📄 মু'জিযার পারিভাষিক সংজ্ঞা
মু'জিয়ার পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনায় বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণের ভাষ্যসমূহে কিছু মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই মতপার্থক্য একান্তই শব্দগত, সবগুলির ভাবার্থ প্রায় এক ও অভিন্ন। নিম্নে মু'জিয়ার কয়েকটি পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করা হইল।
১. আল্লামা ইবন হাজার আস্কালানী লিখিয়াছেন : المعجزة أن يكون المتحدى به مما يعجز عنه البشر في العادة المستحرة .
"রাসূলগণ কর্তৃক সম্পাদিত সেই সকল অলৌকিক বা অসাধারণ কার্যাবলীই মু'জিযা, যাহার প্রতিযোগিতা করিতে সমসাময়িক যুগের মানুষ ব্যর্থ হইয়াছে” (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১)।
২. শায়খ আবু হাফ্স উমার আন্-নাসাফী লিখিয়াছেন : هو امر يظهر خلاف العادة على يد من يدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الايتان بمثله .
"মু'জিযা হইল প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমী কার্য যাহা একজন নবুওয়াতের দাবীদার কর্তৃক প্রকাশ পায়। নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং কার্যটির প্রকৃতি এমন যে, অস্বীকারকারীদের পক্ষে সেইরূপ কার্য সম্পাদন করা অসম্ভব” (শারহুল 'আকাইদিন-নাসাফিয়্যা, পৃ. ১২৪)।
৩. বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ "আল্-মু'জামুল-ওয়াসীত”-এ মু'জিয়ার সংজ্ঞা নিম্নরূপ বিবৃত হইয়াছে : المعجزة امر خارق للعادة يظهره الله على يد نبي تائيدا النبوت .
"মু'জিযা এমন অসাধারণ কার্য, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত করিয়া থাকেন। উদ্দেশ্য নবীর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করা" (আল-মু'জামুল-ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫, শিরো.)।
উপরে উল্লিখিত মু'জিয়ার সংজ্ঞা তিনটির মর্ম প্রায় একই। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, মু'জিযা বলা হয়— (১) যাহা অসাধারণ, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক; (২) যাহা নবী রাসূলগণের দ্বারা প্রকাশ পায়; (৩) তবে উহার সংঘটক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা; (৪) উহা নবী-রাসূলগণের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ; (৫) উহার মধ্যে নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুকাবিলার চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়া হয়। তবে তাহারা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম হয় না।
মু'জিযার উল্লিখিত সংজ্ঞার আলোকে আল-ঈযী আল-মাওয়াকি'ফ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যিনি আল্লাহর নবী তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণ করাই মু'জিয়ার উদ্দেশ্য। তবে যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই মু'জিযা নহে, বরং তাহা মু'জিয়ারূপে স্বীকৃত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য : ১. উহা আল্লাহ্র কার্য হইতে হইবে। ২. প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে হইবে। ৩. অনুরূপ কার্য সম্পাদন অন্যের পক্ষে অসম্ভব হইতে হইবে। ৪. মু'জিযা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হইবে, যিনি নিজেকে নবী বলিয়া দাবি করেন যাহা তাঁহার সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ পায়। ৫. তাঁহার মাধ্যমে প্রকাশিত মু'জিযাটি তাঁহার ঘোষণার সমর্থন জ্ঞাপক হইতে হইবে। ৬. মু'জিযা তাঁহার দাবির পরিপন্থী হইবে না। ৭. মু'জিযা দাবির পরে সংঘটিত হইতে হইবে, পূর্বে নহে।
আল-ঈযীর মতে, মু'জিযা এইভাবে সংঘটিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহার মাধ্যমে উহা ঘটাইয়া থাকেন। ফলে মু'জিযা দর্শকদের মধ্যে নবী-রাসূলের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে (আল-মাওয়াকি'ফ, মু'জিযা অধ্যায়, পৃ. ১৭৫)।
আল্লামা ইব্ন হাজার আস্কালানীর মতেও নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত যে কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ডই মু'জিযা নহে, বরং তিনি এই ক্ষেত্রে দুইটি পরিভাষা স্থির করিয়াছেন। যথা : (১) মু'জিযা এবং (২) 'আলামাতুন-নুবৃওয়াত বা নবুওয়াতের নিদর্শন বা চিহ্ন। যেই সকল অসাধারণ কার্যের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ বিরুদ্ধবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করিয়া থাকেন, কেবল তাহাই মু'জিযা। যেমন তিনি বলিলেন, "যদি আমি এই কার্য করিতে পারি, তবে আমি নবী, অন্যথা আমি মিথ্যাবাদী"। পক্ষান্তরে নবৃওয়াতের 'আলামত ও নিদর্শনের মধ্যে কোন চ্যালেঞ্জ থাকে না, মুকাবিলার আহ্বান থাকে না (ফাতহুল-বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১-৫৮)।
পবিত্র কুরআনে মু'জিযা (معجزة) শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, পারিভাষিক অর্থে নহে। মু'জিযা অর্থ প্রকাশের জন্য পবিত্র কুরআনে আয়াত (آية) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, বহুবচনে আয়াত (آيات) এবং (৫১) আই। ইহার অর্থ কোন বস্তু চিনিবার উপায় বা নিদর্শন। এই চিহ্ন বা নিদর্শন বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। যথা আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার একত্ব প্রমাণের জন্য সমগ্র সৃষ্টি একটি প্রমাণ বা নিদর্শন। এই অর্থে আয়াত-এর ব্যবহার এইরূপ : وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ أَيَتَيْنِ الآية “আর আমি রাত্রি ও দিবসকে করিয়াছি দুইটি নিদর্শন" (১৭-১২; আরও দ্র. ৩০ : ২২-২৫, ৪৬; ১০: ৬; ২ঃ ৭৩; ১৮৭; ৩৪ : ১৯০)।
অনুরূপ নবীগণের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে শব্দটি অসাধারণ কার্য ও অলৌকিক বিষয় বুঝাইবার অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে।
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتب لكل أية . ১২১
"যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে তুমি যদি তাহাদের নিকট সমস্ত দলীলও পেশ কর" (২: ১৪৫ আরও দ্র. ২১১, ২৪৮, ২৫৯; ৩: ৪৯, ৫০; ৫: ১১৪; ৬: ২৫; ১২৪, ৭৪ ৭৩; ১০৬, ১৩২, ১৪৬)।
অবশ্য আয়াত শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে উক্ত দুইটি অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং শব্দটি ইহা ছাড়া অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন উপদেশ ও শিক্ষণীয় অর্থে, যথা আল-কুরআনে আছে : أَن أَيَّةَ مُلک “তাঁহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে,” (২: ২৪৮; ৩ঃ ১৩; ১০: ৯২; ১১ : ১০৩) এবং কুরআনের আয়াত অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যথা আল-কুরআনে আছে : وَلَا تَشْتَرُوا بايتي ثَمَنًا قَلِيلاً "তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না” (২:৪১ অরিও দ্র. ৯৯, ১০৬, ২২১, ২৫২; ৬৪৪, ১২৪; ১৬৪ ১০১; ৩৬৪ ৪৬; ৪৫: ৩১; ৬২: ২; ৮৩:১৩)।
"আয়াতুন" (آية) শব্দটি মু'জিযা (معجزة) শব্দ অপেক্ষা অধিক ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং বলা যায়, পবিত্র কুরআনে 'মু'জিযা' শব্দ ব্যবহৃত না হইয়া বরং "আয়াতুন" শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় নবী-রাসূলগণের মু'জিযা ও তাঁহাদের আলামতে নবুওয়াত উভয়বিধ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। মু'জিযা-এর অর্থ বুঝাইতে পবিত্র কুরআনে আরও একটি শব্দের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। তাহা হইল বুরহান (برهان) শব্দ। ইহার অর্থ অকাট্য এবং সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ। আল- মু'জামুল ওয়াসীতে আছে : البرهان : البينة النبية الفاصلة অর্থাৎ 'সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী প্রমাণ'। যথা পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا أَتْهَا نُودِى مِنْ شَاطئ الوَادَ الْأَيْمَن في البُقْعَة المُبْرَكَة مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يمُوسَى إِنِّي أَنَا اللهُ رَبُّ العَلَمِينَ ، وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه أَنَّهُم كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ
"যখন মুসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্বান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক। আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। তাঁহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস, ভয় করিও না; তুমি-তো নিরাপদ। আর তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পরিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৬: ৩০-৩২)।
সারকথা এই যে, নবৃওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারিগণের হাতে কখনো কখনো মানবিক শক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সাধিত হয়, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনে মানবিক প্রজ্ঞা ও মনীষা অপারগ হইয়া যায়। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর আগুন শীতল হইয়া যাওয়া, হযরত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত জীবিত হওয়া, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর এক রজনীতে পবিত্র কা'বা গৃহ হইতে আল- বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর তথা হইতে সিদরাতুল মুনতাহা, অতঃপর আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য জগত পরিদর্শন করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘটনার মর্মোদঘাটন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি একান্তই অপারগ। আল-কুরআনের ভাষায় এই সমস্ত ঘটনার নাম বুরহান (برهان), বায়ি্যনাত (بینات)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা আয়াত (آیات) অথবা আয়াতুম বায়্যিনাত (آیات بینات)-রূপেও ব্যবহৃত হইয়াছে। মুহাদ্দিছগণ এই সমস্ত ঘটনাকে দালাইলুন নূবৃওয়াত (دلائل النبوة) বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। আর 'আকাইদ বিশেষজ্ঞ (মুতাকাল্লিমূন) এবং দার্শনিকদের পরিভাষায় উহাকে মু'জিযাত (معجزات) বলা হয়।
মু'জিয়ার পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনায় বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণের ভাষ্যসমূহে কিছু মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই মতপার্থক্য একান্তই শব্দগত, সবগুলির ভাবার্থ প্রায় এক ও অভিন্ন। নিম্নে মু'জিয়ার কয়েকটি পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করা হইল।
১. আল্লামা ইবন হাজার আস্কালানী লিখিয়াছেন : المعجزة أن يكون المتحدى به مما يعجز عنه البشر في العادة المستحرة .
"রাসূলগণ কর্তৃক সম্পাদিত সেই সকল অলৌকিক বা অসাধারণ কার্যাবলীই মু'জিযা, যাহার প্রতিযোগিতা করিতে সমসাময়িক যুগের মানুষ ব্যর্থ হইয়াছে” (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১)।
২. শায়খ আবু হাফ্স উমার আন্-নাসাফী লিখিয়াছেন : هو امر يظهر خلاف العادة على يد من يدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الايتان بمثله .
"মু'জিযা হইল প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমী কার্য যাহা একজন নবুওয়াতের দাবীদার কর্তৃক প্রকাশ পায়। নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং কার্যটির প্রকৃতি এমন যে, অস্বীকারকারীদের পক্ষে সেইরূপ কার্য সম্পাদন করা অসম্ভব” (শারহুল 'আকাইদিন-নাসাফিয়্যা, পৃ. ১২৪)।
৩. বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ "আল্-মু'জামুল-ওয়াসীত”-এ মু'জিয়ার সংজ্ঞা নিম্নরূপ বিবৃত হইয়াছে : المعجزة امر خارق للعادة يظهره الله على يد نبي تائيدا النبوت .
"মু'জিযা এমন অসাধারণ কার্য, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত করিয়া থাকেন। উদ্দেশ্য নবীর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করা" (আল-মু'জামুল-ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫, শিরো.)।
উপরে উল্লিখিত মু'জিয়ার সংজ্ঞা তিনটির মর্ম প্রায় একই। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, মু'জিযা বলা হয়— (১) যাহা অসাধারণ, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক; (২) যাহা নবী রাসূলগণের দ্বারা প্রকাশ পায়; (৩) তবে উহার সংঘটক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা; (৪) উহা নবী-রাসূলগণের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ; (৫) উহার মধ্যে নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুকাবিলার চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়া হয়। তবে তাহারা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম হয় না।
মু'জিযার উল্লিখিত সংজ্ঞার আলোকে আল-ঈযী আল-মাওয়াকি'ফ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যিনি আল্লাহর নবী তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণ করাই মু'জিয়ার উদ্দেশ্য। তবে যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই মু'জিযা নহে, বরং তাহা মু'জিয়ারূপে স্বীকৃত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য : ১. উহা আল্লাহ্র কার্য হইতে হইবে। ২. প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে হইবে। ৩. অনুরূপ কার্য সম্পাদন অন্যের পক্ষে অসম্ভব হইতে হইবে। ৪. মু'জিযা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হইবে, যিনি নিজেকে নবী বলিয়া দাবি করেন যাহা তাঁহার সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ পায়। ৫. তাঁহার মাধ্যমে প্রকাশিত মু'জিযাটি তাঁহার ঘোষণার সমর্থন জ্ঞাপক হইতে হইবে। ৬. মু'জিযা তাঁহার দাবির পরিপন্থী হইবে না। ৭. মু'জিযা দাবির পরে সংঘটিত হইতে হইবে, পূর্বে নহে।
আল-ঈযীর মতে, মু'জিযা এইভাবে সংঘটিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহার মাধ্যমে উহা ঘটাইয়া থাকেন। ফলে মু'জিযা দর্শকদের মধ্যে নবী-রাসূলের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে (আল-মাওয়াকি'ফ, মু'জিযা অধ্যায়, পৃ. ১৭৫)।
আল্লামা ইব্ন হাজার আস্কালানীর মতেও নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত যে কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ডই মু'জিযা নহে, বরং তিনি এই ক্ষেত্রে দুইটি পরিভাষা স্থির করিয়াছেন। যথা : (১) মু'জিযা এবং (২) 'আলামাতুন-নুবৃওয়াত বা নবুওয়াতের নিদর্শন বা চিহ্ন। যেই সকল অসাধারণ কার্যের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ বিরুদ্ধবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করিয়া থাকেন, কেবল তাহাই মু'জিযা। যেমন তিনি বলিলেন, "যদি আমি এই কার্য করিতে পারি, তবে আমি নবী, অন্যথা আমি মিথ্যাবাদী"। পক্ষান্তরে নবৃওয়াতের 'আলামত ও নিদর্শনের মধ্যে কোন চ্যালেঞ্জ থাকে না, মুকাবিলার আহ্বান থাকে না (ফাতহুল-বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১-৫৮)।
পবিত্র কুরআনে মু'জিযা (معجزة) শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, পারিভাষিক অর্থে নহে। মু'জিযা অর্থ প্রকাশের জন্য পবিত্র কুরআনে আয়াত (آية) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, বহুবচনে আয়াত (آيات) এবং (৫১) আই। ইহার অর্থ কোন বস্তু চিনিবার উপায় বা নিদর্শন। এই চিহ্ন বা নিদর্শন বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। যথা আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার একত্ব প্রমাণের জন্য সমগ্র সৃষ্টি একটি প্রমাণ বা নিদর্শন। এই অর্থে আয়াত-এর ব্যবহার এইরূপ : وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ أَيَتَيْنِ الآية “আর আমি রাত্রি ও দিবসকে করিয়াছি দুইটি নিদর্শন" (১৭-১২; আরও দ্র. ৩০ : ২২-২৫, ৪৬; ১০: ৬; ২ঃ ৭৩; ১৮৭; ৩৪ : ১৯০)।
অনুরূপ নবীগণের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে শব্দটি অসাধারণ কার্য ও অলৌকিক বিষয় বুঝাইবার অর্থেও ব্যবহৃত হইছে।
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتب لكل أية .
"যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে তুমি যদি তাহাদের নিকট সমস্ত দলীলও পেশ কর" (২: ১৪৫ আরও দ্র. ২১১, ২৪৮, ২৫৯; ৩: ৪৯, ৫০; ৫: ১১৪; ৬: ২৫; ১২৪, ৭৪ ৭৩; ১০৬, ১৩২, ১৪৬)।
অবশ্য আয়াত শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে উক্ত দুইটি অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং শব্দটি ইহা ছাড়া অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন উপদেশ ও শিক্ষণীয় অর্থে, যথা আল-কুরআনে আছে : أَن أَيَّةَ مُلک “তাঁহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে,” (২: ২৪৮; ৩ঃ ১৩; ১০: ৯২; ১১ : ১০৩) এবং কুরআনের আয়াত অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যথা আল-কুরআনে আছে : وَلَا تَشْتَرُوا بايتي ثَمَنًا قَليلاً "তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না” (২:৪১ অরিও দ্র. ৯৯, ১০৬, ২২১, ২৫২; ৬৪৪, ১২৪; ১৬৪ ১০১; ৩৬৪ ৪৬; ৪৫: ৩১; ৬২: ২; ৮৩:১৩)।
"আয়াতুন" (آية) শব্দটি মু'জিযা (معجزة) শব্দ অপেক্ষা অধিক ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং বলা যায়, পবিত্র কুরআনে 'মু'জিযা' শব্দ ব্যবহৃত না হইয়া বরং "আয়াতুন" শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় নবী-রাসূলগণের মু'জিযা ও তাঁহাদের আলামতে নবুওয়াত উভয়বিধ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। মু'জিযা-এর অর্থ বুঝাইতে পবিত্র কুরআনে আরও একটি শব্দের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। তাহা হইল বুরহান (برهان) শব্দ। ইহার অর্থ অকাট্য এবং সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ। আল- মু'জামুল ওয়াসীতে আছে : البرهان : البينة النبية الفاصلة অর্থাৎ 'সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী প্রমাণ'। যথা পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا أَتْهَا نُودِى مِنْ شَاطئ الوَادَ الْأَيْمَن في البُقْعَة المُبْرَكَة مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يمُوسَى إِنِّي أَنَا اللهُ رَبُّ العَلَمِينَ ، وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه أَنَّهُم كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ
"যখন মুসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্বান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক। আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। তাঁহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস, ভয় করিও না; তুমি-তো নিরাপদ। আর তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার
প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পরিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৬: ৩০-৩২)।
সারকথা এই যে, নবৃওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারিগণের হাতে কখনো কখনো মানবিক শক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সাধিত হয়, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনে মানবিক প্রজ্ঞা ও মনীষা অপারগ হইয়া যায়। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর আগুন শীতল হইয়া যাওয়া, হযরত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত জীবিত হওয়া, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর এক রজনীতে পবিত্র কা'বা গৃহ হইতে আল- বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর তথা হইতে সিদরাতুল মুনতাহা, অতঃপর আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য জগত পরিদর্শন করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘটনার মর্মোদঘাটন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি একান্তই অপারগ। আল-কুরআনের ভাষায় এই সমস্ত ঘটনার নাম বুরহান (برهان), বায়ি্যনাত (بینات)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা আয়াত (آیات) অথবা আয়াতুম বায়্যিনাত (آیات بینات)-রূপেও ব্যবহৃত হইয়াছে। মুহাদ্দিছগণ এই সমস্ত ঘটনাকে দালাইলুন নূবৃওয়াত (دلائل النبوة) বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। আর 'আকাইদ বিশেষজ্ঞ (মুতাকাল্লিমূন) এবং দার্শনিকদের পরিভাষায় উহাকে মু'জিযাত (معجزات) বলা হয়।
মু'জিয়ার পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনায় বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণের ভাষ্যসমূহে কিছু মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই মতপার্থক্য একান্তই শব্দগত, সবগুলির ভাবার্থ প্রায় এক ও অভিন্ন। নিম্নে মু'জিয়ার কয়েকটি পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করা হইল।
১. আল্লামা ইবন হাজার আস্কালানী লিখিয়াছেন : المعجزة أن يكون المتحدى به مما يعجز عنه البشر في العادة المستحرة .
"রাসূলগণ কর্তৃক সম্পাদিত সেই সকল অলৌকিক বা অসাধারণ কার্যাবলীই মু'জিযা, যাহার প্রতিযোগিতা করিতে সমসাময়িক যুগের মানুষ ব্যর্থ হইয়াছে” (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১)।
২. শায়খ আবু হাফ্স উমার আন্-নাসাফী লিখিয়াছেন : هو امر يظهر خلاف العادة على يد من يدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الايتان بمثله .
"মু'জিযা হইল প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমী কার্য যাহা একজন নবুওয়াতের দাবীদার কর্তৃক প্রকাশ পায়। নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং কার্যটির প্রকৃতি এমন যে, অস্বীকারকারীদের পক্ষে সেইরূপ কার্য সম্পাদন করা অসম্ভব” (শারহুল 'আকাইদিন-নাসাফিয়্যা, পৃ. ১২৪)।
৩. বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ "আল্-মু'জামুল-ওয়াসীত”-এ মু'জিয়ার সংজ্ঞা নিম্নরূপ বিবৃত হইয়াছে : المعجزة امر خارق للعادة يظهره الله على يد نبي تائيدا النبوت .
"মু'জিযা এমন অসাধারণ কার্য, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত করিয়া থাকেন। উদ্দেশ্য নবীর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করা" (আল-মু'জামুল-ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫, শিরো.)।
উপরে উল্লিখিত মু'জিয়ার সংজ্ঞা তিনটির মর্ম প্রায় একই। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, মু'জিযা বলা হয়— (১) যাহা অসাধারণ, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক; (২) যাহা নবী রাসূলগণের দ্বারা প্রকাশ পায়; (৩) তবে উহার সংঘটক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা; (৪) উহা নবী-রাসূলগণের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ; (৫) উহার মধ্যে নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুকাবিলার চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়া হয়। তবে তাহারা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম হয় না।
আল-ঈযী আল-মাওয়াকি'ফ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যিনি আল্লাহর নবী তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণ করাই মু'জিয়ার উদ্দেশ্য। তবে যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই মু'জিযা নহে, বরং তাহা মু'জিয়ারূপে স্বীকৃত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য : ১. উহা আল্লাহ্র কার্য হইতে হইবে। ২. প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে হইবে। ৩. অনুরূপ কার্য সম্পাদন অন্যের পক্ষে অসম্ভব হইতে হইবে। ৪. মু'জিযা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হইবে, যিনি নিজেকে নবী বলিয়া দাবি করেন যাহা তাঁহার সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ পায়। ৫. তাঁহার মাধ্যমে প্রকাশিত মু'জিযাটি তাঁহার ঘোষণার সমর্থন জ্ঞাপক হইতে হইবে। ৬. মু'জিযা তাঁহার দাবির পরিপন্থী হইবে না। ৭. মু'জিযা দাবির পরে সংঘটিত হইতে হইবে, পূর্বে নহে।
আল-ঈযীর মতে, মু'জিযা এইভাবে সংঘটিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহার মাধ্যমে উহা ঘটাইয়া থাকেন। ফলে মু'জিযা দর্শকদের মধ্যে নবী-রাসূলের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে (আল-মাওয়াকি'ফ, মু'জিযা অধ্যায়, পৃ. ১৭৫)।
আল্লামা ইব্ন হাজার আস্কালানীর মতেও নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত যে কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ডই মু'জিযা নহে, বরং তিনি এই ক্ষেত্রে দুইটি পরিভাষা স্থির করিয়াছেন। যথা : (১) মু'জিযা এবং (২) 'আলামাতুন-নুবৃওয়াত বা নবুওয়াতের নিদর্শন বা চিহ্ন। যেই সকল অসাধারণ কার্যের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ বিরুদ্ধবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করিয়া থাকেন, কেবল তাহাই মু'জিযা। যেমন তিনি বলিলেন, "যদি আমি এই কার্য করিতে পারি, তবে আমি নবী, অন্যথা আমি মিথ্যাবাদী"। পক্ষান্তরে নবৃওয়াতের 'আলামত ও নিদর্শনের মধ্যে কোন চ্যালেঞ্জ থাকে না, মুকাবিলার আহ্বান থাকে না (ফাতহুল-বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১-৫৮)।
পবিত্র কুরআনে মু'জিযা (معجزة) শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, পারিভাষিক অর্থে নহে। মু'জিযা অর্থ প্রকাশের জন্য পবিত্র কুরআনে আয়াত (آية) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, বহুবচনে আয়াত (آيات) এবং (৫১) আই। ইহার অর্থ কোন বস্তু চিনিবার উপায় বা নিদর্শন। এই চিহ্ন বা নিদর্শন বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। যথা আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার একত্ব প্রমাণের জন্য সমগ্র সৃষ্টি একটি প্রমাণ বা নিদর্শন। এই অর্থে আয়াত-এর ব্যবহার এইরূপ : وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ أَيَتَيْنِ الآية “আর আমি রাত্রি ও দিবসকে করিয়াছি দুইটি নিদর্শন" (১৭-১২; আরও দ্র. ৩০ : ২২-২৫, ৪৬; ১০: ৬; ২ঃ ৭৩; ১৮৭; ৩৪ : ১৯০)।
অনুরূপ নবীগণের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে শব্দটি অসাধারণ কার্য ও অলৌকিক বিষয় বুঝাইবার অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে।
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتب لكل أية .
"যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে তুমি যদি তাহাদের নিকট সমস্ত দলীলও পেশ কর" (২: ১৪৫ আরও দ্র. ২১১, ২৪৮, ২৫৯; ৩: ৪৯, ৫০; ৫: ১১৪; ৬: ২৫; ১২৪, ৭৪ ৭৩; ১০৬, ১৩২, ১৪৬)।
অবশ্য আয়াত শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে উক্ত দুইটি অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং শব্দটি ইহা ছাড়া অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন উপদেশ ও শিক্ষণীয় অর্থে, যথা আল-কুরআনে আছে : أَن أَيَّةَ مُلک “তাঁহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে,” (২: ২৪৮; ৩ঃ ১৩; ১০: ৯২; ১১ : ১০৩) এবং কুরআনের আয়াত অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যথা আল-কুরআনে আছে : وَلَا تَشْتَرُوا بايتي ثَمَنًا قَليلاً "তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না” (২:৪১ অরিও দ্র. ৯৯, ১০৬, ২২১, ২৫২; ৬৪৪, ১২৪; ১৬৪ ১০১; ৩৬৪ ৪৬; ৪৫: ৩১; ৬২: ২; ৮৩:১৩)।
"আয়াতুন" (آية) শব্দটি মু'জিযা (معجزة) শব্দ অপেক্ষা অধিক ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং বলা যায়, পবিত্র কুরআনে 'মু'জিযা' শব্দ ব্যবহৃত না হইয়া বরং "আয়াতুন" শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় নবী-রাসূলগণের মু'জিযা ও তাঁহাদের আলামতে নবুওয়াত উভয়বিধ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। মু'জিযা-এর অর্থ বুঝাইতে পবিত্র কুরআনে আরও একটি শব্দের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। তাহা হইল বুরহান (برهان) শব্দ। ইহার অর্থ অকাট্য এবং সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ। আল- মু'জামুল ওয়াসীতে আছে : البرهان : البينة النبية الفاصلة অর্থাৎ 'সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী প্রমাণ'। যথা পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا أَتْهَا نُودِى مِنْ شَاطئ الوَادَ الْأَيْمَن في البُقْعَة المُبْرَكَة مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يمُوسَى إِنِّي أَنَا اللهُ رَبُّ العَلَمِينَ ، وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه أَنَّهُم كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ
"যখন মুসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্বান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক। আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। তাঁহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস, ভয় করিও না; তুমি-তো নিরাপদ। আর তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার
প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পরিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৬: ৩০-৩২)।
সারকথা এই যে, নবৃওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারিগণের হাতে কখনো কখনো মানবিক শক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সাধিত হয়, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনে মানবিক প্রজ্ঞা ও মনীষা অপারগ হইয়া যায়। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর আগুন শীতল হইয়া যাওয়া, হযরত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত জীবিত হওয়া, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর এক রজনীতে পবিত্র কা'বা গৃহ হইতে আল- বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর তথা হইতে সিদরাতুল মুনতাহা, অতঃপর আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য জগত পরিদর্শন করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘটনার মর্মোদঘাটন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি একান্তই অপারগ। আল-কুরআনের ভাষায় এই সমস্ত ঘটনার নাম বুরহান (برهان), বায়্যিনাত (بینات)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা আয়াত (آیات) অথবা আয়াতুম বায়্যিনাত (آیات بینات)-রূপেও ব্যবহৃত হইয়াছে। মুহাদ্দিছগণ এই সমস্ত ঘটনাকে দালাইলুন নুবৃওয়াত (دلائل النبوة) বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। আর 'আকাইদ বিশেষজ্ঞ (মুতাকাল্লিমূন) এবং দার্শনিকদের পরিভাষায় উহাকে মু'জিযাত (معجزات) বলা হয়।
📄 মু'জিযা কখন ও কিভাবে সংঘটিত হয়?
