষয়ের জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাব্যতা উহার কার্যত সংঘটিত হওয়ার দলীল বহন করে না, বরং কোন বিষয়ের কার্যত সংঘটিত হওয়াকে কবূল করার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য।
(এক) বর্ণনাকারীর সন্দেহাতীত প্রত্যক্ষ করা এবং গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া।
(দুই) বর্ণনাকারীর সত্যবাদী হওয়া এবং তাহার স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ ও সুস্থ হওয়া, তাহার মধ্যে প্রতারণা ও প্রবঞ্চণার প্রবণতা না থাকা। (তিন) বর্ণনাটি শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সমগুণ সম্পন্ন বর্ণনাকারীদের দ্বারা বিবৃত হওয়া। চার. উপরন্তু এই প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ অবিচ্ছিন্ন ধারায় সকল যুগের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্র-পরম্পরায় সংরক্ষিত হইয়া আমাদের পর্যন্ত পৌছা।
এখন উল্লিখিত নীতি ও মানদণ্ডের আলোকে আমাদেরকে দেখিতে হইবে যে, হাদীছ, ইতিহাস ও ধর্মীয় কিতাবাদিতে মহানবী (স)-এর যেই সমস্ত মু'জিযার বর্ণনা লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তাহাতে উপরিউক্ত শর্তানুসারে দলীল-প্রমাণ ও সাক্ষ্য পাওয়া যায় কিনা?
আমাদের উসূলে হাদীছে প্রত্যেকটি রিওয়ায়াত গ্রহণ করার জন্য উপরে উল্লিখিত নীতিসমূহকে পূর্বশর্তরূপে নির্ধারণ করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযাত সম্পর্কে যেই সমস্ত সাহাবী প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছেন, তাহাদের সত্যবাদিতা জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা, স্মরণশক্তি এবং সুষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণনী প্রতিভার প্রমাণ সর্বজন স্বীকৃত। তাহাদের নিকট হইতে পরবর্তী সময়ে যেই সমস্ত মুহাদ্দিছীনে কেরাম উক্ত বর্ণনাসমূহ নকল করিয়াছেন তাঁহাদের সত্যবাদিতা, জ্ঞান-বুদ্ধি এবং তীক্ষ্ণ ধীশক্তির কথা আসমাউর রিজাল-এর কিতাবসমূহে বিস্তারিতভাবে সুসংরক্ষিত রহিয়াছে। উপরন্তু তাহাদের সামনে সর্বদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সতর্ক হুঁশিয়ারী বারংবার ঝংকৃত হইতঃ
১৫০ সীরাত বিশ্বকোষ
من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار "যেই ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, তাহার ঠিকানা হইবে জাহান্নাম" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৭)।
এই কারণে তাঁহারা যখনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সম্পর্কিত কোন বক্তব্য রিওয়ায়াত করিতেন, তখন পরিপূর্ণ মানবিক সচেতনতা এবং বিশেষ বিবেচনার সহিত তাহা বর্ণনা করিতেন। তবে যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে সকলের সচেতনতা ও স্মৃতিশক্তি সমান নহে, সেইহেতু সার্বিক সতর্কতা এবং মনোনিবেশের পরও সকলের বর্ণনা একই মূল্যমানের হওয়া সম্ভব ছিল না। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সম্পর্কিত মু'জিযার বর্ণনাসমূহ নির্ভরযোগ্যতার মাত্রা বা স্তর বিবেচনায় কম-বেশী হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু আমাদের সচেতন মুহাদ্দিছীনে কেরাম অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরিপূর্ণ আমানতদারির সহিত নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্বল বর্ণনাসমূহকে সহীহ বর্ণনাসমূহ হইতে পৃথক করিতে সক্ষম হইয়াছেন এবং এই মানদণ্ডের দ্বারা সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।
সারকথা এই যে, মু'জিযার সত্যতা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিদ্যমান থাকা একান্ত জরুরী। সহীহ মু'জিযাতই পরবর্তী সাক্ষ্য-প্রমাণ সম্বলিত রিওয়ায়াত-সমূহ এতই মজবুত ও সুদৃঢ় যে, দুনিয়ার কোন বর্ণনা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম নহে। ইহার ফলে মু'জিযার অকাট্যতা এবং সহজাত প্রকৃতির বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বাস্তবতাকে কেহই অস্বীকার করিতে পারে না।

মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ না নির্দশন?
"মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ না নির্দশন" বিষয়টি লইয়া সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে প্রাচীন মুসলিম মনীষীদের মধ্যে যেমন মতবিরোধ হইয়াছে, বর্তমান কালেও উহাতে প্রচণ্ড মতভেদ বহাল রহিয়াছে। অতীত ও প্রাচীন মুসলিম মনীষীদের মধ্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল-. জামা'আত-এর 'আশাইরা আকীদা বিশেষজ্ঞ আলিমদের অভিমত এই যে, মু'জিযা নবুওয়াত ও রিসালাতের হুজ্জত বা প্রমাণস্বরূপ। পক্ষান্তরে " আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা'আত বহির্ভূত মু'তাযিলা সম্প্রদায়ভুক্ত চিন্তাবিদগণের অভিমত এই যে, "মু'জিযা নবুওয়াতের হুজ্জত বা প্রমাণ নহে, তবে উহা নবুওয়াতের আলামত যে নিদর্শন মাত্র” (দ্র. সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ১০০৮)।
বর্তমান কালে মিসরীয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখগণও এই অভিমত পোষণ করিয়া থাকেন, ইহার বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ট আলিম, মুহাদ্দিস, মুফাস্সিসর ও ইসলামী বিশেষজ্ঞ মনীষীদের সর্বসম্মত অভিমত এই যে, মু'জিযা নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। উহা নিছক আলামত বা নিদর্শনের পর্যায়ের নহে (দ্র. মানহাজুল মাদরাসাতিল আকলিয়া আল-হাদীছাহ ফিত-তাফসীর, ড. ফাহদ বিন আবদুর রহমান, বৈরূত, মুআস্সাসতুর রিসালাহ, ১৪১৪ হি., ২খ., পৃ. ৫৪৫-৫৯৫)।
যুক্তি ভিত্তিক প্রমাণ
মু'তাযিলাদের দাবীর পক্ষে যুক্তি এই যে, তর্কশাস্ত্রের বিধানানুসারে দাবি ও দলীলের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র থাকা অপরিহার্য। কিন্তু মু'জিযা ও নবুওয়াতের মধ্যে কোন প্রকার যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায় না। যেমন, কোন ব্যক্তি যখন নবুওয়াতের দাবি করেন তখন তাঁহার উদ্দেশ্য হয়, তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে মানব জাতির আকীদা ও বিশ্বাস, আমল ও কার্যক্রম এবং আখলাক ও চরিত্র সংশোধনের জন্য প্রেরিত হইয়াছেন। কিন্তু যখন তাঁহার নিকট এই দাবির সত্যতা নিরূপণের জন্য দলীল প্রমাণ তলব করা হয়, তখন তিনি বিশুষ্ক কুয়াকে পানি দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন কিংবা চাঁদকে দুই টুকরা করিয়া দেখান অথবা তাহার যষ্টি সর্পে পরিণত হইয়া যায়। এই সমস্ত ঘটনা যদিও নেহায়েত আশ্চর্যজনক এবং অভাবিতপূর্ব, কিন্তু এই সমস্ত দলীল-প্রমাণের সহিত দাবির কোন যোগসূত্র আছে কি?
