📄 শব্দ পরিচিতি
মু'জিযা )معجزة( মূল : عجز - ع - ج - ز আজ, ضَرَبَ - يَضْرِبُ - ضربًا - এর ওজনে। যথা عجز يعجز عجزاً -এর যেমন ব্যবহার রহিয়াছে, তেমনি বাব-ই ইফ'আল-এর ওজনেও উহার ব্যবহার হইয়া থাকে। মু'জিযা )معجزة( শব্দটি উক্ত মূল হইতে উদ্ভূত একটি কর্তৃপদ )اسم فاعل( জাতীয় শব্দ। আসল রূপ )معجزة( মু'জিযা উহার (ۃ) বর্ণটি মুবালাগা )مبالغة( আধিক্য জ্ঞাপক অর্থের জন্য সংযুক্ত হইয়াছে। উহা স্ত্রীবাচক )تاء تانیث( তা (ۃ) নহে। তবে কাহারও কাহারও মতে معجزة শব্দটি উহ্য বিশেষ্য )موصوف( শব্দের বিশেষণ )صفت(। আসল রূপ اية معجزة )আয়াতুন মু'জিযাতুন), অলৌকিক নিদর্শন (দ্র. ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১; আর-রাগিব ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল- কু'আন, শিরো.)।
সাধারণত কোন কাজ সম্পাদনে অক্ষম ও অসমর্থ হওয়ার অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। ইহা القدرة )শক্তি)-এর বিপরীত। এই অর্থে শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে একাধিক স্থানে পাওয়া যায়। যথাঃ
قَالَ يُوَيْلَتِي أَعَجَرْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِي سَوْءَةَ أَخِي فَأَصْبَحَ من الندمين
"সে বলিল, হায়! আমি কি এই কাকের মতও হইতে অক্ষম হইলাম, যাহাতে আমার ভ্রাতার শবদেহ গোপন করিতে পারি? অতঃপর সে অনুতপ্ত হইল" (৫: ৩১)।
এই অর্থে শব্দটির ব্যবহার আরও দেখুন আল-কুরআন ৬ : ১৩৪; ৮ : ৫৯; ৯ : ২-৩; ১০ : ৫৩; ১১ : ২০, ৩৩; ১২ : ৩১; ১৬ : ৪৬; ২২ : ৫১; ২৪ : ৫৭; ২৯ : ২২; ৩৮ : ৩৫ : ৪৪; ৩৯ : ৫১; ৪৬ : ৩২; ৭২ : ১২।
এই অর্থের সূত্র ধরিয়াই শব্দটি পবিত্র কুরআনে বার্ধক্য বুঝাইবার জন্যও ব্যবহৃত হইয়াছে। যথা :
فَأَقْبَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي صَرَّةٍ فَصَكَّتْ وَجْهَهَا وَقَالَتْ عَجُوزٌ عَقِيمٌ
"তখন তাহার স্ত্রী চীৎকার করিতে করিতে সম্মুখে আসিল এবং গাল চাপড়াইয়া বলিল, এই বৃদ্ধা বন্ধ্যার সন্তান হইবে” (৫১ : ২৯; আরও দ্র. ১১ঃ ৭২)! মোটকথা মু'জিযা (معجزة) শব্দের আভিধানিক অর্থ "কোন কাজ সম্পাদনে অথবা কোন বিষয় প্রদর্শনে অক্ষম করা, অভিভূত করা” (সূত্র : প্রাগুক্ত)।
মু'জিযা (معجزة) মূল : عجز - ع - ج - ز আজ, ضَرَبَ - يَضْرِبُ - ضربًا - এর ওজনে। যথা عجز يعجز عجزاً -এর যেমন ব্যবহার রহিয়াছে, তেমনি বাব-ই ইফ'আল-এর ওজনেও উহার ব্যবহার হইয়া থাকে। মু'জিযা (معجزة) শব্দটি উক্ত মূল হইতে উদ্ভূত একটি কর্তৃপদ (اسم فاعل) জাতীয় শব্দ। আসল রূপ (معجزة) মু'জিযা উহার (ۃ) বর্ণটি মুবালাগা (مبالغة) আধিক্য জ্ঞাপক অর্থের জন্য সংযুক্ত হইয়াছে। উহা স্ত্রীবাচক (تاء تانیث) তা (ۃ) নহে। তবে কাহারও কাহারও মতে معجزة শব্দটি উহ্য বিশেষ্য (موصوف) শব্দের বিশেষণ (صفت)। আসল রূপ اية معجزة (আয়াতুন মু'জিযাতুন), অলৌকিক নিদর্শন (দ্র. ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১; আর-রাগিব ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল- কু'আন, শিরো.)।
সাধারণত কোন কাজ সম্পাদনে অক্ষম ও অসমর্থ হওয়ার অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। ইহা القدرة (শক্তি)-এর বিপরীত। এই অর্থে শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে একাধিক স্থানে পাওয়া যায়। যথাঃ
قَالَ يُوَيْلَتِي أَعَجَرْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِي سَوْءَةَ أَخِي فَأَصْبَحَ من الندمين
"সে বলিল, হায়! আমি কি এই কাকের মতও হইতে অক্ষম হইলাম, যাহাতে আমার ভ্রাতার শবদেহ গোপন করিতে পারি? অতঃপর সে অনুতপ্ত হইল" (৫: ৩১)।
এই অর্থে শব্দটির ব্যবহার আরও দেখুন আল-কুরআন ৬ : ১৩৪; ৮ : ৫৯; ৯ : ২-৩; ১০ : ৫৩; ১১ : ২০, ৩৩; ১২ : ৩১; ১৬ : ৪৬; ২২ : ৫১; ২৪ : ৫৭; ২৯ : ২২; ৩৮ : ৩৫ : ৪৪; ৩৯ : ৫১; ৪৬ : ৩২; ৭২ : ১২।
এই অর্থের সূত্র ধরিয়াই শব্দটি পবিত্র কুরআনে বার্ধক্য বুঝাইবার জন্যও ব্যবহৃত হইয়াছে। যথা :
فَأَقْبَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي صَرَّةٍ فَصَكَّتْ وَجْهَهَا وَقَالَتْ عَجُوزٌ عَقِيمٌ
"তখন তাহার স্ত্রী চীৎকার করিতে করিতে সম্মুখে আসিল এবং গাল চাপড়াইয়া বলিল, এই বৃদ্ধা বন্ধ্যার সন্তান হইবে" (৫১ : ২৯; আরও দ্র. ১১ঃ ৭২)!
মোটকথা মু'জিযা (معجزة) শব্দের আভিধানিক অর্থ "কোন কাজ সম্পাদনে অথবা কোন বিষয় প্রদর্শনে অক্ষম করা, অভিভূত করা” (সূত্র : প্রাগুক্ত)।
মু'জিযা (معجزة) মূল : عجز - ع - ج - ز আজ, ضَرَبَ - يَضْرِبُ - ضربًا - এর ওজনে। যথা عجز يعجز عجزاً -এর যেমন ব্যবহার রহিয়াছে, তেমনি বাব-ই ইফ'আল-এর ওজনেও উহার ব্যবহার হইয়া থাকে। মু'জিযা (معجزة) শব্দটি উক্ত মূল হইতে উদ্ভূত একটি কর্তৃপদ (اسم فاعل) জাতীয় শব্দ। আসল রূপ (معجزة) মু'জিযা উহার (ۃ) বর্ণটি মুবালাগা (مبالغة) আধিক্য জ্ঞাপক অর্থের জন্য সংযুক্ত হইয়াছে। উহা স্ত্রীবাচক (تاء تانیث) তা (ۃ) নহে। তবে কাহারও কাহারও মতে معجزة শব্দটি উহ্য বিশেষ্য (موصوف) শব্দের বিশেষণ (صفت)। আসল রূপ اية معجزة (আয়াতুন মু'জিযাতুন), অলৌকিক নিদর্শন (দ্র. ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১; আর-রাগিব ইসফাহানী, আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল- কু'আন, শিরো.)।
সাধারণত কোন কাজ সম্পাদনে অক্ষম ও অসমর্থ হওয়ার অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। ইহা القدرة (শক্তি)-এর বিপরীত। এই অর্থে শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে একাধিক স্থানে পাওয়া যায়। যথাঃ
قَالَ يُوَيْلَتِي أَعَجَرْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَذَا الْغُرَابِ فَأُوَارِي سَوْءَةَ أَخِي فَأَصْبَحَ من الندمين
"সে বলিল, হায়! আমি কি এই কাকের মতও হইতে অক্ষম হইলাম, যাহাতে আমার ভ্রাতার শবদেহ গোপন করিতে পারি? অতঃপর সে অনুতপ্ত হইল" (৫: ৩১)।
এই অর্থে শব্দটির ব্যবহার আরও দেখুন আল-কুরআন ৬ : ১৩৪; ৮ : ৫৯; ৯ : ২-৩; ১০ : ৫৩; ১১ : ২০, ৩৩; ১২ : ৩১; ১৬ : ৪৬; ২২ : ৫১; ২৪ : ৫৭; ২৯ : ২২; ৩৮ : ৩৫ : ৪৪; ৩৯ : ৫১; ৪৬ : ৩২; ৭২ : ১২।
এই অর্থের সূত্র ধরিয়া শব্দটি পবিত্র কুরআনে বার্ধক্য বুঝাইবার জন্যও ব্যবহৃত হইয়াছে। যথা :
فَأَقْبَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي صَرَّةٍ فَصَكَّتْ وَجْهَهَا وَقَالَتْ عَجُوزٌ عَقِيمٌ
"তখন তাহার স্ত্রী চীৎকার করিতে করিতে সম্মুখে আসিল এবং গাল চাপড়াইয়া বলিল, এই বৃদ্ধা বন্ধ্যার সন্তান হইবে” (৫১ : ২৯; আরও দ্র. ১১ঃ ৭২)!
মোটকথা মু'জিযা (معجزة) শব্দের আভিধানিক অর্থ "কোন কাজ সম্পাদনে অথবা কোন বিষয় প্রদর্শনে অক্ষম করা, অভিভূত করা” (সূত্র : প্রাগুক্ত)।
📄 মু'জিযার পারিভাষিক সংজ্ঞা
মু'জিয়ার পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনায় বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণের ভাষ্যসমূহে কিছু মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই মতপার্থক্য একান্তই শব্দগত, সবগুলির ভাবার্থ প্রায় এক ও অভিন্ন। নিম্নে মু'জিয়ার কয়েকটি পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করা হইল।
১. আল্লামা ইবন হাজার আস্কালানী লিখিয়াছেন : المعجزة أن يكون المتحدى به مما يعجز عنه البشر في العادة المستحرة .
"রাসূলগণ কর্তৃক সম্পাদিত সেই সকল অলৌকিক বা অসাধারণ কার্যাবলীই মু'জিযা, যাহার প্রতিযোগিতা করিতে সমসাময়িক যুগের মানুষ ব্যর্থ হইয়াছে” (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১)।
২. শায়খ আবু হাফ্স উমার আন্-নাসাফী লিখিয়াছেন : هو امر يظهر خلاف العادة على يد من يدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الايتان بمثله .
"মু'জিযা হইল প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমী কার্য যাহা একজন নবুওয়াতের দাবীদার কর্তৃক প্রকাশ পায়। নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং কার্যটির প্রকৃতি এমন যে, অস্বীকারকারীদের পক্ষে সেইরূপ কার্য সম্পাদন করা অসম্ভব” (শারহুল 'আকাইদিন-নাসাফিয়্যা, পৃ. ১২৪)।
৩. বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ "আল্-মু'জামুল-ওয়াসীত”-এ মু'জিয়ার সংজ্ঞা নিম্নরূপ বিবৃত হইয়াছে : المعجزة امر خارق للعادة يظهره الله على يد نبي تائيدا النبوت .