মু'জিযা দুইভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে। (১) তলবী (طلبی): মানুষের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির প্রেক্ষিতে। ইহার প্রকাশ এইভাবে হয় যে, বিরুদ্ধবাদীরা নবী-রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তাই তাঁহার নিকট অতি প্রাকৃত কিছু ঘটাইবার দাবি জানায়। তাহারা মনে করে যে, পয়গাম্বর তাহা কখনও প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবেন না। ফলে তাঁহাকে মানুষের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হইতে হইবে। তৃখন আল্লাহ তা'আলা উহা উপযোগী মনে করিলে তাঁহার পয়গাম্বরের হাতে অতি প্রাকৃত ঘটনার প্রকাশ ঘটান। আর তখন উহার ফল দাঁড়ায় বিপরীতমুখী। পয়গাম্বরের লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁহার সত্যতা ও যথার্থতা। যেমন ফেরআওন যাদুকরদেরকে সমবেত করিয়া হযরত মূসা (আ)-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করিতে এবং তাঁহাকে জনসম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করিতে চেষ্টা চালাইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়ার মু'জিযা সংঘটিত হইল। ফলে ঘটনাটি পরিণামে মূসা (আ)-এর লজ্জা ও অপমানের পরিবর্তে তাঁহার সফলতা ও তাঁহার মিশন বিজয়ের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা জনসম্মুখে সূর্যের মত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। পরিণামে উপস্থিত যাদুকরগণ তাঁহার নবৃওয়াতে বিশ্বাসী হইয়া ঈমানদার হইয়া গেল (দ্র. ৭: ১০৩-১২৬)।
আরিফ রূমী তাঁহার মছনবীতে চমৎকার বলিয়াছেন: منکران را قصد ازلال نقات + ذل شده عز وظهور معجزات قصد شان زان کارذل این بده + عین ذل عز رسوال الله
"অবিশ্বাসীরা মু'জিযা তলবের মাধ্যমে সত্যকে নিষ্প্রভ করিয়া দিতে চাহে। অথচ তাহাদের এই অপচেষ্টার ভিতর দিয়াই সত্যের বিজয় ও যথার্থতা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে। তাহাদের ইচ্ছা ছিল মু'জিযা তলব করিয়া পয়গাম্বরকে লজ্জিত ও অপমানিত করা। কিন্তু তাহাদের এই পায়তারাই পয়গাম্বরের মর্যাদাকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে" (মছনবীর বরাতে সীরাতুন্নবী, ৪ খ., পৃ. ১০৮-১০৯)।
(২) গায়রে তলবী (غیر طلبی) : অর্থাৎ মানুষের পক্ষ হইতে মু'জিযার দাবি করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহারই দ্বারা কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া থাকেন, যাহাতে উহা তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ হিসাবে দর্শকদের মধ্যে প্রভাব ও প্রত্যয় সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। যেমন খাবারের মধ্যে বরকতের মু'জিযা। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত ঐতিহাসিক মু'জিযা। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানগণ চরম আর্থিক সংকট এবং অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষুধায় কাতর হইয়া কটিদেশ সোজা করিতে পারিতেছিলেন না, তাই তিনি পেটে পাথর বাঁধিয়া খন্দক খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। অন্যান্য সাহাবীদের অবস্থাও ছিল অনুরূপ। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে যাইয়া তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী বলিলেন, এক সা' অর্থাৎ প্রায় সোয়া তিন কিলো গম আছে। তৎপর হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে পালিত একটি ছাগল যবেহ করিয়া দিয়া স্ত্রীকে রুটি ও গোস্ত পাকাইবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া অতি সন্তর্পণে তাঁহাকে আরও দুই/তিনজন সাহাবীসহ তাহার গৃহে রুটি ও গোশতের দাওয়াত গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাওয়াত কবুল করিলেন এবং উচ্চৈস্বরে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হে পরিখা খননকারী! জাবির তোমাদেরকে দাওয়াত করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার গৃহে চলিয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আহ্বান শুনিয়া হযরত জাবির (রা) প্রমাদ গুনিতে লাগিলেন। মাত্র এক সা' গমের রুটি আর একটি ছাগলের গোস্ত দ্বারা সহস্রাধিক মেহমানকে কিভাবে পরিতুষ্ট করিবেন, তাহাই তিনি ভাবিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাবির (রা)-এর রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া উনুনের উপর চড়ানো গোশতের হাঁড়িতে এবং খামীর করা আটায় পবিত্র মুখের লালা মিশ্রণ করিয়া বলিলেন, সমস্ত মেহমানের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুলার উপর হইতে হাঁড়ি নামাইও না। আর এই খামীর হইতে অল্প অল্প করিয়া আটা লইয়া রুটি তৈয়ার করিতে থাক। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হইল। ফলে সহস্রাধিক মেহমানকে আহার করানো পরও দেখা গেল, যেই পরিমাণ আটা খামীর করা হইয়াছিল এখনও সেই পরিমাণই অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং হাঁড়ি পূর্ববৎ গোস্তে পরিপূর্ণই আছে (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
মু'জিযা দুইভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে। (১) তলবী (طلبی): মানুষের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির প্রেক্ষিতে। ইহার প্রকাশ এইভাবে হয় যে, বিরুদ্ধবাদীরা নবী-রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তাই তাঁহার নিকট অতি প্রাকৃত কিছু ঘটাইবার দাবি জানায়। তাহারা মনে করে যে, পয়গাম্বর তাহা কখনও প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবেন না। ফলে তাঁহাকে মানুষের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হইতে হইবে। তৃখন আল্লাহ তা'আলা উহা উপযোগী মনে করিলে তাঁহার পয়গাম্বরের হাতে অতি প্রাকৃত ঘটনার প্রকাশ ঘটান। আর তখন উহার ফল দাঁড়ায় বিপরীতমুখী। পয়গাম্বরের লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁহার সত্যতা ও যথার্থতা। যেমন ফেরআওন যাদুকরদেরকে সমবেত করিয়া হযরত মূসা (আ)-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করিতে এবং তাঁহাকে জনসম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করিতে চেষ্টা চালাইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়ার মু'জিযা সংঘটিত হইল। ফলে ঘটনাটি পরিণামে মূসা (আ)-এর লজ্জা ও অপমানের পরিবর্তে তাঁহার সফলতা ও তাঁহার মিশন বিজয়ের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা জনসম্মুখে সূর্যের মত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। পরিণামে উপস্থিত যাদুকরগণ তাঁহার নবৃওয়াতে বিশ্বাসী হইয়া ঈমানদার হইয়া গেল (দ্র. ৭: ১০৩-১২৬)।
আরিফ রূমী তাঁহার মছনবীতে চমৎকার বলিয়াছেন: منکران را قصد ازلال نقات + ذل شده عز وظهور معجزات قصد شان زان کارذل این بده + عین ذل عز رسوال الله
"অবিশ্বাসীরা মু'জিযা তলবের মাধ্যমে সত্যকে নিষ্প্রভ করিয়া দিতে চাহে। অথচ তাহাদের এই অপচেষ্টার ভিতর দিয়াই সত্যের বিজয় ও যথার্থতা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে। তাহাদের ইচ্ছা ছিল মু'জিযা তলব করিয়া পয়গাম্বরকে লজ্জিত ও অপমানিত করা। কিন্তু তাহাদের এই পায়তারাই পয়গাম্বরের মর্যাদাকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে" (মছনবীর বরাতে সীরাতুন্নবী, ৪ খ., পৃ. ১০৮-১০৯)।
(২) গায়রে তলবী (غیر طلبی) : অর্থাৎ মানুষের পক্ষ হইতে মু'জিযার দাবি করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহারই দ্বারা কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া থাকেন, যাহাতে উহা তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ হিসাবে দর্শকদের মধ্যে প্রভাব ও প্রত্যয় সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। যেমন খাবারের মধ্যে বরকতের মু'জিযা। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত ঐতিহাসিক মু'জিযা। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানগণ চরম আর্থিক সংকট এবং অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষুধায় কাতর হইয়া কটিদেশ সোজা করিতে পারিতেছিলেন না, তাই তিনি পেটে পাথর বাঁধিয়া খন্দক খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। অন্যান্য সাহাবীদের অবস্থাও ছিল অনুরূপ। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে যাইয়া তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী বলিলেন, এক সা' অর্থাৎ প্রায় সোয়া তিন কিলো গম আছে। তৎপর হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে পালিত একটি ছাগল যবেহ করিয়া দিয়া স্ত্রীকে রুটি ও গোস্ত পাকাইবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া অতি সন্তর্পণে তাঁহাকে আরও দুই/তিনজন সাহাবীসহ তাহার গৃহে রুটি ও গোশতের দাওয়াত গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাওয়াত কবুল করিলেন এবং উচ্চৈস্বরে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হে পরিখা খননকারী! জাবির তোমাদেরকে দাওয়াত করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার গৃহে চলিয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আহ্বান শুনিয়া হযরত জাবির (রা) প্রমাদ গুনিতে লাগিলেন। মাত্র এক সা' গমের রুটি আর একটি ছাগলের গোস্ত দ্বারা সহস্রাধিক মেহমানকে কিভাবে পরিতুষ্ট করিবেন, তাহাই তিনি ভাবিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাবির (রা)-এর রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া উনুনের উপর চড়ানো গোশতের হাঁড়িতে এবং খামীর করা আটায় পবিত্র মুখের লালা মিশ্রণ করিয়া বলিলেন, সমস্ত মেহমানের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুলার উপর হইতে হাঁড়ি নামাইও না। আর এই খামীর হইতে অল্প অল্প করিয়া আটা লইয়া রুটি তৈয়ার করিতে থাক। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হইল। ফলে সহস্রাধিক মেহমানকে আহার করানো পরও দেখা গেল, যেই পরিমাণ আটা খামীর করা হইয়াছিল এখনও সেই পরিমাণই অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং হাঁড়ি পূর্ববৎ গোস্তে পরিপূর্ণই আছে (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
মু'জিযা দুইভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে। (১) তলবী (طلبی): মানুষের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির প্রেক্ষিতে। ইহার প্রকাশ এইভাবে হয় যে, বিরুদ্ধবাদীরা নবী-রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তাই তাঁহার নিকট অতি প্রাকৃত কিছু ঘটাইবার দাবি জানায়। তাহারা মনে করে যে, পয়গাম্বর তাহা কখনও প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবেন না। ফলে তাঁহাকে মানুষের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হইতে হইবে। তৃখন আল্লাহ তা'আলা উহা উপযোগী মনে করিলে তাঁহার পয়গাম্বরের হাতে অতি প্রাকৃত ঘটনার প্রকাশ ঘটান। আর তখন উহার ফল দাঁড়ায় বিপরীতমুখী। পয়গাম্বরের লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁহার সত্যতা ও যথার্থতা। যেমন ফেরআওন যাদুকরদেরকে সমবেত করিয়া হযরত মূসা (আ)-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করিতে এবং তাঁহাকে জনসম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করিতে চেষ্টা চালাইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়ার মু'জিযা সংঘটিত হইল। ফলে ঘটনাটি পরিণামে মূসা (আ)-এর লজ্জা ও অপমানের পরিবর্তে তাঁহার সফলতা ও তাঁহার মিশন বিজয়ের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা জনসম্মুখে সূর্যের মত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। পরিণামে উপস্থিত যাদুকরগণ তাঁহার নবৃওয়াতে বিশ্বাসী হইয়া ঈমানদার হইয়া গেল (দ্র. ৭: ১০৩-১২৬)।
আরিফ রূমী তাঁহার মছনবীতে চমৎকার বলিয়াছেন: منکران را قصد ازلال نقات + ذل شده عز وظهور معجزات قصد شان زان کارذل این بده + عین ذل عز رسوال الله
"অবিশ্বাসীরা মু'জিযা তলবের মাধ্যমে সত্যকে নিষ্প্রভ করিয়া দিতে চাহে। অথচ তাহাদের এই অপচেষ্টার ভিতর দিয়াই সত্যের বিজয় ও যথার্থতা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে। তাহাদের ইচ্ছা ছিল মু'জিযা তলব করিয়া পয়গাম্বরকে লজ্জিত ও অপমানিত করা। কিন্তু তাহাদের এই পায়তারাই পয়গাম্বরের মর্যাদাকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে" (মছনবীর বরাতে সীরাতুন্নবী, ৪ খ., পৃ. ১০৮-১০৯)।
(২) গায়রে তলবী (غیر طلبی) : অর্থাৎ মানুষের পক্ষ হইতে মু'জিযার দাবি করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহারই দ্বারা কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া থাকেন, যাহাতে উহা তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ হিসাবে দর্শকদের মধ্যে প্রভাব ও প্রত্যয় সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। যেমন খাবারের মধ্যে বরকতের মু'জিযা। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত ঐতিহাসিক মু'জিযা। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানগণ চরম আর্থিক সংকট এবং অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষুধায় কাতর হইয়া কটিদেশ সোজা করিতে পারিতেছিলেন না, তাই তিনি পেটে পাথর বাঁধিয়া খন্দক খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। অন্যান্য সাহাবীদের অবস্থাও ছিল অনুরূপ। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে যাইয়া তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী বলিলেন, এক সা' অর্থাৎ প্রায় সোয়া তিন কিলো গম আছে। তৎপর হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে পালিত একটি ছাগল যবেহ করিয়া দিয়া স্ত্রীকে রুটি ও গোস্ত পাকাইবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া অতি সন্তর্পণে তাঁহাকে আরও দুই/তিনজন সাহাবীসহ তাহার গৃহে রুটি ও গোশতের দাওয়াত গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাওয়াত কবুল করিলেন এবং উচ্চৈস্বরে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হে পরিখা খননকারী! জাবির তোমাদেরকে দাওয়াত করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার গৃহে চলিয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আহ্বান শুনিয়া হযরত জাবির (রা) প্রমাদ গুনিতে লাগিলেন। মাত্র এক সা' গমের রুটি আর একটি ছাগলের গোস্ত দ্বারা সহস্রাধিক মেহমানকে কিভাবে পরিতুষ্ট করিবেন, তাহাই তিনি ভাবিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাবির (রা)-এর রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া উনুনের উপর চড়ানো গোশতের হাঁড়িতে এবং খামীর করা আটায় পবিত্র মুখের লালা মিশ্রণ করিয়া বলিলেন, সমস্ত মেহমানের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুলার উপর হইতে হাঁড়ি নামাইও না। আর এই খামীর হইতে অল্প অল্প করিয়া আটা লইয়া রুটি তৈয়ার করিতে থাক। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হইল। ফলে সহস্রাধিক মেহমানকে আহার করানো পরও দেখা গেল, যেই পরিমাণ আটা খামীর করা হইয়াছিল এখনও সেই পরিমাণই অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং হাঁড়ি পূর্ববৎ গোস্তে পরিপূর্ণই আছে (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
📄 মু'জিযার প্রকারভেদ