'আশাইরা মনীষিগণ মু'তাযিলাদের এই তর্ক-যুক্তির উত্তরে বলেন নবৃওয়াত হইতেছে 'ইলম ও 'আমল-এর সমন্বিত রূপ। যেই ব্যক্তি নবৃওয়াতের দাবি করেন ও তাহার সম্পর্কে এই কথা স্বীকার করিয়া লওয়া হয় যে, তিনি এই 'ইলম ও আমল সম্বন্ধে পরিপূর্ণ দক্ষতার অধিকারী এবং তাঁহার এই পরিপূর্ণতার বিকাশকল্পে তাহার নিকট মু'জিযা তলব করা হয়। নবীগণের মু'জিযা যদিও বিভিন্ন শ্রেণীর হইয়া থাকে, তবুও এইগুলিকে শুধু দুই শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা যায়। যেমন অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রদান করা এবং সৃষ্টি জগতের বস্তুনিচয়ের উপর স্বীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখা। এই দুই শ্রেণীর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন অংশের সহিত এবং নবুওয়াতের বিভিন্ন অংশের সহিত রহিয়াছে এক নিবিড় বন্ধন ও একাত্মতা। অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণের জ্ঞান ও মনীষার পরিপূর্ণতা বিকশিত হইয়া উঠে। অপরদিকে সৃষ্টি জগতের বস্তুনিচয়ের উপর কর্তৃত্ব নিষ্পন্ন করিবার দ্বারা তাহার ব্যবহারিক শক্তির বিকাশ সাধিত হয়।
অপর একটি যোগসূত্র হইতেছে, মু'জিযা হইল সহজাত স্বভাবের অভীত কোন স্বভাবের নাম। তবে এই ক্ষেত্রে ইহা লইয়া কোন মতবিরোধ নাই যে, বস্তুনিচয় উহার গুণাবলী এবং উহার কারণসমূহ কেবল আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ ও হুকুম দ্বারা আত্মপ্রকাশ করে। 'এখন যদি কোন শক্তি এইসব বৈশিষ্ট্য ও কারণসমূহকে স্বীয় মু'জিযার দ্বারা নিশ্চিহ্ন কিংবা ভাঙ্গিয়া-চুরিয়া একাকার করিয়া দিতে সক্ষম হন, তাহা হইলে তিনি বস্তুত এই কথার যথার্থতাই তুলিয়া ধরিলেন যে, যেই মহানুভব ও সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তির অধিকারী সত্তা এই সমস্ত কারণ ও উপাদান সৃষ্টি করিয়াছেন, কেবল তিনিই সেইগুলিকে ধ্বংস কিংবা অকেজো করিয়া দিতে পারেন। এই ভাঙ্গা-গড়ার অবিকল ধারা যেহেতু তাঁহার (নবীর) মাধ্যমে প্রকাশ পাইয়াছে, সেহেতু ইহা প্রমাণ করে যে, ইনিই সেই সত্তার প্রতিনিধি।
ইহার দৃষ্টান্ত এইরূপ যে, একজন বাদশাহ স্বীয় প্রজাদের নিকট প্রয়োজনের তাকিদে দূত প্রেরণ করেন। প্রজাগণ জিজ্ঞাসা করিল, এই কথার প্রমাণ কি যে, আপনি মহান বাদশাহর একজন বার্তাবাহক প্রতিনিধি? তখন সে উহার প্রতিউত্তরে বাদশাহর সীলমোহর এবং অঙ্গুরী পেশ করিতে বাধ্য হয়। যদিও প্রকাশ্যভাবে দূতের পয়গাম্বরীসুলভ দাবির সহিত সীলমোহর এবং অঙ্গুরীয়ের সরাসরি কোন যোগসূত্র নাই, কিন্তু তবুও ইহার মধ্যে সম্পর্ক এইভাবে প্রতিপন্ন হয় যে, সীলমোহর এবং অঙ্গুরীয় বাদশাহরই নিদর্শন বটে, যাহা একজন সাধারণ মানুষের হাতে কখনও আসিতে পারে না। সুতরাং ইহাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, এই দূতকে বাদশাহ সরাসরি তাহার একান্ত ব্যক্তিগত নিদর্শন প্রদান করিয়াই প্রেরণ করিয়াছেন।
মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ হওয়ার অনুকূলে কুরআন-হাদীছের দলীল
(এক) আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এব যুগের মুশরিক ও পৌত্তলিকদের নিন্দা, তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করিয়াছেন এবং এই মর্মে তাহাদের বর্ণনা দিয়াছেন যে, মুশরিকরা আল্লাহর আয়াত ও মু'জিযায় বিশ্বাসী নহে। যদি মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণই না হইত তাহা হইলে মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিবার পর উহাতে ঈমান আনয়ন না করিলে তাহারা ভর্ৎসনা ও নিন্দার যোগ্য হইবে কেন? অথচ দেখুন, নিজের আয়াতসমূহে মু'জিযা অস্বীকার করার কারণে মুশরিকদেরকে কিরূপ ভর্ৎসনা করা হইয়াছে।
وَمَا تَأْتِيهِمْ مِّنْ آيَةٍ مِّنْ أَيْتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوا عَنْهَا مُعْرِضِينَ ، فَقَدْ كَذَّبُوا بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَ هُمْ فَسَوْفَ يَأْتِيهِمْ أَنْبُوا مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
"তাহাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর এমন কোন নির্দশন তাহাদের নিকট উপস্থিত হয় না যাহা হইতে তাহারা মুখ না ফিরায়। সত্য যখন তাহাদের নিকট আসিয়াছে, তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। যাহা লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহার যথার্থ বিবরণ অচিরেই তাহাদের নিকট পৌঁছিবে” (৬:৪-৫)।
وَمِنْهُمْ مِّنْ يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ وَجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَنْ يُفْقَهُوهُ وَفِي أَذَانِهِمْ وَقْرًا وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا حَتَّى إِذَا جَاءُوكَ يُجَادِلُونَكَ يَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هُذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ ، وَهُمْ يَنْهَوْنَ عَنْهُ وَيَنْشُونَ عَنْهُ وَإِنْ يُهْلِكُونَ لِلا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ وَلَوْ تَرَى إِذْ وَقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يُلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا تُكَذِّبَ بِايَتِ رَبَّنَا وَنَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
"তাহাদের মধ্যে কতকলোক তোমার দিকে কান পাতিয়া রাখে, কিন্তু আমি তাহাদের অন্তরের উপর আবরণ দিয়াছি যেন তাহারা তাহা উপলব্ধি করিতে না পারে। আমি তাহাদেরকে বধির করিয়াছি এবং তাহারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিলেও উহাতে ঈমান আনিবে না, এমনকি তাহারা যখন তোমার নিকট উপস্থিত হইয়া বিতর্কে লিপ্ত হয় তখন কাফিররা বলে, ইহা তো সেকালের উপকথা ব্যতীত কিছুই নহে। তাহারা অন্যকেও উহা শ্রবণে বিরত রাখে এবং নিজেরাও উহা হইতে দূরে থাকে। আর তাহারা নিজেরাই শুধু নিজেদেরকে ধ্বংস করে, অথচ তাহারা উপলব্ধি করে না। তুমি যদি দেখিতে পাইতে যখন তাহাদেরকে অগ্নির পার্শ্বে দাঁড় করান হইবে এবং তাহারা বলিবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটিত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনসমূহে অস্বীকার করিতাম না এবং আমরা মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত হইতাম" (৬: ২৫-২৭)।
মু'জিযা যদি হুজ্জত বা প্রমাণই না হয় তাহা হইলে কিসের ভিত্তিতে উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে মু'জিযা অস্বীকারকারীদেরকে এইরূপ তিরস্কার করা হইল?
(দুই) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَمَا مَنَعَنَا إِنْ تُرْسِلَ بِالْآيَتِ إِلا أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُونَ وَأَتَيْنَا ثَمُودَ النَّاقَةَ مُبْصِرَةً فَظَلَمُوا بِهَا وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَتِ الأَ تَخْوِيفًا
" পূর্ববর্তীগণ কর্তৃক নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা হইতে বিরত রাখে। আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ ছামুদ জাতিকে উষ্ট্র দিয়াছিলাম, অতঃপর তাহারা উহার প্রতি জুলুম করিয়াছিল। আমি ভীতি প্রদর্শনের জন্যই নিদর্শন প্রেরণ করি” (১৭: ৫৯)।
এই আয়াতের সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তা'আলা দয়াপরবশ হইয়া মানুষের প্রতি মু'জিযা প্রেরণ করেন না। কেননা মু'জিযা প্রকাশের পর মানুষ যদি তাহা অস্বীকার করে তাহা হইলে তাহারা আযাবের যোগ্য হইয়া পড়িবে। যেমন অতীতের উম্মতসমূহের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটিয়াছে। সুতরাং ইহাই এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, মু'জিযা নবুওয়াতের হুজ্জত বা প্রমাণ, যাহার প্রকাশের পর আর কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই। ইহার পরও কেহ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করিলে সে শাস্তিযোগ্য হইয়া যাইবে। সুতরাং মু'জিযা হুজ্জত না হইলে উহা অস্বীকার করার প্রেক্ষিতে আযাব অবধারিত হয় কিরূপে?