"মু'জিযা এমন অসাধারণ কার্য, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত করিয়া থাকেন। উদ্দেশ্য নবীর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করা" (আল-মু'জামুল-ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫, শিরো.)।
উপরে উল্লিখিত মু'জিয়ার সংজ্ঞা তিনটির মর্ম প্রায় একই। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, মু'জিযা বলা হয়— (১) যাহা অসাধারণ, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক; (২) যাহা নবী রাসূলগণের দ্বারা প্রকাশ পায়; (৩) তবে উহার সংঘটক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা; (৪) উহা নবী-রাসূলগণের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ; (৫) উহার মধ্যে নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুকাবিলার চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়া হয়। তবে তাহারা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম হয় না।
মু'জিযার উল্লিখিত সংজ্ঞার আলোকে আল-ঈযী আল-মাওয়াকি'ফ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যিনি আল্লাহর নবী তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণ করাই মু'জিয়ার উদ্দেশ্য। তবে যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই মু'জিযা নহে, বরং তাহা মু'জিয়ারূপে স্বীকৃত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য : ১. উহা আল্লাহ্র কার্য হইতে হইবে। ২. প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে হইবে। ৩. অনুরূপ কার্য সম্পাদন অন্যের পক্ষে অসম্ভব হইতে হইবে। ৪. মু'জিযা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হইবে, যিনি নিজেকে নবী বলিয়া দাবি করেন যাহা তাঁহার সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ পায়। ৫. তাঁহার মাধ্যমে প্রকাশিত মু'জিযাটি তাঁহার ঘোষণার সমর্থন জ্ঞাপক হইতে হইবে। ৬. মু'জিযা তাঁহার দাবির পরিপন্থী হইবে না। ৭. মু'জিযা দাবির পরে সংঘটিত হইতে হইবে, পূর্বে নহে।
আল-ঈযীর মতে, মু'জিযা এইভাবে সংঘটিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহার মাধ্যমে উহা ঘটাইয়া থাকেন। ফলে মু'জিযা দর্শকদের মধ্যে নবী-রাসূলের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে (আল-মাওয়াকি'ফ, মু'জিযা অধ্যায়, পৃ. ১৭৫)।
আল্লামা ইব্ন হাজার আস্কালানীর মতেও নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত যে কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ডই মু'জিযা নহে, বরং তিনি এই ক্ষেত্রে দুইটি পরিভাষা স্থির করিয়াছেন। যথা : (১) মু'জিযা এবং (২) 'আলামাতুন-নুবৃওয়াত বা নবুওয়াতের নিদর্শন বা চিহ্ন। যেই সকল অসাধারণ কার্যের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ বিরুদ্ধবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করিয়া থাকেন, কেবল তাহাই মু'জিযা। যেমন তিনি বলিলেন, "যদি আমি এই কার্য করিতে পারি, তবে আমি নবী, অন্যথা আমি মিথ্যাবাদী"। পক্ষান্তরে নবৃওয়াতের 'আলামত ও নিদর্শনের মধ্যে কোন চ্যালেঞ্জ থাকে না, মুকাবিলার আহ্বান থাকে না (ফাতহুল-বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১-৫৮)।
পবিত্র কুরআনে মু'জিযা (معجزة) শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, পারিভাষিক অর্থে নহে। মু'জিযা অর্থ প্রকাশের জন্য পবিত্র কুরআনে আয়াত (آية) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, বহুবচনে আয়াত (آيات) এবং (৫১) আই। ইহার অর্থ কোন বস্তু চিনিবার উপায় বা নিদর্শন। এই চিহ্ন বা নিদর্শন বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। যথা আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার একত্ব প্রমাণের জন্য সমগ্র সৃষ্টি একটি প্রমাণ বা নিদর্শন। এই অর্থে আয়াত-এর ব্যবহার এইরূপ : وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ أَيَتَيْنِ الآية “আর আমি রাত্রি ও দিবসকে করিয়াছি দুইটি নিদর্শন" (১৭-১২; আরও দ্র. ৩০ : ২২-২৫, ৪৬; ১০: ৬; ২ঃ ৭৩; ১৮৭; ৩৪ : ১৯০)।
অনুরূপ নবীগণের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে শব্দটি অসাধারণ কার্য ও অলৌকিক বিষয় বুঝাইবার অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে।
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتب لكل أية . ১২১
"যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে তুমি যদি তাহাদের নিকট সমস্ত দলীলও পেশ কর" (২: ১৪৫ আরও দ্র. ২১১, ২৪৮, ২৫৯; ৩: ৪৯, ৫০; ৫: ১১৪; ৬: ২৫; ১২৪, ৭৪ ৭৩; ১০৬, ১৩২, ১৪৬)।
অবশ্য আয়াত শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে উক্ত দুইটি অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং শব্দটি ইহা ছাড়া অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন উপদেশ ও শিক্ষণীয় অর্থে, যথা আল-কুরআনে আছে : أَن أَيَّةَ مُلک “তাঁহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে,” (২: ২৪৮; ৩ঃ ১৩; ১০: ৯২; ১১ : ১০৩) এবং কুরআনের আয়াত অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যথা আল-কুরআনে আছে : وَلَا تَشْتَرُوا بايتي ثَمَنًا قَلِيلاً "তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না” (২:৪১ অরিও দ্র. ৯৯, ১০৬, ২২১, ২৫২; ৬৪৪, ১২৪; ১৬৪ ১০১; ৩৬৪ ৪৬; ৪৫: ৩১; ৬২: ২; ৮৩:১৩)।
"আয়াতুন" (آية) শব্দটি মু'জিযা (معجزة) শব্দ অপেক্ষা অধিক ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং বলা যায়, পবিত্র কুরআনে 'মু'জিযা' শব্দ ব্যবহৃত না হইয়া বরং "আয়াতুন" শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় নবী-রাসূলগণের মু'জিযা ও তাঁহাদের আলামতে নবুওয়াত উভয়বিধ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। মু'জিযা-এর অর্থ বুঝাইতে পবিত্র কুরআনে আরও একটি শব্দের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। তাহা হইল বুরহান (برهان) শব্দ। ইহার অর্থ অকাট্য এবং সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ। আল- মু'জামুল ওয়াসীতে আছে : البرهان : البينة النبية الفاصلة অর্থাৎ 'সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী প্রমাণ'। যথা পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا أَتْهَا نُودِى مِنْ شَاطئ الوَادَ الْأَيْمَن في البُقْعَة المُبْرَكَة مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يمُوسَى إِنِّي أَنَا اللهُ رَبُّ العَلَمِينَ ، وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه أَنَّهُم كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ
"যখন মুসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্বান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক। আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। তাঁহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস, ভয় করিও না; তুমি-তো নিরাপদ। আর তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পরিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৬: ৩০-৩২)।
সারকথা এই যে, নবৃওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারিগণের হাতে কখনো কখনো মানবিক শক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সাধিত হয়, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনে মানবিক প্রজ্ঞা ও মনীষা অপারগ হইয়া যায়। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর আগুন শীতল হইয়া যাওয়া, হযরত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত জীবিত হওয়া, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর এক রজনীতে পবিত্র কা'বা গৃহ হইতে আল- বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর তথা হইতে সিদরাতুল মুনতাহা, অতঃপর আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য জগত পরিদর্শন করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘটনার মর্মোদঘাটন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি একান্তই অপারগ। আল-কুরআনের ভাষায় এই সমস্ত ঘটনার নাম বুরহান (برهان), বায়ি্যনাত (بینات)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা আয়াত (آیات) অথবা আয়াতুম বায়্যিনাত (آیات بینات)-রূপেও ব্যবহৃত হইয়াছে। মুহাদ্দিছগণ এই সমস্ত ঘটনাকে দালাইলুন নূবৃওয়াত (دلائل النبوة) বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। আর 'আকাইদ বিশেষজ্ঞ (মুতাকাল্লিমূন) এবং দার্শনিকদের পরিভাষায় উহাকে মু'জিযাত (معجزات) বলা হয়।
মু'জিয়ার পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনায় বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণের ভাষ্যসমূহে কিছু মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই মতপার্থক্য একান্তই শব্দগত, সবগুলির ভাবার্থ প্রায় এক ও অভিন্ন। নিম্নে মু'জিয়ার কয়েকটি পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করা হইল।
১. আল্লামা ইবন হাজার আস্কালানী লিখিয়াছেন : المعجزة أن يكون المتحدى به مما يعجز عنه البشر في العادة المستحرة .
"রাসূলগণ কর্তৃক সম্পাদিত সেই সকল অলৌকিক বা অসাধারণ কার্যাবলীই মু'জিযা, যাহার প্রতিযোগিতা করিতে সমসাময়িক যুগের মানুষ ব্যর্থ হইয়াছে” (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১)।
২. শায়খ আবু হাফ্স উমার আন্-নাসাফী লিখিয়াছেন : هو امر يظهر خلاف العادة على يد من يدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الايتان بمثله .
"মু'জিযা হইল প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমী কার্য যাহা একজন নবুওয়াতের দাবীদার কর্তৃক প্রকাশ পায়। নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং কার্যটির প্রকৃতি এমন যে, অস্বীকারকারীদের পক্ষে সেইরূপ কার্য সম্পাদন করা অসম্ভব” (শারহুল 'আকাইদিন-নাসাফিয়্যা, পৃ. ১২৪)।
৩. বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ "আল্-মু'জামুল-ওয়াসীত”-এ মু'জিয়ার সংজ্ঞা নিম্নরূপ বিবৃত হইয়াছে : المعجزة امر خارق للعادة يظهره الله على يد نبي تائيدا النبوت .
"মু'জিযা এমন অসাধারণ কার্য, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত করিয়া থাকেন। উদ্দেশ্য নবীর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করা" (আল-মু'জামুল-ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫, শিরো.)।
উপরে উল্লিখিত মু'জিয়ার সংজ্ঞা তিনটির মর্ম প্রায় একই। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, মু'জিযা বলা হয়— (১) যাহা অসাধারণ, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক; (২) যাহা নবী রাসূলগণের দ্বারা প্রকাশ পায়; (৩) তবে উহার সংঘটক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা; (৪) উহা নবী-রাসূলগণের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ; (৫) উহার মধ্যে নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুকাবিলার চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়া হয়। তবে তাহারা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম হয় না।
মু'জিযার উল্লিখিত সংজ্ঞার আলোকে আল-ঈযী আল-মাওয়াকি'ফ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যিনি আল্লাহর নবী তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণ করাই মু'জিয়ার উদ্দেশ্য। তবে যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই মু'জিযা নহে, বরং তাহা মু'জিয়ারূপে স্বীকৃত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য : ১. উহা আল্লাহ্র কার্য হইতে হইবে। ২. প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে হইবে। ৩. অনুরূপ কার্য সম্পাদন অন্যের পক্ষে অসম্ভব হইতে হইবে। ৪. মু'জিযা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হইবে, যিনি নিজেকে নবী বলিয়া দাবি করেন যাহা তাঁহার সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ পায়। ৫. তাঁহার মাধ্যমে প্রকাশিত মু'জিযাটি তাঁহার ঘোষণার সমর্থন জ্ঞাপক হইতে হইবে। ৬. মু'জিযা তাঁহার দাবির পরিপন্থী হইবে না। ৭. মু'জিযা দাবির পরে সংঘটিত হইতে হইবে, পূর্বে নহে।
আল-ঈযীর মতে, মু'জিযা এইভাবে সংঘটিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহার মাধ্যমে উহা ঘটাইয়া থাকেন। ফলে মু'জিযা দর্শকদের মধ্যে নবী-রাসূলের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে (আল-মাওয়াকি'ফ, মু'জিযা অধ্যায়, পৃ. ১৭৫)।
আল্লামা ইব্ন হাজার আস্কালানীর মতেও নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত যে কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ডই মু'জিযা নহে, বরং তিনি এই ক্ষেত্রে দুইটি পরিভাষা স্থির করিয়াছেন। যথা : (১) মু'জিযা এবং (২) 'আলামাতুন-নুবৃওয়াত বা নবুওয়াতের নিদর্শন বা চিহ্ন। যেই সকল অসাধারণ কার্যের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ বিরুদ্ধবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করিয়া থাকেন, কেবল তাহাই মু'জিযা। যেমন তিনি বলিলেন, "যদি আমি এই কার্য করিতে পারি, তবে আমি নবী, অন্যথা আমি মিথ্যাবাদী"। পক্ষান্তরে নবৃওয়াতের 'আলামত ও নিদর্শনের মধ্যে কোন চ্যালেঞ্জ থাকে না, মুকাবিলার আহ্বান থাকে না (ফাতহুল-বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১-৫৮)।
পবিত্র কুরআনে মু'জিযা (معجزة) শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, পারিভাষিক অর্থে নহে। মু'জিযা অর্থ প্রকাশের জন্য পবিত্র কুরআনে আয়াত (آية) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, বহুবচনে আয়াত (آيات) এবং (৫১) আই। ইহার অর্থ কোন বস্তু চিনিবার উপায় বা নিদর্শন। এই চিহ্ন বা নিদর্শন বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। যথা আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার একত্ব প্রমাণের জন্য সমগ্র সৃষ্টি একটি প্রমাণ বা নিদর্শন। এই অর্থে আয়াত-এর ব্যবহার এইরূপ : وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ أَيَتَيْنِ الآية “আর আমি রাত্রি ও দিবসকে করিয়াছি দুইটি নিদর্শন" (১৭-১২; আরও দ্র. ৩০ : ২২-২৫, ৪৬; ১০: ৬; ২ঃ ৭৩; ১৮৭; ৩৪ : ১৯০)।
অনুরূপ নবীগণের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে শব্দটি অসাধারণ কার্য ও অলৌকিক বিষয় বুঝাইবার অর্থেও ব্যবহৃত হইছে।
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتب لكل أية .
"যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে তুমি যদি তাহাদের নিকট সমস্ত দলীলও পেশ কর" (২: ১৪৫ আরও দ্র. ২১১, ২৪৮, ২৫৯; ৩: ৪৯, ৫০; ৫: ১১৪; ৬: ২৫; ১২৪, ৭৪ ৭৩; ১০৬, ১৩২, ১৪৬)।
অবশ্য আয়াত শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে উক্ত দুইটি অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং শব্দটি ইহা ছাড়া অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন উপদেশ ও শিক্ষণীয় অর্থে, যথা আল-কুরআনে আছে : أَن أَيَّةَ مُلک “তাঁহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে,” (২: ২৪৮; ৩ঃ ১৩; ১০: ৯২; ১১ : ১০৩) এবং কুরআনের আয়াত অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যথা আল-কুরআনে আছে : وَلَا تَشْتَرُوا بايتي ثَمَنًا قَليلاً "তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না” (২:৪১ অরিও দ্র. ৯৯, ১০৬, ২২১, ২৫২; ৬৪৪, ১২৪; ১৬৪ ১০১; ৩৬৪ ৪৬; ৪৫: ৩১; ৬২: ২; ৮৩:১৩)।
"আয়াতুন" (آية) শব্দটি মু'জিযা (معجزة) শব্দ অপেক্ষা অধিক ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং বলা যায়, পবিত্র কুরআনে 'মু'জিযা' শব্দ ব্যবহৃত না হইয়া বরং "আয়াতুন" শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় নবী-রাসূলগণের মু'জিযা ও তাঁহাদের আলামতে নবুওয়াত উভয়বিধ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। মু'জিযা-এর অর্থ বুঝাইতে পবিত্র কুরআনে আরও একটি শব্দের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। তাহা হইল বুরহান (برهان) শব্দ। ইহার অর্থ অকাট্য এবং সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ। আল- মু'জামুল ওয়াসীতে আছে : البرهان : البينة النبية الفاصلة অর্থাৎ 'সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী প্রমাণ'। যথা পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا أَتْهَا نُودِى مِنْ شَاطئ الوَادَ الْأَيْمَن في البُقْعَة المُبْرَكَة مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يمُوسَى إِنِّي أَنَا اللهُ رَبُّ العَلَمِينَ ، وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه أَنَّهُم كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ
"যখন মুসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্বান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক। আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। তাঁহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস, ভয় করিও না; তুমি-তো নিরাপদ। আর তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার
প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পরিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়” (২৬: ৩০-৩২)।
সারকথা এই যে, নবৃওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারিগণের হাতে কখনো কখনো মানবিক শক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সাধিত হয়, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনে মানবিক প্রজ্ঞা ও মনীষা অপারগ হইয়া যায়। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর আগুন শীতল হইয়া যাওয়া, হযরত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত জীবিত হওয়া, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর এক রজনীতে পবিত্র কা'বা গৃহ হইতে আল- বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর তথা হইতে সিদরাতুল মুনতাহা, অতঃপর আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য জগত পরিদর্শন করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘটনার মর্মোদঘাটন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি একান্তই অপারগ। আল-কুরআনের ভাষায় এই সমস্ত ঘটনার নাম বুরহান (برهان), বায়ি্যনাত (بینات)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা আয়াত (آیات) অথবা আয়াতুম বায়্যিনাত (آیات بینات)-রূপেও ব্যবহৃত হইয়াছে। মুহাদ্দিছগণ এই সমস্ত ঘটনাকে দালাইলুন নূবৃওয়াত (دلائل النبوة) বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। আর 'আকাইদ বিশেষজ্ঞ (মুতাকাল্লিমূন) এবং দার্শনিকদের পরিভাষায় উহাকে মু'জিযাত (معجزات) বলা হয়।
মু'জিয়ার পারিভাষিক সংজ্ঞা বর্ণনায় বিশেষজ্ঞ 'আলিমগণের ভাষ্যসমূহে কিছু মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। তবে এই মতপার্থক্য একান্তই শব্দগত, সবগুলির ভাবার্থ প্রায় এক ও অভিন্ন। নিম্নে মু'জিয়ার কয়েকটি পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করা হইল।
১. আল্লামা ইবন হাজার আস্কালানী লিখিয়াছেন : المعجزة أن يكون المتحدى به مما يعجز عنه البشر في العادة المستحرة .
"রাসূলগণ কর্তৃক সম্পাদিত সেই সকল অলৌকিক বা অসাধারণ কার্যাবলীই মু'জিযা, যাহার প্রতিযোগিতা করিতে সমসাময়িক যুগের মানুষ ব্যর্থ হইয়াছে” (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১)।
২. শায়খ আবু হাফ্স উমার আন্-নাসাফী লিখিয়াছেন : هو امر يظهر خلاف العادة على يد من يدعى النبوة عند تحدى المنكرين على وجه يعجز المنكرين عن الايتان بمثله .
"মু'জিযা হইল প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমী কার্য যাহা একজন নবুওয়াতের দাবীদার কর্তৃক প্রকাশ পায়। নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জে তিনি উহা সম্পাদন করেন এবং কার্যটির প্রকৃতি এমন যে, অস্বীকারকারীদের পক্ষে সেইরূপ কার্য সম্পাদন করা অসম্ভব” (শারহুল 'আকাইদিন-নাসাফিয়্যা, পৃ. ১২৪)।
৩. বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ "আল্-মু'জামুল-ওয়াসীত”-এ মু'জিয়ার সংজ্ঞা নিম্নরূপ বিবৃত হইয়াছে : المعجزة امر خارق للعادة يظهره الله على يد نبي تائيدا النبوت .
"মু'জিযা এমন অসাধারণ কার্য, যাহা আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত করিয়া থাকেন। উদ্দেশ্য নবীর নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করা" (আল-মু'জামুল-ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫, শিরো.)।
উপরে উল্লিখিত মু'জিয়ার সংজ্ঞা তিনটির মর্ম প্রায় একই। উহার সারসংক্ষেপ এই যে, মু'জিযা বলা হয়— (১) যাহা অসাধারণ, অস্বাভাবিক ও অলৌকিক; (২) যাহা নবী রাসূলগণের দ্বারা প্রকাশ পায়; (৩) তবে উহার সংঘটক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা; (৪) উহা নবী-রাসূলগণের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির সত্যতার প্রমাণস্বরূপ; (৫) উহার মধ্যে নবী-রাসূলগণের পক্ষ হইতে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি মুকাবিলার চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দেওয়া হয়। তবে তাহারা উহার মুকাবিলা করিতে সক্ষম হয় না।
আল-ঈযী আল-মাওয়াকি'ফ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যিনি আল্লাহর নবী তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রমাণ করাই মু'জিয়ার উদ্দেশ্য। তবে যে কোনও অসাধারণ ঘটনাই মু'জিযা নহে, বরং তাহা মু'জিয়ারূপে স্বীকৃত হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতি অপরিহার্য : ১. উহা আল্লাহ্র কার্য হইতে হইবে। ২. প্রচলিত সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে হইবে। ৩. অনুরূপ কার্য সম্পাদন অন্যের পক্ষে অসম্ভব হইতে হইবে। ৪. মু'জিযা এমন ব্যক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হইবে, যিনি নিজেকে নবী বলিয়া দাবি করেন যাহা তাঁহার সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ পায়। ৫. তাঁহার মাধ্যমে প্রকাশিত মু'জিযাটি তাঁহার ঘোষণার সমর্থন জ্ঞাপক হইতে হইবে। ৬. মু'জিযা তাঁহার দাবির পরিপন্থী হইবে না। ৭. মু'জিযা দাবির পরে সংঘটিত হইতে হইবে, পূর্বে নহে।
আল-ঈযীর মতে, মু'জিযা এইভাবে সংঘটিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহার মাধ্যমে উহা ঘটাইয়া থাকেন। ফলে মু'জিযা দর্শকদের মধ্যে নবী-রাসূলের সত্যতায় দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে (আল-মাওয়াকি'ফ, মু'জিযা অধ্যায়, পৃ. ১৭৫)।
আল্লামা ইব্ন হাজার আস্কালানীর মতেও নবী-রাসূলগণের দ্বারা সংঘটিত যে কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ডই মু'জিযা নহে, বরং তিনি এই ক্ষেত্রে দুইটি পরিভাষা স্থির করিয়াছেন। যথা : (১) মু'জিযা এবং (২) 'আলামাতুন-নুবৃওয়াত বা নবুওয়াতের নিদর্শন বা চিহ্ন। যেই সকল অসাধারণ কার্যের মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ বিরুদ্ধবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করিয়া থাকেন, কেবল তাহাই মু'জিযা। যেমন তিনি বলিলেন, "যদি আমি এই কার্য করিতে পারি, তবে আমি নবী, অন্যথা আমি মিথ্যাবাদী"। পক্ষান্তরে নবৃওয়াতের 'আলামত ও নিদর্শনের মধ্যে কোন চ্যালেঞ্জ থাকে না, মুকাবিলার আহ্বান থাকে না (ফাতহুল-বারী, ৬খ., পৃ. ৫৮১-৫৮)।
পবিত্র কুরআনে মু'জিযা (معجزة) শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, পারিভাষিক অর্থে নহে। মু'জিযা অর্থ প্রকাশের জন্য পবিত্র কুরআনে আয়াত (آية) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে, বহুবচনে আয়াত (آيات) এবং (৫১) আই। ইহার অর্থ কোন বস্তু চিনিবার উপায় বা নিদর্শন। এই চিহ্ন বা নিদর্শন বিভিন্ন প্রকারের হইতে পারে। যথা আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং তাঁহার একত্ব প্রমাণের জন্য সমগ্র সৃষ্টি একটি প্রমাণ বা নিদর্শন। এই অর্থে আয়াত-এর ব্যবহার এইরূপ : وَجَعَلْنَا الَّيْلَ وَالنَّهَارَ أَيَتَيْنِ الآية “আর আমি রাত্রি ও দিবসকে করিয়াছি দুইটি নিদর্শন" (১৭-১২; আরও দ্র. ৩০ : ২২-২৫, ৪৬; ১০: ৬; ২ঃ ৭৩; ১৮৭; ৩৪ : ১৯০)।
অনুরূপ নবীগণের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে শব্দটি অসাধারণ কার্য ও অলৌকিক বিষয় বুঝাইবার অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে।
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الكتب لكل أية .
"যাহাদেরকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে তুমি যদি তাহাদের নিকট সমস্ত দলীলও পেশ কর" (২: ১৪৫ আরও দ্র. ২১১, ২৪৮, ২৫৯; ৩: ৪৯, ৫০; ৫: ১১৪; ৬: ২৫; ১২৪, ৭৪ ৭৩; ১০৬, ১৩২, ১৪৬)।
অবশ্য আয়াত শব্দটির ব্যবহার পবিত্র কুরআনে উক্ত দুইটি অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে, বরং শব্দটি ইহা ছাড়া অন্যান্য অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন উপদেশ ও শিক্ষণীয় অর্থে, যথা আল-কুরআনে আছে : أَن أَيَّةَ مُلک “তাঁহার রাজত্বের নিদর্শন এই যে,” (২: ২৪৮; ৩ঃ ১৩; ১০: ৯২; ১১ : ১০৩) এবং কুরআনের আয়াত অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যথা আল-কুরআনে আছে : وَلَا تَشْتَرُوا بايتي ثَمَنًا قَليلاً "তোমরা আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না” (২:৪১ অরিও দ্র. ৯৯, ১০৬, ২২১, ২৫২; ৬৪৪, ১২৪; ১৬৪ ১০১; ৩৬৪ ৪৬; ৪৫: ৩১; ৬২: ২; ৮৩:১৩)।
"আয়াতুন" (آية) শব্দটি মু'জিযা (معجزة) শব্দ অপেক্ষা অধিক ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। সুতরাং বলা যায়, পবিত্র কুরআনে 'মু'জিযা' শব্দ ব্যবহৃত না হইয়া বরং "আয়াতুন" শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় নবী-রাসূলগণের মু'জিযা ও তাঁহাদের আলামতে নবুওয়াত উভয়বিধ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত। মু'জিযা-এর অর্থ বুঝাইতে পবিত্র কুরআনে আরও একটি শব্দের ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। তাহা হইল বুরহান (برهان) শব্দ। ইহার অর্থ অকাট্য এবং সুস্পষ্ট দলীল ও প্রমাণ। আল- মু'জামুল ওয়াসীতে আছে : البرهان : البينة النبية الفاصلة অর্থাৎ 'সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী প্রমাণ'। যথা পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَلَمَّا أَتْهَا نُودِى مِنْ شَاطئ الوَادَ الْأَيْمَن في البُقْعَة المُبْرَكَة مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يمُوسَى إِنِّي أَنَا اللهُ رَبُّ العَلَمِينَ ، وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَأَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَمُوسى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ . أَسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوْءٍ وَأَصْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَلِكَ بُرْهَانَنِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَائِه أَنَّهُم كَانُوا قَوْمًا فَسَقِينَ
"যখন মুসা আগুনের নিকট পৌছিল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিস্থিত এক বৃক্ষের দিক হইতে তাহাকে আহ্বান করিয়া বলা হইল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগতসমূহের প্রতিপালক। আরও বলা হইল, তুমি তোমার যষ্টি নিক্ষেপ কর। অতঃপর যখন সে উহাকে সর্পের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে দেখিল তখন পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল এবং ফিরিয়া তাকাইল না। তাঁহাকে বলা হইল, হে মূসা! সম্মুখে আইস, ভয় করিও না; তুমি-তো নিরাপদ। আর তোমার হাত তোমার বগলে রাখ, ইহা বাহির হইয়া আসিবে শুভ্র সমুজ্জ্বল নির্দোষ হইয়া। ভয় দূর করিবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় নিজের দিকে চাপিয়া ধর। এই দুইটি তোমার
প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ফিরআওন ও তাহার পরিষদবর্গের জন্য। উহারা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (২৬: ৩০-৩২)।
সারকথা এই যে, নবৃওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালনকারিগণের হাতে কখনো কখনো মানবিক শক্তির অতীত কর্মকাণ্ড সাধিত হয়, যাহা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবনে মানবিক প্রজ্ঞা ও মনীষা অপারগ হইয়া যায়। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর উপর আগুন শীতল হইয়া যাওয়া, হযরত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত জীবিত হওয়া, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর এক রজনীতে পবিত্র কা'বা গৃহ হইতে আল- বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর তথা হইতে সিদরাতুল মুনতাহা, অতঃপর আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য জগত পরিদর্শন করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘটনার মর্মোদঘাটন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মানবিক জ্ঞান-বুদ্ধি একান্তই অপারগ। আল-কুরআনের ভাষায় এই সমস্ত ঘটনার নাম বুরহান (برهان), বায়্যিনাত (بینات)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা আয়াত (آیات) অথবা আয়াতুম বায়্যিনাত (آیات بینات)-রূপেও ব্যবহৃত হইয়াছে। মুহাদ্দিছগণ এই সমস্ত ঘটনাকে দালাইলুন নুবৃওয়াত (دلائل النبوة) বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন। আর 'আকাইদ বিশেষজ্ঞ (মুতাকাল্লিমূন) এবং দার্শনিকদের পরিভাষায় উহাকে মু'জিযাত (معجزات) বলা হয়।
📄 মু'জিযা কখন ও কিভাবে সংঘটিত হয়?