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির স্বপক্ষে যেই প্রমাণ তথা মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন তাহা প্রথমত দুই প্রকারের— জাহেরী (ظاهری) বা বস্তুভিত্তিক এবং বাতেনী (باطنی) বা. আত্মিক। জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক' মু'জিযা, যেমন মৃতকে জীবিত করা, যষ্টিকে সর্পে পরিণত করা, আঙ্গুল হইতে পানির প্রবাহ জারী হওয়া, রুগ্নকে সুস্থ করা, চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, সমুদ্র বক্ষে চলার পথ তৈরী হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। আর বাতেনী ও আত্মিক (রূহানী) মু'জিযা হইতেছে— নবৃওয়াতের দাবিদারের সত্যতা, নবীগণের নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়া, তাঁহাদের প্রভাব শক্তি, সফলতা ও গায়বী সাহায্য ইত্যাদি। ইহার মধ্যে পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বাতেনী মু'জিযা। বস্তুত নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে এই সমস্ত আত্মিক ও রূহানী নিদর্শন। আর জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাসমূহ শুধুই আবরণ এবং বাহিরের প্রতি দৃষ্টি দানকারীদের জন্য। এই কারণে দেখা যায়, যাহারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গূঢ় মর্মজ্ঞানী, তাহারা কখনও জাহেরী মু'জিযা তলব করেন নাই। অনুরূপ নবী-রাসূলগণের যুগে যাহারা শিক্ষিত সমাজ হিসাবে পরিচিত ছিল তাহারাও নবী-রাসূলগণের নিকট কোন জাহেরী মু'জিযা দাবি করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগের আহলে কিতাবগণ। তাহারা সন্দেহপ্রবণ মন লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বারংবার উপস্থিত হইয়াছে, তাঁহার সত্যতার পরীক্ষা লইয়াছে। কিন্তু তাহাদের পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি ছিল? তাহা ছিল এই যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অতীতের বনী ইসরাঈলী নবী-রাসূলের অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং তাঁহার শিক্ষা ও উলূমের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে কেহই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট- জাহেরী মু'জিযা তলব করে নাই। কারণ তাহারা জানিত যে, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে দাবিদারের আধ্যাত্মিক ও অভ্যন্তরীণ দিক এবং তাঁহার 'আখলাক ও চারিত্রিক অবস্থা। ঠিক একই কারণে আমরা দেখিতে পাই যে, তৎকালীন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হযরত দিহয়া কালবী (রা) উপস্থিত হইলেন এবং সম্রাটের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র পেশ করিলেন তখন হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা যাচাই করিবার জন্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফয়ানকে রাজ দরবারে ডাকাইয়া আনিয়া কতিপয় প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাহার এই প্রশ্নগুলির সমস্তটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং প্রভাব সম্বন্ধে। সবশেষে হিরাক্লিয়াস বলিয়াছিলেন, তুমি (আবূ সুফয়ান) যাহা বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে মুহাম্মাদ (স) অবশ্যই আল্লাহ্ প্রেরিত নবী এবং রাসূল (সহীহুল বুখারী, ১০খ., পৃ. ৪)।
অনুরূপ নাজরানের খৃস্টান বিদ্বানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণ করিল এবং মুসলমানদের আত্মিক বিকাশের অবস্থা লক্ষ্য করিল। তৎপর তাহারা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইসলামের সিদ্ধান্ত কি তাহা জানিতে চাহিল। সবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের হুকুম মুতাবিক তাহাদের সহিত মুবাহালা করিতে চ্যালেঞ্জ প্রদান করিলেন। কিন্তু তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। তাহারা পরস্পর বলিতে লাগিল, প্রকৃতই যদি মুহাম্মাদ (স) নবী হন তাহা হইলে আমরা সবংশে ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরিশেষে তাহারা বাৎসরিক খারাজ আদায় করিবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করিল। লক্ষ্য করুন, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক শিক্ষা ও তাঁহার আখলাক-চরিত্র ও আচার-অনুষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছে, কিন্তু দাবি প্রমাণের জন্য বাহ্যিক বস্তুভিত্তিক কোন মু'জিযা তলব করে নাই (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৩১-৬৩৭)।
স্বয়ং আরবের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখুন। তাহাদের হাজারও ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাতেনী ও আত্মিক মু'জিযা অনুধাবন করিয়াছেন, তাহাদের একজনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযা দাবি করেন নাই। যথা হযরত খাদীজা (রা), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আলী (রা), আম্মার (রা), হযরত ইয়াসির (রা), হযরত আবু যর গিফারী (রা), হযরত বেলাল (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম। হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা জানিতে পারিলেন, তখন স্বীয় ভ্রাতাকে বলিলেন, ঐ ব্যক্তির নিকট যাও। সে দাবি করিয়াছে যে, তাঁহার নিকট আসমান হইতে ওহী আসিয়াছে। তাঁহার অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। তাহার ভ্রাতা মক্কায় আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আবূ যার গিফারী (রা)-কে বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তিনি সচ্চরিত্রের নির্দেশ দেন এবং তিনি এমন কালাম পেশ করেন যাহা কবিতা নহে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
হযরত জা'ফার (রা) আবিসিনিয়ায় নাজাশীর দরবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পরিচয় সম্বন্ধে ভাষণ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলেন, হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞ ও জাহেল সমাজ। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করিতাম, দুষ্কর্ম লিপ্ত ছিলাম, প্রতিবেশীদের উপর অবিচার করিতাম, পরস্পর হানাহানি ও মারামারি করিতাম, দুর্বল লোককে সবল লোক নিশ্চিহ্ন করিয়া দিত। এমন অমানিশা ও দুর্যোগের সময় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আবির্ভূত হইলেন—যাঁহার ভদ্র ও শিষ্ট আচরণ, সততা, ন্যায়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জ্ঞাত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করিলেন। তিনি আমাদের এই শিক্ষা দিলেন যে, আমরা যেন মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, সত্য কথা বলি, রক্তপাত হইতে বিরত থাকি, ইয়াতীমের অধিকার হরণ না করি, প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেই, সতী রমণীদের প্রতি যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ না করি, নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, সিয়াম পালন করি। আমরা এই সমস্ত কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি, শিরক বর্জন করিয়াছি, সকল প্রকার অপকর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৩২; মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ২০২)।
আলোচনার সারাংশ এই যে, নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক দলীল হইতেছে, নবী-রাসূলগণের বাতেনী ও আধ্যাত্মিক মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী। তবে তাঁহাদের জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাও ছিল। তাই পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করিলে দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা অতীত নবী-রাসূলগণের জীবনেতিহাস বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তাঁহাদের জাহেরী মু'জিযার বিস্তৃত বর্ণনা পেশ করিয়াছেন। তথা হয়রত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, তাঁহার হস্ত শুভ্র আলোকোজ্জ্বল হওয়া, হযরত সালিহ (আ)-এর সময়ে পাথরের মধ্য হইতে উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসা, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত ব্যক্তির জীবিত হইয়া যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়া ইত্যাদি। নবীগণের জাহেরী ও বাতেনী মুজিয়ার আরও একটি পর্যায়লোচনা এই যে, জাহেরী ও বস্তুতিক্ত মুজিয়া শুধু ঐ সমস্ত লোক তলব করে যাহাদের অন্তরচক্ষু অন্ধ এবং যাহারা বিরুদ্ধবাদিতা, পক্ষপাতিত্ব এবং কুপমন্ডুকতাসুলভ মনোভাবের কারণে সত্যকে মানিয়া লইতে রাজি হয় না। বস্তুত গোঁড়া কাফিররাই জাহেরী মুজিয়া তলব করিয়া থাকে। এই কারণে দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে মুজিয়া তলব সংক্রান্ত দাবিগুলিকে সর্বদা কাফিরদের প্রতিই আরোপ করা হইয়াছে। যথা:
وَقَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللّٰهُ اَوْ تَأْتِيْنَا اٰيَةٌ كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ قَدْ بَيَّنَّا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
“এবং যাহারা কিছু জানে না তাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কেন, কিংবা কোন নিদর্শন আমাদের নিকট আসে না কেন? এইভাবে তাহাদের পূর্ববর্তীরাও তাহাদের অনুরূপ কথা বলিত। তাহাদের অন্তর একই রকম। আমি দৃঢ় প্রত্যয়শীলদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করিয়াছি।” (২:১১b)।
وَقَالُوْا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ قَادِرٌ عَلٰى اَنْ يُّنَزِّلَ اٰيَةً وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
“তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? বল, নিদর্শন নাযিল করিতে আল্লাহ অবশ্যই সক্ষম, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই জানে না” (৬:৩৭)।
وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَا اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ اِنَّمَا اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ
“যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক” (১৩:৭)।
وَقَالُوْا لَوْلَا يَأْتِيْنَا بِاٰيَةٍ مِّنْ رَّبِّهٖ اَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِى الصُّحُفِ الْاُوْلٰى
“তাহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যাহা আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে” (২০:১৩৩)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষণীয় যে, প্রত্যেক আয়াতেই মুজিয়া তলব করার বিষয়টি কাফিরদের প্রতি আরোপ করা হইয়াছে। পুণ্যবানগণ কখনও মুজিয়া তলব করেন নাই। ইহা হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মুজিয়া বনী ইসরাইলের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ফিরআওন ও তাহার অনুসারীদের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হইয়া ছিল। তাই যখন হাওয়ারীগণ ঈসা (আ)-এর নিকট খাদ্যভর্তি আসমানী খাঞ্চার জন্য বলিল- ﴿يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ﴾
“হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি এইরূপ করিতে পারেন যে, আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করিয়া দিবেন”? তখন ঈসা (আ) উত্তরে বলিলেন-
﴿اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴾
"যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর"। ইহাতে বুঝা যায়, ঈমানদার বান্দার পক্ষে এ ধরনের ফরমাইশ করিয়া আল্লাহকে পরীক্ষা করা কিংবা তাঁহার কাছে অলৌকিক বিষয় দাবি করা একান্তই অনুচিত (পবিত্র কুরআনুল-করীম, অনূদিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৩৬৩)। এমনিভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট মু'জিযাসমূহ হযরত আবূ বকর, উমার এবং উছমান (রা) তলব করেন নাই, বরং আবূ জাহল, আবু লাহাব, উৎবা, শায়বা প্রমুখ কাফিররাই তলব করিয়াছিল। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কাফিররা জাহেরী মু'জিযা তলব করিত তাহাদের শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ এবং অন্তরের হঠকারিতা ও গোঁয়ার্তুমির বশবর্তী হইয়া-সত্যানুসন্ধানী হইয়া নহে। এই কারণে তাহারা একের পর এক জাহেরী মু'জিযা তলব করিয়াই যাইতেছিল। পক্ষান্তরে যখনই তাহাদের দাবি অনুসারে কোন মু'জিযা বাস্তবায়িত হইত তখন তাহারাই উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিত। বস্তুত এইরূপ গোঁয়ার্তুমি ও কুপমন্ডুকতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনও জাহেরী মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিয়া উপকৃত হইতে পারে না বরং তাহারা নিজেদের অন্তরের কপটতার দরুন জাহেরী মু'জিযাকে যাদু ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং নবৃওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উহাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে। হযরত মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার অনুসারিদেরকে অনেক মু'জিযা দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রতিটি মু'জিযার ক্ষেত্রেই মূসা (আ)-কে ফিরআওনের মুখে একই জবাব শুনিতে হইয়াছিল, "তুমি মহাযাদুকর" (انك لساحر عليم) অথবা "ইহা তো প্রকাশ্য যাদু" (ان هذا الا سحر مبين) অথবা "এই মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারূন উভয়ে যাদুকর" (أن هذان لسحران) (দ্র. ৫:১১০; ৬: ৭৬; ১০: ৭৬; ১১: ৭; ২৭: ১৩; ৩৪: ৪৩; ৩৭: ১৫; ২০: ৬৩; ৭: ১১২)।
আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া মিসরের সমস্ত যাদুকর সিজদায় পতিত হইয়াছিল এবং 'তাহাদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করিয়া চির সৌভাগ্যমণ্ডিত হইয়াছিল। কিন্তু ফিরআওনের মুখে ছিল পূর্বের সেই একই কথা, অভিন্ন বুল : ﴿إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ﴾ “সে তো তোমাদের (যাদুকর) প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে” (২০ঃ ৭১)।
শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ক্ষেত্রে ঠিক একই অবস্থা ঘটিয়াছিল। কাফির কুরায়শ সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মু'জিযা তলব করিয়াছিল এবং মু'জিযার বিকাশ প্রত্যক্ষ করিবার পরই তাঁহাকে যাদুকর বা কাহিনীকার বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল (দ্র. আল-কুরআন ৭৪: ২৪; ৫২: ২৯, ৩০; ৫৪ : ১-২; ৬৯ : ৪০, ৪৮)।
উপরে উল্লিখিত আলোচনার দ্বারা একটি সংশয়ের অবসানও হইয়া গেল যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লক্ষ্য করা যায় যে, মক্কার কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বারবার মু'জিযা তলব করিয়াছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সেই দাবি অনুসারে মু'জিযা প্রদর্শন করেন নাই কেন?
বস্তুত তাহাদেরকে অনেক জাহেরী মু'জিযা প্রদর্শন করান হইয়াছিল, কিন্তু জাহেরী মু'জিযা দ্বারা কাফিরদের মন কখনও শান্ত হয় না এবং ইহাতে তাহারা কখনও হিদায়াত লাভ করিতে পারে না। কারণ এই সমস্ত মু'জিযা তলবের পশ্চাতে তাহাদের অন্তরের কপটতা, হিংসা, দ্বেষ ও গোঁয়াতুমি কার্যকর থাকে। এই অবস্থায় তাহাদের প্রার্থিত মু'জিযা সংঘটনে তাহাদের বিশেষ কোন ফায়দা হইত না, বরং ইহা তাহাদের অন্তরের শঠতাকে আরও বৃদ্ধি করিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ "এবং যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, ইহা তাহাদের কলুষের সহিত আরও কলুষ যুক্ত করে" (৯: ১২৫; আরও দ্র. ২: ১০; ৭১: ২৪, ২৮; ১৭: ৮২; ৫: ৬৪, ৬৮)।
তাই পবিত্র কুরআনে জাহেরী মু'জিযা তলবের কারণে কাফিরদেরকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে এবং বাতেনী মু'জিযার প্রতি তাহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইতেছে:
وَقَالُوا لَوْ لَا يَأْتِينَا بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّهِ أَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِي الصُّحُفِ الْأُولَى "উহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ যাহা আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে" (২০: ১৩৩)?