(তিন) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . قَالُوا نُرِيدُ أَنْ نَّاكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّهِدِينَ . قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لأولنَا وأخرنَا وَآيَةً مِّنْكَ وَارْزُقْنَا وَ أَنْتَ خَيْرُ الرِّزْقِينَ . قَالَ اللهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أَعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أَعَذِّبُهُ أَحَدًا مِّنَ الْعُلَمِينَ .
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিতে সক্ষম? সে বলিয়াছিল, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হও। তাহারা বলিয়াছিল, আমি চাহি যে, উহা হইতে আমরা কিছু খাইব ও আমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করিবে। আর আমরা জানিতে চাহি যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলিয়াছ এবং আমরা উহার সাক্ষী থাকিতে চাহি। মরিয়ম-তনয় ঈসা বলিল, হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক। আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর। ইহা আমাদের এবং পরবর্তী সকলের জন্য হইবে আনন্দোৎসবস্বরূপ এবং তোমার নিকট হইতে নিদর্শন। আর আমাদেরকে জীবিকা দান কর আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বলিলেন, আমিই তোমাদের নিকট উহা প্রেরণ করিব, কিন্তু ইহার পর তোমাদের মধ্যে কেহ কুফরী করিলে তাহাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাহাকেও দিব না” (৫: ১১২-১১৫)।
কুরআনের উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে পরিষ্কার বলা হইয়াছে যে, হাঁ, আমি তোমাদের কাঙ্ক্ষিত মু'জিযা প্রদান করিব। কিন্তু উহা প্রদানের পর কেহ উহা অস্বীকার করিলে তাহাকে
নজীরবিহীন শাস্তির সম্মুখীন হইতে হইবে। 'মু'জিযা নবুওয়াতের প্রমাণ'-এই অভিমতের সমর্থনে কুরআনের এই আয়াতগুলি অকাট্য ও দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ। (চার) আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন: قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكَ بِشَيْءٍ مُبِينٍ . قَالَ فَأْتِ بِهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ . فَالْقَى عَصَاهُ فَإِذَا هِيَ تُعْبَانٌ مُّبِينٌ، وَنَزَعَ يَدَهُ فَإِذَا هِيَ بَيْضَاءُ لِلنَّظِرِينَ ، قَالَ لِلْمَلَا حَوْلَهُ إِنَّ هَذَا لسحر عَلِيمٌ .
"মূসা বলিল, আমি তোমার কাছে স্পষ্ট কোন প্রমাণ আনয়ন করিলেও? ফিরআওন বলিল, তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে উহা (প্রমাণ) পেশ কর। অতঃপর মূসা তাহার যষ্ঠি নিক্ষেপ করিলে তৎক্ষণাৎ উহা এক সাক্ষাৎ অজগর হইল। এবং মূসা হাত বাহির করিল আর তৎক্ষণাৎ উহা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হইল। ফিরআওন তাহার পরিষদবর্গকে বলিল, এ তো সুদক্ষ যাদুকর” (২৬ : ৩০-৩৪)।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মু'জিযাকে بشيء مبين স্পষ্ট ব্যাপার' তথা প্রমাণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন এবং ফিরআওনও উহাকে তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উপস্থিত করিবার জন্য আহবান করিয়াছে। অতঃপর মূসা (আ) তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসাবে তাঁহাকে প্রদত্ত মু'জিযা পেশ করিয়াছেন।
(পাঁচ) নবী ও রাসূলগণকে প্রদত্ত মু'জিযা তাহাদের নবৃওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ-একথা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত দুইটি মু'জিযা সম্বন্ধে স্পষ্টত বলিয়াছেন। যেমন: وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسَى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْأَمِنِيْنَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَسَقَيْنَ .
"আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। 'তাহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস! ভয় করিও না, তুমি তো নিরাপদ। তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পারিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৮ : ৩১-৩২)।
অতএব কুরআনের এ জাতীয় সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্তমান থাকিবার পর-মু'জিযা প্রমাণ না নিদর্শন-এই বিষয়ে কোনরূপ মতবিরোধ এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00