মু'জিযা দুইভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে। (১) তলবী (طلبی): মানুষের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির প্রেক্ষিতে। ইহার প্রকাশ এইভাবে হয় যে, বিরুদ্ধবাদীরা নবী-রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তাই তাঁহার নিকট অতি প্রাকৃত কিছু ঘটাইবার দাবি জানায়। তাহারা মনে করে যে, পয়গাম্বর তাহা কখনও প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবেন না। ফলে তাঁহাকে মানুষের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হইতে হইবে। তৃখন আল্লাহ তা'আলা উহা উপযোগী মনে করিলে তাঁহার পয়গাম্বরের হাতে অতি প্রাকৃত ঘটনার প্রকাশ ঘটান। আর তখন উহার ফল দাঁড়ায় বিপরীতমুখী। পয়গাম্বরের লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁহার সত্যতা ও যথার্থতা। যেমন ফেরআওন যাদুকরদেরকে সমবেত করিয়া হযরত মূসা (আ)-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করিতে এবং তাঁহাকে জনসম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করিতে চেষ্টা চালাইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়ার মু'জিযা সংঘটিত হইল। ফলে ঘটনাটি পরিণামে মূসা (আ)-এর লজ্জা ও অপমানের পরিবর্তে তাঁহার সফলতা ও তাঁহার মিশন বিজয়ের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা জনসম্মুখে সূর্যের মত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। পরিণামে উপস্থিত যাদুকরগণ তাঁহার নবৃওয়াতে বিশ্বাসী হইয়া ঈমানদার হইয়া গেল (দ্র. ৭: ১০৩-১২৬)।
আরিফ রূমী তাঁহার মছনবীতে চমৎকার বলিয়াছেন: منکران را قصد ازلال نقات + ذل شده عز وظهور معجزات قصد شان زان کارذل این بده + عین ذل عز رسوال الله
"অবিশ্বাসীরা মু'জিযা তলবের মাধ্যমে সত্যকে নিষ্প্রভ করিয়া দিতে চাহে। অথচ তাহাদের এই অপচেষ্টার ভিতর দিয়াই সত্যের বিজয় ও যথার্থতা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে। তাহাদের ইচ্ছা ছিল মু'জিযা তলব করিয়া পয়গাম্বরকে লজ্জিত ও অপমানিত করা। কিন্তু তাহাদের এই পায়তারাই পয়গাম্বরের মর্যাদাকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে" (মছনবীর বরাতে সীরাতুন্নবী, ৪ খ., পৃ. ১০৮-১০৯)।
(২) গায়রে তলবী (غیر طلبی) : অর্থাৎ মানুষের পক্ষ হইতে মু'জিযার দাবি করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহারই দ্বারা কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া থাকেন, যাহাতে উহা তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ হিসাবে দর্শকদের মধ্যে প্রভাব ও প্রত্যয় সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। যেমন খাবারের মধ্যে বরকতের মু'জিযা। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত ঐতিহাসিক মু'জিযা। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানগণ চরম আর্থিক সংকট এবং অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষুধায় কাতর হইয়া কটিদেশ সোজা করিতে পারিতেছিলেন না, তাই তিনি পেটে পাথর বাঁধিয়া খন্দক খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। অন্যান্য সাহাবীদের অবস্থাও ছিল অনুরূপ। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে যাইয়া তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী বলিলেন, এক সা' অর্থাৎ প্রায় সোয়া তিন কিলো গম আছে। তৎপর হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে পালিত একটি ছাগল যবেহ করিয়া দিয়া স্ত্রীকে রুটি ও গোস্ত পাকাইবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া অতি সন্তর্পণে তাঁহাকে আরও দুই/তিনজন সাহাবীসহ তাহার গৃহে রুটি ও গোশতের দাওয়াত গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাওয়াত কবুল করিলেন এবং উচ্চৈস্বরে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হে পরিখা খননকারী! জাবির তোমাদেরকে দাওয়াত করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার গৃহে চলিয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আহ্বান শুনিয়া হযরত জাবির (রা) প্রমাদ গুনিতে লাগিলেন। মাত্র এক সা' গমের রুটি আর একটি ছাগলের গোস্ত দ্বারা সহস্রাধিক মেহমানকে কিভাবে পরিতুষ্ট করিবেন, তাহাই তিনি ভাবিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাবির (রা)-এর রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া উনুনের উপর চড়ানো গোশতের হাঁড়িতে এবং খামীর করা আটায় পবিত্র মুখের লালা মিশ্রণ করিয়া বলিলেন, সমস্ত মেহমানের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুলার উপর হইতে হাঁড়ি নামাইও না। আর এই খামীর হইতে অল্প অল্প করিয়া আটা লইয়া রুটি তৈয়ার করিতে থাক। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হইল। ফলে সহস্রাধিক মেহমানকে আহার করানো পরও দেখা গেল, যেই পরিমাণ আটা খামীর করা হইয়াছিল এখনও সেই পরিমাণই অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং হাঁড়ি পূর্ববৎ গোস্তে পরিপূর্ণই আছে (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
মু'জিযা দুইভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে। (১) তলবী (طلبی): মানুষের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির প্রেক্ষিতে। ইহার প্রকাশ এইভাবে হয় যে, বিরুদ্ধবাদীরা নবী-রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তাই তাঁহার নিকট অতি প্রাকৃত কিছু ঘটাইবার দাবি জানায়। তাহারা মনে করে যে, পয়গাম্বর তাহা কখনও প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবেন না। ফলে তাঁহাকে মানুষের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হইতে হইবে। তৃখন আল্লাহ তা'আলা উহা উপযোগী মনে করিলে তাঁহার পয়গাম্বরের হাতে অতি প্রাকৃত ঘটনার প্রকাশ ঘটান। আর তখন উহার ফল দাঁড়ায় বিপরীতমুখী। পয়গাম্বরের লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁহার সত্যতা ও যথার্থতা। যেমন ফেরআওন যাদুকরদেরকে সমবেত করিয়া হযরত মূসা (আ)-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করিতে এবং তাঁহাকে জনসম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করিতে চেষ্টা চালাইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়ার মু'জিযা সংঘটিত হইল। ফলে ঘটনাটি পরিণামে মূসা (আ)-এর লজ্জা ও অপমানের পরিবর্তে তাঁহার সফলতা ও তাঁহার মিশন বিজয়ের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা জনসম্মুখে সূর্যের মত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। পরিণামে উপস্থিত যাদুকরগণ তাঁহার নবৃওয়াতে বিশ্বাসী হইয়া ঈমানদার হইয়া গেল (দ্র. ৭: ১০৩-১২৬)।
আরিফ রূমী তাঁহার মছনবীতে চমৎকার বলিয়াছেন: منکران را قصد ازلال نقات + ذل شده عز وظهور معجزات قصد شان زان کارذل این بده + عین ذل عز رسوال الله
"অবিশ্বাসীরা মু'জিযা তলবের মাধ্যমে সত্যকে নিষ্প্রভ করিয়া দিতে চাহে। অথচ তাহাদের এই অপচেষ্টার ভিতর দিয়াই সত্যের বিজয় ও যথার্থতা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে। তাহাদের ইচ্ছা ছিল মু'জিযা তলব করিয়া পয়গাম্বরকে লজ্জিত ও অপমানিত করা। কিন্তু তাহাদের এই পায়তারাই পয়গাম্বরের মর্যাদাকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে" (মছনবীর বরাতে সীরাতুন্নবী, ৪ খ., পৃ. ১০৮-১০৯)।
(২) গায়রে তলবী (غیر طلبی) : অর্থাৎ মানুষের পক্ষ হইতে মু'জিযার দাবি করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহারই দ্বারা কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া থাকেন, যাহাতে উহা তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ হিসাবে দর্শকদের মধ্যে প্রভাব ও প্রত্যয় সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। যেমন খাবারের মধ্যে বরকতের মু'জিযা। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত ঐতিহাসিক মু'জিযা। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানগণ চরম আর্থিক সংকট এবং অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষুধায় কাতর হইয়া কটিদেশ সোজা করিতে পারিতেছিলেন না, তাই তিনি পেটে পাথর বাঁধিয়া খন্দক খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। অন্যান্য সাহাবীদের অবস্থাও ছিল অনুরূপ। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে যাইয়া তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী বলিলেন, এক সা' অর্থাৎ প্রায় সোয়া তিন কিলো গম আছে। তৎপর হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে পালিত একটি ছাগল যবেহ করিয়া দিয়া স্ত্রীকে রুটি ও গোস্ত পাকাইবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া অতি সন্তর্পণে তাঁহাকে আরও দুই/তিনজন সাহাবীসহ তাহার গৃহে রুটি ও গোশতের দাওয়াত গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাওয়াত কবুল করিলেন এবং উচ্চৈস্বরে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হে পরিখা খননকারী! জাবির তোমাদেরকে দাওয়াত করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার গৃহে চলিয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আহ্বান শুনিয়া হযরত জাবির (রা) প্রমাদ গুনিতে লাগিলেন। মাত্র এক সা' গমের রুটি আর একটি ছাগলের গোস্ত দ্বারা সহস্রাধিক মেহমানকে কিভাবে পরিতুষ্ট করিবেন, তাহাই তিনি ভাবিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাবির (রা)-এর রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া উনুনের উপর চড়ানো গোশতের হাঁড়িতে এবং খামীর করা আটায় পবিত্র মুখের লালা মিশ্রণ করিয়া বলিলেন, সমস্ত মেহমানের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুলার উপর হইতে হাঁড়ি নামাইও না। আর এই খামীর হইতে অল্প অল্প করিয়া আটা লইয়া রুটি তৈয়ার করিতে থাক। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হইল। ফলে সহস্রাধিক মেহমানকে আহার করানো পরও দেখা গেল, যেই পরিমাণ আটা খামীর করা হইয়াছিল এখনও সেই পরিমাণই অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং হাঁড়ি পূর্ববৎ গোস্তে পরিপূর্ণই আছে (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
মু'জিযা দুইভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে। (১) তলবী (طلبی): মানুষের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির প্রেক্ষিতে। ইহার প্রকাশ এইভাবে হয় যে, বিরুদ্ধবাদীরা নবী-রাসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করে। তাই তাঁহার নিকট অতি প্রাকৃত কিছু ঘটাইবার দাবি জানায়। তাহারা মনে করে যে, পয়গাম্বর তাহা কখনও প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবেন না। ফলে তাঁহাকে মানুষের সম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত হইতে হইবে। তৃখন আল্লাহ তা'আলা উহা উপযোগী মনে করিলে তাঁহার পয়গাম্বরের হাতে অতি প্রাকৃত ঘটনার প্রকাশ ঘটান। আর তখন উহার ফল দাঁড়ায় বিপরীতমুখী। পয়গাম্বরের লজ্জিত ও অপমানিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁহার সত্যতা ও যথার্থতা। যেমন ফেরআওন যাদুকরদেরকে সমবেত করিয়া হযরত মূসা (আ)-কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করিতে এবং তাঁহাকে জনসম্মুখে লজ্জিত ও অপমানিত করিতে চেষ্টা চালাইয়াছিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়ার মু'জিযা সংঘটিত হইল। ফলে ঘটনাটি পরিণামে মূসা (আ)-এর লজ্জা ও অপমানের পরিবর্তে তাঁহার সফলতা ও তাঁহার মিশন বিজয়ের কারণ হইয়া দাঁড়াইল। তাঁহার নবুওয়াতের দাবির সত্যতা জনসম্মুখে সূর্যের মত উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। পরিণামে উপস্থিত যাদুকরগণ তাঁহার নবৃওয়াতে বিশ্বাসী হইয়া ঈমানদার হইয়া গেল (দ্র. ৭: ১০৩-১২৬)।
আরিফ রূমী তাঁহার মছনবীতে চমৎকার বলিয়াছেন: منکران را قصد ازلال نقات + ذل شده عز وظهور معجزات قصد شان زان کارذل این بده + عین ذل عز رسوال الله
"অবিশ্বাসীরা মু'জিযা তলবের মাধ্যমে সত্যকে নিষ্প্রভ করিয়া দিতে চাহে। অথচ তাহাদের এই অপচেষ্টার ভিতর দিয়াই সত্যের বিজয় ও যথার্থতা পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে। তাহাদের ইচ্ছা ছিল মু'জিযা তলব করিয়া পয়গাম্বরকে লজ্জিত ও অপমানিত করা। কিন্তু তাহাদের এই পায়তারাই পয়গাম্বরের মর্যাদাকে উদ্ভাসিত করিয়া তোলে" (মছনবীর বরাতে সীরাতুন্নবী, ৪ খ., পৃ. ১০৮-১০৯)।