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ أَيَتْ مِنْ رَبِّهِ قُلْ إِنَّمَا الْآيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ "উহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহার নিকট নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? বল, নিদর্শন আল্লাহর এখতিয়ারে; আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। ইহা কি উহাদের জন্য যথেষ্ট নহে যে, আমি তোমার নিকট কুরআন নাযিল করিয়াছি, যাহা উহাদের নিকট পাঠ করা হয়? ইহাতে অবশ্যই মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ এবং উপদেশ রহিয়াছে" (২৯: ৫০-৫১)।
এই কারণেই পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কাফিরদের জাহেরী মু'জিযা তলবের প্রতিউত্তরে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কেবল এতটুকু বলিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, "আমি তো কেবল একজন মানুষ এবং পয়গাম্বর"। ইরশাদ হইয়াছে :
وَ قَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا ، أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَرَ خِلْلَهَا تَفْجِيرًا ، أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالمَلْئِكَةِ قَبِيلاً ، أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرَقِيَّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتبًا نَّقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولاً
“এবং উহারা বলে, আমরা কখনও তোমাতে ঈমান আনিব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হইতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করিবে অথবা তোমার খেজুরের বা আংগুরের এক বাগান হইবে, যাহার ফাঁকে-ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করিবে নদী-নালা। অথবা তুমি যেমন বলিয়া থাক, তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া আমাদের উপর ফেলিবে অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করিবে অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে। কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি কিতাব নাযিল না করিবে, যাহা আমরা পাঠ করিব। বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭:৯০-৯৩)।
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির স্বপক্ষে যেই প্রমাণ তথা মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন তাহা প্রথমত দুই প্রকারের— জাহেরী (ظاهری) বা বস্তুভিত্তিক এবং বাতেনী (باطنی) বা. আত্মিক। জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক' মু'জিযা, যেমন মৃতকে জীবিত করা, যষ্টিকে সর্পে পরিণত করা, আঙ্গুল হইতে পানির প্রবাহ জারী হওয়া, রুগ্নকে সুস্থ করা, চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, সমুদ্র বক্ষে চলার পথ তৈরী হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। আর বাতেনী ও আত্মিক (রূহানী) মু'জিযা হইতেছে— নবৃওয়াতের দাবিদারের সত্যতা, নবীগণের নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়া, তাঁহাদের প্রভাব শক্তি, সফলতা ও গায়বী সাহায্য ইত্যাদি। ইহার মধ্যে পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বাতেনী মু'জিযা। বস্তুত নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে এই সমস্ত আত্মিক ও রূহানী নিদর্শন। আর জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাসমূহ শুধুই আবরণ এবং বাহিরের প্রতি দৃষ্টি দানকারীদের জন্য। এই কারণে দেখা যায়, যাহারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গূঢ় মর্মজ্ঞানী, তাহারা কখনও জাহেরী মু'জিযা তলব করেন নাই। অনুরূপ নবী-রাসূলগণের যুগে যাহারা শিক্ষিত সমাজ হিসাবে পরিচিত ছিল তাহারাও নবী-রাসূলগণের নিকট কোন জাহেরী মু'জিযা দাবি করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগের আহলে কিতাবগণ। তাহারা সন্দেহপ্রবণ মন লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বারংবার উপস্থিত হইয়াছে, তাঁহার সত্যতার পরীক্ষা লইয়াছে। কিন্তু তাহাদের পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি ছিল? তাহা ছিল এই যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অতীতের বনী ইসরাঈলী নবী-রাসূলের অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং তাঁহার শিক্ষা ও উলূমের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে কেহই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট- জাহেরী মু'জিযা তলব করে নাই। কারণ তাহারা জানিত যে, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে দাবিদারের আধ্যাত্মিক ও অভ্যন্তরীণ দিক এবং তাঁহার 'আখলাক ও চারিত্রিক অবস্থা। ঠিক একই কারণে আমরা দেখিতে পাই যে, তৎকালীন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হযরত দিহয়া কালবী (রা) উপস্থিত হইলেন এবং সম্রাটের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র পেশ করিলেন তখন হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা যাচাই করিবার জন্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফয়ানকে রাজ দরবারে ডাকাইয়া আনিয়া কতিপয় প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাহার এই প্রশ্নগুলির সমস্তটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং প্রভাব সম্বন্ধে। সবশেষে হিরাক্লিয়াস বলিয়াছিলেন, তুমি (আবূ সুফয়ান) যাহা বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে মুহাম্মাদ (স) অবশ্যই আল্লাহ্ প্রেরিত নবী এবং রাসূল (সহীহুল বুখারী, ১০খ., পৃ. ৪)।
অনুরূপ নাজরানের খৃস্টান বিদ্বানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণ করিল এবং মুসলমানদের আত্মিক বিকাশের অবস্থা লক্ষ্য করিল। তৎপর তাহারা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইসলামের সিদ্ধান্ত কি তাহা জানিতে চাহিল। সবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের হুকুম মুতাবিক তাহাদের সহিত মুবাহালা করিতে চ্যালেঞ্জ প্রদান করিলেন। কিন্তু তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। তাহারা পরস্পর বলিতে লাগিল, প্রকৃতই যদি মুহাম্মাদ (স) নবী হন তাহা হইলে আমরা সবংশে ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরিশেষে তাহারা বাৎসরিক খারাজ আদায় করিবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করিল। লক্ষ্য করুন, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক শিক্ষা ও তাঁহার আখলাক-চরিত্র ও আচার-অনুষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছে, কিন্তু দাবি প্রমাণের জন্য বাহ্যিক বস্তুভিত্তিক কোন মু'জিযা তলব করে নাই (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৩১-৬৩৭)।
স্বয়ং আরবের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখুন। তাহাদের হাজারও ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাতেনী ও আত্মিক মু'জিযা অনুধাবন করিয়াছেন, তাহাদের একজনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযা দাবি করেন নাই। যথা হযরত খাদীজা (রা), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আলী (রা), আম্মার (রা), হযরত ইয়াসির (রা), হযরত আবু যর গিফারী (রা), হযরত বেলাল (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম। হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা জানিতে পারিলেন, তখন স্বীয় ভ্রাতাকে বলিলেন, ঐ ব্যক্তির নিকট যাও। সে দাবি করিয়াছে যে, তাঁহার নিকট আসমান হইতে ওহী আসিয়াছে। তাঁহার অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। তাহার ভ্রাতা মক্কায় আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আবূ যার গিফারী (রা)-কে বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তিনি সচ্চরিত্রের নির্দেশ দেন এবং তিনি এমন কালাম পেশ করেন যাহা কবিতা নহে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
হযরত জা'ফার (রা) আবিসিনিয়ায় নাজাশীর দরবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পরিচয় সম্বন্ধে ভাষণ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলেন, হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞ ও জাহেল সমাজ। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করিতাম, দুষ্কর্ম লিপ্ত ছিলাম, প্রতিবেশীদের উপর অবিচার করিতাম, পরস্পর হানাহানি ও মারামারি করিতাম, দুর্বল লোককে সবল লোক নিশ্চিহ্ন করিয়া দিত। এমন অমানিশা ও দুর্যোগের সময় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আবির্ভূত হইলেন—যাঁহার ভদ্র ও শিষ্ট আচরণ, সততা, ন্যায়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জ্ঞাত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করিলেন। তিনি আমাদের এই শিক্ষা দিলেন যে, আমরা যেন মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, সত্য কথা বলি, রক্তপাত হইতে বিরত থাকি, ইয়াতীমের অধিকার হরণ না করি, প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেই, সতী রমণীদের প্রতি যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ না করি, নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, সিয়াম পালন করি। আমরা এই সমস্ত কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি, শিরক বর্জন করিয়াছি, সকল প্রকার অপকর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৩২; মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ২০২)।
আলোচনার সারাংশ এই যে, নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক দলীল হইতেছে, নবী-রাসূলগণের বাতেনী ও আধ্যাত্মিক মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী। তবে তাঁহাদের জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাও ছিল। তাই পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করিলে দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা অতীত নবী-রাসূলগণের জীবনেতিহাস বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তাঁহাদের জাহেরী মু'জিযার বিস্তৃত বর্ণনা পেশ করিয়াছেন। তথা হয়রত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, তাঁহার হস্ত শুভ্র আলোকোজ্জ্বল হওয়া, হযরত সালিহ (আ)-এর সময়ে পাথরের মধ্য হইতে উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসা, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত ব্যক্তির জীবিত হইয়া যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়া ইত্যাদি। নবীগণের জাহেরী ও বাতেনী মুজিয়ার আরও একটি পর্যায়লোচনা এই যে, জাহেরী ও বস্তুতিক্ত মুজিয়া শুধু ঐ সমস্ত লোক তলব করে যাহাদের অন্তরচক্ষু অন্ধ এবং যাহারা বিরুদ্ধবাদিতা, পক্ষপাতিত্ব এবং কুপমন্ডুকতাসুলভ মনোভাবের কারণে সত্যকে মানিয়া লইতে রাজি হয় না। বস্তুত গোঁড়া কাফিররাই জাহেরী মুজিয়া তলব করিয়া থাকে। এই কারণে দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে মুজিয়া তলব সংক্রান্ত দাবিগুলিকে সর্বদা কাফিরদের প্রতিই আরোপ করা হইয়াছে। যথা:
وَقَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللّٰهُ اَوْ تَأْتِيْنَا اٰيَةٌ كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ قَدْ بَيَّنَّا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
“এবং যাহারা কিছু জানে না তাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কেন, কিংবা কোন নিদর্শন আমাদের নিকট আসে না কেন? এইভাবে তাহাদের পূর্ববর্তীরাও তাহাদের অনুরূপ কথা বলিত। তাহাদের অন্তর একই রকম। আমি দৃঢ় প্রত্যয়শীলদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করিয়াছি।” (২:১১b)।
وَقَالُوْا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ قَادِرٌ عَلٰى اَنْ يُّنَزِّلَ اٰيَةً وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
“তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? বল, নিদর্শন নাযিল করিতে আল্লাহ অবশ্যই সক্ষম, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই জানে না” (৬:৩৭)।
وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَا اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ اِنَّمَا اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ
“যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক” (১৩:৭)।
وَقَالُوْا لَوْلَا يَأْتِيْنَا بِاٰيَةٍ مِّنْ رَّبِّهٖ اَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِى الصُّحُفِ الْاُوْلٰى
“তাহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যাহা আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে” (২০:১৩৩)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষণীয় যে, প্রত্যেক আয়াতেই মুজিয়া তলব করার বিষয়টি কাফিরদের প্রতি আরোপ করা হইয়াছে। পুণ্যবানগণ কখনও মুজিয়া তলব করেন নাই। ইহা হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মুজিয়া বনী ইসরাইলের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ফিরআওন ও তাহার অনুসারীদের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হইয়া ছিল। তাই যখন হাওয়ারীগণ ঈসা (আ)-এর নিকট খাদ্যভর্তি আসমানী খাঞ্চার জন্য বলিল- ﴿يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ﴾
“হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি এইরূপ করিতে পারেন যে, আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করিয়া দিবেন”? তখন ঈসা (আ) উত্তরে বলিলেন-
﴿اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴾
"যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর"। ইহাতে বুঝা যায়, ঈমানদার বান্দার পক্ষে এ ধরনের ফরমাইশ করিয়া আল্লাহকে পরীক্ষা করা কিংবা তাঁহার কাছে অলৌকিক বিষয় দাবি করা একান্তই অনুচিত (পবিত্র কুরআনুল-করীম, অনূদিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৩৬৩)। এমনিভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট মু'জিযাসমূহ হযরত আবূ বকর, উমার এবং উছমান (রা) তলব করেন নাই, বরং আবূ জাহল, আবু লাহাব, উৎবা, শায়বা প্রমুখ কাফিররাই তলব করিয়াছিল। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কাফিররা জাহেরী মু'জিযা তলব করিত তাহাদের শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ এবং অন্তরের হঠকারিতা ও গোঁয়ার্তুমির বশবর্তী হইয়া-সত্যানুসন্ধানী হইয়া নহে। এই কারণে তাহারা একের পর এক জাহেরী মু'জিযা তলব করিয়াই যাইতেছিল। পক্ষান্তরে যখনই তাহাদের দাবি অনুসারে কোন মু'জিযা বাস্তবায়িত হইত তখন তাহারাই উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিত। বস্তুত এইরূপ গোঁয়ার্তুমি ও কুপমন্ডুকতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনও জাহেরী মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিয়া উপকৃত হইতে পারে না বরং তাহারা নিজেদের অন্তরের কপটতার দরুন জাহেরী মু'জিযাকে যাদু ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং নবৃওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উহাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে। হযরত মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার অনুসারিদেরকে অনেক মু'জিযা দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রতিটি মু'জিযার ক্ষেত্রেই মূসা (আ)-কে ফিরআওনের মুখে একই জবাব শুনিতে হইয়াছিল, "তুমি মহাযাদুকর" (انك لساحر عليم) অথবা "ইহা তো প্রকাশ্য যাদু" (ان هذا الا سحر مبين) অথবা "এই মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারূন উভয়ে যাদুকর" (أن هذان لسحران) (দ্র. ৫:১১০; ৬: ৭৬; ১০: ৭৬; ১১: ৭; ২৭: ১৩; ৩৪: ৪৩; ৩৭: ১৫; ২০: ৬৩; ৭: ১১২)।
আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া মিসরের সমস্ত যাদুকর সিজদায় পতিত হইয়াছিল এবং 'তাহাদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করিয়া চির সৌভাগ্যমণ্ডিত হইয়াছিল। কিন্তু ফিরআওনের মুখে ছিল পূর্বের সেই একই কথা, অভিন্ন বুল : ﴿إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ﴾ “সে তো তোমাদের (যাদুকর) প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে” (২০ঃ ৭১)।
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির স্বপক্ষে যেই প্রমাণ তথা মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন তাহা প্রথমত দুই প্রকারের— জাহেরী (ظاهری) বা বস্তুভিত্তিক এবং বাতেনী (باطنی) বা. আত্মিক। জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক' মু'জিযা, যেমন মৃতকে জীবিত করা, যষ্টিকে সর্পে পরিণত করা, আঙ্গুল হইতে পানির প্রবাহ জারী হওয়া, রুগ্নকে সুস্থ করা, চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, সমুদ্র বক্ষে চলার পথ তৈরী হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। আর বাতেনী ও আত্মিক (রূহানী) মু'জিযা হইতেছে— নবৃওয়াতের দাবিদারের সত্যতা, নবীগণের নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়া, তাঁহাদের প্রভাব শক্তি, সফলতা ও গায়বী সাহায্য ইত্যাদি। ইহার মধ্যে পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বাতেনী মু'জিযা। বস্তুত নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে এই সমস্ত আত্মিক ও রূহানী নিদর্শন। আর জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাসমূহ শুধুই আবরণ এবং বাহিরের প্রতি দৃষ্টি দানকারীদের জন্য। এই কারণে দেখা যায়, যাহারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গূঢ় মর্মজ্ঞানী, তাহারা কখনও জাহেরী মু'জিযা তলব করেন নাই। অনুরূপ নবী-রাসূলগণের যুগে যাহারা শিক্ষিত সমাজ হিসাবে পরিচিত ছিল তাহারাও নবী-রাসূলগণের নিকট কোন জাহেরী মু'জিযা দাবি করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগের আহলে কিতাবগণ। তাহারা সন্দেহপ্রবণ মন লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বারংবার উপস্থিত হইয়াছেন, তাঁহার সত্যতার পরীক্ষা লইয়াছেন। কিন্তু তাহাদের পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি ছিল? তাহা ছিল এই যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অতীতের বনী ইসরাঈলী নবী-রাসূলের অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং তাঁহার শিক্ষা ও উলূমের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে কেহই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট- জাহেরী মু'জিযা তলব করে নাই। কারণ তাহারা জানিত যে, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে দাবিদারের আধ্যাত্মিক ও অভ্যন্তরীণ দিক এবং তাঁহার 'আখলাক ও চারিত্রিক অবস্থা। ঠিক একই কারণে আমরা দেখিতে পাই যে, তৎকালীন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হযরত দিহয়া কালবী (রা) উপস্থিত হইলেন এবং সম্রাটের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র পেশ করিলেন তখন হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা যাচাই করিবার জন্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফয়ানকে রাজ দরবারে ডাকাইয়া আনিয়া কতিপয় প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাহার এই প্রশ্নগুলির সমস্তটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং প্রভাব সম্বন্ধে। সবশেষে হিরাক্লিয়াস বলিয়াছিলেন, তুমি (আবূ সুফয়ান) যাহা বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে মুহাম্মাদ (স) অবশ্যই আল্লাহ্ প্রেরিত নবী এবং রাসূল (সহীহুল বুখারী, ১০খ., পৃ. ৪)।
অনুরূপ নাজরানের খৃস্টান বিদ্বানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণ করিল এবং মুসলমানদের আত্মিক বিকাশের অবস্থা লক্ষ্য করিল। তৎপর তাহারা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইসলামের সিদ্ধান্ত কি তাহা জানিতে চাহিল। সবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের হুকুম মুতাবিক তাহাদের সহিত মুবাহালা করিতে চ্যালেঞ্জ প্রদান করিলেন। কিন্তু তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। তাহারা পরস্পর বলিতে লাগিল, প্রকৃতই যদি মুহাম্মাদ (স) নবী হন তাহা হইলে আমরা সবংশে ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরিশেষে তাহারা বাৎসরিক খারাজ আদায় করিবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করিল। লক্ষ্য করুন, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক শিক্ষা ও তাঁহার আখলাক-চরিত্র ও আচার-অনুষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছে, কিন্তু দাবি প্রমাণের জন্য বাহ্যিক বস্তুভিত্তিক কোন মু'জিযা তলব করে নাই (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৩১-৬৩৭)।
স্বয়ং আরবের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখুন। তাহাদের হাজারও ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাতেনী ও আত্মিক মু'জিযা অনুধাবন করিয়াছেন, তাহাদের একজনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযা দাবি করেন নাই। যথা হযরত খাদীজা (রা), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আলী (রা), আম্মার (রা), হযরত ইয়াসির (রা), হযরত আবু যর গিফারী (রা), হযরত বেলাল (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম। হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা জানিতে পারিলেন, তখন স্বীয় ভ্রাতাকে বলিলেন, ঐ ব্যক্তির নিকট যাও। সে দাবি করিয়াছে যে, তাঁহার নিকট আসমান হইতে ওহী আসিয়াছে। তাঁহার অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। তাহার ভ্রাতা মক্কায় আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আবূ যার গিফারী (রা)-কে বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তিনি সচ্চরিত্রের নির্দেশ দেন এবং তিনি এমন কালাম পেশ করেন যাহা কবিতা নহে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
হযরত জা'ফার (রা) আবিসিনিয়ায় নাজাশীর দরবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পরিচয় সম্বন্ধে ভাষণ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলেন, হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞ ও জাহেল সমাজ। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করিতাম, দুষ্কর্ম লিপ্ত ছিলাম, প্রতিবেশীদের উপর অবিচার করিতাম, পরস্পর হানাহানি ও মারামারি করিতাম, দুর্বল লোককে সবল লোক নিশ্চিহ্ন করিয়া দিত। এমন অমানিশা ও দুর্যোগের সময় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আবির্ভূত হইলেন—যাঁহার ভদ্র ও শিষ্ট আচরণ, সততা, ন্যায়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জ্ঞাত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করিলেন। তিনি আমাদের এই শিক্ষা দিলেন যে, আমরা যেন মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, সত্য কথা বলি, রক্তপাত হইতে বিরত থাকি, ইয়াতীমের অধিকার হরণ না করি, প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেই, সতী রমণীদের প্রতি যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ না করি, নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, সিয়াম পালন করি। আমরা এই সমস্ত কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি, শিরক বর্জন করিয়াছি, সকল প্রকার অপকর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৩২; মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ২০২)।
আলোচনার সারাংশ এই যে, নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক দলীল হইতেছে, নবী-রাসূলগণের বাতেনী ও আধ্যাত্মিক মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী। তবে তাঁহাদের জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাও ছিল। তাই পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করিলে দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা অতীত নবী-রাসূলগণের জীবনেতিহাস বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তাঁহাদের জাহেরী মু'জিযার বিস্তৃত বর্ণনা পেশ করিয়াছেন। তথা হয়রত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, তাঁহার হস্ত শুভ্র আলোকোজ্জ্বল হওয়া, হযরত সালিহ (আ)-এর সময়ে পাথরের মধ্য হইতে উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসা, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত ব্যক্তির জীবিত হইয়া যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়া ইত্যাদি। নবীগণের জাহেরী ও বাতেনী মুজিয়ার আরও একটি পর্যায়লোচনা এই যে, জাহেরী ও বস্তুতিক্ত মুজিয়া শুধু ঐ সমস্ত লোক তলব করে যাহাদের অন্তরচক্ষু অন্ধ এবং যাহারা বিরুদ্ধবাদিতা, পক্ষপাতিত্ব এবং কুপমন্ডুকতাসুলভ মনোভাবের কারণে সত্যকে মানিয়া লইতে রাজি হয় না। বস্তুত গোঁড়া কাফিররাই জাহেরী মুজিয়া তলব করিয়া থাকে। এই কারণে দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে মুজিয়া তলব সংক্রান্ত দাবিগুলিকে সর্বদা কাফিরদের প্রতিই আরোপ করা হইয়াছে। যথা:
وَقَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللّٰهُ اَوْ تَأْتِيْنَا اٰيَةٌ كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ قَدْ بَيَّنَّا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
“এবং যাহারা কিছু জানে না তাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কেন, কিংবা কোন নিদর্শন আমাদের নিকট আসে না কেন? এইভাবে তাহাদের পূর্ববর্তীরাও তাহাদের অনুরূপ কথা বলিত। তাহাদের অন্তর একই রকম। আমি দৃঢ় প্রত্যয়শীলদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করিয়াছি।” (২:১১b)।
وَقَالُوْا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ قَادِرٌ عَلٰى اَنْ يُّنَزِّلَ اٰيَةً وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
“তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? বল, নিদর্শন নাযিল করিতে আল্লাহ অবশ্যই সক্ষম, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই জানে না” (৬:৩৭)।
وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَا اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ اِنَّمَا اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ
“যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক” (১৩:৭)।
وَقَالُوْا لَوْلَا يَأْتِيْنَا بِاٰيَةٍ مِّنْ رَّبِّهٖ اَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِى الصُّحُفِ الْاُوْلٰى
“তাহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যাহা আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে” (২০:১৩৩)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষণীয় যে, প্রত্যেক আয়াতেই মুজিয়া তলব করার বিষয়টি কাফিরদের প্রতি আরোপ করা হইয়াছে। পুণ্যবানগণ কখনও মুজিয়া তলব করেন নাই। ইহা হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মুজিয়া বনী ইসরাইলের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ফিরআওন ও তাহার অনুসারীদের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হইয়া ছিল। তাই যখন হাওয়ারীগণ ঈসা (আ)-এর নিকট খাদ্যভর্তি আসমানী খাঞ্চার জন্য বলিল- ﴿يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ﴾
“হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি এইরূপ করিতে পারেন যে, আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করিয়া দিবেন”? তখন ঈসা (আ) উত্তরে বলিলেন-
﴿اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴾
"যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর"। ইহাতে বুঝা যায়, ঈমানদার বান্দার পক্ষে এ ধরনের ফরমাইশ করিয়া আল্লাহকে পরীক্ষা করা কিংবা তাঁহার কাছে অলৌকিক বিষয় দাবি করা একান্তই অনুচিত (পবিত্র কুরআনুল-করীম, অনূদিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৩৬৩)। এমনিভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট মু'জিযাসমূহ হযরত আবূ বকর, উমার এবং উছমান (রা) তলব করেন নাই, বরং আবূ জাহল, আবু লাহাব, উৎবা, শায়বা প্রমুখ কাফিররাই তলব করিয়াছিল। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কাফিররা জাহেরী মু'জিযা তলব করিত তাহাদের শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ এবং অন্তরের হঠকারিতা ও গোঁয়ার্তুমির বশবর্তী হইয়া-সত্যানুসন্ধানী হইয়া নহে। এই কারণে তাহারা একের পর এক জাহেরী মু'জিযা তলব করিয়াই যাইতেছিল। পক্ষান্তরে যখনই তাহাদের দাবি অনুসারে কোন মু'জিযা বাস্তবায়িত হইত তখন তাহারাই উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিত। বস্তুত এইরূপ গোঁয়ার্তুমি ও কুপমন্ডুকতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনও জাহেরী মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিয়া উপকৃত হইতে পারে না বরং তাহারা নিজেদের অন্তরের কপটতার দরুন জাহেরী মু'জিযাকে যাদু ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং নবৃওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উহাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে। হযরত মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার অনুসারিদেরকে অনেক মু'জিযা দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রতিটি মু'জিযার ক্ষেত্রেই মূসা (আ)-কে ফিরআওনের মুখে একই জবাব শুনিতে হইয়াছিল, "তুমি মহাযাদুকর" (انك لساحر عليم) অথবা "ইহা তো প্রকাশ্য যাদু" (ان هذا الا سحر مبين) অথবা "এই মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারূন উভয়ে যাদুকর" (أن هذان لسحران) (দ্র. ৫:১১০; ৬: ৭৬; ১০: ৭৬; ১১: ৭; ২৭: ১৩; ৩৪: ৪৩; ৩৭: ১৫; ২০: ৬৩; ৭: ১১২)।
আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া মিসরের সমস্ত যাদুকর সিজদায় পতিত হইয়াছিল এবং 'তাহাদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করিয়া চির সৌভাগ্যমণ্ডিত হইয়াছিল। কিন্তু ফিরআওনের মুখে ছিল পূর্বের সেই একই কথা, অভিন্ন বুল : ﴿إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ﴾ “সে তো তোমাদের (যাদুকর) প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে” (২০ঃ ৭১)।
শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ক্ষেত্রে ঠিক একই অবস্থা ঘটিয়াছিল। কাফির কুরায়শ সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মু'জিযা তলব করিয়াছিল এবং মু'জিযার বিকাশ প্রত্যক্ষ করিবার পরই তাঁহাকে যাদুকর বা কাহিনীকার বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল (দ্র. আল-কুরআন ৭৪: ২৪; ৫২: ২৯, ৩০; ৫৪ : ১-২; ৬৯ : ৪০, ৪৮)।
উপরে উল্লিখিত আলোচনার দ্বারা একটি সংশয়ের অবসানও হইয়া গেল যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লক্ষ্য করা যায় যে, মক্কার কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বারবার মু'জিযা তলব করিয়াছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সেই দাবি অনুসারে মু'জিযা প্রদর্শন করেন নাই কেন?
বস্তুত তাহাদেরকে অনেক জাহেরী মু'জিযা প্রদর্শন করান হইয়াছিল, কিন্তু জাহেরী মু'জিযা দ্বারা কাফিরদের মন কখনও শান্ত হয় না এবং ইহাতে তাহারা কখনও হিদায়াত লাভ করিতে পারে না। কারণ এই সমস্ত মু'জিযা তলবের পশ্চাতে তাহাদের অন্তরের কপটতা, হিংসা, দ্বেষ ও গোঁয়াতুমি কার্যকর থাকে। এই অবস্থায় তাহাদের প্রার্থিত মু'জিযা সংঘটনে তাহাদের বিশেষ কোন ফায়দা হইত না, বরং ইহা তাহাদের অন্তরের শঠতাকে আরও বৃদ্ধি করিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ "এবং যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, ইহা তাহাদের কলুষের সহিত আরও কলুষ যুক্ত করে" (৯: ১২৫; আরও দ্র. ২: ১০; ৭১: ২৪, ২৮; ১৭: ৮২; ৫: ৬৪, ৬৮)।
তাই পবিত্র কুরআনে জাহেরী মু'জিযা তলবের কারণে কাফিরদেরকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে এবং বাতেনী মু'জিযার প্রতি তাহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইতেছে:
وَقَالُوا لَوْ لَا يَأْتِينَا بِآيَةٍ مِّنْ رَبِّهِ أَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِي الصُّحُفِ الْأُولَى "উহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ যাহা আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে" (২০: ১৩৩)?
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ أَيَتْ مِنْ رَبِّهِ قُلْ إِنَّمَا الْآيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ "উহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহার নিকট নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? বল, নিদর্শন আল্লাহর এখতিয়ারে; আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। ইহা কি উহাদের জন্য যথেষ্ট নহে যে, আমি তোমার নিকট কুরআন নাযিল করিয়াছি, যাহা উহাদের নিকট পাঠ করা হয়? ইহাতে অবশ্যই মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ এবং উপদেশ রহিয়াছে" (২৯: ৫০-৫১)।
এই কারণেই পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কাফিরদের জাহেরী মু'জিযা তলবের প্রতিউত্তরে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কেবল এতটুকু বলিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, "আমি তো কেবল একজন মানুষ এবং পয়গাম্বর"। ইরশাদ হইয়াছে :
وَ قَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا ، أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَرَ خِلْلَهَا تَفْجِيرًا ، أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالمَلْئِكَةِ قَبِيلاً ، أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرَقِيَّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتبًا نَّقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولاً
“এবং উহারা বলে, আমরা কখনও তোমাতে ঈমান আনিব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হইতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করিবে অথবা তোমার খেজুরের বা আংগুরের এক বাগান হইবে, যাহার ফাঁকে-ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করিবে নদী-নালা। অথবা তুমি যেমন বলিয়া থাক, তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া আমাদের উপর ফেলিবে অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করিবে অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে। কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি কিতাব নাযিল না করিবে, যাহা আমরা পাঠ করিব। বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭:৯০-৯৩)।
📄 মু'জিযা সম্পর্কে বিতর্ক
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা জাহেরী ও বাতেনী উভয় প্রকার মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন। ইহা প্রত্যেক নবীর বেলায়ই ঘটিয়াছে। কিন্তু এই জাহেরী ও বাতেনী মু'জিযার পার্থক্য এবং উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহের গূঢ়ার্থ অনুধাবনে ব্যর্থতার কারণে কোন কোন লোক মনে করিয়া বসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদেরকে কোন জাহেরী মু'জিযা দেখান নাই। যদি তিনি জাহেরী মু'জিযা দেখাইতেন তাহা হইলে বারংবার তাহারা কেন মু'জিযা তলব করিয়াছিল? এমনকি কোন কোন অবিবেচক ইসলামী পণ্ডিত এই কথাও বলিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর কুরআন ভিন্ন অন্য কোন মু'জিযাই ছিল না"। এই কারণে বর্তমান কালে নূতন বিতর্কের সূচনা হইয়াছে যে, আসলে কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল কি না?
মিসরের কয়েকজন মুসলিম পণ্ডিত, যথা উস্তাদ মুহাম্মাদ ফারীদ ওয়াজদী, শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু, সায়্যিদ আবদুল আযীয জাবীশ, আল-মানার সাময়িকীর সম্পাদক সায়্যিদ রাশীদ রিদা এবং মিসরের আল-আযহার রেক্টর মুহাম্মদ মুস্তাফা আল-মারাগী এবং প্রখ্যাত লেখক শায়খ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল প্রমুখ আধুনিক মুসলিম পণ্ডিতদের অভিমত এই যে, "পবিত্র কুরআনের বাহিরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল না" [দ্র. (১) মুহাম্মাদ ফারীদ ওয়াজদী, "আল-মাদীনা ওয়াল-ইসলাম, মিসর, হি. ১৩৫৩ / খৃ. ১৯৩৩, পৃ. ৭১-৭২; (২) মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা, তাফসীরুল মানার, মিসর, হি. ১৩৭৩ / খৃ. ১৯৫৪, ১১খ., পৃ. ১৫৫; (৩) ঐ লেখক, আল-ওয়াহ যুউল-মুহাম্মাদী, মিসর হি. ১৩৫৪, পৃ. ৬২; (৪) শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু, রিসালাতুত-তাওহীদ, মিসর, হি. ১৩৬৫, পৃ. ১৪৩; (৫) মুস্তাফা আল-মারাগী, মুকাদ্দামা হায়াতে মুহাম্মাদ লিল-হায়কাল, মিসর, খৃ. ১৯৭৪, ১২শ সংস্করণ, পৃ. ১৩; (৬) সায়্যিদ আবদুল আজীজ জাবীশ, দীনুল ফিতরাতি ওয়াল-হুরারিয়্যাহ, পৃ. ১৪৮; (৭) মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ, মিসর, দারুল-আ'আরিফ, খৃ. ১৯৭৪, ১২শ সংস্করণ, ভূমিকা]।
ড. মুহাম্মদ হুসায়ন হায়কাল তাঁহার "হায়াতে মুহাম্মাদ" গ্রন্থের ভূমিকায় তাহাদের উক্ত অভিমতের সমর্থনে পবিত্র কুরআনের পূর্বোক্ত চারটি আয়াত (১৭: ৯০-৯৩) এবং তৎসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত প্রমাণ হিসাবে পেশ করিয়াছেন: وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ جَاءَتْهُمْ آيَةٌ لِيُؤْمِنُنَّ بِهَا قُلْ إِنَّمَا الْأَيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَمَا يُشْعِرُكُمْ أَنَّهَا إِذَا جَاءَتْ لَا يُؤْمِنُونَ .
"তাহারা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করিয়া বলে যে, তাহাদের নিকট যদি কোন নিদর্শন আসিত তবে অবশ্যই তাহারা ইহাতে ঈমান আনিত। বল, নিদর্শন-তো আল্লাহ্র এখতিয়ারভুক্ত, তাহাদের নিকট নিদর্শন আসলেও তাহারা যে ঈমান আনিবে না ইহা কিভাবে তোমাদের বোধগম্য করান যাইবে" (৬:১০৯)?