(২) গায়রে তলবী (غیر طلبی) : অর্থাৎ মানুষের পক্ষ হইতে মু'জিযার দাবি করা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যাঁহার (নবী-রাসূল) সত্যতা প্রমাণ করিতে চাহেন তাঁহারই দ্বারা কোন অসাধারণ কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া থাকেন, যাহাতে উহা তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের প্রমাণ হিসাবে দর্শকদের মধ্যে প্রভাব ও প্রত্যয় সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। যেমন খাবারের মধ্যে বরকতের মু'জিযা। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত ঐতিহাসিক মু'জিযা। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানগণ চরম আর্থিক সংকট এবং অনাহারের মধ্যে জীবন যাপন করিতেছিলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) ক্ষুধায় কাতর হইয়া কটিদেশ সোজা করিতে পারিতেছিলেন না, তাই তিনি পেটে পাথর বাঁধিয়া খন্দক খননকার্য চালাইয়া যাইতেছিলেন। অন্যান্য সাহাবীদের অবস্থাও ছিল অনুরূপ। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে যাইয়া তাঁহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘরে খাবার আছে কি? স্ত্রী বলিলেন, এক সা' অর্থাৎ প্রায় সোয়া তিন কিলো গম আছে। তৎপর হযরত জাবির (রা) তাঁহার গৃহে পালিত একটি ছাগল যবেহ করিয়া দিয়া স্ত্রীকে রুটি ও গোস্ত পাকাইবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাজির হইয়া অতি সন্তর্পণে তাঁহাকে আরও দুই/তিনজন সাহাবীসহ তাহার গৃহে রুটি ও গোশতের দাওয়াত গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার দাওয়াত কবুল করিলেন এবং উচ্চৈস্বরে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হে পরিখা খননকারী! জাবির তোমাদেরকে দাওয়াত করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার গৃহে চলিয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আহ্বান শুনিয়া হযরত জাবির (রা) প্রমাদ গুনিতে লাগিলেন। মাত্র এক সা' গমের রুটি আর একটি ছাগলের গোস্ত দ্বারা সহস্রাধিক মেহমানকে কিভাবে পরিতুষ্ট করিবেন, তাহাই তিনি ভাবিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাবির (রা)-এর রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া উনুনের উপর চড়ানো গোশতের হাঁড়িতে এবং খামীর করা আটায় পবিত্র মুখের লালা মিশ্রণ করিয়া বলিলেন, সমস্ত মেহমানের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুলার উপর হইতে হাঁড়ি নামাইও না। আর এই খামীর হইতে অল্প অল্প করিয়া আটা লইয়া রুটি তৈয়ার করিতে থাক। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হইল। ফলে সহস্রাধিক মেহমানকে আহার করানো পরও দেখা গেল, যেই পরিমাণ আটা খামীর করা হইয়াছিল এখনও সেই পরিমাণই অবশিষ্ট রহিয়াছে এবং হাঁড়ি পূর্ববৎ গোস্তে পরিপূর্ণই আছে (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৮৮-৫৮৯)।
📄 মু'জিযার প্রকারভেদ
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির স্বপক্ষে যেই প্রমাণ তথা মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন তাহা প্রথমত দুই প্রকারের— জাহেরী (ظاهری) বা বস্তুভিত্তিক এবং বাতেনী (باطنی) বা. আত্মিক। জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক' মু'জিযা, যেমন মৃতকে জীবিত করা, যষ্টিকে সর্পে পরিণত করা, আঙ্গুল হইতে পানির প্রবাহ জারী হওয়া, রুগ্নকে সুস্থ করা, চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, সমুদ্র বক্ষে চলার পথ তৈরী হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। আর বাতেনী ও আত্মিক (রূহানী) মু'জিযা হইতেছে— নবৃওয়াতের দাবিদারের সত্যতা, নবীগণের নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়া, তাঁহাদের প্রভাব শক্তি, সফলতা ও গায়বী সাহায্য ইত্যাদি। ইহার মধ্যে পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বাতেনী মু'জিযা। বস্তুত নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে এই সমস্ত আত্মিক ও রূহানী নিদর্শন। আর জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাসমূহ শুধুই আবরণ এবং বাহিরের প্রতি দৃষ্টি দানকারীদের জন্য। এই কারণে দেখা যায়, যাহারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গূঢ় মর্মজ্ঞানী, তাহারা কখনও জাহেরী মু'জিযা তলব করেন নাই। অনুরূপ নবী-রাসূলগণের যুগে যাহারা শিক্ষিত সমাজ হিসাবে পরিচিত ছিল তাহারাও নবী-রাসূলগণের নিকট কোন জাহেরী মু'জিযা দাবি করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগের আহলে কিতাবগণ। তাহারা সন্দেহপ্রবণ মন লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বারংবার উপস্থিত হইয়াছে, তাঁহার সত্যতার পরীক্ষা লইয়াছে। কিন্তু তাহাদের পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি ছিল? তাহা ছিল এই যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অতীতের বনী ইসরাঈলী নবী-রাসূলের অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং তাঁহার শিক্ষা ও উলূমের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে কেহই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট- জাহেরী মু'জিযা তলব করে নাই। কারণ তাহারা জানিত যে, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে দাবিদারের আধ্যাত্মিক ও অভ্যন্তরীণ দিক এবং তাঁহার 'আখলাক ও চারিত্রিক অবস্থা। ঠিক একই কারণে আমরা দেখিতে পাই যে, তৎকালীন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হযরত দিহয়া কালবী (রা) উপস্থিত হইলেন এবং সম্রাটের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র পেশ করিলেন তখন হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা যাচাই করিবার জন্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফয়ানকে রাজ দরবারে ডাকাইয়া আনিয়া কতিপয় প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাহার এই প্রশ্নগুলির সমস্তটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং প্রভাব সম্বন্ধে। সবশেষে হিরাক্লিয়াস বলিয়াছিলেন, তুমি (আবূ সুফয়ান) যাহা বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে মুহাম্মাদ (স) অবশ্যই আল্লাহ্ প্রেরিত নবী এবং রাসূল (সহীহুল বুখারী, ১০খ., পৃ. ৪)।
অনুরূপ নাজরানের খৃস্টান বিদ্বানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণ করিল এবং মুসলমানদের আত্মিক বিকাশের অবস্থা লক্ষ্য করিল। তৎপর তাহারা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইসলামের সিদ্ধান্ত কি তাহা জানিতে চাহিল। সবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের হুকুম মুতাবিক তাহাদের সহিত মুবাহালা করিতে চ্যালেঞ্জ প্রদান করিলেন। কিন্তু তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। তাহারা পরস্পর বলিতে লাগিল, প্রকৃতই যদি মুহাম্মাদ (স) নবী হন তাহা হইলে আমরা সবংশে ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরিশেষে তাহারা বাৎসরিক খারাজ আদায় করিবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করিল। লক্ষ্য করুন, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক শিক্ষা ও তাঁহার আখলাক-চরিত্র ও আচার-অনুষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছে, কিন্তু দাবি প্রমাণের জন্য বাহ্যিক বস্তুভিত্তিক কোন মু'জিযা তলব করে নাই (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৩১-৬৩৭)।
স্বয়ং আরবের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখুন। তাহাদের হাজারও ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাতেনী ও আত্মিক মু'জিযা অনুধাবন করিয়াছেন, তাহাদের একজনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযা দাবি করেন নাই। যথা হযরত খাদীজা (রা), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আলী (রা), আম্মার (রা), হযরত ইয়াসির (রা), হযরত আবু যর গিফারী (রা), হযরত বেলাল (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম। হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা জানিতে পারিলেন, তখন স্বীয় ভ্রাতাকে বলিলেন, ঐ ব্যক্তির নিকট যাও। সে দাবি করিয়াছে যে, তাঁহার নিকট আসমান হইতে ওহী আসিয়াছে। তাঁহার অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। তাহার ভ্রাতা মক্কায় আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আবূ যার গিফারী (রা)-কে বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তিনি সচ্চরিত্রের নির্দেশ দেন এবং তিনি এমন কালাম পেশ করেন যাহা কবিতা নহে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
হযরত জা'ফার (রা) আবিসিনিয়ায় নাজাশীর দরবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পরিচয় সম্বন্ধে ভাষণ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলেন, হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞ ও জাহেল সমাজ। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করিতাম, দুষ্কর্ম লিপ্ত ছিলাম, প্রতিবেশীদের উপর অবিচার করিতাম, পরস্পর হানাহানি ও মারামারি করিতাম, দুর্বল লোককে সবল লোক নিশ্চিহ্ন করিয়া দিত। এমন অমানিশা ও দুর্যোগের সময় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আবির্ভূত হইলেন—যাঁহার ভদ্র ও শিষ্ট আচরণ, সততা, ন্যায়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জ্ঞাত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করিলেন। তিনি আমাদের এই শিক্ষা দিলেন যে, আমরা যেন মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, সত্য কথা বলি, রক্তপাত হইতে বিরত থাকি, ইয়াতীমের অধিকার হরণ না করি, প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেই, সতী রমণীদের প্রতি যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ না করি, নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, সিয়াম পালন করি। আমরা এই সমস্ত কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি, শিরক বর্জন করিয়াছি, সকল প্রকার অপকর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৩২; মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ২০২)।
আলোচনার সারাংশ এই যে, নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক দলীল হইতেছে, নবী-রাসূলগণের বাতেনী ও আধ্যাত্মিক মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী। তবে তাঁহাদের জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাও ছিল। তাই পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করিলে দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা অতীত নবী-রাসূলগণের জীবনেতিহাস বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তাঁহাদের জাহেরী মু'জিযার বিস্তৃত বর্ণনা পেশ করিয়াছেন। তথা হয়রত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, তাঁহার হস্ত শুভ্র আলোকোজ্জ্বল হওয়া, হযরত সালিহ (আ)-এর সময়ে পাথরের মধ্য হইতে উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসা, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত ব্যক্তির জীবিত হইয়া যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়া ইত্যাদি। নবীগণের জাহেরী ও বাতেনী মুজিয়ার আরও একটি পর্যায়লোচনা এই যে, জাহেরী ও বস্তুতিক্ত মুজিয়া শুধু ঐ সমস্ত লোক তলব করে যাহাদের অন্তরচক্ষু অন্ধ এবং যাহারা বিরুদ্ধবাদিতা, পক্ষপাতিত্ব এবং কুপমন্ডুকতাসুলভ মনোভাবের কারণে সত্যকে মানিয়া লইতে রাজি হয় না। বস্তুত গোঁড়া কাফিররাই জাহেরী মুজিয়া তলব করিয়া থাকে। এই কারণে দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে মুজিয়া তলব সংক্রান্ত দাবিগুলিকে সর্বদা কাফিরদের প্রতিই আরোপ করা হইয়াছে। যথা:
وَقَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللّٰهُ اَوْ تَأْتِيْنَا اٰيَةٌ كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ قَدْ بَيَّنَّا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
“এবং যাহারা কিছু জানে না তাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কেন, কিংবা কোন নিদর্শন আমাদের নিকট আসে না কেন? এইভাবে তাহাদের পূর্ববর্তীরাও তাহাদের অনুরূপ কথা বলিত। তাহাদের অন্তর একই রকম। আমি দৃঢ় প্রত্যয়শীলদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করিয়াছি।” (২:১১b)।
وَقَالُوْا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ قَادِرٌ عَلٰى اَنْ يُّنَزِّلَ اٰيَةً وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
“তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? বল, নিদর্শন নাযিল করিতে আল্লাহ অবশ্যই সক্ষম, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই জানে না” (৬:৩৭)।
وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَا اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ اِنَّمَا اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ
“যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক” (১৩:৭)।
وَقَالُوْا لَوْلَا يَأْتِيْنَا بِاٰيَةٍ مِّنْ رَّبِّهٖ اَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِى الصُّحُفِ الْاُوْلٰى
“তাহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যাহা আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে” (২০:১৩৩)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষণীয় যে, প্রত্যেক আয়াতেই মুজিয়া তলব করার বিষয়টি কাফিরদের প্রতি আরোপ করা হইয়াছে। পুণ্যবানগণ কখনও মুজিয়া তলব করেন নাই। ইহা হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মুজিয়া বনী ইসরাইলের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ফিরআওন ও তাহার অনুসারীদের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হইয়া ছিল। তাই যখন হাওয়ারীগণ ঈসা (আ)-এর নিকট খাদ্যভর্তি আসমানী খাঞ্চার জন্য বলিল- ﴿يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ﴾
“হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি এইরূপ করিতে পারেন যে, আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করিয়া দিবেন”? তখন ঈসা (আ) উত্তরে বলিলেন-
﴿اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴾
"যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর"। ইহাতে বুঝা যায়, ঈমানদার বান্দার পক্ষে এ ধরনের ফরমাইশ করিয়া আল্লাহকে পরীক্ষা করা কিংবা তাঁহার কাছে অলৌকিক বিষয় দাবি করা একান্তই অনুচিত (পবিত্র কুরআনুল-করীম, অনূদিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৩৬৩)। এমনিভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট মু'জিযাসমূহ হযরত আবূ বকর, উমার এবং উছমান (রা) তলব করেন নাই, বরং আবূ জাহল, আবু লাহাব, উৎবা, শায়বা প্রমুখ কাফিররাই তলব করিয়াছিল। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কাফিররা জাহেরী মু'জিযা তলব করিত তাহাদের শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ এবং অন্তরের হঠকারিতা ও গোঁয়ার্তুমির বশবর্তী হইয়া-সত্যানুসন্ধানী হইয়া নহে। এই কারণে তাহারা একের পর এক জাহেরী মু'জিযা তলব করিয়াই যাইতেছিল। পক্ষান্তরে যখনই তাহাদের দাবি অনুসারে কোন মু'জিযা বাস্তবায়িত হইত তখন তাহারাই উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিত। বস্তুত এইরূপ গোঁয়ার্তুমি ও কুপমন্ডুকতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনও জাহেরী মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিয়া উপকৃত হইতে পারে না বরং তাহারা নিজেদের অন্তরের কপটতার দরুন জাহেরী মু'জিযাকে যাদু ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং নবৃওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উহাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে। হযরত মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার অনুসারিদেরকে অনেক মু'জিযা দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রতিটি মু'জিযার ক্ষেত্রেই মূসা (আ)-কে ফিরআওনের মুখে একই জবাব শুনিতে হইয়াছিল, "তুমি মহাযাদুকর" (انك لساحر عليم) অথবা "ইহা তো প্রকাশ্য যাদু" (ان هذا الا سحر مبين) অথবা "এই মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারূন উভয়ে যাদুকর" (أن هذان لسحران) (দ্র. ৫:১১০; ৬: ৭৬; ১০: ৭৬; ১১: ৭; ২৭: ১৩; ৩৪: ৪৩; ৩৭: ১৫; ২০: ৬৩; ৭: ১১২)।
আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া মিসরের সমস্ত যাদুকর সিজদায় পতিত হইয়াছিল এবং 'তাহাদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করিয়া চির সৌভাগ্যমণ্ডিত হইয়াছিল। কিন্তু ফিরআওনের মুখে ছিল পূর্বের সেই একই কথা, অভিন্ন বুল : ﴿إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ﴾ “সে তো তোমাদের (যাদুকর) প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে” (২০ঃ ৭১)।
শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ক্ষেত্রে ঠিক একই অবস্থা ঘটিয়াছিল। কাফির কুরায়শ সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মু'জিযা তলব করিয়াছিল এবং মু'জিযার বিকাশ প্রত্যক্ষ করিবার পরই তাঁহাকে যাদুকর বা কাহিনীকার বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল (দ্র. আল-কুরআন ৭৪: ২৪; ৫২: ২৯, ৩০; ৫৪ : ১-২; ৬৯ : ৪০, ৪৮)।
উপরে উল্লিখিত আলোচনার দ্বারা একটি সংশয়ের অবসানও হইয়া গেল যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লক্ষ্য করা যায় যে, মক্কার কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বারবার মু'জিযা তলব করিয়াছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সেই দাবি অনুসারে মু'জিযা প্রদর্শন করেন নাই কেন?
বস্তুত তাহাদেরকে অনেক জাহেরী মু'জিযা প্রদর্শন করান হইয়াছিল, কিন্তু জাহেরী মু'জিযা দ্বারা কাফিরদের মন কখনও শান্ত হয় না এবং ইহাতে তাহারা কখনও হিদায়াত লাভ করিতে পারে না। কারণ এই সমস্ত মু'জিযা তলবের পশ্চাতে তাহাদের অন্তরের কপটতা, হিংসা, দ্বেষ ও গোঁয়াতুমি কার্যকর থাকে। এই অবস্থায় তাহাদের প্রার্থিত মু'জিযা সংঘটনে তাহাদের বিশেষ কোন ফায়দা হইত না, বরং ইহা তাহাদের অন্তরের শঠতাকে আরও বৃদ্ধি করিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ "এবং যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, ইহা তাহাদের কলুষের সহিত আরও কলুষ যুক্ত করে" (৯: ১২৫; আরও দ্র. ২: ১০; ৭১: ২৪, ২৮; ১৭: ৮২; ৫: ৬৪, ৬৮)।
তাই পবিত্র কুরআনে জাহেরী মু'জিযা তলবের কারণে কাফিরদেরকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে এবং বাতেনী মু'জিযার প্রতি তাহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইতেছে:
وَقَالُوا لَوْ لَا يَأْتِينَا بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّهِ أَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِي الصُّحُفِ الْأُولَى "উহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ যাহা আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে" (২০: ১৩৩)?
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ أَيَتْ مِنْ رَبِّهِ قُلْ إِنَّمَا الْآيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ "উহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহার নিকট নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? বল, নিদর্শন আল্লাহর এখতিয়ারে; আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। ইহা কি উহাদের জন্য যথেষ্ট নহে যে, আমি তোমার নিকট কুরআন নাযিল করিয়াছি, যাহা উহাদের নিকট পাঠ করা হয়? ইহাতে অবশ্যই মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ এবং উপদেশ রহিয়াছে" (২৯: ৫০-৫১)।
এই কারণেই পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কাফিরদের জাহেরী মু'জিযা তলবের প্রতিউত্তরে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কেবল এতটুকু বলিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, "আমি তো কেবল একজন মানুষ এবং পয়গাম্বর"। ইরশাদ হইয়াছে :
وَ قَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا ، أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَرَ خِلْلَهَا تَفْجِيرًا ، أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالمَلْئِكَةِ قَبِيلاً ، أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرَقِيَّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتبًا نَّقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولاً
“এবং উহারা বলে, আমরা কখনও তোমাতে ঈমান আনিব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হইতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করিবে অথবা তোমার খেজুরের বা আংগুরের এক বাগান হইবে, যাহার ফাঁকে-ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করিবে নদী-নালা। অথবা তুমি যেমন বলিয়া থাক, তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া আমাদের উপর ফেলিবে অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করিবে অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে। কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি কিতাব নাযিল না করিবে, যাহা আমরা পাঠ করিব। বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭:৯০-৯৩)।
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির স্বপক্ষে যেই প্রমাণ তথা মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন তাহা প্রথমত দুই প্রকারের— জাহেরী (ظاهری) বা বস্তুভিত্তিক এবং বাতেনী (باطنی) বা. আত্মিক। জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক' মু'জিযা, যেমন মৃতকে জীবিত করা, যষ্টিকে সর্পে পরিণত করা, আঙ্গুল হইতে পানির প্রবাহ জারী হওয়া, রুগ্নকে সুস্থ করা, চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, সমুদ্র বক্ষে চলার পথ তৈরী হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। আর বাতেনী ও আত্মিক (রূহানী) মু'জিযা হইতেছে— নবৃওয়াতের দাবিদারের সত্যতা, নবীগণের নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়া, তাঁহাদের প্রভাব শক্তি, সফলতা ও গায়বী সাহায্য ইত্যাদি। ইহার মধ্যে পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বাতেনী মু'জিযা। বস্তুত নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে এই সমস্ত আত্মিক ও রূহানী নিদর্শন। আর জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাসমূহ শুধুই আবরণ এবং বাহিরের প্রতি দৃষ্টি দানকারীদের জন্য। এই কারণে দেখা যায়, যাহারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গূঢ় মর্মজ্ঞানী, তাহারা কখনও জাহেরী মু'জিযা তলব করেন নাই। অনুরূপ নবী-রাসূলগণের যুগে যাহারা শিক্ষিত সমাজ হিসাবে পরিচিত ছিল তাহারাও নবী-রাসূলগণের নিকট কোন জাহেরী মু'জিযা দাবি করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগের আহলে কিতাবগণ। তাহারা সন্দেহপ্রবণ মন লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বারংবার উপস্থিত হইয়াছে, তাঁহার সত্যতার পরীক্ষা লইয়াছে। কিন্তু তাহাদের পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি ছিল? তাহা ছিল এই যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অতীতের বনী ইসরাঈলী নবী-রাসূলের অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং তাঁহার শিক্ষা ও উলূমের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে কেহই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট- জাহেরী মু'জিযা তলব করে নাই। কারণ তাহারা জানিত যে, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে দাবিদারের আধ্যাত্মিক ও অভ্যন্তরীণ দিক এবং তাঁহার 'আখলাক ও চারিত্রিক অবস্থা। ঠিক একই কারণে আমরা দেখিতে পাই যে, তৎকালীন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হযরত দিহয়া কালবী (রা) উপস্থিত হইলেন এবং সম্রাটের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র পেশ করিলেন তখন হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা যাচাই করিবার জন্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফয়ানকে রাজ দরবারে ডাকাইয়া আনিয়া কতিপয় প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাহার এই প্রশ্নগুলির সমস্তটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং প্রভাব সম্বন্ধে। সবশেষে হিরাক্লিয়াস বলিয়াছিলেন, তুমি (আবূ সুফয়ান) যাহা বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে মুহাম্মাদ (স) অবশ্যই আল্লাহ্ প্রেরিত নবী এবং রাসূল (সহীহুল বুখারী, ১০খ., পৃ. ৪)।
অনুরূপ নাজরানের খৃস্টান বিদ্বানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণ করিল এবং মুসলমানদের আত্মিক বিকাশের অবস্থা লক্ষ্য করিল। তৎপর তাহারা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইসলামের সিদ্ধান্ত কি তাহা জানিতে চাহিল। সবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের হুকুম মুতাবিক তাহাদের সহিত মুবাহালা করিতে চ্যালেঞ্জ প্রদান করিলেন। কিন্তু তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। তাহারা পরস্পর বলিতে লাগিল, প্রকৃতই যদি মুহাম্মাদ (স) নবী হন তাহা হইলে আমরা সবংশে ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরিশেষে তাহারা বাৎসরিক খারাজ আদায় করিবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করিল। লক্ষ্য করুন, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক শিক্ষা ও তাঁহার আখলাক-চরিত্র ও আচার-অনুষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছে, কিন্তু দাবি প্রমাণের জন্য বাহ্যিক বস্তুভিত্তিক কোন মু'জিযা তলব করে নাই (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৩১-৬৩৭)।
স্বয়ং আরবের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখুন। তাহাদের হাজারও ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাতেনী ও আত্মিক মু'জিযা অনুধাবন করিয়াছেন, তাহাদের একজনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযা দাবি করেন নাই। যথা হযরত খাদীজা (রা), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আলী (রা), আম্মার (রা), হযরত ইয়াসির (রা), হযরত আবু যর গিফারী (রা), হযরত বেলাল (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম। হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা জানিতে পারিলেন, তখন স্বীয় ভ্রাতাকে বলিলেন, ঐ ব্যক্তির নিকট যাও। সে দাবি করিয়াছে যে, তাঁহার নিকট আসমান হইতে ওহী আসিয়াছে। তাঁহার অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। তাহার ভ্রাতা মক্কায় আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আবূ যার গিফারী (রা)-কে বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তিনি সচ্চরিত্রের নির্দেশ দেন এবং তিনি এমন কালাম পেশ করেন যাহা কবিতা নহে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