ড. হায়কাল আয়াত দুইটি উপস্থাপনের পর লিখিয়াছেন, "বস্তুত পবিত্র কুরআন ও উহার সহিত সাযুজ্যপূর্ণ হাদীছসমূহ কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য মু'জিযার ব্যাপারে অনেকটা নীরব বলা চলে। এই ক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, এমতাবস্থায় পূর্ববর্তীদের হইতে শুরু করিয়া বর্তমান যুগের মুসলমানগণ পর্যন্ত সকলেই পবিত্র কুরআন ছাড়া অন্যান্য মু'জিযার ব্যাপারে এতটা সোচ্চার কেন? এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হইতে পারে। তাহা এই যে, মুসলমানগণ পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের বিভিন্ন মু'জিযার ঘটনা ও কাহিনী দেখিতে পাইয়াছে। ইহাতে তাহারা প্রভাবিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা মনে করিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্যও মু'জিযা হওয়া অত্যাবশ্যক। তাহাদের ধারণায় জড়ো অলৌকিক ঘটনা ছাড়া বিশ্বাস-ই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে না। তাহারা অলৌকিক ঘটনাবলীর ব্যাপারে বর্ণনাগুলিকে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য মনে করিয়া বসিয়াছে; অথচ এই সমস্ত বর্ণনা যে পবিত্র কুরআন সমর্থিত নহে, এই দিকটির প্রতি তাহারা কোন প্রকার গুরুত্বারোপই করেন নাই। তাহারা ধারণা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযার প্রাচুর্য তাঁহার রিসালাতের প্রতি মানুষের ঈমান ও বিশ্বাসকেই শক্তিশালী ও বৃদ্ধির কারণ হইবে। অথচ পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাদৃশ্য", "ভিন্নধর্মী বিষয়কে একত্রিকরণ বৈ আর কিছু নহে” (হায়াতে মুহাম্মাদ, ভূমিকা)।
"পবিত্র কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল না" এই দাবির সমর্থনে ড. হায়কাল কুরআনের যেই দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন, উহা দ্বারা তাহার দাবি কোন ভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ, সকল নির্ভরযোগ্য তাফসীর ও হাদীছে উক্ত আয়াত দুইটির যেই শানে নুযূল, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা বর্ণিত হইয়াছে, উহাতে তাহার দাবির সমর্থন নাই বরং আয়াত দুইটির মর্ম এই যে, ইহাতে মক্কার মুশরিকদের কূট-উদ্দেশ্য তুলিয়া ধরা হইয়াছে।
"পবিত্র কুরআনের বাহিরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আর কোন মু'জিযা নাই", ইহাতে এমন উক্তি করা হয় নাই। আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার তাফসীরুল কুরআনিল আযীম গ্রন্থে প্রথমোক্ত আয়াতটির পটভূমি বর্ণনা প্রসংগে হযরত ইব্ন আব্বাস (রা)-এর সূত্রে সহীহ হাদীছ রিওয়ায়াত-করিয়াছেন যে, একদিন মক্কার মুশরিক সর্দারগণ বসিয়া খোশগল্প করিতেছিল। তাহারা এক লোক দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে ডাকিয়া পাঠাইল। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে হাযির হইলে তাহারা তাঁহাকে উপরের আয়াতে উল্লিখিত প্রশ্নগুলি করিল। এই সমস্ত প্রশ্নের পশ্চাতে তাহাদের কোন সদ্দেশ্য ছিল না। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের দাবিগুলি বাস্তবায়িত করিয়া দেখাইলেও তাহারা ঈমান আনয়ন করিত না, বরং আরও হাজারও মু'জিযা দাবি করিয়া বসিত। আর তাহাদের দেখাদেখি অন্যরাও এই ধরনের দাবি করিতে আরম্ভ করিত। ফলে আল্লাহর নবীকে ইসলাম প্রচারের মহান ব্রতকে বাদ দিয়া তাহাদের এই সমস্ত গোঁয়ার্তুমিমূলক প্রশ্নের উত্তরেও দাবি-দাওয়া পূরণের কাজ করিয়াই বেড়াইতে হইত। তাই আল্লাহ্র রাসূল (স) মুশরিকদের এই সমস্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্নের কোন গুরুত্ব দেন নাই (তাফসীর ইবন কাছীর, ৩খ., পৃ. ৬০-৬১)।
পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতটির পটভূমিও এমন একটি ঘটনা। মক্কার মুশরিকরা শপথ পূর্বক রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিল, আপনি আমাদের প্রত্যাশিত মু'জিযার অংশবিশেষ বাস্তবায়িত করিয়া দেখাইলে আমরা ঈমান আনয়ন করিব। বস্তুত তাহাদের এই শপথ ছিল মিথ্যা, অসার। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের এই মিথ্যা শপথের পর্দা উন্মোচনের লক্ষ্যে উক্ত আয়াতটি নাযিল করেন এবং বলেন, একটি মু'জিযা প্রকাশের পর আরেকটি, তৎপর আরও একটি, এইভাবে মু'জিযা পর মু'জিযা প্রকাশের মাধ্যমে কোন শুভ ফল হইতে পারে না; বরং সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মধ্যে পাথক্য নির্ণয় করার মত একটি মু'জিযাই যথেষ্ট। বারংবার অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনের দাবি নিরর্থক বৈ কিছু নহে (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ১৭৪)।
মোটকথা, উক্ত ভাষ্য দুইটিতে এই কথা বুঝানো হয় নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কুরআনের বাহিরে কোন মু'জিযা নাই; বরং উহাতে এই কথা বুঝানো হইয়াছে যে, সত্য প্রমাণের জন্য বারংবার জাহেরী মু'জিযা তলব ও উহা প্রদর্শনের মধ্যে কোন ফায়দা নাই। হঠকারী ও গোঁয়ার্তুমিমুক্ত অন্তর লইয়া একটি মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিলেই সত্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
পূর্বোল্লিখিত বক্তব্যের বিপরীতে ড. হায়কাল যুক্তি পেশ করিয়াছেন যে, "কুরআনের বাহিরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা আছে" মানিয়া লইলে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সহিত মুহাম্মাদ (স)-এর সাদৃশ্য ভিন্নধর্মী বিষয়কে একত্রকরণ অপরিহার্য হইয়া পড়ে। তাহার এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ মুহাম্মদ (স) সকল নবী-রাসূলের নেতা এবং সর্বশেষ নবী ও রাসূল ছিলেন। কিন্তু তাই বলিয়া অন্য নবী-রাসূলগণের সহিত তাঁহার কোন সাদৃশ্য ও মিল থাকিবে না, এমন নহে। যেমন আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে বলিয়াছেন :
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ
“মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র, তাঁহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছেন। সুতরাং যদি তিনি মারা যান অথবা নিহত হন, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিবে” (৩ : ১৪৪)?
অনুরূপ অসংখ্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের নানাবিধ অবস্থাকে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের অবস্থার সাথে তুলনা করা হইয়াছে এবং উহা হইতে উপদেশ ও দিকনির্দেশনা গ্রহণের জন্য বলা হইয়াছে (দ্র. ৬ : ১০; ৩৩, ৩৪, ৪২)। উপরন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلِ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ .
“আমার এবং অন্যান্য রাসূলের উদাহরণ এইরূপ যেমন একটি সুরম্য অট্টালিকা নির্মিত হইল। বহু লোক সমবেত হইয়া ইহার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দর্শন করিতে লাগিল, তাহারা সকলেই বাহবা বলিয়া প্রশংসা করিতে লাগিল। কিন্তু ঐ সুরম্য অট্টালিকার এক কোণে একটি ইষ্টকের স্থান শূণ্য দেখিয়া তাহারা বলিতে লাগিল, আহা! যদি এই শূণ্য স্থানটি পূর্ণ হইত তবে কতইনা সুন্দর হইত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, অনন্তর আমিই সেই (শূন্যস্থান পূরণকারী) ইষ্টক; আর আমিই সর্বশেষ নবী” (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৫০; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৮)।
সুতরাং অন্যান্য নবী-রাসূলগণের যাহেরী ও জড়ো মু'জিযা ছিল বলিয়া অনুরূপ মু'জিযা তাঁহার থাকিতে পারিবে না, ইহা কোন যুক্তিসঙ্গত কথা নহে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনায় অতীতে কিছু কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটিয়াছে, এই কথা অস্বীকার করা যায় না। তবে এই কথাও স্বতঃসিদ্ধ যে, অতীতের বিভিন্ন যুগের মুহাদ্দিসীন ও হাদীছ বিশেষজ্ঞগণ নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবন-চরিত বিষয়ক বর্ণনাজিকে সেই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি হইতে মুক্ত করিবার নিরলস চেষ্টা চালাইয়াছেন এবং এই ক্ষেত্রে তাঁহারা অভাবিত সাফল্য অর্জন করিয়াছেন। তাঁহারা রিওয়ায়াতসমূহের শুদ্ধ-অশুদ্ধ পার্থক্যকরণে সক্ষম হইয়াছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের অলৌকিক ঘটনাবলী সম্পর্কিত বিশুদ্ধ হাদীছ ও রিওয়ায়াতসমূহ গ্রহণ করিতে এখন আর আপত্তি করিবার সঙ্গত কোন কারণ নাই।
কিন্তু ড. হায়কাল তাঁহার "হায়াতে মুহাম্মাদ" গ্রন্থের ভূমিকায় এই সমস্ত হাদীছ ও বিওয়ায়াতসমূহকে শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্বিশেষে এক দৃষ্টিতে দেখিয়াছেন। তিনি লিখেন: “পবিত্র কুরআনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর একক মু'জিযা।" তৎপর তিনি লিখিয়াছেন, "যদি রিসালাত প্রমাণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা থাকিত তবে তাহা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হইল না কেন?" এই পর্যন্ত বলিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, আরও একটু অগ্রসর হইয়া তিনি মু'জিযাকে যুক্তি-বুদ্ধির নিরিখে বিচার করিতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন, "আজও যদি কোন অমুসলিম সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করে এবং মু'জিয়ার ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ছাড়া অন্য কোন কিছু স্বীকার না করে, তাহা হইলে এই জন্য তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা যাইবে না। ইহাতে তাহাদের ধর্মবিশ্বাস অসম্পূর্ণ হইবে না। কেননা সে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছে। তাহার এই অধিকার রহিয়াছে যে, সে পবিত্র কুরআনের আলোকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য মু'জিযা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিন্তা-গবেষণা করিতে পারিবে। অতঃপর যদি অকাট্য প্রমাণ দ্বারা কোন কিছু সাব্যস্ত হয়, তাহা বিনা দ্বিধায় মানিয়া লইবে।"
ডঃ হায়কালের এই অভিমতও গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ যাহা অস্বাভাবিক ও যাহা যুক্তি-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে, তাহাই তো মু'জিযা। সুতরাং যুক্তি-বুদ্ধির নিরিখে কিরূপে কোন নবী ও রাসূলের অলৌকিক কর্মকীর্তির বিশুদ্ধতা মূল্যায়ন করা যাইবে?
তিনি প্রশ্ন তুলিয়াছেন যে, কুরআন ছাড়া অন্য কোন মু'জিযা রাসূলুল্লাহ (স)-এর থাকিলে তাহা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হইল না কেন? অথচ কুরআনের সাধারণ পাঠক মাত্রই জানেন, কুরআনে মাত্র এক-দুইটি নহে, বরং রাসূলুল্লাহ (স)-এর একাধিক মু'জিযার উল্লেখ রহিয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে কয়েকটির উল্লেখ করিতেছি।
(এক) রাসূলুল্লাহ (স)-এর মি'রাজে গমন তাঁহার জীবনের একটি ঐতিহাসিক সুবিখ্যাত মু'জিযা। পবিত্র কুরআনে মি'রাজ সম্পর্কে পরিষ্কার আলোচনা হইয়াছে। এমনকি উহার একটি সূরার নামকরণ হইয়াছে-'ইসরা' তথা মি'রাজ নামে। এই সূরাতুল ইসরার সূচনাই হইয়াছে এইভাবে:
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ .
"পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁহার বান্দাকে রজনী যোগে ভ্রমণ করাইয়াছিলেন মসজিদুল হারাম হইতে মসজিদুল আকসায়, যাহার পরিবেশ আমি করিয়াছিলাম বরকতময়, তাহাকে আমার নিদর্শন দেখাইবার জন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বদ্রষ্টা" (১৭৪১)।
(দুই) রাসূলুল্লাহ (স)-এর হিজরতও ছিল তাঁহার জীবনের একটি অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনা। হিজরত মাত্র একটি মু'জিযাই নহে, বরং ইহা ছিল একাধিক মু'জিযার ধারক ও সংঘটন স্থল। রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন পার্থিব সহায়-সম্বলহীন। অপরদিকে কুরায়শ কাফিররা ছিল অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত ধনে-জনে বলিয়ান। তাহারা তাঁহাকে হত্যার পরিকল্পনা করিয়াছিল। প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন করিয়া দুর্ধর্ষ বীর নাঙ্গা তরবারি লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার দৃঢ় উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া তাঁহার গৃহের চতুর্দিকে অবস্থান করিতেছিল। আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের কবল হইতে তাঁহাকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করিলেন। পবিত্র কুরআনে সেই ভয়াল ষড়যন্ত্রের দৃশ্য এইভাবে চিত্রিত হইয়াছে শব্দের গাঁথুনীতে :
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُشْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمُكَرِيْنَ .
"স্মরণ কর, কাফিররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করিবার জন্য, হত্যা করিবার জন্য অথবা নির্বাসিত করিবার জন্য এবং তাহারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন। আর আল্লাহ্ই কৌশলীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ” (৮:৩০)।
কুরআনের অপর একটি সূরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর হিজরতের অলৌকিক ঘটনাবলী এইভাবে বিবৃত হইয়াছে :
إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الغارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .
"যদি তোমরা তাহাকে সাহায্য না কর তবে স্মরণ কর, আল্লাহ তাহাকে সাহায্য করিয়াছিলেন যখন কাফিররা তাহাকে বহিষ্কার করিয়াছিল এবং সে ছিল দুইজনের একজন, যখন তাহারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, সে তখন তাহার সংগীকে বলিয়াছিল, বিষণ্ণ হইও না। আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাহার উপর তাঁহার প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাহাকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা যাহা তোমরা দেখ নাই। তিনি কাফিরদের বাক্য হেয় করেন এবং আল্লাহর বাক্যই সর্বোপরি। আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়” (৯:৪০)।
(তিন) অনুরূপ বদর যুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানগণকে অলৌকিকভাবে বিজয় দান করিয়াছিলেন, বদরে তিনি তাঁহার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া আরও অলৌকিক ঘটনা বদরে সংঘটিত হইয়াছে, যাহার প্রতিটির বর্ণনা কুরআনে রহিয়াছে। ফেরেশতা বাহিনীর মাধ্যমে যুদ্ধের ফলাফল মুসলমানদের অনুকূলে আনয়নের মু'জিযা এইভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে:
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنَّى مُمِدُّكُمْ بِأَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُرْدِفِينَ وَمَا جَعَلَهُ اللهُ إِلَّا بُشْرَى وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُمْ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.
"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলে, তিনি উহা কবুল করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন, আমি তোমাদেরকে সাহায্য করিব এক সহস্র ফেরেশতা দ্বারা যাহারা একের পর এক আসিবে। আল্লাহ ইহা করেন কেবল শুভ সংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এই উদ্দেশ্যে যাহাতে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট হইতেই আসে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৮:৯-১০)।
(চার) এমনিভাবে বদর প্রান্তরে মুসলমানদের কল্যাণে অসময়ে বৃষ্টি বর্ষণের মু'জিযা কুরআনে বিবৃত হইয়াছে:
وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لَيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَنِ وَلِيُرْبِطَ عَلَى قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْأَقْدَامَ .
“এবং আকাশ হইতে তোমাদের উপর বারি বর্ষণ করেন, উহা দ্বারা তোমাদের পবিত্র করার জন্য, তোমাদের হইতে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসারণের জন্য, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করিবার জন্য এবং তোমাদের স্থির রাখিবার জন্য" (৮:১১)।
(পাঁচ) অনুরূপ বদর প্রান্তরে কাফিরদের চক্ষে মুসলমানদের সংখ্যা কম দেখানো হইয়াছে যাহাতে তাহারা অধিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অপর দিকে মুসলমানদের চক্ষে কাফিরদেরকে কম দেখানো হইয়াছে যাহাতে মুসলমানগণ ঘাবড়াইয়া না যায়। ইহা ছিল একটি মু'জিযা ও অসাধারণ ব্যাপার। কুরআনে উদ্ধৃত হইতেছে:
قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ التَقَتَا فِئَةٌ تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأُخْرَى كَافِرَةٌ يُرَونَهُمْ مثْلَيْهِمْ رَأَى الْعَيْنِ وَاللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصْرِهِ مَنْ يَشَاءُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِأُولِي الْأَبْصَارِ
"দুইটি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্য নির্দশন রহিয়াছে। একদল আল্লাহর পথে সংগ্রাম করিতেছিল, অন্যদল কাফির ছিল। উহারা তাহাদেরকে চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখিতেছিল। আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় ইহাতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকের জন্য শিক্ষা রহিয়াছে” (৩:১৩)।
বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. মওলানা তফাজ্জল হোছাইন রচিত হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স)ঃ মু'জিযার স্বরূপ ও মু'জিযা। দৃষ্টান্তস্বরূপ মাত্র কয়েকটি মু'জিযা এখানে উদ্বৃত করা হইল। ইহা ছাড়াও আরও বহু মু'জিযার ঘটনা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রহিয়াছে। সুতরাং ড. হায়কালের এই দাবি যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা বলিতে শুধু পবিত্র কুরআনকে বুঝায় এবং ইহা ছাড়া তাঁহার কোন মু'জিযা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয় নাই, সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন।
শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ক্ষেত্রে ঠিক একই অবস্থা ঘটিয়াছিল। কাফির কুরায়শ সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মু'জিযা তলব করিয়াছিল এবং মু'জিযার বিকাশ প্রত্যক্ষ করিবার পরই তাঁহাকে যাদুকর বা কাহিনীকার বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল (দ্র. আল-কুরআন ৭৪: ২৪; ৫২: ২৯, ৩০; ৫৪ : ১-২; ৬৯ : ৪০, ৪৮)।
উপরে উল্লিখিত আলোচনার দ্বারা একটি সংশয়ের অবসানও হইয়া গেল যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লক্ষ্য করা যায় যে, মক্কার কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বারবার মু'জিযা তলব করিয়াছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সেই দাবি অনুসারে মু'জিযা প্রদর্শন করেন নাই কেন?