হযরত জা'ফার (রা) আবিসিনিয়ায় নাজাশীর দরবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পরিচয় সম্বন্ধে ভাষণ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলেন, হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞ ও জাহেল সমাজ। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করিতাম, দুষ্কর্ম লিপ্ত ছিলাম, প্রতিবেশীদের উপর অবিচার করিতাম, পরস্পর হানাহানি ও মারামারি করিতাম, দুর্বল লোককে সবল লোক নিশ্চিহ্ন করিয়া দিত। এমন অমানিশা ও দুর্যোগের সময় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আবির্ভূত হইলেন—যাঁহার ভদ্র ও শিষ্ট আচরণ, সততা, ন্যায়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জ্ঞাত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করিলেন। তিনি আমাদের এই শিক্ষা দিলেন যে, আমরা যেন মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, সত্য কথা বলি, রক্তপাত হইতে বিরত থাকি, ইয়াতীমের অধিকার হরণ না করি, প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেই, সতী রমণীদের প্রতি যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ না করি, নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, সিয়াম পালন করি। আমরা এই সমস্ত কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি, শিরক বর্জন করিয়াছি, সকল প্রকার অপকর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৩২; মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ২০২)।
আলোচনার সারাংশ এই যে, নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক দলীল হইতেছে, নবী-রাসূলগণের বাতেনী ও আধ্যাত্মিক মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী। তবে তাঁহাদের জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাও ছিল। তাই পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করিলে দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা অতীত নবী-রাসূলগণের জীবনেতিহাস বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তাঁহাদের জাহেরী মু'জিযার বিস্তৃত বর্ণনা পেশ করিয়াছেন। তথা হয়রত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, তাঁহার হস্ত শুভ্র আলোকোজ্জ্বল হওয়া, হযরত সালিহ (আ)-এর সময়ে পাথরের মধ্য হইতে উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসা, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত ব্যক্তির জীবিত হইয়া যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়া ইত্যাদি। নবীগণের জাহেরী ও বাতেনী মুজিয়ার আরও একটি পর্যায়লোচনা এই যে, জাহেরী ও বস্তুতিক্ত মুজিয়া শুধু ঐ সমস্ত লোক তলব করে যাহাদের অন্তরচক্ষু অন্ধ এবং যাহারা বিরুদ্ধবাদিতা, পক্ষপাতিত্ব এবং কুপমন্ডুকতাসুলভ মনোভাবের কারণে সত্যকে মানিয়া লইতে রাজি হয় না। বস্তুত গোঁড়া কাফিররাই জাহেরী মুজিয়া তলব করিয়া থাকে। এই কারণে দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে মুজিয়া তলব সংক্রান্ত দাবিগুলিকে সর্বদা কাফিরদের প্রতিই আরোপ করা হইয়াছে। যথা:
وَقَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللّٰهُ اَوْ تَأْتِيْنَا اٰيَةٌ كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ قَدْ بَيَّنَّا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
“এবং যাহারা কিছু জানে না তাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কেন, কিংবা কোন নিদর্শন আমাদের নিকট আসে না কেন? এইভাবে তাহাদের পূর্ববর্তীরাও তাহাদের অনুরূপ কথা বলিত। তাহাদের অন্তর একই রকম। আমি দৃঢ় প্রত্যয়শীলদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করিয়াছি।” (২:১১b)।
وَقَالُوْا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ قَادِرٌ عَلٰى اَنْ يُّنَزِّلَ اٰيَةً وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
“তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? বল, নিদর্শন নাযিল করিতে আল্লাহ অবশ্যই সক্ষম, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই জানে না” (৬:৩৭)।
وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَا اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ اِنَّمَا اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ
“যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক” (১৩:৭)।
وَقَالُوْا لَوْلَا يَأْتِيْنَا بِاٰيَةٍ مِّنْ رَّبِّهٖ اَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِى الصُّحُفِ الْاُوْلٰى
“তাহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যাহা আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে” (২০:১৩৩)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষণীয় যে, প্রত্যেক আয়াতেই মুজিয়া তলব করার বিষয়টি কাফিরদের প্রতি আরোপ করা হইয়াছে। পুণ্যবানগণ কখনও মুজিয়া তলব করেন নাই। ইহা হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মুজিয়া বনী ইসরাইলের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ফিরআওন ও তাহার অনুসারীদের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হইয়া ছিল। তাই যখন হাওয়ারীগণ ঈসা (আ)-এর নিকট খাদ্যভর্তি আসমানী খাঞ্চার জন্য বলিল- ﴿يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ﴾
“হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি এইরূপ করিতে পারেন যে, আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করিয়া দিবেন”? তখন ঈসা (আ) উত্তরে বলিলেন-
﴿اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴾
"যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর"। ইহাতে বুঝা যায়, ঈমানদার বান্দার পক্ষে এ ধরনের ফরমাইশ করিয়া আল্লাহকে পরীক্ষা করা কিংবা তাঁহার কাছে অলৌকিক বিষয় দাবি করা একান্তই অনুচিত (পবিত্র কুরআনুল-করীম, অনূদিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৩৬৩)। এমনিভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট মু'জিযাসমূহ হযরত আবূ বকর, উমার এবং উছমান (রা) তলব করেন নাই, বরং আবূ জাহল, আবু লাহাব, উৎবা, শায়বা প্রমুখ কাফিররাই তলব করিয়াছিল। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কাফিররা জাহেরী মু'জিযা তলব করিত তাহাদের শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ এবং অন্তরের হঠকারিতা ও গোঁয়ার্তুমির বশবর্তী হইয়া-সত্যানুসন্ধানী হইয়া নহে। এই কারণে তাহারা একের পর এক জাহেরী মু'জিযা তলব করিয়াই যাইতেছিল। পক্ষান্তরে যখনই তাহাদের দাবি অনুসারে কোন মু'জিযা বাস্তবায়িত হইত তখন তাহারাই উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিত। বস্তুত এইরূপ গোঁয়ার্তুমি ও কুপমন্ডুকতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনও জাহেরী মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিয়া উপকৃত হইতে পারে না বরং তাহারা নিজেদের অন্তরের কপটতার দরুন জাহেরী মু'জিযাকে যাদু ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং নবৃওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উহাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে। হযরত মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার অনুসারিদেরকে অনেক মু'জিযা দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রতিটি মু'জিযার ক্ষেত্রেই মূসা (আ)-কে ফিরআওনের মুখে একই জবাব শুনিতে হইয়াছিল, "তুমি মহাযাদুকর" (انك لساحر عليم) অথবা "ইহা তো প্রকাশ্য যাদু" (ان هذا الا سحر مبين) অথবা "এই মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারূন উভয়ে যাদুকর" (أن هذان لسحران) (দ্র. ৫:১১০; ৬: ৭৬; ১০: ৭৬; ১১: ৭; ২৭: ১৩; ৩৪: ৪৩; ৩৭: ১৫; ২০: ৬৩; ৭: ১১২)।
আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া মিসরের সমস্ত যাদুকর সিজদায় পতিত হইয়াছিল এবং 'তাহাদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করিয়া চির সৌভাগ্যমণ্ডিত হইয়াছিল। কিন্তু ফিরআওনের মুখে ছিল পূর্বের সেই একই কথা, অভিন্ন বুল : ﴿إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ﴾ “সে তো তোমাদের (যাদুকর) প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে” (২০ঃ ৭১)।
নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদের নবুওয়াত ও রিসালাতের দাবির স্বপক্ষে যেই প্রমাণ তথা মু'জিযা প্রদান করিয়াছেন তাহা প্রথমত দুই প্রকারের— জাহেরী (ظاهری) বা বস্তুভিত্তিক এবং বাতেনী (باطنی) বা. আত্মিক। জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক' মু'জিযা, যেমন মৃতকে জীবিত করা, যষ্টিকে সর্পে পরিণত করা, আঙ্গুল হইতে পানির প্রবাহ জারী হওয়া, রুগ্নকে সুস্থ করা, চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, সমুদ্র বক্ষে চলার পথ তৈরী হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। আর বাতেনী ও আত্মিক (রূহানী) মু'জিযা হইতেছে— নবৃওয়াতের দাবিদারের সত্যতা, নবীগণের নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়া, তাঁহাদের প্রভাব শক্তি, সফলতা ও গায়বী সাহায্য ইত্যাদি। ইহার মধ্যে পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বাতেনী মু'জিযা। বস্তুত নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে এই সমস্ত আত্মিক ও রূহানী নিদর্শন। আর জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাসমূহ শুধুই আবরণ এবং বাহিরের প্রতি দৃষ্টি দানকারীদের জন্য। এই কারণে দেখা যায়, যাহারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গূঢ় মর্মজ্ঞানী, তাহারা কখনও জাহেরী মু'জিযা তলব করেন নাই। অনুরূপ নবী-রাসূলগণের যুগে যাহারা শিক্ষিত সমাজ হিসাবে পরিচিত ছিল তাহারাও নবী-রাসূলগণের নিকট কোন জাহেরী মু'জিযা দাবি করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগের আহলে কিতাবগণ। তাহারা সন্দেহপ্রবণ মন লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে বারংবার উপস্থিত হইয়াছেন, তাঁহার সত্যতার পরীক্ষা লইয়াছেন। কিন্তু তাহাদের পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি ছিল? তাহা ছিল এই যে, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চরিত্র ও আখলাক পরীক্ষা করিয়াছিল। তাহারা অতীতের বনী ইসরাঈলী নবী-রাসূলের অবস্থাসমূহ ও ঘটনাবলী জিজ্ঞাসা করিয়াছিল এবং তাঁহার শিক্ষা ও উলূমের ভাণ্ডার পর্যালোচনা করিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে কেহই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট- জাহেরী মু'জিযা তলব করে নাই। কারণ তাহারা জানিত যে, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার আসল ও মৌলিক প্রমাণ হইতেছে দাবিদারের আধ্যাত্মিক ও অভ্যন্তরীণ দিক এবং তাঁহার 'আখলাক ও চারিত্রিক অবস্থা। ঠিক একই কারণে আমরা দেখিতে পাই যে, তৎকালীন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দূত হযরত দিহয়া কালবী (রা) উপস্থিত হইলেন এবং সম্রাটের নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র পেশ করিলেন তখন হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা যাচাই করিবার জন্য কুরায়শ সর্দার আবূ সুফয়ানকে রাজ দরবারে ডাকাইয়া আনিয়া কতিপয় প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তাহার এই প্রশ্নগুলির সমস্তটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, চরিত্র এবং প্রভাব সম্বন্ধে। সবশেষে হিরাক্লিয়াস বলিয়াছিলেন, তুমি (আবূ সুফয়ান) যাহা বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে মুহাম্মাদ (স) অবশ্যই আল্লাহ্ প্রেরিত নবী এবং রাসূল (সহীহুল বুখারী, ১০খ., পৃ. ৪)।
অনুরূপ নাজরানের খৃস্টান বিদ্বানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইয়া কুরআনের আয়াতসমূহ শ্রবণ করিল এবং মুসলমানদের আত্মিক বিকাশের অবস্থা লক্ষ্য করিল। তৎপর তাহারা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইসলামের সিদ্ধান্ত কি তাহা জানিতে চাহিল। সবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) আল-কুরআনের হুকুম মুতাবিক তাহাদের সহিত মুবাহালা করিতে চ্যালেঞ্জ প্রদান করিলেন। কিন্তু তাহারা ইহাতে সম্মত হইল না। তাহারা পরস্পর বলিতে লাগিল, প্রকৃতই যদি মুহাম্মাদ (স) নবী হন তাহা হইলে আমরা সবংশে ধ্বংস হইয়া যাইবে। পরিশেষে তাহারা বাৎসরিক খারাজ আদায় করিবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করিল। লক্ষ্য করুন, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক শিক্ষা ও তাঁহার আখলাক-চরিত্র ও আচার-অনুষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছে, কিন্তু দাবি প্রমাণের জন্য বাহ্যিক বস্তুভিত্তিক কোন মু'জিযা তলব করে নাই (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৩১-৬৩৭)।
স্বয়ং আরবের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কথা পর্যালোচনা করিয়া দেখুন। তাহাদের হাজারও ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা স্বীকার করিয়াছেন, তাঁহার প্রতি ঈমান আনয়ন করিয়াছেন। অথচ তাঁহারা কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাতেনী ও আত্মিক মু'জিযা অনুধাবন করিয়াছেন, তাহাদের একজনও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযা দাবি করেন নাই। যথা হযরত খাদীজা (রা), হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আলী (রা), আম্মার (রা), হযরত ইয়াসির (রা), হযরত আবু যর গিফারী (রা), হযরত বেলাল (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম। হযরত আবূ যার গিফারী (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির কথা জানিতে পারিলেন, তখন স্বীয় ভ্রাতাকে বলিলেন, ঐ ব্যক্তির নিকট যাও। সে দাবি করিয়াছে যে, তাঁহার নিকট আসমান হইতে ওহী আসিয়াছে। তাঁহার অবস্থা পর্যবেক্ষণ কর। তাহার ভ্রাতা মক্কায় আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আবূ যার গিফারী (রা)-কে বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। তিনি সচ্চরিত্রের নির্দেশ দেন এবং তিনি এমন কালাম পেশ করেন যাহা কবিতা নহে (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৭)।