বস্তুত তাহাদেরকে অনেক জাহেরী মু'জিযা প্রদর্শন করান হইয়াছিল, কিন্তু জাহেরী মু'জিযা দ্বারা কাফিরদের মন কখনও শান্ত হয় না এবং ইহাতে তাহারা কখনও হিদায়াত লাভ করিতে পারে না। কারণ এই সমস্ত মু'জিযা তলবের পশ্চাতে তাহাদের অন্তরের কপটতা, হিংসা, দ্বেষ ও গোঁয়াতুমি কার্যকর থাকে। এই অবস্থায় তাহাদের প্রার্থিত মু'জিযা সংঘটনে তাহাদের বিশেষ কোন ফায়দা হইত না, বরং ইহা তাহাদের অন্তরের শঠতাকে আরও বৃদ্ধি করিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ "এবং যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, ইহা তাহাদের কলুষের সহিত আরও কলুষ যুক্ত করে" (৯: ১২৫; আরও দ্র. ২: ১০; ৭১: ২৪, ২৮; ১৭: ৮২; ৫: ৬৪, ৬৮)।
তাই পবিত্র কুরআনে জাহেরী মু'জিযা তলবের কারণে কাফিরদেরকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে এবং বাতেনী মু'জিযার প্রতি তাহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইতেছে:
وَقَالُوا لَوْ لَا يَأْتِينَا بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّهِ أَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِي الصُّحُفِ الْأُولَى "উহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ যাহা আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে" (২০: ১৩৩)?
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ أَيَتْ مِنْ رَبِّهِ قُلْ إِنَّمَا الْآيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ "উহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহার নিকট নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? বল, নিদর্শন আল্লাহর এখতিয়ারে; আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। ইহা কি উহাদের জন্য যথেষ্ট নহে যে, আমি তোমার নিকট কুরআন নাযিল করিয়াছি, যাহা উহাদের নিকট পাঠ করা হয়? ইহাতে অবশ্যই মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ এবং উপদেশ রহিয়াছে" (২৯: ৫০-৫১)।
এই কারণেই পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কাফিরদের জাহেরী মু'জিযা তলবের প্রতিউত্তরে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কেবল এতটুকু বলিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, "আমি তো কেবল একজন মানুষ এবং পয়গাম্বর"। ইরশাদ হইয়াছে :
وَ قَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا ، أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَرَ خِلْلَهَا تَفْجِيرًا ، أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالمَلْئِكَةِ قَبِيلاً ، أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرَقِيَّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتبًا نَّقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولاً
“এবং উহারা বলে, আমরা কখনও তোমাতে ঈমান আনিব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হইতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করিবে অথবা তোমার খেজুরের বা আংগুরের এক বাগান হইবে, যাহার ফাঁকে-ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করিবে নদী-নালা। অথবা তুমি যেমন বলিয়া থাক, তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া আমাদের উপর ফেলিবে অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করিবে অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে। কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি কিতাব নাযিল না করিবে, যাহা আমরা পাঠ করিব। বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭:৯০-৯৩)।
মু'জিযা সম্পর্কে বিতর্ক
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা জাহেরী ও বাতেনী উভয় প্রকার মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন। ইহা প্রত্যেক নবীর বেলায়ই ঘটিয়াছে। কিন্তু এই জাহেরী ও বাতেনী মু'জিযার পার্থক্য এবং উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহের গূঢ়ার্থ অনুধাবনে ব্যর্থতার কারণে কোন কোন লোক মনে করিয়া বসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদেরকে কোন জাহেরী মু'জিযা দেখান নাই। যদি তিনি জাহেরী মু'জিযা দেখাইতেন তাহা হইলে বারংবার তাহারা কেন মু'জিযা তলব করিয়াছিল? এমনকি কোন কোন অবিবেচক ইসলামী পণ্ডিত এই কথাও বলিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর কুরআন ভিন্ন অন্য কোন মু'জিযাই ছিল না"। এই কারণে বর্তমান কালে নূতন বিতর্কের সূচনা হইয়াছে যে, আসলে কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল কি না?
মিসরের কয়েকজন মুসলিম পণ্ডিত, যথা উস্তাদ মুহাম্মাদ ফারীদ ওয়াজদী, শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু, সায়্যিদ আবদুল আযীয জাবীশ, আল-মানার সাময়িকীর সম্পাদক সায়্যিদ রাশীদ রিদা এবং মিসরের আল-আযহার রেক্টর মুহাম্মদ মুস্তাফা আল-মারাগী এবং প্রখ্যাত লেখক শায়খ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল প্রমুখ আধুনিক মুসলিম পণ্ডিতদের অভিমত এই যে, "পবিত্র কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল না" [দ্র. (১) মুহাম্মাদ ফারীদ ওয়াজদী, "আল-মাদীনা ওয়াল-ইসলাম, মিসর, হি. ১৩৫৩ / খৃ. ১৯৩৩, পৃ. ৭১-৭২; (২) মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা, তাফসীরুল মানার, মিসর, হি. ১৩৭৩ / খৃ. ১৯৫৪, ১১খ., পৃ. ১৫৫; (৩) ঐ লেখক, আল-ওয়াহ যুউল-মুহাম্মাদী, মিসর হি. ১৩৫৪, পৃ. ৬২; (৪) শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু, রিসালাতুত-তাওহীদ, মিসর, হি. ১৩৬৫, পৃ. ১৪৩; (৫) মুস্তাফা আল-মারাগী, মুকাদ্দামা হায়াতে মুহাম্মাদ লিল-হায়কাল, মিসর, খৃ. ১৯৭৪, ১২শ সংস্করণ, পৃ. ১৩; (৬) সায়্যিদ আবদুল আজীজ জাবীশ, দীনুল ফিতরাতি ওয়াল-হুরারিয়্যাহ, পৃ. ১৪৮; (৭) মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ, মিসর, দারুল-আ'আরিফ, খৃ. ১৯৭৪, ১২শ সংস্করণ, ভূমিকা]।
ড. মুহাম্মদ হুসায়ন হায়কাল তাঁহার "হায়াতে মুহাম্মাদ" গ্রন্থের ভূমিকায় তাহাদের উক্ত অভিমতের সমর্থনে পবিত্র কুরআনের পূর্বোক্ত চারটি আয়াত (১৭: ৯০-৯৩) এবং তৎসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত প্রমাণ হিসাবে পেশ করিয়াছেন: وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ جَاءَتْهُمْ آيَةٌ لِيُؤْمِنُنَّ بِهَا قُلْ إِنَّمَا الْأَيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَمَا يُشْعِرُكُمْ أَنَّهَا إِذَا جَاءَتْ لَا يُؤْمِنُونَ .
"তাহারা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করিয়া বলে যে, তাহাদের নিকট যদি কোন নিদর্শন আসিত তবে অবশ্যই তাহারা ইহাতে ঈমান আনিত। বল, নিদর্শন-তো আল্লাহ্র এখতিয়ারভুক্ত, তাহাদের নিকট নিদর্শন আসলেও তাহারা যে ঈমান আনিবে না ইহা কিভাবে তোমাদের বোধগম্য করান যাইবে" (৬:১০৯)?
ড. হায়কাল আয়াত দুইটি উপস্থাপনের পর লিখিয়াছেন, "বস্তুত পবিত্র কুরআন ও উহার সহিত সাযুজ্যপূর্ণ হাদীছসমূহ কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য মু'জিযার ব্যাপারে অনেকটা নীরব বলা চলে। এই ক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, এমতাবস্থায় পূর্ববর্তীদের হইতে শুরু করিয়া বর্তমান যুগের মুসলমানগণ পর্যন্ত সকলেই পবিত্র কুরআন ছাড়া অন্যান্য মু'জিযার ব্যাপারে এতটা সোচ্চার কেন? এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হইতে পারে। তাহা এই যে, মুসলমানগণ পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের বিভিন্ন মু'জিযার ঘটনা ও কাহিনী দেখিতে পাইয়াছে। ইহাতে তাহারা প্রভাবিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা মনে করিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্যও মু'জিযা হওয়া অত্যাবশ্যক। তাহাদের ধারণায় জড়ো অলৌকিক ঘটনা ছাড়া বিশ্বাস-ই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে না। তাহারা অলৌকিক ঘটনাবলীর ব্যাপারে বর্ণনাগুলিকে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য মনে করিয়া বসিয়াছে; অথচ এই সমস্ত বর্ণনা যে পবিত্র কুরআন সমর্থিত নহে, এই দিকটির প্রতি তাহারা কোন প্রকার গুরুত্বারোপই করেন নাই। তাহারা ধারণা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযার প্রাচুর্য তাঁহার রিসালাতের প্রতি মানুষের ঈমান ও বিশ্বাসকেই শক্তিশালী ও বৃদ্ধির কারণ হইবে। অথচ পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাদৃশ্য", "ভিন্নধর্মী বিষয়কে একত্রিকরণ বৈ আর কিছু নহে” (হায়াতে মুহাম্মাদ, ভূমিকা)।
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা জাহেরী ও বাতেনী উভয় প্রকার মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন। ইহা প্রত্যেক নবীর বেলায়ই ঘটিয়াছে। কিন্তু এই জাহেরী ও বাতেনী মু'জিযার পার্থক্য এবং উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহের গূঢ়ার্থ অনুধাবনে ব্যর্থতার কারণে কোন কোন লোক মনে করিয়া বসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদেরকে কোন জাহেরী মু'জিযা দেখান নাই। যদি তিনি জাহেরী মু'জিযা দেখাইতেন তাহা হইলে বারংবার তাহারা কেন মু'জিযা তলব করিয়াছিল? এমনকি কোন কোন অবিবেচক ইসলামী পণ্ডিত এই কথাও বলিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর কুরআন ভিন্ন অন্য কোন মু'জিযাই ছিল না"। এই কারণে বর্তমান কালে নূতন বিতর্কের সূচনা হইয়াছে যে, আসলে কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল কি না?
মিসরের কয়েকজন মুসলিম পণ্ডিত, যথা উস্তাদ মুহাম্মাদ ফারীদ ওয়াজদী, শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু, সায়্যিদ আবদুল আযীয জাবীশ, আল-মানার সাময়িকীর সম্পাদক সায়্যিদ রাশীদ রিদা এবং মিসরের আল-আযহার রেক্টর মুহাম্মদ মুস্তাফা আল-মারাগী এবং প্রখ্যাত লেখক শায়খ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল প্রমুখ আধুনিক মুসলিম পণ্ডিতদের অভিমত এই যে, "পবিত্র কুরআনের বাহিরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্য কোন মু'জিযা ছিল না" [দ্র. (১) মুহাম্মাদ ফারীদ ওয়াজদী, "আল-মাদীনা ওয়াল-ইসলাম, মিসর, হি. ১৩৫৩ / খৃ. ১৯৩৩, পৃ. ৭১-৭২; (২) মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা, তাফসীরুল মানার, মিসর, হি. ১৩৭৩ / খৃ. ১৯৫৪, ১১খ., পৃ. ১৫৫; (৩) ঐ লেখক, আল-ওয়াহ যুউল-মুহাম্মাদী, মিসর হি. ১৩৫৪, পৃ. ৬২; (৪) শায়খ মুহাম্মাদ আবদুহু, রিসালাতুত-তাওহীদ, মিসর, হি. ১৩৬৫, পৃ. ১৪৩; (৫) মুস্তাফা আল-মারাগী, মুকাদ্দামা হায়াতে মুহাম্মাদ লিল-হায়কাল, মিসর, খৃ. ১৯৭৪, ১২শ সংস্করণ, পৃ. ১৩; (৬) সায়্যিদ আবদুল আজীজ জাবীশ, দীনুল ফিতরাতি ওয়াল-হুরারিয়্যাহ, পৃ. ১৪৮; (৭) মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ, মিসর, দারুল-আ'আরিফ, খৃ. ১৯৭৪, ১২শ সংস্করণ, ভূমিকা]।
ড. মুহাম্মদ হুসায়ন হায়কাল তাঁহার "হায়াতে মুহাম্মাদ" গ্রন্থের ভূমিকায় তাহাদের উক্ত অভিমতের সমর্থনে পবিত্র কুরআনের পূর্বোক্ত চারটি আয়াত (১৭: ৯০-৯৩) এবং তৎসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াত প্রমাণ হিসাবে পেশ করিয়াছেন: وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ جَاءَتْهُمْ آيَةٌ لِيُؤْمِنُنَّ بِهَا قُلْ إِنَّمَا الْأَيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَمَا يُشْعِرُكُمْ أَنَّهَا إِذَا جَاءَتْ لَا يُؤْمِنُونَ .
"তাহারা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করিয়া বলে যে, তাহাদের নিকট যদি কোন নিদর্শন আসিত তবে অবশ্যই তাহারা ইহাতে ঈমান আনিত। বল, নিদর্শন-তো আল্লাহ্র এখতিয়ারভুক্ত, তাহাদের নিকট নিদর্শন আসলেও তাহারা যে ঈমান আনিবে না ইহা কিভাবে তোমাদের বোধগম্য করান যাইবে" (৬:১০৯)?
ড. হায়কাল আয়াত দুইটি উপস্থাপনের পর লিখিয়াছেন, "বস্তুত পবিত্র কুরআন ও উহার সহিত সাযুজ্যপূর্ণ হাদীছসমূহ কুরআন ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যান্য মু'জিযার ব্যাপারে অনেকটা নীরব বলা চলে। এই ক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, এমতাবস্থায় পূর্ববর্তীদের হইতে শুরু করিয়া বর্তমান যুগের মুসলমানগণ পর্যন্ত সকলেই পবিত্র কুরআন ছাড়া অন্যান্য মু'জিযার ব্যাপারে এতটা সোচ্চার কেন? এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হইতে পারে। তাহা এই যে, মুসলমানগণ পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের বিভিন্ন মু'জিযার ঘটনা ও কাহিনী দেখিতে পাইয়াছে। ইহাতে তাহারা প্রভাবিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা মনে করিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য মু'জিযা হওয়া অত্যাবশ্যক। তাহাদের ধারণায় জড়ো অলৌকিক ঘটনা ছাড়া বিশ্বাস-ই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে না। তাহারা অলৌকিক ঘটনাবলীর ব্যাপারে বর্ণনাগুলিকে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য মনে করিয়া বসিয়াছে; অথচ এই সমস্ত বর্ণনা যে পবিত্র কুরআন সমর্থিত নহে, এই দিকটির প্রতি তাহারা কোন প্রকার গুরুত্বারোপই করেন নাই। তাহারা ধারণা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযার প্রাচুর্য তাঁহার রিসালাতের প্রতি মানুষের ঈমান ও বিশ্বাসকেই শক্তিশালী ও বৃদ্ধির কারণ হইবে। অথচ পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাদৃশ্য", "ভিন্নধর্মী বিষয়কে একত্রিকরণ বৈ আর কিছু নহে” (হায়াতে মুহাম্মাদ, ভূমিকা)।