হযরত জা'ফার (রা) আবিসিনিয়ায় নাজাশীর দরবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের পরিচয় সম্বন্ধে ভাষণ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলেন, হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞ ও জাহেল সমাজ। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করিতাম, দুষ্কর্ম লিপ্ত ছিলাম, প্রতিবেশীদের উপর অবিচার করিতাম, পরস্পর হানাহানি ও মারামারি করিতাম, দুর্বল লোককে সবল লোক নিশ্চিহ্ন করিয়া দিত। এমন অমানিশা ও দুর্যোগের সময় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আবির্ভূত হইলেন—যাঁহার ভদ্র ও শিষ্ট আচরণ, সততা, ন্যায়ানুবর্তিতা সম্পর্কে আমরা পূর্বেই জ্ঞাত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করিলেন। তিনি আমাদের এই শিক্ষা দিলেন যে, আমরা যেন মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, সত্য কথা বলি, রক্তপাত হইতে বিরত থাকি, ইয়াতীমের অধিকার হরণ না করি, প্রতিবেশীদের কষ্ট না দেই, সতী রমণীদের প্রতি যেনার মিথ্যা অপবাদ আরোপ না করি, নামায আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, সিয়াম পালন করি। আমরা এই সমস্ত কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি, শিরক বর্জন করিয়াছি, সকল প্রকার অপকর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৩২; মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ২০২)।
আলোচনার সারাংশ এই যে, নবুওয়াত ও রিসালাতের আসল ও মৌলিক দলীল হইতেছে, নবী-রাসূলগণের বাতেনী ও আধ্যাত্মিক মু'জিযা ও নিদর্শনাবলী। তবে তাঁহাদের জাহেরী ও বস্তুভিত্তিক মু'জিযাও ছিল। তাই পবিত্র কুরআনে লক্ষ্য করিলে দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা অতীত নবী-রাসূলগণের জীবনেতিহাস বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তাঁহাদের জাহেরী মু'জিযার বিস্তৃত বর্ণনা পেশ করিয়াছেন। তথা হয়রত মূসা (আ)-এর যষ্টি সর্পে পরিণত হওয়া, তাঁহার হস্ত শুভ্র আলোকোজ্জ্বল হওয়া, হযরত সালিহ (আ)-এর সময়ে পাথরের মধ্য হইতে উষ্ট্রী বাহির হইয়া আসা, হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে মৃত ব্যক্তির জীবিত হইয়া যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়া ইত্যাদি। নবীগণের জাহেরী ও বাতেনী মুজিয়ার আরও একটি পর্যায়লোচনা এই যে, জাহেরী ও বস্তুতিক্ত মুজিয়া শুধু ঐ সমস্ত লোক তলব করে যাহাদের অন্তরচক্ষু অন্ধ এবং যাহারা বিরুদ্ধবাদিতা, পক্ষপাতিত্ব এবং কুপমন্ডুকতাসুলভ মনোভাবের কারণে সত্যকে মানিয়া লইতে রাজি হয় না। বস্তুত গোঁড়া কাফিররাই জাহেরী মুজিয়া তলব করিয়া থাকে। এই কারণে দেখা যায়, পবিত্র কুরআনে মুজিয়া তলব সংক্রান্ত দাবিগুলিকে সর্বদা কাফিরদের প্রতিই আরোপ করা হইয়াছে। যথা:
وَقَالَ الَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ لَوْلَا يُكَلِّمُنَا اللّٰهُ اَوْ تَأْتِيْنَا اٰيَةٌ كَذٰلِكَ قَالَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّثْلَ قَوْلِهِمْ تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ قَدْ بَيَّنَّا الْاٰيٰتِ لِقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
“এবং যাহারা কিছু জানে না তাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কেন, কিংবা কোন নিদর্শন আমাদের নিকট আসে না কেন? এইভাবে তাহাদের পূর্ববর্তীরাও তাহাদের অনুরূপ কথা বলিত। তাহাদের অন্তর একই রকম। আমি দৃঢ় প্রত্যয়শীলদের জন্য নিদর্শনাবলী স্পষ্টভাবে বিবৃত করিয়াছি।” (২:১১b)।
وَقَالُوْا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ قُلْ اِنَّ اللّٰهَ قَادِرٌ عَلٰى اَنْ يُّنَزِّلَ اٰيَةً وَّلٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ
“তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? বল, নিদর্শন নাযিল করিতে আল্লাহ অবশ্যই সক্ষম, কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই জানে না” (৬:৩৭)।
وَيَقُوْلُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْلَا اُنْزِلَ عَلَيْهِ اٰيَةٌ مِّنْ رَّبِّهٖ اِنَّمَا اَنْتَ مُنْذِرٌ وَّلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ
“যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তাহার নিকট কোন নিদর্শন নাযিল করা হয় না কেন? তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আছে পথপ্রদর্শক” (১৩:৭)।
وَقَالُوْا لَوْلَا يَأْتِيْنَا بِاٰيَةٍ مِّنْ رَّبِّهٖ اَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِى الصُّحُفِ الْاُوْلٰى
“তাহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে আমাদের নিকট কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যাহা আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে” (২০:১৩৩)।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে লক্ষণীয় যে, প্রত্যেক আয়াতেই মুজিয়া তলব করার বিষয়টি কাফিরদের প্রতি আরোপ করা হইয়াছে। পুণ্যবানগণ কখনও মুজিয়া তলব করেন নাই। ইহা হইতে এই কথাও প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আ)-কে প্রদত্ত মুজিয়া বনী ইসরাইলের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হয় নাই, বরং ফিরআওন ও তাহার অনুসারীদের দাবির প্রেক্ষিতে দেওয়া হইয়া ছিল। তাই যখন হাওয়ারীগণ ঈসা (আ)-এর নিকট খাদ্যভর্তি আসমানী খাঞ্চার জন্য বলিল- ﴿يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ ﴾
“হে মরিয়ম-তনয় ঈসা! আপনার পালনকর্তা কি এইরূপ করিতে পারেন যে, আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করিয়া দিবেন”? তখন ঈসা (আ) উত্তরে বলিলেন-
﴿اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ﴾
"যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহকে ভয় কর"। ইহাতে বুঝা যায়, ঈমানদার বান্দার পক্ষে এ ধরনের ফরমাইশ করিয়া আল্লাহকে পরীক্ষা করা কিংবা তাঁহার কাছে অলৌকিক বিষয় দাবি করা একান্তই অনুচিত (পবিত্র কুরআনুল-করীম, অনূদিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ৩৬৩)। এমনিভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট মু'জিযাসমূহ হযরত আবূ বকর, উমার এবং উছমান (রা) তলব করেন নাই, বরং আবূ জাহল, আবু লাহাব, উৎবা, শায়বা প্রমুখ কাফিররাই তলব করিয়াছিল। অন্যান্য নবী-রাসূলগণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কাফিররা জাহেরী মু'জিযা তলব করিত তাহাদের শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ এবং অন্তরের হঠকারিতা ও গোঁয়ার্তুমির বশবর্তী হইয়া-সত্যানুসন্ধানী হইয়া নহে। এই কারণে তাহারা একের পর এক জাহেরী মু'জিযা তলব করিয়াই যাইতেছিল। পক্ষান্তরে যখনই তাহাদের দাবি অনুসারে কোন মু'জিযা বাস্তবায়িত হইত তখন তাহারাই উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিত। বস্তুত এইরূপ গোঁয়ার্তুমি ও কুপমন্ডুকতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনও জাহেরী মু'জিযা প্রত্যক্ষ করিয়া উপকৃত হইতে পারে না বরং তাহারা নিজেদের অন্তরের কপটতার দরুন জাহেরী মু'জিযাকে যাদু ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং নবৃওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসাবে উহাকে মানিয়া লইতে অস্বীকার করে। হযরত মূসা (আ) ফিরআওন ও তাহার অনুসারিদেরকে অনেক মু'জিযা দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু প্রতিটি মু'জিযার ক্ষেত্রেই মূসা (আ)-কে ফিরআওনের মুখে একই জবাব শুনিতে হইয়াছিল, "তুমি মহাযাদুকর" (انك لساحر عليم) অথবা "ইহা তো প্রকাশ্য যাদু" (ان هذا الا سحر مبين) অথবা "এই মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারূন উভয়ে যাদুকর" (أن هذان لسحران) (দ্র. ৫:১১০; ৬: ৭৬; ১০: ৭৬; ১১: ৭; ২৭: ১৩; ৩৪: ৪৩; ৩৭: ১৫; ২০: ৬৩; ৭: ১১২)।
আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা দেখিয়া মিসরের সমস্ত যাদুকর সিজদায় পতিত হইয়াছিল এবং 'তাহাদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করিয়া চির সৌভাগ্যমণ্ডিত হইয়াছিল। কিন্তু ফিরআওনের মুখে ছিল পূর্বের সেই একই কথা, অভিন্ন বুল : ﴿إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ ﴾ “সে তো তোমাদের (যাদুকর) প্রধান, সে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়াছে” (২০ঃ ৭১)।
শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ক্ষেত্রে ঠিক একই অবস্থা ঘটিয়াছিল। কাফির কুরায়শ সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট মু'জিযা তলব করিয়াছিল এবং মু'জিযার বিকাশ প্রত্যক্ষ করিবার পরই তাঁহাকে যাদুকর বা কাহিনীকার বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল (দ্র. আল-কুরআন ৭৪: ২৪; ৫২: ২৯, ৩০; ৫৪ : ১-২; ৬৯ : ৪০, ৪৮)।
উপরে উল্লিখিত আলোচনার দ্বারা একটি সংশয়ের অবসানও হইয়া গেল যে, পবিত্র কুরআন ও হাদীছে লক্ষ্য করা যায় যে, মক্কার কাফিররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বারবার মু'জিযা তলব করিয়াছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সেই দাবি অনুসারে মু'জিযা প্রদর্শন করেন নাই কেন?
বস্তুত তাহাদেরকে অনেক জাহেরী মু'জিযা প্রদর্শন করান হইয়াছিল, কিন্তু জাহেরী মু'জিযা দ্বারা কাফিরদের মন কখনও শান্ত হয় না এবং ইহাতে তাহারা কখনও হিদায়াত লাভ করিতে পারে না। কারণ এই সমস্ত মু'জিযা তলবের পশ্চাতে তাহাদের অন্তরের কপটতা, হিংসা, দ্বেষ ও গোঁয়াতুমি কার্যকর থাকে। এই অবস্থায় তাহাদের প্রার্থিত মু'জিযা সংঘটনে তাহাদের বিশেষ কোন ফায়দা হইত না, বরং ইহা তাহাদের অন্তরের শঠতাকে আরও বৃদ্ধি করিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ "এবং যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, ইহা তাহাদের কলুষের সহিত আরও কলুষ যুক্ত করে" (৯: ১২৫; আরও দ্র. ২: ১০; ৭১: ২৪, ২৮; ১৭: ৮২; ৫: ৬৪, ৬৮)।
তাই পবিত্র কুরআনে জাহেরী মু'জিযা তলবের কারণে কাফিরদেরকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে এবং বাতেনী মু'জিযার প্রতি তাহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইতেছে:
وَقَالُوا لَوْ لَا يَأْتِينَا بِآيَةٍ مِّنْ رَبِّهِ أَوَلَمْ تَأْتِهِمْ بَيِّنَةُ مَا فِي الصُّحُفِ الْأُولَى "উহারা বলে, সে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে কোন নিদর্শন আনয়ন করে না কেন? উহাদের নিকট কি আসে নাই সুস্পষ্ট প্রমাণ যাহা আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে" (২০: ১৩৩)?
وَقَالُوا لَوْلَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ أَيَتْ مِنْ رَبِّهِ قُلْ إِنَّمَا الْآيَتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُّبِينٌ . أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ "উহারা বলে, তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহার নিকট নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? বল, নিদর্শন আল্লাহর এখতিয়ারে; আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। ইহা কি উহাদের জন্য যথেষ্ট নহে যে, আমি তোমার নিকট কুরআন নাযিল করিয়াছি, যাহা উহাদের নিকট পাঠ করা হয়? ইহাতে অবশ্যই মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য অনুগ্রহ এবং উপদেশ রহিয়াছে" (২৯: ৫০-৫১)।
এই কারণেই পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কাফিরদের জাহেরী মু'জিযা তলবের প্রতিউত্তরে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কেবল এতটুকু বলিতে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, "আমি তো কেবল একজন মানুষ এবং পয়গাম্বর"। ইরশাদ হইয়াছে :
وَ قَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنْبُوعًا ، أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَرَ خِلْلَهَا تَفْجِيرًا ، أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالمَلْئِكَةِ قَبِيلاً ، أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّنْ زُخْرُفَ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرَقِيَّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتبًا نَّقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولاً
“এবং উহারা বলে, আমরা কখনও তোমাতে ঈমান আনিব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হইতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করিবে অথবা তোমার খেজুরের বা আংগুরের এক বাগান হইবে, যাহার ফাঁকে-ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করিবে নদী-নালা। অথবা তুমি যেমন বলিয়া থাক, তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া আমাদের উপর ফেলিবে অথবা আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করিবে অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে। কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি কিতাব নাযিল না করিবে, যাহা আমরা পাঠ করিব। বল, পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল” (১৭:৯০-৯৩)।